Sunday, December 29, 2024

এক ভবনেই বাস পুরো শহরের মানুষের

গোটা শহরের মানুষ বাস করে মাত্র একটি ভবনে। বিচ্ছিন্ন এই শহরেও রয়েছে বাজার, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও স্কুল থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। আর এত সব পরিষেবা পাওয়া যায় শহরের একমাত্র ভবনটিতেই, যেখানে বাসিন্দারা থাকেন। হোয়িটিয়ার নামের ব্যতিক্রমী এই শহরটি অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য আলাস্কায়। সিবিএস নিউজ, উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শহরটির বর্ণনা উঠে এসেছে।

শহরের একমাত্র ভবনটিকে ডাকা হয় বেগিচ টাওয়ার নামে। এটি ১৯৫৩ সালে নির্মাণ করা হয়। শহরটির বয়সও এর ভবনের কাছাকাছি। শুধু একটি ভবনেই গোটা শহর অবস্থান করায় হোয়িটিয়ারকে বলা হয় ভার্টিক্যাল টাউন। অতীতে এটি কোনো শহর ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই ভবনটি ছিল একটি সেনা ব্যারাক। স্নায়ুযুদ্ধ শেষে সেনারা সেখান থেকে সরে গেলে একটিকে বেসামরিক বাসভবনে পরিণত করা হয়। এরপর করিডোর এবং লিফটের মাধ্যমে পুরো বিল্ডিংকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

১৪ তলা বিশিষ্ট বেগিচ টাওয়ারে মোট ১৫০টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৭২ জন মানুষ এখানে বসবাস করছে। আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি এই ভবনে পোস্ট অফিস, জেনারেল স্টোর, লন্ড্রি, চার্চ, থানা, কনফারেন্স রুম এবং ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডেরও ব্যবস্থা রয়েছে ভবনটিতে।

এই শহরের ভেতরে প্রবেশ করার একটাই রাস্তা, যা মূলত ৪ কিলোমিটার লম্বা একটি টানেল। রাত সাড়ে ১০টার পর বন্ধ করে দেওয়া হয় টানেলটি। শহরটিতে একটি এয়ারফিল্ড থাকলেও ১৯৬৪ সালে ভূমিকম্পের পর এটি ব্যবহারযোগ্য নেই। উপকূলীয় শহর হওয়ার কারণে শহরটির একটি বন্দর থাকলেও শীতকালে কিংবা আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে নৌপথে চলাচল ও বাসিন্দাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

হোয়িটিয়ারের ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলটি নর্থ আমেরিকার সর্ববৃহৎ যৌথ রেল ও হাইওয়ে টানেল। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে রেল আসা যাওয়া করে টানেলটি দিয়ে, সে সময় অন্যান্য যানবাহন চলাচল বন্ধ। রাত সাড়ে ১০টায় টানেলের গেট বন্ধ করার পর আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী দিন সকালে আবার টানেলের গেট খোলা হয়।

আলাস্কার আবহাওয়া সারা বছরই খারাপ থাকে। কঠিন আবহাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে এই বেগিচ টাওয়ারে মানুষ বসবাস করে। হোয়িটিয়ারের আবহাওয়া এতোই খারাপ থেকে যে শীতকালে এর তাপমাত্রা নেমে আসে মাইনার ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঘণ্টায় ৯৬ কিলোমিটার বেগে বাতাস ও ৬ মিটার তুষারপাত হয়। এ কারণে এই ভবন ছেড়ে লোকজন অন্য কোথাও যান না।

এক ভবনেই বাস পুরো শহরের মানুষের

’২৫ সালের মধ্যেই জুলাই হত্যার বিচার

আগামী বছরের ১৬ই ডিসেম্বরের আগে জুলাই গণহত্যার বিচার শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন- আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন বিচার সম্পন্ন করে বিজয় উদ্‌যাপন করা হবে। শনিবার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন’ নিয়ে দুই দিনব্যাপী সংলাপের দ্বিতীয় দিনে ‘গুম-খুন থেকে জুলাই গণহত্যা: বিচারের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন। দুই দিনব্যাপী এই সংলাপের আয়োজন করেছে ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ। একই অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামও এক বছরের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার কথা বলেছেন।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতের হত্যাকাণ্ডসহ ধারাবাহিকভাবে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদেরও বিচার করা হবে। এসব বিচার করবে আইন বিভাগ। কোনো গাফিলতি হবে না। সারা দেশে দায়ের হওয়া গায়েবি মামলার আনুমানিক সংখ্যা নির্ধারণের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কতোগুলো ‘গায়েবি’ মামলা হয়েছে তার হিসাব বের করতে সব জেলার পাবলিক প্রসিকিউটরদের তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত ৫১টি জেলা থেকে গায়েবি মামলার আনুমানিক হিসাব পেয়েছে। আরও ১৩টি জেলা থেকে তথ্যের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চার হাজারের বেশি পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয়েছে। এই কাজ তারা করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিল না, তদন্ত কর্মকর্তা ছিল না জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে প্রসিকিউশন টিম করা হয়েছে। তড়িঘড়ি করে বিচার করে বিচারকে প্রশ্নের মুখে ফেলা যাবে না। বিচার নিয়ে কোনো গাফিলতি হবে না, নিশ্চিত করে বলতে চাই। বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো দেরি হচ্ছে না। এ সময় আসামিদের হাতকড়া পরানো নিয়ে উপদেষ্টা আরও বলেন, মামলার শুনানির সময় ও আসামিদের হাতকড়া না পরানো নিয়ে এখন সমালোচনা হচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সময় আসামিদের আইনজীবী যিনি ছিলেন, তিনি বলেছেন, শুনানির জন্য সে সময় তিন মাস দেয়া হয়েছিল। এখন শুধু এক মাস দেয়া হয়েছে। তখন আসামিদের কাউকে হাতকড়া পরানো হয়নি, এখনো আসামিদের হাতকড়া পরানো হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ৮৫৮ জন, আহতের সংখ্যা ১১ হাজার ৫৩৬ জন। অভ্যুত্থানে হতাহতদের প্রথম ধাপের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক বিশেষ সেল। সম্প্রতি সেলের প্রধান, অতিরিক্ত সচিব খন্দকার জহিরুল ইসলামের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে হতাহতের এ তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়। পরে জুলাই-আগস্টে নিহত এবং আহতদের তালিকা তৈরি করতে ১৫ই আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।

এ কমিটি গত ২৯শে সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ৭১৭ জনের নিহতের তালিকা প্রকাশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম-এমআইএস। তবে ২৮শে সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি আন্দোলনে নিহত ও আহতদের সংখ্যা আর বেশি বলে দাবি করে। সেদিন বলা হয়, আন্দোলনে ১৫৮১ জন নিহত হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের অডিটোরিয়ামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেদিন বলা হয়, আন্দোলনকালে ৩১ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন। তবে এটি আরও যাচাই-বাছাই করা হবে।

ট্রাইব্যুনালে ‘টপ কমান্ডার’সহ সবার বিচার আগামী বছরের মধ্যে শেষ হবে: চিফ প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাধারণত ‘টপ কমান্ডার’ বা শীর্ষ অপরাধীদের বিচার করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সবার বিচারই প্রায় আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা হবে। চিফ প্রসিকিউটরকে এই অধিবেশনে সঞ্চালক মনির হায়দার প্রশ্ন করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে সক্ষমতা আছে, তা গণহত্যা, গুম-খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের এত বড় পরিধির বিচারের জন্য কি যথেষ্ট? জবাবে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, এই ট্রাইব্যুনালের ১০ জন প্রসিকিউটর ও ১৭ জন তদন্তকারী কর্মকর্তা আছেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে গুম, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বাংলাদেশের মাটিতে হয়েছে, সেই অপরাধের যারা মাস্টারমাইন্ড (হোতা), যারা একদম সর্বোচ্চ জায়গায় বসে থেকে অপরাধগুলো সংঘটিত করেছিলেন প্রাধান্য দিয়ে, তাদের বিচার করা। সেক্ষেত্রে এই ট্রাইব্যুনাল হাজার হাজার মানুষের বিচার করতে পারবে না এবং সেই লক্ষ্যে অগ্রসরও হচ্ছেন না তারা।
সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ছিল। এর সঙ্গে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা ছিল। দেশব্যাপী সবকিছুর বিচার করতে গেলে এই ট্রাইব্যুনালের পক্ষে তা সম্ভব নয় বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর। তাজুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাধারণত টপ কমান্ডারদের বিচার করা হয়। জুলাই-আগস্টের গণহত্যার প্রধান নিউক্লিয়াস ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার নিচের দিকে কয়েকজন ছিলেন, তাদের বিচারকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা তাদের বিচার শেষ করতে চান। সেই সক্ষমতা তাদের আছে বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মামলা ও সবার বিচারই প্রায় আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা যাবে। দেশব্যাপী যত অপরাধ হয়েছে, সে জন্য বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে এবং সাধারণ আদালতে বিচার চলছে, সেটা চলবে বলেও জানান তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সেই বিচার করতে কতো সময় লাগবে, সেটা সংশ্লিষ্ট আদালত বলতে পারবেন। দুইদিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছেন জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের অনেক প্রাধান্য আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রাধান্য হচ্ছে যারা দেশটাকে খুন ও গুমের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল, যারা ছাত্র-জনতার রক্তে এই বাংলার মাটি রঞ্জিত করেছে, তাদের বিচার এক নম্বর প্রাধান্য। এই জায়গায় ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে বঙ্গোপসাগর: রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু আর হিমালয় নয়, কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বঙ্গোপসাগর বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, সরকার এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব দিতে পারে। সেই নেতৃত্ব দেয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি পরিবর্তন হচ্ছে মন্তব্য করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় রকমের পরিবর্তন হবে। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরে পরিবর্তন হবে। এ অঞ্চলে কোনো নেতা নেই, যিনি বঙ্গোপসাগরে বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয়ভাবে নেতৃত্ব দান করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রতিবেশী আসতে পারে, নতুন রাষ্ট্রের উত্থান হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে, ভূরাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেবে।’

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সংস্কার ও নির্বাচনকে পাল্টাপাল্টি না বলে ন্যূনতম ঐক্যের দিকে যেতে হবে। অর্থনীতি মন্দা অবস্থায় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনীতির উৎপাদন সম্পর্কে কোনো কথাবার্তা নেই। সেটা আসলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কায়দায় চলবে না, অন্য কোনো কায়দাও চলবে না। দেশজ কায়দা চলতে হলে দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাবে। কিন্তু সামগ্রিক সংস্কার করা যাবে না। সরকারের একটাই লক্ষ্য থাকতে হবে, দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। চারটা থেকে পাঁচটা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অনুমোদন দেয়া ১২ ব্যাংকের স্পন্সর কোথা থেকে পেয়েছে, তা বের করা এনবিআরের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

প্রতিশোধ নয়, বিচার করতে চায়: অ্যাটর্নি জেনারেল
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘জুলাই গণহত্যার বিচারে আমরা কি প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি এমন অনেক প্রশ্ন আসছে। আমরা বলতে চাই, আমরা প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি না। আমরা বিচার করতে চাচ্ছি। কেন বিচার করতে চাচ্ছি? আমরা আগামী প্রজন্মকে ইতিহাসের একটি দায় থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান সময়ে এসে কেউ জমি দখলে ব্যস্ত, কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত, কেউ পদ-পদবি দখলে ব্যস্ত, কেউ নিজস্ব লোক পুনর্বাসনে ব্যস্ত, কিন্তু খুনিদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য, খুনিদের বিচারের জন্য আমাদের ওপর যে পরিমাণ চাপ প্রয়োজন ছিল সেদিকে আপনারা ফোকাস করেননি। তিনি বলেন, আপনারা যত বেশি চাপে রাখবেন, আমরা তত বেশি এই বিষয়টাকে (বিচার) সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দৃঢ় চেষ্টা থাকবে। আপনারা যত বেশি অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করবেন আমরা রাষ্ট্রকে এবং জনগণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ততবেশি এজেন্ডা ভিত্তিক সাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাবো।

দেশে ঐক্যের প্রয়োজন উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঐক্য ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়। সংস্কার ছাড়া যৌক্তিক কোনো বাংলাদেশ আপনাদের উপহার দেয়া সম্ভব নয়। ঐক্য ছাড়া, সংস্কার ছাড়া এই বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে করাটা কঠিন এবং দুরূহ।’

বিচারের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে আলোচনা কম হওয়ায় কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রের প্রধান এ আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল চ্যালেঞ্জের জায়গাটা কি সেটা আমাদের বলবেন। আমরা সেটায় যেন যৌক্তিক সমাধানের জায়গায় যেতে পারি, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে আমরা পাইনি। তিনি বলেন, আমার কাছে চ্যালেঞ্জের প্রধান জায়গাটা হলো, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের বিনিময়ে যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা রাস্তায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলাম, সেই লক্ষ্য, সেই ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা, সেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত মিলিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করার যে ঐক্য, সেই ঐক্যটাতে যে ফাটল ধরেছে সেই ফাটলটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। ’

বিভিন্ন মিথ্যা মামলা প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পার্সোনাল গ্রাস এক্সপোজ করার জন্য মামলা দিয়েছেন, আসামির খাতায় নাম দিয়েছেন, এই মামলাগুলোর পরিণতি কি হবে এবং এটার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে মামলা তার কোনো কনফ্লিক্ট হবে কিনা প্রশ্ন এসেছে। আপনাদের আইনিভাবে, স্পষ্টভাবে বলতে চাই, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, সেই ট্রাইব্যুনাল ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৯৭৩ এর ১৯ নাম্বার আইন। সে আইনে মানবতাবিরোধী আইনের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা, নির্যাতন, গুমসহ অনেকগুলো অপরাধের কথা বলা হয়েছে, যে অপরাধগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সিভিলিয়ান পপুলেশনের ওপর ঘটনা ঘটানো হয়েছে তার বিচার হবে। সেটি একটা দুইটা স্পেসিফিক ঘটনার দরকার নেই। ইন জেনারেল সেটার বিচার হবে। ঐ আইনেই বলা আছে ডমেস্টিক অন্যান্য আইনে যাই বলা থাকুক না কেন, ঐটার বিচার ওখানে হবে। অর্ডিনারি গুমের বিচার, খুনের বিচার, নির্যাতনের বিচার, নিপীড়নের বিচার, এইগুলো অর্ডিনারি কোর্টে হতে কোনো বাধা নেই এবং সেটাও চলবে।

সংস্কারের বিষয়ে সরকার একা সিদ্ধান্ত নেবে না: উপদেষ্টা মাহফুজ
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। মাহফুজ বলেন, ‘কমিশন থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পর সব রাজনৈতিক দল এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার পরিকল্পনা করছে সরকার। যা জানুয়ারিতে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংস্কারের বিষয়ে সরকার একা কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।’
তিনি বলেন, ‘কতোটা সংস্কার সম্ভব এবং কোনটা স্বল্পমেয়াদি আর কোনটা দীর্ঘ সময়ের জন্য সব কিছুই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এরপর জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে পরিষ্কার হবে যে আমাদের অগ্রাধিকারমূলক সংস্কারগুলো কী এবং আমরা কী করতে সক্ষম হবো।’

মাহফুজ বলেন, ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ঐক্য দিয়ে কী করবেন। রাষ্ট্র প্রধানত তার প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। আমরা ৭২’র সংবিধানের সমালোচনা করছি কারণ এর দ্বারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা না যায়, তাহলে এ সংস্কার ক্ষমতার পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না।’

ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিমূলক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, ‘১৯৭১ সালের পর আমরা দেশকে সংস্কার ও প্রতিষ্ঠা করতে বড় একটা সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা যদি রাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হই, তাহলে সবকিছু ভেস্তে যাবে।’ গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, ‘আমরা চাই জনগণ সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করুক। কেননা এটি সরকারের কাজের গতি ত্বরান্বিত করে। জনগণের ব্যাপক সমালোচনা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

সংলাপে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাখা যায় কিনা, তা সংবিধান সংস্কার কমিটিকে ভাবতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধান রচনার সময় শেখ মুজিবও কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেননি। সংবিধান নতুন করে রচনার সময় এ অঞ্চলের ধর্মীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। আতাউর রহমান দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দেন।

