Tuesday, March 8, 2011

সাঙ্গাকারার মুম্বাই-বিস্ময়

শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা বিস্মিত। তাঁর বিস্ময়ের কারণ একটাই—শ্রীলঙ্কাকে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের শেষ গ্রুপ ম্যাচটি খেলতে হবে মুম্বাইতে গিয়ে। ‘নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি মুম্বাইতে গিয়ে খেলতে হবে শুনে আমরা খুব আশ্চর্য হয়েছি। আমি তো মনে করেছিলাম স্বাগতিকেরা গ্রুপ ম্যাচগুলো নিজেদের মাঠেই খেলবে’—বলেছেন শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক। এএফপি।
তিন দেশের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ তাদের সব গ্রুপ ম্যাচ খেলছে নিজেদের মাঠে। তবে আরেক স্বাগতিক ভারতকেও খেলতে হয়েছে বাংলাদেশের মাঠ ঢাকায়। সাঙ্গাকারার প্রশ্ন, শ্রীলঙ্কা কেন দেশের বাইরে গিয়ে খেলবে? বিস্ময়ের সঙ্গে সাঙ্গাকারার একটু ক্ষোভও আছে—মুম্বাই গিয়ে খেললে নিজেদের মাঠের সুবিধাটা যে পাবেন না তাঁরা। এতে শ্রীলঙ্কার দর্শকও একটা ম্যাচ দেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে।
তবে যা হওয়ার হয়েছে, এখন তো আর কিছু করার নেই। তাই নিজেদের আসল কাজে মনোযোগ দেওয়ার জন্য সতীর্থদের আহ্বান জানিয়েছেন সাঙ্গাকারা, ‘নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে কোথায় খেলব, এটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখন আর এটা পরিবর্তনও করা যাবে না। আমাদের নিজেদের কাজটা করে যেতে হবে।’

বল হাতে ‘অচেনা’ নায়ক

বোলিং নিয়ে ভারতের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। কালকের ম্যাচে সেই দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে গেল। মেঘ তাড়ানি গান গাইলেন কে? না, কোনো বিশেষজ্ঞ বোলার নন; ‘পার্টটাইমার’—যুবরাজ সিং!
দুজন পেসারের সঙ্গে দুজন বিশেষজ্ঞ স্পিনার ছিলেন—হরভজন সিং ও পীযূষ চাওলা। কিন্তু তাঁদের নিজের ছায়ায় আড়াল করে বল হাতে জ্বলে উঠলেন যুবরাজ। বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে আগের দুই ম্যাচের চারটি ইনিংসই ছিল ৩০০ পেরোনো। সেই চিন্নাস্বামীতে কাল ভারত আয়ারল্যান্ডকে বেঁধে ফেলল ২০৭ রানে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা যুবরাজের। ৩১ রান দিয়ে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো তুলে নিয়েছেন ৫ উইকেট।
পার্টটাইম বোলার হিসেবে বল হাতে নিলেও কাল বল করলেন পুরো ১০ ওভার। তাও ভীষণ বিপদে পড়েই তাঁকে ২৬তম ওভারে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ধোনি। উইকেটে ততক্ষণে গেড়ে বসেছেন উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড ও নিয়াল ও’ব্রায়েন। তৃতীয় উইকেটে ততক্ষণে ১০৯ রানে জুটি গড়েছেন এই দুজন। যুবরাজ আক্রমণে যেন সৌভাগ্যই নিয়ে এসেছিলেন ভারতের জন্য। না, তিনি উইকেট পাননি। তবে ২৭তম ওভারে রান আউটে ভাঙল নিয়াল-পোর্টারফিল্ডের জুটি।
এর পর? শুধুই যুবরাজ! আয়ারল্যান্ডের পরের পাঁচটি উইকেটই তাঁর শিকার। এর মধ্যে মাত্র ৯ রানে ফিরিয়েছেন আগের ম্যাচে ৫০ বলে সেঞ্চুরি করে আলোড়ন তোলা কেভিন ও’ব্রায়েনকেও। সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যেতে থাকা পোর্টারফিল্ডকেও থামিয়েছেন। মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর সঙ্গী হলো ক্যারিয়ার-সেরা বোলিংয়ের তৃপ্তি। আগে সেরা বোলিং ছিল ৬ রানে ৪ উইকেট, ২০০৩ বিশ্বকাপে নামিবিয়ার বিপক্ষে।
স্পিনই ভারতের মূল শক্তি। তবে সম্প্রতি ভারতীয় স্পিনারদের স্পিন যেন ফুরিয়ে গেছে। পারফরম্যান্সেই তার প্রমাণ। হরভজন বিশ্বকাপের তিন ম্যাচে নিয়েছেন ২ উইকেট। চাওলা দুই ম্যাচে ২ উইকেট। কাল এই দুই বিশেষজ্ঞ স্পিনারই উইকেটশূন্য! এ অবস্থায় বল হাতে যুবরাজের জ্বলে ওঠাটা প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল যুবরাজের নিজের জন্যও।
দলে জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। ব্যাটিং অর্ডারে সুরেশ রায়না, বিরাট কোহলির মতো প্রতিদ্বন্দ্বিরা আছেন। তাই ব্যাটের সঙ্গে বল হাতেও অবদান রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। কাল দলের প্রয়োজনটা ভালোভাবেই মিটিয়েছেন যুবি।

নোবেল বিজয়ীর প্রতি এ কেমন আচরণ? ব্য মাহফুজ আনাম

মুহাম্মদ ইউনূস

তাহলে ‘রক্তচোষা’ আর ‘কোটি কোটি টাকা তছরুপ’ করা নিয়ে এত কথাবার্তার পর আমাদের একমাত্র নোবেলজয়ী ও বিশ্ববাসীর প্রশংসাধন্য ক্ষুদ্রঋণের দিশারি ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূসের আসল দোষ হলো ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে থাকার বয়স পেরিয়ে গেছে আর তাঁর পুনর্নিয়োগ অনুমোদন করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক? গতকালই কি তাঁর বয়স পেরোল, নাকি সাম্প্রতিক অতীতে? মুহাম্মদ ইউনূসের বয়স এখন ৭০। তাহলে এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কয়েকটি সরকার, যারা এল-গেল, তারা এত বছর কী করছিল? তাঁর পুনর্নিয়োগের তথাকথিত অনিয়ম কেন আগেই ঠিক করা হলো না? প্রশাসনিকভাবে অথবা আদালতে কেন সেই প্রক্রিয়াটিকে চ্যালেঞ্জ করা হলো না? গত ১০ বছর যা কোনো ইস্যু ছিল না, তা কেন হঠাৎ ইস্যু হয়ে উঠল?
জবাবটা সোজা। সরকার তাঁর বিদায় চায় আর তাই তাঁকে যেতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি খোলাসা করে বলেছিলেন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে। সেখানে তিনি ইউনূস ও ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কে বলেছিলেন, গরিবের ‘রক্তচোষা’, আর বলেছিলেন, গরিবের নামে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। হঠাৎ ইউনূস ভিলেনে পরিণত হলেন। আর গণমাধ্যমের একাংশ মিথ্যা ও অত্যন্ত অবমাননাকর প্রচারণা চালিয়ে তাঁর চরিত্রে কালিমা লেপন করল। উদ্ভট অভিযোগে উদ্ভট মামলা হতে লাগল।
নিশ্চয়ই একসময় অধ্যাপক ইউনূসকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটির নেতৃত্বের দায়িত্ব ছাড়তে হবে। নোবেল জয়ের বুদ্ধি যেহেতু তাঁর আছে, তাঁর নিশ্চয়ই এই বুদ্ধিও আছে যে তিনি আজীবন গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি থাকতে পারবেন না। সুতরাং তাঁর উত্তরসূরির প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত যে পথে হাঁটল, তাতে পরিষ্কার যে সরকারের দুরভিসন্ধির পেছনে গ্রামীণ ব্যাংকের লাখ লাখ ঋণগ্রহীতার স্বার্থ কিংবা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা ভালো করার ব্যাপার নয়, বরং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তির এবং দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষুদ্রঋণের খ্যাতির মারাত্মক ক্ষতিসাধন করবে।
পুনর্নিয়োগের বিষয়টি এখন যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, তাই এখন আমরা আইনগত বিষয়ে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকব। আমরা আজ নজর দেব, ইউনূসের কাজ কিসের প্রতিনিধিত্ব করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দারিদ্র্য বিমোচনে বহু প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনোটাই ক্ষুদ্রঋণের মতো বিশ্ববাসীর মন কাড়তে পারেনি। এখন সব মহাদেশের অনেক দেশের দরিদ্রতম অংশের জন্য ঋণ দেওয়ার এই বিশেষ মডেলটি চর্চিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেনসহ পশ্চিমা উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বের দেশ থেকে শুরু করে চীনসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় কয়েকটি রাজতান্ত্রিক দেশ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ এখন ক্ষুদ্রঋণকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এই দারিদ্র্য বিমোচন মডেলের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ও ইউনূসের খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ ইউনূস ও তাঁর তৈরি করা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতে আমাদের জনগণের জন্য অসীম গর্ব বয়ে এনেছে।
দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ কতটুকু সফল হয়েছে, তা নিয়ে তর্ক আছে। কিন্তু কোনো না-কোনোভাবে এটা যে গরিবদের সহায়তা করেছে, সে ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। বহু অনুসন্ধানে তা প্রমাণিত।
ক্ষুদ্রঋণ ঋণগ্রহীতাকে ঋণের জালে আটকে ফেলে—এমন যুক্তি দিচ্ছেন যাঁরা, তাঁরা নজর দিয়েছেন কয়েক শ (হয়তো কয়েক হাজার) ব্যর্থ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতার ওপর; আর যে লাখ লাখ মানুষ ক্ষুদ্রঋণের সুবিধাভোগী, তাদের তারা উপেক্ষা করছেন। শুধু গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতার সংখ্যা এখন ৮০ লাখ। অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার সঙ্গে মিলে দুই কোটি ঋণগ্রহীতা। ঋণের জালে তাদের কত জন পড়েছে—হয়তো কয়েক হাজার। দুই কোটির তুলনায় তা কত শতাংশ? এই বিতর্ক ভাবাদর্শ কিংবা অনুমানভিত্তিক না হয়ে আরও বেশি তথ্যনির্ভর হওয়া দরকার।
অধ্যাপক ইউনূসের বিশাল কাজের শুধু একটি দিক অর্থনৈতিক। গ্রামীণ ব্যাংকের আগে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারীকে তাদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রাখেনি। বাংলাদেশের জন্য তা বৈপ্লবিক ফল বয়ে এনেছে। যে গ্রামীণ গরিব নারীদের কখনো আর্থিক লেনদেনের সুযোগ ছিল না, সেই সুযোগ তাদের দিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। প্রমাণিত হয়েছে, তারা বিচক্ষণ ও তীক্ষ বুদ্ধিসম্পন্ন বিনিয়োগকারী এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ঋণগ্রহীতা, যাদের ঋণ ফেরত দেওয়ার হার ৯৯ শতাংশ। হাতে অর্থ আসায় নারীরা আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান অর্জন করেছে, পারিবারিক বিষয়ে তাদের কথা বলার জায়গা তৈরি হয়েছে, এত দিন যা ছিল পুরুষদের একচেটিয়া। তারা ভালোভাবে বিনিয়োগ করে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দিয়েছে।
নারী আন্দোলন হয়তো লিঙ্গীয় প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে এসেছে, কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের কাজের ফলেই (পরে অন্যরা তা অনুসরণ করেছে) আমাদের গ্রামীণ নারীদের রূপান্তর ঘটেছে, তাদের মানসিকতা, বিশ্ববীক্ষা ও নেতৃত্বের সামর্থ্য চিরতরে বদলে গেছে। অর্থ যখন কথা বলে, বিশেষত দারিদ্র্যের পরিবেশে, তখন গ্রামীণ ব্যাংকের কল্যাণে নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়ন আমাদের নারীদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করে। এর ফলে তারা অধিক হারে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোতে সংরক্ষিত আসন দাবি করার দিকে এগিয়েছে।
সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার হলো, গ্রামীণ ব্যাংক এবং বেশ কিছু এনজিওর কর্মকাণ্ড নারীদের ক্ষমতায়ন ঘটিয়েছে, তাদের অধিকতর সচেতন করে তোলার মাধ্যমে এবং এভাবে গ্রামাঞ্চলে সম্ভাব্য মৌলবাদী উত্থান প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। মৌলবাদ মোকাবিলায় আমাদের এনজিওগুলোর ভূমিকা আর এই প্রক্রিয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ভূমিকা অস্বীকারের উপায় নেই।
নারীকে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রেখে গ্রামীণ ব্যাংক নেতৃত্ব দিয়েছে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন, ফতোয়ার অপব্যবহার ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। ঋণগ্রহীতাদের দল গঠনের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংক একটি সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া চালু করে, যা নারীদের মধ্যে মিত্রতা তৈরি করে। পুরুষের নিপীড়ন এবং সামাজিক প্রয়োজনের সময়ে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়—বিদ্যমান গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর ক্ষয় ঘটিয়ে এক ধরনের সামষ্টিক প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। এনজিও এবং বিশেষত গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকাণ্ডের প্রতি ধর্মীয় চরমপন্থীরা যে বরাবর ঘৃণা প্রকাশ করে আসছে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
অনেকটা জায়গাজুড়ে নারী বিষয়ে আমরা লিখলাম শুধু এ কারণে যে নারীর মুক্তি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কেন্দ্রে অবস্থিত, আর এতে গ্রামীণের ভূমিকা পুরোপুরি উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
ইউনূসের স্বাপ্নিক নেতৃত্বে গ্রামীণ ব্যাংক ডানোন, এডিডাস, ভায়োলা ইত্যাদি বৈশ্বিক কোম্পানির সঙ্গে উদ্ভাবনী অংশীদারিতে গেছে, যার মাধ্যমে পুষ্টিকর দই, সস্তা জুতা এবং নিরাপদ খাওয়ার পানি সস্তায় দেওয়া হবে। গ্রামীণের অপূর্ব অংশীদারি গড়ে ওঠে নরওয়ের টেলিনরের সঙ্গে, যা গ্রামীণফোন সৃষ্টি পর্যন্ত গড়ায়। গ্রামীণফোন দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন কোম্পানি, অন্যদের চেয়ে অনেক ব্যবধানে এগিয়ে। এটি এখন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় করদাতা কোম্পানি, যার বার্ষিক করের পরিমাণ ৯০০ কোটি টাকা।
এত কিছু ইউনূস করেছেন নিজের জন্য এক টাকাও মুনাফা না নিয়ে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি যে বেতন পান (যা সরকারের সচিবের সমতুল্য, তবে অন্যান্য ভাতা নেই), তাতেই রয়ে গেছে, আর তাঁর গড়ে তোলা প্রায় দুই ডজন কোম্পানি থেকে তিনি কিছুই নেন না। তাঁর দপ্তর অনাড়ম্বর। বইয়ের তাক, কয়েকটি কাঠের চেয়ার আর নিজের জন্য একটা বর্গাকার ডেস্ক। ছোট একটি পাঁচতলা দালানে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের আরও চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে ভাগ করে বসবাস করেন। তাঁদের প্রত্যেকে একেক তলায় থাকেন। নোবেল পাওয়ার আগে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বাহন ছিল না, কোথাও যেতে হলে ব্যাংকের মাইক্রোবাস ব্যবহার করতেন। সব সময় তাঁর পরনে থাকত গ্রামীণ চেকের পোশাক, যেটি এখন বৈশ্বিক ট্রেডমার্ক হিসেবে সুপরিচিত। তিনি যেখানেই যান, ইদানীং তো সারা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছেন, সেখানেই তা বাংলাদেশের পোশাক ও নকশা তুলে ধরে।
বাংলাদেশে আমরা সব সময় অভিযোগ করি যে বিশ্ববাসী আমাদের অর্জনের স্বীকৃতি দিচ্ছে না; আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম শুধু নেতিবাচক চিত্রই তুলে ধরে। তো ইউনূসকে স্বীকৃতি দিল বিশ্ব আর বিশ্ব-গণমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে বিরামহীনভাবে প্রশংসামূলক লেখালেখি হলো। অবশেষে যখন একজন ব্যক্তি বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে নিয়ে গেলেন, আমরা তাঁকে ‘অপসারণ’ করলাম, তাঁকে অভিহিত করলাম ‘রক্তচোষা’ গরিব-শোষক বলে। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিলাম। কত সুন্দরভাবে আমরা দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরলাম!
শুধু নোবেল পুরস্কার নয়, আরও অনেক মর্যাদাকর পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। অধ্যাপক ইউনূসের মতো এত বেশি পুরস্কার ও সম্মান হয়তো নিকট অতীতে আর কেউ পাননি। তাঁর কাজের ওপর বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স পরিচালনা করা হয়। বিভিন্ন বিভাগ ও কেন্দ্রের নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে। প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এমন কোনোটা খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে বক্তৃতা দিতে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সম্প্রতি বিশ্বনেতারা যেখানেই মিলিত হয়েছেন, সেখানে কথা বলার জন্য তাঁকে ডাকা হয়নি—এমন ঘটনা বিরল। তাঁর লেখা বই প্রায় সব নামকরা বইয়ের দোকানে স্থান পায়। ইউনূসের অর্জনের এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো এ জন্য যে, তিনি বাংলাদেশকে কোন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। বিশ্বের দরবারে আমাদের দেশকে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ইউনূস যে ভূমিকা রেখেছেন, আর কোনো ব্যক্তি তাঁর কাছাকাছিও যেতে পারেননি।
যে ব্যক্তি আমাদের এত সম্মান, মর্যাদা ও স্বীকৃতি এনে দিলেন, তাঁর প্রতি আমাদের আচরণের এই কি পথ?
ইংরেজি থেকে অনূদিত
মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, ডেইলি স্টার।

অনৈতিক উপহার - আড়ম্বর সংবর্ধনা দিয়ে কি অন্যায় ঢাকা যাবে?

