Tuesday, April 1, 2025

নির্বাচনের পর সংস্কার: নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের ব্যর্থতা কি ভুলে যাব by মকবুল আহমেদ

২০২৪-এর জুলাই গণ–অভ্যুত্থান এ অঞ্চলে একাত্তরের জনযুদ্ধের পর একটি অনন্যসাধারণ নতুন ঘটনা। বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের বা দলসমূহের নেতৃত্বে এ অভ্যুত্থান ঘটেনি, বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী এ অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন বটে, তবে তাঁরা জনগণের সঙ্গে মিলেমিশে, একাকার হয়ে।

অনেকে বলবেন, উনসত্তরের আইয়ুববিরোধী অভ্যুত্থান, বাংলাদেশে এরশাদবিরোধী অভ্যুত্থান কি হয়নি? তা হয়েছে বটে, কিন্তু তার নেতৃত্বে ছিল বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দল বা দলসমূহ। তাদের নেতৃত্বে সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন ব্যাপক পেশাজীবী ও সর্বস্তরের জনগণ।

বলাই বাহুল্য, পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একাত্তরের গণ-অভ্যুত্থান রূপ নিয়েছিল জনযুদ্ধে, যোগ দিয়েছিলেন কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে পূর্ববাংলার সব রাজনৈতিক দলের কর্মী, নানা পেশাজীবী ও ছাত্র–যুবক-সৈনিক এবং কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ।

সামরিক-স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনও শেষে অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল, কিন্তু সেই অভ্যুত্থান ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মতো একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানে রূপলাভ করতে পারিনি। তার আগেই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া দলগুলোর নেতৃত্ব অভ্যুত্থানের লাগাম টেনে ধরে এরশাদ নেতৃত্বের সঙ্গে আপসরফা করে তথাকথিত ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র নামে পুরোনো রাষ্ট্রকে রক্ষার তাগিদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তত্ত্ব হাজির করে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

সেই ঘটনাকে বিচার করে দেখলে বলা যায়, এরশাদশাহির ক্ষমতা ভোগকারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ ও বিদ্রোহ অবশেষে ক্ষমতাবহির্ভূত বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া (আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত ও ৫ দলীয় বামজোট) দলগুলোর নেতৃত্বের কাছে বৈঠকের মাধ্যমে আপসরফার ক্ষমতা হস্তান্তরে পরিণত হয়।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিরোধী সব দল তখন মাসের পর মাস বলে এসেছিল, এরশাদের শাসনাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সেই রাষ্ট্রের সংবিধান একটি কলুষিত জনবিরোধী সংবিধান।

অতএব তারা এরশাদের পতন চান। সেই চিন্তা থেকে তখনকার আন্দোলনকারী নেতৃত্ব সবাই ঐকমত্য হয়ে ‘তিন জোটের রূপরেখা’ নামের একটি রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন এবং তাতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে সব দল স্বাক্ষর করেছিল। এসব কথা নিয়ে তখনকার সংবাদপত্র বড়বড় হেডলাইন করেছিল, আমাদের মনে আছে।

এরশাদের পতন যখন আসন্ন, এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তাঁর সংবিধানের বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র পরিবর্তনের প্রচণ্ড ক্ষোভকে তখনকার আন্দোলনকারী নেতৃত্ব একজন শাসক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়ে গিয়ে অগণতান্ত্রিক স্লোগান তোলে ‘একদফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’ বলে।

এতে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার অগণতান্ত্রিক সংবিধানের বিরুদ্ধে জনগণের উত্থিত ক্ষোভকে একজন ব্যক্তি এরশাদের বিরুদ্ধে নিয়ে যেতে তখনকার আন্দোলনকারী নেতৃত্ব সফল হয়েছিলেন। অতএব নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আপসরফার ক্ষমতা হস্তান্তরের তথাকথিত ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিতা’র ক্ষমতা হাতবদলের অভ্যুত্থান আর ২০২৪–এর জুলাইয়ের জনগণের সার্বিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের মধ্যে মৌলিকভাবে পার্থক্য রয়েছে।

এরশাদবিরোধী অভ্যুত্থানের উপসংহার টানা হয়েছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ধুয়া তুলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করার প্রস্তাবে সবার সম্মতি জ্ঞাপনের মাধ্যমে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের ক্ষমতা গ্রহণ। উল্লিখিত সব কথা আমাদের জানা বিষয়, আলোচনার সুবিধার জন্য শুধু পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ামাত্র।

এরশাদের কাছ থেকে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র বদৌলতে প্রাপ্ত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি অক্ষত ও অপরিবর্তিত অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ পায়। সেদিন ১৯৯০ সালে গণতন্ত্র পাওয়া বলতে আন্দোলনকারী দলগুলোর নেতৃত্ব জনগণকে বোঝাতে চাইলেন, এমনকি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, শুধু একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাবে।

তখনই কেউ-কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, শুধু নির্বাচন, এমনকি শতভাগ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম হয় না, যত দিন না রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি গণতান্ত্রিক কনস্টিটিউশন গঠিত হয়। তাঁদের মতে, এরশাদের পতনের পর তখন প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য গণতান্ত্রিক কনস্টিটিউশন তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

কিন্তু তখন সেই দাবি প্রধান হয়ে ওঠেনি এবং তা গুরুত্বও পায়নি। কারণ, আন্দোলনের অবসান হয়েছিল ‘একদফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি’ নামের অগণতান্ত্রিক স্লোগানের মাধ্যমে এবং একটি আপসরফার ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র চুক্তির মাধ্যমে। এতেই সবার বিজয় হয়েছিল বলে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কর্মীরা এক ভ্রান্তির বিভ্রমে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ভ্রান্তির মোহমুক্তি ঘটতে বেশি দিন লাগেনি।

তত্ত্বাবধায়ক সকারের প্রধান সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বহুল আলোচিত নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে জনগণ দেখতে পেলেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মাধ্যমে প্রাপ্ত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার সংবিধানের ধারালো নখ-দন্ত এরশাদ আমলের মতোই সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং বিএনপি ‘তিন জোটের রূপরেখা’ নামের অঙ্গীকার করা রাষ্ট্র সংস্কারের চুক্তি বেমালুম ভুলে যেতে পারল এবং অস্বীকার করল। আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টের বিরোধী আসনে বসে অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করা ‘তিন জোটের রূপরেখা’ বিষয়ে কোনো রা শব্দ উচ্চারণ করল না।

এমনকি পরবর্তী মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তারাও বিএনপির পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাষ্ট্র সংস্কারের ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ভুলিয়ে দিতে পেরেছিল। জনগণ এ থেকে শিক্ষা নিতে পারে, কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন কিংবা নিরপেক্ষ নির্বাচনের বুর্জোয়া পার্লামেন্ট স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ দিতে পারে না।

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রসঙ্গে শুধু নির্বাচন ও পার্লামেন্টের দোহাই দেওয়া জনগণকে প্রতারণার শামিল। নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্র পরিচালনার অনুষঙ্গ বটে, কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের মাধ্যমেই স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ গেড়ে বসে। এরশাদ, হাসিনার একরোখা শাসন গেড়ে বসেছিল নির্বাচনের পথ ধরেই।

এ ছাড়া কোনো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার দায়িত্ব বা কাজ চার বা পাঁচ বছর মেয়াদের রাষ্ট্র পরিচালনার নিমিত্তে গঠিত পার্লামেন্টের নয়। নির্বাচিত পার্লামেন্টের কাজ রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন বা সংবিধান রূপান্তরের বা সংস্কারের নয়, তাদের কাজ রাষ্ট্রের বিদ্যমান কনস্টিটিউশনের আলোকে সরকার গঠন করে জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। রাষ্ট্রের সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের কাজ করতে পারে একমাত্র কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলি বা নির্বাচিত গণপরিষদ। সেই কথাই প্রধান হয়ে উঠেছে এবারের ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর।

উল্লেখ্য, ২০২৪ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ক্ষমতামুখী বা নির্বাচনবাদী কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। এ কথা অনায়াসে বিএনপি, জামায়াত স্বীকার করে নিয়েছে। এমনকি শুধু নির্বাচনের দাবিতেও এ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়নি। আমরা সবাই জানি, এ অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার আগে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে এবং পর্যায়ক্রমে এ আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-তরুণ-জনগণের সম্মিলিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে।

সমাজে ও রাষ্ট্রে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কথাটির গভীরতা ও তাৎপর্য ব্যাপক। এ বৈষম্যবিরোধী দাবির ভিত্তিতেই একাত্তরে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। গত ৫০ বছরে রাষ্ট্রের উদ্যোগে বৈষম্য সৃষ্টি এমন এক চরম আকার ধারণ করেছিল, যার প্রতিবাদে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে জনগণের সব পর্যায়ের মানুষকে আন্দোলনে শরিক হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অবশেষে তাতে যোগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রের সাধারণ সৈনিকেরাও। অতএব এ অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক নীতির অবসান, অথবা বলা যায়, রাষ্ট্রের মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা, কখনো শুধু নির্বাচন নয়। অতীতের কোনো নির্বাচন, শুধু নির্বাচন সমাজে ও রাষ্ট্রে বৈষম্য কমাতে সাহায্য করেনি, বরং বৈষম্য বেড়েছে।

অভ্যুত্থান–পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, অভ্যুত্থানকারীদের আকাঙ্ক্ষা ক্ষমতামুখী নির্বাচনবাদীদের মতো নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টে গিয়ে রাষ্ট্রের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়। অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল যথার্থভাবেই দাবি তুলেছে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের। তবে পার্লামেন্টে সরকার গঠনের নির্বাচন ও কনস্টিটিউশন রূপান্তরের নিমিত্তে গণপরিষদ নির্বাচন একই সঙ্গে হবে, নাকি আলাদাভাবে হবে, নাকি সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কনস্টিটিউশনের রূপরেখা প্রস্তুত করে গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে, তা নির্ভর করে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলসমূহের ঐকমত্যের ওপর।

যাঁরা তড়িঘড়ি করে নির্বাচন দিয়ে পার্লামেন্টে গিয়ে সরকার গঠন করে রাষ্ট্র সংস্কার করার দাবি তুলছেন, তাঁরা নেহাতই ভুলভাবে কথা বলছেন। তাঁদের দাবি দেশে দেশে চিরাচরিত নিয়মে কনস্টিটিউশন তৈরি বা রূপান্তরের নিয়মের সঙ্গে মেলে না। নির্বাচনের দোহাই দিয়ে পার্লামেন্টে গিয়ে সংবিধান সংশোধনের দাবি যাঁরা তুলছেন, তাঁদের সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়োজিত নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর পার্লামেন্টে বিএনপি-জামায়াতের প্রথম গঠিত সরকার কর্তৃক তিন জোটের রূপরেখার অঙ্গীকার ভঙ্গ করার ঘটনাকে মনে করে দেখতে অনুরোধ করব।

এ দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্ট গিয়ে জনগণের সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গের ইতিহাস তো কম নেই। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ নিকট অতীতের বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের সঙ্গে বেইমানি! অতএব জনগণ অবশ্যই ভেবে দেখবে, ন্যাড়া মাথা বেলতলায় কয়বার যাবে!

শুধু নির্বাচনপন্থী দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি অন্যতম, জামায়াতও সেই পথের পথিক। আরও অনেক বামপন্থী বলে পরিচিত রাজনৈতিক দল উচ্চ কণ্ঠে নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার। যদিও কোনো রাজনৈতিক দলকে বামপন্থী বলে আখ্যায়িত করলে তার চরিত্র কিছুই বোঝা যায় না। একমাত্র গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমেই কোনো ফ্যাসিবাদী কনস্টিটিউশনকে গণমুখী বা গণতান্ত্রিক কনস্টিটিউশনে রূপান্তর করা যায়—এ কথা নির্বাচনের দাবিদার দলগুলো জেনেশুনেই এখনই নির্বাচনের দাবি তুলছে।

তাদের দাবি, নির্বাচিত পার্লামেন্টই রাষ্ট্র সংস্কার করবে। কিন্তু তারা প্রকাশ্যভাবে বলার নৈতিক সাহস হারিয়েছে যে সাবেক বা বর্তমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ও তার সংবিধান তারা রক্ষা করতে চায়! জনগণকে খুশি করার জন্য তাদেরও বলতে হচ্ছে, তারাও রাষ্ট্র সংস্কার চায়। পক্ষান্তরে ‘এখনই নির্বাচন দাও’ কথার অন্তর্নিহিত মর্ম হচ্ছে পুরোনো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ও তার সংবিধানকে রক্ষা করা এবং ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচারকে ভূলুণ্ঠিত করা। বলাই বাহুল্য, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নিহিত রয়েছে স্বয়ং বাহাত্তরের সংবিধানেই। অতএব গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংবিধানসভা একমাত্র পুরোনো ফ্যাসিবাদী সংবিধানের খোলনলচে বদলে নতুন গণতান্ত্রিক কনস্টিটিউশনের রূপদান করতে পারে।

অতীতে যাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন শুধু নির্বাচনের দাবিতে যুগব্যাপী আন্দোলন করেছিলেন, তাঁরা ফ্যাসিবাদী একরোখা সরকারের নটবল্টু ঢিলা করতে পারেননি। কারণ, ব্যাপক জনগণ তাতে সাড়া দেয়নি। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনের দাবিটি ছিল শুধু ৩০০ জন কোটিপতির পার্লামেন্টের ভোটে দাঁড়িয়ে নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে গিয়ে গদি দখলের রাজনৈতিক দাবি।

এটা দৈনন্দিন জীবনে বৈষম্যের হাহাকারে দিনাতিপাত করা নানা পেশাজীবী ও কৃষক-মজুর-শ্রমিকের বা কোনো মধ্যবিত্তের দাবি ছিল না। অতএব সেই আন্দোলন ব্যর্থ না হয়ে যায়নি। সাধারণ মানুষের ব্যর্থ দিনযাপনের অবসানের দাবি ছাড়া কোনো আন্দোলন সফল হতে পারে না। এই সাধারণ সত্য আড়াল করার জন্যই অনেকে ২৪ জুলাইয়ের সফল অভ্যুত্থানের পেছনে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করেছে।

এখন যে বিতর্ক দৃশ্যমান হচ্ছে, ফ্যাসিবাদী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে জনগণের অংশগ্রহণে একটি সফল অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর একটি গণতান্ত্রিক কনস্টিটিউশন হাজির করার দায়িত্ব কার—সরকার গঠন করার জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের, নাকি গণতান্ত্রিক কনস্টিটিউশন তৈরির জন্য নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যদের বা সংবিধানসভার? ইতিহাস বলে, অবশ্যই এ কাজ করতে পারে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সংবিধানসভা।

একটি গণতান্ত্রিক কনস্টিটিউশন তৈরির প্রক্রিয়া সেই পথেই হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পর্যায়ে কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলি বা সংবিধানসভার ধারণা অনেকটা অনালোচিত বলা যায়।

এ ধারণার বিতর্কটি শুধু ২৪ জুলাই অভ্যুত্থানের পর উঠেছে বলে এখনো জনগণের কাছে, এমনকি রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও ধারণাটির অস্পষ্টতা কাটেনি। যতই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনা জনগণের সামনে হাজির করবে, ততই গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার বিকাশ ঘটবে বলে আশা করি।

* মকবুল আহমেদ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সাবেক অধ্যক্ষ। সাবেক সদস্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)।

ই-মেইল: moqbul.coast@gmail.com

ফিলিস্তিনিরা হামাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন? by মোতাসেম আ দল্লউল

এ সপ্তাহের শুরুর দিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার সড়কে কয়েক শ ফিলিস্তিনি নেমে এসে ইসরায়েলি বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তাঁরা অবরুদ্ধ গাজা থেকে হামাসের নিয়ন্ত্রণ অবসানের দাবি জানান। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া বৃহত্তম একটা প্রতিবাদ, যেখানে ৫০০ জন বিক্ষোভকারী অংশ নেন।

কিছুসংখ্যক মানুষ হামাস ও ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। বক্তাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমরা বেইত লাহিয়ার মানুষেরা শান্তির পক্ষে। আমরা শান্তি ভালোবাসি এবং আমরা চাই এই যুদ্ধের অবসান হোক।’

ইসরায়েলি, ইসরায়েলপন্থী মিডিয়া এবং ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা ফিলিস্তিনিদের এই প্রতিবাদকে ব্যবহার করে। এটিকে ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনকে, বিশেষ করে হামাসকে, আক্রমণ করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।  

এমনকি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ এই বিক্ষোভে উল্লাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে বর্ণবাদী রাষ্ট্র হামাসকে পরাজিত করার প্রচেষ্টায় তাদেরকে বাজি ধরছে।

পাঁচ মাস আগে ইসরায়েলে একজন সাংবাদিক বলেছিলেন, ইসরায়েলি লোকেরা তাঁদের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধ নিয়ে বিরক্ত এবং সে কারণে তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন এবং যুদ্ধ শেষ করার দাবি জানাচ্ছেন। এরপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘গাজার লোকেরা কবে হামাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন?’ তিনি আমাকে বলেছিলেন, ইসরায়েলি নেতারা সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছেন।

প্রকৃতপক্ষে, গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা চলছে। ইসরায়েলি নেতারা ও তাঁদের মিত্ররা অবরুদ্ধ ছিটমহলে ইসরায়েলি সেনারা যেসব যুদ্ধাপরাধ করে চলেছেন, তার জন্য হামাস এবং ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনকে দায়ী করে চলেছেন। গাজাকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার তাঁদের পূর্বপরিকল্পনায় ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য তাঁরা এটা সাজিয়েছেন।

একজন ফিলিস্তিনি, আরেকজন ফিলিস্তিনি—ইসরায়েল কখনো এভাবে ভাগ করে না। তারা সব ফিলিস্তিনিকে শত্রু বলে মনে করে এবং সবাইকে নির্মূল করা উচিত বলে মনে করে। কারণ হলো, তাঁদের জোর করে নিজেদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করার পরও, তাঁদের জমি চুরি করার পরও এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর পরও তাঁরা প্রতিরোধ ছেড়ে দেননি।

একটা বড় অংশের লোকেদের স্মৃতিশক্তি খুবই স্বল্পমেয়াদি। তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধ ইসরায়েলি নৃশংসতাগুলো এবং ইসরায়েলি নেতাদের অপমানজনক মন্তবগুলো এবং মিথ্যা দাবিগুলো মনে রাখতে অক্ষম। অতএব তাঁরা সেই ইসরায়েলি নেতাকে জানতে আগ্রহী না–ও হতে পারেন, যিনি বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সেরা বন্ধু হলো সেই ফিলিস্তিনি, যিনি মারা গেছেন।’

গণহত্যা শুরুর পর একটি টেলিভিশন ভাষণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইহুদি বাইবেল থেকে ধার নিয়ে ফিলিস্তিনিদের ‘আমালেক’ বলেছিলেন। এটি ইঙ্গিত করে যে সেখানে একটি আদেশ ছিল, যা নির্ধারণ করে যে ফিলিস্তিনিদের অবশ্যই ইহুদিদের দ্বারা ধ্বংস করতে হবে।

নেতানিয়াহুর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত ফিলিস্তিনিদের ‘নরপশু’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। এর মাধ্যমে গাজায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার যৌক্তিকতা দিতে চেয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি দখলকৃত জায়গায় এ সবকিছুর সরবরাহ অবশ্যই জনগণকে বিনা মূল্যে দিতে হবে।

এরপর নেসেটের (ইসরায়েলের আইনসভা) উপ–স্পিকার নিসিম ভাতুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ইসরায়েলের একটি সাধারণ লক্ষ্য হচ্ছে, ‘গাজাকে দুনিয়ার মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা।’ গাজার এতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী আমিচায় ইলিয়াহু গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গাজায় একজনও বেসামরিক নাগরিক নেই।

গাজার বাসিন্দাদের জোর করে উচ্ছেদ করে দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইসরায়েলের যোগাযোগমন্ত্রী শোহলো কারহি ফিলিস্তিনিদের দ্রুত বের করে দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিলে ফিলিস্তিনিরা মিসরে যেতে বাধ্য হবেন।

ইসরায়েলি নেতাদের কাছে ফিলিস্তিনি মানেই শত্রু। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা করছেন। কোনো প্রতিরোধযোদ্ধা নেই, সেটা জানার পরও তাঁরা সেই সব এলাকাকে টার্গেট করছেন।

বিক্ষোভকারীরা শান্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা হয়তো ভুলে গেছেন যে ১৯৯৩ সাল থেকে আমাদের শান্তিতে বাস করা উচিত ছিল। কেননা, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন ফাতাহকে নিরস্ত্রীকরণের মধ্য দিয়ে ১৯৯৩ সালে পিএলও ওসলো শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আমাদের তাতে কী হয়েছে? তারা আমাদের খুন করা অব্যাহত রেখেছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রমাণ করতে হবে না যে তারা শান্তিপূর্ণ লোক। সেটা প্রমাণ করতে হবে ইসরায়েলিদের। যা–ই হোক, বিশ্বের ভণ্ড পরাশক্তি ও আরব নেতারা যতক্ষণ ইসরায়েলকে সমর্থন করে যাবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটা হবে না।

ফিলিস্তিনিরা যদি তাঁদের অস্ত্র ত্যাগ করেন এবং বৈধ প্রতিরোধ বন্ধ করেন, তাহলে সেটা হবে না। প্রতিরোধ আমাদের মর্যাদা, প্রতিরোধ আমাদের সম্মান। আমাদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের একমাত্র রাস্তা প্রতিরোধ।

* মোতাসেম আ দল্লউল গাজার মিডল ইস্ট মনিটরের সংবাদদাতা
* মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া বৃহত্তম একটা প্রতিবাদ, যেখানে ৫০০ জন বিক্ষোভকারী অংশ নেন।
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া বৃহত্তম একটা প্রতিবাদ, যেখানে ৫০০ জন বিক্ষোভকারী অংশ নেন। ছবি : রয়টার্স

মরুভূমির মাঝে তাঁবুতে একরাত by পরিতোষ পাল

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম, মরুভূমির মাঝে একরাত তাঁবুতে কাটালে কেমন হয়? কেমন রোমাঞ্চ হবে সেই রাত কাটানোয়? অভিজ্ঞতার সেই মায়াময় দিনগুলো কি কোনোদিন ভোলা যাবে? ভাবতে ভাবতেই ঠিক করে ফেললাম। ভারতের একমাত্র মরুভূমি হলো থর মরুভূমি। সেখানকার জয়সলমিরে ডেজার্ট ক্যাম্পের তাঁবুতে একরাত কাটাবো। সঙ্গে বালিয়াড়িতে জিপের দুরন্ত গতিতে ছুটে যাওয়া এবং মন্থর গতিতে চলা উট সফারির দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবো। 

বিশ্বের সবচেয়ে জনসংখ্যাবহুল মরুভূমি হচ্ছে থর মরুভূমি। প্রতি কিলোমিটারে ৮৩ জন মানুষের বসবাস। হিন্দু, জৈন, শিখ ও মুসলিমরাই এখানকার বাসিন্দাদের অন্যতম। রাজস্থানের ৪০ শতাংশ জনসংখ্যার বাস মরুভূমিতেই।  থর মরুভূমি ভারত ও পাকিস্তানে বিস্তৃত হলেও ভারতেই এই মরুভূমির ৮০ শতাংশের অবস্থান। আর এই মরুভূমির ৬০ শতাংশই রয়েছে রাজস্থানে। পাশাপাশি পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কিছু অংশ এবং গুজরাটের কচ্ছের উপকূল বরাবর অঞ্চলে বিস্তৃত এই মরুভূমি।
সময়টা ছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। আমি, আমার সহধর্মিণী ও আমার ৮২ বছরের উৎসাহী শ্যালিকাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাজস্থান সফরের উদ্দেশ্যে। সকলের মধ্যেই চরম উত্তেজনা। বিশেষ করে মরুভূমিতে আমাদের দিন-রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতা কেমন হবে তাই নিয়েই যত আলোচনা।

অসাধারণ স্থাপত্য সমৃদ্ধ প্রাসাদ, হাভেলি আর দুর্গের রাজ্য হলো রাজস্থান। রয়েছে অনেক মনোরম হ্রদ। শৌর্য আর বীর্যের ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। মীরাবাঈয়ের ভজন যেমন এর আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়, তেমনি রাণাদের অস্ত্রের ঝনঝনানি এর ইতিহাসকে করেছে রক্তাক্ত। আবার এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জহরব্রতের ইতিহাস। বহু হানাহানি আর রক্তপাতের সাক্ষী এই রাজস্থান।
রাজপুতানাদের বাসস্থান থেকেই নাম হয়েছে রাজস্থান। কথিত রয়েছে রাজপুতরা আবু পাহাড়ে দেবতাদের হোমাগ্নি থেকে জাত। আবার এমনও বলা হয় ভারতে আসা হূণদের উত্তরপুরুষ এরা। কারও মতে, আরয বংশীয়  তথা সূরয ও চন্দ্রের বংশোদ্ভূত এরা।  স্বাধীনতার পর রাজপুতানা নামে পরিচিত রাজপুত শাসিত দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতে যোগ দেয়। এই রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে ১৯৪৯ সালের ৩০শে মার্চ রাজস্থান রাজ্যটি গঠিত হয়। আরাবল্লী পর্বতমালা ও মরুভূমির যুগলবন্দি রাজস্থানকে করেছে অনবদ্য। আর জয়সলমির ব্যারিকেড গড়েছে গ্রেট গ্লোবাল ডেজার্ট বেল্টের বিস্তীর্ণ মরুভূমিকে।

রাজস্থান সফরের মাঝপথেই হাজির হয়েছিলাম জয়সলমিরে। এই জয়সলমিরেই রয়েছে সোনার কেল্লা। বিশ্বের জীবন্ত কেল্লাগুলোর অন্যতম এই হলুদ বেলেপাথরে তৈরি কেল্লা। এই কেল্লাতে রয়েছে তিন চার হাজার মানুষের বাস। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লা ছবি করেছিলেন এই কেল্লাকে ঘিরে। তারপর থেকেই এই কেল্লার নাম মুখে মুখে ছড়িয়েছে সোনার কেল্লা হিসেবে। স্থানীয় গাইড হরিপ্রসাদ বলছিলেন, আগে এই কেল্লায় খুব বেশি পর্যটকের সমাগম হতো না। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা ছবির বদৌলতে এখন এই কেল্লায় পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। 

অতীতের ভাটি রাজপুতদের রাজধানী ছিল এই জয়সলমির। একসময় দেয়াল ঘেরা ছিল এই শহর। এখন আর সেই দেয়ালের চিহ্ন নেই। জয়সলমিরের সব মন্দির, প্রাসাদ, দুর্গ সবই মধুরঙা হলুদ বেলেপাথরে তৈরি। জয়সলমিরের চারপাশে রয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ বালুকারাশি। সূর্যের আলোতে তা সোনালী রূপ ধারণ করে। সূর্যাস্তে সোনারঙ আর সূর্যাস্তের ঠিক আগে হলুদ রঙা বালিয়াড়ি গোলাপি রূপে মায়াময় হয়ে ওঠে।

জয়সলমির থেকে পশ্চিমে প্রায় ৪০ কিলোমিটার গেলেই সাম স্যান্ড ডিউনস। ৩ কিলোমিটার ব্যাপ্ত টিলা টিলা আকারে দিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়ি। সেই বালিয়াড়ির একপাশে তৈরি হয়েছে অনেক ডেজার্ট ক্যাম্প। এমনই একটি ক্যাম্পে আমরা উঠেছিলাম।
সুন্দর এক আপ্যায়ন পেলাম। ক্যাম্পের প্রবেশপথে। কুমকুম, আবীর আর চন্দনের ফোঁটা দিয়ে হাতে কিছু ফুলের পাপড়ি দিয়ে আমাদের প্রদীপের আলোয় লিটারারি বরণ করে নেয়া হলো। এর সঙ্গেই দেয়া হলো শরবত। এই আন্তরিক আহ্বানে আমরা আপ্লুত, ধূ-ধূ মরুভূমিতে এটা আমাদের প্রত্যাশার মধ্যেও ছিল না। আধুনিক পর্যটন যে কোথায় পৌঁছে গিয়েছে এসবই তার নমুনা। ক্যাম্পের মধ্যে তিনদিক ঘিরে রয়েছে একাধিক তাঁবু। অবশ্য পাথরের তৈরি উঁচু ভিতের উপর তৈরি এই সব তাঁবু। আধুনিক সব রকম ব্যবস্থাই রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো তাঁবুতে রয়েছে শীতাতপ যন্ত্রেরও ব্যবস্থা। পরিপাটি করে সাজানো খাটের উপর সুসজ্জিত বিছানা। তাঁবুর ভেতরে অন্দরসজ্জায় রয়েছে রাজস্থানি সংস্কৃতির ছাপ।  আমরা এমনি একটি তাঁবুতে মালপত্র রেখে জিপে করে মরুভূমির আরও কিছুটা ভেতরে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলাম। বেলা দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে। সামনেই অপেক্ষা করছে হুড খোলা জিপ। আমরা তিনজন ছাড়াও আরেকটি পরিবারের দুজন আমাদের সঙ্গী হলেন। বালিয়াড়ি দিয়ে জিপ দুরন্তগতিতে ছুটে চলেছে। আমরা রীতিমতো রোমাঞ্চিত। ঢেউয়ের পর ঢেউ পেরিয়ে আমরা চলেছি বালিয়াড়ি দিয়ে। জিপের মধ্যে আমাদের টালমাটাল অবস্থা। মনে হচ্ছে আমরা চলেছি কোনো অ্যাডভেঞ্চারে। এইভাবে প্রায় ৯-১০ কিলোমিটার যাবার পর জিপ থামলো এক জায়গায়। সেখানে রয়েছে মরুবাহন উটের দল। সুন্দরভাবে সাজানো অনেক উট। পর্যটকদের জন্যই তাদের অপেক্ষা। এই মরুবাহনের পিঠের উপরে বসে এবার আমাদের উট সফারি শুরু হবে। প্রতিটি উটের পিঠে দুইজনের বসার জায়গা। উটগুলোকে নিয়ে যাবার জন্য রয়েছে উটের মালিক কিংবা তাদের পরিবারের লোকজন। বেশ কিছু নাবালকও রয়েছে তাদের মধ্যে। তারাই দড়ি ধরে পর্যটক সহ উটগুলোকে নিয়ে চলেছে বালিয়াড়ির এদিক সেদিক। আমরা এবার উঠবো একটি বেশ বড় মাপের উটের পিঠে। কিন্তু এখানে উটের পিঠে ওঠার জন্য কোনো মইয়ের ব্যবস্থা নেই। উটগুলো মালিক বা পরিচালকের নির্দেশ পেয়ে নিচে হামাগুড়ির মতো বসে পড়ে। আমরা গিয়ে উঠে বসি। সামনে যে বসছে তার ধরার জন্য কুজের কাছে ছোট্ট একটি লোহার দণ্ড আড়াআড়িভাবে দেয়া। আর পেছনের জনের ভরসা সামনের সঙ্গী। কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো উটের ঝাঁকুনি দিয়ে সামনের পায়ে ভর দিয়ে খাঁড়া হয়ে দাঁড়ানো। সেই সময় শক্ত করে ধরে বসে থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। যাক কোনো অঘটন না ঘটিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে উটের পিঠে অভিনব সফারিতে বেরোলাম। আমাদের পেছন  পেছন চলছিল লাইন ধরে আরও অনেক উট। সকলেরই পিঠে পর্যটক। তবে মজার ঘটনা হলো, আমাদের পেছনের উটের সঙ্গে কোনো পরিচালনা করার মতো লোক ছিল না। আমাদের উটের পরিচালক সেই উঠটির দড়িটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, আপনি ধরে বসে থাকুন। কিচ্ছু হবে না। এবার আমিই হলাম পেছনের উটের পরিচালক। চরাই উতরাই পেরিয়ে  দুলতে দুলতে চলেছি। প্রায় এক কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর আমরা ফিরে আসি। সত্যিই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছে এই উট সফারিতে। তাও খোদ মরুভূমির বুকে। চারদিকে  শুধুই ধু ধু বালিরাশি। কোনো ওয়েসিসের দেখা পাইনি ঠিকই তবে ঢেউয়ের মতো চরাই-উতরাই ডিঙিয়েছি ছন্দে ছন্দে।

আমরা উট সফারি শেষ করে নির্ধারিত জায়গায় ফিরে এলেও দেখি আমাদের সঙ্গী ৮২ বছরের বৃদ্ধার কোনো খোঁজ নেই। মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেল নাকি? দূরের উটের সারির দিকে তাকিয়ে দেখি একটি ছোটখাটো উটের পিঠে বসে তিনি, একাই। দুলকি চালে হাত নাড়তে নাড়তে ফিরে এলেন। আমাদেরও ধড়ে প্রাণ এলো।

ততক্ষণে সন্ধ্যা প্রায় নামতে চলেছে। পশ্চিম দিকে কাঁটাগাছের ঝোপের ফাঁক দিয়ে সূর্যাস্তের সে এক মোহনীয় দৃশ্য। চারদিকে রঙ বদল হচ্ছে। সোনালি হলুদ বালুকারাশি গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছে। অনেক উট বাড়ির পথ ধরেছে। একজন উটের মালিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তার নাম ইসমাইল। জানালেন তার রয়েছে প্রায় পঞ্চাশটির বেশি উট। পর্যটনই তার প্রধান ব্যবসা।
এদিকে আকাশে নীড়ে ফেরা বিহঙ্গদের সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি ড্রোন। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেল, পাকিস্তান সীমান্ত খুব কাছেই। তাই বিএসএফের নজরদারি চলছে এই সব ড্রোনের মাধ্যমে।

এবার আবার সেই বিপজ্জনকভাবে টালমাটাল খেতে খেতে বালিয়াড়ির  ঢেউয়ের  পর ঢেউ ডিঙিয়ে জিপে করে ফিরে এলাম ক্যাম্পে। সামান্য ফ্রেশ হয়ে চলে আসি ক্যাম্পের প্রবেশ পথের কাছে বিরাট উঠোনে। সেখানে সাজানো বর্ণময় মঞ্চে অপেক্ষায় লোকসংস্কৃতির আসরের কুশিলবরা। চারদিকে গ্যালারির মতো চেয়ারে বসার জায়গা। সন্ধ্যা নেমে এলেও অন্ধকার নেমে আসেনি। আসলে কয়েকদিন পরেই ছিল পূর্ণিমা। তাই আকাশ পরিষ্কার। ঠান্ডা বাতাসের আমেজ। বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কারে জেগে উঠলো বর্ণময় নর্তকির দল। শুরু হলো রাজস্থানী লোকসংগীতের সঙ্গে নানা মুদ্রায় নৃত্য। শুরুতেই প্রত্যক্ষ করলাম, বলা ভালো অনুভব করলাম, এক অসাধারণ শৈলি। কি নেই তাতে। নাচ, অভিনয়, জিমন্যাস্টিক্সের এমন সম্মিলন আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছিল। দু’চোখ ভরে দেখেছি রূপকথার মায়াজাল। এক কথায় আমরা খোলা আকাশের নিচে এক মনোরম পরিবেশে বসে রাজস্থানী সংস্কৃতির রূপ-রস-গন্ধ আমাদের মাতিয়ে রেখেছিল  কয়েক ঘণ্টা। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল আগুনের খেলা দিয়ে। অসাধারণ স্কিলের নৈপুণ্য ভোলার নয়। অনুষ্ঠানের  মাঝে আসছিল পকোড়া ও চা-কফি। এই দুইয়ের আমেজে আমরাও ততক্ষণে মাতোয়ারা। চারদিকের নিস্তব্ধতার মাঝে বানজারা ধুন মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

এরপর রাতের খাবার খেয়ে পুলকিত মনে শুতে গিয়েছিলাম। আমরা শহুরে মানুষ এমন নিস্তব্ধতায় অভ্যস্ত নই। এক অদ্ভুত নৈঃশব্দের মাঝে তাঁবুতে আমরা তিন জন। তবে খানিকটা সময় যেতেই সব আবেগ, তন্ময়তা একেবারে উধাও। আতঙ্কে নয়, মরুভূমির কনকনে ঠান্ডায় আমাদের তখন কাহিল অবস্থা। সমস্ত কাঁথা-কম্বল জড়ো করেও শীতকে আড়াল করা যাচ্ছে না। একরকম ঠকঠক করে কাঁপুনির মধ্যদিয়ে রাত কাটালাম।
মরুভূমির ঠান্ডা গায়ে মেখে গিয়ে হাজির হলাম রাজস্থানের একমাত্র শৈল শহর আবু পাহাড়ে। আরাবল্লী পর্বতমালার দক্ষিণে ১২১৯ মিটার উচ্চতায় এই আবু পাহাড়। গ্রানাইট পাথর আর সবুজ বনানী হাত ধরাধরি করে হাজির। মধ্যযুগীয় মন্দির ভাস্কর্য এই আবুর অন্যতম আকর্ষণ। আবু পৌঁছেই গেলাম এখানকার বিস্ময় ভাস্কর্যের রূপ দর্শনে। দিলওয়ারা জৈন মন্দির এবং একলিংজি মন্দিরের মতো আকর্ষণীয়  জৈন ও হিন্দু মন্দির রয়েছে এই আবুতে। গাছে ছাওয়া দিলওয়ারা মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে আদিনাথ, নেমিনাথ, মহাবীর, ঋষভদেব ও পারশ্বনাথের মন্দির। প্রথম জৈন তীরথঙ্কর আদিনাথের মন্দির বিমল বাসাহি তৈরি হয়েছিল ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে। গুজরাটের প্রথম সোলাঙ্কি রাজা ভীম দেবের মন্ত্রী বিমল শাহ এটি তৈরি করেছিলেন। ১৫০০ শিল্পী আর ১২০০ শ্রমিকের মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে  ১৪ বছরে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির। খরচ হয়েছিল ১৮ কোটি  ৫৩ লাখ টাকা। সোলাঙ্কি স্থাপত্য  শৈলিতে  সম্পূর্ণ শ্বেত পাথরে তৈরি এই মন্দিরে প্রবেশ করেই থমকে গিয়েছিলাম। কি অপূর্র সৃষ্টি। যেদিকে তাকাই সেদিকেই বিস্ময়কর কারুকাজের উপস্থিতি। শিল্পীদের দক্ষতা আর নিপুণ খোদাই করে গড়ে তোলা প্রতিটি ভাস্কর্য দেখতে দেখতে বারে বারে স্যালুট জানিয়েছি মনে মনে। ৪৮টি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভের উপর অষ্টভূজাকার গম্বুজ। যূথবদ্ধ হাতির দল। অনন্য কারভিংয়ের কাজ।  রয়েছে ৫২টি দেব কুঠরি। প্রতিটিতেই অলঙ্করণ ও ভাস্কর্য চুম্বকের মতো আকর্ষণে দাঁড় করিয়েছে বারে বারে। অলিন্দের ভাস্কর্য বা সিলিংয়ের কারুকার্য মোহিত করে রেখেছিল। এ এক মর্মরের কাব্য কথা। বারে বারে একটি কথাই ভাবছিলাম, ভাস্কর্যের এই মর্মর রূপ দান কি সম্ভব মানুষের পক্ষে। কিন্তু হাজার বছর আগের শিল্পীরা সেই দক্ষতার নজির রেখে গিয়েছেন সারা বিশ্বের কাছে। আর তাই ভারত সহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন এই মর্মর মন্দির স্থাপত্যকে দেখার পাশাপাশি অনুধাবন করতে।
দিলওয়ারা ছাড়াও আরাবল্লীর সর্বোচ্চ শিখরে ১৭৭২ মিটার উচ্চতায় রয়েছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের মন্দির। আবুতে ছড়িয়ে রয়েছে আরও অনেক মন্দির।

এবার আমাদের গন্তব্য নক্কি লেক। শহরের প্রাণকেন্দ্রে চারপাশ পাহাড় ঘেরা এই কৃত্রিম লেক। নক্কি লেক থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। পাহাড়ের গাছের ফাঁক দিয়ে লাল সূর্য আস্তে আস্তে দিগন্ত রেখায় বিলীন হচ্ছে। জলে তার প্রতিফলন অন্য এক রূপ নিয়েছে। প্রবাদ আছে রাক্ষসদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতারা ব্রহ্মার পরামর্শে দেবলোক ছেড়ে আবু পাহাড়ে আসেন যজ্ঞ করতে। আর যজ্ঞের জলের জন্য দেবতারা নখ দিয়ে খনন করেছিলেন এই লেক। সেই থেকেই এর নাম নক্কি লেক। লেক দেখে এসে আমাদের তাড়াতাড়িই আশ্রয়স্থলে ঢুকে পড়তে হয়েছিল। তাপমাত্রা ততক্ষণে নেমে এসেছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হাড় হিম করা কাঁপুনি দিয়ে ঠাণ্ডা যাকে বলে। সেই ঠাণ্ডায় কোনোরকমে রাত কাটিয়ে পরের দিন চলছিলাম রাজস্থানের অন্য শহরগুলোর উদ্দেশ্যে।
রাজস্থানের শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম যোধপুর, বিকানীর, জয়পুর, চিতোর, জয়সলমির, উদয়পুর ও আজমীর। রাজস্থানীদের পোশাকের মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্য। ছেলেরা পরেন ধুতির সঙ্গে বোতামহীন ফতুয়ার মতো ফুলহাতা জামা আর মাথায় থাকে ১৬ মিটার কাপড়ের তৈরি পাগড়ি। মেয়েরা পরেন ঘাঘরা, কাঁচুলি আর ওড়না। চোখে সুরমা, গায়ে মেহেন্দি, নাকে নোলক, কানে ঝুমকো, গলায় হাঁসুলি ও পায়ে মল।
রাজস্থানের তিনটি শহরকে রঙিন শহর বলা হয়। একটি হলো সোনালী শহর জয়সলমির, দ্বিতীয়টি রাজধানী জয়পুর, গোলাপি শহর নামেই পরিচিত। অন্যটি নীল শহর বলে পরিচিত যোধপুর। এই শহরের পুরনো অংশের সব বাড়িঘর নীল রঙে রঙিন। শহরের ব্রাহ্মণরা নিজেদের আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করতে তাদের বাড়িঘরে নীল রঙ করিয়েছিলেন। সেই ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে। মার্বেল স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নির্দশন রয়েছে এই শহরে।
জয়পুরের সমস্ত প্রাসাদ ও বাড়িঘর গোলাপি রঙে রাঙানো। ১৮৭৬ সালের রানী ভিক্টোরিয়ার সফর উপলক্ষে মহারাজা রাম সিং আতিথেয়তার রঙ হিসেবে গোটা শহরের সব প্রাসাদ ও বাড়িঘর পোলাপি রঙে রাঙিয়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই একই পরম্পরায় সব বাড়িঘর গোলাপি। গোটা শহরটি ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র মেনে তৈরি করেছিলেন রাজা দ্বিতীয় জয় সিংহ। জয়পুরে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত হাওয়া মহল, আমের দুর্গ, চোখি ধানি, সিটি প্যালেস, অ্যালবার্ট হল মিউজিয়াম, মশলা চক এবং আরও অনেক কিছু।
উদয়পুরকে বলা হয় দ্য সিটি অব সানরাইজ। অনেকে বলেন, এটি প্রাচ্যের ভেনিস বা হ্রদের শহর। মনোরম হ্রদ, মর্মর প্রাসাদ, কারুকার্যময় হাভেলি ও মন্দির নিয়ে এই উদয়পুর। এটি মেবার রাজ্যের রাজধানী ছিল। তাই এটিকে মেবারের রত্নও বলা হয়।       
রাজস্থানের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং দর্শনীয়  দুর্গগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চিত্তোরগড়, মেহরানগড়, জয়সলমির, জয়গড় এবং জুনাগড় দুর্গ। এর মধ্যে যোধপুরের মেহরানগড় দুর্গটি ৫ কিলোমিটার  বিস্তৃত এবং প্রায় ১২৫ মিটার উঁচু একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে। চিত্তোরগড় দুর্গটি এশিয়ার বৃহত্তম দুর্গ। এটি ৭০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১৩ কিলোমিটার। চমৎকার স্থাপত্যের ছাপ সর্বত্র।
রাজস্থানের প্রতিটি শহরে এখনো রয়েছে রাজকীয় ঐশ্বর্যের নানা নিদর্শন। প্রাসাদ আর হাভেলির অসাধারণ স্থাপত্যের পাশাপাশি রাজস্থানী শিল্প ও সংস্কৃতির নানা ঐতিহ্য।

আমাদের সফরে অন্তর্ভুক্ত ছিল আজমিরও। আজমিরের খাজা মইনুদ্দিন চিশতির দরগাহ হল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সুফিবাদের মিলনস্থল। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি হিন্দু দর্শনাথীও আজমিরের এই দরগাহে হাজির হন মনস্কামনা পূরণের জন্য। নারীদের প্রবেশ যেহেতু অবাধ তাই আমার সঙ্গীরা চাদর চড়াতে গিয়েছিলেন। আমাদের মতো বহু মানুষ এসেছিলেন দরগাহে। তাদের মধ্যে একটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে আলাপ হলো। তারা কয়েক বছর পরপর দরগাহে আসেন।
এবার রাজস্থান সফর শেষ করি এক অভিনব মন্দিরের সন্ধানে। বিকানির থেকে প্রায় ৩১ কিলোমিটার দূরে দেশনোকে রয়েছে এই কার্নি মাতা মন্দির। এটি ইঁদুরের মন্দির নামে পরিচিত। কয়েক হাজার ইঁদুরের বাস এই মন্দিরে। কাবা নামে পরিচিত এই ইঁদুরদের পবিত্র বলে মনে করা হয়। আমরা যখন মন্দিরে পৌঁছেছিলাম তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামতে চলেছে। মন্দিরে প্রবেশ করেই অজস্র ইঁদুরের ছুটোছুটি দেখে চমকে গিয়েছিলাম। মন্দিরের সর্বত্র এদের দৗড়াদৌড়ি। পায়ের উপর দিয়ে কখনো গায়েও উঠে পড়ছে। পূণ্যার্থীরা কেউই আপত্তি করছেন না।
মন্দিরের মেঝেতে রয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। তার মধ্যদিয়ে এরা যাতায়াত করছে। এমনকি বিগ্রহের গর্ভগৃহেও এদের অবাধ প্রবেশ। মন্দিরের কর্মীদের কাছ থেকে জানা গেল, প্রায় ২০ হাজার কাবা বাস করে মন্দির চত্বরে। মন্দিরের কর্মীরাই এদের দেখাশোনা করেন। খাওয়া দাওয়াও দেয়া হয় মন্দির থেকেই। এক বিচিত্র দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম যখন দেখলাম ইঁদুরগুলো দর্শনার্থীদের থালা থেকে বা রান্নাঘরে চরণ কর্মীদের একই থালা থেকে তারা খুটে খুটে খাবার খাচ্ছে। শুনলাম, ভক্তরা নাকি কাবা দ্বারা খাওয়া দাওয়াকে সম্মান হিসেবে মনে করেন। আধুনিক যুগেও এমন বিশ্বাস নিয়ে কিছু মানুষ বেঁচে রযেছেন।

mzamin

সেভেন সিস্টার্স নিয়ে ইউনূসের বক্তব্যে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া

চীন সফরে গিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস দাবি করেছে, ভারতকে ঘেরাও করার জন্য বাংলাদেশ উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে চীনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এজন্য অবশ্য কংগ্রেস ভারতের পররাষ্ট্র নীতির দুর্বলতাকেই দায়ী করেছেন।

তবে ইউনূসের বক্তব্যকে আপত্তিকর এবং নিন্দনীয় বলে অভিহিত করেছেন সেভেন সিস্টার্স অন্তর্ভুক্ত আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। অন্যদিকে ত্রিপুরার মহারাজা তথা তিপ্রা মোথা নেতা প্রদ্যোৎ মাণিক্য বাংলাদেশ থেকে চট্টগ্রামকে আলাদা করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা মঙ্গলবার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে স্থলবেষ্টিত বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশকে তাদের সমুদ্রে প্রবেশের অভিভাবক হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। তার এই বক্তব্য আপত্তিকর এবং তীব্র নিন্দনীয়। তিনি লিখেছেন, ইউনূসের এই মন্তব্য ভারতের কৌশলগত ‘চিকেনস নেক’ করিডোরের সাথে জড়িত অবিরাম দুর্বলতার আখ্যানকে তুলে ধরে। ঐতিহাসিকভাবে, এমনকি ভারতের অভ্যন্তরীণ উপাদানগুলোও বিপজ্জনকভাবে উত্তর-পূর্বকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বিচ্ছিন্ন করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। পাশাপাশি তিনি আবেদন করেন, ইউনূসের এই  মন্তব্য যেন হালকা ভাবে না নেয়া হয়। কারণ এগুলো গভীর কৌশলগত বিবেচনা এবং দীর্ঘস্থায়ী এজেন্ডা প্রতিফলিত করে।

এই আবহে হিমন্তের দাবি, চিকেনস নেক করিডোরের নিচে এবং আশেপাশে আরও মজবুত রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। প্রয়োজনে চিকেনস নেককে কার্যকরভাবে বাইপাস করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী বিকল্প সড়ক পথের সন্ধান করাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। যদিও এটি উল্লেখযোগ্য ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে সংকল্প থাকলে উদ্ভাবনের সাথে এটা অর্জন করা সম্ভব।

ইউনূসের দেয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিপুরার তিপ্রা মোথা নেতা প্রদ্যোৎ বলেন, আমাদের আদিবাসীদের সমর্থন নিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার পথ তৈরি করার সময় এসেছে ভারতের কাছে। একসময় চট্টগ্রাম শাসন করত এই আদিবাসীরাই। তাই আমরা আর এই অকৃতজ্ঞ শাসনের উপর নির্ভরশীল নই। ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরটি ছেড়ে দেয়া ভারতের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেন প্রদ্যোৎ তিনি বলেন, সে সময়  সেখানে বসবাসকারী পাহাড়ি জনগণ ভারতের অংশ হতে চেয়েছিলেন।

রিপোর্টে প্রকাশ, সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে উত্তরপূর্ব ভারতের ৭ রাজ্যকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ইউনূস। তিনি নাকি বলেছিলেন, উত্তর-পূর্বে ভারতের সাতটি রাজ্য স্থলবেষ্টিত অঞ্চল। তাদের সমুদ্রে পৌঁছনোর কোনও উপায় নেই। এই অঞ্চলে আমরাই সমুদ্রের দেখভাল করি। এটি একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। এটি চীনা অর্থনীতির একটি সম্প্রসারণ হতে পারে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে।

ইউনূসের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল, এক্সে একটি  ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, আশ্চর্যজনক যে ইউনূস চীনাদের কাছে প্রকাশ্যে আবেদন করেছেন যে, ভারতের ৭টি রাজ্য স্থলবেষ্টিত। চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে স্বাগত, কিন্তু ৭টি ভারতীয় রাজ্য স্থলবেষ্টিত হওয়ার তাৎপর্য ঠিক কী?

