Saturday, February 28, 2026

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রাসনে কি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আজ শনিবার সকালে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানও পাল্টা জবাব দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সংঘাতের মধ্যে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার হুমকি দূর করবে। একই সঙ্গে ইরানিদের জন্য তাঁদের শাসক উৎখাত করার সুযোগ তৈরি করবে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন এ হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

ইরান ও তার দীর্ঘদিনের শত্রুদের মধ্যে এ নতুন সংঘাত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের আশাকে আরও ক্ষীণ করে তুলেছে।

১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের উল্লেখ ট্রাম্পের

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের বিরোধের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন, যেখানে ছাত্ররা ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিল। এ ছাড়া ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে বিভিন্ন হামলার জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সব জায়গায় বোমা পড়বে’। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। এটি আপনাদেরই হবে। সম্ভবত পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটিই আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করেছে। আকাশ ও সমুদ্রপথে এ অভিযানের পরিধি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তবে এক কর্মকর্তা জানান, এ অভিযান কয়েক দিন ধরে চলতে পারে।

তেহরানকে পারমাণবিক আলোচনায় নমনীয় করতে ট্রাম্প এ অঞ্চলে বিশাল মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘ব্যাপক ও চলমান’ অভিযান শুরু করেছে।

তেহরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে না পারে, তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার একটি বড় বাধা ছিল। ট্রাম্প বলেন, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানি শাসনের “আসন্ন হুমকি” নির্মূল করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’

ইরানিদের প্রতি ‘স্বৈরশাসনের জোয়াল’ সরানোর আহ্বান ইসরায়েলের

ইরানিদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন উগ্রবাদী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ যৌথ হামলা ‘সাহসী ইরানি জনগণের জন্য তাঁদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে’।

যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের সব স্তরের মানুষের জন্য সময় এসেছে...স্বৈরশাসনের জোয়াল ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলার এবং একটি মুক্ত ও শান্তিকামী ইরান গড়ে তোলার।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তেহরানে নেই। তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এ হামলা হলো। ইরান যদি তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যায়, তবে আবারও হামলা করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার হুমকি দিয়ে আসছিল।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, ইসরায়েল রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে এবং হুমকি দূর করতে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক’ হামলা শুরু করেছে।

ইসরায়েল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে পবিত্র রমজান মাসে এ হামলা চালিয়েছে। আবার এ হামলা ইহুদি সম্প্রদায়ের উৎসব ‘পুরিম’-এর ঠিক আগে করা হলো। পুরিম উৎসব প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান) ইহুদিদের ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে ফেরার স্মৃতিতে পালন করা হয়, যা আগামী সোমবার শুরু হতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাসের পরিকল্পনা

ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে কয়েক মাস ধরে এ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। হামলার তারিখ কয়েক সপ্তাহ আগেই ঠিক করা হয়েছিল।

আজ তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে পুরো ইসরায়েলে সাইরেন বেজে ওঠে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য জনগণকে প্রস্তুত রাখতে এ আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জরুরি খাত বাদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে উপস্থিতি বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া আকাশপথ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। বেসামরিক ফ্লাইটের জন্য ইসরায়েল তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জনগণকে বিমানবন্দরে না যেতে অনুরোধ করেছে।

কয়েক দশকের পারমাণবিক বিরোধ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, এমন সামরিক সংঘাত এড়াতে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনা শুরু করেছিল।

তবে উগ্রবাদী নেতানিয়াহু সরকার বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যেকোনো চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করার শর্ত থাকতে হবে। শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করলে হবে না। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্যও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।

ইরান বলেছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে তারা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি হয়নি।

তেহরান আরও বলেছিল, যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে তারা নিজেদের রক্ষা করবে। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল, যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেখান থেকে হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে।

গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দিয়েছিল, যা ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ।

তেহরান তখন কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আল–উদাইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছিল।

পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবি করে আসছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম হতে পারে। যদিও তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-28%2F1bvoc597%2Firan-israel-us-conflict-070728.jpg?rect=0%2C0%2C6061%2C4041&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের রাজধানীর আকাশে ধোঁয়া। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, তেহরান। ছবি: এএফপি

অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে নজর ঘোরাতেই কি পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত by শুভজিৎ বাগচী

সপ্তাহখানেক আগে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া লড়াই এখন বড় আকার ধারণ করেছে। গত অক্টোবরে এই দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ‘মিনি ওয়ার’ বা নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া বর্তমান লড়াই এতটাই তীব্র যে একে তাঁরা এখন ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করছেন।

কারণ, এই লড়াই এখন আর শুধু পদাতিক বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের অন্তত তিনটি শহরে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একের পর এক জঙ্গি হামলা। বিশেষ করে ইসলামাবাদের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং বাজৌরে সেনাচৌকিতে হামলা। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার যে প্রচেষ্টা তৃতীয় কয়েকটি দেশ শুরু করেছিল, এই হামলার ফলে সেগুলোও ব্যর্থ হয়। শুরু হয় ‘ওপেন ওয়ার’।

পাকিস্তানের দাবি, কাবুল আফগান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এরপর আফগানিস্তানের ভেতরে গিয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে জঙ্গিরা পাকিস্তানে প্রবেশ করছে।

পাকিস্তানের বরাবরের বক্তব্য, ১৮৯৩ সালে এই সীমান্ত (ডুরান্ড লাইন নামেও পরিচিত) নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত। পরিবর্তন করার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে আফগানরা এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয় না। এর কারণ, ১৮ শতকের মাঝামাঝি আফগান সাম্রাজ্য বর্তমান পাকিস্তানের পূর্ব দিকেও বিস্তৃত ছিল। অবশ্য সে সময় পাকিস্তানের জন্ম হয়নি। আফগানদের দাবি, ওই অংশ তাদের।

পাকিস্তানকে যদি এই দাবি মেনে নিতে হয়, তাহলে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ আফগানিস্তানের হাতে তুলে দিতে হয়, বেলুচিস্তানেরও কিছুটা চলে যায়। এটা পাকিস্তানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই নিয়েই লড়াই। পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন সীমান্ত নিয়ে বিবাদ সামনে আসে না। বর্তমানে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।

সম্পর্কের সর্বশেষ এই অবনতির শুরুটা গত বছরের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের পর থেকে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিকে সার্বিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত বিশেষজ্ঞরা।

কাবুলে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। আফগানিস্তানের একটি সরকারি সূত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, এ কথা যেমন ঠিক যে কিছু আফগান তালেবান আফগানিস্তানে আছে, তেমনি এটাও ঠিক যে প্রধানত পাকিস্তানের বসবাসকারী তালেবান বা পাকিস্তানি তালেবানরা এই হামলা মূলত চালাচ্ছে।

২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিতায় টিটিপি আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান পাল্টা স্থল অভিযান শুরু করে এবং দাবি করে যে তারা পাকিস্তানের বেশ কিছু সামরিক চৌকি দখল করেছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাধারণভাবে বক্তব্য, বিভিন্ন দেশ অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের নজর ঘোরাতে বাইরের শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পাকিস্তান একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে রয়েছে, সেই কারণে তারাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে।

তালেবান কাবুলে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যায়ে হামলা (টিটিপি ও বালুচ স্বাধীনতাকামী) বেড়েছে। পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের বক্তব্য, এর পেছনে ভারতের ভূমিকা রয়েছে। এই বক্তব্যকে ভারত সব সময় ভিত্তিহীন বলেছে। পাকিস্তানের ভেতরে ২০২২ সালে ইমরান খানকে সরানো, জেলে রাখা নিয়ে এবং তাঁর ওপর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে পাকিস্তান সরকার অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে সে দেশের মানুষের নজর সরাতেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে। পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদের একটা হাওয়া তৈরি করেছে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে।

অন্যদিকে সেই একই কথা আফগানিস্তান সম্পর্কেও খাটে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ২০২৬ সালের আগস্টে পাঁচ বছর পূর্ণ করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তারা কিছুটা সংহত করতে পেরেছে। আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ বা সংখ্যালঘুদের ওপর সরাসরি আক্রমণ প্রায় হচ্ছে না। কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো তারা সমাধান করতে পারেনি, যার অন্যতম ভঙ্গুর অর্থনীতি। আফগানিস্তানের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ।

প্রতি মার্কিন ডলার সমান ৬৬ আফগানির মুদ্রা হলেও তা দিয়ে অর্থনীতির চেহারা বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনীতির সার্বিক উন্নতি হচ্ছে না। চরম দারিদ্র্য, বিশেষত খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে, যুবকদের অধিকাংশই কর্মহীন, তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যনতুন আইন প্রণয়ন করছে সরকার, যার অধিকাংশই দমনমূলক এবং অনেক ক্ষেত্রে তা নারীদের বিরুদ্ধে। উত্তর আফগানিস্তানে উজবেক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের ছোটখাটো সংঘাত চলছে। এটাও কাবুলকে চাপে রাখছে।

এই অবস্থায় এখন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে তালেবান নেতৃত্বাধীন ইসলামি আমিরাতের সরকারের কিছুটা সুবিধাই হয়। আফগান সরকারের তরফে অবশ্য অভিযোগ করা হয়েছে যে তারা বারবার ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটাতে চেয়েছিল, যা ইসলামাবাদ চায়নি। দুই দেশের মধ্যে অবশ্য গত কয়েক মাসে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে, অন্তত ছয়টি দেশের মধ্যস্থতায়। কিন্তু গতকাল শুক্রবার বিকেলে এই যাবতীয় মধ্যস্থতা ব্যর্থ হয়েছে বলেই ধরে নিতে হচ্ছে।

রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি তালেবান সেনাদের। গতকাল আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে
রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি তালেবান সেনাদের। গতকাল আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে। ছবি: রয়টার্স

এপস্টিন ফাইলে দালাই লামার নাম যেভাবে কাজে লাগাচ্ছে চীন by তেনজিন ডালহা

চীনের প্রোপাগান্ডা ওয়ার বা তথ্যযুদ্ধ এখন আর কেবল প্রচলিত প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের কৌশলে। ডিজিটাল নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কনটেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌশলী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বেইজিং আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে পরিশীলিত তথ্যযুদ্ধের একটি গড়ে তুলেছে। বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রচেষ্টা এখন চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ্য একটাই—কর্তৃত্ববাদী শাসনকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ধীরে ধীরে বাস্তবতাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা।

এই অভিযানের একটি প্রধান লক্ষ্য তিব্বত এবং বিশেষ করে দালাই লামা। চীনের তথ্য অভিযান তিব্বতি সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে দিতে চায় এবং জোরপূর্বক একীভূতকরণকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ তাদের ২০২৪ সালের এশিয়া–প্যাসিফিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা মূল্যায়নে এসব উদ্যোগকে একটি পরিকল্পিত ‘কূটকৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য সমাজের ভেতরের বিভাজনকে কাজে লাগানো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল করা এবং প্রকাশ্য ও গোপন নানা পদ্ধতিতে চীনের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া।

এই প্রেক্ষাপটে জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত আদালতের নথিতে দালাই লামার নাম ৬৯ থেকে ১৬৯ বার আছে বলে যে দাবি সম্প্রতি ভাইরাল হিসেবে, তা আধুনিক তথ্যযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এই সংখ্যা কোনো যাচাইকৃত আইনি বিশ্লেষণ থেকে আসেনি। এটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট থেকে ছড়িয়েছে। তবু স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী ও আইন বিশ্লেষকেরা নথি পর্যালোচনা করে বারবার ভুয়া প্রমাণ করার পরও দাবিটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

নথিগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, এপস্টিন দালাই লামার সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সেই আগ্রহ বাস্তবে পূরণ হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ নেই। দালাই লামার নাম যেসব জায়গায় এসেছে, সেগুলো মূলত গণহারে পাঠানো নিউজলেটার, প্রশাসনিক যোগাযোগ তালিকা বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে আলাপচারিতার প্রসঙ্গে। কোথাও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, আর্থিক সম্পর্ক বা এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে দালাই লামার কোনো সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণ নেই। তথাকথিত ১৬৯টি উল্লেখের বড় একটি অংশ আসলে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি।

তবু অভিযোগটি ছড়িয়েছে। এর কারণ ডিজিটাল তথ্যপরিবেশের একটি বড় দুর্বলতা। নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহার করলে তা বিশ্বাসযোগ্যতার ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে, যদিও প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত থাকে। এমন পরিবেশে যাচাইয়ের জায়গা নেয় বারবার পুনরাবৃত্তি।

সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে, যখন দালাই লামা তাঁর স্পোকেন ওয়ার্ড অ্যালবামের জন্য গ্র্যামি পুরস্কার পান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কারটিকে ‘চীনবিরোধী রাজনৈতিক অপচেষ্টা’ বলে নিন্দা জানায়। তিব্বতি পরিচয় বা নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে অতীতেও এমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে একটি তিব্বতি সাংস্কৃতিক অভিবাদন ভঙ্গিকে তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনলাইনে অশোভন আচরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়ায়। পরে তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি গবেষকেরা এই ব্যাখ্যাকে বিকৃত বলে স্বীকার করেন।

এপস্টিন–সংক্রান্ত বয়ানটির বিশেষত্ব হলো এর বিস্তার ও সমন্বয়। ডিজিটাল ভুয়া তথ্য গবেষক ও ওপেন সোর্স অনুসন্ধানকারীরা দেখেছেন, এতে অস্বাভাবিক আচরণের স্পষ্ট ছক রয়েছে। হঠাৎ তৈরি হওয়া নতুন অ্যাকাউন্ট, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা প্রোফাইলের একসঙ্গে সক্রিয় হওয়া এবং একেবারে একই বা প্রায় একই বার্তা একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হিসেবে। অনেক অ্যাকাউন্ট নিজেদের পশ্চিমা ব্যবহারকারী হিসেবে তুলে ধরেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি প্রোফাইল ছবি বা চুরি করা পরিচয় ব্যবহার করেছে। এসব কৌশল আগে থেকেই চীন-সম্পর্কিত প্রভাব বিস্তার অভিযানে নথিভুক্ত।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও এতে ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রথম দিকেই বিভ্রান্তিকর ‘১৬৯ বার’ সংখ্যাটি তুলে ধরে। এতে দাবিটি একধরনের সাংবাদিক বৈধতা পায় এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেন স্বতঃস্ফূর্ত বলে মনে হয়।

তথ্যযুদ্ধ নিয়ে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, এই পদ্ধতিতে প্রথমে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বয়ানের ভিত্তি তৈরি করে, পরে সমন্বিত অনলাইন নেটওয়ার্ক সেটিকে দৃশ্যমান করে তোলে।

এই ঘটনাগুলো তিব্বত নিয়ে চীনের বহির্মুখী বয়ান ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের সঙ্গেই মিলে যায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লাসায় তিব্বত ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন সেন্টার চালু করে বেইজিং। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কাজ হলো তিব্বত নিয়ে বিদেশি বয়ান ও গল্প বলার একটি নিজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা। এটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রচার থেকে সক্রিয় বয়ান প্রকৌশলের দিকে স্পষ্ট সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।

এই ধরনের অভিযানের লক্ষ্য একক কোনো তথ্য বিশ্বাস করানো নয়। বরং বিতর্কের সঙ্গে নাম জুড়ে দিয়ে নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় করা। তথ্যের ভিড়ে কাছাকাছি থাকাই সন্দেহ হয়ে ওঠে এবং পুনরাবৃত্তিই স্মৃতিতে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহই হয়ে ওঠে ফলাফল। তিব্বতি জনগোষ্ঠীর জন্য এটি কেবল রাজনৈতিক দমন নয়। এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গল্প বলার সক্ষমতা এবং মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক টিকে থাকার প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান বজায় রাখার ওপর সরাসরি আঘাত।

গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর জন্যও ঝুঁকি কম নয়। উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা না থাকা শক্তিগুলোর কাছে বিশেষভাবে দুর্বল। যখন কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রচার বাস্তব জনমতের মতো দেখাতে পারে, তখন প্রকৃত উদ্বেগ আর সংগঠিত হস্তক্ষেপ আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন প্রভাব বিস্তার নিয়ে গবেষকেরা বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

দালাই লামার বিরুদ্ধে চীনের এই অভিযান দেখায়, ঘরোয়া বয়ান নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে এসে এখন বৈশ্বিক ডিজিটাল পরিসরে বৈধতা নিয়েই লড়াই চলছে।

এপস্টিন নথির ঘটনা কোনো জবাবদিহির চেষ্টা নয়। এটি ছিল বয়ান নিয়ন্ত্রণের একটি উদাহরণ, যেখানে তুচ্ছ ও প্রসঙ্গবহির্ভূত উল্লেখকে ইচ্ছাকৃতভাবে বড় করে দেখিয়ে সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হিসেবে। গুরুত্ব নথিতে কী আছে, তা নয়। গুরুত্ব হলো কীভাবে কর্তৃত্ববাদী শক্তি গণতান্ত্রিক তথ্যব্যবস্থার খোলা দরজা ব্যবহার করে সামান্য সংযোগকে স্থায়ী সন্দেহে রূপ দেয়। এ ধরনের অভিযান যদি চিহ্নিত না হয়, তবে প্রমাণ নয়, বরং তৈরি করা বিতর্কই ভবিষ্যতে মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক বৈধতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ধারণা গড়ে দেবে।

* তেনজিন ডালহা, চীনের সাইবার নিরাপত্তা নীতি, নজরদারি ব্যবস্থা এবং তিব্বতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গতিবিধি গবেষক
- দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

দালাই লামা
দালাই লামা। ফাইল ছবি

ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলন কি ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে

সিএনএন, বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে যা খুশি তা–ই করার অধিকার আমার আছে।’ তবে ট্রাম্পের সেই দিন এখন আর আগের মতো যাচ্ছে না। সব সময় আর নিজের ইচ্ছা খাটাতে পারছেন না তিনি।

ট্রাম্প অবশ্য এখনো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার বাসনা ছাড়েননি। তবে এখন তিনি প্রতি পদক্ষেপে ছোট ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতিরোধের মুখে পড়তে শুরু করেছেন।

প্রতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের প্রতি মানুষের ভয় একটু একটু করে কমছে। এমনকি নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের মধ্যেও এখন জড়তা কাটতে শুরু করেছে। তিনি এখন রাজনৈতিক তৎপরতা, আদালত, সাধারণ নাগরিক এবং নির্বাচনী রাজনীতির ক্ষেত্রেও বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁর প্রিয় কিছু নীতি ও ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে অনেকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের পিছুটান

গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বর্ডার জার’ টম হোম্যান মিনেসোটা থেকে হাজারো ফেডারেল কর্মকর্তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চার হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায় থেকে এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসা একধরনের পিছু হটাই বলা যায়। রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নামে দুই মার্কিন নাগরিককে হত্যার ঘটনায় চলা ব্যাপক বিক্ষোভ ও জনরোষের মুখেই এমন সিদ্ধান্ত এল। মূলত মিনেসোটাতে ট্রাম্পের শুদ্ধি অভিযানের রাজনীতি আর টেকসই হচ্ছিল না।

মিনেসোটার ডেমোক্রেটিক গভর্নর টিম ওয়ালজ একে ‘নজিরবিহীন আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে এর অবসানের ঘোষণা দেন। এই সংঘাতের ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওয়ালজ বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা বলা এখন নিরাপদ যে পুরো দেশ আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ, আমরা দেখিয়েছি ন্যায়ের পক্ষে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়।’

বড় বাধা আদালত

ট্রাম্পের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে আদালতও এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু বড় সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষেই গেছে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের একটি আদালত নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ও অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলির বিরুদ্ধে আনা ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কেলিকে শাস্তি দেওয়ার এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

এক বিবৃতিতে কেলি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আমাকে শাস্তি দিতে বা অন্যদের মুখ বন্ধ করতে যত কঠোরভাবেই লড়াই করুক না কেন, আমি তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলব। এটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ এর আগে একটি গ্র্যান্ড জুরিও কেলি ও অন্য পাঁচ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের আনা অভিযোগপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।

ট্রাম্পের বিরোধিতা

কানাডার ওপর ট্রাম্পের চাপানো শুল্ক বাতিলের পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন ছয় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। তাঁদের এই পদক্ষেপ মূলত ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির ফলে ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে দলের ভেতরে থাকা উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ।

এর পাশাপাশি হাউস স্পিকার মাইক জনসনের একটি প্রচেষ্টাও ব্যর্থ করে দিয়েছেন তিন রিপাবলিকান সদস্য। জনসন চেয়েছিলেন ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো ভোটাভুটির পথ বন্ধ করতে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও দেশটির মিত্ররা এখন ট্রাম্পকে ছাড়াই চলার পথ খুঁজছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বের মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে বড় শক্তিগুলোর দাদাগিরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের ক্ষমতা

দেশের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের প্রতাপ এখনো প্রবল। গত বৃহস্পতিবার তিনি পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিজের সেই শক্তিরই মহড়া দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ওবামা এবং বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ুবিষয়ক অর্জনগুলোকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দেবে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন বাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযানই প্রমাণ করে, ট্রাম্পের হাতের মুঠোয় কতটা ক্ষমতা রয়েছে। দলের ভেতরে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ এখনো অটুট।

ট্রাম্পবিরোধীদের এই ছোট ছোট জয় হয়তো স্বল্প মেয়াদে তাঁর ক্ষমতাকে টলাতে পারবে না। তবু ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অথবা নিজ এলাকার ভোটারদের স্বার্থ রক্ষায় অনেক আইনপ্রণেতাই হয়তো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন। বর্তমানে জরিপগুলোতে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার নিম্নমুখী অবস্থান বিরোধীদের আরও উৎসাহিত করছে। সিএনএনের সব জরিপের গড়ে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা এখন ৩৯ শতাংশে আটকে আছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

নরসিংদীতে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূরা গ্রেপ্তার

নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর এক কিশোরীকে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের মাওনা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দীর মধ্যবর্তী একটি শর্ষেখেত থেকে ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে ৯ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর মা।

মামলার এজাহারে নামোল্লেখ করা ৯ জন আসামি হলেন, নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইছহাক ওরফে ইছা (৪০), আবু তাহের (৫০) ও মো. আইয়ুব (৩০)। আহাম্মদ আলী দেওয়ান মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি। তাকেসহ পাঁচ আসামিকে এই বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকি চারজন হলেন ইমরান দেওয়ান, এবাদুল্লাহ, আইয়ুব ও গাফফার।

এদিকে অভিযোগ ওঠার পর আহাম্মদ আলী দেওয়ানকে দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে সদর উপজেলা বিএনপির এক নোটিশে এই তথ্য জানানো হয়। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশে উল্লেখ করা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় আহাম্মদ আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরা নামের এক তরুণের সঙ্গে কিশোরীর কথাবার্তা ছিল। ১৫ দিন আগে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ কিশোরীকে তুলে নেয়। তখন তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনার বিচারের জন্য কিশোরীর পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যায়। তবে পরিবারটি বিচার পায়নি। সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে অভিযোগ করায় নূরাসহ সংশ্লিষ্ট তরুণেরা ক্ষুব্ধ হন।

এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার রাতে মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ বাবার কাছ থেকে কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যান। রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি একটি শর্ষেখেতে কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে মাধবদী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।

কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ধর্ষণের বিচারের দায়িত্ব নিয়ে আহম্মদ আলী দেওয়ান অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কোনো বিচার না করেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। পাশাপাশি কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চাপ দেন। বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর জেরেই গত বুধবার রাতে বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে অপহরণের পর শর্ষেখেতে নিয়ে হত্যা করা হয়।

গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা
গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে

শুধু পুলিশের বাড়িতে চুরি করতেন তিনি

ভারতের মধ্যপ্রদেশের খান্ডওয়া জেলায় ধরা পড়েছেন অদ্ভুত এক ‘চোর’। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে তিনি শুধু পুলিশের বাড়িতে চুরি করে আসছিলেন। কারণ হিসেবে পুলিশ বলছে, ১৫ বছর আগের এক ঘটনার ক্ষোভ তাঁকে এমন পথে ঠেলে দিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম দীপেশ। তাঁর বাড়ি আলিরাজপুর জেলায়। গত ২০ জানুয়ারি খান্ডওয়ার পুলিশ লাইনে চুরির ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়েই তাঁর খোঁজ মেলে। সেদিন গভীর রাতে কনস্টেবল করণপাল সিং ও সুরেশ খাটের বাড়িতে চুরি হয়। কয়েক লাখ টাকার গয়না ও নগদ অর্থ খোয়া যায়।

ঘটনার পর পুলিশ লাইনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। সেখান থেকে সন্দেহভাজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে অভিযান চালিয়ে দীপেশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ও কিছু গয়না উদ্ধার করা হয়।

তদন্তকারীরা জানান, দীপেশ দীর্ঘদিন ধরে বারবার স্থান বদল করছিলেন, যাতে পুলিশ তাঁকে ধরতে না পারে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে ঝাবুয়া, আলিরাজপুর ও ধর জেলায় তল্লাশি চালানো হয়। প্রযুক্তিগত তথ্য ও নজরদারির ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি বুরহানপুরের দিকে যাচ্ছেন।

পুলিশ যখন দীপেশকে ধরতে যায়, তখন তিনি একটি বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এতে তাঁর হাত ও পায়ে আঘাত লাগে। আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে খান্ডওয়া আদালতে তোলা হলে তাঁকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়।

খান্ডওয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহেন্দ্র তারনেকর এই গ্রেপ্তারকে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে আরও কয়েকটি ঘটনার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত অন্য সহযোগীদের খোঁজও চলছে।

পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে দীপেশ স্বীকার করেছেন, তিনি চুরির জন্য শুধু পুলিশ সদস্যদের বাড়ি নিশানা করতেন। কারণ, হিসেবে তিনি ১৫ বছর আগের এক ঘটনার কথা বলেন। তখন আলিরাজপুরে এক পুলিশ সদস্য তাঁকে মারধর করেছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকে তাঁর মনে ক্ষোভ জন্মায়।

খান্ডওয়ার কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রবীণ আর্য জানান, দীপেশ নাকি চুরির আগে ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। কখনো রাস্তার ফেরিওয়ালা সেজে পুলিশ লাইনের আশপাশে ঘোরাফেরা করতেন। পরিস্থিতি বুঝে রাতের অন্ধকারে বাড়িতে ঢুকে পড়তেন। এ ঘটনায় রমেশ ও ভুরালিয়া নামের আরও দুজনকে খোঁজা হচ্ছে। তাঁরা পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি। এআই/প্রথম আলো

পাকিস্তান-আফগানিস্তান কী কারণে ‘যুদ্ধ’ করছে, এটা কি অনিবার্য ছিল

প্রকাশ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু দিন ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দেশটির অন্য কয়েকটি শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।

আজ শুক্রবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের ওপর ইসলামাবাদের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন থেকে ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থা’ নামবে।

এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ একটি বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, দুই দেশকে বিভক্তকারী ‘ডুরান্ড লাইন’ বরাবর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগানিস্তান ‘বড় আকারের সামরিক অভিযান’ চালাচ্ছে।

উভয় দেশের সীমান্তজুড়ে কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হলো। দুই পক্ষই দাবি করেছে, এই সংঘর্ষে এরই মধ্যে কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছেন।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের এই শত্রুতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আসলে কী ঘটেছে

আজ পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলেছেন, আফগান বাহিনী সীমান্তের কাছাকাছি সামরিক অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা শুরু করে। রাজধানী কাবুলসহ অন্যান্য শহরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

