সপ্তাহ পেরিয়ে বইমেলা- অপূর্ব শর্মা

অমর একুশে বইমেলা ২০১৩ এর বয়স এখন এক সপ্তাহ। দেখতে দেখতেই কেটে গেছে সাতটি দিন। প্রথম দু’দিন ছুটির দিন থাকায় মেলায় প্রচুর লোক সমাগম হয়েছে।
প্রথম সপ্তাহে মেলায় নতুন বইও এসেছে প্রচুর। কিন্তু বেচা-কেনা এখনো সেভাবে জমে উঠেনি। পরপর দু’দিন হরতালের কারণে মেলার স্বাভাবিকতায় ছন্দপতন ঘটছে। কিন্তু বইপ্রেমীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দমেনি। পাঠকেরা প্রাণের টানে ছুটে এসেছে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে। চেষ্টা করেছে নিজেদের প্রিয় লেখকের বই সংগ্রহের। নামী-দামী অনেক লেখকের বই এখনও না অসায় পাঠকদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কেনা-বেচার দিক থেকে জমে না উঠলেও অন্যরকমভাবে জমে উঠেছে বইমেলা। প্রতিদিনই মেলায় বসছে লেখকদের জমজমাট আড্ডা। নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করতে দূর-দূরান্ত ছুটে আসছেন কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং উপন্যাসিকরা। তরুণরাই আড্ডাবাজির প্রাণ। লেখক কুঞ্জের পাশাপাশি মেলার লিটল ম্যাগ চত্বরকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে আড্ডা। সাহিত্যিকদের পাশাপাশি প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরাও ছুটে আসছেন মিলন মেলায় একত্রিত হতে। নিজেদের লেখা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবই স্থান পাচ্ছে আড্ডায়।
প্রচ্ছদ শিল্পী চারুপিন্টু প্রতিদিনই মেলায় আসেন আড্ডা দিতে। তার দাবি, বছরের এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করেন তিনি। প্রায় প্রতিদিনই ছুটে আসেন মেলায়। তিনি বলেন, বইমেলা দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং প্রবাসে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে দেখার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। আমার কাছে বইমেলা তাই প্রাণের মেলা।
কবি সৈকত হাবিবের মতে, বইমেলায় লেখক কুঞ্জ বা অন্যান্য স্থান থাকলেও আমার পছন্দের স্থান হচ্ছে ছোট কাগজ চত্বর। কারণ আমার লেখালেখির বিকাশ ঘটেছে লিটল ম্যাগের হাত ধরে। অন্যদিকে এই চত্বরে সারাদেশের অনেক কবি সাহিত্যিক এবং লিটল ম্যাগাজিন কর্মী এসে জড়ো হন। তাই এখানে এলে হারানো দিনগুলো এবং পুরনো বন্ধুদের সাক্ষাত পাওয়া যায়। তাদের লেখালেখি, বইপত্র এবং ছোট কাগজ চর্চা সম্পর্কেও জানা যায়।
তিনি বলেন, লিটলম্যাগ চত্বরেই আমি আমার নতুন বইয়ের উন্মোচন করে থাকি। কারণ এখানে বাজারি সাহিত্যের দৌরাত্ম্য নেই। সাহিত্য যে আসলে একটা প্রাণময় বিষয় তা এই চত্বরে এলে সহজেই উপলব্ধি করা যায়। তাই আমি এখানে বার বার ছুটে আসি এবং এখানকার আড্ডাকে উপভোগ করি।

সৈয়দ শামসুল হকের
‘কেরানীও দৌড়েছিল’
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায়ই রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। কবিতায় মনের ভাব প্রকাশে তিনি যেমন সিদ্ধহস্ত তেমনি শব্দশৈলীতে কাহিনী বিনির্মাণেও পারঙ্গম। ‘কেরানীও দৌড়েছিল’ উপন্যাসে সৈয়দ হক অতিসাধারণ একজন কেরানীর জীবন আখ্যান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের যাতনাকে উপস্থাপিত করেছেন উপন্যাসে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে লেখকের বয়ান থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় এর পটভূমি। ‘কেরানির জ্বর ঘন হয়ে আসে। জ্বর বাড়তেই থাকে। দিনের পর দিন। মাঝে মাঝে কেরানি নিজেই টের পায় সে জ্বরের ঘোরে ভুল বকছে। লঞ্চের পাটাতনে যাত্রীর জামার কলার ধরে চেচিয়ে উঠছে, ভাড়া নেই! লঞ্চে উঠছ কেন? তার ধন্দ লাগে, সে এখনো নীল সাগর লঞ্চের চাকরিতেই।
শরীরের নিচে নদীর স্রোত টের পায় কেরানি। নদী বয়ে চলেছে নদীর মতো। এই নদী থেকে সেই নদী। পানির কোন বাধা নেই। জ্বরের ঘোরে পানির ওপরে কেরানি ভেসে চলে। তলতল করে বয়ে চলেছে নদী। অন্ধকার রাত। কুচকুচে নদীর পানি। চোখে না দেখা যায়, শুধু কুলুকুলু ধ্বনিতে টের পাওয়া যায়।’
সাধারণ এই জীবন আখ্যানকে লেখনির মাধ্যমে অসাধারণ করে তুলেছেন সৈয়দ শামসুল হক। জীবনের গতিও যে এক সময় থেমে যায় তাই চিত্রিত হয়েছে বর্ণিত উপন্যাসে।

হাসান আজিজুল হকের
‘চিন্তন-কণা’
চিন্তার সমভূমে লেখকের বাস। চিন্তাকে আবর্তিত করেই শব্দসৈনিকদের পথচলা। মনের মাঝে দাগ কাটে এমন সব বিষয়ই ভাবনার অতলান্ত থেকে বের হয়ে এসে জন্ম দেয় নতুন নতুন শব্দের। সেই শব্দের সংযোজনে তৈরি হয় বাক্য এবং তা থেকে লেখা। সময় প্রবাহের ঘটনা দুর্ঘটনাকে যিনি সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করতে পারেন তিনিই প্রকৃত লেখক। শব্দচিন্তক হিসেবে হাসান আজিজুল হক তেমনি অনন্য একজন। এবারের বই মেলায় বের হতে যাওয়া তাঁর চিন্তার ফসলের নামÑ‘চিন্তনকণা’। প্রখ্যাত এই লেখকের ২৮টি প্রবন্ধের এই সঙ্কলন বের করেছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ।
‘চিন্তন-কণা’ প্রবন্ধের বই হলেও লেখ তাঁর ছেলে বেলার গল্প থেকে শুরু করে নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন বইটিতে। বদলে যাওয়া ঢাকা শহরের আখ্যানের পাশাপাশি স্বজন হারানোর বেদনা, লেখালেখির যন্ত্রণা, শৈশবের শরৎ, জীবনের গতিপ্রবাহ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন সাবলীলভাবে। যা থেকে ইতিহাসের রসদ পাওয়া যাবে সহজেই। তাই ‘চিন্তন-কণা’ শুধুই লেখকের প্রবন্ধের সমষ্টি নয়Ñ ইতিহাসেরও এক ভিন্ন অধ্যায়।

বেলাল চৌধুরীর
‘নবরাগে নব আনন্দে’
স্মৃতিকাতরতায় ভুগেন না এমন সাহিত্যিক হয়ত একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফেলে আসা দিনগুলো সব লেখককেই তাড়িত করে। সেইসব দিনগুলোকে কালির আঁচড়ে যখন লেখক প্রাণবন্ত করে তুলেন তখন সৃষ্টি হয় সাহিত্যের এক ভিন্ন ধারার। ‘নবরাগে নব আনন্দে’ বইয়ে ফেলে আসা দিনগুলোকেই চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন বেলাল চৌধুরী। সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বিষাদে কাটানো যাযাবর দিনগুলোকে তিনি সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন বইয়ে। পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া কয়েকজন লেখকের স্মৃতিচারণ করেছেন গ্রন্থে। সৈয়দ মোস্তফা সিরাজ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শহীদ কাদরী, আবদুর রশীদ, সন্তোষ গুপ্ত এবং হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে তাঁর অভিব্যক্তি রয়েছে বইটির বৃহৎ অংশজুড়ে। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়েও লিখেছেন তিনি। সব মিলিয়ে অনন্য সব প্রবন্ধের সমাহার ঘটেছে ‘নবরাগে নব আনন্দে’ বইয়ে। বইটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি।

মহাদেব সাহার
‘১৯৭৫ : সেই অন্ধকার সেই বিভীষিকা’
মহাদেব সাহার আত্মস্মৃতি ‘১৯৭৫ : সেই অন্ধকার সেই বিভীষিকা’ বের করছে নান্দনিক। লেখক তাঁর দৃষ্টি দিয়ে ১৯৭৫ সালের কালো অধ্যায়কে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন কালির আঁচড়ে। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশ যে দুঃসময় অতিক্রান্ত করেছে, দেশের মানুষের ওপর যে বিভীষিকা নেমে এসেছে তারই প্রতিচ্ছবি তিনি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন আলোচ্য গ্রন্থে। তাঁর দেখা বর্বরদের রৌদ্ররোষ, অমানবিকতা, বর্বরতা ঠাঁই পেয়েছে বইটির পাতায় পাতায়।
মহাদেব সাহা মুুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে বইটি লেখার চেষ্টা করেছেন। শুধুমাত্র ১৫ আগস্টের বেদনাবহ ইতিহাস উঠে আসেনি তাঁর লেখায়, উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর জীবন, আন্দোলন, ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধে হায়নাদের বর্বরতার বিষয়টিও। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর বদলে যাওয়া সময়কে শুধু নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেননি তিনি, একজন কবির দৃষ্টিতেও দেখার চেষ্টা করেছেন।

বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ
না থেকেও বইমেলায় আছেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। মেলার বিভিন্ন স্টলে রয়েছে তাঁর প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়েছে নানা পঙ্ক্তিমালা। বড় বড় ছবিসংবলিত ব্যানারে হুমায়ূনের উপস্থিতি! এবারের বইমেলা উৎসর্গ করা হয়েছে তাঁরই নামে। ইতোমধ্যে হুমায়ূন আহমেদের লেখা একাধিক বইও এসেছে মেলায়। অন্যপ্রকাশ বের করেছে হিজিবিজি ও ভ্রমণ সমগ্র। বিভিন্ন সময়ে অগ্রন্থিত লেখাগুলো-ই স্থান পেয়েছে বইগুলোতে। তবে, হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই ‘দেয়াল’ প্রকাশিত হয়নি প্রথম সপ্তাহে। আগামী সপ্তাহে তাঁর লেখা রাজনৈতিক এই উপন্যাস প্রকাশের কথা রয়েছে।
নারীদের যত বই
এক সময় দেশে লেখালেখিতে নারীদের সংখ্যা ছিল একেবারেই কম। সময়ের বিবর্তন সেই ব্যবধান কমিয়েছে। অসংখ্য নারী সম্পৃক্ত হয়েছেন লেখালেখির সঙ্গে। লেখিকা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। অর্জন করেছেন পাঠকপ্রিয়তা। কবিতা থেকে শুরু করে উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, গবেষণাÑসাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায়ই রয়েছে তাদের অবাদ বিচরণ। আশির দশকে যেখানে হাতেগোনা কয়েকজন নারী ছিলেন লেখালেখিতে সরব এখন আর সেই দিন নেই। অসংখ্য নারী লেখালেখির সঙ্গে নিজেদের সম্প্ক্তৃ করে এগিয়ে যাচ্ছেন আগামীর পথে। এবারের বইমেলায় দুই শতাধিক লেখকের বই প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।
লেখালেখিতে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও নারী লেখকদের পাঠক সৃষ্টি হয়নি সেভাবে। হাতেগোনা কয়েকজন লেখক ছাড়া বাদবাকি লেখিকারা এখনো উঠে আসতে পারেননি জনপ্রিয় ধারায়। নানা কারণেই এমনটি হচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সুলতানা কামাল এ প্রসঙ্গে বলেন, সাহস করে নিজের লেখা প্রকাশ করার যে চিন্তা নারীরা করছেন সেটা ইতিবাচক দিক। এর মাধ্যমে নতুন ধারার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র লেখক হলেই চলবে না; সমৃদ্ধ লেখা লেখতে হবে। গুনগত মানম্পন্ন লেখার বিকল্প নেই। পাঠক তো রসদ চাইবে। পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। তিনি নতুন লেখকদের উদ্দেশে বলেন, নিজেকে প্রকাশ করতে হলে তৈরি হওয়ার বিকল্প নেই। ঋদ্ধ হতে হবে। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। অনুশীলনের মাধ্যমে যদি একজন লেখিকা পুরোপুরি তৈরি হয়ে লেখালেখিতে আসেন তাহলে অবশ্যই তিনি স্থান করে নিতে পারবেন পাঠক মহলে। পেছন ফিরে তাকাতে হবে না তাকে।
মাসুদা ভাট্টি লেখালেখিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আখ্যায়িত করে বলেন, খেয়াল রাখতে হবে, যখনই কোয়ালিটি বাড়ে তখনই কোয়ান্টিটি কমেÑনারী লেখকরা যদি এ বিষয়টি মাথায় রেখে অগ্রসর হন তাহলে পাঠক মহলে অবশ্যই তারা সামাদৃত হবেন।
তিনি বলেন, একজন পুরুষের চেয়ে নারীর জীবন দেখার ক্ষমতা বেশি। ঘরের জানালা দিয়ে তারা যেভাবে জীবনকে উপলব্ধি করতে পারেন; মুক্ত বাতাসে ঘুরে একজন পুরুষের পক্ষে তা অনেকাংশেই অসম্ভব। নিজেদের উপলব্ধিকে যথাযথভাবে লেখনির মাধ্যমে যদি একজন নারী লেখক উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে আমাদের সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হবে।
এ প্রসঙ্গে শিখা প্রকাশনের প্রকাশক নজরুল ইসলাম বাহার বলেন, আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে লেখিকাদের বইয়ের পাঠক কম। জনপ্রিয় ধারার লেখিকাদের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। তবে, ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই নারী লেখকরা জনপ্রিয় হয়ে উঠুন। দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেহেতু নারীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে তাই প্রকাশনা শিল্পেও তাদের কদর বাড়–ক এমনটাই প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে নারীদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত লিখতে হবে এবং মানের দিকও দেখতে হবে; তাহলেই পাঠক সৃষ্টি হবে। প্রকাশকরা এগিয়ে আসবেন বই প্রকাশে।