কংগ্রেসের মিডিয়া এবং প্রচার বিভাগের প্রধান পবন খেরা এক্সে  একটি  ভিডিও শেয়ার করে বলেছেন, বাংলাদেশ চীনকে ভারতকে ঘেরাও করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের এই মনোভাব আমাদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য খুবই বিপজ্জনক। সরকার মণিপুরের যত্ন নিচ্ছে না এবং চীন ইতিমধ্যেই অরুণাচলের গ্রামগুলোতে  বসতি স্থাপন শুরু  করেছে। খেরা আরও বলেছেন, আমাদের পররাষ্ট্র নীতি এতটাই করুণ অবস্থায় পৌঁছেছে , যে দেশটির সৃষ্টিতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সেই দেশটিও আজ আমাদের বিরুদ্ধে লিপ্ত।

mzamin

কলম্বোর দিন-রাত by জাকারিয়া মণ্ডল

মহাসাগরের ঢেউ ছুঁয়ে নারিকেল গাছের সারি। এপাশে রেললাইন। তার এপাশে মহাসড়ক। বেরুয়ালা থেকে রওনা হওয়া বাসটা কলম্বো অভিমুখে ছুটছে। কলম্বো ছেড়ে আসা একটা ট্রেন দ্রুতগতিতে বিপরীত দিকে চলে গেল।

রাজধানী শহরে ঢুকতে ঢুকতে দুপুর গড়িয়ে গেল। পার্লামেন্ট ভবনকে ডানে রেখে আর একটু এগিয়ে বাঁয়ে কলম্বো বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনাল। বিপরীতে শহরের ভেতর খানিক এগিয়ে ওল্ড ডাচ্ হসপিটাল।  
টালি ছাওয়া দোচালা কাঠামোর নিচে সারিবদ্ধ ঘর। কোনোটা ফ্যাশন, কোনোটা সুভ্যেনির, কোনোটা বা খাবারের দোকান। এমন চারটি ঘরের বাহু পুরো স্থাপনাটাকে আয়তক্ষেত্রের রূপ দিয়েছে। ভেতর দিক টানা বারান্দার বেড়ে খোলা উঠোন। পাশ দিয়ে সারিবদ্ধ বাঁধানো টেবিল চেয়ার।
সিলন কারি ক্লাবে মুরগি ও মাছের কারি, পাঁপড় ভাজি, মিশ্র সবজি, বেগুনের টক ঝোল আর ঘন ডালে উদরপূর্তি নেহায়েত মন্দ হলো না। রেস্তরাঁটার অনতিদূরেই বিখ্যাত কাঁকড়া মন্ত্রণালয়। মানে ‘মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাব’। শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত দুই ক্রিকেটার কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে মিলে রেস্তরাঁটা জমিয়েছেন বেশ। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের সেরা ৫০ এশীয় রেস্তরাঁর তালিকায় এটা ২৯ নম্বরে ছিল। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে এখানে ভূরিভোজ সারতে এসেছিলেন কোহলি ও তার দল। কিন্তু খাবারের ছবি পোস্ট করে পড়েছিলেন ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তোপের মুখে। যদিও যতই তোপ দাগা হোক, যে দেশেরই ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কায় খেলতে আসুক না কেন, কাঁকড়া মন্ত্রণালয়ে খেতে আসা ঠেকানো যায় না।  
দুপুর গড়িয়েছে বলে কাঁকড়া মন্ত্রণালয়ে এখন ভিড় নেই। তবে বিকাল থেকে সরগরম হয়ে উঠবে রেস্তরাঁটা। সেইসঙ্গে ভোজ আর কেনাকাটার উৎসবে জমে উঠবে এই ওল্ড ডাচ্ হসপিটাল চত্বর। মূলত ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হসপিটাল ছিল এখানে। সতেরো শতকের মাঝামাঝিতে। পরবর্তীতে ইতিহাসের আরও অনেকগুলো যুগ পাড়ি দিলেও ডাচ্ হসপিটাল নামেই এখনো পরিচিত এই ভবন ও চত্বরটা।
যদিও এখন আর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল ঘিরে থাকা ডাচ্ দুর্গের চিহ্নও খুঁজে নেয়া ভার। সামনের দিকটায় রাস্তার ওপাশে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া টাওয়ার। মাথা উঁচু করে আকাশ ছুঁতে চাইছে। কলম্বোর তিন রাতের ঠিকানা হোটেল রামাদায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ৪টা বেজে গেল। শ্রীলঙ্কার প্রখ্যাত রত্ন ব্যবসায়ী তারিক আলীওয়াফা এসেছেন হোটেল লবিতে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন সভাপতি ও এই ট্যুরের লিডার আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলের পূর্ব পরিচিত তিনি। তার শ্বশুর শ্রীলঙ্কান পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। গাড়িতে করে বেয়ারফুটের সামনে নামিয়ে দিলেন।
বারবারা সানসোনি নামে এক শিল্পী ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বেয়ারফুট প্রতিষ্ঠা করেন। এখন এটি পরিচালনা করছেন তারই উত্তরসূরি ডমিনিক। বড়ই অমায়িক মানুষ। সঙ্গে করে ঘুরিয়ে দেখালেন সবকিছু। রঙ আর নকশার রাজ্য চোখ ধাঁধিয়ে দিল। কাপড়ে কাপড়ে বৈচিত্র্যের সমাহার। রকমারি কারুপণ্য। চা ও ভেষজ। বইয়ের গ্যালারি। সবখানে চারু আর কারুশিল্পের অভূতপূর্ব সমন্বয়।
মূল ভবনের একপাশে আর্ট গ্যালারি। পেছনের উঠোন জুড়ে ক্যাফে। খোলা চত্বরে বহু দেশের মানুষের আড্ডা।
এরইমধ্যে গোধূলি নেমেছে কলম্বোর আকাশে। সেই আলোয় মূল সড়কের পাশে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে রিফর্মড ডাচ্ চার্চের শ্বেতভবন। যানজটহীন সড়কে সাই সাই ছুটে চলেছে গাড়ি। রাস্তার ওপাশে একটা তামিল মন্দির। প্রবেশপথের ওপরে কয়েকতলা গোপুরামে দেবদেবীর মেলা। এ জাতীয় মন্দিরের প্রবেশপথের ওপরে বিভিন্ন দেবদেবী খচিত যে বহুতল কাঠামোটা থাকে, তারই তামিল নাম গোপুরাম। এই গোপুরামের মাথায় সাঁঝবাতি জ¦লে উঠলো হুট করে। এরইমধ্যে সূর্যটা ডুবে গেছে ভারত মহাসাগরের বুকে। কলম্বোর রাস্তা আলোকিত ল্যাম্প পোস্টের আলোয়। সুপারশপ ম্যাজেস্টিক সিটিতে উপচে পড়া ভিড়। রাত ৮টার আগেই বন্ধ হয়ে গেল কলম্বো শহরের দোকানপাট।
হোটেল রামাদার সুইমিং পুল ঘিরে সবুজ বাগান। ফাঁকে ফাঁকে টেবিল-চেয়ার। ডিনারের পর মাঝরাত অবধি চললো অলস আড্ডা। ঘুমিয়ে যাওয়া শহরের কাছেই কোথাও নাইট পার্টি চলছে। ড্রামের বিট আর হৈ-হুল্লোড় শোনা গেল রাতভর।
সকালে হোটেল রুমের জানালা থেকেই মহাসাগরের শান্ত জলরাশি চোখে পড়লো। প্রাতরাশের পর শুরু হলো লোটাস টাওয়ার অভিযান। সুউচ্চ সবুজ দণ্ডের মাথায় গোলাপি পদ্মটা যেন আকাশের গায়ে বসে আছে। শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতিতে পদ্ম হলো বিশুদ্ধতা ও উন্নয়নের প্রতীক। তাই পদ্মের আদলেই এই টাওয়ার। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ এই টাওয়ারের উচ্চতা ১১৬৮ ফুট। আছে রেস্তরাঁ, অডিটোরিয়াম, টেলিকমিউনিকেশন জাদুঘর, পরিদর্শন গ্যালারি।  
উন্নয়ন কাজ চলমান বলে এখন লোটাস টাওয়ারে প্রবেশ নিষেধ। তবে এয়ারফোর্সের তত্ত্বাবধানে পরিদর্শনের বিশেষ অনুমতি মিলেছে। অতিকায় দ্রুতগামীর লিফটে পরিদর্শন প্ল্যাটফরমে পৌঁছাতে সময় লাগলো না। তত্ত্বাবধায়কদের বিশেষ অনুমতি ও সহযোগিতায় মই বেয়ে ছাদের ফোকর গলে উপরের খোলা চত্বরেও ওঠা গেল। তারপর আরও খাড়া মই বেয়ে একেবারে শীর্ষে ওঠার সুযোগও করে দিলেন তারা।
টাওয়ারের চূড়া থেকে নিচের মানুষগুলোকে মনে হলো লিলিপুট। গোড়াতেই বেইরা লেক। সরু ক্যানাল হয়ে পশ্চিমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। মহাসাগরের ওপরে জমে থাকা কুয়াশায় খুব বেশি দূর দৃষ্টি চলে না। এপাশে কুয়াশামাখা শহর। ছবির মতো সুন্দর। স্কুল, খেলার মাঠ। ছুটে চলা গাড়ি আর ট্রেনকে মনে হচ্ছে খেলনা। মার্চের শুরুতে কলম্বো শহরের অসাধারণ টপ ভিউ ধরা দিল চোখের সামনে।
মধ্যাহ্নভোজের পর বিটুবি সেশন শুরু হলো হোটেল রামাদায়। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস এসোসিয়েশন (টোয়াব) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কান ট্যুর অপারেটরদের বিজনেস বৈঠক। তারপর সবার হাতে সুভ্যেনির তুলে দিলেন শ্রীলঙ্কার পর্যটন সচিব।
বিকালে হোটেল থেকে বেরুতেই হাজির তারিক আলী। তার ড্যাজলজিম অ্যান্ড জুয়েলারি শপটা বেয়ারফুটের কাছেই। লম্বাটে দোকানটায় বিদ্যুতের আলো ছাপিয়ে রত্নের ঝিলিক। নানা রঙের দ্যুতি। রুবি, নীলকান্তমণি। নীল একটা রত্ন দেখিয়ে জানালেন, ওটার দাম ৩৫ হাজার ডলার। বিভিন্ন দেশ থেকে রত্নপ্রেমীরা ছুটে আসেন তার দোকানে। আর তিনি রত্ন সংগ্রহ করেন রত্নপুরা থেকে। যার অবস্থান কলম্বো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বদিকে।

রত্নপুরা মানে রত্ননগরী বা রত্নের শহর। ওখানকার নদীর কাদাবালি চালনিতে নিয়ে চাললে একসময় রত্ন পাওয়া যেতো। এখন নিচু ধানের জমিতে ৩৩ ফুট থেকে ১৬০ ফুট পর্যন্ত গভীরে বেশ কিছু রত্নের খনি। এসব খনির কারণেই পৃথিবীর কোথাও রত্নদ্বীপ, কোথাওবা রত্নের ভাণ্ডার নামে শ্রীলঙ্কা পরিচিতি। এ নিয়ে আছে ঢের গল্প, কিংবদন্তি। শ্রীলঙ্কা থেকে রত্ন সংগ্রহের ইতিহাসও শত সহস্র বছরের প্রাচীন। অতি রূপবতী বিলকিসকে বিয়ে করার পর বাদশাহ সোলায়মান দু’টি জাহাজ পাঠান রত্নের দেশ শ্রীলঙ্কায়। জাহাজভর্তি রত্ন এনে নববধূকে খুশি করবেন বলে। এদেশে এখনো ভুরি ভুরি ব্লু শেফায়ার বা নীলা পাথর পাওয়া যায়। নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে প্রদর্শিত ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ নামে অতি মূল্যবান রত্নটি আসলে এই শ্রীলঙ্কারই রত্ন। বৃটিশ রাজমুকুটে শোভিত ৪০০ ক্যারেটের নীলা পাথরটিও এই শ্রীলঙ্কার। এটাই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে কমলা ও গোলাপি মিশ্রিত পদ্মরাগ মণি মেলে। আরও আছে রুবি। চীনা পর্যটক ফা হিয়েন এদেশে মানুষের হাতের মতো লম্বা ও বিঘত খানেক চওড়া রুবি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে মুরগির ডিমের সমান রুবি দিয়ে হাতির মাথা সাজানো হতো বলে লিখে গেছেন। এখানকার রুবির প্রেমে পড়েছিলেন মার্কোপেলোর মতো পর্যটকও। আরও আছে ক্যাটস আই, টোপাজ, আরও যে কতো রত্ন!   
শ্রীলঙ্কার রত্ন ব্যবসায়ে মুসলমানদের আধিপত্য রয়েছে বলে গর্বিত তারিক আলী। ১১ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যার শ্রীলঙ্কায় রত্নপুরার মুসলমান জনসংখ্যা ৩৩ শতাংশের বেশি, আর রাজধানী কলম্বোতে প্রায় ৪২ শতাংশ। সন্ধ্যায় ড্যাজল থেকে বেরিয়ে কয়েক মিনিটেই ফের বেয়ারফুট। খোলা ক্যাফেতে গাছের নিচে আড্ডা জমে জয়ন্তির সঙ্গে। জয়ন্তি কুরু-উতুমপালা। শ্রীলঙ্কার প্রথম এভারেস্টজয়ী। পুরুষ-নারী বৈষম্য করে না পর্বত। হয় তাকে জয় করো, নয়ত পরাজিত থাকো। এ আপ্তবাক্যকে মূল সূত্র ধরেই শ্রীলঙ্কার প্রথম এভারেস্টজয়ী হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম পোক্ত করে নিয়েছেন জয়ন্তি। নারী হিসেবে তো বটেই, প্রথম শ্রীলঙ্কান হিসেবেই এই অনন্য গৌরব অর্জন করে নিয়েছেন তিনি। যে গৌরবে এ দেশের পুরুষরাও তার থেকে পিছিয়ে।
জয়ন্তির সঙ্গে কথায় কথায় সন্ধ্যা গড়ায়। কলম্বোতে আর একটা রাত গভীর হয়। তারপর সকাল। দুই আলোকচিত্রী আবির আবদুল্লাহ ও আজিম খান রনি ছুটে যান ফটোগ্রাফিক এসোসিয়েশনে। সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে একটা ফটো প্রেজেন্টেশন দেবেন তারা। পাটের কাপড় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন ছুটলেন তার ব্যবসার কাজে। এসোসিয়েশন সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ও শাকিল বিন মুশতাকসহ তিনজনের দল ছুটলো সিলন টুডে অফিসে।
শ্রীলঙ্কার অন্যতম ডেইলি নিউজপেপার সিলন টুডের অফিসটা ছিমছাম, পরিপাটি। প্রথমে সাংবাদিক সঞ্জু, তারপর জেনারেল ম্যানেজার-এডভারটাইজিং সঞ্জিব ওটেউয়ি, সবশেষে ফিচার এডিটর খুবই আন্তরিক সবাই।
পত্রিকা অফিস থেকে বেরিয়ে পেরেরা হুসেইন পাবলিশিং হাউজ। বিখ্যাত লেখক আমেনা হুসেইন আগে থেকেই আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলকে চিনতেন। তার অফিসে জমে উঠলো আড্ডা। স্বামী সাম পেরেরার সঙ্গে মিলে প্রকাশনা সংস্থাটাকে জমিয়ে তুলেছেন তিনি।
মনোযোগ দিয়ে সুনেলা জয়াবর্ধনের ‘লাইন অব লঙ্কা: মিথ অ্যান্ড মেমোরিজ অব অ্যান আইল্যান্ড’ গ্রন্থটির পৃষ্ঠা উল্টাতে দেখে সেটা উপহারই দিয়ে বসলেন আমেনা হোসেন। এ ছাড়া আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলকে দিলেন মাইকেল রোহান সূরিয়া রচিত ‘মোটর সাইক্লিং এডভেঞ্চারস ইন শ্রীলঙ্কা’ গ্রন্থটি। আর নিজের অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ ‘ইবনে বতুতা ইন শ্রীলঙ্কা’ গ্রন্থটি তিনি দিলেন শাকিল বিন মুশতাককে। যে পথ ধরে ইবনে বতুতা শ্রীলঙ্কা ঘুরে বেড়িয়েছেন, সে পথ ধরে নিজেও ঘুরেছেন আমেনা হোসেন। সেই অভিজ্ঞতাই তিনি প্রকাশ করেছেন গ্রন্থটিতে। তার কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতে দুপুর।
ফুডকোর্টে মধ্যাহ্নভোজ সারতে নিয়ে গেলেন তারিক আলী। বাংলাদেশের ফুডকোর্টের মতোই গিজগিজে ভিড়। খাবারের পর কলম্বোর পুরনো শহর ও স্থাপনা ঘুরিয়ে দেখালেন তারিক আলী। তারপর বিদায় নিলেন। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে ডিনারের দাওয়াত। হাইকমিশনার তারেক মো. আরিফুর রহমানের সঙ্গে জমে উঠলো শ্রীলঙ্কা সফরের শেষ আড্ডা।
শ্রীলঙ্কান ট্যুরিজম থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে বলে অকপটে মত প্রকাশ করলেন বাংলাদেশ হাইকমিশনার। নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি মেলে তিনি বললেন, শ্রীলঙ্কান ট্যুরিজমের অতিথিসেবা অনেক নিখুঁত। অবকাঠামো থেকে শুরু করে ভাষা, ট্যুর প্ল্যান সবকিছুতেই তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের উন্নতির ধারা এখনো অব্যাহত। আমরা তাদের কাছে অনেক কিছুই শিখতে পারি।
ভারত মহাসাগরের পাড়ে কলম্বোর অবস্থান শ্রীলঙ্কার পশ্চিম উপকূলে। কালানী নদীর মোহনায়। অতীতে এ শহরের নাম ছিল কালান তোতা, যার অর্থ কালানী নদীর ফেরিঘাট। আরব বণিকরা যার নাম দেয় কালাম্বু। ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে পতুর্গিজরা এ শহর দখলের পর ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামে নাম রাখে কলম্বো। ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এ শহরের দখল নেয় ওলন্দাজরা। ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজরা হয় এ শহরের নিয়ন্ত্রক। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে বৃট্রিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়া শ্রীলঙ্কার কলম্বো এখন প্রধান সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক রাজধানী।
ঐতিহাসিক এ শহরে এখন মাঝরাত। ট্যুরিস্ট বাস ছুটে চলেছে ৩৫ কিলোমিটার দূরের বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের দিকে। Í
লেখক: নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা
(সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০২৫)

নজরুল-প্রমীলার প্রেমের সাক্ষী যে বাড়ি by রিপন আনসারী

যমুনা নদীর তীরঘেঁষা মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ি। জমিদারি প্রথা ও প্রজা নিপীড়নের জ্বলন্ত সাক্ষী, নানা রহস্য ভরা এই জমিদার বাড়িটি অযত্ন আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। একই সঙ্গে মুছে যাচ্ছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রিয়তম পত্নী প্রমীলা দেবীর প্রেমের ইতিহাস।

জমিদার বাড়ির সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক স্মৃতি বিজড়িত থাকলেও তা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। এ জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল নজরুলের প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দেবীর বাড়ি। প্রমীলা দেবীর বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেনের সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে এবং তাদের বন্ধুত্বের সৃষ্টি হলে নজরুল মাঝে মধ্যেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীরেন সেনের সঙ্গে তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। এরই মাধ্যমে বসন্ত সেনের পরমা সুন্দরী কন্যা প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে আলাপ পরিচয়ে এক পর্যায়ে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। প্রমীলা নজরুলকে কবিদা বলে ডাকতেন।

জনশ্রুতি রয়েছে, নজরুল যখন প্রমীলা অনুরক্ত, তখন একদিন জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের পুকুরে স্নানরত প্রমীলার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমিক নজরুল গান গেয়ে ওঠেন, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ। এরপর প্রেম প্রণয়ের অনেকটা জায়গা জুড়েই আছে জমিদার বাড়ি, পুকুর ঘাট, নাটমন্দির ও নবরত্ন মঠ।
এক সময়কার  সৌন্দর্যমণ্ডিত তেওতা জমিদার বাড়িটি সম্পর্কে এলাকার বয়োবৃদ্ধের মুখে মুখে এখনো  কিংবদন্তির মতো অনেক অজানা কাহিনী, যা এক সময় মানুষকে অবলীলায় বিস্ময়ের আবর্তে টেনে নেয়।

জানা গেছে, পঞ্চদশ শতকের প্রারম্ভে পাচুসেন নামক এক পিতৃহীন যুবক তার সততা ও আন্তরিক চেষ্টায় তামাকের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ-সম্পদের মালিক হন। পাচুসেন দিনাজপুর অঞ্চলে প্রথম জমিদারী ক্রয় করে তার পাচু নাম পরিবর্তন করে পঞ্চনন্দ সেন নাম গ্রহণ করেন। পঞ্চনন্দ সেনের পুত্র শঙ্কর রায় বাহাদুর ১৬৭০;এর দশকে (বাংলা ১০৮০) তৎকালীন নাগপুরের নীলকুঠির ম্যানেজার উডীন সাহেবের কাছ থেকে কিনে নিয়ে তেওতা জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

সৌন্দর্যমণ্ডিত এ জমিদার বাড়ির নবরত্ন মঠটির শিলালিপি থেকে জানা যায়, এ মঠটি ১৭০২-১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত। এই হিসাবে প্রায় ৩০০ বছর পূর্ব থেকে তেওতা জমিদার বাড়ি সমৃদ্ধিশীল ছিল। জমিদার বাড়ির উত্তর দিকের ভবনগুলো নিয়ে হেম শংকর এস্টেট এবং দক্ষিণ দিকের ভবনগুলো নিয়ে জয় শংকর এস্টেট গঠিত। প্রতিটি এস্টেটের সামনের অংশে যে অট্টালিকা আছে তা বর্গাকৃতির এবং এর মাঝখানে আছে দৃষ্টিনন্দন নাট মন্দির। এ মন্দিরে পূজা ও নাচ গানের আসর হতো। এস্টেটের পূর্ব দিকে ছিল অন্দরমহল। দক্ষিণ দিকে ভবনের নিচে ভূগর্ভে আজও একটি চোরা কুঠি রয়েছে। যা এ এলাকার অন্ধকূপ নামে পরিচিত ছিল। এটি ক্রমান্বয়ে ভরে গেছে। সেখানে বর্তমানে সাপ বিচ্ছুদের আস্তানা। জমিদার বাড়ির সামনের একটি ভবনে রয়েছে দুটি কয়েদখানা। সাধারণ প্রজারা খাজনা দিতে বিলম্ব  করলে তাদের কয়েকখানার ভেতরে বন্দি করে নির্যাতন চালানো হতো। কয়েদখানাটি এখন আর নেই। সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। জমিদার বাড়ির সামনে টলমলে দিঘিতে ছিল বাঁধানো ঘাট। ঘাট সংলগ্ন প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সেই নবরত্ন মঠ। চারতলাবিশিষ্ট এই নবরত্নের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার চারদিকে ক্ষুদ্রাকৃতির মঠ বা রত্ন এবং মাথার মঠ বা রত্ন নিয়ে মোট আটটি মঠ থাকায় একে নবরত্ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল বলে সেখানকার মানুষজনের কাছ থেকে শোনা গেছে।
এ নবরত্ন মঠটিতে সে সময় জাঁকজমকপূর্ণ দোল পূজা অনুষ্ঠিত হতো।
তেওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শরৎচন্দ্র জমিদার বাড়ি প্রসঙ্গে বলেন, তেওতা জমিদার বাড়ি মূলত জমিদারদের সময় থেকেই ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এরপর আমরা ছোট থেকে আস্তে আস্তে জেনেছি এখানে প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমাদের এলাকার আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলা দেবীর একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রমীলা দেবীর বাড়ি জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল। আমরা যতটুকু জেনেছি প্রমীলা দেবীর সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ের যে ব্যাপারটা ছিল সেটা মূলত তার বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেন। বীরেন সেনের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা সখ্যতা ছিল। তিনিও সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন এবং কবিতা ভালোবাসতেন। এই সূত্রে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকবার তেওতা জমিদার বাড়িতে আসা। এখানে প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে নজরুলের পরিচয় ঘটে। বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি বিশেষ করে ছোট হিটলার কবিতায় তেওতার কথাটা নজরুল তার কবিতায় লিখেছিলেন। সেখানে তিনি একটা লাইন লিখেছিলেন, ভয় করি না পুলিশদের, জার্মানির ওই ভাঁওতাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামার বাড়ি তেওতাকে।’ এ ছাড়া লোকমুখে শোনা গেছে আরও বেশ কয়েকটি গান, আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী  এ কোন সোনার গাঁয় অথবা তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ। এটা শুনেছি প্রমীলা দেবীকে দেখেই নজরুলের গান লেখা।

এই শিক্ষক জানান, প্রতিনিয়তই দেশি-বিদেশি অনেক দর্শনার্থী আসেন, দেখেন- তাদের ভালো লাগে। এটা আসলেই ভালোলাগার একটা জায়গা। কারণ এটা কাজী নজরুল ও প্রমীলার স্মৃতি বিজড়িত এলাকা। যত দিন যাচ্ছে আর দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে-বিদেশে পর্যন্ত তেওতা জমিদার বাড়ির নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে এখানকার জমিদাররা পরবর্তীতে ইন্ডিয়া চলে যায়। ইন্ডিয়া থেকে অনেকেই মায়ার টানে, নাড়ির টানে এখানে ছুটে আসেন।
এদিকে, বিপন্নপ্রায় তেওতা জমিদার বাড়ির কিছু অংশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা গবেষণার জন্য ব্যবহার করছেন। জমিদার বাড়ির প্রায় আট একর জমির বেশির ভাগ অবৈধ দখলদারদের কব্জায়। ইটপাথরে গাঁথা অতি প্রাচীন অট্টালিকাগুলো আজ রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ধসে পড়ছে।
তবে জমিদার বাড়ির সম্মুখ রাস্তার পাশে নজরুল এবং প্রমীলার স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ইট পাথরে গাঁথা ছবি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে। দর্শনার্থীরা জমিদার বাড়ির প্রবেশের আগেই নিজেদের সঙ্গে নজরুল-প্রমীলার ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন।  বিভিন্ন দিবসের মধ্যে বিশেষ করে ঈদের আগে-পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে জমিদার বাড়িটি। 

mzamin

বাঘের ইচ্ছে হলেই সম্ভব by শামীমুল হক

বাঘের সঙ্গে মোলাকাত ক’জনের হয়েছে? সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখাই কি শেষ কথা? খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট জুড়ে সুন্দরবনের বিস্তৃতি। এটা শুধু বাংলাদেশ অংশ। ভারতের অংশেও রয়েছে সুন্দরবনের একাংশ। দুই দেশ মিলে দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠেছে এই সুন্দরবন। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশের আয়তন ছয় হাজার সতের বর্গ কিলোমিটার। মোট কথা সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ রয়েছে বাংলাদেশে। বাকিটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। আমরা যখন খুলনা থেকে জাহাজে উঠি রাত তখন প্রায় তিনটা। প্রত্যেকেই যার যার কেবিনের চাবি বুঝে নিয়ে রুমে চলে যাই। প্রত্যেক রুমে রয়েছে স্পিকার। হঠাৎ স্পিকারে বলতে শোনা যায়Ñ সকাল আটটায় নাস্তার পর সুন্দরবন নিয়ে একটা ধারণা দেয়া হবে। সবাইকে যথাসময়ে জাহাজের তিন তলায় খাবারের রুমে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান ঘোষক। জাহাজ চলছে নদীর মাঝ দিয়ে। দু’পাশে সুন্দরবন। এমন অপরূপ দৃশ্য? কোনো মানুষের পক্ষে কি এভাবে সাজানো সম্ভব? আসলে প্রকৃতির এমন উপহার মানুষের জন্য। তাই তো দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ ছুটে চলে সুন্দরবন দেখতে। বাঘের দেখা পেতে। কিন্তু বাঘের দেখা পাওয়া আর পাহাড় ঠেলা সমান কথা। কারণ যেদিকে বাঘ থাকে সেদিকে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় না। এটা অঘোষিত একটা নিয়ম। তিন দিনের সুন্দরবন সফরে এমনটাই মনে হলো। আর সকালে গাইড আল-আমিনের কথায় এটা আরও স্পষ্ট হলো। নাস্তা পর্ব শেষে সবাই যার যার টেবিলে বসা। জাহাজ চলছে বিরতিহীনভাবে। গাইড আল-আমিন এসে দাঁড়ালেন একটি টিভির সামনে। গুডমর্নিং সবাইকে। আমি গাইড আল-আমিন। তিনদিন আপনাদের সঙ্গে থাকবো। সুন্দরবনের রহস্য কথায় এগিয়ে যাবো সামনে। এই যে সুন্দরবন এটা বাঘের অভয়ারণ্য। আর সুন্দরবনের বাঘ পৃথিবীর সকল বাঘের চেয়ে আলাদা। আমি প্রায় নয় বছর ধরে গাইড হিসেবে সুন্দরবনে রয়েছি। এই যে জাহাজ এটি একেবারেই নতুন। পাঁচ মাস হলো নামানো হয়েছে। এখন এখানে আছি। বহু পর্যটকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। আলাপ হয়েছে। বন্ধুত্ব হয়েছে। কিন্তু এই নয় বছরে আমি কোনো বাঘ দেখতে পাইনি। তাই বলে আপনারা হতাশ হবেন না। ভাগ্য ভালো থাকলে একদিনেই আপনারা বাঘ দেখতে পাবেন। এমনটা হয়েছে শুনেছি। আল-আমিনের কথায় বুঝা গেল বাঘ দেখাটা আসলে দুরূহ। কারণ যেদিকে বাঘ থাকে সেদিকে পর্যটকদের নিয়েই যাওয়া মানা।

আল-আমিন স্পষ্ট করে না বললেও আন্দাজ করা যায়। সুন্দরবনের হরিণের কথাও বললেন তিনি। পাখ-পাখালির কথাও বাদ যায়নি। টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠলো  মানচিত্র। আমরা কোন কোন নদী দিয়ে কোথায় যাবো। এমন সময় আল-আমিন জানালেন আগামীকাল আমরা কটকায় যাবো। তবে আপনাদের জন্য সুখবর হলো কটকায় হেঁটে যেতে পারবেন। যেখানে জাহাজ থামবে সেখান থেকে সাড়ে ৯ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। আর যারা যাবেন না তারা জাহাজেই থাকবেন। জাহাজও একই সঙ্গে ছাড়বে। এই সাড়ে ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জাহাজ গিয়ে থামবে। ওদিকে যারা হেঁটে যাবেন তারাও সেখানে গিয়ে একসঙ্গে মিলিত হবেন। হেঁটে যাওয়া পথের তিন কিলোমিটার জঙ্গল। তিন কিলোমিটার বিস্তীর্ণ চর। আর তিন কিলোমিটার সাগর। অন্যরকম এক ফিলিংস এই হেঁটে যাওয়ার। যারা গিয়েছেন তারা বলেছেন, এমন স্মৃতি মনের গহীনে গেঁথে থাকবে আজীবন। যারা যাননি তারা বড্ড মিস করেছেন। গাইড আল-আমিন বলেই যাচ্ছিলেন সুন্দরবনের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা। এই তিনদিন আমরা কোথায় কোথায় যাবো। কীভাবে যাবো। সবই বলা হলো। পরদিন ভোর ৬টায় পাখি দেখতে যারা যাবেন তাদের কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। কি করতে হবে সবই বললেন। কুমির প্রজনন কেন্দ্রে গিয়ে কি করতে হবে। কীভাবে চলতে হবে। আল-আমিনের সব মুখস্থ। সবশেষে বললেন, এরপরও যদি কারও কিছু জানার থাকে আমাকে বলবেন। আমি সর্বদা আপনাদের সেবায় নিয়োজিত।  কথায় কথায় জাহাজ গিয়ে থামলো হাড়বাড়িয়া পয়েন্টে। এবার আল-আমিন বললেন, এবার আমরা হাড়বাড়িয়া পয়েন্টে যাবো। ঘুরে দেখবেন জীব বৈচিত্র্য। খুলনা চার নম্বর ঘাট থেকে যে ট্রলারে করে আমরা দূরে অপেক্ষারত জাহাজে গিয়ে উঠেছিলাম সেই ট্রলার আর জাহাজ ছাড়েনি। ট্রলার বেঁধে দেয়া হয় জাহাজের সঙ্গে। যেখানেই যাই জাহাজ মাঝ নদীতে থেমে যায়। তারপর ট্রলার নিয়ে যায় তীরে বা কোনো স্পটে। আমরাও এবার জাহাজ থেকে নেমে ট্রলারে গিয়ে বসলাম। উদ্দেশ্য হাড়বাড়িয়া পয়েন্ট দেখা। চার কিংবা পাঁচ মিনিট চলার পরেই হাড়বাড়িয়া পয়েন্ট। ট্রলার থেকে একে একে সবাই নামলাম। প্রবেশ পথেই বানরের দেখা। দলবদ্ধ বানরের দল। এত মানুষ দেখেও বানরগুলোর কোনো ভয় নেই। বরং আমাদের এক সহযাত্রীকে আক্রমণ করে বসে। গাইড আগে এগুচ্ছে আমরা পেছনে পেছনে। যতই এগুচ্ছি সামনে গহীন জঙ্গল। সবাই চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে বাঘ দেখা যায় কিনা? ভয়ও কাজ করছে সবার মনে এই বুঝি বাঘ হামলে পড়ছে কারও না কারও ওপর। ভয় আর আতঙ্কে হিমশীতল হয়ে আসছিল শরীর। অন্যদিকে সুন্দরবন দেখার আনন্দও ছিল মনে। মাঝে মাঝে গাইড চিৎকার করে বলছিলেন সবাই  একসঙ্গে থাকেন। কেউ একা হবেন না। তাহলে বিপদ হতে পারে। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টটি খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দুই কিলোমিটার জঙ্গলের ভেতরে গিয়েও বাঘের দেখা পাওয়া যায়নি। যা দেখা গেছে তা হলো বাঘের পায়ের ছাপ। আর ছাপ কোথায়? যে পথে মানুষ চলাচলের জন্য সুন্দর করে ইটপাথরের সুড়কি দিয়ে বানানো হয়েছে তার পাশেই। মানুষ যেন চলাচল করতে পারে সেজন্য এ পথ বানানো হয়েছে উঁচু করে পিলারের উপর। দুই পাশে আবার রেলিং দেয়া।

হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ পর পর দেখা যাচ্ছিল বাঘের পায়ের ছাপ। আসলেই কি এটা বাঘের পায়ের ছাপ? এখানেও রয়েছে রহস্য। কথিত রয়েছে, বন বিভাগ থেকে এক ধরনের অস্ত্রের মাধ্যমে এমন ছাপ দেয়া হয়। পর্যটকরা যাতে পায়ের ছাপ দেখে শিহরিত হন। বাঘ না দেখলেও পায়ের ছাপ দেখেছি-এটা ভেবে তৃপ্তি পান। এমন তৃপ্তি নিয়েই হাজার হাজার পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ শেষ করে ফিরে আসেন নিজ গন্তব্যে। বেশক’টি নদী ঘিরে রেখেছে সুন্দরবনকে। এর সবক’টিই জোয়ার- ভাটার নদী। তাই জোয়ারে সুন্দরবনে পানি জমে। আবার ভাটায় সেই পানি নেমে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে জোয়ারের পানিতে যেন গাছ না মরে এ প্রতিটি গাছই তাকে রক্ষায় শ্বাসমূল ছড়িয়ে দেয়। ছোট থেকে বড় বহু শ্বাসমূল ঘিরে রাখে প্রতিটি গাছকে। গাইড আল-আমিন সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলটি দেখিয়ে বলেন, এটি সবচেয়ে বড়। মানে হলো জোয়ারে পানি এ শ্বাসমূলের উপরে উঠে না। জোয়ারের সময় গাছ এ শ্বাসমূল থেকে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টেই ছোট খালে এক প্রকার মাছ দেখা যায়। এ মাছগুলোর সামনে গিয়ে গাইড আল-আমিন এ মাছের বিশদ বর্ণনা দেন আমাদের। এ মাছ জলে ও স্থলে বসবাস করে। সামনেই একটি পুকুর। পুকুরে পানি থৈ থৈ। নিশ্চয় জোয়ার- ভাটায় এ পুকুরও ডুবে ও ভাসে।

সুন্দরবন নাম হয়েছে সুন্দরী গাছের কারণে। কিন্তু সুন্দরী গাছ কীভাবে সুন্দর তা বোঝা গেল না। তবে তার একটি বৈশিষ্ট্য আছে। সুন্দরী গাছের গোড়া এমনভাবে নিজ থেকে তৈরি যা দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। গাছটিকে যেন চারদিক থেকে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। যেন ভেঙে না যায়। কারণ সুন্দরী গাছ একেবারে লম্বা ও সোজা হয়। এর কোনো ডালপালা নেই। একেবারে লক-লকিয়ে এগিয়ে গেছে উপরে। প্রচণ্ড বাতাসেও এ গাছ ভেঙে পড়ে না। কারণ তার গোড়ায় নিজ থেকেই মোটা মোটা জড় ঠেস দিয়ে রেখেছে। আসলেই প্রকৃতির কী খেলা! প্রত্যেকেই নিজেকে বাঁচানোর উপায় নিজেই খুঁজে নেয়। সুন্দরী গাছও তেমন। আর এ সুন্দরী গাছ বেশি দেখা যায় আন্দারমানিক পয়েন্টে। হাড়বাড়িয়া ভ্রমণ শেষে আন্দারমানিকের উদ্দেশ্যে যাত্রা। শুরুতেই বাঘের ছবি দিয়ে বিরাট নিয়ন সাইনের পোস্টার সাঁটানো। এ বাঘ দেখেই আন্দারমানিক স্পটে প্রবেশ। শুরুতেই বিশাল এক উঁচু টাওয়ার। এর নাম ডলফিন টাওয়ার। এ টাওয়ার থেকে নদীতে ডলফিন দেখা যায় বলে এর নাম রাখা হয়েছে ডলফিন টাওয়ার। সহযাত্রীদের অনেকেই ডলফিন দেখতে এ টাওয়ারে উঠেন। তাদের দু’চোখ নদীর দিকে বড় বড়  চোখ নিয়ে তাকানো। ডলফিন দেখার স্বপ্ন এ চোখে। কিছুক্ষণ পর একে একে সবাই নেমে এলেন। কি ভাই ডলফিন দেখেছেন। কেউ কোনো কথা বলছে না। অবশ্য গাইড আল-আমিন কথার মারপ্যাঁচ জানেন ভালো। আগেই বলে নিয়েছিলেন ডলফিন টাওয়ারে উঠলে ডলফিন দেখা যেতেও পারে। নাও পারে। যাদের ভাগ্য ভালো তারা ডলফিন দেখতে পায়। এই আন্দারমানিকে বেশক’টি হরিণ আটকে রাখা হয়েছে। বাউন্ডারির বাইরে থেকে ডাক দিলে হরিণগুলো ছুটে আসে। কেউ কেউ এসব হরিণকে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অবশ্য জাহাজ চলাকালীন সুন্দরবন থেকে অনেক হরিণ নদীতে পানি খেতে এসেছে তা দেখা গেছে। আন্দারমানিকের প্রায় দেড় কিলোমিটার  ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে সব সুন্দরী গাছের আখড়া।

এবার পশু-পাখি দেখার পালা। জাহাজ এক জায়গায় গিয়ে থামলো। সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো সকাল ৬টায় ট্রলার পশু-পাখি দেখার জন্য যাবে। যথাসময়ে সবাই ট্রলারে গিয়ে উঠলেন। ট্রলার ছাড়লো। একটু সামনে গিয়ে মূল নদীর শাখা দিয়ে প্রবেশ করলো ট্রলার। একটি খালের মতো। সবার নজর খালের দু’পাশের গাছের দিকে। পাখি দেখার জন্য। কিন্তু না! কোনো পাখিই দেখা যাচ্ছিল না। কিছু দূর যাওয়ার পর একজন এসে বললেন, ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ করে দাও। আস্তে আস্তে চলুক। ইঞ্জিনের শব্দে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। সত্যিই তাই। ইঞ্জিন বন্ধ করে ট্রলার এগুতে থাকে। এবার পাখির কিচিরমিচির শব্দ কানে আসছে। আসছে বন মোরগের ডাক। সত্যিই পাখ-পাখালির এমন ডাক মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু খালের পাশের কোনো গাছেই পাখির চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। ফেরার পথে আবার একই দৃশ্য। চোখ বড় করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সবাই। কিন্তু না পাখির দেখা মিললো না। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর বন মোরগের ডাক পুঁজি করেই ফিরে আসা জাহাজে। সেখান থেকে করমজাল যাওয়া। যেখানে রয়েছে কুমির প্রজনন কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে দেখা মিললো ছোট ছোট দোকানপাটের। দোকানিরা এসেছেন মোংলা থেকে। করমজালে আসা পর্যটকদের কাছে তাদের পণ্য বেচতে। পণ্য বলতে পানি, চা, রুটি, পেয়ারা, শসা, পানীয়। কিন্তু সবই ডাবল দাম। আবার সেখানে হরিণের খাবার বিক্রি হচ্ছে। মানুষ লাইন ধরে খাবার কিনছে। হরিণকে খাবার দিবে বলে। করমজালে হরিণ, বানর সবই আছে। তবে কুমির দেখতেই এখানে ভিড় বেশি। করমজালের নদীতেও কুমিরের আস্তানা। করমজালের ভেতরে একটি পুকুর আছে। এ পুকুরেই প্রথম আনা হয় রোমিও আর জুলিয়েট কুমির জুটিকে। কিন্তু রোমিও আর জুলিয়েট প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে জুলিয়েটকে বন্দি করে রাখা হয় একটি খাঁচায়। আর রোমিওকে নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়। রোমিও যেন তার আর কোনো সঙ্গীকে বেছে নিতে পারে। কিংবা সে তার পথ নিজেই বেছে নিবে। বেশক’টি খাঁচায় ছোট কুমির আর বড় কুমির। পুকুরের পাড়ে গিয়ে দেখা গেল বড় দুটি কুমির পানি থেকে পাড়ে উঠে ঘুমিয়ে আছে। একটি উল্টো হয়ে ঘুমিয়ে আছে। প্রথম দেখায় মনে হয়েছে মরে আছে। এত মানুষের হইচই তবু কুমিরের ঘুম ভাঙছে না। মনে মনে ভাবলাম এ জন্যই বুঝি বলা হয়, কুমিরের ঘুম ঘুমিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর একটি কুমির সজাগ হয়ে দ্রুত পুকুরে নেমে যায়। অন্যটি মরার মতো ঘুমিয়েই আছে। ফেরার পথে সেখানকার ডাব খেয়ে একে একে সবাই ট্রলারে উঠেন। এরপর ট্রলার নিয়ে যায় আমাদের জাহাজে।

সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে হলেও এ অংশে নাকি বাঘ আছে ১২৫ কি ১২৮টি। আর ভারতের অংশে ৪০ শতাংশ হলেও সেখানে বাঘ রয়েছে ৪০০-এর উপরে। আচ্ছা বাঘ কীভাবে গণনা করে। এ নিয়ে মনে প্রশ্ন। শুধু আমার নয়, অনেকের মনেই এ প্রশ্ন। আর বাঘের সংখ্যা যে বলা হয় এটা কতোটুকু সত্যি? এ নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। তবে লিখলে বাঘ গণনায় যে বাজেট তাতে টান পড়বে। তারচেয়ে বরং যে হিসাব দেয়া হয় সেটা মেনেই সবার চলা উচিত। চলছেও।  সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাস করে। কিন্তু এ বনে বাঘের দেখা মেলা অন্য যেকোনো বনের চেয়ে বেশ দুরূহ। সুন্দরবনে দিনে দু’বার জোয়ার-ভাটা হয়। এখানে মোটরবোটে চড়ে বন দেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তবে প্রায়ই রিপোর্ট হয় কোনো না কোনো সময়ে জেলে, কাঁকড়া শিকারী, মধু আহরণকারী ও গোলপাতা আহরণকারীরা বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন।
সুন্দরবনে কথা হয় এক গোলপাতা আহরণকারীর সঙ্গে। তাকে বাঘের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ওই যে বাঘের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে একটা বাঘ এখান দিয়ে গেছে। কথায় কথায় তিনি বলেন, বাঘ দেখবেন কোথা থেকে? বাঘের নির্দিষ্ট একটি এলাকা আছে।  সে এলাকায় আপনারা যেতে পারবেন না। তবে একটা কথা শুনে রাখুন সুন্দরবনে কেবল বাঘের ইচ্ছে হলেই মানুষ তাকে দেখতে পায়। করমজালে কথা হয় মামুনের সঙ্গে। তার বাড়ি মোংলায়। প্রতিদিন নদী পার হয়ে করমজালে আসে। পেয়ারা-শসা আর বড়ই বিক্রি করছে এখন। বেশির ভাগ সময় মৌসুমি ফলমূলই বিক্রি করে। মামুনের কথাÑ সুন্দরবনের আনাচকানাচ তার নখদর্পণে। তার মতো এখানকার বাসিন্দাদের কাছে বাঘ হচ্ছে ‘মামা’। সকালে বেরুনোর আগে বনবিবির কাছে প্রার্থনা করে বেরিয়েছে মামুন।  সুন্দরবনের নরম মাটিতে বাঘের পায়ের চিহ্ন কয়েক ইঞ্চি ডুবে আছে। যেন কিছুক্ষণ আগে কেওড়ার শ্বাসমূল বাঁচিয়ে নেমে এসেছিল বাঘ। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টের একজন কর্মচারী ফ্যাকাসে মুখে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো। ‘মানুষখেকো, বেজায় চালাক। গত সপ্তাহে এক জেলের ওপর হামলা চালিয়েছিল। বেচারা ছুরি দিয়ে আত্মরক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বাঘটিই তার দফারফা করে ফেলে। তার কথা কানে আসতেই আমি ঢোক গিললাম। আগেই বলেছি দিনের মধ্যে দু’বার সুন্দরবন পানির নিচে ডুবে যায়। এখানকার বাঘদের তখন লবণাক্ত পানি পান ও আধা-জলজ জীবনযাপন করতে হয়। এ কারণে সুন্দরবনের বাঘ দক্ষ সাঁতারুও। এ বনের বাঘের লেজ শক্ত ও পেশিবহুল। সাঁতারের সময় পানিতে লেজ ঝাপটায় এটি। সুন্দরবনের বাঘ অন্য জায়গার বেঙ্গল টাইগারের মতো নয়। এর খাদ্যাভ্যাসও অন্যদের থেকে ভিন্ন। এ বনের বাঘেরা মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপ, বড় গুঁইসাপ ইত্যাদিও শিকার করে। সুন্দরবনের বাঘের সাপ শিকার করারও নজির আছে। তবে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। ক’দিন আগে একটি বাঘকে নদীর এপার থেকে ওপার যেতে দেখেছেন অনেকেই। কেউ কেউ এটি ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছেন।

সুন্দরবনের জেলে, কাঁকড়া শিকারী, মৌয়াল এদের বেশির ভাগই বিনা অনুমতিতে ও কোনো প্রকার আত্মরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া বনে প্রবেশ করে। আর এরা বাঘের জন্য বেশ সহজ শিকার। সহজে শিকার করা যায় বলেই মাঝেমধ্যে এ বাঘগুলো মানুষের ঘাড় মটকায়। কিন্তু গুজব আর মিথ ছাড়া সুন্দরবনকে চিন্তা করা যায় না। এসব চিন্তা করতে করতেই রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সকালে জাহাজের তিন তলায় উঠতেই দেখা হলো জাহাজের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঘুম হয়নি মনে হচ্ছে। বাঘের স্বপ্ন দেখলেন নাকি রাতে? ভয় পাবেন না। ও আমি প্রতি রাতে দেখি। ছোটবেলায় বাঘ মামা আর শিয়াল পণ্ডিতের গল্প শোনেননি, এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিংবা, ‘বনের রাজা কে? বাঘ নাকি সিংহ?’, এই ধাঁধার মাঝে পড়েননি, এমন মানুষের সংখ্যাও হাতেগোনা। সিংহকে বনের রাজা বলা হলেও বাস্তবে সিংহ কিন্তু বনে বাস করে না। পৃথিবীর বেশির ভাগ সিংহের বসবাস আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির সাভানা অঞ্চলে। অন্যদিকে, বাঘের বসবাস কিন্তু এশিয়ার মাত্র কয়েকটি দেশের বন-জঙ্গলে। বাংলাদেশ ও ভারতের কোল ঘেঁষা সুন্দরবন এই বাঘের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। একসময় পৃথিবীতে বাঘের নয়টি উপ-প্রজাতি ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বা দুইশ’ বছর আগে তিনটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং পৃথিবীতে এখন টিকে রয়েছে মাত্র ছয়টি উপ-প্রজাতির বাঘ। তবে আকৃতি এবং সৌন্দর্য্যে যেসব বাঘ খ্যাতিমান, তার মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার অন্যতম।

(সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০২৫)

mzamin

মুঘল ভারতের অলিন্দে by ড. মাহফুজ পারভেজ

বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে মানুষ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। একদল, যারা তাজমহল দেখেছে। আরেক দল, যারা দেখে নি। তাজমহলের শহর আগ্রাকে বলা হয় মুঘল ঐতিহ্যের হৃৎপিণ্ড। মুঘলদের যতগুলো রাজধানী ছিল, তারমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী হলো আগ্রা। মধ্যযুগের বিশ্বে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহর আগ্রায় এখনো বিশ্বের নানা প্রান্তের ভ্রমণ বিলাসী মানবস্রোত গভীর আগ্রহ নিয়ে উপসি'ত হয়। ভারতের পর্যটন ক্ষেত্রের মধ্যে যে কারণে শীর্ষে অবস্থান করছে আগ্রা। উত্তর ভারতের পথে-প্রান্তরে ভ্রমণের সূত্রে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নাভিমূল, মুঘল রাজধানী, তাজমহলের শহর আগ্রা সম্পর্কে সবিস্তারে হচ্ছে এই লেখায়। বর্তমানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অতীতের বিচিত্র উপাদান দিয়ে সাজানো হয়েছে লেখাটি।

বৃষ্টিস্নাত জয়পুর থেকে আগ্রার পথে
আমরা আগ্রায় প্রবেশ করি তুমুল বৃষ্টিপাতের মধ্যে। সারা উত্তর ভারতই তখন বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে। মধ্য সেপ্টেম্বরের বর্ষণে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রাদুর্ভাব। বৃষ্টিভেজা সড়ক পথে রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর থেকে আগ্রায় এসেই মুখোমুখি হলাম প্রবল বর্ষণের।
মধ্যযুগে ভারতের রাজধানী আগ্রা নানা কারণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত মুঘল স্থাপনায় উজ্জ্বল হয়ে আছে প্রাচীন আগ্রা। বাগিচা, প্রাসাদ ও দুর্গের নগরীতে ঢুকতেই গা ছমছমে ইতিহাসের পরশ পেলাম, যার কয়েকটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করেছে।
রাজনৈতিক ও যোগাযোগের দিক থেকে অত্যন্ত কৌশলগত স্থান হওয়ায় আগ্রাকে শাসনের কেন্দ্রস'ল রূপে বেছে নিয়েছিলেন মুঘলরা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগ্রায় প্রবেশের অনেকগুলো পথ রয়েছে। সম্ভবত এ কারণেই মধ্য এশিয়া থেকে আগত মুঘল বিজেতারা দিল্লি জয় করলেও রাজধানী বানিয়েছিলেন আগ্রায়। আগেকার মুসলিম শাসকদের হাতে গড়া রাজধানী দিল্লিকে ছেড়ে আগ্রায় ক্ষমতার মূলকেন্দ্র ও রাজধানী তৈরির পেছনে অনেকগুলো বিবেচনার মধ্যে আগ্রার কৌশলগত ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও যোগাযোগ সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

আগ্রা থেকে ভারতের সব দিকে যাওয়ার পথ সুগম। সব জায়গা থেকে আগ্রায় আসাও সহজ। উত্তর প্রদেশের অংশ হলেও আগ্রা দিল্লির কাছেই। পাঞ্জাব থেকে সন্নিকটে। রাজস্থান, গুজরাত হয়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের দিকেও পথ উন্মুক্ত। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকেও আসা যায় আগ্রায়। আর লক্ষ্ণৌ, আলিগড় ছুঁয়ে বিহারের পাটনা হয়ে বাংলায় যাতায়াতের সুবিধাও আগ্রার রয়েছে।
এক সময়ে ভারতের রাজধানী বা এক নম্বর শহর আগ্রা এখন উত্তর প্রদেশের চতুর্থ আর সারা ভারতের ২৪তম গুরুত্বপূর্ণ শহর। উত্তর ভারতের হিন্দি-উর্দু বলয়ের এই শহরের প্রধান ভাষা হিন্দুস্থানি তথা হিন্দি ও উর্দু। জনসংখ্যার ৮৫% ভাগ হিন্দু, ১০% মুসলমান আর বাকি জনসংখ্যা জৈন, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান। ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত হিন্দি পত্রিকা দৈনিক জাগরণ-এর প্রধান দপ্তর আগ্রায়, যদিও উত্তর ভারতের অন্যান্য শহর থেকেও পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় একযোগে।

আগ্রাকে বলা যায় উত্তর ভারত বা হিন্দি বলয়ের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন কেন্দ্র। মুঘল স্থাপনা ছাড়াও এখানে আছে ক্যান্টনমেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা। আগ্রার প্রধান দ্রষ্টব্য অবশ্য বিশ্বের বিস্ময় তাজমহল, আগ্রার দুর্গ ও সম্রাট আকবরের রাজধানী ফতেহপুর সিক্রি, যার প্রতিটিই ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিজেট বা বিশ্বসভ্যতার অংশ। এগুলো ছাড়াও ছোট-বড় আরও বহু দর্শনীয় স্থান, বাগ-বাগিচা-উদ্যান, হর্ম্য, প্রাসাদ, স্থাপনা ছড়িয়ে আছে আগ্রার সর্বত্র।
ভারতের প্রধান পর্যটন ডেসটিনেশন বা ভ্রমণ এলাকাকে বলা হয় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল বা সোনালি ত্রিভুজ, যার একবাহু দিল্লিতে, আরেক বাহু জয়পুরে এবং অন্য বাহু আগ্রায় মিশেছে। ত্রিভুজের মতো এই তিনটি এলাকাতেই ভারতের সিংহভাগ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন।

জয়পুর থেকে আসার কারণে আমরা পথে পেয়েছি উত্তর প্রদেশের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যার মধ্যে রয়েছে মথুরা ও বৃন্দাবন। জয়পুর-আগ্রা সুপার হাইওয়ে ধরে রিজার্ভ কারে চলতে চলতে সুবিধা মতো থেমে থেমে এগিয়েছি আমরা। পথের ধারে রাজস্থানী ধাবায় চা, নাস্তা করে দেখেছি ঊষর মরুময় প্রান্তরে সবুজের সমাবেশ। রঙ-বেরঙের শাড়ি ও ওড়নায় ঢাকা রাজস্থানের গ্রাম্য নারীদের। বিশালাকায় পাগড়ি মাথায় রাজস্থানের রাজপুত বা জাট। কখনো ময়ূরের সমাবেশ বা উটের বহর।
গ্রামের দিকে পুরুষদের সবারই বড় পাগড়ি ব্যবহারের রহস্য বুঝতে গিয়ে দেখলাম, এর সঙ্গে ঐতিহ্য ও বাস্তব প্রয়োজন মিশে আছে। রাজস্থানের মরুময় ও ঊষর ভূমি থেকে প্রচুর ধুলাবালি বাতাসে ছড়িয়ে থাকে। বিরাট পাগড়িতে নাক, মুখ, মাথা, শরীর ঢেকে ফেলার সুবিধা নিয়ে থাকেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
জয়পুর থেকে আগ্রা যেতে একটি পাহাড়ের ভেতরের সংক্ষিপ্ত ট্যানেল পেরিয়ে ধরতে হয় দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের মাঝ দিয়ে প্রসারিত সুপার হাইওয়ে। ২০০ মাইলের এই দূরত্ব নৈসর্গিক দৃশ্যে ভরপুর। পথের পাশে হাট, বাজার ও ছোট ছোট শহর। আর আছে প্রতিমা ও পূজার মঞ্চ তৈরির কুটির শিল্প। মার্বেল ও গ্রাফাইট পাথর কেটে কেটে বানানো হয় মনোরম প্রতিমূর্তি, যেজন্য যোধপুর, কিষাণগড়, জয়সালমের থেকে আসে বাহারি পাথর।

রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের সীমানায় হিন্দু তীর্থক্ষেত্র মথুরা ও বৃন্দাবন জয়পুর-আগ্রা সড়কের পাশেই। ফলে পূজার সামগ্রী ও প্রতিমা বানানো আর বিক্রির জমজমাট বাজার চারপাশে। হিন্দু ধর্মের ভাবাবেগ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে এই নির্দিষ্ট স্থানে।  
সড়কের রাজস্থান অংশ পেরিয়ে উত্তর প্রদেশে ঢুকতেই হিন্দি ভাষা, পোশাক, পরিচ্ছদে পার্থক্য দেখা গেল। রাজস্থানের হিন্দিতে গুজরাতি, মাড়োয়ারি ও পাঞ্জাবি টান বদলে গেল। উত্তর প্রদেশের হিন্দিতে পাওয়া গেল উর্দু আর বিহারি হিন্দির প্রভাব। হিন্দি ভাষার অনেকগুলো উপভাষা ও কথ্যরূপ আছে। যার মধ্যে মৈথিলি, ভোজপুরি, ব্রজবুলি ইত্যাদি অন্যতম। বিশাল উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়ের নানা প্রান্তে চর্চিত হচ্ছে হিন্দি ভাষার একেকটি ধারা।    
মথুরা ও বৃন্দাবনে এক চক্কর দিতে গিয়ে পেলাম পেয়ারিলালকে। অবসর নিয়ে ফৌজি ধাবা নামে জলপানির দোকান চালাচ্ছেন তিনি। চাকরি করেছেন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামেও। ভাঙা ভাঙা বাংলা জানেন। ঢাকা ও বাংলাদেশের অনেক কথা বললেন তিনি।
কৃষ্ণের কারণে মথুরা আর রাধার জন্য বৃন্দাবন প্রসিদ্ধ। স্থান দুটি বৈষ্ণব ভাবধারার হিন্দুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মন্দির আর ভক্তের উপসি'তিতে মুখর স্থান দুটি। একটির থেকে আরেকটি মোটামুটি নিকটবর্তী। তবে বৃন্দা বা তুলসী বন নামে পরিচিতি বৃন্দাবনে নগরায়ণের ফলে বনাঞ্চল কমছে। কিন' ভক্তি-মিশ্রিত ধর্মীয় ভাবাবেগ আর প্রেমের বাতাবরণ সেখানে অটুট। বার্ডস আই ভিউ ধরনের সংক্ষিপ্ততম চোখের দেখা দেখে ফিরে আসার সময় আর্দ্র হৃদয়ে বাজে দুটি লাইন:
সে কি মথুরায় থাকে আমায় ভুলে
বাজে বাঁশি যুগে যুগে যমুনা কূলে।

ধর্মীয় ভক্তির নিদর্শন কিন' ভারতের দ্রষ্টব্য স্থানগুলোতে খুবই স্পষ্ট। রাজস্থানের মুসলিম ধর্মীয় কেন্দ্র আজমির থেকে খানিক এগিয়ে গেলে টিলা ও মরুর উপান্তে পৃথিবীর একমাত্র ব্রহ্মা মন্দির পুষ্পর। সেসব স্থানে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমাদের মূল আকর্ষণ যেহেতু আগ্রা, তাই পথের দ্রষ্টব্য স্থানগুলোতে যথেষ্ট সময় দেয়া যায় নি। এমনিতেই বৃষ্টি পিছু নেওয়ায় গাড়ির গতি কমিয়ে রেখেছে ড্রাইভার সুরজিৎ। এসিতে বসে গাড়ির এফএম রেডিওতে রাজস্থানী কান্ট্রি মিউজিক শুনতে শুনতে চলে এলাম আগ্রার কাছাকাছি। আগ্রার শহরে প্রবেশের আগে আগে পথে পড়লো বিখ্যাত ফতেহপুর সিক্রি। দিল্লি হয়ে এলে মূল আগ্রা শহর আগে পড়তো। আমরা বিপরীত দিক দিয়ে আসায় এ সুবিধা পেলাম। ভোরে রওয়ানা দিয়ে থেমে থেমে ১১টা নাগাদ ফতেহপুরের সামনে পৌঁছে গেলাম। মূল সড়ক থেকে ডানে মোড় দিয়ে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে ফতেহপুর সিক্রি। যদিও হাইওয়ে থেকে ফতেহপুর সিক্রির প্রাচীর ঘেরা দুর্গ-সদৃশ্য বিশালাকায় নগরীর আবছায়া দেখা যায়, তথাপি এতে প্রবেশ করতে হয় মূল সড়ক থেকে উপপথ ধরে খানিকটা ভেতরে এসে।

আমরা ঠিক করেছি দুপুরটা এখানে কাটিয়ে বিকালে যাবো আগ্রা শহরের মূল আকর্ষণ বিশ্বের বিস্ময় তাজমহলে। তারপর রাতে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন আগ্রার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানে। যমুনা তীরে স্থাপিত ইতিহাসের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময় ঐতিহাসিক আগ্রা-ফতেহপুরের বৃষ্টিভেজা বাতাসের স্পর্শে কেমন একটা শিহরণ দোলা দিল শরীর ও মনে। গাড়ি থেকে নামতে সময় লাগলো কিছুটা। তন্ময় চোখে ফতেহপুর সিক্রিতে প্রবেশের অতিকায় বুলন্দ দরওয়াজা নামের রাজকীয় তোরণের দিকে তাকাতেই মনে হলো ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছি ইতিহাসের অলিন্দে।  

ফতেহপুর সিক্রি
পরিত্যক্ত মুঘল রাজধানীতে ষোড়শ শতকে শুরু হয়ে (৩০ এপ্রিল, ১৫২৬) ঊনিশ শতকে সমাপ্ত (১৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৭) কয়েক শতাব্দীব্যাপী মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে মাত্র ১৪ বছর রাজধানী ছিল ফতেহপুর সিক্রি। সে আমলে রাজা-বাদশাহের খেয়াল-খুশির অন্ত ছিল না। আর সেসব ছিল বড়ই বিচিত্র ও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের চেয়ে অনেক আলাদা। ফতেহপুর সিক্রিতে মিশে আছে সেইসব রাজসিক খেয়ালের খানিকটা ঝলক।
স্বল্প জীবনপ্রাপ্ত হলেও ফতেহপুর সিক্রির দীর্ঘ ইতিহাস ও তাৎপর্য আছে। ১৫৭১ সালে এখানে রাজধানী বানিয়ে তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালেই তা সরিয়ে নেন। ১৬১০ সালে শহরটি সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হয়। পরিত্যক্ত হয়ে নিঃসঙ্গভাবে পড়ে থাকে বিশাল স্থাপনাসমূহ, যা এখন ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের অংশ।

রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ফতেহপুর সিক্রির সঙ্গে মিশে আছে আধিভৌতিক রহস্যময়তা। কালের করাল গ্রাসে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন রাজধানীর পাদদেশে টুপটুপ বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে সেই পরশ এসে শরীরে লাগলো। খানিক অপেক্ষার পর বৃষ্টির আঁচ কমে এলে আমরা ফতেহপুরের ভেতরে প্রবেশ করি আর তখনো এর অতীত ও ইতিহাসের গুঞ্জন সঙ্গী হলো আমাদের।
সম্রাট আকবর এখানে রাজধানী স্থাপন করার আগে সিক্রি নামের একটি গ্রাম ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর এ জায়গাটি চিনতেন এবং পছন্দও করতেন। ফলে জায়গাটি মুঘলদের কাছে অচেনা-অজানা ছিল না। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সিক্রি নামটি সম্রাট বাবরের দেওয়া। বাবর এই এলাকাটিকে বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য অনেকবার ব্যবহার করেছিলেন এবং সিক্রির নিকটবর্তী সীমান্তে রাজস্থান-পাঞ্জাব হয়ে আগত মহারাজা রানা সংগ্রাম সিংহের বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।
বাবরের জীবনীকার বেভারেজ লিখেছেন, রানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করে বাবর এখানে ফতেহবাগ বা বিজয় উদ্যান নামে একটি বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্য এশিয়ান মুঘলদের উদ্যানপ্রীতি ছিল সর্বজনবিদিত। তারা যেখানেই কর্তৃত্ব করেছে, সেখানেই সুপরিকল্পিত বাগান বা উদ্যান বানিয়েছেন। বাগানকে তারা বলতেন  গুলিস্তাঁ। আগ্রার চারদিকে শত শত বছর পরেও ছড়িয়ে আছে মুঘল রাজন্যদের উদ্যানপ্রেমের চিহ্ন। দিল্লি, ঢাকা, কাশ্মীর, লাহোর, সর্বত্র মুঘল-প্রতিষ্ঠিত বাগানের দেখা পাওয়া যায় এখনো।
ফতেহপুরে বাবরের বাগান সম্পর্কে তার কন্যা ও সম্রাট হুমায়ূনের জীবনী হুমায়ূননামা-এর রচয়িতা গুলবদন বেগম লিখেছেন, বাবর সেই বাগানে একটি আটকোণা চাতাল বানিয়েছিলেন, যা তিনি বিনোদন ও লেখার কাজে ব্যবহার করতেন। তিনি নিকটবর্তী ঝিলের মাঝখানে একটি বেদিও নির্মাণ করেন।
     
সম্রাট আকবর রাজধানী বানানোর সময় (১৫৭১) জায়গাটির কোনো আনুষ্ঠানিক নামকরণ করেন নি। রাজকীয় ফরমান দিয়ে ফতেহপুর বা বিজয়ের শহর নামটি প্রতিষ্ঠা করেন আরো পরে, ১৫৭৩ সালে গুজরাট জয় উপলক্ষে। তারও আগে, ১৫৬৯ সালে বেশ পরিণত বয়সে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে আকবরের ঔরসে। আগে থেকেই এখানে শেখ সেলিম চিস্তি নামে একজন বুজুর্গ পিরের খানকাহ বা আশ্রম ছিল এবং পিরের দোয়ায় আকবর পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন বলে পুত্রের নামও রাখা হয় পিরের নামানুসারে, সেলিম, যিনি পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে খ্যাত। জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় জন্মদিনেই আকবর এখানে রাজধানী নির্মাণ শুরু করেন।  

জয়পুর-আগ্রা হাইওয়ে থেকে ডানে মোড় দিয়ে যে গলিপথ, তাতে কিছুদূর এগিয়ে আবার ডানে কিঞ্চিত উপরের দিকে উঠতে হয় ফতেহপুর সিক্রিতে যেতে। আকবর বাদশাহের এই রাজধানী নগরীটি কিছুটা উচ্চভূমিতে অবসি'ত। নগরের প্রবেশের মুখেই বুলন্দ দরওয়াজা নামে বিশাল গেট। মধ্যযুগের বিবেচনায় সুবিশাল তোরণে এক সুপরিকল্পিত নগরীর প্রাচীন প্রচ্ছায়া ভেসে আসে প্রথম দর্শনেই। মুঘল পূর্ব-পুরুষ তৈমুর লং মধ্য এশিয়ার রীতির সঙ্গে পারসিক আদলের মিশেলে যে স্থাপত্যশৈলীর প্রচলন করেছিলেন, সম্রাট আকবর সেভাবে ফতেহপুর সিক্রি নির্মাণ করতে চাইলেও এতে স্থানীয় স্থাপত্যরীতির মিশেল হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পার্শ্ববর্তী রাজস্থানে প্রচুর ও বিচিত্র বেলেপাথর থাকায় ভেতরের অট্টালিকাগুলো পাথুরে এবং অধিকাংশই লালচে রঙের। মুঘলরা সাধারণত লাল আর সাদা, এই দুই রঙের প্রতি তাদের আগ্রহ দেখিয়েছেন। মুঘল স্থাপনাগুলোর যেগুলো ধর্মস্থান বা সমাধিস'ল, সেগুলো সাধারণ সাদা আর রাজকীয় অন্যান্য নির্মাণের ক্ষেত্রে লাল রঙের প্রাধান্য দিয়েছেন তারা।    
 
মুঘলরা ভারতকে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও স্থাপত্য উপহার দিয়েই শেষ করেন নি, এখনো আয়ের পথ খুলে দিয়ে গেছেন। টিকিট কেটে ঢুকতে হচ্ছে এসব স্থাপনায়। এতে ভারতীয়দের জন্য টিকিটের দাম কম হলেও বিদেশিদের জন্য যথেষ্ট উচ্চমূল্য। তাজমহল, আগ্রা ফোর্ট, কুতুব মিনারসহ বিভিন্ন মুঘল ও মুসলিম স্থাপনায় লাখ লাখ পর্যটক কোটি কোটি টাকা দিচ্ছে ভারত সরকারের তহবিলে। টিকিটের পাশাপাশি দালাল ও গাইডের লম্বা বহর। সব কিছু চিনিয়ে-জানিয়ে দেওয়ার জন্য পিছু নেয় তারা। ভারতের মুঘল ঐতিহ্য এমনই এক নিঃশেষ-না-হওয়া বিষয়, যা এখনো খুলে রেখেছে কর্মসংস্থান ও রোজগারের পথ!

বৃষ্টির কারণে ফতেহপুর সিক্রিতে ভিড় কম। দালাল ও গাইডরাও তেমন নেই। ড্রাইভার সুরজিৎ সঙ্গী হলো আমাদের। রাজপুত যুবক এ পথে পর্যটক আনা-নেওয়া করতে করতে ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্থান-কাল সম্পর্কে বেশ ওয়াকেবহাল। যথারীতি বুলন্দ দরওয়াজা দিয়েই প্রবেশ করি আমরা। তবে বাদশাহী দরওয়াজা নামে আরেকটি প্রবেশদ্বারও রয়েছে। লাল-হলুদ বেলে পাথরে নির্মিত ফটকে সাদা-কালো মার্বেল দিয়ে নকশা করা। মাটি থেকে ৫৪ মিটার লম্বা দরওয়াজা পর্যন্ত পৌঁছাতে ৪২টি সিঁড়ির ধাপ উঠতে হলো। দরজার পাল্লাগুলো কাঠের কারুকাজ করা এবং এর মাথায় এক সারি প্যারাপেট ও পেছনে তিনটি ছত্রী রয়েছে। মূল দ্বারের দেওয়ালে খোদাই করা আছে ধর্মকথা, যাতে এই বিশ্বের নশ্বরতার উল্লেখ করে অবিনশ্বর সৃষ্টিকর্তার গুণ কীর্তন করা হয়েছে। বুলন্দ বা সুমহান নামে খ্যাত প্রবেশ তোরণে সৃষ্টিকর্তার মহিমাব্যঞ্জক বাণী থাকাই স্বাভাবিক।

ফতেহপুরের ভেতরে প্রাসাদ প্রাঙ্গণ, যেখানে জ্যামিতিকভাবে সজ্জিত বেশকিছু চাতাল দেখা গেল। রয়েছে বুজুর্গ-পির সেলিম চিস্তির মাজার শরিফ। দুর্দান্ত শিল্প ভাবনা ও নান্দনিক স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দু ফতেহপুর সিক্রির চারদিকে তাকিয়েই নিজের বোকামির জন্য লজ্জিত হলাম। বৃষ্টিসিক্ত বিরূপ আবহাওয়ায় আর স্বল্প সময় নিয়ে এখানে আসার কোনও মানেই হয় না। পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে অনুসন্ধান করে দেখতে হলে দীর্ঘ সময় নিয়ে এখানে আসাই শ্রেয়। তা না হলে দুই মাইল লম্বা ও এক মাইল চওড়া প্রাসাদ আর প্রাঙ্গণ সমৃদ্ধ রাজধানী শহর ভালো করে দেখা মোটেও সম্ভব নয়।
পুরো ফতেহপুর সিক্রি পাঁচ মাইল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মনে করা হয়, রাজপুত, জাঠ, মারাঠা, শিখ আক্রমণের কারণে শহরটিকে দুর্গ-সদৃশ্য করা হয়েছে মুঘল যুদ্ধরীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলের আলোকে। আগ্রা দুর্গও তেমনি। রাজস্থানেও দুর্গ শহর দেখেছি। মধ্যযুগের শহরগুলো সামরিক নিরাপত্তার কারণে সুদৃঢ় প্রাচীর বেষ্টিত দেখতে পাওয়া যায়। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, শত শত বছর পরেও প্রাচীরগুলো বেশ মজবুত ও সুরক্ষিত।

সুললিত ও সুসজ্জিত ফতেহপুর আবাস দেখে মুঘলদের পরিচ্ছন্ন রুচি ও গুছানো প্রশাসনিক কার্যক্রমের নমুনা বোঝা যায়। রাষ্ট্রীয় কাজ, বসবাস, আহার, বিহার, বিনোদন ও অন্যান্য তৎপরতায় জীবনকে চমৎকার অবকাঠামোয় প্রবাহিত করেছিলেন মুঘলরা। তৎকালের ভারতে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, খাদ্য, উন্নত প্রশাসনের পাশাপাশি যুক্ত করেছিলেন স্থাপত্য সুষমায় ঋদ্ধ নান্দনিক বসবাসের আমেজ।
হাতের সময়কে যথাসম্ভব কাজে লাগানোর পরও ফতেহপুর সিক্রি পুরো ঘুরে না দেখতে পারার অতৃপ্তি নিয়ে ফিরতে হলো। ভেতরে অনেক ছোট বড় স্থাপনা, মহল, প্রাঙ্গণ এবং এসবের ইতিহাস ও শিল্প গুণ পরখ করে দেখার জন্য পুরো একটি দিনও মনে হয় যথেষ্ট নয়। অনুচ্চ ফতেহপুর সিক্রির চারপাশে প্রসারিত বিশাল ভারতের সবগুলো দিক, যেখানে বসে মধ্য এশিয়ার পারস্য-তুর্কি-মোঙ্গল ঐতিহ্যের মুঘলরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমাজের শৈল্পিক রূপান্তর সাধন ও সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ করেছিলেন, যার ঐতিহাসিক প্রভাব আজও অম্লান।  

কয়েক শত বছর মুঘলরা ভারত শাসন করে চুঘতাই তুর্কি ও পার্শি ভাষা এবং মধ্য এশীয় সংস্কৃতির নানা উপকরণের মিশেলে হিন্দি ও উর্দু ভাষা, হিন্দুস্থানী সঙ্গীত, রুচি, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভাসে যুক্ত করেছিলেন অভাবনীয় উৎকর্ষতা। ফতেহপুর সিক্রিতে দাঁড়িয়ে মনে হলো, তারা ছিলেন মিলনের দূত। তারা না ছিলেন বিদেশি, না ছিলেন এদেশীয়। তারা ছিলেন এ উপমহাদেশের গঙ্গা-যমুনা-সিন্ধু বাহিত বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক স্রোতধারা আর বর্ণময় শিল্পকলার সুসমন্বয়ের প্রতীক। উন্নত সকল কিছুর মিশ্রণে ও ভালোবাসায় ভারতকে তারা সাজিয়ে ছিলেন আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে।

মুঘলরা একই সঙ্গে তৈমুর ও চেঙ্গিস খানের বংশধারার ঐতিহ্য বহন করলেও তাদের ধমনীতে মিশেছিল উপমহাদেশীয় রক্ত। এজন্যই তারা ছিলেন দেশজ কাঠামোতে উত্তর-পুরুষের ঐতিহ্যের সংস্থাপক। ইতিহাস বলে, শুধুমাত্র বাবর ও হুমায়ূন ছিলেন প্রকৃত মধ্য এশীয়। আকবর ছিলেন পার্শিয়ান হামিদা বানুর গর্ভজাত অর্ধেক ইরানি। মাতা যোধাবাঈ-এর কারণে জাহাঙ্গীর ছিলেন অর্ধেক রাজপুত। পূর্বের বাংলা থেকে পশ্চিমের কাবুল আর উত্তরের কাশ্মীর থেকে দক্ষিণের কাবেরী নদী পর্যন্ত শাসন করেছিলেন তারা মৈত্রী, সমন্বয় ও মিলনের মাধ্যমে। ৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার জায়গায় ১৫০ মিলিয়ন মানুষকে নিয়ে যে সাম্রাজ্য ভারতবর্ষে মুঘলরা শাসন করেছিলেন, তা ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ এবং সমৃদ্ধতম দেশ, যার অপসৃয়মান ঝলক এখনো মিশে আছে আগ্রা, দিল্লি, লাহোর, হায়দরাবাদ, লখনৌ, ঢাকা এবং সংক্ষিপ্ততম রাজধানী ফতেহপুর সিক্রির সুনিপুণ বিন্যাসে।       

ফতেপুর সিক্রির শান বাঁধানো চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে অতীত ঐতিহ্যের সেইসব কথা বার বার প্রতিধ্বনি তুলেছে মনের অজান্তেই। বার বার মনে জাগে, শ্রেষ্ঠ মুঘল সম্রাট ও নগরের গোড়াপত্তনকারী আকবরের কথাও। স্বল্প সময়ের রাজধানী হলেও ফতেহপুর সিক্রিতে আকবর তার অভিনব দ্বীন-ই-ইলাহি বিষয়ে নানা ধর্মের পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনায় মত্ত হতেন। আকবরের তারিখ-ই-ইলাহি-এর জন্মস্থানও ফতেহপুর সিক্রি, আকবরের যে বর্ষগণনা রীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ। নিঃসন্তান আকবরের শেষজীবনে একমাত্র পুত্রও পির সেলিম চিস্তির দোয়ায় ভূমিষ্ঠ হয় ফতেহপুরের মাটিতে। আর এখানেই পরবর্তীকালে শেষ দিকের মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের প্রতিনিধি সৈয়দ হাসান আলি খানকে হত্যা করা হয় ঔপনিবেশিক ইংরেজ দখলদারদের ইঙ্গিতে। মুঘলরা দুর্বল হলে এই পরিত্যক্ত রাজধানী কখনো মারাঠা, কখনো রাজপুত, জাঠ বা শিখ জাতির দখলে আসে। সর্বশেষে ইংরেজরা ভারত দখল করে তারা এখানে গড়ে সেনা ছাউনি। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই হয়েছে এই সংক্ষিপ্তকালের রাজধানী শহরে। ফলে এখানে রয়েছে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পাশাপাশি আনন্দ ও বেদনার প্রবহমান অশ্রুধারা। বৃষ্টিভেজা ফতেহপুর সিক্রি ঘুরে ইতিহাস ছুঁয়ে আগ্রায় ফিরে আসার সময় সেসব কথাই দোলা দিয়েছে মনে।