নুন খেলে গুণ গাইতে হয়, সংবর্ধনা বা সোনার নৌকা উপহার পেলে করতে হয় আরও বেশি কিছু। ঝালকাঠির সাংসদ এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু সেটা করেছেন। তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবর্ধনা গ্রহণ করেছেন, সোনার নৌকা উপহার নিয়েছেন বলেও পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। যদিও সংবর্ধনা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তা অস্বীকার করেছে। ঘটনাটি তখন ঘটেছে যখন স্থানীয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থানীয় শাখা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগ থামিয়ে দিতেই যে এহেন সংবর্ধনার আয়োজন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংসদ জেনেশুনে কেন গেলেন? এখানে অন্যায় হলো একটি অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবর্ধনা গ্রহণ করে তাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা। খেয়াল করার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকলে সোনার নৌকা আর বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকলে সোনার ধানের শীষ উপহার দেওয়া-নেওয়ার একটি চর্চা দেশে চালু হয়েছে। মূলত ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই এমন আদান-প্রদান হয়। স্পষ্টতই এটা ঘুষ দেওয়ার অভিনব কায়দা। এখানে তোষামোদকারী ক্ষমতাবানদের কৃপায় নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে অন্যায় আড়াল করতে সচেষ্ট থাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে’। যিনি বা যাঁরা এটা দিচ্ছেন এবং যিনি নিচ্ছেন, উভয়ে মিলে গোটা সমাজে কুণ্ঠিত হচ্ছেন না। এটা চিন্তার বিষয়। খারাপ কাজের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হলো সামাজিকভাবে খারাপ কাজকে ভালো বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া। বিএনপির আমলেও আমরা দেখেছি, মন্ত্রী থেকে শুরু করে সাংসদেরা পর্যন্ত লজ্জার মাথা খেয়ে এ রকম অনৈতিক চর্চায় অংশ নিয়েছেন।
শিক্ষা নিয়ে অসাধু বাণিজ্যে রাজনীতিবিদদের সংশ্লিষ্টতা সুবিদিত। অথচ তাঁরাই আবার জনসভায় দাঁড়িয়ে, সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষা ও নীতি-নৈতিকতার কথা বলতে বলতে পেরেশান হয়ে যান! এই কপটতা রাজনীতির গভীরতর এক অসুখ। এ থেকে সমাজকে মুক্ত করতেই হবে।

সাম্প্রতিক বিতর্ক ও উত্তরণের উপায় by মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

জাতীয় সংসদের কাছে বিচার বিভাগের জবাবদিহি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এটি আলোচনায় আসে যখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা গত ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি পূর্ণাঙ্গ সভায় সংসদের কাছে বিচার বিভাগের জবাবদিহি করার বিপক্ষে মত দেন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিচার বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠানোকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল বলে অভিহিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান বিচারপতি গত ১৫ জানুয়ারি বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বলেন, সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ—কেউ কারও কাছে জবাবদিহি করবে না; জবাবদিহি থাকবে কেবল জনগণের কাছে। জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি না করার বিচার বিভাগের এ অবস্থানের সূত্রপাত হয় মূলত আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে (সুপ্রিম কোর্টের প্রতিনিধি হিসেবে) ডেকে পাঠানোকে কেন্দ্র করে।
জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতার প্রয়োগ যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বেচ্ছাচারী করে তুলতে পারে। তাই বিচার বিভাগও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। এখন দেখা দরকার, এই জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে সংসদ সাংবিধানিকভাবে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি না। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ভাষ্য হচ্ছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে’ [অনুচ্ছেদ ৭(১), বাংলাদেশ সংবিধান]। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় সংসদ। সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এই সংসদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে এবং এ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংসদ ও সাংসদদেরকে যেকোনো কোর্টের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে [অনুচ্ছেদ ৬৫(১) এবং অনুচ্ছেদ ৭৮(১), বাংলাদেশ সংবিধান]। অন্যদিকে, বিচারকার্য সম্পাদনের ক্ষমতা বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে এবং এ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ স্বাধীন থাকবেন [অনুচ্ছেদ ৯৫(৪), বাংলাদেশ সংবিধান]। তাঁরা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং নিযুক্ত হবার পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে কোনো বিচারককে স্বীয় পদ থেকে অপসারণ করা যাবে না। অতএব, বিচারকার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে অথবা বিচারক নিয়োগে বা অপসারণে বিচার বিভাগের ওপর সংসদের আপাত সাংবিধানিক কোনো কর্তত্ব নেই। এমনকি, সংসদীয় কমিটি কর্তৃক অনুসন্ধান ও সাক্ষ্য গ্রহণ কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে নয়। এ ক্ষেত্রে সংসদ যা করতে পারে তা হলো, সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে আইন প্রণয়ন করা। যেমন—সম্প্রতি (২৯ নভেম্বর ২০১০) ভারতের লোকসভায় ‘জুডিশিয়াল স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি বিল, ২০১০’ নামে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। বিলে কর্মস্থলে যোগদানের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিদের সম্পত্তি ও দায়দেনা (assets and liabilities) সম্পর্কে ঘোষণা করে তা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ওভারসাইট কমিটি’ (National Judicial Oversight Committee) এবং কমিটির কাজে সহায়তার জন্য যাচাই-বাছাই (scrutiny) কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ওভারসাইট কমিটি গুরুতর অসদাচরণে অভিযুক্ত যেকোনো বিচারককে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বলবে। অভিযুক্ত কোনো বিচারক এ নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে তাঁকে অপসারণের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া শুরু করতে কমিটি রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করবে। বিলে সাধারণ জনগণকেও বিচারকদের অসদাচরণ সম্পর্কে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে।
আদালত অবমাননার বর্তমান আইনটি (The Contempt of Court Act, 1926) অনেকটা নিবর্তনমূলক। এ আইনে আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে মন্তব্য, বিচারকের ব্যক্তিগত আচরণ এবং রায়ের সমালোচনাকে আদালত অবমাননা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে আদালত সম্পর্কে এমনকি যুক্তিসংগত সমালোচনা করা থেকে সবাই বিরত থাকে। একুশ শতকের অবাধ তথ্যপ্রবাহের এ যুগে ১৯২৬ সালের আইনের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু রয়েছে, তা পর্যালোচনা করা দরকার। তাই আইজিএস আদালত অবমাননার একটি নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে, যেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। নতুন আইনে আদালত অবমাননার একটি বৃহত্তর সংজ্ঞা থাকবে, যাতে করে গণমাধ্যম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করার সুযোগ পাবে।
বিচারকদের আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসৃত হয় কি না, তা দেখভাল করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে একটি সেল হতে পারে। বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো বিচারকের দক্ষতা ও আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ জানানোর কোনো সুযোগ নেই। এ শূন্যতা পূরণে আইজিএস সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে একটি গ্রিভেন্স সেল হতে পারে।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পড়ে। সুপ্রিম কোর্টে এ আইনের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কোর্টের আদেশ ও রায়সমূহ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করতে পারে।
অধস্তন আদালতে বিচারকদের কার্যসম্পাদন মূল্যায়নপদ্ধতির আধুনিকায়ন দরকার। কারণ বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা এসিআরের মাধ্যমে অধস্তন আদালতে বিচারকদের কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের যে পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, তা বিচারকদের মধ্যে জবাবদিহির অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটি বিচারক নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন/কলেজিয়ামকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করতে পারে।
গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। তাই জনগণের প্রয়োজনে আমাদের আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ সংবিধানে অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গে পালন করবে। জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন—আইন বিভাগ একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকে সুগম করতে পারে।
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম: গবেষণা সহযোগী/প্রভাষক, ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স স্টাডিজ (আইজিএস), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
i.sirajul@yahoo.com

গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে কিউবায় এক মার্কিনের বিচার শুরু

কিউবায় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক এক মার্কিন নাগরিকের বিচার শুরু হয়েছে। অ্যালান গ্রস (৬১) নামের এই ব্যক্তি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন ঠিকাদার হিসেবে কিউবায় কাজ করতেন। তাঁকে মুক্তি দিতে মার্কিন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দাবি জানানো হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার হাভানায় এক রুদ্ধদ্বার আদালতে অ্যালানের বিচার শুরু হয়। কিউবার আইনজীবীরা আদালতে তাঁর অন্তত ২০ বছর কারাদণ্ডের আবেদন করেন। কমিউনিস্ট দেশটির একটি দ্বীপের ছোট ইহুদি সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে মুঠোফোন ও কম্পিউটার বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৯ সালের শেষ দিকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হাভানায় বিচারকাজ শুরুর আগ মুহূর্তে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন অ্যালানকে মুক্তি দিতে কিউবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নিঃশর্তভাবে তাঁকে কিউবা ত্যাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পরিবারের কাছে ফেরার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানান। হিলারি বলেন, অ্যালানের এ অবস্থা তাঁর পরিবার এবং সেই সঙ্গে মার্কিন সরকারের জন্য উদ্বেগের।
বিচার চলাকালে হাভানার আদালত চত্বরে অ্যালানের স্ত্রী জুডি ও তাঁদের একজন পারিবারিক আইনজীবীকে দেখা যায়। তা ছাড়া তিনজন মার্কিন কনস্যুলার কর্মকর্তা ও ওই দ্বীপের ইহুদি সম্প্রদায়ের কিছু লোক উপস্থিত ছিলেন। তবে কেউই বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে মুখ খোলেননি।
মার্কিন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কিউবার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। কিউবার পাঁচ বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ওই আদালতের একজন কর্মকর্তা জানান, গত শুক্রবার কয়েক ঘণ্টা পরই শুনানি শেষ হয়। গতকাল শনিবারও শুনানি হয়।

ফ্রান্সে প্রকাশ্যে বোরকা পরা নিষিদ্ধ হচ্ছে

ফ্রান্সে আগামী এপ্রিল থেকে জন সমাবেশ স্থানে বোরকা পরা নিষিদ্ধ হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা এ কথা জানান। পুলিশ যেকোনো বোরকা পরা নারীকে থানায় তলব করতে পারবে। এ ছাড়া পুলিশ বোরকা খুলতে বলতে পারবে বা জরিমানা করতে পারবে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, এই আইন মূলত প্রতীকী। পুলিশ বোরকা পরা প্রত্যেক নারীকে তলব করবে না। কিন্তু প্যারিসের এক ইমাম বলেন, বোরকা পরা নারীদের থানায় ডাকা হলে তা হবে তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর।
মুসলিম নেতারা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এতে নারীরা হয়রানির শিকার হবেন। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদী হামলার উদ্বেগ থেকে এ আইনের সমর্থকেরা বলছেন, পুলিশের প্রতিটি মানুষের মুখ দেখতে পারা উচিত।

সৌদি আরবে শিয়াদের বিক্ষোভ

সৌদি আরবের শিয়া ধর্মাবলম্বীরা গত শুক্রবার দেশটির পূর্বাঞ্চলে দুটি ছোট বিক্ষোভ করেছে। একজন শিয়াধর্মীয় নেতাসহ এ সম্প্রদায়ের অন্যান্য বন্দীর মুক্তি, শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের কর্মমংস্থান বাড়ানো ও সম-অধিকারের দাবিতে তারা এ বিক্ষোভ করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও মানবাধিকারকর্মীদের সূত্রে এ কথা জানা যায়।
মানবাধিকারকর্মীদের সূত্রে জানা যায়, দেশটির তেলসমৃদ্ধ শহর হোফাফে শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। বিক্ষোভকারীরা শিয়া নেতা তাওফিক আল-আমিরের মুক্তির দাবিতে মিছিল করে শহরটি প্রদক্ষিণ করে। সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার দাবি করায় এই নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পূর্বাঞ্চলের অপর উপকূলীয় শহর কাতিফেও শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ করেছে।
উল্লেখ্য, এই পূর্বাঞ্চলে দেশটির সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়ের বাস। আর দেশটির তেল সম্পদের মূল খনিগুলোও এ অঞ্চলে অবস্থিত। শিয়া সম্প্রদায়ের অভিযোগ, সরকারি ঊর্ধ্বতন পদ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা অন্য নাগরিকদের তুলনায় বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিদের তুলনায় বরাবর বঞ্চিত হয়ে আসছে।

মিসরের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুর্নীতির বিচার শুরু

দুর্নীতির অভিযোগে মিসরের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাবিব আল-আদলির বিচারকাজ গতকাল শনিবার রাজধানী কায়রোর একটি আদালতে শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের শাসনামলের কোনো মন্ত্রী প্রথমবারের মতো বিচারের মুখোমুখি হলেন।
আদলির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আদালতকে বলেছেন, ‘এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ পরে বাদী ও বিবাদী পক্ষের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর বিচারক আল-মোহাম্মদী কানসুয়া আগামী ২ এপ্রিল পর্যন্ত বিচারের শুনানি মুলতবি ঘোষণা করেন।
বিচারক কানসুয়া বলেন, মন্ত্রণালয়ের জন্য কাজ করা এক ঠিকাদারের কাছে জমি বিক্রি করতে আদলি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এর বিনিময়ে তিনি আট লাখ ১৩ হাজার ডলার হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশে সাত লাখ ৬২ হাজার ডলার পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
আদলির পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ ইউসেফ মামলার বিভিন্ন নথি পরীক্ষার আদালতে তাঁর মক্কেলকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। তবে বিচারের শুনানি শেষে ইউসেফ কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
পুলিশের দপ্তরে হামলা: গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস করার অভিযোগ এনে গতকাল আলেকজান্দ্রিয়া নগর পুলিশের প্রধান কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে একদল বিক্ষোভকারী। এ সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে কয়েকজন আহত হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে হোসনি মোবারকের পতনের পর থেকে বিক্ষোভকারীরা পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে। মোবারকের পতনের পর থেকে সামরিক বাহিনীর সুপ্রিম কাউন্সিল দেশ চালাচ্ছে।

লিবিয়ার সঙ্গে কাশ্মীরের ঘটনার মিল আছে

লিবিয়ায় বিক্ষোভ দমনে সাধারণ জনগণের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং ব্যাপক দমন-পীড়নকে কাশ্মীরের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন দেশটির নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেন।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে লিবিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের ওই বৈঠকে লিবিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপকে সমর্থন দেওয়ার জন্য মনমোহন সিংকে অনুরোধ জানান গাদ্দাফি। লিবিয়ায় অবস্থিত জাতিসংঘের দূতসহ আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলো যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গাদ্দাফির বিচারের পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন গাদ্দাফি ভারতকে এ অনুরোধ জানান।

মোশাররফকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে দুই সপ্তাহ সময় দিলেন আদালত

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো হত্যা মামলায় দেশটির সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে আরও দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার পাকিস্তানের একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত এই সময় দেন।
২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসলামাবাদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বেনজির ভুট্টো নিহত হন। এ সময় পারভেজ মোশাররফ ছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে তিনি লন্ডনে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। তাঁর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, পারভেজ মোশাররফ এ পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো আদালতেই কোনো শুনানিতে অংশ নেননি।
বিচারক রানা নিসার আহমেদ গত ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর এক সপ্তাহ পর এটি আবার জারি করা হলো।
সরকারপক্ষের আইনজীবী মালিক মোহাম্মদ রফিক জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ বিচারকের কাছে এক মাস সময় চেয়েছিল। কিন্তু বিচারক মাত্র দুই সপ্তাহ মঞ্জুর করেন। রফিক আরও জানান, শুনানির সময় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পারভেজ মোশারফের লন্ডনের বাসভবনে পাঠানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা কামনা করে পুলিশ। এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয় রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের একটি বিচারকক্ষে।

ভারতে জোট সরকার থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা ডিএমকের

ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে অন্যতম শরিক দল ডিএমকে। তবে দলটি সরকারকে ইস্যুভিত্তিক সমর্থন দিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে।
ডিএমকের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তামিলনাড়ু রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় তারা জোট সরকার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ডিএমকের ১৮টি আসন রয়েছে।
ডিএমকের সভাপতি এম করুনানিধি বলেন, ‘আমরা সরকার থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি জানান, মন্ত্রিসভায় দলের ছয় সদস্যও শিগগিরই পদত্যাগ করবেন।
বিভিন্ন দুর্নীতি নিয়ে মনমোহন সরকার যখন বেকায়দায় ঠিক সেই সময় ডিএমকের সমর্থন প্রত্যাহার কংগ্রেসের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র জানায়, ডিএমকে চলে যাওয়ার কারণে সরকারের কোনো সমস্যা হবে না।

আসন ভাগাভাগি নিয়ে কংগ্রেস-তৃণমূল বিরোধ

সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ার ঘোষণা দিলেও দুই দল এখনো আসন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। দুই দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় রয়েছে ২৯৪টি আসন। জাতীয় কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কমিটির সভাপতি মানস ভূইয়া বলেছেন, তাঁরা অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আসন চান। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে তৃণমূল নির্বাচন করুক। কিন্তু এই এক-তৃতীয়াংশ আসন ছাড়তে রাজি হচ্ছে না তৃণমূল। কংগ্রেস ইতিমধ্যে ৯৮টি আসন দাবি করে সেই দাবিপত্র পাঠিয়ে দিয়েছে দলের নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে। কিন্তু মমতা তাঁর দলের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে এত বেশি আসন ছাড়তে নারাজ। প্রথম অবস্থায় মমতা ৪২টি আসন দিতে চাইলেও এখন তাঁরা ৬০টি আসন ছাড়তে রাজি। এতে রাজি হচ্ছে না কংগ্রেস। ফলে আসন ভাগাভাগি নিয়ে জোটের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
এদিকে এই সংঘাতের মধ্যেই গতকাল শনিবার মালদহের জেলা কংগ্রেস সভাপতি আবু হাসান খান জানান, মালদহের ১২টি আসনেই কংগ্রেস প্রার্থী দেবে। এখানে তৃণমূলের জন্য একটি আসনও ছাড়া হবে না। এই ঘোষণার ফলে কংগ্রেস-তৃণমূল জোটে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিক্ষোভ না করতে দেশের মানুষকে সতর্ক করল চীন

আরব বিশ্বের মতো বিক্ষোভ না করতে দেশের মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছে চীন। তারা বলেছে, কমিউনিস্ট পার্টির শাসনে দেশে স্থিতিশীলতা আছে, আর তা নষ্ট হলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম মুখপত্র বেইজিং ডেইলি পত্রিকায় গতকাল শনিবার একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি আরব বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে একের পর এক গণ-আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে চীনের বাইরে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়। কঠোর সেন্সরশিপের কারণে চীনের কোনো ওয়েবসাইটে এ ধরনের প্রচারণা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশের বাইরে এ ধরনের প্রচারণা শুরু হওয়াতেই সেন্সরশিপ আরও জোরদার করা হয়, বাড়ানো হয় বেইজিংয়ের নিরাপত্তা। সেই সঙ্গে বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। গত সপ্তাহে রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় কিছু লোক বিক্ষোভ করতে চাইলে পুলিশ তাঁদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বেইজিং ডেইলির মন্তব্য প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এতে বলা হয়, প্রত্যেকেরই জানার কথা, স্থিতিশীলতা মানেই আশীর্বাদ; আর বিশৃঙ্খলা মানেই বিপর্যয়।
মধ্যপ্রাচের কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উল্লেখ করে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘এই বিশৃঙ্খলা থেকে দেশগুলোর মানুষের ওপর মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। চীনের ভেতর ও বাইরে কিছু লোক চীনে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে। লোকজন উসকে দেওয়ার জন্য তারা ইন্টারনেটকে কাজে লাগাচ্ছে।’
পত্রিকাটি আরও লিখেছে, ‘দেশে ও দেশের বাইরে এমন কিছু লোক সব সময় থাকে, যারা আমাদের উন্নয়নপ্রক্রিয়ার কিছু দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করতে চায়।’ দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য দেশের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানায় পত্রিকাটি। বেইজিং ডেইলির এই নিবন্ধটি অন্য পত্রপত্রিকায়ও ফলাও করে ছাপা হয়।
বেইজিং ডেইলি কমিউনিস্ট পার্টির বেইজিং শাখার মুখপত্র। পার্লামেন্টে বার্ষিক অধিবেশন শুরুর দিনই পত্রিকাটি এই সতর্কবার্তা দিল। গতকাল শনিবার এই অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাও পার্লামেন্ট অধিবেশনে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে দেশের মুদ্রাস্ফীতি সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দিতে পারে। ওই ভাষণে জিয়াবাও স্বীকার করেন, দেশের মানুষের মধ্যে বেশ অসন্তোষ রয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের অনেক মৌলিক সমস্যার সমাধান তাঁর সরকার এখনো করতে পারেনি। আবাসনসমস্যা, খাদ্যনিরাপত্তা, দুর্নীতি ও ভূমি সমস্যাসহ অনেক বিষয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

ভাট্টি হত্যার ঘটনায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে পাকিস্তান সরকার

পাকিস্তানে বন্দুকধারীদের গুলিতে সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টির মৃত্যুর ঘটনায় কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সরকার। ভাট্টিকে সরকার যথাযথ নিরাপত্তা দিতে পারেনি অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিকের পদত্যাগ দাবি করছেন ক্ষমতাসীন দলেরই মন্ত্রী ও এমপিরা। তবে মালিক বলেছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি পদত্যাগ করবেন।
খোদ ক্ষমতাসীন দলেরই কয়েকজন মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, নিরাপত্তাহীনতা বাড়লেও সরকার ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এই অবস্থায় সরকার কত দিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে, তা নিয়ে কথা উঠেছে।
পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অনেক নেতার পক্ষ থেকে পদত্যাগ দাবির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মালিক বলেন, ‘আজ আমি হুমকির মুখে। পরবর্তী সময়ে হয়তো আপনারা আমাকে এই জায়গায় নাও পেতে পারেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, পিপিপির নেতা শেরি রহমান ও ফাওজিয়া ওয়াহাবসহ তিনি নিজেও জঙ্গিদের হামলার তালিকায় আছেন।
ভাট্টিকে নিরাপত্তা দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন দাবি করে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন বিরোধীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও। ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা জামশেদ দোস্তি জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি তাঁর পদে বহাল থাকেন, তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন।
ভাট্টির হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে পিপিপির আরেক এমপি আকরাম মসি গিল জানিয়েছেন, নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি ভাট্টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে আরও নিরাপত্তা চেয়েছিলেন।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মালিকের দাবি, সরকার ভাট্টিকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিয়েছিল, তবে তা কাজে আসেনি। মন্ত্রণালয় থেকে ভাট্টিকে দুটি গাড়ি এবং ১৬ জন নিরাপত্তারক্ষী দেওয়া হয়েছিল। তবে ঘটনার দিন তিনি এই নিরাপত্তা নেননি।
গত সপ্তাহে নিজের পারিবারিক বাড়ির সামনে কয়েকজন বন্দুকধারী ভাট্টির গাড়ি ঘিরে ধরে গুলি করে তাঁকে হত্যা করে। এ সময় তাঁর সঙ্গে কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছিল না।
সরকার সম্প্রতি জানিয়েছে, ভাট্টিকে মন্ত্রিপাড়ায় একটি বাসা দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি সে বাড়িতে ওঠেননি। এ ছাড়া একটি বুলেটপ্রুফ গাড়িও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু গাড়িটি পুরোনো বলে তিনি তা নিতে অস্বীকার করেন।
গত জানুয়ারিতে নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে নিহত হন পাঞ্জাব রাজ্যের গভর্নর সালমান তাসির। এ ঘটনায় সরাসরি কোনো নিন্দা জানাতে অস্বীকার করেছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি। তবে তিনি সম্প্রতি পশ্চিমা কূটনীতিকদের বলেছেন, ওই ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের সহানুভূতি ছিল। লাহোরের লেখক-সাংবাদিক আহমেদ রশিদ এ দাবি করেছেন। ভাট্টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও সেনাবাহিনী কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইউএই উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের তাঁদের দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছেন।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্যোক্তাদের জাহাজ নির্মাণ, অবকাঠামো, খাদ্য ও পানীয়, কৃষি, বন্দর ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বারে আয়োজিত বাংলাদেশ এবং রাস আল খাইমা ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির (রাকিয়া) সঙ্গে ‘বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য প্রসার বৃদ্ধি’-বিষয়ক বাণিজ্য আলোচনায় এসব প্রস্তাব করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম। এ সময় আরএকে অফসোরের জেনারেল ম্যানেজার পিটার সুসটার ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ আসমা ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি টি আই এম নূরুল কবীর।
ডিসিসিআই সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম বলেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য কর অবকাশসহ অন্যান্য সুবিধা এবং আকর্ষণীয় বিনিয়োগ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তিনি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্রবন্দরে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। এতে উভয় দিকে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আরএকে অফসোরের জেনারেল ম্যানেজার পিটার সুসটার বলেন, ম্যানুফ্যাকচারিং, রিয়েল এস্টেট, পর্যটন, কৃষি, যোগাযোগ, হাসপাতাল, শিক্ষা ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগের জন্য আরএকে উপযুক্ত স্থান। তিনি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিনিয়োগকারীদের আয়কর ও ব্যক্তিগত খাতসহ করপোরেট খাতে শূন্য হারে কর দেওয়া ছাড়াও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। তিনি এ সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সে দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের কক্সবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আরএকে অফসোর সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যেটি সারা বিশ্বে বিনিয়োগের জন্য কাজ করে থাকে। আরএকে তাদের সাম্প্রতিক বিনিয়োগবিষয়ক বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের গন্তব্যস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে সেবা খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতে যৌথ বিনিয়োগের খাত নির্ধারণে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে।
মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইয়ের পরিচালক এ এস এম মহিউদ্দিন মোনেম, খাইরুল মজিদ মাহমুদ, সাবেক সভাপতি আর মাকসুদ খান, সাবেক ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি আবদুস সালাম, আশরাফ ইবনে নূর, এম এস সেকিল চৌধুরী, সাবেক পরিচালক সবুর খান, নেসার মাকসুদ খান, সালেম সোলায়মান প্রমুখ অংশ নেন।

প্রথমার্ধে বাজেট ঘাটতি ৫,০২৩ কোটি টাকা

চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ২৩ কোটি ১১ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এতে আরও দেখা যায়, ওই ঘাটতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ছিল চার হাজার ১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ছয় মাসের এই ঘাটতি অর্থায়নে বিদেশি উৎস বড় ভূমিকা রাখছে।
পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বিদেশি উৎস থেকে সরকার তিন হাজার ১০৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। অবশ্য গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল সাত হাজার ৮৯৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সে হিসাবে বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়ন কমেছে প্রায় ১৫৫ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ঘাটতি অর্থায়নে এবারও আমরা সহজ শর্তে স্বল্প সুদের বৈদেশিক উৎসকে গুরুত্ব দিচ্ছি।’ আর বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ১০ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা।
আলোচ্য সময়কালে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে এক হাজার ৯১৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আর গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়ন ছিল নেতিবাচক। কেননা, ওই সময়ে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের তুলনায় আগের নেওয়া ঋণ ফেরত দেওয়ার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। ফলে সরকারের হাতে ফেরতযোগ্য বাড়তি অর্থ জমে গিয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত প্রকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে নেতিবাচক পর্যায়ে, যার পরিমাণ ৭৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের ঋণ ফেরত দেওয়ার পরও এই পরিমাণ ফেরতযোগ্য অর্থ সরকারের হাতে রয়েছে। আর গত অর্থবছরের একই সময়ে আগের ঋণ ফেরত দেওয়ার পরও সরকারের হাতে ফেরতযোগ্য সাত হাজার নয় হাজার ৮১৭ কোটি ১০ লাখ টাকা ছিল।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে সরকার ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে দুই হাজার ৬৯৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৯৩৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণের সিংহভাগই আসে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বা প্রকৃত বিক্রি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৬৯ কোটি ৭২ লাখ টাকার।
এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ শতাংশ কমেছে। এর মানে হলো সঞ্চয়পত্রের বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
একটি নির্দিষ্ট সময়ে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি থেকে ওই সময়ে নগদায়ন করা বা ভাঙানো সঞ্চয়পত্রের পরিমাণ বাদ দিলে যা পাওয়া যায়, তা সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত বা নিট বিক্রি হিসেবে গণ্য করা হয়।
পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, আলোচ্য সময়কালে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি দাঁড়িয়েছে নয় হাজার ১৩৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় সাড়ে ২৩ শতাংশ কম।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার ২৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। অভ্যন্তরীণ উৎসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ১৫ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে আট হাজার কোটি টাকা।
আর ২০১০-১১ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেট অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর সরকার মোট ঘাটতি প্রাক্কলন করেছে ৩৪ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা।
২০০৯-১০ অর্থবছরের সামগ্রিকভাবে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১৮ হাজার ৯৯ কোটি টাকা, যা ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৬২ শতাংশ।

সংকুচিত হয়ে পড়েছে শেয়ারবাজারের লেনদেন

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সপ্তাহে লেনদেনের পরিমাণ আগের সপ্তাহের চেয়ে প্রায় ছয় শতাংশ কমে গেছে। গত সপ্তায় ডিএসইতে দুই হাজার ৫১৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ১৫৬ কোটি টাকা কম।
তবে গত মঙ্গলবার ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে আইসিবির পক্ষ থেকে বাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়াতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ঋণ সমন্বয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করে বিক্রি বা ফোর্সড সেল করছে না বলে দাবি করে।
অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানায়।
এসব ঘটনা বিনিয়োগকারীদের কিছুটা আশান্বিত করে তোলে। এতে সপ্তাহের শেষ দিনে ডিএসইতে সাধারণ মূলসূচক ১৩৬ পয়েন্টের মতো বাড়ে। এভাবে সূচক বাড়ার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, অন্যদিনগুলোর মতো একসঙ্গে বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার বিক্রেতা বা ক্রেতাশূন্য হয়ে না পড়াটা ছিল ভালো লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে কিছু দিন চললে বাজার আবার স্বাভাবিক গতিধারা ফিরে পাবে। কারণ বাজার বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম বা মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় কারবারির মানসিকতার পরিবর্তে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে শেয়ার কিনলে বিনিয়োগকারীরা ভালো ফল পাবেন।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ নিরীক্ষিত বা অনিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী বাজারের পিই গড়ে এখন ১৩-এর ঘরে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ২০ জানুয়ারি বাজার পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ২৩ থেকে ২৪ পিই বাজারে বিনিয়োগের জন্য সহনীয়।
পিই: ডিএসইর সর্বশেষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের গড় পিই ১০-এর ঘরে। রূপালী ও এসআইবিএল ছাড়া প্রায় সব ব্যাংকের পিই ২০-এর নিচে। অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের গড় পিই ১৭। এ খাতের ২১টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ছয়টির পিই ২৫-এর ওপরে। মিউচুয়াল ফান্ডের গড় পিই ছয়-এর নিচে নেমে এসেছে। তবে প্রকৌশল খাতের পিই এখনো ২৫-এর বেশি। এ খাতের ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটির পিই ২৫-এর নিচে রয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি: সব মিলিয়ে গত সপ্তাহে ডিএসইর সাধারণ সূচক কমেছে ৩৭২ পয়েন্ট। সপ্তাহের শুরুতে রোববার সূচক ছিল পাঁচ হাজার ৮০০ পয়েন্ট, যা সপ্তাহ শেষে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে পাঁচ হাজার ৪২৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। অপরদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গত সপ্তাহে এক হাজার ছয় পয়েন্ট কমে। সপ্তাহের শুরুতে স্টক এক্সচেঞ্জটিতে সূচক ছিল ১৬ হাজার ৩৩০ পয়েন্ট, সপ্তাহ শেষে যা ১৫ হাজার ৩২৪ পয়েন্টে নেমে আসে। গেল সপ্তাহে ডিএসইতে ২৬০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৩০টির ও কমেছে ২২৮টি প্রতিষ্ঠানের। ডিএসইতে গত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৫১৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ কম। এ সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন ৫ দশমিক ১০ শতাংশ কমে দুই লাখ ৫০ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল



পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ‘বাংলাদেশ ফান্ড’ নামে একটি ওপেন এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তহবিলটির আকার হবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আজ রোববার দুপুরে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সম্মেলনকক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফায়েকুজ্জামান এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
ফায়েকুজ্জামান বলেন, তহবিলটির ৫০ শতাংশ মুদ্রাবাজারে এবং বাকি ৫০ শতাংশ পুঁজিবাজারে থাকবে। তবে সময়ের সঙ্গে তহবিলটির আকার পরিবর্তন হতে পারে। তিনি আরও জানান, সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি, চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক (সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা), বাংলাদেশে জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) যৌথভাবে এ তহবিলটি গঠন করবে। তবে অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংক ও অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানও তহবিল গঠনে অংশ নিতে পারবে। তিনি জানান, বাজারের বর্তমান অবস্থা ও সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে বিদ্যমান আইনের আওতার মধ্যেই তহবিলটি গঠন করা হচ্ছে।
আইসিবি তহবিলটির স্পন্সর হিসেবে কাজ করবে এবং অন্য সাতটি প্রতিষ্ঠান জয়েন্ট স্পন্সর হিসেবে থাকবে। স্পন্সর হিসেবে আইসিবি তহবিলের মোট অর্থের ১০ শতাংশ অর্থাত্ ৫০০ কোটি টাকা দেবে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাকি অর্থের জোগান দেবে। তিনি বলেন, তহবিলটি অনুমোদনের জন্য এ সপ্তাহের মধ্যে আইসিবির পরিচালনা পর্ষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে অন্য সাতটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সম্মতিক্রমে এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) অনুমোদনের পরপরই তহবিলটি বাজারে আসবে।
এদিকে তহবিলটি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নতুন করে বাজারে আসা সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ১০ শতাংশ এবং নতুন আইপিওর ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫ শতাংশ তহবিলটিকে শুধু অভিহিত মূল্যে দেওয়ার ব্যাপারে প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।
ফায়েকুজ্জামান আশা প্রকাশ করেন, নতুন এই তহবিলটি গঠনের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হবে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। বাজারে স্থিতিশীলতা ছাড়াও বিভিন্ন স্টেক হোল্ডার নতুন এই তহবিল থেকে সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এই তহবিল গঠনে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

