শিক্ষা ভবনের দুর্নীতি

পূর্বে সচিবালয়, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এবং উত্তর-পূর্ব কোণে হাইকোর্ট। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বৃক্ষশোভিত সুন্দর পরিবেশে শিক্ষা ভবনের অবস্থান। দেশে শিক্ষা বিস্তারের আলোকবর্তিকাস্বরূপ কাজ করার কথা এই ভবনের। কিন্তু বাস্তবে হয় তার উল্টোটি।


প্রদীপের নিচেই যেমন অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, তেমনি দুর্নীতি নামক অন্ধকারে এই ভবন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। শিক্ষার কারিগর শিক্ষকদের সম্মানহানি ও হয়রানি এখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার।
বিভিন্ন সময় শিক্ষা ভবনের দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাতে এখানকার দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য একটুও কমেনি। বরং প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সেখানে দুর্নীতি যেন নতুন করে ডালপালা বিস্তার করছে। দেশের ৩০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, এমপিওভুক্তি, টাইমস্কেলসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এখানে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। শিক্ষক-কর্মচারীদের বিভিন্ন আবেদন বছরের পর বছর ফাইলবন্দি থাকে, না হয় হারিয়ে যায়। শিক্ষক-কর্মচারীরা জানেন, শিক্ষা ভবনে এলেই নাকের পানি, চোখের পানি একাকার হয়ে যাবে। তবু তাঁরা এখানে আসতে বাধ্য হন। শিক্ষকের মানমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে তাঁরা পিয়ন বা কেরানিদের পেছন পেছন দৌড়ান। এই যদি হয় শিক্ষকদের মূল্যায়ন, তাহলে এ দেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন কিভাবে সম্ভব?
শিক্ষা ভবনের এ অবস্থা নতুন কিছু নয়, দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে এই চিত্র। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের সমর্থক শিক্ষক ও কর্মচারীদের সংগঠন এই দুর্নীতিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। মহাজোট সরকারের আমলেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দিন বদলের নামে এখানে ঘুষের হাতবদল হয়েছে মাত্র। ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কলেজ ও প্রশাসন শাখা, মাধ্যমিক শাখা ও মাদ্রাসা শাখায় ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। মহাপরিচালকও ঘুষের অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত আছেন বলে জানিয়েছেন। তাই তিনি অধ্যাপক সিরাজুল হককে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। সেই কমিটির রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি জানিয়েছেন, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি কবে আসবে, আদৌ আসবে কি না, তা নিয়েও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তাই মহাজোট সরকার জাতির মেরুদণ্ডকে ঋজু ও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে নানামুখী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দও অনেকাংশে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষটিই যদি এভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জন আদৌ সম্ভব হবে কি? আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে যত দ্রুত সম্ভব যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেবে।