অভিমত- মাধ্যমিক স্তরের পরিকল্পিত পাঠদান ॥ কার্যকর পদক্ষেপ এখনই জরুরী by মোঃ আবুল বাশার, মোঃ দিদার চৌধুরী ও মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন খোকন

মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিটি জাতির স্বপ্ন। কিন্তু এটি নির্ভরশীল অনেকগুলো নিয়ামকের ওপর। যার অন্যতম হচ্ছে যোগ্য শিক্ষক। যোগ্য শিক্ষক কে? শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ডিগ্রী নিয়েই কেউ যোগ্য শিক্ষক হতে পারেন না।
চাই সত্যিকার পেশাগত যোগ্যতা। অর্থাৎ পেশার সঙ্গে জড়িত সকল কাজ সুচারুরূপে করতে পারা দরকার। পেশাগতভাবে যোগ্য শিক্ষকের পক্ষেই কেবল সম্ভব প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠে অংশগ্রহণ করানোর মাধ্যমে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করা। একজন যোগ্য শিক্ষক নিজের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা শ্রেণীকক্ষে উজাড় করে ঢেলে দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, চাহিদা, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা সম্পর্কে থাকেন সজাগ ও সচেতন। তিনি উপযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করেন। তাই তাঁর পাঠ হয় সহজ, আকর্ষণীয়, সজীব ও প্রাণবন্ত। শিক্ষার্থীরা থাকে পাঠে আগ্রহী ও মনোযোগী।
শিক্ষকের কাছে এ সাফল্য তখনই ধরা দেয় যখন তাঁর পাঠদান হয় পূর্বপরিকল্পিত। শিক্ষার্থীদের আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনের জন্য পাঠপরিকল্পনার বিকল্প নেই। তাই প্রথম দরকার বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন। তারপর এরই ভিত্তিতে দৈনিক পাঠপরিকল্পনা। সবশেষে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। তাই বিএডসহ সকল বিভিন্ন মেয়াদী মাধ্যম ও স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য শিক্ষকদের পরিকল্পিত পাঠদানে অভ্যস্ত করানো।
তবু প্রশ্ন আছে, প্রশিক্ষণান্তে মাধ্যমিক শিক্ষকগণ পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ব্যবহার কতটুকু করেন। অথবা আদৌ ব্যবহার করেন কি-না। এ সংশয়ের আছে হরেক রকম জবাব। আছে নানা মুনির নানা মত। নেই বাস্তবতার আলোকে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা। উল্লেখযোগ্য কোন গবেষণার হদিসও মেলে না।
সমস্যার শেকড় সন্ধানে আমরা তাই "মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ব্যবহারের মাত্রা নিরূপণ_ একটি সমীক্ষা" শিরোনামে একটি প্রশ্নমালা জরিপ করি। সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১৩০ জন মাধ্যমিক শিক্ষকদের কাছে প্রশ্নোত্তরিকা সরবরাহ করা হয়। তাঁরা সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জবাব দেন। উল্লেখ্য, উত্তরদাতাদের সকলে Teaching Quality Improvement in Secondary Education Project (TQI-SEP) কর্তৃক পরিচালিত Continuous Professional Development (CPD)-1 প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। অনেকের একাধিক প্রশিক্ষণও রয়েছে।
