‘আবে অর্থনীতি’ কাজ করছে কি? by কোইচি হামাদা

জাপান সরকার গত এপ্রিলে ভোক্তা কর ৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করেছে, ব্যাপারটা বহুপ্রতীক্ষিত ছিল। ২০১৫ সালের মধ্যে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, ফলে এটা এই কর বাড়ানোর প্রক্রিয়ার দুটি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপ। এই কর বৃদ্ধি আসলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ‘আবে অর্থনীতির’ একটি বিশেষ দিক। জাপানের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে আবে ত্রিমুখী কৌশল গ্রহণ করেছেন। দেশটির আর্থিক খাত সংহত করা আবের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি রয়েছে, এই কর বাড়ানো সেটারই অংশ। কিন্তু এতে জাপানের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধাক্কা লেগেছে।

২০১১ সালের সুনামিতে জাপান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কমে গেছে। তদুপরি, ভোক্তা ব্যয়ও রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে (মুদ্রাস্ফীতি ধরার পরও), গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ বছর তা ৫ দশমিক ৯ শতাংশ কম। কিন্তু ব্যাপারটা সর্বাংশে নেতিবাচক নয়। আবে তাঁর ত্রিমুখী কৌশলের দ্বিতীয় ধাপে যে প্রসারণমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছেন, তাতে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে গেছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় সমাজে একরকম ভারসাম্য এসেছে, জিডিপির সংকোচনমুখী প্রবণতাও কমে প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে।

এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে দুটি বিপরীতমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে। অনেক অর্থনীতিবিদই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকের নেতিবাচক ধারায় মুদ্রাস্ফীতির হার কমে যাবে, ফলে আবে যে প্রবৃদ্ধির আশা করছেন, তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এদিকে ব্যাংক অব জাপান তার মুদ্রানীতির ইতিবাচক ফলাফলের কথা বলে এই সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে ইতস্তত করছে।

প্রথমোক্ত ধারাটি সঠিক হলে, ব্যাংক অব জাপানকে মুদ্রাস্ফীতি কমে যাওয়া রোধে মুদ্রানীতি আরও শিথিল করতে হবে। আর ব্যাংক অব জাপানের অবস্থান সঠিক হলে তাদের এই অবস্থান বজায় রাখা দরকার। সরকারকে এই ভোক্তা কর বৃদ্ধি স্থগিত করতে হবে বা দুই ধাপে ১ শতাংশ করে বাড়াতে হবে, একবারে ২ শতাংশ বাড়ানো ঠিক হবে না।
অবশ্যই এই কর বাড়ানোর ফলাফল দেশটির দ্বিতীয় প্রান্তিকের জিডিপির পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফল না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। সেই পরিসংখ্যান থেকে আসলে বোঝা যাবে, দ্রুত হারে কর বাড়ালে জাপানের অর্থনীতিতে তা কী ফল বয়ে আনবে। সুসংবাদ হচ্ছে, আবে ঠিক এটাই করতে চাচ্ছেন।

যাই হোক, মুদ্রানীতির এই সফলতা অস্বীকার করার উপায় নেই। মুদ্রাস্ফীতির হ্রাসের ব্যবধান কমে এলে মুদ্রানীতির সামগ্রিক প্রভাব কমে যাবে। কারণ, এটা ক্রমবর্ধমান হারে শুধু মূল্যের ওপরই প্রভাব ফেলে, পরিমাণের ওপর নয়।
সময় এসেছে, জাপানের নেতাদের এখন চাহিদামুখিনতার জায়গা থেকে সরবরাহমুখিনতার দিকে যেতে হবে, সেটা হবে আবের ত্রিমুখী কৌশলের তৃতীয় দিক—প্রবৃদ্ধির এক নতুন কৌশল। অর্থনীতিতে সরবরাহের পরিমাণ বেড়ে গেলে চাহিদা বাড়াতে হয়, এ ছাড়া কোনো গতি নেই। তার মানে, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের ব্যবধান ব্যাপকভাবে কমে না গেলে প্রবৃদ্ধিতে জোর দেওয়া সমীচীন নয়। আবের কৌশলের এই তৃতীয় দিকটি প্রথাগত শিল্পনীতিবিষয়ক কোনো ব্যাপার নয়। বরং এটা শ্রমবাজারের সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ শিথিল ও করপোরেট কর হার কমানোয় জোর দিচ্ছে।
আবের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, শ্রমশক্তি বাড়ানো। এটি একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জই বটে, কারণ জাপানে বুড়ো মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিদেশ থেকে শ্রমশক্তি আমদানি করা এর একটি যৌক্তিক সমাধান হতে পারে। কিন্তু সেটা করতে গেলে অভিবাসন হতে হবে, আর তা করতে গেলে আবের সরকারকে ব্যাপক সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে।

যে কর্মক্ষম নারীরা গৃহিণী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের একত্র করে শ্রমশক্তির ঘাটতি সহজে পূরণ করা যেতে পারে। নারীদের কাজ করার ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো দূর করে জাপান সরকার অনায়াসে নারীদের শ্রমে অংশগ্রহণের হার বাড়াতে পারে: শিশু সেবা ও সামাজিক বাধা। ফলে দেশটি আপৎকালের জন্য শ্রমশক্তি সঞ্চয় রাখতে পারে।
জাপানের সরকারি নিয়মকানুন বেশ ঝামেলাপূর্ণ, দেশটির প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে হলে এসব দূর করতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় একটি নতুন মেডিকেল স্কুল স্থাপন করতে ৩৪ বছর লেগে গেছে। সরকারি কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রয়াসে এটা করা সম্ভব হয়েছে।

আবের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করতে হবে। সেগুলোর নিয়মকানুন শিথিল রাখতে হবে, প্রতিটির আবার আলাদা লক্ষ্য থাকতে হবে। যেমন নতুন কোনো মেডিকেল প্রযুক্তি গ্রহণ বা বিদেশি ব্যবসা আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কর্তৃপক্ষের নজরদারিরর ধরনটা কোনো কাজের কিছু নয়, বরং সেটা বাস্তব কাজে বাধার সৃষ্টি করে। উল্লিখিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই প্রক্রিয়ার রাশ টেনে ধরা যাবে। একই সঙ্গে, সরকার দেশটির ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করলে শ্রমবাজারের দক্ষতা ও ধারণক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
পরিশেষে, আবের পরিকল্পনা সফল করতে হলে করপোরেট কর কমাতে হবে। এতে উল্টো কর সংগ্রহের পরিমাণ বাড়বে, কারণ এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সব দেশই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। করপোরেট কর কমানো হলে জাপানে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।

এসব পদক্ষেপ নিতে গেলে জাপানের আমলারা বাদ সাধতে পারেন, পাছে তাঁদের প্রভাব–প্রতিপত্তি কমে যায়। বিশেষত, নিয়মকানুন শিথিল করতে গেলে এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু আবে ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইওশিহিদে সুগা যত দিন লক্ষ্যের ব্যাপারে অবিচল থাকবেন, তত দিন জাপানের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
কোইচি হামাদা: জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।