প্রিমিয়ার ব্যাংক ও বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রডসের লভ্যাংশ ঘোষণা

প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড ৩১ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ এবং বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রডস ৫ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আজ রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য ৩১ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের ‘হল অব ফেম’-এ অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ২০ মার্চ। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি মোট আয় ৬০.৮ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ২০.৫০ টাকা এবং মোট নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ৭.১২ টাকা।
বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রডস : প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১০ সালের জন্য ১০ শতাংশ শেয়ার এবং ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ১৭ এপ্রিল বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকার রমনায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ২০ মার্চ। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি মোট আয় ১.১৯ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ৫৭৫.০৮ টাকা এবং মোট নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ০.৫০ টাকা।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর হবে না

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ক্রিকেট সম্ভবত আর হবে না! এই ইঙ্গিত দিয়েছেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাত। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া এই ওয়ানডে টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাল তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি ফরম্যাটের সর্বোচ্চ আয়োজনে আমরা নতুন কিছু একটা করার চেষ্টা করছি। পরবর্তী ধাপটা যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে অবশ্যই আমাদের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নিয়ে ভাবতে হবে।’
এতেই আইসিসির লক্ষ্যটা পরিষ্কার, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নিয়ে এখন আর তারা আগ্রহী নয়। প্রতি দুই বছর পর পর অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টের পরিবর্তে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ করার কথা ভাবা হচ্ছে। ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হওয়ার কথা ইংল্যান্ডে, এটা না হলে সেখানেই ওই সময় টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ হবে।
আগামী বিশ্বকাপে কতগুলো দল খেলবে—এ প্রশ্নের উত্তরটাও শিগগিরই চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দেবে আইসিসি। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত, ১০টি টেস্ট খেলুড়ে দেশ নিয়ে ২০১৫ সালে হবে পরের বিশ্বকাপ ক্রিকেট। আগামী মে মাসে আইসিসির সভায় এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।

এক ম্যাচে চার শূন্য

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিজেদের সর্বনিম্ন স্কোর করার পথে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা ছুঁয়েছেন এক ইনিংসে সর্বাধিক শূন্যের নিজেদের রেকর্ডও। চারজন ব্যাটসম্যান শূন্য রানে আউট হয়েছেন এদিন। তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, শফিউল ইসলাম ও রুবেল হোসেন। এক ইনিংসে চার বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের শূন্য রানে আউট হওয়ার সপ্তম উদাহরণ এটি।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচটিতেই চার ব্যাটসম্যান শূন্য রানে আউট হন। শ্রীলঙ্কার মোরাতুয়ায় হওয়া দ্বিতীয় এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে নুরুল আবেদীন, গাজী আশরাফ, জাহাঙ্গীর শাহ ও সামিউর রহমান শূন্য রানে আউট হন। ওয়াসিম আকরামের পেস ও আবদুল কাদিরের ঘূর্ণি বলে দিশেহারা বাংলাদেশ ৩৫.৩ ওভারে মাত্র ৯৪ রানে অলআউট হয়। বাংলাদেশের চার ব্যাটসম্যানের শূন্য রানে আউট হওয়া ম্যাচগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো।

কেভিনকে হেইডেনের অভিনন্দন

রেকর্ড হাতছাড়া হওয়ার দুঃখ আছে। কিন্তু তাতেও সান্ত্বনা আছে ম্যাথু হেইডেনের। তাঁর রেকর্ড যিনি ভেঙেছেন, তাঁর ব্যাটে যে ছারখার হয়েছে চিরশত্রু ইংল্যান্ড!
আইরিশ এক তরুণ কেভিন ও’ব্রায়েনের ব্যাটে যখন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তাঁর ৬৬ বলে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড, হেইডেন তখন দুর্গম এক এলাকায়। আধুনিক দুনিয়ার সঙ্গে প্রায় যোগাযোগবিহীন, ডারউইন উপকূল থেকে ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে, টিউয়ি নামের এক দ্বীপে। এই দ্বীপে বেশ কিছু সমাজসেবামূলক কাজ করছে হেইডেনের দাতব্য সংস্থা ‘দ্য হেইডেন ওয়ে’। সেখানেই একটা অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানের ঠিক আগ মুহূর্তে স্থানীয় ভূমি পরিষদের চেয়ারম্যান সিরিল রাইওলি হেইডেনকে জানালেন, ৫০ বলে সেঞ্চুরি করে কেভিন ভেঙে দিয়েছেন হেইডেনের রেকর্ড।
হেইডেনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘তাই নাকি? জানি না তো, সত্যি?’ রাইওলি এবার জানালেন বিস্তারিত, জানালেন গোটা দশেক (আসলে ১৫) বল কম লেগেছে কেভিন ও’ব্রায়েনের। একাই হারিয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ডকে। টিউয়ি দ্বীপ থেকে ডারউইনে ফিরেই আইসিসির মিডিয়া ও যোগাযোগ কমিটির প্রধান ও ২০১১ বিশ্বকাপের মিডিয়া ডিরেক্টর কলিন গিবসনকে মেইল করে হেইডেন জানিয়েছেন, ‘অসাধারণ এই অর্জনের জন্য কেভিনকে হূদয়ের গভীর থেকে অভিনন্দন। ও ইংলিশদের তুলাধোনা করেছে, এবারে অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়া যেটা করতে পারেনি!’

বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখছে আইসিসি

ওয়েস্ট ইন্ডিজের টিম বাসে ঢিল, ঢিল পড়েছে সাকিব আল হাসানের মাগুরার বাড়িতেও। এ খবরগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কারণে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছে ক্রিকেট-বিশ্বে। আসল ব্যাপারটি যতই বিচ্ছিন্ন এবং ছোট হোক না কেন, বিশ্ব মিডিয়ায় এই খবর ঠাঁই পেয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে। কদিন আগে বাংলাদেশি সমর্থকদের ক্রিকেট-প্রেম নিয়ে যেসব পত্রিকায় গালভরা প্রশংসা ছিল, সেই একই পত্রিকায় গুটিকয়েক সমর্থকের এই কাণ্ডের জন্য পৌঁছে গেল ভুল বার্তা। আশার কথা, আইসিসি এটিকে দেখছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই।
কাল চেন্নাইয়ে আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাতের সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্ব পেল পরশুর এই প্রসঙ্গ। লরগাত বলেছেন, ‘এ ঘটনা অবশ্যই হতাশাজনক। এটি আমাদের কাম্য নয়। তবে আমাদের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। এটা আসলে ছিল বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা।’
অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনা ঘটার পর বাংলাদেশের নিরাপত্তাকর্মীদের তাৎক্ষণিক উদ্যোগেও সন্তুষ্ট আইসিসি, ‘যে ঘটনা ঘটেছে, তার পরও আমি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট। পুলিশ সেখানে ছিল। এ ঘটনায় তারা কয়েকজনকে দ্রুত গ্রেপ্তারও করেছে।’ কেন এটিকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা হিসেবে দেখছেন, সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন লরগাত, ‘হাতেগোনা কয়েকজন বাসে ইটের ছোট টুকরো ছুড়ে মেরেছে। সেগুলো আসলেই ছোট টুকরো ছিল।’
নিরাপত্তা আয়োজনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর তাই আস্থা হারাচ্ছে না আইসিসি। লরগাত বলেছেন, ‘আগেও বলেছি, যে নিরাপত্তাব্যবস্থা আমরা নিয়েছি, তাতে আমি খুব, খুবই সন্তুষ্ট। আমাদের অভিজ্ঞ কর্মী আছে, অভিজ্ঞতাও আছে। বাংলাদেশ নিজস্ব উদ্যোগে এ ব্যাপারে একটা প্রতিবেদন তৈরি করছে। আমি নিশ্চিত, এরপর যথাযথ উদ্যোগই নেওয়া হবে।’
সব মিলে সমর্থকদের বৃহত্তর অংশটির আচরণটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে আইসিসির কাছে। চার-পাঁচজনের এমন অবিবেচক কাণ্ডে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের নিখাদ ক্রিকেট-প্রেম তো আর কলঙ্কিত হতে পারে না। তবে রাগে বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলা ওই অংশটির মনোভাবও বুঝতে পারছেন লরগাত, ‘আসলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাংলাদেশকে এত সহজে হারিয়ে দিয়েছে বলেই এই হতাশার জন্ম নিয়েছে।’
এখনো গ্রুপ পর্বেরই তিনটি ম্যাচ বাকি আছে বাংলাদেশের সূচিতে। ১১ মার্চ ইংল্যান্ড, ১৪ মার্চ হল্যান্ড এবং ১৯ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকা খেলবে বাংলাদেশের মাটিতে। এরপর বাংলাদেশে দুটি কোয়ার্টার ফাইনালও হবে। একটা গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, হয়তো এরপর বিদেশি দলগুলো বাংলাদেশে যেতে রাজি হবে না। কিন্তু লরগাত বলছেন, এ ধরনের কিছু ঘটনার আশঙ্কা নেই, ‘আমাদের খুবই দৃঢ় একটা নিরাপত্তা পরিকল্পনা আছে। আমি নিশ্চিত, টুর্নামেন্ট তার সূচি অনুযায়ীই এগোবে। বাংলাদেশ থেকে ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।’
তার মানে কিন্তু এই নয় আইসিসি নিরাপত্তার বিষয়টি হালকা করে দেখছে। কারণ লরগাত এও মনে করিয়ে দিয়েছেন, পরিস্থিতি গুরুতর হলে নির্দ্বিধায় এক ভেন্যু থেকে ম্যাচ অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হবে, ‘অগুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছুর কারণে আমরা ম্যাচ সরাব না। তবে এমন নয় এই পদক্ষেপ একেবারেই বাতিল করে দেওয়া হলো। যদিও এদিন যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা কিন্তু ম্যাচ সরিয়ে ফেলার মতো গুরুতর নয়।’
বাংলাদেশি সমর্থকদের ওই ক্ষুদ্র অংশটিরও বোধ হয় সতর্ক হওয়ার সময় এসে গেছে!

ঢাকার ঘটনায় ক্ষুব্ধ ধোনি

গতবার বিশ্বকাপ-পরবর্তী অভিজ্ঞতার কথা ভালোই মনে আছে। বাংলাদেশের গুটি কয়েক সমর্থক বাসে ঢিল ছোড়াতেই মহেন্দ্র সিং ধোনি তাই সতর্ক। ভারতীয় সমর্থকদের আবেগের বেগ কমাতে পরামর্শ দিলেন ধোনি। ঢাকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বাসে ঢিল পড়া প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘এটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু সমর্থকেরা এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানায়। একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। খেলোয়াড়েরা হয়তো বাড়িতে থাকছে না (হোটেলের নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে আছে), কিন্তু তাদের পরিবার বাড়িতেই থাকে, ক্রিকেটের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আপনাকে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা শিখতেই হবে।’
২০০৭ বিশ্বকাপের পর ধোনির বাড়িতেও ঢিল পড়েছিল। সেই ঘটনা উল্লেখ করে ভারতীয় অধিনায়ক বলেছেন, ‘যখন জিতি, আমরা তো আর সমর্থকদের পেটাতে যাই না। বলি না, এই তোমরাই তো ২০০৭ সালে আমার বাড়িতে ঢিল ছুড়েছিলে।’ ভালো সমর্থকের সংজ্ঞাটিও আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন ধোনি, ‘যখন আমরা ভালো করি না, সেই সময়ই খেলোয়াড়দের সমর্থন সবচেয়ে জরুরি। অথচ যখন জিতবেন, তখন সবাই পাশে থাকে। পাশে থাকা উচিত যখন আপনি ভালো করবেন না তখনো। যারা থাকে, তারাই প্রকৃত সমর্থক। বাকি যারা আছে, তারা কেবল জিতলেই দলকে নিয়ে মাতামাতি করে। দল যখন জিতে যায়, সেই সময় তারাই সাচ্চা সমর্থক বনে যায়। যেন ওদের চেয়ে বড় সমর্থক আর কেউ নেই।’

আয়ারল্যান্ড-হত ইংল্যান্ডকে সমীহ স্মিথের



গ্রায়েম স্মিথের তো প্রশ্নটা শুনে খুশি হওয়াই উচিত ছিল। উল্টো বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘সম্ভবত পঞ্চাশতম বারের মতো আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে!’
গত কয়েক বছর ইংল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকা মুখোমুখি হলেই যে আলোচনাটা বড় হয়ে ওঠে, প্রশ্নটা তা নিয়েই। পিটারসেন-স্ট্রাউস-ট্রটদের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইংল্যান্ডকে অনেকে বলে ফেলছেন ‘দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা!’ একই কথা বারবার শুনতে কাঁহাতক আর ভালো লাগে! স্মিথ তাই বিরক্ত হতেই পারেন।
তাহলে খুশি হওয়ার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে? স্মিথ খুশি হতে পারতেন এই ভেবে যে, এই প্রশ্নটা তো আর খারাপ কিছু নয়, অন্তত ওই প্রশ্নটা তো এখনো শুরু হয়নি! বড় টুর্নামেন্টে অবধারিতভাবেই যে প্রশ্নটা কুইনাইনের মতো গিলতে হয় দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়ককে। যে প্রশ্ন তাঁর কানে ‘চোকার্স’ ‘চোকার্স’ ‘চোকার্স’ প্রতিধ্বনি তুলতে থাকে।
এবার সেই অপবাদকে মাটিচাপা দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছে গ্রায়েম স্মিথের দল। প্রথম দুই ম্যাচে দোর্দণ্ড প্রতাপে জিতেছেও। তবে আসল পরীক্ষা তো বাঁচা-মরার ম্যাচে। আজকের ম্যাচটিকে বলতে পারেন প্রথম বড় পরীক্ষা। এমন এক দল প্রতিপক্ষ, যাদের বিপক্ষে নিষ্পত্তি হওয়া সর্বশেষ আট ম্যাচের সাতটিতেই পরাজয়। স্মিথ অবশ্য এর চেয়েও বড় করে দেখছেন আয়ারল্যান্ডের কাছে ইংল্যান্ডের ধরাশায়ী হওয়াকে। ‘বড় করে দেখছেন’ উল্টো অর্থে। আয়ারল্যান্ডের কাছে পরাজয়ে নিশ্চয়ই আগুন জ্বলছে স্ট্রাউসের মনে। এই ম্যাচে ইংল্যান্ড তাই নখদন্ত বের করে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
নখদন্ত বের করে ঝাঁপিয়ে পড়া কথাটা বোলিংয়ের সঙ্গেই যায় এবং এখানে একটুও যাচ্ছে না। এই বিশ্বকাপের প্রথম তিন ম্যাচে ইংল্যান্ডের বোলিং তো বাপুরাম সাপুড়ের ওই সাপ—দাঁত নেই, চোখ নেই, কাটে না তো মারে না। ‘করে না তো ফোঁসফাস’টাই বা বাদ থাকে কেন? তিন ম্যাচে ৯৫৯ রান দিয়ে অ্যান্ডারসন-ব্রডরা তো এখন পর্যন্ত ‘দাতা মুহসীন’-এর ভূমিকায়।
তার পরও স্মিথ এটি নিয়ে ‘মাইন্ড গেম’ না খেলে উল্টো যে সমীহের গান গাইছেন, তার কারণ একটাই। দুই অ্যান্ড্রু—স্ট্রাউস-ফ্লাওয়ারের এই ইংল্যান্ড অনেকবারই মাটিতে পড়ে গিয়েও এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়েছে। এই বিশ্বকাপে মাটিতে না পড়ে গেলেও পড়পড় অবস্থা তো অবশ্যই। হল্যান্ড, ভারত ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম তিন ম্যাচে অন্তত ৪ পয়েন্ট তো ধরেই রেখেছিল ইংল্যান্ড। পয়েন্ট মাত্র একটাই কম হয়েছে, কিন্তু তাতেই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সমীকরণটা শেষ তিন ম্যাচের অন্তত দুটিতে জয় দাবি করছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পর বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ—আজ হেরে গেলে চট্টগ্রামে খেলতে নামবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ইংল্যান্ড।
সেটি অবশ্য মজাই হবে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এক দল খেলবে ৫৮ রানে অলআউট হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকা এক দলের বিপক্ষে! ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা মহারণেও তাই প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকছে বাংলাদেশ। কোয়ার্টার ফাইনাল-স্বপ্ন পূরণে এই দুই দলের একটিকে হারাতেই হবে বাংলাদেশকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন কোনো দলই কারও অচেনা নয়। তার পরও আজকের ম্যাচটি ভালো একটা হোমওয়ার্কের সুযোগ করে দিয়েছে সাকিব-সিডন্সকে।
কাল চেন্নাইয়ে বাংলাদেশ থাকল অন্যভাবেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজের টিম বাসে ঢিল বাংলাদেশে বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। আইসিসির প্রধান নির্বাহীকে সংবাদ সম্মেলনও করতে হলো এ নিয়ে। ‘মামুলি ব্যাপার’ বলে আপাতত সেই সংশয় থেকে মুক্তি দিয়েছেন বাংলাদেশকে। তবে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে যে মিরপুরের আর বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল দেখার সুযোগ না-ও হতে পারে, সেই প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারিও কিন্তু পাওয়া গেল হারুন লরগাতের কথায়।
ম্যাচের আগের দিনের এই অংশটাকে মনে হলো সুর কেটে যাওয়া। এমন মন ভরিয়ে দেওয়ার সব উপাদান মজুদ এই ম্যাচে যে ক্রিকেটীয় আলোচনাতেই তো সারা বেলা কেটে যাওয়া উচিত। স্বরূপে ফিরতে পারবেন অ্যান্ডারসন-ব্রডরা? আরেকটি সেঞ্চুরি করে ইতিহাস গড়বেন এবি ডি ভিলিয়ার্স? তিন ম্যাচেই রানের ফোয়ারা ছোটানো ইংল্যান্ডের টপ অর্ডারের সঙ্গে স্টেইন-মরকেলের লড়াইটাও তো জিবে জল এনে দেওয়ার মতো। আর কেভিন পিটারসেন? প্রথম তিন ম্যাচে ৩৯, ৩১ ও ৫৯ করে আউট হয়ে যাওয়ার আক্ষেপ কি আজই ঘুচবে?
‘দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা’ আলোচনাটা এই পিটারসেনকে দিয়েই শুরু। জন্মভূমির বিপক্ষে খেলতে নামলেই যেন ‘দেখো, তুমি কী হারিয়েছ’ মনে করিয়ে দেওয়ার জেদ খেলা করে তাঁর রক্তে। ক্যারিয়ার-গড় যেখানে ৪১.৪০, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেটিই তাই ৭১.৫৫ হয়ে যায়। ৮৭ থেকে বেড়ে স্ট্রাইক রেট হয়ে যায় ১০১-এর বেশি। এই ম্যাচে পিটারসেনকে ঘিরে আরেকটি কৌতূহলের কারণ যোগ হয়েছে। হার্নিয়ায় ভুগছেন—এই খবরটা প্রকাশ্য হয়েছে। বিশ্বকাপের পর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তও। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে অনেকক্ষণ ফিল্ডিং করেননি। পিটারসেন সমস্যা নিয়েই নামছেন জানার পর গ্রায়েম স্মিথ কি আজ সেটি অনুমোদন করার লোক!
পিটারসেন এই ম্যাচের আকাশে অনেক তারার একটি। আগ্রহ আর কৌতূহল উৎপাদনে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা তারাটির বয়স মাত্র দুই ম্যাচ। নাম ইমরান তাহির। প্রথম দুই ম্যাচে ৭ উইকেট নিয়েছেন। ক্রিকেট রোমান্টিকদের মন ছুঁয়ে যাওয়ার আসল কারণ উইকেট-টুইকেট নয়, ক্লাসিক্যাল লেগ স্পিনের প্রদর্শনী। আবদুল কাদির-মুশতাক আহমেদের উত্তরসূরি টিপিক্যাল এক পাকিস্তানি লেগ স্পিনার। পাকিস্তানি পরিচয় অবশ্য অতীত, এখন পুরোদস্তুর দক্ষিণ আফ্রিকান। বোলিং করার সময় যেমন উইকেট নেওয়া ছাড়া আর কিছু ভাবেন না, কথাবার্তাতেও তেমনই। সেই কবে বলে রেখেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেললে সবাই যেন মনে রাখে এভাবেই খেলবেন। দক্ষিণ আফ্রিকা যখন তাঁর ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, সটান বলে দিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বমানের কোনো স্পিনার চাইলে তিনি হাত তুলে দাঁড়াতে তৈরি হয়ে আছেন।
স্টেইন-মরকেলের সঙ্গে ইমরান তাহির—ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের জন্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটা এর চেয়ে কঠিন আর হতে পারত না। গত কয়েক দিন ইংল্যান্ড দলের স্পিন কোচের সঙ্গে শুধু ইংলিশ স্পিনাররাই নয়, পিটারসেন-স্ট্রাউসরাও তাই অনেক সময় কাটালেন।
স্পিন কোচের নাম যে মুশতাক আহমেদ!

অসমাপ্ত স্বাধীনতাস্তম্ভ

পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল আসলে ঐতিহাসিক সাতই মার্চের জনসভায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে সংকল্পবদ্ধ জনস্রোতই সারা বাংলায় স্বাধীনতার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিল। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এখান থেকে স্বাধীনতার শুরু এবং এখানেই ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের সমাপ্তি। এই বিরাট কীর্তি অমর করে রাখা গত ৪০ বছরে সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণও গত ১৩ বছরে সম্পূর্ণ না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। অসমাপ্ত অবস্থাতেই আজ স্বাধীনতাস্তম্ভ উদ্বোধন করা হচ্ছে। একে অভিনন্দন। কিন্তু কেন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি এত দিন ধরে ঝুলে আছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া প্রয়োজন।
১৯৯৮ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আগের বছরই এর পাশে শিখা অনির্বাণের উদ্বোধন হয়। শিখা অনির্বাণের শিখা এখনো অনির্বাণ আছে, কিন্তু স্বাধীনতাস্তম্ভ পুরোপুরি মাথা তোলেনি। প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তর বলছে, ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খাতা-কলমে যা শেষ, বাস্তবে তা অনেকটাই অসম্পূর্ণ। স্বাধীনতাস্তম্ভের কাচের স্তম্ভটি নির্মিতই হয়নি। এ অবস্থায় সরকার আজ এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও স্থানটি অগোছালো, অরক্ষিত ও আবর্জনাপূর্ণ ছিল। বোঝা যায়, স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে শেষমুহূর্তে ব্যর্থতা ঢাকতেই এই উদ্বোধনের আয়োজন।
প্রকল্পটি বারবার বাধার মুখে পড়েছে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, ১৯৯৮ সালে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়, বরাদ্দ কমানো হয়; মূল নকশাতেও পরিবর্তন আসে। এর পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর পেরিয়ে এখন নির্বাচিত মহাজোট সরকারেরও দুই বছর পার হয়েছে। কিন্তু তারাও প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে পারেনি। এরই মধ্যে মন্ত্রীর একটি মন্তব্যের জের ধরে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি পদত্যাগ করে। গত রোববারের প্রথম আলোর সংবাদ অনুসারে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এই কমিটিকে নতুন করে সক্রিয় করতে ইচ্ছুক নন। অন্যদিকে, দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১৬৫ কোটি টাকা। এসবের ব্যাখ্যা তো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথা সরকারকেই দিতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাসংগ্রাম, একাত্তরের আত্মদান—সবই যেন আবেগ আর উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিকতায় বন্দী। তা না হলে বঙ্গবন্ু্লর যুগান্তকারী সাতই মার্চের ভাষণ, ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ইতিহাস সৃষ্টিকারী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের পীঠস্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে এত বিলম্ব হতো না। সরকার বলছে, ২০১২ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হবে। আশা করি, এ কথা রক্ষিত হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদেরও তাঁদের ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে। স্বাধীনতাস্তম্ভ কেবল ভবন বা কাঠামো নয়, তা ফুটিয়ে তুলবে স্বাধীনতার আবহ। সেই আবহ জীবন্ত করে তোলা কারিগরি কাজ নয়, আন্তরিক সৃজনশীলতার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন তাই ফুরায়নি।

যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে করণীয়

একসময় বলা হতো, যার হয় যক্ষ্মা তার নেই রক্ষা। কিন্তু এখন যক্ষ্মার সুচিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। এটা নিরাময়যোগ্য রোগ। প্রধান শর্ত হলো, নিয়মিত ও নির্ধারিত মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে হবে। সেখানে ভুল হলে যক্ষ্মার জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। একে বলা হয় এমডিআর যক্ষ্মা (মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবি)। তখন রোগের চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমডিআর যক্ষ্মা রোগীদের পৃথকভাবে ও আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা করারই নিয়ম। না হলে অন্য রোগীর মধ্যেও এই বিপজ্জনক রোগের সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। রোববার প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে অনিয়ম ও শৈথিল্য চলছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক।
মারাত্মক গণ্য করে এমডিআর যক্ষ্মা রোগীদের শুধু জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে একই ওয়ার্ডে সাধারণ যক্ষ্মা রোগী ও অন্য রোগীদেরও রাখা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, শয্যার তুলনায় রোগী বেশি বলে নিয়ম ভাঙতে হচ্ছে। কিন্তু এতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা কি উপেক্ষা করা যায়? কারণ, এমডিআর যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কঠিন ও ব্যয়সাধ্য। এ রোগের সংক্রমণ রোধ করার কর্তব্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। শয্যাসংখ্যার অভাব কোনো অজুহাত হতে পারে না। অর্থসংকট থাকলে নতুন তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বাগ্রে এদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের বেশ সাফল্য রয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল) অনুযায়ী যক্ষ্মায় মৃত্যুহার ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা। ১৯৯০ সালে প্রতি লাখে যক্ষ্মায় মারা যেত ৭৬ জন। ২০০৯ সালে সেই সংখ্যা কমে হয়েছে লাখে ৪৫ জন। আগামী চার বছরে এই মৃত্যুহার লাখে ৩৮ জনে নামিয়ে আনা খুবই সম্ভব। এ জন্য দরকার সচেতন উদ্যোগ।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে ডটস (সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যক্ষ্মার চিকিৎসা) পদ্ধতির চিকিৎসায় মোটামুটি সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে এ চিকিৎসা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টি করা ছাড়া পূর্ণ সাফল্য পাওয়া যাবে না। ধারাবাহিক প্রচেষ্টা থাকলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে ক্রমান্বয়ে যক্ষ্মা নির্মূলের দিকে আমরা যেতে পারব। পৃথিবী থেকে বসন্ত নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। যক্ষ্মাও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আজ আর দূরের বিষয় নয়।

ইংলিশদের ভাবনায় ফিল্ডিং

দারুণ একটা কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছে আয়ারল্যান্ড। ইংলিশদের বধ করে ‘বি’ গ্রুপটাকে উন্মুক্ত তো করে দিয়েছেই, সঙ্গে দলগুলোর মধ্যে ছিটিয়ে দিয়েছে যুদ্ধের মনোভাব। প্রতিটি ম্যাচই যেন এখন একেকটা যুদ্ধ! আজ চেন্নাইতে আক্ষরিক অর্থেই ‘বড়’ ম্যাচ। এটি আরও ‘বড়’ হয়ে উঠেছে নাগপুরের আইরিশ-কাণ্ডের রেশ লাগায়। আজ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিপক্ষ যে ‘আইরিশ-শিকার’ ইংল্যান্ড।
যুদ্ধের হাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা শিবিরে। তবে উত্তাপটা ইংল্যান্ড শিবিরে বেশি। হল্যান্ডের বিপক্ষে জয় এবং ভারতের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী ‘টাই’তে যে ইংলিশরা কোয়ার্টার ফাইনালের রাস্তাটা সহজ ভাবতে পারছিল, আয়ারল্যান্ড সেটা কঠিন করে দিয়েছে। শেষ আটে উঠতে স্ট্রাউসদের পরের তিন ম্যাচের দুটিতে জয় দরকার। তিনটি ম্যাচই টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে।
দুটি নয় জোনাথন ট্রট বলছেন তিনটি ম্যাচেই তাঁদের জয় পাওয়া সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এই ইংলিশ ব্যাটসম্যান যেন দলকে উজ্জীবিত রাখতে চাইছেন, ‘আমাদের ম্যাচ (আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে) জেতা উচিত ছিল। কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গেছে। বিশ্বকাপে আমাদের আরও তিনটি ম্যাচ আছে। তিনটি ম্যাচেই আমাদের জেতা সম্ভব। ভালো পারফর্ম এবং কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার এটা দারুণ সুযোগ। এই সময়টা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
আয়ারল্যান্ডের কাছে হারের পরই ইংলিশ মিডিয়ায় শুরু হয়ে গেছে স্ট্রাউসদের স্বপ্ন মিলিয়ে যাওয়ার আলোচনা। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারলে পরিস্থিতি কেমন ঘোলাটে হবে স্ট্রাউস-পিটারসেনদের তা খুব ভালো জানা। কিন্তু জয়ের কথা ভাবতেই তাদের সামনে হতাশার প্রতীক হয়ে ফুটছে বাজে ফিল্ডিং।
প্রথম ম্যাচে হল্যান্ডের বিপক্ষে জিতলেও বোলিং-ফিল্ডিং ছিল যাচ্ছেতাই। অধিনায়ক স্ট্রাউস অসন্তুষ্ট ছিলেন। গ্রায়েম সোয়ান তো এমনও বলেন, ‘ফিল্ডিং ছিল স্কুলছাত্রদের মতো।’ গণ্ডায় গণ্ডায় ক্যাচ মিসের ফল কী সেটা ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছে আয়ারল্যান্ড, নির্দিষ্ট করে বললে কেভিন ও’ব্রায়েন। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের আগে ইংলিশরা তাই ফিল্ডিং নিয়েই ভাবছে বেশি। শুক্রবার চেন্নাইতে পা দিয়ে দুই ঘণ্টা তারা ঢালল শুধু ফিল্ডিংয়ের পেছনেই। ফিল্ডিং নিয়ে শিষ্যদের বাড়তি পরিশ্রমে সন্তুষ্ট ফিল্ডিং কোচ রিচার্ড হ্যালসাল।

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ! by মিজানুর রহমান খান

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অসম্মানজনকভাবে বিদায় দেওয়ার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের নিম্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা। এই কাণ্ড ঘটিয়ে ভিন্নমতকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আনুগত্যহীনদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই নিকৃষ্ট রূপটি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে তাজউদ্দীন আহমদের কথা। ওই সময়ে তাঁর অবস্থান অন্য সতীর্থদের মতো ছিল না। অনেক বিষয়ে তাঁর ভিন্নমত ছিল। সে জন্য তাঁকে খেসারত দিতে হয়।
ড. ইউনূস নোবেল জিতেছিলেন বলে কি রুষ্ট হন শেখ হাসিনা? ইউনূস দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেসব অন্যতম উপসর্গ। আসল রোগ নয়। গ্রামবাংলায় বিরল, যেখানে একজন মানি লোক আছেন যিনি স্থানীয় দলীয় এজেন্ট বা মাস্তানকে কুর্নিশ করছেন না, সেলাম ঠুকছেন না, ভেট-ভোট দিচ্ছেন না। নিরীহ নাগরিকের সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে না রাষ্ট্র। রাষ্ট্রযন্ত্র শুধু মেধা ও প্রজ্ঞার জন্য কাউকে কুর্নিশ করছে এমনটা কোথাও নেই। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বহু ব্যক্তির বিকাশ ও সহাবস্থান আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বেশি দিন ধারণ করতে পারে না। আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনেকেই সামন্ত আমলের জমিদারের মতো। তাঁরা দেশটাকে নিজের জমিদারি মনে করেন। অজ্ঞতা ও স্বেচ্ছাচারিতা তাঁদের ধর্ম। আমরা তাকে কখনো জাতীয়তাবাদী, কখনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিহ্নিত করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। তাঁরা সংবিধান ও গণতন্ত্রের লেবাস বেশিক্ষণ গায়ে চাপিয়ে রাখতে পারেন না। অভ্যাস নেই। অস্বস্তি লাগে। তাই হঠাৎ হঠাৎ লেবাসটা খসে পড়ে।
ড. ইউনূসের ছায়াটা আরও প্রকাণ্ড হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববাঙালি হওয়ার পথে তাঁর ছায়াটা দীর্ঘতর হচ্ছিল। কিন্তু তা ব্যক্তির পূজায় লাগছিল না। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অসম্মানজনক অন্তর্ধানের কারণও ওই একই সুতোয় গাঁথা। আমিই শক্তি, নৈবেদ্য আমারই প্রাপ্য। প্রশ্নটা নিরঙ্কুশ আনুগত্যের। একইভাবে ড. কামাল হোসেনকে ‘বস্তি থেরাপি’ দেওয়া হয়েছিল। এভাবে আমরা আমাদের ইতিহাসে এটা দেখব যে—কি সামরিক কি বেসামরিক—একজন ব্যক্তিকে আমরা আরাধনার পাত্রে পরিণত করি। আর তাঁকে ঘিরে অন্য সবার অনন্ত আরাধনা আশা করি। অনেক জ্ঞানীগুণী তাই বড় দলে ভাত পান না। হারিস চৌধুরী ও মোসাদ্দেক আলী ফালুর মতো মাপের ব্যক্তি ভাত পান। তাঁরাই রাজনৈতিক উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হন। কিচেন ক্যাবিনেটে মোসাহেবদের রোশনাই বরাবর।
হাইকোর্টে শুনানি শুনছিলাম। রাষ্ট্রের ধাতব কণ্ঠ শুনলাম। রাষ্ট্র বলছে, মোদ্দা কথা, এটা বয়সের ব্যাপার। বয়সগত একটা সর্বজনীন ব্যাপার আছে। সবচেয়ে হাস্যকর ও ঠুনকো যুক্তি। আমরা ব্যক্তির জন্য সংবিধান তাঁর পায়ের মাপে করে নিতে ওস্তাদ জাতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হবেন প্রধানমন্ত্রী, তাই একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতেই নির্বাহী ক্ষমতা সমর্পিত হলো। মুজিব হবেন রাষ্ট্রপতি, তাই সংবিধানে লেখা হলো, ধরে নিতে হবে যেন তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। সামরিক ফরমানের যুগেও যেই লাউ সেই কদু। জিয়া সিএমএলএ থাকবেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনাও পুর্ণ করবেন। সেভাবে ফরমান পয়দা হলো। বিচারপতি সাত্তারের জন্য ষষ্ঠ সংশোধনী ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের জন্য আমরা একাদশ সংশোধনী পাস করেছি। বিচারপতি কে এম হাসানের জন্য এল ১৪তম সংশোধনী। এর আগে বয়সের ফাঁদ পেতে প্রধান বিচারপতি বধ করেন ‘বিশ্ববেহায়া’ এরশাদ। ড. ইউনূসের মতো প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন আকস্মিক ‘নো-বডি’ হন।
আমরা আইনের চোখে (অ)সমতা নিশ্চিত করা জাতি। সে জন্য আমরা ইউনূসকে ‘নিয়মিত কর্মকর্তার’ ঊর্ধ্বে তুলিনি। তবে তাঁকে স্বপদে বহাল রাখতে সংবিধান সংশোধনের দরকার ছিল না। বড়জোর এক লাইনের একটি বাক্য দরকার ছিল। গ্রামীণ ব্যাংকে বিকল্প নেতৃত্ব কিংবা ক্ষুদ্রঋণ পুঁজিবাদকে প্রশ্রয় দেয় কি দেয় না; দারিদ্র্যকে, সাম্রাজ্যবাদকে মহান করল কি না সেসব বিতর্ক এখন অবান্তর। তাঁকে অপমান করার মনোভঙ্গিই প্রকট। পুরো বিষয়টি আপাদমস্তক সামন্ততান্ত্রিক।
ইউনূস একা নন। এই সমাজে আরও অনেক ইউনূস রয়েছেন, যাঁরা ভিন্নমতাবলম্বী। তাঁরা দাসখত দিতে রাজি নন, তাঁদের প্রতি এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আদালতে ড. কামাল হোসেন বলছিলেন, ‘যদি ব্যাংকের স্বার্থ দেখার কথা বলা হয়, তাহলে একজন সিইও (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার) পেতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েও ইউনূসের চেয়ে যোগ্য কাকে মিলবে?’ জবাবে রাষ্ট্র মশকরা করেছে। কিংবা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে ‘কঠিন সত্য’। আমাদের রাষ্ট্র বলল, নেলসন ম্যান্ডেলা দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হননি। সোনিয়া গান্ধী শত অনুরোধেও প্রধানমন্ত্রী হননি। জ্যোতি বসুও প্রধানমন্ত্রী হননি। অথচ এর কোনোটাই ইউনূসের জন্য খাটে না। খাটে বরং তাঁদের জন্য, যাঁরা এই রাষ্ট্রের খেয়ে-পরে এই রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মাথা খাচ্ছে, অমরত্বের দাবি নিয়ে একই পদে গদিনশিন থাকছে—তিন দশকের বেশি সময় ধরে। আমরা হয়ে আছি চিন্তার ক্রীতদাস। দুই নেত্রী দলীয় গদি ছাড়লে তাঁদের দল কয় টুকরা হবে, সে উত্তর পাওয়া কঠিন কিছু নয়।
ম্যান্ডেলা ৭৬ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতি হন। ৮১-তে দ্বিতীয়বার হতে চাননি। ৮৬ বছর বয়সেও মুখ্যমন্ত্রী থাকা জ্যোতি বসু ও সোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সঙ্গে ইউনূস তুলনীয় নন। কলকাতার দৈনিক টেলিগ্রাফ এক সম্পাদকীয়তে ইউনূসকে তালিম দিয়েছে। তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, রতন টাটা (৭৫) আগামী বছর অবসর নেবেন। বাংলাদেশের বাজেটের চেয়ে বড় বাজেটের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বে অনেক আছে। সেসব সংস্থার তুখোড় সিইও হিসেবে বিশ্বে এখন অন্তত এক ডজন ব্যক্তি আছেন যাঁরা বয়সে সত্তরোর্ধ্ব। রুপার্ট মারডক আশিতেও বাসি নন। তাহলে ৭০ পেরোনো ইউনূসের জন্য বয়স বাধা হবে কেন?
আমরা আক্রান্ত ‘আমি’ নামক শব্দদূষণে। ‘আমি’, ‘আমি’, ‘আমি’। ‘আমি’ এটা করেছি। ‘আমার সরকার‘ এটা করেছে। ‘আমি’ দেশের জন্য এটা করব, ওটা করব। ‘আমরা’ আমাদের সংস্কৃতিতে নেই। সে কারণে আমরা বিশেষ দুই ব্যক্তির নেতৃত্ব মানলাম। স্রেফ অধিকতর যোগ্যতার কারণে কাউকে নেতা মানা আমাদের স্বভাবে নেই। অথচ আমরা একই সঙ্গে যোগ্যতা, শিক্ষা ও মেধার কথা বলি। সসম্মানে আমরা কাউকে বিদায় দেওয়া ভুলছি। ধারণা করি, বিদায় সংবর্ধনার কার্ডই সবচেয়ে কম ছাপা হয়। এই সংস্কৃতি ক্রমশ আরও নিম্ন ও পশ্চাদমুখী। ‘যেতে নাহি দেব হায়, তবু যেতে দিতে হয়’—এ পঙিক্ত প্রায় অনুচ্চারিত। আমরা যে যেখানে আছি, বিদায় কেউ সহজে নিতে চাই না। দিতেও চাই না।
গত বছর অর্থমন্ত্রীকে লেখা একটি চিরকুট ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। তাতে দেখি, ইউনূস মসৃণ ক্রান্তিকাল চেয়েছেন। ক্রান্তিকালের আভিধানিক অর্থ হলো, একপর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উত্তরণের মধ্যবর্তী সময়। এই সামন্ত মুলুকের ক্রান্তিকাল তো যায় না।
ইউনূস শেষতক দল করতে উৎসাহ পাননি। অথচ আমরা বিকল্প শক্তির কথা বলি। বিকল্প শক্তির উত্থান না দেখে হা-পিত্যেশ করি। আবার কেউ এগিয়ে এলে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত হলে, এই আমরাই অদ্ভুত আচরণ করি। বাম-ডান যা-ই হোক, সর্বাগ্রে মতলব খুঁজি। ইউনূসকেও আমরা পত্রপাঠ অবিশ্বাস করেছি। সন্দেহ করেছি। সেটা কি অসময়ের কারণেই? সময় কবে আসবে? পাশ্চাত্য ঠেকাতে আমরা নাকি দুই নেত্রীকে বাগে রাখতে পারি। বেশি শিক্ষিত ও বিদেশি লাইন থাকা ইউনূসকে আমরা বাগে রাখতে পারব না। তাই অনেকেই তাঁকে গাছে তুলে মই সরিয়ে নেন। মাত্র চার বছর আগে ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘আমি নিজেকে রাজনৈতিক দল গঠন থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছি। কারণ, গোড়াতে যাঁরা আমাকে এ কাজে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, তাঁদের উৎসাহে ভাটির টান পড়েছে।’ তিনি আরও স্বীকার করেছিলেন, জরুরি অবস্থা জারি না হলে তিনি রাজনীতিতে নামার কথা ভাবতেন না। সামরিক শাসনে আমরা তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র পেয়েছি। আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম দেখেছি। সম্ভাবনাময় কেউ যদি এখন দল করেন, যাঁরা কল্পনা তৈরি করতে পারেন, তাহলে তাঁরা মার খাবেন। আমরা তাঁদের পিটিয়ে তক্তা বানাব। কারও না কারও এজেন্ট বলব।
সেই কল্পনাটা কী? আগামী সাধারণ নির্বাচন হবে। কিন্তু সেখানে আর দুটি সম্ভাবনা থাকবে না। মানুষ বাজি ধরবে না নির্দিষ্ট দুটো প্রতীকে। নৌকা ও ধানের শীষ ছাড়াও নতুন দল দাঁড়াবে। কিংবা ওই দুই দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসবে। যোগ্যতাসম্পন্নরা মনোনায়ন পাবেন। ছোট দলের অনেক গুণী লোক আফসোস করেন, বড় পত্রিকা তাঁদের বক্তব্য ছাপে না। কারণটা বাণিজ্যিক। জায়গা দিয়ে লাভ কী? খামোখা কে জায়গা নষ্ট করে! কারও তো মুরোদ নেই দাবার ছক পাল্টানোর। গরিবের পেটে ঋণ সয়, ঘি সয় না। আমরা কোনো ব্যক্তি বা ছোট দলকে সম্ভাবনাময় মনে করি না। সেভাবে কেউ গড়ে উঠুক, তাও চাই না। দুই বড় দল নিয়েই থাকি। কিন্তু সেখানে দুই ব্যক্তির বাইরে সম্ভাবনাময় অন্য কেউ আছেন কি? আমরা সে চিন্তা করতেও ভুলে গেছি।
আমরা কী অবলীলায় সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের পূজারি বানালাম ইউনূসকে। তাই দ্রুতই তাঁর অবস্থা দাঁড়াল, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। আমরা তাঁকে তিরস্কার করলাম। পুরস্কার আমরা তাঁকে দিইনি। আমরা কতটা হীনম্মন্য, তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার কেড়ে নিতে বলেছি। আজ জন কেরি ও মরিয়ার্টির প্রতিবাদের ভাষা আমাদের জাতীয় প্রতিবাদের নিনাদকে যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে। আমাদের চেনা শাসকগোষ্ঠী এতটাই পরীক্ষিত যে, তাঁরা নাকি ‘পুঁজিবাদে’র দোসর নন। অথচ আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে বাংলাদেশ ভাড়া নিতে হামিদ কারাজাই লাগেনি। গ্যাস-তেলের চুক্তি আমরা জানতেও পারি না। চটজলদি ইউনূস যখন বিদায় নিলেন, তখন দুই বড় দলই অভিনন্দন জানাল। আপদ বিদায় নিয়েছে বলে তারা উভয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ইউনূসের অপসারণকে প্রতিহিংসামূলক বলে প্রত্যাশিত বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের জায়গাটি কি স্পষ্ট করবে বিএনপি?
ব্যাংকার ইউনূসকে আমরা এই সমাজে ৩০ বছর বাঁচতে দিয়েছি। একজন রাজনীতিক ইউনূসকে ২০০৭ সালে আমরা বাঁচতে দিয়েছি মাত্র ৬৮ দিন। সেই দিনগুলোও অবশ্য টেস্টটিউবেই কেটেছে। ময়দান তাঁকে দেখেনি। ইউনূস বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক ছেড়ে রাজনীতিতে নামবেন। ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ত্যাগ করা তাঁর কখনো সেভাবে হবে না। ব্যাংকে তাঁর প্রচণ্ড প্রভাব, যা রাজনীতিতে ব্যবহার করা সম্ভব। গ্রামীণ ব্যাংকের মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশে যদি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার থাকত, তাহলে তিনি অনেক আগেই রাজনীতিতে আসতেন। সামনের দিনগুলোতে এসব উক্তি আমরা যাচাই করতে পারব।
অনেকের চোখ আদালতের দিকে। কিন্তু প্রশ্নটা আইনগত নয়, একান্তভাবেই রাজনৈতিক। আদালতের সিদ্ধান্তে আমার আগ্রহ নেই। দি ইকোনমিস্ট ২ মার্চ লিখেছে, ‘১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, প্রফেসর ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের অসাধারণ কাজের জন্য তাঁরা গর্বিত। শান্তিচুক্তির পরে তাঁর ‘পারিষদ-দলের’ মদদে তিনি নোবেল জয়ের স্বপ্ন দেখেন। আর লক্ষ করেন, ইউনূস জনপ্রিয়তায় বিশ্বে তাঁর প্রয়াত পিতাকে ছাড়িয়ে গেছেন। শেখ হাসিনাকে যারা ব্যক্তিগতভাবে জানেন তাঁরা বলেন, এটা তাঁর জন্য তেতো বটিকা গেলা। তাঁর সেই তিক্ততা শত্রুতায় পরিণত হয় যখন নোবেল পাওয়ার পাঁচ মাস পরে তিনি দল গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি সন্দেহ করেন তাঁকে সরানোর জেনারেলদের চেষ্টায় তাঁর সায় ছিল।’ সুতরাং অসুখটা সর্বগ্রাসীরূপে রাজনীতিতে। সেই অসুখের সংক্রমণ থেকে এ দেশের কেউ, কোনো প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্ন নয়। ইকোনমিস্ট আদালত সম্পর্কে যে ভাষ্য দিয়েছে তার প্রবণতা সাম্প্রতিক নয়। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘বাংলাদেশের আদালত উত্তরোত্তর সরকারসংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়ছে। তিনি হবেন এক সাহসী বিচারক, যিনি তাঁর পদোন্নতি বরবাদ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ইউনূসের সমর্থনে কোনো আদেশ দেবেন।’
এক নোবেলজয়ীকে কুপোকাত করতে রাষ্ট্র ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়ে আরেক নোবেলজয়ীর ওপর ভর করেছেন। ইউনূসকে অনির্দিষ্ট মেয়াদে ব্যাংকে রাখতে রেহমান সোবহান ব্যাংকের বোর্ড সভায় যথার্থ যুক্তি দেন। আদালতে রাষ্ট্রের আইনজীবী তাঁকে কটাক্ষ করেন। ‘দুই বিঘা জমি’ থেকে বলেন, ‘বাবু যতো বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।’ আর দীপু মনি সংবাদ সম্মেলনে আবৃত্তি করেন রবীন্দ্রনাথ। বয়সটাই যে আইনি বাধা, সেটাই তিনি বোঝান। তাঁর সুন্দর বচন শুনে মনে হবে, আহা! সরকার চক্ষুষ্মান, কিন্তু আইনের চোখ তো অন্ধ। দীপু মনি বলেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা’।
আমার বিশ্বাস, রাষ্ট্রে যোগ্যতম লোকের নেতৃত্বই ভোটাধিকার-অসেচতন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনমান বাড়াবে। ক্ষুদ্রঋণ অন্যতম হাতিয়ার মাত্র। তবে এখন সত্য কী? সরকারি প্রচারযন্ত্র কোটি কোটি টাকা তছরুপের গল্প শোনাচ্ছে। আমরা তা সত্য বলে বিশ্বাস করি না। শ্রদ্ধেয় রবীন্দ্রগবেষক আহমেদ রফিককে সত্য বলে বিশ্বাস করি। শনিবার তিনি আমাকে বললেন, ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ। ইউনূসের ঋণদানের ৭৫ বছর আগের কথা। ১৯০৫ সাল। পতিসরে কৃষি ব্যাংক বসে। রবীন্দ্রনাথ শতকরা আট শতাংশ সুদে ঋণ নিতেন। কৃষকদের দিতেন চার শতাংশ বেশি সুদে। নোবেল পুরস্কারের অর্থের সিংহভাগ (এক লাখ ১২ হাজার টাকা) তিনি ওই ব্যাংকে জামানত রেখেছিলেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথকে কেউ ‘রক্তচোষা’ বলেছিল কি না জানি না। তবে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা রচনা করেছিলেন পতিসরেই, হয়তো কোনো উপেনের জমি কেড়ে নেওয়ার ঘটনা তাঁকে বিচলিত করেছিল।
আমি বড় রসসিক্ত হলাম। বৃৃহস্পতিবার সকালে দেখি আদালতে ইউনূসকে জব্দ করতে রবীন্দ্রনাথ, পরদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রবীন্দ্রনাথ। ইউনূসকে ‘গরিবের রক্তচোষা’ বলার ধরন দেখে হাসি পায়। রাজনীতিকদের দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছিলেন তিনি। হঠাৎ আইন ‘আপন গতি’ নেয়। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে স্বতঃস্ফূর্ত মামলার হিড়িক পড়েছিল। এসবের একটা সমুচিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ক্ষুদ্রঋণ-গুরু রবীন্দ্রনাথকেই ধ্যান করি।
আদালতকক্ষে ড. ইউনূসের ঠিক পেছনে বসেছিলাম। রাষ্ট্র যখন বলল, ইউনূস ‘ধানাইপানাই’ করেছেন, সরকারের ৬০ ভাগ মালিকানা কমিয়ে ২৫ ভাগ করেছেন, তখন ইউনূসের এক পরিহাসসূচক অভিব্যক্তি চোখে পড়ে। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, গ্রামীণ ব্যাংক যেন কখনো আদমজীতে পরিণত না হয়। ড. ইউনূস রবীন্দ্রনাথেই সান্ত্বনা পেতে পারেন: ‘বাবু কহে হেসে, বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!’ আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে—তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

অস্ট্রেলিয়ার জয়রথ থামাল বৃষ্টি

বিশ্বকাপে দুটি দল সর্বশেষ খেলেছে প্রায় অন্ধকারে। ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ কটি ওভার আলো-আঁধারির মাঝে তবু স্পিন বোলিং দিয়ে চালিয়ে নেওয়া গেছে। কিন্তু বৃষ্টিতে তো সেটাও সম্ভব নয়। ২০০৩ বিশ্বকাপের দুই দলের সেমিফাইনাল পুরো হতে পারেনি বৃষ্টিতে। কাল হলো মাত্র ৩২.৫ ওভার। সম্ভাব্য উত্তেজনাময় আর রোমাঞ্চকর ম্যাচটার হলো অপমৃত্যু! ভাগাভাগি হলো পয়েন্ট।
কলম্বোর বৃষ্টির সঙ্গে ক্রিকেট-বিশ্বের পরিচয় ভালো রকমই আছে। হুটহাট নেমে পড়বে, একবার নামলে যাওয়ার নামগন্ধ নেই। শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই শঙ্কা ছিলই। আগের ৫ ম্যাচে সেই শঙ্কা সত্যি হয়নি। কাল স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটা পাঁচে হঠাৎই দেখা মিলল সেই অনাহূত অতিথির। আধা ঘণ্টা হলো মুষলধারে, এরপর টিপটিপ, কিন্তু টানা। আর থামলই না। হয়তো বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার জয়রথ থামাতে প্রয়োজন ছিল এটাই। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত ‘টাই’ সেমিফাইনালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের ম্যাচে জয় ছাড়া অন্য কিছু পেল অস্ট্রেলিয়া। মাঝখানের ২৫ ম্যাচে টানা জয়! জয়যাত্রায় ছেদ পড়লেও অপরাজেয় যাত্রা কিন্তু ঠিকই অব্যাহত থাকল। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের কাছে ১০ রানে হারার পর এই নিয়ে টানা অপরাজিত টানা ৩২ ম্যাচ!
প্রেমাদাসায় কালই প্রথম সত্যিকার অর্থে দেখা গেল উৎসবের আবহ। গ্যালারিভর্তি দর্শক, নাচ-গান, ব্যান্ড-ড্রাম, উল্লাস আর প্রাণ—সবই ছিল। কিন্তু হাজার তিরিশেক দর্শক বাড়ি ফিরল হতাশা নিয়ে। এর আগে অবশ্য ঝিমিয়ে পড়া আবহে প্রাণ আনার চেষ্টা করেছিলেন কয়েকজন দুঃসাহসী দর্শক। রেলিং টপকে মাঠের ভেতরে ঢুকে ব্যাট-বলের কৃত্রিম লড়াই দেখালেন কয়েকজন, কয়েকজন মেতে উঠলেন পিচ কাভারে স্লাইডিং খেলা, দু-একজন দেখালেন নাচের প্রতিভা। মাঠের মাঝখানে মাইকেল জ্যাকসনের ‘মুনওয়াক’ দেখিয়ে গ্যালারি মাতালেন একজন। কিন্তু বেরসিক নিরাপত্তাকর্মীদের বাধায় এই বিনোদনও পণ্ড।
দুপুরে মাঠের লড়াই শুরু হয়েছিল প্রত্যাশিত আগুন ছড়িয়েই। ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারেই শন টেইটের একটি গোলা তিলকরত্নে দিলশানের ব্যাটের কানা ছুঁয়ে স্লিপের পাশ দিয়ে চার। ফাস্ট বোলারের মেজাজ বিগড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দিলশানের নাকের ডগায় গিয়ে ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ করে এলেন টেইট। নিজের দেশের মাটি, পাল্টা শাসাতে সময় নেননি দিলশান। পরের বলে ডেলিভারির একেবারে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁঁড়ালেন দিলশান, সাইট স্ক্রিনের পেছনে কোনো একটা সমস্যা দেখালেন। যদিও আসল উদ্দেশ্য যে টেইটকে পাল্টা জবাব দেওয়া, এটা বুঝতে কারও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
ছোট্ট কিন্তু দারুণ উপভোগ্য দ্বৈরথটি জিতলেন টেইটই। ব্যক্তিগত জয়ের দিকেই বেশি মনোযোগ ছিল বলেই কি না, ক্ষণিকের জন্য আসল জায়গাটায় মনোযোগ হারিয়ে ফেললেন দিলশান। হয়তো ভেবেছিলেন, খেপে গিয়ে বাউন্সার ছুড়বেন টেইট, অন্তত ফুটওয়ার্ক বলছিল এটাই। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট চালিয়ে স্লিপে ক্যাচ।
এরপর শ্রীলঙ্কার উইকেট পড়েছে দুটি। একটিতেও বোলারের নাম স্টিভেন স্মিথ ছিল না, কিন্তু দুটি উইকেটই বলতে হবে তরুণ অলরাউন্ডারের। অফ স্টাম্পের বাইরে ব্রেট লির শর্ট বলটিতে চার লেখাই ছিল, উপুল থারাঙ্গা মেরেছিলেনও গায়ের জোরে। সেই বুলেটকে পয়েন্টে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় তালুবন্দী করলেন স্মিথ। বিপজ্জনক মনে হতে থাকা মাহেলা জয়াবর্ধনেকে রানআউট করলেন বুলেট গতির এক সরাসরি থ্রোতে। সামারাবীরাকে নিয়ে এরপর ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন সাঙ্গাকারা। জুটিটা ঠিক ডানা মেলতে পারেনি, রান উঠেছে ওভারপ্রতি মাত্র চার করে। কিন্তু ৭১ রানের জুটিটায় শ্রীলঙ্কাকে এনে দিচ্ছিল ২৬০-৭০ রান করার একটা ভিত্তি। আর সেটা হয়ে গেলেই জমে উঠত মালিঙ্গা আর তিন স্পিনারের সঙ্গে অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানদের জমজমাট লড়াই। বেরসিক বৃষ্টি কি আর সেই রোমাঞ্চ বোঝে?

জবাবদিহির রাজনীতি, সুশাসনের অর্থনীতি by মামুন রশীদ



বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি ও রাজনীতিতে সহনশীলতার ব্যাপারে ড. আকবর আলি খানের অবস্থান পরিষ্কার। তাঁর সর্বশেষ বই ফ্রেন্ডলি ফায়ার, হাম্পটি ডাম্পটি ডিজঅর্ডার অ্যান্ড আদার এসেইজ যেন তাঁর হূদয়ের কথারই বহিঃপ্রকাশ। অর্থনীতি ও সুশাসন যেকোনো জাতিরই মেরুদণ্ড। আকবর আলি খানের গ্রন্থেও মূল আধেয় বা উপাদান হিসেবে আছে এই দুটি ইস্যু। লেখক দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি সুচিন্তিত অর্থনৈতিক নীতিমালার অভাবটাও তুলে ধরেছেন। দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনকে ঘিরেই মূলত প্রবন্ধগুলো আবর্তিত, যেগুলো লেখক তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে বেশ প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তিনি ১৯৭০ সাল থেকে অর্থনীতি ও সুশাসনবিষয়ক চালচিত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণও করেছেন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির যখন জন্ম হয়, তখন এটি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে ছিল একেবারেই বিধ্বস্তপ্রায়। তিন দশক পরে এসে অবশ্য পরিস্থিতির কমবেশি পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু এখন দেশটি অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা বিকাশমান পর্যায়ে বা ধারায় থাকলেও রাজনৈতিক দিক থেকে অস্থিরতায় নিমজ্জিত। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও জনগণের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। সমাজে বৈষম্য বাড়লেও দারিদ্র্য কমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। লেখক পরামর্শ দিয়েছেন, ধনী ও গরিব উভয় শ্রেণীর স্বার্থে শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সেবা-পণ্যের মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি এবং পরিবহনব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া ক্ষুধামুক্তির জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কার্যক্রম ও খাদ্য উৎপাদন জোরদার করা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে যে সরকারি নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত পাল্টায়, সেটি যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি সরকারের নেওয়া ইতিবাচক সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও আলোচনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশ মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সত্তরের দশকে যেখানে নিম্নপর্যায়ে অবস্থান করছিল, তা এখন মধ্যম স্তরে উন্নীত হয়েছে। এটি অবশ্যই সরকারি নীতিমালায় সঠিকতার সুবাদে সম্ভব হয়েছে। তা সত্ত্বেও, সরকার অনেক সময়ই অজ্ঞতার কারণে ফ্রেন্ডলি ফায়ার করে বা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রে ইনফরমেশন গ্যাপ বা তথ্যের দুর্বলতা সরকারযন্ত্রের ভুলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া সরকার কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে সহজ ও জনপ্রিয় সমাধানের পথটাই বেছে নিতে পছন্দ করে। আকবর আলি খানের মতে এটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবঞ্চনা বা প্রতারণা’বিশেষ। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিটা এমন যে অজ্ঞতার বিষয়টি প্রকাশ করলে নিজের ভাবমূর্তি যেন ধুলায় মিশে যাবে! সে জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নীতিমালা প্রণয়ন-প্রক্রিয়ায় ভুলত্রুটি রুখতে হলে তৃণমূল পর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করতে হবে।
লেখক সরকার বা প্রশাসনযন্ত্রের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হাম্পটি ডাম্পটি ডিসঅর্ডার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। নার্সারি শ্রেণীর বহুল জনপ্রিয় রাইম বা ছড়ায় যেমন বলা হয়েছে যে ‘হাম্পটি ডাম্পটি’ একবার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না, তেমনি এই গ্রন্থে তিনি বলতে চেয়েছেন, যেকোনো সংস্থা বা সরকারব্যবস্থা একবার মুখ থুবড়ে পড়লে পরে আর ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। সে জন্য গ্রন্থটির প্রণেতা বেসরকারীকরণ, আউটসোর্সিংয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করাসহ সরকারি সংস্থাগুলোতে কার্যকর সংস্কার সাধন এবং নতুন জনবলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাজিয়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
গ্রন্থটিতে লেখক দেশে নৈতিকতানির্ভর ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপরও জোর দিয়েছেন। কারণ, নীতি-নৈতিকতাবর্জিত কার্যক্রম সার্বিকভাবে ব্যাংককে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায়। সে জন্য লেখক কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ তদারকি সংস্থাগুলো ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপর তদারকি চালানোর পরামর্শ দেন। তিনি ব্যাংকের কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জন্য একটি যথাযথ আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তা কঠোরভাবে পরিপালনের পরামর্শ দিয়েছেন। নীতি-নৈতিকতাবহির্ভূত কার্যক্রম রুখতে আইনি কাঠামো জোরদার করারও পরামর্শ দেন তিনি।
লেখক গ্রামাঞ্চলে অর্থায়ন বিষয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে দেখতে পান যে গ্রাম থেকে শহরের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছে অর্থ। অথচ এর বিপরীতটাই হওয়ার কথা, অর্থাৎ শহর থেকে গ্রামে অর্থ স্থানান্তর হবে, এটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের উল্টো পরিস্থিতির কারণে পল্লি অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক ও উদ্যোক্তারা নিদারুণভাবে ঋণসংকটে ভোগেন। গ্রামাঞ্চলে অর্থায়নের প্রবণতা কমে যাওয়ার কারণে সরকারকেই প্রধান ভিলেন মনে করেন লেখক। তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন. ব্যাংক-বিমাসহ রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ও আইনি কাঠামোয় সংস্কার সাধন এবং আর্থিকভাবে অলাভজনক বা সম্ভাবনাহীন ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বাতিলের সুপারিশ করেন। সংস্কার-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে খরচ ও ঝক্কিটা দৃশ্যত একটু বেশি মনে হলেও এটি দীর্ঘ মেয়াদে দারুণ ফল বয়ে আনবে বলে তিনি মনে করেন।
এই গ্রন্থে লেখক যেসব বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো দেশের ভৌত অবকাঠামো জোরদারকরণ। নিয়মানুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাড়ে ৭ শতাংশ পরিমাণ অর্থ ভৌত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা উচিত। গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য ১৭০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়, যা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক অনেক কম। সে কারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে (পিপিপি) বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। তবে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতির হার কম। কারণ, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকায় তাঁরা শহরকেন্দ্রিক বিনিয়োগের পথই বেছে নেন। তাঁরা বেশ ভেবেচিন্তে তবেই ঠিক করেন কোথায় কোন খাতে বিনিয়োগ করবেন। লেখক বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে কিছু নীতিগত পরামর্শ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম পরামর্শ হলো, লালফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো উচিত সরকারের। সংস্কারের মাধ্যমে উপযোগসেবা প্রদানকারী সরকারি সংস্থাগুলোর সেবার মান বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। পিপিপির অপেক্ষায় না থেকে সরকারের উচিত বিদ্যুৎ ও পানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। দরিদ্রদের জন্য যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তা নিবিড়ভাবে তদারক করতে হবে। সরকারি নীতিমালা এমনভাবে গ্রহণ করতে হবে, যা অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ায় এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।
লেখক বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে ভোলেননি। কারণ দেশের বিচার বিভাগের সর্বস্তরে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আদালতের কাছে যেন নিষ্পাপ মানুষের জীবন-মৃত্যু তেমন কিছু নয়। এটি যেন ভুয়া বা জাল কাগজপত্র দাখিল আর অধিকতর অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকারও পরিচালিত হয় এলাকার তথাকথিত এলিট বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নেতৃত্বে। লেখক বিচারব্যবস্থায় কম্পিউটারায়ন এবং এই খাতের ওপর অব্যাহত তদারকি ও নজরদারি রাখার বিষয়ে জোর দিয়েছেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। গ্রন্থে লেখক রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে পাঁচটি উৎস চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে: সামাজিক পুঁজির অভাব, উত্তরাধিকারের রাজনীতি, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা, প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপ বা পৃষ্ঠপোষক-গ্রাহক সম্পর্ক এবং বড় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধানদের মধ্যে ‘জিরো সাম গেইম’ বা কোনো রকম কথাও না বলা বা মুখ দেখাদেখিও না থাকা। তিনি বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও) আর সুশীল সমাজকে রাজনৈতিক শত্রুতা বা বৈরিতার ঊর্ধ্বে থাকা, এনজিওর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক পুঁজি জোরদারকরণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বংশানুক্রমিক বা উত্তরাধিকারের রাজনীতির নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অধিকতর কার্যকর করে তোলা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও উদারতা দেখানোর বিষয়ে জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন।
আমাদের দেশের উন্নয়ন-প্রক্রিয়া সম্পর্কে নীতিনির্ধারক, পণ্ডিত-গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং যাঁরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে জানতে আগ্রহী তাঁদের সবাই এই গ্রন্থ থেকে জ্ঞান আহরণের সুযোগ পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।
মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

তাঁদের হাতে চট্টগ্রামের চাবি

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বিমানবন্দরে পা ফেলতেই পড়ল র্যাব ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে। অস্ত্র তাক করে রয়েছেন সেনাসদস্যরাও। তবে নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হতেই অন্য চেহারা। সেখানে ফুল হাতে অপেক্ষমাণ ‘চট্টগ্রাম’। সারিবদ্ধভাবে ফুলের পাপড়ি হাতে দাঁড়ানো সিটি করপোরেশন স্কুলের শিক্ষার্থীদের আনন্দের সীমা নেই। তাদের প্রতীক্ষা—কখন আসবে, কখন দেখবে সাকিব-তামিমদের।
এই সারির অগ্রভাগে চট্টগ্রামের মেয়র এম মন্জুর আলম। একসময় ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে আসে সাকিব আল হাসানের দল। সাকিবের হাতে মেয়র তুলে দিলেন পুরো চট্টগ্রামকে। কাচের বাক্সে বাঁধানো বিশাল আকৃতির চট্টগ্রাম নগরের প্রতীকী চাবি উপহার দেওয়া হলো তাঁকে। মেয়র সাকিবের উদ্দেশে বললেন কয়েকটি মাত্র শব্দ, ‘তোমাকে চট্টগ্রামের চাবি দিয়ে দিলাম। শুভ কামনা।’ মুচকি হেসে সাদরে গ্রহণ করলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। তারপর মখমল গালিচা ধরে একে একে আশরাফুল, তামিমরা বের হয়ে এলেন। ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেওয়া হলো তাঁদের ওপর।
অতিথি বরণে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের মুখে মুখে শুধু একটাই কথা—সব ভুলে এগিয়ে যাও। ১১ ও ১৪ মার্চ চট্টগ্রামে দুটি ম্যাচ খেলতে আসা স্বাগতিক দলকে এভাবেই বরণ করল চট্টগ্রাম। ঢাকার দুঃস্বপ্ন ভুলে জেগে উঠবে নতুন বাংলাদেশ—এই প্রত্যাশা বিমানবন্দরে জড়ো হওয়া বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও উৎসুক সাধারণ মানুষের।
ঢাকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ-দুঃস্বপ্নের পর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া সাকিবদের বড় প্রেরণা হতে পারে চট্টগ্রামের এই অভ্যর্থনা। টিম বাস নির্বিঘ্নে বিমানবন্দর ত্যাগ করল। সামনে-পেছনে র্যাব, পুলিশ আর সেনাবাহিনী। তবে সবার মুখে এই কথাও ছিল—চট্টগ্রামে ক্রিকেটারদের জন্য এই সূচিভেদ্য নিরাপত্তায় ক্রিকেট দলকে কেমন অচেনা লাগে!
টিম চলে যাওয়ার পর ক্রিকেটারদের সান্নিধ্য পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে দারুণ ভালো লাগার অনুভূতি ছড়িয়ে ছিল। শ্রাবণী, তমা, মেহেরুননেছারা ছিল উচ্ছ্বসিত।
শুধু বিমানবন্দরে নয়, বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত পথে পথে বাংলাদেশ দলের জন্য ছিল এ রকম শুভ কামনার মিছিল। আর সাজসজ্জা তো ছিলই। বিমানবন্দরের মুখেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দুটি সাম্পান। কাস্টমস মোড়ে ফোয়ারা ছিটাচ্ছে রং-বেরঙের পানি। আর কিছুদূর যাওয়ার পর নিমতলা মোড়ে ক্রিকেটারদের ১১টি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের পাশে লেখা রয়েছে ‘দৃঢ় প্রত্যয়’। বিমানবন্দর থেকে যেতে যেতে তামিমদের চোখে পড়বে দেশের পতাকা আর ফেস্টুন। আর মোড়ে মোড়ে লাগানো রং-বেরঙের ফটক। তাতে লেখা ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ কিংবা ‘গর্জে উঠুক বাংলাদেশ’। পুরো চট্টগ্রাম অপেক্ষায়, এখান থেকেই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ দল।

ও’ব্রায়েনকে হুমকি ভাবছেন না মাঞ্জেরেকার

৬৩ বলে ১১৩ রানের রেকর্ড গড়া দানবীয় এক ইনিংস খেলে ইংল্যান্ডকে হতাশায় ডুবিয়েছিলেন আইরিশ ব্যাটসম্যান কেভিন ও’ব্রায়েন। আয়ারল্যান্ডকে এনে দিয়েছিলেন ৩ উইকেটের এক ঐতিহাসিক জয়। আজ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে তাই ও’ব্রায়েনই হতে পারেন স্বাগতিক ভারতের প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয়।
তবে ও’ব্রায়েন ভারতের জন্য খুব একটা হুমকি হয়ে দাঁড়াবেন না বলে মনে করছেন ইএসপিএন-স্টার স্পোর্টসের ক্রিকেট বিশ্লেষক সঞ্জয় মাঞ্জেরেকার। তিনি বলেছেন, ও’ব্রায়েন অবশ্যই একজন ভালো ক্রিকেটার। কিন্তু প্রতি ম্যাচেই অমন পারফরমেন্স তাঁর কাছে আশা করাটা একটু বেশিই হয়ে যাবে। ভারতীয় বোলাররা, বিশেষত স্পিনাররা ও’ব্রায়েনদের মতো ব্যাটসম্যানকে ভালোভাবেই রুখে দিতে পারবেন। তাঁরা নিশ্চয়ই ও’ব্রায়েনের খেলার ধরন খুব ভালোমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
এর আগে মাত্র একবারই আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল ভারত। ২০০৭ সালে সেই ম্যাচে ভারত পেয়েছিল ৯ উইকেটের জয়। আজকের ম্যাচেও নিশ্চিতভাবে ভারতই ফেবারিটের আসনে থাকবে বলে মনে করছেন মাঞ্জেরেকার। বলেছেন, যদি ক্রিকেটীয় যুক্তিবোধ দিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে ভারতের আজ সহজ জয়ই পাওয়ার কথা। আয়ারল্যান্ড ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ খেলেছিল। কিন্তু প্রতি ম্যাচেই তারা সে রকম খেলতে পারবে, এটা আশা করা যায় না। এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের অভিজ্ঞতা অনেক কম।

গণতন্ত্র, ক্রিকেট আর ক্রীড়া সংস্থায় গণতন্ত্র by আখতার হোসেন খান

গণতন্ত্র আর ক্রিকেটের কাকতালীয় সম্পর্ক নিয়ে এ কে এম জাকারিয়ার লেখা (প্রথম আলো, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১১) আরেকবার প্রমাণ করল, একটা দেশে বা সমাজে যখন কোনো সুস্থ কাজ সুস্থিরভাবে সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে তাকে নিয়ে একটা উল্লেখযোগ্য লেখার ভান্ডারও গড়ে উঠতে থাকে। তার কিছুটা যেমন দৈনিক পাঠ্য হিসেবেই তার দায়িত্ব শেষ করে, তেমনি কিছুটা আবার ক্রীড়া-সাহিত্যের দীর্ঘস্থায়ী ভান্ডারেও জায়গা করে নেয়। প্রথম আলো এবং আরও কিছু বাংলা পত্রিকার নিয়মিত লেখক-সাংবাদিকদের বেশ খানিকটা লেখাই অনেক দিন পরও ক্রীড়ামোদীরা পড়েন তার মজাদার আবেশের জন্য, এক সুখস্মৃতিময় অতীতকে মনে ফিরিয়ে আনার জন্য।
ইংরেজি ভাষায় গড়ে উঠেছে বিপুল ক্রীড়াবিষয়ক এক প্রায় অথবা পুরো সাহিত্য পদমর্যাদার খনি। দুটো উদাহরণ মনে আসে। প্রাতঃস্মরণীয় ক্রিকেট-লেখক নেভিল কার্ডাস বলতেন, জ্যাক হবসের ব্যাট থেকে ‘স্নিক’ হলে মহাজাগতিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। এর চেয়ে বেশি সম্মান আর কীভাবে একজন ব্যাটসম্যানকে দেওয়া যেতে পারে?
শুরুতে বর্ণিত লেখার মূল প্রতিপাদ্যের সঙ্গে একমত হয়েও বলা যায়, আসলে ইংরেজরা দীর্ঘদিনের জন্য যেখানে উপনিবেশ গেড়েছে, সেখানেই ক্রিকেটের বিস্তার ঘটেছে। পৌনে দু শ বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশ পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে মত্ততায় আর গণভিত্তিতে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সমান পর্যায়ের। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের বাইরে থেকে শুধু হল্যান্ডই আসে নিয়মিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে। আর সেখানেও ছিল আজ থেকে অনেক দিন আগে ঘটে যাওয়া নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে অবস্থানরত ব্রিটিশ সৈন্যদের ক্রিকেটচর্চা।
ক্রিকেটের পরিচালক সংস্থা আইসিসির সঙ্গে এমসিসির সম্পর্ককে আইনসভা-নির্বাহী বিভাগের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা যুক্তিযুক্ত। শুধু ক্রিকেটেই নয়, ফুটবলেও আছে একই ধরনের এক বিধান এবং তা দিয়ে ক্রিকেটের মতো ফুটবলের উদ্ভাবক শ্বেতদ্বীপবাসীরা খেলার আইনকানুনে বাহ্য আধিপত্য বজায় রেখেছে। হয়তো এটার প্রয়োজন ছিল, নয়তো বিশ্বজোড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের হাতে পড়ে ক্রিকেট-ফুটবলের পুরো চেহারাই পাল্টে যেত।
এমসিসি যেমন একটা অসরকারি ক্লাব, কিন্তু সম্পূর্ণত এবং বিদেশি কিছু সদস্যত্ব সত্ত্বেও নিঃসংকোচে ব্রিটিশ, তেমনি ফুটবলের আদি আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (ইফাব) ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত ছিল পুরোপুরি গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের চারটি অ্যাসোসিয়েশনের হাতে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইংল্যান্ডের স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরা ফুটবলের আইন সুষম করার প্রথম প্রয়াস পান। এর পরও ব্রিটেনে চার ধরনের আইন প্রযুক্ত হতে থাকে। ১৮৮২ সালে চার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক সভায় ঠিক হয় ফুটবলের জন্য সুষম আইন হবে, আর চার বছর পরে ১৯৮৬ সালে লন্ডনের আরেক সভায় এরা মিলে তৈরি করে ‘ইফাব’। শুরুতে এর প্রয়োজন ছিল ব্রিটিশ হোম চ্যাম্পিয়নশিপে সুষম আইন প্রয়োগের জন্য। ফুটবল অনেক দিন আগে থেকেই একেক জায়গায় একেকভাবে খেলা হচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ইফাবের বিধিবিধান মানার অঙ্গীকার করে বটে, কিন্তু শুধু ১৯১৩ সালেই ইফাবের সদস্যত্ব পায়, তা-ও আবার উত্তর আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের সমান ভোটাধিকার নিয়ে। ১৯৫৮ সালে ইফাব বর্তমান ভোটক্ষমতা চালু করে, এতে ফিফা পায় চার ভোট আর মূল প্রতিষ্ঠাতারা একটি করে চার ভোট। আইনের সংশোধনের জন্য প্রয়োজন ছয় ভোটের, অর্থাৎ ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সহযোগিতা ছাড়া আইন বদলানো সম্ভব নয়, যদি বা ফিফা গ্রহণ করার পরেই সংশোধিত আইনের প্রয়োগ হতে পারে। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে অবশ্য আইন ইংলিশ ক্লাব এমসিসিরই একক দায়। এবং মনে করা যেতে পারে, আইসিসিতে অশ্বেতাঙ্গদের দাপট বাড়ার পরে এবং লর্ডস-মন্টিকার্লো হয়ে সদর দপ্তর দুবাইয়ে সরে আসায় এমসিসি ক্রিকেটে নিজস্ব বিশ্বজনীনতা বজায় রাখতেই এমসিসি বিশ্ব ক্রিকেট কমিটির গঠন হয়েছে।
ইফাবে যেমন ব্রিটিশদের প্রাধান্য, তেমনি ফিফাতেও আছে একধরনের ইউরোপীয় কর্তৃত্ব: ২০৮ সদস্যের ফিফাতে (লক্ষণীয় যে এ সংখ্যা জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যার চেয়েও বেশি) নির্বাহী ক্ষেত্রে ইউরোপীয়রাই প্রধান। সভাপতির পদে ২০৮ সদস্যের সবাই ভোট দেন বটে, কিন্তু ফিফার কার্যনির্বাহী পরিষদের ২৪ সদস্যের মধ্যে তিনটি সহসভাপতি আর পাঁচটি সদস্যের পদ ইউরোপের জন্য সংরক্ষিত; এর মধ্যে একটি সহসভাপতি পদ আবার ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জন্য চিরদিনের রেখে দেওয়া। এ ছাড়া অন্যান্য মহাদেশের জন্যও পদ সংরক্ষিত আছে বটে, কিন্তু সভাপতি বাদে বাকি ২৩ পদের আটটিই ইউরোপের হাতে। আবার বিশ্বকাপ কোথায় হবে, তা-ও ঠিক করে কার্যনির্বাহী পরিষদ। অল্প বিছুদিন আগে রাশিয়া আর কাতারে ২০১৮ ও ২০২২-এর বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় প্রাধান্য-সংবলিত নির্বাহী পরিষদই নেয়। তাই দৈনন্দিন ও প্রধান কাজে ইউরোপ যা চায়, তা-ই হয়।
আমরাই বা কম যাই কোথায়? জাতীয় শুটিং ফেডারেশন বাদে বাংলাদেশের বেশির ভাগ জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনের গঠন গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতি একধরনের অবজ্ঞা বৈকি। রাজধানী ঢাকার ক্লাবগুলোর ভোট কমপক্ষে একটা, অন্যদিকে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনার মতো ক্রীড়া কেন্দ্রগুলোর বড় ক্লাবগুলোর একটাও ভোট নেই; যেন ঘটনাচক্রে ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থিতিই সব মুশকিল আসান করে, স্বর্গ সন্নিধির নিশ্চয়তা দেয়। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের পরামর্শে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ভৌগোলিক এলাকার ভিত্তিতে ভোটক্ষমতায় যে সমতাভিত্তিক পুনর্বিন্যাস এনেছে, তা-ই হওয়া উচিত অন্য সব ফেডারেশনের জন্য অনুকরণীয়।
অন্য অনেক খেলার মতো ক্রিকেটে ফাঁকি নেই: যতক্ষণ ভালো খেলা, ততক্ষণ ফললাভ। একসময়ের অবসরভোগী শ্রেণীর খেলা এখন বিবর্তনে এবং ৫০ ওভার ও টি-টোয়েন্টির কল্যাণে সাধারণ জনতারও দুঃখ-কষ্ট ভোলায়, অসীম আনন্দের কারণ হয়। এবং এ-ও এক এক গণতান্ত্রিক বিকাশ। এবং সে পথেই হয়তো দুনিয়াজোড়া ক্রীড়া সংস্থাগুলো প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে পা বাড়াবে।
বিশ্বকাপের আনন্দযজ্ঞে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিশুদ্ধতম বিকাশে কৃষক-শ্রমিকদের প্রকৃত অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানুষের চিরন্তন দাবি বিনোদনের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে ক্রিকেট বেঁচে থাকবে, এ আশা প্রত্যেকের। কৃষক আর শ্রমিকেরা শুধু দর্শকই জোগায় না, খেলোয়াড় বানানোর অফুরন্ত উৎস। ক্রিকেট ও গণতন্ত্রের কাকতালীয় সম্পর্ক খোঁজার জন্য লেখক এ কে এম জাকারিয়াকে ধন্যবাদ।
আখতার হোসেন খান: সাবেক সচিব।

মন্দার কারণে বাতিল মুদ্রাও...

নয় বছর আগে স্পেনের মুদ্রা ছিল পেসেতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত হওয়ায় ২০০২ সালে দেশটিতে চালু হয় ইউরো। তবে শক্তিশালী ইউরো স্পেনের অর্থনীতিকে যে মজবুত করতে পারেনি তার প্রমাণ মিলছে। সম্প্রতি দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় মুগারদোস শহরে ইউরোর পাশাপাশি পেসেতাও চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে রাতারাতি স্থানীয় বাজারে চাঙা ভাবও লক্ষ করা যাচ্ছে।
মুগারদোস শহরের বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এখন ইউরোর পাশাপাশি পেসেতার মাধ্যমেও সব ধরনের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। নগর কর্তৃপক্ষ বলেছে, অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে তারা আবার পেসেতা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন দেশটির বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন পেসেতা ভাঙানোর জন্য মুগারদোস শহরে ছুটে আসছেন।
প্রথম দিকে পেসেতা গ্রহণে সংশয়ে ছিলেন ব্যবসায়ীরা। তবে তাঁরা এখন বলছেন, কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগে সুফল মিলছে।

কিউবায় মার্কিন নাগরিক দোষী সাব্যস্ত

কিউবার একটি আদালত গত শনিবার অ্যালান গ্রোস নামের এক মার্কিন সাহায্যকর্মীকে রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।
২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কিউবা সরকার গ্রোসকে গ্রেপ্তার করে। মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইএসএআইডির অর্থায়নে কিউবায় গণতন্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে তিনি কাজ করছিলেন।
কিউবার আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, মার্কিন সরকারের অর্থায়নে গ্রোস দেশটিতে অবৈধ ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করছিলেন।
তবে আদালত এখনো গ্রোসের শাস্তি ঘোষণা করেননি। আইনজীবীরা আদালতের কাছে গ্রোসের ২০ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর শাস্তি ঘোষণা করা হবে।
এদিকে মার্কিন সরকার সতর্ক করে বলেছে, গ্রোসের মুক্তির আগে কিউবার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক উন্নয়ন নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন গ্রোসের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।

চে গুয়েভারার বন্ধু গ্রানাদো আর নেই

বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহচর কমরেড আলবার্তো গ্রানাদো (৮৮) আর নেই। গত শনিবার কিউবার রাজধানী হাভানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। গ্রানাদোর দেহভস্ম কিউবা, আর্জেন্টিনা ও ভেনেজুয়েলায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে কিউবার টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে।
লেখক, চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী গ্রানাদোর জন্ম আর্জেন্টিনায়। এসব ছাপিয়ে তাঁর বড় পরিচয় তিনি গুয়েভারার বন্ধু; তাঁরা মোটরসাইকেলে সফর করেছেন দক্ষিণ আমেরিকা। ১৯৫১ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ১৯৫২ সালের জুলাই পর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকা সফরকালে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র কীভাবে একেকটি রাষ্ট্রকে জর্জরিত করে রাখে, তা প্রত্যক্ষ করেন গুয়েভারা ও গ্রানাদো। ওই সফর নিয়ে তাঁর লেখা জনপ্রিয় বই ট্রাভেলিং উইথ চে গুয়েভারা: দ্য মেকিং অব আ রেভলুশনারি।
গ্রানাদোর ওই জনপ্রিয় বই অবলম্বনে ২০০৪ সালে নির্মিত হয় দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ নামে চলচ্চিত্র। ওই ছবিতে রদ্রিগো ডি লা সেরমা নামে গ্রানাদোকে এবং গায়েল গার্সিয়া বেরনাল নামে গুয়েভারাকে উপস্থাপন করা হয়।

বাহরাইনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবরোধ বিক্ষোভকারীদের

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিক্ষোভকারীরা গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবরোধ করেন। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি প্রায় দুই শতাব্দী ধরে সুন্নিরা শাসন করে আসছে।
সম্প্রতি সাংবিধানিক সংস্কার, রাজবন্দীদের মুক্তি ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে শিয়া মুসলমানদের নেতৃত্বে দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের আরেকটি অন্যতম দাবি হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ খলিফা বিন সালমান আল খলিফার পদত্যাগ। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও বিরোধীদের দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলেছেন শিয়া বিক্ষোভকারীরা। এই বিক্ষোভে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শত শত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ খলিফা বিন সালমান গতকাল মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে নিজের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক বৈঠক করছিলেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রধান ফটক অবরোধ করে সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভকারীরা আল খলিফা পরিবারের শাসনের অবসান ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের দাবি জানান।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ খলিফা বিন সালমান দেশটির রাজা শেখ হামাদ বিন ইসা আল খলিফার চাচা। রাজা শেখ হামাদ বিন ইসা বিক্ষোভ দমনে ২০ হাজার সরকারি পদ সৃষ্টি ও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ক্রাউন প্রিন্স সালমান বিন হামাদ আল খলিফাকে নির্দেশ দিয়েছেন।