Saturday, July 10, 2010

মিরাজের প্রকৃতি ও শিক্ষা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হলো মিরাজ; এর আভিধানিক অর্থ সিঁড়ি, সোপান, ঊর্ধ্বগমন, বাহন, আরোহণ, উত্থান প্রভৃতি। অন্য অর্থে ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ বা মহামিলন। যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মুজিযা এবং মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার কুদরতের একটি মহা নিদর্শন। সমগ্র নবীকুলের মধ্যে একমাত্র বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এই অনন্য মর্যাদা প্রদান করা হয়। যাতে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার ঊর্ধ্বজগতের নিদর্শনাবলি ও তাঁর নিয়ামতরাজি স্বচক্ষে অবলোকন করে উম্মতকে তা সবিস্তারে বর্ণনা করতে পারেন। নবী করিম (সা.)-এর সফরের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দা (মুহাম্মদ)-কে এক রজনীতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় পরিভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছিলাম তাকে আমার নিদর্শন পরিদর্শন করার জন্য, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১)
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ৫০ বছর বয়সে রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে মিরাজের বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ওই রাত্রিতে তিনি পবিত্র কা’বা শরিফের চত্বরে (হাতীমে), কারও কারও মতে, উম্মে হানীর ঘরে শায়িত ও নিদ্রিত ছিলেন। এমন সময় জিব্রাঈল (আ.) সেখানে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগালেন, ওজু করালেন, তাঁর সীনা চাক করলেন এবং বোরাকে চড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছলেন। সেখানে তাঁকে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে বললেন, যে নামাজে নবীজি সমস্ত নবী-রাসূলগণের ইমামতি করলেন। তারপর তিনি আবার বোরাকে চড়ে সপ্ত আকাশ পরিভ্রমণ করলেন এবং এ ভ্রমণে তাঁর সঙ্গে হজরত আদম (আ.), হজরত ঈসা (আ.), হজরত ইয়াহ্ইয়া (আ.), হজরত ইউসুফ (আ.), হজরত ইদ্রিস (আ.), হজরত হারুন (আ.), হজরত মূসা (আ.) ও হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও সালাম বিনিময় হলো। নবীদের সংবর্ধনা শেষে সেখান থেকে সপ্তম আকাশের ওপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক স্থানে পৌঁছলেন, যেখানে ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ.) থেমে গেলেন এবং নবীজি একাকী রফরফে চড়ে বায়তুল মামুরে গিয়ে উপনীত হলেন।
এরপর নবীজি একাই রফরফে চড়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হন। তিনি এখানে শুধু একটি পর্দার আড়ালে থেকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করলেন। সেখানে তিনি প্রভুর সঙ্গে একান্ত আলাপে মিলিত হন। আশেক ও মাশুকের মধ্যে নানাবিধ কথোপকথন হলো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র সৃষ্টিরহস্য বুঝিয়ে দিলেন এবং বেহেশত-দোজখ দেখিয়ে দিলেন, যাতে এ সম্বন্ধে কথা বলতে তাঁর মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না হয়। সবশেষে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে আবার বোরাকে আরোহণ করে মুহূর্তের মধ্যে ধরণির বুকে ফিরে এলেন। সংক্ষেপে এই হলো মিরাজের ঘটনা। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর সে (মুহাম্মদ) তাঁর নিকটবর্তী হলো, অতি নিকটবর্তী; ফলে তাঁদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা কিছু প্রকাশ করার ছিল, তা প্রকাশ করলেন। ...নিশ্চয়ই সে তাকে (জিব্রাঈলকে) আরেকবার দেখেছিল সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার সন্নিকটে রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। যখন বৃক্ষটি যদ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার তদ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। এ সময় তার দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই সে তার প্রতিপালকের মহা নিদর্শনাবলি স্বচক্ষে অবলোকন করেছিল।’ (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৮-১৮)
শবে মিরাজ বা লাইলাতুল মিরাজের প্রকৃতি এতই অস্বাভাবিক যে, সাধারণ মানুষের এটা বুঝে আসে না বা জ্ঞানে ধরে না। কিন্তু এ ঘটনা ঘটেছে এবং আরও অনেক অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ পবিত্র কোরআন ও হাদিসে রয়েছে। যেমন, হজরত মূসা (আ.)-এর দলবলসহ হেঁটে নীলনদ পার হওয়া, হজরত ইব্রাহীম (আ.)-এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়া, হজরত ঈসা (আ)-এর আকাশে আরোহণ এবং আবারও দুনিয়াতে আগমন হবে, বিবি মরিয়মের স্বামী ব্যতীত পুত্রসন্তান লাভ এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মিরাজ ভ্রমণ—এ সবই অস্বাভাবিক ঘটনা। কেউ কেউ মিরাজকে স্বপ্ন বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এটা স্বপ্ন হলে নবীজি সোজাসুজি বলে দিতেন, গত রাতে তিনি এ ধরনের একটি স্বপ্ন দেখেছেন। সে ক্ষেত্রে ১৪০০ বছর যাবৎ এ নিয়ে এত তর্কবিতর্কের কোনো প্রয়োজন হতো না। আল্লাহ তাআলা এক বিশেষ উদ্দেশ্যে অর্থাৎ সৃষ্টিরহস্য ও বেহেশত-দোজখ সামনা-সামনি দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর প্রিয় হাবিবকে নিজের সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছিলেন, যাতে তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইসলাম প্রচার করতে পারেন। মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় এটা সংঘটিত হয়েছিল। মানুষ যদি তার জ্ঞান-বুদ্ধি বলে মহাশূন্যের এত বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে পারে, তাহলে সর্বময় ক্ষমতার আধার আল্লাহর পক্ষে তাঁর বন্ধুকে মিরাজে নেওয়া নিশ্চয়ই সম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকিত যুগে বসবাস করে কেউ মহানবী (সা.)-এর এ বিস্ময়কর ভ্রমণকে অস্বীকার করতে পারে না। এ মিরাজের সূত্র ধরে মানুষ মহাকাশ গবেষণায় বেশ সাফল্য পেয়েছে।
শবে মিরাজের উপহার সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে, মিরাজের রাতে নবী করিম (সা.) ও তাঁর উম্মতের জন্য কয়েকটি জিনিস দান করা হয়—প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ; যা প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁর উম্মতের যেসব ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কারও শরিক করবে না, আল্লাহ তার ধ্বংসাত্মক পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। তৃতীয়ত, সূরা আল-বাকারার শেষ অংশ। চতুর্থত, সূরা বনি ইসরাইলের ১৪ দফা নির্দেশ; যথা—১. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা ও তাঁর সঙ্গে কারও শরিক না করা, ২. পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, ৩. আত্মীয়স্বজন, মিসকিন ও মুসাফিরের হক মেনে চলা, ৪. অপচয় না করা, ৫. যারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী তারা যেন কোনো ফকির ও প্রার্থীকে বঞ্চিত না করে, ৬. সব সময় কিছু দান করা; হাতকে গুটিয়ে না রাখা, ৭. অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা না করা, ৮. দারিদ্র্যের অজুহাতে যেন সন্তান হত্যা না করা হয়, ৯. ব্যাভিচারের নিকটবর্তীও না হওয়া, ১০. এতিমের সম্পদের ধারেকাছেও না যাওয়া, ১১. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তা অনুসন্ধান না করা, ১২. মেপে দেওয়ার সময় সঠিক ওজন দেওয়া, ১৩. প্রতিশ্রুতি পালন করা, ১৪. পৃথিবীতে দম্ভ ভরে চলাফেলা না করা। এসব দিকনির্দেশনা মেনে চললে ইহকালীন ও পারলৌকিক জীবনে অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজের প্রকৃতি ও অনুপম শিক্ষা বিভিন্ন দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। শবে মিরাজের মাধ্যমে ঊর্ধ্বলোকের উচ্চতম স্থানে মহান স্রষ্টার চরম, নিবিড় সান্নিধ্যে মহাবিশ্বে পরিভ্রমণের মাধ্যমে সৃষ্টিরহস্য উদ্ঘাটনের পরম সৌভাগ্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রদান করে মানবমর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব বিধান করা হয়। ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর উৎপীড়নের কাল সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে আদর্শ সমাজ ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের বুনিয়াদি মূলনীতি মিরাজের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য উপহার হিসেবে পাওয়া যায়, যা পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাইলে মিরাজসংক্রান্ত আলোচনায় বিধৃত হয়েছে, যাকে ইসলামি মূলনীতির ১৪ দফা নামে অভিহিত করা যায়। নবী করিম (সা.) মিরাজ থেকে ফিরে এসে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে আদর্শ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে জগৎবাসীকে বিশ্বশান্তির পথ প্রদর্শন করে সফল হয়েছিলেন। তাই আজকের অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিরাজের ১৪ দফা ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের শিক্ষা গ্রহণ করা দরকার। যদি মুসলমানদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান জীবনাদর্শ ও মিরাজের শিক্ষামূলক অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে—একটি আদর্শ ও কল্যাণমুখী জাতি গঠনের রূপরেখা অনুযায়ী—নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নমুখী কাজ করা যায়, তাহলেই বিশ্ব মানবতার সর্বাঙ্গীণ শান্তি ও মুক্তি সম্ভব হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়; পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
dr.munimkhan@yahoo.com

বিএনপির মানববন্ধন

বুধবার বিরোধী দল আহূত দেশব্যাপী এক ঘণ্টার মানববন্ধন কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হতে পারত, যদি না পুলিশ বাধা দিত। একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এ ধরনের বাধাদান যেমন অযৌক্তিক, তেমনি উসকানিমূলকও। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধের দাবিতে বিরোধী দল মানববন্ধন কর্মসূচি আহ্বান করেনি, করেছিল হরতালের সময়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে। এর বিকল্প হিসেবে তারা কী-ই বা করতে পারত?
এর আগে বিরোধী দলের ডাকা হরতালের আমরা বিরোধিতা করেছিলাম এই যুক্তিতে যে এ ধরনের হিংসাত্মক কর্মসূচি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, অর্থনীতির গতি থামিয়ে দেয়। অন্যবারের মতো গত ২৭ জুনের হরতালটিও শান্তিপূর্ণ হয়নি। আগের রাতে পিকেটারদের আগুনে পুড়ে একজন ট্যাক্সিচালককে জীবন দিতে হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
কিন্তু এক ঘণ্টার মানববন্ধন কর্মসূচিতে সে আশঙ্কা ছিল না। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও বিধিনিষেধ জারি করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে আইন ভাঙারও প্রশ্ন ছিল না। তার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন কঠোর অবস্থানে গেল, কেন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের রাস্তায় দাঁড়াতে দেয়নি, তা রহস্যজনক। বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিলে তারা বিকল্প পথই খুঁজে নেবে। সেটি কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।
বুধবারের কর্মসূচিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই খড়্গহস্ত ছিল না, কয়েকটি স্থানে সরকার-সমর্থক সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও হামলা চালিয়েছেন। এ ধরনের হামলা নিন্দনীয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব জনজীবনের নিরাপত্তা দেওয়া, কোনো দলের কর্মসূচি পণ্ড করা নয়। তাঁরা দলীয় কর্মীদের মতো আচরণ করবেন কেন?
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিরোধী দলের কর্মসূচিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধী দলকে দমন করা কিংবা দলীয় কাজে রাষ্ট্রের কোনো বাহিনী বা সংস্থাকে ব্যবহার করার পরিণাম কখনো ভালো হয় না। যে পুলিশ আজ বিরোধী দলকে ঠেঙাচ্ছে, সেই পুলিশই জোট আমলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালাত।
অতএব, শক্তি প্রয়োগ না করে সরকারের উচিত সহনশীলতা প্রদর্শন করা ও যেকোনো রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া। একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও কর্তব্য হবে রাজপথে সমাধান না খুঁজে সংসদে তাদের দাবিদাওয়া তুলে ধরা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদই হবে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হওয়াও বাঞ্ছনীয়। উভয় পক্ষকে দল ও গোষ্ঠীস্বার্থের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশবাসী সংঘাত চায় না, চায় শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

ব্রিটেনে বাড়ির দাম আরও কমেছে

ব্রিটেনে বাড়ির দাম টানা তৃতীয় মাসের মতো গত জুনেও কমেছে। বাড়ি কেনায়ঋণ দেওয়ার একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা জানায়।
ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান হ্যালিফ্যাক্সের কর্মকর্তা মার্টিন এলিস বলেন, ‘ গত মে মাসের পর জুনেও বাড়ির দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। এই প্রবণতা থেকে আমাদের মনে হচ্ছে, এ বছরজুড়ে বাড়ির দাম খুব একটা বেশি পরিবর্তন হবে না।’
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপের (এলজিবি) মালিকানাধীন হ্যালিফ্যাক্স জানিয়েছে, ব্রিটেনে এখন বাড়ির গড় দাম এক লাখ ৬৬ হাজার ২০৩ পাউন্ড।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিচারে লাদেনের বাবুর্চি দোষী সাব্যস্ত

কিউবার গুয়ানতানামো বে কারাগারে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিচারে আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনের বাবুর্চিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই বিতর্কিত আদালতে এই প্রথম কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো।
পেন্টাগনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওসামার ওই বাবুর্চির নাম ইব্রাহিম আহমেদ মাহমুদ আল কুজি। তিনি ২০০২ সাল থেকে গুয়ানতানামো কারাগারে বন্দী আছেন। ইব্রাহিম স্বীকার করেন, তিনি আল-কায়েদাকে সহায়তা করেছেন এবং এটাও জানতেন, সংগঠনটি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত। গুয়ানতানামো মার্কিন নৌঘাঁটির মেজর তানিয়া ব্রাডসের বলেন, আগামী মাসে শুনানির পর তাঁর সাজা ঘোষণা করা হবে।
৫০ বছর বয়সী ইব্রাহিম সুদানের নাগরিক। তিনি স্বীকার করেন, ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি আল-কায়েদাকে সহায়তা করে আসছিলেন।

ক্যালিফোর্নিয়ায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গত বুধবার মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪।
জানা গেছে, ভূমিকম্পের ফলে কিছু এলাকার দোকানের তাক থেকে বিভিন্ন পণ্য পড়ে যায়। পাম স্প্রিং অ্যারিয়েল ট্রামওয়ের কাছে পাহাড় থেকে ছোট পাথরের খণ্ড ধসে পড়ে। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ভূমিকম্পবিদ কেট হুটন বলেন, ‘আমরা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করেছিলাম। ভূকম্পন বিন্দু (যে বিন্দুতে ভূমিকম্প পৃথিবীর উপরিভাগ স্পর্শ করে) ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানে বহুতল কোনো ভবন বা ইটের তৈরি পুরোনো কোনো বাড়ি না থাকায় ক্ষতি অনেক কম হয়েছে।

ধর্মঘটে অচল গ্রিস

অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর প্রতিবাদে ডাকা সাধারণ ধর্মঘটে গতকাল বৃহস্পতিবার অচল হয়ে পড়েছিল গ্রিস। দেশটির বিমান ও রেল যোগাযোগ ভীষণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতাল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে।
গ্রিক সরকার গত বুধবার পার্লামেন্টে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া অবসর ভাতা গড়ে সাত শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় অবসর ভাতা থেকে অর্থ বাঁচানোর লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের এক দিন পরই গতকাল দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।
২৪ ঘণ্টার ধর্মঘটে রাজধানী এথেন্সসহ অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। বিমান কর্মকর্তারা জানান, ধর্মঘটের কারণে ৮০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করা হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ এ ধর্মঘটে অংশ নেওয়ায় আরও ১১০টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়।
দেশটির চরম ঋণসংকট কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গ্রিক সরকারের বর্তমানে ৩০ হাজার কোটি ইউরো ঋণ রয়েছে

ডেভিড জনস্টোন কানাডার পরবর্তী গভর্নর জেনারেল

কানাডার পরবর্তী গভর্নর জেনারেল পদে ওয়াটারলু ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট ডেভিড জনস্টোনকে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি আগামী সেপ্টেম্বরে কানাডার বর্তমান গভর্নর জেনারেল মিশেল জেনের স্থলাভিষিক্ত হবেন। চলতি সপ্তাহে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কানাডা সফরকালে জনস্টোনকে নতুন গভর্নর জেনারেল হিসেবে অনুমোদন করেন। কানাডার প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদার গভর্নর জেনারেল পদটি একটি সাংবিধানিক পদ, যা এখনো রানির অনুমোদনসাপেক্ষে নির্ধারিত হয়।
জনস্টোন (৬৯) কানাডার সাডবুরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ এবং কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। মন্ট্রিলের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে তিনি ১৫ বছর অধ্যাপনা করাসহ এর ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্বও পালন করেন। কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মালরোনির সঙ্গে জার্মানের অস্ত্র ব্যবসায়ী কার্লহেইস স্কেরিবারের অস্ত্র কেলেঙ্কারি তদন্তের প্রতিবেদন তৈরির জন্য তিনি আলোচিত হন। এ ছাড়া টেলিভিশনে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক বিতর্ক অনুষ্ঠানে সূত্রধরের দায়িত্ব পালন করে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হন।

কলম্বোয় জাতিসংঘের কার্যালয়ের সামনে মন্ত্রীর অনশন শুরু

শ্রীলঙ্কার গৃহায়ণমন্ত্রী বিমল বিরাবানসা কলম্বোয় জাতিসংঘের কার্যালয়ের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। তামিল টাইগারদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জাতিসংঘ একটি তদন্ত প্যানেল গঠন করেছে। সেই প্যানেলের তদন্ত-কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে তিনি এই অনশন শুরু করেন।
এর আগে সমর্থকদের নিয়ে দুই দিন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন মন্ত্রী বিরাবানসা। বিক্ষোভের সময় সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধাপরাধ আদালতের সামনে হাজির করতে চায়। কিন্তু আমরা এটা ঘটতে দিতে পারি না।’ তিনি জাতিসংঘের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সারা দেশে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
গত বুধবার জাতিসংঘ এই বিক্ষোভকে ‘অপ্রীতিকর’ বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের মতে, শ্রীলঙ্কার সেনারা গত বছরের মে মাসে তামিল টাইগার গেরিলাদের সঙ্গে লড়াইয়ের একেবারে শেষ দিকে কমপক্ষে সাত হাজার বেসামরিক তামিলকে হত্যা করে। ৩৭ বছরের এই লড়াইয়ে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত হয়।

২৬ ঘণ্টা আকাশে উড়ল সৌরশক্তিচালিত বিমান

সুইজারল্যান্ডে সৌরশক্তিচালিত বিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফল হয়েছে। গত বুধবার রাতে বিমানটি উড্ডয়ন শুরু করে ২৬ ঘণ্টা পর সফলভাবেই অবতরণ করে।
সুইজারল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের পেয়ার্ন বিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা এইচবি-এসআইএ নামের বিমানটি গতকাল স্থানীয় সময় সকাল নয়টা এক মিনিটে ওই ঘাঁটিতেই অবতরণ করে।
ফ্লাইট পরিচালনাকারী দলের প্রধান বারট্রান্ড পিক্কার্ড বলেন, রাতভর সৌরশক্তিচালিত বিমান ওড়ানোর ঘটনা এটাই প্রথম। আমরা এটা করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা সফল হয়েছি। তিনি জানান, বিমানে আরও তিন ঘণ্টার মতো শক্তি সঞ্চিত ছিল, যা আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।’
ফ্লাইটের পরিচালক ক্লদ নিকোলিয়ার বলেন, পাইলট আন্দ্রে বোর্সবার্গ রাতভর সফলভাবে বিমান চালনার পর বৃহস্পতিবার সকালে অবতরণ করেন। এটা অসাধারণ এক ব্যাপার।
উচ্চপ্রযুক্তির এক আসনের এই বিমানের ডানায় স্থাপিত সোলার সেলে সঞ্চিত সৌরশক্তি দিয়ে এটি চালানো হলো। বিমানটির ওজন একটি সাধারণ পারিবারিক গাড়ির সমান হলেও ডানার বিস্তৃতি একটি বড় বিমানের মতোই। যার দৈর্ঘ্য ৬৩ মিটার। এই ডানাতেই রয়েছে ১২ হাজার সোলার সেল।
গত সপ্তাহে এই পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন চালানোর কথা ছিল। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে তা স্থগিত করা হয়।

কিউবা ৫২ জন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিচ্ছে

কিউবা ৫২ জন ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিতে রাজি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকেই মুক্তি দেওয়ার এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিন-চার মাসের মধ্যে এঁদের মুক্তি দেওয়া হবে। গত কয়েক দশকের মধ্যে কিউবায় এটাই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি দেওয়ার ঘটনা।
কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো ও সফররত স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল মরাটিনোসের মধ্যে বৈঠকের পর রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার এ ঘোষণা আসল। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিউবা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে কিউবায় নতুন যুগের সূচনা হলো।
মুক্তিপ্রাপ্ত পাঁচজন বন্দীকে অ্যাঞ্জেলের সঙ্গে করে স্পেন নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। অবশিষ্ট ৪৭ বন্দীকেও স্পেন সরকার রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ২০০৩ সাল থেকে কিউবা যে ৭৫ জন ভিন্নমতাবলম্বী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁদের ৫২ জনকেই মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের ছয় থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত সাজা হয়েছে।
কিউবার রোমান ক্যাথলিক গির্জার আর্চবিশপ কার্ডিনাল জেইমি ওর্তেগা ও মোরাশন বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠকের পর মোরাশন জানান, কাস্ত্রো তাঁদের বলেছেন, মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কিউবায় বেড়াতে আসতে পারবেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা ও যোগাযোগ করতে পারেবেন এবং তাঁদের সম্পত্তিও সরকার বাজেয়াপ্ত করবে না। মুক্তির ঘোষণাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সরকার ব্ল্যাকমেইলও করবে না—এ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশনে একজন বন্দীর মৃত্যুর পরই বিষয়টি বিশ্ববাসীর নজরে আসে। রাজনৈতিক বন্দীদের ছেড়ে দিতে কিউবার ওপর চাপ আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। সম্প্রতি একই দাবিতে আরেকজন বন্দী আমরণ অনশন করতে গিয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছালে কিউবা সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়।

৫ রাজ্যে মাওবাদীদের হামলা

মাওবাদীদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার ভারত বনেধর প্রথম দিনে ভারতের মাওবাদী অধ্যুষিত রাজ্য ছত্তিশগড়, ওড়িশা, আসাম, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক হামলা, সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার থেকে শুরু হয়েছে এই বন্ধ্। শেষ হবে আজ শুক্রবার। অন্ধ্র প্রদেশের শীর্ষ মাওবাদী নেতা চেরিপুরি রাজকুমার ওরফে আজাদকে ‘হত্যা’ করার প্রতিবাদে এই বনেধর ডাক দেয় মাওবাদীরা। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুলিশের সঙ্গে এক সংঘর্ষে নিহত হন মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় নেতা আজাদ। মাওবাদীরা অবশ্য ওই সংঘর্ষের কাহিনিকে পুলিশের মিথ্যা রটনা বলে দাবি করেছে।
বনেধর প্রথম দিনেই মাওবাদীরা ওড়িশার কেওনঝাড় জেলার দৈতারি থানায় হামলা চালায়। ৮০ জন মাওবাদীর একটি স্কোয়াড থানাটির ওপর আক্রমণ চালিয়ে উমেশ চন্দ্র মারান্ডি নামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে অপহরণ করে। মাওবাদীদের স্কোয়াডটি কাছের বন বিভাগের একটি অফিসেও হামলা চালায় এবং অফিসটি জ্বালিয়ে দেয়।
মহারাষ্ট্রের গাদচিরোলি জেলার ডংগারগাঁও গ্রামে মাওবাদীরা টহলরত একদল পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের গুলিতে এক মাওবাদী নারী নিহত হন।
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনির কলমীমাতা গ্রামে মাওবাদীরা সাতজন সিপিএম নেতার বাড়িতে হামলা চালায়। বুধবার রাতে ছত্তিশগড়ের কুয়াকোন্ডা থানার নকুলনর গ্রামের কংগ্রেস নেতা অধ্যেশ গৌতমের বাড়ির ওপর মাওবাদীদের একটি দল হামলা চালায়। এ হামলায় অধ্যেশ গৌতমের দুই সহযোগী নিহত এবং তাঁর ছেলে ও এক নিরাপত্তা রক্ষী আহত হন। মাওবাদীরা কুয়াকোন্ডা থানাতেও হামলা চালায়। এ হামলার সময় ছয়জন মাওবাদী নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া এদিন ছত্তিশগড়ের তিনটি জেলায় সিআরপিএফের তিনটি ক্যাম্পে হামলা চালায় মাওবাদীরা। রাত সাড়ে নয়টার দিকে নারায়ণপুরের এরকা গ্রাম, দান্তেওয়ারার পোলামপল্লি এবং বিজাপুর জেলার বসাগুড়ায় তিনটি সিআরপিএফ ক্যাম্পে একই সময়ে হামলা চালায় মাওবাদীরা। ঝাড়খণ্ডের লাতেহার জেলার একটি রেলস্টেশন ও রেললাইনের একটি অংশ উড়িয়ে দিয়েছে মাওবাদীরা। ঝাড়খন্ডের ধানবাদেও ব্যাপক নাশকতা চালিয়েছে মাওবাদীরা।
আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে কলকাতা আসার পথে গরিবরথ এক্সপ্রেস ট্রেনটি আসামের গোসাঁইগাঁও স্টেশনের কাছে দুর্ঘটনায় পড়ে। অনুমান করা হচ্ছে, বোমা বিস্ফোরণের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ট্রেনটির ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাত আড়াইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশের সন্দেহ, মাওবাদীরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে।
পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী অধ্যুষিত পুরুলিয়া, বাকুরা এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জঙ্গল মহলে এ বন্ধ্ কর্মসূচি বেশ জনসমর্থন পেয়েছে। এ অঞ্চলে রাতের বেলায় সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে মাওবাদী সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ১৪ জুলাই রাজধানী দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম মাওবাদী অধ্যুষিত সাতটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের এক বৈঠক ডেকেছেন। এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও উপস্থিত থাকবেন।

আল-কায়েদার নেতাসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

২০০৯ সালে নিউইয়র্কের ব্যস্ততম পাতালরেলে আত্মঘাতী হামলার চেষ্টা মামলায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আল-কায়েদার এক নেতাসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন মার্কিন বিচার বিভাগের কৌঁসুলিরা। তাঁরা বলেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যুক্তরাজ্যেও হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। পাকিস্তানে থাকা আল-কায়েদার নেতারা ওই দুটি হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তাঁদের সে চেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়। গত বুধবার নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে দাখিল করা অভিযোগনামায় কৌঁসুলিরা এ কথা জানান।
অভিযোগে বলা হয়, পাকিস্তানভিত্তিক আল-কায়েদার নেতারা তাঁদের পশ্চিমা সহযোগীদের মাধ্যমে যে নাশকতামূলক চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে পাতালরেলে হামলার পরিকল্পনা সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। অভিযোগে বলা হয়, গত বছর ৯/১১ ঘটনার অষ্টম বছর পূরণ হওয়ার দিনে আল-কায়েদা চক্র নিউইয়র্কের ব্যস্ততম পাতালরেলে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দারা সে চেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়। কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের ওই পরিকল্পনা যদি সফল হতো, তাহলে সেটা হতো ৯/১১ ট্র্যাজেডির পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নাশকতামূলক ঘটনা।
এ মামলায় আফগান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক নাজিবুল্লাহ জাজিকে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। আটক হওয়া জাজি গত ফেব্রুয়ারিতে আদালতে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। জাজি বলেছেন, পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানে আল-কায়েদার ঘাঁটিতে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন এবং তিনি নিজেই নিউইয়র্কে আত্মঘাতী হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
মামলার আরেক অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে কৌঁসুলিরা সৌদি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আদনান আল শুকরিজুমাহর নাম উল্লেখ করেছেন। সাত বছর ধরে তিনি পলাতক। তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণাও করেছে। অভিযোগনামায় বলা হয়, শুকরিজুমাহ পাকিস্তানভিত্তিক আল-কায়েদার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাদের নির্দেশমতো কাজ করতেন। আল-কায়েদার নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগে মধ্যস্থতা করতেন পাকিস্তানের পেশোয়ারের আহমাদ নামের এক ব্যক্তি। এই আহমাদই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত নাজিবুল্লাহ জাজি এবং যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে অবস্থানরত আবিদ নাসির নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করতেন। তিনি শুকরিজুমাহর পক্ষ থেকে জাজি ও নাসিরকে হামলার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। কৌঁসুলিরা জাজি, শুকরিজুমাহ, নাসির ছাড়া আরও যে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। তাঁরা হলেন বসনীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আদিস মেদুনজানিন ওরফে মোহাম্মাদ ও পাকিস্তানি নাগরিক তারিক উর রহমান। মোহাম্মাদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আটক রয়েছেন এবং তারিক পাকিস্তানে পালিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হয়। এঁদের সবার বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টাসহ মোট ১০টি অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে এঁদের সবারই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নরিয়েগাকে আরও সাত বছরের সাজা দিল ফরাসি আদালত

পানামার সাবেক স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে সাত বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন ফ্রান্সের একটি আদালত। আশির দশকে কলম্বিয়ার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাদক বিক্রির অর্থ পাচারের দায়ে তাঁকে এ সাজা দেওয়া হলো। আদালত তাঁর পাচার করা ২৮ লাখ মার্কিন ডলার জব্দ করারও নির্দেশ দিয়েছেন।
প্যারিসের একটি আদালতে গত বুধবার এ রায় ঘোষণা করা হয়। এ সময় ৭৬ বছরের নরিয়েগা কাঠগড়ায় কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। রায় শোনার পর তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া এ রায় একজন দোভাষী নরিয়েগাকে পড়িয়ে শোনান। তাঁর আইনজীবী এ রায়কে ‘মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
আদালতের রায় ঘোষণার পর নরিয়েগার আইনজীবী ইভস লেবারকুয়ার বলেছেন, রায় শুনে তাঁর মক্কেল বিস্মিত হয়েছেন। তিনি ভেঙ্গে পড়েছেন।
এর আগে ১৯৯৯ সালে ফ্রান্সের আদালতে তাঁর অনুপস্থিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছর কারাভোগ করার পর গত এপ্রিলে নরিয়েগাকে ফ্রান্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নরিয়েগার বিরুদ্ধে আনা অর্থ পাচারের মামলার শুনানি গত সপ্তাহে একই আদালতে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় নরিয়েগা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আশির দশকে তাঁর একসময়কার মিত্ররাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের শিকার তিনি।
অনেক বছর ধরে পানামার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান থাকার পর নরিয়েগা ১৯৮২ সালে সে দেশের ক্ষমতাধর ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার হন। এরপর থেকে তিনি কার্যত দেশের শাসক হয়ে যান। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত পানামা শাসন করেন তিনি।
অর্থ পাচারের অভিযোগের ব্যাপারে নরিয়েগা জবানবন্দিতে বলেছেন, আশির দশকে মিত্ররাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন তিনি। মধ্য আমেরিকায় বামপন্থীদের উত্থান দমনে যুক্তরাষ্ট্র পানামা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাবে রাজি হননি। তাই যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ বছর কারাভোগ শেষে ২০০৭ সালে নিজেকে পানামায় পাঠানোর জন্য মার্কিন সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন নরিয়েগা। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট গত ফেব্রুয়ারিতে এ আবেদন খারিজ করে দেন।
পানামা সরকার জানায়, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি তারা সম্মান জানায়। তবে তারা নরিয়েগাকে দেশে ফিরিয়ে নিতেও চেষ্টা করবে। কেননা পানামাতেও তিনি সাজাপ্রাপ্ত।
ষাটের দশকের শেষের দিক নরিয়েগা সিআইয়ের এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি সিআইএকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনে যুক্তরাষ্ট্র

পুরো মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের দাবি করলেন ফরাসি চিকিৎসকেরা

এবার ফরাসি চিকিৎসকেরা দাবি করেছেন, বিশ্বে তাঁরাই প্রথম চোখের পাতাসহ পূর্ণাঙ্গ মুখমণ্ডল সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের লো পাখিজিঁয়া অজুগোদুই সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এর আগে গত এপ্রিলে স্পেনের চিকিৎসকেরা দাবি করেছিলেন, তাঁরাও একই ধরনের অস্ত্রোপচার করেছেন। খবর এএফপির।
গত জুনের শেষের দিকে জেরোম (৩৫) নামের ব্যক্তির মুখে এ অস্ত্রোপচার করা হয়। তাঁর মুখমণ্ডল জন্ম থেকে বিকৃত ছিল। অস্ত্রোপচার করা হয় প্যারিসের উপশহরের ক্রেতেই অঁরি মদখ হাসপাতালে।
হাসপাতালটির রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারি বিভাগের প্রধান লরা লাতিয়েরি বলেন, ‘এ ধরনের অস্ত্রোপচার বিশ্বে এটাই প্রথম। আমার রোগী এখন ভালো আছে। তিনি হাঁটছেন, খাচ্ছেন ও কথা বলছেন। তাঁর নতুন মুখে দাড়ি গজাচ্ছে।’
চিকিৎসক লরা জানান, অস্ত্রোপচারের পর রোগী যখন প্রথম আয়নায় নিজেকে দেখেন, তখন তিনি চমকে ওঠেন। এই প্রতিস্থাপনের জন্য তিনি দুই বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি খুব খুশি।
অস্ত্রোপচারের ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে ওই রোগী ও চিকিৎসক কারও সঙ্গে বার্তা সংস্থা এএফপি কথা বলতে পারেনি।
গতকাল সকাল পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।
অস্ত্রোপচারের জন্য একটি মৃতদেহ থেকে মুখ, চোখের পাতাসহ পুরো মুখমণ্ডল নেওয়া হয়। পরে তা প্রতিস্থাপন করা হয় ওই ব্যক্তির মুখমণ্ডলে। একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে স্নায়ু ও রক্তনালির পথ যুক্ত করা হয়।
লরার বরাত দিয়ে পত্রাকাটি জানায়, চোখের পাতাসহ আমরাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপন করেছি। আমি গর্বিত, কারণ এটা ফ্রান্সে হয়েছে। লরা জানান, ১০ জনেরও কম মানুষের মুখে এ ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে স্পেনের বার্সেলোনার ভল হেবরন বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ৩০ জনের একটি শক্তিশালী দল জানায়, তারা দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক তরুণের শরীরে পুরো মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপন করেছে।
এর আগে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন ফ্রান্সের। পাঁচ বছর আগে ফ্রান্সের চিকিৎসকেরা প্রথমবারের মতো আংশিক মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের দাবি করেছিলেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণের দাবি

অর্থনীতির স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দেশের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)।
এফবিসিসিআই জানিয়েছে, দুই বছর আগেও এসব প্রতিষ্ঠানের লোকসানের পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটি টাকা। বর্তমানে তা হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। সরকারকে অহেতুক লোকসানের বোঝা বইতে হচ্ছে এবং দিন দিন তা বাড়ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে বেসরকারিকরণ কমিশনকে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করে এফবিসিসিআই।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত নেতাদের একটি প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব দাবি জানানো হয়।
এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত সভাপতি এ কে আজাদের নেতৃত্বে দলে অন্যদের মধ্যে প্রথম সহসভাপতি জসিম উদ্দিন, সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, পরিচালক আবদুল হক, হারুন উর রশিদ, গোলাম মোস্তফা তালুকদার, আবদুর রাজ্জাক, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, হেলাল উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারীকরণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে একটি সমীক্ষা চালাচ্ছে বেসরকারীকরণ কমিশন। সামনে ভালো কিছু হতে পারে।
বৈঠকে সদ্য পাস হওয়া বাজেটের কয়েকটি খাতের মূল্য সংযোজন কর (মূসক), আমদানি শুল্ক ও আয়কর পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করে এফবিসিসিআই।
প্লাস্টিক খাতের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টি এবং পণ্যের গায়ে ‘বন্ডের আওতায় আমদানি, বিক্রয়ের জন্য নয়’ প্রত্যাহার এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) পাঁচ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগের তিন শতাংশই বহাল রাখা দরকার বলে এফবিসিসিআই মনে করে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, দেশীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে তৈরি পিভিসি পাইপের ওপর থেকে টার্নওভার ট্যাক্স প্রত্যাহার করে মূসকের আওতায় নিয়ে আসাটা উচিত হয়নি।
নেতারা এফবিসিসিআইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ, শিল্প পুলিশ গঠন, ব্যাংকের সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা, ২৭০টি রুগ্ণ পোশাক কারখানার পুনর্বাসনে টাস্কফোর্সের সুপারিশ বাস্তবায়নসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের সহযোগিতা দাবি করেন।
পুলিশের সঙ্গে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও শিল্প পুলিশ গঠনে এখন আর কোনো বাধা নেই বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এটি প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার উল্লেখ করে তিনি জানান, শিগগির শিল্প পুলিশ গঠন করা হবে।
৩০ কোটি টাকা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ একে ভালো চোখে দেখবে না। বলবে, এফবিসিসিআইয়ে যাঁরা আছেন, তাঁরা সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি। তাঁদের টাকা দেওয়া কেন?’
গ্যাস সরবরাহের ব্যাপারেও কোনো অঙ্গীকার করবেন না বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, ‘গ্যাসের বিষয়টি একেবারেই অনিশ্চিত।’
সরকার ঘোষিত মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ‘রূপকল্প’ বাস্তবায়নে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা, শিল্প এলাকা ও শিল্প উন্নয়নের জন্য নীতি-সহায়তার দাবি জানান এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদ।
এ কে আজাদ জানান, চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৯ শতাংশ বাড়িয়ে যে ৭২ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা করা হয়েছে, জাতীয় সংসদ কার্যকর ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেই তা অর্জিত হওয়া সম্ভব।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আরও জানান, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনলে ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ হচ্ছে, তার চেয়ে ১০ গুণ রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে।
এ কে আজাদ বলেন, ঢাকা যানজটের এক নগরে পরিণত হয়েছে। এর এক পাশ থেকে আরেক পাশে যেতে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। সুতরাং ঢাকায় আর কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়। যেগুলো আছে সেগুলোকেও বরং বাইরে পাঠাতে হবে।

এ যেন বার্সেলোনাই!

এটা এখন জ্বলন্ত সূর্যের মতো সত্য। বিশ্বকাপ শিরোপা সাত দলের মণিহার হয়ে আর থাকতে পারছে না। নতুন কারও গলায় সে উঠছেই। স্পেন বা হল্যান্ড যে-ই ১১ জুলাই জোহানেসবার্গ সকার সিটি স্টেডিয়ামে বিজয়ীর হাসি হাসুক, নতুন চ্যাম্পিয়নকে পাওয়া যাচ্ছেই। কিন্তু একটা পুরোনো বিতর্কের মীমাংসা তবু হবে না। জাতীয় দলের গৌরবের পতাকা উড়িয়েও খেলোয়াড়েরা তাঁদের ক্লাবের আবেগ ভুলতে পারেন না বিশ্বকাপে এসেও। ক্লাব বনাম জাতীয় দল—এই দ্বন্দ্ব যেন অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকবে।
সেদিন সেমিফাইনালে ওঠার পর ডাচ তারকা স্নাইডারের মুখের প্রথম বাক্যটি ছিল এমন, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের পর বিশ্বকাপেরও ফাইনালে উঠলাম। এটা তো আরও বড় অর্জন।’
কোথায় বিশ্বকাপ, আর কোথায় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগ! স্নাইডার তাঁর ক্লাব ইন্টার মিলানের সাফল্যের কথা বলছেন বিশ্বকাপের আগে! কিছুই বলার নেই। যে পেশাদার পৃথিবীর কাছে অর্থের টানটা সবকিছুর আগে সেখানে একজন ফুটবলারের কাছে তাঁর ক্লাবের কথাই মনে পড়ে যাবে সবার আগে। তাহলে তো বার্সেলোনার কথা স্পেন দলটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হওয়ার কথা। জার্মানির আনন্দ-দৌড় থামিয়ে ফাইনালে ওঠার পর কার্লোস পুয়োলরা বলতেই পারেন, ‘এই তো শেষ ম্যাচটা জিতেই বার্সেলোনার লা লিগা জয়ের মতো হাসি হাসব আমরা!’ তাঁরা তা বলছেন না। তাঁরা বলছেন না, তবে পুরো স্প্যানিশ সমর্থক গোষ্ঠী বা সাংবাদিক সমাজের মধ্যে বার্সেলোনা বার্সেলোনা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে আগেই। বার্সেলোনা-ভিত্তিক কাতালান সাংবাদিকদের পুরো স্পেন দল থেকে আলাদা করে নেওয়া যায়। তাঁরা সংবাদ সম্মেলনে বসেন একটা জায়গায়, মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে যান সামনের সারিতে। স্পেনের এই দলের প্রতি তাঁদের অধিকারই তো বেশি। হিসাব করে দেখুন, স্পেনের ২৩ জনের দলে বার্সেলোনারই খেলোয়াড় ৮ জন। কার্লোস পুয়োল, জেরার্ড পিকে, জাভি হার্নান্দেজ, সার্জিও বুসকেটস, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, পেদ্রো রদ্রিগেজ, ভিক্টর ভালদেস ও ডেভিড ভিয়া। ডেভিড ভিয়া এখনো লাল-বেগুনি জার্সি গায়ে মাঠে না নামলেও তিনি বিশ্বকাপ শুরুর দিন বিশেক আগেই বার্সেলোনার হয়ে গেছেন। প্রথম একাদশের অন্তত ৬ জনই থাকছেন ‘লস ব্লগ্রানা’র। বার্সেলোনার খেলোয়াড়েরাই তো স্পেনকে ফাইনালে তুলে নিতে রাখলেন মূল ভূমিকা। যে ৭টি গোল স্পেনের ফাইনালের সেতুবন্ধ, তার সবগুলোই বার্সেলোনার। যার মধ্যে ভিয়া একাই করেছেন পাঁচটি। আর যাঁর অসাধারণ এক হেডে সেমিফাইনাল পেরোল লা ফুরিয়া রোজারা, সেই পুয়োল তো বার্সেলোনার প্রতীক, বার্সেলোনার আনন্দ-বেদনার সঙ্গী, তাঁর নিঃশ্বাসের নামই বার্সেলোনা।
পরশু জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে ডারবানের মোজেস মাভিদা স্টেডিয়াম পুয়োলের কাছে যেন হয়ে উঠল ন্যু ক্যাম্প। অধিনায়কের বাহুবন্ধনী ইকার ক্যাসিয়াসের হাতে, কিন্তু তিনিই দিলেন নেতৃত্ব। রক্ষণ সামলালেন। মাঝমাঠে উঠে বল দিলেন ইনিয়েস্তা জাভির পায়ে। গোলমুখ খোলা যাচ্ছে না দেখে মাঝেমধ্যেই ওপরে উঠে গোল করার চেষ্টা করলেন। গোলের জন্য মরিয়া বার্সেলোনার হয়ে যেমনটা করেন। অবশেষে ৭৩ মিনিটে স্পেনের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় গোলটাই করে ফেললেন ধ্রুপদি এক কর্নার কিকে। মাঝারি আকৃতির শরীরটা হাওয়ায় ভাসিয়ে পেরিয়ে গেলেন পার মার্টেসেকার ও সামি খেদিরার নাগাল। তারপর ঝাঁকড়া চুলে মোক্ষম হেড। গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার তাতে হাত ছোঁয়াতে হলেন অক্ষম। ভাগ্যলিপি লেখা হয়ে গেল জার্মানির। চতুর্থ শিরোপা দূর অস্ত, অষ্টমবারের মতো ফাইনালেই ওঠা হলো না তাদের। অসাধারণ ওই কর্নার কিকটা নিয়েছেন কে? জাভি হার্নান্দেজ, বার্সেলোনার ‘মিডফিল্ড জেনারেল’।
স্পেনের সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হলে নিশ্চয়ই জানা যাবে, মাদ্রিদের চেয়ে বার্সেলোনায় উৎসবের রং ছিল বেশি। পুরো কাতালান হয়তো আলোকসজ্জা শুরু করে দিয়েছে।
স্পেনের এক সাংবাদিক, নাম সেবাস্তিয়ান, তাঁর দায়িত্ব ছিল আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ দেখে মেসির ওপর রিপোর্ট করা। মেসি কেমন খেললেন, কতগুলো পাস দিলেন, দলের সঙ্গে কতটা তাঁকে একাত্ম দেখা গেল—এসব নিয়ে। কারণ হলো, মেসি বার্সেলোনা আর কাতালানের নায়ক। এই মেসি যদি স্পেনের নাগরিকত্ব নিতেন, তাহলে কোনো কথাই ছিল না। এই স্পেন আরও বেশি বার্সেলোনা হতো। ফাইনালে মাঠে নামার আগেই হেরে বসে থাকত হল্যান্ড। সারা বিশ্বের মানুষকে যুগ যুগ ধরে ক্লাব ফুটবলের অমৃত উপহার দেওয়া স্পেনের হাতে বিশ্বসেরার স্বীকৃতি জুটতই। ‘জুটত’ এই সংশয় কেন? স্পেনই চ্যাম্পিয়ন হবে। স্পেনের মধ্যে বার্সেলোনা উজ্জ্বল আলো জ্বেলে রেখেছে না!

‘পুয়োল দ্য শার্ক’

ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন গোলরক্ষক হিসেবে। বার্সেলোনায় এসেছিলেন স্ট্রাইকার হিসেবে। অথচ মানুষ তাঁকে চেনে দুনিয়ার অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে। কাল পরিচয়টা একটু সময়ের জন্য বদলে ফেলতে ইচ্ছে হলো।
অনেক দিন পর ‘স্ট্রাইকার’ হয়ে উঠে জার্মানিকে আঘাত করলেন। আর এক আঘাতেই জার্মানিকে কুপোকাত করে দিলেন ‘দ্য শার্ক’—কার্লোস পুয়োল।
ডেভিড ভিয়া, ফার্নান্দো তোরেস, পেদ্রো রদ্রিগেজ এমনকি জাভি, ইনিয়েস্তারাও পারলেন না। প্রবল প্রতাপে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে থাকা স্পেনের হয়ে একমাত্র গোলটা করলেন ডিফেন্ডার পুয়োল। পুয়োলের এই কীর্তিতে রীতিমতো গর্জন করছেন সদ্যই পুয়োলের বার্সেলোনায় যোগ দেওয়া ভিয়া, ‘দ্য শার্ক পুয়োলই আমাদের ফাইনালে নিয়ে গেছে।’
শুধু ভিয়া না, পুয়োলকে নিয়ে হইচই করতে কম যাচ্ছেন না রিয়াল মাদ্রিদের জাবি আলোনসোও। স্প্যানিশ মিডফিল্ডারটি ব্যাখ্যা করেছেন পুয়োলের কৃতিত্ব, ‘মিনিট দশেক ধরে আমরা ওদের পেনাল্টি এলাকার ঠিক বাইরে একেবারে শিবির গেড়ে বসেছিলাম। কিন্তু স্কোর করতে পারছিলাম না। তখনই পুয়োল বুনো শুয়োরের মতো তেড়ে এসে গোল করে ফেলল।’
পুয়োলের গোলে মুগ্ধ হয়ে গেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী হোসে লুই রদ্রিগেজ জাপাতেরো। বার্সেলোনার অন্ধ ভক্ত জাপাতেরো স্প্যানিশ এক রেডিওকে বলেছেন, ‘কী একটা লাফ! কী একটা হেড করল পুয়োল! ও তো স্রেফ অসাধারণ।’
অসাধারণ পারফরম্যান্স পুয়োল এক দশক ধরেই করছেন। কিন্তু ফুটবলের ট্র্যাজেডি—লোকজন গোলদাতাদের নাম মনে রাখে, ডিফেন্ডারদের নয়। তা না হলে পুয়োলের নাম মেসি, রোনালদোদের চেয়ে কম উচ্চারিত হওয়ার কথা নয়।
প্রায় এক দশক ধরে বার্সেলোনার প্রতীকে পরিণত হয়ে আছেন কার্লোস পুয়োল। ২০০৪ সালে লুইস এনরিকে অবসর নেওয়ার পর পুয়োলের হাতেই তুলে দেওয়া হয় বার্সেলোনার নেতৃত্ব। তাঁর অধিনায়কত্বে বার্সেলোনা চারবার স্প্যানিশ লিগ, দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ, একবার ক্লাব বিশ্বকাপ, একবার স্প্যানিশ কাপ, তিনবার স্প্যানিশ সুপার কাপ ও একবার উয়েফা সুপার কাপ জিতেছে।
বার্সেলোনার হয়ে ৩৩১ ম্যাচ খেলেছে, গোল ৬টি। এই সময়ে পুয়োলের ব্যক্তিগত অর্জনও নিতান্ত কম নয়। ২০০২ সালে ইউরোপের সেরা রাইটব্যাক হয়েছেন। ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৮ সালে ইউরোপের সেরা সেন্টারব্যাক হয়েছেন। ২০০৬ সালে পেয়েছেন ইউরোপ-সেরা ডিফেন্ডারের পুরস্কার।
বার্সেলোনার মতো স্পেন দলে তিনি অবশ্য অধিনায়ক নন। ‘আর্মব্যান্ড’টা ছেড়ে দিতে হয় তাঁকে ইকার ক্যাসিয়াসের জন্য। কিন্তু স্পেন দলেও তাঁর আধিপত্য কম দিনের নয়। ২০০০ সালে অভিষেকের পর থেকে স্প্যানিশ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, খেলা হয়ে গেছে ৮৯ ম্যাচ। গত ইউরো জয়ের পথে পুয়োলদের ডিফেন্স গলে মাত্র দুটি বল জালে জড়াতে পেরেছিল প্রতিপক্ষ। পুরস্কার হিসেবে টুর্নামেন্টের সেরা একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন।
এই নিয়ে টানা তিনটি বিশ্বকাপ খেলতে এলেন। প্রতিবারই পুয়োলদের নিয়ে স্বপ্ন থাকে, ভঙ্গ হয়। এবার ‘দ্য শার্ক’ নিজেই গোল করে দলকে স্বপ্নের দুয়ারে পৌঁছে দিলেন। বাকিটুকু পারবেন তো?

স্বপ্ন এখন আরও বড়

ভিসেন্তে দেল বস্ক তো বটেই, নিজের শিষ্যদের নিয়ে এমন স্তুতি খুব কম কোচের কণ্ঠেই এর আগে দেখা গেছে। সেমিফাইনালে উঠেই ইতিহাস গড়েছিল স্পেন, ইতিহাসের পরিধি বাড়িয়ে দিল ফাইনালে উঠে। কিন্তু দলের খেলায় স্পেন কোচ এতটাই মুগ্ধ যে ইতিহাস নয়, তাঁর কণ্ঠে শুধুই শিষ্যদের নিয়ে উচ্ছ্বাস। যে জার্মানিকে থামানো মনে হচ্ছিল অসম্ভব, সেই জার্মানিকেই এভাবে নাস্তানাবুদ করল স্পেন! দেল বস্কের কিন্তু একটুও অবাক লাগছে না, ‘আমার ছেলেরা সবাই অসাধারণ, দুর্দান্ত ফুটবলার। এটাই সবকিছুকে সহজ করে দেয়। আমি একদল তরুণকে পরিচালনা করছি, যারা আবার দারুণ অভিজ্ঞও!’
টুর্নামেন্টের আগেও তারা ফেবারিট ছিল। কিন্তু প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হারার পর শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠাটাই। সেই দলই এখন ফাইনালে। দেল বস্ক জানাচ্ছেন, ওই হারটাই দলকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে, ‘আমার ছেলেরা জানে ফুটবলটা কী। সুইজারল্যান্ডের কাছে হারটা আমাদের জন্য ছিল বড় একটা আঘাত, ওই হার আমাদের প্রাপ্য ছিল না। সেই থেকে আমরা নিজেদের আরও গুছিয়ে নিয়েছি। এটাই আমাদের ফাইনালে তুলেছে।’
নিজে খুব বেশি কিছু করতে পারেননি, কিন্তু পরশু দলের খেলায় মুগ্ধ ডেভিড ভিয়াও, ‘এই বিশ্বকাপে আমাদের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ম্যাচ এটাই।’ পাঁচ গোল করা স্ট্রাইকার এখন তাকিয়ে আছেন আরও বড় সাফল্যের দিকে, ‘সেমিফাইনালে উঠেই আমরা ইতিহাস গড়েছিলাম, তবে এটা হলো (ফাইনাল) সত্যিকারের ইতিহাস, অবিশ্বাস্য। তবে স্পেনের এটা প্রাপ্য। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে আমরা অনেক কষ্ট করেছি। এখন আমরা হতে চাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।’ অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াসও মানছেন পরশুর স্পেন ছিল অনন্য, ‘আমরা খুবই খুশি। এই ম্যাচটাতেই আমরা সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলেছি। নিজেদের খেলাটা আমরা খেলতে পেরেছি বলেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। দুদলের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে এটাই।’
স্পেন অধিনায়কের কথাটাই আসলে পরশুর ম্যাচের সারমর্ম। স্পেন নিজেদের পরিচিত খেলাটা খেলতে পেরেছে, কিন্তু জার্মানি পারেনি নিজেদের মতো খেলতে। অন্যভাবে বললে স্পেন নিজেদের সেরাটা খেলেছে বলেই জার্মানি পারেনি বা জার্মানিকে খেলতে দেয়নি স্পেন। জাভি-ইনিয়েস্তা-আলোনসো-বুসকেটসদের পাসিং ফুটবল অসহায় দর্শক বানিয়ে ফেলেছিল জার্মানদের।
পুরো টুর্নামেন্টেই দুর্দান্ত খেলেছেন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকে। পরশুও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথম কোনো বড় টুর্নামেন্টে খেলতে এসেই ফাইনাল, এই তরুণ ভেসে যাচ্ছেন উচ্ছ্বাসে, ‘আমি অনেক খুশি, আমরা সবাই খুশি। মিনিট দশেক সময় বাদ দিয়ে ম্যাচের প্রায় পুরোটাই আমরা নিয়ন্ত্রণ করেছি। আগামীকাল থেকে আমরা হল্যান্ড নিয়ে ভাবব, তবে আজ শুধুই আনন্দ করব, সাফল্য উপভোগ করব।’ মাঝমাঠের শিল্পীদের একজন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাও চান সময়টা শুধুই উপভোগ করতে। তবে শুধু ফাইনালে ওঠার উৎসবই নয়, ইনিয়েস্তা উৎসব করতে চান ফাইনাল শেষেও, ‘আমরা যেভাবে খেলে আসছি, এর পুরস্কার এই ফাইনাল। আমরা আজ উপভোগ করব। আশা করি, উপভোগ করব ফাইনাল শেষেও।’

‘রেকর্ডটা মুরালিধরনের প্রাপ্য নয়’

বিদায়বেলায় সবাই যখন মুত্তিয়া মুরালিধরনকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন, একজন দাঁড়িয়ে গেলেন উল্টো স্রোতে। এই উল্টো স্রোতে দাঁড়িয়ে যাওয়া একজন রয় এমারসন। প্রায় ১৫ বছর আগে গ্যাবায় একটি ওয়ানডে ম্যাচে মুরালিধরনকে ৭ বার ‘নো’ ডেকেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান এই আম্পায়ার। এবার আরেকটা ‘নো’ ডেকে দিলেন এমারসন।
১৮ জুলাই ভারতের বিপক্ষে গল টেস্টই তাঁর শেষ টেস্ট—এই ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই প্রশংসার ডালি সাজিয়ে বসেছে সবাই। সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ডের মালিকানা নিয়ে যাঁর সঙ্গে লড়াই ছিল, সেই শেন ওয়ার্ন থেকে বর্তমানের অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান মাইকেল ক্লার্ক—সবাই প্রশংসা করেছেন যে যাঁর মতো। কিন্তু এমারসন বলে দিলেন, ‘মুরালি টেস্টের সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ডটির যোগ্য নয়।’
মুরালিধরন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেড় দশক আগের সেই স্মৃতি তুলে আনলেন এমারসন, ‘এই ১৫ বছরেও আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করিনি। এই রেকর্ডটি আসলে তার প্রাপ্য নয়।’ ব্রিসবেনে ১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কা-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে আম্পায়ার হিসেবে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচেই এমারসন ‘নো’ ডেকেছিলেন মুরালিধরনকে। স্কয়ার লেগে দাঁড়িয়েও আপত্তি জানিয়ে গেছেন তিনি, মুরালিধরন লেগ ব্রেক করার পরও। ৩ বছর পর অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে আবারও মুরালিধরনকে ‘নো’ ডাকেন তিনি। এর পর আইসিসি তাঁকে আম্পায়ারিং থেকে নিষিদ্ধ করে। টিকে থাকেন মুরালিধরন। গড়েন টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেট পাওয়ার রেকর্ডও (বর্তমানে ৭৯২ উইকেট)।
তবে এমারসনের বিশ্বাস, মুরালিধরন নন, রেকর্ডটি আসলে ওয়ার্নেরই প্রাপ্য, ‘শেন ওয়ার্নের সঙ্গে তার রেকর্ডটি তুলনা করা যাবে না। ওয়ার্নের অ্যাকশনের বৈধতা নিয়ে কেউ কোনো দিন প্রশ্ন তুলতে পারেনি। মুরালি দারুণ এক প্রতিযোগী এবং ভালো বোলার। তবে সে নিয়মের মধ্যে থেকে বল করেনি।’
এমারসন এই ভেবে খুশিও হতে পারেন, নিজের পাশে আরও একজনকে পেয়ে গেছেন তিনি। ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে মুরালিধরনের অ্যাকশন নিয়ে প্রথম প্রশ্ন তুলে দেওয়া আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ারও বললেন তিনি ঠিকই ছিলেন, ‘আমি তার বিশ্ব রেকর্ডের বিরুদ্ধে নই, তবে এই রকম বোলারদের জন্য আইনটা পরিবর্তন করতে হওয়ায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, মুরালিধরনকে আমিসহ অন্যরা যে নো ডেকেছিলাম, সেটা ঠিকই আছে।’

বুফনের কণ্ঠে উল্টো সুর

বুড়ো দল’ তকমা লেগে গিয়েছিল বেশ আগেই। বিশ্বকাপেও এমন নামের যথার্থতা প্রমাণ করেছে ইতালি। তিরিশের বেশি বয়সী ৯ জন ফুটবলার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় আসা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ড থেকে। দলের দুর্দশার জন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করেছেন ওই ‘বুড়ো’দেরই। অথচ উল্টো সুর জিয়ানলুইজি বুফনের কণ্ঠে। তাঁর দাবি, দলের এমন ব্যর্থতা অভিজ্ঞতার অভাবেই!
‘সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল স্কোয়াডে অনেক তরুণ ফুটবলার ছিল, যাদের এ ধরনের বড় টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। স্বাভাবিকভাবেই মানসিক দিক থেকে ওরা ছিল দুর্বল’—প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বুফন।
ইতালির ম্যাচগুলোর দিকে তাকালে বুফনের কথার সঙ্গে একমত হওয়ার মতো লোক খুব একটা পাওয়া যাবে না। বিশ্বকাপে ইতালির তিন ম্যাচে মোটামুটি নিয়মিত খেলেছেন এমন ফুটবলারদের মধ্যে একমাত্র ডিফেন্ডার ডোমেনিকো ক্রিসিতোর বয়সই ছিল তেইশের কম। নিয়মিত খেলা খেলোয়াড়দের মধ্যে ১০টির কম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন কেবল ক্রিসিতো এবং বুফনের ইনজুরিতে সুযোগ পাওয়া গোলকিপার ফ্রেদেরিকো মার্চেত্তি।
বুফন বলছেন, ‘গত বছর কনফেডারেশনস কাপের পরই প্রচারমাধ্যমে সমানে ২০০৬ বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারদের বাদ দেওয়ার জন্য প্রচারণা চলতে লাগল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অভিজ্ঞ ফুটবলারদের প্রয়োজন আছে।’
এই দল বাছাই করেছেন যিনি, সেই কোচ মার্সেলো লিপ্পিকেও ব্যর্থতার কোনো দায় দিতে রাজি নন ইতালির হয়ে চতুর্থ সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা বুফন। তাঁর ভাষাষ, লিপ্পি একজন ‘জয়ী’ কোচ।
ইতালির ব্যর্থতায় কিছুটা ভূমিকা আছে বুফনের ইনজুরিরও। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই নিতম্বের পুরোনো ইনজুরিতে পড়েন ইতালির এক নম্বর গোলরক্ষক। তাঁর জায়গায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি মার্চেত্তি। নিতম্বে এরই মধ্যে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন বুফন। আশা করছেন, তিন-চার মাসের মধ্যেই ফিরতে পারবেন মাঠে। জুভেন্টাসের হয়ে সিরি ‘আ’র নতুন মৌসুমের প্রথম কয়েকটি ম্যাচ অবশ্য খেলতে পারবে না। জাতীয় দলে যখনই ফিরবেন পেয়ে যাবেন পরম নির্ভরতায় এক যুগ ধরে ইতালির গোলবার সামলানোর পুরস্কার—অধিনায়কত্ব।

বার্সাতেই প্রেরণা খুঁজছেন মারউইক

রাইনাস মিশেলসের হল্যান্ড দলে একজন ইয়োহান ক্রুইফ ছিলেন, ছিলেন একজন ইয়োহান নিসকেন্স। ক্রুইফ-নিসকেন্সের আলোয় ফুটবল-বিশ্ব আলোকিত করে ১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে হল্যান্ড। পরের বিশ্বকাপে ক্রুইফ না থাকলেও হল্যান্ড ছিল ফাইনালে।
বার্ট ফন মারউইকের হল্যান্ড দলে একজন ক্রুইফ বা একজন নিসকেন্স নেই। আছেন একজন আরিয়েন রোবেন, আছেন ওয়েসলি স্নাইডার। তবে পুরো ফুটবল-বিশ্ব এটা মেনে নেবে—ক্রুইফের দীপ্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো এঁরা কেউ নন। তবু মারউইকের হল্যান্ড খেলছে এই বিশ্বকাপের ফাইনালে। আর এই ফাইনালে ওঠার পথে ব্রাজিলের মতো দলের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন শেষ আটেই শেষ করে দিয়ে এসেছেন রোবেন-স্নাইডাররা। ডাচদের এমন সাফল্যের রহস্য কী?
কোচ মারউইক বললেন—১৯৭৪ আর ’৭৮-এর হল্যান্ড দলে একটা জিনিসের অভাব ছিল, সেটা আবিষ্কার করে এই হল্যান্ড দলকে পূর্ণতা দিয়েছেন তিনি। এই আবিষ্কার এবং বার্সেলোনা-প্রেরণাই হল্যান্ডের এই এগিয়ে চলার রহস্য। ’৭৪ আর ’৭৮-এ হল্যান্ডকে ফাইনালে তুলেছিল ‘টোটাল ফুটবল’। এর পরও ’৭৪ আর ’৭৮-এর হল্যান্ড দলে কিসের অভাব ছিল? অভাব ছিল হারিয়ে ফেলা বল কেড়ে নেওয়ার মনোভাবের! এই হল্যান্ড দলকে তিনি এভাবেই অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছেন বলে দাবি কোচ মারউইকের। আর রোবেন-স্নাইডারদের এভাবে গড়ে তুলতে তিনি আদর্শ হিসেবে নিয়েছিলেন বার্সেলোনার খেলাকে।
‘দুই বছর ধরে আমি বার্সেলোনার খেলা অনুসরণ করেছি। সব সময় আমি আমার দলের খেলাকে বার্সেলোনার সঙ্গেই তুলনা করেছি। আমি সুন্দর ফুটবল পছন্দ করি। বার্সাও সেই ধরনের ফুটবলই খেলে। বল হারালে লিওনেল মেসি, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, ইনিয়েস্তা আর জাভিরা প্রতিপক্ষকে চাপ দিয়ে আবার তা দখল করে নেয়!’—বলেছেন মারউইক।
হল্যান্ডের সমস্যাটা কী ছিল এবং দলে এখনকার মনোভাব কী, মারউইক বললেন সে কথাও, ‘আমরা ভালো ফুটবল খেলি, সুন্দর ফুটবল খেলি। কিন্তু জিততে শুরু করলেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভুগি। আর দ্রুত বাড়ি ফিরে যাই। আমি খেলোয়াড়দের বারবার মনে করিয়ে দিই, সব সময়ই খেয়াল রাখতে হবে যে আরও ম্যাচ আছে। আমি আক্রমণাত্মক ফুটবল ভালোবাসি। তবে রক্ষণের কাজটাও তো করতে হবে।’
মারউইক হল্যান্ড দলে আরও একটা জিনিস উপহার দিয়েছেন। হল্যান্ড দলের চিরায়ত একটি অভাব ছিল—ঐক্যের অভাব। এই হল্যান্ডে সেই অভাবটা চোখে পড়ছে না। নিজেদের মধ্যে কলহ হল্যান্ড দলে বরাবরই ছিল। এই বিশ্বকাপেও রবিন ফন পার্সি আর স্নাইডারের মধ্যে কলহ নিয়ে কথা হয়েছে। হল্যান্ড দলের অনুশীলনে নাকি নিয়মিত একটি বচসার উপাদান—ফ্রি-কিক কে নেবেন, স্নাইডার না পার্সি? এ দুজন নাকি দুই বছর ধরে একে অন্যের সঙ্গে কথাও বলেন না। তবে মাঠে এর কোনো প্রতিফলন নেই। কমলা জার্সিটা গায়ে উঠলেই তাঁরা হয়ে যান অন্যরকম। মন-কষাকষি রেখে নিজেদের এক সুতোয় গেঁথে নেন সবাই। হল্যান্ডের জয়—অভিন্ন লক্ষ্য সবার। হল্যান্ডের যৌথ গোল-উদ্যাপন আর জয়োৎসবই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আর রোবেন-পার্সি-স্নাইডারদের সবাইকে এভাবে একসূত্রে গাঁথতে পারাই মারউইকের বড় অবদান।

পেদ্রো তবু নায়কই

৮১ মিনিটে মাঠ ছাড়লেন মাথা নাড়তে নাড়তে। টিভির ভাষ্যকার বললেন, হয়তো শাস্তিস্বরূপ তুলে নেওয়া হলো তাঁকে। একটু আগে যা করেছেন, তাতে পেদ্রো রদ্রিগেজের ওপর যথেষ্টই ক্ষিপ্ত হওয়ার কথা কোচের। ফাঁকায় দাঁড়ানো ফার্নান্দো তোরেসকে পাসটা দিলেই ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারত স্পেন। কিন্তু স্পেনের জার্সি গায়ে প্রথম একাদশে প্রথমবার নামাটা পেদ্রো হয়তো স্মরণীয় করে রাখতে চাইলেন গোল করে। তোরেসকে পাস না দিয়ে নিজেই গোল করতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না।
মাঠেই হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছিলেন সতীর্থদের কাছে। ভুলটা স্বীকার করলেন ম্যাচ শেষেও, ‘আমি একা ছিলাম, পাশে ছিল তোরেস। হয়তো একটু বেশিই আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলাম।’ এর আগ পর্যন্ত খেলেছেন অবশ্য আত্মবিশ্বাসী হওয়ার মতোই। গোল না পাওয়া কিংবা ওই পাস না দেওয়ার ঘটনার পরও শুরুর একাদশে অভিষেকটা স্মরণীয়ই হয়ে থাকবে ২২ বছর বয়সী এই তরুণের। পরশু ফার্নান্দো তোরেসের জায়গায় সুযোগ পেয়ে খেললেন দুর্দান্ত। ৬ মিনিটে জার্মান ডিফেন্স চিরে ডেভিড ভিয়াকে যে পাসটি দিয়েছিলেন, সেটিকে রাখতে হবে এই বিশ্বকাপের সেরা পাসগুলোর মধ্যে। নিজেও গোলের কাছাকাছি গিয়েছেন কয়েকবার। গতি আর স্কিল দিয়ে বারবার আতঙ্ক ছড়িয়েছেন জার্মান ডিফেন্সে।
অথচ এই ম্যাচে তাঁর খেলাটাই ছিল একটা বিস্ময়। সেরা একাদশ ঘোষণার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ ভাবতে পারেননি দলে থাকবেন পেদ্রো। অফ ফর্ম থাকা তোরেসের সেরা একাদশে না থাকাটা অবাক করেনি, আলোচনা চলছিল কদিন থেকেই। তবে তাঁর জায়গায় আরেক ‘তোরেস’, ফার্নান্দো লরেন্তে তোরেস আর সেস ফ্যাব্রিগাসের একজনকে খেলানোর কথাই শোনা যাচ্ছিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভিসেন্তে দেল বস্ক নামালেন পেদ্রোকে, জুয়াটা কাজেও লেগে গেল দারুণভাবে। সেরা একাদশে থাকাটা অবাক করেছিল স্বয়ং পেদ্রোকেও, ‘সত্যি বলতে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। ম্যাচে অবদান রাখতে পেরে ভালো লাগছে। আমরা যেভাবে খেলেছি, তাতে আমি খুবই খুশি।’
বার্সেলোনায় পেদ্রোকে দেখে থাকলে অবশ্য পরশুর পারফরম্যান্সে অবাক হওয়ার কিছু নেই। স্পেনের এই দলের জেরার্ড পিকে, সার্জিও বুসকেটস, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজদের মতো তিনিও বার্সার বিখ্যাত যুব প্রকল্প থেকে উঠে এসেছেন। বার্সেলোনায় অভিষেক হয়েছে বছর দুয়েক আগে। একাদশে এখনো নিয়মিত হতে পারেননি, তবে যখনই সুযোগ পেয়েছেন প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন। ২০০৮-’০৯ মৌসুমে বার্সার হয়ে ছয়টি ভিন্ন প্রতিযোগিতায় গোল করে গড়েছেন অবিস্মরণীয় একটি রেকর্ড। বিশ্বকাপ দলে তো আর এমনি এমনি সুযোগ পাননি! জার্মানির বিপক্ষে যা খেললেন, তাতে নিশ্চিত হয়ে গেছে, দারুণ একটা ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে পেদ্রোর জন্য।

আরেক ধাপ পেরোলেই স্বপ্ন পূরণ

অবশেষে শেষ হয়ে গেল জার্মানির স্বপ্ন। উরুগুয়েরও। রোববারের ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন আর একাধিকবার শিরোপার কাছে গিয়ে খালি হাতে ফেরা হল্যান্ড। দুদলের কেউই এর আগে শিরোপা জেতেনি। ফলে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, রোববারের ফাইনালে যে খেলোয়াড়েরা শিরোপা জিতবে, ইতিহাসে অমরত্ব পাবে তারাই। সারাটা জীবন তাদের দেশের জাতীয় বীরের মর্যাদা পাবে। যারা এই সোনালি ট্রফিটা হাতে তুলে নেয়, তাদের গৌরব-আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেমন ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, তেমনি এত কাছে থেকে শূন্য হাতে ফেরার হতাশা বর্ণনা করার সাধ্যও কারও নেই।
জার্মানির স্বপ্নের হূৎপিণ্ড স্পেন এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়েছে আসলে একটা মাত্র ছুরিকাঘাতে। না, ভিয়া নয় এমনকি তোরেসও নয়; শেষ পর্যন্ত জার্মানির হন্তারকের নাম পুয়োল, যে কিনা আদতে একজন ডিফেন্ডার। ৭৩ মিনিটে অরক্ষিত পুয়োল যেন মাটি ফুঁড়ে কোত্থেকে হাজির হলো। জোরালো হেডে বল পাঠিয়ে দিল জালে। আগের ম্যাচগুলোতে স্পেন থেমে থেমে জ্বলে উঠেছে। কিন্তু এভাবে ঝলসে ওঠেনি কখনোই।
জার্মানির বিপক্ষে তাদের মূল অস্ত্র ছিল বলের দখল রাখা। ওদের পাসিং আর মুভমেন্ট ছিল অসাধারণ। তা ছাড়া জার্মানির বেশির ভাগ পাল্টা আক্রমণই ওরা ঠেকিয়ে দিয়েছে। নতুন এক উচ্চতায় উঠে গেছে তারা, শীর্ষবিন্দুটার একদম কাছাকাছি। কিন্তু ফাইনালে ওদের প্রতিপক্ষ হল্যান্ড বলেই বলছি, আরও উন্নতি করতে হবে স্পেনকে। দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে পেদ্রো যদি ঠিকমতো বলটা ঠেলে দিত তোরেসের দিকে, ম্যাচটা তখনই সে শেষ করে দিতে পারত। তোরেস খুঁজে পেতে পারত তাঁর ফর্মটাও।
স্পেন মাঝে মাঝেই জার্মানিকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল, কিন্তু সম্মিলিত এই ভালো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ছিল জার্মানির ডিফেন্সে। বলের দখল আর জায়গা খুঁজে পেতে হাঁসফাঁস করেছে জার্মানি। মাঠের পুরোটা জায়গাজুড়ে স্পেন জার্মানির পথ বন্ধ করে রেখেছিল। যে দুর্দান্ত গতিতে উঠে এসে আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডকে ধ্বংস করে দিয়েছিল জার্মানি, সেটি এ ম্যাচে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত যোগ্য দল হিসেবেই ফাইনালে উঠে গেল স্পেন।
হল্যান্ডও উরুগুয়ের বিপক্ষে প্রাপ্য জয়টা নিয়ে ফাইনালে উঠেছে। ঠান্ডা মাথায় নিজেদের কাজটা করেছে ওরা। ফোরলান সমতা ফেরানোর ওই মুহূর্তটা বাদে ম্যাচের পুরোটা সময় নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই ছিল। অধিনায়ক জিওভানি ফন ব্রঙ্কহর্স্টের সেই ডিফেন্স ভেদ করে ঢুকে পড়া মিসাইল ম্যাচের শুরুতেই বড় ধাক্কা দিয়েছিল উরুগুয়েকে। রোববারের ফাইনালের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ডাচরা যখন প্রথমার্ধের শেষ দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ফোরলান এক ধাক্কায় ওদের নামিয়ে এনেছিল বাস্তবতার মাটিতে।
দক্ষিণ আমেরিকার এই দলটি সহজে বশ মানে না। আর তাই আবারও লিড নিতে হল্যান্ডকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল দ্বিতীয়ার্ধের ২৫ মিনিট। স্নাইডারের ওই গোলের তিন মিনিট পর ফাইনাল নিশ্চিত করে দেয় রোবেনের গোল। কিন্তু উরুগুয়ে যে শেষ না হওয়া পর্যন্ত শেষ মানে না। আর তাই পেরেইরার আগুনঝরা শট নিশ্চিত করল, শেষ কয়েক মিনিটে হল্যান্ডের স্নায়ুর চরম পরীক্ষাই নেবে উরুগুয়ে।
ফাইনালে উঠে আসার এই পথে ডাচরা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসের পারদ উঁচুতে নিয়ে গেছে। প্রতি ম্যাচেই আগের চেয়ে ভালো খেলেছে। রোবেনের ফেরাটাও ওদের জন্য খুবই সহায়ক হয়েছে। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ব্রাজিলকে হারিয়েছে ওরা। এটা যোগ করেছে বাড়তি আত্মবিশ্বাস। এখন আর একটা মাত্র চ্যালেঞ্জ, একটা শেষ প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। যেটি পেরোলেই আরাধ্য সেই শিরোপা।
স্পেনের জন্যও তা-ই। বিশ্ব ফুটবলের সেরা দল এখন ওরাই। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নের মুকুটের সঙ্গে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের গৌরবটাও যোগ করার স্বপ্ন দেখছে ওরা। আর একটা মাত্র দিন, একটি মাত্র প্রতিপক্ষ, একটা মাত্র ম্যাচ এবং অবশ্যই একমাত্র সুযোগও!

তাঁহার ফুটবল-দর্শন

ঘরোয়া ফুটবল মৌসুমে সপ্তাহে পাঁচটি করে ম্যাচ দেখেন তিনি। তাঁর মোবাইলে ফোন করলে শোনা যায় ফুটবল ধারাভাষ্যের আওয়াজ। প্রেম করেছেন স্টেডিয়ামে পরিচয় হওয়া এক তরুণীর সঙ্গে।
কী বলবেন তাঁকে! ফুটবলপাগল? এটুকু বললেও থুলানি এনকোবোকে ঠিক বোঝা যাবে না। থুলানিকে বলতে পারেন ‘বিশ্বসেরা ফুটবল-দর্শক’। হ্যাঁ, ১১ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ দেখার ভেতর দিয়ে এই স্বীকৃতিটাই পেয়ে যাচ্ছেন এনকোবো। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠছে তাঁর এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক পূর্ণাঙ্গ ম্যাচ দেখার জন্য।
গিনেসে এর আগে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার রেকর্ড ছিল ২০টি। সে রেকর্ড এবার অনেক আগেই পার করে এসেছেন এনকোবো। আসলে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল এনকোবোর এই রেকর্ড।
‘লাস্ট ফ্যান স্ট্যান্ডিং’ নামের একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সেরা পুরস্কার হিসেবে বিশ্বকাপের ৩৮টি ম্যাচের টিকিট পেয়েছিলেন এনকোবো। তবে এই টিকিট পাওয়াই তো আর শেষ কথা নয়। ৬৪টা (এখন পর্যন্ত ৬২টি) ম্যাচের অর্ধেকেরও বেশি ম্যাচ বিশাল দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়ে ছুটে ছুটে দেখাটা সোজা কথা না।
সবচেয়ে চাপ গেছে তাঁর ওপর প্রথম পর্বে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চারটি ম্যাচ দেখতে হয়েছে। নেলসপ্রুইট থেকে পোর্ট এলিজাবেথ, কেপটাউন থেকে পোলকওয়ানে পর্যন্ত ছুটে বেড়াতে হয়েছে এনকোবোকে। শুধু গাড়িতে ঘুমানো ছাড়া বিশ্রামেরই সময় পাননি।
স্পনসর কোম্পানির সৌজন্যে স্টেডিয়ামের বাইরে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থেকেছে। একটা খেলা শেষ করেই ছুট বিমানবন্দরে। গাদা গাদা ভিটামিন বড়ি গিলতে হয়েছে অনিদ্রাজনিত অসুস্থতা থেকে দূরে থাকার জন্য। তার পরও মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, ছোটখাটো বিপাকে পড়েছেন।
এই যেমন ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় একটা ম্যাচে পৌঁছাতে ৭ মিনিট দেরি হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি ম্যাচ তিনি পুরোটা দেখছেন কি না, এটা দেখার জন্য আবার গিনেস কর্তৃপক্ষের লোক ছিল সেখানে। তাঁদের সাক্ষ্য অনুযায়ী এ রকম সাতটি ম্যাচ তাঁর রেকর্ডে আসবে না। কারণ, কোনো না কোনোভাবে এসব ম্যাচের কিছু সময় মিস করেছেন তিনি।
এনকোবো অবশ্য দাবি করছেন, ‘আমি একটাও ম্যাচ মিস করিনি।’ সে যাই হোক, রেকর্ড যে হচ্ছে, তাতেই মহা খুশি এনকোবো, ‘স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো একটা ব্যাপার। এ রকম সুযোগ জীবনে একবারই আসে।’
এনকোবো শুধু রেকর্ড করার জন্য খেলা দেখে গেছেন, তা না। যেহেতু ফুটবল-পাগল মানুষ, তাই নিজের মতো করে বিশ্বকাপের বিশ্লেষণও করেছেন। তাঁর মতে, দ্বিতীয় পর্বের জাপান-প্যারাগুয়ে ম্যাচটা ছিল সবচেয়ে বিরক্তিকর। ঘানার বিদায় সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার। মেক্সিকোর সমর্থকেরা এনকোবোর কাছে সবচেয়ে আবেগপ্রবণ মনে হয়েছে।
নিজে দক্ষিণ আফ্রিকান সমর্থক বলেই কিনা, শাবালালার করা টুর্নামেন্টের প্রথম গোলটাকে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বলছেন এনকোবো। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের ৭-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচ দেখে মনে হয়েছে, ‘সরাসরি হাইলাইটস দেখছি।’
ওয়েইন রুনি, কাকা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরা ভালো কিছু করতে না পারায় কষ্ট পেয়েছেন। তবে মন ভরে গেছে তাঁর মেসির খেলা দেখে। আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের মতো এনকোবোরও ধারণা, মেসি ভিডিও গেমের চরিত্র, ‘আগে আমি তাকে টেলিভিশনে দেখেছি। কিন্তু ওকে সরাসরি খেলতে দেখলে মনে হয়, প্লে-স্টেশনের চরিত্র। কিংবা মনে হয়, ওকে কোনো মেশিন দিয়ে চালানো হচ্ছে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ওকে দেখাটা আমার জন্য স্রেফ একটা মহাবিস্ময় ছিল।’
শুনলে মনে হয়, সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো। একটার পর একটা বিশ্বমানের খেলা দেখছেন, গ্যালারিতে বসে মেসি-কাকাদের দেখতে পাচ্ছেন; কী আনন্দ! কিন্তু ত্যাগটা দেখলেন না? এই রেকর্ড করতে গিয়ে খাওয়া-নাওয়া ত্যাগ তো করতেই হয়েছে। একটা মাস ধরে দেখতে পান না তিন বছর বয়সী ছেলেটাকে।
তার পরও এনকোবোর কষ্ট নেই। মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের মানুষ হয়ে এতগুলো বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখতে পাওয়ার তো তৃপ্তি আছেই, ‘আমি বড়লোক নই। সাধারণ একটা মানুষ। তার পরও কাজটা করতে পারছি। আসলে ব্যাপারটা নির্ভর করে সুযোগ নিতে পারার ওপর।’
সেটা পেরেছেন এনকোবো। নিজে যেমন রেকর্ড করছেন, আনন্দ পাচ্ছেন; তেমনই দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য একটা গর্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—আর কেউ না হোক বিশ্বকাপ ফাইনালে অন্তত একটা লোক থাকবে দক্ষিণ আফ্রিকার পতাকা হাতে!
এমন গর্বের মালিক হতে চান? এনকোবোর সমর্থন পাবেন। তবে শর্ত আছে, ‘আমার চেয়েও আবেগপ্রবণ একজন মানুষ কবে আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে, সেদিকে চেয়ে থাকব আমি। কিন্তু তাকে বুঝতে হবে, কাজটা সোজা হবে না। খুব, খুব কঠিন। আপনি যদি ফুটবল-পাগল হয়ে থাকেন, তাহলে আমাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।’
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে একটা চেষ্টা করবেন নাকি?

উরুগুয়ে-জার্মানির গৌরবের লড়াই

কান্নাভেজা বিদায় হয়ে গেছে দুই দলেরই। বিশ্বকাপের ফাইনাল, তারপর সোনার শিরোপায় চুমু—এসব স্বপ্ন উড়ে গেছে আগেই। তার পরও কাল আরেকবার লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে জার্মানি ও উরুগুয়েকে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী এ লড়াই দুই দলের জন্য শুধুই গৌরব অর্জনের। কান্না আর শোক কাটিয়ে জয় নিয়ে দেশে ফেরার উপলক্ষ। তবে জয় আসুক আর না আসুক, মাথা উঁচু করেই দেশের ফেরার কথা উভয় দলের।
এককালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তারা। বিশ্বকাপের প্রথম শিরোপার মালিক উরুগুয়ে ১৯৫০ সালে মাত্র দ্বিতীয় অংশগ্রহণেই জয় করে নেয় আরও একটি বিশ্বকাপ শিরোপা। এরপর ৬০ বছরের খরা। এককালের অবিসংবাদিত সেরারা পতনের খাদ বেয়ে নিচে নেমে গেছে অতলে। বিশ্বকাপ শিরোপা দূরে থাক, দলটি সর্বশেষ বিশ্বকাপের শেষ চারে খেলেছে আজ থেকে ৪০ বছর আগে—সেই ১৯৭০ সালে। এবারের বিশ্বকাপ উরুগুয়ের ফুটবলের পুনর্জাগরণের ইতিহাস হয়েই রইবে। ফাইনালে ওঠা হয়নি তাতে কী। ফুটবলাররা যা অর্জন করেছেন তা-ই উরুগুয়ের সোনালি ইতিহাস তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট।
মাথা উঁচু রাখার মতো যথেষ্ট অর্জন রয়েছে জার্মানিরও। তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে জার্মানি। পরপর তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার রেকর্ডও আছে তাদের। মাঝখানে কেবল ’৯৪ ও ’৯৮-এর বিশ্বকাপ বাদ দিলে সবগুলোতেই সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলেছে দলটি। এবার দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ড, আর কোয়ার্টার ফাইনালে শিরোপার অন্যতম দাবিদার আর্জেন্টিনাকে গুঁড়িয়ে শেষ চারে উঠেছিল জার্মানি। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে ফাইনালে ওঠা হয়নি। তবে তরুণ দলটি যেভাবে খেলেছে তাতে গর্ব করতেই পারে জার্মানরা।
এত সফলতার পর হার নিয়ে দেশে ফেরাটা একটু কেমন দেখায় না? গৌরবের লড়াইয়ে তাই জয় নিয়েই ভাবছে সেমিফাইনাল থেকে ছিটকে পড়া জার্মানি ও উরুগুয়ে। জার্মান কোচ জোয়াকিম লো রয়টার্সকে সরাসরি বলেই ফেললেন, ‘মাথা নিচু করে দেশে ফিরতে কেউ চায় না। শেষ ম্যাচটিতে জয় পেতে চাই আমরা।’ হালকা ইনজুরিতে আছেন উরুগুয়ের সফলতার নায়ক ডিয়েগো ফোরলান। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিকে উরুগুয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে ফোরলান বলছেন, ‘আমি এই ম্যাচে খেলতে চাই। আশা করছি, শনিবার ঠিকই সুস্থ হয়ে উঠব।’