হেফাজতে ভর করে জামায়াতের ডিজিটাল প্রচারণা by ইসমাইল হোসেন

ধর্মের নামে হেফাজত ইস্যুতে গ্রামাঞ্চলের সহজ সরল মানুষকে ধোকা দিচ্ছে জামায়াত। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচারের রায়কে বাধাগ্রস্ত করতে জনমত সংগ্রহে সরকারের বিরুদ্ধে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ অপপ্রচারে নেমেছে তারা। আর এক্ষেত্রে হাতে হাতে মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন।
একাত্তরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধে দলের শীর্ষ ৫ নেতার বিচারের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচার প্রক্রিয়া চলছে আরও কয়েকজনের। এছাড়া নিবন্ধন নিয়ে সৃষ্ট আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত হতে না পেরে অস্তিত্ব টিকে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জামায়াত-শিবির।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গাজীপুরসহ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

গত ৫ মে হেফাজতের ঢাকা অবরোধের সময় সংগঠনটির কর্মীরা নারকীয় কায়দায় ব্যাপক যানবাহন, ল্যাম্পপোস্ট, ডিভাইডার, পুলিশবক্সে ভাঙচুর চালায়। কেটে ফেলে শত শত গাছ। অগ্নিসংযোগ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ঘিরে গড়ে ওঠা দোকানগুলোতে। এতে পুড়ে যায় শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কোরআন শরীফসহ বই ও অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রী। তারা ব্যাংক লুটেরও চেষ্টা চালায়। বাধ্য হয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মধ্যরাতে হেফাজতের কর্মীদের সরিয়ে দেয়।

হেফাজতের ব্যানারে জামায়াত-শিবির গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে ছোট ছোট ছাত্রদের ‘ইসলাম গেল ইসলাম গেল’ বলে ঢাকায় জড়ো করে। সারা দেশের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকেও বাধ্য করা হয় মতিঝিলের কর্মসূচিতে।

হেফাজত ও জামায়াত এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নৈরাজ্যের জবাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় চারজন নিহত হয়। নিহতদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারেনি খোদ হেফাজতে ইসলামও।

কিন্তু রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে জামায়াত ও হেফাজত এবং বিএনপি ‘শাপলা চত্বরে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে’ বলে প্রচার চালায়। এতে সফলও হয় তারা। সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে তারা সফলও হয়। আর এই ইস্যুকে এবার ডিজিটালি ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে নেমেছে তারা।

সম্প্রতি রংপুর সদরের হারাগাছ, সদ্যপুস্করণি, বদরগঞ্জের লোহানীপাড়া, মিঠাপুকুরের খোড়াগাছসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে সরকারের বিরুদ্ধে ডিজিটাল কায়দায় অপপ্রচার চালাতে দেখা গেছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এসব এলাকার সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে ওয়াজের নামে মতিঝিলের সমাবেশে ‘হাজার হাজার আলেম-ওলামাকে হত্যার’ অডিও ব্লুটুথের মাধ্যমে এক মোবাইল থেকে আরেক মোবাইলে ছড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি মতিঝিলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও লাশের ছবির ভিডিও দেখা গেছে মোবাইলে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুর সদর উপজেলার পালিচড়ার এক জামায়াতকর্মী বলেন, হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে মুসলমান হত্যার বিষয়টি নিয়ে তারা প্রচার চালাচ্ছেন। পাশাপাশি মোবাইলে অডিও-ভিডিও’র মাধ্যমে প্রচারণা চলছে।

জানতে চাইলে এই জামায়াতকর্মী বাংলানিউজকে জানান, তিনিও নেতাদের কাছে জানতে পেরেছেন মতিঝিলে হাজার হাজার মুসলমানকে গুলি করে মারা হয়েছে।

এদিকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে নামলেও বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের মুখে কুলুপ দিতে তেমন তড়িৎ উদ্যোগ নেই। সম্প্রতি বিলবোর্ডে উন্নয়ন প্রচারেও সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার।

তবে এখন বিকল্প হিসেবে সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রচারে এনালগ থেকে ডিজিটাল সব কলা-কৌশল নিয়ে তারা যুদ্ধে নামছে। চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, দলীয় নেতৃত্ব ছাড়াও পুরো কাজের তদারকি করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

টিভি বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে মোবাইলে এসএমএস, পাড়া-মহল্লায় জনসভা, প্রজেক্টরের মাধ্যমে ভিডিওচিত্র প্রদর্শন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থিরচিত্র দেখানো, ভিডিওগ্রাফি, গ্রাফিক্স ও এনিমেশনের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন ও আগামী দিনের পরিকল্পনা জনগণের কাছে তুলে ধরবে তারা।

এদিকে হেফাজত ও জঙ্গিবাদ সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বার্ষিকীতে শোকসভায় তিনি বলেন, বোমা ও গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বাংলানিউজকে বলেন, জামায়াত ধর্মকে ব্যবহার করে সব সময় রাজনীতি করে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে হেফাজত।

অপপ্রচার চালিয়ে কোন লাভ হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, যাতে মানুষ তাদের আসল চেহারা চিনতে পারেন সেজন্য জনগণের দ্বারে দ্বারে প্রচারণা চালানো হবে।

জামায়াত-হেফাজতের অপপ্রচারের ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন এই নেতা।

দেশব্যাপী প্রচারণায় উন্নয়নচিত্রের পাশাপাশি জামায়াত-হেফাজতের সহিংসতা ও নৈরাজ্য জনগণের কাছে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।