জাতীয় নাগরিক কমিটির সরোয়ার তুষার বলেন, ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের যে সংবিধান তা বাতিল হয়ে গেছে। বলা যায়, এ সংবিধান এখন কোমায় চলে গেছে। সংবিধান পরিবর্তন করার লক্ষ্যে একটি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, গঠন করতে হবে একটি গণপরিষদ। এ গণপরিষদ সংবিধান রচনা করবে নতুন করে। এই গণপরিষদ পরে আইনসভা বা জাতীয় সংসদে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজনে গণভোট করা যেতে পারে।
তবে তুষারের কথার বিরোধিতা করেন ছাত্রদলের গবেষণা সেলের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবীব। তিনি বলেন, ‘যে সংবিধানের ১০৪ ধারা মতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে, আপনারা শপথ নিয়েছেন, তা এত সহজে বাতিল করে দেবেন? সংবিধান সংস্কার করতে গেলে প্রয়োজন গণভোট। থাকতে হবে জনগণের ভাষ্য। জনগণের কথা বলবেন, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। জনগণের প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে কেবল ১০-১২ জনের পাঠচক্রে সংবিধান সংস্কার করে ফেলবেন?’ জবাবে সারোয়ার তুষার বলেন, রাজনৈতিক দলই জনগণের প্রতিনিধি এটা ভুল ধারণা। তাহলে জুলাই বিপ্লবে ছাত্রদের ডাকে সাধারণ মানুষ নেমে আসতো না।

দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিনের সঞ্চালনায় সংলাপে অংশ নেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, গণফোরামের কো-চেয়ারম্যান সুব্রত চৌধুরী, গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরাজী, গণসংগীত আন্দোলনের আবুল হাসান রুবেল প্রমুখ।

সৈয়দ আবদুল্লাহর সঞ্চালনায় অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন- নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি’র সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু, মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির চেয়ারপারসন রোকসানা খন্দকার, মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান, এডভোকেট দিলরুবা শারমিন, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

mzamin

পুলিশ ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল হয়ে উঠেছিল

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, বিপ্লবের আগে পুলিশ ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল হয়ে উঠেছিল। পুলিশের নেতৃত্ব স্তর ভেঙে পড়েছিল, জনআস্থা থেকে পুলিশ ছিটকে পড়েছিল। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, জনগণের কাছে পুলিশকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মিলনায়তনে বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার্স কল্যাণ সমিতির (বিআরপিওডব্লিউএ) এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

আইজিপি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ একটি ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে পুলিশকে এমন অবস্থায় পতিত হতে হয়নি। জুলাই-আগস্ট বিপ্লব-পূর্ব ও বিপ্লব-উত্তর পুলিশের পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। বিপ্লবের আগের সময়ে পুলিশ হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল। ফলে পুলিশকে জনরোষের শিকার হতে হয়েছে। এখন উদ্যম, আগ্রহ আর নিষ্ঠা নিয়ে আমরা পুলিশকে সংগঠিত করছি। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুলিশকে সুসংগঠিত করা, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা এবং এ পুলিশ যাতে আর কখনো জনবিরোধী অবস্থানে ফিরে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা করা।

আইজিপি বলেন, সারা দেশে অপরাধ দমনে পুলিশ কাজ করছে এবং এর কোনো ম্যাজিক সলিউশন (জাদুকরি সমাধান) নেই। সারা দেশের এসপিদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমাদের কাছে কোনো জাদুকরি সমাধান নেই কারণ আপনি পরিস্থিতি জানেন এবং কোথা থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড বেড়েছে, পুলিশ কী ভূমিকা নিচ্ছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, আমরা পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর করতে এবং তাদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। আমরা মানুষের আরও কাছাকাছি যেতে চাই এবং তাদের সহযোগিতা চাই। আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদেরও আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে আমাদের সমপ্রদায়ের (পুলিশ সদস্যদের) সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করেন।

সমপ্রতি বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শিক্ষার্থী সমন্বয়কারীদের হুমকির বিষয়ে আইজিপি বলেন, আমরা প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে সমাধান করেছি। কালিয়াকৈরে ডাকাতি ও নারায়ণগঞ্জে মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত হয়েছে। ছাত্র সমন্বয়কদের নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হলে তারা ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সব ঘটনা পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা নয় বলেও উল্লেখ করেন আইজিপি। হুমকিসহ আরও দু’টি ঘটনার কথাও উল্লেখ করে আইজিপি বলেন একটি হলো- ময়মনসিংহ থেকে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে তার বাবা-মায়ের জিম্মায় দেয়া হয়। অপর ঘটনায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেহের নামে এক শিক্ষার্থীকে হুমকি দেয়া হয়, যার ফলে সিরাজগঞ্জ থেকে জাহিদ হাসানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আইজিপি বলেন, আমরা প্রতিটি ঘটনা সমাধানের জন্য কাজ করছি, তবে সবগুলো ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র নেই। সমপ্রতি সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এটা তদন্ত কমিটি কাজ করবে। আমি এ বিষয়ে কথা বলতে পারবো না। পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতির বিষয়ে আইজিপি বলেন, কর্মকর্তাদের অবদানের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের উপায় হিসেবে মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন চাকরির মেয়াদ বাকি থাকতেই পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। তার নিজের চাকরির মেয়াদ নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, আমি অবসর থেকে ফিরে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। জানি না কতটুকু অর্জন করতে পারবো। তবে আমি চলে যাওয়ার সময় সম্মানটা সঙ্গে করে নেয়ার চেষ্টা করবো।

আইজিপি বলেন, গর্ব করার মতো অবদান আছে পুলিশের। এই বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ রুখে দিয়ে গড়ে তুলেছিল সশস্ত্র প্রতিরোধ। আমরা সে বাহিনীর উত্তরসূরি। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পুলিশের পুনর্গঠনের পবিত্র দায়িত্ব আমার ওপর বর্তেছে। আশা করি, পুলিশ পুনর্গঠনের এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে অবসরপ্রাপ্ত সব পুলিশ সদস্য আমাকে সহায়তা করবেন। এর আগে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে বিআরপিওডব্লিউএ’র ৪১তম বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সমিতির মৃত্যুবরণকারী সব সদস্য ও গত জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শাহাদতবরণকারী সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। পরে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে আইজিপি বাহারুল আলম সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির পাঁচজন বয়োজ্যেষ্ঠ পুলিশ সদস্যকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেয়া হয়। কমিউনিটি পুলিশিং ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের জন্য তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘এসএম আহসান স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হয়। এ ছাড়া নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু সুরক্ষায় ভিকটিম সাপোর্ট কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘প্রফেসর অনামিকা হক লিলি-ড. এম এনামুল হক অ্যাওয়ার্ড’- দেয়া হয়।

mzamin

ভারতের কারাগারে নেয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা সুখরঞ্জন বালির

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন বালি কীভাবে ভারতের কারাগারে পৌঁছান, এর লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। ২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর সকালে ঘটনাটি ঘটে। অপহৃত হওয়ার পর তার সঙ্গে কী কী ঘটেছে, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সঙ্গে আলাপকালে তার বিশদ বর্ণনা তুলে ধরেন সুখরঞ্জন বালি।

বাসসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুখরঞ্জন বালি বলেন, ২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর আমি ঢাকায় কোর্টে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে দু’জন ব্যারিস্টার ও দু’জন উকিল ছিলেন। আমাদের গাড়ি দেখে কোর্টের গেটে আটকে ফেলা হয়। তখন আমার সঙ্গে থাকা আইনজীবীদের সঙ্গে গেটের লোকদের তর্কবিতর্ক চলছিল। আমি গাড়িতে দু’জন ব্যারিস্টারের মাঝে বসা ছিলাম। এ সময় কিছু সাদা পোশাকের লোক আমাকে নামিয়ে টানাটানি করতে লাগলো। তারা বলছিল, যার জন্য গাড়ি থামানো হয়েছে, সেই লোক উনি। একেই আমাদের দরকার। সেই লোকরা আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে টেনে-হিঁচড়ে পাঁচ-ছয় হাত দূরে অপর একটি গাড়িতে তুলে আমার চোখ বেঁধে ফেলে এবং একটু পরে গাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়িটি চালানোর পর সাদা পোশাকের লোকেরা আমাকে হাঁটাতে থাকে। এ সময় আমি নিচের দিকে নামার মতো অনুভব করি। কিছুদূর হাঁটিয়ে একটা দরজা খুলে অন্ধকার জায়গায় আমাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কোনো আলো সেখানে ছিল না, অথচ তখন সকাল ১০টা-১১টা বাজে।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, আমাকে একটি খালি রুমে আটকে দেয়া হয়। বাইরে কোনো শব্দ ছিল না। ঘরে কোনো জানালা বা ফাঁকা ছিল না, যা দিয়ে কোনোরকম আলো ভেতরে আসতে পারে। তখন আমাকে মাঝে মাঝে অল্প করে খাবার দেয়া হতো। সেখানে কিছু লোক ছিল, যারা আমাকে খাবার দিতো বা পাহারায় আসতো; তারা নীল রংয়ের পোশাক পরা থাকতো।

তিনি বলেন, এর দু’দিন পর আমাকে সেই রুম থেকে বের করে অন্য একটি রুমে নেয়া হয়। সেখানে আমাকে নিয়ে তারা জোর করে সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি নিতে চায়। সে রুমে অনেকগুলো ক্যামেরা লাগানো ছিল আমি দেখতে পাই। আমার ভাইয়ের হত্যায় সাঈদী হুজুর জড়িত কিনা জানতে চাইলে আমি যখন অস্বীকার করি এবং বলি যে, যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, তাদের আমি চিনি। তাদের বিরুদ্ধে আমি সাক্ষ্য দিতে পারবো। কিন্তু তারা বারবার আমাকে সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বলে এবং একপর্যায়ে তারা আমাকে মারধরসহ কারেন্টের শক দেয়, নির্যাতন করে।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, তারা আমাকে একপর্যায়ে টাকা দিয়ে লোভ দেখানোর চেষ্টা করে। এরপরও রাজি না হলে তারা অমানবিক নির্যাতন চালায়। সেখানে টানা কয়েকদিন ছিলাম। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তখন তিন-চারজন লোক জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তাদের অত্যাচারে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর তারা একদিন সকাল ৭টা কি ৮টার দিকে আমাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলে। আয়নাঘর থেকে যখন গাড়িতে উঠানো হচ্ছিলো, তখন আমি ভয়ে ভয়ে জানতে চাই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? জবাবে তারা বলেছিল, আমরা তোকে তোর দেশে নিয়ে যাবো। বল কোথায় নামিয়ে দিলে তুই তোর বাড়ি চিনে যেতে পারবি। তখন বলি, বাগেরহাটে নামিয়ে দিলে আমি আমার বাড়িতে যেতে পারবো। সারাদিন গাড়ি চালানোর পর মাঝে একবার ফেরিতে উঠানো ও নামানো হয়, সেটা আমি অনুভব করতে পারি।

তিনি বলেন, একপর্যায়ে আবার গাড়ি চলতে শুরু করে; দীর্ঘক্ষণ চালানোর পর দুইজন লোক গাড়িতে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পর ১০-১২ মিনিটের মতো হবে গাড়িটি চলতে চলতে থেমে যায়। এ সময় গাড়ি থেকে আমাকে নামানো হয় এবং চোখ খুলে আমাকে সামনে এগোতে বলা হয়। জায়গাটি বাগেরহাট কিনা, সেটা বুঝতে চেষ্টা করি। আমি বুঝতে পারি যে, ওটা বাগেরহাট নয় এবং স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সামনে বিএসএফ, এটা বর্ডার এলাকা। সেখানে যারা আমায় নিয়েছে, কান্না করতে করতে আমি বিএসএফ-এর হাতে তুলে না দিতে তাদের অনুরোধ করি। আমি বলি এদের হাতে তুলে দিয়েন না। প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেলেন। এ কথা বলতে বলতে আমি মাটিতে পড়ে যাই।

সুখরঞ্জন বলেন, আমাকে নেয়া গাড়ির লোকেরা জোর করে বিএসএফ-এর কাছে দিয়ে আসে আমায়। এ সময় আমি দেখতে পাই গাড়িতে ৬-৭ জন সবুজ পোশাকের পুলিশের সঙ্গে দু’জন বিজিবি সদস্য আছেন। তখন আমি বুঝতে পারি গাড়ি থামিয়ে যাদের নেয়া হয়, তারাই বিজিবি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের একজন নিরপরাধ নাগরিককে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরেকটি দেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেয় কেমন করে?

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুখরঞ্জন বালি বলেন, আমি যেতে না চাইলে জোর করে তারা আমাকে ধরে বিএসএফ সদস্যদের হাতে তুলে দেয়। বিএসএফ কিছু জিজ্ঞাসা না করেই আমাকে প্রচুর মারধর শুরু করে। বিএসএফ হিন্দিতে কথা বলছিল এবং আমি আমাকে না মারার জন্য বাংলায় বোঝাতে চেষ্টা করি। আমার কোনো কথা তারা বুঝতে পেরেছিল কিনা, আমি আজও বুঝিনি। একপর্যায়ে বিএসএফ মোটা দড়ি দিয়ে পেছন দিক দিয়ে আমার হাত বেঁধে ফেলে। হাত বাঁধার সেই দাগ এখনো স্পষ্ট। সেটা তিনি এই প্রতিবেদককে দেখান। বিএসএফ-এর মারধরের পর তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা বেহুঁশ ছিলেন। তিনি বলেন, বিএসএফ-এর ক্যাম্পটির বিষয়ে জানতে পারি, এটি বৈকারী বাজার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর-চব্বিশপরগণা জেলার স্বরূপনগর থানা এলাকা। এরপর বশিরহাট জেলে আমাকে ২২ দিন রাখা হয়। সেখানে একদিন আমাকে কোর্টেও নেয়া হয়। এরপর আনা হয় দমদম জেলে।

সুখরঞ্জন বলেন, দমদম জেলে থাকাকালীন সেখানে এক বন্দিকে (সম্পর্কে আমার ভাগনে হয়) আমি দেখি। সে আমাকে চিনতে পারেনি। আমি সুযোগ বুঝে তাকে আমার পরিচয় দিলে সে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে, মামা তুমি বেঁচে আছ। আমরা তো জানি তুমি মারা গেছ। সে ভাগনে কারামুক্তির পর আমার বাড়িতে ও নিকটাত্মীয়দের আমার বেঁচে থাকা ও ভারতের দমদম জেলে বন্দি থাকার কথা জানায়। তিনি বলেন, আমার বাড়ির লোকেরা ভারতে প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলে মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ২০১৮ সালের প্রথমদিকে ৫ বছর জেল খেটে আমি মুক্ত হয়ে দেশে ফেরত আসতে পারি।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, সেই দৃশ্য আমি আমার বাড়ির পাশে টয়লেটের ভেতর লুকিয়ে থেকে নিজ চোখে দেখেছি। সেখানে সাঈদী হুজুরকে আমি দেখিনি। তখন এ নামে কাউকে আমি চিনতামও না। উনি আমাদের এলাকা থেকে নির্বাচিত দুই/দু’বারের এমপি ছিলেন। তখন উনার সম্পর্কে জানি ও চিনতে পারি। সাঈদী হুজুর যখন এমপি ছিলেন, তখন আমাদের মনে হতো যেন আমরা মায়ের কোলে আছি। হুজুর নিরপরাধ-নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে শত নির্যাতন সহ্য করেও আমি সাক্ষ্য দিইনি। আমাকে ক্ষুদিরামের মতো ফাঁসি দিলেও আমি প্রস্তুত ছিলাম। তিনি বলেন, ভারত থেকে দেশে ফিরেও আমি নিজ এলাকায় পিরোজপুরের ইন্দুরকানিতে যেতে পারিনি। নিরাপত্তার কারণে বাগেরহাটে আত্মীয় ও পরিচিতদের সহায়তায় তাদের আশ্রয়ে ছিলাম।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানি (সাবেক জিয়ানগর) উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামে আমার বাড়ি। আমি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। আমার ছেলেও কাঠমিস্ত্রির কাজ করতো। তাতে যে আয়রোজগার ছিল, তাতে আমি পরিবার নিয়ে ভালোই চলতাম। সাঈদী হুজুরের মামলায় সাক্ষ্য দেয়াকে কেন্দ্র করে আমাকে অপহরণ করে গুম করে নির্যাতন, নিপীড়ন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিজিবি’র সহায়তায় বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিয়ে টানা ৫ বছর কারাবন্দি করে অবর্ণনীয় সাজা ভোগে বাধ্য করা হয়। অনেক ভয়-আতঙ্কের পরও সাঈদী হুজুরের মুত্যুর পর তার জানাজায় উপস্থিত হয়েছিলাম। তারপর আবারো আমি নিরাপত্তার কারণে আড়ালে চলে যাই। তিনি জানান, তার ওপর ঘটে যাওয়া এত ঘটনার পর তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারেননি। নিজ পেশায়ও ফিরে যেতে পারেননি। ফলে অর্থকষ্টে ও অভাবে দিন কাটছে তার ও পরিবারের।

সুখরঞ্জন বালি রাষ্ট্রের প্রষ্ঠপোষকতায় অপহরণ, গুম এবং ৫ বছর কারাবন্দি থাকাসহ তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব অন্যায়ের বিচার চান তিনি। ক্ষতিপূরণ চান রাষ্ট্রের কাছে।

উল্লেখ্য, সুখরঞ্জন বালি পশ্চিমবঙ্গের এক কারাগারে আছেন, এ খবর প্রথম প্রকাশ করে ঢাকার একটি ইংরেজি পত্রিকা। ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবীরা তখন অভিযোগ করেছিলেন যে তাকে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন অপহরণ করে নিয়ে গেছে। ইংরেজি দৈনিকটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের পক্ষে একজন ভারতীয় নাগরিক কারাগারে সুখরঞ্জন বালির বক্তব্য নেন, যেখানে বালি বলেন, তাকে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ অপহরণ করে এবং পরবর্তীতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর কাছে তুলে দেয়।

mzamin

নতুন বছরে ট্রাম্পের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতি, যুদ্ধ, চীন ইস্যু, জলবায়ু

নতুন বছরে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তার ওপর ভোটাররা যে আস্থা প্রকাশ করেছেন, তা অর্জন করতে হলে তাকে পাড়ি দিতে হবে চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণার সময় অন্যতম ইস্যু ছিল অর্থনীতি। মার্কিন ভোটাররা যে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন তা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রোসারিগুলোতে মূল্যস্ফীতি অনেক এবং পণ্যের মূল্য অনেক বেশি। ডনাল্ড ট্রাম্পকে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছে। এ উপলক্ষে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ১২ই ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, মার্কিনিরা খুব শিগগিরই গ্রোসারিতে কেনাকাটায় সক্ষম হবেন। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব হাউসটনের অর্থনীতি বিভাগের এনার্জি বিষয়ক ফেলো এড হিরস বলেন, তিনি যতটা বলেছেন অতটা সহজ হবে না। অন্তত সঙ্গে সঙ্গে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। ওদিকে  মেক্সিকো, কানাডা সহ শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছ থেকে পণ্য আমদানিতে ট্রাম্প শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এড হিরস বলেন, যদি তিনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমদানি কর বাড়িয়ে দেন, তাতে পণ্যমূল্য বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, যদি মেক্সিকোর পণ্যের ওপর শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনকারীর সেই ২৫ ভাগ মূল্য বাড়ানোর সক্ষমতা থাকতে হবে। ঘটবে এটাই। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা মিলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ করে থাকে বছরে প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ট্রাম্প যদি শুল্ক হার বৃদ্ধি করেন তাহলে উৎপাদিত পণ্যের খুচরা দাম অনেক বেড়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, কানাডা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কানাডার কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। এর ওপর শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক আরোপ করা হলে পুরো দেশে প্রতিজন ভোক্তার ওপর তার ফল পড়বে। তাদের তেলের দাম বেড়ে গেলে তখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকারীরাও তাদের পণ্যের সমান মূল্য বাড়িয়ে দেবেন। ট্রাম্প মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাই তিনি এ সংক্রান্ত আইন ঢেলে সাজাবেন। তবে শুরু করবেন গণহারে অভিবাসীদের দেশ থেকে বের করে দিয়ে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলেই তাকে নাগরিকত্ব দেয়ার যে বিধান আছে, তাও বাতিল করে দিতে চেয়েছেন। কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। একটি নতুন আইন করার কথাও তুলেছেন তারা। এড হিরস বলেন, গণহারে লাখ লাখ ডকুমেন্টবিহীন অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দিলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। শ্রমিকদের করা কাজ বা গড়পড়তার কাজের ক্ষেত্রে জনশক্তির সংকট দেখা দেবে। এসব এমন কাজ, যা মার্কিনিরা করতে চান না। এর মধ্যে আছে বাড়ির লন দেখাশোনা করা, হাঁড়িপাতিল পরিষ্কার করা, রেস্তরাঁর টেবিল পরিষ্কার করা। তিনি টেক্সাসের পশ্চিমে পারমিয়ান বেসিনে তেলক্ষেত্রগুলোর কাজের দিকে ইঙ্গিত করেন। বলেন, এসব স্থানের তাপমাত্রা ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪৮.৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়। এত কড়া তাপমাত্রায় কাজ করার জন্য কর্মী পাওয়া কঠিন হবে। গ্রীষ্মের কড়া গরমে তেলক্ষেত্রগুলোতে কাজ করতে হয়। ফলে এসব অভিবাসী শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হলে তার আগে ওই কাজ করবে এমন মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে খুঁজে বের করতে হবে।

ওদিকে চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক মোটেও ভালো নয়। তিনি নিজে সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ে ২০২০ সালে তিনি প্রথম মেয়াদে ওভাল অফিসের দায়িত্বে থাকার সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল উত্তেজনার। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো অবকাশযাপন কেন্দ্রে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কোভিডের পূর্ব পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। তিনি শি জিনপিংকে একজন বন্ধু হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট একজন বিস্ময়কর মানুষ। ট্রাম্প আরও বলেন, কোভিড সম্পর্ককে শেষ করে দেয়নি। কিন্তু সেই সম্পর্ক আমার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধের আবির্ভাব হয়। এর ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনকে এলোমেলো করে দেয়। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়। কারণ, চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধের ফলে বিশ্ব জুড়ে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়। কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেখানে রেখে এসেছিলেন সেখান থেকে শুরু করতে চান। চীন থেকে পণ্য আমদানি করলে শতকরা ৬০ থেকে ১০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করতে পারেন। তা যদি করেন তাহলে সেটা হবে আরেকটি বাণিজ্যিক যুদ্ধ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আবারো বিঘ্নিত হবে। আরও ক্ষতির শিকার হবে যুক্তরাষ্ট্র। এড হিরস বলেন, ট্রাম্প যদি মেক্সিকো, কানাডার পণ্যের ওপর শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক সহ এই পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন, তাহলে দ্রুততার সঙ্গেই মুদ্রাস্ফীতি এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা কখনো দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প আক্রমণ চালিয়েছিলেন তার প্রথম মেয়াদে- এটা আমরা জানি। জবাবে চীন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপরে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শস্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল।

বিশ্ব ক্রমশ সংঘাতময় হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত যুক্তরাষ্ট্র। এসব যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। তিনি যদি এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তাহলে প্রশংসিত হবেন। বিশেষ করে গাজাকে কেন্দ্র করে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ। তবে ট্রাম্প যে ইসরাইলের প্রতি ভীষণভাবে ঝুঁকে আছেন বা থাকবেন তা নতুন করে বলার কিছু নেই। ফলে তিনি ফিলিস্তিনবাসীর স্বার্থকে বড় করে দেখবেন না। ইসরাইলের সঙ্গে তার সখ্য কোনো গোপন কথা নয়। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইল সেখানে বিমান, স্থল হামলা চালিয়ে গণহত্যা চালিয়ে কমপক্ষে ৪৫ হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ইসরাইলকে সামরিক সহ নানাবিধ সহায়তা অব্যাহত রেখেছে, যা দিয়ে তারা নিরীহ গাজাবাসীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। ট্রাম্প কি তার ব্যতিক্রম কিছু করবেন? এ জন্য তার দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মহল এই যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প কি করেন সেদিকে তাদের অণুবীক্ষণ যন্ত্র সেট করে রাখবে। এখানে উল্লেখ করতেই হয় যে, ১৯৬৭ সালে সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমিকে কেড়ে নেয় ইসরাইল। ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে এই গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলিদের নিয়ন্ত্রণ সরকারি ভাবে পশ্চিমা নেতাদের মধ্যে সবার আগে স্বীকৃতি দেন ট্রাম্প। এখন তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত। ফলে ইসরাইল সরকারের কিছু সদস্য আশা করছেন, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে সম্প্রসারিত ইসরাইলি বসতিকে তিনি স্বীকৃতি দেবেন। পশ্চিম তীর বর্তমানে আইনগতভাবে ফিলিস্তিনিদের। কিন্তু সেখানেও থাবা বসিয়েছে ইসরাইল। এড হিরস বলেন, কোনো পক্ষ নেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই যুক্তরাষ্ট্রের। তিনি বলেন, গাজা উপত্যকার ট্র্যাজেডি হলে কয়েক লাখ মানুষ সত্যিকার অর্থে দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে। তারা সমুদ্রের পাড়ে তাঁবুতে বসবাস করছেন। খাবার নেই। এটা নরহত্যা। এটা যুদ্ধের একটি সবচেয়ে খারাপ দিক। আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসন কি গাজার সমাজ ব্যবস্থাকে গড়ে তোলার জন্য কোনো ভূমিকা নেবেন কিনা- জানি না। এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় আসবেন, তখনো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলতে থাকবে। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে তিনি কথা বলবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে। তিনি তাদেরকে একটি চুক্তি করার ওপর জোর দেন। এর মধ্যদিয়ে উভয় নেতা যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেবেন। ট্রাম্প বলেন- এই যুদ্ধ থামাতে হবে। এমন অনেক শহর আছে, যেখানে কোনো ভবন আর দাঁড়িয়ে নেই। এড হিরস বলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের মতোই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যদিও ট্রাম্প বলেন, তিনি চান দুই দেশ যুদ্ধবিরতি চুক্তি করুক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাতে জড়িত হবে না। তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাড়াতে পারে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তারা সতর্কতার সঙ্গে মনে করে ন্যাটো সহ আন্তর্জাতিক বড় বড় জোট থেকে যদি ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন, তাহলে তার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে টেক্কা দেয়ার জন্য বিশ্বের অন্য সুপার পাওয়ারগুলোর জন্য সুযোগ করে দেয়া হবে। যদি ট্রাম্প এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে না আসেন, তাতে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এর ফলে শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন অথবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এগিয়ে আসবে। তাতে বিশ্বনেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা খর্ব হবে। এটা হবে তাদের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতি।

আরও একটি বৈশ্বিক স্বার্থে ট্রাম্পকে অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে। তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ কমিয়ে আনার জন্য একটি আইন করেছে। এর নাম ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট (আইআরএ)। গ্রিনহাউজ নির্গমন কমাতে বিনিয়োগ করা হবে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলার। ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তারপর জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে তা পুনর্বহাল করেন। এখন আবার ট্রাম্প কি করবেন- তা সময়ই বলে দেবে। 

mzamin

ভারতের ‘অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বৃহস্পতিবার রাতে দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। প্রধানমন্ত্রী পদে তারই উত্তরসূরি, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাত ১০টা ৩৭ মিনিটে টুইট করে এ খবর জানিয়েছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তার স্ত্রী গুরচরণ সিং এবং তিন কন্যা আছেন। এ খবর দিয়েছে বিবিসি বাংলা। এতে বলা হয়, মোদির ঘোষণার কিছুক্ষণ আগেই দিল্লির এইমস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ড. সিং এদিন সন্ধ্যায় বাড়িতেই অজ্ঞান হয়ে যান। বাড়িতেই তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। পরে এইমস হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয় মনমোহন সিংকে। কিন্তু সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনা যায় নি এবং রাত নয়টা ৫১ মিনিটে তিনি মারা গেছেন। এইমস হাসপাতালের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. রিমা ডাডার সই করা এক বিবৃতিতে একথা বলা হয়েছে।

ড. মনমোহন সিং ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল। এই ১০ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এর আগে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। সেই সময়েই ভারতের অর্থনীতির উদারীকরণের যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও, সেটির বাস্তবায়ন করেছিলেন পেশা ও শিক্ষায় অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং। ড. মনমোহন সিং-ই ভারতের প্রথম শিখ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। জওহরলাল নেহরুর পরে ড. মনমোহন সিংই প্রথম ভারতীয় নেতা, যিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর সম্পূর্ণ মেয়াদ পূর্ণ করার পরে দ্বিতীয়বার আবারো নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন।
আবার ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পরে যে শিখ-বিরোধী দাঙ্গায় প্রায় তিন হাজার শিখ নিধন হয়েছিল, যে দাঙ্গায় অভিযোগের আঙ্গুল ওঠে তারই দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে, সেই ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই ক্ষমা চেয়েছিলেন মনমোহন সিং। দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন অবশ্য বারেবারে তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। কিছুটা সেইসব অভিযোগের কারণেই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার দল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
মনমোহন সিংয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৩২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাব প্রদেশের এক ছোট্ট গ্রামে। সেই সময়ে ওই গ্রামে না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল খাওয়ার জলের ব্যবস্থা। এরকমই একটা গ্রাম থেকে উঠে আসা মনমোহন সিং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপরে ডি ফিল উপাধি পান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার কন্যা দমান সিং বাবার সম্বন্ধে একটি লেখায় জানিয়েছিলেন কেমব্রিজে পড়াশোনা করার সময়ে অর্থ সংকটে দিন কাটতো পরবর্তীতে ভারতের অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়া মনমোহন সিংয়ের। দমান সিং তার একটি বইতে লিখেছেন, পড়াশোনা আর থাকা-খাওয়ার জন্য বছরে তার ছয় শ’ পাউন্ডের মতো খরচ হতো। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যে বৃত্তি পেতেন তা ছিল প্রায় ১৬০ পাউন্ড। বাকি খরচের জন্য তার বাবার ওপরে নির্ভর করতে হতো তাকে। তিনি খুব সচেতনভাবে কিপটে হয়ে জীবনযাপন করতেন। ডাইনিং হলে বেশ সস্তায়, দুই শিলিং ছয় পেন্সে খাবার পাওয়া যেত, জানিয়েছিলেন তার কন্যা। তার এটাও মনে আছে যে, তার বাবা বাড়ির ব্যাপারে একদম অসহায় ছিলেন। না পারতেন একটা ডিম সেদ্ধ করতে, না চালাতে পারতেন টেলিভিশন।

শিক্ষায় আর পেশায় অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং রাজনীতির ময়দানে পরিচিত হন ১৯৯১ সালে, ভারতের অর্থমন্ত্রী হিসেবে। সেই সময়ে ভারতের অর্থনীতির ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল। হঠাৎ করেই মন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি একসময়ে ছিলেন সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আর ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর। এখনো এমন ভারতীয় নোট দেখতে পাওয়া যায়, যদিও খুবই কম, যেখানে রিজার্ভ ব্যাংকের নোটে তার সই থাকতো গভর্নর হিসেবে। একটা সময়ে রিজার্ভ ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে কলকাতাতেও কাজ করেছেন মনমোহন সিং। নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পরে তার প্রথম ভাষণে তিনি ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, যদি একটি ভাবনা আসার সময় হয়ে গিয়ে থাকে, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তিই আটকাতে পারে না। সেটিই ছিল ভারতের এক উচ্চাভিলাষী এবং অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংস্কারের শুরুর ইঙ্গিত। এরপরেই শুরু হয় করের হার কমানো, ভারতীয় টাকার অবমূল্যায়ন, সরকারি সংস্থাগুলোর বেসরকারিকরণ আর বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়ার মতো কর্মসূচিগুলো। তার সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থনীতি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে, মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব হয় আর গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে প্রবৃদ্ধির হার লাগাতার উঁচুর দিকেই থাকে।

মনমোহন সিং খুব ভালো করেই জানতেন যে, তিনি রাজনীতিবিদ নন। তার কথায়, একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা যায়, কিন্তু সেটা হতে হলে তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটে জিততে হবে! ভারতের সংসদের নিম্ন-কক্ষ লোকসভার ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। কিন্তু হেরে যান তিনি। এরপরে উচ্চ-কক্ষ রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন আসাম থেকে। এরপর এলো ২০০৪ সালের নির্বাচন। কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলো, কিন্তু কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী পদ নিতে অস্বীকার করলেন। সম্ভবত তিনি যেহেতু জন্মসূত্রে ইতালীয়, তাই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে, এটা ভেবেই সম্ভবত তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান নি। সমালোচকরা এও বলে থাকেন যে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কালে সোনিয়া গান্ধীই ছিলেন আসল ক্ষমতার উৎস। ড. সিংয়ের নিজের কোনো ক্ষমতাই ছিল না বলে মনে করেন সমালোচকরা।

ড. মনমোহন সিংয়ের প্রথম পাঁচ বছরের মেয়াদকালে সব থেকে বড় জয়টা ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য একটি চুক্তি সই করা। তবে ওই চুক্তির জন্য মূল্য চোকাতে হয়েছিল তাকে- ভারতের কমিউনিস্ট দলগুলো ওই চুক্তির বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল এবং শেষমেশ সরকারের ওপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্যান্য দলের কাছ থেকে সমর্থন জোগাড় করতে হয়েছিল কংগ্রেসকে আর এজন্য ভোট কেনা-বেচার অভিযোগও উঠেছিল দলটির বিরুদ্ধে। মনমোহন সিংকে অবশ্য জোট সরকার চালাতে বারেবারেই বেশ বেগ পেতে হয়েছে। বিশেষ করে গলার জোর তোলা, কখনো কখনো রাজ্যভিত্তিক জোট-সঙ্গী দল এবং তাদের সমর্থকদের উচ্ছৃঙ্খল কার্যকলাপ বারবার বিব্রত করেছে মনমোহন সিং এবং তার সরকারকে। তিনি অবশ্য সবসময়েই ঐকমত্যের ভিত্তিতেই চলার চেষ্টা করেছেন।
তবে তার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ সব সময়েই থেকেছে যে, তিনি খুব নরম প্রকৃতির মানুষ আর সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। তবে তার সততা বা বুদ্ধিমত্তার কারণে সবাই তাকে সম্মান করে এসেছেন। কিছু কিছু সমালোচক বলে থাকেন, তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন অর্থনৈতিক সংস্কার করেছিলেন যে গতিতে, সেটা কিছুটা শ্লথ হয়ে গিয়েছিল তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে।

বিজেপি’র নেতা ও ভারতের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানি একবার মনমোহন সিংকে দেশের দুর্বলতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। জবাবে ড. সিং বলেছিলেন যে, তার সরকার যে অঙ্গীকার করেছিল, সেসব পূরণ করতে এবং দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে সর্বতো ভাবে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে। তবে, তার দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে আগেকার সাফল্যগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা একের পর এক দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হতে থাকেন। সেই সব কথিত দুর্নীতির পরিমাণ লক্ষ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছায়। বিরোধীরা স্তব্ধ করে দেয় পার্লামেন্টের কাজকর্ম। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক ঊর্ধ্বগতি কিছুটা থমকে যায়।

তার দুই পূর্বসূরির পথ অনুসরণ করেই এক বাস্তববাদী বিদেশ নীতি নিয়ে চলতেন মনমোহন সিং। পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, যদিও সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে দেয়ার জন্য যেসব হামলা চালানো হয়, তার দায়ভার গিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপরে। এই সব হামলা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বই হামলার সময়ে। অন্যদিকে তিনি চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলার লক্ষ্যে নাথু লা দিয়ে তিব্বতের সঙ্গে ৪০ বছর ধরে বন্ধ থাকা পুরনো একটি ব্যবসায়িক রুট ফের চালু করেছিলেন।
আবার আফগানিস্তানকে বাড়তি আর্থিক সহায়তাও দিয়েছিলেন তিনি। তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি আগের প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথমবার আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। একজন শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন আমলা মনমোহন সিং নিজের পড়াশোনা নিয়ে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। কোনো সময়েই তিনি নিজের পরিচয় নিয়ে উচ্চকিত ছিলেন না। তার সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলে আকর্ষণীয় কোনো পোস্ট যেমন থাকতো না, তেমনই তার ফলোয়ারের সংখ্যাও ছিল খুবই সীমিত। তবে স্বল্প কথার, শান্ত এমন একজন ব্যক্তিকে পছন্দ করতেন বহু মানুষ। বেআইনিভাবে কয়লা খনির বরাদ্দ দেয়া নিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা অর্থমূল্যের কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি নিশ্চুপ থাকার যুক্তি দিয়েছিলেন এভাবে যে চুপ করে থাকাটা হাজার শব্দ দিয়ে জবাব দেয়ার থেকে ভালো। আবার ২০১৫ সালে যখন আদালত তাকে ডেকে পাঠায় ফৌজদারি ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির অভিযোগে, দৃশ্যতই মনঃক্ষুণ্ন মনমোহন সিং সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, তিনি ‘আইনি বিচারের জন্য প্রস্তুত’ আর ‘সত্যের জয় হবে।’

প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ থেকে সরে যাওয়ার পরে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা হিসেবে দলের দৈনন্দিন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। যদিও বয়স সব সময়ে তার সঙ্গ দিতো না। বিবিসিকে দেয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে ২০২০ সালের আগস্টে ড. মনমোহন সিং বলেছিলেন যে, করোনাভাইরাসের মহামারির প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে ভারতকে ‘অতি দ্রুত’ তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেছিলেন মানুষের হাতে সরাসরি নগদ সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মূলধনের জোগান দিতে হবে আর আর্থিক খাতকে পুনর্গঠিত করতে হবে। মনমোহন সিংকে ইতিহাস মনে রাখবে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে যিনি ভারতকে অর্থনৈতিক আর পারমাণবিক একঘরে হয়ে যাওয়ার থেকে উদ্ধার করেছিলেন। যদিও ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন যে, তার বোধহয় আরও আগেই অবসর নেয়া উচিত ছিল। তবে মনমোহন সিং ২০১৪ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি আশা করবো যে, সমসাময়িক গণমাধ্যম এবং সংসদের বিরোধী দলগুলোর তুলনায় ইতিহাস আমার প্রতি বেশি সদয় হবে।

হাসিনার পলায়ন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নাটকীয় ছায়া -পিটিআই’র রিপোর্ট

দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। এ বছর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যদিয়ে এক অস্থিরতার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। এই ঘটনা ভারতের সঙ্গে দেশটির প্রচলিত শক্তিশালী সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলেছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের কাছে তাকে ফেরত চাইছে। এর ফলে এই সম্পর্ক আরও উত্তেজনাকর হতে পারে। সরকারি চাকরিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে কয়েক সপ্তাহের প্রতিবাদ বিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত হন ৭৭ বছর বয়সী শেখ হাসিনা। ছাত্রদের বিক্ষোভ দেশ জুড়ে আন্দোলনে রূপ নেয়। তাতেই ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠীর ইতি ঘটে। অনলাইন পিটিআইয়ের খবরে এ কথা বলা হয়েছে।  

আগস্টে রাজনৈতিক নিষ্পেষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন লাখো মানুষ। বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেয় সেনাবাহিনী। সে সময়ে তাড়াহুড়ো করে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এ ঘটনা ঘটে তিনি চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মাত্র কয়েক মাস পরে। সরকারবিরোধী প্রতিবাদ বিক্ষোভে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষকালে কমপক্ষে ১৫০০ মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে আছেন ছাত্ররাও।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ৮৪ বছর বয়সী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের বিরোধ ছিল দীর্ঘদিনের। প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের প্রিয় ব্যক্তি তিনি। তাকে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে নিয়ে আসেন। কিন্তু ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ৮ই আগস্ট ক্ষমতায় আসার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে। কয়েক মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করা হয়। এর মধ্যে আছেন হিন্দুরাও। এর মধ্যে চিন্ময় কৃষ্ণ দাশকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় গ্রেপ্তার করার পর ভারতের উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। এ মাসের শুরুর দিকে ঢাকা সফরে এসে এই বার্তা জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর ভারতীয় প্রথম কোনো উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে তিনি বাংলাদেশ সফরে আসেন। এ বিষয়ে থিংক ট্যাংক বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রধান এবং সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সফর একটি বার্তা দিয়েছে। তা হলো, বাস্তব পরিবর্তিত পরিস্থিতি মেনে নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায় নয়াদিল্লি। তিনি শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরও উদ্ধৃতি দেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনা। বলেছেন, তারা গণহত্যা করেছে। সংখালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

জবাবে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নোট ভারবাল বা কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লিকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রীদের, উপদেষ্টাদের, সেনা ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার দায়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল। অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে  জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে কমপক্ষে ৩৫০০ নাগরিককে। হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ কমপক্ষে ২০০ মামলা করা হয়েছে।

এখন ছাত্রনেতারা এক সময়ের শক্তিধর আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত করে আগামী নির্বাচন থেকে তাদেরকে দূরে রাখতে চান। এমন অবস্থায় নিজেদের ভাগ্য ঝুলে আছে আওয়ামী লীগের। বিশ্লেষকরা বলেন, এটা হলে শুধু বড় দুটি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং ডানপন্থি জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে তার প্রভাব পড়বে।
হুমায়ুন কবির এর আগে ভারতে ডেপুটি হাইকমিশনার এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, আগামী নির্বাচনের দৃশ্যপট কি হবে তা আন্দাজ করা খুব কঠিন। বিশেষ করে বড় দলগুলোর অংশগ্রহণের বিষয়ে।
আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী জেলখানায় অথবা পালিয়ে আছেন। এ অবস্থায় তারা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে চালিয়ে নেবেন তা এখনো অনিশ্চিত। ওদিকে দেশের মুদ্রা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি মুছে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ। এর পরিবর্তে তাতে স্থান পাবে ধর্মীয় স্থাপনা, বাংলাদেশের রীতিনীতি এবং জুলাই গণআন্দোলনের ছবি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় ২০ টাকা, ১০০ টাকা, ৫০০ টাকা এবং ১০০০ টাকার নোট ছাপা হচ্ছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে যে জাতীয় ছুটি পালন করা হতো তাও বাতিল করেছে। তবে তারা এখনো নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেনি। বিজয় দিবসের ভাষণে প্রফেসর ড. ইউনূস বলেছেন, ২০২৫ সালের শেষে বা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে হতে পারে নির্বাচন।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং ন্যাশনাল ইলেকশন অবজারভার পরিষদের প্রেসিডেন্ট নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, এতে মনে হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করছে বলেই মনে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক মসৃণ প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নের একটি রোল মডেল বলে অনেক বছর ধরে দাবি করে আসছিল আওয়ামী লীগ শাসকগোষ্ঠী। কোভিড মহামারির আগে এক দশকে এখানে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বছরে শতকরা ৭ ভাগ হয়েছে। তবে তাদের এই বয়ানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে রাষ্ট্র নিয়োজিত কমিটির শ্বেতপত্র। কমিটি বলেছে, তাদের উন্নয়নের গল্প ছিল বানানো। জাতীয় প্রবৃদ্ধির যে ফিগার দেয়া হয়েছে তাও বানোয়াট। ওদিকে ডিসেম্বরে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বাংলাদেশের জন্য তার প্রবৃদ্ধি কম ধরেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, গ্রামে বসবাসকারী গরিব নন (নন-পুওর) মানুষদের অর্ধেকই আবার দারিদ্র্যে নিপতিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ক্ষমতাচ্যুত শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, প্রত্যাহার অথবা একপেশে করে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যুরোক্রেসি, পুলিশ প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় অন্য প্রতিষ্ঠানে বড় রকমের রদবদল করেছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২৫ সালে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ফেরানো এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বড় কাজের মুখোমুখি হবে এই সরকার।

mzamin

কয়েকটি দাবির ক্ষেত্রে আব্দুল কাদের নিজস্ব অভিমত দেন by এস এম ফরহাদ

ডিজিটাল ক্র্যাকডাউন শুরু হওয়ার আগে আমাদের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল যে খুব শিগগিরই নেটওয়ার্ক শাটডাউন করে দেয়া হবে। আবু সাঈদ ভাইসহ সারা বাংলাদেশে অসংখ্য ভাই শাহাদতবরণ করার পর আন্দোলনকে কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাটা আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। সেজন্য সাদিক কায়েম ভাই, সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ ভাই সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কয়েকজন সভাপতি ও অন্যান্য দায়িত্বশীল মিলে পরামর্শ করে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ কী হতে পারে তা নির্ধারণ করি। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা ৯টি কৌশলী দাবি প্রস্তুত করি। দাবির ভাষা এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে, দাবিগুলো  যেন সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই মানা সম্ভবপর না হয় এবং মানলেও সরকারের ফ্যাসিবাদী কাঠামো যেন ভেঙে যায়। তখনো ইন্টারনেট সচল ছিল। দাবিগুলোর খসড়া যখন প্রস্তুত করা হয় সর্বপ্রথম রাখা হয়- ‘শেখ হাসিনাকে বক্তব্য প্রত্যাহার ও শেখ হাসিনাকে ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে’। পরে সাবেক সভাপতিদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রথম দফায় কিছুটা সংশোধন করে শেখ হাসিনাকে ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি যুক্ত করা হয়। ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে আমরা দুইটা অপশন রাখি। ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ অথবা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, পরিস্থিতি বিবেচনায় যেন যেকোনো একটি ঘোষণা দেয়া যায়। আন্দোলনের সময়ে হলের যে শিক্ষার্থীরা দুঃসাহসী ভূমিকা রেখে সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগকে হল ও ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেছিল, ওই সকল শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ৯ দফায় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি যুক্ত করা হয়েছিল। যেহেতু তখনো আন্দোলন একদফায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটনের আগ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য এই দফার সংযুক্তি সময় বিবেচনায় অত্যন্ত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত ছিল। বর্তমানে ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটনের মাধ্যমে সেই সংকট সমাধান হয়েছে একইসঙ্গে ছাত্ররাজনীতির পুরো সিস্টেমে পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ইন্টারনেট শাটডাউন হয়ে গেলে ১৯ জুলাই দাবিগুলোকে পুনরায় পর্যালোচনা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি সিবগাতুল্লাহ ভাই ও কেন্দ্রের অঞ্চল তত্ত্বাবধায়ক ভাইসহ আমরা মিলিত হই। এখানে দায়িত্বশীল ভাইয়েরা পরামর্শ দেন যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে এখনই সরকার পতনের ডাক দিলে তা প্ল্যাটফর্মটিকে বিতর্কিত করবে এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রেরকসহ সকল নেতৃবৃন্দের ওপর অসহনীয় চাপ, জুলুম ও নির্যাতন নেমে আসতে পারে। আব্দুল কাদেরের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপচারিতায়ও অনেকটাই সেরকম পর্যালোচনা হয়। তাই আমরা কৌশলী ভূমিকা হিসেবে উল্লেখ করি ‘ছাত্র হত্যার দায় নিয়ে শেখ হাসিনাকে জাতির সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে’। দাবিটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যেটি মেনে নিলে শেখ হাসিনার সরকারে থাকার নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার বাতিল হয়ে যায়। উল্লেখ্য, তারও কয়েকদিন আগে থেকেই সভাপতি সাদিক ভাই সাবেক দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে বিভিন্ন দফা নির্ধারণ করেন ও ইন্টারনেট শাটডাউনের আগেই আসিফ-নাহিদ ভাইকে তার বেশ কয়েকটি দফা পাঠিয়ে নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা-পরামর্শ করতে বলেন। এর আগের কর্মসূচির ক্ষেত্রেও নিয়মিত তাদের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হতো, কিন্তু তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই বাকি সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হয়। এদিকে, ৯ দফা প্রস্তুত শেষে আব্দুল কাদেরকে ফোন দিয়ে জানালে সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি জ্ঞাপন করে। তবে, কয়েকটা দাবির ক্ষেত্রে আব্দুল কাদেরের নিজস্ব অভিমত থাকে যা আমরা আবারো আলোচনা করে চূড়ান্ত করি। আব্দুল কাদেরকে নতুন একটা নম্বর নিতে বলা হয়, যেখানে সাংবাদিকরা ফোন দিয়ে নিশ্চিত হবে ৯ দফা সম্পর্কে। সে অনুযায়ী সাংবাদিকরা নিশ্চিত হন।

কীভাবে আব্দুল কাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্বার সাহসিকতার সঙ্গে ৯ দফা সম্পর্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, আমাদের টিম কোন উপায়ে কতটা কৌশল ও ঝুঁকির সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমের হাউজে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছিল, কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে কীভাবে সারা দেশে কঠিন সময়ে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, ঠিক কীভাবে নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকা অবস্থায় বিকল্প নেটওয়ার্ক মেইনটেইন করে স্থানীয় শাখাগুলোর ব্যবস্থাপনায় দেশব্যাপী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলমান ছিল এবং নিয়মিত কর্মসূচিগুলো কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল- ঘটনার পেছনের বিস্তৃত ঘটনাগুলো সম্পর্কে আমরা অন্য কোনো সময়ে লিখবো, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের অংশ হতে পেরেছিলাম ও আমাদের দেয়া ৯ দফা সাদরে গ্রহণ করে জনগণ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে সেসময় দাঁড়িয়ে যায় বুলেটের সামনে। আমরা সেই শ্রমজীবী, পেশাজীবী, প্রবাসী, আলেম সমাজের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি; যারা দেশের স্বার্থে ৯ দফার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। বলতে চাই, ৯ দফার কৃতিত্ব একক কোনো ব্যক্তি বা প্ল্যাটফর্মের নয়। এর কৃতিত্ব সেই শিশুটির যে বারান্দায় খেলতে গিয়ে শহীদ হয়েছে, যারা অকুতোভয় সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে গেছে ময়দানে। যাদের জন্য ‘৯ দফা’ হয়েছে ‘ফ্যাসি মুক্তির ৯ দফা’; রূপান্তরিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত ‘১ দফা’।

আমি সশ্রদ্ধ চিত্তে ওই সকল শহীদ ও আহত ভাইদের প্রতি বিনম্র সালাম জ্ঞাপন করছি মূলত যারা এই আন্দোলনের স্পিরিট নিয়ে মাঠে লড়াই করে গেছেন। একইসঙ্গে সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা ও তাদের জন্য শাহাদতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনা করছি। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোক।
লেখক: সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

mzamin