প্রেম ও বেদনার মহাকাব্য তাজমহলে
তাজমহলের সামনে এসে আমি বৃষ্টির সঙ্গে ভেঙে পড়লাম বিষাদে। পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্য শ্বেতমর্মরকাব্য নামে পরিচিত তাজমহলও কম বেদনার্ত নয়। যার বুকের উপর দাঁড়িয়ে অনিন্দ্য সুষমাময় তাজ, সেই মমতাজ মহল দেখতে পারেন নি তাজকে। প্রেমে ও আবেগে আপ্লুত নির্মাতা সম্রাট শাহজাহানও বন্দি জীবন কাটিয়েছেন অদূরের আগ্রা দুর্গে, সেখান থেকে তাজের দিকে চেয়ে চেয়ে তার চোখ হয়েছে অশ্রুসিক্ত, হৃদয় বেদনা-দীর্ণ ও রক্তাক্ত। কারণ তাজের চত্বরেই প্রিয়তমা স্ত্রীর শেষশয্যার অদূরে সমাহিত করা হয় তার প্রিয় পুত্র, ভ্রাতৃঘাতী ক্ষমতার লড়াইয়ে পরাজিত দার্শনিক রাজপুত্র দারাশিকোহ’র মস্তক-বিহীন দেহ। (তার কর্তিত মস্তক সমাহিত রয়েছে দিল্লিতে, হুমায়ূনের কবরগাহ বা মাকবারায়)।

আরজুমান্দ বানু নামে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীর ফুফু ছিলেন মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান। ১৬০৭ সালে পারস্য বংশধারার এই কিশোরীর প্রেমে পড়েন শাহজাদা খুররম, যিনি পরে পরিচিতি লাভ করেন সম্রাট শাহজাহান নামে। প্রেম ও পরিচয়ের পাঁচ বছর পর ১৬১২ সালে আরজুমান্দকে বিয়ে করে শাহজাহান নাম স্ত্রীর দেন মমতাজ মহল বা প্রাসাদের রত্ন। সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের শেষে ১৪তম সন্তানের (কন্যা গওহর বেগম) জন্ম দিতে গিয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মমতাজ মারা যান। ব্যথিত শাহজাহান, আরো স্ত্রী থাকার পরেও মমতাজের প্রেম ও স্মৃতি ভুলতে পারেন নি। মমতাজের সমাধিস'লে তাজমহল নির্মাণ শুরু করেন তিনি।   
১৬৩১ সালে মমতাজের মৃত্যুর পরের বছর (১৬৩২) শাহজাহান তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু করেন। মূল সমাধি ছাড়াও উদ্যান আর অন্যান্য স্থাপনা নিয়ে তাজমহল নামে বিরাট কমপ্লেক্সের মূল নির্মাণ ১৬৪৮ সালে এবং সামগ্রিক নির্মাণকাজ ১৬৫৩ সালে শেষ হয়। অনেক শিল্পী ও নকশাকারক ছাড়াও দেশ-বিদেশের ২০ হাজার সুদক্ষ কর্মী জড়িত ছিলেন তাজমহল নির্মাণে। এদের মধ্যে উস্তাদ আহমেদ লাহোরীর নাম রয়েছে সর্বাগ্রে। এছাড়াও পারস্য থেকে আনা হয় স'পতি ঈসাকে। বেনারসের পুরু নামের একজন কিছু কাজ করেন। বড় গম্বুজটির নকশা করেন উসমানিয়া সাম্রাজ্য থেকে আগত তুর্কি শিল্পী ইসমাঈল খান। বড় গম্বুজের শীর্ষে স্বর্ণের দণ্ড নির্মাণ ও স্থাপন করেন লাহোরের কাজিম খান। পাথর খোদাইয়ের কাজের নেতৃত্ব দেন দিল্লির ভাম্বর চিরঞ্জিলাল। পারস্যের সিরাজ থেকে এসেছিলেন চারুলিপিকর আমানত খান, যার নাম তাজমহলের প্রবেশ পথের দরজায় প্রত্যায়ন করা হয়েছে। পুরো কাজের রাজমিস্ত্রিদের নেতৃত্ব দেন মোহাম্মদ হানিফ। ইরানের মীর আ. করিম ও মুকার্রিমাত খান সমগ্র কাজের ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক হিসাবের দায়িত্বে ছিলেন। মোটামুটি এমন কয়েকজনের নাম নানা সূত্রে উল্লিখিত হলেও তাজমহলের পেছনে আরও বহু শিল্পী ও শ্রমিক যে নিয়োজিত ছিলেন তা এর বিরাট এবং সূক্ষ্ম কাজের দিকে তাকালেই বুঝা যায়।  

তাজমহলে প্রবেশের তিনটি গেট আছে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া তাজের শুভ্রতা ও সৌন্দর্য ম্লান করছে বলে বেশ দূরে গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। আমরা নগরীর বিশাল রাজপথ ছেড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তাজে প্রবেশের অপেক্ষাকৃত সরু গলিপথের মুখে আসি। সেখানে বেজায় ভিড়। গাইড, টাঙ্গা, ব্যাটারিচালিক ও মানবচালিত রিকশার হট্টগোল। আরো আছে হুইলচেয়ারের সারি এবং সাহায্যকারীদের দল। এদের এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াও বেশ মুশকিল। বছরে যাকে দেখতে ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন পর্যটক আসেন, সেখানে ভিড় হবে না তো কোথায় হবে!

তাজের আশেপাশে প্রাচীন মুঘল ধরনের নগর বিন্যাস দেখা গেল, যদিও পুরনো কাঠামো বদল করে অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল গড়ে উঠেছে সেখানে। তাজের চারপাশের জায়গাটির নাম তাজগঞ্জি বা মুমতাজাবাদ। তাজের দক্ষিণ দিকে এলাকাটি নির্মাণ করা হয়েছিল দর্শনার্থীদের জন্য থাকার সরাইখানা ও অন্যান্য প্রয়োজনে। এখন নানা দোকানে গিঞ্জি অবস্থা সেখানে। এসব ভিড় ঠেলে আসতে হলো মূল ফটকের কাছে এবং যথারীতি টিকিট কেটে ঢুকতে হলো ভেতরে। 
 
তাজ আসলে একটি নয়, অনেকগুলো স্থাপনার মিলনে একটি উদ্যানময় কমপ্লেক্স। মমতাজের মূল সমাধিস'লই তাজমহল নামে পরিচিতি। তাজমহল তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নকশার ভিত্তিতে, যাতে মুঘল, পারস্য, তুর্কি, কুর্দি, মধ্য এশীয় তৈমুর প্রভাব রয়েছে। সমরখন্দে তৈমুর নির্মিত গুর-ই-আমির-এর পরোক্ষ প্রভাব এখানে কেউ কেউ লক্ষ্য করেন। যদিও মুঘলদের দুর্গ, লালকেল্লা, জামে মসজিদ, দেওয়ানে খাস, দেওয়ানে আম ইত্যাদিতে মধ্য এশীয় প্রভাব সুবিদিত।
তাজমহলের ক্ষেত্রে ভবন, মিনার, কারুকাজ, লিপি, অলংকরণ ইত্যাদির মধ্যে সুসমন্বয় রক্ষা করা হয়েছে চমৎকারভাবে। বাগানের বিন্যাসেও মুঘল, পারস্য, তুর্কি শিল্প ও স্থাপত্য কলাকে একাকার করা হয়েছে। প্রথম দর্শনের সবুজ গালিচাময় পুষ্পিত বাগানের মধ্যে শ্বেত-শুভ্র তাজমহল ও পুরো কমপ্লেক্সকে দেখে মনে হয়েছে শান্ত-সমাহিত এমন এক উদ্যান, যা পৃথিবীর কোলাহল ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে একখণ্ড নান্দনিক পরিসর ও স্বর্গীয় আরাম।
খুব কাছে থেকে নয়, তাজমহলের সামনের চত্বরের বাগানে দাঁড়িয়ে দেখলে চোখের সামনে তাজের সামগ্রিক সৌন্দর্য প্রস্ফূটিত হয় সবচেয়ে বেশি। বাগানটি চারটি অংশে বিভক্ত এবং একে বলা হয় চারবাগ বা চারটি বাগান। বাগানের মাঝখানে স্বচ্ছ জলের চৌবাচ্চা, যেখানে তাজের প্রতিবিম্ব জলে টলমল করে। ভেতরের পুরোটাই পাকা ও চিলতে সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত, যে হাঁটা-সড়কের চারপাশ পুষ্পিত ও বৃক্ষময়।

তাজমহলের চত্বরটি বেলে পাথরের দুর্গের মতো দেয়াল দিয়ে তিন দিক থেকে বেষ্টিত। এতে মমতাজের বড় ও আরো কয়েকটি ছোট সমাধিক্ষেত্র রয়েছে। এতে কিছু কিছু লাল বেলে পাথরও ব্যবহার করা হয়েছে। সমাধি ছাড়াও দেয়াল, স্তম্ভ ইত্যাদি অপূর্ব নান্দনিক অলংকরণে সমৃদ্ধ। বরফি-কাটা ঝালর, খিলান, প্রভৃতির জ্যামিতিক বিন্যাস পুরো স্থাপনাকেই শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় উজ্জ্বলতর করেছে। তাজ কমপ্লেক্সের মধ্যে অনন্য সুন্দর একটি মসজিদও রয়েছে।
শুধু ভবন নয়, প্রসারিত দেয়াল আর তাজের গম্বুজ ও মিনারের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেও কোনো ক্লান্তি আসে না। কেন হাজার হাজার মানুষের এতো বছর লেগেছিল তাজ বানাতে, তা টের পাওয়া যায় শৈল্পিক কাজের দিকে নজর দিলে। গম্বুজ ও মিনারের সৌন্দর্য ছাড়াও কারুকাজ, জালির কাজ, অলংকরণ, হস্তলিপি, খোদাই, সূক্ষ্ম কাট-স্টাইলে দেয়াল বা আচ্ছাদনের ঝালক পুরো আয়োজনকে একটি সামগ্রিক শিল্পকর্ম বা আর্টপিসে রূপ দিয়েছে। দূরের তাজমহল কাছে থেকে দেখলে মনে হয়, রাজকীয় পোশাক পরিহিত তার প্রতিটি অঙ্গ ও অংশ। প্রতিটি স্থানে শিল্পীর নানা রকমের স্পর্শ উদ্ভাসিত। কোথাও পারস্য ইমেজ তো কোথাও তুর্কি চিত্রময়তা কিংবা কোথায় মধ্য এশীয় স্টাইলের সমুন্নত রূপ।

সমাধি সৌধ মূল কেন্দ্রে রেখে সমগ্র তাজ কমপ্লেক্স প্রায় তিন একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। এতো মানুষের অংশগ্রহণ ও দীর্ঘ সময় ছাড়াও তাজের নির্মাণ সামগ্রীতে ছিল তৎকালের বিশ্বসেরা উপাদান। নির্মাণসামগ্রী আনাতে মানুষের পাশাপাশি হাজার হাজার হাতি ব্যবহৃত হয়। রাজস্থানের স্বচ্ছ আলো-প্রবাহী পাথর, পাঞ্জারের মার্বেল ও রঙিন পাথর, চীন দেশের সবুজ রত্ন ও স্ফটিক, তিব্বতের ফিরোজা পাথর, আফগানিস্তানের নীলকান্তমণি, শ্রীলঙ্কার বর্ণময় পাথর ও রত্ন তাজমহলের নির্মাণের সময় সৌন্দর্য বিধানের কাজে ব্যবহার করা হয়। আর নির্মাণে খরচ করা হয় তৎকালীন সময়ের আনুমানিক ৩২ মিলিয়ন রুপি, যা আজকের হিসাবে অকল্পনীয়ভাবে এক বিশাল অঙ্ক।   

তাজমহল নিয়ে ভাবালুতা ও আবেগ আসা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। নির্মম শাসক ও বহু নারীর স্বামী হয়েও যে প্রেমের প্রকাশ ঘটানো যায়, তাজমহল সে প্রমাণবহ। তাজমহল মুঘল নির্মাণশৈল্পী ও সৌন্দযপ্রিয়তার বিশ্বজনীন নিদর্শনও বটে। প্রেম ও সৌন্দর্যে তাজ এতোই আকর্ষক যে ভারতের সিংহভাগ পর্যটকের প্রায়-সবাই এখানে আসেন, যাদের মধ্যে বিদেশিই বেশি। বৃষ্টির হাল্কা দাপটের মধ্যে আমরা যখন তাজমহল পরিদর্শন করি, তখনো পর্যটকদের কমতি ছিল না। অধিকাংশই ছিলেন বিদেশি এবং নানা বয়সের।
সন্ধ্যার মুখে তাজ কমপ্লেক্স থেকে ফিরে আসার সময় বৃষ্টিভেজা মেঘলা আকাশের কারণে রাতের চন্দ্রালোকে তাজের আরেক মায়াবী রূপ দেখার সুযোগ ঘটেনি। তাজের মূল গম্বুজ আর চারটি মিনার ও কারুময় দেয়াল, খিলান, গম্বুজ, হর্ম্য, ঝালর থেকে পাশের যমুনা নদীতে জোছনা ছুঁয়ে চির শায়িত মমতাজ মহলের বিষাদ মিশে যাওয়ার ছবিটিও দেখা হলো না। বরং নিজের ভেতরে কেন যেন টের পাওয়া গেল অন্য রকম অচেনা এক তরঙ্গ। উত্তর ভারতের ঐতিহাসিক বাতাসে ভেসে আসা সে তরঙ্গে হাহাকার নয়, প্রেম নয়, বেদনা নয়, আনন্দ নয়, মিলন নয়, ছিল অন্যরকম, অন্য কিছুর পরশ, যা এসে মিশে যাচ্ছিল হৃদয়ের মর্মমূলে, পাওয়া-না-পাওয়ার মাঝখানের গভীর শূন্যতায়।  

রাতের আগ্রায়
তাজমহল থেকে বের হয়ে অলিগলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে রাতের আগ্রার মুখোমুখি হলাম। পুরনো আগ্রার গিঞ্জি এলাকার ভিড়, রিকশার টুংটাং, মিনা বাজারের হইচই ফেলে চলে এসেছি নগরীর আলো-শোভিত এভিনিউ-এ। মোবাইল অ্যাপে হোটেল বুক করা আছে, ড্রাইভার সুরজিৎ সেখানে ব্যাগ রেখে বিশ্রাম নিতে চলে গেল। আমরা আগামীকাল সারাদিন ঘুরে রাতের মধ্যে জয়পুর ফিরে যাবো, এমন চুক্তি হয়েছে তার সঙ্গে। কাজটি ভুল হয়েছে। যে টাকায় আগ্রা-জয়পুর আপ-ডাউন করছি, তাতে জয়পুর-আগ্রা হয়ে দিল্লি চলে যাওয়া যেতো। রাস্তায় যেতে কষ্ট হবে ভেবে আমরা জয়পুর থেকে দিল্লির প্লেনের টিকিট কেটে রেখেছি। ফলে আমাদের আগ্রা থেকে আবার জয়পুরই ফিরতে হচ্ছে। এতে সময় ও টাকা খরচ হলো বেশি। একই পথ দুবার ঘুরতে হলো।
সবচেয়ে ভালো হতো, জয়পুর থেকে আগ্রা হয়ে দিল্লি চলে যাওয়া। জয়পুর-আগ্রা-জয়পুরের খরচে জয়পুর-আগ্রা-দিল্লি যাতায়াত হয়ে যেতো। সময় যেমন বাঁচতো, তেমনি হোটেল আর জয়পুর-দিল্লির বিমান ভাড়াও লাগতো না। অভিজ্ঞতা না থাকায় ভুলের মাশুলস্বরূপ সময় ও টাকার গচ্চা দিতেই হলো।

উত্তর ভারতে হোটেল বেশ সুলভ, কলকাতার চেয়েও কম টাকায় ভালো হোটেল পাওয়া যায় অ্যাপে। গাড়িও অ্যাপে নেওয়া যায়। ওয়ান ওয়ে, টু ওয়ে, ঘণ্টা ধরে গাড়ি পাওয়া যায়। সুরজিৎ সার্বক্ষণিক থাকার জন্য চুক্তিবদ্ধ। সে গাড়ি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলও। কাল আবার জার্নি করবে আর আমি হেঁটে শহরের জীবনকে স্পর্শ করতে চাই বলে ওকে বিদায় দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরতে শুরু করি। অবশ্য প্রয়োজন হলে ফোনে ডাকলেই সে ছুটে আসবে। আমাদের হোটেলের পাশেই কম দামের একটি হোটেলে সে উঠেছে। অতএব, চিন্তার কিছু নেই।
ঘুরাঘুরির সময় খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটাও আমি ঝামেলাহীন রাখি। যেখানে সুবিধা হয় খেয়ে নিই। প্রধানত পাউরুটি, কলা, আপেল, ডিম সেদ্ধ, দুধ খেয়ে দিব্যি চলছে। ভ্রমণে ভারি খাবার আমার অপছন্দ। রাতের দিকে সুবিধা মতো কোথাও ডিনার করে নেওয়া যাবে। খাওয়া ও দেখার পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে তাজমহল সংলগ্ন এলাকা থেকে হেঁটে হেঁটে চলে এলাম আগ্রা শহরের মূলকেন্দ্রে।
এতো বছরের পুরনো হওয়ার পরেও আগ্রার সর্বত্র মুঘলাই রোশনাই ঝলঝল করছে। চারিদিকে বাগান, উদ্যানের ছড়াছড়ি। আগ্রা ফোর্টের সামনে শাহজাহান গার্ডেন তো এলাহী ব্যাপার। আর আছে মোড়ে মোড়ে নেতৃবৃন্দের ভাস্কর্য। নেতাজি সুভাষ বসুর মূর্তি পেলাম। পেলাম উত্তর ভারতের পুরনো হিন্দু শাসক পৃথ্বিরাজ চৌহানের মূর্তি। উত্তর প্রদেশ বিজেপি শাসনে থাকায় প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য পুনরুত্থানের বিশেষ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় এসেই প্রাচীন নগর এলাহাবাদের নাম বদলে রেখেছেন প্রয়াগ। বিখ্যাত মুঘলসরাই রেলজংশন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নামও বদল করা হয়েছে। শুনতে পেলাম, আগ্রার নামও বদলে অগ্রবন রাখা হবে। কিন' ইতিহাসবিদ ও সুশীল সমাজ তা হতে দিচ্ছেন না। তারা অগ্রবন নামের অস্তিত্ব পাচ্ছেন না। বরং আগ্রা নামের মজবুত ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে। মুঘলদের আগে লোদি বংশও আগ্রায় অনেক স্থাপনা করেছে। আগ্রা সম্পূর্ণভাবে মুঘল ও মুঘল-পূর্ব মুসলিম শাসকদের শহর। ফলে নামবদলের বিষয়টি খানিক পিছিয়ে গেছে।
আলোশোভিত, উদ্যানময় এভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম আগ্রার বিখ্যাত জামে মসজিদের কাছে। মুঘলরা যেখানেই গিয়েছে প্রাসাদ ও দুর্গের পাশাপাশি বড় আকারের মসজিদ নির্মাণ করেছে। আগ্রার জামে মসজিদও বিরাট চত্বর, মিনার, গম্বুজ, ক্যালিগ্রাফিতে সমৃদ্ধ। মসজিদটি চট করে দেখলে মধ্য এশীয় কোনও স্থাপনা বলে ভ্রম হবেই। পাথুরে কাঠামোতে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় উজ্জ্বল হয়ে আছে মুঘল ঐতিহ্য। রাতের বেলাতেও দেশি-বিদেশি পর্যটক-দর্শনার্থীদের ভিড় দেখতে পাওয়া গেল মসজিদের চারপাশে।

মসজিদের লাগোয়া আগ্রার বিখ্যাত পাইকারি বাজারগুলো অবসি'ত। চামড়ার জুতা, পোশাক, ধাতব তৈজসপত্র ইত্যাদিতে ঠাসা ছোট ছোট অসংখ্য দোকান। পুরান ঢাকার চকবাজার বা লালবাগের মুঘল নগর বিন্যাসের আদল এখানেও লক্ষণীয়। দোকানের মালামাল আর হরেক রকম ক্রেতায় ঠাসাঠাসি ভিড়। দামও আধুনিক মলের চেয়ে অনেক কম। সস্তায় মজাদার খাবারের অনেক হোটেলও পাওয়া গেল। কাবাব ও মাংসের প্রাধান্যে মুঘলাই রান্নার প্রাচুর্য হোটেলগুলোতে।
অনেকেই আমাদের আগ্রা ভ্রমণের সময় অবশ্যই ইতিমুদ্দৌলাহ নামের একটি সমাধিস'লে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলে, যাকে শিশু তাজমহল বলা হয়। এটা দিল্লির হুমায়ুন মাকবার আর সেকেন্দ্রার আকবর মাকবার অনুরূপ। মাকবারা মানে সমাধিস'ল। মুঘলরা মধ্য এশীয় রীতিতে সমাধি সৌধ নির্মাণ করতেন, যার অনেকগুলো এখনো ভারতের নানা স্থানে অটুট। ইতিমুদ্দৌলা যমুনা নদীর পূর্ব পাশে অবসি'ত সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ও মাতা আসমৎ বেগমের কবরস্থান। নূরজাহান নিজের অর্থে এই সুরম্য সৌধ নির্মাণ করেন।

আরেকটি জায়গায় যাওয়ার জন্যও পরামর্শ ছিল। সেটার নাম মাহতাব বাগ, যার বাংলা হলো চন্দ্রালোকিত বাগান (মুনলাইট গার্ডেন)। সম্রাট বাবর এটি নির্মাণ করেন যমুনার অপর তীরে, যেখান থেকে ভিন্ন কৌণিক অ্যাঙ্গেলে তাজমহল ও আগ্রা দুর্গকে দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষত রাতে এবং জোছনায় মাহতাব বাগ থেকে তাজের অসামান্য সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। নদীর জোছনা প্লাবিত স্রোতে বিম্বিত শ্বেত মর্মর তাজের অনিন্দ্য অবয়ব দেখার জন্য মোহতাব বাগ শ্রেষ্ঠ স্থান।

বৃষ্টিমগ্ন আবহাওয়া এবং সময় স্বল্পতার কারণে এসব স্থানের মতো আরো কিছু ছোটখাটো স্থাপনা, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও দর্শনীয় স্থান দেখা সম্ভব হলো না এবারে ভ্রমণে। মনে মনে ঠিক করলাম, এটা কেবল প্রাথমিক দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়।
না দেখার আফসোস আর যতটুকু দেখেছি, তার তৃপ্তি নিয়ে নগর পরিভ্রমণ শেষে হোটেলে ফিরে এলাম। আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেটি একটি বিশাল ও আধুনিক স্থাপনার তিনতলার পুরো ফ্লোর নিয়ে অবসি'ত। একতলায় দেখতে পেলাম কোচিং সেন্টার চলছে। বাইকে চেপে জিন্স আর টি-শার্ট চাপিয়ে শত শত ছেলেমেয়ে ক্লাসে আসছে, যাচ্ছে। সম্ভবত দিনে কোনও চাকরি করে রাতের দিকটায় প্রাইভেটে তারা পড়াশোনা করছে। ক্যারিয়ার আগে বাড়াতে এসব প্রতিযোগিতামূলক শহরে ডিগ্রি, ট্রেনিং নিয়েই চলতে হয়। ইতিহাসের প্রাচীন আগ্রাতেও আধুনিক জীবনের গতিময় তেমন ধারা চলছে।

দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর মতো নারীর নিরাপত্তাহীনতা আগ্রায় ততটা প্রকট মনে হলো না। রাত ১১/১২টা পর্যন্ত অনায়াসে তরুণ-তরুণীরা নিজস্ব বাইকে চলাফেরা করছে। দীপক রাঠোর নামে একটি ১৯/২০ বছরের ছেলে হোটেলে দেখা করতে এলো। আমাদের জয়পুরের বন্ধুর পরিচিত ছেলেটি কলেজে পড়ে এবং স্থানীয় ক্লাবে ক্রিকেট খেলে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক খোঁজ-খবরই সে রাখে। সুস্বাস'্যবান দীপক ছাড়াও প্রতিটি ছেলে-মেয়েকেই স্বাস'্য সচেতন মনে হলো। দীপকের বাইকে আশেপাশের এলাকায় এক চক্কর দিতে দিতে পথে জিম দেখেছি অনেকগুলো। জীবনকে উপভোগ করতে হলে অটুট স্বাসে'্যর অধিকারী হওয়ার মন্ত্র তরুণ প্রজন্মের চোখে-মুখে। নিজের কাজ অন্য কারো ভরসা ছাড়া নিজেকেই যে করতে হবে, এই কাণ্ডজ্ঞানটি আগ্রায় ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রকট। পথে পথে অলস আড্ডায় মেতে চা খেয়ে, সিগারেট ফুঁকে ফুটপাথ দখল করতে বিশেষ কাউকে দেখিনি। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত এবং সেটা অবশ্যই উদ্দেশ্যভিত্তিক, লাভজনক ও প্রয়োজনীয়। আর বিখ্যাত পর্যটক শহর বলে এখানে নানা কিসিমের কাজের কমতি নেই।
শুধু স্বাস'্য নয়, আগ্রায় বসবাস করতে আরেকটি জিনিস লাগবে, তা হলো মুঘল বাদশাহ হয়ে জন্মানোর ভাগ্য। বিরাট বিরাট বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও তকমাধারী স্থাপনা ছাড়াও আগ্রায় ছড়িয়ে আসে অসংখ্য রাজকীয় ঢঙের প্রাসাদ, বাড়িঘর। ইংরেজ আমলে তৈরি রাজসিক ভবনও কম নয়। সম্ভবত এসব দেখেই কথাটি বলেছিলেন কবি ও অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসু। যাদবপুরের অধ্যাপক বুদ্ধদেব এক চিঠিতে দার্শনিক দেবীপ্রসাদকে কথাটি জানিয়েও ছিলেন। সেই ভাষ্যটিই তুলে দিচ্ছি:
‘আমি এখন আগ্রায়। এসব শহরে বসবাস করতে হলে মুঘল বাদশাহ হয়েই জন্মাতে হয়। আগ্রা ফোর্টে জাহান আরার ঘরগুলো ভারি ভালো, ও-রকম বাড়িতে থাকতে পারলে তবেই এ-অঞ্চলে বসবাস সম্ভব। কিংবা তাজমহলের ভেতরটাও মন্দ নয়। এ ছাড়া আর ঠাণ্ডা জায়গা এখানে আছে বলে মনে হয় না। যে যুগে ইলেকট্রিসিটি ছিল না, সে যুগে ও-ধরনের বিরাট কেল্লা গড়তেই হতো শাহানশাহদের, নয়তো প্রাণ কি বাঁচতো? স্নানের কী বিলাসিতা! শ্বেতপাথরের কী উদার মসৃণ শীতলতা! ইলেকট্রিসিটি থাকলে অত দরকার হতো না, এয়ার কন্ডিশন করে দিলেই হতো। তবু ওরা ওগুলো করেছিলেন বলেই আজ সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমরা একটু বুঝতে পারি যে ভারতবর্ষ এককালে সত্যিই ইংরেজ বর্জিত ছিলো এবং ইংরেজ-বর্জিত সে ভারত তখনকার পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের চাইতে কোনো অংশে ছোটও ছিল না। নবাবী আমলের সূর্যাস্তের সোনা এ অঞ্চলে চেখে বেড়াচ্ছি,-পচে গেছে, কিন' একটা রূপ আছে।
১৯৪১ সালের ১০ই অক্টোবর দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে বুদ্ধদেব বসু চিঠিতে কথাগুলো বলেছিলেন। আগ্রায় শত শত বছরের প্রাচীন মুঘল ঐতিহ্যের অপসৃয়মান দ্যুতিময় রশ্মি এখনো সেইসব স্থাপনার চমকাচ্ছে।   
 