আল-জাজিরার সংবাদদাতা নাসের শাদিদ জানান, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে পাকিস্তান প্রথম হামলা চালায়। জবাবে আফগান বাহিনী বিমানবিধ্বংসী গোলাবর্ষণ করে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন আমাদের ও আপনাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলো।’

পাকিস্তান এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’।

আফগানিস্তানের কোথায় পাকিস্তান হামলা চালাল

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক্সে লিখেছেন, রাজধানী কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বের পাকতিয়া প্রদেশ এবং দক্ষিণের কান্দাহারে ‘আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থায়’ রয়েছে।

আফগান সরকারের মুখপাত্র মুজাহিদ এক্সের একটি পোস্টে এই তিন প্রদেশে হামলার খবর নিশ্চিত করেছেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, হামলায় আফগানিস্তানের দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পাকিস্তান টিভি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, তাদের বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তালেবানের বেশ কিছু অবস্থান ‘গুঁড়িয়ে’ দিয়েছে।

ওই সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আফগানিস্তানে আক্রান্ত স্থানগুলোর মধ্যে কান্দাহারের একটি তালেবান ব্রিগেড সদর দপ্তর ও গোলাবারুদ ডিপো রয়েছে। এ ছাড়া ওয়ালি খান সেক্টর, শাওয়াল সেক্টরের পার্শ্ববর্তী এলাকা, বাজাউর সেক্টর এবং আঙ্গুর আড্ডার তালেবান চৌকিতেও হামলা চালানো হয়েছে।

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বেশ কিছু জেলায়ও আফগান তালেবান বাহিনীকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। জেলাগুলো হলো চিত্রল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম এবং বাজাউর।

আজ বিকেলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ তোরখাম সীমান্ত পারাপারের কাছে গোলাবর্ষণ ও বন্দুকযুদ্ধের খবর পাওয়া গেছে।

ইসলামাবাদ থেকে আল-জাজিরার কামাল হায়দার এবং বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আজ সকালে সীমান্ত পারাপারের কাছে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। আফগান সেনারা সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।

গত অক্টোবর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে লড়াইয়ের কারণে স্থলসীমান্ত অনেকটা বন্ধ রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান থেকে বিপুলসংখ্যক আফগানিস্তানের নাগরিকের ফেরার জন্য তোরখাম ক্রসিংটি খোলা রাখা হয়েছে।

হতাহতের বিষয়ে যা জানা যাচ্ছে

উভয় পক্ষের দেওয়া হতাহতের তথ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি আজ ভোরে এক্সে লিখেছেন, সকালের হামলায় আফগান তালেবানের ১৩৩ সদস্য নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, তালেবানের ২৭টি চৌকি ধ্বংস এবং ৯টি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এ ছাড়া ৮০টির বেশি ‘ট্যাংক, কামান ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে’।

ডন জানিয়েছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চলমান ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ অভিযানে এখন পর্যন্ত ২৭৪ জন আফগান তালেবান সেনা ও ‘খারিজি’ জঙ্গি নিহত হয়েছেন। আজ ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন।

শরিফ চৌধুরী আরও বলেন, অভিযানে ৪ শতাধিক আফগান সেনা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় তালেবানদের ৭৩টি চৌকি ধ্বংস হয়েছে এবং ১৭টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী আফগান বাহিনীর অন্তত ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং কামানের গোলা (আর্টিলারি) ধ্বংস করা হয়েছে।

অন্যদিকে তালেবান সরকার জানিয়েছে, তাদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন।

আফগানিস্তান জানিয়েছে, গত রোববার আফগান সীমান্তের ভেতরে পাকিস্তানের হামলার প্রতিবাদে তারা শুক্রবার ভোরে সীমান্তজুড়ে পাকিস্তানি ঘাঁটি ও চৌকিতে পাল্টা হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, আফগান বাহিনী ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং দুটি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। পাকিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

গত রোববারের বিমান হামলার পর পাকিস্তান দাবি করেছিল, তারা অন্তত ৭০ জন ‘জঙ্গি’ হত্যা করেছে। তবে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ কয়েক ডজন মানুষ হতাহত হয়েছে।

নঙ্গরহার প্রদেশের আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রাদেশিক পরিচালক মৌলভি ফজল রহমান ফাইয়াজ জানান, রোববারের হামলায় ১৮ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বর্তমানে কোনো দাপ্তরিক পদে না থাকলেও তিনি এখনো বেশ প্রভাবশালী। তিনি বলেছেন, দেশবাসী ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা করবে এবং সাহসের সঙ্গে আগ্রাসনের জবাব দেবে’।

আজ শুক্রবার এক পোস্টে কারজাই আরও লিখেছেন, ‘পাকিস্তান নিজের তৈরি করা সহিংসতা ও বোমা হামলা থেকে মুক্তি পাবে না। তাদের উচিত নীতি পরিবর্তন করা এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ, সম্মান ও সভ্য সম্পর্কের পথ বেছে নেওয়া।’

