সাগরে ১২ গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়া হচ্ছে- ১০ বিদেশী কোম্পানির সাথে পেট্রোবাংলার বৈঠক by আশরাফুল ইসলাম

দেশের সাগরবক্ষের ১২ গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল ১০টি বিদেশী কোম্পানির সাথে প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করেছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সব প্রস্তুতি শেষ করে আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচিত কোম্পানির সাথে চুক্তি (উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তি-পিএসসি) সই করা হবে।

জানা গেছে, ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল স্থল ও জলভাগের গ্যাস ব্লকগুলোকে ইজারা দেয়া হবে। ওই দিন জ্বালানি বিভাগে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে জ্বালানি উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। একই সাথে গত বছর জুন মাসে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু  ওই সময় সরকারের এ সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সসহ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সরকারের এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তারা জানান, স্থলভাগের সহজলভ্য ও সম্ভাবনাময় গ্যাস ব্লকগুলো বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে ইজারা দেযার আর কোনো প্রয়োজন নেই। এখন এসব গ্যাস ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধান করার সব ধরনের সক্ষমতা বাপেক্সের হয়েছে। ইতোমধ্যে বাপেক্স এ ধরনের নজিরও স্থাপন করেছে। প্রমাণ করেছে বিদেশী কোম্পানিগুলোর চেয়ে তারা ভালো করতে পারে।

এর বাইরে গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করে পেট্রোবাংলা। পাশাপাশি বাপেক্স বিদেশী কোম্পানিগুলোর চেয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। এ অবস্থায় বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্তই বলা চলে। এভাবে সমালোচিত হওয়ার পর স্থলভাগের গ্যাস ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসে। পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় স্থলভাগের সহজলভ্য ২৩টি গ্যাস ব্লকের তেল-গ্যাস অনুসন্ধ্যানের জন্য বিদেশীদের কাছে ইজারা দেয়া হবে না।

এ দিকে গত বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের মামলার রায় পক্ষে আসায় এ ১২টি ব্লককে পুনর্গঠন করা হয়। গভীর সমুদ্রের তিনটি ও অগভীর সমুদ্রের ৯টিসহ ১২ ব্লকের জন্য এ দরপত্র ডাকা হয়। সাগরের ৬১ হাজার ৬৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করা হবে। এর মধ্যে  ১০ হাজার ৪১ বর্গকিলোমিটার এলাকা পড়েছে গভীর সমুদ্রে। বাকি ৫১ হাজার ৫৮৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা অগভীর সমুদ্রে পড়েছে।

অগভীর সমুদ্রের ৯টি ব্লক হচ্ছে এসএস-০২ থেকে এসএস-০৪ ও এসএস-০৬ থেকে এসএস-১১। আর গভীর সমুদ্রের তিন ব্লক হচ্ছে ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১। এ ছাড়া রিংগফেসড এলাকা কুতুবদিয়া ও টেকনাফকেও দরপত্রে রাখা হয়েছে। এ দুটোকে যথাক্রমে ব্লক এসএস-১০ ও এসএস-০৪ এ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে কুতুবদিয়ায় গ্যাস কাঠামো অনেক আগেই চিহ্নিত করা হয়েছে।

সাগরবক্ষের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১২ গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়ার অংশ হিসেবে গত ১৭ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০১২ নামে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। আগামী ১৮ মার্চ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়া যাবে। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে নির্বাচিত কোম্পানির সাথে আগামী  জুন-জুলাই মাসে উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) সই করা হবে।

দরপত্র আহ্বান করার পর ১৪টি বিদেশী কোম্পানি দরপত্রের শিডিউল কেনে। দরপত্র অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে গতকাল ১০টি বিদেশী কোম্পানি প্রাক-বিডিং বৈঠকে অংশগ্রহণ করে। কোম্পনিগুলোর মধ্যে পাঁচটি যুক্তরাষ্ট্রের, দু’টি অস্ট্রেলিয়ার এবং বাকি চারটি অন্য চার দেশের কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির মধ্যে ছিল শেল, কনোকো-ফিলিপস, শেভরন ও আইপিআর আনাদারকো পেট্রোলিয়াম। অস্ট্রেলীয় কোম্পানির মধ্যে ছিল সান্তোস ও কারনাভন, সিঙ্গাপুরের কৃশ এনার্জি। এ ছাড়া চীনের ন্যাশনাল অফশোর ওয়েল করপোরেশন (সিনুক), ভারতের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি), বাহরাইন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি। আর আগে দু’টি কোম্পানির সাথে বৈঠক করেছে পেট্রোবাংলা। আর বাকি দুই কোম্পানির সাথে পরে বৈঠক হবে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হক, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।