বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৪৬৩ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন।আবদুল মালেক, বীর প্রতীক অবিচল এক যোদ্ধা ৬ ডিসেম্বর১৯৭১।ভোরেমুক্তিযোদ্ধারাঅবস্থাননিলেনপাইকপাড়ায়।ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সিলেট মহাসড়কের পাশে পাইকপাড়া। মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে বিভক্ত। সব মিলে এক ব্যাটালিয়ন শক্তির।


নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন এ এস এম নাসিম (বীর বিক্রম, পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল)। তাঁর নির্দেশে কিছুক্ষণ পর মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ (ব্রাভো [বি] কোম্পানি) গেল চান্দুরার এক মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে। তাদের দায়িত্ব অগ্রসরমান মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বি দল নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নিয়েছে। এ খবর পাওয়ার পর বাকি মুক্তিযোদ্ধারা হরষপুর-সরাইল হয়ে রওনা হলেন চান্দুরার অভিমুখে। তিনটি দল—আলফা (এ), চার্লি (সি) ও ডেল্টা (ডি) কোম্পানি। তারা দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকল। ডি দলে আছেন আবদুল মালেক। তাঁদের বাঁ দিকে এ ও সি দল। বেলা আনুমানিক দুইটা। ডি দল সরাইলের পথে শাহবাজপুরের কাছে পৌঁছে গেল।
যুদ্ধের পরিকল্পনা অনুযায়ী ডি দল অগ্রসর হচ্ছে অন্য দুই দলের পেছনে। একদম সামনে সি দল। তাদের ওপর দায়িত্ব কৌশলে শাহবাজপুর সেতুর দখল নেওয়া। এই দলকে অনুসরণ করছে এ দল। দুই দলের মধ্যে আছে কিছুটা দূরত্ব। সবশেষে ডি দল। দলের সঙ্গে আছেন মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাটালিয়ন অধিনায়কও।
এই অভিযানে বিকেলে এস ফোর্সের অধিনায়ক মেজর কে এম সফিউল্লাহও (বীর উত্তম, পরে সেনাপ্রধান ও মেজর জেনারেল) মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ তাঁর অবস্থান ডি দলের কিছুটা সামনে। তাঁর ও ডি দলের মধ্যে ব্যবধান অল্প।
ডি দলের মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যেতে থাকলেন দৃপ্ত পদভারে। তাঁদের সামনে কে এম সফিউল্লাহ। কোথাও তাঁরা বাধা পাননি। বিকেলের দিকে তাঁরা পৌঁছে গেলেন ইসলামপুরের কাছে। অদূরে চান্দুরা। এমন সময় সেখানে আকস্মিকভাবে হাজির হলো একদল পাকিস্তানি সেনা। হঠাৎ তাদের উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বিভ্রান্ত।
পাকিস্তানি সেনাদের এই উপস্থিতি একেবারে অনাকাঙ্ক্ষিত। আবদুল মালেকসহ মুক্তিযোদ্ধারা ভেবে পাচ্ছেন না, এটা কীভাবে ঘটল। কেননা, পেছনে আছে তাঁদের বি দল। তাদের ওপর দায়িত্ব অগ্রসরমান মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কে এম সফিউল্লাহ পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সেনারা সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গোলাগুলি শুরু করল।
নিমেষে সেখানে শুরু হয়ে গেল তুমুল যুদ্ধ। আবদুল মালেকরা পড়ে গেলেন উভয় সংকটে। একদিকে কে এম সফিউল্লাহ পাকিস্তানি সেনাদের আওতায়, অন্যদিকে তাঁরা ক্রসফায়ারের মধ্যে। আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া যুদ্ধে ক্রসফায়ারে পড়ে আহত হয়েছেন তাঁদের অধিনায়ক এ এস এম নাসিমসহ কয়েকজন।
আবদুল মালেক বিচলিত হলেন না। সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন পাকিস্তানি সেনাদের ওপর। তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হলেন তাঁর অন্য সহযোদ্ধারাও। এই যুদ্ধে তিনি যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহস প্রদর্শন করেন।
আবদুল মালেক চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। তখন তাঁর পদবি ছিল নায়েক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে পুনর্গঠিত হয়ে প্রথমে ৩ নম্বর সেক্টরে, পরে এস ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষত চান্দুরার যুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য আবদুল মালেককে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৯৯।
আবদুল মালেক ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে সুবেদার হিসেবে অবসর নেন। ২০১১ সালে মারা গেছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি রাজশাহী জেলার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (ডাক ঘোড়ামারা) রানীনগরে। তবে বাস করতেন ঢাকায়। বর্তমান ঠিকানা ১৩৯/৬ মাটিকাটা, ঢাকা সেনানিবাস। বাবার নাম আবেদ আলী, মা ফেলি বেগম। স্ত্রী আম্বিয়া বেগম। তাঁদের তিন ছেলে।
সূত্র: আমজাদ হোসেন (আবদুল মালেক বীর প্রতীকের ছেলে), তাসলিমা বেগম এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৩।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com