১১টি প্রশ্ন সংবলিত প্রশ্নোতালিকার একটি প্রশ্ন ছিল বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ব্যবহার করেন কি-না? এর জবাবে ৮৪ জন 'হ্যাঁ' এবং ৪৬ জন 'না' বলেছেন। বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা প্রণয়নে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে ১৪ জন না বলেছেন। অর্থাৎ (৪৬-১৪)=৩২ জন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেও পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন/ব্যবহার করেন না। আমরা একটি উন্মুক্ত প্রশ্নের মাধ্যমে পাঠ পরিকল্পনার ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সুপারিশ আহ্বান করেছিলাম। উত্তরে প্রায় প্রত্যেকেই একাধিক সুপারিশ প্রদান করেছেন। বিশেষ প্রণিধানযোগ্য সুপারিশগুলো হলো_ মাথাপিছু ক্লাস সংখ্যা কমানো (৫৬ জন), প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতা ও তদারকি করা (৪৮ জন), শিক্ষকের অর্থনৈতিক সমস্যা দূর করা যাতে তাঁদের অতিরিক্ত উপার্জনের চিন্তা করতে না হয় (৪৩ জন), শিক্ষকের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করা (৩৪ জন), বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা (৩৪ জন), শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ (৩১ জন), কার্যকর ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান (২৬ জন), একজন শিক্ষকের প্রতিদিন ৩টির অধিক কাস না রাখা (১৪ জন), কাসের সময় বৃদ্ধি করা (১২ জন)।
আরও যে সকল সুপারিশ উঠে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয়ভাবে পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা সরবরাহ করা, পর পর কাস না দেয়া, অতিরিক্ত অফিসিয়াল দায়িত্ব না দেয়া, একাডেমিক সুপারভিশন নিশ্চিত করা, পাঠ্যসূচী সংৰিপ্ত করা, পাঠ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা, আনত্মঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিষয়ভিত্তিক শ্রেণীকক্ষের ব্যবস্থা করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১ঃ৩০ নিশ্চিত করা, উন্নয়নের জন্য শিক্ষকগণের ডায়েরি ব্যবহারে উৎসাহিত করা ইত্যাদি।
অস্বীকার করার জো নেই যে, শিক্ষকদের সুপারিশের তালিকা এবং তা বাস্তবায়নের দুরূহতা যে কাউকে সাফল্যের ব্যাপারে সন্দিহান করতে পারে। কিন্তু আমাদের আশার দিকও আছে। যেমন অন্য একটি প্রশ্নের জবাবে শতভাগ শিক্ষকই স্বীকার করেছেন যে, পাঠপরিকল্পনা ব্যবহার করেই পাঠদান করা উচিত। এ আমাদের ছোট্ট পুঁজি। একে নিয়েই আমাদের এগুতে হবে পরিকল্পিত শ্রেণী কার্যক্রম বাস্তবায়নের লৰ্যে। কারণ আমরা যদি পরিকল্পনা নিতে ব্যর্থ হই, তাহলে তো আমরা ব্যর্থ হবার জন্যই পরিকল্পনা করলাম। তাই আজই সময়। আগামীকাল মানেই দেরি।
শিক্ষক, সরকারী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, সিলেট


