দূর দেশ-‘সমঝোতা’ না ওবামার পরাজয়? by আলী রীয়াজ

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান পার্টির কাছে পরাজিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণসীমা বাড়ানোর ব্যাপারে দুই মাস ধরে তিক্ত বিতর্কে রিপাবলিকান পার্টির কৌশলের কাছে ওবামার পরাজয় ঘটেছে, যখন প্রেসিডেন্ট এমন এক ‘সমঝোতা’ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন, যাতে তাঁর প্রত্যাশিত কোনো কিছুই অন্তর্ভুক্ত হয়নি।


রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক দলের নেতারা শেষাবধি যে বিল কংগ্রেসে পাস করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট যাকে আইনে পরিণত করেছেন, তাতে ঋণসীমা আগামী ১০ বছরে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়ানো হবে বটে, কিন্তু এর অধিকাংশই আসবে ব্যয়-সংকোচনের মধ্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ডেমোক্র্যাটরা এই বিতর্কের শুরু থেকে বলে আসছিলেন, তাঁরা চান ঋণসীমা বাড়ানোর জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা যেন ভারসাম্যমূলক হয়। অর্থাৎ এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় থাকবে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যয় হ্রাস এবং ধনী ব্যক্তি ও করপোরেশনগুলোর আয়কর বৃদ্ধি। প্রকৃতপক্ষে প্রেসিডেন্ট আয়কর বাড়ানোর কথা বলেননি, রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য তিনি ধনী ব্যক্তি ও করপোরেশনগুলোকে দেওয়া কিছু কিছু কর রেয়াত বাতিলের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু এসবের বদলে শেষ পর্যন্ত যে চুক্তি হয়েছে, তার আওতায় প্রথম পর্যায়ে কেবল ব্যয়-সংকোচনের কথাই বলা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ওবামা, রিপাবলিকান পার্টি ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে যে তথাকথিত ‘সমঝোতা’ হয়েছে, তার সারাংশ হলো, আগামী ১০ বছরে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে হবে, যার নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই ঋণসীমা প্রথম বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়ানোর জন্য প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ১ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হবে আগামী ১০ বছরে কেবল ব্যয়-সংকোচনের মধ্য দিয়ে। ঠিক কোন কোন খাতে ব্যয় কমিয়ে এই অর্থের সংস্থান হবে, তার বিস্তারিত এখনো স্থির হয়নি। তবে সাধারণভাবে অনুমান করা হচ্ছে, ৪২০ বিলিয়ন আসবে প্রতিরক্ষা খাত থেকে, বাকি প্রায় ৬০০ বিলিয়ন আসবে সামাজিক খাতে সরকারের ব্যয় হ্রাসের মধ্য দিয়ে। দেশের অর্থনীতি যখন গভীর সংকটে, বেকারত্বের হার যখন ৯ শতাংশ, সে সময় সামাজিক খাতে ব্যয়-সংকোচনের ভার বইতে হবে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত নাগরিকদেরই। ওবামা ও ডেমোক্র্যাটরাও এটা জানেন, তবে তাঁরা সেটা প্রতিরোধ করতে চাইলেও তাতে সফল হননি। এর অর্থ হলো, চুক্তির এই অংশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য একটা বড় রকমের ভয়ের। এই পরাজয় সে কারণেই কেবল প্রেসিডেন্ট ওবামার নয়, ডেমোক্র্যাটদের মূল সমর্থকগোষ্ঠীরও বটে।
ঋণসীমা বৃদ্ধি চুক্তির দ্বিতীয় অংশ হলো বাকি ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সংস্থান করা। এ জন্য কংগ্রেসের দুই কক্ষ থেকে ছয়জন করে সদস্য নিয়ে ১২ সদস্যের একটি কমিটি করা হবে, যাঁরা খাতগুলো চিহ্নিত করবেন এবং সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্দেশ করবেন। এই কমিটি ২৩ নভেম্বরের মধ্যে সুপারিশ করবে এবং ২৩ ডিসেম্বরের মধ্যে কংগ্রেসে তা পাস করতে হবে। কংগ্রেস যদি এই প্রতিবেদন পাস করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রতিরক্ষা ও সামাজিক খাতে সমান পরিমাণ ব্যয় হ্রাস করে এই অর্থের সাশ্রয় করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণসীমা বাড়ানোর ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়। ১৯৬২ সাল থেকে এবার নিয়ে ৭৯ বার কংগ্রেস এই সীমা বাড়াল। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের আট বছরের শাসনামলে ১৮ বার, বিল ক্লিনটনের সময় চারবার এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সময় সাতবার ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলেও এর আগে তিনবার ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সময়ই এসব নিয়ে এ রকম তিক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। এবার এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হলো, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে টি-পার্টি বলে কথিত দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান এবং তাদের শক্তির মহড়া প্রদর্শনী। টি-পার্টির সমর্থক ও নেতারা গত আড়াই বছরে প্রেসিডেন্ট ওবামার বিরোধিতাই শুধু করেননি, তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তিকর প্রচারণাও চালিয়ে আসছেন। এই বিতর্কে তাঁরা রিপাবলিকান দলের নেতৃত্ব কবজায় নিয়ে আসতে পেরেছেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রেসিডেন্ট ওবামা এ ধরনের একটি ক্ষতিকারক ‘সমাঝোতা’য় রাজি হলেন কেন? আলোচনার গোড়া থেকে প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ডেমোক্রেটিক পার্টি কৌশলগত কিছু ভুল করার করণে তাঁরা রিপাবলিকানদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েন। জনমত জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ একটি ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ অর্থাৎ কর বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাসের পক্ষে ছিলেন। ডেমোক্র্যাটরা আশা করেছিলেন, জনমতের এই চাপ রিপাবলিকানদের প্রভাবিত করবে। তদুপরি হোয়াইট হাউস ও ডেমোক্র্যাটরা কখনোই আপসহীন কঠোর মনোভাব দেখাননি; ফলে তাঁদের অবস্থান গোড়া থেকেই দুর্বল বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আলোচনার শেষ পর্যায়ে এসে প্রেসিডেন্টের সামনে বিকল্পের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। প্রেসিডেন্ট যদি রিপাবলিকানদের প্রস্তাবে রাজি না হন, তবে যুক্তরাষ্ট্র খেলাপি অবস্থায় উপনীত হবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনোই দেশটি তার ঋণ পরিশোধে খেলাপি হয়নি। ওবামা যদি সেই পরিস্থিতিতে দেশকে নিয়ে যেতেন, তবে তাঁর শাসনামল এ কারণেই পরিচিত হতো এবং আগামী বছরের নির্বাচনে তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেত। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর একটি ধারা অনুসরণ করে এককভাবে ঋণসীমা বাড়াতে পারতেন। কিন্তু এই ধারা অতীতে কখনোই এ কারণে ব্যবহূত হয়নি। ফলে এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মতভিন্নতা থাকত এবং সেই সুযোগে রিপাবলিকান পার্টির দক্ষিণপন্থীরা প্রতিনিধি পরিষদে ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে তা বিস্ময়কর হতো না। সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে তাঁর পুনর্নির্বাচনের আগের সময় আত্মরক্ষা ও সপক্ষে যুক্তি হাজির করেই সময় ব্যয় করতে হতো।
ফলে প্রেসিডেন্ট ওবামার জন্য এই তেতো ওষুধ গেলার আর কোনো আশু বিকল্প হাতে ছিল না। এর অর্থ এই নয় যে প্রেসিডেন্ট ওবামার সমর্থকেরা, বিশেষত উদারপন্থী সমর্থকেরা তাঁর এই অবস্থা উপলব্ধি করতে পারছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট এমন এক চুক্তি মেনে নিয়েছেন, যা ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থকের জন্য ক্ষতিকারক। উদারপন্থী ডেমোক্র্যাটরা সে কারণেই এই বিল সমর্থন করেননি এবং প্রেসিডেন্ট ওবামার ওপর ভীষণ রকম বিরক্ত।
ঋণসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে রিপাবলিকান পার্টি ও প্রেসিডেন্ট ওবামার মধ্যকার বিরোধিতার প্রথম পর্যায়ের অবসান হলেও এই লড়াই মোটেই শেষ হয়ে যায়নি। বরং আরও দুটি পর্যায় এখনো বাকি রয়েছে। সমঝোতার আওতায় যে কমিটি গঠন করা হবে এবং তার যে সুপারিশ তৈরি হবে, সে সময় আবারও এই বিতর্কের মুখোমুখি হতে হবে গোটা দেশকে। ডেমোক্র্যাটরা আশা করছেন, ওই কমিটি সাশ্রয়ের জন্য কেবল ব্যয়-সংকোচন নয়, রাজস্ব বৃদ্ধির (অর্থাৎ কর রেয়াত প্রত্যাহার) বিষয় বিবেচনায় নেবে এবং প্রস্তাব দেবে। রিপাবলিকান পার্টি যেকোনো ধরনের কর বৃদ্ধির—নতুন কর আরোপ বা কর-সুবিধা হ্রাস—বিরুদ্ধে। ফলে শেষাবধি ওই কমিটি এবং তার বাইরে এ নিয়ে জোর বিতর্ক তৈরি হবে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ডেমোক্র্যাটদের জন্য সামান্য আশার আলো হচ্ছে যে একই বিল আইনে পরিণত হওয়ার পরও ৫২ শতাংশ মার্কিন তা অপছন্দ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, এই সমঝোতা ভারসাম্যমূলক নয়। ডেমোক্র্যাটরা যদি এই জনমতকে একটি সারিতে পরিণত করতে পারেন, তবে হয়তো দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সক্ষম হবেন।
এই বিতর্কের তৃতীয় পর্যায় হবে আগামী বছর নির্বাচনের সময়। এ বছরের জুন-জুলাই মাস ধরে চলা এই তিক্ত, দলীয় বিতর্কের পর ফলাফলের দিক থেকে টি-পার্টির সমর্থকেরা জয়ী হয়েছেন বটে, কিন্তু এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে রিপাবলিকান পার্টি কতটা কট্টর ও জাতীয় স্বার্থেও আপস করতে নারাজ। রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরের বিরোধও এতে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের নির্দলীয় ভোটাররা চান রাজনৈতিক দলগুলো আপস ও সমঝোতা করতে প্রস্তুত থাকুক। সেই বিবেচনায় ওবামার আপস করার চেষ্টাকে তাঁরা ইতিবাচক বলেও বিবেচনা করতে পারেন। রিপাবলিকান দল, বিশেষত টি-পার্টির সমর্থকেরা যে সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে ধনী ও করপোরেশনের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়—এ কথা ডেমোক্র্যাট ও ওবামা প্রমাণসহ তুলে ধরতে পারবেন। দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান যে কেবল ব্যয় সংকোচন করে সম্ভব নয়, সেটা অধিকাংশ মার্কিন বোঝেন। আগামী নির্বাচনে বারাক ওবামা ও ডেমোক্র্যাটরা এই উপলব্ধিকে ভোটে পরিণত করতে পারবেন কি না, সেটা নির্ভর করবে নির্বাচনী কৌশল ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর। কিন্তু ওবামার এই পরাজয় থেকে যদি কোনো লাভের সুযোগ থাকে, তবে সেটা এই সম্ভাবনার ভেতরেই আছে।

ইলিনয়, ৩ আগস্ট
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।