আনোয়ারা সৈয়দ হকের
‘খাদ’
আনোয়ারা সৈয়দ হকের কোলাস উপন্যাস খাদ বের করেছে শুদ্ধস্বর। বাসে কেরোসিন ঢেলে মানুষ পুড়িয়ে মেরে ফেলার পটভূমিতে শুরু হয়েছে এই উপন্যাস। মানুষের প্রতি মানুষের জিঘাংসা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অব্যবস্থা, দৈনন্দিক টানাপড়েন, ঘাত-প্রতিঘাত, লোভÑলালসা, হিংসা বিদ্বেষ, সামাজিকভাবে বৃক্ষনিধন, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করার অশুভ তৎপরতাÑএবং এর ফলে সৃষ্ট অতল গহ্বর লেখিকা চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন আলোচ্য উপন্যাসে। মানবতাবোধের জায়গাগুলোও যে ক্রমশ সঙ্কোচিত হয়ে আসছে সে বিষয়টি ব্যথাতুর করে তুলেছে আনোয়ারা সৈয়দ হককে। লেখনির মাধ্যমেই এসবের প্রতিবাদ করেছেন তিনি।

সেলিনা হোসেনের
‘আগস্টের একরাত’
সেলিনা হোসেনের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘আগস্টের এক রাত’ বের করেছে সময় প্রকাশন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। নামকরণের ক্ষেত্রে আগস্টকে প্রাধান্য দেয়া হলেও আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা কি ছিল তা যথাযথভাবে লেখিকা উপস্থাপন করেছেন উপন্যাসে। এই উপন্যাসকে হিউম্যান ট্রাজেডির উপাখ্যানও বলা যায় নিঃসন্দেহে।
আগস্টের একরাতে আলোচ্য চরিত্রগুলোর প্রতিটি চরিত্রই মৃত। এই চরিত্রগুলো এমন একজন মানুষকে ঘিরে আছেন, যার জন্ম না হলে আমাদের আত্মপরিচয় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠত না, আমরা অর্জন করতে পারতাম না নতুন মানচিত্র, নতুন পতাকা। আমাদের জীবন হয়ে উঠত দুর্বিসহ। স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু যেভাবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। বইটি পাঠে বঙ্গবন্ধুকে জানা যাবে অনায়াসে।

নাসরিন জাহানের
‘কানামাছি কোন স্বপ্নে ছুট’
জীবনের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো এক মফস্বলবাসী যুবকের আখ্যান নিয়ে রচিত হয়েছে ‘কানামাছি কোন স্বপ্নে ছুট’ উপন্যাসটি। লেখিকা নাসরিন জাহান সোনালেখা গ্রামের এক স্বাপ্নিক যুবকের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন উপন্যাসে।
মফস্বলবাসী যুবক শাহেদ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন গ্রাম থেকে শহরে আসে। একদিন এক যুবকের উদ্দাম নৃত্য তার মধ্যে অনুরণ তুলে। নিজের মধ্যে শাহেদ এক ধরনের অক্ষমতা উপলব্ধি করে। একই সময়ে বাসার কাজের মেয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শাহেদ বুঝতে পারে সে অক্ষম নয়। কবিতা পেয়ে বসে তাকে। কবি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে কবিদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করে শাহেদ। ভার্সিটির এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমও হয় তার। কিন্তু কবিদের মধ্যে সমকামী একজনের প্রেমে পড়ে যায় সে। শাহেদ নিজেকে উভচারি হিসেবে আবিষ্কার করে সেখান থেকে পালায়। এবার এক সন্তানসহ ডিভোর্সি নবনিতা স্ত্রী হয়ে তার জীবনে আসে। তাকে ঘিরে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালায় সে। কিন্তু নবনিতাও তার সঙ্গে প্রতারণা করে। সে নবনিতাকে সৎ ভেবে জীবনসঙ্গী করেছিল। কিন্তু বিপরীত চরিত্র প্রত্যক্ষ করে সেখান থেকে পালিয়ে যায় শেকড়ের সন্ধানে গ্রামে। শাহেদের পলায়নপরতাই নাসরিন জাহানের উপন্যাসের পটভূমি।

No comments

Powered by Blogger.