Thursday, January 22, 2026

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ঘৃণার রাজনীতি জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল by মীনাক্ষী গাঙ্গুলি

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাংলাদেশে দীপু কুমার দাসকে পিটিয়ে হত্যা করেছে জনতা। পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির এক কর্মকর্তা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বার্ষিক বড়দিনের মধ্যাহ্নভোজে হামলা চালান। জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মিথ্যা অভিযোগ তুলে এক অন্ধ নারীকে লাঞ্ছিত করেন। নেপালে এক দলিত যুবককে মোবাইল চুরির ভ্রান্ত অভিযোগে মারধরের পর তার মৃত্যু হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সহিংসতা ও মানবিক দুর্ভোগের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র এগুলো। যা স্পষ্টভাবে আইনের শাসন ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে যখন রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতার স্বার্থে নির্যাতন ও প্রতিশোধের চক্রকে ব্যবহার করেন। তারা অনুসারীদের তথাকথিত ‘শত্রুদের’ বিরুদ্ধে উসকে দেন- হোক তা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, শরণার্থী, অভিবাসী কিংবা প্রতিবেশী দেশ। তাদের আশা থাকে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে দিলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা থেকে মানুষের মনোযোগ সরানো যাবে।

এই ঘৃণামূলক ভাষ্য সীমান্ত ছাড়িয়েও ছড়িয়ে পড়ে। বহু ভারতীয় বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার নিন্দা করেছেন, আবার অনেক বাংলাদেশি ভারতে মুসলমানদের ওপর চলমান আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ক্ষোভ এমনকি খেলাধুলার জগতেও ঢুকে পড়ে। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড জাতীয়তার অজুহাতে প্রিমিয়ার লিগের একটি দলকে বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দিতে বাধ্য করে। এর জবাবে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দেয়, ভারতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তাদের জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

ভারত-পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের কারণে ক্রিকেট ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বহু আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এপ্রিল মাসে জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গিদের হাতে পর্যটক নিহত হওয়ার পর সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। দুই দেশের মানুষই ক্ষোভ প্রকাশ করে, যার বড় অংশই তাদের নেতাদের উসকানিতে সৃষ্ট।

অনলাইনে ঘৃণার বিস্তার
এখন স্পষ্ট যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাজনৈতিক মতাদর্শীরা ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যালগরিদমের অপব্যবহার করে অসন্তোষ উসকে দিতে পারে। তারা প্রচার করে যে আইন মেনে চলা, মানবাধিকারকে সম্মান করা কিংবা ভিন্ন পরিচয় ও মতকে গ্রহণ করা- সবই নাকি অপ্রয়োজনীয় ‘তুষ্টিকরণ’। যখন এই কৌশল ব্যর্থ হয়, তখন রাজনীতিকরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে হাঁটেন এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেন, যেগুলো তাদের লাগাম টেনে ধরতে পারত।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনে অতিষ্ঠ জনগণ অজনপ্রিয় শাসকদের ক্ষমতা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান বা মালদ্বীপের মতো দেশে ভীত শাসকগোষ্ঠী বিক্ষোভ দমিয়ে রাখার পথ বেছে নিয়েছে। ঘৃণা উসকে দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার বদলে নেতারা চাইলে অধিকারভিত্তিক উন্নয়নের কঠিন পথ বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তারা সে পথে যেতে অনিচ্ছুক।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের দমনপীড়নের পর সরকারি চাকরির কোটাবিরোধী ছোট একটি আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলেও দ্রুতই তারা পথ হারায় এবং জনতার প্রতিশোধমূলক দাবির কাছে নত হয়। সরকার ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করে। ফলে আবারও বাংলাদেশের মানুষ পছন্দের নেতৃত্ব বেছে নেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। পরিস্থিতি কার্যত আগের তিনটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি, যখন হাসিনা সরকারের অধীনে বিরোধী দলগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

নেপাল ও শ্রীলঙ্কা
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে সেপ্টেম্বরে হওয়া বিক্ষোভে ৭৬ জন নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং ‘জেন জি’ বিক্ষোভকারীদের পছন্দে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে। কিন্তু পরিবর্তনের আশায় থাকা তরুণরা আবারও হতাশ। তাদের মতে, পুরোনো দুর্নীতিবাজ নেতারাই আবার নির্বাচনে ফিরবে।

শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে গোটাবায়া রাজাপাকসেকে উৎখাত করা গণআন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট হন অনূঢ়া কুমারা দিসানায়েকে। তিনি দুর্নীতি দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গৃহযুদ্ধের সময়কার অপরাধের জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মতে, তার সরকার এখনও কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করছে, যা মূলত তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে প্রয়োগ করা হয়। হেফাজতে নির্যাতন, নজরদারি, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের হয়রানিও অব্যাহত রয়েছে।

ভারতের বাস্তবতা
ভারতে দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি ভোটের স্বার্থে বিষাক্ত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি নেতারা ঘৃণামূলক বক্তব্য দেন এবং উসকানি দেয়ার পর সমর্থকদের থামাতে অনিচ্ছুক থাকেন- যখন তারা মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করে, খ্রিস্টানদের উপহাস করে বা শিখ ও দলিতদের লাঞ্ছিত করে। প্রতিবাদ হলে কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো দমনমূলক আইনে মানুষকে কারাবন্দি করে এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেয়।

শেষ কথা
রাজনৈতিক নেতাদের বুঝতে হবে- ঘৃণা ছড়ানো, পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থা বা মানবাধিকার স্থগিত রাখা কেবল আরও নির্যাতন ডেকে আনে। এক সময় এই ক্ষোভ এমন জনরোষে রূপ নিতে পারে, যা স্বৈরাচারী নেতাদের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করবে। এর বদলে তাদের উচিত সমতা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনগণের অধিকার রক্ষা করা। মানুষের জীবনে প্রকৃত উন্নয়ন- রাজনৈতিক কৌশলের নামে বিভাজন নয়, এটাই সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।

(মীনাক্ষী গাঙ্গুলি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক। তার এ লেখাটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

mzamin

ইরানে সরব পশ্চিমারা, পাকিস্তানে নীরব কেন by জুনায়েদ এস আহমদ

পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে বেশ গর্বিত। তাদের স্যাটেলাইট সর্বক্ষণ নজরদারিতে ব্যস্ত। অ্যালগরিদম করছে তথ্য সংগ্রহ। সাংবাদিকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো করে যাচ্ছে মেটাডাটা বিশ্লেষণ। আমাদের নিয়মিতই আশ্বস্ত করা হয়, কিছুই তাদের নজর এড়িয়ে যায় না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানে মুসলিম বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ, ঐক্যবদ্ধ ও প্রকাশ্যভাবে অহিংস একটি আন্দোলন চলেছে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছে, তবু এই আন্দোলন প্রায় কোনো আন্তর্জাতিক আলোচনাতেই স্থান পায়নি।

আদালতকে ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। গণমাধ্যমকে জোর করে নীরব করা হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের হত্যা করা হয়েছে। প্রকাশ্যেই একটি নির্বাচন বিকৃত করা হয়েছে।

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে একঘরে করা হয়েছে। ধীরে ধীরে আইনের মাধ্যমে তাঁকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব এসব দেখেনি, বলা যায়, সব দেখেও নীরব থেকেছে।

এই নীরবতা আর ভুল বা অসাবধানতার ফল নয়, অন্ধত্বও নয়। এটি ইচ্ছাকৃত নীতিগত সিদ্ধান্ত। পাকিস্তানের শাসকেরা যেভাবে দমন চালায়, ঠিক সেই কৌশলেই এই নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে—প্রশাসনিকভাবে, আইনি প্রক্রিয়ায়, ধাপে ধাপে। ফলে পুরো বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরাপদভাবে আড়াল হয়ে আছে।

এখন ইরানের দিকে তাকানো যাক। সেখানে সামান্য অস্থিরতাও ব্যাপক প্রচার পায়। প্রতিটি ঘটনাই বড় করে দেখানো হয়। একটি জ্বলন্ত ডাস্টবিন ভবিষ্যতের সংকেত হয়ে ওঠে। প্রতিটি সংঘর্ষকে নিয়তির ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। টক শো ভরে ওঠে। হ্যাশট্যাগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।

নিষেধাজ্ঞাকে নৈতিক শুদ্ধতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি সামরিক হামলার কথাও মানবিক উদ্বেগের ভাষায় বলা হয়। আমাদের জানানো হয়, পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক বিবেক এখনো পুরোপুরি জাগ্রত।

পাকিস্তানে দমননীতি তেমন দৃশ্যমান নয়। এখানে সিনেমার মতো দৃশ্য নেই। আছে কাগজপত্র, আদালতের আদেশ আর লাঠির আঘাত। আন্দোলন করলে এখানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়। মানুষ গুম হয়। বেছে বেছে হত্যা চলে। সবকিছু ঘটে নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিতভাবে, এমনভাবে যাতে তা সহজে হজমযোগ্য থাকে। কোনো নাটক নেই। কোনো মুক্তির গল্প নেই। কোনো ভাইরাল মুহূর্ত নেই। তাই ক্ষোভও তৈরি হয় না।

এটাই প্রকৃত দ্বিমুখী মানদণ্ড। বিষয়টি গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র নয়। বিষয়টি দৃশ্যমানতা বনাম শৃঙ্খলা। পশ্চিমা বিশ্ব অন্যায়ের প্রতি নয়, সাড়া দেয় দৃশ্যমানতার প্রতি। নীতির চেয়ে তারা গুরুত্ব দেয় সামঞ্জস্যকে। ইরান অবাধ্য। আদর্শগতভাবে অস্বস্তিকর। তারা আনুগত্য মানে না। পাকিস্তান সামরিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রিত। প্রয়োজনমতো ব্যবহারযোগ্য।

ইসলামাবাদে সরকার পরিবর্তন হয়েছে ২০২২ সালের এপ্রিলে। ওয়াশিংটন যা চেয়েছিল, তা পেয়েছে। এরপর আর পরিস্থিতির গভীরে তাকানোর তাগিদ নেই। তাই ইরানে দমননীতি হয়ে ওঠে সভ্যতার সংকট। আর পাকিস্তানে দমননীতি, যা আরও বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত, তাকে বলা হয় ‘জটিল অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা’। এ বাস্তবতায় নব্য রক্ষণশীলেরা চোখ ফেরান। উদারপন্থীরা হঠাৎ সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা খুঁজে পান।

পাকিস্তানের শাসকেরা এ কারণে নীরব প্রশংসার দাবিদার বলেই মনে হয়। তারা দমনকে এমনভাবে পরিশীলিত করেছে, যাতে আন্তর্জাতিক দাতারা আতঙ্কিত না হন। টেলিভিশনে ট্যাংক নেই। গণহত্যার দৃশ্য নেই। আছে আগাম আটক, আদালতের সাজানো প্রক্রিয়া, মিডিয়া ব্ল্যাকআউট এবং মেপে নেওয়া সহিংসতা। তাদের লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো নয়, লক্ষ্য ক্লান্তি ছড়ানো—মানুষকে ধীরে ধীরে হাল ছেড়ে দিতে শেখানো।

তারা শক্তিকে ‘নিরাপত্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে শিখেছে। দমনকে ‘স্থিতিশীলতা’ নামে পালিশ করে বিনিয়োগ সম্মেলনে উপস্থাপন করতে জানে। বাইরে আনুগত্য, ভেতরে নিয়ন্ত্রণ—এই সমীকরণে মানবাধিকার হয়ে ওঠে ঘরোয়া ঝামেলা। ইমরান খানের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা এই বাস্তবতার প্রতীক।

তাঁকে বিরক্তিকর এক পাদটীকায় পরিণত করা হয়েছে। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তাকে খারাপ আবহাওয়ার মতো দেখা হয়েছে। তাঁর কারাবাসকে আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে তাঁকে নিষ্ক্রিয় করার কৌশল। কারণ, তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সামরিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সম্মতি সংগঠিত করতে পারতেন।

পশ্চিমা কর্মকর্তারা ও সাংবাদিকেরা এসব জানেন। তাঁদের নীরবতা অজ্ঞতার ফল নয়, এটি অঙ্ক। পাকিস্তান এমন কোনো দেশ নয়, যাকে তারা রক্ষা করতে চায়। পাকিস্তান এমন এক অংশীদার, যাকে তারা ধরে রাখতে চায়। এই ছাড়ের কারণ একটাই—পাকিস্তান প্রয়োজনমতো কাজে লাগে।

সেখানে নিষেধাজ্ঞার ছায়ায় অস্ত্র বিক্রি করা যায়। প্রয়োজনে আফগানিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। গোপন বার্তা আদান-প্রদান করা যায়। চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতার নাটক মঞ্চস্থ করে দুই পক্ষের ওপরই প্রভাব রাখা যায়। এসবই করা যায় কম খরচে।

ইরান ঠিক উল্টো। তারা নিজেদের ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে চায় না। সার্বভৌমত্ব ভাড়া দেয় না। অনুমোদনের জন্য অনুনয় করে না। তাই সেখানে অস্থিরতা নৈতিক মহাকাব্যে রূপ নেয়। আর পাকিস্তানের সংগঠিত, শৃঙ্খলিত ও কৌশলগত গণ-আন্দোলন পরিণত হয় অপ্রচলিত শব্দে। এখানেই নির্মম শিক্ষা লুকিয়ে আছে।

অহিংস আন্দোলন অদৃশ্য থাকে। সংগঠনগুলো তবু আসে শাস্তির আওতায়। জনপ্রিয়তা তখন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। দমন সফল হয় যদি তা নীরবে করা যায় এবং যদি তা পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। মনোযোগের এই নৈতিক অর্থনীতি দুর্ঘটনাবশত নয়, এটি পেশাদারভাবে গড়ে তোলা।

পাকিস্তানের শাসকেরা এই ভণ্ডামির শিকার নন। তাঁরা এর সুবিধাভোগী। তাঁরা এমন এক ভারসাম্য আয়ত্ত করেছেন, যাতে ভেতরে কর্তৃত্ব বজায় থাকে এবং বাইরে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ভণ্ডামির মতো দমনও সুদে-আসলে বাড়ে।

যে বিশ্ব তেহরানের অস্থিরতাকে বড় করে দেখে এবং পাকিস্তানের গণদমন উপেক্ষা করে, সে বিশ্ব গণতন্ত্র রক্ষা করছে না। সে বিশ্ব কেবল নির্লজ্জ বাস্তববাদ প্রচার করছে। যে গণমাধ্যম বিশৃঙ্খলাকে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং সংগঠনকে তুচ্ছ করে, সে গণমাধ্যম মানুষকে তথ্য দেয় না।

বরং বিকট শব্দকে সাহস আর শৃঙ্খলাকে উদাসীনতা হিসেবে ভাবতে শেখায়। আর যে পররাষ্ট্রনীতি বৈধতার চেয়ে উপযোগিতাকে পুরস্কৃত করে, তা স্থিতিশীলতা আনে না। বরং ভবিষ্যতের ভাঙনের বীজ বপন করে।

পশ্চিমা বিশ্ব এখানে নীরবে স্পষ্ট একটি বার্তা দিয়েছে—‘জোরে চিৎকার করো। আগুন জ্বালাও। নাটকীয়ভাবে রক্ত ঝরাও। তাহলে তোমাকে দেখা হবে। কিন্তু ধৈর্যের সঙ্গে সংগঠিত হও। লাখো মানুষ জড়ো করো। দৃশ্য তৈরি ছাড়াই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করো, তাহলে তোমাকে মুছে ফেলা হবে।’ এটি নিরপেক্ষতা নয়। এটি নির্দেশনা। ইতিহাস কখনোই সেই সাম্রাজ্যগুলোর প্রতি দয়ালু হয়নি, যারা নিয়ন্ত্রণকে নিধনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।

* জুনায়েদ এস আহমদ, পরিচালক, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশন, পাকিস্তান
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

যে বিশ্ব তেহরানের অস্থিরতাকে বড় করে দেখে এবং পাকিস্তানের গণদমন উপেক্ষা করে, সে বিশ্ব গণতন্ত্র রক্ষা করছে না।
যে বিশ্ব তেহরানের অস্থিরতাকে বড় করে দেখে এবং পাকিস্তানের গণদমন উপেক্ষা করে, সে বিশ্ব গণতন্ত্র রক্ষা করছে না। গ্রাফিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ঘৃণার রাজনীতি জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল

দক্ষিণ এশিয়ায় সামপ্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় আইন শাসনের ভাঙনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে (যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়) এক হিন্দু ব্যক্তিকে মুসলিম জনতার গণপিটুনিতে মৃত্যু, ভারতে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র এক নেতার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বার্ষিক বড়দিনের অনুষ্ঠানে হামলা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে এক অন্ধ নারীকে লাঞ্ছিত করা, কিংবা নেপালে মোবাইল চুরির মিথ্যা অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাগুলো তারই উদাহরণ।

দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক স্বার্থে যখন নেতারা নিপীড়ন ও প্রতিশোধের চক্রকে ব্যবহার করেন, তখনই এ ধরনের ঘটনার জন্ম হয়। সংখ্যালঘু সমপ্রদায়, শরণার্থী, অভিবাসী কিংবা প্রতিবেশী দেশকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে অনুসারীদের উস্কে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য একটাই- অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়া।

নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন।

‘এ ক্রস সাউথ এশিয়া, লিডারস আর প্রমোটিং হেইট টু ডিসট্র্যাক্ট সিটিজেনস ফ্রম ইকোনমিক ইনসিকিউরিটি’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে মিনাক্ষী গাঙ্গুলি লিখেছেন, ঘৃণার এই রাজনীতি অনেক সময় দেশের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে হিন্দুর ওপর হামলার অভিযোগে ভারতের বহু নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন, আবার ভারতে মুসলমানদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সরব হন বাংলাদেশিরা। এমনকি খেলাধুলার অঙ্গনও এর বাইরে থাকেনি। জাতীয়তার কারণে বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে বাদ দিতে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশের পর বাংলাদেশ সরকার জানায়, ভারতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে তাদের জাতীয় দল নিরাপদ নাও থাকতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের কারণে ক্রিকেট ও সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের ওপর হামলার জেরে পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। দুই দেশের জনগণের ক্ষোভে ঘি ঢেলেছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

অনলাইন ঘৃণা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে অ্যালগরিদমকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যবহার করে রাজনৈতিক মতাদর্শীরা যে অসন্তোষ উস্কে দিচ্ছেন তা এখন স্পষ্ট। আইন মানা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা করা কিংবা বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করাকে তারা ‘অপ্রয়োজনীয় তোষণ’ হিসেবে তুলে ধরছেন। এসব কৌশল ব্যর্থ হলে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ বেছে নেন, আগেই ভেঙে ফেলেন সেই প্রতিষ্ঠানগুলো, যেগুলো তাদের লাগাম টানতে পারতো।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সামপ্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে অর্থনৈতিক স্থবিরতায় জর্জরিত জনগণের ক্ষোভে ক্ষমতাসীন নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। আবার ভারত, পাকিস্তান কিংবা মালদ্বীপের মতো দেশে শঙ্কিত শাসকরা বিক্ষোভ দমনে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছেন।

ঘৃণা ছড়িয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা না করে নেতারা চাইলে অধিকার রক্ষা করে বাস্তব উন্নয়নের কঠিন পথ বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা তা করতে অনিচ্ছুক।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের দমননীতির পর সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে একটি ছোট আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তবে সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারও দ্রুত দিশা হারায়, জনতার প্রতিশোধমূলক দাবিতে তারা অচল হয়ে পড়ে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেয়ায় বাংলাদেশিরা আবারো পছন্দের নেতা নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। যা আগের তিনটি নির্বাচনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি।

তরুণদের বিক্ষোভ: নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৭৬ জন নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন, ‘জেন-জি’ আন্দোলনকারীদের পছন্দে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু পরিবর্তন না আসায় হতাশ আন্দোলনকারীরা আবার রাজপথে নেমেছেন। তাদের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনে সেই পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারাই ক্ষমতায় ফিরবেন।
শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে গণ-অভ্যুত্থানে গোটাবাইয়া রাজাপাকসের সরকার উৎখাতের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট হন অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। তিনি দুর্নীতি দমন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, তার সরকার এখনো কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করছে, যা মূলত সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলমানদের লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হয়। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন, নজরদারি, ভয়ভীতি ও মানবাধিকারকর্মীদের দমন অব্যাহত রয়েছে।

ভারতে দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি ভোটের রাজনীতিতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে আরও উস্কে দিচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে নেতাদের ঘৃণামূলক বক্তব্যের পর সমর্থকরা মুসলমান হত্যা, খ্রিষ্টান বিদ্রূপ, শিখ ও দলিতদের নিপীড়নে জড়িয়ে পড়লেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহী। বিক্ষোভ দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগ ও আদালতের আদেশ অমান্য করে সম্পত্তি ভাঙচুরও ঘটছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘৃণা ছড়ানো, পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার স্থগিত রাখলে সহিংসতা আরও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে কোনো শাসককে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। নেতাদের উচিত বিভাজন নয়, বরং সাম্য প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করা। মানুষের জীবনে বাস্তব উন্নতিই বিভাজন নয়।

mzamin