১৯ মার্চের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ
কামরুল হক ইউসূফী

৭ মার্চের সেই বিখ্যাত ভাষণের নির্দেশনা অনুযায়ী পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ অনুযায়ী জয়দেবপুরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি। এরপর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের অপেক্ষায় প্রতিদিন প্রস্তুত হয়ে থাকি আমরা। দিনের পর দিন দেশের উত্তেজনা বাড়তে থাকল। এমন সময় আনুমানিক ১৮ মার্চ শুনতে পেলাম যে, জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট অভিমুখে পাকবাহিনী আসতে পারে এবং বাঙালী সৈনিকদের হাতিয়ার হস্তগত করে নিতে পারে। এমতাবস্থায় আমরা আমাদের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিই যে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে কোন প্রকারেই যেন পাক মিলিটারি জংদেবপুরে পৌঁছাতে না পারে। সেই জন্য টঙ্গী সংগ্রাম পরিষদ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনসমূহে আমরা এই বলে ত্বরিত সংবাদ পাঠাই যে, পাকবাহিনীকে ঠেকানোর জন্য টঙ্গী জয়দেবপুর রুটে সাধ্যমতো ব্যারিকেড দেয়া হোক। যা ওইদিনই কার্যকর করা হয়েছিল।
এদিকে আমাদের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা দুটি ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাই। প্রথম দলটিকে জয়দেবপুর রাজবাড়ী ক্যান্টনমেন্টের বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়কের সঙ্গে গোপন কূটনৈতিক আলোচনা করার নির্দেশ দেয়া হয়। এই দলে প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মরহুম মোতালেব, মরহুম ছোট নজরুল, বড় নজরুল, মরহুম হাবিবুল্লাহ, মোজাম্মেল, শহীদুল্লাহ বাচ্চুসহ অনেকে। আমাদের তৃতীয় দলটি ছিল পাকবাহিনীকে সশস্ত্রভাবে মোকাবেলা করার জন্য। সশস্ত্র দলে ছিলাম আমি কামরুল, এবিএম গোলাম মোস্তফা ও গিয়াসউদ্দিনসহ অনেকে। আমরা সবাই গাজীপুর মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ছিলাম। ১৯ মার্চে আমাদের গাজীপুরের ক্যান্টনমেন্টের কূটনৈতিক প্রতিনিধির মাধ্যমে জানতে পারলাম, সশস্ত্র পাকবাহিনী ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সমস্ত ব্যারিকেড ভেঙ্গে জয়দেবপুর অভিমুখে আসছে। এ খবর পেয়ে আমরা সশস্ত্র দল ত্বরিত সিদ্ধানত্ম নিয়ে জয়দেবপুর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সম্মুখে অবস্থান গ্রহণ করি। কল্পনাতীতভাবে হঠাৎ একটি জীপে করে পাঁচ ছয়জন বাঙালী সিপাই এবং সম্ভবত একজন নন কমিশন্ড অফিসার আমাদের অবস্থানের সামনে দিয়ে জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাচ্ছিলেন। সুযোগ বুঝে আমাদের সহযোগীদের মধ্যে ১৫/২০ জন তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের পাঁচ ছয়টি রাইফেল এবং একটি চাইনিজ এলএমজি ছিনিয়ে নেয়। পরে উক্ত জীপের সব বাঙালী সিপাই আমাদের অনুরোধ করেন যাতে অস্ত্রগুলো ফেরত দিয়ে দিই এবং গ্রামে গ্রামে ঘুরে বলতে থাকেন যে, অস্ত্র ছাড়া তারা ক্যান্টনমেন্টে গেলে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ তাদের মেরে ফেলবে। এদিকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিলেও আমরা তখনও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র চালনায় অপারগ ছিলাম। ভাগ্যবশত ছুটি কাটানোরত একজন বাঙালী মিলিটারি আমাদের দলে তখন যোগদান করেন এবং এলএমজিটি তুলে নেন। সেই সঙ্গে তিনি জয়দেবপুর অভিমুখে আসতে থাকা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে পজিশনও নেন এবং আমরা সবাই আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করে রেললাইনের পশ্চিমপাশে অবস্থান করি। কিন্তু অবস্থানটি সুবিধাজনক মনে না হওয়ায় আরও পশ্চিমে বাজার সংলগ্ন একটি ব্যাংকের পাশে বিভিন্ন গর্তে আমরা সবাই পূর্বমুখী হয়ে অস্ত্রসহ অবস্থান করি। আনুমানিক এক ঘণ্টা পর জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টস্থিত পাক মিলিটারিরা আমাদের পরিত্যক্ত রেললাইনের ওপর অবস্থান নেয়। অবশ্য আমাদের সঠিক অবস্থান তখনও টের পায়নি। পশ্চিমমুখী হয়ে মিলিটারিরা গুলি ছুড়তে থাকলে সেই সঙ্গে সবাই পূর্বমুখী হয়ে গুলি ছুঁড়তে থাকি। পাকবাহিনীর ঝাঁকে ঝাঁকে গুলির মুখে আমরা টিকতে পারলাম না। পিছু হটে গিয়ে নিরাপদ অবস্থানে চলে গেলাম এবং পাকবাহিনীও জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে যায়। বেলা ১২টার সময় খবর পেলাম যে, আমাদের দু'জন গুলির মুখে প্রাণ হারিয়েছে এবং অসংখ্য আহত হয়েছে। আহতদের মির্জাপুর কুমুদিনি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমাদের সঙ্গে ছিলেন মরহুম মোতালেব, এবিএম গোলাম মোসত্মফা, জয়দেবপুর গ্রামের আরও দু'জন। মোতালেব কিভাবে যেন একটা এ্যাম্বুলেন্স যোগাড় করে আনল। সেই এ্যাম্বুলেন্সে শহীদদের লাশ নিয়ে আমরা ঘুরপথে জয়দেবপুর চৌরাস্তা হয়ে মির্জাপুর-মিরপুর হয়ে ঢাকায় সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২নং বাড়িতে আসি এবং বঙ্গবন্ধুকে লাশ দেখাই।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা

No comments

Powered by Blogger.