পতন ঠেকাতে 'গ্রান্ড বার্গেন'-ইউরো জোন by এম. আবদুল হাফিজ

গ্রান্ড বার্গেনের যেটুকু প্রকাশ পেয়েছে তার মর্মানুযায়ী ফরাসিরা জার্মানদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছে। এটা তাদের অমনোযোগিতাজনিত ভুলের খেসারত। ইউরো জোন দেশগুলোর জাতীয় বাজেটের ওপর কঠোর অর্থদণ্ডের মাধ্যমে এটি বলবৎ করা হয়েছে।


ইউরোপিয়ান ভোটারদের কিছুদিন আগে কীভাবে এটা কাজ করবে তার একটি নমুনার প্রতি দৃষ্টিক্ষেপণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সে সময়ে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী এন্ডা কেনি বার্লিন সফরে ছিলেন


স্বাভাবিক অবস্থায় ইউরোপীয় নেতারা ব্রাসেলস শীর্ষ বৈঠকে নির্ধারিত সময়ে একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় ক্ষিপ্ত হতে পারলেই খুশি থাকতেন। সামিট-পূর্ব প্রস্তুতিপর্বে কর্মকর্তারাই ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু সম্প্রতি ইউরোকে বাঁচাতে যে সামিটটি হয়ে গেল সেটিকে ঘিরে কোনো কিছুই সামান্যতম স্বাভাবিক ছিল না। এটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থা ছিল মহাবিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। সঙ্গে সঙ্গে ইউরো জোন (ঊঁৎড় তড়হব)ও সম্ভাব্য ভাঙনের মুখে উপনীত। তাই ইউরোপের নেতৃত্ব যদি কোনো ভুল করে শুধু ইউরো জোনই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে না।
সেক্ষেত্রে ব্রিটেনসহ সমগ্র ইউরোপ ও তার ব্যাংকের কারবার সংকটে নিপতিত হবে। ফলে সূচনা হবে রাষ্ট্রের আর্থিক বিপর্যয়। যে কারণে ডিসেম্বরের শুরুতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সামিটের নির্ধারিত দিনে শত্রুরূপে মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে ফ্রাঞ্চের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির সঙ্গে অনতিবিলম্বে সাক্ষাৎ করতে উদগ্রীব। এক সপ্তাহ আগে নেতৃবর্গ যখন মিলিত হয়েছিলেন, কর্মকর্তারা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করেছিলেন যে, তিনি কোনো কিছুই দৈবের ওপর ছাড়তে পারেন না। তাছাড়াও ক্যামেরন বারাক ওবামার তরফ থেকে অদৃশ্য কিন্তু একটি অভিভূতকারী চাপের মুখে আছেন। ওবামা ভয় করছেন যে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিপর্যয়তার পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করবে। তার ট্রেজারি সেক্রেটারি টিমথি গেইথনারের পরামর্শ অনুযায়ী অব্যাহত মন্দা থেকে বাঁচাতে ফ্রাঞ্চ ও জার্মানির যে উদ্ধার কৌশল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় ব্রিটেনের সাহায্য প্রয়োজন। শুধু এতে করেই ইউরোপের বর্তমান পতন ঠেকানো সম্ভব। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর স্যার সেরভিন কিং মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছাকে আরও মজবুত করে তিনি বলতে চেয়েছেন যে, ইউরো বিপর্যস্ত হলে ব্রিটেনে এবং বিশ্বের অনেক অঞ্চল মন্দাক্রান্ত হবে এবং এই মন্দা হবে ১৯৩০ সালের মন্দার চেয়েও ভয়াবহ। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর সবসময় সতর্ক উক্তি করেন। সে জন্যই তার সতর্কীকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি আরও অদ্ভুত এই জন্য যে, ত্রিশের দশকের মন্দা চলাকালে মূলধারার রাজনীতিকরা ঘটনাপ্রবাহের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। জার্মানিতে নাৎসিরা ক্ষমতা দখল করেছিল এবং সমগ্র ইউরোপের দক্ষিণপন্থিরা প্রভাব বিস্তার করেছিল। স্মর্তব্য যে, ঐ দশক অতিক্রান্ত না হতেই সারাবিশ্বে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠেছিল।
সুতরাং ক্যামেরন ও সারকোজির সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ গুরুত্ব এবং প্রভাব বিস্তারের পরিপূর্ণ না হয়ে পারেনি। তাদের আলোচিত অনেক ইস্যুই যেমন আর্থিক নিয়ামন, অস্পষ্ট চুক্তি পরিবর্তন, বেইল-আউটের মেকানিজম সংকটের ব্যাপকতার বিবেচনায় হাস্যকরভাবে তুচ্ছ মনে হতে পারে; কিন্তু তাদের আলোচনার মৌলিকতা নির্ধারণে একটি বিশাল প্রশ্ন ওপরে উঠে এসেছিল, ব্রিটেন কি ফ্রাঞ্চ ও জার্মানির সদয় মনোভাব পোষণ করবে যখন কর্মকর্তাদের ভাষায় দেশটি ইউরোপের অপর দুটি শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে একটি জীবন-মরণ দরকষাকষিতে লিপ্ত হবে শুধু 'ইউরো' বাঁচানোর লক্ষ্যে।
এই তথাকথিত দরকষাকষির বিশদ বর্ণনা ক্রমশ গোচরীভূত হচ্ছে বিগত কিছুদিন যাবৎ। গ্রান্ড বার্গেনের যেটুকু প্রকাশ পেয়েছে তার মর্মানুযায়ী ফরাসিরা জার্মানদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছে। এটা তাদের অমনোযোগিতাজনিত ভুলের খেসারত। ইউরো জোন দেশগুলোর জাতীয় বাজেটের ওপর কঠোর অর্থদণ্ডের মাধ্যমে এটি বলবৎ করা হয়েছে। ইউরোপিয়ান ভোটারদের কিছুদিন আগে কীভাবে এটা কাজ করবে তার একটি নমুনার প্রতি দৃষ্টিক্ষেপণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সে সময়ে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী এন্ডা কেনি বার্লিন সফরে ছিলেন। সেখানে প্রথম আবিষ্কৃত হলো যে, বুন্ডেসটাগের (জার্মান পার্লামেন্ট) সদস্যরা ইতিমধ্যে আইরিশ ন্যাশনাল বাজেটের খুঁটিনাটি ঘেঁটে দেখছিলেন। যদিও তা পরবর্তী মাসের আগে ঘোষিত হবে না এবং তা অবশ্যই তখনও পর্যন্ত আইরিশ আইনসভার সদস্যদের দেখানো হয়নি। কেনির জন্য এর চেয়ে অধিক অপ্রস্তুত হওয়ার আর কী হতে পারে। তার এই অজ্ঞতা কাণ্ডজ্ঞানহীনতা বা নির্বোধের দৃষ্টান্তরূপেই পরিগণিত হতে পারে।
কেননা যা সত্য তা নির্দয়ভাবে স্পষ্ট। জার্মানরাও এমনই বেখেয়ালি ভুল যা নৃশংস, যা খোলামেলা অগ্রসর মানসম্মত ভুলকে তাদের দিকের গ্রান্ড বার্গেনে দেখতে চায়। কেননা জার্মানির অর্থনৈতিক শক্তিই ইউরো বাঁচানোর যুদ্ধের পেছনে থাকতে হবে। যদিও অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এ পর্যন্ত তাতে স্থির সংকল্পভাবে অমত করে এসেছেন। তিনি জার্মানির শক্তিশালী ক্রেডিট রেটিংকে একটি বৃহদায়তন বেইল আউটের_ তাও আবার কিছু অমিতব্যয়ী দেশের জন্য অনুমতি চান না। তার এই অনিচ্ছা মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। কেননা দেশের কষ্টার্জিত অর্থনীতিকে স্পেন বা গ্রিসের মতো আর্থিকভাবে লম্পট দেশের উদ্ধারে ব্যয় জার্মান জনগণ পছন্দ করবে না। এছাড়া এমন পদক্ষেপ জার্মানির শাসনতান্ত্রিক আদালতে বেআইনি বিবেচিত হবে। কিন্তু এক উদ্ধার প্রচেষ্ট ছাড়া ইউরো জোন খুব সম্ভবত ভেঙে পড়বে। এ কারণেই একটি মহা দরকষাকষির প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম. আবদুল হাফিজ : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস

No comments

Powered by Blogger.