কেলেঙ্কারি- চুরি থেকে সাবধান by মশিউল আলম

‘সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদকেরা শনাক্ত করেছেন যে নিউইয়র্কার পত্রিকার ২৩ এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত জিল লেপোরের লেখা একটি প্রবন্ধের কয়েকটি স্তবকের সঙ্গে এ সপ্তাহে টাইম সাময়িকীতে প্রকাশিত আমার কলামের কয়েকটি স্তবকের খুব মিল রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য সঠিক।


আমি ভয়ংকর ভুল করেছি। এটি একটি গুরুতর বিচ্যুতি, এর জন্য আমিই সম্পূর্ণভাবে দায়ী। আমি তাঁর (জিল লেপোর) কাছে, টাইম-এ আমার সম্পাদকদের কাছে এবং আমার পাঠকদের কাছে অকপটে ক্ষমা চাইছি।’
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ফরিদ জাকারিয়ার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। গত শুক্রবার টাইম সাময়িকী ও সিএনএন টেলিভিশন তাঁকে বরখাস্ত করেছে। তিনি টাইম-এর জন্য প্রতি সপ্তাহে একটি কলাম লিখতেন, আর সিএনএন-এ প্রতি রোববার ‘ফরিদ জাকারিয়া জিপিএস’ (গ্লোবাল পাবলিক স্কয়ার) নামের একটি টক শো পরিচালনা করতেন। টাইম সাময়িকী বলেছে, ফরিদ জাকারিয়ার কলাম আগামী এক মাস স্থগিত থাকবে। সিএনএন বলেনি, তাঁর টক শো কত দিন বন্ধ থাকবে। সিএনএনের এ সিদ্ধান্তের কারণ, ফরিদ জাকারিয়া তাঁর ওই কলামের ওপর ভিত্তি করে একটি সংক্ষিপ্ত ব্লগপোস্ট লিখেছিলেন সিএনএনের ওয়েবসাইট সিএনএন ডট কমে। সিএনএন সেই ব্লগপোস্ট সরিয়ে ফেলেছে। টাইম সাময়িকী ও সিএনএন টেলিভিশন ‘টাইম ওয়ার্নার ইনকরপোরেটেড’ নামের এক আমেরিকান বহুজাতিক সংবাদমাধ্যম গ্রুপের মালিকানাধীন।
ফরিদ জাকারিয়া ওয়াশিংটন পোস্ট-এও নিয়মিত কলাম লেখেন। ঘটনার পর পত্রিকাটি বলেছে, তাঁরাও বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। সম্ভবত ওয়াশিংটন পোস্টও তাঁর কলাম বন্ধ করে দেবে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফরিদ জাকারিয়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন আমেরিকান সাংবাদিক। ২০১০ সালে টাইম সাময়িকীর এডিটর অ্যাট লার্জ হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি দীর্ঘ ১০ বছর নিয়মিত কলাম লিখেছেন নিউজউইক সাময়িকীতে, নিউজউইক ইন্টারন্যাশনাল-এর সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন দীর্ঘদিন। হার্ভার্ড ও ইয়েল ইউনিভার্সিটির সনদধারী ফরিদ জাকারিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর বই লিখেছেন।
বিলেতি দৈনিক গার্ডিয়ান-এর যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি পল হ্যারিস গত শুক্রবার লেখা প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছেন, ফরিদ জাকারিয়ার এ ঘটনা আমেরিকান সাংবাদিকতার সর্বস্তরে প্ল্যাজিয়ারিজম বা কুম্ভিলকবৃত্তির এক দীর্ঘ তালিকার সর্বশেষ সংযোজন মাত্র। পল জানিয়েছেন, গত মাসে কানেকটিকাট শহরের নিউ ক্যানান নিউজ পরেশ ঝা নামের এক প্রতিবেদককে চাকরিচ্যুত করেছে। গত জুনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বরখাস্ত করেছে লাইয়েন মেমবিস নামের এক শিক্ষানবিশ প্রতিবেদককে। আর যে পত্রিকাটির প্রবন্ধ থেকে ফরিদ জাকারিয়া টুকলিফাই করেছেন বলে চাকরি হারালেন, সেই নিউইয়র্কার-এর একজন বিজ্ঞানবিষয়ক লেখকও একই অপরাধে চাকরি হারিয়েছেন।
ফরিদ জাকারিয়ার এই কেলেঙ্কারির পর তাঁর বিরুদ্ধে আরও দুটি অভিযোগ উঠেছে। একটি হলো, এ বছর তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, সেই একই বক্তৃতা তিনি আগেও দিয়েছেন ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ধরনের কাজকে বলা হয় সেলফ-প্ল্যাজিয়ারিজম। সংবাদমাধ্যমে লেখালেখির ক্ষেত্রে এটা ঘটে, যখন কোনো কলাম লেখক নিজের পুরোনো লেখা ঘষামাজা করে নতুন লেখা বলে চালান। তাঁর বিরুদ্ধে কুম্ভিলকবৃত্তির আরেকটি পুরোনো অভিযোগ নতুন করে বেশ প্রচারিত হচ্ছে। সেটা হলো, ২০০৯ সালে তিনি যখন নিউজউইক সাময়িকীতে কলাম লিখতেন, তখন দি আটলান্টিক সাময়িকীর জাতীয় সংবাদদাতা জেফরি গোল্ডবার্গ অভিযোগ করেছিলেন, ফরিদ জাকারিয়া ইরান নিয়ে নিউজউইক-এর প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে তাঁর একটি উদ্ধৃতি চুরি করেছিলেন। শুক্রবারের ঘটনার পর জেফরি গোল্ডবার্গ তাঁর ব্লগে অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি সাক্ষাৎকার তিনি নিয়েছিলেন। তাঁর ওই সাক্ষাৎকারের একটা অংশ ফরিদ জাকারিয়া নিজের লেখা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন।
আমেরিকান সাংবাদিকতায় যে কুম্ভিলকবৃত্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিলেতের গার্ডিয়ান দাবি করছে, সেই একই চর্চা খোদ বিলেতসহ অনেক দেশেই ব্যাপকভাবে চলছে। সাংবাদিকতায় নৈতিকতার অবক্ষয় কেবল আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং যেসব নেতিবাচক চর্চা আমেরিকায় অপরাধ বলে গণ্য হচ্ছে, অন্যান্য দেশে সেগুলো গা-সহা সাধারণ চর্চার বিষয়। ফরিদ জাকারিয়ার অপরাধ, তিনি নিউইয়র্কার-এ প্রকাশিত জিল লেপোরের প্রবন্ধের কিছু অংশ নিজের কলামে ব্যবহার করেছেন কিন্তু তথ্যসূত্র হিসেবে নিউইয়র্কার বা লেখক জিল লেপোরের নাম উল্লেখ করেননি। এতেই তাঁর চাকরি চলে গেল, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েও তিনি ক্ষমা পেলেন না। বড় সাংবাদিক না হলে সম্ভবত এমন লঘু অপরাধে এতটা গুরুদণ্ড তাঁকে পেতে হতো না।
একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, ফরিদ জাকারিয়ার কলামটি (‘দ্য কেস অব গান কন্ট্রোল’) ছাপা হয়েছে টাইম সাময়িকীর ২০ আগস্ট সংখ্যায়। ১০ আগস্ট সংখ্যাটির অনলাইন সংস্করণ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কুম্ভিলকবৃত্তি ধরা পড়েছে। ওই দিনই সন্ধ্যার পরে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে এবং তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টাইম ও সিএনএন তাঁকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এমন বিদ্যুৎ-গতিতে এসব ঘটতে পেরেছে ইন্টারনেটের কল্যাণে। ‘নিউজবাস্টার্স’ নামের একটি সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইটসহ কয়েকটি ব্লগে ব্যাপারটা ধরা পড়লে ভীষণ হইচই শুরু হয়। সাংবাদিকতায় শুধু নয়, গবেষণা ও সৃজনশীল লেখালেখির ক্ষেত্রে কুম্ভিলকবৃত্তি অনেক পুরোনো এক প্রবণতা। তবে ইন্টারনেটের যুগে এই অনৈতিক চর্চা করে পার পাওয়া যে আগের মতো সহজ নেই, ফরিদ জাকারিয়ার এ ঘটনা তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। অতএব, কুম্ভিলক সাবধান!
মশিউল আলম: সাংবাদিক
mashiul.alam@gmail.com