খালেদা জিয়ার উদ্দেশে শেখ হাসিনা- যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই, খামাখা মানুষ মারবেন না

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হবেই। তারা উপযুক্ত সাজা পাবে। তিনি খালেদা জিয়াকে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘খামাখা মানুষ পুড়িয়ে মারবেন না। তাদের কষ্ট দেবেন না। জনগণের অভিপ্রায় বোঝার চেষ্টা করুন।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
জাতীয় পতাকা, বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। নগরের বিভিন্ন থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড থেকে কয়েক হাজার কাউন্সিলর ও ডেলিগেট কাউন্সিলে অংশ নেন। দীর্ঘ নয় বছর পর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল ঘিরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছিল উর্যা সাহ-উদ্দীপনা।
এর আগে গত বুধবার বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বিভিন্ন পথসভায় আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘বিষধর সাপকে বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায় না।’
খালেদার এই বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘উনি সাপ নিয়ে খেলছেন। সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলছেন। তাঁর সময়ে একই দিনে ৫০০ স্থানে বোমা হামলা হয়েছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা হয়েছে।’
এরপর গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘সাপকে যে উনি বিশ্বাস করেছেন, এটা তো ঠিক। যে সাপ একাত্তর সালে দেশকে ধ্বংস করেছিল। মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে। উনি সেই সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলছেন। উনার যে কী হবে, এটা ভাবা দরকার। ওঝা মরে সাপের বিষে।’
সূচনা বক্তব্যের পর কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন দলীয় প্রধান।
এর আগে বিকেলে মহানগর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজয়ের মাসে খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে মাঠে নেমেছেন। এর আগেও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রায় ঘোষণার দিন হরতাল ডেকেছিলেন তিনি। তাই যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
খালেদা জিয়ার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৮১ সালে জিয়া মারা গেলেন, তখন জিয়ার ছেঁড়া প্যান্ট দিয়ে পুত্রদের প্যান্ট বানালেন। সংসার চালাতে পারতেন না। এরশাদের কাছ থেকে বাড়ি-গাড়ি-টাকা নিলেন। আবার গুলিস্তান চত্বরে বক্তৃতায় তাঁকে স্বামীর হত্যাকারী বলেছিলেন। তাহলে স্বামীর হত্যাকারীর কাছ থেকে কীভাবে বাড়ি-গাড়ি-টাকা নিলেন?’
খালেদার উদ্দেশে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আপনি কালোটাকা সাদা করেছেন। এ টাকা কি সর্যা পথে উপার্জন করেছেন? আপনার ছেলেরা দুর্নীতি করে। তাদের পাচার করা টাকা ফেরত নিয়ে এসেছি। তার পরও লজ্জা হয় না। চোরের মার বড় গলা।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড থেকে মাস্টার্স করেছে। মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাস্টার্স করেছে। আপনার ছেলেরা তো সরকারি টাকা নিয়েছে লেখাপড়ার জন্য। কী শিক্ষা নিয়েছে? একজন মানি লন্ডারিং আর অন্যজন ড্রাগে মাস্টার্স।’
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ‘এক-এগারোর’ সময়ে শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তবে সময়মতো কাউন্সিল না করায় অসন্তোষও প্রকাশ করেন।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী, কামরুল ইসলাম, হাজী সেলিম, শাহ আলম মুরাদ প্রমুখ বক্তব্য দেন। কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়। ২৯ ডিসেম্বর নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা হবে বলে জানা গেছে।
বনানী উড়ালসড়ক উদ্বোধন: রাজধানীর বনানী উড়ালসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল ৮০৪ মিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়কের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
র্যা ডিসন হোটেল প্রান্তে ফিতা কেটে উড়ালসড়কে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। সেখানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী আর্মি স্টেডিয়ামে যাওয়ার পর যানবাহনের জন্য উড়ালসড়ক উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। উড়ালসড়কের ফলক উন্মোচন ও মোনাজাতের পর এর নিচে একটি কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণ করেন শেখ হাসিনা।
১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নির্ধারিত সময়ের ছয় মাস আগেই ছয় লেনবিশিষ্ট এ উড়ালসড়কের নির্মাণ শেষ হয়েছে।
উদ্বোধনী ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বিমানবন্দর সড়ক। উড়ালসড়কটি হওয়ার ফলে এখন বনানী রেলক্রসিংয়ে কোনো গাড়ি থামতে হবে না। বিশ্বরোড বা মহাখালী পর্যন্ত যানজটের সৃষ্টি হবে না। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে জনগণ সুরক্ষা পাবে।
রাজধানীকে যানজটমুক্ত করতে কয়েক মাসের মধ্যে কুড়িল উড়ালসড়ক, মিরপুর-বিমানবন্দর উড়ালসড়ক ও যাত্রাবাড়ী উড়ালসড়ক সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং সড়ক উন্নয়নসহ সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন শেষ হলে ঢাকা শহরের সৌন্দর্য অনেকাংশে বেড়ে যাবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূইয়া, সড়ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব এম এ এন সিদ্দিক এবং প্রকল্প পরিচালক ও সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আবু সাইদ আল মাসুদ।
যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, শেষ করতে পারব না। তবে পদ্মার প্রদীপ এখনো জ্বলছে। হতাশ হওয়ার কিছু নেই।’ তিনি বলেন, মেট্রোরেল ও বাসের বিশেষ লেনের কাজ চালু হবে শিগগিরই।