বিপর্যস্ত ঢাকা সরকারের দায়িত্বহীনতারই ফল-বসবাসের অনুপযোগী ঢাকা

ঢাকা যে বিশ্বের মধ্যে বসবাসের অনুপযোগী শহরের মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। প্রায় দেড় কোটি ঢাকাবাসী প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে এই সত্য টের পাচ্ছে। ঢাকা এখন ধনী-গরিব সবার জন্যই দুর্বিষহ। আন্তর্জাতিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এ সত্যকেই ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে।


একটি দেশের রাজধানী সে দেশের শাসকদের মানসিক প্রতিচ্ছবি। বিপর্যস্ত ঢাকা তাই দায়িত্বহীনতারই প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা নগরও বটে। ঢাকা শহরের বেলায় যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। আবাসন, নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা—সব দিক থেকে পরিস্থিতি অবনতির দিকে। ঢাকার অবস্থা এমন—সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা। ঢাকার বর্তমান অবকাঠামো স্বাস্থ্য-শিক্ষা-যাতায়াত-পানি-বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ নাগরিক জীবনের আবশ্যকীয় কোনো চাহিদাই মেটানোর অবস্থায় নেই।
ঢাকার সংকট গত চার দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির ফল। গ্রামাঞ্চল থেকে সম্পদ ক্রমাগত ঢাকায় জমা হয়েছে। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। ঢাকা এখন অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের প্রধান লক্ষ্য। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সব শ্রেণীর লোকই ঢাকামুখী হলেও ঢাকা মহানগরের অবকাঠামো এত মানুষের ভার নিতে অক্ষম। সম্প্রতি ক্রিকেট বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকাকে বহু টাকা ব্যয়ে সাজানো হয়েছে। অথচ চাইলে এই অর্থ এই উদ্যম দিয়ে স্থায়ীভাবে অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটানো যেত।
ঢাকার বিস্তার রোধ করতে হবে এখনই। ঢাকার চারপাশের কৃষিজমি উদ্ধার করতে হবে এবং নদী ও খাল-জলাশয়কে ঢাকার পানিপ্রাপ্তি ও পানিনিষ্কাশনের উপযোগী করতে হবে। প্রথমেই হাত দিতে হবে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গণপরিবহনভিত্তিক করা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত ও কম ক্ষমতাসম্পন্ন পরিবহন কমিয়ে মেট্রোরেল বা পাতালরেল চালু করতে হবে। ঢাকাকে ঘিরে সার্কুলার ওয়াটারওয়ে তৈরির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করলে সড়কের ওপর চাপ কমবে। প্রায় অর্ধকোটি বস্তিবাসীকে পরিত্যক্ত ও খাসজমিতে স্বল্প খরচে আবাসন দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে সুযোগ-সুবিধা ও অর্থনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে ঢাকামুখী অভিবাসন কমাতে হবে।
সুতরাং ঢাকাকে বাস-উপযোগী করা মানে শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গিরই বদল ঘটানো। তা না করলে ঢাকা একসময়কার বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের মতোই পরিত্যক্ত হবে। দি ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদনটি সেই বিপর্যয়ের হুঁশিয়ারি বার্তাই জানাল।