Thursday, March 26, 2015

জীবন যেভাবে বদলে যায় by হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

[নিজের ও পরিজনের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা অপরাধীদের ধরতে সাহায্য করলেন, আইনের চোখে তারাই হয়ে গেলেন আসামি! তবে আইন চোখ বন্ধ করে রাখলেও মিডিয়া রাখেনি। তিন সাংবাদিকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো সত্য। মুক্তি পেলেন তিন বিমানকর্মী। কিন্তু তত দিনে যা ঘটে গেছে, তা রূপকথাকেও হার মানায়। তাদের জীবনটাই তখন বদলে গেছে। বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে লিখেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী]
অপরাধ দমনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যত ব্যবস্থা থাকে, তেমনটি আর কোথাও খুব বেশি দেখা যায় না। এখানে থাকে অনেক ভিডিও ক্যামেরা, নিরাপত্তাকর্মী এবং স্ক্যানার। এ ছাড়া প্রত্যেক যাত্রীর নাম তালিকাভুক্ত থাকে। প্রত্যেক পাইলটকে স্ক্যান করে তবেই বিমানবন্দরে ঢুকতে দেয়া হয়। এমনকি নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও নিরাপত্তা তল্লাশির পরই ঢুকতে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে এমন কড়াকড়ি, কেউ যে ট্যাঁ ফো করবে, তার উপায় নেই।
এরকম অবস্থা সারা বিশ্বের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরই। ভেনিজুয়েলার তৃতীয় বৃহত্তম শহর ভ্যালেনসিয়ার আর্তুরো সিচেলেনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানেও বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডের কম্যান্ডো-২৪ এর প্রহরীরা সর্বক্ষণ টহল দিয়ে চলেছে। যখন যাকে খুশি থামাচ্ছে, তল্লাশি করছে, তল্লাশির নামে বেফজুল হয়রানিও করছে। এ নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগের অন্ত নেই।
নিরাপত্তার নামে এসব কড়াকড়ি-বাড়াবাড়ি নিয়ে যার যত অভিযোগই থাকুক, একে তাচ্ছিল্য করতে পারেন একজনই; তিনি কার্ল লুকার্ট। কারণ সব কড়াকড়ির মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটেছিল, যা তার জীবনকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। কিভাবে? জানতে হলে আসুন একটু পেছনে ফিরে যাই।
২০১২ সালের আগস্ট মাসের কোনো এক দিনে একটি প্রাইভেট জেট বিমান চালিয়ে আর্তুরো মিচেলেনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেছিলেন লুকার্ট। এ ধরনের বিমান ভাড়া করেন সাধারণত কোনো কোম্পানির সিইও, তারকা কিংবা ধনপতিরা। পাইলট লুকার্ট ভেবেছিলেন, আর্তুরো বিমানবন্দরে তার যাত্রাবিরতিটা হবে সংক্ষিপ্ত। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, তা কি আর হয়? ‘স্বাভাবিকভাবে’ এ ক্ষেত্রেও হলো একেবারে বিপরীত। এবং বৈপরীত্যটা এমন যে, লুকার্টের সামনে তখন দু’টি বিকল্প রইল এক. মৃত্যু, দুই. মাদক বহনকারী হওয়া।
এটা ঘটল এভাবে আগস্টের সেই রাতে পাইলট লুকার্ট হঠাৎ দেখলেন তার বিমানের দিকে মেশিনগানের ব্যারেল তাক করে এগিয়ে আসছে ন্যাশনাল গার্ডের একদল সৈন্য। তিনি চেঁচিয়ে জানালেন, ‘নো! নো ব্যাগেজ!’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! লুকার্ট দেখলেন, ওরা একে একে ৪৭টি প্লাস্টিক ব্যাগ তার জেট বিমানে ঠেসে দিলো। এসব ব্যাগভর্তি মাদক।
সুন্দরী ও গোপন কথা
কার্ল লুকার্ট যে বাণিজ্যিক বিমানটি চালান, তুষারধবল সেই বিমানটি ১৯ জন আরোহী বহন করতে পারে, আর কোথাও না থেমে একনাগাড়ে উড়তে পারে সাত হাজার মাইল। পাইলট লুকার্ট মজা করে বলেন, ‘আরে আমি তো ট্যাক্সিক্যাব চালাই। ট্যাক্সিক্যাব রাস্তায় চলে, আর আমারটা আকাশেএই যা তফাৎ।’
কথাটা পুরোপুরি অসত্য যে, তাও নয়। আগেই বলেছি, সিইও, তারকা বা ধনাঢ্য মানুষেরাই নিজেদের প্রয়োজনে এ ধরনের বিমান ভাড়া করেন। সেদিনও একটি চার্টার কোম্পানির কাছ থেকে বিমানটি ভাড়া নিয়েছিল বৈরুতের প্রিন্সেস অ্যাভিয়েশন। কথা ছিল মরক্কো থেকে ছেড়ে বিমানটি ত্রিনিদাদ-টোব্যাগো হয়ে ভেনেজুয়েলা যাবে। সেখানে যাত্রাবিরতি শেষে আফ্রিকার বেনিনে।
সেদিন বিমানটিতে যাত্রী ছিলেন একজন রাইমা তাউক। ৩৭ বছর বয়সী এই নারী খুবই আকর্ষণীয়া, খোলামেলা, বন্ধুভাবাপন্ন ও চমৎকার পোশাক পরিহিতা। বিমানে ওঠার আগে পাইলট লুকার্টের সাথে তার নিয়মমাফিক কিছু কথাবার্তা হয়। লুকার্ট জানলেন, মহিলা একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। এ কাজে অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। বৈরুত, দুবাই ও সিডনিতে তার অফিস আছে।
বিমানে উঠেও পাইলটের সাথে অনেক কথা বললেন রাইমা। বৈরুতের জীবন, ভেনেজুয়েলায় তার বন্ধুর অপেক্ষা ইত্যাদি। বিমানের তরুণ স্টুয়ার্ডসদেরও অনেক সময় দিলেন তিনি।
নিরাপদ অবতরণ
প্রথম গোলটি বাধল বিমানটি টোবাগোর একটি দ্বীপে ল্যান্ড করার পর। রাইমা চান তিনি ওই রাতটা হিলটন হোটেলে কাটাবেন। কিন্তু হিলটন হোটেল তো পাশের ত্রিনিদাদে। ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগোর মাঝখানে যে সাগরের বিপুল জলরাশি! বিষয়টা জানা ছিল না রাইমার। তা ছাড়া ওই দেশে ঢোকার এন্ট্রি ভিসাও ছিল না তার। কিন্তু এসব তো আইনের অসুবিধা, পকেটে মালকড়ি থাকলে দুনিয়ার সব অসুবিধারই ‘সুবিধা’ হয়ে যেতে সময় লাগে না। কাজে কাজেই পাইলট লুকার্ট কোরাল রিফ হোটেলে রাইমার থাকার ব্যবস্থা করে ফেললেন। হোটেল থেকে রোলস রয়েস গাড়ি এসে তাকে নিয়ে গেল।
পরদিন সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটের সময় ভেনিজুয়েলার উদ্দেশে উড়াল দিলো লুকার্টের বিমান। ওখান থেকে ৯০ মিনিট লাগবে ভেনিজুয়েলা যেতে। বিমান চলাকালে ককপিটে এলেন রাইমা। স্যাটেলাইট ফোনে কার সাথে যেন কথা বললেন। তবে কী বললেন কিছুই বুঝলেন না পাইলট। কারণ কথা হলো আরবিতে। তবে রাইমাকে বেশ খুশি খুশি মনে হলো।
ভেনিজুয়েলা এসে বিমান নিরাপদে অবতরণ করল। রাইমা নেমে হোটেলের উদ্দেশে চলে গেলেন। জ্বালানি তেল ভরতে হবে বলে বিমানে রয়ে গেলেন লুকার্ট। বিমানে তেল ভরা হচ্ছে, এ সময় তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, ইউনিফর্ম পরা বেশ কিছু লোক বিমানটি ঘিরে রেখেছে। তেল ভরা শেষ হলে বিমানটিকে ওই রাতের জন্য পার্কিং স্পটে নিয়ে গেলেন লুকার্ট। সেখানকার কর্মীরা তাকে বললেন বিমানটিকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে রাখতে। লুকার্ট অবাক, ব্যাপারটা কী! এরকম অনুরোধ তো করার কথা নয় (অনেক পরে অবশ্য তিনি এর কারণ ধরতে সমর্থ হন। এর অর্থ হলো, বিমানের কার্গো দরজাটিকে বিমানবন্দরের বাতি ও নজরদারি ক্যামেরার আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়া)!
এর একটু পরই বিমানবন্দরের এক কর্মী এসে লুকার্টের হাতে একটি মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিলো। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে একজনের গলা, যার সারমর্ম হলো, বিমানের দরজা খোলা রেখে লুকার্ট ও তার কর্মীদের ওই রাতে এক হোটেলে চলে যেতে হবে। হোটেলে পৌঁছে দেয়ার জন্য গাড়ি বাইরে অপেক্ষা করছে।
লুকার্ট রাজি হন না। এটা কি সম্ভব? তা ছাড়া বিমানের ক্রুরাও হোটেলে যেতে নারাজ। কেননা বিমান ছাড়ার শিডিউল খুব ভোরে। হোটেলে গেলে সেখান থেকে আসতেই সময় পেরিয়ে যাবে। বিমানে থাকলে সেই সময়টা তো ঘুমানো যাবে। তার চেয়েও বড় কথা, বিমানে তালা না লাগিয়ে রেখে যাওয়া সিকিউরিটি প্রটোকলের লঙ্ঘন। এমন বেআইনি কাজ লুকার্ট করতেই পারেন না। টেলিফোনকারীকে এসব যুক্তি দেখিয়ে লাইন কেটে দেয়ার একটু পর এলো রাইমার ফোন। তারও একই কথা, ‘রাতটা হোটেলে কাটাও। ভালো হবে।’ মহাবিরক্ত হলেন লুকার্ট।
‘আমরা একেবারে অসহায়’
এরপর সবাই বিছানায় চলে গেলেন, কিন্তু নানা চিন্তা ও দুশ্চিন্তায় ঘুম আর আসে না। এলেও একটু পর ভেঙে যায়। রাত ২টার দিকে দরজায় ঠক ঠক শব্দ শোনা গেল; বেশ ক’বার। উঁকি দিতেই দেখা গেল মোবাইল ফোন হাতে দাঁড়িয়ে এক লোক। কাকে যেন বলছে, ‘সব কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বিমানে তুলতে হবে।’
লুকার্ট কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিনেমার দৃশ্যের মতো ঘটনাগুলো ঘটে যেতে লাগল। ঘোর কালো রঙের দুটো গাড়ি চলে এলো। সেখান থেকে নেমে একদল অস্ত্রধারী খুলে ফেলল বিমানের কার্গো দরজা। ‘এসব কী হচ্ছে, বন্ধ করো এসব!’ চেঁচালেন লুকার্ট। জবাবে তার দিকে উদ্যত হলো অস্ত্র। এরপর প্লাস্টিকের সাদা প্যাকেটে ভরে যেতে লাগল বিমান। প্রত্যেক প্যাকেটের গায়ে লেখা ‘রেড ক্রস’। সাদা প্যাকেটগুলো দেখে লুকার্টের মনে হলো যেন ‘তুষারধস হয়েছে। কিন্তু আমরা ছিলাম একেবারেই অসহায়’।
পুরো ‘কাজ’টি সারতে লাগল ২০ মিনিটের মতো। মোট ৪৭টি প্যাকেট উঠল বিমানে। কার্গো বে, যাত্রীদের আসন এবং মাঝখানের চলার পথ সবখানেই ছড়িয়ে আছে এসব প্যাকেট। পুরো সময়টায় সাত-আটজন অস্ত্রধারী দাঁড়িয়েছিল বিমানের সামনে। চোখের সামনে এসব দেখতে দেখতে লুকার্ট ও তার সহকর্মীরা বুঝে গেলেন, তাদের ডাকে কেউ আসবে না। পুরো বিমানবন্দরই এতে জড়িত। আর পুলিশকে খবর দেয়ারও উপায় ছিল না।
‘কাজ’ সেরে অন্ধকারের প্রাণীরা ফের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লুকার্ট ফোন করলেন সুইজারল্যান্ডে; বিমানটি চার্টার করেছে যে কোম্পানি তার সিইও এরিক ওয়েইজকফকে। সব জানিয়ে তাকে বললেন, ‘আমাদের আসলে কিছুই করার ছিল না।’ লুকার্ট যখন কথা বলছিলেন, তখন দরজায় আবার টোকা। লুকার্ট তার কো-পাইলটকে পাঠালেন কী ব্যাপার দেখতে। কো-পাইলট ফিরে এলে দেখা গেল, আতঙ্কে তার মুখ রক্তশূন্য। তিনি জানালেন ‘লোকটি বলে গেছে, আমরা যদি এখনই বিমানটি ওড়াই, তাহলে আমাদের ওরা খুন করবে।’ রিয়ার উইন্ডো দিয়ে লুকার্ট দেখলেন, হাল্কা মেশিনগান নিয়ে বিমানের পাখার নিচে দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্রধারীরা।
লুকার্ট ভাবতে বসলেন কী করা যায়। এই বিমানবন্দরটি রাতে বন্ধ থাকে। মধ্যরাতের পর থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এখানে কোনো বিমান ওঠানামা করে না। লুকার্ট চেষ্টা করলেন টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু কেউ ফোন ধরে না। লুকার্ট এবার ভাবলেন, এত বস্তা যে ভরা হয়েছে, বিমান কি এর ভার বইতে পারবে? তিনি ছোট একটা পরীক্ষা করলেন। দেখা গেল, ঠিক আছে। ওরা ঠিকই জানে, এই বিমান কতটা ভার বহনে সক্ষম।
শত্রু যখন অন্দরে
পরদিন সকালে বিমানটি আকাশে ডানা মেলল। মিনিট দশেক উড়তে-না-উড়তেই স্যাট-ফোনে কল এলো। এক ব্যক্তি ইংরেজিতে বলল, ‘যেখানে যেতে বলা হয়েছে বিমান যেন ঠিক ঠিক সেখানে যায়। তাহলেই তোমরা জীবন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে। কথাটা মনে থাকে যেন।’ দেখা গেল, ওরা শুধু পাইলট ও ক্রুদের স্যাট ফোন নাম্বার জানে তা নয়, তাদের দেশ কোনটি, তাদের ঠিকানা এবং আরো অনেক কিছু জানে।
এ দিকে সুইজারল্যান্ডে বিমানটির চার্টার কোম্পানির সদর দফতরে ততক্ষণে তুলকালাম শুরু হয়ে গেছে। নানা মুনি নানা মত দিচ্ছে। এর কারণও অবশ্য আছে। ২০০৪ সালে কারাকাসে এয়ার লুক্সরের একটি ফ্লাইট থেকে বিপুল মাদক উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় বিমানটি বাজেয়াপ্ত করা হয়, পাইলট ও কো-পাইলট দু’জনকেই দীর্ঘ কারাবাস করতে হয়। ঘটনাটি মনে করে আঁৎকে ওঠেন কোম্পানির সিইও এরিক। বিমানটি বাজেয়াপ্ত হলে কী হবে, ওটি তো তার কোম্পানির নয়, এক জার্মান ব্যবসায়ীর।
তবে বিমানের পাইলট লুকার্টের প্রতি কোম্পানির ‘৯৯ ভাগ’ আস্থা রয়েছে। বাকি এক ভাগ হলো সন্দেহ যে, আসলেই তো লুকার্ট এই অপকর্মে জড়িত থাকতেও পারে!
শনিবার পেরিয়ে রোববার এলো। কিন্তু এরিক এমন কাউকে পেলেন না যে, এই বিপদে তাকে একটুখানি সাহায্য করতে পারে। গুগল ঘেঁটে তিনি এবার ইন্টারপোলের নাম্বার জোগাড় করলেন। কথাও হলো এক অফিসারের সাথে। মাদক পাচারের তথ্য জানানোর জন্য অফিসার তাকে ধন্যবাদও দিলেন। ব্যস, ওই পর্যন্তই। তারপর তার আর কোনো খোঁজ নেই।
অন্য দিকে লুকার্টের বিমানের স্যাট-ফোনটি ক্রমাগত বেজেই চলেছে। ধরতেই এক ব্যক্তি জানতে চাইল, বিমানটি এখন ঠিক কোথায় আছে। প্রশ্ন শুনে ক্রুরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তাদের ধারণা ছিল, গ্রাউন্ড থেকেই বুঝি তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। সর্বশেষ ফোনকলে নিশ্চিত হওয়া গেল, তা নয়।
তবে ক্রুরা তখনো নিশ্চিত ছিল না, আসলে প্লাস্টিকের ভেতরে কী রয়েছে। তারা খুলে দেখতেও ভয় পাচ্ছিল, যদি ওতে বোমা থাকে! আর যদি বিস্ফোরক থাকে এবং জিপিএস ট্র্যাকারের সাহায্যে ওরা দেখতে পায় যে, আমরা ওদের দেখানো পথে চলছি না, তাহলে বিমানটি যদি উড়িয়ে দেয়!
এর মধ্যে লুকার্টের ফোনে রাইমার কল এলো। সে খুব দুঃখ প্রকাশ করল। বারবার ‘সরি!’ বলে জানাল যে, যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কাজ কিন্তু সেভাবে এগোচ্ছে না। এ দিকে লুকার্ট তো রেগে আগুন। সে ফোনে যা-তা বলল রাইমাকে। বলল, তুমি আমাদের সবাইকে মারতে বসেছ। রাইমা সব শুনেও শান্ত গলায় বলল, তোমাদের যেভাবে বলা হয়েছে, তা-ই করো। বেনিন যাও। সেখানে আমি তোমাদের জন্য জ্বালানির ব্যবস্থা করব। মাল খালাস করেই তোমরা নিরাপদে ইউরোপের দিকে চলে যেতে পারবে।
ওরা রাইমার সব কথা শুনল, তবে এক বর্ণও বিশ্বাস করল না। বরং লুকার্ট ও তার কো-পাইলট ঠিক করল, বিমানটিকে তারা কিছুতেই আফ্রিকা (বেনিন) নিয়ে যাবে না। তবে হ্যাঁ, তার আগে নিজ নিজ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। দু’জনই পরিবারে ফোন করে নিরাপদ কোনো জায়গায় সরে যেতে বলল।
বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট
এ দিকে চার্টার কোম্পানির সুইজারল্যান্ড সদর দফতরে ফোন এলো ইন্টারপোলের। তাদের তদন্তকারীরা ভেনিজুয়েলায় খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে, একটি বিমান চুরি হয়েছে। ইন্টারপোল আরো বলল, বিমানটি বেনিনে ল্যান্ড করলে অসুবিধা হবে। বিমান বা ক্রু কাউকেই ওই দেশের বাইরে আনা সম্ভব হবে না। তবে ক্রুদের পরিবারের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ পাঠাল ইন্টারপোল।
কোম্পানির সদর দফতরে তখন আরো কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞরা বসে গেছেন হিসাব কষতে যে, ট্যাঙ্কে যে পরিমাণ তেল আছে তা দিয়ে কদ্দুর যাওয়া যাবে। ইউরোপের সব গন্তব্যের মধ্যে নিকটতম হচ্ছে গ্র্যান ক্যানারিয়া দ্বীপ। সেখানে বিমানটিকে অবতরণ করানোর বিষয়ে ইন্টারপোলও একমত হলো। বলল, ক্রুদের নিরাপত্তায় সব রকম ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ দিকে বিমানের ট্রান্সমিটিং লোকেশান ইনফরমেশন বন্ধ করে দিলেন লুকার্ট। এর ফলে বিমানটি তখন কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেল। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠে বসে কোনোভাবেই জানা সম্ভব হবে না যে, বিমানটি কোথায়। এরপর পাইলট বিমানটি নিয়ে গেলেন ৪৬ হাজার ফুট উঁচুতে (সাধারণত, যাত্রীবাহী জেট বিমানগুলোই এরকম উচ্চতায় চলাচল করে)। এ অবস্থায় মাদক ব্যবসায়ীরা যখন ফোন করে বিমানের অবস্থান জানতে চাইল, বিমান থেকে জানানো হলো যে, বিমান আফ্রিকার দিকে এগিয়ে চলছে।
এবার ফোনে বলা হলো বারকিনা ফাসো যেতে। আফ্রিকার এই দেশটির বেশ কয়েকটা বিমানবন্দরের নাম বলে জানানো হলো যে, এর যেকোনো একটিতে লুকার্ট যেন তার বিমানটি নামান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যেসব বিমানবন্দরের নাম বলা হয়েছে, তার বেশির ভাগের মালিকই সেনাবাহিনী। কিন্তু লুকার্টের গ্লোবাল এক্সপ্রেস বিমানটি তো সবখানে নামতে পারে না। এর পাখার দৈর্ঘ্য ৩০ মিটার এবং এটি নিরাপদ অবতরণের জন্য আট শ’ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে লাগবে। আর রানওয়ের ভার বহন ক্ষমতা হতে হবে ৪৫ টন।
এ অবস্থায় লুকার্ট আবার তার বস এরিককে ফোন করলেন। বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কথা বললেন তারা। যেমন, মাদকের প্যাকেটগুলো আটলান্টিকে ফেলে দিলে কেমন হয়? লুকার্ট বললেন,্ এ কাজটি করতে গেলে বিমানটিকে সাগরের যথাসম্ভব কাছাকাছি নামিয়ে ওড়াতে হবে। এতে জ্বালানি খরচ হবে বেশি। তাহলে গ্র্যান ক্যানারিয়া পৌঁছার মতো জ্বালানির ঘাটতি পড়ে যাবে। তা ছাড়া দুই পাইলটের একজনকে কার্গো দরজাটি খুলতে হবে। দরজাটি যেহেতু ইঞ্জিনের খুব কাছে, তাই দরজা খোলার সাথে সাথে প্রবল বায়ুচাপ সৃষ্টি হবে। এটা একটা বড় ঝুঁকি। এতে একজনের প্রাণহানিও ঘটতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা, বিমান লাস পামাসে অবতরণের পর কী হবে? পুলিশ যদি বিমানে একটাও মাদকের ব্যাগ না পায়, তাহলে তো তারা আমাদেরই ধরবে যে, তোমরা ওগুলো অন্য কোথাও রেখে এসেছ।
এসব বলতে বলতে কাছে চলে এলো গ্র্যান কানারিয়া বিমানবন্দর। কো-পাইলট এবার স্যাটেলাইট ফোনটি বন্ধ করে দিলেন। আফ্রিকায় পৌঁছার নির্ধারিত সময়সীমার ৪৫ মিনিট আগে বিমানটি লা পামাসের মাটি স্পর্শ করল। স্পেন সরকারকে আগেই সব জানিয়ে রেখেছিল ইন্টারপোল। পুলিশের একটি বিরাট দল অপেক্ষা করছিল। একদল মুখোশধারী পুলিশ কর্মকর্তা বিপুল বিক্রমে বিমানে ঢুকে পড়ল। বিমানের ভেতরে যেন ঝড় বয়ে গেল। এরপর তারা বিমানের পাইলট, কো-পাইলট ও স্টুয়ার্ডসকে ধরে বাইরে নিয়ে এলো। প্রথমে তাদের বিমানবন্দরের সেলে নেয়া হলো। পরে সেখান থেকে পাঠিয়ে দেয়া হলো পামাসের পুলিশ সদর দফতরে।
রাবার প্যাডে শয্যা
একটা সময় এসে তারা বুঝতে পারলেন যে, স্পেনিশ পুলিশ তাদেরকেই মাদক পাচারকারী ভাবছে। এরপর তাদেরকে ভূগর্ভের নির্জন প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হলো। প্রকোষ্ঠের আয়তন ২দ্ধ৪ মিটার। এর সামনের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত লোহার শিক। দিনের আলো দেখা যায় না। কোনো টয়লেট নেই। বেসমেন্টের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঘুমানোর জন্য তারা পেল একটি করে রাবারের প্যাড।
এ দিকে ‘বড় শিকার’ ধরার কৃতিত্বে স্পেনে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে লাগল। পত্রিকায় সেই বিমানটির ছবি ছাপা হলো, তার সামনে মাদকভর্তি প্যাকেটগুলো।
অন্য দিকে চার্টার কোম্পানির সিইও এরিক ভেবে পেলেন না কী হতে কী হয়ে গেল। ইন্টারপোল তার সাথে যেসব ওয়াদা করেছিল, একে একে সবই তারা ভেঙে ফেলল। যারা ঘটনার শিকার, তাদেরই বানানো হলো আসামি। তার ওপর তাদের পক্ষের আইনজীবী প্রথম দিকে কিছুই করতে পারছিলেন না। কেননা সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে যেসব দলিল তার দেখা প্রয়োজন, কিছুই তাকে দেয়া হলো না। বলা হলো, এসব ক্লাসিফায়েড; তাই দেয়া যাবে না। এভাবে চার সপ্তাহ কেটে গেল, কিছুই হলো না। এসব মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। আর যাকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে, তিনি কিছুই করলেন না।
এভাবে কেটে গেল আট সপ্তাহ। বিমানের ক্রুরা তখনো ভূগর্ভের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী, বিমানটিও আটক স্পেনে। কোম্পানি প্রতিদিন গচ্চা দিচ্ছে হাজার হাজার ডলার।
অবশেষে অক্টোবর মাসে লুকার্ট ও তার দুই সহকর্মীকে কারাধ্যক্ষের কাছে নেয়া হলো। লুকার্টের মা ও বাবা ৬০ হাজার ইউরো জামিনে তাদের মুক্ত করলেন। তারা মুক্তি পেলেন বটে, তবে স্পেন ছাড়ার অনুমতি পেলেন না। অবশ্য বিমানটি তার মালিককে ফিরিয়ে দেয়া হলো।
এ অবস্থায় এক দিন বৈরুতে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন এক নারী। তিনি নিজের পরিচয় দিলেন রাইমা তাউক বলে। জানালেন, ৩০ হাজার ইউরো দেয়া হবে এই অঙ্গীকারে তিনি ওই বিমানের যাত্রী হতে রাজি হয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, বিমানে কিছু নিষিদ্ধ জিনিস থাকবে, তবে সেটা যে কোকেন তা তিনি জানতেন না।
রাইমাকে কে ভাড়া করেছিল? করেছিল যে লোকটি, সে আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তাদের খুবই চেনা একজন। তার নাম আলি ক্লেইলাত। বিশ্বব্যাপী মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার একজন বড় চাঁই। তার আছে কমপক্ষে ছয়টি ডাকনাম। জন্মসালেও আছে ভিন্নতা কখনো ১৯৭০, কখনো বা ১৯৬৩। তার আছে লাইবেরিয়া, দ্য নেদারল্যান্ডস, ভেনিজুয়েলা ও লেবাননের পাসপোর্ট।
২০১১ সালে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে এক টনেরও বেশি মাদকের একটি চালান আটক হয়। এর সাথে জড়িত সন্দেহে ক্লেইলাতকে ধরতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযান শুরু হয়। একপর্যায়ে ধরা পড়ে সে। বর্তমানে বেলজিয়ামের একটি কারাগারে আটক রয়েছে। সেদেশের আদালত তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি দেবে বিচার মন্ত্রণালয়।
ক্লেইলাতের সাঙ্গপাঙ্গরাই আর্তুরো মিচেলেনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ঘটনাটিও ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে ১৮ জন, যাদের নয়জন বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য, দু’জন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অসামরিক সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য এবং একজন বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক। এ কাজে সহযোগিতার জন্য প্রত্যেকে পেয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থাত সর্বনিম্ন ১৯ হাজার থেকে এক লাখ ৮৮ হাজার ইউরো। ধারণা করা হয়, এফরেইন পেরেদা নামে এক দুর্বৃত্তই কলম্বিয়ান মাদকচক্র ও স্থানীয় অপরাধীদের মধ্যে যোগাযোগটি ঘটিয়ে দিয়েছে।
মামলা শেষ হয়েছে। লুকার্ট ও তার ক্রুরা স্বদেশ জার্মানিতে ফিরে গেছেন। পুলিশ লুকার্টকে একটি নতুন নাম দিয়েছে। তিনি এখন নতুন শহরে নতুন নাম-পরিচয়ে বসবাস করেন। কোনো অসুবিধা নেই, তবু মনের তিক্ততা কাটে না। লুকার্ট তিক্ত গলায় বলেন, ‘কিছুই আগের মতো নয়। ভালো লাগে না।’
নাম বদলে গেছে, তবে পেশা আগেরটাই আছে। এখনো লুকার্ট দুনিয়াজুড়ে প্রাইভেট ক্লায়েন্টদের বিমান চালান। তবে যাত্রীদের আগে যেমন বিশ্বাস করতেন, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি করেন অবিশ্বাস। আর বিমান নিয়ে কখনো ভেনিজুয়েলা বা লেবানন যান না।

সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান যা দিলেন by রজার কোহেন

অন্য এশীয়দের মতো ভিয়েতনামিরাও ঝাঁকে ঝাঁকে কেনাকাটা করতে আসে সিঙ্গাপুরে। অর্চার্ড রোডের শীতল সুবাসিত বিপণিবিতানগুলোয় তারা ভিড় করে। যারা কিছুটা অবস্থাপন্ন তারা ডাক্তার দেখাতে কিংবা বাচ্চা প্রসব করতেও এসে থাকে। সিঙ্গাপুর তাদের টানে আরও এক কারণে, সেটা হলো সমৃদ্ধি ও দক্ষতার আবহ। যেন জাদুবলে সুইজারল্যান্ডের শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা এ গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে দেখা দিয়েছে। আধুনিক এশিয়ার কর্কশ জীবন থেকে মুক্ত হয়ে সিঙ্গাপুরের কৈশোরিক শান্তির মধ্যে এসে তাদের মনে হয়, এখানে কোনো কিছুই ভুল হতে পারে না।
সিঙ্গাপুরকে পছন্দ না করেও এই স্বস্তি আপনাকে টানবে। একবার একে পছন্দ করা শুরু করলে আপনি দেখবেন, আপনার মধ্যে গোপনে এর প্রতি আকর্ষণের জন্ম হচ্ছে। ৯১ বছর বয়সী সদ্য প্রয়াত লি কুয়ান ইউয়ের অর্জন অসামান্য। তিনিই এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতা। বিশ শতকে তাঁর মতো রাষ্ট্রনায়ক খুব কম, তাঁর মতো বাস্তববাদীও আর কেউ ছিলেন না।
বিপর্যয়ের যথেষ্ট মালমশলা থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর টিকে আছে; এটাই তাঁর অর্জনের পরিমাপক। ২০০৭ সালে নিউইয়র্ক টাইমস-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে লি বলেছিলেন, ‘সিঙ্গাপুরের টিকে থাকার কথাও নয়, টিকতে পারেও না।’ তিনি বলেন, ‘জাতি হয়ে ওঠার আবশ্যকীয় উপাদান, যেমন: সমধর্মী জনসংখ্যা, একই ভাষা, একই সংস্কৃতি এবং একই নিয়তি সিঙ্গাপুরে নেই।’ বিপরীতে এটি জাতিগত ও ধর্মীয় গোলমালের জ্বলনক্ষেত্র। চীনা, মালয়ী ও ভারতীয়রা এই নগররাষ্ট্রে জড়ো হয়েছে এবং এর কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই।
এ রকম অবস্থাতেও সিঙ্গাপুর সফল হয়েছে, যেখানে এর থেকে বেশি জাতি-যোগ্যতার উপাদানে সমৃদ্ধ দেশ ব্যর্থ হয়েছে, আর্জেন্টিনা তাদের মধ্যে অন্যতম। যেখানে বলকান অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত গোষ্ঠীগত ভেদাভেদ দূর করা খুবই কঠিন বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং যার কারণে প্রায়ই এখানে যুদ্ধ ও জাতীয় বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে।
সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে বিপর্যয়ের উপাদানে ভরপুর থাকা মানেই বিপর্যয়ের অনিবার্যতা নয়। লি এটা এমন এক সময়ে করে দেখিয়েছেন, যে সময়ে বিশ্বজুড়েই চলছিল সার্বিক বিশৃঙ্খলা। তিনি প্রতিটি রাজনৈতিক মুহূর্তকে কাজে লাগিয়েছেন ও ফল বের করে এনেছেন, যখন রাষ্ট্রনায়কতা করাও ছিল খুবই কঠিন। সিঙ্গাপুরের এই ব্যতিক্রমী পথযাত্রার মূল উপাদান হলো নেতৃত্ব। আর নেতৃত্ব মানে সবকিছুর ওপরে নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, লক্ষ্যে অবিচলতা, সামগ্রিক স্বার্থে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং দূরদর্শিতা।
লির একমাত্র ধর্ম হলো বাস্তববাদিতা আর ধর্মগুলো একে শত্রু মনে করে। কেননা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা এমন অবতীর্ণ সত্য হাজির করে, যা বাস্তবতাবিরুদ্ধ। যে মতাদর্শ বাস্তবিক ঘটনাকে অস্বীকার করে, তা সমস্যাজনক (ধরেন কেউ বিশ্বাস করে যে ভূমির মালিক আপনি কারণ আপনার ধর্মগ্রন্থে তা দলিল করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ধরুন, সেখানে শত শত বছর ধরে অন্য মানুষেরা বসবাস করে আসছে। এখন আপনার এই বিশ্বাস নিজেই সহিংসতার সম্ভাবনা ধারণ করে)। কোনো কাজের বেলায় লির একমাত্র মানদণ্ড হলো: এটা কি কার্যকর? এটাই হলো এক সম্ভাবনামুখী মানুষের বৈশিষ্ট্য, যিনি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন কিন্তু তার মধ্যে আটকে থাকেন না। তিনি আক্রান্তের ভাব ধরে থাকা (এটা পঙ্কিল চিন্তা ও জাতীয়তাবাদী খেয়ালের অজুহাত) এবং দুর্নীতি অপছন্দ করতেন। তিনি সুযোগ, যোগ্যতা, অভিবাসীদের কর্মনৈতিকতা এবং শিক্ষাকে পুরস্কৃত করতেন।
পশ্চিমা গণতন্ত্র তাঁর জন্য নয়। যে জাতিকে সংগঠিত করে সমৃদ্ধির পথে দ্রুত ছোটাতে হবে তার জন্য এটা পিচ্ছিল পথ। তিনি কর্তৃত্ববাদী এবং প্রয়োজনমাফিক কঠোর। তাঁর সময়ে মতপ্রকাশের অধিকার ও রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করা হয়েছিল। একমাত্র অর্থনীতির বিভিন্ন ধরনের বেলাতেই তিনি উদার ছিলেন। লি এশীয় ও কনফুসীয় মনোভাবে এমনভাবে আচ্ছন্ন ছিলেন, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির মঙ্গলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এবং তিনি সিঙ্গাপুরের জনগণকে ভয়ের মধ্যে রাখতেন। কিন্তু মোটের ওপর এই পদ্ধতি কাজ করেছিল। সিঙ্গাপুর পরিণত হয় বিকাশমান বাণিজ্যিক ও ব্যাংকিং কেন্দ্রে। সমৃদ্ধি ভেদাভেদ মুছে দেয়, যদিও সারা দুনিয়ার মতো সিঙ্গাপুরেও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়া উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।
যদিও মুক্তি ও তা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বিশ্বজনীন, তবু সমগ্র মানবজাতির জন্য অভিন্ন কোনো মডেল নেই। প্রাযুক্তিক নিবিড় যোগাযোগ রাজনৈতিক মতৈক্য তৈরি করে না। বাস্তববাদিতা অবশ্য মন্দের সাপেক্ষে ভালোর গুণ বিচার করে, যদিও তা দাঁড়ায় নিকৃষ্টতমের বিরুদ্ধে এবং চর্চা করে ধৈর্যের।
সিঙ্গাপুরের উত্থান এখন এশীয় দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে। এশিয়া যদি সংঘাতের প্রশ্নে বাস্তববাদী হয়ে থাকে, বিশেষ করে চীন ও ভারতের মধ্যকার রেষারেষি বিষয়ে, তবে তারা লির কাছে ঋণী। চীনের মডেল—কর্তৃত্ববাদিতা, মুক্তবাজার, অর্থনৈতিকভাবে খোলামেলা কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বদ্ধ—সরাসরি লির সিঙ্গাপুর দেখে উদ্বুদ্ধ। লির বিশালতার একটা পরিমাপ বিষয়ে আমাকে বলেছিলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত সিঙ্গাপুরের সাবেক রাষ্ট্রদূত টমি কোহ। তাঁর কথায়, ‘তাঁর প্রস্থান সিঙ্গাপুরের ভবিষ্যতের ওপর মন্দ প্রভাব ফেলবে না।’
সমৃদ্ধিশালী এশীয়রা খোলামেলা রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিষয়ে কতটা সোচ্চার হতে পারেন? ভবিষ্যৎই তা বলে দেবে, তবে আমি রাতারাতি পরিবর্তনের পক্ষে বাজি ধরব না। যা কাঙ্ক্ষিত তা সর্বদা অপরিহার্য নাও হতে পারে, অন্তত এখন পর্যন্ত না। লি আরেকটি এশীয় অবদানের জনক: তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে মূল্য দিতেন। তিনি রাজনীতিবিজ্ঞানী জোসেফ নাইয়ের মতো বিশ্বাস করতেন না যে আমেরিকা পতনশীল। জোসেফ বলেছিলেন, চীন ১৩০ কোটি মেধাপুঞ্জ থেকে যা নেওয়ার নেয়। কিন্তু আমেরিকা বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষের থেকে এমনভাবে নেয় এবং তাদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মধ্যে আবার এমনভাবে মেশায়; যা থেকে নির্গত হয় সৃষ্টিশীলতা, চীনের হান জাতীয়তাবাদ যা সেভাবে পারে না।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
রজার কোহেন: নিউইয়র্ক টাইমস-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতিবিষয়ক কলাম লেখক।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

মহান স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে গত ২৫ মার্চ নগরীর চকবাজার ফুলতলাস্থ মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের স্বাধীনতা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান প্রিন্সিপাল ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহর সভাপতিত্বে উদ্বোধন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাকলিয়া থানা অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মহসিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের সহ-সভাপতি লায়ন সৈয়দ মোরশেদ হোসেন। এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানের চীফ কো-অর্ডিনেট শিহাব ইকবাল, উপাধ্যক্ষ রাজেশ কান্তি পাল। প্রতিযোগিতার মডারেট হিসেবে ছিলেন রাহমাতুল্লাহ আজাদ, মোহাম্মদ শাহ আলম, নিজাম কুতুবী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন স্বপ্না রাণী দত্ত, পঙ্কজ দাশ, মোহাম্মদ শওকত ওসমান প্রমুখ। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বক্তব্যে বলেন, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস আগামী প্রজন্মের পাশাপাশি এই মূল্যবোধের চেতনার চর্চা করতে হবে। এই মাসটা আমাদের পরিচয় অর্জনের মাস। এই মাসে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার তাড়াতে পেরেছিলাম। পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা আজ স্বাধীন জাতি হিসেবে পরিচিত। দুশ বছরের গোলামীর শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে আমরা আত্ম পরিচয়ে দীক্ষিত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে সামনে রেখে আমাদের জাতি হিসেবে আরো এগিয়ে যেতে হবে। এই ব্যাপারে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

আস্থার সংকটে পুলিশ by আলী ইমাম মজুমদার

জাতি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গত প্রায় তিন মাস লাগাতার হরতাল-অবরোধ ও সন্ত্রাস জনজীবনকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর মোকাবিলা করছে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। প্রধানত পুলিশ। তারা সংকট থেকে উত্তরণের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে। দীর্ঘ বিরতিহীন প্রচেষ্টায় বেশ কিছু সাফল্য দেখা যাচ্ছে। এ সাফল্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তাদের পরিশ্রম। তবে মূল ভূমিকায় জনগণ। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের মতামত যা-ই থাক, এটা বাস্তবায়নে জনগণ দীর্ঘমেয়াদি হরতাল আর অবরোধকে মেনে নেয়নি। তাদের সমর্থন নেই কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতি। তবে রাজনৈতিক ইস্যুতে ঐকমত্যের অনুপস্থিতিতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে কি না, এটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
চলমান পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা আলোচনার দাবি রাখে। ২০১৩ সালে সন্ত্রাসের সামনে তাদের বেশ কিছু ক্ষেত্রে এরূপ অসহায় ও অপ্রস্তুত মনে হয়েছিল। ফলে এই বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য হতাহত হন। পুড়িয়ে দেওয়া বা ভেঙে ফেলা হয় তাদের যানবাহনও। এ ধরনের দৃশ্য দেখে আমরা আহত ও শঙ্কিত হয়েছিলাম।
এবার মনে হয় তারা বেশ কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে দৃশ্যমান ব্যর্থতার দায়ভারও তাদের নিতে হবে। এমনকি কিছু প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত পদ্ধতিতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সমালোচনাও সংগত। আর তা হচ্ছেও। এরূপ অতীতেও হয়েছে। প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে পুলিশ, কোনো কাজে ব্যর্থতা কিংবা বাড়াবাড়ির জন্য। এবার একুশের বইমেলা থেকে বেরিয়ে আসার পথে লেখক–ব্লগার অভিজিৎ রায় নিহত হওয়ার ঘটনাটি নতুনভাবে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
এ ধরনের ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থায় এরূপ ঘটনা ঘটা অনেকটা অস্বাভাবিক, তাই সমালোচনা হচ্ছে। তবে সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে পারলে তারা প্রশংসিতও হবে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারও কারও মন্তব্যে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে দাবি করা হয়, এরূপ মন্তব্য বাহিনীর সদস্যদের মনোবলে আঘাত হেনেছে। ফলে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে তাদের উদ্যমকে বাধাগ্রস্ত করবে। এ দাবির সঙ্গে একমত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং আশা করা সংগত, এ ধরনের সমালোচনায় তারা আরও আগ্রাসী হয়ে নিেজদের সাফল্যের ছাপ রাখবে। মুছে ফেলবে ব্যর্থতার দায়ভার।
পুলিশ রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। এর গঠনকাঠামো ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কোথাও প্রাদেশিক বা রাজ্য সরকারের আর কোথাওবা স্থানীয় সরকারের আওতায় থাকে পুলিশ। আমাদের মতো এককেন্দ্রিক দেশে সরকারের আওতায়ই তা আছে। তবে কাজের ধরন মোটামুটি এক। তদন্তের জন্য কোনো কোনো দেশে পৃথক সংস্থা আছে বটে। দুর্জনের হাত থেকে দুর্বলের সুরক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি। এর দায়িত্বে থাকে পুলিশ। আর সেই কাজের পরিসর ব্যাপকতর। তেমনি আইন তাদের দায়িত্ব সম্পাদনে প্রভূত ক্ষমতা দিয়েছে।
আমাদের ফৌজদারি আইনে উল্লিখিত ধর্তব্য অপরাধ করার অভিযোগ কারও বিরুদ্ধে থাকলে বিনা পরোয়ানায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। এমনকি কতিপয় অপরাধ সংঘটনের সন্দেহভাজনদেরও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে তাদের। এ ধরনের ক্ষমতা থাকাও যৌক্তিক। পাশাপাশি এর অপব্যবহার হলে তারও সমালোচনা হবে। আইনি প্রতিকারও চাইতে পারেন কেউ। আর তা করলেই পুলিশের মনোবলে ভাটা পড়ার কোনো কারণ নেই। কেননা, নাগরিকের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার যার যত ক্ষমতা, তাকে ততটা নিয়ন্ত্রণে রাখা আবশ্যক। শাসনব্যবস্থার ভারসাম্যের জন্যও এর প্রয়োজন রয়েছে।
ইদানীং পুলিশের প্রসঙ্গ বেশি বেশি আলোচনায় আসছে। এর মধ্যে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ সংশোধন নিয়ে পুলিশের প্রস্তাব উল্লেখ করার মতো। প্রস্তাব করতে গিয়ে আইনটি প্রণয়নের পটভূমিকা সম্পর্কে তারা যে তথ্য উল্লেখ করেছে, তা যথার্থ নয়। তবে দায়িত্ব সম্পাদনে প্রতিকূল বিবেচিত হলে পুলিশ কিছু প্রস্তাব করতেই পারে। পুলিশের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ আর নাগরিকের সুরক্ষা উভয় দিক বিবেচনা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়া সংগত। হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনা কমছে না। অতিসম্প্রতি একজন সংবাদকর্মীকে ব্যাপক নির্যাতনের কাহিনিটিও বেদনাদায়ক। তা ছাড়া রাতের বেলায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনাগুলো আতঙ্কের নতুন কারণ সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি ঢাকা শহরে দুজন রাজনৈতিক নেতাকে এভাবে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। একজনকে র্যাব ২১ ঘণ্টা পর থানায় হস্তান্তর করে। অবশ্য তারা গ্রেপ্তারের স্থান ও সময় ভিন্নরূপ উল্লেখ করেছে। অন্যজনের প্রায় দুই সপ্তাহ কোনো খোঁজই নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে নেয়নি বলে হাইকোর্টকে জানানো হয়েছে। কারও কারও মতে, পেশাদার সন্ত্রাসী কোনো গোষ্ঠীও এরূপ কাণ্ড ঘটাতে পারে।
যেটাই হোক, এগুলো তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব পুলিশের। এ ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ও প্রচেষ্টা বেদনাদায়কভাবে কম। এভাবে গুম হওয়া কিছু ব্যক্তি চিরতরেই বিলীন হয়েছেন। তাই পুলিশের সমালোচনা হতে পারে। ক্ষুব্ধ হতে পারে মানুষ।
অনেক অপরাধ ঘটে ১৬ কোটি মানুষের দেশটিতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধী পার পেয়ে যায় কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায়। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে অক্ষমতা আর তদন্তে ত্রুটি এর মধ্যে প্রধান। তদন্তে ত্রুটির দায় পুলিশের। তবে সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসতে আমাদের সমাজে অনীহা বিরাজমান।
এর জন্য শুধু পুলিশকে দায়ী করা চলে না। আর তদন্তে ত্রুটি ও বিলম্বিত তদন্ত মামলার স্বাভাবিক গতিকে বিঘ্নিত করে। বিলম্ব ঘটনার গুরুত্ব হ্রাস, সাক্ষীদের অনাগ্রহ ও ক্ষেত্রবিশেষে স্মৃতিবিভ্রাটের কারণ ঘটায়। উৎসাহে ভাটা পড়ে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের। উল্লেখ্য, পুলিশের কাজের চাপের তুলনায় জনবলসহ অন্যান্য সুবিধা অপ্রতুল। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ বিষয়ে সরকার সমস্যা দূরীকরণে সচেষ্ট।
উল্লেখ করা যায়, কোনো সংস্থারই চাহিদা অনুসারে সুবিধাদি নেই। যত সীমাবদ্ধতাই থাকুক, সাগর-রুনি হত্যা মামলার আজ পর্যন্ত রহস্য উন্মোচন না হওয়া আর নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দুই বছরেও দাখিল না করার অক্ষমতাকে মেনে নেওয়া যায় না। তেমনি র্যাবের কতিপয় সদস্যের দ্বারা নারায়ণগঞ্জে সাতজন লোককে অপহরণ করে হত্যার ঘটনাটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থায় চিড় ধরিয়েছে। সেই খুনের ঘটনায় ইন্ধনদাতা নূর হোসেনের টেলিফোন আলাপ রেকর্ড করা হলো। অথচ তাঁকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ধরা সম্ভব হলো না। এতে ঘটনাটির যথাযথ দ্রুত বিচার সম্পর্কে কেউ সংশয় প্রকাশ করতেই পারেন। তবে এটা সহজবোধ্য যে পুলিশ শুধু কাজের চাপ নয়, নানাবিধ চাপে আছে। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এগুলোর দ্রুত সফল সুরাহা পুলিশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
পুলিশসহ দেশের গোটা প্রশাসনযন্ত্র জনগণকে সেবা দেওয়ার কথা। তবে শুধু পুলিশ নয়, মাত্রার হেরফের থাকলেও কোনো সংস্থাই সেবা যথার্থভাবে দিতে পারছে এমন দাবি করা যাবে না। তাই সেবাদানকারী সব সংস্থাই কমবেশি জনগণের আস্থার সংকটে ভুগছে। তবে কোনোটিকে ফেলে দেওয়া যাবে না। পুলিশের প্রতি আস্থার সংকটও নিরঙ্কুশ, এমনটি বললে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। তাই যদি হতো, ক্রমাগতভাবে নতুন নতুন থানা আর ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠার দাবি আসত না।
বিপন্ন মানুষ সহায়তার জন্য পুলিশের কাছেই ছোটেন। কিছু ক্ষেত্রে পানও সে সহযোগিতা। আবার হতাশও হন কেউ কেউ। এসব ক্ষেত্রে সমালোচনা থেকে প্রতিকারের সুযোগ নিতে পারে পুলিশ। একজন ফরিয়াদির অভিযোগ ন্যায়সংগতভাবে অনুসন্ধান, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের প্রতি আইনের বিধান অনুসারে মানবিক আচরণ ও যথার্থ তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে সুবিচারের রাস্তা পুলিশ উন্মুক্ত করতে পারে। ক্রমান্বয়ে এরূপ করতে থাকলে তাদের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থার মানও বাড়তে থাকবে। সে আস্থাই হবে পুলিশের মনোবল বৃদ্ধির মূল প্রেরণা।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

খালেদার মামলায় নজর রাখছে যুক্তরাজ্য

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলা মামলার দিকে নজর রাখছে যুক্তরাজ্য। বৃটিশ লর্ডসভার এক সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে বুধবার এ কথা জানান দেশটির কমনওয়েলথ ও পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জয়েস অ্যানিলে।
বৃটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ লর্ডসভার সদস্য এরিক অ্যাভবেরি সরকারের কাছে জানতে চান, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ব্যাপারে ১১ই মার্চ সংসদে প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার  দেয়া ঘোষণাকে বৃটিশ সরকার কিভাবে দেখছে? ১১ই মার্চ সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, আদালতের নির্দেশ থানায় গেলে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং তার কার্যালয়েও তল্লাশি করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমি মনে করি, তল্লাশি চালানো প্রয়োজন। কারণ তিনি এখন আর বিএনপির নেত্রী নেই, জঙ্গি নেত্রী’।
বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্যের ওই প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জয়েস অ্যানিলে জানান, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনা দুটি দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে যুক্তরাজ্য জানে। তিনি বলেন, আমরা ঘনিষ্ঠভাবে আইনি প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখছি। বৃটিশ এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা বাড়াতে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় (ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম) নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। তিনি জানান, যুক্তরাজ্য আশা করে, খালেদা জিয়ার বিষয়ে যে কোন পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া মানা হবে এবং খালেদা জিয়া তার নাগরিক অধিকার চর্চায় সক্ষম হবেন।

মালদ্বীপে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে ৪ বাংলাদেশী নিহত

মালদ্বীপে স্থানীয় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে ৪  বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। গত দুদিন ধরে হামলায় তারা নিহত হন। নিহতদের তাৎক্ষণিক পরিচয় জানা যায়নি।  এ ঘটনায় মালদ্বীপস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনও ওই দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর সতর্কতা জারি করেছে। মালদ্বীপে বসবাসরত উজ্জল নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশী মানবজমিনকে জানান, মালদ্বীপে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশী বসবাস করছে। গত দুদিন দিন ধরে হঠাৎ করে মালদ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে  ধারালো ছুরি নিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে তারা। এতে দুদিনে প্রায় ৪ বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত আরও ১০-১২ জন।  তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশীদের ওপর এরকম বর্বও হামলা হলেও স্থানীয় পুলিশ কিংবা মালদ্বীপ সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি বাংলাদেশ দূতাবাসও কোন ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ওই দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকরা। এদিকে মালদ্বীপস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন এক সতর্ক বার্তায় বলেছে, বাংলাদেশী নাগরিকদের অপরিচিত কারও সঙ্গে ঝগড়া কিংবা তর্ক না করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এছাড়া রাতে যার যার আবাসস্থলে অবস্থান এবং রাস্তায় কোন ধরনের আড্ডা না দেয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। কোন ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য নিন্মের নাম্বারে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। মোবাইল নং-৯৬০-৩৩৪৪৮২৫/৯৬০-৩৩২০৮৫৯, ৯৬০-৭৫৮৮৮২৬/৯৬০-৯৭৬৬৯২৬।

আমরা ধ্বংস চাই না, শান্তি চাই -প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা ধ্বংস চাই না, শান্তি চাই। আর পেছনে যেতে চাই না। যে অগ্রগতির সূচনা হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে চাই। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত স্ব-স্ব ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও অনন্য অবদানের জন্য ৭ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় খেতাব স্বাধীনতা পদক-২০১৫ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ বছর এই পদক পেয়েছেন বৃহত্তর সিলেটে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকার জন্য কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী (মরণোত্তর), ১৯৭১ সালে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার জন্য পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাতে নিহত মামুন মাহমুদ (মরণোত্তর), ১৯৭১ সালে ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মকালে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত সংগঠনকারী সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া (মরণোত্তর), সাহিত্যে অবদানের জন্য বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রফেসর আনিসুজ্জামান, শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশিষ্ট অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে বিশিষ্ট কৃষি বিষয়ক গবেষক ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ হোসেইন মণ্ডল এবং সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য প্রখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত (মরণোত্তর) এ পদক লাভ করেন। পদকপ্রাপ্তদের পক্ষে প্রফেসর আনিসুজ্জামান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা পদকপ্রাপ্তদের সংক্ষিপ্ত জীবনীসহ সম্মাননা পাঠ করেন। প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, কূটনীতিক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর অনেক দেশ দ্রুত ব্যাপক উন্নয়ন করেছে, কিন্তু বাংলাদেশ বারবার পিছিয়ে পড়েছে। দেশ যখন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে তখন বিএনপি-জামায়াত দেশের চলমান অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে ৫ই জানুয়ারি থেকে নাশকতা, ধ্বংস, জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে যাচ্ছে এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই চক্রের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির শিকার অগ্নিদগ্ধ মানুষদের পোড়া গন্ধে দেশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট দেশ ও জনগণের উন্নয়ন ব্যাহত করতে নাশকতা ও জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তাদের এ ধ্বংসযজ্ঞ প্রায় তিন মাস ধরে চলছে এবং আমরা ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি। তিনি বলেন, আমরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবো। কারণ আমরা জানি মানুষ এই জঙ্গি কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না। তারা আমাদের সঙ্গে রয়েছে। কিন্তু আমরা এটা চাই না যে, মানুষ এমন নৃশংসভাবে মারা যাবে এবং একটি পরিবার ধ্বংস হবে। বিএনপি-জামায়াতের ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বয়কটের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যে কোন নেতা বা দলের ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য অবশ্যই তাদের মাশুল দিতে হবে। কিন্তু এজন্য কেন দেশের জনগণ নৃশংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হবে। শেখ হাসিনা দুঃখ করে বলেন, অতীতে এমন সব ব্যক্তিকে স্বাধীনতার পদক দেয়া হয়েছে, যারা দেশের স্বাধীনতা চায়নি ও সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল। দেশের স্বার্থে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ব্যাপক অবদান ও আত্মোৎসর্গের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব রয়েছে। এজন্য আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগের জন্য নয় বরং দেশের জনগণের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত ও দেশকে মর্যাদাশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই হচ্ছে সরকারের লক্ষ্য।

এগারো বছর পার করলো র‌্যাব

নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ বৃহস্পতিবার র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয় (র‌্যাব) এগার বছর পার করছে। ২০০৪ সালের এই দিনে স্বাধীনতা দিবস প্যারেডে অংশ গ্রহনের মাধ্যমে র‌্যাব জনসাধারনের সামনে আত্মপ্রকাশ করে। অপারেশন দায়িত্ব পায় ২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে। রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের সম্মুখে আসে র‌্যাব। ওই বছরের ৩০ জুন রাজধানীর উত্তরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান ক্রসফায়ারে নিহতের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ অপারেশন কার্যক্রম শুরু করে।
তবে গত এগারো বছরে একদিকে যেমন র‌্যাবের সাফল্য দেশবিদেশে প্রশংসিত হয়েছে তেমনি র‌্যাবের বিরুদ্ধে মানবধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য অভিযোগও রয়েছে। এমনকি নানা অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে র‌্যাব সদস্যরা। সর্বশেষ গত বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবি চন্দন কুমার সরকারসহ সাত জনকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় ইমেজ সংকটে পড়ে র‌্যাব। ওই ঘটনায় র‌্যাবের তিন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার পর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
র‌্যাব সূত্র জানায়, কার্যক্রম শুরুর সময় ব্যাটালিয়ন ছিল সদর দফতরসহ ৭টি। লোকবল ছিল ৫ হাজার ৫২১ জন। প্রয়োজনের তাগিদে র‌্যাবের জনবল ও ব্যাটালিয়নের সংখ্যা বেড়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার ও সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের বাছাইকৃত চৌকস কর্মকর্তা ও অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে এখন ১৪টি ব্যাটালিয়নে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার র‌্যাব সদস্য কর্মরত রয়েছেন।
র‌্যাবের হিসাব অনুযায়ী গত এগারো বছরে সারাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭শ’ ৮২ জনকে তারা গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১শ’২৬ জন জামায়াতুল মুজাহিদীন (জেএমবি) ও হরকাতুল জিহাদসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। অভিযানে গত এক দশকে ৮ হাজার ৭শ’৬ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেফতার, ১১ হাজার ৭শ’১৪ টি অস্ত্র, ১লাখ ২৩ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ, সাড়ে ৭ হাজার ককটেল, বোমা, গ্রেনেড এবং ৫,২৮০ কেজি  বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে র‌্যাব।
তবে র‌্যাবের বিরুদ্ধে দেশ বিদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলির বড় অভিযোগ হলো বিচারবর্হিভূত হত্যাকণ্ড। র‌্যাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০০৪ সালে ৫৪ জন, ২০০৫ সালে ১০৬ জন, ২০০৬ সালে ১০৯ জন, ২০০৭ সালে ৮১ জন, ২০০৮ সালে ৬৩ জন, ২০০৯ সালে ৩৮ জন, ২০১০ সালে ৪২ জন, ২০১১ সালে ২৩ জন, ২০১২ সালে ৪৫ জন, ২০১৩ সালে ৩৫ জন, ২০১৪ সালে ২২ জন ক্রসফায়ার, লাইন অব ফায়ার এবং বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। নিহতদের বেশিরভাগই হলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী দলের সদস্য, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও সুন্দরবনের জলদস্যু। র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান একাদশ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জানান, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও আস্থার মূল্যায়ন করে র‌্যাব সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

স্টেথোস্কোপ, একে-৪৭ দুটোই থাকে পাক-ডাক্তারদের কাছে

গুপ্ত হামলা, চাঁদাবাজি, অপহরণ আর মৃত্যু আতংকের ভেতর দিন কাটছে পাকিস্তানে চিকিৎসকদের। যে হাতে থাকত প্রাণের প্রাণবাতি, স্পন্দন পরীক্ষার যন্ত্র স্টেথোস্কোপ, সেই হাতেই এখন ধরতে হয় একে-৪৭। জীবন বাঁচাতে ও জীবন রক্ষায় এ দুই-ই এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকা পেশোয়ারে কাজ করেন ডাক্তার মাহমুদ জাফরি। সকালে কাজে যাওয়ার আগে প্রথমেই তিনি যা করেন তা হল- গাড়িতে একে-৪৭ রাইফেল রাখেন। পরে বাড়ির সশস্ত্র গার্ডদের কিছু করণীয় বিষয় সম্পর্কে জানিয়ে তিনি হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। জাফরি এর আগে একবার খুন এবং অপহরণের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন।
ফলে জীবন হারানোর দ্বিতীয় কোনো সুযোগ তিনি তৈরি করতে চান না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষায় নিজের ব্যবস্থা তিনি নিজেই করছেন। এ পরিস্থিতিতে রয়েছেন পেশোয়ারের শত শত ডাক্তার। যারা তালেবান জঙ্গি ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের নিত্য হুমকির মধ্যে বসবাস করছেন। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন থেকে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে বেশ কিছুসংখ্যক ডাক্তারকে হত্যা ও ৩০ জনেরও বেশিকে অপহরণ করা হয়েছে। প্রায় তিন হাজারের মতো ডাক্তার শান্তিপূর্ণ জীবনের আশায় অন্যত্র চলে গেছেন। পরিস্থিতি এমনই যে, ডাক্তারদের কাছে স্টেথোস্কোপের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এক-৪৭। করাচির ডাক্তার সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে ২০ জন ডাক্তারকে হত্যা এবং গত দু’বছরে ১০ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। প্রাদেশিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেহরাম খান তারাকি ৩০ জন ডাক্তার অপহৃত হওয়া এবং ডজনখানেকের মতো নিহত হওয়ার ঘটনা নিশ্চিত করেন। গোটা পাকিস্তানে এখন এই একই চিত্র। এদিকে যেসব ডাক্তারকে অপহরণ করা হয়, তারা ফিরে এসে মারাত্মক আতংকের মধ্যে দিন কাটান। কারও সঙ্গে কথা বলেন না।
কারণ, যারা তাদের অপহরণ করে তাদের প্রবল নিষেধাজ্ঞা থাকে অপহরণ সংক্রান্ত ঘটনা প্রকাশ করা যাবে না। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট আমির তাজ খান বলেন, তারা আমাদের কোনো সভায় আসেন না। তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে অপহরণের ঘটনা বর্ণনা সম্ভব হয় না। এমনকি তাদের লাখ লাখ রুপি দেয়া হলেও না। তিনি বলেন, প্রায় ৩২ জন ডাক্তারকে অপহরণ করা হয়েছে। কেবল দু’জন অপহরণের ঘটনার বর্ণনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, অপহরণকারীরা ডাক্তারদের দড়ি দিয়ে বেঁধে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে কারোরই কোনো যোগাযোগ থাকে না। তারা অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো চিকিৎসা সুবিধা পান না। এছাড়া পেশোয়ারের ডাক্তারদের নিয়মিত জঙ্গিদের চাঁদা দিয়ে আসতে হয়। এখন এখানে জঙ্গিদের অন্যতম আয়ের উৎস চাঁদাবাজি আর অপহরণ ব্যবসা। তাজ খান বলেন, এখানকার প্রায় শত ভাগ ডাক্তার অপহরণ ও খুন এড়াতে জঙ্গিদের চাঁদা দিয়ে আসছে।

লি কুয়ান ইউ : একটি আশ্রয়, একটি বুরুজ

আধুনিক আবাসনব্যবস্থা ও সবুজ সিঙ্গাপুরের স্বপ্নদ্রষ্টা লি কুয়ান ইউ গণমানুষের একটি আশ্রয়। তিনি কেবল রূপকার নয়, একজন কর্মকারও। যেন নিজের হাতে পরিশ্রম করে সৃষ্টি করেছেন। সিঙ্গাপুরবাসীর মাথার ওপর ছায়া হয়েছেন। উন্নত বুরুজ (দুর্গ, বুর্জ) হয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন সবসময়।
আধুনিক আবাসনের রাজমিস্ত্রি
গরিব ছিন্নমূল সিঙ্গাপুরবাসীর প্রতিটি নাগরিকের একটি নিজস্ব বাড়ি হোক- এই স্বপ্নটা স্বাধীনতার শুরুতেই দেখেছিলেন লি কুয়ান ইউ। তার ভাষায়, ‘আমি উপলব্ধি করেছিলাম মালিকানার অনুভূতি আমাদের নতুন সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কেননা আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে তেমন কোনো গভীর শেকড় ছিল না।’ রাষ্ট্রনায়ক তার জনগণের রাজমিস্ত্রি হয়ে উঠলেন। ১৯৬০ সালে আবাসন উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন তিনি। ১৬ তলা ভবন দিয়ে শুরু হয় উন্নত আবাসন প্রতিষ্ঠা। গত ৫০ বছরে সরকারি উদ্যোগে ১০ লাখের বেশি ফ্ল্যাটবাড়ি বানানো হয়েছে। সিঙ্গাপুরের ৮৭.২ শতাংশ মানুষ এখন ফ্ল্যাটবাড়ির মালিক।
দক্ষ জাতি গঠনের শিক্ষা-কারিগর
শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নয়, দক্ষ জনসম্পদ গঠনে কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন লি কুয়ান ইউ। শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে অবকাঠামো ও কারিকুলামের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটান। পড়ালেখাকে সিলেবাসের বোঝা না বানিয়ে একটি ‘মজাদার উপহার’ হিসেবে প্রবর্তন করেন। দ্বিভাষী ব্যবস্থার মাধ্যমে ইংরেজিকে সার্বজনীন করলেও মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘সমাজ-প্রকৌশলের হাতিয়ার’ বানাতে ১৯৭৫ সালে নিজেই চার মাসের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। বর্তমানে দেশটির স্বাক্ষরতার হার ৯৭ শতাংশ। স্ট্রেইট টাইমস।
সবুজ সিঙ্গাপুরের প্রধান মালি
স্বাধীনতার পর আমি একটি চমকপ্রদ উপায় খুঁজছিলাম, যাতে তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে চেনা যায়। আমার মাথায় ‘পরিচ্ছন্ন ও সবুজ সিঙ্গাপুর’ গড়ার চিন্তা আসল। আমার সবুজায়ন কর্মসূচি সবচেয়ে মূল্যবান ও ফলপ্রসূ প্রজেক্ট।’ নিজের কর্মসূচি নিয়ে আÍজীবনী ‘তৃতীয় বিশ্ব থেকে প্রথম’ বইয়ে এভাবেই লিখেছেন লি কুয়ান ইউ। লি মনে করতেন জাতি গঠনের অবিচ্ছেদ্য অংশ সবুজায়ন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গল থেকে বিভিন্ন গাছের চারা এনে লাগিয়েছিলেন তিনি। গড়ে তুললেন গ্রিন সিটি। এখন দেশটির ৫০ শতাংশ ভূমিই সবুজবেষ্টিত। আর বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ সিঙ্গাপুর।

বেনজিরের সেই জড়োয়া সেট নিলামে

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর একটি জড়োয়া সেট নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুইজারল্যান্ড কর্তৃপক্ষ। বৈধ উত্তরাধিকার হিসেবে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বা অন্য কোনো উত্তরাধিকার জড়োয়া অলংকারের জন্য দাবি না জানালে এটি নিলামে তোলা হবে বলে জানানো হয়েছে। জেনেভার সরকারি কৌঁসুলি এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকারকে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জড়োয়া সেটের বৈধ উত্তরাধিকারদের নাম গেজেটে প্রকাশ করতে হবে। এ বিষয়ে সুইস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে না হলে এটি নিলামে তোলা হবে।
জারদারির ঘুষ বিষয়ে তদন্ত চালানোর সময় সুইস কর্তৃপক্ষ এ জড়োয়া সেট জব্দ করে। এতে একটি নেকলেস, ব্রেসলেট, একজোড়া কানফুল এবং একটি আংটি রয়েছে। পাকিস্তান সরকারের দাবি মোতাবেক কেনার সময় এ সেটের দাম পড়েছিল ১ লাখ ১৭ হাজার পাউন্ড স্টার্লিং বা ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বেনজির সরকারের দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় আসার পর এক কোটি ৩৫ লাখ ডলার ঘুষের অংশ হিসেবে এ সেটটি দেয়া হয়েছিল। সুইস কোম্পানি এজিএস-এস এবং কন্টেকয়ান ইন্সপেকশন এসএ ১৯৯৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এটি প্রদান করেছিল।পাকিস্তান টুডে।

পশ্চিমা বিশ্বে ইহুদিবিদ্বেষ by মেহেদী হাসান

ইহুদিদের প্রতি মানুষের মনোভাব কেমন তা বোঝার জন্য ব্রিটেনের ইহুদি সাংবাদিক জোনাথান কামুস ইউরোপের বেশ কয়েকটি শহরে মাথায় ইহুদি টুপি ‘কিপা’ পরে হেটেছেন। হাটা শুরুর এক মিনিটের মাথায় তিনি আক্রমনের শিকার হন। ২৫ মিনিটের মাথায় তার প্রতি থুতু মারতে শুরু করে তার পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া লোকজন। এছাড়া ইংরেজিতে চার অক্ষরের প্রকাশ অযোগ্য একটি অশ্লীল গালির আক্রমন শুনতে থাকেন অনবরত। ‘ইউ লিটল জিউ’ ‘মার শালা ইহুদি’ ‘কুকুর তোমাকে খাবেনা’ প্রভৃতি গালির শিকার হতে থাকেন অনরবত। তবে মুসলিম অধ্যুষিত যেসব এলাকায় জোনাথান হেটেছেন সেখানে তিনি কোন ধরনের অপ্রীতিকার আক্রমনের শিকার হননি কারো কাছ থেকে। কোন গালি তাকে কেউ দেয়নি। বরং অনেকে তাকে হিব্রু ভাষায় ‘শালোম’ বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। শালোম মানে হল শান্তি।
জোনাথান হাটার সময় নিজের শরীরে একটি গোপন ক্যামেরা বেধে রাখেন । তাকে উদ্দেশ্য করে কে কি বলেছেন, কে কিভাবে তাকিয়েছে সবই ভিডিও রেকর্ড হয়েছে।
জোনাথান যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, ব্রাডফোর্ড, ইতালির রোম, জার্মানির বার্লিন, সুইডেনের স্টকহোম এবং কোপেনহেগেন শহরে হেটেছেন। এছাড়া ইসরাইলের ইহুদি সাংবাদিক জাভিকা প্যারিসের বিভিন্ন রাস্তায় ১০ ঘন্টা হাটার দৃশ্য রেকর্ড করেছেন
সাংবাদিক জোনাথান সবচেয়ে বেশি আক্রমনের শিকার হন যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার এবং ব্রাডফোর্ড শহরে। আর কোন আক্রমনের শিকার হননি বার্লিন এবং স্টকহোমে। রোম এবং কোপেনহেগেনও তিনি বেশ আক্রমনের শিকার হন। আর সাংবাদিক জাভিবকা প্যারিসেও তীব্র ইহুদিবিদ্বেষ আক্রমনের শিকার হন। গত সপ্তাহে ব্রিটেনের ডেইলিমেইল অনলাইনে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
জোনাথান ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার শহরে হাটা শুরুর এক মিনিটের মাথায় ইহুদি বিদ্বেষজনিত আক্রমনের শিকার হন। সেখানে তার প্রতি থুতু মারা হয়। এমনকি বাবার সাথে হাটতে থাকা ছোট এক শিশু তাকে ইঙ্গিত করে উচ্চারন করল ‘জিউ’। জোনাথান বলেন, ম্যানচেস্টারে হাটা শুরুর আড়াই মিনিটের মাথায় একটি বালক আমার ওপর প্রায় সাইকেল উঠিয়ে দিয়ে মুখের কাছে মুখ এনে বলল ‘তুমি ইহুদি’।
ব্রাডফোর্ডে হাটা শুরুর ১৩ মিনিটের মাথায় তিনি আক্রমনের শিকার হন। ব্রাডফোর্ডে এক লোক ৫ মিনিট পর্যন্ত তার পেছনে লেগে থাকে এবং তার ছবি তোলে। এখানে সিটি পার্ক এলাকায় একজন তাকে দেখে বলে ওঠে ‘তুমি ইহুদি’। আরেকজন বলে, ‘মার শালা ইহুদিকে’। একটু পরে তিনজন যুবক একসাথে চেচিয়ে বলতে থাকে ‘তুমি ইহুদি, মুসলমান নও, দৌড়া ইহুদি। ’
জোনাথান জানান, তবে ব্রাডফোর্ডে এ ধরনের তীব্র আক্রমনের মুখে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটল। যেইমাত্র আমি সিটি পার্কে প্রবশে করলাম একজন মুসলিম আমার দিকে তাকালেন। তিনি কিছু একটা পান করছিলেন। তার মুখে কালো দাড়ি, প্রচলিত ইসলামিক পোশাক পরিহিত। আমাকে দেখে তিনি পান করা ছেড়ে আমার দিকে বিস্ময়ে তাকালেন। এরপর বললেন ‘শালোম শালোম’। হিব্রু ভাষায় শালোম মানে হল শান্তি। পরষ্পরকে অভ্যর্থনা করার জন্য শালোম বলা হয়।
ব্রাডফোর্ডে বিভিন্ন দেশের অভিবাসিদের বসবাস। এটি ব্রিটেনের আলোচিত রাজনীতিবিদ এমপি জর্জ গ্যালওয়ের এলাকা। শেষবার গাজায় ইহুদি আক্রমনের পর এখানে ৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে রাস্তায়। জর্জ গ্যালওয়ে ফিলিস্তিনের যোদ্ধাদের উদ্দেশে এখানে বলেছেন, তোমরা একা নও। জোনাথান জানান, সে কারনে ব্রাডফের্ডকে বেছে নেয়া হয়েছে ইহুদিবিদ্বেষ পরীক্ষার জন্য।
লন্ডনের রাস্তায় জোনাথন
জোনাথান কোপেনহেগেন শহরে দুই ধরনের আচরন পান। এ শহরের বিভিন্ন রাস্তায় হাটার সময় এক মহিলা তাকে আলিঙ্গন করে এবং আরেক লোক তার সাথে হাটার প্রস্তাব দেয় তার নিরাপত্তার জন্য। আরেক লোক তাকে গালি দেয় “(উচ্চারনযোগ্য নয়).... ইউ লিটল জিউ” বলে।
ইতালির কলোসিয়াম এলাকায় বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার পর্যটক আনাগোনা করছে। সেখান দিয়ে হাটার সময় কেউ কেউ বলল, ‘শাবাত শালোম’। মানে শুভ শনিবার। জোনাথান জানান, এখানে ভিগনা ক্লারায় লোকজনের মধ্যে বিদ্বেষের বদলে বিস্ময়বোধটা বেশি কাজ করছে রাস্তায় একজন ইহুদিকে টুপি পরে হাটতে দেখে। রোমের পিগনোটো এলাকাটি মুসলিম অধ্যূষিত। সেখানে হাটার সময় অনেকে বলেছেন “শালোম”। মানে শান্তি। অনেকে এখানে ভাল সম্বোধন করেছে তাকে।
এখানে সান মার্টিনো ডি মন্টিতে ইউরোপ ফুটবল লিগ ম্যাচ উপলক্ষে অনেকে জড়ো হয়েছে। সেখানে তাকে দেখে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলে “গে ফা....(উচ্চারনযোগ্য নয়)”
ইতালির টারমিনির কেন্দ্রেীয় রেলস্টেশনের এক রেস্টুরেন্টে যাওয়া মাত্র একজন ওয়েটার তার কিপা টুপি দেখামাত্র তার এক সহকর্মীকে দিকে তাকিয়ে বিদ্বেষমুলক ইঙ্গিত করে। এখানে আরেকটি পিজা দোকানের কাছে কয়েকজন লোক খুবই বিদ্বেষমূলকভাবে তার প্রতি অঙ্গভঙ্গি করে এবং আরেকজন তার কাঁধে থুতু দেয়।
বার্লিনের মার্জান এবং লিচেনবার্গে উগ্র বস্তিবাসী এবং ডানপন্থী নব্য নাজিবাদী ইহুদিবিদ্বেষীদের চারনভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এখানে হাটার সময় কেউ তার দিকে ফিরেও তাকায়নি বলে জানান জোনাথান।
বার্লিনে মুসলিম অধ্যুষিত হারমানপ্লাজ দিয়ে হাটার সময় অনেক হিজাব পরিহিত এবং দাড়িওয়ালা লোকজনকে হাটতে এবং কর্মরত দেখা গেছে। কিন্তু অপ্রীতিকর কোন কিছু বলেনি কেউ।
বার্লিনের অন্য কোন কোন রাস্তায় হাটার সময় তরুনরা কেউ কেউ মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়েছে মাত্র। কিন্তু খারাপ কিছু বলেনি।
প্রযুক্তির শহর স্টকহোমের আরেকট পরিচয় হল এখানে প্রচুর মুসলমানের বসবাস। এখানে কিপা টুপি পরিহিত কোন ইহুদিকে রাস্তায় দেখতে পাওয়া খুব কঠিন। কারণ নিরাপত্তার অভাব।
জোনাথান বলেন, সকাল আটটায় স্টকহোমের খুবই ব্যস্ত সাবওয়ে স্টেশনে দাড়িয়ে আছি ইহুদি কিপা টুপি পরে। একজন নিকাব পরিহিত মুসলিম আসে আমার কাছাকাছি। কিন্তু সে আমার কিপা টুপি দেখতে পায়নি বলে মনে হল। এরপর আরেকজন আরব লোক আসে। সে আমার পাশ দিয়ে হেটে গেল কিন্তু কিছু বললনা। এরপর বেলা বাড়ার সাথে সাথে শহরের অনেক রাস্তায় এভাবে হাটলাম। কিন্তু কারো কাছ থেকে কোন আক্রমনের শিকার হয়নি।
চার ঘন্টা হাটলেও স্টকহোম শহরে কোনো আক্রমনের শিকার হয়নি জোনাথন। শেষে ছোট ছোট শিশু আছে এমন একটি স্কুলের মাঠে যাই কিন্তু কেউ কিছু বলেনি। এভাবে ছয়, সাত, আট ঘন্টা পার হয়ে গেলেও কারো কাছ থেকে বিদ্বেষমূলক কিছুই শুনিনি। অবশেষে একটি প্লাটফর্মের কাছে অনুমান ১০ বছর বয়সী এক শিশু আমাকে দেখে তার আরেক বন্ধুকে বলল, দেখ একজন ইহুদি যাচ্ছে। তবে তার এ বলার মধ্যে কোন ঘৃনা বা বিদ্বেষ ছিলনা।
কিছুদিন আগে প্যারিসে ইসরাইলের একজন ইহুদি সাংবাদিক আক্রমনের শিকার হন এবং সে আক্রমনের ঘটনা নিজেই ভিডিও করেন। ইহুদিবিদ্বেষ বোঝার জন্য তিনি প্যারিসের রাস্তায় দশ ঘন্টা হাটেন এবং ভিডিও করেন। তার অনুসরনের ব্রিটেনের ইহুদি সাংবাদিক জোনাথান সম্প্রতি ইহুদি টুপি কিপা পরে রাস্তায় হাটেন এবং গোপন ক্যামেরায় ভিডিও করেন তার প্রতি মানুষের আচরন।
ডেইলিমেলের প্রতিবেদনে বলা হয় ২০১৪ সাল ছিল ব্রিটেনের অন্যতম ইহুদিবিদ্বেষের বছর। ১১৬৮টি ইহুদিবিদ্বেষের ঘটনা ঘটেছে। ফ্রান্সের তুলনায় এ সংখ্যা ৩৭ ভাগ বেশি। ২০১৪ সালে ব্রিটেনে ২০১৩ সালের তুলনায় দ্বিগুন ইহুদিবিদ্বেষের ঘটনা ঘটেছে এবং দিন দিন এ বিদ্বেষ বাড়ছে।

সিটি নির্বাচন নিয়ে সিইসির সঙ্গে বৈঠকে সময় চাইলেন বিএনপিপন্থী 'শত নাগরিক'

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপিপন্থী 'শত নাগরিক' সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বুধবার শেরে বাংলা নগরে ইসি সচিবালয়ে গিয়ে সিইসির সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন ‘শত নাগরিক কমিটি’র ওই প্রতিনিধি দল। সিইসির সঙ্গে বৈঠকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোসহ প্রার্থী হতে ইচ্ছুক অনেকের বিরুদ্ধে মামলা ও পুলিশি হয়রানির কথা তুলে ধরেন এমাজউদ্দীন।
এর আগে, শত নাগরিকের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নির্বাচন কমিশনে আলোচনা করার জন্য যান। প্রতিনিধিদলটি বিকেল পৌনে ৫টার দিকে কমিশন থেকে বের হয়ে আসেন। এরপর সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তারা।
এমাজ উদ্দিন বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন করা উচিত। এটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভূষণ। এটাকে বাদ দেয়া যাবে না। আমরা চাই সবাই মিলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। প্রার্থীরা যাতে সঠিকভাবে প্রার্থী হতে পারেন সে বিষয়ে আমরা ইসির পদক্ষেপ চেয়েছি। এজন্য মনোনয়ন দাখিলের জন্য দুই/তিনদিন সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছি। সিইসি আমাদের এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।’
তিনি বলেন, ঢাকা সিটি (উত্তর ও দক্ষিণ) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহনে আগ্রহী প্রার্থীদের অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা ও হয়রানির শিকার হয়ে গ্রেফতার কিংবা গা ঢাকা দিয়ে আছেন। নির্বাচনকালে তাদের অন্তত জামিন দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য আমরা অনুরোধ জানিয়েছি। তারা যেনো নির্বিঘ্নে তাদের প্রচার ও নির্বাচনী সমাবেশ করতে পারে। সেটা না করতে পারলে তো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।
প্রতিনিধি দলের অপর সদস্যরা হলেন- বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রীম কোর্ট বার আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, শত নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার, অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ড. জাফরুল্লাহ ও আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন মুন্নী।

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় জঙ্গিবাদ উত্থানের আশঙ্কা -দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

বাংলাদেশে ব্যাপক দমন অভিযান দেশটিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রোধ আর ভীতি সঞ্চার করেছে। এতে চরমপন্থি জঙ্গিদের জন্য ভিত গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, গত বছর চরম বিতর্কিত নির্বাচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটাই বর্তমানের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার ভিত্তি। একের পর এক হচ্ছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, পুলিশি হেফাজতে বা নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকা ব্যক্তিদের এনকাউন্টারে মৃত্যুর একটি ধারা লক্ষ্য করছে তারা। নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এসব ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী বা অপরাধী বলে দাবি করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এসব মৃত্যু এক ধরনের অবৈধ হত্যাকাণ্ডের শামিল। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর এক সদস্য বলেছেন, ধরপাকড় ও ক্রসফায়ারের ভয়ে তাদের অনেক কর্মীই ক্রমে চলে যাচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ডে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জানুয়ারি মাসে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের জোট শরিক জামায়াতে ইসলামী আগাম নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে নামে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। পুলিশ হাজারো কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে আর বিরোধী দলগুলোকে সভ-সমাবেশ আয়োজনে নিষিদ্ধ করেছে। বিরোধীরা ওই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে। ফলে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। পুলিশ যেসব কৌশল অবলম্বন করে সহিংস প্রতিবাদের জবাব দিচ্ছে, সমালোচকদের অভিযোগ তার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ রুদ্ধ করা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা জঙ্গি দলগুলো এখন বিরোধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে পারে। উদার ইসলামের ভূমি হিসেবে দীর্ঘদিন পরিচিত এ দেশটিতে এখন এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে গেলে, জঙ্গিবাদের উত্থান হতে পারে। ভিন্ন মতপ্রকাশের রাজনৈতিক সুযোগ এখন খুবই সামান্য।’ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত করা বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সরকার অস্বীকার করছে। সরকারের সিনিয়র এক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, কর্তৃপক্ষ ‘শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেবে। কিন্তু ‘নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে। এদিকে, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক শহিদুল হক বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীগুলো শুধু আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার জন্য প্রচারণা চালায় এমন একটি সংগঠন হলো সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার সকল পথ যদি রূদ্ধ হয়ে যায় তাহলে নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ইসলামপন্থি দলগুলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পরিত্যাগ করে তালেবানে পরিণত হতে পারে। বাইরের জঙ্গি দলগুলোও এ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের সুযোগ নিতে পারে।’ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোকে পুলিশ একাধিক অস্ত্রের মজুদ উদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলছে এগুলো নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদিনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ২০০২ সালে আদালত, প্রেক্ষাগৃহ ও বিপণিবিতানে সিরিজ বোমা হামলার অভিযোগ রয়েছে এ সংগঠনের বিরুদ্ধে। পুলিশের আশঙ্কা এ দলটি নতুন করে ফিরে আসার প্রক্রিয়ায় থাকতে পারে। বিশেষ করে গত বছরের শেষের দিকে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বিস্ফোরণের পর পর এ আশঙ্কা বেড়েছে। ওই ঘটনায় ভারত একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। আর দেশটির পুলিশ বলছে ধৃত ব্যক্তিরা জেএমবির সদস্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার আংশিক ভিত্তি গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরম বিতর্কিত নির্বাচন। হাসিনা সংবিধান থেকে নির্বাচন তদারকিতে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করেন। এরপর বিরোধীরা নির্বাচন বর্জন করে। তারা হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবণতার অভিযোগ তোলে। বিরোধী দলগুলো তার পদত্যাগ এবং নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। এদিকে হাসিনা তার অবস্থান থেকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়েছেন। আর তার দলের কর্মকর্তারা বিএনপিকে জঙ্গি সংগঠন আইএসের সঙ্গে তুলনা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচিত বিএনপি। তাদের দাবি জোরালো করতে দেশব্যাপী সড়ক, রেল এবং নৌপথে অবরোধ পালন করার চেষ্টা করার কারণেই হাসিনার সহযোগীরা এমন মন্তব্য করেছেন। সরকারের অভিযোগ বিএনপি ও তার জোট শরিকরা যানবাহনে সিরিজ বোমা হামলার জন্য দায়ী। এসব হামলায় ৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বিরোধী দলগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তারা শুধু শান্তিপূর্ণভাবেই আচরণ করছে। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে এ মাসে যোগ হয়েছে বিরোধী দল বিএনপির মুখপাত্র এবং যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের ঘটনা। তাকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তার পরিবার বলছে, তারা ছিল পুলিশের গোয়েন্দা। স্ত্রী হাসিনা আহমেদ তার স্বামীকে হাজির করতে পুলিশের প্রতি দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে আবেদন দাখিল করেন। আদালতে দাখিলকৃত লিখিত বিবৃতিতে পুলিশ সালাহউদ্দিনকে আটকের কথা অস্বীকার করেছে। হাসিনা আহমেদ শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ভীষণ আতঙ্কিত যে, তাকে অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছে এবং তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতে পারে।’ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা সরাসরি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু তিনি বলেন, বর্তমান অস্থিরতার কারণে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ বাহিনীর ওপর অসামাঞ্জস্য মাত্রায় চাপ বেড়েছে। পুলিশের ওপর যখন মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ছে, জনস্বাধীনতা আর যথাযথ প্রক্রিয়া কখনও কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিএনপি সদস্য এবং শ্রমিক কর্মী ৩০ বছরের ওয়াদুদ ব্যাপারী ঢাকায় পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান। তার পিতা আবদুল আলি ব্যাপারী (৬০) গভীর রাতে ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পান ফোনে। অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে তাকে বলে, ‘মর্গে এসে আপনার ছেলেকে নিয়ে যান’। এরপর ফোন লাইন কেটে দেয়া হয়। পুলিশ বলছে, ওয়াদুদকে গত মাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়। হেফাজতে থাকাকালীন পুলিশ এবং বিরোধী কর্মীদের মধ্যে গোলাগুলির মধ্যে পড়ে ক্রসফায়ারে মারা যায় সে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার বুকে পিঠে কমপক্ষে ৬ বার গুলি করা হয়। সন্তানের মৃত্যুর পুলিশি বর্ণনা বিশ্বাস করতে নারাজ ওয়াদুদের পিতা। তিনি বলেন, সে কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট অব্যাহত রয়েছে আর ওয়াদুদ ব্যাপারীর মতো তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’ মৃত্যুগুলো ক্রমাগত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশী মানবাধিকার এবং আইনি সহায়তাবিষয়ক সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তদন্তবিষয়ক পরিচালক নুর খান বলেন-  ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা অন্য যে নামেই ডাকা হোক না কেন এগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। সংগঠনটি এমন ৩৭ জনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে; যেখানে বলা হয়েছে তারা ফেব্রুয়ারিতে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর হাতে নিহত হয়েছে। এগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটেছে আটক অবস্থায়। এছাড়াও সংগঠনটি জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে এমন ১৫টি এবং ডিসেম্বরে ৭টি  বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বাংলাদেশের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর তদারকি করে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। তাদের কাছে মন্তব্যের অনুরোধ জানালে কোন জবাব মেলেনি। গত বছর মার্কিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। এর জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাংলাদেশে কোন অপহরণ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় না। ৩২ বছরের জামায়াতে ইসলামীর কর্মী আবুল বাশার বলেন, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বাড়িতে রাত কাটাতে ভয় পান তিনি। তার আশঙ্কা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলে মেরে ফেলবে। বাশার জানালেন, পেট্রলবোমা হামলায় অংশগ্রহণের সন্দেহে পুলিশ তাকে খুঁজছে। এমন কোন হামলায় সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, তার জেলায় যখন ঘটনাটি ঘটে সে সময় তিনি ছিলেন ঢাকায়। তিনি আরও বলেন, আমাদের জন্য কোন আইন নেই, নিরাপত্তা নেই। বিরোধীদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করলেও তিনি আশঙ্কা করেন অনেক কর্মী ক্রমেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাচ্ছে। আর তারা অপেক্ষাকৃত চরমপন্থি কৌশল অবলম্বন করতে পারে। মানুষ হারাচ্ছে বন্ধু, ভাই। আর বিতাড়িত হচ্ছে ঘর থেকে। তারা মরিয়া হয়ে উঠছে, বললেন বাশার।

৯ মাস ধরে হিমঘরে খোকনের লাশ

দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস ধরে লাশটি পড়ে আছে হিমঘরে। নিহত ব্যক্তি হিন্দু না মুসলিম এর সমাধান না হওয়ায় লাশের কবর বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হচ্ছে না। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালেও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। লাশের দাবিদার দুই নারী। একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী। অন্যজন মুসলমান। দুই নারীর দাবি তারা নিহত ব্যক্তি খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরীর স্ত্রী। মুসলমান স্ত্রীর দাবি, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাকে বিয়ে করেছেন খোকন। অন্যদিকে হিন্দু স্ত্রীর দাবি, তিনি ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। খোকন হিন্দু না মুসলিম এই সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।
গতকাল খোকন চৌধুরী ওরফে খোকন নন্দীর স্ত্রী দাবিদার হাবিবা খানম বাবলি জানান, খোকন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরও তার সাবেক স্ত্রী মীরা নন্দীর বাধার কারণে লাশটি কবর দেয়া যাচ্ছে না। লাশটি কবর দেয়ার জন্য তিনি আদালতে মামলা করেন। গত বছরের ১০ই জুলাই এ বিষয়ে আদালতের শুনানির দিন ধার্য ছিল। কিন্তু এ দিন বিচারক এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না বলে অন্য আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে অন্য আদালতে গেলে বারবার শুনানির দিন ধার্য হলেও মীরা নন্দী সময় চেয়ে আবেদন করেন। এভাবেই সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বাবলি বলেন, আমি তার সম্পদ চাই না। শুধু তার লাশটা কবর দিতে চাই। কিন্তু তারা কিছুতেই তা করতে দেবে না। তারা খোকনের লাশের জন্য না বরং তার সম্পদের জন্য বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে।
গত বছরের ১৫ই জুন খোকন অসুস্থ হয়ে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন। ২৬শে জুন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে তিনি মারা যান। নিহত খোকনের গ্রামের বাড়ি মহেশখালীর জামালপাড়া গ্রামে।
এদিকে, গতকাল সকালে মোহাম্মদপুর থানাধীন রায়েরবাজারের সুলতানগঞ্জের কাপড়পট্টির ১৫ নম্বর হাজী ভবনের ১/সি নম্বর ফ্ল্যাটে গেলে কথা হয় খোকনের ভাই বাবু নন্দীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের লাশ সৎকারের জন্য ব্যবস্থা করলে কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে হাবিবা নামে এক মহিলা তাকে স্বামী দাবি করে বসেন। তাকে আমরা কখনও দেখেনি। প্রমাণস্বরূপ তার কাছে আমরা বিয়ের কাবিননামা দেখতে চাই কিন্তু তাও তিনি দেখাতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি থানা পুলিশ সমাধান করতে না পেরে বর্তমানে আদালতে মামলা করা হয়েছে।
নিহতের ভাই আরও বলেন, আমার বড় ভাই যে ব্র্রাহ্মণ ছিলেন তার পক্ষে সব তথ্য, পেপার্স ও ডকুমেন্ট উপস্থাপন করা হয়েছে। আশা করি আদালত বিষয়গুলো আমলে নেবেন। আমরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি।
নিহতের স্ত্রী মীরা নন্দী বলেন, আমার স্বামীর কোটি টাকার সম্পত্তির লোভে ওই মহিলা (হাবিবা) আমার স্বামীকে স্বামী বলে দাবি করছেন। খোকন নন্দী মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছি। তার লাশ এখনও হিমঘরে পড়ে আছে। এমন ঘটনা আর ঘটেছে কিনা আমার জানা নেই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক by ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
আমাদের দেশে বহুল প্রচারিত একটি বিতর্ক আছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা কে করেছেন ? দেশে বড় দুটি দল , একটি বিএনপি অপরটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগ । তাদের প্রত্যেকের দাবি তাদের নেতার পক্ষে। এমন একটি বিষয় যা স্বাধীনতার বিশেষ একটি মান মর্যাদার সাথে জড়িত, এমন একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক করা কখনই উচিত নয় । কিন্তু আমাদের দেশে অনুচিত অনেক কিছু ঘটে যা বিশ্বে আর কোন দেশে ঘটে না । যেমন, স্বাধীনতার মহান নেতাকে গালি দেয়া , দেশ নিয়ে বিতর্ক করা , রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিতর্ক করা .। ইত্যাদি ।
এর সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এই বিতর্ক কোন নূতন ঘটনা নয় । তবে আমাদের এই বিতর্কের ফলে জাতি দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে । এই পিছিয়ে পড়া জাতি কি করে মাথা তুলে দাঁড়াবে যদি কোন একতা না থাকে ?
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে বীরত্ব দেখিয়ে জিয়াউর রহমান পাক সেনাবাহিনীতে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। এ সময়েই জিয়াউর রহমান বাঙালি সহকর্মীদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তাকে পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখানেও তিনি নবীন সেনা অফিসারদের সঙ্গে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ বিষয়ে কথা বলেছেন।
এদিকে, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতা প্রাপ্তির সুযোগ পায় পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। জাতীয় পরিষদের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।
এই বিশাল বিজয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের অপেক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে, পাকিস্তান পিপলস্্্্্ পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এ নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত কম আসনে জয় পেয়েও ক্ষমতা ভাগাভাগির নানা কৌশল আটতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও এ অপকৌশলে সহায়ক ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ বিলম্বের পর ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। কিন্তু, কোনো কারণ ছাড়াই হঠাত্ ১ মার্চ দুপুরে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন তিনি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফুঁসে ওঠে পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ। ১ মার্চ থেকেই রাজপথে নেমে আসেন তারা। ২ মার্চ উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। শাসকগোষ্ঠীর কারফিউ ভেঙে দিন-রাত চলে বিক্ষোভ। বিক্ষোভে নির্বিচারে গুলিতে নিহত হয় অন্তত তিনজন। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এদিন এক বিবৃতিতে ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গোটা প্রদেশে হরতালের ডাক দেন।
২ মার্চ থেকে ৫ মার্চ দেশজুড়ে সংঘর্ষ চলে। বহু মানুষ হতাহত হন। ৬ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে রেডিও পাকিস্তানের জাতীয় অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন আহ্বান করেন।
পরের দিন ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান কী ভাষণ দেবেন তা শোনার জন্য সারাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৭ মার্চ শেখ মুজিব বজ্রকণ্ঠে সাত দফা ঘোষণা করেন। সামরিক আইন ও সেনা বাহিনী প্রত্যাহার, গণহত্যার তদন্ত এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হইলে পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের প্রশ্ন বিবেচনা করা যাইতে পারে, তাহার পূর্বে নয়।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের লেখা ‘বাংলাদেশের তারিখ’ (প্রথম সংস্করণ) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয়-বাংলা, জয় পাকিস্তান’ বলে ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেন।”
৯ মার্চ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পল্টনের এক জনসভায় শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অপেক্ষা বাংলার নায়ক হওয়া অনেক গৌরবের।’ (দৈনিক আজাদ, ১০ মার্চ ১৯৭১) ১০ মার্চ একইভাবে তিনি বলেন, ‘আলোচনায় কিছু হবে না। ওদের আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে দাও।’
১৩ মার্চ ভৈরবে এক জনসভায় ভাসানী বলেন, ‘পূর্ববাংলা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আমরা এখন একটি পূর্ববাংলা সরকারের অপেক্ষায় আছি।’ ১৪ মার্চ জনতার বাঁধভাঙা আন্দোলনের একপর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান ওয়ালী খানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শাসনতান্ত্রিক সংকট প্রশ্নে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ১৫ মার্চ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবু মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ১৬ মার্চ প্রথম শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বৈঠকে বসেন।
১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দ্বিতীয় দফা সংলাপও সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। ১৮ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের বিরতি ছিল। ১৯ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠক হয়। বৈঠকের পর শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মঙ্গলের প্রত্যাশী, আবার চরম পরিণতির জন্যও প্রস্তুত।’ ২০ মার্চ বৈঠকের পর আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
২১ মার্চ পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পৃথকভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে ২২ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পূর্ব ঘোষিত ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের সভা স্থগিত করা হয়।
দীর্ঘ আলোচনার পর ২৪ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সমঝোতার আভাস দেন। সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি। আমি আশা করি, প্রেসিডেন্ট এখন তা ঘোষণা করবেন।’
২৫ মার্চ দিনব্যাপী ঢাকা শহরে চলে প্রতিবাদ মিছিল, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলে সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জওয়ানদের। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। এ দিন রাত ১১টার পর থেকে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পাকবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ইপিআর সদর দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো ঢাকা মহানগরীতে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে।
রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ট্যাংক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির ওপর দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে এবং তাকে সহ ৪ জন চাকর এবং একজন দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান গণহত্যার প্রতিবাদ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে ২৭ মার্চ সারাদেশে হরতাল আহ্বান করেন। পরের দিন শেখ মুজিবের গ্রেফতার ও হরতালের খবর প্রায় সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
এদিকে রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। এর আগে দিনে চট্টগ্রাম শহরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াতের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয় প্রবল প্রতিরোধ। অস্ত্র খালাস করে যাতে পশ্চিমা সৈন্যদের হাতে না পৌঁছতে পারে সে জন্য রাস্তায় রাস্তায় তৈরি করা হয় ব্যারিকেড। এই ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে লাগানো হয় বাঙালি সৈন্যদের। রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এই ব্যারিকেড সরানোর কাজ। রাত ১১টায় চট্টগ্রামস্থ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবদুর রশীদ জানজুয়া আকস্মিকভাবে সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে নির্দেশ পাঠান এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওয়ার জন্য।
রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় জানজুয়া নিজে এসে মেজর জিয়াকে নৌ-বাহিনীর একটি ট্রাকে তুলে ষোলশহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে রওনা করিয়ে দেন। সঙ্গে একজন নৌ বাহিনীর অফিসারকে (পশ্চিম পাকিস্তানি) গার্ড হিসেবে দেয়া হয়। রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড সরিয়ে যেতে তাঁর দেরি হয়। আগ্রাবাদে একটা বড় ব্যারিকেডের সামনে বাধা পেয়ে তাঁর ট্রাক থেমে যায়, তখনই পেছন থেকে একটি ডজ গাড়িতে ছুটে আসেন ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান। গাড়ি থেকে নেমেই তিনি দৌড়ে যান মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে। হাত ধরে তাকে রাস্তার ধারে নিয়ে যান। জানান, ক্যাপ্টেন অলি আহমদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছেন। পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে। শহরে বহু লোক হতাহত হয়েছে। এতে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন মেজর জিয়াউর রহমান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন— ‘উই রিভোল্ট।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি খালেকুজ্জামানকে ষোলশহরে ফিরে গিয়ে ব্যাটালিয়নকে তৈরি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদকে নির্দেশ দিতে বলেন। আর সেই সঙ্গে নির্দেশ পাঠান ব্যাটেলিয়নের সমস্ত পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেফতারের। এই রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়াসহ সব পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেফতার করা হলো।
এরপর অন্যান্য ব্যাটেলিয়নের বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের ফোন করলেন, কিন্তু অনেককেই পেলেন না। এ পর্যায়ে তিনি বেসামরিক বিভাগে টেলিফোন অপারেটরকে ফোন করে ডিসি, এসপি, কমিশনার, ডিআইজি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে অনুরোধ করেন যে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছে। টেলিফোন অপারেটর মেজর জিয়ার এ অনুরোধ সানন্দে গ্রহণ করেন।
এ পরিস্থিতিতে মেজর জিয়া অষ্টম ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও জোয়ানদের জড়ো করলেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তখন রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিট। তিনি ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। ঘোষণায় বললেন, “আমি মেজর জিয়াউর রহমান প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট ও লিবারেশন আর্মি চিফ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ স্বাধীন। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। আপনারা যে যা পারেন, সামর্থ্য অনুযায়ী অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। আমাদেরকে লড়াই করতে হবে এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে দেশ ছাড়া করতে হবে।”
মেজর জিয়া ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে যান। বেতার কর্মীরা মেজর জিয়াউর রহমানকে পেয়ে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন। কিন্তু কি বলবেন তিনি? একটি করে বিবৃতি লেখেন আবার তা ছিঁড়ে ফেলেন। এদিকে বেতার কর্মীরা বারবার ঘোষণা করছিলেন যে, আর পনের মিনিটের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান ভাষণ দেবেন। প্রায় দেড় ঘণ্টায় তিনি তৈরি করেন তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণাটি। সেটা তিনি বাংলা এবং ইংরেজিতে পাঠ করেন। এই ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ দিল্লির ‘দি স্টেটস্ম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এনিয়ে কোনো বিতর্কের কোন সুযোগ নেই।জিয়াউর রহমান সেদিন সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের স্বাধীণতার ঘোষনা তৎক্ষালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ জন্য ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান এই ঘোষনা দিয়ে জাতিকে মুক্তি সংগ্রামের দিকে দাবিত করেছিলেন। এই ঘোষনা কারো প্রেরিত বার্তা ছিলোনা বরং জিয়াউর রহমানের নিজের লিখা বার্তা ছিলো।
জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন এবং জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মহান বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান ব্যারাকে ফিরে যান এবং সেনাবাহিনীর নিয়মিত চাকরিতে যোগ দেন। তাঁর ডাকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেন।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতারের পরমুহুর্তে মেজর জিয়ার দুঃসাহসিক আত্মপ্রকাশ। মেজর জিয়াই মরহুম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করে শেখ মুজিবকে ইতিহাসের মহানায়ক হওয়ার ক্ষেত্র টেকসই করে সম্প্রসারিত করেছেন। আজকাল স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক নিরর্থক এবং নিতান্তই কূট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার মাত্র। মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা আছে বিশ্বজুড়ে।
ততকালীন মেজর জিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ ত্যাগ করে একাত্তরের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজ কানে শুনেছেন জিয়ার কন্ঠে ঘোষিত স্বাধীনতার বাণী। শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নয় বর্হিবিশ্বের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কেও জিয়াউর রহমানের দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণা ধরা পড়ে। আর সেভাবেই সন্নিবেশিত হয় তাদের নথিতে। অবমুক্তকৃত সিআই এর গোপন দলিলে সেই সত্যটিই প্রকাশ পেয়েছে মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ভারতের প্রেসিডেন্ট মোরারজী দেশাইও জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেছেন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে এবং বিভিন্ন সময় উচ্চারিত হয়েছে এ প্রসঙ্গটি। জিয়াউর রহমান একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ নিজ দায়িত্বে এবং ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কথা ১৯৮২ সালে নভেম্বর মাসে প্রথম প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের ১৫ খন্ডে উল্লেখ রয়েছে। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণা সিআইএর মত লন্ডনের সাপ্তাহিক গার্ডিয়ান সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও সংবাদ মাধ্যম লিপিবদ্ধ করে রেখেছে।জিয়ার তেজোদীপ্ত কন্ঠের ঘোষণা শুনেছেন এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনো বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে নি:শ্বাস ফেলছেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনানায়ক ও আওয়ামী লীগ নেতা জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ, মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, সৈয়দ আলী আহসান, ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল সুখবন্ত সিং, মেজর জেনারেল লছমন সিং, লে. জেনারেল মতিন, জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়াসহ অনেকেই তাদের নিজগৃহে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জিয়ার কন্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। জিয়া একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গররত অবস্থায় একটি জাপানী জাহাজ থেকে অষ্ট্রেলিয়া রেডিওতে জিয়ার ঘোষণার বার্তাটি পাঠানো হয়। অস্ট্রেলিয়া রেডিও জিয়ার ঘোষণাটি প্রথম প্রচার করে। এরপর বিবিসি’তে প্রচারিত হওয়ার পর তা পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।
জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার প্রমাণ মিলে ভারতের ততকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্যেও। ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারে বক্তৃতায় এক জায়গায় ইন্দিরা গান্ধী বলেন, শেখ মুজিব এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান, যার সুযোগ এখনো আছে। ‘ইন্ডিয়া সিকস’ (ওহফরধ ঝববশং) নামক বইতে ইন্দিরা গান্ধীর এ বক্তব্যটি সংকলিত হয়েছে।১৯৭৮ সালে ভারত সফরকালে দিল্লিতে জিয়াউর রহমানের সম্মানে আয়োজিত ভোজ সভায় ভারতের ততকালীন প্রেসিডেন্ট নীলম সঞ্জীব রেড্ডি জিয়াকে বলেন, সর্বপ্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে আপনি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। প্রয়াত ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার “জোসনা ও জননীর গল্প” উপন্যাসের (১৮২-১৮৩) পাতায় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন।এরকম অনেক উদাহরণ ও প্রমাণ রয়েছে দেশে বিদেশে বইপুস্তকে-দলিল দস্তাবেজে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের উক্তিতে। একাত্তরে ২৬ মার্চ শেখ মুজিব গ্রেফতার হন পাকবাহিনীর হাতে। এমতাবস্থায় তার পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার মতো সুযোগ ও সময় কোনটাই ছিলো না। সেদিন শেখ মুজিবের কন্ঠের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা কেউ শুনেননি। তাতে কিবা আসে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে শেখ মুজিবের ভূমিকা ও অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে না পারার কারণে তার মর্যাদা বিন্দুমাত্র ম্লান হওয়ার কোন অবকাশ নেই।
অথচ এমন একটি স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত সত্যকে মিথ্যে প্রমাণিত করার যারপরনাই চেষ্টা চলছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে । দেশের আপামর জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে কোর্ট-কাচারী, মামলা-মোকদ্দমা এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবিধান পাল্টিয়ে জিয়াউর রহমানকে তার প্রাপ্য মূল্যায়ন ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টায় রত বর্তমান সরকার। বিকৃত করা হচ্ছে ইতিহাস। প্রতিহিংসার করাত চালিয়ে জাতিকে চিড়ে ফেলার চেষ্টা কখনো শুভ হতে পারে না। ইতিহাসে যার যেখানে স্থান সেখানে অবশ্যই তাকে সমাসীন করতে হবে। কাউকে অবমূল্যায়ন, অবমাননা করে কিংবা একজনের জায়গায় অন্যকে প্রতিস্থাপিত করে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অসুস্থ রাজনীতির বহমান এ ধারা দেশ ও জাতিকে কোথায় নিয়ে ঠেকাবে সে আশংকাই আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বিভেদ বিভ্রান্তি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে তাদের নিজ নিজ মর্যাদার আসনে বসাতে হবে।
জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সিপাহশালার। তিনি ছিলেন, এগার হাজার প্রতিরোধকারী সেনার কমান্ডার। সেটাই ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে একটি বক্তব্য দেন, যেটি প্রচারিত হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। সেখানে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন First announced through Major Ziaur Rahman, to set up a full Fledged operational base from which it is administering the liberated areas. (Bangladesh Documents, Vol-I, Indian Government, page 284).
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ (মরহুম) অলি আহাদ তার "জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৭-৭৫" বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে লেখেন, "...আমি জনাব আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সহিত নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করিতাম তাহার বাসায় রাত্রিযাপন করিতে গিয়ে তাহারই রেডিও সেটে ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র হইতে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠস্বরে স্বাধীন বাংলার ডাক ধ্বনিত হইয়াছিল। এই ডাকের মধ্যে সেই দিশেহারা, হতভম্ব, সম্বিতহারা ও মুক্তিপ্রাণ বাঙালি জনতা শুনিতে পায় এক অভয়বাণী, আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়িবার আহ্বান, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ের সংবাদ।"
ভারতে সরকারী ওয়েব সাইটে বলা আছে “While the where abouts of Mujib remained unknown, Major Ziaur Rahman announced the formation of the provisional government of Bangladesh over radio Chittagong. আর মার্কিন ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি On march 27 the clandestine radio announced the formation of a revolutionary army and provisional government under the leadership of Major Ziaur Rahman”.
মুক্তিযুদ্ধের ৫ নাম্বার সেক্টরের কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলী (বীর-উত্তম) লিখেছেন, " অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করলে এবং পরে স্বাধীনতাযুদ্ধের ডাক দিলে আমি সানন্দে যুদ্ধে যোগদান করি। "
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিক-উল ইসলাম (বীর-উত্তম) তার A tale of Millions বইয়ের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, "২৭ মার্চের বিকেলে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।"
একজন পাকিস্তানী সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন’ বলে সম্প্রতি দালিলিক সত্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সংস্থাটির ওয়াশিংটনস্থ সদর দফতর সম্প্রতি বাংলাদেশ বিষয়ক গোপন দলিল অবমুক্ত করলে এ বিষয়ে গত ৯ডিসেম্বর ঢাকায় প্রথম আলো পত্রিকায় সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান এর লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে গত ৮ ডিসেম্বর প্রেরিত নিবন্ধে মিজানুর রহমান খান সিআইএর গোপন দলিলের বরাত দিয়ে লিখেন- ‘সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হলেও জিয়া ছিলেন ক্যারিশমেটিক নেতা । প্রায় ছয় বছরের নেতৃত্বে এক আশাবিহীন দরিদ্র ও বিশৃংখল অবস্থা থেকে তিনি বাংলাদেশকে সমস্যা মোকাবিলা করার উপযোগী করে তুলেছিলেন।’ ১৯৮২ সালের নভেম্বরে প্রস্তুত সিআইএ’র বাংলাদেশ বিষয়ক হ্যান্ডবুকে দেশের প্রথম দশকের রাজনীতি মূল্যায়ন করে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। পর্যাপ্ত সামরিক নেতৃত্বের ঘাটতির সুযোগে সামরিক বাহিনী একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সিআইএর গোপন দলিলে জিয়াউর রহমানের প্রশংসার পাশাপাশি বলেছে ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রাজনীতিকরণকে তিনি আরো বিস্তৃত করেছিলেন।’
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, যিনি সামরিক বাহিনীর উর্দি ছেড়ে নিজেকে বেসামরিক ব্যক্তিতে পরিণত করেছেন। এর আগেও তিনি আরেকবার উর্দি ছেড়েছিলেন, সেটা ২৬ মার্চ উই রিভোল্ট বলার মাধ্যম।
জিয়া সৈনিক ছিলেন আজীবন, যে অর্থে একজন সৈনিক সব সময় যিনি যুদ্ধে থাকেন, থাকেন যুদ্ধক্ষেত্রে। সেই যুদ্ধ পাকিস্তানের দুঃশাসন থেকে অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশ বুক ভরে শ্বাস নেয়, তারা জানালা খুলে দেয়। বাংলাদেশকে অস্পষ্ট মেরুদ- থেকে একটা শক্ত মেরুদন্ডের ওপর দাঁড় করান তিনি। জিয়া অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তান কে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের সৃষ্টি করেন। আবার সেই বাংলাদেশে যখন একদলীয় বাকশাল আর রাহুর গ্রাসের মধ্যে পড়ে তখন তাকে মুক্ত করেন।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতীক। ১৯৩৬ সালের এই দিনে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা মনসুর রহমান একজন রসায়নবিদ হিসেবে কলকাতাতে সরকারী চাকুরী করতেন। মাতা-পিতা তখন আদর করে নাম রাখেন কমল। দেশ, মাটি ও মানুষের জন্যে আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্বের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, অসাধারণ দেশপ্রেমিক, অসম সাহসী ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তার শৈশবের কিছুকাল বগুড়ার গ্রামে ও কিছুকাল কলকাতাতে কেটেছে। দেশবিভাগের পর (১৯৪৭) তার বাবা করাচি চলে যান। তখন জিয়াউর রহমান কলকাতার হেয়ার স্কুল ত্যাগ করেন এবং করাচি একাডেমী স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঐ স্কুল থেকে তার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেন এবং তারপর করাচিতে ডি.জে. কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে তিনি কেকুলে পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীতে শিক্ষানবিস অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেনেন্ট হিসেবে কমিশন প্রাপ্ত হন। তিনি সেখানে দুই বছর চাকুরি করেণ, তারপর ১৯৫৭ সালে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন। তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন এবং তার কোম্পানি যুদ্ধে বীরত্বের জন্য যে সব কোম্পানি সর্বাধিক পুরষ্কার পায়, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। ১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে একজন প্রশিক্ষক হিসেবে দ্বায়িত্ব পান। সে বছরই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটা স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি জয়দেবপুরস্থ সেকেন্ড ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ পান। উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানীতে যান। ১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ পান।
২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বরের মতো ঘৃণ্য হামলা চালায় তখন এর আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে সবোর্স্তরের জনগণ। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিন সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধপরিচালনা করেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা জেলার কিয়দংশে মুক্তিপাগল মানুষকে মেজর জিয়া সংগঠিত করেন এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্সের’ অধিনায়ক হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেন সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে। দীর্ঘ নয় মাস মরণপণ লড়াই করে অজির্ত হল সবুজ জমিনে ওপর রক্তলাল সূর্যখচিত পতাকাসমৃদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশ- আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। লাখো শহীদের পবিত্র রক্ত আর হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অজির্ত হল এদেশের স্বাধীনতা। গণতন্ত্র এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, শোষন বঞ্চনার অবসান ঘটবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হবে এবং আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব- এই ছিল সেদিনের স্বপ্ন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান যুদ্ধের পরিক্লপনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ এর জুন পর্যন্ত ১ নং সেক্টর কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। অসীম সাহসিকতা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্বে তিনি ছিলেন নির্ভীক। যখন রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলেন, তখন সেনাবাহিনীর একজন মেজর এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন; জীবনবাজি রেখে সশস্ত্র যুদ্ধ করেন। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন; বীর উত্তম খেতাব পান। স্বাধীনতার পর তিনি ফের সৈনিক জীবনে ফিরে যান। সেনাবাহিনীতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর প্রথমে তিনি কুমিল্লা ব্রিগেড কমান্ডার এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ-অফ-স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে কর্নেল, ১৯৭৩-এর মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং শেষ দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত হলেও পরে তিনি বাংলাদেশের একজন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশকে রাজনৈতিক ঐকতানে নিয়ে আসা ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কারণে তিনি আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আখ্যা পান। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনের মধ্যদিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির সূচনা করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নতুন দর্শন উপস্থাপন করেন জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যান।
শুধু রাজনীতিবিদরাই নন, জিয়াউর রহমানও বালাদেশের স্বাধীনতার জন্য সেই তরুণ বয়স থেকেই নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তত রেখেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে “একটি জাতির জন্ম“ শিরোনামে নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন ..“স্কুল জীবন থেকেই পাকিস্তানীদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমার মনকে পীড়া দিতো। আমি জানতাম, অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে।—বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটা ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেওয়া হতো স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই।—সেই স্কুল জীবন থেকে মনে মনে আমার একটা আকাংখাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে, তাহলে এই পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো..পাকিস্তানী পশুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার, দুর্বারতম আকাংখা দুর্বার হয়ে উঠতো মাঝে মাঝেই। উদগ্র কামনা জাগতো পাকিস্তানের ভিত্তি ভূমিটাকে তছনছ করে দিতে। কিন্তু উপযুক্ত সময় আর উপযুক্ত স্থানের অপেক্ষায় দমন করতাম সেই আকাংখাকে ”।
তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি দেশের মানুষের প্রিয় দল হিসেবে ’৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ, ’৯১ সালের পঞ্চম সংসদ ও ষষ্ঠ এবং অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত ’৮৬ সালের তৃতীয় ও ’৮৮ সালের চতুর্থ এবং এছাড়া সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন মহাজোটের অধীনে অনুষ্ঠিত একতরফার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ দল। এই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না। বাকি ১৪৭ আসনের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল বলে বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটসহ অন্যান্য বিরোধী দলও এই নির্বাচন বর্জন করে। একতরফার এই নির্বাচনে সমর্থন জানায়নি দেশী-বিদেশী কোনো সংস্থাই। ভোটারবিহীন সেই নির্বাচনের পর থেকেই বিরোধী জোট দ্রুত সবার অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।
সংবিধান অনুযায়ী দলটি এখনও দেশের প্রধান বিরোধী দল। আগামী ২৪ জানুয়ারি নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। যদিও এরই মধ্যে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।
৭১ সালে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল, তেমনি ’৭৫ সালে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন সিপাহি-জনতার অভ্যূত্থান হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হন। তিনি একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে জিয়াউর রহমান চীনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সূচনা করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশকে নিয়ে ‘সার্ক’ গঠনের উদ্যোগ তারই। ওআইসিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সংহতি জোরদার করার জন্য তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী অবদানের জন্য স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকার তাকে বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত করে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শহীদ জিয়ার জন্মদিন আজ এমন এক সময়ে উদযাপিত হতে যাচ্ছে, যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত দেশের বৃহত্তম ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি পার করছে একটি চরম ও কঠিন সময়। শহীদ জিয়ার সহধর্মিনী, বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুলশানে নিজ অফিসে আজ ১৬ দিন ধরে অবরুদ্ধ।
রাষ্ট্রের যথোপযুক্ত দর্শন ও নেতৃত্বের অনুপস্থিতি আজ স্পষ্ট। নেতৃত্ব ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার নেশায় ডুবে আছে, যা জাতিকে বারবার সঙ্কটের মুখোমুখি করছে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, দেশ ও মানুষকে নিয়ে জিয়াউর রহমান যেভাবে ভেবেছেন, কাজ করেছেন, রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করেছেন, সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশকে গুরুত্ব দিয়েছেন—এসবের মাধ্যমে তিনি এক ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসেছেন। তিনি দেশ গড়ার ভিশনকে ক্ষমতা ও সময়ের মাপকাঠির বাইরে রেখেছিলেন। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভিত্তি মূলত জিয়াউর রহমানই গড়ে তুলেছেন। এজন্য একদিকে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ও অন্যদিকে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতিতে কাজ করেছেন।
বহুদলীয় গনতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ জিয়া ছিলেন বাংলার আকাশের সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্র।স্বাধীনতা উত্তর দুর্ভিক্ষ পিড়িত জনগন শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর যখন শুধু অনিষচয়তা আর হতাশা ছাড়া আর কিছুই চোখে দেখছিলনা , ঠিক তখনই জিয়া জালিয়েছিলেন আশার আলো, বাংলাদেশের জনগন বুকে বেধেছিল অনেক বড় স্বপ্ন। কিন্তু দেশ বিরোধী ঘাতক চক্র ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র ” এর সহযোগীতায় নির্মম ভাবে শহীদ করে প্রেসিডেন্টকে। তার শাহাদাতে জাতি কলংকিত। সেদিনই আমরা সেই কলংক থেকে মুক্ত হতে পারব যেদিন আমরা গড়তে পারব জিয়ার স্বপ্নের সেই সোনার বাংলাদেশ।
আবার পঁচাত্তরের এক কালো সময়ে জিয়াউর রহমান সামনে চলে আসেন। সময় তাকে জাতীয় ভূমিকায় টেনে আনে। সেটাও ছিল এক অন্ধাকারাচ্ছন্ন সময়। সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশের বিদ্রোহে এবং আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। জাতি এক চরম সঙ্কটের মুখোমুখি হয়। এমন এক দিকনির্দেশনাহীন সময়ে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জাতীয় ভূমিকায় আবির্ভূত হন। সেখানেও তিনি নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন। কিন্তু দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা তাকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে গেছে।
সিপাহী-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’-এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে সিপাহী-জনতা। ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে এ দেশের রাজনীতির গতিপথ নতুন করে নির্মাণ করে। তত্কালীন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য রাতের আঁধারে বিদ্রোহ করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ৩ নভেম্বর সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করেন। ওইদিন জাতীয় চার নেতাকেও জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাককে পদচ্যুত করে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। ৩ নভেম্বর জিয়াউর রহমান বন্দী হওয়ার পর ৭ নভেম্বর পর্যন্ত এ চারদিন দেশ ও দেশের জনগণ দুঃসহ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে। ৬ নভেম্বর রাত প্রায় ১টার সময় সশস্ত্র বাহিনীর পুনরুত্থানবাদী চক্রের বিরুদ্ধে বীর জনগণ, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহীরা বিপ্লব ঘটিয়ে বন্দী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্নের ইতি হয়। আওয়াজ ওঠে ‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। ৭ নভেম্বর সিপাহী বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ হয়।
জিয়াউর রহমান আবার সেনাবাহিনীপ্রধানের দায়িত্ব নেন। এরপর তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যেমন উদ্যোগ নেন, তেমনি সময়ের প্রয়োজেন তিনি দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সমাজনীতি, নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই তিনি সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। রাজনীতিতে অস্থিরতা কাটিয়ে একটি সমন্বিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। সামরিক ব্যক্তি হয়েও তিনি রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। সাধারণত মিলিটারি শাসকরা রাজনীতিকদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে সামরিক সিদ্ধান্ত প্রয়োগের চেষ্টা করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান রাজনীতি ও সমরনীতির প্রভেদ বুঝতেন। দেশের একটি অন্ধকার সময়ে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পেয়ে ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া দ্বিতীয় ভাষণেই জেনারেল জিয়াউর রহমান অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়া
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহি জনতা বিপ্লবের পর তিনি রাজনীতের কেন্দ্র চলে আসেন। ১৯ শে নভেম্বর ১৯৭৬ সালে তিনি প্রধান সামরিক প্রশাষকের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সায়েমকে কৌশলে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ফেলার পর ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ অধীষ্ঠ হন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিয়া দেশে আবার গনতান্ত্রায়নের উদ্যোগ নেন। তিনি বহুদলীয় গনতন্র চালুর সিদ্ধান্ত নেন। দেশের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা সৃষ্টির আভাস দিয়ে তিনি বলেন, “I will make politics difficult for the politicians” (আমি রাজনীতিকে রাজনীতিবিদের জন্য কঠিন করে দেব)। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক বিদ্রোহে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়। ২৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাক সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ নিয়োগ করেন। নভেম্বরে পুনরায় সেনা বিদ্রোহ, খন্দকার মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত, আবূ সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রেসিডেন্ট হন। ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবে জিয়াউর রহমানকে পুনরায় সেনাবাহিনীর চীফ-অফ-স্টাফ পদের দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন এবং উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ মহিলা পুলিশ গঠন, ১৯৭৬-এ কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ ৭ জাতি গ্রুপের চেয়াম্যান পদ লাভ করে। ১৯৭৬ সালেই তিনি উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্বোধন করেন। ১৯৭৬-এর ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৬-এ গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন, ১৯৭৭-এর ২০ ফেব্রুয়ারি একুশের পদক প্রবর্তন, এপ্রিলের ২১ তারিখ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ। মে মাসে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা এবং আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠান ও হাঁ-সূচক ভোটে বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন।
জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জননির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। যে রাষ্ট্রপতি তার জীবদ্দশায় গেছেন কৃষকের পর্ণকুটিরে, শ্রমিকের বস্তিতে। গ্রামে গ্রামে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা জেনে তা সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব, দুরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তা, জনসাধারণকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করার পদক্ষেপ এবং নিজের প্রশ্নাতীত সততা তাঁকে এক যুগে তার সমসাময়িক কালের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করে। আবার ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে’র ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সব মতের মানুষের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংক্ষেপে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়া এর সভানেত্রী।‘দেশ’ ও ‘মানুষ’ই তার রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আদর্শের পরিচয় একটি বক্তৃতার মাধ্যমে আমি তুলে ধরছি। ১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ রামপুরা টেলিভিশন ভবনে বেতার ও তথ্য বিভাগের পদস্থ অফিসারদের এক সমাবেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।’ (দৈনিক বাংলা, ১৪ মার্চ, ১৯৭৬)
১৯৭৭ সালে তিনি প্রণয়ন করেন ১৯ দফা কর্মসূচি। জিয়াউর রহমান ঘোষিত এই ১৯ দফা ছিল তার উন্নয়নের মূলমন্ত্র। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়ে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তার পেছনে গাইডলাইন হিসেবে কাজ করেছে ১৯ দফা।
জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় সেনাবাহিনী’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠা দ্বারা অফিসারদের নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও তাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগাতে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন তাদের। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সামরিক বাহিনীর একটা ক্ষুদ্র গ্রুপ দ্বারা সংঘটিত অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলেও এটা সত্য যে, তিনিই সামরিক বাহিনীতে ঐক্য ও সংহতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রশস্ত্রের সমন্বয়ে এবং সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে তিনি সামরিক বাহিনীর মনোবলকে উন্নত স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্বল-শক্তিশালী সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ সবার সঙ্গে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বৈদেশিক নীতি নির্দিষ্ট ও বাস্তবায়ন করেন। জোটনিরপেক্ষ এবং ইসলামী দেশগুলো ও বিভিন্ন উন্নয়নকামী দেশের সম্মেলনে তার ব্যক্তিগত এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষ গতি সঞ্চারিত হয়। ব্যক্তিগত কূটনীতি দ্বারা তিনি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলকে তিন ভাগে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, তিনি জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্বব্যাপী শান্তির আবহ তৈরি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালিত করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটান। এর ফলেই বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তিনি উপমহাদেশের জন্য একটি স্থানীয় শান্তিকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আসিয়ানের মতো সংস্থা গড়ার উদ্যোগ নেন, যা পরবর্তীকালে সার্ক নামে প্রতিষ্ঠা পায়।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার পররাষ্ট্র নীতির আরেকটা লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সাহায্যকে উত্সাহিত করা। তার শাসনকালে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকা। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সুজান গ্রিন ঢাকা থেকে পাঠানো এক ডেসপাচে লিখেছিলেন, ‘সাম্যের প্রতীক ও সত্ লোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান স্ব্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুড়ি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ মালয়েশিয় দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই ডেসপাচে বলা হয়, ‘অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবী সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর ১৯৭৯)
ওই সময় নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংখ্যায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উত্পাদন দ্বিগুণ করার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়। কাজের জন্য জনগণকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করতে প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রায়ই গ্রামে-গঞ্জে সফর করেন। ‘জনগণের সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় বাংলাদেশী নেতা’ শিরোনামে মাইকেল টি ক্যাফম্যানের এ রিপোর্টে গ্রামাঞ্চলে সপ্তাহে তিন-চারবার সফরের সময় জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেয়া হয়।
এ সময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও বিশ্ববাসী উচ্চ ধারণা পোষণ করে। বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি বহির্বিশ্বের আস্থা সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার আরেকটা অবদান হলো নাগরিক বাহিনী গঠনের চিন্তা বাস্তবায়ন করা। তিনি এক কোটি নারী ও পুরুষকে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ দানের লক্ষ্যে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) গঠনের মাধ্যমে দেশগঠন ও নিরাপত্তায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেন।
জিয়াউর রহমানের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পদক্ষেপ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ প্রচার পেয়েছিল। জিয়াউর রহমান আমলানির্ভর প্রকল্প না করে স্থানীয় নেতাদের দ্বারা কৃষককে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এতে কৃষকের মধ্যেও ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক প্লাটফর্মে থেকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি এদেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগানোর প্রয়াস চালান। অনেকটা সফলও হন তিনি। এ জাতীয়তাবাদী দর্শনই একটি জাতি ও দেশের রক্ষাকবচ।
জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য:
সকল দলের অঃশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি; বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া; দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব; সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লেক্ষ্য স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারী সহায়তায়র সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন; গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান; গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন; গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা; হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ; ২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ কের গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ; নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত দূরীকরণ; কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তআনীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ; যুব উন্নয়ন মন্ত্রাণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ; ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্টা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃইষ্ট করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন; তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণ এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লেক্ষ্য গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন; জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ; তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি; দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ; বেসরকারিখাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ; জনশক্তি রপ্তানি, তৈরী পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যোর রপ্তানীর দ্বার উন্মোচন; শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ। যে গার্মেন্ট ও টেক্সটাইলের ওপর আমাদের অর্থনীতি আজ দাঁড়ানো, তার গোড়াপত্তন করেন জিয়া
জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার সময় সংক্ষিপ্ত—পাঁচ বছরের একটু বেশি। এই স্বল্প সময়ে তিনি যুগান্তকারী সব কাজ করে গেছেন। তাঁর সঙ্গে আমি ভারতবর্ষের ইতিহাসের সেই পাঠান সম্রাট শেরশাহের অনেক মিল খুঁজে পাই। শেরশাহের শাসনভার ছিল এমনই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু জনকল্যাণে, সাধারণ মানুষের মঙ্গলে তাঁর কীর্তিগুলো ছিল যেমন অভিনব, তেমনই অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাবের, যা আজও তাঁর দূরদর্শিতার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। জিয়া জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে একটি বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়ে গেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, নারী, শিশু—সবকিছুতেই একটা বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন। গোটা জাতিকে তিনি একাত্তরের মতো একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। একটি দৃঢ় জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। পরিচয়-সংকটে আক্রান্ত হীনম্মন্যতায় ভোগা জাতিকে তার সত্যিকারের পরিচয় এবং তার আপন স্বাধীন স্বকীয়তার পরিচিতি তিনি উন্মোচন করতে পেরেছিলেন। সে পরিচিতি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে রসায়ন, তারই আবিষ্কার তিনি ঘটিয়ে ছিলেন। নাম দিয়েছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত তাঁর মন, মনন ও চেতনা—তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। তাই তাঁর প্রিয় গান, যা তিনি আপন মনে গুন গুন করে গাইতেন, ‘আমার জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ।’
১৯৮১ সালের ৩০শে মে গভীর রাতে সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন।
চট্রগ্রামে বিএনপির উপদলীয় কোন্দল নিরসনের লক্ষ্যে ২৯ মে সকালে পতেঙ্গা বিমান বিন্দরে পৌছলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। তার সফরসঙ্গী ছিলেন বি চৌধুরি, মহিবুল হাসান, নাজমুল হুদা, ড: আমিনা , নৌ বাহিনীর প্রধান এম এ খান প্রমুখ। চট্রগ্রাম সার্কিট হাউজে হাল্কা নাস্তা সেরে বারান্দায় আলোচনায় বসলেন বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে । বেলা সাড়ে বারটার দিকে জুম্মা নামাজের বিরতি । সাদা পাঞ্জাবি -পায়জামা পরে চকবাজারের নন্দনপুরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন জিয়া। নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লীদের সাথে কুশল বিনিময় করে ফিরে আসলেন সার্কিট হাউজে । দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দুপুরের খাবার সেরে ঘন্টা দেড়েক বিশ্রাম নেন । বিকালে চবির ভিসি, অধ্যাপকবৃন্দ, আইনজীবি, সাংবাদিক প্রমুখ আগত অতিথীদের সাথে আড়াই ঘন্টা আলাপ করেন । তারপর স্থানীয় বিএনপির দুই উপদলের সাথে আলাদাভাবে রাত ৯ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত আলোচনা করেন । এর মধ্যে চট্রগ্রামের ডিসি ও পুলিশ কমিশনারের সাথে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন । রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসক লে কর্নেল মাহতাবুল ইসলাম তার খাবার পরখ করে শেষ করলে রাত ১১টার একটু পরে জিয়াকে রাতের খাবার দেয়া হয় । ডিনার শেষে ঢাকায় তার স্ত্রী খালেদার সঙ্গে টেলিফোনে মিনিট পনেরো কথা বলেন জিয়া । জীবনের আলো নিভে যাবার ৫ঘন্টা আগে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমুতে গেলেন জিয়া । নিশ্চিন্তে বিছানায় নিদ্রায় গেলেন তিনি । ওদিকে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করতে এগিয়ে আসছে ঘাতক দল । বাইরে তখন তুমুল ঝড় বৃষ্টি আর বিদ্যুতের ঝলকানি ।
রাত আড়াইটার দিকে কালুরঘাটস্থ রেডিও ট্রানসমিটারের কাছে হাজির হল ঘাতক দল । ঘাতকদলের নেতৃত্ব দেয় লে. কর্নেল মতিউর রহমান । ঘাতকদল তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমন পরিচালনার পরিকল্পনা নেয় । মতি থাকল দ্বিতীয় দলে যারা প্রথমদলকে পেছন থেকে সহায়তা দিবে । রাত সাড়ে তিনটার সামান্য কিছু পরে দল তিনটি প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে এগুতে থাকে । ঘাতকদল বিনাবাঁধায় সার্কিট হাউজে ঢুকে পড়ে । ভীতি সঞ্চার করতে রকেট ল্যান্সার থেকে ফায়ার ও গ্রেনেড চার্জ করা হয় আর মেশিনগানের গুলি চালানো হয় । পাহারারত ৪৪ জন পুলিশের ১ জন নিহত, ১২ জন আহত ও বাকিরা আত্মগোপন করেন । রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যরা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল । যে দুজনের রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে পাহারা দেবার কথা তাদের আগেই খতম করে দেয়া হয় । রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজ দু'তলায় রাষ্ট্রপতির শয়নকক্ষের পেছনের কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন । রকেটের আওয়াজে তারা জেগে উঠে । রাষ্ট্রপতিকে বাচাতে তারা তাদের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পাবার আগেই ঘাতকদের গুলিতে নিহত হন । ঘাতকদলটি ঐ সময় দুতলায় রাষ্ট্রপতির ৯ নম্বর কক্ষ খুজতে শুরু করে । ঘাতকদলের একজন ঐ কক্ষের দরজা ভেঙ্গে ফেলতেই ঘরে ড. আমিনাকে আবস্কার করেন । ফলে রাষ্ট্রপতির খোজে ওরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকে । তারা ইতিমধ্যে বুঝতে পারে রাষ্ট্রপতি আছেন ৪ নম্বর রুমে । ঘাতকদলের একজন ঐ কক্ষের বারান্দার দিকে দরজা লাথি দিতে ভাঙ্গতে চেষ্টা করে ।
গোলাগুলি আর চিৎকার চেচামেচিতে উঠে বসলেন চকিতে জিয়া ।
কি ব্যাপার ? ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে বেরিয়ে এলেন দরজা খুলে , পরনে রাতে শয্যার পোষাক । গভীর আত্মপ্রত্যয় আর অগাধ আস্থা নিয়ে বেরিয়ে এলেন ।
কি চাও তোমরা?
কাছে দন্ডায়মান লে. মোসলেহউদ্দিন রীতিমত ঘাবরে যান । সে জিয়াকে আশ্বস্ত করে-‘‘স্যার আপনি ঘাবরাবেন না । এখানে ভয়ের কিছু নেই ।’’
মোসলেহউদ্দিনের ঠোট থেকে জিয়ার প্রতি আশ্বাসবানী মিলিয়ে যাবার আগেই লে. কর্নেল মতিউর রহমান তার এসএমজি থেকে অতি কাছ থেকে ব্রাশ ফায়ার করেন জিয়ার শরীরের ডানদিক একেবারে ঝাঝরা করে ফেলে । দরজার কাছেই মুখ থুবরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া । এরপর মতি তার বন্দুকের নল দিয়ে জিয়ার প্রাণহীন দেহ উলটিয়ে নেয় । তারপর ক্ষিপ্তপ্রায় মতি জিয়ার মুখমন্ডল আর বুকের উপর তার এসএমজির ট্রিগার টিপে রেখে ম্যাগাজিন খালি করে তার খুনের নেশা মেটায় । আনুমানিক চার থেকে সাড়ে চারটায় জিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে । জিয়াকে খুন করে ঘাতকদল ঝটপট সার্কিট হাউজ ছেড়ে চলে যায় ।
জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে দাফন করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে যেখানে প্রায় ২০ লক্ষ্যাধিক মানুষ সমবেত হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের জনগণের মাঝে অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। গণমানুষের এ শোক জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নীতির প্রতি দেশবাসীর ব্যাপক সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ক্ষনজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। নানা কারণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তার সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম,পরিশ্রমপ্রিয়তা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণাবলি এ দেশের গণমানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তার যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে তা জোটেনি। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার ওপর ছিল প্রচণ্ড আস্থাশীল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার ওপর মানুষের এই আস্থায় কোনো চিড় ধরেনি।
জাতির বর্তমান দুর্বিসহ ক্রান্তিকালে মেজর জিয়ার মতো একজন কালজয়ী বহুদলীয় গণতন্ত্রের কান্ডারীর নিরন্তর প্রয়োজন।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম , জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহবায়ক