লিবিয়ায় শান্তি ফিরে আসুক-গাদ্দাফি হত্যা

লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা করা হলো। তাঁর জন্মের শহর সিরতে বৃহস্পতিবার বিদ্রোহীরা তাঁকে একটি পানিনিষ্কাশন পাইপের ভেতর থেকে বের করে প্রথমে নির্যাতন ও পরে গুলি করে হত্যা করেছে। তার আগে ন্যাটো বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ফরাসি বিমানসেনারা ওই শহরের ওপর বিমান হামলা চালায়।


ন্যাটো বাহিনী লিবিয়ায় বিদ্রোহীদের পক্ষে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করার পর গাদ্দাফি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি কাপুরুষের মতো ধরা দেবেন না, বীরের মতো আমৃত্যু লড়াই করে যাবেন। গাদ্দাফি প্রমাণ করলেন, তিনি তাঁর সংকল্পে অটল ছিলেন।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি স্বৈরশাসক ছিলেন; কিন্তু আল-জাজিরা টেলিভিশনে তাঁর নির্যাতন ও হত্যাদৃশ্যের যে ভিডিওচিত্র প্রচার করা হয়েছে, তা নৃশংস। এমন নৃশংসতা এবং এর প্রতি পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তিগুলোর সমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়ে পারে না।
নানা গোত্রে বিভক্ত তেলসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ার জাতীয় ঐক্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু তাঁর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেশটির সামাজিক অগ্রগতির জন্য ছিল বিরাট প্রতিবন্ধকতা। গাদ্দাফি মূলত একটি কঠোর পুলিশি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, নাগরিক ও মানবিক অধিকারগুলো ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। গাদ্দাফির একচ্ছত্র শাসনে লিবিয়া পরিণত হয়েছিল একটি বদ্ধ ও স্থবির সমাজে। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে গভীর অসন্তোষ জমে উঠেছিল। কিন্তু এ বছরের গোড়ার দিকে আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরুর আগ পর্যন্ত লিবিয়ায় গাদ্দাফিবিরোধী অসন্তোষের সহিংস বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। তিউনিসিয়া ও মিসরে গণ-অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর লিবিয়ায় গাদ্দাফির বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়, তা ছিল অধিকতর সংঘবদ্ধ ও অস্ত্রসজ্জিত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, লিবিয়ায় গাদ্দাফিবিরোধী বিদ্রোহীদের অস্ত্র, গোলাবারুদ, গোয়েন্দা তথ্য ও কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছে পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তিগুলো। তারপর ন্যাটো বাহিনী দেশটিতে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করার মধ্য দিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কথিত স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র রপ্তানি করার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তার সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও জীবন-জীবিকায় অচলাবস্থা। এখন এসব ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দেশটিতে শান্তিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের বিরাট কাজ রয়েছে সামনে।
প্রথমত, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থিতি প্রয়োজন। গাদ্দাফির ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে যে ট্রানজিশনাল ন্যাশনাল কাউন্সিল লিবিয়ায় সরকার পরিচালনা করছে, তারা অঙ্গীকার করেছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু লিবিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কখনোই ছিল না। দেশটিতে কোনো রাজনৈতিক দলও নেই। পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারায় সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা কতটা ফলপ্রসূভাবে সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের মতো একটি আইনসভা প্রতিষ্ঠা প্রাথমিক কাজ। তবে এ মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি কাজ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র যেসব গোষ্ঠী এখনো সক্রিয় রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণে এনে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা; সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক বিভক্তি থেকে লিবিয়াকে রক্ষা করা।
লিবিয়ার জনজীবনে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক।