Monday, June 22, 2026

ভারতের সঙ্গে ‘বড় অস্ত্র চুক্তির পথে’ আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে ভারত তাদের কিছু প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করছে। চারটি ভারতীয় সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারত আমিরাতের কাছে যেসব অস্ত্র বিক্রি করতে পারে তার মধ্যে রয়েছে, দেশটির সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রহ্মস। এ ছাড়া ভারতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশতীর বিক্রির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি সম্পৃক্ত দুইটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্রগুলো বলছে, দেশ দুইটির মধ্যে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অস্ত্র কেনার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। তবে ভারত সরকার বা আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
ব্রহ্মস হলো, ভারত ও রাশিয়ার যৌথভাবে নির্মিত বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এটি স্থল, সমুদ্র ও আকাশ- তিন ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায়।

অন্যদিকে আকাশতীর হলো- ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (বিইএল) এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে তৈরি একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সময় ইরানের ব্যাপক হামলার শিকার হয়েছে আমিরাত। তাই পরবর্তী হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমিরাত ভারত ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার কথা বিবেচনা করছে। এ ছাড়া দেশটিকে জ্বালানি প্রবাহের জন্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকেও সুরক্ষা দিতে হবে।
চলতি বছরের শুরুতে আমিরাত দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রসারের লক্ষ্যে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া বলেন, আমিরাত যদি বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র কেনে, তাহলে তাদের জন্য একটি বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি হয়। এর ফলে তারা কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কৌশলগতভাবে বেশি স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্কের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমিরাতের বিদ্যমান জোট সম্পর্কের কোনো বিরোধ বা উত্তেজনা তৈরি হবে না।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ। ওই সময়ে মোট আমদানির প্রায় ৫৪% এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর পরের অবস্থানে ইতালি (১২%) এবং তৃতীয় অবস্থানে ফ্রান্স (১১%)।
আমিরাতের কাছে কোনো ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির আগে ভারতের রাশিয়ার অনুমোদন প্রয়োজন হবে, কারণ ২৯০ কিলোমিটার (১৮০ মাইল) পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটি যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, আবুধাবির সঙ্গে মস্কোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এটি কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।

সিপ্রির অস্ত্র স্থানান্তর কর্মসূচির সিনিয়র গবেষক সাইমন ওয়েজম্যান বলেন, ভারতের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রহ্মস এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশতীর- দুটিই আমিরাতের চাহিদা পূরণে সক্ষম হতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি আমিরাতের ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার ও ক্রয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, ফলে তাদের জন্য বিকল্প সরবরাহকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।

জোরদার হচ্ছে ভারত-আমিরাত সম্পর্ক
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) তথ্য অনুযায়ী, আমিরাতের বর্তমান অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বেশ কিছু উন্নত অস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মার্কিন তৈরি এমজিএম-১৬৮ এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র। যার সর্বোচ্চ কার্যকর পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার।
এ ছাড়া দেশটির কাছে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক থাড মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের তৈরি আকাশতীর দেশটির এই বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে আকাশপথে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও আমিরাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে একাধিক চুক্তি এবং যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির একটি চুক্তি সই হয়েছে।

ভারত সরকারের দুইটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের প্রধান অস্ত্র ব্যবস্থা বিক্রির বিষয়ে আমিরাতের সঙ্গে চলমান আলোচনা শুধু একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক জোট ও শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনের প্রমাণ।
সূত্রগুলোর মতে, এই পদক্ষেপকে ভারত দেখছে একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে- বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির পাল্টা ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে।
পার্ল পান্ডিয়া বলেন, এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত, বিশেষ করে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষিতে।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, ভারত ও আমিরাতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো মূলত একটি কৌশলগত বার্তা প্রদানের মাধ্যম। অর্থাৎ, এটি শুধু অস্ত্র বা বাণিজ্যের বিষয় নয়, বরং দুই দেশই এই সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের জোট ও অংশীদারিত্বের শক্তি এবং গভীরতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শন করছে।

ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের চার দিনের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের সময় প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় ভারতের সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্রহ্মস। এই ব্যবহার আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্ত্রের প্রতি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
ভারতীয় সূত্রগুলো বলছে, এরপর থেকে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ব্রহ্মস বিক্রির চুক্তি হয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও চিলি এই অস্ত্র কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসগুলো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে ভারপ ২০২২ সালে ফিলিপাইনের কাছে প্রথম ব্রহ্মস বিক্রি করেছিল
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩–১৪ সালে দেশটি প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল মাত্র ৭.২৬ মিলিয়ন ডলার, সেটি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে ‘বড় অস্ত্র চুক্তির পথে’ আরব আমিরাত

ইসরাইলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়েছে ইরান by হামিদ দাবাশি

যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর কিছু অপরাধমূলক দলিল আবার খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যখন ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজি করাতে নানা যুক্তি তুলে ধরছিল, তখন জায়নবাদী লেখক ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলামিস্ট ব্রেট স্টিফেনস তার বিভিন্ন লেখায় এমন এক ইসরাইলকে জোরালো সমর্থন দিতে থাকেন, যে দেশটি মানুষকে ধর্ষণের জন্য কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেয়। তিনি তার এক কলামে যুদ্ধে শিগগিরই পরাজিত হতে যাওয়া ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কী কী অর্জন করা উচিত, তার একটি তালিকাও তুলে ধরেন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ব্রেট স্টিফেনসের সেই বিভ্রান্তিপূর্ণ এবং ভারসাম্যহীন কলামটি আবার খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তিনি তার লেখায় ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের বিজয়ের চারটি পরিস্থিতি কল্পনা করেছিলেন। প্রথমটি ছিল ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, যা তার মতে ‘কারো উপেক্ষা করা উচিত নয়, বিশেষ করে যদি ইরান সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্রমাগত বিধ্বস্ত হতে থাকে এবং সম্ভবত নেতৃত্বের আরো উচ্চস্তর হারাতে থাকে’।

দ্বিতীয়টি ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন—‘এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যা বহাল থাকবে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দাবি মেনে চলবে’। তিনি লিখেছেন, ইরানের বিচ্ছিন্নতা ‘বিশেষভাবে প্রকট হবে যদি মার্কিন বাহিনী খার্গ দ্বীপ দখল করে... যেটি ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানির টার্মিনাল হিসেবে কাজ করে।’

তৃতীয়টি ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে এবং চতুর্থটি ছিল ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের পতন। এর সবচেয়ে উদ্বেগজনক রূপটি হতে পারে ১৩ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময়কার সিরিয়ার মতো, যেখানে ইরানের কিছু এলাকায় শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে, অন্য জায়গায় এর পতন ঘটবে, যে পরিস্থিতি বিদেশি হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানাবে এবং ব্যাপক মাত্রায় হত্যাকাণ্ডের দিকে নিয়ে যাবে। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় শরণার্থীর ঢল নামবে...।’

ইসরাইল হেরেছে, ইরান টিকে গেছে

ব্রেট স্টিফেনসের ওই জঘন্য কলামটি হলো সেই বিভোর জায়নবাদীদের গণহত্যামূলক মানসিকতার এক ঐতিহাসিক দলিল, যাদের এ শহরে প্রতি সপ্তাহে পত্রিকাটির একটি পুরো কলাম দেওয়া হয় অন্য জাতিগুলোর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য। এ কাজটিকে তারা মনে করেন গণহত্যায় লিপ্ত ইসরাইলের সর্বোত্তম স্বার্থে, যে দেশটিকে রক্ষার জন্য তাদের অর্থ দেওয়া হয়।

কিন্তু বাস্তবে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান এবং মিসরে প্রায় ৮০ বছরের গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ভূমি দখলের পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে ইসরাইল। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিনির ইচ্ছা ও বিচারবুদ্ধির বিরুদ্ধে গিয়ে এই যুদ্ধে বোকা ও গুন্ডা ট্রাম্পকে টেনে এনেছিল। কিন্তু তারপরও ইসরাইল এই যুদ্ধে হেরেছে। তাদের মোসাদ ও হাসবারা, তাদের আইপ্যাক ও অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগ (এডিএল), তাদের কেনা আমেরিকান রাজনীতিবিদ, তাদের ইরানি রাজতন্ত্রবাদী দালাল এবং হুভার ইনস্টিটিউশন ও অন্যান্য স্থানে তাদের দালাল থিংক ট্যাংকাররা সবাই মিলে ইরানের কাছ থেকে শোচনীয় এক পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে উল্টো ইরান আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে। দেশটির শাসনব্যবস্থা অক্ষত আছে, পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর এর সার্বভৌম অধিকার বহাল আছে এবং এর ভৌগোলিক অখণ্ডতা মূল্যবান হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ইসরাইল ট্রাম্পকে বোকা বানিয়ে আমেরিকার সাহায্য নিয়ে ইরানের নাগরিক অবকাঠামো, সাংস্কৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র ধ্বংস করতে এবং মিনাব স্কুলের নিরীহ শিশুদের গণহত্যাসহ অনেক কিছু করেছে। কিন্তু বিজয় শেষ পর্যন্ত ইরানেরই হয়েছে।

সারা বিশ্ব যখন ইসরাইলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখছিল, তখন নিউ ইয়র্ক টাইমসের ইসরাইলপন্থি দুই কলামিস্ট টমাস ফ্রিডম্যান ও ব্রেট স্টিফেনস ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা ভন্ডুল করার মরিয়া চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন, যাতে এটি প্রমাণ করা যায়, বসতি স্থাপনকারী এই শয়তান উপনিবেশটি ভুক্তভোগী হিসেবে একটি ন্যায়সংগত সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। ইরানকে একটি জঘন্য শাসনব্যবস্থা হিসেবে দানবীয় রূপে তুলে ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমস মার্কিন জনগণকে এই বিশ্বাস করাতে চাইছিল, ইরান শয়তান আর ইসরাইল ন্যায়পরায়ণ একটি দেশ।

আমেরিকানদের জন্য এক বিজয়

প্রভাবশালী আমেরিকান গণমাধ্যমের কথা শুনলে মনে হবে, ট্রাম্প সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং তারপর শান্তি আলোচনার সময় ঔদ্ধত্যের সঙ্গে ইসরাইলকে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়েছেন। কিন্তু ঘটনাটি সম্পূর্ণ উল্টো। নেতানিয়াহু এবং মোসাদ প্রধান ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে যোগ দিতে প্ররোচিত করেছে এবং ইরান ও লেবাননে ক্রমাগত বোমা হামলা করে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ট্রাম্প আমেরিকান জনগণের অদম্য ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে ইসরাইলকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং মার্কিনিদের সর্বোত্তম স্বার্থে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ মার্কিন জনগণ এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এটি অবৈধ যুদ্ধ ছিল, যার অনুমোদন মার্কিন কংগ্রেস দেয়নি। সুতরাং এ বিজয় ইরানের ও আমেরিকান জনগণের বিজয়।

যুদ্ধে পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর ইরানের অবিচ্ছেদ্য অধিকার ভেঙে পড়েনি। তারা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে, নৃশংস ইসরাইলি বোমারু বিমানের আঘাত সহ্য করেছে এবং কঠোর পাল্টা আঘাত হেনেছে। ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেখে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ আনন্দিত হয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা করে সেগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি তারা তাদের তুরুপের তাস হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দিয়েছে।

গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার মতোই ইরান যুদ্ধও পুরো বিশ্বকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। একের পর এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইল আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত ঔপনিবেশিক সত্তা। জরিপ অনুসারে, এই ফল ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ র‍্যাংকিংয়ের একেবারে তলানিতে স্থান দিয়েছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ‘আমেরিকানদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইসরাইল ও নেতানিয়াহু সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত বাড়ছে।’ জরিপগুলো ইঙ্গিত দেয়, ৬০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যা গত বছর ছিল ৫৩ শতাংশ। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই ৫০ বছরের কম বয়সি ভোটারদের অধিকাংশ এখন ইসরাইল এবং নেতানিয়াহুকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে।

ইরানিরা এই যুদ্ধে জিতেছে, আমেরিকান পণ্ডিতদের ভাষ্যমতে, এই যুদ্ধ ইরানিদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত উপনিবেশবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তুলেছিল। তারা সর্বদাই একই সঙ্গে বিদেশি আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা করে যাবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা ইরানিদের তাদের সরকারের সমালোচনা করার এবং তাদের নাগরিক স্বাধীনতা ও অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার রক্ষার অধিকার আছে। তাদের সংবিধানে বর্ণিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের অধিকার, স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন ও নারী অধিকার দাবি এবং তা আদায় করার আন্দোলন অব্যাহত রাখার পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। এসব বিষয়ে কারোরই দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই।

এগুলো ইরানিদের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার। কিন্তু এগুলো শুধু তখনই অর্জন করা যাবে, যদি তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা বজায় থাকে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে হত্যাকারী মোসাদের এজেন্টদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করা হয় এবং নিরীহ শিশু ও নাগরিক অবকাঠামো লক্ষ করে চালানো ইসরাইলি-মার্কিন নৃশংস বোমা হামলা বন্ধ করা হয়।

বর্তমানে অন্যান্য জাতির মতো ইরানিদের সামনেও এক দীর্ঘ ও বিপৎসংকুল পথ রয়েছে, যেখানে তাদের নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত করাই আজ সবচেয়ে মৌলিক এবং বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা। যে সরকারই শাসন করুক না কেন, জনগণের এসব মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করা তাদের আবশ্যিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

* মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী

ইসরাইলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়েছে ইরান

হরমুজ থেকে লেবানন: সংকট নিরসনে যে রোডম্যাপে এগোবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনার প্রথম দিন শেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় ‘উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি’ হয়েছে।

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৮ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও।

উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা

কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি রাজনৈতিক তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। আগামী দুই মাসে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত কারিগরি আলোচনাও চলবে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সমঝোতার তুলনায় কারিগরি বিষয়গুলোর সমাধান আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে পারবে কি না, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ কী হবে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিধি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিক বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত অপসারণ বা এর মাত্রা কমানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এতে হাজারো বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখতে চাইছে, যা ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ

দুই দেশ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাত এড়াতে একটি বিশেষ যোগাযোগ লাইন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর লক্ষ্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা।

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরানের কার্যত অবরোধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও সংকট দেখা দেয়।

ভ্যান্স জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতি তদারকি এবং হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের জন্য পৃথক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।

লেবাননের জন্য ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রচেষ্টা জোরদার করতে ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লেবাননের যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে ‘বড় ধরনের অগ্রগতির’ কথা উল্লেখ করলেও তিনি বলেন, এই ব্যবস্থার কার্যকারিতাই হবে চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, প্রয়োজন মনে করা পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করবে। বর্তমানে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত বাফার জোন লেবাননের প্রায় ৬ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত।

এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের প্রধান ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন ত্যাগের আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকলে ইসরায়েলকে ‘অপমানজনক পরাজয়ের’ মুখে সরে যেতে হবে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, লেবানন ও ইসরায়েল সরাসরি আলোচনায় অংশ না নেওয়ায় এই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ জটিল হতে পারে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জোয়ি হুডের মতে, এতে লেবানন ইস্যুতে ইরানের প্রভাব আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তবে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ শহর থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য বলছে, সেখানে আপাতত সতর্ক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যুদ্ধবিরতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জব্দ সম্পদ মুক্তির ইঙ্গিত

আব্বাস আরাঘচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। পাশাপাশি অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করা এবং ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু করার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে বলে তিনি জানান।

থমাস ওয়ারিকের মতে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ কংগ্রেসের অনেক সদস্য বর্তমান চুক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট নন।

ভ্যান্স বলেন, ইরানের অবমুক্ত সম্পদের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনায় ব্যবহার করা হলে তা মার্কিন কৃষকদের উপকারে আসবে এবং একই সঙ্গে ইরানের জনগণের খাদ্যচাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি

ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের আবারও দেশে প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তিনি এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।

তার মতে, এটি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পথে প্রথম ধাপ হতে পারে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় আইএইএ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তদারকি করত। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরান আইএইএ পরিদর্শকদের প্রবেশও সীমিত করে দেয়।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান বিরোধের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজেদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানালেও ইরান বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তৃতীয় কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর বা ইরানের ভেতরেই এর মাত্রা কমিয়ে আনার বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। 

ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনায় মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান। ছবি : সংগৃহীত
ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনায় মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান। ছবি : সংগৃহীত

ট্রাম্পের কস্তানজা মতবাদ: বুদবুদের জগত, যেখানে তিনিই রাজা by নেভো কোহেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে নানা মন্তব্য প্রচলিত রয়েছে। কখনো তাকে বলা হয়েছে অজ্ঞ, স্বৈরাচারী ও আত্মকেন্দ্রিক। আবার কখনো তাকে বর্ণনা করা হয়েছে বুদ্ধিমান, কৌশলী, সাহসী ও বিপ্লবী হিসেবে।

ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে চেনার সুযোগ না থাকলেও তার সম্পর্কে জানা যায় তার বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং বিভিন্ন ভিডিও থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।

‘ট্রাম্পের নিজস্ব বাস্তবতার জগৎ’

ট্রাম্প নিজের চারপাশে একটি আলাদা বাস্তবতার জগৎ বা ‘বুদবুদ’ তৈরি করেছেন, যেখানে তিনি নিজেই প্রধান চরিত্র। এই কল্পিত জগতে তিনি গল্পের কেন্দ্রবিন্দু, আর অন্য সবাই তার সহায়ক চরিত্র মাত্র।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি নিজেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ও কেন্দ্র হিসেবে দেখেন। যেখানে তিনিই কারণ, তিনিই ফলাফল। তার চারপাশের মানুষ এবং পুরো মানবজাতি কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকে।

‘সাফল্যের নিজস্ব সংজ্ঞা’

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে তিনি সবসময়ই বিজয়ী। এবার বাস্তবতার সঙ্গে তার অবস্থার মিল থাকুক বা না থাকুক। নিজের চোখে তিনি সফল, বুদ্ধিমান এবং শক্তিশালী।

তার ব্যবসায়িক জীবনের বিভিন্ন ব্যর্থতা, ঋণ ও দেউলিয়াত্ব সত্ত্বেও তিনি নিজেকে সফল ব্যবসায়ী হিসেবেই দেখেছেন বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

‘কল্পিত বিজয়ের ধারণা’

ট্রাম্পের কাছে বাস্তব সত্যের চেয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন এক মানসিক কাঠামোর মধ্যে থাকেন যেখানে তিনি যা বিশ্বাস করেন, সেটিই সত্য হিসেবে কাজ করে।

এ প্রসঙ্গে জর্জ কস্টানজার একটি বিখ্যাত ধারণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এটি মিথ্যা নয়, যদি আপনি সত্যিই তা বিশ্বাস করেন’। এটি ট্রাম্পের চিন্তাভাবনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানকে ট্রাম্প নিজের দৃষ্টিতে সফলতা হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এটি একটি কৌশলগত ব্যর্থতা হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন সৌদি আরব, উপসাগরীয় দেশগুলো, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করতে পারে।

এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

‘নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা’

বর্তমান পরিস্থিতি একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং বিভিন্ন শক্তি নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে।

ইতিহাস ভবিষ্যতে এই সময়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে, যদিও ট্রাম্প হয়তো সেটিকেও নিজের বিজয় হিসেবেই ব্যাখ্যা করবেন।

* লেখক : নেভো কোহেন; ইসরায়েলি রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং প্রচার ব্যবস্থাপক। (শীর্ষস্থানীয় হিব্রু গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের সংবাদবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়াইনেট নিউজে এই কলামটি লেখা হয়।) 

ছবি : সংগৃহীত

ইরান দিয়েছে ১২ গোল, যুক্তরাষ্ট্র ২ গোল by হাসান ফেরদৌস

মাত্র কয়েক দিন আগেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতাদের উন্মাদ ও নরাধম (‘স্কামব্যাগ’) নামে অভিহিত করেছিলেন। সে দেশের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে দুষ্টব্যক্তি’ নামে অভিহিত করেছিলেন। অশোভন ভাষায় ইরানি নেতাদের ঢালাওভাবে ‘ক্রেজি বাস্টার্ডস’ বলে বিষোদ্‌গার করেছিলেন।

