ইরানকে কেন হুমকি ভাবে সৌদি আরব?

সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলছে। রিয়াদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব বাড়ছে। বাড়ছে গুরুত্ব। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকে ইরানকে হুমকি ভাবছে সৌদি আরব।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে তেহরানের ঐতিহাসিক চুক্তির পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি সবিধাজনক স্থানে চলে আসে ইরান।
ইরানের ভাবনা, চুক্তির ফলে তাদের ওপর চাপ শিথিল হবে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের স্বার্থ সীমিত করার আরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ইরানের উচ্চাভিলাষ কখনোই ভালো চোখে দেখেনি সৌদি আরব। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়টি প্রভাবশালী দেশের চুক্তি তেহরানকে আরও সাহসী করে তুলবে বলে মনে করছে রিয়াদ। তাই চুক্তিটিকে ভালোভাবে নেয়নি সৌদি আরব।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সম্পর্ক, পারমাণবিক চুক্তি, সিরিয়া-ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। রিয়াদ একধরনের সংকট বোধ করছে। দেশটি ভাবছে, ইরান দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের প্রভাবকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে সৌদি। এমন প্রেক্ষাপটে নিজের প্রভাব অটুট রাখা এবং ইরানকে ঠেকাতে সৌদি আরব মরিয়া।
সম্প্রতি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা শেখ নিমর-আল নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি আরব। রিয়াদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য প্রভাবিত করার চেষ্টা কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিমরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানে সৌদি দূতাবাস ও কনস্যুলেটে হামলা হয়। দুই দেশের সম্পর্কে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। এই উত্তেজনায় অন্য দেশও যোগ দেয়।
সৌদি আরব ও ইরানের বিরোধের ইতিহাস দীর্ঘ। সৌদি আরব সুন্নিপন্থী রাষ্ট্র। আর ইরান শিয়াপন্থী। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে জাতিগত বিভক্তি। সৌদিরা আরব, আর ইরানিরা পারস্য জাতি।
১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের অবনতি হয়। এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে ওঠে সৌদি আরব।
ইরানের প্রভাব ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে সুন্নিদের ঐক্য সৃষ্টির চেষ্টা চালায় সৌদি আরব। শিয়া প্রভাব মোকাবিলায় সৌদি আরব ওয়াহাবি আদর্শের বিস্তারেও তৎপর হয়।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এসে ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। তবে তাদের মধ্যে ভেতরে-ভেতরে একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই যায়।
গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতির কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এসেছে। সবশেষ আরব বসন্তে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
সিরিয়া ও ইয়েমেনে চলা সংঘাতে সৌদি আরব ও ইরানের অবস্থান বিপরীতমুখী। উভয় দেশই তাদের প্রভাববলয় বাড়াতে তৎপর। এই দুই দেশে ইরান-সমর্থিতরা জয়ী হলে তা সৌদি আরবের জন্য সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক হুমকি সৃষ্টি করবে বলে রিয়াদের শঙ্কা।
সৌদি আরবের খ্যাতিমান সাংবাদিক জামাল খাশোগির ভাষ্য, ইরান মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সৌদি সরকারের উপদেষ্টা হামাদ আল-শেহরি বলেন, গত কয়েক বছরে সৌদি আরবের প্রভাব কমেছে বলে মনে করছে রিয়াদ। আর ইরান হয়ে উঠেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধের হুমকির বিষয়ে সৌদি আরব উদ্বিগ্ন।
তেহরানের প্রতি ‘বৈরী নীতি’ অবসানের জন্য রিয়াদের প্রতি সম্প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান।
পাল্টা বক্তব্যে রিয়াদ বলেছে, সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তেহরানকে অবশ্যই তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
দুই দেশের সম্পর্কের এমন টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের এক বিশেষজ্ঞের মত, রিয়াদ ও তেহরানের সুসম্পর্ক মুসলিম বিশ্বের জন্য ভালো। আরব বিশ্বের জন্যও ভালো।