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান কেন যুদ্ধ করছে

এই দুই দেশের মধ্যে বর্তমান এই সহিংসতার বিস্ফোরণ গত কয়েক মাসের উত্তেজনার চূড়ান্ত পরিণতি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্তে সপ্তাহব্যাপী ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তান তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই সীমান্ত ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত, যা ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ। আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের যুক্তি, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা, যা জাতিগত পশতুন এলাকাগুলোকে অন্যায়ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।

তালেবান ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতা দখলের পর থেকে প্রতিবেশী এই দুই দেশ ঘন ঘন সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সামি ওমারি আল-জাজিরাকে জানান, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

পাকিস্তান চায়, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করুক। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে। ২০০৭ সালে পাকিস্তানে টিটিপির উদ্ভব হয়। তারা আফগান তালেবান থেকে আলাদা। কিন্তু দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আদর্শিক, সামাজিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে টিটিপি এবং খনিজ সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশে সক্রিয় বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা বৃদ্ধি করেছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে তারা বেশি হামলা চালায়।

নিরপেক্ষ সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ড্য আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সম্ভবত ইচ্ছুক নয়। দুই গোষ্ঠীর পুরোনো সখ্যের পাশাপাশি টিটিপির যোদ্ধারা আফগানিস্তানে তালেবানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সে (আইএসকেপি) যোগ দিতে পারে—এমন একটি ভয় আফগান তালেবানের রয়েছে।’

পান্ড্য যোগ করেন, আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের সংঘাত ‘অপরিহার্য’।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড আল-জাজিরাকে বলেন, এই সংঘর্ষ অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। এটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েক মাসের ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ সম্পর্কের ফল।

থ্রেলকেল্ডের মতে, পাকিস্তানের এই ‘অধিকতর আক্রমণাত্মক ও জোরালো হামলা’ সম্ভবত তাদের কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা পাকিস্তানের ভেতরে বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলা হতে দেখেছি। তাই ক্রমাগত হামলার পর উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পরিস্থিতির এমন অবনতি হওয়া দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিস্ময়কর নয়।’

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

পবিত্র রমজান মাসে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারত। এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এই হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। এটি মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার পাকিস্তানের আরেকটি চেষ্টা।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, মহাসচিব উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে আলোচনা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের ভিত্তিতে মতভেদ দূর করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘পবিত্র রমজান মাস সংযম এবং মুসলিম বিশ্বের সংহতি বৃদ্ধির মাস। এই সময়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উচিত আলোচনার মাধ্যমে তাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান করা।’

রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, রাশিয়া উভয় পক্ষকে অবিলম্বে আন্তসীমান্ত হামলা বন্ধ এবং কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

পাকিস্তানের বিমান হামলার ওপর নজর রাখছেন তালেবানের এক নিরাপত্তাকর্মী। খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পাকিস্তানের বিমান হামলার ওপর নজর রাখছেন তালেবানের এক নিরাপত্তাকর্মী। খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

টিটিপি বা পাকিস্তান তালেবান কারা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের কেন্দ্রে কেন তারা

আফগানিস্তানের মূল তালেবান গোষ্ঠী ১৯৯৪ সালে দেশটি শাসন শুরু করে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন আগ্রাসনে তাদের পতন ঘটে। ক্ষমতা হারানোর পর তালেবান যোদ্ধারা পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় পালিয়ে যান। সেখানে ২০০৭ সালে বেশ কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী একটি জোট গঠন করে। তারা নিজেদের নাম দেয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। এটিই মূলত পাকিস্তান তালেবান হিসেবে পরিচিত।

টিটিপি পাকিস্তানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করতে চায়। এ উদ্দেশ্য হাসিলে টিটিপি সরাসরি সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে এবং রাজনীতিবিদদের হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

টিটিপি ও আফগানিস্তানের তালেবান আলাদা সংগঠন হলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা রয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরেছে আফগান তালেবান।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, সীমান্ত পেরিয়ে তাদের দেশে হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তান। তবে আফগান তালেবান শুরু থেকেই পাকিস্তানের এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আফগান বাহিনী পাকিস্তান সীমান্তে দেশটির সামরিক বাহিনীর অবস্থানে হামলা চালায়। এতে দুই সেনা নিহত হওয়ার খবর জানায় ইসলামাবাদ। এর পরপরই কাবুল, কান্দাহারসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায় পাকিস্তান।

এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিকা প্রদেশে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। এতে ১৩ বেসামরিক মানুষ নিহত হন বলে জানিয়েছিল আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মিশন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-27%2Fgdsq388n%2F00-4.jpg?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র হাতে একজন তালেবান যোদ্ধা। ফাইল ছবি: রয়টার্স