৯২৩ কোটি টাকা সাদা হয়েছে সুযোগ নিলেন ১৯২৩ জন

শুরুতে অনীহা দেখালেও শেষ পর্যন্ত অর্থ সাদা করার সুযোগ ভালোই কাজে লাগিয়েছেন কালো টাকার মালিকেরা। সদ্য সমাপ্ত ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে সুনির্দিষ্ট তিনটি খাতে বিনিয়োগের শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আর শেষ সময়ে এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বৈধ করে নিয়েছেন কালো টাকার মালিকেরা।
এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ১২১ কোটি টাকারও বেশি। রাজনৈতিক সরকারব্যবস্থায় অর্জিত এ আয়কে সন্তোষজনক বলেই মনে করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআরের সম্মেলন কক্ষে বিদায়ী অর্থবছরের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার পক্ষ থেকে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। এ সময় জানানো হয়, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এক হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থবছরটিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬২ হাজার সাত কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ শতাংশের মতো।
এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অর্থবছরের এ তথ্য সাময়িক। এখনো চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যায়নি। আশা করছি, সব তথ্য পাওয়া গেলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আরও বাড়বে।’
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের দুই অর্থবছর ছাড়া আগে কখনো সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। কিন্তু এবার স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্জন সম্ভব হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্যমী প্রচেষ্টা ও করদাতাদের সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। চলতি অর্থবছরেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে এনবিআরের সদস্য আমিনুর রহমান, বশির উদ্দিন আহমেদ, আবদুল মান্নান পাটোয়ারী, শম্ভুনাথ দাস, জাহানারা সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) খাতে। এ খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকার বেশি। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ১০৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আর আগের অর্থবছরের চেয়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। এনবিআরের পর্যবেক্ষণে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রমে এ খাতের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।
আমদানি পর্যায়ে অবশ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। এ খাতে ২৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু আদায় হয়েছে ২২ হাজার ৮৯১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৯৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের মতো।
আয়কর খাতেও সমাপ্ত অর্থবছরে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এ খাতে মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। আয় হয়েছে ১৭ হাজার ৮৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের চেয়ে এ খাতে ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এ ছাড়া ভ্রমণ বা অন্যান্য খাতে ৩৮৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। কিন্তু এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ খাতটি থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। আগের অর্থবছরের চেয়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধির হারও ঋণাত্মক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির হার কমে যাওয়ায় এর পেছনের বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত ছিল অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ। এ সময় নতুন শিল্প ও ভৌত-অবকাঠামো নির্মাণ, পুরোনো শিল্পের পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের শর্তে ১০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ফ্ল্যাট বা বাড়ি তৈরির জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এলাকা ভিত্তিতে আয়তন ও পরিমাপের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে অর্থ বৈধ করার সুযোগও দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এসব খাতে অর্থবছরের শেষ দিন, অর্থাৎ ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ৯২৩ জন ব্যক্তি ৯২২ কোটি ৯৮ লাখ আট হাজার ৯৭২ কোটি টাকা বৈধ করেছেন। এর মধ্যে নতুন শিল্প ও ভৌত-অবকাঠামো নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ দেখিয়ে টাকা বৈধ করেছেন ১৬২ জন। সম্মিলিতভাবে তাঁদের প্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ ২৩৯ কোটি দুই লাখ ৬১ হাজার ৮২১ টাকা। এ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকার মতো। পুরোনো শিল্প পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণে ১৪৫ জন ব্যক্তি ২৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ দেখিয়েছেন। তাঁরা কর দিয়েছেন ২৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সবচেয়ে আলোচিত খাত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করেছেন ২৯৬ জন। তাঁরা ৪২৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনে টাকা বৈধ করার সুযোগ নিয়েছেন এক হাজার ৩২০ জন। এ খাত থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে কী পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে, তার চূড়ান্ত হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। এনবিআর থেকে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া গেলে মোট টাকা বৈধ করার পরিমাণ আরও বাড়বে।