ফরিদপুরে ৫ জন নিখোঁজ

ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে একটি মাইক্রোবাসে প্রকাশ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম বাজার থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া ৫ ব্যক্তির সন্ধান গত ১০ দিনেও পাননি তাদের পরিবারের সদস্যরা। এ ব্যাপারে স্থানীয় ভাঙ্গা থানায় মামলা হয়েছে। তবে ডিবি পুলিশ বিষয়টি স্বীকার করেনি। সরেজমিন অনুসন্ধান করে ঘটনার শিকার হয়েও ঘটনাচক্রে ছাড়া পাওয়া এক ব্যক্তির জবানিতে জানা গেছে অপহরণের এ কাহিনীর বিবরণ।


প্রাণভয়ে আপাতত আত্মগোপনে থাকা স্থানীয় পুলিয়া বাজারের ওষুধের দোকানের মালিক ও গ্রাম্য চিকিৎসক আবদুুল মালেক সিকদারের ছেলে মোঃ আসাদুজ্জামান (৩০) সেদিন তার আত্মীয়কে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে শুনে এগিয়ে গিয়েছিলেন ঘটনাস্থলে। মোবাইল ফোনে তিনি জানান (০১৭১২৪৬৭৪৭৮), ৫ ব্যক্তির একজন তার নিকট আত্মীয় কাইয়ুম মুন্সীকে পুলিশের কাছ থেকে ছড়িয়ে আনতে গেলে তাকেও জোর করে তুলে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশের পরিচয়ধারী ৬ জন স্বাস্থ্যবান যুবক। তিনি সমকালকে বলেন, 'ছয় পুলিশ পরিচয়ধারী ব্যক্তির মধ্যে চারজন এসে আমাকে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসের কাছে নিয়ে যায়। তারা আমাকে গাড়ির কাছে নিয়ে বলে, আমরা ডিবির লোক, গাড়িতে না উঠলে গুলি করে দেব। গাড়িতে মাঝের সিটে বসিয়ে আমাকে তারা বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে করতে তিনদিক থেকে চোখে মুখে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। গাড়ি ছাড়ার ৪-৫ মিনিট পর আমার মুখে মুখোশ পরিয়ে দেওয়া হয়। তারা আমাকে বলে, তুই কি মাস্তান হয়েছিস যে, এদের ছাড়িয়ে নিতে এসেছিস। তোকে এবারের মতো জীবনে বাঁচিয়ে গেলাম। এরপর পুলিশের কাছ থেকে কাউকে ছাড়িয়ে নিতে এলে পরিণাম ভয়াবহ হবে।'
ওইদিন সন্ধ্যার একটু আগে আসাদুজ্জামানকে মালিগ্রাম থেকে ফরিদপুর যাওয়ার পথে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের জোয়ারের মোড় নামক এলাকায় আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। তারা তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও নিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, মাইক্রোবাসের মধ্যে তার নিকট আত্মীয় কাইয়ুম মুন্সীকে (৩৩) হ্যান্ডকাপ পরা অবস্থায় এবং আরও চারজন আবদুল বশির খাঁর ছেলে বেলায়েত (২৩), আনোয়ার খাঁর ছেলে সোবহান (২০), নূরুল ইসলাম খাঁর ছেলে রুবেল (১৮) ও লতিফ হাওলাদারের ছেলে ফয়েজ হাওলাদারকে (২২) অপহরণ করে নিয়ে যেতে দেখেছি।
ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী পুলিয়া বাজারের চায়ের দোকানদার বকুল জানান, ডিবি পরিচয় দিয়ে বেলায়েত, সোবাহান, রুবেল ও ফয়েজকে মালিগ্রাম ডেকে নিয়ে যায় নীরব নামের একটি ছেলে। নীরবের বাড়ি নগরকান্দা উপজেলার আলগাদিয়া গ্রামে। নীরব প্রথমে সোবাহানকে ফোন করে বলে মোবাইলের কয়েকটি সিমকার্ড বিক্রির কথা। এ কথা বলার পরই সোবাহান বাকি তিনজনকে নিয়ে মোটরসাইকেলে মালিগ্রাম চলে যায়। সেখানে আগে থেকেই ওতপেতে থাকা সাদা রঙের মাইক্রোবাসে তাদের জোর করে তুলে নেওয়ার সময় তাৎক্ষণিক বাধা দেয় স্থানীয় বাসিন্দা কাইয়ুম মুন্সী। পরে কাইয়ুমকেও অপহরণ করা হয়। কাইয়ুম ঘটনার অন্যতম শিকার প্রত্যক্ষদর্শী আসাদুজ্জামানের নিকট আত্মীয়।
আসাদুজ্জামানের ভাই গোলজার জানান, অপহরণের বিষয়টি তিনিসহ স্থানীয় মালিগ্রাম বাজারের অনেকেই দেখেছেন। কিন্তু পুলিশ পরিচয় দেওয়ায় অপহরণকারীদের কেউ বাধা দিতে সাহস পায়নি।
কাইয়ুমের বাবা নায়েম মুন্সী জানান, আমার ছেলে নিরপরাধ। সে সংসারী। সোবাহান আমাদের প্রতিবেশী। সোবাহানসহ চার যুবককে পুলিশ পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ার কারণেই আমার ছেলে অপহরণ হয়েছে।
রুবেলের মামা ওবায়দুল মোল্লা জানান, রুবেল স্থানীয় আটরশি মাদ্রাসার দাখিলের ছাত্র ছিল। ফয়েজের ভাই সোহেল জানান, ফয়েজ স্থানীয় ভাঙ্গা-মাওয়া-পুলিয়া রুটে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করত। সোবাহানের মা সালমা বেগম জানান, সোবাহান ঢাকায় ফেরি করে মালপত্র বিক্রি করত। সে মাঝে মাঝে বাড়িতে আসত। বেলায়েতের বাবা বশির খান জানান, তার ছেলে কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নয়। ডিবির পরিচয় দিয়ে তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। তিনি তার ছেলের সন্ধান চেয়েছেন।
অপহৃত বেলায়েতের বোনের স্বামী স্থানীয় দেওরা বাজারের সেলুনের মালিক মাহাবুব জানান, অপহৃত সবার বাড়ি ভাঙ্গা উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের আটরাভাসরা গ্রামে। ৮ ডিসেম্বর অপহৃত সোবাহানের বাবা আনোয়ার খাঁ বাদী হয়ে ভাঙ্গা থানায় একটি অপহরণ মামলা করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপহৃত পাঁচজনের মধ্যে কাইয়ুম মুন্সী ছাড়া অন্য চার যুবক প্রতারক চক্রের সঙ্গে যুক্ত। তারা মানুষকে মোবাইলে ফোন করে লটারিতে টাকা জিতেছেন বলে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের স্থানীয়ভাবে 'ওয়েলকাম পার্টি'র লোক হিসেবে সবাই চেনে। তারাসহ স্থানীয় আরও বেশ কয়েক যুবক গ্রামীণসহ বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের হেড অফিসের লোক পরিচয় দিয়ে মানুষের কাছ থেকে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিত। অপহরণের পর থেকে ওয়েলকাম পার্টির সদস্যরা গাঢাকা দিয়েছে বলে জানায় এলাকাবাসী।
ভাঙ্গা থানার ওসি দাদন ফকির জানান, আমরা ঘটনা জানতে পেরে অভিযান শুরু করেছি। নগরকান্দার নীরব যে ফোন করে অপহৃত চার যুবককে প্রথমে পুলিয়া থেকে মালিগ্রাম ডেকে আনে, সেই নীরবের বাড়িতে পুলিশ হানা দিয়েছিল। সে পলাতক রয়েছে। তাকে ধরার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দু'দিন আগে স্থানীয় দুই যুবক কামাল (২৪) ও ফারুককে (২৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতারকৃত দুই যুবক প্রতারক চক্রের সদস্য বলে পুলিশ জানায়।
অপহৃতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ধলেশ্বরী নদীতে খুঁজে পাওয়া লাশের পরিচয় জানতে তারা মুন্সীগঞ্জ গিয়েছিল। কিন্তু তাদের স্বজনদের লাশ কি-না তা শনাক্ত করতে পারেননি। তাদের ফিরে পেতে স্বজনরা এলাকায় বিভিন্ন মহলে অনুসন্ধান করে যাচ্ছেন। পুরো আটরাভরসা গ্রামের মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।
৬ ডিসেম্বর ভাঙ্গার মালিগ্রাম ও দেওড়া এলাকা থেকে অপহরণ হওয়া পাঁচ ব্যক্তির স্বজনরা গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে উপস্থিত হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে লিখিত বক্তব্যে অপহৃত সোবাহানের বাবা ও এ ব্যাপারে দায়ের করা অপহরণ মামলার বাদী আনোয়ার খাঁ জানান, অপহরণকারীরা ০১৮২৫৭৯০৮৭০ নম্বর থেকে তাকে ফোন করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে। এ ব্যাপারে তারা ভাঙ্গা থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে। তারা অবিলম্বে তাদের স্বজনদের উদ্ধার করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের জোর তৎপরতা দাবি করেছেন। তারা বলেন, এলাকাবাসী ঘটনার পর থেকে খুবই অস্থির ও মর্মাহত অবস্থায় আছে। তারা জানে না তাদের স্বজনরা বেঁচে আছেন কি-না।