সেই বদ্ধ উন্মাদ ও নরাধমদের সঙ্গেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প। কথা ছিল উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়ে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ নতুন সংঘর্ষের কারণ তা বাতিল হয়ে গেলে ট্রাম্প নিজেই জেনেভায় জি-৭ শীর্ষ বৈঠকের এক ফাঁকে কলম নিয়ে সেই চুক্তি করলেন।

প্রায় সব ভাষ্যকারের বিবেচনায় ইরানের জন্য এই চুক্তি—হোক না তা সাময়িক—বিশাল বিজয় এনে দিয়েছে। যুদ্ধ করে ইরান যা করতে পারেনি, পারা সম্ভবও ছিল না, ঠিক সেই অসম্ভবটি সম্ভব হয়েছে। মাত্র ৬০ দিনের জন্য স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকের ফলে ইরানের সমুদ্রসীমায় মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হচ্ছে, সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন নৌসেনা। পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা। যে বিপুল পরিমাণ ইরানি অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জব্দ করা হয়েছে, তাও ফিরিয়ে দেওয়া হবে। শুধু তা–ই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার ফলে ইরানে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা মেটাতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ‘বিনিয়োগ তহবিল’ গঠিত হবে।

এই স্মারক সমঝোতা অনুসারে, শুধু এই দুই দেশের মধ্যে সব হানাহানি বন্ধ হবে তা–ই নয়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলাও বন্ধ হবে। বলা হয়েছে, ইসরায়েল লেবাননের সার্বভৌমত্ব মেনে চলবে, যদিও দেশটি এই চুক্তিপত্রের অংশীদার নয়।

অন্যদিকে ইরান দুটি সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণে সম্মত হয়েছে তারা অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং কখনোই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করবে না এই মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।

ইরান সব, যুক্তরাষ্ট্র কাঁচকলা

এই চুক্তিতে মোট ১৪টি ধারা রয়েছে। ফুটবলের ভাষায় বলতে হয়, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান দিয়েছে ১২ গোল, যুক্তরাষ্ট্র ২ গোল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই বলছেন, এই চুক্তির ফলে ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র আত্মসমর্পণ করল। রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি বলেছেন, হায় হায়, এমন আত্মঘাতী চুক্তি ট্রাম্প কীভাবে স্বাক্ষরে সম্মত হলেন! তাঁর আরেক সমর্থক সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, এমন চুক্তিকে সমর্থন করা যায় না। এদের মনোভাবের সারাংশ মিলবে ট্রাম্পের ঘোর সমর্থক নিউইয়র্ক পোস্ট পত্রিকায়, যার প্রথম পাতায় শিরোনাম হলো—এই চুক্তি ইরানকে সব দিয়েছে, আমেরিকা পেয়েছে কাঁচকলা।

ইসরায়েলের মিডিয়া ও রাজনৈতিক নেতারা যা বলেছেন তার তুলনায় এসব সমালোচনা অবশ্য বলতে গেলে নস্যি। ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ‘বিবি’ নেতানিয়াহু ও আমেরিকায় ইসরায়েলি যুদ্ধবাজ লবি। নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন, ট্রাম্পের কাঁধে বন্দুক রেখে ইরান নামক এই ‘বিষধর সাপটি’ (উপমাটি অবশ্য সৌদি বাদশা আবদুল্লার) চিরতরে নাশ করা যাবে। অথচ দেখা গেল, সাপ তো মরলই না, উল্টো তাঁর নিজের লাঠিটিই ভেঙে খানখান। প্রকাশ্যে কিছু বলার ক্ষমতা তাঁর নেই, ট্রাম্প যা বলবেন তার বিরুদ্ধাচরণ করে টিকে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ক্ষিপ্ত নেতানিয়াহু সহকর্মীদের বলেছেন, এটি ট্রাম্পের চুক্তি, ইসরায়েলের নয়। বেসবলের উপমা ব্যবহার করে তিনি বলেছেন, এই চুক্তির ফলে ইরান ‘হোম রান’ করল। অর্থাৎ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে গোহারা হারাল।

অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নেতানিয়াহু চাইলে পুরো চুক্তিটি বানচাল করতে পারেন। তাঁর হাতের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হলো লেবানন। সে বিবেচনা মাথায় নিয়ে নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক বিবৃতিতে তিনি ইসরায়েলি নেতাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব। তিনি বলেছেন, যে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আপনাদের দেশকে রক্ষা করা হলো, ভুলে যাবেন না তার দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে আমেরিকা থেকে।

কোনো সন্দেহ নেই, যে ফন্দি নিয়ে ট্রাম্প ইসরায়েলকে বগলদাবা করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তার কোনোটাই অর্জিত হয়নি। সুপরিচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জেরেমি স্কেহিল ‘ডেমোক্রেসি নাও’ পডকাস্টে বলেছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন খুব সহজেই ইরানের বিপ্লবী সরকারকে হটিয়ে তাঁদের পছন্দমতো সরকার ক্ষমতায় বসাবেন এবং সে দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে ইতি টানবেন। বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি।

ইরান যদিও বলছে সে পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না—যে কথা সে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তিতেও বলেছিল—কিন্তু পারমাণবিক শক্তি শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করবে না, সে কথা সে কখনোই বলেনি। হয়তো মেনেও নেবে না। স্কেহিলের কথায়, পারমাণবিক অস্ত্র প্রশ্নে ইরানের প্রতিশ্রুতিকে ট্রাম্প মস্ত এক বিজয় বলে দাবি করছেন বটে, কিন্তু সে কথা তো ইরান ২০১৫ সালে ওবামা আমলের চুক্তিতেই বলেছিল। তাহলে এত অর্থ-অস্ত্র-লোকবল ক্ষয় করে যুদ্ধ কেন? আর হরমুজ প্রণালি তো যুদ্ধের আগে খোলাই ছিল। স্কেহিলের কথায়, এটা একটা ‘ম্যানুফাকচারড ভিক্টরি’ বা কৃত্রিম বিজয় ছাড়া অন্য কিছু নয়।

আরও বিস্ময়ের কথা, একসময় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি বাতিলের জন্য ট্রাম্প গোঁ ধরেছিলেন। এখন উল্টো গান শোনাচ্ছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরানের প্রতিবেশীদের যদি ব্যালিস্টিক মিসাইল থাকে, তাহলে ইরানের কেন থাকবে না? একই কথা পারমাণবিক অস্ত্র নিয়েও বলা যায়, যদিও ট্রাম্পকে সে প্রশ্নে কেউ চেপে ধরেনি।

কেন ট্রাম্প রাজি হলেন

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, যে চুক্তি প্রশ্নে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকেরা, বিশেষত ইসরায়েল, এমন কঠোর নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে, তা জেনেও তিনি কেন এমন চুক্তিতে সম্মত হলেন? স্পষ্টতই প্রধান কারণ রাজনৈতিক। কয়েক মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। জনমত জরিপ থেকে স্পষ্ট, এই যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির যে বেহাল অবস্থা, তার জন্য আমেরিকার অধিকাংশ মানুষই ট্রাম্পকে দায়ী করছে। সব আগাম হিসাব-নিকাশে থেকে মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি ঠেকানো কঠিন—কঠিন কেন, অসম্ভব—হবে। তবু শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি যুদ্ধের রাশ টেনে ধরলেন। তাঁর বিশ্বাস, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেই তেলের দাম কমবে, তাঁর ওপর চাপ কমে আসবে।

অন্য কারণ, যা তিনি গত সপ্তাহে জি-৭ শীর্ষ বৈঠকে নিজেই বলেছেন। তাঁর কথায়, আমি চাই না আমার দশা হার্ভাট হুভারের মতো হোক। পাঠকের মনে থাকতে পারে, ১৯২৯-এ যে মন্দাবস্থা আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের ওপর জাঁকিয়ে বসে, ভুল হোক বা ঠিক হোক তার জন্য সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হার্ভাট হুভারকে দায়ী করা হয়। ট্রাম্প ভালো করেই জানেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে সত্যি সত্যি ১৯২৯-সালের মতো অবস্থা হতে পারে। তিনি চান না পৃথিবী তাঁকে হুভারের মতো বাঁকা চোখে স্মরণ করুক।

এই চুক্তি টিকবে তো

বাজি ধরতে হলে বলতে হয়, টেকা-না টেকার সম্ভাবনা ৫০/৫০। ইরান যদি স্মারক সমঝোতার প্রথম ৬০ দিনে বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর তার শর্ত পালন না করে তাহলে ফের যুদ্ধ শুরুর আগাম হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। তবে এই চুক্তি ভন্ডুলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি যে কারণে তা হলো ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু। অনেকেই বলছেন, নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্যই নেতানিয়াহু লেবানন প্রশ্নে এই চুক্তির শর্ত মেনে চলবেন না। তিনি লেবানন থেকে সৈন্য সরিয়ে আনার ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী নন, এ কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত লেবাননে হামলা বন্ধ করেনি ইসরায়েল। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।

ট্রাম্প যদি এই চুক্তি ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে হবে, এমন কথা বলেছেন কট্টরপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।

অন্য কারণ ট্রাম্প নিজে। তিনি যদি ভাবেন এই চুক্তির ফলে তিনি রাজনৈতিকভাবে ঠকে গেলেন, তাহলে যেকোনো মুহূর্তে ‘এই চুক্তি বাতিল’ বলে লাফিয়ে উঠতে পারেন।

যেখানে আশার আলো

এই চুক্তি যদি টিকে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যেতে পারে, ক্রমাগত যুদ্ধ অথবা যুদ্ধাবস্থা থেকে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে পারে।

এই চুক্তি ইরানকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করবে, সে কারণে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও উদ্বিগ্ন। কিন্তু প্রতিবেশী এই দেশের সঙ্গে অব্যাহত উত্তেজনার বদলে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অনেক বেশি জরুরি, এ কথা উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পেরেছে। আরব আমিরাতের দৈনিক খালিজ টাইমস লিখেছে, এই চুক্তির পর আমরা এখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বড়সড় যুদ্ধের বদলে আমরা যে এখন শান্তির কথা বলছি, তা সমালোচনার বদলে উদ্‌যাপন করা উচিত।

যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিলের কথা এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তার সিংহভাগই আসবে এসব দেশ থেকে। ইরানের অর্থনীতির যে বেহাল অবস্থা, তাতে এই মোটা অঙ্কের টাকা তাদের খুব উপকারে আসবে তাতে সন্দেহ নেই। সে কারণে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের ধারণা, ইরান নিজ থেকে এই চুক্তি ভাঙবে না।

বিগত ৪৭ বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কার্যত যুদ্ধাবস্থার মধ্যে থেকেছে। সেই পরিস্থিতি বদলে গেলে শুধু এই অঞ্চলের নয়, সারা বিশ্বেই তার বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। হরমুজ প্রণালির কারণে ইতিমধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার অর্থনীতিতে বড় রকমের ঘা লেগেছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে এক দশমিক তিন শতাংশে গড়াতে পারে।

এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য নিয়ে এখনো বিস্তর কথা চালাচালি হচ্ছে। সন্দেহবাদীদের সংখ্যাই বেশি, কিন্তু এমন লোকও আছে যারা এই চুক্তিকে ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক সমঝোতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের একজন হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, যাকে এই স্মারক সমঝোতার প্রধান রূপকার হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। সেই সফর ও পরবর্তী সময়ে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে একসময়ের এই দুই শত্রু একে অপরের কৌশলগত মিত্রতে পরিণত হয়। সম্ভাবনার অর্থে ইরান চুক্তি তেমন ফলাফল অর্জনে সক্ষম।

অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু ট্রাম্প নিজে একাধিকবার বলেছেন, পৃথিবীর প্রকৃত মহান কোনো দেশ অনন্তকাল অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে থাকে না, থাকতে পারে না। একই কথা বলেছেন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক প্রশ্নে। ‘আমাদের দুই দেশ অনন্তকাল একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।’ যে ট্রাম্প একসময় ইরানকে ধূলিসাৎ করার কথা বলেছিলেন, সেই তিনি যে শান্তির কথা বলছেন, তা ঠাট্টার বিষয় নয়, স্বস্তির বিষয়।

চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ষাট দিনের সময়-ঘণ্টা চলা শুরু হয়েছে। আমাদের প্রার্থনা থাকবে, এই চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক ক্রুদ্ধ ও করুণ সময় অতিক্রম করে পৃথিবী যেন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তাচক্রে প্রবেশে সক্ষম হয়।

* হাসান ফেরদৌস, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জি–৭ সম্মেলনের ফাঁকেই ইরানের সঙ্গে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
জি–৭ সম্মেলনের ফাঁকেই ইরানের সঙ্গে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

বিজেপি গুজরাটের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেবে, এই ভয়েই কি ইউসুফ পাঠান তৃণমূল ছাড়লেন

ভারতের সাবেক তারকা ক্রিকেটার এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য (এমপি) ইউসুফ পাঠান একটি জমি নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। গুজরাটের ভদোদরা শহরে ২০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রাখার অভিযোগে ওই জমি প্রকাশ্যে নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে স্থানীয় পৌরসভা।

একই সঙ্গে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরেও তীব্র রাজনৈতিক কোন্দল ও কাদা-ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে।

ঘটনাটি গুজরাটের ভদোদরা শহরের তানদালজা এলাকার। ২০১২ সালে সাবেক এই অলরাউন্ডার ক্রিকেটার ওই এলাকার ৯৭৮ বর্গমিটারের একটি সরকারি প্লট ৯৯ বছরের জন্য ইজারা (লিজ) নেওয়ার আবেদন করেন। ভদোদরা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (ভিএমসি) সে সময় কোনো প্রকাশ্য নিলাম ছাড়াই প্রতি বর্গমিটার ৫৭ হাজার ২৭০ রুপি দরে জমিটি পাঠানের নামে বরাদ্দ করার প্রস্তাব অনুমোদন করে।

প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য গুজরাট রাজ্যের নগর উন্নয়ন দপ্তরের কাছে পাঠানো হলে বাধে বিপত্তি। ২০১৪ সালের জুনে দপ্তরটি এই বরাদ্দ বাতিল করে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল, প্রকাশ্য নিলাম বা দরপত্র ছাড়া সরকারি জমি এভাবে দেওয়া যাবে না। জমি বরাদ্দ বাতিল হলেও ইউসুফ পাঠান জায়গাটি কাঁটাতারের বেষ্টনী দিয়ে নিজের দখলেই রেখে দেন।

দীর্ঘ ১০ বছর পর ২০২৪ সালে ইউসুফ পাঠান পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর আসন থেকে তৃণমূলের টিকিটে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। এর পরপরই বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত ভদোদরার পৌরসভা তাঁকে সরকারি জমি অবৈধ দখলের নোটিশ পাঠায়। পাঠান এই নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যান।

তবে গত বছরের আগস্টে গুজরাট হাইকোর্ট সরকারের আগের বাতিল আদেশই বহাল রাখেন। এরপর চলতি বছরের ১৫ জুন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ পাঠানকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ কোটায় জমি পাওয়ার আবেদনের জন্য চার সপ্তাহ সময় দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে আদালত কড়া প্রশ্ন তুলেছেন, ২০১৪ সালে বরাদ্দ বাতিল হওয়ার পরও কোনো অর্থ পরিশোধ না করে তিনি কীভাবে ১২ বছর ধরে এই মূল্যবান সরকারি জমি দখলে রাখলেন।

আদালত ইঙ্গিত দিয়েছেন, অবৈধ দখলের জন্য পাঠানকে বর্তমান বাজারদরে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ওই জমির মূল্য প্রায় ৩ গুণ বেড়ে ২০ কোটি ৫০ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। পৌরসভা এখন জমিটি নিলামে তোলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জমি বিতর্ক থেকে তৃণমূলে কোন্দল

এই জমি নিয়ে বিতর্ক ভারতের লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরের একটি বড় রাজনৈতিক সংকটকে সামনে এনেছে। ইউসুফ পাঠান সম্প্রতি তৃণমূলের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, যারা সংসদে মূল দল থেকে আলাদা হয়ে নতুন ব্লক বা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চাচ্ছে। দলবিরোধী এই অবস্থানের কারণে তৃণমূল নেতৃত্বের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি।

এই রাজনৈতিক নাটকীয়তা প্রকাশ্যে আসে ১৫ জুন। ওই সময় জম্মু-কাশ্মীরের সংসদ সদস্য আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে এক মুসলিম সংসদ সদস্য তৃণমূলের সংসদ সদস্য ইউসুফ পাঠানকে ভয় দেখিয়েছিলেন, সংসদে বিরোধী দলের আন্দোলনে যোগ দিলে গুজরাটে পাঠানের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিতে পারে বিজেপি সরকার। ওই সময় তৃণমূলের শীর্ষ নেত্রী মহুয়া মৈত্র পাঠানকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে বিরোধী দল তাঁর পাশে থাকবে।

এই দাবির জবাবে মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, পাঠানকে ভয় দেখানো ওই মুসলিম এমপি ছিলেন সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। এরপরই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়া ইউসুফ পাঠানের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে মহুয়া মৈত্র লেখেন, ‘খুব আফসোস হচ্ছে, আমি এমন একজন বিশ্বঘাতকের জন্য লড়াই করেছিলাম, যাঁর কোনো সাহস বা মেরুদণ্ড নেই। এর চেয়ে মাঠে ক্রিকেট ধারাভাষ্য দেওয়া তাঁর জন্য অনেক ভালো ছিল।’

এই সমালোচনার জবাবে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি পাল্টা আক্রমণ করে লিখেছেন, তৃণমূলের অন্য ১৯ জন এমপি কেন দল ছাড়লেন বা বিদ্রোহী হলেন, সেই ব্যর্থতার দায় দলটির শীর্ষ নেতারা এড়াতে পারেন না।

ইউসুফ পাঠান
ইউসুফ পাঠান। ফাইল ছবি: এএনআই

ইসরাইলকে যুদ্ধের বিদেশী অর্থের বৃহত্তম যোগানদাতা জার্মান-মার্কিন কোম্পানি

জার্মান বীমা প্রতিষ্ঠান আলিয়াঞ্জ এবং তাদের সহযোগী মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পিমকো ইসরাইলি সরকারি বন্ডে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে, যার ফলে তারা ইসরাইলের অন্যতম বৃহৎ বিদেশী বন্ডধারক হিসেবে উঠে এসেছে।

গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর সামরিক অভিযানের মধ্যে বিশ্বমঞ্চের এক করপোরেট জায়ান্ট ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বিদেশী অর্থদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই একটি কোম্পানি ইসরাইলি সরকারের কাছ থেকে যে পরিমাণ বন্ড বা ঋণপত্র কিনেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিশ্বের অন্য সব দেশের মোট কেনার চেয়েও বেশি।

এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি জার্মানির বীমা ও আর্থিক পরিষেবা জায়ান্ট ‘আলিয়াঞ্জ’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক এক সহযোগী বন্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ‘পিমকো’।

আমস্টারডাম-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা প্রফেন্দোর বরাতে জানা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ আলিয়াঞ্জ গ্রুপ ইসরাইলি সরকারের প্রায় ২৬৭ কোটি ডলারের বন্ড নিজেদের কবজায় নিয়েছে। সহজ ভাষায়, যুদ্ধকালীন ভয়াবহ মুহূর্তে ইসরাইলের মোট বিদেশী বন্ডের অর্ধেকের বেশি ছিল এই একটি মাত্র যৌথ কোম্পানির হাতে, যা বাকি গোটা বিশ্বের সম্মিলিত বিনিয়োগকেও হার মানায়।

একটি দেশের সরকার যখন আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসঙ্ঘের তদন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গণহত্যা চালায়, তখন সেই দেশের বন্ড কেনা আইনি ও নৈতিক ঝুঁকির বিষয়। কিন্তু রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধকে পুঁজি করে অধিক মুনাফার লোভ সামলাতে পারেনি এই পশ্চিমা কোম্পানি।

যুদ্ধের বাজারে নিজেদের বন্ডের সুদ এক লাফে ৫.৫৬ শতাংশে বাড়িয়ে দেয় ইসরাইল, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ১.৪ শতাংশ। এই বাড়তি মুনাফার লোভেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা।