আগ্রা দুর্গে ইতিহাসের প্রতিধ্বনি
বৃষ্টির মধ্যেই সকাল হলো আগ্রায়। বাংলাদেশের বর্ষার মতো উত্তর ভারতে মনে হয় বৃষ্টি এসেই চলে যায় না। আসা অবধি দেখছি, ক’দিন ধরেই উত্তর ভারত জুড়ে অবিরাম বর্ষণের রেশ থেমে থেমে চলছে। সকালের শুরুতে তাজমহলের দিকে এক চক্কর দেওয়ার ইচ্ছা ছিল, সেটা স'গিত করতে হলো আবহাওয়ার বিরূপতায়। কিছুক্ষণ হোটেলে অপেক্ষার পর বৃষ্টি সহনীয় হলে চলে এলাম আগ্রা দুর্গে।
আগ্রা দুর্গ নামটি শুনে মনে হতে পারে পারে যে, এটি কোনও সামরিক ছাউনি বিশেষ। আসলে মোটেও তা নয়। আসলে আগ্রা দুর্গ হলো একটি আস্ত শহর। মুঘল সচিবালয়, বাসগৃহ, সামরিক স্থাপনা ইত্যাদি মিলিয়ে পরিকল্পিত এক রাজধানী, মধ্যযুগের আরবান সেটেলমেন্ট।
তাজমহল থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে অবসি'ত আগ্রা দুর্গের সামনে, রাস্তার আরেক পাশে শাহজাহান গার্ডেন। বিশাল মুঘল উদ্যান আর আগ্রা দুর্গের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে প্রশস্ত এভিনিউ। গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম একপাশের সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা দুর্গ-নগরী আর অন্যপাশের সুবিস্তৃত শাহজাহান গার্ডেন।

৯৪ একক আয়তন বিশিষ্ট অতিকায় আগ্রা দুর্গে প্রবেশের জন্য দুটি প্রবেশ তোরণ আছে। একটির নাম অমর সিং গেট, যাকে লাহোর গেটও বলা হয়। আরেকটি দিল্লি গেট, যা দুর্গের পশ্চিমাংশে অবসি'ত। বর্তমানে দিল্লি গেট বন্ধ আর একমাত্র প্রবেশ পথ হলো অমর সিং গেট। তবে দুর্গের আরো দুটি ছোট আকারের প্রবেশ পথ আছে। দুর্গে অনেকটাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাসুট ব্রিগেডের সদর দপ্তর আগ্রা দুর্গের উত্তরাংশে অবসি'ত।   
আগ্রা দুর্গ হলো একমাত্র স্থান, যেখানে ভারতের সব শাসকরাই কর্তৃত্ব করেছেন। আফগান-গজনির শাসকরা যখন প্রথম আগ্রায় সামরিক ছাউনি গড়েন, তা ছিল এই দুর্গের চৌহদ্দিতেই। পরে চৌহান, রাজপুত, জাঠ, শিখরা এখানে কর্তৃত্ব করেন। দিল্লি দখল করে সেখানেই রাজধানী স্থাপন করা হলেও সিকান্দার লোদি আগ্রায় রাজধানী নিয়ে আসেন ষোড়শ শতকেই। পানিপথের প্রথম যুদ্ধ জয়ী হয়ে বাবরও এ দুর্গ থেকেই রাজত্ব শুরু করেন। পুত্র হুমায়ূনের রাজ-অভিষেকও আগ্রা দুর্গে সম্পন্ন হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আকবরের জীবনীকার আবুল ফজল আইন-ই-আকবরি গ্রনে' জানিয়েছেন। তা হলো আগ্রা দুর্গের নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলার কারিগরগণ, সঙ্গে ছিলেন গুজরাটের শ্রমিকরা। 

হুমায়ূনের শাসনামলে বাংলার আফগান-সুরি বংশ শের শাহের নেতৃত্বে ভারত তথা দিল্লি দখল করে আগ্রা থেকে শাসন চালায়। পরে মুঘলরা আবার ভারতের ক্ষমতা দখল করলে আগ্রার দুর্গ হয় শাসনের মূল কেন্দ্র। আকবর আগ্রা দুর্গকে বর্ধিত করেন এবং বিশাল আকারে অনেকগুলো স্থাপনা নির্মাণ করেন। তিনি কিছুদিনের জন্য রাজধানী পাশের ফতেহপুর সিক্রিতে নিয়ে গেলেও পরবর্তী মুঘল শাসকরা আগ্রাকেই রাজধানী হিসেবে বেছে নেন। পরে রাজধানী কিছু দিনের জন্য লাহোর এবং আবার দিল্লি স্থানান্তরিত হলেও মুঘল শাসনে আগ্রার গৌরব, শক্তি ও ঐতিহ্য সমুন্নত ছিল। ফলে আগ্রা দুর্গের প্রতিটি বালি-কণা ও ইটে বহু বছরের বিচিত্র ইতিহাসের জানা-অজানা বহু কথা ও কাহিনি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।
আগ্রার দুর্গ একজনের হাতে নয়, অনেক মুঘল নৃপতির দ্বারা সংস্কার ও পরিবর্ধন লাভ করে। তবে আকবরের সময় এর সর্বোচ্চ বিকাশ হয়। তিনি রাজস্থানের লাল বেলে পাথর দিয়ে আগ্রা দুর্গের ভেতরে অনেকগুলো স্থাপনা নির্মাণ করেন এবং সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে পুরো স্থাপনাকে পরিবেষ্টন করেন।    

আগ্রার দুর্গস' সমগ্র এলাকা অর্ধবৃত্তাকার ভূমিতে পরিকল্পিতভাবে নির্মিত। প্রবেশ তোরণ থেকে শুরু করে দুর্গের প্রতিটি স্থাপনা অত্যন্ত সুনির্মিত ও কারুকার্যময়। লাল বেলে পাথরের সঙ্গে সাদা মার্বেলের ব্যবহারও দুর্গটির বিশেষ নির্মাণ বৈশিষ্ট্য। ফলে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ দুর্গের দিকে তাকালেই গা ছমছম করে।
রাজকীয় মুঘলাই ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করে লালের সঙ্গে সবুজের মিতালিতে চোখ জুড়িয়ে গেল। মুঘল রীতি ও ঐতিহ্যানুযায়ী সাজানো উদ্যান দুর্গের ভেতরেও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মুঘলরা যেখানেই গেছেন, যে স্থাপনাই গড়েছে, তাতে বাগানের উপসি'তি আবশ্যিক। হালকা বৃষ্টি থাকলেও দর্শনার্থীর ভিড় কম নেই। ঘুরে ঘুরে দেখলাম মুঘল ঐতিহ্যের অনবদ্য আকর্ষণ আগ্রা দুর্গ।
দুর্গের ভেতরেও একটি গেট আছে, যাকে বলা হয় হাতি গেট। খুবই পরিকল্পিত স্থাপত্য বিন্যাস চারিদিকে। অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে কালের করাল গ্রাস থেকে সামান্যই রক্ষা পেয়েছে। শত শত যুদ্ধ, দাঙ্গা, বিশেষত দখলদার ইংরেজদের হাতে অনেক সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে। ভাঙা-গড়া হয়েছে ভেতরের অনেক ইমারত ও প্রাসাদ। মুঘল সম্রাটের অধিষ্ঠানের ময়ূর সিংহাসন আর কোহিনূর হীরক সম্পদও ইংরেজরা এখান থেকে লুট করে নিয়ে গেছে বিলাতে। সিপাহি বিপ্লবের পর বিজয়ী হয়ে ইংরেজরা শুধু গণহত্যাই করেনি, হীরা-জহরত, বই-পত্র, তৈজসপত্র, ব্যবহার সামগ্রী লুটে নিয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের মিউজিয়াম, বাজার ও ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় এসবের কিছু কিছু এখনো রয়েছে।

আগ্রা দুর্গের প্রধান আকর্ষণ দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, জাহাঙ্গীর হৌস, যা আকবর নির্মাণ করিয়েছিলেন পুত্রের জন্য। বাবরের আমলে নির্মিত বাওলি (পানির কূপ) আছে। আছে মসজিদ, আকবর মহল। সম্রাট শাহজাহানের আমলে নির্মিত মহলও আছে, যাতে তার দুই কন্যা রওশান আরা ও জাহান আরা বসবাস করতেন।
আশ্চর্য হলাম, আগ্রার দুর্গে বাংলা মহল দেখে। কথিত আছে, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান এটি নির্মাণ করেছিলেন। এর নির্মাণশৈলীতে বাংলার কুটিরের ছাপ আছে। নূরজাহান সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিণত সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে ছিলেন বাংলার এক সুবেদারের স্ত্রী। ফলে পারসিক বংশধারার হলেও নূরজাহানের একটি সম্পর্ক ছিল বাংলার সঙ্গে। বাংলার আম গাছ তিনি আগ্রার দুর্গে রোপণ করেছিলেন এবং ঢাকাই মসলিন কাপড়ের উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করেছিলেন।
দুর্গের ভেতর যমুনা নদীমুখী একটি আবাসে সম্রাজ শাহজাহানের বন্দি জীবন কেটেছিল। এর বারান্দা থেকে দূরের তাজমহল দেখা যায়। বন্দি সম্রাটের জীবন কাটে এখান থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাজ দেখে আর তাজে শায়িত প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজমহলের স্মৃতিতে।
আগ্রার দুর্গ নিয়ে প্রচলিত আছে বহু উপকথা ও কাহিনী। দুর্গের নিচে সুড়ঙ্গপথ নাকি নানা জায়গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ছিল অনেক গোপন কুঠরী, যেখানে সংকটকালে সম্রাট আত্মগোপন করতে পারতেন বা প্রতিপক্ষকে লোকচক্ষুর আড়ালে বন্দি করে রাখতে পারতেন।

মুঘল হেরেম নিয়ে শত শত উপাখ্যানের ভিত্তিভূমিও আগ্রার দুর্গ। যেখানে সেলিম (সম্রাট জাহাঙ্গীর) ও আনারকলির করুণ প্রেম-উপাখ্যান ছাড়াও বহু বাদশাহজাদি ও শাহজাদার নানা রোমাঞ্চকর ইতিবৃত্ত প্রচলিত রয়েছে। বলতে গেলে মুঘল ইতিহাসের আখ্যান রচনা করতে গেলে সর্বাগ্রে চলে আসবে আগ্রা দুর্গের নাম। বিশ্বসেরা গোয়েন্দা শার্লক হোমস পর্যন্ত আগ্রা দুর্গের পটভূমিতে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। শার্লক হোমসের রচয়িতা স্যার আর্থার কোনাল ডুয়েল  দ্য সাইন অব ফোর গ্রন'টিতে আগ্রা দুর্গের পটভূমি নিয়ে এসেছেন। এমন আরো শত শত গ্রন' আছে আগ্রা দুর্গের সামগ্রিক বা বিশেষ বিশেষ ঘটনার আলোকে। স্থাপত্য ও নির্মাণ প্রকৌশলেও আগ্রা দুর্গকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। মধ্যযুগে বাগদাদ, দামেস্কো, ইস্পাহান, সিরাজ, কায়রোর মতোই আগ্রা ছিল এক আন্তর্জাতিক শহর, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল আগ্রা দুর্গ কেন্দ্রিক রাজপ্রাসাদসমূহ, আবাসস'ল ও প্রশাসনিক দপ্তরগুলো।
বৃষ্টি কমে এক সময় হাল্কা রোদ ঝলক দেওয়ায় মনে হলো শত শত বছরের ঘুম ছেড়ে চমকে উঠেছে আগ্রা দুর্গের ভেতরের স্থাপনাগুলো। শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে দুর্গের নানা স্থাপনা দেখতেই সময় কেটে যায় না, প্রতিটি স্থানের পেছনের ইতিহাস ও ইতিবৃত্তও সামনে চলে আসে হারিয়ে যাওয়া অতীতের ঝঙ্কার তুলে।

সুদূর মধ্য এশীয় অঞ্চলের মোঙ্গল-তুর্ক-পারস্য ঐতিহ্য নিয়ে যে মুঘলরা ভারতে এসেছিলেন, তারা শাসন ও সংস্কৃতির প্রতিটি অঙ্গনকে করেছিলেন আলোকিত ও সমৃদ্ধ। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে আধুনিক জীবনবোধ ও যাপন প্রণালী মিলে আছে অর্ধ-সহস্র বছরের মুঘল শাসনের পরতে পরতে। তাদের প্রাসাদ, হর্ম্য, স্থাপনা, প্রশাসনিক রীতি, খাদ্য, পোশাক, লোকাচার, কাব্য, সঙ্গীত ইত্যাদি প্রতিটি বিষয়ই শুধু ভারত নয়, বিশ্ব সভ্যতা ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল রত্নস্বরূপ। সেই মুঘলদের নাভিমূল আগ্রার দুর্গে প্রতিটি পদক্ষেপে কানে বাজে ইতিহাসের শব্দ-সঙ্গীত। অতীত পুরনো হলেও যে দীপ্তি হারায় না, মুঘল ঐতিহ্যের হৃৎপিণ্ড ও রাজধানী আগ্রা সে সত্যটিই মনে করিয়ে দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম রাজধানী আগ্রা
আগ্রার দুর্গ থেকে বের হলাম পড়ন্ত বিকাল বেলায়। অতীতের উজ্জ্বলতায় ঝলমল আগ্রা শহরের কথায় ইতিহাসের নানা কথা মনে পড়ে। যদিও বিশাল ভারতবর্ষের কথা আসলেই চলে আসে দিল্লির নাম, তথাপি দিল্লি নয়, অধিকাংশ সময় আগ্রা ছিল মুঘল ভারতের রাজধানী। মধ্যযুগে ভারতবর্ষের রাজধানী হিসাবে যেসব শহরের নাম জানা যায়, তার মধ্যে আগ্রা ছিল সুদীর্ঘকাল। দক্ষিণ এশিয়ায় আগ্রা ছাড়া অন্য কোনো শহর এতো অধিক বছর রাজধানীর মর্যাদা পায় নি।
মুসলিমরা ভারত জয় করে রাজধানী গড়েন দিল্লিতে। দিল্লির প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয় মুহাম্মদ ঘোরীকে। দিল্লি সালতানাতের শাসনকালেরই একপর্যায়ে আগ্রায় রাজধানী স্থাপন করা হয়, যেখানে কয়েক শত বছর আগে গজনীর সুলতান মাহমুদ দুর্গ গড়েছিলেন। আগ্রা থেকে উত্তর, মধ্য, পশ্চিম ভারত শাসন ছিল সহজতর। এবং পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে গমনের পথও ছিল সুগম। ফলে আগ্রা রাজধানী ও কেন্দ্রীয় শহরের মর্যাদা পায় রাজনৈতিক এবং ভূকৌশলগত গুরুত্বের কারণে।

পূর্ববর্তী মুসলিম শাসকদের মতোই মুঘলরাও ছিলেন প্রধানত আগ্রা কেন্দ্রিক। উপমহাদেশের নানা স্থানে নানা স্থাপনা, দুর্গ, প্রাসাদ নির্মাণ করলেও মুঘলদের মূল আবাস ছিল আগ্রা এবং শাসনের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল এই শহর। যদিও আকবর কিছুদিনের জন্য রাজধানী আগ্রার পাশে ফতেহপুর সিক্রিতে স্থানান্তরিত করেন, যা আসলের আগ্রারই সম্প্রসারিত এলাকা বিশেষ। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য হলো এই যে, মাত্র একটি ছাড়া, মুঘলদের সবগুলো রাজধানীই বর্তমান ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবসি'ত। ভারতের বাইরে একমাত্র শহর পাকিস্তানের লাহোর, যেখানে সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত হয় স্বল্পকালের জন্য। তারপর আগ্রা হয়ে দিল্লি হয় ভারতের রাজধানী। তথাপি মুঘল ক্ষমতা ও স্থাপনার অন্যতম শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী কেন্দ্র রূপে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখে আগ্রা।
বাংলা তথা কলকাতায় ক্ষমতাসীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারত দখল করে ইংরেজরা রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে নতুন শহর কলকাতায়। তারপর ১৯১৩ সালে আবার ভারতের রাজধানী হয় দিল্লি। এভাবে আগ্রার ক্ষমতা ও শক্তি স্থানান্তরিত হয়। তথাপি মধ্যযুগের পটভূমিতে নানা শাসকের অধীনে আগ্রার চেয়ে সুদীর্ঘ বছর রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকার গৌরব ভারত বা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো শহরের নেই।

শাহজাহান বাগিচা আর আগ্রা দুর্গের দিকে ফিরে আসার সময় পেছন তাকিয়ে দেখতে পেলাম, অস্তাচলগামী সূর্যের রক্তিমাভা আগ্রার লালাভ দুর্গ স্থাপনায় টকটক করছে। ততক্ষণে বৃষ্টি কমে সূর্যের স্বচ্ছ আলো ছড়িয়েছে প্রাসাদ আর উদ্যান ঘেরা নগরী আগ্রার দিগন্তে। পায়ে পায়ে হোটেলের দিকে যেতে যেতে কানে বাজে রণধ্বনি, উৎসব আর হুল্লোড়ের কোলাহল। আগ্রার আশেপাশেই হয়েছে ভারতবর্ষে বিখ্যাত ও ভাগ্যনির্ণায়ক যুদ্ধগুলো। কাছেই মুহাম্মদ ঘোরী আজমিরের শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে ভারত অধিকার করেন। সন্নিকটের পানিপথে লোদি বংশকে পরাজিত করে বাবর বসেন মসনদে। আকবর এই পানিপথেই হিমুকে হারিয়ে ভারতের ক্ষমতা সুসংহত করেন। আফগান আহমাদ শাহ আবদালি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা-শিখদের বিতাড়িত করেন। আগ্রাকে নাভিশূলে রেখেই মধ্যযুগের ভারতের ক্ষমতার পালাবদল আর বিন্যাস রচিত হয়েছে।

এতো যুদ্ধ ও দামামার মধ্যেও আগ্রাকে সাজানো হয়েছে সুরম্যভাবে। লোদি গার্ডেন, শাহজাহান গার্ডেন, মাহতাব বাগ ইত্যাদি বহু কিছু এখনো অটুট সবুজে-শ্যামলে। আর স্থাপনার তো শেষ নেই! ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া তাজমহল, ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা দুর্গ ছাড়াও শত শত মসজিদ, প্রাসাদ ইত্যাদি মুঘল স্থাপনা ছড়িয়ে রয়েছে আগ্রার সর্বত্র।
বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তে আগ্রা লাভ করেছে স্বপ্নের শহরের মর্যাদা। শান-শওকত, আভিজাত্য, সমৃদ্ধিতে আগ্রাকে তুলনা করা হয়েছে ভেনিস, প্যারিসের সঙ্গে। আগ্রার নান্দনিক অবয়ব লোভনীয় হয়ে ধরা দিয়েছিল পৃথিবীর মানুষের কাছে। তৎকালের ভাগ্যান্বেষী মানুষের ঢল নেমেছিল আগ্রা নগরীতে। বহুবিচিত্র মানব সমাবেশের কারণে আগ্রা পরিণত হয়েছিল মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অগ্রণী আন্তর্জাতিক শহর বা কসমোপলিটন সিটিতে।

আগ্রা দুর্গ পরিদর্শনের পর প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোর কথা মনে পড়ে। কি নেই এই দুর্গে। একটি আস্ত শহর আড়াই-তিন মাইল জায়গা জুড়ে সুপরিকল্পিতভাবে সজ্জিত করার কৃতিত্ব মুঘলদের। বসবাস, রাজকাজ, প্রশাসনিক দপ্তর, যুদ্ধ কৌশল প্রণয়ন, বিনোদন ইত্যাদি সবই হয়েছে এখানে। খেলার মাঠ, মল্লযুদ্ধ, হাতি বা বাঘের লড়াইয়ের ব্যবস্থাও ছিল দুর্গের ভেতরেই। শীশ মহল, স্নানাগার, হারেম ও হাভেলিতে মশগুল আগ্রার দুর্গে জীবন যেন প্রবহমান ছিল আরব্য রজনীর মখমল কার্পেটে।

আগ্রা দুর্গের বাইরেও সাধারণদের বসবাসের জায়গায় মিনাবাজার, মসজিদ, প্রমোদালয়, বিশ্রামাগার, সরাইখানার অন্ত ছিল না। এখনো আগ্রার পথে পথে গম্বুজওয়ালা প্রহরী ছাউনির দেখা পাওয়া যায়, যা মুঘল নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়ে স্মৃতিস্বরূপ বিরাজমান।
শুধু ইতিহাস আর ঐতিহ্যই নয়, কিংবা যুদ্ধ আর বিজয়ই নয়, আগ্রার উপর দিয়ে বয়ে গেছে মর্মান্তিক রক্তস্রোত। সিপাহি বিদ্রোহে মুঘল-ভারতীয় পক্ষ পরাজিত হলে দিল্লির মতো আগ্রাতেও বয়ে যায় রক্তের বন্যা। শুধু মুঘল পরিবারের সদস্যই নয়, মুসলিম সম্ভ্রান্ত, অভিজাত ও সৈনিকদের গণহারে হত্যা করা হয়। দিল্লির পতন হলে বিপুল মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন আগ্রা দুর্গে। তাদের ধরতে সশস্ত্র অভিযান ও গণহত্যা চালানো হয় আগ্রায়।

এখনো আগ্রার পথে-প্রান্তরে, দুর্গের দেয়ালে কালচে রক্তের ছোপ মিশে আছে। নিহতের আহাজারি আর নিগৃহীত রমণীর বিলাপ গুমড়ে কাঁদে আগ্রায়। আগ্রার একটি প্রচলিত উপকথার বিষয়ে স্থানীয় লোকমুখে শুনেছি। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে পরাজিত করে ইংরেজরা বন্দি বানিয়ে পাঠিয়ে দেয় সুদূর বার্মার রেঙ্গুনে। তার পরিবারের অনেককেই হত্যা করা হয় দিল্লিতে। দিল্লির হুমায়ূন মাকবারা বা কবরগাহে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। সেই স্থানে কাতারবন্দি করে মুঘল পরিবারের শত শত সদস্যকে হত্যা করে ইংরেজ সেনাপতি। আগ্রায় যারা লুকিয়ে এসেছিলেন, তাদেরকেও দুর্গের ভেতরে চিরুনি তল্লাশি করে খুঁজে খুঁজে বের করে মারা হয়। আজও নাকি সেসব নিহত আত্মা প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আগ্রা দুর্গে ফিরে আসে। অনেকেই দুর্গের অভ্যন্তরে, খিলান ও স্তম্ভের পাশে নারী ও শিশুদের কান্না শুনতে পান!

এসব কাহিনীর সত্যাসত্য যাচাই করা দুরূহ। কিন' যে বীভৎসতা এ নগরের উপর দিয়ে বয়ে গেছে, তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সাজানো-সুন্দর শহরকে ছারখার শ্মশানে পরিণত করার কষ্ট শুধু মানবতার কষ্ট নয়, সভ্যতার জন্যও বেদনার। আগ্রা এখনো বেঁচে আছে মৃত্যুর বিষাদ নিয়ে। সঙ্গে আছে সভ্যতার এমন বহু চিহ্ন, যা ধ্বংস ও আক্রমণের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে মুঘল সভ্যতার জয়গান গাইছে।
আমরা আবার ফিরে যাবো জয়পুরে, সেখান থেকে দিল্লি। ভ্রমণ পরিকল্পনায় ভুল করায় এখান থেকে সহজে দিল্লি যাওয়ার বদলে আবার উল্টো দিকের জয়পুর ফিরে গিয়ে দিল্লি যেতে হচ্ছে। ফেরার পথে গাড়িতে একে একে চোখের সামনে থেকে সরে যাচ্ছিল তাজমহল, অসংখ্য বাগিচা, স্থাপনা, আগ্রা দুর্গের মজবুত দেয়াল, ফতেহপুর সিক্রির আবছা কাঠামো, যা প্রমাণ করে এই সত্য যে, ধ্বংস করলেই সব শেষ হয় না; হত্যা করলেও সবকিছুর অবসান ঘটানো যায় না। সাম্রাজ্যবাদী-ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে নিষ্পেষিত হয়েও শত বছরের মুঘল ঐতিহ্য ঠিকই মাথা উঁচিয়ে আছে সারা ভারতে, দক্ষিণ এশিয়ায়, সমগ্র বিশ্বে। বিশ্বসভ্যতার অংশ হয়ে বিশ্বসাংস্কৃতিক গৌরব বৃদ্ধি করছে মুঘল ঐতিহ্য। আর প্রতিনিয়ত শাসক ও শোষকদের সামনে হাজির করছে, ইতিহাসের সেই শিক্ষা, যে শিক্ষা স্বৈরাচারীরা কখনোই গ্রহণ করে না। এটাও এক অমোঘ ঐতিহাসিক শিক্ষণীয় বিষয়, ইতিহাস শিক্ষা দিলেও ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। তবু ইতিহাস শিক্ষা দিয়েই যাচ্ছে। একদার মুঘল রাজধানী সুরম্য আগ্রা নগরী ধ্বংসের করাল গ্রাস থেকে নিজেকে রক্ষা করে তেমনই এক ইতিহাসের শিক্ষালয় হয়ে আছে। আগ্রা, জীবন্ত ইতিহাস বইয়ের মতো ইতিহাসের কঠিন অধ্যায়গুলোর শিক্ষা বিতরণ করছে আজ এবং আগামীর পৃথিবীকে।  
      
ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের বর্ণনায় আগ্রা
বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের মুঘল শাসিত ভারতে এসেছিলেন এবং একপর্যায়ে তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের চিকিৎসক নিযুক্ত হন। তার ভ্রমণ-বৃত্তান্তে সেকালের বাদশাহী জীবন তো বটেই, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনেরও অতুলনীয় ইতিহাস রয়েছে। বিশেষত রাজধানী আগ্রা এবং মুঘল দরবার ও হারেমের অন্তরঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায় তার ভাষ্যে। বার্নিয়েরের অসাধারণ পর্যবেক্ষণশক্তির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন স্বয়ং কাল মার্কস ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস।
বার্নিয়েরে বিবরণের গুরুত্ব একটি বিশেষ কারণে অপরিসীম। আর তা হলো, আগ্রা বা তাজমহল সম্পর্কে আমরা যা দেখি বা পড়ি, তা অন্তত কয়েক শত বছর পরের অভিজ্ঞতা। বার্নিয়েরের মাধ্যমে ঠিক সেই সময়কার ইতিবৃত্ত জানা যায়। তিনি জানিয়েছেন, আগ্রার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো দুটি স্থাপনা। একটি সম্রাট জাহাঙ্গীরের তৈরি আকবর বাদশাহের সমাধি-স্মৃতিস্তম্ভ। আর একটি সম্রাট শাহজাহানের তৈরি বেগম মমতাজের সমাধি-স্মৃতিস্তম্ভ তাজমহল। তার পর্যবেক্ষণ মতে, আকবর বাদশাহের সমাধি-স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপনার যে সৌন্দর্য তা তাজমহলের মধ্যে আরো চমৎকারভাবে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। তাজমহলের বিস্তারিত বর্ণনা বার্নিয়ের তার ভ্রমণ কাহিনীতে চার পৃষ্ঠার অধিক জায়গা জুড়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাজমহল সম্পর্কে সমকালীন পর্যটক ও বিশ্লেষক বার্নিয়েরের মূলকথা বা সারমর্ম ছিল এই রকম:
তাজমহল বাস্তবিকই বিস্ময়কর কীর্তি। হয়তো বলবেন যে, আমার রুচি অনেকটা ভারতীয় ধরনের হয়ে গেছে, দীর্ঘকাল ভারতবর্ষে থাকার জন্য। কিন' তা নয়। আমি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি যে মিশরীয় পিরামিড আগ্রার তাজমহলের তুলনায় এমন কিছু আশ্চর্য কীর্তির নিদর্শন নয়। মিশরের পিরামিডের কথা অনেক শুনেছি এবং দু-দুবার নিজের চোখে দেখেও যে আমি ব্যক্তিগতভাবে আনন্দ পাইনি, একথা স্বীকার করতে আমার কোনো কুণ্ঠা নেই। নিরাকার পাথরের স্তূপ ছাড়া মিশরীয় পিরামিড আমার কাছে আর কিছু মনে হয়নি। বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই স্তরে স্তরে সাজিয়ে একটা কিমাকার কিছু গড়ে তুললেই বিস্ময়কর কীর্তি হয় না। তার মধ্যে মানুষের কল্পনা বা কারিগরির নিদর্শন কিছু নেই। কিন' আগ্রার তাজমহলের মধ্যে তা আছে।
বার্নিয়ের এক চিঠিতে মুঘল সম্রাটদের প্রধান শহর দিল্লি এবং রাজধানী আগ্রা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী রূপে অতি জীবন্ত একটি বিবরণ দিয়েছেন। ১৬৬৩ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের মঁশিয়ে দ্য লা ভেয়ারের কাছে লিখা চিঠিকে মুঘল রাজ-দরবারের জীবনধারা, আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি তথা মধ্যযুগের মুঘল শাসিত ভারতবর্ষের সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন তিনি:
মঁশিয়ে, আমি জানি আমি স্বদেশে ফিরে আসবার পর আপনি প্রথমেই আমাকে হিন্দুস্থানের রাজধানী তথা দিল্লি ও আগ্রা শহরের কথা জিজ্ঞাসা করবেন। সৌন্দর্যে, আয়তনে ও লোকজনের বসবাসের দিক থেকে ফরাসি শহর প্যারিসের সঙ্গে দিল্লি ও আগ্রার তুলনা হয় কিনা, সেকথা জানবার জন্য এবং আমার কাছ থেকে শুনবার জন্য আপনি ব্যাকুল হয়ে উঠবেন।
দিল্লি ও আগ্রার সৌন্দর্য-প্রসঙ্গে প্রথমেই একটি কথা আমি বলতে চাই। আমি দেখেছি, অনেক সময় ইউরোপীয় পর্যটকরা বেশ একটা উদাসীন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হিন্দুস্থানের এইসব শহরের কথা বলে থাকেন। তাদের মন্তব্য শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। পাশ্চাত্য শহরের সঙ্গে এসব শহরের সৌন্দর্য্যের তুলনা করেন যখন তারা তখন একটি কথা একেবারেই ভুলে যান যে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী স্থাপত্যের বিভিন্ন স্টাইলের বিকাশ হয়। প্যারিস, লন্ডন বা আমস্টার্ডামের স্থাপত্য আর হিন্দুস্থানের স্থাপত্য এক ও অভিন্ন হতে পারে না। কারণ, ইউরোপে যা বাসোপযোগী, হিন্দুস্থানে তা ব্যবহার্য নয়। কথাটা যে কতখানি সত্য তা রাজধানী স্থানান্তরিত করলেই বোঝা যেতে পারে। ইউরোপের শহর যদি হিন্দুস্থানে স্থানান্তরিত করা যায়, তাহলে তা সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে নতুন পরিকল্পনায় আবার গড়ে তোলার দরকার হবে। ইউরোপের শহরের সৌন্দর্য অতুলনীয় স্বীকার করি। কিন' তার একটা নিজস্ব রূপ আছে, যেটা শীতপ্রধান দেশের রূপ। সেইরকম দিল্লি-আগ্রারও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, যেটা গ্রীষ্মপ্রধান দেশের শহরের সৌন্দর্য।     

বার্নিয়ের জানান, যমুনা তীরে বর্তমান সম্রাট আওরঙ্গজেবের পিতা সম্রাট শাহজাহান দিল্লি শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন নিজের নাম অমর করার জন্য। নতুন রাজধানীর নামকরণ তার নামেই হবে, এই ছিল তার বাসনা। সে মতে, দিল্লি শহর যখন নতুন করে তৈরি হলো, তখন তার নাম রাখা হয়  শাহজাহানাবাদ বা সংক্ষেপে  জাহানাবাদ। যার অর্থ, সম্রাট শাহজাহানের বাসস্থান।
সম্রাট শাহজাহান সি'র করেন, নতুন নির্মিত দিল্লি বা শাহজাহানাবাদেই তিনি আগ্রা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করবেন। কারণ, আগ্রায় গ্রীষ্মের উত্তাপ এতো বেশি যে, সেখানে তার পক্ষে বাস করাই সম্ভব নয়। (শেষ জীবনে একটি দীর্ঘ সময় তাকে কিন' আগ্রা দুর্গে বন্দি হয়েই কাটাতে হয়।) মুহাম্মদ ঘোরি প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন দিল্লির ধ্বংসাবশেষের ওপর সম্রাট শাহজাহান প্রতিষ্ঠিত নতুন দিল্লি নগরী গড়ে উঠলো। হিন্দুস্থানে এখন আর কেউ দিল্লিকে দিল্লি বলেন না, জাহানাবাদ বলেন।  

আগ্রা কিন' দিল্লির চাইতেও প্রাচীন শহর। অনেক মুসলিম ও মুঘল সম্রাট শহরটির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। তবে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে শহরটি পরিপূর্ণ অবয়ব ও মর্যাদা লাভ করে। সেজন্য আগ্রার প্রাচীন নাম ছিল আকবরাবাদ। দিল্লির চাইতে অনেক বড় শহর আগ্রা। আগ্রায় আমির-ওমরাহ, রাজা-রাজড়াদের বাড়িঘরও অনেক বেশি। পাকাবাড়ি, ইটপাথরের বাড়ির সংখ্যা দিল্লির চাইতে আগ্রায় অধিক। ক্যারাভান, সরাইয়ের সংখ্যাও দিল্লির চেয়ে আগ্রায় অনেক বেশি। বিশেষত, বিখ্যাত কীর্তিস্তম্ভের জন্য আগ্রার খ্যাতি সমধিক। আগ্রার রাস্তাঘাট অবশ্য দিল্লির মতন সুপরিকল্পিত নয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র চার-পাঁচটি রাস্তা মোটামুটি সুন্দর, ঘরবাড়িও মন্দ নয়। তা ছাড়া বাকি সব রাস্তা খুবই সংকীর্ণ, ঘিঞ্জি ও আঁকাবাঁকা।

দিল্লি তুলনায় আগ্রাকে অনেকটা মফস্বল শহরের মতন মনে হয়। আমির-ওমরাহ, রাজা-রাজড়াদের বাড়িঘর অনেকটা বাগানবাড়ির মতন উদ্যান পরিবেষ্টিত, খোলামেলা এবং রাজকীয় ঢঙে নির্মিত। তার মধ্যে ধনী হিন্দু বেনিয়ান ও ব্যবসায়ীদের বাড়িগুলো ঠিক প্রাচীন দুর্গের মতো দেখায়। প্রাকৃতিক পরিবেশের দিক থেকে বিচার করলে আগ্রা শহর দিল্লির তুলনায় অনেক বেশি মনোরম মনে হয়। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সবুজের সমারোহ যে কতো মনোমুগ্ধকর তা বর্ণনা করা যায় না।  

আগ্রা শহরে জেসুইটদের একটি গির্জা আছে। একটি প্রতিষ্ঠানও আছে পৃথক বাড়িতে, যাকে  কলেজ বলা হয়। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশটি খ্রিষ্টান পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এখানে খ্রিষ্টধর্ম সম্বন্ধে শিক্ষা দেয়া হয়। বার্নিয়েরের মতে, কোথা থেকে কীভাবে এই খ্রিষ্টান পরিবারগুলো এখানে জুটলো, তা জানি না। এইটুকু জানি যে, জেসুইটদের আর্থিক দানের লোভেই তারা এখানে এসেছে এবং তার ওপর নির্ভর করেই তারা বসবাস করছে। এই পাদ্রি সাহেবরা আকবর বাদশাহের আমলে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন এখানে। ভারতবর্ষে পর্তুগিজদের প্রতিপত্তি ছিল যখন খুব বেশি, তখন সম্রাট আকবর এই ধর্মযাজকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন। সম্রাট আকবর এই পাদ্রিদের একটা বাৎসরিক আয়েরই যে ব্যবস্থা করেছিলেন, শুধু তাই নয়, আগ্রায় ও লাহোরে তাদের গির্জা নির্মাণ করার অনুমতি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। জেসুইট পাদ্রিরা অবশ্য আকবর বাদশাহের পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে আরও বেশি সহযোগিতা ও সমর্থন পান। কিন' সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র সম্রাট শাহজাহানের কাছ থেকে তারা পান প্রচণ্ড বিরোধিতা ও শত্রুতা। তবে খ্রিষ্টান গির্জার ঘড়ির শব্দ সারা আগ্রা শহরে শোনা যেতো।

ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের যে আমলের আগ্রা ও তাজমহলের বিবরণ দিয়েছেন, তা সম্রাট শাহজাহান পরবর্তী সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়কালের কথা। কালের করাল গ্রাসে সেসব চিত্রের অনেক কিছুই বিলীন হয়ে গিয়েছে। তথাপি আগ্রা মুঘল ঐতিহ্য আর তাজমহলের গৌরব নিয়ে বহাল রয়েছে। বহু ধর্ম ও বর্ণে মানুষের মতো আগ্রা এখনো বিশ্বের নানা জাতির পর্যটকদের আকর্ষণ করছে একটি আন্তর্জাতিক কসমোপলিটন শহরের মতো।   

দক্ষিণ এশিয়ার আইকন আগ্রার তাজমহল
বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে মানুষ আছে দুই ধরনের। একদল, যারা তাজমহল দেখেছে। আরেক দল, যারা তাজমহল দেখেনি। দেখুক বা না দেখুক, আগ্রার তাজমহল তাবৎ পৃথিবীর মানুষকেই আকৃষ্ট করছে অহর্নিশি। সারা বিশ্ব তো বটেই, পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশের একক কোনো ব্র্যান্ডের নাম করতে হলেও বলতে হয় তাজমহলের নাম। দক্ষিণ এশিয়ার আইকন রূপে চিহ্নিত করা যায় আগ্রার তাজমহলকে। উপমহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের আফগান সীমান্তের খাইবার পাস থেকে পূর্ব প্রান্তের মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন চট্টগ্রামের টেকনাফ পর্যন্ত এবং উত্তরের কাশ্মীর থেকে দক্ষিণের কন্যাকুমারী পর্যন্ত এমন কোনো ছোট-বড় শহর, জনপদ নেই, যেখানে তাজের নাম উচ্চারিত হয় না।

আমার জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের জনপ্রিয় খাবারের দোকানের নাম তাজ হোটেল। ময়মনসিংহ শহরের সবচেয়ে নামকরা প্রতিষ্ঠানটি রেল স্টেশনের সামনের তাজমহল হোটেল। ঢাকা-চট্টগ্রামে সড়ক পথে যাতায়াতের সময় কুমিল্লায় যে একাধিক অভিজাত হোটেলে বিরতি দেয়া হয়, তার অন্যতম একটি হলো তাজমহল। চট্টগ্রাম শহরের আনন্দকিল্লায় সবচেয়ে বনেদি প্রতিষ্ঠানের নাম তাজ সায়েন্টিফিক, যেখানে নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়।
নেপালে যেমন যেদিকেই তাকানো যাক, হিমালয় নামের পানি, বাস, হোটেল, দোকানের ছড়াছড়ি, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্র তেমনি তাজ নামটি দৃষ্টিগোচর হয়। হয়তো অনেকেই তাজমহল দেখেন নি। তথাপি দেখার আগ্রহ বুকে ধারণ করেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন। সাধারণ মানুষও তাজ নামকে একান্ত নিজস্ব ও আপন ভেবে গ্রহণ করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ও অভিজাত হোটেল চেইনের সঙ্গে মিশে আছে তাজমহলের নাম, যা একদিকে উপমহাদেশীয় গৌরব ও বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে স্বদেশী প্রত্যয়ের প্রতীকস্বরূপ এবং জাতীয় জাগরণের ঐতিহাসিক ছোঁয়ায় মহিমান্বিত। একথা সবারই জানা যে, টাটাদের প্রথম দিকের উদ্যোগগুলো যেসব ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে ও নানা মাত্রায় বৃটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার সম্পর্ক ছিল। সম্ভবত এটা সবচেয়ে বর্ণময় রূপে দেখা গিয়েছিল বোম্বাইয়ের একটি সর্বোচ্চ স্তরের বিশ্বমানের হোটেল প্রতিষ্ঠার জন্য জামসেদজী টাটার দৃঢ় সংকল্পের মধ্যদিয়ে, যার নেপথ্যে একটি বহুকথিত কাহিনী রয়েছে।

একবার জামসেদজী টাটা তার এক বিদেশি বন্ধুকে খাওয়ানোর জন্য তৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পায়ার্কস অ্যাপোলো হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে বলা হয় যে হোটেলটিতে কেবলমাত্র ইউরোপীয়দের প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে হোটেলে তার বন্ধুকে স্বাগত জানানো হচ্ছে, কিন' তাকে নয়। তারপরই জামসেদজী ১৯০৩ সালে তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা-প্রসূত হোটেল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন, যার নাম ঠিক করেন তাজমহল। তাজমহল ছিল বোম্বাইয়ে প্রথম বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত ভবন এবং যা অচিরেই সমারসেট মম থেকে গ্রেগরি পেক-এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করেছিল। স্পষ্টতই এই গল্পে সত্যতা রয়েছে, যা আর. এম. লাল তার ক্রিয়েশন অব ওয়েলথ গ্রনে' লিপিবদ্ধ করেছেন। অমর্ত্য সেন মনে করেন, কাহিনীটি আত্মপরিচয় ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে জামসেদজীর বোধ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে অবশ্যই সমৃদ্ধ করেছে। আর এক্ষেত্রে হাতিয়ার ছিল মুঘল গৌরবসিক্ত তাজমহলের নাম ও মাহাত্ম্য।     

টাটাদের তাজ হোটেল সারা ভারত ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে গেছে। কলকাতাতেও সবচেয়ে নামি হোটেলের নাম তাজ বেঙ্গল। উপমহাদেশের সর্বত্র শ্রেষ্ঠ থেকে সাধারণ মানের হোটেলের সঙ্গে তাজের নাম যুক্ত হওয়ার ঘটনাটি দৃষ্টান্তমূলক। সারা দক্ষিণ এশিয়ায় তাজ/তাজমহল ছাড়া আরেকটি নাম পাওয়া যাবে না, যা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল নির্বিশেষে সকলের কাছেই সার্বজনীনভাবে সাদরে গৃহীত হয়েছে। শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার যেখানেই বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অভিবাসীরা রয়েছেন, সেখানেই তাজ বা তাজমহল নামের একটি প্রতিষ্ঠান, নিদেনপক্ষে হোটেল রয়েছে।
আগ্রা ও তাজমহল নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখির অন্ত নেই। তাজমহল নিয়ে যত উক্তি করা হয়েছে, তা নিয়েও ইংরেজি ভাষায় একাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন' রয়েছে। তাজমহলের অতীত, ইতিহাস, রোমাঞ্চ এবং তাতে বসবাসকারী বা জড়িতদের নিয়েও গল্প, উপন্যাসের কমতি নেই। তাজমহলে শায়িত মমতাজমহলের মতোই নানা গবেষক ও লেখক আকৃষ্ট হয়েছেন আগ্রা তথা মুঘল ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্রের প্রতি। যাদের মধ্যে একাধিক মুঘল সম্রাট ছাড়াও রয়েছেন নূরজাহান, জাহান আরা, রওশান আরা, আনারকলি প্রভৃতি আলোচিত চরিত্র।

অ্যালেক্স রাদারফোর্ড রচনা করেছেন Empire of Moghil: Ruler of the World নামের সুবিখ্যাত গ্রন'। অ্যালেক্স রাদারফোর্ড হলো দুইজনের পেন নেইম বা লেখক নাম। তারা হলেন ডায়না প্রিস্টন এবং মাইকেল প্রিস্টন। মুঘল ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী পশ্চিমা লেখকদের অন্যতম এই দুইজন লেখক অ্যালেক্স রাদারফোর্ড নামে Empire of Moghil: Ruler of the World বিখ্যাত গ্রন' ছাড়াও মুঘল বিষয়ক Empire of Moghil সিরিজের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন' প্রকাশ করেছেন। এগুলো হলো: Empire of Moghil: Raiders from North, Empire of Moghil: Brothers at Wat, Empire of Moghil: Ruler of the World, Empire of Moghil: The Tainted Throne, Empire of Moghil: The SerpentÕs Tooth, Empire of Moghil: Traitors in the Shadwos।
তাছাড়া মুঘল ঘটনাবলির বিশ্বস্ত সাংস্কৃতিক বিবরণ পাওয়া যায় তাজমহল ট্রিলজির রচয়িতা ভারতীয়-আমেরিকান লেখক ইন্দু সুন্দারেসানের অ্যাখ্যানে। তাজমহল ট্রিলজিতে যে তিনটি গ্রন' রয়েছে, সেগুলো হলো: BOOK ONE:  The Twentieth Wife, BOOK TWO: The Feast of Roses, BOOK THREE:  Shadow Princess। কাহিনীগুলোর সূত্রপাত প্রাচীন পারস্য থেকে ভারতের পথে আগত আমত্য গিয়াস বেগের পরিবারের যাত্রাপথের রোমাঞ্চকর বিবরণের মধ্যে আবর্তিত। পথিমধ্যে আফগানিস্তানের কান্দাহারে গিয়াস-পত্নী মেহেরুন নেসা নামে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। নানা বির্পযয় পেরিয়ে এক সময় গিয়াস বেগ সম্রাট আকবরের রাজদরবারে স্থান লাভ করেন। তার কন্যা বিবাহসূত্রে আগ্রা থেকে বাংলায় চলে আসেন। প্রাথমিক অবস্থায় কন্যার বৈবাহিক জীবনে নানা বিপদ ও সমস্যা নেমে আসে। অবশেষে বহু উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে জন্মের ৩৪ বছর পর এই কন্যা নূরজাহান নামে মুঘল ভারতের সম্রাজ্ঞীর আসন লাভ করেন। এটাই ট্রিলজি বা তিনখণ্ডের প্রথম বইটির মূল উপজীব্য বিষয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রনে' সম্রাট শাহজাহান-পত্নী মমতাজ মহল আর তদীয় কন্যা জাহান আরার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। আগ্রার মুঘল রাজপরিবার ও হেরেমের অন্তরঙ্গ বিবরণ, প্রেম ও প্রণয়ের বহুমাত্রিক ভাষ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে ‘তাজমহল ট্রিলজিতে’।

বাংলা ভাষায় আনিস সিদ্দিকী  মুঘল হেরেমের অন্তরালে নামের এক চমৎকার গ্রন' রচনা করেন, যা মূলত সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভাগ্যহত জীবনের উত্থান-পতনের নাটকীয় কাহিনীগুলোকে চিত্রিত করেছে। এতে আগ্রা শহর, আগ্রা দুর্গ, আগ্রার বিশিষ্ট চরিত্রসমূহ, যেমন তাজমহলে চিরনিদ্রায় শায়িত সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল, সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহান আরা, রওশন আরা প্রমুখের জীবনালেখ্যের কথাও এসেছে। সম্রাট শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে মুঘল রাজধানী আগ্রা শহর আর রাজ-অন্তঃপুর ছিল উত্তাল। সেসময় জাহান আরা দারাশিকোহর এবং রওশন আরা আওরঙ্গজেবের পক্ষে ছিলেন। আগ্রার রাজদরবারের মতোই হেরেমের অভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই ও রাজনৈতিক মেরূকরণ জমে উঠেছিল।

এসব কারণে আগ্রার মুঘল হেরেম নিয়েও গবেষণার অন্ত নেই। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রুবি লালের Domesticity and Power in the Early Mughal World, কে. এস. লালের The Mughal Harem, করুণা শর্মার A Visit to the Mughal Harem: Lives of Royal Women, South Asia, তিরমিজি সাই-এর Edicts from the Mughal Harem, সুগন্ধা রাওয়াতের The Women Of Mughal Harem, বাঁশি শর্মার The Naked Mughals: Forbidden Tales of Harem and Butchery, রেশমি বাচ্চুর গঁমযধষ ঐধৎবস, সুভদ্রা সেনগুপ্তার Mahal: Power and Pageantry in the Mughal Harem এবং তনুশ্রী পোদ্দারের Escape from Harem অন্যতম। এসব প্রসিদ্ধ গ্রনে' ঐশ্বর্যশালী মুঘল সাম্রাজ্যের বিবর্তনের সমান্তরালে রাজধানী আগ্রা, রাজদরবার ও হেরেমের উত্থান ও বিকাশ, আগ্রার অন্যতম প্রধান নির্মাতা সম্রাট আকবরের হাতে নগরীর মতোই হেরেমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন, মুঘল রাজধানীর পাওয়ার, পলিটিক্স ও পার্সোনালিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এসেছে আগ্রা নগরের আলোকিত ও অন্ধকার নানা দিকও। মুঘল আগ্রার পটভূমিতে বিশেষ বিশেষ কাউকে কেন্দ্র করে উপন্যাস বা আখ্যান বা কাহিনীও রচিত হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বহু লোকশ্রুতি, মিথ ও উপাখ্যান।

বাংলার সাহিত্যের প্রায়-সকল প্রধান কবিই তাজমহল নিয়ে অসাধারণ কবিতা রচনা করেছেন। যে তালিকার উপরের দিকে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের নাম। উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যে তাজমহল পেয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা। বিখ্যাত কবি ও গীতিকার সাহির লুধিয়ানভী ও লেখিকা অমৃতা প্রীতমের মধ্যে যে অভাবনীয় প্রেমময়তা বিরামজান ছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আগ্রার তাজমহল। আগ্রার সঙ্গে মিশে রয়েছে এমন এক ট্র্যাজিক নায়িকার নাম, তিনি বাস্তব নাকি কাল্পনিক চরিত্র, তা নিয়ে বিস্তর সংশয় থাকলেও জনপ্রিয় হয়ে আছেন তিনি আনারকলি নামে মানুষের মুখে মুখে, লোককথায়, চলচ্চিত্রে, নাটকে ও সাহিত্যে। অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র মুঘল-ই-আজম নির্মিত হয়েছে যার করুণ প্রেমের ভিত্তিতে।
মুঘল ভারতের অলিন্দে এখনো লুক্কায়িত ইতিহাসের অধ্যায়, প্রেমের আখ্যান, আনন্দের ধ্বনি এবং বেদনার ইতিবৃত্ত, যা গৌরব ও ঐতিহ্যের সমান্তরাল ধারায় রোমাঞ্চকর শিহরণে আজও প্রবহমান। 

mzamin