সিগন্যাল বাতি মেনে গাড়ি চালাতে হবেঃ এতদিন কেন মানা হয়নি

খন থেকে সিগন্যাল বাতির সংকেত মেনে গাড়ি চালাতে হবে মর্মে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সিদ্ধান্ত গতকাল প্রায় প্রত্যেকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। তাও আবার এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে পরীক্ষামূলকভাবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শহীদুল হক শনিবার রাজধানীর ট্রাফিক পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর সিগন্যাল বাতি আবার চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
বিষয়টি স্পষ্ট করে ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২২ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে যান নিয়ন্ত্রণে সফলতার মুখ দেখা গেলে এ প্রক্রিয়া বহাল থাকবে। আর যদি পরীক্ষামূলক এ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তবে কারণ খতিয়ে দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয় হবে। এক সপ্তাহের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় সিগন্যাল অমান্য করলে শাস্তির বিধানও থাকছে। অমান্যকারী চালককে এক হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। সে সঙ্গে তিন মাসের জন্য তার লাইসেন্সটি স্থগিত থাকবে।
এ খবরটি পড়ে কেউ যদি হেসে ফেলেন, তবে তার দিকে তেড়ে যাওয়া যাবে না। সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে চালু হয় গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে। এ ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে নয়, বরং স্থায়ী হিসেবে বছরের পর বছর চলে আসছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাপকতা লাভ করে। ৫/৬ বছর আগে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে এ ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছিল। এখনও রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্থাপিত সিগন্যাল বাতিগুলো আগের মতোই নির্দিষ্ট সময় পরপর লাল, হলুদ এবং সবুজ আলো ছড়ায়। কোনো কোনো সবুজ আলো প্রদানকারী বাল্ব জ্বলে ওঠা তীরচিহ্ন আগের মতোই স্পষ্ট। অথচ ব্যবস্থাটি অচল হয়ে পড়েছে। এই অচল হওয়ার দায় যতটা না গাড়ি চালকের, তার চেয়ে অনেক বেশি ট্রাফিক পুলিশের। ট্রাফিক পুলিশরা দায়িত্ব পালনের কোনো এক শুভলগ্নে ‘মেধা’ খাটিয়ে অনুভব করলেন যে, বাতির রঙ পাল্টানোর দিকে খেয়াল রেখে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে হাতের ইশারায় সে কাজটা সম্পন্ন করা তাদের কর্তৃত্বের পক্ষে অধিকতর মানানসই। তখন থেকে বাতির সিগন্যাল মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। সিগন্যাল বাতির সেই হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত এবং সিগন্যাল বাতি আবার চালুর সিদ্ধান্ত এক নয়। দুনিয়ার প্রায় সব দেশে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের চল অনেক আগেই উঠে গেছে। আমাদের দেশেও উঠে গিয়েছিল। যারা তা ফিরিয়ে এনেছিল, তারাই আবার ‘পরীক্ষামূলক’ভাবে এক সপ্তাহের জন্য সিগন্যাল বাতি মেনে চলার পদ্ধতি চালু করেছে। ব্যাপারটা চাল আর ডাল একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলে আবার তা বেছে আলাদা করার মতো হয়ে গেল।
আসলে রাজধানীতে যানজট এমন প্রকট রূপ ধারণ করেছে যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করবে দিশা পাচ্ছে না। ট্রাফিক পুলিশের অদক্ষতা এবং সংখ্যাস্বল্পতা এর জন্য মূলত দায়ী। আমাদের অধিকাংশ ট্রাফিক কনসেল্টবল গাড়ি চালাতে জানেন না। অথচ চলন্ত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল দায়িত্ব হচ্ছে তাদের। এর ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। সে সঙ্গে অসততা, দায়িত্বে অবহেলা, স্বল্প বেতনের ঘাটতি ঘুষ খেয়ে পূরণের চেষ্টা ইত্যাদি মিলে পরিস্থিতি একেবারে নাজুক করে তুলেছে। কথায় কথায় আমরা উন্নয়নের বড়াই করি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার ৩৮ বছর পর আমাদেরনতুন করে ‘পরাধীন’ আমলে চালু হওয়া ট্রাফিক বাতির ব্যবহার শিখতে হচ্ছে। তাও আবার আমরা রপ্ত করতে পারব কিনা, সে আশঙ্কায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হচ্ছে ট্রাফিক বাতির নব-ধারাপাত। আমাদের ‘অগ্রগতির’ বহর মাপার জন্য এই একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট।