Tuesday, October 12, 2010

গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা

দিলশাদ নিজে থেকেই বারবার আপত্তি করে। বলে, শালা নেই শালি নেই তো কোন মজাও নেই। কী হবে আমার বাপের বাড়ি গিয়ে? গিয়েও তো সেই আমাকেই দেখবে। তাছাড়া আমার এই ভরন্ত চারকোণ ছাড়া কোথাও গিয়ে আমি শান্তি পাই না।

সেজানও বোঝে। দেড় বছরের কিছু বেশী হলো ওদের বিয়ে হয়েছে। দিলশাদের প্রেমে ভান নেই, সংসারে অমনোযোগ নেই, নিজেকে সাজাতে ক্লান্তি নেই, নিত্যনতুন রান্নায় গবেষণার শেষ নেই, সেজানের লেখা পড়তে উৎসাহের কমতি নেই, বিছানায় বিন্দুমাত্র অসহযোগিতা নেই, সেজানকে বুঝতেও তার কিছু বাকি নেই। কারণ দিলশাদ জানে লেখক সেজানকে কতখানি ছাড় দিলে তার টেবিল থেকে ভালো ফসল তোলা সম্ভব।
সেজান বলতে গেলে ঢাকারই ছেলে। ওর বাবা ঢাকায় স্থায়ী হয়েছিলেন ওর জন্মের অনেক আগে। গ্রামের সাথে সেজানের নাড়ির সম্পর্ক নেই। ঈদ বা লম্বা ছুটিতে মানুষজন গ্রামে দৌড়ায়। সেজান ঢাকার নির্জনতা উপভোগ করে। ফুলার রোডের সুনসান রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে চপ্পল পরে পা ঘষে ঘষে হাঁটতে থাকে। ওর হাঁটার গন্তব্যহীন ভঙ্গী দেখে দু’একটা খালি রিকশা ‘যাইবেননি স্যার’ বলার কোন তাগিদ অনুভব করে না। খাবারহীন ডাস্টবিনে বসে কাকেরা ঠোঁটে শান দেয়। বৃটিশ কাউন্সিলের পাশ দিয়ে যাবার সময় হাঁটার গতি শ্লথ করে গেটের নামফলকের দিকে তাকিয়ে সে মৃদু হাসে। কিছুদিন আগেও লেখা ছিল ‘দি বৃটিশ কাউন্সিল।’ এখন কেবল ‘বৃটিশ কাউন্সিল।’ যাক্ এতদিনে বোধোদয় হয়েছে। ঢাকার এই নাগরিক জীবন ছাড়া লেখক সেজানের ভান্ডারে গ্রাম নেই, মাইলের পর মাইল ধানক্ষেত নেই, মাটির ঘরের পাশে দাঁড়ানো দাঁতে ঘোমটা কাটা লাজুক বউটি নেই, ন্যাংটো ছেলেদের মুহূর্মুহু ঝাঁপিয়ে পড়া নদী নেই। তবে কোকিল আছে। বসন্ত আসার আগেই ওরা সেজানের বাসার পাশের বন্ধ্যা আমগাছে এসে বসে। ডাকে। ইদানিং দিলশাদ বলে, ‘ঢাকার কোকিলরা যেন কেমন ভোঁদাই। আমি ওদের মুখ ভেঙ্গাই আর ওরা চুপ মেরে যায়। হতো আমাদের মফস্বলের কোকিল! একশোবার মুখ ভেঙ্গালে একশোবার তার জবাব দিত।’

‘ঢাকারগুলো শিক্ষিত আর তোমাদের গ্রামেরগুলো আনকালচার্ড তো তাই।’ সেজান গোঁফের নিচে কিঞ্চিত ঠোঁট প্রশস্ত করে।

‘আমিও তো গ্রামের।’

‘তুমি তো আর কোকিল নও।’

‘কিন্তু গলাটা?’

বিদ্যুৎ চলে গেলেই দিলশাদ গান গায়। অসাধারণ গলা দিলশাদের। ওর গানের সুরে অন্ধকারের শরীরে যেন ফুটে ওঠে হাজার বুটির জামদানী। অন্ধকারই নয়নাভিরাম হয়ে দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ পেতে থাকে। তখন সেজানের মনে হয় এই স্নিগ্ধ মেয়েটি মফস্বল শহরের কোথায় কীভাবে কোন বাড়িতে বেড়ে উঠেছে? কোন জানালার পাশে শুয়ে শুয়ে মেয়েটি আকাশ দেখতো, কোন আলনার পেছনে ঝুলতো ওর সাদা-কালো অন্তর্বাস, ছাদের কোন কোণে বসে ও ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলতো, আমগাছের কোন ডালে দোলনা বেঁধে ঝুলতে গিয়ে পড়ে ওর পা ভেঙেছিল, কোন খাটে বসে হারমনিয়াম কোলে টেনে মেয়েটি গাইতো ‘আমারও পরানও যাহা চায়’ বা যে বারান্দায় বসে মেয়েটি চুল শুকাতো সেই রোদ আজও সেখানে প্রতীক্ষায় থেকে ফিরে যায় কি না - সেজানের লেখক প্রাণ তা দেখার জন্যে আঁইঢাই করে। সেজান এতো কিছু ভেঙে বলে না। কিন্তু দিলশাদদের গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাবার কথা বললেই দিলশাদ বলে, শালা নেই, শালি নেই…।

মা তো বেঁচে আছে। যদিও মাকে তার বড় ও একমাত্র ছেলে ঢাকা শহরেই বেশির ভাগ আটকে রাখার চেষ্টা করে কিন্তু টানা দুমাস হয়ে গেলেই মাকে আর ধরে রাখা যায় না। দশ-বারো দিনের জন্যে হলেও মা বাড়ি যান। বলে যান, ‘তোমরা আমার শেকড় উপড়ে এনে মাথায় পানি ঢালো। এভাবে আমি বাঁচতে পারবো না।’ মেয়ে দিলশাদের কাছে এসেও থাকতে চান না। বলেন, ‘আমাদের বংশে জামাই বাড়ি পড়ে থাকার চল্ নেই।’

দিলশাদ বলে, ‘আরে বাবা তোমাকে তো কেউ পড়ে থাকতে বলছে না। তাছাড়া তোমার জামাই কি অন্য সবার মতো? দেখনা তোমার সাথে কেমন বন্ধুর মতো সহজ।’

‘একবার গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেল না’ মা বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে অভিমান করেন। ঢাকা শহরে ভাইয়ের সরকারি বাসায় দিলশাদের বিয়ে হয়েছে। তা বলে কি নিজেদের ভিটেমাটি নেই? দিলশাদের বাবা যে অতো বড়ো বাড়ি রেখে গেছেন তার দেখাশুনাও তো করতে হয়। ভবঘুরে ভাইপোটা থাকে বটে কিন্তু সে কি আর অতোদিকে খেয়াল করে? তার তো কেবল গল্পের বই পড়ে আর কি সব ছাইপাশ লিখে দিন কাটে। রিটায়ারের পর বাবা গ্রামে ফিরে গিয়ে বাড়িটাকে মনের মতো করে গুছিয়েছিলেন। গ্রামের বাড়ি হলেও দিলশাদের বাবার ছিল পৈতৃকসূত্রে পাওয়া পারিবারিক লাইব্রেরি। পরবর্তীতে দিলশাদরা ভাইবোন মিলে ভার্সিটি থেকে ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় পছন্দের বই কিনে নিয়ে গিয়ে ওদের লাইব্রেরিটাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এখনতো ওটা ওই ভবঘুরে লেনিনের দখলে। দিলশাদের ভাই অবশ্য বলেছিল কিছু কিছু করে ওরা ভাইবোনে মিলে ঢাকায় ওদের বাসায় বইগুলো নিয়ে আসবে। শুনতে পেয়ে মায়ের সে কি রাগ!

‘আমি মরে গেলে যা খুশী তাই ক’রো। ওগুলো তোমাদের বাবার স্মৃতি। আমি হাতছাড়া করবো না।’

দিলশাদ জানে এটা যদিও মায়ের সেন্টিমেন্টের বিষয় কিন্তু লেনিনের প্রতি মায়ের অপত্য স্নেহটাই এর পেছনে বেশি কাজ করে। বইগুলো ঢাকায় নিয়ে এলে ছেলেটা কী পড়বে? ও মন খারাপ করবে না? মা মরা ছেলেটাকে সেই ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানদের পাশাপাশি মানুষ করেছেন তিনি। একলা অতোবড়ো বাড়িতে রেখে আসেন। তারও তো সময় কাটতে হবে? সে তো আর দিলশাদের মতো উচ্চশিক্ষিত হতে পারেনি। ওর মাথা তো আর খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু দিলশাদের বাবার খুব একটা আগ্রহ লক্ষ করেননি মা এ ব্যাপারে। দিলশাদের সাথেই ম্যাট্রিক পাস করলে মায়ের জোরাজুরিতে তাকে স্থানীয় কলেজে ভর্তি করে দেয়া হয়। দিলশাদ তো ইন্টারের পর থেকেই ঢাকাতে। বড়ভাই তখন বুয়েটে ফাইনাল ইয়ারে। এতো লেখাপড়া করতে গেলে বাড়ি-বাজারঘাট-জমাজমির দেখাশুনাটা করবে কে? ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলে লেনিনের আর পড়াশুনা এগোলো না। কলেজে তা বন্ধ হলেও বাড়ির লাইব্রেরি হয়ে উঠলো লেনিনের বেঁচে থাকার প্রেরণা। স্বামীর জীবদ্দশায় ছেলেটিকে আস্কারা দিতে পারেননি দিলশাদের মা। মারা যাওয়ার পর যেন বাঁধভাঙা স্নেহবর্ষণ হতে থাকলো।

‘ছেলেটা আছে বলেই নিশ্চিন্তে তোমাদের কাছে এসে থাকতে পারছি। বইপত্তরগুলো কি আর এতদিন আস্ত থাকতো? সে-ই তো ঝেড়ে পুঁছে যতেœ আগলে রেখেছে,’ শ্বশুরের লাইব্রেরি সম্পর্কে সেজানের গভীর আগ্রহের জবাব দিতে গিয়ে মা আনন্দে প্রায় কেঁদেই ফেললেন। কেঁদে ফেলার পেছনে আরও যে কারণটা ছিল। তা হলো সেজান এবারই শাশুড়ির সাথে গ্রামের বাড়ি যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

দিলশাদ বলতে চেয়েছিল সাতদিন পেরিয়ে গেল এবার ওর শরীর খারাপ হচ্ছে না। সম্ভবত কনসিভ করেছে। এসময় কি নড়াচড়া ঠিক হবে? কিন্তু যেদিন ওরা রওনা দেবে তার পূর্বরাতে সেজান দিলশাদকে প্যাড চেঞ্জ করতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। যাক্ ফিরে আসি আগে গ্রাম থেকে।

যাওয়ার পথে দিলশাদের মধ্যে কোন উত্তেজনা লক্ষ্য করছিল না সেজান। বরং মাঝে মাঝেই দুই ভ্রুর মধ্যে ভাঁজের ঢেউ এসে নদীর ঢেউয়ের মতো দুদিকে মিলিয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা নিজের সংসার ছাড়া এখন আর কিছু বোঝে না। যেন জোর করে ওকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লুকিয়ে একটু চিমটি দিয়ে ওকে উৎফুল্ল হতে বলতেই দিলশাদ একেবারে খেপে উঠলো, ‘সবসময় ফাজলামি করবে নাতো’ মাকে উদ্দেশ্য করে গলার স্বর আরও এককাঠি উপরে উঠিয়ে।

‘বুড়ো হচ্ছো আর দিনদিন বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। এ সাতদিনে ওকে একটা উপন্যাস শেষ করতেই হবে। প্রকাশকরা আগেই টাকা দিয়ে রেখেছে। একে নাচুনি বুড়ি তার উপর ঢোলের বাড়ি।’

সেজান গলা ছেড়ে হেসে উঠলে মায়ের মাথা থেকে ভার নেমে গেল। রাগ করুক আর যা-ই করুক মেয়েটা যে তার স্বামী নিয়ে দারুণ সুখী সেটা বুঝে নিয়ে মেয়ের ধমককে পুষ্পচন্দনের মতো গায়ে মেখে রাখলেন।

বাড়ি দেখে সেজানের সে কী উচ্ছ্বাস! ঐতো সেই ছাদ। ঐযে বারান্দার কোণে এখনও সেই প্রেমিক রোদ যাবো যাবো করেও যাচ্ছে না। এই পিলারে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিলা গুনগুনিয়ে কতো গান গেয়েছে। দিলার কাছ থেকে বাড়ির গল্প শুনে শুনে কল্পনার সাথে প্রায় সবই মিলে যাচ্ছিল সেজানের। লেনিনকে নিয়ে দিলশাদ তেমন বড় একটা গল্প না করলেও সেজানের কল্পনার লেনিনের সাথে বাস্তবের লেনিনের কোন মিলই খুঁজে পেল না। লেখকরা একটু বেশি অনুভূতিপ্রবণ। কারো গল্প শুনলে মনে মনে তার একটা ছবি আঁকা হয়ে যায় মনের মধ্যে। যখনই তার কথা ওঠে সেই ছবি নিখূঁত ধরা দেয় মানসপটে। ছোটবেলায় মায়ের মুখে তুষারকন্যার গল্প শুনে বারবার ওর ছোটফুপুর ছবি ভেসে উঠতো মনে। ছোটফুপুর সারা শরীরে ছিল শ্বেতী রোগ। ঠোঁটদুটো লাল টকটকে। ঠিক মায়ের বর্ণনার তুষারকন্যা। একটু বড় হয়ে যখন ‘স্নো হোয়াইট’ দেখল সিনেমায় ও তখন বিরতির সময় বেরিয়ে এসেছিল হল থেকে। স্নো হোয়াইট মোটেই ওরকম না। ওর ফুপুর মতো ওরকম স্নো হোয়াইট আর কেউ হতে পারে না। তো লেনিনকেও সে মনে মনে এঁকে রেখেছিল পুরুষের স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে বেশি লম্বা, সামান্য ঝুঁকে হাঁটে, একমাথা কোকড়া চুল, একটু ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির ভাবনাটা বলাই বাহুল্য রুশ নেতা লেনিনের ছবি মনে রেখেই। কিন্তু যাকে পেল সে রোগা-পটকা, উচ্চতায় গড়মানের, মাথার চুল পাতলা, তবে চোখদুটো গভীর আর চিবুকটা দৃঢ়।

সমবয়সী কাজিনদের সাথে যে সখ্য থাকে দিলশাদ আর লেনিনের মধ্যে সে রকম কিছুই দেখলো না সেজান। এমনকি কুশল বিনিময়ও করেছে কিনা ওরা সন্দেহ। আশ্রিতদের প্রতি এ ধরনের আচরণ হয়তো স্বাভাবিক। লেনিনের জন্যে সেজানের একটু মায়াই হলো। আন্ডারপ্রিভিলাইজড্। বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখার জন্যে যখনই লেনিনকে ডাকে দিলশাদ বলে, ‘ওকে দরকার কী? ম্যা হু না? চলো তোমাকে ছাদে নিয়ে যাই।’

বাড়ি এসে পর্যন্ত দিলশাদ একেবারে আঠার মতো লেগে আছে সেজানের সাথে। লাইব্রেরিটা সত্যিই সমৃদ্ধ। আর মলাট লাগিয়ে নাম্বারিং করে লেনিন খুব যতেœ রেখেছে বইগুলো। সাহিত্য সম্পর্কে লেনিনের কথাবার্তাও বেশ পরিপক্ক ও বুদ্ধিদীপ্ত। আধুনিক অনেক বই নিয়ে তার সাথে কথা বলে ভালোও লাগলো। এমনকি সেজানের শেষ উপন্যাসটার যেটুকু সমালোচনা লেনিন করলো সেজান সে যুক্তিকে খুব জোরালোভাবে খণ্ডন করতে পারলো না। ক্রমেই লেনিনের সঙ্গ সেজানের কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠলেও লেনিনের সাথে একা বিশ্বসাহিত্য নিয়ে আলাপ করার কোন সুযোগই পেল না। কারণ তাদের মধ্যে দিলশাদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং বাড়িটার কোথায় কোথায় ওর ছোটবেলা জমে আছে তা সেজানকে দেখিয়ে বেড়ানোর ব্যস্ততায়। তবু ঢাকা ফিরে আসার আগের দিন শাশুড়ির অনুরোধে সেজান লেনিনের সাথে এলাকাটা ঘুরে দেখে আসতে দিলশাদের আপত্তি সত্ত্বেও বেরিয়ে পড়লো। দিলশাদ জোর আপত্তি করছিল, ‘এলাকার আবার দেখবেটা কী হ্যাঁ? আর যদি যেতে হয় আমিই না হয় সাথে গেলাম।’

‘কোথায় মাঠে-ঘাটে ঘুরবো, লেখার রসদ জোগাড় করবো - ভ­াদিমির লেনিন থাকলেই সুবিধা।’

নাহ্, দিলশাদের শেষরক্ষা হলো না। এ ক’দিন সেজানকে একমুহূর্তের জন্যও লেনিনের সাথে একা ছাড়েনি সে। আজ কি আর সেজানকে একা পেয়ে লেনিন ছেড়ে দেবে? যদিও লেনিনকে দিলশাদ ওর সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেয়নি তবুও এরই মধ্যে একদিন দুপুরে ছাদ থেকে কাপড় নামাতে গেলে সিঁড়িঘরের পেছন থেকে লেনিন বেরিয়ে এসে পথ আটকালে দিলশাদ চমকে প্রায় চিৎকার করে উঠতে গিয়েছিল কিন্তু সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘কিরে কেমন আছিস?’

‘তিনদিন পর জানতে চাইলি কেমন আছি?’

‘না, মানে ভালোই তো আছিস মনে হচ্ছে।’

‘ভালো আমি আছি, না তুই?’

‘কেন, আমি ভালো থাকলে তোর অসুবিধা আছে?’

‘অসুবিধা তো থাকতেই পারে।’

এই অসুবিধাটার জন্যেই সে সেজানকে নিয়ে এতদিন বাড়ি আসেনি। এই অসুবিধাটার জন্যেই সেজানকে একমুহূর্তের জন্যও লেনিনের সাথে একা ছেড়ে দেয়নি। অথচ শেষ পর্যন্ত লেনিন একতরফা পুরো একটা বিকেল পেয়ে গেল সেজানকে সঙ্গ দেয়ার। লেনিন কি আর কিছু বাকি রাখবে বলতে? লেনিন কি বলবে না দিলশাদের প্রথম মল্লিকা কুঁড়ি ফুটিয়েছিল ও? লেনিন তো বলতেই পারে - একদিন বাইরে ঝুম বৃষ্টি। লাইব্রেরির মধ্যে শুধু দুটো কিশোর-কিশোরী। ওরা বুদ্ধদেব গুহের ‘মাধুকরী’ পড়ছিল দুজনে মিলে। কিশোরীটি হঠাৎ কিশোরের ডান হাতটা ধরে নিজের বুকের মাঝখানে চেপে রেখে বলেছিল, ‘আমার বুকের মধ্যে এরকম লাগছে কেন? আমি কি হার্টফেইল করবো? প্লিজ আমাকে জড়িয়ে ধরো। আমি বোধহয় মারা যাচ্ছি।’

সমবয়সী হওয়ার কারণে কিশোরটির সাথে তুই-তোকারি সম্পর্ক কিশোরীটির। কিন্তু ‘প্লিজ আমাকে জড়িয়ে ধরো’ কথাগুলি শোনার পর মুহূর্তেই কিশোরটি যেন একলাফে যুবক হয়ে গেল। ওর শরীরের প্রতিটি রোমকূপের উঠে দাঁড়ানো ও টের পাচ্ছিল। কিশোরটি পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে নিলে কিশোরী হঠাৎ কেঁদেই আকুল। কিশোরের বুকে তখন কেমন স্বামী স্বামী অনুভব আর শরীরের বেসামাল উন্মাদনা। কিশোরী কান্নাভেজা চোখ তুলে তাকাতেই কিশোর বুঝে হোক না বুঝে হোক কিশোরীর ঠোঁটের বিমূর্ত আহ্বান পড়ে নিয়ে নিজের ঠোঁট সমর্পণ করলে কিশোরীর উরুর স্পন্দন তীব্রতর হলো। কম্পমান দু’পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হলেও এক ঝটকায় কিশোরকে সরিয়ে কিশোরী পালিয়ে গেল নিচে।

কিন্তু নিজেদের কাছ থেকে ওরা কেউই পালাতে পারেনি কৈশোর অতিক্রান্ত হবার পরেও। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে দিলশাদ প্রথমদিকে বাড়ি আসার জন্যে দিন গুনতো। লেনিনের জন্যে নতুন নতুন বই কিনে আনতো। বই হাতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও ওরা ছাদের কোণে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতো। লেনিনের জন্যে দিলশাদের কেমন যেন মায়া হতো। লেনিন যেন না ভাবে ভর্সিটিতে ভর্তি হয়ে ও কিছু একটা হয়ে গেছে, তার জন্যে ওকে আরো বেশি বেশি টানতো দিলশাদ। ওরই মধ্যে বাবা মারা গেলে বেদনায় কাতর দিলশাদ লেনিনের সান্ত্বনা ও সহানুভূতির নিবিড় সান্নিধ্যে একটু বেশিই কাছাকাছি এসে পড়েছিল। সে-ই প্রথম ও বুঝতে পেরেছিল শরীরের যাচ্ঞা কেবলই ধাপ অতিক্রম করতে চায়। অনেকটা ধর্মাচার পালনের মতো। কম তকলিব থেকে বেশিতে। ছোট আনন্দ থেকে পরমানন্দে।

বাবার চল্লিশায় যে দিলশাদকে পেল লেনিন তা ওর কাছে ছিল অভাবনীয়। সেই ‘থিরবিজুরি’ কী কারণে যেন চঞ্চলা। কী যেন এক অস্থিরতা ওর ভেতর সারাক্ষণ তোলপাড় করছিল। বাবার স্মৃতি? কই, চোখে তো জল নেই। তাহলে কি লেনিনকে নিয়ে ও কোন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে? কিন্তু টানা দু’ঘন্টা ছাদে ওর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে লেনিন হতাশ হয়ে যখন নিচে ফিরছিল তখন দেখে দিলশাদ পরের দিন চলে যাওয়ার জন্যে ব্যাগ গুছাচ্ছে। আত্মীয়স্বজনদের সামনেই বললো, ‘আয় বোস। কাল সকালেই যেতে হবে বলে গুছিয়ে রাখছি। তোর জন্যে একটা বই এনেছিলাম’ বলে নিতান্তই ক্যাজুয়ালি বইটা ওর কোলের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হলো। পরদিন দীর্ঘদিনের জন্য দিলশাদ ভার্সিটিতে চলে আসার সময় বাসে উঠিয়ে দেয়ার মুহূর্তে লেনিন সেই প্রথম কেঁদেছিল। লেনিন কি ভেবেছিল দিলশাদকে হারিয়ে ফেলার সময় তার ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে?

এরপর অল্প কদিনের জন্যে দিলশাদ বাড়ি এসেছিল। ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে পাঁচ’ছ জন বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈচৈ করে কাটিয়ে গেল। আধুনিক পোশাক, চুল, কথাবার্তা, চালচলনের একঝাঁক উচ্ছল তরুণ-তরুণীর মধ্যে লেনিনের নিজেকে কেমন অবাঞ্ছিত, উপেক্ষিত ও সেকেলে মনে হতে লাগলো। এই দিলশাদকে তার অচেনা, অহংকারী, আরো সুন্দরী, আরো দুর্লভ মনে হচ্ছিল। যাওয়ার আগের দিন ওর বন্ধুরা লাইব্রেরিতে আড্ডা দিতে বসলে লেনিনের নীরব আকুল আহ্বানে দিলশাদ ওকে খানিকটা সময় ধার দিয়েছিল। ছাদে গিয়ে পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়ালে কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারেনি।

‘আর বোধহয় আমাদের সেভাবে দেখা হবে না’ - আধোচেনা এই সুদূরিকাকে না ‘তুই’ না ‘তুমি’ কোন সম্মোধনেই ডাকার সাহস পাচ্ছিল না লেনিন। বুক ভেঙে যাওয়ার কোন শব্দ হয় না কিন্তু তা যে পাহাড়ের ধস নামার চেয়েও ভয়াবহ সন্ধ্যার আবছা আলোয় তার প্রতিফলন লেনিনের রক্তহীন পাণ্ডুর মুখের ওপর স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিল দিলশাদ।

‘কীভাবে?’

‘না বলছিলাম ফুপুও চলে যাবেন ভাইয়ার সাথে। তখন কে আর গ্রামে আসবে?’

‘বারে, তুই তো থাকবি। মায়ের সাথে মাঝে মধ্যে আমি আসবো না? আমার লাইব্রেরি, আমার বারান্দা, আমার ছাদ, আমার অনেক সন্ধ্যা, অনেক দুপুর, অনেক কিছু তোর জিম্মায় রেখে যাচ্ছি। তুই এগুলো যত্নে রাখিস’ লেনিনের ঘাড়ে হাত রেখে একটু ঝাঁকি দিয়ে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দূরতমা তার সিঁড়ির আঁধারে মিলিয়ে গেল। এ ছোঁয়ায় না ছিল উষ্ণতা, না ছিল আবেগ, না কেঁপে ওঠা। যেন এক পুরুষ বন্ধুর কাঠখোট্টা সান্ত্বনা।

সে আঘাত, সে বঞ্চনা কি লেনিন ভুলে গেছে? কিন্তু এ-ও তো সত্যি যে তাদের ভেতর কোনদিন কোন শর্ত বা অঙ্গীকারের অবতারণা হয়নি। দিলশাদ তো কোনদিনও তাকে অপেক্ষা করতে বলেনি। এমনকি মুখ ফুটে কোনদিন বলেওনি ‘ভালোবাসি’। তাহলে আজ কেন সেজানকে একলা পেয়ে ও সব বলে দেবে? ও কি নিজেও জানে না দিলশাদকে পাওয়া অবিশ্বাস্য, অসম্ভব? কিন্তু ওদের পরস্পরের কাছে আসার প্রথম দিনগুলোতে দিলশাদের আহ্বান, আকুলতা, বিহ্বলতা, ভেঙে পড়া তো একটুও মিথ্যে ছিল না। প্রথমবার ভার্সিটি থেকে এসে দিলশাদ পাগলের মতো লেনিনকে জড়িয়ে ধরেছিল। কেঁদে আকুল হয়েছিল। সেসব তো ভান ছিল না। নাকি দিলশাদের কেবলই তা ছিল শরীরের আকর্ষণ? তাহলে ভালোবাসা কি শরীরের বাইরের বায়বীয় কিছু? মেঘের মতো মুঠো মুঠো আকাশ থেকে ধরে এক প্রশ্বাসে বুকে পোরা? তারপর সময়মতো নিশ্বাসের সাথে ছেড়ে দিয়ে নির্ভার হওয়া? ভালোবাসা হৃদয়কে বিক্ষত করে না? হৃদয়ের ক্ষত হয়তো সারে কিন্তু তার দাগ মুছে ফেলা এতো সহজ? বৃষ্টির দিন, একলা দুপুর, কনে দেখা আলো, শ্যাওলা-পিছল ছাদ, ঘুঁটঘুঁটে সিঁড়ি, চারুসন্ধ্যা - এগুলো কি স্মৃতির লেজ দুলিয়ে পায়ে পায়ে নাছোড় বেড়ালটির মতো ঘুরে বেড়ায় না?

সেজান আর লেনিন ফিরলে দিলশাদের রক্তহীন শাদা মুখের দিকে তাকিয়ে সেজান ভয় পেয়ে যায়। এরই মধ্যে হলো কী মেয়েটার? ওভাবে পাথরের মতো বসে আছে কেন?

‘দিলা, কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? - বলে অস্থির সেজান একপ্রকার জড়িয়ে ধরেই দিলশাদকে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বললো, ‘এই দেখো তোমার জন্যে ছানার মুড়কি নিয়ে এসেছি। লেনিন বলছিল তোমার নাকি দারুণ পছন্দের মিষ্টি।’

সেজানের উচ্ছ্বসিত কথাবার্তায় মনে তো হচ্ছে না লেনিন কিছু বলেছে। কিছু বললে সেজান কি এতো সহজ হতে পারতো ওর সাথে? ছি! লেনিনকে কী ভাবছিল ও। লেনিন আসলেই মহান। লেনিনের মতো মানুয় হওয়া চাট্টিখানি কথা না। দুঃখী, প্রবঞ্চিত, প্রতারিত, একাকী লেনিনের জন্যে ওর অন্তর হু হু করে উঠলো। ভ­াদিমির লেনিন! চোখে পানি দেখে সেজান বললো, ‘কাল চলে যাবে বলে মন খারাপ? না আমি দেরি করে ফিরে এলাম দেখে? চলো ছাদে গিয়ে সবাই মিলে শেষ সন্ধ্যাটা তোমার গান শুনে স্মৃতির বটুয়ায় শেষ মোহরটা ভরে নিয়ে এবারের যবনিকা টানি।’

দিলশাদের মা আরও সাতদিনের জন্য থেকে গেলেন। স্টেশনে ওদের দুজনকে তুলে দিতে এল লেনিন। সেজান গভীরভাবে লেনিনকে বুকে চেপে পিঠ চাপড়িয়ে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানালো। দেখে দিলশাদ আরও একবার নিশ্চিত হলো যে না, লেনিন কিছুই বলেনি। জানালার কাচ নামিয়ে বসে পড়লো দিলশাদ। বাইরে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে লেনিন। ট্রেন চলতে শুরু করলে বাতাস ওর পাতলা চুল উড়িয়ে খানিকটা টাক বের করে দিল। ও বাম হাত দিয়ে ডানদিকের ক’টা চুল বামে টেনে এনে টাক ঢাকার চেষ্টা করতে করতে ট্রেনের সাথে হাঁটতে লাগলো। ট্রেন হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দিলে লেনিনও খানিকটা দৌড়ে এসে একজায়গায় থেমে গেল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিলশাদ যখন বললো, ‘লিলু ভালো থাকিস’ তখন লিলুর থেকে ওর দূরত্ব প্রায় দেড় কিলো।

‘লিলুর কানে কি দিলুর কণ্ঠস্বর পৌছালো?’ চমকে উঠে মুখ ফিরিয়ে দিলশাদ দেখলো বাইরে চোখ রেখেই সেজান প্রশ্ন করলো। লেনিন ওকে ‘দিলু’ বলে ডাকে সেজান তা জানলো কেমন করে? দিলশাদের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। এই নির্জন কেবিনে সেজান কি কোন প্রশ্নের মুখোমুখি করবে দিলশাদকে? কিন্তু না, ট্রেন দুলতে থাকার পরপরই সেজান চোখ বন্ধ করলো। মুখে কোন ভাবান্তর নেই।

ট্রেন চলতে শুরু করলে ট্রেনের চাকা আর রেললাইনের সম্মিলিত সংঘর্ষে যে ধ্বনি উঠলো সে সুরতাল নিয়ে শৈশবে দিলশাদরা ছন্দোময় ছড়া কাটতো। ট্রেন যেন বলতো - ‘একধামা চাল, একটি পটল…একধামা চাল, একটি পটল…’। ট্রেন আজও তা-ই বলছে। পা তুলে বসে সেজানের ঘাড়ে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করে দুলতে দুলতে দিলশাদ জিজ্ঞাসা করলো, ‘আমাদের বাড়িটা কেমন?’

‘অসাধারণ’

‘ছাদ?’

‘ছেলেবেলাময়।’

‘বারান্দা?’

‘স্মৃতিভারাতুর।’

‘সিঁড়ি?’

‘বেদনাবিধুর।’

‘লাইব্রেরি?’

‘নীরব দর্শক।’

ট্রেনের লাইন পরিবর্তনের জোর ঝাঁকুনিতে, না সেজানের জবাবে দিলশাদ কেঁপে উঠলো বোঝা গেল না। কিন্তু দ্রুত প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে দিলশাদ সেজানকে বললো, ‘ট্রেনটা কী বলছে বুঝতে পারছো সেজান? যেন বলছে, ‘সব ভালো তার, শেষ ভালো যার…সব ভালো তার, শেষ ভালো যার…সব ভালো তার, শেষ ভালো যার…।’
===============================



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ উম্মে মুসলিমা


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

ঋণসংক্রান্ত এসইসির আদেশ বহাল রইল

কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্যের (এনএভি) ভিত্তিতে ঋণ বিতরণের বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) আদেশটি বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
এর ফলে বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিতে হলে শেয়ারের সর্বশেষ বাজারমূল্যের সঙ্গে এনএভি যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ দিয়ে যে ফলাফল পাওয়া যাবে, সেই অনুপাত অনুসরণ করতে হবে। ইতিমধ্যে এ অনুপাতের বেশি কাউকে ঋণ দেওয়া থাকলে প্রয়োজনে বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ার বিক্রি করে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসকে তা সমন্বয় করতে হবে।
এসইসির এ আদেশের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ দুজন বিনিয়োগকারী হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এসইসির আদেশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। একই সঙ্গে এসইসির ওই সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
তবে হাইকোর্টের এ আদেশের স্থগিতাদেশ চেয়ে চেম্বার বিচারপতির কাছে আবেদন করে এসইসি কর্তৃপক্ষ। চেম্বার বিচারপতি বিষয়টি শুনানির জন্য আপিল বিভাগে পাঠিয়ে দেন।
প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের তিন বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল রোববার সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টকে রুল নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। বলেছেন, হাইকোর্টের রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে।
আপিল বিভাগে রিট আবেদনকারীর পক্ষে রোকনউদ্দিন মাহমুদ, শেখ ফজলে নূর তাপস ও আবুল কালাম আজাদ এবং এসইসির পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মামলা পরিচালনা করেন।

আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে শেয়ারবাজার, সাধারণ সূচক বেড়েছে ১০৩.৮৯ পয়েন্ট

গতকাল রোববারের দরপতনের পর আজ সোমবার আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঢাকার শেয়ারবাজার। আজ বেলা তিনটায় লেনদেন শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণ মূল্যসূচক ১০৩ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩৯৬ দশমিক ৪৩ পয়েন্টে।
আজ বেলা ১১টায় লেনদেনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাধারণ সূচক ওঠানামা করে। লেনদেনের শুরুতে সাধারণ সূচক ১৯ পয়েন্ট বেড়ে যায়। দুপুর ১২টার দিকে সাধারণ সূচক বেশ কমে যায়। সোয়া ১২টার পর থেকে আবারও সাধারণ সূচকের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যায়।
এদিকে ডিএসইতে আজ মোট এক হাজার ৫৬৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা গতকালের চেয়ে ৮০০ কোটি টাকা কম।
আজ শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। লেনদেন হওয়া মোট ২৪৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ১৮৯টির, কমেছে ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। এ ছাড়া সাতটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অপরিবর্তিত ছিল।
লেনদেনে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো: প্রিমিয়ার ব্যাংক, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স সার্ভিসেস, উত্তরা ফিন্যান্স, সামিট পাওয়ার ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।
আজ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে উত্তরা ফিন্যান্সের শেয়ারের দাম। এ ছাড়া বিজিআইসি, বিডি ফিন্যান্স, সোনারগাঁও টেক্সটাইল ও পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স সার্ভিসেস দাম বেড়ে যাওয়া শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া দাম কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো: ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফিন্যান্স করপোরেশন, কোহিনুর কেমিক্যাল, লিব্রা ইনফিউশনস, বিএসসি ও স্টাইল ক্রাফট।
আজ ডিএসইর বাজার মূলধন ৩,২১,৫১১ কোটি টাকা।
এদিকে টানা ১৫ দিন অব্যাহতভাবে শেয়ারের দর বাড়ার পর গতকাল রোববার দেশের দুই শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটে। শেয়ারের দাম অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে গত শনিবার ডিএসই ও সিএসইর নেতারা যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে সতর্ক করেন বিনিয়োগকারীদের।
ডিএসই কর্মকর্তাদের সতর্কতা ও গতকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) হিসাব করে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এসইসির নির্দেশনা বহাল রাখায় শেয়ার বাজারে এর প্রভাব পড়ে। এর জের ধরে গতকাল দুই শেয়ার বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়। তবে এক দিন অতিবাহিত হতে না হতেই আজ আবারও শেয়ারবাজার চাঙা হয়ে ওঠে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

আরও তিন রাজবন্দীকে মুক্তি দেবে কিউবা

আরও তিন রাজনৈতিক কারাবন্দীকে শিগগিরই মুক্তি দিতে যাচ্ছে কিউবার সরকার। গত শনিবার হাভানার একটি রোমান ক্যাথলিক চার্চ এ ঘোষণা দেয়।
গত ১৯ মে বিশপ জেইম ওর্তেগা ও প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর মধ্যকার আলোচনার পর ২০০৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ৭৫ জন ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তির মধ্যে ৫২ জন রাজনৈতিক কারাবন্দীকে মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কিউবার সরকার। এ ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকায় আরও তিনজন যোগ হলো।
এ সিদ্ধান্তের ফলে কিউবার সরকার সব রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ৩৬ জনকে মুক্তি দিয়ে সপরিবারে স্পেনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

উত্তর কোরিয়ার দেশত্যাগী নেতার মৃত্যু

উত্তর কোরিয়ার দেশত্যাগী নেতা হোয়ং জং য়োপকে (৮৭) গতকাল রোববার দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের নিজ বাসভবনে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ জানায়, তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। য়োপ পুলিশি প্রহরায় গোপন এক ঠিকানায় বাস করতেন। তবে উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে তিনি হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন।
য়োপ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং ইলের গৃহশিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি দেশ ত্যাগ করার আগে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দল ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি সে দেশের একজন কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন।
সিউল পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, এক নিরাপত্তা-কর্মী য়োপের মৃতদেহ তাঁর বাথটাবে পেয়েছেন। তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।

অস্ট্রেলীয় চার পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত

বর্ণবাদী ই-মেইল পাঠানোর সঙ্গে জড়িত থাকায় অস্ট্রেলিয়ার চার পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও অন্য ১৫ জনের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারতে এক ট্রেনযাত্রীর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় রসিকতা করে ওই বর্ণবাদী ই-মেইল লেখা হয়।
ই-মেইল লেখা ও পাঠানোয় জড়িত থাকায় চার পুলিশকে বরখাস্ত, একজনের পদাবনতি ও পাঁচজনকে তিন হাজার ডলার জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া বাকি নয় পুলিশ কর্মকর্তাকে পুলিশের একটি বিশেষ প্যানেলের সামনে ১২ ও ১৫ অক্টোবর হাজির হতে হবে। এর মধ্যে ছয়জনের ব্যাপারে শুনানি হবে পরবর্তী সপ্তাহে। গত শনিবার এ পুলিশ কর্মকর্তাদের আটক করা হয়। হেরাল্ড সান-এর প্রতিবেদনে গতকাল রোববার এ কথা বলা হয়।
ওই ই-মেইলের সঙ্গে পাঠানো ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ভারতের এক ট্রেনযাত্রী বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। ওই ভিডিওর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় ভিক্টোরিয়া প্রদেশের পুলিশ কর্মকর্তারা রসিকতা করে একটি মন্তব্য যুক্ত করেন, তা হলো এভাবে মৃত্যুর মাধ্যমে মেলবোর্নে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান হতে পারে।

চিলির খনিশ্রমিকদের উদ্ধারকাজ বুধবার শুরু হতে পারে

চিলির খনিতে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকা ৩৩ খনিশ্রমিককে উদ্ধারের কাজ আগামী বুধবার থেকে শুরু হতে পারে। গত শনিবার সুড়ঙ্গ খননের কাজ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর দেশটির খনিমন্ত্রী লরেন্স গোলবোর্ন এ ঘোষণা দেন।
গোলবোর্ন বলেন, ‘বুধবারের দিকে আমরা উদ্ধারকাজ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি। শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য ক্যাপসুল লিফট স্থাপনে প্রকৌশলীদের দেড় দিনের মতো সময় প্রয়োজন। কারণ, লিফটের চারদিকে আবদ্ধকারী ৯৬ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ইস্পাতের খাঁচা স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া লিফট ওঠানামা করার জন্য একটি কপিকলও বসাতে হবে। কপিকল বসাতে বাড়তি ৪৮ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন। এই লিফটেই একজন একজন করে আটকে পড়া ৩৩ শ্রমিককে উদ্ধার করা হবে।’
কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী একদল শ্রমিককে লিফটে করে খনি থেকে বের করে আনা হবে। এরপর স্বাস্থ্যগতভাবে দুর্বলদের এবং সবশেষে আবারও অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী শ্রমিকদের খনি থেকে বের করে আনা হবে। কর্মকর্তারা আরও জানান, বুধবার উদ্ধারকাজ শুরু করা গেলে আগামী শুক্রবারের মধ্যেই আটকে পড়া ৩৩ শ্রমিককে উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
গত ৫ আগস্ট দুর্ঘটনাবশত চিলির সান হোসে খনির একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০ মিটার গভীরে ৩৩ জন শ্রমিক আটকা পড়েন। তাঁদের মধ্যে ৩২ জন চিলি ও একজন বলিভিয়ার নাগরিক।
বলিভিয়ার শ্রমিকের নাম কার্লোস ম্যামানি। বয়স ২৩ বছর। ম্যামানির উদ্ধারের সম্ভাবনায় সে দেশের প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস বেশ উৎফুল্ল। তিনি উদ্ধারের পর ম্যামানিকে একটি চাকরি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এ ছাড়া উদ্ধারের সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন।

বোরহানুদ্দিন রাব্বানি আফগান শান্তি পর্ষদের চেয়ারম্যান

আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট বোরহানুদ্দিন রাব্বানিকে গতকাল রোববার তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টায় গঠিত শান্তি পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ থেকে দেওয়া এক ঘোষণায় এ কথা বলা হয়েছে। বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করার জন্য ‘দ্য হাই পিস কাউন্সিল’ নামের এ পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে তালেবানের পতনের পর থেকে কারজাই সরকারকে হটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তালেবান জঙ্গিরা।
গত জুনে একটি জাতীয় সম্মেলনের পর ৬৮ সদস্যের এ পর্ষদ গঠিত হয়। গতকাল পর্ষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে রাব্বানিকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই পর্ষদের সদস্যদের বেছে নিয়েছেন।
কারজাইয়ের প্রাসাদ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, দ্য হাই পিস কাউন্সিলের দ্বিতীয় বৈঠকে বোরহানুদ্দিন রাব্বানিকে সর্বসম্মতভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছে। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট কারজাইও উপস্থিত ছিলেন।
১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর উপস্থিতির বিরুদ্ধে যে কয়েকটি গোষ্ঠী লড়াই করেছিল, সেগুলোর একটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাব্বানি।

পাকিস্তান থেকে ন্যাটোর রসদ সরবরাহ শুরু

টানা ১১ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল রোববার পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহ ফের শুরু হয়েছে। এদিকে ন্যাটো বাহিনীর রসদ সরবরাহকারী যানের ওপর গত শনিবার চালানো হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানের তালেবান জঙ্গিরা।
পাকিস্তানের শুল্ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নওয়াজ জানিয়েছেন, ন্যাটো সেনাদের জন্য রসদ বোঝাই এক ডজন যান গতকাল আফগানিস্তানের উদ্দেশে পাকিস্তান ছেড়েছে। গত শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সরবরাহ পথ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় একটি সেনা চৌকিতে গত সপ্তাহে ন্যাটোর হেলিকপ্টার হামলায় তিন সেনা নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান খাইবার এলাকার তোর্কহাম সীমান্তের সরবরাহ পথটি বন্ধ করে দেয়। পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ন্যাটো সেনাদের জন্য রসদ পাঠানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ এটি।
এদিকে পাকিস্তানের তেহেরিক-ই-তালেবানের (টিটিপি) মুখপাত্র আজম তারিক গতকাল রোববার অজ্ঞাত স্থান থেকে টেলিফোনে এএফপিকে জানান, ‘পাকিস্তানের সিবি এলাকায় ন্যাটোর ট্রাক ও তেলের ট্যাংকারে হামলার দায় আমরা স্বীকার করছি। ন্যাটো পরিচালিত চালকহীন বিমান হামলা (ড্রান) বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমরা হামলা চালিয়ে যাব।’ এর আগের হামলাগুলোর দায়ও তারা স্বীকার করে। গত ৩ সেপ্টেম্ব থেকে এ পর্যন্ত ন্যাটোর হামলায় ১৪০ জনেরও বেশি লোক মারা গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা কর্মসূচিতে হাজারো এশীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য পরিষ্কার ও দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। আয়োজকেরা ধারণা করছেন, গতকাল রোববারের ওই কর্মসূচি জলবায়ু-পরিবর্তনবিষয়ক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।
‘গ্লোবাল ওয়ার্ক পার্টি’ নামের ১০/১০/১০ তারিখের এই কর্মসূচির উদ্বোধন হয় অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোয়। পরে তা চলে আসে এশিয়ায় এবং ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের ১৮৮টি দেশে সাত হাজারের বেশি সামাজিক কর্মসূচি পালন করা হয়।
আয়োজকদের পক্ষে থ্রিফিফটিডটঅর্গ প্রচারাভিযানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল ম্যাককিবেন বলেন, ‘আমাদের জানা মতে, শুধু ইকুয়েটরিয়াল গিনি, সান ম্যারিনো ও উত্তর কোরিয়া এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়নি। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই এটা সবচেয়ে ব্যাপক পরিবেশবাদী কর্মসূচি। আমরা যতটুকু বলতে পারি তা হলো, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো একটি বিষয়ের ওপর কর্মসূচিতে এক দিনে সবচেয়ে বিস্তৃত অঞ্চলের নাগরিকদের অংশগ্রহণ।’
কর্মসূচির ম্যানিলাভিত্তিক সমন্বয়কারী জয়েস সিয়েরা বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মসূচির মাধ্যমে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক হাজার মানুষ এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। আমার মনে হয়, এর মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের কাছে একটি বার্তা পরিষ্কারভাবে পৌঁছে গেছে—এশিয়ার মানুষ, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে, তারা নিজেরাই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছে।’
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক শহরে হেঁটে হেঁটে বর্জ্য সংগ্রহ করেছে। চীনের ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। গণমাধ্যমবিষয়ক মুখপাত্র জোয়ানা ওয়াং বলেন, ‘চীনের ইতিহাসে পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচিতে যুব শ্রেণীর অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় ঘটনা এটি।’
ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় কয়েক হাজার নাগরিক স্থানীয় প্যাসিগ নদী রক্ষার ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে গতকাল একটি দৌড় কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই নদীপথটি ব্যাপক দূষণের শিকার। অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় নাগরিকেরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। প্রশান্ত মহাসাগরের সব কয়টি দ্বীপ এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়। কঙ্গোতে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত শরণার্থীরা ‘ফরেস্ট অব হোপ’ নামের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে। ইরাকে ব্যাবিলন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের ছাদে সৌরশক্তি প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়।

নেপালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের উদ্যোগ ফের ব্যর্থ

নেপালের সাংবিধানিক পরিষদ আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল রোববার দেশটিতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের উদ্যোগ ১২তম বারের মতো ব্যর্থ হয়। স্থায়ী কোনো সরকার ছাড়াই ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে হিমালয়ের পাদদেশের এ দেশটি। আগামী ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে আবারও ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সাংবিধানিক পরিষদে গতকাল প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেসের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য একমাত্র প্রার্থী রাম চন্দ্র পৌদেল ৮৯ ভোট পেয়েছেন। ৬০১ আসনের সাংবিধানিক পরিষদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ৩০১ ভোট। ভোট গ্রহণের সময় অন্য দলের সদস্যরা অনুপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পেরে এর আগে ১১ বারের চেষ্টাতেও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পারেনি।
সাবেক গেরিলা নেতা পুষ্প কমল দহল প্রচন্ডের মাওবাদী দলের জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের দাবির মুখে গত ৩০ জুন পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপাল।
এর পর থেকে দেশটিতে স্থায়ী কোনো সরকার নেই। মাধব কুমার অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মোশাররফের শিরশ্ছেদ করলে ১০০ কোটি রুপি পুরস্কার!

পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের শিরশ্ছেদ করতে পারলে হত্যাকারীকে ১০০ কোটি পাকিস্তানি রুপি ও এক হাজার একর জমি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বেলুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী নেতা নওয়াব আকবর বুগতির ছেলে তালাল আকবর বুগতি। গত শনিবার কোয়েটায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন।
উল্লেখ্য, তালাল আকবর বুগতির বাবা জামহুরি ওয়াতান পার্টির প্রধান নওয়াব আকবর বুগতি পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে সেনা অভিযানে নিহত হন। বর্তমানে তালাল আকবর বুগতি এই দলের প্রধান।
তালাল আকবর বলেন, ‘মোশাররফ খুন হওয়ার যোগ্য, যেহেতু তিনি গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। সংবিধানের ৬ ধারা অনুযায়ী এ অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডই তাঁর প্রাপ্য।’
এ ছাড়া বেলুচিস্তানের অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা, ২০০৭ সালে লাল মসজিদে অভিযানকালে নির্দোষ মানুষকে হত্যাসহ বহু ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করায় মোশাররফকে হত্যা করা আবশ্যক বলে মনে করেন তালাল আকবর বুগতি। মোশাররফ এখন স্বেচ্ছানির্বাসনে ব্রিটেনে বসবাস করছেন।
নওয়াব আকবর বুগতি একজন বিশ্বাসঘাতক ছিলেন—তাঁর বাবার বিরুদ্ধে মোশাররফের এই অভিযোগের নিন্দা জানিয়ে তালাল আকবর বলেন, এর মাধ্যমে সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর বুগতিকে হত্যায় তাঁর (মোশাররফ) জড়িত থাকারই জোরালো স্বীকৃতি।
সংবাদ সম্মেলনে তালাল আকবরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) নেতা সরদার ইয়াকুব নাসির।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটা থেকে ১৫০ মাইল পূর্বে একটি গুহায় নওয়াব আকবর বুগতি সেনা অভিযানে নিহত হন।

আফগানিস্তানে ৬০ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে

আফগানিস্তানের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ, সামাজিক সমস্যা ও দারিদ্র্যের কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। দেশটির উচ্চপদস্থ এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা গতকাল রোববার এ কথা জানিয়েছেন।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে কাবুলে এক অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত জনস্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রী সুরাইয়া দালিল বলেন, আফগানিস্তানের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ মানসিক চাপে ভুগছে। এটি একটি বড় সমস্যা।
সুরাইয়া বলেন, দেশের কিছু এলাকার চিত্র ভয়ানক। তালেবান জঙ্গিদের অব্যাহত সহিংসতার কারণে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীরা ওই সব এলাকায় যেতে পারছেন না। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা সৃষ্টির পেছনে প্রধান কারণ চরম দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা ও নারী-পুরুষের বৈষম্য।
আফগানিস্তানের নারী ও শিশুদের মধ্যে অশিক্ষিতের হার ৭০ শতাংশের বেশি। অশিক্ষা ও বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দেশটিতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, এমন পেশাজীবীর সংখ্যা কম থাকায় চিকিৎসা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি পিটার গ্রাফ বলেন, দেশের মানসিক রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য মাত্র ২০০ শয্যা এবং মাত্র দুজন মনোরোগ চিকিৎসক আছেন।’

শুরু হলো ফুটবলের নতুন মৌসুম

কদিকে বাংলাদেশ লিগের দল চট্টগ্রাম আবাহনী। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিভাগের দল বাংলাদেশ পুলিশ—যাদের সবাই ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের কনস্টেবল। এরা ফুটবল খেলবে কখন, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে রাস্তাঘাটে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তো দিন শেষ! ফাঁকা সময়ে যতটুকু অনুশীলন করা যায়। কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে গ্রামীণফোন ফেডারেশন কাপ ফুটবলের উদ্বোধনী ম্যাচে পুলিশের সহজেই হারার কথা চট্টগ্রাম আবাহনীর কাছে। পুলিশ হারল (২-১), তবে আকাশি-নীল জার্সিধারীদের জয়টা দাপুটে নয়। এই ম্যাচ দিয়েই শুরু হলো ঘরোয়া ফুটবলের নতুন মৌসুম।
খেলার শুরু থেকেই চট্টগ্রাম আবাহনীর আক্রমণ। প্রথম গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি—১৫ মিনিটের মাথায় অধিনায়ক মাসুদ আলমের পাস থেকে গোল করেন ধীমান। ৬০ মিনিটে কর্নার থেকে পাওয়া বল দারুণ হেডে জালে জড়ান আরাফাত (২-০)। খেলার শেষ মিনিটে পেনাল্টি থেকে পুলিশের পক্ষে গোলটি করেন অধিনায়ক মফিজুর।
জয় দিয়ে মৌসুম শুরু করতে পেরে দারুণ খুশি চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ সেলিম খান, ‘চট্টগ্রামে দুটি স্টেডিয়ামেই চলছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রস্তুতি। আমরা কোথাও একদিনও অনুশীলন করতে পারিনি। অনুশীলন ছাড়াই ছেলেরা যা খেলল তাতে আমি খুশি।’ কাল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করেন পেশাদার লিগ কমিটির চেয়ারম্যান আবদুস সালাম মুর্শেদী। উপস্থিত ছিলেন গ্রামীণফোনের হেড অব মার্কেট কমিউনিকেশনস আজিজুল হক। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের মায়ের মৃত্যুতে খেলা শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
আজকের খেলা: চট্টগ্রাম মোহামেডান-ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং (বেলা ৩-৩০ মি., বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম, কমলাপুর)।

সমালোচনায় মুখর চীনেরই মানবাধিকারকর্মীরা

শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর বিশ্বব্যাপী রাতারাতি পরিচিতি পেয়ে গেছেন চীনের কারাবন্দী ভিন্নমতাবলম্বী নেতা লিউ সিয়াওবো। কিন্তু তাঁকে নোবেল দেওয়ার সমালোচনায় মুখর হয়েছেন চীনেরই অনেক মানবাধিকারকর্মী। তাঁরা বলছেন, লিউ এই পুরস্কারের উপযুক্ত নন।
৫৪ বছর বয়সী লিউকে গত বছর ডিসেম্বরে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেন চীনা আদালত। ২০০৮ সালে চার্টার ২০০৮ শিরোনামে একটি মেনিফেস্টো প্রকাশ করার দায়ে তাঁকে এই শাস্তি দেওয়া হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে চীনের অনেক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও লেখক ওই মেনিফেস্টোতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এ ছাড়া ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে চার দফায় কারাভোগ করেন লিউ।
চীনে আধুনিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জনক বলে ধরা হয় ওয়েই জিংশেংকে। প্রায় দুই দশক তিনি কারাবন্দী জীবন কাটিয়েছেন। ওয়েই বলেন, নোবেল কমিটির কাছে লিউয়ের গ্রহণযোগ্যতাই বেশি এবং বেইজিং কর্তৃপক্ষের কাছেও। কেননা তিনি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই আন্দোলন করেছেন। তবে লিউ সত্যিকার অর্থে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি।
ওয়াশিংটনে বসবাসকারী ওয়েই বলেন, লিউ ছাড়াও চীনের হাজার হাজার মানুষ নোবেল পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। তাঁদের মধ্যে আছেন নিখোঁজ মানবাধিকার আইনজীবী গাও ঝিশেং এবং চীনের এক সন্তান নীতির প্রবঞ্চনার বিষয়টি তুলে ধরা চেন গুয়াংচেং।
প্রবাসী চীনাদের একটি অংশও লিউকে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে নোবেল কমিটিকে চিঠি দিয়েছে। প্রবাসীদের এই অংশটির অন্যতম সংগঠক দিয়ানে লিউ। তিনি জানান, চীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম বড় দৃষ্টান্ত ফালুনগং আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম নির্যাতন। অথচ এ বিষয়টিকে লিউ কখনো গুরুত্ব দেননি।
দিয়ানে লিউ বলেন, যাঁরা মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলেন, নোবেল পুরস্কার তাঁদের জন্য। লিউ সেই ব্যক্তি নন। পশ্চিমারা চীনা ভাষা পড়তে পারে না, এ জন্য তিনি তাঁদের ধোঁকা দিতে পেরেছেন। পশ্চিমারা জানে না, কত কৌশলে কমিউনিস্টরা এ দেশ শাসন করছে।’
ওয়াশিংটনভিত্তিক চীনের আরেক মানবাধিকারকর্মী হ্যারি উই। প্রায় দুই দশক তিনি আটক ছিলেন চীনের লেবার ক্যাম্পে। উই বলেন, ‘লিউ কোনো দলকে সংগঠিত করেননি। কোনো পদক্ষেপও তিনি নেননি। তিনি শুধু তাঁর আদর্শের কথা জানিয়েছেন। আর তাতেই তাঁকে ১১ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, দেশের অবস্থা কী এবং আমরা কী করতে পারি।’
ভ্যানকুভারে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার চীন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ টিমোথি চেক জানান, চীনের অসংখ্য মানবাধিকারকর্মীর মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিয়ে বিদ্বেষের মুখে পড়েছে নোবেল কমিটি। তবে কারাগারে বন্দী থাকায় লিউ একটি বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন, যেটা ওয়েই জিংশেং বা হ্যারি উই পাননি।
চেক বলেন, লিউ সিয়াওবো চীনের একজন অন্যতম বুদ্ধিজীবী। কেননা তিনি একই সঙ্গে দুটি কাজ করেছেন। সরকারের সমালোচনা করেছেন আবার একই সঙ্গে চীনেও থেকেছেন।
স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ: হংকংভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, লিউ সিয়াওবোর স্ত্রী লিউ সিয়া গতকাল রোববার তাঁর স্বামীর সঙ্গে দেখা করেছেন। গত শুক্রবার পুরস্কার ঘোষণার পরপরই সিয়া জানিয়েছিলেন, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবরটি স্বামীকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুলিশ তাঁকে কারাগারে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু এরপর থেকেই তাঁর ফোন বন্ধ ছিল এবং তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

হেরেই গেল জিম্বাবুয়ে

২০ ওভারের ম্যাচে ১৯৪ রান অনেক বড় স্কোর। তার পরও প্রথমে ব্যাট করে এই রান তুলেও স্বস্তিতে ছিল না দক্ষিণ আফ্রিকা। জিম্বাবুয়ে যে ভয়ই পাইয়ে দিয়েছিল স্বাগতিকদের। নিজেদের টি-টোয়েন্টির সর্বোচ্চ স্কোর গড়েও শেষ পর্যন্ত কাল কিম্বার্লিতে মাত্র ৮ রানে হারল জিম্বাবুয়ে। ২-০-তে সিরিজ জিতে নিল ইয়োহান বোথার দল।
দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে রেকর্ড সর্বোচ্চ অপরাজিত ৯৬ রানের ইনিংস খেলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৯৪/৬ রানের পুঁজি এনে দেন জ্যঁ পল ডুমিনি। ৪ ছক্কা ১০ চারে ৫৪ বলে এই রান করেন তিনি। কিন্তু ব্রেন্ডন টেলরের ৩৯ বলে ৫৯ আর জাস্টিস চিবাবার ৪১ বলে ৫৯ রানের ইনিংস দুটিতে চড়ে জয়ের পথে ছোটে জিম্বাবুয়ে। শেষ দিকে দ্রুত উইকেট খোয়ানোয় জিম্বাবুয়ে ৭ উইকেট হারিয়ে করতে পারে ১৮৬ রান।

আইপিএল থেকে প্রীতি-শিল্পার বিদায়

আইপিএল থেকে আপাতত বিদায় নিতে হলো দুই বলিউড-নন্দিনী প্রীতি জিনতা আর শিল্পা শেঠিকে। কাল আইপিএলের গভর্নিং কাউন্সিলের জরুরি বৈঠকে নীতিমালা ভঙ্গের দায়ে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব ও রাজস্থান রয়্যালস—এই দুটি দলের ফ্রাঞ্চাইজি বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া মালিকানা-সংক্রান্ত বিবাদ ১০ দিনের মধ্যে মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এ বছরই যুক্ত হওয়া দল কোচিকে। এই কোচির মালিকানার একটা অংশ নিয়েই ঘটনার শুরু।
দলের শেয়ারহোল্ডিং আর মালিকানা-সংক্রান্ত নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগে গত ১ অক্টোবর এই ফ্রাঞ্চাইজিগুলোকে নোটিশ পাঠিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সময়। কিন্তু পাঁচ দিন আগেই নবগঠিত গভর্নিং কাউন্সিল রাজস্থান ও পাঞ্জাবের মালিকানা ফিরিয়ে নিল।
২০০৮ সালে ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারে পাঞ্জাবের মালিকানা কেনেন ব্যবসায়ী নেস ওয়াদিয়া, মোহিত বর্মণ, করন পল, আদিত্য খান্না ও প্রীতি জিনতা। ওই বছরেই ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারে রাজস্থানের মালিকানা কেনেন মনোজ বাদালে আর লালচান মারডক। পরের বছর রাজ কুন্দ্রা আর শিল্পা শেঠি মালিকানার একটা অংশ কিনে নেন।
এই মালিকানা পরিবর্তনে অনিয়ম করা হয়েছে বলে বিসিসিআইয়ের অভিযোগ। টেন্ডারে অংশ নিয়েছে এক পক্ষ, মালিক হয়েছে আরেক পক্ষ, পরে মালিকানা বদল হয়েছে তৃতীয় পক্ষের কাছে। আর এই প্রক্রিয়ায় মানা হয়নি বিসিসিআইয়ের বেঁধে দেওয়া কোনো নিয়ম। ধারণা করা হয়, আইপিএলের তৎকালীন প্রধান লোলিত মোদির জ্ঞাতসারেই এসব অনিয়ম হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত মোদির বিরুদ্ধেও চলছে তদন্ত।
কাল বিসিসিআইয়ের বিবৃতিতে অবশ্য এই তিনটি দলকে কেন শাস্তি দেওয়া হলো এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। শুধু জানানো হয়েছে, কাল মুম্বাইয়ের জরুরি বৈঠকে নেওয়া সব সিদ্ধান্তই হয়েছে সর্বসম্মতিতে। অবশ্য কোচিকে ঠিক নিষিদ্ধ করা হয়নি। মালিকানা-সংক্রান্ত বিবাদ মিটিয়ে ফেললেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ মুহূর্তে পাঞ্জাব আর রাজস্থানের মালিকানার কী হবে, নতুন করে টেন্ডার হবে কি না—এসবও পরিষ্কার নয়। অবশ্য ২০১১ আইপিএলের এখনো ছয় মাস দেরি।
যোগাযোগ করা হলে রাজস্থানের মালিক রাজ কুন্দ্রা ক্রিকইনফোকে বলেছেন, তাঁদের হাতে এখনো এ সংক্রান্ত নোটিশ পৌঁছায়নি। নোটিশ ভালোমতো পড়ার পরই তাঁরা পদক্ষেপ নেবেন। তবে মামলা-মোকদ্দমায় যেতে রাজি নয় পাঞ্জাব। দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ ব্যক্তি জানিয়েছেন, আপাতত বিসিসিআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই সমস্যার সমাধান করতে চান তাঁরা।

কে দাঁড়াবেন সাকিবের পাশে?

চাইলে ‘সহ-অধিনায়ক চাই’ শিরোনামে পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে দিতে পারে বিসিবি। তবে জেমি সিডন্সের তো আর আগ বাড়িয়ে সেটা করার উপায় নেই। তাঁর যত দাবি বোর্ডের কাছে। কাল অনুশীলন শেষে ড্রেসিংরুমে এক বোর্ড পরিচালককে পেয়ে দাবিটা নাকি জানিয়েও দিয়েছেন কোচ, ‘আমার একজন সহ-অধিনায়ক দরকার।’
মাশরাফি বিন মুর্তজা আর নাজমুল হোসেন ইনজুরিতে। আজ তাঁদের জায়গা নিতে পারেন রুবেল হোসেন ও শফিউল ইসলাম। নাঈম ইসলামের বদলে মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দীর কথা শোনা যাচ্ছিল। আবার মাশরাফির সঙ্গে ইনজুরির মিতালিতে আপাতত বাকি সিরিজে অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। কিন্তু সবকিছুর পরিবর্তক থাকলেও নেই শুধু সহ-অধিনায়কের! সাকিব অধিনায়ক হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সহ-অধিনায়ক পদটি বুঝিয়ে দেওয়ার লোক খুঁজে পাচ্ছে না বিসিবি। এর পেছনে অন্য কোনো গূঢ় রহস্যও থাকতে পারে। তবে প্রকাশ্যে যা বলা হচ্ছে, সেটি পীড়াদায়ক। সহ-অধিনায়ক করা যায়, এমন নিয়মিত পারফর্মারই নাকি নেই বাংলাদেশ দলে!
সহ-অধিনায়ক একজন পারফর্মারকেই করতে হবে, এমন তত্ত্ব মেনে যদি সিডন্সকে বলা হয় একজন সহ-অধিনায়ক খুঁজে দিতে, বিপদে নির্ঘাত তিনিও পড়বেন। নিয়মিত ভালো খেলেন এমন ক্রিকেটারদের অনেকে ইনজুরিতে, আর একজন সাকিব তো আপৎকালীন নেতৃত্ব নিতেই ব্যস্ত! অধিনায়ককে যদি দলের নেতা বলা হয়, সাকিব আক্ষরিক অর্থেই তা-ই। বোলিং-ব্যাটিং দুটিতেই এই দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। সহ-অধিনায়ক পেতে নয়, ভালো ফলাফলের আশাতেই দলের অন্য ব্যাটসম্যানদের কাছেও কিছু চাইছেন কোচ। কাল বিকেলে মিরপুর ইনডোরে অনুশীলন শেষে যে কয় মিনিট কথা বললেন, তাতে একাধিকবার তুললেন প্রসঙ্গটা, ‘আমাদের ওপরের দিকের চার ব্যাটসম্যানের একজনকে বড় স্কোর করতে হবে।্রসেটি হলে ম্যাচ খুব ক্লোজ হবে।’ একটু পর আবার বলেছেন, ‘দলে সাকিব ছাড়া আর কোনো সুপারস্টার নেই। আমি মনে করি, সবাইকেই অবদান রাখতে হবে এবং আবারও বলছি ওপরের দিকে কাউকে বড় ইনিংস খেলতে হবে।’
আপাতত এই দুটি জিনিসই চাইছেন কোচ—একজন সহ-অধিনায়ক, সঙ্গে সাকিব ছাড়া অন্যদের কাছেও ভালো পারফরম্যান্স। পরিস্থিতি তো সেটিরই অনুকূল। তামিম-মাশরাফি-আশরাফুল দলে নেই; তাঁদের বদলে যাঁরা খেলছেন, কেন তাঁরা জোরেশোরে নিজেদের দাবি জানানোর এই সুযোগটা কাজে লাগাবেন না? মাশরাফি-নাজমুলদের জন্য শফিউল-রুবেলরা যেমন হুমকি হতে পারেন, তেমনি শাহরিয়ার নাফীসও পারেন তামিম-ইমরুলদের ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস ফেলতে। ভালো পারফরম্যান্সে এই স্বাস্থ্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতাটাও তো হতে পারে বড় প্রভাবক! চ্যালেঞ্জটা আছে মেনেও সেটাকে চাপ হিসেবে নিচ্ছেন না ওপেনার ইমরুল, ‘সবারই টার্গেট থাকে ভালো কিছু করে জায়গা ধরে রাখার। তবে আমার মনে হয় না এটা কোনো চাপ।’
যত রকমের চাপ আছে, সেটা বরং বাংলাদেশ তুলে দিতে চাইছে নিউজিল্যান্ডের ওপর। ইমরুলই বললেন, ‘ম্যাচ জেতার পর সবার আত্মবিশ্বাসই উঁচুতে থাকে। অন্যদিকে প্রথম ম্যাচে হারলে সব দলই স্বাভাবিকভাবে চাপে থাকে। আমরা পরের ম্যাচে ভালো খেললে নিউজিল্যান্ড আরও চাপে থাকবে।’ প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা এবং সেটার জন্য সামর্থ্য উজাড় করে দিয়ে খেলা—এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ‘স্ট্র্যাটেজি’ কি আছে বাংলাদেশ দলের? খেলাধুলার সঙ্গে এই ইংরেজি শব্দটা বেশ যায়, যদিও জেমি সিডন্স যেন কালই তা প্রথম শুনলেন! ‘স্ট্র্যাটেজি...? ভালো প্রশ্ন। ভালো ক্রিকেট খেলা...আমি আসলে জানি না স্ট্র্যাটেজি বলতে ঠিক কী বোঝায়।’ তবে কীভাবে করতে হবে, সেটি ব্যাখ্যা না করলেও কী করতে হবে সেটি ভালোই জানেন সিডন্স, ‘শুধু জানি আমাদের ভালো খেলতে হবে। প্রতিটি বলেই জিততে হবে। আমাদের ব্যাটিংয়ের জন্য ভেট্টোরি খুব বিপজ্জনক। তার বলে কম উইকেট হারিয়ে বেশি রান করতে হবে।’
বাংলাদেশের জন্য যেমন ড্যানিয়েল ভেট্টোরি, নিউজিল্যান্ডের জন্য তেমনি সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড বেশ কিছুদিন ধরেই এই দুই বাঁহাতির লড়াই। প্রথম ওয়ানডেতে জিতেছেন সাকিব। এবার কি তাহলে ভেট্টোরির পালা? উত্তরটা ‘না’ হলেই ভালো।

রেকর্ডে লেখাল নাম দিল্লি

কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসরের রেকর্ড গড়ে যাত্রা শুরু দিল্লি গেমসের। এরপর তো দিল্লি বিতর্কের ‘রেকর্ড’ই করতে বসেছিল। অবশ্য সব ঝুটঝামেলা পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা ১৯তম আসর এরই মধ্যে কমনওয়েলথের বেশ কিছু রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে।
কাল পর্যন্ত নতুন রেকর্ড হয়েছে ৮১টি। এক আসরে সর্বোচ্চ রেকর্ডের রেকর্ড এটিই। ২০০২ ম্যানচেস্টার গেমসে রেকর্ড হয়েছিল ৭০টি।
২০০৬ মেলবোর্ন গেমসে রেকর্ড হয়েছিল ৪১টি, ১৯৯৮ কুয়ালালামপুর গেমসে ২৭টি, ১৯৯৪ গেমসে ৪৫টি, ১৯৯০-এ ২৬টি, ১৯৮৬-তে ১৯টি, ১৯৮২-তে পাঁচটি, ১৯৭৮ ও ১৯৭৪-এ তিনটি করে এবং ১৯৭০ গেমসে রেকর্ড হয়েছিল ছয়টি।
এবার ৮১টি গেমস রেকর্ডের ৩০টিই এসেছে সাঁতার থেকে। ভারোত্তোলনে হয়েছে ১২টি নতুন রেকর্ড। সাইক্লিং ও শ্যুটিংয়ে ১১টি করে, অ্যাথলেটিকসে হয়েছে ১০টি।
স্বাগতিক ভারতের নামের পাশে লেখা হয়েছে ১১টি রেকর্ড। একা অস্ট্রেলিয়া রেকর্ড গড়েছে ২৪টি! অস্ট্রেলীয় সাঁতারুরাই জোগান দিয়েছে ১৪টি রেকর্ডের। দেশ হিসেবে ১১টি রেকর্ড গড়েছে ইংল্যান্ড, কানাডা নয়টি।

টেন্ডুলকারের ১৪ হাজার

এভারেস্টে’ পা রেখেছেন আগেই। শচীন টেন্ডুলকার আরও উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন নিজেকে। কাল ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টে পেরিয়ে গেলেন ১৪ হাজার রানের মাইলফলক। আর কত দূরে নিয়ে যাবেন নিজেকে? আজ ব্যাঙ্গালোরে আবারও ব্যাট করতে নামবেন যখন, নামের পাশে লেখা থাকবে ১৪,০১৭ টেস্ট রান।
দ্বিতীয় দিন শেষে ৪৪ রানে অপরাজিত টেন্ডুলকার যেভাবে খেলছিলেন, কে জানে আজই হয়তো ৪৯তম সেঞ্চুরিটাও পেয়ে যাবেন। রিকি পন্টিং অবশ্য চাইবেন যত দ্রুত সম্ভব টেন্ডুলকারকে ফিরিয়ে দিতে। দলের জন্য তো বটেই, এতে তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থও আছে একটা। বয়সে টেন্ডুলকারের চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট পন্টিংয়ের সামনেই সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনা তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। সর্বোচ্চ রানের তালিকায় টেন্ডুলকারের পরেই অস্ট্রেলীয় অধিনায়কের অবস্থান। টেস্টে পন্টিংয়ের রান ১২,১৭৮। ব্যবধান কিন্তু ১,৮৩৯ রানের!

নতুন ইতিহাস লিখতে পারবে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশ চাইলে নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগটা নিতে পারে। বড় দলের বিপক্ষে জয় পেতে বছরের পর বছর হাপিত্যেশ করে বসে থাকার দিন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সেই আনন্দের ক্ষণ এখন নিয়মিতই আসে। তবে এক ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছাড়া আর কোনো বড় দলের বিপক্ষে পর পর দুই ম্যাচে জয় নেই এখনো। ক্রিকেটার-বিদ্রোহের জের ধরে গত বছর ক্যারিবীয় দলটা শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়িয়েছিল, সেটাকে বড় দল না বলাই ভালো। আজ নিউজিল্যান্ডকে আরেকবার হারাতে পারলেই বরং বলা যাবে, পূরণ হলো বড় দলের বিপক্ষে পর পর দুই ম্যাচ জেতার অপূর্ণ সাধ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পাওয়া তিনটি জয় বাদ দিয়েও গত দুই বছরে বড় দলের বিপক্ষে চার ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। সেগুলোর কোনোটিতেই যখন জয়টাকে পর পর দুই ম্যাচে টেনে নেওয়া যায়নি, এখন কেন হঠাৎ করে উঠছে প্রশ্নটা? উঠছে বাংলাদেশ দলের মানসিকতায় একটা নতুনত্বের দেখা মেলায়। বৃষ্টিবিঘ্নিত প্রথম ওয়ানডে জেতার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সুযোগ পেলেই জানিয়ে দিচ্ছেন, নিউজিল্যান্ডের ওপরই এখন অনন্ত চাপ। প্রথম ম্যাচে হারা দল সব সময়ই চাপে থাকে। বাংলাদেশকে পাল্টা চাপে ফেলবে কি, ড্যানিয়েল ভেট্টোরির দল ‘আমরা চাপে নেই’ বলে বাংলাদেশের দাবি অস্বীকারেই ব্যতিব্যস্ত! বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতির ছোট ছোট চিহ্নগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে এই উন্নতিটাও বোধ হয় আছে।
দ্বিতীয় ম্যাচটা বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার পর আর তৃতীয় ওয়ানডের আগে সিরিজে সন্দেহাতীতভাবেই ‘ফেবারিট’ বাংলাদেশ। নিজেদের মাঠ আর পরিচিত দর্শকের সামনে প্রতিপক্ষের সমীহও যে মিলছে! গত দুই দিনে নিউজিল্যান্ডের কঠোর অনুশীলন দেখেও মনে হয়েছে বাংলাদেশ এখন তাদের সামনে ‘প্রবল প্রতিপক্ষ’।
ড্যানিয়েল ভেট্টোরি অবশ্য সিরিজ শুরুর আগেই বাংলাদেশের পাল্লাটা ভারী করে দিয়েছেন। অভিজ্ঞতায় এগিয়ে রেখেছিলেন, সঙ্গে বলেছিলেন এই সিরিজে সাকিব আল হাসানই তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। সাকিবের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের কাছে হেরে প্রথম ওয়ানডেতে সেটা প্রমাণিতও। ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে ভেট্টোরি তাই এক শতে এক শই পাচ্ছেন আপাতত। তবে বাকি সিরিজে যে ভেট্টোরিই বাংলাদেশের জন্য পাল্টা হুমকি হয়ে উঠবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? দুই দলের অতীত ইতিহাসও বলছে, বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজ অনেকটাই ভেট্টোরি-বিষয়ক ব্যাপার। কাল অনুশীলন শেষে বাংলাদেশ কোচ জেমি সিডন্সের সতর্কবাণীটা হয়তো সে কারণেই। এই ম্যাচে নাকি তাঁর রণকৌশলের মূল কথা—ভেট্টোরি সামলাও। তার বলে যত পার কম উইকেট দাও, যত বেশি পার রান তুলে নাও।
বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড তৃতীয় ওয়ানডের আড়ালে আজ তাই আরেকটি সাকিব-ভেট্টোরি লড়াই-ই আসলে দেখবে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম। বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া আগের ম্যাচের হতাশ দর্শকদের জন্য সুসংবাদ, ওই ম্যাচের টিকিট দিয়েই গ্যালারিতে প্রবেশাধিকার মিলবে আজ। সঙ্গে এ ম্যাচের জন্য আলাদা করেও ছাড়া হয়েছে টিকিট। কাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫ হাজার ৮০টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। আজ টিকিট মিলবে স্টেডিয়াম কাউন্টারেও। তবে ভিড় সামলাতে টিকিট কাউন্টার শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ফটক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে পার্শ্ববর্তী জাতীয় সাঁতার কমপ্লেক্সে।
বিশ্বকাপ সামনে রেখে তুমুল নির্মাণযজ্ঞের মধ্যেও মিরপুরে এবার দর্শক কম হচ্ছে না। প্রথম ম্যাচটা বাংলাদেশ জেতায় আজও হয়তো আরেকটি সাকিব-ভেট্টোরি লড়াই দেখতে লাইন পড়ে যাবে গ্যালারির গেটে। তা শেষ পর্যন্ত সাকিব-ভেট্টোরি দ্বৈরথটা না জমলে?
তাতেও সমস্যা নেই। কখনো কখনো নায়কের চেয়ে পার্শ্বনায়কেরাও তো পেয়ে যান সেরা অভিনেতার পুরস্কার! প্রত্যাশা শুধু একটাই—সেই পার্শ্বনায়কও যেন হয় বাংলাদেশেরই কেউ।

পিসিবি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করবেন ইউনুস

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, তার পরও দলে ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন না। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান ইজাজ বাট জেদ ধরে আছেন, আগে ক্ষমা চাইতে হবে ইউনুস খানকে—তার পর দলে ফেরা। সাবেক এই অধিনায়ক ক্ষমা প্রার্থনা করবেন কি না, জানা যায়নি। তবে পিটিআইয়ের খবর সত্যি হলে, ক্যারিয়ার বাঁচানোর স্বার্থে পিসিবি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন ইউনুস।
পিসিবি হুমকি দিয়ে রেখেছে, এক সপ্তাহের মধ্যে ইজাজ বাটের কাছে ক্ষমা না চাইলে নতুন করে নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হবে ইউনুসকে। একটি সূত্র আজ সোমবার জানিয়েছে, সমস্যা সমাধানে পিসিবি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইউনুস। এ নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো অহংবোধ কাজ করছে না।

গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ

হসা আন্নার মনে ভীতি জাগ্রত হয়। জীবনটা অসহনীয় রকমের সাধারণ, সাদামাটা, এই বোধ তাকে এতটাই কাবু করে ফেলে যে, তার মনে হয় সে যেন বছরের একটা দিনকে আর সব দিনের থেকে আলাদা করতে পারছে না। যেন পুরো বছরটা মিলে তার কাছে একটা দিন - বিশাল, দীর্ঘ একটা অন্তহীন দিনের মধ্যে আন্নার অনন্ত জাগরণ।

গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর

প্রীতের সকাল
প্রীত সক্কাল বেলা উঠে মাকে খুঁজতে থাকে, ভীষণ হিসি পেয়েছে। চাইলে মেঝেতে শোয়া মজনুকে ডেকে তোলা যায়, আবার নিজেই কাজটা করবার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু বিছানা থেকে বাথরুম পর্যন্ত শরীরটা টেনে নিয়ে যাবার কথা ভাবতেই, ভয় ধরে যায় ওর মনে। নিজে গিয়ে হিসি করবার সম্ভাবনা ভাবতে ভাবতে আজো সে বিছানা ভেজায়। ভেজা কাপড়ে, ভেজা বিছানায় আর একবার ঘুম দিলে গা কুটকুট করতে থাকে। ফলে প্রীত প্যান্ট খুলে বিছানার শুকনো জায়গাটাতে খানিক গড়ায়। ভারমুক্তির প্রশান্তিতে তার বিশ বছরের ঢ্যাঙা শরীরটাকে ভাঁজ করে ‘দ’ হয়ে ঘুমায়।

মজনুর সকাল

মজনুর ঘুম ভাঙতেই বিটকেলে গন্ধটা নাকে আসে। এতোগুলো চাদর, কাঁথা, প্রীতের কাপড় ধোয়ার কথা মনে করতে মেজাজটা খিঁচড়ে যায়, তার ওপরে খালাম্মার গালমন্দ তো আছেই। রোজ মজনু ভাবে আর মেজাজ খারাপ করবে না, অন্তত সকাল বেলাটাতে না। চাকরিটা জেনেশুনেই নিয়েছে সে, বেতনও ভাল। কাজও অনেক না, প্রীতের সঙ্গে থাকা, ওর খেদমত করা। প্রীতের খেদমতও তেমন করতে হয় না, ও মোটামুটি নিজের কাজ নিজেই করতে চেষ্টা করে। সমস্যা একটাই, মাঝে-মধ্যে প্রীত বিছানা ভেজায়। আর ঐ গন্ধটা নাকে যাওয়া মাত্র মজনুর মেজাজ খিঁচড়ে যায়।
 
খালাম্মা আসার আগেই মজনু প্রীতের বিছানা বদলাবার উদ্যোগ নেয়। একবার মনে হয় হেচ্কা টানে প্রীতকে ওঠায়। কিন্তু প্রীতের ঘুমন্ত চেহারাটা দেখে ভীষণ মায়া হয় মজনুর। গায়ে হাত বুলিয়ে আস্তে আস্তে ডাকতে থাকে প্রীতকে।

“ও প্রীত ভাইয়া ওঠ। জলদি ওঠ। ”

“হুঁ।” প্রীত ঘুমের মধ্যে সাড়া দেয়।

“হুঁ না এহনি ওঠ। খালাম্মা আসলো বুইলে।” মজনু একটু অধৈর্য হয়ে পড়ে, গলা চড়ায় সে।

“হুঁ।” প্রীতও নাছোড়বান্দা, মজনুর তারস্বরে চিৎকারের মধ্যেও সে ঘুমাতে থাকে।

“হুঁ হুঁ কইরে না। খালাম্মা আসলি কিন্তু তোমারে আমারে দুইজনরেই ভাঙ্গবেয়ানে। তখন কিন্তু কতি পারবানা মজনু আমারে বুলাসনি ক্যান?” গম্ভির হয়ে মজনু তার শেষ অস্ত্র চালায়।

মজনুর শেষ চেষ্টায় কাজ হয়। প্রীত ধড়মড় করে ওঠে। “মা, মা কৈ?” খানিক বিব্রত হয়ে প্রীত নিজের উদোম শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

“আম্মা রেডী হয়ে আসতিছে। আর লজ্জা পাতি হবে না, আইজকেরাও বিছনা ভিজাইছ। এখন গোসল কইরে রেডী না হতি পারলি, ইস্কুলেও জাতি পারবানা কয়ে দেলাম।” মজনু গজগজ করতে করতে বিছানার চাদর, প্রীতের কাপড় জড়ো করে বালতিতে ভেজায়। প্রীত খানিকটা হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠলে ওকেও ধরে নিয়ে সাওয়ারের তলে দাঁড় করিয়ে দেয়। গোসলটা প্রীত নিজেই সারে, মজনু পিঠ ঘসাতে হাত লাগায়।

প্রীতের স্কুল ছুটির দিনগুলো বাদে, মজনু আর প্রীতের দিন রোজ প্রায় একই ভাবে শুরু হয়। মজনু আর প্রীতের বয়স প্রায় সমান, বরং মজনু প্রীতের চাইতে বয়সে খানিক বড়ই হবে। তবুও মনিব-পুত্র বলেই প্রীতকে ভাইয়া ডাকতে হয়। যদিও মনিব কামরুল, অর্থাৎ প্রীতের পিতা সম্পর্কে মজনুর চাচা হয়। কামরুলের বাবা আর মজনুর দাদা চাচাতো ভাই। ফলে একই ভিটায় শরিক-ঘর হিসেবে মেলা দিনের বসবাস। শরিক হলেও মজনুর দাদার আমল থেকেই ওদের অবস্থা পড়তির দিকে। পুরা সরদার বাড়ির নাম ডুবিয়ে মজনুর দাদা তিন ধাক্কায় ক্লাস টু পার করেন। বিদ্যাদেবীর সঙ্গে সেযাত্রা রফা করে দাদাজি পড়ালেখার ইতি টানেন। ফলে জমি-জিরাতের পাশাপাশি পড়াশুনার কারণে যে উপরি আয় হতে পারত সে রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ফলতঃ ভাগের সামান্য জমি দিয়ে তাঁর দিন গুজরান্ চলে। মজনুর বাপ-চাচারা তাঁদের বাপজানের নাম রওশন করেছেন - ধরে বেধেও তাদের স্কুলমুখো করা যায়নি। বাপ মরবার পরে ভাগ-বাটোয়ারায় জমিজিরাত যা ছিল সেটুকুও ধরে রাখতে পারেননি। শরিকি ভিটা ছাড়া তাদের কিছুই ছিল না। লজ্জার মাথা খেয়ে অন্য শরিকদের জমিতে পাইট দেয়া ছাড়া অন্য কোন রাস্তা খোলা ছিল না। মজনুর বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে আয়ের সে রাস্তাটাও বন্ধ হয়।

সেবার কামরুলের স্ত্রী সাহানা শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গেলে মজনুর কথা জানতে পারে। দয়াপরবশ হয়ে মজনুুকে সাথে করে ঢাকা নিয়ে আসে সে। সাহানা মজনুকে লিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করবে বলে মজনুর মাকে কথা দিয়ে আসে। সাহানার এহেন মহানুভবতায় ধন্য ধন্য পড়ে যায় চারদিকে, কামরুলের মাথাটাও উচা হয়। শরিক ঘর পেরিয়ে মহানুভবতার সেই বার্তা গ্রামবাসীর কান অব্দি পৌঁছে যায়। ফলে বার্তার সত্যতা যাচাই, তো স্ব স্ব মত প্রকাশের জন্য কয়েক জন মজনুদের ঘরে হাজির হয়। বেশির ভাগের মতে মজনুর বাপ মরাতে বরং ভালো হয়েছে, কারণ মজনুর বাপ শত চেষ্টা করলেও ওকে কামরুলদের মতো সাচ্ছন্দ্য দিতে পারত না, ফলে মজনুর মার খুশি থাকা উচিত। মজনুর মা খুশি হোক বা না হোক রাজি সে হয়েই ছিল। মানুষের লম্বা কথায় সে কখনই অনেক ভরসা পায় নাই। ফলে পড়া-লেখা হোক বা না হোক ছেলে না খেয়ে যে মরবে না সেটা নিশ্চিত জেনে সে চুপচাপ থাকে।

সাহানা-কামরুলের সংসার
প্রীত গোসল করে নিজের কাপড় নিজেই পরতে চেষ্টা করে। মজনু জামার বোতাম ঠিকঠাক লাগিয়ে প্রীতের চুল আঁচড়ে দেয়। মজনু প্রীতকে গুছিয়ে দিতে দিতে সাহানা ঘরে ঢোকে। “হাউ ইজ মাই বেবি টুডে? আর ইউ রেডি ফর দি স্কুল?” সাহানা প্রাথমিক খোঁজ-খবর নেবার পরে ওর নাকেও বিটকেলে গন্ধটা লাগে। মজনুকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। বরং একদম ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলতে থাকে। “মজনুরে আজ যে আমার জরুরি দুটো মিটিং পড়ে গেছে সকালে, তুই বাবা একটু সামলে নিতে পারবি না প্রীতের স্কুল?” “কাকী আপনার তো কাজ লাইগেই থাকে, আমিতো সামলাই আমার মতো, ভাইয়া ফিট না খালিতো কোন সমস্যাই নেই।” মজনু খানিকটা একঘেয়ে সুরে কথাগুলো বলতে থাকে আর প্রীতের ব্যাগ গোছাতে থাকে।

সাহানা গাড়ি বের করতে করতে আড়চোখে মজনু আর প্রীতকে পেছনের সিটে দেখে নেয়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, একই সঙ্গে উন্মনা দেখায় ওকে। মনের কোথাও একটা দুশ্চিন্তা পাঁক খেতে থাকে - মজনু বা সাহানার পরে প্রীতের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

কামরুল সেদিন একটু আগেই বাড়ি ফিরেছিল প্রীত, সাহানা আর মজনুকে নিয়ে বাইরে বেরুবে বলে। ওরা প্রায় তৈরি হয়েই ছিল, তবে সাহানাকে অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি ক্লান্ত আর ম্লান দেখাচ্ছিল। শেষবারের মতো সাহানা নিজেকে দেখে নিচ্ছিল আয়নায়, কামরুল বিছানায় আধসোয়া হয়ে ঘোরলাগা চোখে ওঁকে দেখছিল। সাহানা যখন ওর ব্যাগ হাতে নিয়ে তৈরি কামরুল তখন ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে আলতো চুমু খায়। সাহানার এতে কোন ভাবান্তর হয় না। কামরুল খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়ে সাহানার নির্লিপ্ত চেহারায়, অথচ কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয় না। প্রীত, মজনুসহ সাহানা আর কামরুল বেরোয়।

পিজ্জাহাটে ঢোকামাত্রই একঝাঁক কৌতূহলী দর্শকের চোখ প্রীতকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। দর্শককূলের দৃষ্টিতে সাহানা-কামরুল দম্পতি নতুন করে আর আজকাল বিব্রত হয় না। কিন্তু প্রীতকে নিয়ে লোকজনের অতি কৌতূহলে মজনু বিরক্ত হয়। প্রীত যে আর দশজনের মতোই স্বাভাবিক তা প্রমানের জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠে মজনু। খাবার অর্ডার করতে করতে অধীর হয়ে ওঠে প্রীত। মজনু বুদ্ধিমানের মতো ওকে রেস্তোরাঁর বাইরে বাঁশিওয়ালার কাছে নিয়ে যায়। কামরুল সাহানাকে একলা পেয়ে আলাপ শুরু করে।

“কিহে মহারানী উদাস দেখায় যে?” হালকা স্বরে কামরুল শুরু করে খুঁনসুটি। সাহানা অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ায়। কামরুল সাহানার এই দশা খুব ভালো করে চেনে। গাঢ় কোন বিষাদময় ভাবনাকালেই কেবল ওকে এমন সমাহিত দেখাতে পারে। কামরুল পরম মমতায় সাহানার হাতদুটো ধরে, চোখে চোখ রাখে।

সাহানাকে আরো বিষন্ন দেখায়। আপনমনে ও বলতে থাকে, “জানো কামরুল আমার না ইদানিং প্রীতের স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে না। কোন ইমপ্রুভমেন্ট নাই Ñএকই কথা শুনতে আর ভালো লাগে না।”

কামরুল কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। খানিকটা অপ্রস্তুত স্বরে বলে বসে, “সমস্যা নেই কোন, আমি প্রীতকে স্কুলে দিয়ে আসবো না হয়। ”

সাহানা খানিক চোখ কুঁচকে কামরুলকে দেখে নেয়। আরো শান্ত গলায় বলতে থাকে, “আমি রোজকার কথা বলছি না কামরুল, আমার প্রীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বসলে অসহায় লাগে। ও রোজকার কাজ নিজে করতে চেষ্টা করে প্রাণপণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখনো ও রাতে বিছানা ভেজায়, মজনু বা আমরা কেউ পাশে না থাকলে অজ্ঞান হয়ে নিয়মিত হাত-পা কাটে, কারো উপর রাগ করলে বেহুশ হয়ে মারতে থাকে।”

“আমি মানি তা, কিন্তু সাধ্যমতো দেশে, দেশের বাইরে আমরা ওর চিকিৎসা করিয়েছি। ষোলটা বছর, ষোলটা বছর পরীক্ষার পরে আমরা জানতে পেরেছি ওটা ওর ক্রোমজমাল ক্রুটি, যেটা সারানোই সম্ভব না। সানু প্রীতের অযতœ হতে পারে দেখে আমরা আর কোন সন্তান পর্যন্ত নেইনি। আর কী করতে পারতাম আমরা?” কামরুলকেও ক্লান্ত দেখায় এবার।

“হুঁ, আসলে আমি মনে হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি সোনা। প্রীত কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো ওর প্রতি টানের সঙ্গে ইদানীং মনে হয় আমি বা আমরা ওকে করুণাও করছি। ”

“সানু তোমার মাথা তো ঠিক আছে? করুণা করছি মানেটা কি? ওর আমাদেরকে প্রয়োজন আর আমরা তাই ওর সঙ্গে ছায়ার মতো আছি।”

“Exactly, listen to yourself darling. Preet needs us or we needed him that’s why we brought him to this world? দেখ ভাষ্যগুলো কীভাবে বদলায়। এই বদলগুলোকেই আমি করুণা বলছিলাম। ”

ওয়েটার খাবার টেবিলে দিতে দিতেই প্রীত আর মজনু হাজির। মজনু আর প্রীতের স্যুপ বেশ পছন্দ। ওরা দুজনেই হুড়মুড় করে ওটার উপর পড়ে। মজনু যতœ করে প্রীতের ন্যাপকিন গলায় গুঁজে দেয়, আর নিজের জিভ পুড়িয়ে প্রীতকে সতর্ক করে। “ভাইয়া স্যুপ কিন্তু গরম কলাম। তোমার জিভ পোড়বেয়ানে, ফুঁ দিয়ে দিয়ে খাও।” ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাহানা আর কামরুলের খানিক মুড বদল হয়, দুজনেই হাসতে থাকে।

পরদিন সকালে ছুটির দিন বলেই সাহানা ছাদে নাস্তার বন্দোবস্ত করে। কামরুল আর সাহানার ভীষণ প্রিয় বাড়ির এ অংশটা। সাহানা পৈতৃক সূত্রে গুলশানে এই জমিটুকু পায়। সাহানা আর কামরুল দীর্ঘদিন দেশের বাইরে স্থপতি হিসেবে কাজ করে দেশে ফিরতেই চেয়েছিল। প্রীতের চিকিৎসার কারণে কিছু দিন অপেক্ষা করে ওরা। কোন রকম আশার আলো দেখতে না পেয়ে সাহানা দেশে ফেরবার সিদ্ধান্ত নেয়। পাকাপোক্ত দেশে আসবার আগে কামরুল আর সাহানা এই বাড়ি বানিয়েছে, ডিজাইন থেকে নির্মাণ তদারকি সকল কিছু ওরা পালাক্রমে সামলেছে - দু’জায়গায় দু’সংসারও। এই একতলা বাড়িতে সবকিছু ডিজাইন করা হয়েছে প্রীতের কথা ভেবে, এমনকি বাগান আর সুইমিংপুলটাও।

সম্বন্ধ

ছুটির দিন বলেই সাহানা ছাদে নাস্তার বন্দোবস্ত করে। কামরুল আর সাহানার ভীষণ প্রিয় বাড়ির এ অংশটা। সাহানা পৈত্রিক সূত্রে গুলশানে এই জমিটুকু পায়। সাহানা আর কামরুল দীর্ঘদিন দেশের বাইরে স্থপতি হিসেবে কাজ করে দেশে ফিরতেই চেয়েছিল। প্রীতের চিকিৎসার কারণে কিছু দিন অপেক্ষা করে ওরা। কোন রকম আশার আলো দেখতে না পেয়ে সাহানা দেশে ফিরবার সিদ্ধান্ত নেয়। পাকাপোক্ত দেশে আসবার আগে কামরুল আর সাহানা এই বাড়ি বানিয়েছে , ডিজাইন থেকে নির্মাণ তদারকি সকল কিছু ওরা পালাক্রমে সামলেছে - দু’জায়গায় দু’সংসারও। এই একতলা বাড়িতে সবকিছু ডিজাইন করা হয়েছে প্রীতের কথা ভেবে, এমনকি বাগান আর সুইমিংপুলটাও।

খাবার পরে মজনু আর প্রীত বাগানে ঘুরতে থাকে। কামরুল পেপার পড়তে পড়তে সাহানাকে ওর বড় ননদের খবর জানায়। “বড় বুজি তোমাকে ফোন করতে বলেছে।”

সাহানা প্রীতের দিকে তাকিয়ে ছিল, “আচ্ছা” বলে সেদিকেই চেয়ে থাকে।

“বুজি আজকাল ঘন ঘন ফোন করছে, খুবই সন্দেহজনক। আবার কার পরোপকারে নেমেছেন?”

“প্রীতের।”

“মানে?”

“মানে বুজি প্রীতের জন্য মেয়ে দেখেছেন। ওদের অবস্থা ভয়াবহ। একে তো বাবা-মা বাচ্চাগুলোকে খেতে দিতে পারে না, তার পরে এই মেয়েকে সমানে ছেলেরা উত্ত্যক্ত করছে। মেয়ের বাবা-মা সব জেনেশুনেই রাজি হয়েছেন। ”

“রাজি হয়েছে মানেটা কি? তুমি বুজির কথা শুনে চুপচাপ থাকলে?”

“আমি ভাবছি।”

“তোমার কী মাথা খারাপ হয়েছে? ভাবছ মানেটা কী?”

“ভাবছি মেয়েটাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসবো।” সাহানা এক দৃষ্টিতে প্রীতের দিকে চেয়ে থাকে।

মনোয়ারা
মনোয়ারা এ বাড়িতে ওর পদমর্যাদা নিয়ে খানিকটা বিচলিত। অথচ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার কথাও ভাবতে পারছে না। বাড়ি থেকে সবাই বলেছে ওর বিয়ে দেয়া হয়েছে। ওর নিজের কাপড়, গয়না দেখেও নিজের মনে হয়েছে বিয়েই হয়েছে। মজনু ওকে সবার সামনে ‘মনু আপা’ ডাকলেও, আড়ালে ভাবি বলে খেপায়। কিন্তু সানু মামানি কোন রকম শাশুড়ির মতো আচরণ করছেন না। মনোয়ারাকে প্রীতের সঙ্গেও থাকতে হচ্ছে না। মনোয়ারা এই প্রথম নিজের কামরায়, নিজের বিছানায় অসংখ্য নরম পুতুলের মধ্যে শুয়ে থাকতে থাকতে রাজ্যের কথা ভাবতে থাকে। ভাবনায় সানু মামানি, প্রীতের বাবা, প্রীত, মজনু, বেলতলি গ্রাম, বেলতলি স্কুল, মা, আব্বা, ভাই নশু, বোন মশু, খালেদা, কুঁজোবুড়ি আসা-যাওয়া করে - নরম খাটে নাক ডেকে ঘুমায় ও।

গালে হাতের স্পর্শ পেয়ে ধড়মড় করে ওঠে মনোয়ারা। খাটের পাশে প্রীতকে দেখে চমকে ওঠে ও। প্রীতও মনোয়ারাকে জাগতে দেখে খানিক ইতস্তত বোধ করে। মনোয়ারাকে ছুঁয়ে দেখলেও জাগাতে একেবারেই চায়নি ও। মনোয়ারার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় প্রীত, “আমি প্রীত, খেলবে আমার সাথে?” মনোয়ারা হাতটা ধরতেও ভুলে যায়, ভ্যালভ্যালে চোখে তাকিয়ে থাকে।

“প্রীত বাবা কতোবার বলেছি কারো ঘরে ঢুকতে হলে নক করতে হয়। সরি মামনি প্রীত তোমাকে জাগিয়ে দিয়েছে।” সাহানা বিব্রত স্বরে কথাগুলো বলতে থাকে।

“মা আমি নক্ করেছি। ওর দরজা খোলা ছিল তাও নক করেছি।” প্রীত কাতর স্বরে ওর মাকে বোঝাতে থাকে। মনোয়ারা মা-ছেলের দিকে চেয়ে থাকে।

কিছুদিনের মধ্যেই মনোয়ারা নিজের আগ্রহে এবং সাহানার উদ্যোগে বাড়ির কেতা তথা ভদ্দরলোকেদের ভাষাটাও রপ্ত করে ফেলে। সাহানা ওকে নিজে ক’দিন পড়িয়ে ক্লাস এইটে ভর্তি করিয়ে দেয়। পড়া, তো নতুন বন্ধুরা, সাহানা-কামরুলের স্নেহ, বাড়ির বাতাবরনে ক্রমশ বুঁদ হতে থাকে মনোয়ারা ওরফে মনু। প্রীতের সঙ্গে খেলে সময় পেলে, মজনুর সাথে সাথে ওর দেখভাল করে। মজনুর সঙ্গে ওর ভীষণ ভাব - বাড়ির কথা মনে হলে ওর সঙ্গে গপ্পো করে। কিন্তু মজনুর স্বরে আজকাল কিছু ভাজ থাকে, সেটা টের পায় মনোয়ারা।

প্রেম - প্রীত, মনোয়ারা আর মজনু
সেদিনকার কথাই ধরা যাক, প্রীতকে গোসল দিতে দিতে মজনু বলছিল, “আমার চাকরির দিন তো শেষ হইয়ে আসল বুইলে, তোমার ভাতার তুমি এহন থেইকে সামলাও। আমি কিডা এসবের মধ্যি।” তো আরেকদিন ঠাট্টা করেই বলল, “ভাবি এরেই কয় কপাল। তুমি আমি দুইজনেই কপালপোড়া। দুইজনেই বেলতলির। আমাগে মিল কিন্তু ম্যালা। দুই জনরেই কিন্তুক ম্যালা আশা দিয়ে আনিছে কাকা, কাকী। কও কিসের জন্যি?” মনোয়ারা কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করে, “কিসের জন্য?” মজনু মনোয়ারার প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হয়, “কিসের জন্যি আবার, প্রীত ভাইয়ার খেদমতের জন্যি।” মনোয়ারা সেটা শুনে হাসে। “তয় অমিল আমাগের আছে। দেখ ভাবিজান তুমি বিয়েটা কইরে এক ধাক্কায় মইয়ের আগায় - আমার মনিব। আর আমারে সাপে কাটতি কাটতি শেষ কইরে দেল - মুতের কাথা ধুতি ধুতি জীবন যাবে। কপাল খারাপ না হলি নাইলে মনোয়ারা বেগম তোমার মতো কাউরে বিয়ে করতাম।” কথাটা বলে মজনু দ্রুত বেরিয়ে যায়। মনোয়ারা মজনুর কথায় হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে।

প্রীতের ইদানীং স্কুলে আর ভালো লাগে না। ওর বরং মনুর সঙ্গে থাকতে বেশী ভাল লাগে। প্রীত ক্লাসে ছবি আঁকা আর কাঠের কাজ শিখেছে। তো ক্লাসে ইদানীং সে কাঠের পুতুল বানাতে চেষ্টা করে। ওর মনযোগ দেখে শেফালী মিস জিজ্ঞেস করেই বসে, “কী বানাচ্ছো প্রীত?” প্রীত কাজ করতে করতেই উত্তর দেয়, “মনুর জন্য পুতুল বানাই। ”

প্রীত পুতুল বানানো শেষ হলে বাড়ি ফিরে মনোয়ারাকে দেয় সেটা। পুতুলটা ভীষণ পছন্দ হয় মনোয়ারার। মনোয়ারার খুশি দেখে প্রীতের চোখ ছল্ছল্ করে। ও দ্বিগুণ খুশিতে মনোয়ারাকে শক্ত করে জাপটে ধরে চুমু খায়। মনোয়ারার হতচকিত লাগে। প্রীত খুশিতে মনোয়ারার সারা গালে, চোখের পাতায়, নাকে চুমু খায়। বেখেয়ালে মনোয়ারার ঠোঁটেও চুমু দেয় ও। প্রীতের এবার পাগলপারা লাগতে থাকে - চুমু প্রলম্বিত হয় - আরো শক্ত করে মনোয়ারাকে জড়িয়ে ধরে প্রীত। মনোয়ারার হাঁসফাস লাগে - দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। ও আর্তচিৎকার দেয়, “মামানি!” চিৎকার শুনে ভয়ে প্রীত মনোয়ারার কাঁধে কামড় বসায়।

মনোয়ারার চিৎকার শুনে ছুটে আসে সাহানা। মনোয়ারার ত্রস্ত চেহারা, কাঁধে নীলচে দাগ, অবিন্যস্ত বেশ দেখে সাহানা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সাহানার বুকে ওর আদরের মনু কাঁপতে থাকে, কাঁদতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রীত বিমূঢ় হয়ে বসে থাকে। এই প্রথমবার প্রীতের মাকে এমনকি মনুকেও অনেক দূরের মানুষ মনে হতে থাকে। ও কাঁপতে থাকে - কামনায়, প্রত্যাখ্যানে, বিস্ময়ে , বিমূঢ়তায়, হতাশায় - সবার অলক্ষে। ওর চোখের কোনায় কান্না জমতে থাকে - মা আর মনুর চেহারা অস্পষ্ট হতে থাকে। ওর পাকস্থলী উলটে আসতে চায় - প্রীত জ্ঞান হারায়, ঠোঁটের কোনা দিয়ে গাদ বেরোতে থাকে।

প্রীতকে ঐ ঘটনার পরে প্রায় এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়। হুইল চেয়ারে করে বাড়ি ফেরে ও। ডাক্তারের মতে ট্রমায় প্রীতের একাংশ প্যারালাইজ হয়ে গেছে। কথাও বলে খুব কম। সাহানা প্রীতের এই অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী করে, ভিতরে পুড়তে থাকে। কামরুল সেটাও করতে পারে না, গৌতমের নির্লিপ্তি নিয়ে অবিচল থাকতে চেষ্টা করে। মজনু এক মনে প্রীতের সেবা করে যায়। মনোয়ারা পড়ায় মন দিতে চেষ্টা করে। প্রীতের জন্য ভীষণ টান লাগে ওর, ভার লাগে। কেন লাগে তার কূল-কিনারা করে উঠতে পারে না। আবার ভীষণ ভয় লাগে কাছে যেতে। সারা বাড়িজুড়ে গাঢ় বিষাদ আর নিশ্চুপতা ভর করেছে। এতোগুলো মানুষ যার যার মতো নিজ নিজ ভার সমেত বাক্সবন্দি হয়ে আছে - সান্ত্বনা দেবার কেউ নাই, আসলে ভেবে দেখলে সান্ত্বনা পাবারো কিছু বাকি নাই।

প্রীতের দেখভালের জন্য সাহানা কাজ বাড়ি বসেই করে। প্রীতের খাওয়া-দাওয়া, পায়খানা-পেচ্ছাব সবই সাহানা আর মজনু সাপেক্ষে। মনোয়ারা প্রায়ই ওদের কাজে হাত লাগায়। প্রীতের সেটা ভাল লাগে না কিন্তু বলতেও পারে না কিছু। মনোয়ারা আর মজনু প্রীতের কারণেই আরো ঘনিষ্ঠ হয়। প্রীতের প্রতি ওদের টান, বন্ধুহীনতা ওদের একই সমতটে নিয়ে আসে। প্রীতকে বিকেলে দুজনে বাগানে ঘোরাতে নিয়ে যায়, কখনো বা পুলের ধারে বসে ওরা গল্প করে, তিনটিতে মিলে আকাশ দেখে। প্রীতের ওদের দুজনকে পাশে দেখতে ভাল লাগে।

সেদিন প্রীতের খানিক জ্বর এসেছিল। সারাদিন সেবা করে ক্লান্ত হয়ে সাহানা ঘুমিয়ে পড়ে। মজনু ক্লান্ত থাকায় মনোয়ারা রাতে প্রীতকে দেখভালের দায়িত্ব নেয়। ঘুমন্ত প্রীতের চুলে, কপালে, গালে এই প্রথম মনোয়ারা হাত বুলায়। ঘুমের মধ্যেই মনোয়ারার হাতটা বুকে নিয়ে পরম প্রশান্তিতে ঘুমায় প্রীত। মাঝরাতে প্রীতের ভীষণ পানির তেষ্টা পায়। মজনুকে ডাকতে যাবে এমন সময়ে খসখস আওয়াজ কানে আসে প্রীতের, আর আধো আধো কথা। মেঝেতে তাকাতেই ডিমলাইটের আলোতে কিছূ নড়তে দেখে। মেঝেতে মনু শোয়া। ওর চোখ আধবোজা, আর ভীষণ সুন্দর করে হাসছে, ওর ওপরে মজনুর নগ্ন শরীর। তেমন কিছু বুঝতে পারে না প্রীত, কিন্তু ভীষণ আজব লাগে ওর। একবার ওর মনে হয় মনু কষ্ট পাচ্ছে, ওদের ডাক দিক। কিন্তু পরক্ষণে মনুর হাসির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে পাগল পাগল লাগতে থাকে - সেই পুরানো কামনা, প্রত্যাখ্যান সাপের মতো পেচিয়ে ধরে প্রীতকে। ভীষণ অভিমানে ঘুমিয়ে পড়ে ও, চোখের কোনে দু’ফোঁটা কান্না লেগে থাকে।

সায়াহ্নে প্রীতের আরেক সকাল
আজ প্রাণ ভরে সূর্যের আলো গায়ে মাখবার দিন। ভীষণ চনমনে রোদে প্রীতের নাচতে ইচ্ছা করে। ওর ভীষণ ইচ্ছে করে পুলের স্বচ্ছ নীল আর নীল আকাশকে এক করে দিয়ে, সেই অসীম নীলে ভাসতেই থাকে - মাছের মতো আবার পাখির মতো। এই প্রথম ও মাছ হতে হতে ঝাপ দেয়, তারপর পাখির মতো উড়াল দেয়। উড়তে উড়তে ও বাড়ির বাগান দেখতে পায়, মা, বাবা, মনু, মজনুকে খুব ছোট দেখায়। ও আরো দূরে যেতে চায়, আরো দূরে। উড়তেই থাকে প্রীত আজ - সাত আসমান পার করে ওর জিরোতে ইচ্ছা করে - এবার ও তারা হয় - প্রীত পরায়া।
=============================


bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ সিউতি সবুর


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার শাহাদাত

দু’পক্ষের ঝগড়া তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলামটরের মোড়ে যখন কিনা সেখানে রাস্তা পারাপারের জন্যে আটকে পড়া লোক জনের ভিড় জমে যায় কেননা দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সোনারগাঁ হোটেলের দিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে যাওয়ার জন্য তের মিনিট একতিরিশ সেকেন্ড দাঁড় করিয়ে রাখে এবং তারই ফলে তখন সেই ভিড় জমে যদিও সেই ভিড়ের কোনো আগ্রহ থাকে না পুষ্পধাম নামক দোকানের সামনে বাংলা মটরের কোনো এক কোনায় একজন কলা ও আপেল বিক্রেতার ভিন্নমত, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, এমনকি যাকে ঝগড়াও বলা যেতে পারে তার প্রতি এবং সেই ঝগড়া বা বিবাদ বা যাই বলা হোকনা কেন তা চলা কালে অর্থাৎ ঝগড়া চলা কালে যখন কিনা কলা আপেলকে বলে : ‘আরে বেডা বড় কতা কয়, তোমারে চিনি না, চিনমু না কেয়া?’ কি কথার প্রসঙ্গে কলাওয়ালা ওই কথা বলে। তা খুব স্পষ্ট নয় তবে কলার ওই ক্ষোভমিশ্রিত কথার উত্তরে আপেলও অনুরূপ চড়া গলায় আবার প্রশ্ন করে, কি চেনো আহ্ ? কি চেনো ? কলা এবার তার প্রতি-উত্তরে বলে তুমি ক্যালা বেচ্তা, ক্যালা; কলাওয়ালা একথাটা বলবার পর এক সেকেন্ডের পচিশ ভাগের সাত ভাগ সময় বিরতি নেয় বা তার কথা বলার যথা ভঙ্গীতে ওইরকম যৎসামান্য সময় বিরতি পড়ে এবং তারপর বলে, ক্যালার মুহে আবার বড় কতা! কলাওয়ালার ওই কথায় তখন বোঝা যায় ‘ক্যালা বেচ্তা’ তথ্য আপেলের আভিজাত্যে ও উচ্চ শ্রেণিতে সামান্য হলেও সম্ভবত, হয়তো সম্ভবতই অথবা সত্যই আঘাত করে, আরো বোঝা যায় যে সেই আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় শ্রাবণ মাসের উচ্চ জলীয়বাষ্প সমেত গরমে যে গরম কিনা সল্প জলীয়বাষ্পের মরু অঞ্চলের কোনো জ্যাকুয্যি নির্মিত সুইমিং পুলের মধ্যে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট বুদবুদ থেকে সরবরাহকৃত হট স্টিমে ভিজে যাওয়ার মতো ঘাম আপেলওয়ালার গলা, গাল ও কপালে জমে যায় মনে হয়, রাগে, ক্ষোভে যে উপসর্গই হোক তা সত্ত্বেও ভলতেয়ার তত্ত্ব অর্থাৎ এখানে মত প্রকাশের অধিকার তত্ত্ব সক্রিয় থাকে, আপেল সেই জ্যাকুয্যির হট স্টিমের মতো ঘাম নিয়ে প্রতিউত্তর করে, কোথায় কি আর কোথায় কি? কলা সম্ভবত এ কথার গূঢ়ার্থ ধরতে পারে না সেরকম বুঝতে পেরে আপেল আবারও তার সাড়া গায়ে সেই ঘাম নিয়ে আরো পরিষ্কার করে বলে কোথায় রাজ-রানী আর ‘কোথায় বুড়া-চুতমারানি?’ এখন এই পরিষ্কার ইঙ্গিত কলার কাছে স্পষ্ট হয় এবং সে তার উত্তরে এবারে বলে, আরে মেয়া ক্যালা; হ্যাও আবার বীচিকেলা, আইট্যা কেলা, আইট্যা কলাওয়ালার সাধ্যমত তার ভাষা প্রয়োগের সকল মেধাই ব্যবহার করা হয় তা বোঝা যায়, এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দেখলে স্বভাবতই আরো বোঝা যায় যে আপেল আহত হয় ওই বিচি সহ কলা বিক্রির কথা উল্লেখ করায় যা কিনা তার কাছে হয়তো অপবাদ অথবা অপমানের কিংবা অমর্যাদার বা এইরকমই কিছু। অথচ বিবাদ ও প্রকাশভঙ্গীর এইজাতীয় তথ্যভিত্তিক ভাষ্য বিনিময়ের মধ্যে আপেলওয়ালার কলাবিষয়ক কোনো এক অতীত সম্পর্ক অস্বীকারের ঘটনা ঘটে যার ফলে তার জীবনে একটি সত্য তথ্যের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ইতিহাস বিচ্ছিন্নতা তৈরী হয়, যা অবশ্য মাক্রীয় তাত্ত্বিক বিশ্লেষনে একটা সমষ্টিগত ব্যাখ্যা দাঁড় করানো গেলে তা যেতেই পারে কিন্তু তা ঘটনা বর্ণনায় অত জরুরি নয় বিধায় একথা বলা যায় যে আপেলওয়ালার এই যে ইতিহাস ও সত্য বিচ্ছিন্নতা হয়তো তা ‘সুশীল’ সমাজের চোখে কিনা ‘তাত্ত্বিক’; অবশ্য তা শুধু শুশীল সমাজের কাছে কেনো সমাজের ‘চোখ নাই’র কাছেও তা ‘তাত্ত্বিক’ হতেও পারে আবার নাও হতে পারে, সেসব বাদ দিলে যা উপরন্তু বোঝা যায় তা হলো যে ওই সব ‘তত্ত্বে’ আপেলওয়ালারা চলে না, অতএব সে হয়তো এই ধরনের অপবাদ শুনে ভেতরে আরো ক্ষুব্দ হয়, শ্রাবণের ঘাম আরো তাকে ভিজিয়ে ফেলে, পাশে রাখা সিলভারের ঘটির পানিতে হাত ডুবিয়ে সে হাত তুলে আনে, সম্ভবত কর্তব্য ও অভ্যাসবশতই সেই আঙ্গুলে লাগা পানি আপেলের উপরে ছড়ায়, এরপর হাত দিয়ে তার ওই ভেজা দু’গাল ও কপালের ঘাম মোছে, তাতে হাত ও আঙ্গুলগুলো আবারও ভিজে যায় ঘামে যেমনটি সিলভার ঘটিতে রাখা পানিতে তার আঙ্গুলগুলো ভিজেছিল, এবারে ঘামে ভেজা সেই আঙ্গুল হতে আগের বারের মতোই আপেলের উপর ছিটায়, আপেল ভিজে যায়, ভিজে যায় জলে ও ঘামে, ঘামে ও জলে।
শ্রেণিবৈষম্য তখনো দু’পক্ষের মধ্যে সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়নি বলেই ধরে নেয়া হচ্ছে; যখন কিনা আপেল ওয়ালা তার ভাদ্র মাসের কপালের ঘাম নির্দেশনা আঙ্গুলে কুড়িয়ে এনে বুড়ো আঙ্গুল সহযোগিতায় ঘামজলবিন্দু ছটায় ছড়ায় আপেলের উপর। কিন্তু শ্রেণিবৈষম্যের প্রকৃত তথ্য ও ঘটনা কিভাবে তত্ত্বের আওতাভুক্ত ও কার্যকরী হয়ে ওঠে সেটা জানা হয়তো জটিল বা খুব জটিল নয়। কলা ও আপেলওয়ালা তাদের এই কথিত বাণিজ্য পসার নিয়ে বসে নিউ ইস্কাটন থেকে আসা রাস্তাটির যে দিকে আমেরিকান কোনো শহর কি কোনো ব্যক্তির কি কোনো ইউনিভার্সিটির নামে নাম বিশ্ববিদ্যালয় ভবন নির্মিত হচ্ছে তার উল্টোদিকের কোনায়, তাকে প্রকৃত অর্থে ফুটপাত বলা যায়না কিন্তু তারপরও তা ফুটপাতই, ফুটপাত ছাড়া বলবার আর কিছু নাই, সেই ফুটপাতে তারা বসা অর্থাৎ কলাওয়ালা ও আপেলওয়ালা, তারা মুখোমুখি দিক করে একে অপরের বিপরীতে, ওভাবে বসবার ফলে তাদের মাঝখানে যতটুকু ফাকা থাকে সেইটুকু ফাকার মধ্যে দিয়ে একজন পথিকের হাঁটবার সুযোগ থাকে কিন্তু সেতো কেবল একটি সত্য কথা কিন্তু বাস্তবে সংখ্যায় সব মিলিয়ে কত যে জন হাঁটে তার কোনো ইয়ত্তা থাকে না, এতসব আদম-সুমার আমাদের অর্থাৎ বাঙ্গালীদের অর্থাৎ বাংলাদেশীদের পোষায় না যে সবকিছুতে জরিপ করতে হবে এবং একটি সংখ্য নিয়ে কষাকষি করতে হবে; কলা বিক্রেতার সামনে তিন ধরনের কলা - শাগর কলা, শবরী কলা, বীচি কলা; বীচিকলাই বা আজকাল এই ঢাকার শহরে কেনো, কে বা কারাই তা খায় ইত্যাদি, তারপরও হয়তো বাণিজ্যিক নিয়মেই বিচিকলার অস্তিত্ব ও বাজারজাত, এরপর থাকে শবরী কলা। শবরী কলার পারিমান শাগর কলার পরিমানের চেয়ে কম, আর শাগর কলা সব মিলিয়ে পৌনে পাঁচ ফালা, হালির হিসাবে উনিশ হালির মতো হবে, শবরী কলা সাড়ে ছয় হালি, আর বীচিকলার পরিমাণ বা সংখ্যা এখানে কোনো ব্যাপার নয়। কলাওয়ালার লুঙ্গি কুচকানো, দলামোচা করে অন্ডকোষের দিকে গুটিয়ে ঠেলে রাখা হয়েছে, গায়ে পায়ে সর্বত্র ভাদ্র মাসের জলীয়বাস্প, ঘাম, কোনো রকম জুতা-স্যান্ডেল বা স্পঞ্জ ছাড়া দু’পায়ের উপর আলগা বসা, বাম হাত হাটুর উপর দিয়ে ঝুলে থাকা, ডান হাত কারণ ছাড়া কলা থেকে কলান্তরে স্পর্শ করতে থাকে বাতিকের মতো; আর আপেলওয়ালার সঙ্গে এর ফাকে ওই বাক-বিতন্ডা হতে থাকে যদি তাকে বাকবিতন্ডা বলা যায়। সেই বাকবিতন্ডা কি কারণে কি দিয়ে শুরু হয় তা জানা যায় না, জানার দরকারও পড়েনা; কলাগুলো বিছানো একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম ও শেষ পাতার উপরে অর্থাৎ ডাবল ডিমাই সাইজের কাগজটা ওই অর্থে উপুর করা, যেখানে প্রথম পাতায় ব্যানার হেডিংএ বাণীর মতো যা ছাপা হয়েছে তার বিষয় ‘বিশাল গণতন্ত্র ও সুশীল সমাজ’ সংশ্লিষ্ট, ওই বানীপ্রধান শিরোনামের ঠিক নিচে ডান দিকে আট ইঞ্চি ছয় ইঞ্চি মাপ সমান একটি ছবিতে একজনকে অথবা কয়েকজনকে দেখা যায়, যদিও সেই ছবিতে থাকা লোক কি লোকদের মুখ দেখা যায়না, একটি সামান্য বীচিকলার কারণে সেই মুখ ঢাকা পড়েছে বা এভাবেও বলা যায় বীচিকলা সেই মুখ ঢেকে দিয়েছে কিন্তু ছবিতে ঢেকে যাওয়া মুখ ও মুখেদের পরিধানের জামাটা দেখা যায়, সে স্পষ্টই দেখা যায়, জামাটার রং সে যাই হোক তা ঘন ও গার রঙ্গের, এবং অবশ্যই তা মরা গরুর চামড়ার মতো মোটা কাপড়ের উপরে সেই রং দেয়া ঘন বর্ষা-বৃক্ষরাজী ধরনের ছাপার জামা, সে ছাপার রং ছাতন গাছের নতুন পাতা ও তার কান্ড তখন যে রং ধরে সেই রঙের মতন, বিভিন্ন দেশে এমনকি যথা গণতান্ত্রিক দেশসমূহ আমেরিকা, বৃটেন, ভারত, ফ্রান্স কি জার্মানের সৈন্য সামন্তরাও ওই রঙেরই পোষাক পড়ে থাকে যেমন সেইসব নিয়ে যে কোনো দেশের মাঝারির চেয়ে একটু নিচের গল্পকার বা কবি বলেন ‘গনতন্ত্রের সেই পোষাক সেই পোষাকের গণতন্ত্র‘ তাতে অবশ্য কোনো দোষ থাকেনা পোষাক ও গনতন্ত্র একসঙ্গেই যায় বা গণতন্ত্র ও পোষাকে প্রায় সর্বদা সমান্তরাল। তো ওই বর্ষা বৃক্ষরাজি তুল্য ছবি সুশীল সমাজের সংবাদপত্রে আসে অর্থৎ ছাপা হয়, সেই সংবাদপত্রের সেই অংশটুকুই কিনা অর্থাৎ ছবিখানার উপরভাগ কলা ঘরানার অবহেলিত গ্রামীন দরিদ্র লোকের কলা বলে পরিচিত সেই বীচি-কলাই সক্ষম হয়, সক্ষম হয় ওইসব পোষাকের বদন কি তোক্মা কি থোত্মা খানা ঢেকে দিতে, যদিও এই তিন ধরনের কলা বিক্রেতার নগদের শ্রেনী-শত্র“ আপেলওয়ালার অবস্থা মোটেই খারাপ বলা যাবে না কলার তুলনায় বরং ধনতন্ত্র, অসাম্যবাদ, অসমাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ জাতীয় যতসব বিপ্লবী ও বিপ্লবী-প্রতি ধারণাসমূহ আছে তা এখানে খুবই স্পষ্ট, সঙ্গে কৌলিন্য চর্চাতো আছেই, যেমন তার অর্থাৎ আপেলওয়ালার পরনের লুঙ্গি দু’হাঁটুর বাটি পর্যন্ত প্রায় ঢাকা-ঢাকা অবস্থা আছে যা কিনা ব্যাখা করলে দাঁড়ায় যে তা আভিজাত্যেরই অংশ হিসাবে অর্থাৎ লুঙ্গি জাতে উঠছে কি উঠতে চাচ্ছে, কলাওয়ালার মতো তা অন্ডকোষ কেন্দ্রিক না হয়ে হাঁটু ও নলার কেন্দ্রিক এবং যা কিনা একদিন হয়তো পাজামা প্যান্টের দিকে যাবে ধনতন্ত্রের অতি সাধারণ নিয়মে, আপেলওয়ালার গায়ের গেঞ্জি খানা ছত্রাকের ফলে নতুন এক ভিন্ন রং ধরলেও কোনো এক কালে সে যে সাদা ছিল তা যে কোনো অনুসন্ধানী চোখ সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে, সে আলগা পায়ে বসা নয়, পাছার নিচে প্লাস্টিকের জল-চৌকি, অটোবির পাশের রাস্তা থেকে কেনা, দুটো ছোট্র শাজিতে গোটা ক’য়েক করে আপেল সাজানো, একটার রং জাতে লালচে ও অপরটি সবুজাভ, সবুজ জাতের আপেলের পাশে তিনটে নাশপাতি, সেগুলো তুলনায় দেশী ডালিমের চাইতে বেশ বড় রাওয়ালপিন্ডি থেকে করাচী হয়ে এসেছে চোরাচালান নিয়মে ভারতের উপর দিয়ে র‌্যাবি ট্যাগোরের শহরের হয়ে, এছাড়া বেচা-কেনার টাকা রাখবার জন্য আপেলের মানিব্যাগ আছে তা চামড়ার নয় রেক্সিনের, আর কলার টাকা রাখা হয় সেই দলামোচা করে রাখা লুঙ্গির কোচায়। এই হচ্ছে কলা ও আপেলের মধ্যে দৃশ্যত কি অদৃশ্যত প্রাতিষ্ঠানিক তফাৎ যাকে কিনা এস্টাবলিশমেন্টের তফাৎ বলা হলে তা অধিকতর উপোযোগী ধরা হবে রাজনৈতিক পরিভাষায়। পুরোনো কালের মার্ক্সীয় কি একালের গ্রীনস্প্যানীয় সে যে মতেই হিসাব করা হোকনা কেনো এই বাণিজ্যে কলাওয়ালার মূলধন ডলারের হিসাবে এক ডলার ছিয়ানব্বুই সেন্টস্ আর আপেলওয়ালার সর্বমোট মূলধনের পরিমাণ প্রায় ছয় ডলার সাইতিরিশ সেন্টস্ যখন কিনা প্রতি ডলারের সরকার নির্ধারিত মূল্য সত্তুর টাকা সত্তুর পয়সা, এ ছাড়াও আপেলের দুটো শাজি ও সেই শাজিতে কাগজ কাটা থেকে উৎপাদিত খড় ও রেক্সিনের মানিব্যাগ তা বিক্রি-বাট্টার টাকা রাখার জন্য যা কলাওয়ালার নাই এমনকি পুরোনো কাপড়ে বানানো খুতিও না। সম্পত্তি ও মূলধনের এই ব্যবধানের কারনেই এখানে ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার উপসর্গ হয়তো শক্তভাবেই প্রতিফলিত হয়, যা এই রকম : কলার ভেতরে প্রলেতারিয়ানের অনুভূতি ও ক্ষোভ, হয়তো কোনো একদিন তা ওই আপেলের দিকেই যেতে উদগ্রীব, আর আপেলের ভেতরে কলার তুলনায় অধিক অর্থ ও আভিজাত্যের কারণে ভেতরে ভ্রণ হয় এক অহমবোধ জন্ম নেবার ।
এক পর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশের বাঁশিতে ফু’ পড়ে সবুজ বাত্তির ইঙ্গিত হিসেবে যদিও এর আগে কমছে কম ষোলোবার কি কিছু বেশিবার কি কিছু কমবার ওই রকম বাত্তি জ্বলেছে নিভেছে, পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু তাতে পথচারীরা পারাপারের কোনো অধিকার পায়নি যতক্ষণে না পুলিশ তার বাঁশিতে ফু’দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যে এই হলো পথচারী পারাপারের সবুজ সংকেত, তখন পারাপারি পথচারীদের পেছনে পড়ে থাকে কলা ও আপেলের শ্রেণীবৈষম্য ও দ্বন্দ্ব বা তাকে অন্য ভাষায় যা কিছুই বলা হোক না কেন।
===========================

bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ আনোয়ার শাহাদাত

এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না বললেও চলত by মানস চৌধুরী

পরপর ইমেইলগুলো আসতে থাকে।

অনেকগুলো। কিংবা অনেকগুলো নয়, কয়েকটাই মাত্র। কিন্তু পুনঃপৌণিকতায় কিংবা অন্যকিছুতে আমার অনেকগুলো মনে হয়। ইমেইলগুলো আমার নিরাসক্ত লাগে, এমনকি অমিশ্রিত, ডিসএনগেইজড। তবু প্রায় ভৌতিকভাবে সবগুলোতে একই জিজ্ঞাসা: ‘কবে ফিরছ?’ পয়লাতে আমি আসলে ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি ফেরা নিয়ে। বলি কেন আমি ফিরি না, বা কেন ফিরবার জন্য ন্যূনতম শর্তগুলো আমি মেটাতে ব্যর্থ। আমার মনে পড়ে, আমি খুব দ্রুত বিদ্যাবিদ হয়ে যাই। এবং মুখে মাপা হাসি ধরে রেখে আমি লিখে চলি, ফিরবার জন্য অন্ততঃ দুটো, বা এর যে কোনো একটা, অভিলক্ষ্য লাগে। যেমন ধরা যাক, মানুষে ফেরেন ডিফিনিট সম্পত্তিরাজিতে; কিংবা মানুষে ফেরেন ডিফাইন্ড সম্পর্কমালাতে। আমি এসব শর্ত মেটাই না। আমি ফিরি না। আমি যাই। যাওয়া ভিন্ন আর কিছু করবার যোগ্যতা আমার নাই। এরকম অনুপ্রাসধর্মী শব্দচয়নে, আমি কল্পনা করি, শ্রোতার মুখে বিহ্বল হাসি খেলে যায়। কখনো চতুর হাসি।
 
এরকম একটা উত্তরে যা হবার কথা বলে আমি ভাবি তা আসলে হয় না। আমি ভাবি, এরকম উত্তরে সম্পত্তি ও সম্পর্ক নিয়ে তাঁরা আরও কথা কইবেন। কিংবা আমাকে কথা বলবার সেতু বানিয়ে দেবেন। আমি কম্প্যুটারের পর্দায় অস্তিত্বমান হয়ে থাকি। কিন্তু তাঁরা তা করেন না। একদল আর কিছু জানতে চান না। ওটাই ওই পর্যায়ের প্রথম ও শেষ যোগাযোগ হয়ে থাকে। হতে পারে এঁরাই বিহ্বল হাসির দল। আর অন্যদল, হতে পারে তাঁদের মুখে চতুর হাসিখানা ছিল, হতে পারে তাঁরা আমার বার্তা থেকে কেবল আমার কথাকার সত্তার এক জাদুকরী সামর্থ্য ঠাহর করে নেন। তাঁরা আমাকে দিয়ে আরও কিছু কথা লিখিয়ে নিতে চান। এবং হয়তো তাঁরা আশা করেন যে আমার সংজ্ঞাগুলোর একটা সীমানাতে এসে আমার কারিগরি ক্লিষ্ট হয়ে পড়বে। আর তাঁরা সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন যে কথাকারের জাদুকরীর সীমানাটা তাঁরা চেনেন। কিন্তু আমি খেয়াল করি যে এরকম ব্যাখ্যাতে আমার ক্লান্ত লাগে। এমনকি একটা অঘোষিত মল্লযুদ্ধের হাতছানি সমেতও। আবার এসব ব্যাখ্যাতেও ইমেইলকারকেরা ডিসএনগেইজড থাকেন। বড়জোর একদম স্বতন্ত্র কোনো বিষয়ে নতুন এক আলাপ শুরু করেন। বা প্রকৃতার্থে আলাপহীনতা শুরু করেন। ফলে আমি আর ব্যাখ্যা দিই না। আসলে জিজ্ঞাসার উত্তরও করি না আর। হয়তো ইমেইলগুলোতে আমারই ডিসএনগেইজড লাগে।

কিন্তু ততদিনে আমাকে অন্যেরা জিজ্ঞেস করতে শুরু করেছেন। ইমেইলে নয়। সরাসরি। তাঁরা ওই প্রান্তের মানুষ। ফলে যে পরিমণ্ডলকে ‘আমার’ বলে কেউ কেউ ধরে নিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দা তাঁরা নন। তাঁদের বড়জোর জিজ্ঞেস করবার কথা কবে যাচ্ছি আমি। কিন্তু তাঁরাও জিজ্ঞেস করলেন কবে ফিরছি। ফেরা বিষয়ক আলাপ না করবার উপায় থাকে না। আমি ওই প্রান্তেও একই আলাপ সম্পন্ন করি। এতে একমাত্র যে লাভটা আমি নিশ্চিত করতে পেরেছি তা হলো প্রায় প্রতিদিন একই প্রশ্ন করা যাঁদের অভ্যাস হয়ে পড়েছিল তাঁরা প্রশ্নটা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু এতে আবার আমি লক্ষ্য করি যে আমার নিজেকেই প্রায় প্রত্যাহার করে নিতে হচ্ছে। এবং সেটাও বেশ অসুবিধাজনক একটা অনুশীলন। হতে পারে যে আমার এই তথাকথিত ফেরা সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া আর কোনোভাবে তাঁরা আমাকে অনুধাবন করতে পারছিলেন না। এবং এই একমাত্র অনুধাবন-লক্ষণাটি আমি ভেঙে দিতে চাইলে তাঁরা ভঙ্গুর হয়ে পড়েন। কিংবা হয়তো আমাকেই ভঙ্গুর ভাবেন। কিন্তু আসলে তা ছিল না ব্যাপারটি, এমনকি পরেও তা হয়নি।

এভাবে আমার প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলাপ গুটিয়ে আনতে পারা যায়। ইমেইল কিংবা সাক্ষাৎ-জবান দুটোতেই।

তবে একটা নিস্তরঙ্গ অশান্তি কোথায় যেন আমি টের পাই। আমি বুঝে উঠতে পারি না কেন আমার সহজ আলাপটাও লোকে বুঝে উঠতে পারছেন না। কিংবা, এর থেকেও বেশি যে ভাবনাটা আমাকে পেরেশান করতে শুরু করল, কীভাবে আলাপটাকে দাঁড় করালে মানুষজনে সেটাতে সংমিশ্রিত হবেন এবং তাঁদের বোধগম্য হবে।

পেরেশান থেকেও, আমি তাই করতে থাকলাম অন্যান্য দিনে যা আমি করতাম।

যেমন ধরা যাক, স্বীয় ইমেজে সকাল বেলার সিগারেটের সঙ্গে হাগার সম্পর্কটা আমার পছন্দ নয়। কিন্তু সেটাই দাঁড়িয়ে গেছিল। ফেরা সংক্রান্ত আলাপবিভ্রাটের কালে, কিংবা বিভ্রান্ত আলাপের কালেও, হাগাটা সিগারেট সাপেক্ষ হয়েই থাকল। কিংবা উদরকেন্দ্রিক আরও উদাহরণ, ঠিক যেরকম উদাস মুখে যে কয়টার সময় সমবায়ের যে অফিসে যে কোম্পানির যে স্যান্ডউইচটা আমি আগে কিনতাম এবং যে জায়গায় যেভাবে বসে সেটা খেতাম ঠিক একই ভাবে এগুলো তখনও চলতে থাকল। আবার দিনের যে সময়টা নেহায়েৎ আর কিছু করার কল্পনা আমার মাথায় খেলত না বলে আমি পশ্চিমের লাইব্রেরির কোনার দিকটাতে কফি মেশিনে পয়সা পুরে দিয়ে একটা কাগজের কাপের জন্য অপেক্ষা করতাম, সেটাতেও কোনো বদল আসেনি। এরকম।

ফলে আমি অবাক হইনি যে আমার প্রশ্নকারীরাও, আমার সঙ্গে একটা বিহ্বল আলাপ সত্ত্বেও, তাঁদের দৈনন্দিন কাজকর্ম অবিকল জারি রাখলেন।

ততদিনে ডিজিটাল জনগণ নিরস্ত হলে এ প্রান্ত নিয়ে আমি নৈর্লিপ্তি অর্জন করি। মানে যে প্রান্তে আমার পৌঁছানোর কথা। আমি প্রাত্যহিক ক্রিয়াদি করি এবং আমার হাওয়াই জাহাজের টিকেটের জন্য বায়না করি এবং আমার ব্যাগ ও অন্যান্য পোঁটলা বানাবার চেষ্টায় লিপ্ত থাকি। আমি মাঝে মধ্যে রুটিন করি সকালে উঠে। ঠিক সকাল আসলে নয়। সকালের পর। কখনো প্রায় দুপুর। আবার অন্য সময়ে একদম সন্ধ্যাবেলা। আমি বিছানা ছেড়ে যখন পূর্ববৎ ওকোনোমিয়াকি খেতে যাই, কিংবা খেতে না-যাবার বেদনা সমেত অন্যকিছু খাই, তখন আমি রুটিন বানাই মনে মনে।

আগামী ২/৩ দিন কম্প্যুটারের ফাইল-টাইল গোছগাছ …
তারপর অত তারিখ থেকে তত তারিখ যত কাগজপত্র আছে তা বাছবিচার …
তারপর অফিসঘরের মেঝেতে লেগে থাকা কফির ঝোল ও অন্যান্য কুৎসিত দাগ মোছাই অমুক দিন …
এই শেষোক্তটা নিয়ে মন অনেক সায় দেয় না। কারণ অনেক দাগই আমি দাগাইনি। কিন্তু একটা জেশ্চার হিসেবে আমার করাই ঠিক মনে হয়। এটা ভাবতে গিয়েই আবার মনে হয় Ñ
বাসার যৌথ হাগুখানার চিনামাটির ডাব্বাটা ঝকঝকে করে মোছাই তমুক দিন …

বাসাটাতে আমিই একমাত্র বিদেশী। আবার বিদেশী বলতে একটা বাংলাদেশীকে গ্রহণ করা বাড়ির মালকিন অশীতিপর বৃদ্ধার পক্ষে ভীষণ কঠিন ছিল। ফলে আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ ছিলাম। একটা চকচকে চিনামাটির ডাব্বা যখন হাগুখানায় তিনি দেখবেন তখন, আমি আসবার পর, আমার প্রতি তাঁর অপত্য স্নেহ তিনি বায়ুমণ্ডলে বিতরণ করবেন। এরকম ভাবলাম আমি। কিন্তু সেটাও সহজ নয়। আমি আসবার পর, হতে পারে, কেউই বুঝতে পারবে না যে ওই চকচকে ভাবটা আমার কারণে সৃষ্ট। যৌথতায় যা হয় আরকি! হাগুখানা কিংবা অন্য যা কিছু। আমি আবার রুটিন করি Ñ
১৭ তারিখ বাক্সে কাগজপত্র ভরা …
১৮ আর ১৯ যৌথ ধোলাইমেশিনে সবকিছু ভরে দেয়া …

ক্রমশঃ আমি আমার হাওয়াই জাহাজের টিকেট আর ব্যাগ-বাক্সকে আমার দুনিয়া ভাবা রপ্ত করে ফেলি। এটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু এরূপ অভ্যাস অন্যকালে তেমন ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। এবং সেই নবলব্ধ ভাবনা সমেত আমার উচ্ছ্বাসকেও যথাসম্ভব লুক্কায়িত রেখে আমি পোশাকাবৃত হই, এবং ঘরের বাইরে চলতে থাকি। এভাবে জোভান কিংবা ইভান কিংবা ওইশি কিংবা মিকা আমি সমানে সামলে চলি। মাঝে মাঝে হিসিখানায় জিপার আটকাতে আটকাতে আয়নায় আমার হাসি আর চোখের মাপসই কম্বিনেশন রিভিউ করে নিই। লক্ষ্য করি, দিনকে দিন ওদুটোর কম্বিনেশন বিস্ময়কর সমর্থ হয়ে চলেছে। আমি নিয়মিত, এবং নির্লিপ্তভাবে, দিনপাত করি।

তবে একদম অকস্মাৎ যেদিন এই নতুন প্রশ্নটার সম্মুখীন হই, আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়ি।

‘কী? খুশি খুশি লাগছে নিশ্চয়ই?’

আমার বুঝতে একটুও সমস্যা হয় না যে, কোনোপ্রকার মীটিং ছাড়াই, এখন থেকে অন্যরা সকলেই এই প্রশ্ন করে যাবেন আমাকে। রুটিন করে প্রতিদিন। কিংবা হয়তো একই দিনের নানান সময়ে। এমনও হতে পারে একত্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলেও একাধিক প্রশ্নকারেরা, প্রশ্নটির গুরুত্ব অনুধাবন করে নিশ্চয়ই, অপেরার মতো প্রশ্নটা করতে থাকতে পারেন। নতুন এই পরিস্থিতি নিয়ে আমার কোনোই পূর্বধারণা কাজ করছিল না। এটাতে হতভম্ব না হবার উপায় ছিল না। হতভম্বতার মূল কারণ অবধারিত। এই প্রশ্নটার কোনো উত্তর করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ওই সেকেন্ডগুলোতেই খুব দ্রুতগতিতে আমি সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখতে থাকি।

এর একটা উত্তর হতে পারত ‘হ্যাঁ খুবই খুশি খুশি লাগছে।’ কিন্তু এটা একটা নিরর্থক উত্তর। এমনকি ডাহা মিথ্যা। কিন্তু আমার খুশি খুশি লাগছে না বলার অবধারিত মানে দাঁড়াবে আরও জটিল কিছু। আমার ঘোষণা দিতে হবে যে তুলনামূলক বৈভবে আমার অধিকতর খুশি খুশি লাগছিল এদ্দিন। কিন্তু সেটাও সত্যি নয়। কিংবা আমাকে প্রশ্নকারীরা অকারণ একটা ঘ্যানঘেনে কিছু ভেবে বসতে পারতেন। অন্ততঃ সেই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিংবা আমি যদি বলতাম ‘কেন? খুশি খুশি লাগার কী আছে!’ তাহলেও তাঁরা এটা বুঝতেন না যে আমি খুশি লাগার ব্যাকরণ নিয়ে ভাবছি। অনায়াসেই তাঁরা খুশি লাগছে না উত্তর ধরে নিয়েই পরের আলাপ সাজাতেন। এসব চিন্তা ওই দ্রুত সময়ে করার কারণে যা হবার তাই হলো। একটা ভ্যাবদা-মারা হাসি সমেত কোনো উত্তর না-করা হলো। এতে নিশ্চিত হলো যে এই প্রশ্নটা এরপর যতবার করা হয়েছে, আসলে অনেকবার, প্রত্যেকবারই ওই নিরুত্তর ভ্যাবদা হাসিই আমার উত্তর হলো। এবং প্রশ্নকার তরফেও এটা নিশ্চিত হলো যে ‘ফিরে’ যেতে আমি খুশি হয়েই আছি।

এই দুর্ঘটনাকে মেনে নেয়া ছাড়া আমার উপায় ছিল না। অনেক ভেবে দেখেছি যে এই খুশির প্রশ্নটাও গুরুতরভাবে ফেরা বিষয়ক তাঁদের তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেহেতু ফেরার তত্ত্ব নিয়ে কোনোরকম ব্যাকরণ-পল্টান আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি, খুশির প্রশ্নের সঙ্গে আলাপ গড়ে তোলাও আমার পক্ষে অসম্ভব।

এরকম একটা দুরূহ পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র হাওয়াই জাহাজের টিকিটের তারিখ ধরে কাউন্টডাউন করতে থাকাই তখন আমার কর্তব্য মনে হলো। এটার একটা নিজস্ব উত্তেজনা আছে। শেষবার, সম্ভবতঃ, ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আগে আমি এরকম কাউন্টডাউন করেছিলাম। আমার যদ্দুর মনে পড়ে সেবার যেমন ক্রিকেটটা শুরু হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি দম ধরে অপেক্ষা করছিলাম, এবারও হাওয়াই জাহাজে ওঠা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করছিলাম। এমনকি অতটা পর্যন্তও না। ইমিগ্রেশনে প্রাক-নাঙ্গা দরবার পর্যন্ত। যদ্দুর পর্যন্ত বিদায়দাতারা দেখতে পারেন। অপ্রাসঙ্গিক না যে দু’জন অন্ততঃ বিদায় দিতে এসেছিলেন। যে খুশি আমার লাগছে বলে তাঁরা ফয়সালা করতে পেরেছিলেন সেই খুশি তাঁদের মুখ পর্যন্ত বি¯তৃত রেখে, এবং আমাকে বিদায় দেবার কারণে যতটা বেদনা তাঁদের বোধ করবার কথা বলে তাঁরা মনে করছিলেন ততটা বেদনাও মাখামাখি রেখে তাঁরা পুরোটা সময় থাকেন। এর কোনোটা নিয়েই আমি নেগোশিয়েট করার আর ইচ্ছা করিনি। বরং যতটা পারা যায় সেগুলোর গ্রহীতা হয়ে আমি বিদায় নিই।

কিন্তু মন্দ ব্যাপারটা হচ্ছে হাওয়াই জাহাজ চিরকাল আকাশে ভাসে না। এগুলো সাধারণতঃ নেমে আসে। এবং নামে সাধারণতঃ টিকেট মোতাবেক। টিকেটে যে গন্তব্য লেখা থাকে তার বাইরে অন্যান্য কিছু খতিয়ে দেখা হাওয়াই জাহাজের অভ্যাস না। সেটা আমি জাহাজে বসেই জানতাম। এমনকি তার আগে থেকেও। জাহাজে, ফলে, সেটাই প্রধান ভাবনা হয়ে দেখা দিল। জাহাজ নামার পরও দেখা গেল আমি সেটাই ভাবছি। অন্ততঃ জিয়া থেকে একটা লাইনে থাকা ট্যাক্সিওয়ালা পাওয়া পর্যন্ত এই ভাবনা আমার কিছুমাত্র পাৎলা হয় না। ট্যাক্সিটা পেতে সাহায্য করলেন একজন পুলিশ। এরকম পুলিশ অনেক দেখিনি আগে আমি। কিছু পরে আমার মনে হলো এই ট্যাক্সি নেটওয়ার্কের তিনি একজন অনুগ্রাহী। কিন্তু তাতেও আমার সন্তোষ কিছু কমেনি। এর একটা কারণ হতে পারে আমাকে নিতে কেউ আসেনি শুনে, সম্ভাব্য একটা জেরা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, তিনি সেটা না করে ট্যাক্সি খুঁজে দিতেই আগ্রহ দেখিয়েছেন।

তবে আমার ভাবনাপ্রবাহ বাধা পড়ে যখন ট্যাক্সিচালক জানতে চাইলেন যে আমি কোথায় যাব। সেটা তিনি রাস্তায় নামতে না-নামতেই জিজ্ঞাসা করে বসেন। এবং কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই আমি মেসবাড়ির ঠিকানাটা তাঁকে বলি। এই পুরা রাস্তায় তিনি অবশ্য ফেরা বা খুশি বিষয়ক থিসিসের তেমন ধার ধারেননি। বা, হতে পারে, আমার থিসিসের ব্যাপারে তিনি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়েছিলেন। ফলে আমরা ওই সময়টাতে অন্য নানান কিছু নিয়ে আলাপ করলাম। যেগুলো আসলে চাইলেই ভুলে যাওয়া সম্ভব। যেমন ওর বাড়ি কোথায়। কবে এসেছে। এই ট্যাক্সিই চালাতে চেয়েছিল কিনা। কত টাকা চালান দিতে হয়। কে কে কোথায় থাকেন। এইসব। বহুদিন ধরে অভ্যাস গড়ে তোলায় এসব আলাপ অনায়াসে করে যেতে পারি। এমনকি হয়তো ভুলে যেতেও। কেবল অভ্যাসটাই মনে থাকে। কারণ এই যেমন এখন, এখন কিন্তু সেসব তথ্য আমার একটুও মনে পড়ছে না যা সেই ট্যাক্সিচালক আমাকে দিয়েছিলেন। আবার আমার অভ্যাস মোতাবেক যে প্রশ্নগুলো করেছি সেগুলো কিন্তু ঠিকই মনে আছে আমার।

ট্যাক্সিটার সারা শরীর একটা ঝনঝনানো আওয়াজ করতে করতে কাঁপছে। এই আওয়াজটা আর তার মধ্যে আমার অভ্যাস মোতাবেক ড্রাইভারের সঙ্গে আলাপ করতে থাকায় আমার সন্তোষ লাগতে থাকে। গাড়িটা এভাবে ঝনঝনিয়ে বনানী ডিঙায়, মহাখালির হাওয়াই সেতুতে চড়ে, আবার নামে, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে লটকে থাকে, ডিজ্যুসের তরুণদের সাইনবোর্ড পাশে রেখে আগারগাঁওয়ের দিকে যায়। এভাবে যেতে থাকে। আর আমরা কথা বলি। আমার মেসবাড়ির কিছু আগে এসে সরু রাস্তার অভিযোগে আর যেতে না চাইবার আগ পর্যন্ত ড্রাইভারের সঙ্গে এরকম নির্লিপ্ত অথচ রেওয়াজমাফিক সম্পৃক্ত যোগাযোগ চলতে থাকে। আসলে সরু রাস্তা নিয়েও আমাদের বিশেষ গোলযোগ সম্পন্ন হয় না। বরং আমি প্রায় মুখস্ত দক্ষতায় নেমে রিকশা ডাকি। যদিও, এটা একটা উপায় হতে পারত, তাঁকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমি অন্য আরও বড় গাড়ির ওই রাস্তায় চলাচল দেখাতে পারতাম। কিন্তু সেটা করি না।

বাসার নিচে কলাপসিবল দরজাটা কায়দামাফিক আটকানো, কিংবা খোলা। মানে অর্ধেক কিংবা তারও বেশি আটকে রেখে একটা শিকল পরিয়ে দরজাটা রাখা। তালাটা বিশ্রিভাবে বেঁকে আছে। দেখে মনে হয় যেকোনো সময়েই ওটা গভীরভাবে আটকে যেতে পারে। এমনকি কলাপসিবলের এই কায়দাটুকু না রেখেই। তখন খুলবার জন্য সাধ্যসাধনা করতে হবে। ওটুকু খোলা পেয়ে আমার সন্তুষ্টি অটুট থাকে।

আমার লাল রঙের ব্যাগটা ওই ফাঁকটুকুতে আটকে গেল। আমি লক্ষ্য করি, তাতে আমার খানিক ছন্দোপতন ঘটে। আমি সামনে বা পেছনে ব্যাগটা ছাড়াবার চেষ্টা করি। মানে নিজেকেও। ব্যাগটা থেকে আমাকে ছাড়ানো তখন আরও কঠিন হয়ে গেছে। নিচতলার মহিলা গণ রান্নাঘর থেকে দেখতে পেলেন। এগিয়ে এলেন। কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। হাসলেনও না। মন খারাপ করেছেন বলেও মনে হলো না। কেবল আমার ব্যাগে-থাকা কাঁধটা একপাশে ঠেলে ব্যাগটা কায়দামাফিক টান দিলেন। আমি বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়লাম।

আমার বাসায় সাত জন বাসিন্দা। নানান বয়সের। আমার মনে নেই কে দরজা খুলে দিলেন। আমার এও মনে নেই সবাই তখন বাড়িতেই কিনা। কিন্তু দরজা খুলে হাসির অধিকন্তু কেবল বললেন Ñ
‘চলে আসছেন?’
পরে লক্ষ্য করলাম সেই প্রশ্নটাই সবাই করছেন Ñ
‘চলে আসছেন?’
গতবার যার ভাষাশিক্ষা হয়নি, সেই ছোটটা, সম্ভবতঃ ওর মা দরজা খুলে দিলেন, সেও এসে বলল Ñ
‘কাকা আসছেন?’
ফেরা বা খুশি সংক্রান্ত কোনো থিসিস নিয়ে কিছুমাত্র আমার আলাপ করা লাগল না। আমি ব্যাগটা নামিয়ে আমার ঘরের তালা খুললাম না আগে। আগে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন Ñ
‘থাকবেন তো এখন?’
‘হ্যাঁ থাকব তো! কই যাব!’ এটা বোধহয় নিজেকে বললাম। ছোটটাও জিজ্ঞেস করল Ñ
‘কাকা থাকবেন?’
আমাকে যে কাকা ডাকা যায় এই জ্ঞান নিশ্চয়ই আমি আসার আগেই পেয়েছে। সামনে তো কই দেখলাম না! অথবা হতে পারে ওর আগেই ওর বড়টা ডেকেছিল এবং একই প্রশ্ন করেছিল। সম্ভবতঃ।

দরজার তালা খুলে আমি কেবল ব্যাগটা রাখি। জুতা খুলি। চপ্পল পায়ে দিই। তারপর চা খেতে বের হই।

পাড়ার লন্ড্রিতে চোখাচোখি হয় Ñ
‘আসছেন?’
তারপর হয় আলুপটলের দোকানের চাচার সঙ্গে Ñ
‘আসছেন? আমি তো চটপটি ছাইড়া শব্জি ধরলাম।’
চুলকাটার দোকানের ছেলেটার সঙ্গে শব্দ ছাড়াই এই ভঙ্গি বিনিময় হয় Ñ
‘আসছেন?’
তারপর পাড়ার পুরি আর ভাতের দোকানের দু’জন Ñ
‘চইলা আসছেন?’

আসমা পান খাওয়া মুখে ওর স্বামীকে বেঞ্চ পরিষ্কার করতে বলে। লোকটা ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। বেঞ্চ পরিষ্কার করে দিয়ে কোথায় গেল। সম্ভবতঃ মুততে। যাবার আগে বলল ‘বসেন’। দোকানটাকে আসমার দোকান বললেই ভাল বোঝায়। চায়ে চিনি দিয়ে ঘুটতেই থাকল সে। আমার আর বলতে ইচ্ছা করে না যে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আমি নিশ্চয়ই আরও কয়েক কাপ চা খাব। ফলে আসে যায় না এটা গরম থাকল কিনা। আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। আসমা আমার দিকে তাকায়। আর চা নিয়ে দেরি করতে থাকে। কিন্তু আমার একট্ওু তাড়া লাগে না।
‘আপনারে এট্টা কথা জিগামু।’
‘হ্যাঁ জিগান। আমি আরও চা খাব।’
‘না এহন জিগামু না।’
‘পরে একটু সুবিদামতো সোময়ে জিগামু।’
‘আচ্ছা, আমি আবার আসব।’
‘না আসলে আমি ডাইকা জিগামু।’

আমি মাথা নেড়ে চা খেতে থাকি। ততক্ষণে চা আমার কাছে দিয়ে গেছে আসমা। মাথার উপর ঘড়ঘড় করে একটা বহু পুরাতন ফ্যান ঘুরছে। এই ঘরটাতে ওরা বোধহয় রাতে ঘুমায়। আমার মনে হলো। আমি আবার চা খেতে চাই। আসমা কী জিজ্ঞেস করবে কিংবা আদৌ কিছু করবে কিনা এ নিয়ে আমার কোনোই চিন্তা কাজ করে না।

ওর প্রশান্তি দেখে আমার মনে হলো জানানো দরকার Ñ
‘আজকেই আসলাম।’
‘হ দেখি নাই তো মইদ্দে।’

পাশে চা খেতে-থাকা লোকটা ততক্ষণে একটা কথা খুঁজে পেল Ñ
‘হ কই জানি আছিলেন।’
‘হুঁম।’ আমি জানাই।

একটা বছর নিমেষে তিন কাপ চায়েই মিটে গেল। আসমাকে পয়সা দেবার আগে দাম জিজ্ঞেস করি। দাম বাড়বার কথা। বেড়েছে। কিন্তু নয় টাকা ও নেয় না। ও ছয় টাকাই নেয়। বলে পয়লা কাপটা ও খাওয়াল। আমি মানা করলাম না। নেমে হাঁটা দিলাম।

আশ্চর্য! ফেরা নিয়ে দেখি এদের কোনো ভাবনাই নাই!

(০৮ই জুলাই ২০০৭॥ শেওড়াপাড়া, ঢাকা; ০৩-০৮ অক্টোবর ২০০৭॥ লালমাটিয়া, ঢাকা)
=========================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা

bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ মানস চৌধুরী


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা

রায়কা ঘুম ভেঙে দ্যাখে বাইরে তখনও অন্ধকার। জোর বৃষ্টি হচ্ছে। ঘড়িতে দ্যাখে সকাল সাড়ে নয়টা । পাশে মেয়ে রুদাবা আর স্বামী আলিম ঘুমাচ্ছে। রান্নাঘরে গিয়ে দ্যাখে কাজের মেয়ের নাস্তা বানানো প্রায় শেষ। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে দৈনিক পত্রিকা টেনে নেয়। পত্রিকার প্রথম পাতায় আলিমের ছবি দেখে সংবাদটা পড়েই বিলাপ করে ওঠে, “হায় খোদা রে, ওরে আমার আল্লাহ, কী করলি তুই!” বেডরুমে আলিমের কাছে ছুটে যায়, “রুদাবার আব্বু, তুমি দ্যাখো কী সর্বনাশ হইছে!”

আলিম তখন মাত্র ঘুম ভেঙে এসির ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে-যাওয়া তিন বছরের মেয়ে রুদাবার গায়ে কাঁথা টেনে দিচ্ছিল। চিৎকার শুনে পত্রিকা হাতে নিয়ে চোখে পড়ে প্রথম পাতায় তার ছবি আর শিরোনাম : “বহুজাতিক কোম্পানির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ তকদির হাসান খুন”। ভেতরে লেখা আছে “অফিসে তাদের ব্যক্তিগত বিরোধের জের হিসাবে এ-হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অনুমান করা হয়। অফিস-সূত্রে জানা যায়, তার সহকর্মী আলিমুদ্দৌলা তকদিরকে চৌদ্দ তলার ওপর থেকে ফেলে দিয়ে এ-হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পুলিশ আলিমুদ্দৌলাকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছে। গতকাল রাত আটটায় এ-হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে তকদিরের স্ত্রীর সাথে আলিমের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল।”

রায়কা তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “কালকে তো তুমি সন্ধ্যা ছয়টায় বাসায় ফিরলা। তারপরই তো আমরা বড়আপার বাসায় গেলাম। এত বড় শত্র“তামি কে করল?”
আলিম কাঁপতে কাঁপতে বলে, “আমি তো তোমারে আগেই বলছিলাম, নাসিম স্যার আমারে সহ্য করতে পারে না। সে জিএম হয়ে বসে আছে। পত্রিকাওয়ালা এবং পুলিশে আমার নাম উনিই দিছে। আমারে তো শেষ কইরা দিল এই নাসিম শুয়োরের বাচ্চা!” হাউমাউ কাঁদে সে। ওদের দু’জনের কান্নায় রুদাবাও ঘুম থেকে উঠে কাঁদতে শুরু করে। রুদাবাকে জড়িয়ে ধরে আলিমের কান্নার তোড় আরও বেড়ে যায়। এরই মাঝে ফোন আসে, আলিমদের বাসা থেকে। ফোন ধরে সে আবারও কাঁদে, “আব্বা, আমারে তো শেষ কইরা ফালাইছে।” তারপরই ওপাশে মা ফোন ধরে। আলিমের কান্নার শব্দ দ্বিগুণ হয়, “আমার তো সব শেষ, আম্মা। আম্মা গো, আমার সব শেষ।” ওপাশে তার মাও কাঁদছে।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তার বাবা মা শ্বশুর শাশুড়ি ভাই বোন সবাই চলে আসে। তার বাবা এসে বলে, “দেশ ছাইড়া আজকেই তুই ভাইগা যা, ইন্ডিয়া যা গিয়া, নাইলে পুলিশ আইসা অ্যারেস্ট কইরা নিবে।” রায়কা এবং আলিমের বাবা মা সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়ে। কেউ কলিংবেল টিপলেই মনে হয় পুলিশ এসেছে। আলিমের বাবা ছেলেকে কোনোভাবেই দেশে থাকতে দিতে রাজি না। বলে, “তুই আজকাই ইন্ডিয়া যা গা।” আলিমের শ্বশুর বাধা দেয়, বলে, “সে পলায়া গেলে পুলিশ তখন তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিবে।”

আত্মীয়স্বজনের টেলিফোনে রায়কা কান্নাকাটি করে নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করে এটা কত বড় মিথ্যা ঘটনা। আলিমের বাবা মা শ্বশুর শাশুড়ি কেউ মেঝেতে, কেউ বিছানায়, রুদাবা বারান্দায় তাঁর খেলনা নিয়ে খেলতে বসে। আলিমের শ্বশুর রিটায়ার্ড সরকারি আমলা। তিনি চেষ্টা করেন তাঁর পরিচিত পুলিশ অফিসারদের অনুরোধ করে আলিমের অ্যারেস্ট আটকাতে। তারপরও বিকালে পুলিশ আসে। আলিমের বাসায় মরাকান্না শুরু হয়। রায়কা বারান্দায় কাঁঠালিচাঁপা গাছের পাশে হেলান দিয়ে বসে চোখ মোছে। থানায় পিকআপ ভ্যানের পিছনে আলিমকে বসিয়ে নিচ্ছে। সে না আবার আত্মহত্যা করে! তার বাবা এবং শ্বশুর দু’জনেই তার পিছে পিছে থানায় যায়। আলিমকে লকআপে দেখে বাবা ছোট শিশুর মতো হাউমাউ কাঁদে।

আলিমের অফিস কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ঐ অফিসে নাসিম সাহেব প্রায় সর্বেসর্বা। তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। তিন দিন পর বিধ্বস্ত আলিমকে জেলে পাঠানো হয়। আত্মীয়স্বজন জেলে তার সাথে দেখা করতে গেলে আলিম শুধুই কাঁদে, কিছু বলতে পারে না। জেল সুপারের সাথে তাঁর শ্বশুরের খুব ভালো সম্পর্ক থাকায়, এবং ক্রমাগত টাকা ঢালায়, আলিমের জেল-জীবনের কষ্ট সামান্য কমানোর যায়।

