ঠাকুরবাড়ির রান্না by খাদিজা ফাল্গুনী

ঠাকুরবাড়ির হেঁসেলের রান্না সুঘ্রাণ ছড়ায় বাঙালির খাবারের পাতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী ভালো রান্নার সমঝদার ছিলেন খুব। নেমন্তন্নে বা কারও বাড়িতে যে রান্নাই ভালো লাগত, রেসিপি লিখে রাখতেন লম্বা, মুদির খাতার মতো দেখতে এক খাতায়।


নতুন বউ প্রণাম করতে এলে তাঁকে আশীর্বাদ করেই জিজ্ঞেস করতেন, তাঁর রান্নার ক্ষমতা সম্বন্ধে।
নতুন বউদের অবস্থা তখন কী হতো, তা এখন কে বলবে? কিন্তু ইন্দিরা দেবীর সেই রান্নার খাতাকে ভুলে যেতে দেননি ঠাকুর পরিবারের আরেক সদস্য পূর্ণিমা দেবী। তাঁর মা নলিনী দেবী ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পৌত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের মেয়ে। তিনিও খুব ভালো রাঁধতেন। পূর্ণিমা দেবীর মা নলিনী দেবী, নমা ইন্দিরা দেবী এবং নিজের সংগ্রহ করা কিছু রান্নার রেসিপি নিয়ে পূর্ণিমা দেবীর নিজের লেখা বই ঠাকুরবাড়ির রান্না (১৯৮৬) থেকে কিছু পদ তুলে দেওয়া হলো এবারের নকশায়। ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নকশার এই আয়োজন।
নৃত্যশিল্পী শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে রান্না করা পদগুলো দেখে নিন ঝটপট। শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাহায্য করেছেন বিজয়া দাশগুপ্ত, মণিদীপা দাশগুপ্ত, নন্দিতা সরকার ও দিপালী বিশ্বাস।
বিশেষ ধন্যবাদ আলমগীর রহমান।

পটোলের দোলমা
উপকরণ: পটোল, পেঁয়াজ কুচা, আদাবাটা, হলুদ, নারকেলবাটা, তেল, জিরার গুঁড়া, কাঁচা লঙ্কা, সরষেবাটা, লবণ, চিনি প্রথমে গরম তেলের মধ্যে আস্ত ছোলা, পটোল ভেজে তুলে রাখতে হবে।
প্রণালি: তারপর গরম তেলের মধ্যে পেঁয়াজ কুচা ভেজে তার মধ্যে সামান্য হলুদ, জিরার গুঁড়া, আদাবাটা ও নারকেলবাটা দিতে হবে। কিছুক্ষণ মসলা কষানো হলে এর মধ্যে কাঁচা মরিচ ও ভাজা পটোল, নুন ও সামান্য চিনি দিয়ে অল্প পানি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কিছুক্ষণ পর সরষেবাটা দিয়ে নামিয়ে ফেলতে হবে।

পোস্ত দিয়ে মাংস
উপকরণ: মুরগির মাংস, রসুন, আদাবাটা, গোটা গরম মসলা, পোস্তবাটা, সাজিরাবাটা।
প্রণালি: মাংসে পেঁয়াজ, রসুন ও আদাবাটা মেখে রাখতে হবে। তেল চড়িয়ে তাতে গোটা গরম মসলা, সাজিরাবাটা ও পোস্তবাটা দিতে হবে। একটু কষে মাংস দিয়ে নাড়তে হবে। মাংস কষলে অল্প পানিতে সিদ্ধ করতে হবে। মাখা মাখা করে নামাতে হবে।

পায়েস
উপকরণ: দুধ, পোলাওর চাল, চিনি, কিশমিশ, হরেক রকমের বাদাম, গরম মসলা (এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ)।
প্রণালি: দুধ গরম মসলাসহ জ্বাল দিয়ে ঘন করে নিতে হবে। তাতে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নেওয়া চাল ফুটিয়ে নিতে হবে। নামানোর আগে চিনি দিতে হবে। তারপর হরেক রকমের বাদাম কেটে মেশাতে হবে। কিশমিশ সাজিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

সরষে কই
উপকরণ: কই মাছ, মরিচ, হলুদ, সরষেবাটা, লবণ, কাঁচা মরিচ, তেল।
প্রণালি: কই মাছ আলাদা ভেজে তুলতে হবে। কড়াইয়ে গরম তেলে প্রথমে কালিজিরা ফোড়ন দিয়ে নিতে হবে। তারপর সব মসলা কষিয়ে কই মাছ ছাড়তে হবে। পানি দিয়ে রান্না করে হালকা ঝোলসহ নামাতে হবে।

সুক্তানি
উপকরণ: আলু, পটোল, বেগুন, শিম, কাঁচকলা, উচ্ছে, করলা অথবা নিমপাতা, তেল বা ঘি, পোস্তবাটা, সরষেবাটা সামান্য।
প্রণালি: সব সবজি মাঝারি রকম করে কুটে রাখতে হবে। কড়াইয়ে তেল বা ঘি গরম করে তরকারি সরষেসহ খুব ভালো করে কষাতে হবে। পানি দিয়ে সিদ্ধ করে নিতে হবে। পোস্তবাটা বেশি করে দিয়ে ফোটাতে হবে। অল্প ঝোল রেখে নামাতে হবে।

ধোঁকার ডালনা
উপকরণ: ছোলার ডাল ৫০০ গ্রাম ছয় ঘণ্টা ভিজিয়ে বেটে নিতে হবে। এবার এতে আদা, হলুদ ও শুকনো লঙ্কার গুঁড়া মিশিয়ে কড়াইতে তেল দিয়ে ডালসহ অল্প লবণ দিয়ে ভালো করে নাড়তে হবে। এবার একটু আঠালো মতো হলে একটা থালায় অল্প ঘি মাখিয়ে এগুলো ভালো করে চেপে চেপে দিতে হবে। খুব ভালো করে মসৃণ করে দিতে হবে। ঠান্ডা হলে ছুরি দিয়ে কেটে নিতে হবে।
প্রণালি: কড়াইয়ে তেল দিয়ে প্রথমে একটু আলু ভেজে এতে কেটে রাখা ডালের বরফিগুলো ভেজে নিন।
এবার কড়াইতে ঘি গরম করে আস্ত জিরা, গরম মসলা, তেজপাতা দিয়ে একটা টমেটো কোচানো দিয়ে ওতে জিরাবাটা, আদাবাটা, মরিচ ও হলুদ গুঁড়া এবং ধনে গুঁড়া দিয়ে ভালো করে কষিয়ে আলু দিয়ে পানি দিতে হবে, যাতে আলু সিদ্ধ হয়ে যায়। এবার এর ওপর ভেজে রাখা ডালের বরফিগুলো দিয়ে একটু চিনি দিয়ে নামাতে হবে। নামানোর আগে অল্প ঘি ও গরম মসলা দিয়ে নামালে ভালো।

আমের চাটনি
উপকরণ: কাঁচা আম, তেল, মেথি, লবণ, চিনি, কাঁচামরিচ।
প্রণালি: লবণ পানিতে আম ভাপিয়ে পানি ঝরাতে হবে। গরম তেলে মেথি ফোড়ন দিয়ে সেই আম ভাজতে হবে। তারপর পানি, লবণ, চিনি দিয়ে চাটনি তৈরি করতে হবে। নামানোর আগে কাঁচামরিচ দিতে হবে।

ছোলার ডাল
উপকরণ: ছোলার ডাল, আদা-জিরাবাটা, হলুদ, দারুচিনি, এলাচ, কিশমিশ, নারকেল কোরানো অল্প অল্প ঘি, জিরা আস্ত, লবণ। প্রথমে ডাল সিদ্ধ বসাতে হবে, ফুটে উঠলে অল্প হলুদ, আদা ও জিরাবাটা লবণ দিয়ে ফুটাতে হবে। ডাল সিদ্ধ হলে নামাতে হবে।
এবার চুলায় কড়াই বসিয়ে দুই টেবিল-চামচ ঘি দিয়ে আস্ত জিরা, দারুচিনি, এলাচ, শুকনো লঙ্কা, কিশমিশ ও নারকেল কোরানো ও তেজপাতা দিয়ে ভালো করে ভেজে ডাল দিতে হবে। এবার অল্প চিনি দিয়ে নামাতে হবে। ডালটা একটু ঘন হবে।

মুড়িঘণ্ট
উপকরণ: আতপ চাল, আলু, বড় রুই বা কাতল মাছের মাথা, তেল, আদা, হালকা ঘি, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ।
প্রণালি: আতপ চাল ধুয়ে থালায় মেলে রাখতে হবে। আলু ছোট ডুমো করে কেটে ভেজে রাখতে হবে। মাছের মাথা ভেজে রাখতে হবে। প্রথমে তেল, ঘি মিশিয়ে চড়াতে হবে। বেশি করে পেঁয়াজ কুচি লাল করে ভাজতে হবে। তাতে চাল দিয়ে ভাজা ভাজা করতে হবে। তারপর আদা, হলুদ ও মরিচ দিয়ে ভাজতে হবে। এবার ভাজা আলু, লবণ ও কাঁচা মরিচ দিতে হবে। মুড়ো ভাজা ভেঙে মেশাতে হবে, ভালোমতো কষাতে হবে। চাল নরম হওয়ার মতো পানি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। মাঝেমধ্যেই নাড়তে হবে, নইলে তলা ধরে যাবে।
চাল সিদ্ধ হলে নামিয়ে ভালো ঘি ও গরম মসলা বাটা দিয়ে নামাতে হবে।