মানবাধিকার সংস্থা ব্যাংকট্র্যাক-এর কর্মী ম্যাক্স হ্যামার বলছেন, গাজায় চলমান গণহত্যার মুখেও পিমকোর এই বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করেছেন, ইসরাইলকে অর্থ দেয়ার অর্থই হলো যুদ্ধাপরাধ ও ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরাসরি অংশ নেয়া।

তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ইসরাইলের যুদ্ধ চাঙ্গা করতে পশ্চিমা পুজির সরবরাহ বেড়েছে। এই সময়ে ইসরাইলি বন্ডে বিদেশী বিনিয়োগ ১১৬ কোটি ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪৯১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আর এই পুরো বিনিয়োগের ৯০.৭ শতাংশই এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পকেট থেকে। ২০২৪ সালে আলিয়াঞ্জের বিনিয়োগ যেখানে ছিল মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, এক বছরের মাথায় তা আকাশচুম্বী আকার নেয়। ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন কিংবা ইরানের ওপর আগ্রাসন চালাতে ইসরাইলের যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তার বড় জোগানদার এই মার্কিন-জার্মান অক্ষ।

যদিও এই যুদ্ধের তহবিল জোগানোর ক্ষেত্রে ইউরোপের অনেক দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আয়ারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ের বেশ কিছু বড় ফান্ড ইসরাইলি বন্ড ও ব্যাংক থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমনকি মানবাধিকার কর্মীদের আন্দোলনের মুখে আলিয়াঞ্জ ব্রিটেনের মাটিতে ইসরাইলি অস্ত্র কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসের বীমা সুবিধা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা ইসরাইলি সরকারের হাতে ঠিকই তুলে দিয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।

প্রকৃতপক্ষে, আলিয়াঞ্জ-পিমকোর আসল বিনিয়োগ ২৬৭ কোটি ডলারের চেয়েও অনেক বেশি, কারণ তারা বিভিন্ন বিদেশী ক্লায়েন্ট ও পেনসন ফান্ডের হয়েও গোপনে বিপুল পরিমাণ ইসরাইলি বন্ড কিনেছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা এই নির্মম যুদ্ধের পেছনে মার্কিন ও পশ্চিমা পুজিই যে মূল চালিকাশক্তি, তা আরো একবার বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত হলো।

সূত্র : মিডলইস্ট আই
ইসরাইলি সৈনিক
ইসরাইলি সৈনিক। সংগৃহীত

নেতানিয়াহু নির্মমভাবে হেরে গেছেন, এখন তাঁকে সরে দাঁড়াতেই হবে by সাইমন টিসডাল

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ থামানোর জন্য গত সপ্তাহে যে প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মধ্যপ্রাচ্যকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া এক খলনায়ক হিসেবেই তিনি ইতিহাসে নিন্দিত হয়ে থাকবেন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইসরায়েলি এই নেতার ‘সমাধান’ ছিল সব সময় একটাই—চরম এবং বেআইনি সহিংসতা।

ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে এই অবৈধ যুদ্ধ ঘোষণা ছিল নেতানিয়াহু নীতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই তা ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মরিয়া হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে ভার্সাইয়ে তিনি যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, তা কোনো কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণ নয়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সংশয় ও উপহাসের মুখে পড়েও ট্রাম্প হয়তো এই রাজনৈতিক লজ্জা কোনোমতে এড়াতে পারবেন। তবে নেতানিয়াহুর জন্য এর পরিণতি হতে যাচ্ছে চরম বিপর্যয়কর।

তাঁর রাজনৈতিক খতিয়ান এখন একটি অপরাধনামার মতো শোনায়। কয়েক দশক ধরে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের (দুই রাষ্ট্রনীতি) বিরোধিতা করে এসেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের ভয়াবহ হামলা ঠেকাতে তিনি ব্যর্থ হন আর এরপর গাজায় চালান নির্বিচার গণহত্যা। কট্টর ডানপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে বসিয়ে তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেছিলেন, যা তাঁর দেশের জন্য চিরস্থায়ী লজ্জা ও গ্লানি বয়ে এনেছে। তিনি ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত পরমাণু চুক্তিটিকে দুর্বল করে দিয়েছিলেন। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবেই ধেয়ে এসেছে চলতি বছরের এই বিপর্যয়কর সংঘাত।

তবে আসন্ন নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুখেও নেতানিয়াহু যে নিশ্চিত রাজনৈতিক পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তার মূল কারণ ওপরের কোনোটিই নয়। এর আসল কারণ হলো, তিনি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বিষাক্ত এবং মারাত্মকভাবে দুর্বল করে ফেলেছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন একে অপরের সঙ্গে কথাই বলছেন না।

মার্কিন জনগণ ও হোয়াইট হাউস—সবাই এখন নেতানিয়াহুকেই দোষারোপ করছেন। তাঁদের ধারণা, খুব সহজে জয় ও ইরানের শাসনব্যবস্থা পতনের চটকদার গল্প শুনিয়ে নেতানিয়াহুই যুক্তরাষ্ট্রকে এই অন্তহীন যুদ্ধে টেনে এনেছেন। আর এখন যখন শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে, তখন লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে নেতানিয়াহু সেই শান্তিপ্রক্রিয়া নস্যাৎ করছেন বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের জন্মের পর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে বহুবার বিরোধ হয়েছে—১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকট, আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, শান্তি পরিকল্পনা, সীমানা কিংবা বসতি স্থাপন নিয়ে। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জেরে তাদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থ একসুতায় গেঁথে যায়। ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা হু হু করে বাড়তে থাকে, একই সঙ্গে ওয়াশিংটনে শক্তিশালী হতে থাকে ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপগুলো। যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে ইসরায়েলের প্রধান রক্ষাকর্তা আর ইসরায়েল হয় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান সহযোগী।

এই ঐকমত্যে প্রথম ফাটল ধরে ২০১৫ সালে, যখন বারাক ওবামার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা রুখে দিতে নেতানিয়াহু এবং আমেরিকার ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো এক বিশাল প্রচারণায় নামে।

হ্যারেটজ পত্রিকার কলামিস্ট জোশুয়া লেইফার লিখেছেন, ‘ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপগুলোর সেই আক্রমণ পরমাণু চুক্তি ঠেকাতে পারেনি। উল্টো তারা আমেরিকার রাজনীতিতে তাদের এত দিনের দ্বিপক্ষীয় মুখোশটি চিরতরে উন্মোচন করে ফেলে। তারা প্রকাশ্যেই রিপাবলিকান পার্টির একটি অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করা শুরু করে।’

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এই রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করে। তিনি ফিলিস্তিনিদের অবজ্ঞা করেন, মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন এবং গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেন। লেইফার উল্লেখ করেছেন, ‘যেকোনো ফিলিস্তিপন্থী অ্যাকটিভিস্টের চেয়ে ট্রাম্প সাধারণ ডেমোক্র্যাটদের ইসরায়েল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে বেশি ভূমিকা রেখেছেন।’

পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ভূখণ্ড সম্প্রসারণের উগ্র নীতি এবং গাজা, লেবানন ও সবশেষ ইরানের সঙ্গে ব্যর্থ যুদ্ধ—এই ফাটলকে আরও চওড়া করেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে এক অভাবনীয় চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইতিহাসে এই প্রথম ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি মার্কিন নাগরিক সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। তাঁরা ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধ বা সীমিত করার দাবি জানাচ্ছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই সমালোচনা এখন শুধু বামপন্থী প্রগতিশীলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্য থেকেও এই আওয়াজ উঠছে।

নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পের গালিগালাজপূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণের খবর যদি সত্যি হয়, তবে তা দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাসের চরম ধসেরই প্রমাণ। আর এটার স্থায়ী ভূরাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে। নেতানিয়াহু এমন কিছু করেছেন, যা তাঁর পূর্বসূরিরা করতে পারেননি: আমেরিকাকে এক পুরোদস্তুর যুদ্ধে টেনে নিয়ে এসেছেন এবং তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার এক গভীর কৌশলগত ফাটলের কেন্দ্রে।

ট্রাম্পের এই ইরান চুক্তি অনেক ইসরায়েলিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং তা কেবল ডানপন্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ সাধারণ ইসরায়েলিদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। কারণ, নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি চিরতরে শেষ করবেন, হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দেবেন এবং তেহরানে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাবেন। এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। উল্টো ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার এখন আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে।

গত সপ্তাহে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের পর ট্রাম্প কার্যত নেতানিয়াহুর সব ‘লাল রেখা’কে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দিতে হবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অধিকার তাদের রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অংশ হিসেবে ইরানের ফ্রিজ হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অত্যন্ত কড়া ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ বন্ধ করে লাইনে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু এখন কোণঠাসা। তিনি যদি ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা দেখাতে যান, তবে ইরান হয়তো আবারও যুদ্ধ শুরু করবে এবং শান্তিচুক্তি ভেস্তে যাবে। গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলার কারণে তেহরান আলোচনা থেকে পিছিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে দুই পক্ষ আগের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহু যদি ট্রাম্পের এই হুকুম মুখ বুজে মেনে নেন, বিশেষ করে লেবানন থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে, তবে কট্টর ডানপন্থী মিত্র এবং ভোটারদের কাছে তাঁর আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।

এই ভাঙনের সম্ভাব্য পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এটি হয়তো ইসরায়েলের একাধিপত্যের অবসান ঘটাবে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান পরাশক্তি হিসেবে নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার স্বপ্ন এবং আমেরিকার নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার দিন হয়তো এখানেই শেষ। এটি সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ সম্প্রসারণের আশাকেও ধূলিসাৎ করতে পারে। ট্রাম্পের অন্যায্য গাজা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ও চিরতরে মুখথুবড়ে পড়বে। আর এটিই হতে পারে ইরানের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে মূল ধারায় ফেরার মুহূর্ত।

ইরানের বিরুদ্ধে বিজয় পাওয়ার আশায় নেতানিয়াহু জুয়া খেলেছিলেন এবং তিনি তাতে নির্মমভাবে হেরে গেছেন। এখন এই ধ্বংসযজ্ঞের দায় তাঁকেই নিতে হবে। আর কোনো অজুহাত বা অশান্তি তৈরি না করে তাঁকে পদত্যাগ বা সরে দাঁড়াতে হবে।