রায়কা, রায়কার বাবা, আলিমের বাবা দিনরাত হাইকোর্টে দৌড়াদৌড়ি করে। তাদের তকদির-তদবির এবং খুব নামিদামি ব্যারিস্টার নিয়োগের কারণে আলিমকে হাইকোর্টে থেকে জামিনে ছাড়ানো যায়। জেল থেকে ফিরে আলিম অন্য মানুষ। আত্মীয়স্বজন সবার সাথেই যতটা সম্ভব কম কথা বলে, এমনকি রায়কার সাথেও।
বন্ধুবান্ধব অনেকেই ফোন করে। আফসোস করে, কেন বোকার মতো ট্র্যাপড হ’ল সে, তার বস নাসিমকে কেন সে ম্যানেজ করে চলে নাই, “জলে থেকে তো কুমিরের সাথে লড়াই করা চলে না” ইত্যাদি। বন্ধুদের সান্ত্বনা, ভালবাসা সবই বিরক্তিকর লাগে। বিষয়টা নিয়ে তার কথা বলতেই ইচ্ছা করে না।

অমায়িক মিশুক আলিম অফিসে বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রায় যে-কোনো পরিস্থিতিতেই মাথা ঠাণ্ডা রাখত সে। অথচ তারই বস নাসিম সাহেব সবার সাথে খুঁচিয়ে কথা বলত, কটাক্ষ করত। অফিসে এমডি সাহেব অথবা সিনিয়ররা কাউকে বেশি স্নেহ করলে তাকে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলত অথবা নানা উছিলায় সেসব অফিসারদের বিরক্ত করত। ফলে বহু জুনিয়র কলিগ তাকে এড়িয়ে চলত। কিন্তু লোকটা অফিসের চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রীর নিকটাত্মীয় হওয়ার কারণে লোকজন ভয়ে প্রতিবাদ করত না বা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাত না তার অন্যায় আচরণের। আলিম দীর্ঘদিন তার সাথে যথাসম্ভব সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করেছে।

নাসিম ছিল তার সাত আট বছরের সিনিয়র। অফিসের সবার কাছে পরিচিত ছিল খুবই বুদ্ধিমান, কিন্তু জটিল লোক বলে। সবাই বলে লোকটা হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারে। তবে তার পাণ্ডিত্যে মাঝে মাঝেই মুগ্ধ হ’ত আলিম। অফিসের কোনো ড্রাফট লেখা বা ডিকটেশন দেয়ায়, কি বাংলা কি ইংরেজিতে, সবাই একবাক্যে মানত যে লোকটার ভাষাদক্ষতা দুর্দান্ত। নাসিম অন্যদের তুলনায় আলিমকে বেশ স্নেহ করে তা টের পেত আলিম। প্রায়ই তাকে রুমে ডেকে নিয়ে নানা বিষয়ে গল্প করে, তবে বেশির ভাগ সময় যা করে তা হচ্ছে নির্জলা কুৎসা। অমুক অফিসারের দশটা গার্লফ্রেন্ড আছে; তমুক নারী অফিসার প্রায় খানকি টাইপের, যে কেউ ডাকলেই, বা একটা পারফিউম কিনে দিলেই, তার সাথে শুয়ে পড়বে, ইত্যাদি। আলিমকে একদিন বলে, “ফ্লোরাকে এক সেমিনারে সেদিন দেখলাম, জিন্স আর টিশার্ট পরা। মনে হ’ল টিশার্টের উপর দিয়ে ব্রেস্ট উপচে পড়ছে। বাইশ শতকের মেয়ে। একশ বছর আগে জন্মেছে। এত ইনডিসেন্ট কাপড় পরে।” আলিম দেখল, কথা বলতে বলতে নাসিম সাহেবের দু’চোখ চকচক করছে। আলিম ফ্লোরাকে ভালোভাবে চেনে। কখনোই সে অশালীন পোশাক পরে না। সেদিন হয়তো জিন্স-টিশার্ট পরেছে, তাতেই লোকটার…

এত পাণ্ডিত্য, এত পড়াশোনা নিয়ে লোকটা কোন্ রুচিতে যে দিনরাত মানুষের চরিত্র হনন করে! নাসিম স্যারের আরও একটা ব্যাপার তার খুবই বিরক্তিকর লাগে, আর তা হচ্ছে অষ্টপ্রহর আতিক স্যারের নামে দুর্নাম। “খুব বাজে অফিসার, পড়ালেখা কিছু জানে না। কিন্তু লিয়াজোঁ মেইনটেইন করে খুব। সাবস্ট্যাণ্ডার্ড একটা লোক। প্রেম করে আবার ফ্লোরার মতো দুই নম্বর এক মেয়েমানুষের সাথে।” এগুলো শুনতে আলিমের খুব ভালো লাগে না, কারণ আতিক স্যার এ-অফিসে আলিমের প্রিয় ব্যক্তিদের একজন। অন্যের ব্যাপারে কখনও নাক গলায় না, দুর্নাম করে না কারো, নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। জুনিয়র কলিগদের সাথে ভালো ব্যবহার করে। অফিসের পিয়ন-দারোয়ান-সহ বহু মানুষ তার ভক্ত। কাজে ব্যস্ত থাকায় কিছুদিন নাসিম সাহেবের অফিসে যাওয়া কমিয়ে দেয় সে। এর মাঝে আতিক স্যারের সাথে ব্যাংককে একটা ট্রেনিং-এ যায়। ওখানে আতিক স্যারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং তার সাথে ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে। ঢাকায় ফেরার পরে আতিক স্যার মাঝে-মধ্যেই আড্ডা দিতে কিংবা নানা বিষয়ে পরামর্শ করতে ডাকে তাকে। একদিন দুপুরে বাইরে থেকে নাস্তা এনে আলিমকে রুমে ডেকে নেয় আতিক। নাসিম সাহেব তখনই আতিক সাহেবের রুমে ঢুকেছে। আলিমকে দেখে আতিক সাহেবকে বলেন, “কী খবর, আতিক, নতুন শিষ্য পাইছো মনে হয়।”

শুনে আতিক স্যার বেশ প্রশংসা করেন আলিমের, “ও একজন খুবই স্মার্ট অফিসার। ব্যাংককে গিয়ে টের পাইলাম ভিতরে-ভিতরে মহাপণ্ডিত সে। ওইখানে ট্রেইনাররা তো খুবই ইমপ্রেস্ড্ ওর ব্যাপারে।” প্রসঙ্গ পাল্টে নাসিম সাহেব আলিমকে বলেন, “বিকালে মিটিং-এ যে-বিষয়গুলো আলোচনা করতে বলেছি তা মাথায় রাইখো।” বলে বেরিয়ে যান।

চারপাঁচ দিন পর লাঞ্চ আওয়ারে খাওয়া শেষ করে নাসিম সাহেবের রুমে যায় আলিম। তাকে দেখেই গম্ভীর স্বরে নাসিম সাহেব বলে, “এখন খুব ব্যস্ত আছি, আলিম। পরে আইসো।” বেশ খটকা লাগে আলিমের। নাসিম স্যার কী রাগ করল কোনো কারণে? লোকটা তো খুবই প্রতিহিংসাপরায়ণ। না জানি কোন্ ক্ষতি করে আবার। চৌদ্দ তলায় অফিসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে ছোট ছোট ঘরবাড়ি, বস্তি স্টেডিয়াম… নাসিম স্যার পিছনে লাগলে খালাস করে ফেলে মানুষকে।

পরদিনই অফিসে কাজের ফাঁকে আবারও যায় নাসিম সাহেবের রুমে। নাসিম গম্ভীর মুখে বলে, “কী ব্যাপার, কোনো কাজে আসছো?”

“না স্যার, এমনি ভাবলাম একটু গল্প করে আসি আপনার সাথে।”

“কিছুক্ষণ পর একটা মিটিং আছে আমার, তার প্রেপারেশন নিতে হবে।”

“ঠিক আছে, স্যার, পরে আরেক সময় আসব,” বলে আলিম নিজের রুমে চলে আসে। তার টেবিলের ওপর ছোট টবে রাখা ক্যাকটাসের কাঁটাতে আনমনে হাত বুলায় আর ভাবে নতুন চাকরি খুঁজতে হবে হয়তো।

অফিসে কাজের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয় সে। প্রতিদিন রাত প্রায় আটটা-নয়টা বেজে যায় বাড়ি ফিরতে। ফেরার সময় নাসিম সাহেবের সাথে পর-পর দু’দিন দেখা হয় নিচে। এমডি স্যারের পিএস রীনাকে পাশের সিটে বসিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আলিমকে দেখে দ্রুত গাড়ি টান দিয়ে চলে যান। তারপর থেকে আলিম হয়ে পড়ে নাসিম সাহেবের চরম শত্র“। অফিস মিটিং-এ সুযোগ পেলেই একেকদিন তুলাধুনা করে ছাড়েন। আলিমের মনে হয় নাসিম হয়তো ভাবেন এমডি’র পিএস রীনার সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা আলিম সবাইকে বলে দেবে। প্রায় প্রতিটা দিন বাসায় ফেরে তীব্র অশান্তি নিয়ে। কখনও অতি অল্পে স্ত্রী রায়কার সাথে ঝগড়াঝাঁটি, কখনও বা গলাজল হতাশায় রায়কার কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ। “নতুন চাকরি আমারে কে দিবে, সোনা। যে-কোনো মুহূর্তে আমার যে কোনো ক্ষতি করবে নাসিম শুয়োরের বাচ্চা। মিটিং-এ এত মানুষের সামনে আমারে এমন অপমান করে সে!” রায়কা সান্ত্বনা দেয়, “এত ভয় পায়ো না তো! এক আল্লাহ সহায় থাকলে হাজারো শয়তানে কিছু করতে পারে না।”

বউ বাচ্চা নিয়ে বাইরে খেতে যায় সে।

এর মাঝে এমডি সাহেব আলিমকে প্রায়ই রুমে ডাকেন একটা প্রজেক্ট প্ল্যান তৈরি করতে। নাসিমের চোখে পড়ে যে আলিম প্রায়ই এমডি সাহেবের রুমে যায়। অনেক সময় থাকে। তারপরের সপ্তাহে রাতে অফিসের চৌদ্দতলার জানালা থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় আলিমের বন্ধু তকদির হাসান। অফিসে অধিকাংশ মানুষই অনুমান করে তকদির আত্মহত্যা করেছে। অফিসের শুভাকাক্সক্ষীরা জানায়, তকদির আসলে চৌদ্দ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল। দীর্ঘদিন সে বিষণœতার রোগী ছিল। অফিসে কারো সাথে মিশত না। খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলত না কারো সাথে। মিডিয়া এবং পুলিশে কানেকশন থাকায়, নাসিম একে হত্যাকাণ্ড বলে চালিয়ে দেয় এবং আলিমকে আসামি করে অফিস থেকে বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করে।

আলিমের শ্বশুরের প্রভাব, যোগাযোগ আর টাকার কল্যাণে অবশেষে তার জামিন হয়। বেরিয়ে এসে টেলিফোনে অফিসের কলিগ এবং বন্ধুবান্ধব সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করে, কীভাবে সে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। তার কলিগ ও সিনিয়র নাসিম সাহেবের নীচতা বর্ণনা করে। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে জিজ্ঞাসা আসে জেল খানায় কেমন ছিল সে, পুলিশ রিমান্ডে টরচার করেছে কীনা… এ-জাতীয় সব প্রশ্ন। এসবের জবাব দিতে ভালো লাগে না তার। বন্ধুদের ফোনও অসহ্য লাগে একেক সময়। তার মনে হয় সবাই স্বার্থপর। কেউ বিপদে পড়লে মজা দ্যাখে। সত্যিকার বন্ধু হয়তো বাবা মা স্ত্রী সন্তান ছাড়া আর কেউই হয় না।

দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধু মিজান ফোন করে। “কী রে দোস্ত, কী খবর? আরমান ফোন করছিল আমারে। তোরে নিয়া সবাই ভীষণ টেন্সড। আমরা আসলে কেউই বিলিভ করি না মানুষ খুনের সাথে তুই জড়িত থাকতে পারস। আবার সিডনি থিকা আকবরও ফোন করছিল। সেও খুব আফসোস করছে তোর জন্য। এই দেশে পুলিশ আর পত্রিকাওয়ালারা পারেও। একটা নিরীহ মানুষরেও রাস্তায় বসাইয়া দিতে পারে। সামি আমারে প্রথম জানাইছে যে, হাইকোর্ট থিকা তোরে জামিন দিছে। জেলখানার ভিতরের পরিবেশটা কেমন, দোস্ত? চোর, ডাকাইত, অন্যসব আসামিগো লগে থাকতে দিছে তোরে? পুলিশ কি রিমান্ডে নিয়া টরচার করছে?”

“দ্যাখ মিজান, জেলখানা নিয়া একটা কথাও কমু না আমি। ভালো লাগে না। তবে একটা কথা বলতে পারি: জেলখানায় থাইকা আমার মনে হইছে যে ওইখানে যারা আছে তার একটা বড় অংশই ইনোসেন্ট।”

মিজান জিজ্ঞাসা করে, “দোস্ত, ওরা ওইখানে কী খাইতে দিছে তোরে? জেলখানার খাবার খাইতে পারছিস?”

আলিম জবাব দেয় না।

মিজান বলে, ‘ঠিকাছে, সরি দোস্ত, অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি তাইলে। আমাদের যে ক্লাসমেট ছিল হানিফ, ট্যাক্সেশন ক্যাডারের, সে যে কী বদমাইশ চিন্তা কর, তোরে নিয়া যখন পত্রিকায় লেখালেখি হইতেছে সে আমারে কয়, ‘আলিম নিশ্চয়ই খুনে ইনভলভ্ড্ ছিল। হাইকোর্ট থিকা সে জামিন পাইছে তার শ্বশুরবাড়ির তদবিরে, কারণ তার শ্বশুর সরকারি আমলা ছিল। খুব কানেকটেড লোক।’ বিশ্বাস কর দোস্ত, ওর কথা শুইনা মন চাইছে দুই গালে দুই চটকনা লাগাই। অথচ ইউনিভার্সিটিতে কত রাত্র তোর লগে সে এক বিছানায় ঘুমাইছে, এক লগে খাইছে। একেকটা ইনোসেন্ট পোলাপান গভর্মেন্ট সার্ভিসে ঢুইকা বাইর হয় একেকটা জটিলতম প্রাণী হিসাবে… দোস্ত, তোরে কি আগের চাকরিতে নরমালি অ্যাকসেপ্ট করবে? তোর ঐ হারামি কলিগটা কি এখনও ঐখানেই আছে?”

“হ্যাঁ, হাইকোর্ট যেহেতু নির্দোষ বলছে ওরা হয়তো নিবে আমারে। তা ছাড়া অফিসের প্রায় সব লোকেই বোঝে যে আমি নির্দোষ। কিন্তু তারপরও জয়েন করমু না। শুনছি ঐ হারামজাদার নাকি প্রমোশনও হইছে। হারামিরা সবসময়ই ভালো থাকে। ঠিক আছে, এখন ফোন রাখি, দোস্ত। রায়কারে নিয়া বাইরে যাইতে হইব।” বলে আলিম ফোনটা রেখে দেয়।

আসলে রায়কাকে নিয়ে বাইরে যাবার প্ল্যান আলিমের নাই। মিজানকে এড়াতেই বলা। আলিমের মনে হয় মিজান নিজেও হয়তো বিশ্বাস করে আলিম এই খুনের সাথে জড়িত ছিল। অবশ্য খুনের মামলায় জড়াবার আগ থেকেই বন্ধুবান্ধবের আড্ডা এড়িয়ে চলত সে, যেসব আড্ডায় কে কতবার বিদেশ গেল, কয়টা অ্যাপার্টমেন্ট, জমি কিনল, নয়তো অন্যের সমালোচনা, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুটিও দুর্নাম করছে তার বন্ধুর… এ-কারণেই অনেকদিন বন্ধুদের আড্ডা আর আকর্ষণ করত না তাকে। অবশ্য এমনকি রায়কার সাথে, তার বাবা মা ভাইবোন কারো সাথেই আর কথা বলতে মন চায় না এখন।

রায়কাও মাঝে-মধ্যে অশান্তি করত, “এই দেশে থাকলে আমার মেয়ের বিয়া দেওয়া যাবে কোনোদিন? চল, বিদেশে সেটল করি আমরা।” বিদেশে গিয়ে কী করবে মাথায় আসে না আলিমের। অফিস থেকে ট্রেনিং-এ লন্ডন ও সিডনি গিয়েছিল সে। সেখানে দেখেছে স্বামী-স্ত্রী কী কষ্ট করে অড-জব করে সংসার চালায়। ঢাকায় কাজের মেয়ে সংসারের সব কাজ করে দেয়, তবুও রায়কা হিমশিম খায়। বিদেশে গিয়ে কী করবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না আলিম। বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভায়রা-শালা-শালি সবাই পরামর্শ দেয়, “বিদেশে গিয়া সেটল করো।” মানতে পারে না আলিম। এদেশের ইট-কাঠ-ধূলিকণা, রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টস-কর্মী, বাংলা সিনেমার নায়িকা, প্রযোজক, চোর, ডাকাত, পুলিশ সবাইকেই সে ভালোবাসে। কেন এদেশ ছেড়ে যাবে?

খুব কাছের কিছু মানুষ, তার সত্যিকার কিছু আপনজন ছিল যারা মারা গেছে। এমন আত্মার আত্মীয় তার এখন খুব কম আছে। একজন তার নানি। নানি তাকে কোলে-পিঠে মানুষ করেছে। সে কলেজে যখন পড়ে তখনও মুখে তুলে খাইয়েছে। বাবার ছিল বদলির চাকরি। নানা জেলায় জেলায় ঘুরতে হ’ত। ফরিদপুরে নানির বাড়ি থেকে জেলা স্কুলে পড়ত সে। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার পর-পর নানী মারা যায় ব্রেইনস্ট্রোক করে। নানির মৃত মুখটা ধরে সে আদর করেছে। একবারের জন্যও তাকে মরামানুষ মনে হয় নাই। কবর দিয়ে আসার পরও মনে হয় নাই নানি নাই। কখনও মন খারাপ হলে, নিজেকে বিপন্ন লাগলে হয়তো একা বালিশে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে, “নানু গো, আমি ভীষণ বিপদে আছি। তুমি আমার জন্য দোয়া করো। তুমি আমার মঙ্গল চাইলে কেউ আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না…।” আরেকজন তার শিক্ষক অতীশ স্যার। ক্লাস সিক্সের শেষের দিকে প্রাইভেট টিউটর হিসেবে পায় অতীশ স্যারকে। এর আগে কয়েকজন প্রাইভেট টিউটর এসেছিল আলিমের জীবনে। কাউকেই তার পছন্দ হ’ত না। অতীশ স্যারই তাকে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। স্যার তার প্রশংসা করত সবার কাছে, একসময় নিবিড় বন্ধুত্ব হয়ে যায় দু’জনের। স্যারের প্রেমিকা স্যারকে ছেড়ে চলে গেছে। আলিম যখন ক্লাস টেন-এ পড়ে, তাকে পড়াতে এসে আলিমের সাথে এ-গল্প করতে-করতে চোখ ছলছল করে ওঠে স্যারের। আলিম বলে, “স্যার, আপনি আরেকটা প্রেম করেন, সব ঠিক হয়ে যাবে আবার। অতীশ স্যার বুয়েট থেকে পাশ করে আমেরিকায় স্কলারশিপ পায়। যাওয়ার আগেই একদিন কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনা। স্যারের লাশ দেখতে আলিম তার বাসায় গিয়েছিল। উঠানের এপাশ থেকে ওপাশে গড়িয়ে-গড়িয়ে কাঁদছে মাসিমা। আলিমকে দেখে জড়িয়ে ধরে চিৎকার, “তোমারে তো অনেক আদর করত আমার ছেলে।” আলিমের কখনোই মনে হয় নাই অতীশ স্যার নেই। সে সবসময় তাকে অনুভব করে তার পাশে।

রায়কার সাথে প্রেম হয় ভার্সিটিতে পড়ার সময়। মাস্টার্স পরীক্ষা দেয়ার তিন-চার মাস আগে রায়কার বিয়ে ঠিক হয়ে যায় এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। আলিম তার বাবা-মাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয় যে, রায়কাদের পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো এখন খুবই জরুরি। রায়কাও কোর্ট ম্যারেজে রাজি ছিল না, প্রায় সারারাত সে হলের বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে, “নানুমণি, অতীশ স্যার, তোমরা প্রার্থনা করো আমি যেন রায়কাকে ফিরে পাই।” বিপদে পড়লে মৃত আপনজনদের আকুল হয়ে সে ডাকে। শেষমেশ রায়কাই তার বাবা-মাকে বুঝিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের সাথে তার বিয়ে ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। আলিমের মনে হয় তার নানু এবং অতীশ স্যারের জন্যই রায়কাকে ফিরে পেয়েছে সে। জেলখানায়ও দিনরাত তার নানি আর স্যারকে স্মরণ করেছে সে, আর কাউকে নয়, কাউকেই না। যথেষ্ট সাক্ষ্যসাবুদের অভাবে একসময় বেকসুর খালাস হয় তার ঠিকই, কিন্তু পুরো পৃথিবীটাই হঠাৎ করে জেলখানা হয়ে যায় আলিমের।

রায়কার সাথে প্রায়ই ঝগড়া হয়। রায়কা চাপ দেয় চাকরিবাকরির চেষ্টা করার জন্য। প্রচুর বন্ধু আছে নানা বহুজাতিক কোম্পানিতে। অথচ পরিচিত কারো কাছেই যেতে তার মন চায় না। মনে হয় সবাই উপরে-উপরে সহানুভূতি দেখায়, মনে-মনে হয়তো তারা ভাবে আলিম খুনি। বন্ধুদের ফোনও রিসিভ করে না সে আর। রায়কা যখন আত্মীয়স্বজনের বিয়ে বা জন্মদিনের দাওয়াতে নিয়ে যেতে জবরদস্তি করে, তাকে খুন করে ফেলতে মন চায়।

ইউএনডিপির একটা প্রজেক্টে চাকরি নিয়ে রাঙ্গামাটি চলে যায় আলিম। রুদাবা ঢাকায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে বলে রায়কাকে ঢাকায় তার মায়ের বাসায় রেখে যায়। রাঙ্গামাটি গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সে। অফিসের সময় কাজে ব্যস্ত থাকে। পাহাড়ের পাশেই একটা বাড়িতে তার ঠাঁই হয়। অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় বসে একাকী পাহাড়ের গায়ে সন্ধ্যা নামা দ্যাখে। নির্জনতা, নিঃসীম নির্জনতা। তবে এখানে মাঝে-মধ্যেই অপরাধ বোধে ভোগে সে। ভাবে, খুনটা না করলেই হ’ত! এত ঝামেলায় পড়তে হ’ত না। অবসরে নির্জনতায় ডুবে থাকে আলিম। আর, এই নির্জনতাকে আকণ্ঠ পান করার চাইতে ভালো কিছু পৃথিবীর কাছে পাওয়ার আছে তা আর মনে হয় না তার। 
===================



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ রাশিদা সুলতানা

এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters