এমপি রনির দুষ্টচক্র by রাশেদ মেহেদী ও মুফতী সালাহউদ্দিন,

টুয়াখালী-৩ আসনের এমপি গোলাম মাওলা রনির বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আর নিজস্ব বাহিনীর দাপটে অতিষ্ঠ গলাচিপা-দশমিনার সাধারণ মানুষ। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত এই এমপির বিএনপি-জামায়াত প্রীতির কারণে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দলও। রনির শ্যালক মকবুল খান ও ছোট ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন 'ভাইয়া বাহিনী' দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো এলাকা। গলাচিপা-দশমিনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার, টিআর-কাবিখাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি_ সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে ভাইয়া বাহিনী।


গত ২০ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের সভায় খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপি রনিকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে বিতর্কিত এই সাংসদকে 'মীরজাফর' বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। দলের অন্য সাংসদরাও রনির কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী এমপি রনিকে যথার্থই মীরজাফর বলেছেন। তার বিরুদ্ধে আরও নেতিবাচক বিশেষণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারা মনে করছেন, দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী তাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদিকে এলাকাবাসী বলছেন,
রনির বিরুদ্ধে লুটপাট, চাঁদাবাজির যেসব খবর প্রকাশ হয় তা বাস্তবের তুলনায় খুবই নগণ্য। সুষ্ঠু তদন্ত করলে বিশ-ত্রিশ গুণ বেশি দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে। মহাদুর্নীতিবাজ এ সাংসদের বিভিন্ন অপকর্মের কিঞ্চিৎ আজ প্রকাশ করা হলো।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমপি রনির বিভিন্ন কুকর্মে পটুয়াখালীর দুটি উপজেলায় যখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছিল, ঠিক তখনই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। এমপির তৎপরতায় রাদনাবাদ আর রণগোপালদী নদীর তীর গলাচিপায় চলছে তীব্র উত্তেজনা। যে কোনো মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রাদনবাদের স্রোতের সঙ্গে মিশে যেতে পারে খোদ আওয়ামী লীগেরই নেতাকর্মীদের রক্তস্রোত। এ অবস্থায় গলাচিপা-দশমিনা এলাকার পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগ এমপি রনির বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত প্রীতির অভিযোগ এনেছে। গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগও করেছেন। সেখানে রনির বিরুদ্ধে হতদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসূচির অর্থ লুটপাটসহ টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়। এলাকাবাসী বলেন, নির্বাচনের আগে এলাকায় কেউ তাকে চিনত না। নির্বাচনী প্রচারাভিযানে এসে মিষ্টি কথা বলে সবাইকে ভুল বুঝিয়েছেন। এখন তার স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। এমপি রনি অবশ্য দাবি করেন, এলাকায় যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি এবং সাধারণ মানুষের জমি দখল করেছিল, তাদের কাছ থেকে সেসব দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার কারণেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে। ভাইয়া বাহিনী নামে তার কোনো বাহিনী নেই, এটা কিছু মানুষ এবং মিডিয়ার অসুস্থ চিন্তা থেকে জন্ম নিয়েছে বলেও দাবি করেন রনি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লিখিত অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা অভিযোগ করেছেন, তাদের স্ট্যাটাস আমার চেয়ে অনেক নিচে। এ অভিযোগ মোটেও গুরুত্ব দেওয়ার মতো বিষয় নয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমার সম্পর্কে ভালো জানেন।
মকবুল-সারোয়ার বাহিনীর আতঙ্কে পুরো এলাকা
পটুয়াখালী থেকে হরিদেবপুর ঘাট পর্যন্ত ভাঙাচোরা রাস্তায় বাসে যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। হরিদেবপুর ঘাট থেকে রাদনাবাদ নদী পার হলেই গলাচিপা। খেয়া নৌকা গলাচিপা প্রান্তে আসতেই চোখে পড়ে নদীর হাঁটুজলের ভেতর তিন-চার ইঞ্চি পর্যন্ত ইটের গাঁথুনি। কিছু নির্মাণসামগ্রী বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। এলাকাবাসী জানান, এ নদীতীর দখল করে এখানে স্টেডিয়াম আর শিশুপার্কের আড়ালে একটি মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন এমপি রনি। বেসরকারি সংগঠন বেলার একটি রিট আবেদনের কারণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞায় স্থগিত হয়ে গেছে সেই প্রকল্প। ঘাটের বাজারে অনেকেই জানালেন, এলাকায় এখন কেউ রনির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পায় না। তার লোকজন আশপাশ কোথায় কে আছে, কেউ জানে না। মকুবল-সারোয়ার বাহিনী কখন কোত্থেকে এসে কার ওপর হামলা করবে সে আতঙ্কও আছে সব সময়।
মকবুল বাহিনীর মকবুলের পুরো নাম মকবুল খান। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি স্থানীয় ডাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি এমপি রনির শ্যালক। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর রনি এলাকায় এসে প্রকাশ্যেই মকবুল খানকে এলাকার নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কাছে তার স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর মেয়র হাজি আবদুল ওয়াহাব খলিফা এই মকবুল খান সম্পর্কে জানান, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মকবুল খান যুবদল ক্যাডার হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিল এবং এলাকায় যুবলীগ নেতা মুকুল হত্যাসহ আওয়ামী লীগ অফিস পোড়ানোয় নেতৃত্ব দেয়। এমপি রনি নিজের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে পরিচয় করে দেওয়ার পরই এলাকাবাসী জানতে পারেন, মকবুল খান আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে গোলাম সারোয়ার এমপি রনির ছোট ভাই এবং উলানিয়া বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী। চলতি বছরের প্রথমদিকে মকবুল বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে সারোয়ার তার নেতৃত্বে আরও একটি বাহিনী তৈরি করে। এ বাহিনী বর্তমানে ভাইয়া বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মকবুলকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর থেকেই মকবুল বাহিনীর প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড শুরু হয়। তাদের প্রথম কর্মকাণ্ড ছিল হতদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসূচির বরাদ্দ দখল। এ বরাদ্দ নিয়ে সীমাহীন লুটপাটের চিত্র পাওয়া যায় গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত আট সদস্য এবং তিন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের অভিযোগ থেকে। গলাচিপা অগ্রণী ব্যাংক শাখার ম্যানেজারের কাছে করা অভিযোগে বলা হয়_ তদন্তে দেখা গেছে, ৪০ দিনের কর্মসূচিতে কাজ করার জন্য ৩০৮ জনের যে তালিকা হয়েছে তার মধ্যে মাত্র ৮০ জনের অস্তিত্ব রয়েছে। বাকি ২২৮ জনের নাম মনগড়াভাবে দেওয়া হয়েছে। এলাকায় তাদের অস্তিত্ব নেই। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির যোগসাজশে টাকা তুলে কিছু ব্যক্তি নিজেরা ভোগ করছে।
জানা গেছে, এ প্রকল্পে দৈনিক ১৫০ টাকা হিসাবে শ্রমিকদের তিন পর্যায়ে কাজ করার কথা ছিল। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী প্রায় হতদরিদ্রদের তালিকায় ৮০ শতাংশ ভুয়া হলে একটি ইউনিয়নের ভুয়া তালিকা দিয়ে ১৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ হিসাবে গলাচিপা উপজেলার ১২টি এবং দশমিনা উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ব্যাপারে গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা টিটো বলেন, এটা লুটপাটের খুব নগণ্য একটি হিসাব। এখন গলাচিপা-দশমিনার টেন্ডার, টিআর-কাবিখা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে মকবুল বাহিনী বা ভাইয়া বাহিনী।
এলাকায় মকবুল বাহিনীর সন্ত্রাস সম্পর্কে গলাচিপা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক সন্তোষ কুমার দে সমকালকে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ২০১০ সালের ১৭ আগস্ট পানপট্টি স্কুলমাঠে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভা শুরুর কিছুক্ষণ পরই সেখানে মকবুল বাহিনী অস্ত্র নিয়ে হামলা করে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সব শ্রেণীর নেতাকর্মীসহ সভায় উপস্থিত সাধারণ মানুষকে বেধড়ক মারধর করে মকবুল বাহিনী। পৌর চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াহাব খলিফা বলেন, ২০০৯ সালের ১৫ আগস্ট পালনেও এমপি রনি বাধা দেন। দীর্ঘদিনের পুরনো রীতি অনুযায়ী কাঙালিভোজের আয়োজন করা যায়নি। পরে ১৯ আগস্ট এমপি রনি এলাকায় এসে সমাবেশ করে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন অর রশিদকে জুতাপেটা করার ঘোষণা দেন মাইকে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে এবং খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এলাকায় মকবুল বাহিনীর গত আড়াই বছরে সন্ত্রাসের তালিকা বেশ দীর্ঘ। এমপি রনির নদী ভরাটের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশ হওয়ায় ২০০৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দুটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় দুই প্রতিনিধির বিরুদ্ধে সাজানো ধর্ষণ মামলা দেওয়া হয়। এর পর খবর পেয়ে পটুয়াখালী থেকে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা গলাচিপা যাওয়ার জন্য হরিদেবপুর ঘাটে এলে তাদের ওপর হামলা করে মকবুল বাহিনী। এটিই মকবুল বাহিনীর প্রথম প্রকাশ্যে বড় হামলা। এরপর ২০০৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান তালুকদার গলাচিপায় একটি বেড়িবাঁধের কার্যক্রম পরিদর্শনে গেলে মঞ্চ ও তোরণ পুড়িয়ে দেয় মকবুল বাহিনী। একই বছর ডিসেম্বরে উপজেলা পরিষদের সামনে উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ, পরের বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি গলাচিপা পৌর চেয়ারম্যান ওয়াহাব খলিফা, ১৯ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতা কাশিনাথ দত্তের ওপর হামলা চালায় তারা। কাশিনাথ দত্তের ওপর হামলার প্রতিবাদে একই দিন মিছিল বের হলে সে মিছিলেও হামলা করে মকবুল বাহিনী। এ হামলায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। হামলায় মারধরের শিকার হন দশমিনা উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ডা. শামসুন্নাহার ডলি। এলাকাবাসী জানান, বর্তমানে মকবুল বাহিনীর বিপরীতে এমপি রনির ছোট ভাই সারোয়ারের নেতৃত্বে আরও একটি বাহিনী তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে মকবুল-সারোয়ার ক্ষমতার দ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছে বলে এলাকার অনেকে জানান।
গোলাম মাওলা রনি সমকালকে বলেন, ভাইয়া বা মকবুল বাহিনী নামে কোনো বাহিনী গলাচিপা-দশমিনায় নেই। আমার ছোট ভাই কিংবা শ্যালকের নেতৃত্বে কোনো বাহিনী থাকার প্রশ্নই ওঠে না। এটা কিছু অসুস্থ মানসিকতার মানুষের বিকৃত প্রচার। এলাকায় আমি আগে পরিচিত ছিলাম না। এখন আমার যে পরিচিতি তাতে এলাকা নিয়ন্ত্রণে বাহিনী লাগে না। এলাকায় গিয়ে একা মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াই। তিনি বলেন, কাউকে মারতে চাইলে একাই পারি। মকবুল আমার শ্যালক। সে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। আমার পরিবারে আমি, মকবুল আর আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ আওয়ামী লীগ করে না। মকবুল একসময় বিএনপি করতে পারে, কারণ শ্বশুরকুলের সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমার মামাশ্বশুর শাহজাহান খান গত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। এখন মকবুল আওয়ামী লীগ করে।
এমপি রনি বলেন, ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে জমি উদ্ধার করে সাধারণ মানুষকে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে মদ-গাঁজার আসর। এ কারণে ভূমিদস্যু, মাদক ব্যবসায়ীরা ক্ষিপ্ত হয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এমপির দাবি, ৪০ দিনের কর্মসূচি, টিআর-কাবিখা দেখে উপজেলা প্রশাসন। এর সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। নদী দখল নিয়ে যে অভিযোগ, তার সঙ্গেও আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। সেটাও উপজেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত। তিনি অবশ্য বলেন, আসলে নদী দখল করা হয়নি, ওখানে চর ছিল, নদী ছিল না। বিভিন্ন সময়ে হামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, কেউ ঝামেলা করতে এলে বিনা বাধায় ছেড়ে দেওয়ার কারণ নেই। আগে থেকে আমরা কারও প্রতি হামলা করেছি, এটা কেউ বলতে পারবে না। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাটি সাজানো ছিল। যে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা ছিল, সে সাংবাদিকের বড় ভাই আমার কাছে এসেছিলেন। আমি বুঝতে পারি, মামলাটি সঠিক ছিল না। সে মামলা তো এখন আর নেই। রনি বলেন, টেন্ডারবাজি করার কোনো প্রশ্ন কিংবা সুযোগ নেই। কারণ পটুয়াখালীর সব টেন্ডার প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া আর পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান নিয়ন্ত্রণ করেন। ৪০ দিনের কর্মসূচিসহ যারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ করছে, তারা এর একটিও প্রমাণ করতে পারলে আমি সংসদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করব।
রনির বিএনপি-জামায়াত প্রীতি : কিছুদিন আগে গলাচিপা আওয়ামী লীগ সভাপতি হারুন অর রশীদ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা টিটো এমপি রনির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগকারীদের স্বাক্ষর করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়, 'এমপি এলাকায় এলেই জামায়াত নেতা মাওলানা জামাল উদ্দিনকে নিয়ে মাহফিল করেন। জঙ্গি সংগঠনের সাহায্যদাতা হিসেবে সমালোচিত মুসলিম এইডের যুক্তরাজ্য শাখার কান্ট্রি ডিরেক্টর ওলামা ফাদুল্লাহকে নিয়ে এসে গলাচিপা ডিগ্রি কলেজে এমপি রনি অন্তত তিনবার মিটিং করেছেন। জামায়াত পরিচালিত আইডিয়াল স্কুল এমপিওভুক্তির জন্য এমপি শিক্ষামন্ত্রীর কাছেও ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এলাকার চিহ্নিত রাজাকার ও জামায়াতের রোকন আবদুল জব্বার খানকে চরবিশ্বাস কলেজের অধ্যক্ষ রেখেই ওই কলেজ এমপিওভুক্ত করে দেন। এ ছাড়া তিনি নির্বাচনের পরদিন ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রথমেই যান গলাচিপা বিএনপি অফিসে। সেখানে গিয়ে তিনি বিএনপি-জামায়াত নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি আওয়ামী লীগের স্থানীয় ১১ নেতার বিরুদ্ধে সাজানো মামলা দিলেও এখন পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের কাউকে তিনি স্পর্শ করেনি।'
অভিযোগে আরও বলা হয়, 'এমপি রনি ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল জেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ না করেই উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রেজাউল করিম এবং প্রচার সম্পাদক কাজী শহীদকে সাধারণ সম্পাদক করে গলাচিপা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন এবং স্থানীয় হাইস্কুল চত্বরে আওয়ামী লীগের পৃথক একটি অফিস চালু করেন।'
স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, গলাচিপা আওয়ামী লীগ এখন 'রনি লীগ' এবং 'আওয়ামী লীগ' এ দু'ভাগে বিভক্ত। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা টিটো বলেন, রনির রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তিনি কখনও কোনো পর্যায়ে আওয়ামী লীগের কমিটিতে ছিলেন না। তার শ্বশুরবাড়ির সবাই বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। তিনি বলেন, এমপি রনির আদি বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুরেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তার পরিবারের সবাই মুসলিম লীগ এবং বিএনপির সঙ্গে ছিলেন। তাকে কীভাবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তা জানি না। তিনি বলেন, এমপি রনির ভাইয়া বাহিনীর হামলা এতদিন সহ্য করেছি। এমপি রনির প্রকাশ্য বিএনপি-জামায়াত প্রীতির কারণে এখন অবস্থা এমন যে, এলাকায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, আওয়ামী লীগের রাজনীতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমরা এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছি। তিনি বলেন, দলের কেন্দ্র পর্যায়েও বারবার জানানো হয়েছে। আমাদের কথা বিশ্বাস না হলে সবাই এসে দেখে যাক, এলাকায় এমপি রনি কাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।
এ আসনের সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন সমকালকে বলেন, এমপি রনির শ্বশুরবাড়ি কিংবা তার পরিবারের কেউই কখনও আওয়ামী লীগকে ভোট দেননি। এটুকু বলতে পারি, রনি আগে কখনও আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন না, তার কর্মকাণ্ডের কারণে ভবিষ্যতেও তিনি আওয়ামী লীগের কেউ থাকবেন না।
এলাকার প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যাপক সন্তোষ কুমার দে সমকালকে বলেন, দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ব্যবস্থা না নিলে এলাকায় বড় ঘটনা ঘটতে পারে। এমপি রনির বিএনপি-জামায়াত প্রীতি এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলার কারণে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অতিষ্ঠ।
নিজের সম্পর্কে রনি যা বলেন : এমপি গোলাম মাওলা রনি সমকালকে বলেন, এলাকার পৌর মেয়র ওহাব খলিফা, উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন অর রশীদ, অধ্যাপক সন্তোষ কুমার দে, কাশীনাথ বসাক সবাই খুব খারাপ লোক। হারুন অর রশীদ, ওহাব খলিফা ভূমিদস্যু। তারা এমপি খ ম জাহাঙ্গীরকে ভেট দিয়ে খাসজমি দখল করত। আর সন্তোষ কুমার দে এলাকায় গোপনে মদের ব্যবসা করত। আমি শক্ত হাতে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করেছি। এ কারণে তারা আমার বিরুদ্ধে এত কথা বলছে। আমি স্পষ্ট বলতে চাই, যারা আমার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেছেন বলে প্রচার করছেন, তাদের অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।
রনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে অনেক ভালো জানেন। আমি টেলিভিশনের টক শোতে অনেক স্পষ্ট কথা বলি। এ নিয়ে আমাকে কখনও প্রধানমন্ত্রী কিছু বলেননি। জামায়াত সংশ্লিষ্টতা আমার কখনও ছিল না, এখনও নেই। আমি ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রলীগ করি। গলাচিপায় আমার শ্বশুরকুলের প্রায় সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়টি গোপন নয়। এটাকে পুঁজি করে অপপ্রচার চালিয়ে লাভ হবে না। কারণ এলাকায় যে পরিমাণ উন্নয়ন কাজ করেছি সারাদেশের আর কোথাও এত কাজ হয়নি। ৪ হাজার কোটি টাকায় আমার উপজেলায় দেশের বৃহৎ বীজক্ষেত্র হচ্ছে। দুটি ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে। এলাকার সব ইউনিয়নে কানেক্টিং সড়ক করেছি। আবার মনোনয়ন পেলে আগের চেয়ে আরও ২০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হবো। তিনি বলেন, আমি সাংবাদিক হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছিলাম। ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর পত্রিকায় ১ হাজার টাকা বেতনে আমার কর্মজীবন শুরু। এখন আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৫০০ কোটি টাকা। আমার বিরুদ্ধে এত লেখালেখি, সমালোচনা আমাকে বরং আরও পরিচিতি এনে দিয়েছে। টক শোতে আমার বক্তব্য সবাই পছন্দ করে। সারাদেশে এক নামে সবাই আমাকে চেনে।
রনি বলেন, আমি তিনটি পত্রিকার বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার স্যুট মামলা করেছি। দেশের একটি খ্যাতনামা ল' ফার্ম এ মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। আমি সাংবাদিক ছিলাম। এ কারণে আমি জানি, কোন সংবাদ কেন, কী উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়। কোন সংবাদ মালিকের চাওয়া আর কোন সংবাদ সাংবাদিকদের বিশেষ উদ্দেশ্যে লেখা।
আওয়ামী লীগ সংসদীয় কমিটির সভায় তুলাধোনা রনি : রাজধানীর মেহেরবা প্লাজায় অবস্থিত এমপি রনির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বসে তার সঙ্গে আলাপ হয় ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায়। সেখানে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে খুব ভালো জানেন এবং টক শোতে তার স্পষ্ট বক্তব্য সত্ত্বেও তাকে কিছু বলেন না। এ বক্তব্যের পরদিন ২০ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের সভায় চ্যানেল আইয়ের টক শোতে যোগাযোগমন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব পাওয়া নিয়ে তার বক্তব্যের কারণে দলের সিনিয়র নেতাদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে মীরজাফর, বেইমান বলে উল্লেখ করেন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে এমপি রনির বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়ে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কার্যালয়ের সামনে গলাচিপা এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিলও করেন।

No comments

Powered by Blogger.