* সাইমন টিসডাল, গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কলামিস্ট।
- গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।

ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে অবৈধ যুদ্ধ ঘোষণা ছিল নেতানিয়াহু নীতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই তা ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে অবৈধ যুদ্ধ ঘোষণা ছিল নেতানিয়াহু নীতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই তা ব্যর্থ হয়েছে। ছবি : এএফপি

ইরান চুক্তি আসলে গোটা অঞ্চল পুনর্গঠনের নকশা by সানিয়া ফয়সাল এল-হুসাইনি

১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে অস্থায়ী কাঠামোগত সমঝোতা ঘোষণা করা হয়েছে, তা কেবল স্থবির হয়ে থাকা পারমাণবিক আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা নয়। এটিকে ২০১৫ সালের চুক্তিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও বলা যেতে পারে।

এটি আসলে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক এক বিস্তৃত রূপরেখা। এর লক্ষ্য যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে সমগ্র অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করা। এর গুরুত্ব শুধু এর বিষয়বস্তুর মধ্যে নয়, বরং সময়ের মধ্যেও নিহিত।

লেবাননকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘাত ও উত্তেজনার পর এই কাঠামো প্রকাশিত হওয়ায় স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরে গিয়ে ইরান, লেবানন, গাজা, ইসরায়েল ও সম্ভাব্যভাবে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ—এসব আন্তসংযুক্ত সংকট নিয়ন্ত্রণকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও বিনিয়োগব্যবস্থার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আবারর যুক্ত করার প্রস্তাবও এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। অর্থাৎ এটি শুধু পারমাণবিক চুক্তি নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের কৌশলগত বাস্তবতা নতুনভাবে সাজানোর এক প্রচেষ্টা।

এই কাঠামো অনুযায়ী সব ধরনের সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এর মধ্যে লেবাননের যুদ্ধও অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশ থেকে সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করবে এবং দেশটির ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এর বিনিময়ে ইরান প্রথম ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।

এরপর এই চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাবে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং দেশটির ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করবে।

পারমাণবিক ইস্যুটি ইচ্ছাকৃতভাবে আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রথম ৬০ দিনের আলোচনায় এর সমাধানের চেষ্টা হবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে তা বাড়ানো যাবে। পাশাপাশি এই কাঠামোতে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলিয়ে ইরানের পুনর্গঠন কর্মসূচির কথাও ভাবা হয়েছে।

এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সীমিত দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া হিসেবে ধরা কঠিন। বরং এটি একই সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক আঞ্চলিক ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, যাতে এই চুক্তির সম্ভাবনা নষ্ট না হয়। একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রস্তাব এবং উপত্যকাটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা চলছে। আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে গাজার পুনর্গঠন উদ্যোগও সামনে এসেছে।

ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অন্যদিকে ইসরায়েল গাজা ও লেবাননে মূলত সামরিক পথেই অগ্রসর হচ্ছে। তবে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরে একটি নতুন রাজনৈতিক পর্বের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যা এই চুক্তির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এই কাঠামোর মাধ্যমে শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ইরানের তেল রপ্তানি আবার শুরু করা, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইরানকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এই সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যায়, এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ২০১৫ সালের মতো পারমাণবিক ইস্যুর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। বরং সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতা এবং তার কারণে সব পক্ষের ওপর যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি সামাল দেওয়া।

ইরান বলেছিল, যদি লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোঝাপড়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে ইসরায়েল এই শর্ত মানতে রাজি হয়নি। তারা মনে করে, তাদের সামরিক অভিযান কোনো আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ায় যাতে লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করা হয়, কারণ অতিরিক্ত উত্তেজনা আলোচনাকে ব্যর্থ করতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন। এখন ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সরাসরি এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।

এমনকি লেবানন এখন এই চুক্তির অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। আগের আলোচনায় ইসরায়েলকে প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হতো, কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। এই পরিবর্তন কেবল লেবাননেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনাকে নতুনভাবে সংযুক্ত করছে।

ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের চাপের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি জাতিসংঘে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া নিউইয়র্ক ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের দিকে আন্তর্জাতিক অগ্রগতিকে প্রতিফলিত করে।

তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে ইসরায়েলের ওপর, যাকে এখন সবচেয়ে জটিল ভেরিয়েবল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান ইসরায়েলি সরকার এই কাঠামোকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পথ হিসেবে দেখে না। বরং তাদের মতে, এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা ও আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক—এই মৌলিক নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো সমাধান করে না।

এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও তেল আবিবের অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে উত্তেজনা কমিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার পথে যেতে চায়, এমনকি যদি সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলো ভবিষ্যতের আলোচনায় রেখে দিতে হয়। কিন্তু ইসরায়েল এমন কোনো পন্থায় আস্থা রাখে না, যা চূড়ান্ত নিরাপত্তা সমস্যাগুলোকে স্থগিত রাখে।

এই পার্থক্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও যুক্ত। সেখানে আসন্ন নির্বাচন এবং সরকারের প্রতি জনসমর্থন হ্রাসের প্রবণতা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। যদিও ইসরায়েলি জনগণ ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিরাপত্তা নীতির পক্ষে রয়ে গেছে, তবু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

বর্তমান জোট সরকার ক্ষমতায় থাকলে আঞ্চলিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং চুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম ডানপন্থী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ বাড়াতে পারে, যদিও ইরানের প্রতি নীতি পুরোপুরি বদলাবে না, তবে মতপার্থক্যগুলোকে সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এই কাঠামোগত সমঝোতা নিঃসন্দেহে নতুন এক কূটনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কিন্তু এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কতটা বাস্তব ও কার্যকর ব্যবস্থায় এটিকে রূপ দিতে পারে তার ওপর।

এই প্রচেষ্টা শুধু ইরানকেন্দ্রিক হতে পারে না। এর সঙ্গে লেবানন, পশ্চিম তীর ও গাজা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমন্বয়ের ভবিষ্যৎও যুক্ত থাকতে হবে, তবেই একটি টেকসই আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি সম্ভব হবে, যা গোটা অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

* সানিয়া ফয়সাল এল-হুসাইনি, ফিলিস্তিনের আরব-আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক গবেষক ও লেখক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক হাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক হাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রয়টার্স

হরমুজসহ নানা ইস্যুতে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় কী কী হলো

সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, ইরানের জব্দ করা সম্পদে ছাড় দেওয়া এবং লেবানন যুদ্ধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ইস্যুতে কিছু অগ্রগতির কথাও জানা গেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও আলোচনায় কয়েকটি ইস্যুতে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। গতকাল সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক শহরে শুরু হয়েছে আলোচনা।

হরমুজ নিয়ে যোগাযোগ থাকবে

বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে হামলা ও জাহাজ চলাচলে বাধা এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ রাখবে। প্রথম ধাপের আলোচনা শেষে এ কথা জানায় কাতার ও পাকিস্তান।

যৌথ বিবৃতিতে দেশ দুটি জানিয়েছে, দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ রাখা হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো ও ভুল–বোঝাবুঝি দূর করতে এই যোগাযোগ রাখা হবে।

‘বড় অগ্রগতি’ হয়েছে

প্রথম দিনের আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল ও ইরানের জব্দ করা কিছু সম্পদের বিষয়ে আলোচনায় ‘বড় অগ্রগতি’ হয়েছে।

পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘পাকিস্তান ও কাতারের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় লেবাননে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বড় অগ্রগতি হয়েছে।’

৬০ দিনেই চুক্তি

পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা চালায়। পরে ৮ এপ্রিল দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এরপর ১২–১৩ এপ্রিল পাকিস্তানে দুই পক্ষ আলোচনায় বসলেও কোনো সমঝোতা হয়নি।

তার পর থেকে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশ। জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতায় গত বুধবার সমঝোতা স্মারকে সই করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

সপ্তাহজুড়ে আলোচনা চলবে

প্রথম ধাপের আলোচনা শেষে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার আজ সোমবার একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক অবকাশযাপনকেন্দ্রে এ সপ্তাহজুড়ে ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত আলোচনা চলবে। আলোচনার লক্ষ্য থাকবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানো।

যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতায় আগেই পৌঁছেছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এখন ৬০ দিনের সময়সীমা মাথায় রেখে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনায় বসেছে দুপক্ষ। নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর গতকাল সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক শহরে শুরু হয়েছে আলোচনা।

আলোচনার লক্ষ্য গত বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা। তবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও লেবাননে যুদ্ধবিরতির মতো বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

চলমান শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সঙ্গে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার।

অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সঙ্গে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ সরকারের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা।

মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান ও কাতার। গতকালের আলোচনায় ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির। আলোচনায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানি উপস্থিত ছিলেন।

আরও ছিলেন সুইজারল্যান্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগনাজিও ক্যাসিস এবং জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি।

বৈঠক শুরুর আগে (বাঁ থেকে) মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল-থানি ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। গতকাল সুইজারল্যান্ডের ব্যুর্গেনশ্টকে
বৈঠক শুরুর আগে (বাঁ থেকে) মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল-থানি ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। গতকাল সুইজারল্যান্ডের ব্যুর্গেনশ্টকে। ছবি: এএফপি

কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ পদত্যাগ করতে চান

ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ পদত্যাগ করতে চাইছেন। বছরের পর বছর বন্দী থাকার জন্য সংসদ সদস্যের দায়িত্বপালনে অপারগ রশিদ দলের কাছে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

রশিদ বলেছেন, বন্দী থাকার কারণে তিনি সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এলাকার জনতার আশা–আকাঙ্ক্ষা মেটাতে পারছেন না। তাঁদের অভাব–অভিযোগের কথা সংসদে বলতে পারছেন না। প্রতিকার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কাজেই তিনি সংসদ সদস্য পদ ত্যাগ করতে চান।

রশিদের অনুরোধ দল বিবেচনা করে দেখবে জানিয়েছে। সে জন্য দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। দুই দিন ধরে সেই বৈঠক চলবে। তার পর দল সিদ্ধান্ত নেবে।

রশিদের দল আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি) এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে। রশিদ এআইপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

৫৮ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ার রশিদের আসল নাম শেখ আবদুল রশিদ। কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকায় তিনি ইঞ্জিনিয়ার রশিদ নামেই পরিচিত। বিএসসি পাস করার পর তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা পান এবং জম্মু–কাশ্মীর প্রোজেক্টস কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশনে এক দশক ধরে কাজ করেন। সেই কারণেই তিনি পরিচিত হন ইঞ্জিনিয়ার রশিদ নামে। কিশোর বয়সে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আবদুল গণি লোনের দল পিপলস কনফারেন্সে। বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার অভিযোগে তাঁকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০০৫ সালে। সাড়ে তিন মাস জেল খাটার পর মুক্তি পান।

রশিদ ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার সদস্য ছিলেন।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইউএপিএ আইনে তিনি বন্দী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ সাহায্য করেছিলেন। সেই থেকে সাত বছর তিনি বন্দী।

বন্দী থাকা অবস্থাতেই রশিদ এআইপি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বারামুল্লা কেন্দ্র থেকে তিনি দলের প্রার্থী হন। লক্ষাধিক ভোটে হারিয়ে দেন ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহকে।

ওই নির্বাচনে বিজেপি চেয়েছিল জম্মু–কাশ্মীরের ক্ষমতা দখল করতে। সে জন্য প্রথমে জম্মু–কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন করা হয়, যাতে মুসলমানপ্রধান কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে হিন্দুপ্রধান জম্মুর আসনের তারতম্য কমে যায়। ওই ভোটে জিততে বিজেপি উপত্যকার ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিডিপির দলত্যাগী নেতাদের নিয়ে ‘জম্মু–কাশ্মীর আপনি পার্টি’ নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গড়তেও সাহায্য করে। ভোটে তাঁদের মদদও দেয়। ইঞ্জিনিয়ার রশিদের দলকেও কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে মদদ দিয়েছিল। ভোটে প্রচারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার রশিদের জামিনের বিরোধিতা করেনি। যদিও বিজেপির লক্ষ্য পূরণ হয়নি। উপত্যকা দখলে রেখে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সহায়তায় ন্যাশনাল কনফারেন্স সরকার গড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হন ওমর আবদুল্লাহ। ইঞ্জিনিয়ার রশিদকেও আবার ফেরত পাঠানো হয় দিল্লির তিহার জেলে।

রশিদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে বারামুল্লা সংসদীয় ক্ষেত্রের অন্তর্গত ১৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের দলীয় নেতাদের সঙ্গে এআইপি বৈঠক করেছে। এবার দলের শীর্ষস্থানীয় কমিটি দুই দিন ধরে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করবে।

রশিদ ইস্তফা দিলে বারামুল্লা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে। তাতে এআইপির জয়ের সম্ভাবনা কতটা, সেটাই হবে মুখ্য বিচার্য।

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি বন্ধের তাগিদ

গত ১৪ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। এর আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, লেবাননে বোমাবর্ষণ বন্ধ এবং হত্যাকাণ্ড বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতারাও রয়েছেন। এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল। তবে পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তির জন্য ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বা ‘বৃহত্তর ইসরাইল’-এর বিপজ্জনক মতবাদ বন্ধ করা জরুরি।

‘গ্রেটার ইসরাইল’ একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানা নয়, বরং একটি ধারণা। এই ধারণার কারণে ইরাক, গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানে একের পর এক যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে।

এই মতবাদ অনুযায়ী, ইসরাইলের সীমানা জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সমগ্র ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত হওয়া উচিত। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ধারণার প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

এই মতবাদের পেছনে দুই ধরনের চরমপন্থি গোষ্ঠী রয়েছে। প্রথমত, নেতানিয়াহুর মতো ধর্মনিরপেক্ষ কট্টরপন্থিরা, যারা মনে করে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য নদী থেকে সাগর পর্যন্ত পুরো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা উচিত এবং এর জন্য সেখানে থাকা ৮০ লাখ ফিলিস্তিনির ভাগ্যকে তারা পরোয়া করে না। দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো ইহুদি আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী, যারা বিশ্বাস করে ঈশ্বর এই জমি কেবল ইহুদিদেরই দিয়েছেন।

স্মোট্রিচের মতে, ‘ফিলিস্তিনি বলে কিছু নেই।’

অতি সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ইসরাইল পশ্চিম তীর, গাজা, লেবানন বা সিরিয়ার ভূখণ্ডের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ত্যাগ করবে না।

এই চরমপন্থি মতবাদটি কয়েক দশক আগে প্রত্যাখ্যান করা উচিত ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পক্ষকে ইসরাইলপন্থি ইহুদি জায়নিস্ট এবং ‘এন্ড টাইমস’ বা শেষ জামানার ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাসী খ্রিস্টান জায়নিস্টদের ব্যবহার করে এটিকে টিকিয়ে রেখেছেন।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল এই ‘গ্রেটার ইসরাইল’ কল্পকাহিনীরই সর্বশেষ অংশ। ধারণা করা হয়েছিল, ৯০ লাখ মানুষের দেশ ইরানকে একদিনেই পতন ঘটানো যাবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি ও মার্কিন বোমায় ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও দেশটির পতন ঘটেনি। উল্টো হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়েছে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে।

এর আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন-ইসরাইলি পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়েছে এবং দীর্ঘ ১২ বছরের যুদ্ধে দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বিভ্রান্তিতে যোগ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ইরানের সাথে নতুন চুক্তিটি তার জন্য এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি পথ। এই কারণেই ইসরাইলের ‘গ্রেটার ইসরাইল’ পন্থি রাজনীতিকরা এই চুক্তিকে নস্যাৎ করতে চাইছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও ইসরাইল লেবাননে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গত শুক্র ও শনিবার যথাক্রমে ৪৭ ও ৩২ জন নিহত হয়েছেন।

‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি ইসরাইলকে রক্ষা করছে না, বরং ধ্বংস করছে। বিশ্বজুড়ে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ধসে পড়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখন ইসরাইলকে নেতিবাচকভাবে দেখে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৬ জনই ইসরাইলকে পছন্দ করেন না।

তাই পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি আনার একমাত্র উপায় হলো ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি বন্ধ করা। এর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করা, গাজায় গণহত্যা বন্ধ করা এবং পশ্চিম তীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করা বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ইসরাইলের পাশাপাশি ১৯৪তম জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। একই সাথে আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে লেবানন ও সিরিয়া থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আরব বিশ্ব এবং ইরানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি স্পষ্ট করতে হবে যে, ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি ত্যাগ করাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির একমাত্র পথ।

সূত্র: আল-জাজিরা

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি বন্ধের তাগিদ
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: আল-জাজিরা

কেমন হবে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মধ্যপ্রাচ্য নীতি

যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরাইল নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন ফিলিস্তিনপন্থিরা। স্থানীয় নির্বাচনে গ্রিন পার্টির উত্থান, ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সম্ভাব্য বিদায় এবং ইসরাইলে সব ধরনের অস্ত্র পাঠানো বন্ধে লেবার পার্টির সদস্যদের ভেতর তৈরি হওয়া জনমতের কারণেই এমনটা ভাবা হচ্ছে।

স্টারমারের পরে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ওয়েস স্ট্রিটিং এবং অ্যান্ডি বার্নহাম।

চলতি মাসে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরের রাজা) হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গ্রেটার ম্যানচেস্টারের লেবার পার্টির মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসনে উপনির্বাচনে ৫৪ দশমিক ৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তিনি এখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে পরিবর্তনের লক্ষ্যে দলের ভেতরের নেতৃত্ব নির্বাচনের লড়াই শুরু করতে পারবেন অথবা নিজে তাতে অংশ নিতে পারবেন।

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৫৬ বছর বয়সি বার্নহাম লেবার পার্টির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ, যিনি দলের সদস্যদের ভোটে যেকোনো নেতৃত্ব নির্বাচনে অনায়াসে জয়ী হবেন।

অন্যদিকে, স্টারমার বর্তমানে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তা নিয়ে লড়াই করছেন।

মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিয়ানস-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, লেবার পার্টির ৮৭ শতাংশ সদস্য অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের পক্ষে এবং ৭৮ শতাংশ সদস্য ইসরাইলে সম্পূর্ণ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা চান।

অ্যান্ডি বার্নহাম তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন উভয় পক্ষের প্রতিই সহনশীল নীতি বজায় রেখেছেন। গাজা যুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি সাদিক খান ও আনাস সারওয়ারের সঙ্গে মিলে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং গাজায় মানবিক সহায়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। গত বছরের জুলাই মাসে তিনি গাজার পরিস্থিতিকে ‘ভাষাতীত’ বর্ণনা করে সেখানকার চিকিৎসা সহায়তার জন্য তহবিল সংগ্রহের আহ্বান জানান।

তবে বার্নহাম আন্তর্জাতিক আইন মেনে ইসরাইলের লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানের অধিকারকে সমর্থন করেছেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি ‘লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরাইল’ গ্রুপের সদস্য বা সমর্থক হিসেবে যুক্ত আছেন।

ফিলিস্তিনপন্থি রাজনীতিক জারা সুলতানা বার্নহামকে ‘জায়নিস্ট’ বা ইহুদিবাদী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার সমালোচনা করেছেন। কারণ বার্নহাম বয়কট আন্দোলনকে (বিডিএস) ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ এবং বেলফোর ঘোষণাকে ‘ব্রিটিশ মূল্যবোধের প্রতিফলন’ বলেছিলেন।

অন্যদিকে, ২০১২ ও ২০১১ সালে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্রিটিশ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছিলেন বার্নহাম। ২০১২ সালে তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরও সফর করেন।

এখন পর্যন্ত লেবার পার্টি সরকারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলে আংশিক অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত করা এবং তার এক বছর পর ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। তবে স্টারমারের সম্ভাব্য বিদায়ের পর নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে দলটির নীতিতে আরো বড় পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স 

কেমন হবে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মধ্যপ্রাচ্য নীতি
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির নবনির্বাচিত এমপি অ্যান্ডি বার্নহাম। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউ আরব

কাছের মানুষ পাশে থাকলে কঠিন যুদ্ধেও জেতা যায়, তার প্রমাণ বিসিএস ক্যাডার মালিহা by জিনাত শারমিন

প্রকাশ ১৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ এই গল্পের ‘নায়ক’ মুলকে সাদ মালিহা বিয়ের এক যুগ পার করে ৪৪তম বিসিএসে লাইভস্টক ক্যাডার হয়েছেন। বিয়ে আর ক্যাডার হওয়ার মাঝের গল্পটা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার, কখনো হাল না ছাড়ার।

মালিহার মা আসমা বেগমের কথা না বললেই নয়। জন্ম মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার কলমা গ্রামে। ঢাকায় বড় হয়েছেন। বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

১৯৯৩ সালে জগন্নাথ কলেজে (সে সময় কলেজ ছিল, ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হয়) ভর্তি হন। এর এক বছর পর তাঁর বিয়ে হয়ে যায়।

একঝটকায় ঢাকার শিক্ষার্থী থেকে ঝিনাইদহের হরিশংকরপুর ইউনিয়নের বাকড়ি গ্রামের গৃহবধূ হয়ে গেলেন। আসমা বেগমের খুব ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করার।

স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার পাট চুকে গেল। চাকরির স্বপ্নের সমাপ্তি। মালিহা তাঁর মাকে সারাটা জীবন কেবল অন্যের জন্য করে যেতে দেখেছেন। বিনিময়ে মা পেয়েছে কেবল উপেক্ষা আর অবহেলা।

নতুন জীবন নতুন সংগ্রাম

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর ২০১৩ সালে বিয়ে হয়ে যায় মালিহার। বিয়েতে মালিহার মায়ের কেবল একটা অনুরোধ ছিল পাত্র মোস্তাফিজুর রহমান ও তাঁর মা-বাবার কাছে—তাঁর কন্যার লেখাপড়ার যাতে কোনো ত্রুটি না হয়। বিয়ের পর মায়ের ইচ্ছায়, স্বামীর পরামর্শে মালিহা ভর্তি হন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেনারি কলেজে।

মালিহা এই কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী। তখন কলেজটি ছিল শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। বর্তমানে কলেজটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

২০১৯ সালের মার্চে ইন্টার্ন চলাকালীন মা হন মালিহা। মা হয়েও ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করেন। তারপর সময় নষ্ট না করে শুরু করেন চাকরির পড়াশোনা।

যে কান্না আনন্দের

মালিহার মামি শিক্ষা ক্যাডার হন। সে সময় থেকে তাঁর রঞ্জু মামা তাঁকে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন। মালিহা ২০২০ সাল থেকে চাকরির পড়াশোনা শুরু করেন। ২০২৫ সালে এসে প্রথম সরকারি চাকরি পান। যোগ দেন সরকারি ব্যাংকের অফিসার পদে।

এর কিছুদিন পর ৩০ জুন ৪৪তম বিসিএসের ফল প্রকাশ করে। তবে তখন ক্যাডার পদ আসেনি মালিহার। বেশ হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন।

লাইভস্টক ক্যাডারে ৬৮জন ‘রিপিট ক্যাডার’ ছিল। সেসব পুনর্মূল্যায়ন করে আবার যখন ৬ নভেম্বর নতুন ফল প্রকাশ করা হয়, তাতে নাম আসে মালিহার। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নপূরণ হয় তাঁর।

মালিহার মা আসমার নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন যেন মেয়ের ভেতর দিয়ে সত্য হয়ে ধরা দেয়। মালিহা যখন চাকরির সুখবর জানাতে মাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে ‘আম্মুউউউ’ বলে একটা চিৎকার দিয়েছেন, মা আসমা বেগম ভয়েই অস্থির! নিশ্চয়ই মেয়ের কোনো বিপদ হয়েছে। এরপরই শুনলেন খবরটা। মা-মেয়ে দুজনেই ফোনের দুই পাশে কাঁদছেন, যে কান্না আনন্দের, প্রাপ্তির, সফলতার।

যাঁদের জন্য এত দূর

মালিহা বলেন, ‘আমার আম্মু সব সময় বলত, আমি যদি বিসিএস ক্যাডার হতে পারি, তাহলে তাঁর সব কষ্ট সার্থক হবে। অনেক ঝড়ঝাপটা সামাল দিয়েছি, হতাশ হয়েছি, টেনশনে বুক ধড়ফড় করত, শ্বাস নিতে পারতাম না, ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু পড়াশোনা ছাড়িনি।’

মালিহার যে মামি বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার, ৪৪তম বিসিএসের ভাইভা দেওয়ার জন্য ওই মামির শাড়ি আর ব্লেজার নিয়ে গিয়েছিলেন। ৪৫তম বিসিএসের ভাইভা দিয়েছেন। ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষাও দিয়েছেন।

মালিহা বলেন, ‘ভাইভা দিতে গিয়ে কোথায় থেকেছি, জানেন? ফেসবুকের মাধ্যমে আফরিন আপুর সঙ্গে পরিচয়। তাঁর বাসা ঢাকার পিএসসি অফিসের কাছে। তিনি আমাকে তাঁর বাসায় থেকে ভাইভা দিতে বলেছিলেন। আমিও ঝিনাইদহ থেকে সোজা তাঁর বাসায় উঠে ৪৪ আর ৪৫ বিসিএসের ভাইভা দিয়েছি।’

জীবনসঙ্গী যখন অনুপ্রেরণা

মালিহার বাবা তাঁর পড়াশোনায় বা অন্য কিছুতে সমর্থন না করলেও সব সময় সঙ্গে ছিলেন মা আর স্বামী। সন্তান নিতে দেরি হওয়া থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে দূরসম্পর্কের আত্মীয়স্বজন কথা শোনালে এই দুজনই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

মালিহা বলেন, ‘পাঁচ বছরে আমরা কোথাও বেড়াতে যাইনি। যখনই সময় পেয়েছি, পড়তে বসেছি। বাবু হয়তো খেলছে, আমি পড়তে বসেছি। বাবু আর আমার স্বামী ঘুমিয়ে পড়তেন, আমি পড়তে বসতাম। আবার রাত দুইটায় আমার স্বামী উঠে কফির মগ হাতে আমি যা যা পড়েছি, সেসব পড়া ধরতেন। পরের দিন, পরের সপ্তাহে কী কী পড়ব, তার রুটিন করে ঘুমাতে যেতাম। আমার স্বামী আমাকে বলতেন, “তুমি হয়তো অন্যদের মতো ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়তে পারবা না; কিন্তু তুমি দৈনিক ৪-৫ ঘণ্টা পড়বা। এক পাতা হলেও পড়বা।” আমি সে কথা রেখেছি। গত ৫ বছরে এক দিনও পড়িনি, এমন কখনো হয়নি। এক পাতা হলেও পড়েছি।’

জীবনের নতুন আরেক অধ্যায় খুলেছেন মালিহা। তাঁর স্বপ্ন এখন আরও বড়। অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে চান বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা নারীদের কাছে। কামনা করেন, কোনো নারীই যেন হাল না ছাড়েন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2F1k08vnsw%2FWhatsApp-Image-2025-11-12-at-10.10.09-PM.jpeg?rect=32%2C0%2C759%2C506&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
৪৪তম বিসিএসে লাইভস্টক ক্যাডার হয়েছেন মুলকে সাদ মালিহা। ছবি: মুলকে সাদ মালিহার সৌজন্যে

তিনটি নগ্ন দৃশ্যের একটি বাদ গেল, নির্মাতা বললেন...

প্রকাশ ১৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ বহুল প্রশংসিত ‘তিতলি’র পর ‘আগ্রা’ বানিয়েছেন কানু বেহল। ছবিটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎসবে প্রশংসিতও হয়েছে। সম্প্রতি সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে ভারতের প্রেক্ষাগৃহে। সিনেমাটিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি অন্তরঙ্গ ও নগ্ন দৃশ্য। সম্প্রতি সার্টিফিকেশন বোর্ডের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন কানু।

বলিউড হাঙ্গামাকে নির্মাতা কানু বেহল জানান, তাঁর ‘আগ্রা’ ছবিতে সেন্সরের কাঁচি পড়েছে। একটি নগ্ন দৃশ্যসহ কিছু গালাগালের সংলাপ বাদ দেওয়া হয়েছে; এরপর ছবিটি পেয়েছে ‘এ’ বা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সার্টিফিকেট

কানু বেহলের ভাষ্য, ‘আমার অভিজ্ঞতায় সেন্সরের কাছ থেকে কোনো ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাইনি। উল্টো তারা খুবই সহযোগিতা করেছে। তারা ছবিটা পছন্দ করেছে। পরিবর্তনগুলোও করেছি আমি নিজেই। তারা শুধু তিনটি শট কাটতে বলেছিল। বলেছিল, ‘‘আমরা ছবিটা পছন্দ করেছি, কাটতে চাই না; কিন্তু আজকের দিনে এ সার্টিফিকেট পেলেও নগ্নতা ও অশ্লীল ভাষা রাখা যায় না।”’

কানু বেহল আরও বলেন, ‘তিনটি নগ্ন শটের মধ্যে দুটির গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হই। সামান্য বদল করে সেগুলো রেখে দিই। শেষ পর্যন্ত কেবল একটি শট বাদ গেছে। গালাগালের সংলাপও সরানো হয়েছে—এ নিয়ে আমি আপত্তি করিনি। কারণ, সেটি বড় কাঠামোগত প্রশ্ন এবং কমিটিও সে বিষয়ে কিছু করতে পারত না। তারা খুব খোলামেলাভাবে বিষয়টি বলেছেন, এটা আমি সম্মান করি।’

পরবর্তী চলচ্চিত্র নিয়ে প্রশ্ন করলে কানু বেহলের জবাব, ‘এখন বলার মতো কিছুই নেই। “আগ্রা”র জন্য আরও শো পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যেতে চাই। স্বাধীন সিনেমার জায়গা নিয়ে বড় পরিসরের আলাপ শুরু হোক—এটাই চাই। এখনকার পুরো ব্যবস্থাটা কিছু নির্দিষ্ট ধরনের বিনোদনমূলক ছবির পক্ষেই দাঁড়িয়ে আছে। এর বাইরে থাকা চলচ্চিত্রগুলোর জায়গা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2Fic6d0d2g%2FThe-Symbolism-of-Sexuality-in-%E2%80%98Agra-hof-33-1536x1024.jpg?rect=141%2C0%2C1296%2C864&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
‘আগ্রা’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি