Friday, December 11, 2015

অলৌকিক আঙুল by বাদল সৈয়দ

তাঁর আঙুলগুলো প্রজাপতির মতো নাচছে। ওগুলো বাজাতে চায়। কিন্তু পারছে না। বয়স আঙুলের শক্তি শুষে ফেলেছে। তারপরও তাঁর আঙুল নাচে, প্রজাপতির মতো। বেটোফেনের মুনলাইট সোনাটার সঙ্গে। তিনি আরাম চেয়ারে বসে কাঁপছেন, পারকিনসন্স না সোনাটার মূর্ছনায় বোঝা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে ঝুঁকে এসে মনোযোগের কান দিচ্ছেন সোনাটায়। আমার মাথা রিনঝিন করে, নেশা নেশা ভাব। পুরো রুমটা মনে হচ্ছে হালকা তুলোর মতো ভেসে আছে। পিয়ানোয় বেটোফেন সৃষ্টি করেছেন পরাবাস্তবতা। আমি তাঁর দিকে তাকাই। তিনি এখনো ঝুঁকে আছেন।
হঠাৎ আমার নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে, কে বেশি শক্তিশালী?
বেটোফেন না তিনি, যিনি সামনে কান বাড়িয়ে সুর শুনছেন?
ভদ্রলোকের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় অবিশ্বাস্য। কোনো রকমেই আমার তাঁর কাছে যাওয়ার কথা না। বলা হয়, ওয়াশিংটনের সাদা বাড়ির ভদ্রলোক এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ছয় মাস আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়! আমার তাঁর সঙ্গে শুধু দেখা হওয়ার কথা স্বপ্নে। কিন্তু তিনি বসে আছেন আমার সামনে। কান পেতে শুনছেন মুনলাইট সোনাটা। তাঁর নিজের বাজানো। বাজছে রেকর্ডে! একটু বোধ হয় ঠান্ডা লাগছে। আমি গরম গাউনের ওপর চাপিয়ে দিলাম পাতলা কম্বল। তিনি চোখের ভাষায় ধন্যবাদ দিয়ে আবার মনোযোগ দিলেন বেটোফেনে, আসলে বলা যায় নিজের সৃষ্টিতে। এখনো হালকা কাঁপছেন। কয়েক মাস হলো, নিউইয়র্ক এসেছি। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পাঠিয়েছে ফেডারেল রিজার্ভের সঙ্গে মুদ্রাবিষয়ক একটা কাজে। কয়েক দিন হলো ছুটি শুরু হয়েছে। লম্বা ছুটি। আমি ফ্রিজভর্তি খাবার নিয়ে আশ্রয়ে ঢুকেছি। ইচ্ছে ছুটির সময়ে কাজ এগিয়ে রাখব। বেরটের হব না। এই জম্পেশ ঠান্ডায় আমার ক্রিসমাস পালনের কোনো ইচ্ছে নেই।
প্রথম দিন আরামসে ঘুমালাম। দুপুরে খাবার বাদ গেল। সন্ধ্যায় স্যান্ডউইচ আর কড়া টার্কিশ কফি নিয়ে বসেছি, এমন সময় ফোন। বিরক্তিতে ফোন ধরতেই রিনঝিন ভেসে এল, ‘লং আইল্যান্ডস হ্যাভেন হাসপাতাল। আমি কি সায়েদের সাথে কথা বলছি?’
একটু ভড়কে গেলাম। হাসপাতাল?
‘হ্যাঁ, সায়েদ বলছি।’
‘হ্যাপি ক্রিসমাস সায়েদ, আমি বারবারা বলছি, হ্যাভেন হাসপাতাল। তুমি তো আমাদের “আই অ্যাম উইথ ইউ” প্রোগ্রামের ভলান্টিয়ার, তাই না?’
প্রথম বুঝতে পারলাম না, রিনঝিন কণ্ঠ কী বলছে? তারপর বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে পড়ল, এখানকার হাসপাতালগুলোতে নিঃসঙ্গ রোগীদের সময় দেওয়ার জন্য কিছু প্রোগ্রাম থাকে। ‘আই অ্যাম উইথ ইউ’ সে রকম একটি প্রোগ্রাম। অনেক আগে এখানে যখন ছাত্র ছিলাম, তখন আমিও নাম লিখিয়েছিলাম। তারপর ভুলেই গিয়েছি। কিন্তু ওরা ভোলেনি।
বললাম, ‘হ্যাঁ, করেছি। দশ বছর আগে। কিন্তু এর আগে আমার সাথে কখনো যোগাযোগ করা হয়নি।’
রিনঝিন কণ্ঠ বলল, ‘তা ঠিক, হয়তো দরকার পড়েনি। তবে আমার কম্পিউটার বলছে, আমাকে তুমি এখন সাহায্য করতে পারো। কারণ, তুমি লিখেছ, ভলান্টিয়ার করার জন্য তোমার পছন্দের সময় হচ্ছে ক্রিসমাসের ছুটি।’
আমি আসলে ফরমে তা-ই লিখেছিলাম। কারণ ছাত্রাবস্থায় আমার ছিল হতদরিদ্র অবস্থা। স্কলারশিপ আর টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টের টাকায় খাবারই ঠিকমতো জোটে না, তার আবার ক্রিসমাস।
ওপারের মেয়েটি অপেক্ষা করছে। আমি লম্বা নিশ্বাস নিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, বলেছিলাম। কী করতে হবে বলো।’
টেলিফোনে স্বস্তি ভেসে এল।
‘আমাদের একজন রোগী, কিছুদিন থেকে এখানে আছেন, আরও থাকতে হবে, সমস্যা হচ্ছে ছুটির সময় তাঁর সঙ্গ দরকার, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি কি পারবে?’
‘আমাকে কি রোগীর ব্যাপারে ধারণা দিতে পারো?’
‘না, সরি, ওটা বলা যাবে না। এই রোগীর সব তথ্য ক্লাসিফায়েড। আমিও জানি না। তুমি যদি রাজি থাকো তাহলে তোমাকে জানানো হবে, তবে একটি বন্ড সই করার পর। যেটাতে তুমি বলবে, কখনোই তুমি তার কোনো তথ্য প্রকাশ করবে না। এটাতে সই না করলে কাজটা তোমাকে দেওয়া হবে না।’
বেশ বিরক্তই লাগছে। ছাত্রজীবনের মমতাভরা হৃদয় এখন বাস্তবতার কাঠিন্যে কঠিন হয়ে গেছে। তখন যেটা করতে মন চাইত, তা এখন সম্ভব না। তারপরও ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করল না। বয়স্ক একজন নিঃসঙ্গ মানুষ সঙ্গ চাইছেন।
বললাম, ‘ঠিক আছে কখন আসব?’
‘কাল সকাল নয়টায়, ইফ ইউ প্লিজ।’
রিনিঝিনি কণ্ঠ ফোন রেখে দিল।
সেদিন সকালে নিউইয়র্কের চৌদ্দ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়েছে। মাইনাস তের।
ভোরে উঠে রাজ্যের কাপড় পরে, গাড়িতে স্নো টায়ার লাগিয়ে রওনা দিলাম। চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছি, নিজের আর হাসপাতালের।
ঘণ্টা খানেক পর জিব পুড়ে যাওয়া কফির সঙ্গে রোগীর ফাইল এল। তার আগে আমার বন্ড নেওয়া হয়েছে, কাজ করি না করি, যা দেখব তা প্রকাশ করা যাবে না। বিরক্তিতে গা গরম হয়ে যাচ্ছে, ঘোড়ার ডিমের এক রোগী আর ব্যাটারা এমন ভাব করছে যেন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে আমার হাতে তুলে দিচ্ছে।
ঘোড়ার ডিম নয়, যেন আস্ত হিমালয় ভেঙে পড়ল আমার মাথায়। ফাইল নয়, এ তো ঘন লাল আগুন! হাত পুড়ে যাচ্ছে।
এ লোক হাসপাতালে, কেউ জানে না! এটা তো বিশ্ব সংবাদ হতে পারত!
বলা হয় আলোর গতিতে তাঁর আঙুল নাচে। আসলে কি তাঁর আঙুল, না ঈশ্বরের? অনেকের সন্দেহ আছে।
তবে সে আঙুল পিয়ানোতে যে সুর তোলে তা যে দেবতাদের সুর, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি সুরের দেবতা।
তাঁর হাতে সুরের রং ফোটে।
একেক সময় একেক রং। বিটোফেনের পঞ্চম সিম্ফনি হলে সোনালি আর মুন লাইট সোনাটা হলে তরল রুপালি!
সভ্যতা এমনভাবে আর কারও হাতে সুরকে নাচতে দেখেনি।
তিনি হাসপাতালে! আর আমাকে দেওয়া হয়েছে তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার দায়িত্ব!
এক শ বছর গল্প করলেও তো এ গল্প ফুরাবে না! জিব পোড়ানো কফি অনেক আগেই বাইরে রাস্তায় জমে থাকা তুষারের চেয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে।
জন্মেছিলেন পোল্যান্ডে। হিটলারের ভয়ে বাবা যখন তাঁর আমেরিকায় পালিয়ে আসেন, তখন তাঁর বয়স দশ। হার্ভার্ডে সংগীত নিয়ে পড়তে যান ১৯৫৫ সালে। ত্রিশ বছর বয়সে বিটোফেনের ৩২টি সনেট গুচ্ছ সুরে বাঁধেন। শুধু এ কাজটির জন্যই তিনি ইতিহাস হয়ে থাকতে পারতেন। কারণ বিটোফেনকে নিয়ে এ সাহস করার মতো কেউ এর আগে জন্মাননি।
তারপর থেকে যা-ই করেছেন, মনে হয়েছে তিনি নন, ‘ওপরের উনি’ তাঁর আঙুলে ভর করেছেন। তিনিই ফোটাচ্ছেন সুর। পিয়ানোতে।
১৯৬২ সালের শেষের দিকে নিউইয়র্কে মেরিলিন মনরো তাঁর বাজনা শুনতে এসেছিলেন। কথা ছিল অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চে এসে তিনি শিল্পীকে ধন্যবাদ দেবেন। কিন্তু মাঝ অনুষ্ঠানে কোনো কথা না বলে মেরিলিন উঠে যান, তারপর বাড়ি ফিরে ত্রিশটি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে যান।
হাসপাতালে তিনি নাকি প্রেসিডেন্ট কেনেডিকে বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, এ সুরের রেশ হারিয়ে যাওয়ার আগে মরে যাওয়া ভালো।
আমার হাতে হালকা গরম কফি, বাড়িয়ে দিলে তিনি চুমুক দিচ্ছেন, বাচ্চাদের মতো চুক চুক আওয়াজ করে। তারপর মৃদু হাসছেন ধন্যবাদের হাসি। আবার ঝুঁকে পড়ে নিজেকে শুনছেন। হালকা সুরে মিউজিক সিস্টেমে বাজছে তাঁর রেকর্ড।
সিম্ফনি সাত তারপর আট। চলতে থাকবে বত্রিশ পর্যন্ত। তারপর প্রথম আলো ফোটা লালচে ভোরে ঘুমাতে যাবেন। এরপর সন্ধ্যা অবধি আমার ছুটি।
কথা বলেন খুব কম। যখন বলেন সেখানে থাকে বিনয়ের আভা।
আবার মাঝেমধ্যে দেখি চেহারা টকটকে লাল হয়েছে। বোঝা যায়, খুব রেগে আছেন, কার ওপর তা বোঝা যায় না। সে সময় আমি চুপ থাকি।
আবার কখনো ঘোরের মধ্যে চলে যান, শুধু হাত কাঁপতে থাকে, মনে হয় পিয়ানো খোঁজে, কিন্তু পায় না। কিছু বললেও বোঝেন না। সম্ভবত তখন তিনি চলে যান অতীতে, যখন মানুষ এক মাস আগে থেকে মাঝরাতেও লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত তাঁর কনসার্টের টিকিট কেনার জন্য, যখন ঈশ্বর কথা বলতেন তাঁর আঙুলে ভর করে।
মাঝেমধ্যে দুষ্টামিও করেন। একদিন রহস্য করে বললেন, ‘হার্ভার্ডকে দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ বিশ্ববিদ্যালয় কেন বলা হয় জানো?’
‘কী! হার্ভার্ড খারাপ?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই খারাপ। তুমি জানো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র পঞ্চাশ শতাংশ সফল হয়। বাকিরা হারিয়ে যায়। অথচ এরা সারা দুনিয়া ওলটপালট করে সেরা মেধাবীদের জড়ো করে, কিন্তু ফিরিয়ে দেয় তার অর্ধেক। তাহলে কী দাঁড়াল? হার্ভার্ড কি অত ভালো, যা তোমরা ভাবো?’
ঘোরের মধ্যে ছুটি শেষ হয়ে এল, আমার ডিউটির সময়ও। এরপর আবার হাসপাতাল তাঁর দায়িত্ব নেবে। অবশ্য তিনি এখন প্রায় সুস্থ। কিন্তু তারপরও হাসপাতাল তাঁকে ছাড়ছে না কিংবা তিনিই যাচ্ছেন না। নিঃসঙ্গ বাড়ির চেয়ে হয়তো হাসপাতালের সঙ্গই বেশি ভালো!
শেষ সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে বসে আছি। তাঁর মেজাজ বেশি ভালো না। বিকেলে রাগ করে গ্লাস ভেঙেছেন। একটু পরপর গরগর করছেন। হাসপাতাল থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, দরকার ছাড়া কথা না বলতে। চুপচাপ বসে আছি। আজ মিউজিকও বাজছে না। নিষেধ করে দিয়েছেন। কম্বল গায়ে শুয়ে আছেন, ছাদের দিকে চোখ। সে চোখে কোনো ভাব নেই, ভাষা নেই।
বাইরে তীব্র ঠান্ডা। মাইনাস ছয়। পুরো শহর যেন মৃত্যুশয্যায়। স্ট্রিট লাইটগুলো ঢাকা পড়ে গেছে বরফের চাদরে।
তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি পড়ছি। হাতে এরিক সেগালের থ্রিলার। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
ঘুম ভাঙল চাপা গর্জন শুনে, চমকে দেখি আধা ঘুমে তিনি উঠে বসেছেন। চাপা গলায় কাকে যেন ধমকাচ্ছেন, ‘গেট লস্ট, লিভ মি অ্যালোন, ম্যান।’ তাঁর ঠোট বেয়ে নামছে লালা। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম, তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম। কম্বলের নিচে ছোট্ট শরীর থরথর কাঁপছে।
কিছুক্ষণ পর কাঁপুনি থামল। বললাম, নার্স ডাকব? তিনি হাত নেড়ে না করলেন। তারপর মৃদু গলায় বললেন, ‘লাইট নিভাও, পানি দাও।’
হয়তো আলোতে তাঁর চোখ টাটাচ্ছে। আমি লাফ দিয়ে উঠে পানি নিয়ে এলাম, তিনি লম্বা ঢোঁকে খেলেন। মনে হলো খুব তৃষ্ণার্ত। পানি খাওয়ার পর আবার বললেন, ‘লাইট নিভাও।’
আলো নেভানোর পর নেমে এল কোমল অন্ধকার। শুধু বারান্দার হালকা বাতির ছটায় তাঁকে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললেন, ‘১৯৭৭।’
আমার দম বন্ধ হয়ে এল। ১৯৭৭!
প্রথম দিনেই বন্ডে লেখা ছিল, তাঁর সামনে এই শব্দটি উচ্চারণও করা যাবে না, প্রসঙ্গ তোলা তো দূরের কথা। এদিন তিনি বাজানো থামিয়ে দিয়েছিলেন!
ভরা মজলিসে পিয়ানোয় ঘুষি মেরে বলেছিলেন, ‘আমি আর কখনোই বাজাব না, কখনোই না।’ থরথর করে কাঁপছিলেন। তারপর আবার পিয়ানোতে ঘুষি। এরপরই জ্ঞান হারান। দর্শকদের সামনের সারিতে ছিলেন মোনাকোর প্রিন্স, তিনি লাফ দিয়ে উঠে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন, হাসপাতালে নিয়ে যান।
ভিয়েনা অপেরা হাউসে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল তা যদি হয় মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন, তাহলে সংগীতের প্রায় ঈশ্বর কেন সেদিন বাজনা ছেড়ে দিয়েছিলেন তা হচ্ছে বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। অনেক জল্পনা হয়েছে, কিন্তু উত্তর পাওয়া যায়নি।
তিনি ব্যাপারটি নিয়ে শুধু চুপই থাকেননি, ব্যাপারটা উঠলেই প্রায় মারতে যান। তাই এ ব্যাপারে কথা বলা নিষেধ।
সম্ভবত এটাই শতাব্দীর সবচেয়ে রহস্যময় নীরবতা।
আর সেই নীরবতা তিনি ভাঙছেন, আমার সামনে!
‘১৯৭৭!’
তিনি আবার ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, ‘ভিয়েনা অপেরা হাউস, ১৯৭৭, তুমি কি জানো ব্যাপারটা?’
আমি দম বন্ধ করে বলি, ‘হ্যাঁ।’
তিনি মুখ বাঁকা করে রহস্যময় হাসি হাসেন, ‘কিন্তু কেন তা জানো না, তাই না?’
আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘সেটা তো বিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।’তিনি প্রায় ঝুঁকে এসেছেন আমার মুখের কাছে, তাঁর নিশ্বাস পড়ছে আমার ঠোঁটের ওপর। ‘চল্লিশ সালে যখন বাবা নিউইয়র্ক পালিয়ে এলেন তখন আমার বয়স দশ বছর। মা নেই, আমি, আমার দু-বছরের বড় ভাই গিবসন—এ নিয়ে আমাদের পরিবার। কিন্তু আমাদের দু-ভাইয়ের মধ্যে কোনো মিল ছিল না। আমি ছোটখাটো আর গিবসন ছয় ফুট দুই। আমি ক্লাসে শেষের দিকে থাকি, গিবসন জীবনে দ্বিতীয় হয়নি। আমি খেলার মাঠে সুযোগই পাই না, আর সে টেনিসে লোকাল হিরো। পরে অল আমেরিকান ইয়ুথ র্যা ঙ্কিংয়ে সাত নম্বর ছিল। এসব আমার কাছে কোনো ব্যাপার ছিল না, যেটা আমার মাথাব্যথা ছিল, তা হচ্ছে বাবা যখন তাঁর সাথে আমার তুলনা করতেন। নিষ্ঠুর তুলনা। সে ছিল বাবার ব্লু আইডল বয়। আর আমি ছিলাম গুড ফর নাথিং। আমি পরীক্ষায় খারাপ করলে আমাকে গিবসনের সাথে তুলনা করা হতো। সে টেনিসে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এলে বাবা ক্রূর হেসে আমার দিকে তাকাতেন। মমতাহীন সে দৃষ্টিতে একজন কিশোরের মরে যেতে ইচ্ছে করত। ‘আমি গিবসনকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম। বলার অতীত ঘৃণা। সে সময় আমি আশ্রয় নিলাম পিয়ানোয়। ‘রাত-দিন পিয়ানো নিয়ে পড়ে থাকি। কিন্তু তেমন সুর ওঠে না। বাবা বাঁকা হাসি হাসেন, বলেন, “ভালো, নাইট ক্লাবের মিউজিক কন্ডাক্টর হতে পারবি। তোর বাজনা শুনে মাতালেরা নাচবে।” আমার গা রি রি করে। জেদ আমাকে পেয়ে বসে। পিয়ানোকে বশ মানাতেই হবে। ‘সিদ্ধান্ত নিই, মিউজিক নিয়ে আমি হার্ভার্ডে পড়ব। বাবাকে কিছুই বললাম না। তিনি আবার হাসবেন। হো হো নিষ্ঠুর হাসি। নিজে নিজেই আবেদন করলাম। তারপর রাত-দিন বেজমেন্টে পিয়ানো নিয়ে পড়ে রইলাম।
‘আমাকে চান্স পেতেই হবে। হার্ভার্ডে। বাবাকে দেওয়া সেটাই হবে আমার উপহার। কিন্তু আমি হলাম বঞ্চিতদের দলে। যাদের প্রকৃতি নির্মমভাবে বঞ্চিত করে। তাই আমার আঙুলে সুর ওঠে না। আমার ভর্তি পরীক্ষার এক মাস আগে গিবসন মারা গেল। সারা জীবন এই কাসানোভা বেপরোয়া ছিল। মারাও গেল বেপরোয়া ঘোড়া চালাতে গিয়ে। হর্স রাইডিং শিখছিল। বাবার বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেল। রাতারাতি তিনি বুড়ো হয়ে গেলেন। তবে আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, গিবসনের মৃত্যু আমাকে তেমন কষ্ট দিল না, বরং মনে মনে কেন যেন খুশিই হলাম। মনে হলো, আপদ বিদায় হয়েছে। আমি খুশিমনেই পিয়ানোতে মন দিলাম। তবে সেই পুরোনো সমস্যা, কিছুতেই সুর ওঠে না। আমার মন খারাপ। হার্ভার্ড পরীক্ষার তারিখ দিয়েছে, সারা দুনিয়ার ভবিষ্যৎ মিউজিক লিজেন্ডরা সেখানে পরীক্ষা দেবে। আর আমি, এ সুর নিয়ে যাব সেখানে? তীব্র আতঙ্কে সারাক্ষণ ঘামতে থাকি। আমার ঘুম হয় না, খাওয়া হয় না। আমি হার্ভার্ডে পড়তে চাই, নয়তো বাবাকে জবাব দেওয়া হবে না। আমাকে একদিনের জন্য হলেও সেখানে পড়তে হবে। যে করেই হোক। কিন্তু সুর আমার কাছে অধরাই থেকে যায়। প্রায় নার্ভাস ব্রেকডাউন নিয়ে পরীক্ষায় বসলাম। আমার সামনে পিয়ানো। আমার হাত ঘামছে, পিছলে যাচ্ছে কি-বোর্ড। আমার খুব কান্না পাচ্ছে, ছুটে গিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করছে। যাঁরা পরীক্ষা নেবেন তাঁরা অবাক হয়ে ভাবছেন, এ গাধা এখানে কী করছে। এমন সময় সুর উঠল। পিয়ানোতে, আমার আঙুলে! মনে হচ্ছিল স্বয়ং বিটোফেন নেমে এসেছেন। ছড়িয়ে দিচ্ছেন রং, সুরের রং।
একজন পরীক্ষক শুধু বলতে লাগলেন, ‘ও মাই গড, ও মাই গড।’ আরেকজন কাঁদতে লাগলেন ভেউ ভেউ করে।
তারপর থেকেই সুর রং নিয়ে ফুটেছে আমার আঙুলে। বলা হতো, আলোর গতির চেয়ে দুরন্ত আমার পিয়ানো।
টাইম ১৯৬৮ সালের পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র হিসেবে আমার আঙুলের ছবি নিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল। ক্যাপশন ছিল, “ঈশ্বরের আঙুল”।
তারপর ১৯৭৭ সাল।’
আমি দমবন্ধ উত্তেজনায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘সেদিন কী হয়েছিল, কেন বাজানো ছেড়ে দিলেন?’
‘কারণ সেদিন আমার ধৈর্য শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমার পক্ষে আর অভিনয় করা সম্ভব ছিল না।’
‘অভিনয়?’—আমার গলা প্রায় চিৎকারের মতো শোনায়।
‘হ্যাঁ, হার্ভার্ডে পরীক্ষার সময় যখন আমার হাত থেকে কি-বোর্ড ছুটে যাচ্ছিল ঘামে, ঝুঁকে থেকে যখন আমি অসহায় কান্না লুকোচ্ছিলাম, যখন বোঝা যাচ্ছিল এইমাত্র আমার স্বপ্ন নিহত হতে যাচ্ছে, তখন হঠাৎ আমাকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। আমি পড়ে গেলাম। তারপর বেজে উঠল সুর।
অবাক হয়ে দেখলাম, আমি নই, পিয়ানো বাজাচ্ছে গিবসন। আমার ভাই গিবসন, যে মারা গেছে এক মাস আগে! যে কোনো দিন পিয়ানো ধরেও দেখেনি। সে বাজাচ্ছে আর হাসছে, দুষ্টু হাসি, আমার দিকে তাকিয়ে। তাঁর হাত নেচে যাচ্ছে পিয়ানোতে—অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায়। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি, গিবসন কোত্থেকে? সে কখন পিয়ানো শিখল? সে তো মারা গেছে এক মাস আগে। আমি ছাড়া আর কেউ তাঁকে দেখছে না কেন?’
বৃদ্ধ হাঁপাচ্ছেন, কেমন লালচে তাঁর চোখের জল।
‘আমি আসলে কোনো দিন বাজাইনি। আমি বাজাতে পারি না। বাজিয়েছে মৃত গিবসন, সারা জীবন।’
তিনি আমার হাত ধরলেন, তারপর হাউমাউ কাঁদতে লাগলেন, আসলেই তাঁর চোখের জল লাল।
কেন লাল আমি জানি না।
হঠাৎ দূরের পিয়ানো নিজে নিজে বেজে উঠল।
সিম্ফনি নাইন, বিটোফেন।
কে যেন তা বাজাচ্ছে!
কেমন যেন বেগুনি আলোয় ধোঁয়া ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে, কি-বোর্ডে নেচে যাচ্ছে অশরীরী আঙুল।
ঈশ্বরের আঙুল?

এশিয়ার শিরায় শিরায় ব্লক থাকলে হার্ট কাজ করবে না

সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় মিলেমিশে কাজ করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে শেষ হল পঞ্চম ‘হার্ট অব এশিয়া’ সম্মেলন। আফগানিস্তানবিষয়ক এ সম্মেলন যৌথভাবে আয়োজন করে ইসলামাবাদ ও কাবুল। মোট ৩১টি দেশ এবং ১২টি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রতিনিধিরা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বৃহস্পতিবার দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে (বুধবার) মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী কবি আল্লামা ইকবালের ‘হার্ট অব এশিয়া’ কবিতাটির কয়েকটি চরণ আবৃত্তি করেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি। ইকবালের ওই কবিতায় সমগ্র এশিয়াকে শরীর ধরে কাবুলকে তার ‘হার্ট অব এশিয়া’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এশিয়ায় আফগানিস্তানের গুরুত্ব বোঝাতে ইকবালের এ কবিতাটিই সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন ঘানি। পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ওই কবিতার সূত্র ধরে বলেন, এশিয়ার শিরায় শিরায় ব্লক থাকলে হার্ট কাজ করবে না। ইকবালের উপমা ব্যবহার করে সুষমা আঞ্চলিক সংঘাত ও সন্ত্রাসবাদকে ইঙ্গিত করেন। এ সম্মেলনে সুষমা স্বরাজ আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমন ও আফিগানিস্তানে স্থিতিশীলতা-উন্নয়নে ভারতের অঙ্গীকারের ওপর জোর দেন। প্রতিবেশী বৈরী পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে সুষমা স্বরাজ বলেন, পাকিস্তান যখন চাইবে তখনই তাদের সহায়তা করতে ভারত প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীরা যাতে ঘাঁটি বা আবাস গড়তে না পারে তার জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ সময় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে সুষমা বলেন,
‘আমরা এখন অনেক পরিণত হয়েছি। দু’দেশের আত্মবিশ্বাসও যথেষ্ট বেড়েছে। দু’দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককেও আরও জোরদার করে তুলতে হবে।’ ভারত পাকিস্তানের এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দু’দেশ আবার শান্তি আলোচনা শুরু করবে। এ ছাড়া আগামী বছর সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে ইসলামাবাদ যাবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যা গত ১২ বছরে প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর পাকিস্তান সফর বলে বিবেচিত হবে। এদিকে হার্ট অব এশিয়া সম্মেলনে তেমন কোনো অগ্রগতি না হলেও আঞ্চলিক উন্নয়নের স্বার্থে ৩টি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এক. আফগানিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা। দুই. পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠায় (সিবিএম) ক্রমবর্ধমান টেকসই পদ্ধতির বাস্তবায়ন এবং তিন. আঞ্চলিক বিভিন্ন সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় বৃহত্তর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যস্থতায় তালেবানদের সঙ্গে বৈঠকে সম্মত হয়েছে আফগান সরকার। এর আগে ‘হার্ট অব এশিয়া’ সম্মেলনের ফাঁকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গেও বৈঠক করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে দুই নেতা সন্ত্রাস ও কাশ্মীর সমস্যাসহ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এ ছাড়া আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সঙ্গেও বৈঠক করেছেন সুষমা।

ক্ষমা করা ও চাওয়ার রাজনীতি by মাসুদ মজুমদার

ক. যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে আমরা কি পাকিস্তানিদের বগল বাজানোর সুযোগ করে দিলাম! এই মুহূর্তে বাংলাদেশ-ভারত অন্তত সরকারিভাবে এক মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। পাকিস্তান ভিন্ন মেরুতে। বিপরীত মেরুর এই আকর্ষণ-বিকর্ষণ ও পাক-ভারত উত্তেজনায় আমরা কোনো পক্ষ না হলেই ভালো ছিল। দুই দেশ যখন ক্রিকেট ডিপলোম্যাসি করে কিংবা গোপন আঁতাতে যায়, তখন আমাদের সাক্ষী রাখে না। আমাদের সব ব্যাপারে তাদের সাক্ষী মানার যুক্তি নেই। বাস্তবতা ভিন্ন। আমরাও পক্ষ। কেউ কেউ ঠাণ্ডামাথায় পক্ষ হতে চান। জনগণ হয়তো তা চায় না। এটা বিজয়ের মাস। এত দিন পর আমরা আর পাকিস্তানি বর্বরতার নিকুচি না-ই বা করলাম। তবে বিজয় দিবসে, স্বাধীনতার মাসে একাত্তর আমাদের নাড়া দেবেই। ন’মাসের একটা ইতিহাস ও চিত্র সামনে এসে দাঁড়াবে। ৪৪ বছর ধরে এর ব্যতিক্রম হয়নি। কখনো বেশি, কখনো কম। এই দেশ, মানচিত্র ও পতাকা থাকলে এই ধারার ব্যত্যয় খুব একটা হওয়ার কথা নয়। তারপরও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে পাকিস্তান এতটা আবেগ দেখানোর সুযোগ নিলো কেন! ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ছেড়ে দেয়ার দায়টাই কি আমাদের দিকে ঠেলে দিলো। ১৯৫ জনকে ছেড়ে দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাঙালিরা ক্ষমা করতে জানে। এটাই কি তার প্রতিদান? ধর্ষণ, লুণ্ঠন, হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করার পর অভিযুক্ত হয়েও তারা ছাড়া পেল। তাদের দেশীয় সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পেল। ইনসাফ কি বলে না, পাকিস্তানি চিহ্নিত অপরাধীদের ছেড়ে না দিয়ে কয়েকবার মৃত্যুদণ্ড দেয়া সঙ্গত ছিল। আমরা পাকিস্তানি অভিযুক্তদের ছেড়ে দিয়ে নিজের দেশের নাগরিকদের বিচার করছি বলেই কি তাদের আঁতে ঘা লাগল। মানলাম, যুক্তির বিচারে এমনটি হয়নি, আমরা যুক্তি দিয়ে পথ চলছিও না। আমাদের আবেগ, রাজনীতি এবং অন্যদের প্রেসক্রিপশন বিবেচনা হয়তো বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাচ্ছে। তারপরও পাকিস্তান সরকারের বাড়তি প্রতিক্রিয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, পাকিস্তান আমাদের মুক্তিযুদ্ধে স্বীকৃত প্রতিপক্ষ। ইতিহাস থেকে এই সত্যটি মুছে ফেলা যাবে না।
২০০৯ সালে একটি মিডিয়া টিমের সদস্য হিসেবে পাকিস্তান সফরের সুযোগ হয়েছিল। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শওকত আজিজ; ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং। আমরা ছিলাম একটি ছদ্মবেশী সামরিক সরকারের আওতায়। প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। কাকতালীয়ভাবে উপমহাদেশের এই তিন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকে চাকরি করেছেন একসাথে। মনমোহন সিং ছিলেন সিনিয়র, দ্বিতীয় সিনিয়র শওকত আজিজ, তারপর ফখরুদ্দীন আহমদ।
৯ সদস্যের মিডিয়া টিমে দু’জন ছিলেন দু’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এর একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এবং নারী; অন্যজন ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর। অবশিষ্ট সাতজন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সংবাদ সংস্থার সিনিয়র সাংবাদিক। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমাদের সাক্ষাৎ ছিল ঘণ্টাব্যাপী।
আমরা সবাই পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীকে একাত্তর ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইবার তাগিদ দেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। তিনি ভুট্টো-মুজিব বিশেষ সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুর করাচিতে ওআইসি সম্মেলনে যাওয়া, ত্রিদেশীয় সম্মতিতে ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী জেনেভা কনভেনশনের দোহাইতে ছেড়ে দেয়া, ক্ষমা করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ঔদার্য, পারস্পরিক স্বীকৃতি, কূটনৈতিক বোঝাপড়ার প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। ক্ষমা চাইবার প্রসঙ্গটা সজ্ঞানে চেপে গেলেন। বরং আকারে-ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলেন, ইস্যুটি ফরগেট, ফরগিভ ফর্মুলায় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আমাদের পুরো মিডিয়া টিম ও বাংলাদেশের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ জনগণের জন্য তার শুভেচ্ছা, কৃতজ্ঞতার অকৃপণ শব্দচয়ন আমাদের মুগ্ধ করল, কিন্তু ক্ষমা চাইবার দাবিটি আমরা কেউ ভুলে গেলাম না। মিটিং শেষে সমস্বরে বললাম, তিনি ক্ষমা চাইলেন না। ব্যথিত হলাম। সম্ভবত এটাই আমাদের জাতীয় অহম।
প্রসঙ্গটি বিনা কারণে এখানে টানিনি। সামনে বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস। তার এক দিন পর বিজয় দিবস। বিজয়ের রক্তিম শুভেচ্ছা জানানোর আগে আমরা বুদ্ধিজীবী হত্যার দগদগে ক্ষতটিতে টনটনে ব্যথা অনুভব করব। স্মৃতি তর্পণ করে একসময় সব কিছু ভুলেও যাবো। কিন্তু যে বিষয়টি ভুলে যাবো না- সেটি হচ্ছে পাকিস্তানিরা ক্ষমা চায়নি। বাংলাদেশের যেসব মানুষ একাত্তরের দায় বহন করেন, কিন্তু ভুল স্বীকার করেন না, তাদের ব্যাপারে তিন প্রজন্মের ক্ষোভ ফিবছরের মতো কি জেগে উঠবে না! যেকোনো দল ও গোষ্ঠী রাজনৈতিক ভুল করতেই পারে। রাজনৈতিক ভুলের খেসারত এড়ানো যায় না। মানুষের হক নষ্ট হলে মানুষের কাছেই ক্ষমা চাইতে হয়। বিধাতা তার হক নষ্টের জন্য ক্ষমা করেন, বান্দার হক নষ্টের জন্য ক্ষমা করেন না। তাওবা না করলে পাপেরও স্খলন হয় না। স্বাধীন দেশের মানচিত্রজুড়ে লাল-সবুজের পতাকা উড়বে। আর আমরা তার প্রতি সম্মান দেখাব না, তা কী করে হয়! স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নেব, কিন্তু দেশটির জন্মের প্রসব বেদনায় বিশ্বাস করব না, সেই জন্মের ইতিহাসের সাথে কলঙ্কের দাগ থাকলে তা ধুয়ে মুছে সাফ করব না, তাও কি হয়! জাতি হিসেবে আমরা আবেগপ্রবণ- এটা অর্ধসত্য হতে পারে, পূর্ণ সত্য নয়। জাতিরাষ্ট্রের ধারণা আমরা সযত্নে লালন করি, কিন্তু দায়টা পালন করি না। এখান থেকেই ভ্রষ্টাচার ও গণতন্ত্রচর্চার অভাবের ভ্রুণ জন্ম নেয়, এবং বেড়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের দোহাই, আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনা ফিরিয়ে দিন। বিজয় দিবসের দোহাই, রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করুন। শত্রুরা ভাগ-বিভাজনের সুযোগ নেবেই। আপনি আমি সেই সুযোগ দিলে ঘুঘু বারবার অর্জিত ফসল সাবাড় করবেই। একাত্তরে যার যতটুকু দায় আছে, তার ততটুকু শোধ করা উচিত। নয়তো বিবেকের দংশন এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণের টার্গেট এড়ানো যাবে না। মানুষ কৃতকর্মের স্বীকৃতি দিয়ে ক্ষমা চাইলেই সব কিছুর উপসংহার হয়ে যায় না। কিন্তু উল্লেখযোগ্য মানুষ তাদের প্রতি সহমর্মী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্য এই সহমর্মিতা খুবই জরুরি।তা ছাড়া যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল হতেই পারে। সেই ভুলের দায় না নিয়ে কোনো উপায় নেই। যুদ্ধে হারলে সত্য-মিথ্যা সব ইতিহাস বিজয়ীর গোলায় উঠবেই। ভোটে হেরে গেলেও পরাজয় মেনে নতুনভাবে যাত্রা করতে হয়। হারের কারণ চিহ্নিত করতে হয়। সেভাবেই ভবিষ্যৎ রচনা করতে হয়। এতে লজ্জা বা অসম্মান খুঁজলে তাদের রাজনীতি না করাই উত্তম। ইন্দিরা গান্ধী জোর করে ভেসেক্টমি-লাইগেশন করার কারণে এবং জরুরি অবস্থা জারির জন্য ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ক্ষমা চেয়ে আবার ক্ষমতায় এসেছিলেন। রাজনৈতিক ভুলের খেসারত দিয়ে আওয়ামী লীগ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। বর্তমানে বিএনপি-জামায়াত জোট কি রাজনৈতিক ভুলের খেসারত দিচ্ছে না! বর্তমান জোট সরকারকে কি বিচ্যুতিগুলোর দায় নিতে হবে না। অবশ্যই নিতে হবে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যম্ভাবী। অপরাধের দায় অনিবার্য। তবে অপরাধ বিচারের মানদণ্ড মানুষের আদালতে রাজনৈতিক জিঘাংসার ঊর্ধ্বে নয়। আদালতে আখেরাতের বিষয়টি প্রশ্নাতীত। তাই অপরাধের মাত্রা নিরূপণের বিষয়টি আপেক্ষিক হলেও রাজনৈতিক ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা করা সব সময় প্রাসঙ্গিক। এর সাথে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন একেবারেই গৌণ। তাই ভুলের অকপট স্বীকৃতি সব সময় মর্যাদা বাড়ায়। জনগণের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা উদার আচরণ পাওয়ার পথ প্রশস্ত করে। ক্ষমাপ্রার্থীর পক্ষে আমজনতা দাঁড়িয়ে যায়। এই মাটি আমার আপনার, এখানে কী ফসল ফলাব তা আমরাই ঠিক করব। সাময়িক পরগাছা জন্মালে তাও উপড়ে ফেলা আমাদের দায়িত্ব। পরজীবী বাসা বাঁধলে সেটাও বিনাশ করার দাওয়াই এ দেশের জনগণের কাছে রয়েছে। তাই জনগণকে আস্থায় নিন।
খ. স্থানীয় নির্বাচনের বাতাবরণেও রাজনীতি কার্যত উন্মুক্ত হয়নি। গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের অভাবে অবারিত হয়নি গণতন্ত্রচর্চার রুদ্ধ দরজাগুলো। পৌর নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। দলীয় মেজাজে নির্বাচন রাজনৈতিক কোলাহল বাড়াবে, এক রত্তি গণতন্ত্রও ফিরিয়ে আনবে না। উপরি কাঠামোয় গণতন্ত্রের চাষবাস না করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এক ধরনের আইয়ুবি চর্চা। এ ধারায় উপজেলা নির্বাচনও গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারপরও বিরোধী দল থেকে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদেরকেও সরকার সহ্য করতে রাজি হয়নি। বিরোধী দল ও জোটের নাম নিয়ে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের সমূলে উপড়ে ফেলা হয়েছে। জেলা পরিষদে কোনো নির্বাচনের উদ্যোগই নেয়া হয়নি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত সরকারদলীয় নেতা, যাদের সংসদে আনা যায়নি, তাদের জেলা পরিষদে পুনর্বাসন করা হয়েছে। সংসদ থেকে গ্রামের কাউন্সিলর, প্রশাসনের উপরি কাঠামো থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় লোকদের পুনর্বাসন করার এতটা সর্বপ্লাবী রূপ এ দেশের মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি। আমরা যারা আইয়ুবের বুনিয়াদি গণতন্ত্র দেখেছি, তারা অবশ্যই সাক্ষ্য দিতে পারব- আইয়ুব বর্তমান সরকারপ্রধানের তুলনায় দুগ্ধপোষ্য শিশুই ছিলেন। প্রশাসনকে আইয়ুব ব্যবহার করেছেন, দলীয় ও আত্মীয়করণের মতো বিষয়গুলো উপেক্ষা করেছিলেন।
আইয়ুবি দুঃশাসনের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য, বক্তব্য ও ভূমিকা আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে বাধ্য। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি বঙ্গবন্ধু হননি। একজন মুজিব হয়ে উঠেছিলেন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ। সেই পথ ধরেই তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন।
পৌর নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে বিরোধী দল সম্ভবত বুঝে নিয়েছে এর ফলাফল কী দাঁড়াবে। ফেনী ও কুমিল্লায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার খবর মিলেছে। ইসির বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপারে নির্বিকার থাকার অভিযোগ গতানুগতিক। তারা বোধ করি নিশ্চিতভাবেই জানেন সমন্বয় হীন ও আজ্ঞাবহ ইসির পক্ষে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মতো কোনো হিম্মত অবশিষ্ট নেই। তারা চাকরি করেন। সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ও শপথ পালন করার সামর্থ্য রাখেন না।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনী আদলের রূপান্তর ঘটে এখন কোথাও কোথাও ভোটের উৎসব থাকবে। কিন্তু এক তরফা নির্বাচনের ধারায় সামান্যও হেরফের হবে না। বিরোধী দল বাস্তবে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মতো এখানেও গণতন্ত্রচর্চার কোনো স্পেস পাবে না। স্থানীয় নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া ছাড়া কিছুই হবে না। ধরপাকড়, গুম, অপহরণ, গণগ্রেফতার ও জেলজুলুমের মধ্যে থেকে বিরোধী দলের সমর্থকেরা একটু নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ নিতে চাইবেন, কতটা পারবেন তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সরকার এসব নেতিবাচক বিষয়গুলোকে তাদের সাফল্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপ্রতিহত প্রভাব হিসেবে দেখছে। জনগণ কিভাবে দেখছে তা ভেবে দেখার গরজ কিংবা দায় কোনোটি সরকারের নেই। সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনের ধারায় পৌর নির্বাচন আরো একটি ক্ষত বাড়াবে। সব ক্ষত এক সময় গ্যাংরিনের উপসর্গ নিশ্চিত করবে। তখন মানুষ বাঁচাতে অঙ্গহানি মেনে নেয়া ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকবে!
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি অনুরোধ, আপনারা যেসব মন্দ উপমা সৃষ্টি করছেন, তার খেসারত আপনারাই দেবেন। বিএনপি জোটের ভুলের খেসারত সুদে-আসলে তাদেরকেই দিতে হচ্ছে। রাষ্ট্র ও সরকারের সব ক’টি ভরকেন্দ্রকেই ভুলের দায় নিতে হয়, খেসারত দিতে হয়। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ব্যাপারে প্রত্যাশা বেশি। ক্ষোভও বেশি দানা বাঁধবে- এটাই স্বাভাবিক। জনগণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা করে ও ভাবে- প্রধানমন্ত্রী সক্ষম মানুষ, তিনি সিদ্ধান্ত নিতে জানেন। সিদ্ধান্ত আদায় করতেও পারেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তার নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং চমৎকার। প্রত্যাশার এ জায়গাটিতে তিনি যতটা সম্মান দেখাবেন ততটা পাবেন। ততটাই হারাবেন।
masud2151@gmail.com

দাওয়াতের অন্যতম পথ ওয়াজ মাহফিল

কোরআন কারিমের ৭৭টি নামের এক নাম হলো ‘ওয়াজ’ বা উপদেশ। মহান আল্লাহ হলেন প্রথম ওয়ায়েজ বা ওয়াজকারী। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন দ্বিতীয় ওয়ায়েজ—এই সূত্রে নবী করিম (সা.)-এর উত্তরাধিকারীরা ওয়ায়েজিন। এই উম্মতের দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করবেন ওয়ারেসাতুল আম্বিয়া তথা নবীদের উত্তরাধিকারী উলামায়ে কিরাম। আর উলামায়ে কিরামের দায়িত্ব হলো এই দাওয়াতি কাজ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রাখা। ওয়াজ, নসিহত, বয়ান, খুতবা, তাফসির ইত্যাদি দাওয়াতের প্রচলিত মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়।’ (আল কোরআন, পারা-১৪, সূরা: নাহল, আয়াত: ১২৫)। দাওয়াতি আলোচনার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন: ওয়াজ, নসিহত, বয়ান, খুতবা, তাফসির ইত্যাদি। ‘ওয়াজ’ হলো সুন্দর, আকর্ষণীয়, যুক্তিপূর্ণ ও হৃদয়স্পর্শী আবেদনময় আলোচনা। সাধারণত ওয়াজ সুরেলা কণ্ঠে উপমার মাধ্যমে আকর্ষণীয় উপায়ে গল্প–কাহিনির সমন্বয়ে পরিবেশন করা হয়। যিনি ওয়াজ করেন, তাকে ওয়ায়েজ বলে। ওয়ায়েজিন হলো এর বহুবচন। ‘নসিহত’ হলো কল্যাণ কামনায় আন্তরিক আদেশ বা অনুজ্ঞাসূচক চূড়ান্ত নিবেদন। এর জন্য ব্যক্তিত্ব, অধিকার ও কল্যাণকামী হওয়া প্রয়োজন। যিনি নসিহত করেন, তাঁকে নাসিহ বলা হয়। নাসিহিন এর বহুবচন। হাদিস শরিফে আছে, ‘নসিহত অর্থাৎ সদুপদেশ বা কল্যাণ কামনাই দ্বীন বা ধর্মের মূল কথা।’ (বুখারি)।
‘বয়ান’ হলো বক্তৃতা বা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, যাতে নির্ধারিত বিষয়ের বিবরণভিত্তিক সুস্পষ্ট বর্ণনা থাকে। এর জন্য পর্যাপ্ত বিষয়জ্ঞান, দালিলিক প্রমাণ প্রয়োজন। কোরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দয়াময় আল্লাহ, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনি তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে “বয়ান”।’ (আল কোরআন, পারা: ২৭, সূরা: আর রহমান, আয়াত: ১-৪)। ‘খুতবা’ হলো ভাষণ, যাতে দায়িত্বশীল ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কোনো বিষয়ে কর্মসূচির উল্লেখ করে থাকেন। যিনি খুতবা প্রদান করেন, তাঁকে খতিব বলা হয়। এর বহুবচন খুতাবা। এর মূল হলো খিতাব অর্থাৎ সম্বোধন বা উপস্থাপন। ‘তাফসির’ হলো কোরআনের নির্ধারিত অংশ বা বিষয়ে যোগ্য মুফাসসির কর্তৃক মূলনীতির ভিত্তিতে সুন্নাহ, ফিকাহ ও প্রয়োজনীয় ইসলামি শাস্ত্রসমূহের আলোকে ব্যাখ্যা করা। যিনি তাফসির করেন, তাঁকে ‘মুফাসসির’ বলা হয়। ‘মুফাসসিরিন’ হলো এর বহুবচন। এ জন্য অগাধ ইসলামি জ্ঞানের প্রয়োজন, বিভিন্ন গ্রন্থে মুফাসসিরের জন্য ১০ থেকে ৪০টি বিষয়ের জ্ঞান থাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু সব তাফসিরকারক আলেম তাফসিরের শর্তে মুফাসসিরের মানোত্তীর্ণ নন; তাই যাঁরা নিজে মুফাসসির না হলেও অন্য মুফাসসিরদের তাফসির পড়ে মানুষের কাছে তা পেশ করেন, তাঁদের জন্য অন্তত দুটি শর্ত প্রযোজ্য। যথা: ব্যক্তির বিশ্বস্ততা ও সূত্রের গ্রহণযোগ্যতা। অর্থাৎ ব্যক্তিকে দ্বীনদার, পরহেজগার, ন্যায়নিষ্ঠ হতে হবে, বর্ণনায় সততা থাকতে হবে এবং তিনি যেসব তাফসিরগ্রন্থ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, সেগুলো বিশুদ্ধ ও অবিসংবাদী হতে হবে।
এ ধরনের তাফসির উপস্থাপনকারীদেরও বর্তমানে মুফাসসির নামে আখ্যায়িত করা হয়। এঁরা মুফাসসিরে হাকিকি বা প্রকৃত মুফাসসির নন, বরং তাঁরা মুফাসসিরে মাজাজি বা রূপকার্থে মুফাসসির। ওয়াজে সাধারণত কোরআনের আয়াত, নবীজি (সা.)-এর হাদিস, ফিকহি মাসায়িল ও উপদেশমূলক কাহিনি মূল প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত। যে ওয়াজে কোরআনের বয়ান সবচেয়ে বেশি, তারপর হাদিসের বয়ান এবং গল্প-কাহিনি সবচেয়ে কম, সেই ওয়াজ বেশি উপকারী। যে ওয়াজ এর যত বিপরীত, তার উপকারিতাও তত কম। ওয়াজে সাধারণত তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাত, ইমান ও আমল, হক্কুল্লাহ তথা আল্লাহর হক ও হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক; হারাম ও হালাল, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি থাকা উচিত। তবে ওয়াজে বিতর্কিত মাসআলা–মাসায়িল, অপ্রয়োজনীয় অভিনব বিষয়, মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ, ভুল-বোঝাবুঝি ও সংশয় সৃষ্টি হতে পারে—এমন কোনো বিষয় থাকা অনুচিত। দ্বীনি ইলম শিক্ষা ও দাওয়াতি কাজের জন্য সনদ বা সূত্রপরম্পরা থাকা জরুরি। সনদ ছাড়া ইসলামি প্রচারকার্য অনধিকারচর্চার শামিল। সনদ দুই প্রকার—একটি হলো সংক্ষিপ্ত, অন্যটি বিস্তারিত। প্রথমটি নিজের আমলের জন্য যথেষ্ট, দ্বিতীয়টি শিক্ষাদান ও প্রচারের জন্য অপরিহার্য। আজকাল অনেকেই তাফসির মাহফিল করেন, কিন্তু তাতে শুধু ওয়াজই করে থাকেন। ওয়াজ-নসিহত করারও কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। পর্যাপ্ত শিক্ষাগত ইলমি যোগ্যতা, অবয়ব সুরত সুন্নাত মুতাবিক হওয়া, আখলাক সিরাত নবী (সা.)-এর আদর্শে আদর্শিত হওয়া, তাকওয়ার অধিকারী মুত্তাকি হওয়া, ইখলাসওয়ালা মুখলিস হওয়া, তাওয়াক্কুল আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা থাকা, ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু হওয়া, কপটতামুক্ত সরলমনা হওয়া, বিনয়ী হওয়া, সুমিষ্টভাষী হওয়া, ভদ্র ও মার্জিত রুচিসম্মত হওয়া, দূরদর্শী হওয়া, সব বিষয়ে মতামত না দেওয়া বা কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য না করা,
নিজের বিদ্যা ও পাণ্ডিত্য জাহির না করা, হিকমতের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনমতো কোরআনের আয়াত ও হাদিস উল্লেখ করা, সহিহ কাহিনি বলা, উদ্ধৃতি যেন নির্ভুল হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা, শব্দ–বাক্য ও উচ্চারণ শুদ্ধ হওয়া, তাজবিদসহ বিশুদ্ধ তিলাওয়াত করা, গ্রামারসহ আরবি পাঠ করা, কথায় ও কাজে মিল থাকা, উম্মতের ইসলাহ তথা সংশোধন ও কল্যাণকামিতার মনোভাব থাকা, ইতিবাচক কথা ও আশার বাণী শোনানো এবং নিয়ত সহিহ থাকা। হাদিয়া দেওয়া ও নেওয়া সুন্নত। তবে ওয়াজ করে তার বিনিময় গ্রহণ না করাই উত্তম। এতে এর সুফল বা প্রভাব কমে যায়। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অনুসরণ করো তাদের, যারা তোমাদের নিকট কোনো প্রতিদান চায় না এবং যারা সৎপথপ্রাপ্ত।’ (আল কোরআন, পারা: ২৩, সূরা: ইয়াসিন, আয়াত: ২১)। ধর্মীয় সেবা দিয়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ হলেও তা উত্তম নয়। তাই সামর্থ্যবানদের জন্য তা পরিহার করাই শ্রেয়। এটাই ইখলাস ও তাকওয়ার উচ্চ স্তর। নবী-রসুলগণ দাওয়াতি কাজের শেষে সাধারণত এভাবেই বলতেন, ‘আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না; আমার পুরস্কার তো জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকটই আছে।’ (আল কোরআন, পারা: ১৯, সূরা: শোআরা, আয়াত: ১০৯, ১২৭, ১৪৫, ১৬৪ ও ১৮০)। যুক্তিসংগত কারণ ও শরয়ি ওজর ছাড়া মাহফিলের তারিখ প্রত্যাহার করা মোটেই উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং প্রতিশ্রুতি পালন করিয়ো; নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (আল কোরআন, পারা: ১৫, সূরা: বনি ইসরাইল/ইসরা, আয়াত-৩৪)। হাদিস শরিফে আছে, ‘যার আমানতদারি নেই, তার ইমান নেই, যার প্রতিশ্রুতি রক্ষা নেই, তার কোনো ধর্মই নেই।’ (তিরমিজি)। আল্লাহ সব ওয়ায়েজিনকে যথার্থভাবে কবুল করুন। মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক: আহছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com

ট্রাম্পের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা খর্ব হচ্ছে: পেন্টাগন

বিতর্ক উঠলেও অনেক সমর্থকই ডোনাল্ড
ট্রাম্পের ছবি বুকে লাগিয়েছেন l এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য দেশটির মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক; এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তাকে খর্ব করেছে। পেন্টাগন বলেছে, এই মন্তব্য ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রচারণাকে উসকে দেবে।
গতকাল বুধবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি পিটার কুক ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘আইএসের প্রচারণাকে উসকানি দেয় অথবা মুসলমানদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে দাঁড় করিয়ে দেশটিকে ঝামেলায় ফেলে দেয়; এমন যেকোনো কিছু নিশ্চিতভাবেই শুধু আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গেই নয় বরং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।’
পেন্টাগন বলেছে, মুসলমানদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করা হলে তা উগ্রবাদী আদর্শ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে গত সোমবার এক নির্বাচনী সভায় ট্রাম্প বলেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে। এর আগে নির্বাচনী দপ্তর থেকে প্রচারিত এক তথ্য বিবরণীতে ট্রাম্প বলেন, আমেরিকার প্রতি মুসলিমদের বিদ্বেষ এত তীব্র যে তা ‘ধারণারও বাইরে’। এই ঘৃণার উৎস কী এবং আমেরিকার জন্য তা কী হুমকি সৃষ্টি করেছে, তা পুরোপুরি বুঝে না ওঠা পর্যন্ত মুসলিমদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা চালু রাখতে হবে।
ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের জন্য তাঁকে ‘বিকৃত মস্তিষ্কসম্পন্ন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তাঁর দলের আরেক মনোনয়নপ্রার্থী ও ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর জেব বুশ। হোয়াইট হাউস এবং মুসলিম নেতাদের পক্ষ থেকেও ট্রাম্পের ওই বিতর্কিত মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।
ট্রাম্পের আস্ফালন অব্যাহত: যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সব মহল থেকে নিন্দিত হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেননি। মঙ্গলবার এমএসএনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট হাজার হাজার জাপানি ও ইতালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিককে বিশেষ ক্যাম্পে অন্তরীণ থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা এক যুদ্ধের মধ্যে বাস করছি।’ তিনি মুসলমানদের সঙ্গে যে ধরনের ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে হিটলার ইহুদিদের সঙ্গে একই ধরনের ব্যবহার করেছিলেন—এ কথা মনে করিয়ে দিলে ট্রাম্প বলেন, ‘কে কী বলল, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।’
বস্তুত, সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামা থেকে শুরু করে রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করলেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় কোনো ভাটা পড়েছে, এ কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। একাধিক রক্ষণশীল টিভি ও রেডিও ব্যক্তিত্ব ট্রাম্পের বক্তব্য সমর্থন করেছেন। বিখ্যাত টিভি ব্যক্তিত্ব লরাইংগ্রাম টুইটারে লেখেন, ‘ট্রাম্প আমেরিকার জনগণের মানসিকতা খুব ভালো করেই জানেন।’
সিনেটর টেড ক্রুজ, যিনি রক্ষণশীল ইভানজেলিকাল ধর্মাবলম্বীদের ভোট নিজের পক্ষে টানার ব্যাপারে ট্রাম্পের সঙ্গে সমানে লড়ছেন, তিনি কার্যত তাঁর বক্তব্যের পক্ষে মত দিয়েছেন। আগের দিন ট্রাম্পের প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করলেও মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল হিলে ক্রুজ সাংবাদিকদের বলেন, আমেরিকার সীমান্তপথগুলো নিরাপদ করার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার সাহসিকতার জন্য তিনি ট্রাম্পকে সাধুবাদ জানান।
এ দেশের উদারনৈতিক ভাষ্যকারেরা মনে করছেন, ট্রাম্প খুব ভেবেচিন্তেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষমূলক অবস্থান নিয়েছেন। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের একাংশ, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী নির্বাচনের প্রাইমারি বা প্রাথমিক পর্যায়ে যারা ঠিক করবে কে তাদের দলের মনোনয়ন পাবেন, তাদের অধিকাংশই প্রেসিডেন্ট ওবামা ও তাঁর অনুসৃত নীতি সর্বান্তঃকরণে অপছন্দ করেন। এদের কাছে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের ক্ষমতাচক্রের বাইরের একজন মানুষ, তাঁর কঠোর ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব, তা যতই অবাস্তব বা আগ্রাসী মনে হোক না কেন, তাদের আকৃষ্ট করেছে।
মুসলিমদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে একশ্রেণির মানুষ আগে থেকেই ক্ষিপ্ত, প্যারিস ও স্যান বার্নার্দিনোর ঘটনার পর তাঁদের ক্রোধ আরও বেড়েছে। ট্রাম্প ঠিক এই ভোটারদের সমর্থন আশা করছেন। অনেকের ধারণা, প্রাথমিক ভোটের হিসাব মাথায় রেখেই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ইসলামবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প।

মাত্রাহীন মুদ্রা পাচার

এক বছরে বিদেশে অর্থ পাচার ৩৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার তথ্যটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এর মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির যে চিত্রটি বের হয়ে আসছে, তা খুবই হতাশার। প্রমাণ হচ্ছে, দেশে মানুষের হাতে অর্থ রয়েছে কিন্তু তা দেশে কাজে লাগানো হচ্ছে না বা যাচ্ছে না। ফলে তা বিদেশে পাচারের প্রবণতা মাত্রাছাড়াভাবে বাড়ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয়েছে, তার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭৬ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এর আগের বছর (২০১২) অর্থ পাচারের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। মুদ্রা পাচার একটি বাস্তবতা এবং এটা হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভবও নয়, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে হারে এটা বাড়ছে, তা খুবই অস্বাভাবিক। প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, ২০১৩ সালে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা চলতি অর্থবছরের (২০১৫-১৬)
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, পল্লী উন্নয়ন, শিল্প ও ভৌত অবকাঠামো খাতের মোট উন্নয়ন বাজেটের সমান। প্রথম আলো পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে রয়েছে। যাদের হাতে অর্থ রয়েছে তাদের একটি অংশ তা ব্যবহার করছে না, আর অন্য একটি অংশ তা বিদেশে পাচার করছে। দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না, ফলে নতুন কর্মসংস্থানও হচ্ছে না। জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে মুদ্রা পাচার রোধে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর করণীয় সম্পর্কে কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে নানা আইনি পদক্ষেপ ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে হয়তো কিছু ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু দেশের মানুষের হাতে থাকা বিপুল অর্থ কেন দেশে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে পাচার হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। জানতে হবে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থাহীনতা তৈরি হলো কেন? এই উত্তরগুলো বের করে এর সমাধানেও মনোযোগী হতে হবে।

ডাকাত সন্দেহে ৮ জনকে পিটিয়ে হত্যা by আসিফ হোসেন

আড়াইহাজার থানায় গিয়ে স্বামী রনির লাশ দেখে
অচেতন হয়ে পড়েন নাজমা বেগম। এ সময় মাকে
জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়ে সাদিয়া।
আড়াইহাজারের পুরিন্দা বাজারে গতকাল ভোরে
গণপিটুনিতে নিহত হন রনিসহ আটজন -প্রথম আলো
প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছেন জনা দশেক লোক। পেছনে শত শত উন্মত্ত মানুষ। তাঁদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে মসজিদ থেকে ‘বাজারে ডাকাত হানা দিয়েছে’ বলে দেওয়া ঘোষণা। কারও হাতে লাঠি, কেউ খালি হাতে। দৌড়ের সঙ্গে ভেসে আসছে ‘ধর ধর’ গগনবিদারী আওয়াজ। আধা কিলোমিটার পড়িমরি করে যাওয়ার পর সামনে থাকা লোকদের কেউ পড়েছে পানি-কাদায়, কেউ কচুরিপানায় ভরা মজা পুকুরে। তবু শেষরক্ষা হয়নি। পেছনে ধেয়ে আসা জনতা তাদের আটজনকে পিটিয়ে মেরেছে।
‘ডাকাত সন্দেহে’ আটজনকে পিটিয়ে মারার এই নৃশংস ঘটনার এমন বিবরণ দিয়েছেন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে এ ঘটনা ঘটে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পুরিন্দা বাজারে। এ সময় জনতার হাত থেকে প্রাণে বেঁচে গেছেন চারজন। এঁদের তিনজনকে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। একজনকে পুলিশ আটক করেছে। নিহত আটজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় মিলেছে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের একটি ছোট বাজার পুরিন্দা। কয়েকটি চালের আড়ত আছে বাজারে। মোতালেব ও মনিরুজ্জামান নামের দুজন নৈশপ্রহরী সেখানে পাহারায় থাকেন। ডাকাতির খবর গ্রামবাসীকে জানান তাঁরাই।
মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ভোরবেলা একটি খালি ট্রাক নিয়ে ২০-২৫ জন লোক বাজারে আসে। তারা বাজারের ‘ভাই ভাই স্টোর’ নামের আড়ত থেকে চাল নিতে এসেছে বলে জানায়। কিন্তু ওই সব লোক আড়তের তালা না খুলে সেটি ভাঙতে শুরু করলে প্রহরীদের সন্দেহ হয়। তাঁরা এর প্রতিবাদ করলে ডাকাতেরা অস্ত্রের মুখে রশি দিয়ে দুই প্রহরীর হাত এবং গলার মাফলার দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলে। এরপর আড়তের তালা ভেঙে চালের বস্তা ট্রাকে তুলতে থাকে। দুই প্রহরীর মধ্যে মনিরুজ্জামান হাতের বাঁধন খুলে গ্রামের ভেতরে দৌড়ে যান। পাশের মসজিদ থেকে এ সময় লোকজন নামাজ পড়ে বের হচ্ছিলেন। মনিরুজ্জামানের কথা শুনে মুসল্লিরা পুরিন্দা বাজার জামে মসজিদের মাইক থেকে ‘বাজারে ডাকাত হানা দিয়েছে’ বলে ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণা শুনে আশপাশের বাড়িঘর ও কারখানার শ্রমিকসহ শত শত লোক লাঠিসোঁটা হাতে বেরিয়ে আসেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, মাইকের ঘোষণা শুনে কথিত ডাকাতেরা দৌড়ে পালাতে শুরু করে। তাদের ধাওয়া করে শত শত মানুষ। ডাকাতদের কয়েকজন পুরিন্দা বাজার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে এক পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেউ কেউ মহাসড়কের পাশে নিচু জমি ও ডোবায় আশ্রয় নেয়। গ্রামবাসী তাদের ঘেরাও করে তুলে আনেন। এরপর শুরু হয় গণপিটুনি। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন মারা যান। আহত পাঁচজনকে উদ্ধার করে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানে আরেকজন মারা যান। পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা থেকে একটি হাঁসুয়া, দুটি বড় ছোরা, একটি দা, তালা কাটার যন্ত্র উদ্ধার করে। একটি ট্রাকও বাজার থেকে উদ্ধার করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গ্রামবাসী বলেন, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি থানা-পুলিশকে জানানো হলেও তারা ঘটনাস্থলে আসে এক ঘণ্টা পরে। পুলিশ দ্রুত এলে এসব লোককে হয়তো জীবিত উদ্ধার করা যেত।
সাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অদুদ মাহমুদ বলেন, আনোয়ার মেম্বারের বাড়ির পুকুর থেকে তিনজন, রোকনউদ্দিন মোল্লার মাঠের দুটি ডোবা থেকে তিনজন, ঢাকা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে একজন, পাঁঠাওয়ালার বাড়ির সামনে থেকে একজন, বাগবাড়ি বাজারের সামনে থেকে একজন, পুরিন্দা বাজারের পাশ থেকে একজনকে প্রায় মৃত অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে।
প্রত্যক্ষদর্শী বিল্লাল হোসেন ও শহীদুল বলেন, কয়েক দিন আগে পুরিন্দা বাজারে হানিফ অ্যান্ড ব্রাদার্সের বাগবাড়ি গুদামে হানা দিয়ে ডাকাতেরা ২০০ বস্তা চাল লুট করে। এই ঘটনায় থানায় মামলা হলেও চাল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এ কারণে লোকজন ক্ষুব্ধ ছিল। তাই গ্রামবাসী নিজের হাতে আইন তুলে নিয়েছেন।
পুলিশ বলেছে, নিহত আটজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় মিলেছে। তাঁরা হলেন ফেনীর সোনাগাজী থানার আলমপুর গ্রামের ওবায়দুল হকের ছেলে রনি ওরফে গঠন (৪০), ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার মধ্য বাড়েবা আকুয়া এলাকার রোবেল (২৫), টিটু (৩০) ও শওকত (৩২)।
আহত ব্যক্তিরা হলেন ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার মিলন মিয়ার ছেলে সাব্বির (২৫), ছানা মিয়ার ছেলে সজীব (২৬), লতিফের ছেলে মানিক (৩২) এবং চাঁদপুর সদরের ওছমান মিয়ার ছেলে লোকমান (২৮)।
বেলা তিনটার দিকে আড়াইহাজার থানায় এসে রনির লাশ শনাক্ত করেন তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম। তিনি বলেন, তাঁরা ঢাকার শনির আখড়া এলাকায় ভাড়া থাকেন। তাঁর স্বামী বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করতেন। বুধবার রাতে কাজের কথা বলে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। তাঁদের আট বছরের একটি মেয়ে আছে।
পুলিশ বলেছে, আটক লোকমান প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, তাঁরা রাত দুইটার দিকে ঢাকার তেজগাঁও থেকে ১৫-১৬ জন ও পরে যাত্রাবাড়ী থেকে আরও ১৪-১৫ জন মিলে একটি ট্রাক নিয়ে ভোরে পুরিন্দা বাজারে ডাকাতি করতে আসেন।
পুরিন্দা বাজারের ভাই ভাই স্টোর চালের আড়তের মালিক হাজি গফুর ভূঁইয়া বলেন, ডাকাতেরা তাঁর আড়ত থেকে ১৫০ বস্তা চাল ট্রাকে তুলে ফেলেছিল।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ১৫ থেকে ২০ জনের সংঘবদ্ধ ডাকাত দল পুরিন্দা বাজারে একটি চালের আড়তে ডাকাতি করতে ট্রাক নিয়ে এসেছিল। তারা তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে ট্রাকটি ভাড়া করে।
এ ঘটনায় গতকাল রাতে আড়াইহাজার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে দায়ের করা হত্যা মামলায় কয়েক হাজার লোককে আসামি এবং চালের আড়তে ডাকাতির ঘটনায় ভাই ভাই ট্রেডার্সের মালিক এম এ গফুর বাদী হয়ে ২০-২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) মো. জহিরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
আসকের উদ্বেগ ও নিন্দা: ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে আটজন নিহত ও চারজন আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসক বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম সুষ্ঠু ও পরিণামদর্শিতার সঙ্গে পরিচালিত হলে জনগণের পক্ষে এমন সহিংস ও উন্মত্ত হওয়া সম্ভব হতো না। সংবাদপত্রের খবরের ভিত্তিতে আসকের তৈরি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর সাত বিভাগে ১২৩ জন গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছেন।
আসক আড়াইহাজারের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও গণপিটুনির ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ মোহাম্মদ আলী মুসলিমদের পাশে জাকারবার্গ

মোহাম্মদ আলী ক্লে, মার্ক জাকারবার্গ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্যের অব্যাহত সমালোচনায় এবার শরিক হলেন কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী ক্লে। এদিকে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম চরমপন্থীদের হামলার পর সন্ত্রস্ত সাধারণ মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। খবর রয়টার্স ও এপির।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের ঢোকা বন্ধ করার দাবি জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। গত বুধবার ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করে মোহাম্মাদ আলী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যারা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের মুসলিমদের দাঁড়াতে হবে।’ আলী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী একজন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছেন।’
মোহাম্মদ আলী তিনবারের বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। ১৯৬৪ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বিবৃতিতে তিনি মুসলিম চরমপন্থীদের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি একজন মুসলিম। নিরীহ মানুষ হত্যা কখনো ইসলামসম্মত হতে পারে না। তা সে প্যারিস, সান বার্নার্দিনো বা যেখানেই হোক। সত্যিকারের মুসলমানেরা জানেন, তথাকথিত ইসলামি জিহাদিদের ভয়াবহ সন্ত্রাস ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধবিরোধী।’
বিবৃতি দেওয়ার পর আলীর মুখপাত্র রবার্ট গানেল বলেন, বিবৃতিটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয়নি। এটা মোহাম্মদ আলীর বিশ্বাসের প্রতিফলন যে মুসলিমদের অবশ্যই জিহাদিদের জঙ্গিপনাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
মুসলিমদের পাশে জাকারবার্গ: প্যারিস, সান বার্নার্দিনোতে মুসলিম চরমপন্থীদের ভয়াবহ হামলার পর এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে সন্ত্রস্ত সাধারণ মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ। গত বুধবার জাকারবার্গ তাঁর ফেসবুক পেজে মুসলিমদের স্বাগত জানান। তিনি লেখেন, ‘আপনাদের অধিকার রক্ষার জন্য আমরা লড়াই করব। একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করব।’ এ জন্য জাকারবার্গ কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেননি। তিনি লিখেছেন, ‘একজন ইহুদি হিসেবে আমার বাবা-মা আমাকে শিখিয়েছেন, যেকোনো সম্প্রদায়ের ওপর কোনো হামলা হলে রুখে দাঁড়াতে হয়। এমনকি আজ তোমার ওপর হামলা না হলেও এর প্রতিবাদ করতে হবে, কারণ একজনের স্বাধীনতার ওপর হামলা প্রত্যেককেই আহত করে।’

তেরো বছর পর খালাস পেয়ে কাঁদলেন সালমান খান

রায় ঘোষণার পর মুম্বাইয়ের উচ্চ আদালত থেকে
বেরিয়ে আসছেন সালমান খান l এএফপি
গাড়ি চাপা দিয়ে পথচারী হত্যার ঘটনা-সংশ্লিষ্ট ‘হিট অ্যান্ড রান’ মামলা থেকে অবশেষে খালাস পেলেন বলিউড সুপারস্টার সালমান খান। ওই মামলায় নিম্ন আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে পাঁচ বছরের যে কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন, তা গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের মুম্বাইয়ের হাইকোর্ট বাতিল করে তাঁকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
রায় শুনে আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সালমান খান। দীর্ঘ ১৩ বছর তাঁকে এই মামলা লড়তে হয়েছে। রায়ের পর সালমান-ভক্তরা আদালতের বাইরে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। খবর এনডিটিভি ও এএফপির।
হাইকোর্ট রায়ে বলেন, যে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয় না সালমান দোষী ছিলেন। আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কাউকে হত্যা করেননি সালমান। নিম্ন আদালতের তদন্তেই ত্রুটি ছিল। সঠিক আইনি পথে মামলা এগোয়নি। তাই মামলা সালমানের পক্ষে যাবে। একই সঙ্গে আদালত বলেন, সালমানের সামাজিক অবস্থান বা জনপ্রিয়তা এই মামলাকে প্রভাবিত করেনি।
২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে সালমান খানের গাড়ি মুম্বাইয়ের ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা কয়েকজন লোকের ওপর উঠে গেলে এক ব্যক্তি মারা যান এবং চারজন গুরুতর আহত হন। পরের মাসে সালমানের বিরুদ্ধে অসাবধানতাবশত তবে দণ্ডযোগ্য হত্যাকাণ্ডের (এটি সজ্ঞানে খুন করার মতো অপরাধ নয়) মামলায় অভিযোগ গঠন হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি জামিনে মুক্তি পান। ২০০৩ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট এই অভিযোগ থেকেও তাঁকে অব্যাহতি দিলে তাঁর বিরুদ্ধে বাকি থাকে শুধু বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগ।
২০০৭ সালের অক্টোবরে মামলার প্রধান সাক্ষী মারা যান। ২০১৫ সালের মার্চে সালমান আদালতে বলেন, তিনি দুর্ঘটনার সময় মাতাল ছিলেন না এবং গাড়িও চালাচ্ছিলেন না। তবে ওই বছরের মে মাসে নিম্ন আদালত তাঁকে মদ্যপ অবস্থায় বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য দোষী সাব্যস্ত করে পাঁচ বছরের সাজা দেন। এরপরই সালমান হাইকোর্টে আপিল করেন এবং সবশেষে গতকাল খালাস পান।

আমরা কি হাল্লা রাজার দেশে বাস করছি? -সুলতানা কামাল

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেছেন, এখন কথা বলতে অনেক চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি শঙ্কা- কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া হচ্ছে কিনা। সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর হাল্লা রাজা দেশের মানুষের জিব কেটে দিয়েছিলেন, যাতে তারা কথা বলতে না পারে। আমরা কি হাল্লা রাজার দেশে বাস করছি?’ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার : পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারটি আয়োজন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। সুলতানা কামাল বলেন, অভিজিৎরা (ব্লগার অভিজিৎ? রায়) নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। আর এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আশ্চর্যজনকভাবে নিশ্চুপ। ব্লগারদের প্রসঙ্গে পালটা কথা শুনতে হচ্ছে- ‘আপনাদেরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল’।
তিনি বলেন, দেশে একটা ধারণা জন্মেছে। শিয়া হলে গুলি করা যাবে। হিন্দু হলে দেশ ছেড়ে চলে যাবে। আদিবাসী সমপ্রদায়কে আদিবাসী বলতে পারবো না। এ রকম ধারণা একটি রাষ্ট্রে চলতে পারে না। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলি কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এটা কীভাবে সম্ভব? রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না।
সভাপতির বক্তব্যে মিজানুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র তখনই নিরাপদ যখন দেশের প্রতিটি মানুষ নিরাপদে থাকে। নাগরিককে অনিরাপদ রেখে রাষ্ট্রকে নিরাপদ ভাবা যায় না। তিনি বলেন, গণপিটুনিতে মানুষ মেরে ফেললে কিছুই হয় না। এই গণ কারা? তারা তো একজন একজন করেই গণ হয়। এ ধরনের ঘটনা একদিনে হয়নি। এর পেছনে তিনটি কারণ আছে। প্রথমত, আইনের শাসনের ঘাটতি, দ্বিতীয়ত, আক্রান্তকারীদের আইনের সাহায্যের ঘাটতি এবং তৃতীয়ত, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। এ ধরনের ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় আনতে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আলোচনায় জাতিসংঘের জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি বরার্ট ওয়াটকিনস বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে মত ও ধর্ম প্রকাশের স্বাধীনতাকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা দুশ্চিন্তার বিষয়। অতীতে বাংলাদেশে মতপ্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নিহত হয়েছেন। এটা শুভলক্ষণ নয়। গীতি আরা নাসরিন বলেন, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১০০ বছর আগে যা চিন্তা করে বলতে পেরেছেন। হয়তো এখন তিনি থাকলে তা বলতে পারতেন না। আমরা জাতি হিসেবে পিছিয়ে পড়ছি।
সেমিনারে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মতন্ত্র ও মানবাধিকার : এ সময়ের বাংলাদেশ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রভাষক রোকেয়া চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য কাজী রিয়াজুল হক। এতে মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের খালেদ মুহিউদ্দীন আলোচনায় অংশ নেন। সেমিনার শুরুর আগে সকালে বিভিন্ন পেশার মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি র‌্যালি করে কমিশন।

মুসলমানরা ইউরোপ দখল করবে : ভবিষ্যৎবাণী

প্রায় এক দশক আগেই আইএসের উত্থান নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন এক রহস্যময়ী অন্ধ মহিলা জ্যোতিষী।
বাবা ভাঙ্গা নামের বুলগেরিয়ান জ্যোতিষী বলেছিলেন, মুসলিমরা একটি ‘বৃহত্তর যুদ্ধের’ মাধ্যমে ইউরোপ আক্রমণ করে পদানত করবে এবং ২০৪৩ সালের মধ্যেই ইসলামি খেলাফত গঠন করবে। এ খেলাফতের রাজধানী হবে ইতালির রোমে।
১৯৯৬ সালে মৃত্যু হওয়ার আগে এই রহস্যময়ী জ্যোতিষী আরো বলেছিলেন, পরমাণু যুদ্ধে ইউরোপ খ্রিস্টানশূন্য হয়ে যাবে এবং মুসলিমরা ইউরোপের দখল নিবে।
বাব ভাঙ্গা নামের এই মহিলা ১২ বছর বয়সে এক তীব্র ঝড়ের কবলে পড়ে তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তারপর থেকেই তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান বলে তার ভক্তরা জানিয়েছেন। তার ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতার কথা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বুলগেরিয়ার স্বৈরশাসক তৃতীয় বরিস তার সাথে দেখা করতে আসেন এবং পরবর্তীতে বরিস তাকে নিজের উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। যদিও বরিসের দুর্ভাগ্য ঠেকাতে পারেননি বাবা ভাঙ্গা তবে এখনো তার অনেক ভক্ত রয়ে গেছে বুলগেরিয়ায়।১৯৯৬ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে রহস্যময়ী এই নারী পৃথিবী ত্যাগ করেন।
সূত্র: ইন্ডিয়ান টাইমস

খুব শিগগির দৃশ্যমান পরিবর্তন চোখে পড়বে -বিশেষ সাক্ষাৎকার: আনিসুল হক by এ কে এম জাকারিয়া

আনিসুল হক
দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ মাসের বেশি সময় পার করেছেন ঢাকার দুই মেয়র। তাঁদের বেশ কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। এসব প্রতিশ্রুতি পূরণে তাঁরা কতটুকু এগিয়ে গেলেন, কী কী করতে যাচ্ছেন, কোনো বাধা বা সমস্যার মুখে পড়ছেন কি না—এসব নিয়ে প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক
প্রথম আলো : মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাস ছয়েক হলো। নির্বাচনের আগে আপনি বলেছিলেন সমস্যাগুলো চিহ্নিত, বলেছিলেন এবার সমাধানযাত্রা। এই পথে কতটুকু এগোলেন?
আনিসুল হক : আমাদের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা, সচল ঢাকা, মানবিক উন্নয়নের ঢাকা, স্মার্ট ও ডিজিটাল ঢাকা এবং অংশগ্রহণমূলক ও সুশাসিত ঢাকা। বলতে পারেন এই সব কটি ক্ষেত্রেই আমরা কাজ শুরু করেছি। এসবের সুফল আপনারা খুব শিগগির দেখতে পাবেন।
প্রথম আলো : এসব ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ অগ্রগতির কথা জানাবেন কি?
আনিসুল হক : পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে বলতে পারি, রাস্তায় ময়লা জমানো এবং সেখান থেকে তা সরানোর যে পদ্ধতি এত দিন কার্যকর ছিল, তা আর থাকবে না। আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন স্থানে ৭২টি মিড ট্রান্সফার স্টেশন করতে যাচ্ছি, যেখানে স্প্রে ও ওয়াশ করার ব্যবস্থা থাকবে এবং এসব স্টেশন থেকে ময়লা ডাম্পিং স্টেশনে চলে যাবে। ডিসেম্বরের মধ্যে ৪৫টি এবং মার্চ নাগাদ সব কটি স্টেশন হয়ে যাবে বলে আশা করছি। রাস্তাঘাট যাতে নিয়মিত পরিষ্কার হয় সে জন্য ক্লিনারদের সঙ্গে দফায় দফায় বসেছি। ঢাকা শহরকে অপরিকল্পিত বিলবোর্ডমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়েছে। ৮৫ শতাংশ বিলবোর্ড সরে গেছে। সবুজ ঢাকার অংশ হিসেবে ফ্লাইওভারগুলো ফুল দিয়ে সুশোভিত করার কাজ শুরু হয়েছে। শাহীন স্কুলের পাশেরটি হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাকিগুলোও হয়ে যাবে। আমরা সবুজায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। কয়েকটি পার্ক সবুজ করার উদ্যোগ নিয়েছি। প্রজাপতি পার্ক, কাঠবিড়ালি পার্ক—এসব করার উদ্যোগ নিয়েছি। সব বাড়িতে যাতে গাছ লাগানো হয়, সে জন্য আমরা গাছ সরবরাহ করব। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় আমরা কাজটি করব। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে মিলে বিমানবন্দর সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হচ্ছে। ১০০-এর বেশি গণশৌচাগার নির্মিত হচ্ছে। এসব দৃশ্যমান হতে কিছু সময় লাগবে।
প্রথম আলো : ঢাকা শহরবাসী যানজটকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে করে। আপনিও ঢাকাকে সচল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ছয় মাসে কী অগ্রগতি হলো? আর যানজট দূর করার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের খুব কিছু করার আছে কি?
আনিসুল হক : আসলে যানজট দূর করতে সরাসরি আমাদের করার কিছু নেই। যানবাহন বলুন বা রাস্তাঘাটের নিয়ন্ত্রণ বলুন, এগুলো আমাদের হাতে নেই। আমরা যা করার চেষ্টা করছি তা হচ্ছে রাস্তাঘাট দখলমুক্ত করা। মহাখালীর সামনের বাস পার্কিং বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাজটি খুব সহজ না। আমরা গাজীপুর থেকে হাতিরঝিল পর্যন্ত ২২টি ইউলুপ নির্মাণ করতে যাচ্ছি। এগুলো তৈরি হলে কোনো গাড়ি ক্রসিংয়ে আটকা পড়বে না। এ জন্য দুটি মন্ত্রণালয় থেকে জমি নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে। আশা করি তাদের সহযোগিতা পাব। এটা হলে যানজট অনেকটা কমবে। এই প্রকল্প সফল হলে অন্যান্য এলাকাতেও তা করা হবে।
প্রথম আলো : বিশৃঙ্খলার চরমে পৌঁছেছে ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা। নগরবাসীর জন্য এ ক্ষেত্রে কি সিটি করপোরেশনের কিছু করার নেই?
আনিসুল হক : এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতির কথা আপনাকে জানাতে চাই। ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসমালিকদের সঙ্গে আমরা বসেছি। সমন্বিতভাবে বিভিন্ন রুটে বাস চালানো যায় কি না, সে ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি কোম্পানির অধীনে সব মালিক বাস চালাতে রাজি হয়েছেন। পুরোনো বাস উঠিয়ে তিন হাজার বাস নামানোর কথা হয়েছে। তবে তাঁরা আমাকে শর্ত দিয়েছেন যে ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে ঋণ জোগাড় করে দিতে হবে। আমি এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছি। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হবে। এটা কার্যকর করা গেলে ঢাকার গণপরিবহনের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন হবে। নতুন ও আধুনিক বাস চলবে। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামবে ও যাত্রীরা ওঠানামা করবে। সব মালিকের বাস পাঁচটি কোম্পানির আওতায় এলে বেপরোয়া বাস চালানোর প্রবণতাও কমবে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে কাজটি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
প্রথম আলো : নতুন মেয়রদের অধীনেও এবার বর্ষায় ঢাকাবাসী জলাবদ্ধতার পুরোনো রূপই দেখল। কোনো আশার কথা?
আনিসুল হক : এই একটি জায়গায় আমি আপনাদের পরিষ্কার করে বলতে পারছি না যে কী করতে পারব বা পারব না। এটা আমার হাতের বাইরে। খাল বন্ধ, নালা বন্ধ। এসব পরিষ্কার ও খনন করার দায়িত্ব ওয়াসার। আমরা এখন গুলশান ও বনানী এলাকার রাস্তাগুলোকে মানসম্মত ড্রেনসহ নির্মাণ করছি। আগামী দুই বছরের মধ্যে এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। উত্তরাতেও হচ্ছে। কিন্তু মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের ক্ষেত্রে ওয়াসার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো : এ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের কোনো সমস্যা হচ্ছে কি?
আনিসুল হক : ঢাকার বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা জড়িত। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছি ওয়াসা ও রাজউকের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে। বিষয়গুলো বেশ জটিল। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন।
প্রথম আলো : মাস ছয়েক দায়িত্ব পালন করে কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন?
আনিসুল হক : আমার মনে হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জোরালো সমর্থন ও তা কাজে লাগানোর আকাঙ্ক্ষা থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলা সে কারণেই সম্ভব হয়েছে। সামনে এ ধরনের কাজগুলোও আশা করি সবার সমর্থন নিয়ে করতে পারব।
প্রথম আলো : কারওয়ান বাজারের কাঁচা ও পাইকারি বাজার স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অগ্রগতি কতটুকু? এ ব্যাপারে তো সুনির্দিষ্ট কিছু শোনা যাচ্ছে না।
আনিসুল হক : কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে আমি অন্তত ২০ বার বসেছি। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে, ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যে তিনটি আধুনিক কাঁচাবাজার হয়েছে, সেখানে এই বাজার স্থানান্তর করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে অনেক ব্যবসায়ী আমাকে বলেছেন যে তাঁরা যেতে চান, কিন্তু কয়েকজন নেতার হাতে তাঁরা পুতুল হয়ে পড়েছেন। কারওয়ান বাজারে একটি তিনতলা মার্কেট রয়েছে, যেটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে বলে বুয়েটের মাধ্যমে করা পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় নেতাদের নিতে হবে। আমি আশা এবং অনুরোধ করছি, যাতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা নতুন বাজারগুলোতে চলে যান। এ ব্যাপারে স্থানীয় কাউন্সিলররা খুবই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছেন। মেয়র এবং দীর্ঘদিনের একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি কোনো কঠোর পথ নিতে চাই না। কিন্তু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তা না হলে আমরা প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা ও দরকার হলে অধিগ্রহণ করতে বাধ্য হব।
প্রথম আলো : নাগরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নিরাপত্তাহীনতার বোধ কিন্তু কমেনি। নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি?
আনিসুল হক : প্রাথমিকভাবে আমরা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনকে শক্তিশালী সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছি। কার্যকর হলে অন্ধকারের লোকজন শনাক্ত বা গাড়ির নম্বরপ্লেট পড়া যাবে। টঙ্গী থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত সড়কও সিসি ক্যামেরার আওতায় আসবে আগামী জুনের মধ্যে। এ জন্য স্থানীয় সোসাইটিগুলোকে নিয়ে আমরা কাজ করছি। তহবিল জোগাড় হচ্ছে। আমি মেয়র অফিসে এর কন্ট্রোল রুম করার প্রস্তাব দিয়েছি। পুলিশ বিষয়টি দেখবে।
প্রথম আলো : নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একজন মেয়র হিসেবে এই ছয় মাসে কোন বিষয়টিকে বড় সমস্যা বা বাধা বলে মনে হচ্ছে?
আনিসুল হক : আমার ছয় মাসের অভিজ্ঞতা বলে ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু করতে হলে ও নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সমন্বয় সংস্থা দরকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা প্রয়োজন। অনেক কিছুই মেয়রদের কাছে থাকা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের কিছু পুলিশ থাকা দরকার। নানা ধরনের দখল উচ্ছেদে তাদের কাজে লাগানো যাবে। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি সমন্বয়ের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছি। তিনি বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
আনিসুল হক : আপনাকেও ধন্যবাদ।

কাজ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা সমন্বয়হীনতা -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: সাঈদ খোকন by এ কে এম জাকারিয়া

দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ মাসের বেশি সময় পার করেছেন ঢাকার দুই মেয়র। তাঁদের বেশ কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। এসব প্রতিশ্রুতি পূরণে তাঁরা কতটুকু এগিয়ে গেলেন, কী কী করতে যাচ্ছেন, কোনো বাধা বা সমস্যার মুখে পড়ছেন কি না—এসব নিয়ে প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন
প্রথম আলো : মেয়র হওয়ার আগে কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল। মাস ছয়েকের মধ্যে কী বা কতটুকু করতে পারবেন তারও ভাবনা নিশ্চয়ই ছিল। তার কতটুকু করতে পারলেন?
সাঈদ খোকন : এই ছয় মাস আমি প্রতিটি দিন কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। খুব কম ছুটির দিনই ব্যক্তিগতভাবে উপভোগ করতে পেরেছি। কোরবানির ঈদের দিনও বাইরে-বাইরে কাটিয়েছি। এসব বলছি এ জন্য, এই সময়ের মধ্যে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিনি। ছয় মাসে অনেক কিছু করে ফেলব, এমন কোনো ম্যাজিক আমার কাছে নেই। এই সময়ের মধ্যে কীভাবে কাজ করব, তার একটি দিকনির্দেশনা ঠিক করার চেষ্টা করেছি।
প্রথম আলো : এই সময়ের মধ্যে কাজ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ও চ্যালেঞ্জ কোনটি বলে মনে হচ্ছে?
সাঈদ খোকন : বড় সমস্যা হচ্ছে সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। ঢাকা শহরের নাগরিক সেবা ও সুবিধা নিশ্চিত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সংখ্যা ৫৬টি। একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সমন্বয় নেই। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে আমরা একটি সেমিনার করেছি। সেখানে দেখা গেল ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আমি বলব, সমন্বয়হীনতাই সবচেয়ে বড় সমস্যা কাজ করার ক্ষেত্রে।
প্রথম আলো : এই সমস্যাটি পুরোনো। তবে আপনি কীভাবে কাজ করবেন বা এই সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে?
সাঈদ খোকন : আমরা ঢাকার দুই মেয়রই কাজ করতে গিয়ে সমস্যাটির মুখে পড়েছি। এই পরিস্থিতিতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করার কথা বলেছি। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছি, তিনি যাতে এর নেতৃত্ব দেন। তিনি আমাদের সমস্যাটি বুঝতে পেরেছেন এবং বিষয়টি বিবেচনা করার কথা বলেছেন। বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটা হয়ে গেলে সমন্বয়হীনতার সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।
প্রথম আলো : আর কোনো বাধা বা চ্যালেঞ্জ?
সাঈদ খোকন : ঢাকা যেভাবে বিভক্ত হয়েছে তাতে দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে আয় ও ব্যয় দুই ক্ষেত্রেই বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে যে রাজস্ব আয় হতো তার ৬৫ ভাগ এখন পাচ্ছে ঢাকা উত্তর। আর আমার ঢাকা দক্ষিণ পাচ্ছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। আবার ঢাকা দক্ষিণে ব্যয় অনেক বেশি। ঢাকা দক্ষিণ অনেকটা প্রশাসনিক রাজধানীর মতো, ফলে এর অপারেটিং কস্ট অনেক বেশি। অবিভক্ত ঢাকায় আগে রাজস্ব আয়ের ৬৫ ভাগ খরচ হতো ঢাকা দক্ষিণে। এখন বিষয়টি উল্টে গেছে। ফলে সাধারণ পরিচালনা কর্মকাণ্ডের বাইরে নিজস্ব অর্থে নতুন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
প্রথম আলো : ২০০৯ সালের অ্যাক্ট অনুযায়ী নানা খাতে কর আদায়ের সুযোগ সিটি করপোরেশনের রয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে এসব দিকে নজর দিতে সমস্যা কোথায়?
সাঈদ খোকন : এটা আমাদের জন্য এক বড় সুযোগ। আইনগত অধিকার থাকলেও এটা কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আইন হয়েছে কিন্তু বিধিবিধান হয়নি। সিটি করপোরেশনের মধ্যে নানাভাবে কর ও রাজস্ব আদায় হচ্ছে, যার একটি ভাগ সিটি করপোরেশনের পাওয়ার কথা। আমি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। আমি আইনে দেওয়া অধিকার ও সুযোগের বিষয়টি তাঁর কাছে তুলে ধরেছি। তিনি বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন। এটা করা গেলে আমরা অনেকটাই স্বাবলম্বী হয়ে যাব। সরকারের কাছে থোক বরাদ্দ চাওয়া ও তা অনুমোদন পাওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। আমরা নিজেদের অর্থেই নিজেরা চলার পরিস্থিতি তৈরি করার উদ্যোগ নিচ্ছি।
প্রথম আলো : জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর করতে তো কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
সাঈদ খোকন : আমরা এ নিয়ে কাজ শুরু করেছি। শান্তিনগরের জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়ার পর আমি সেখানে গিয়েছি। সমস্যাটির কিছু দিক আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। আমরা আশা করছি, আগামী বর্ষার আগেই পুরো না হলেও এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করে ফেলা যাবে।
প্রথম আলো : নির্বাচনী ইশতেহারে আপনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাঁচটি বিষয় আপনি অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছিলেন। যানজট এর মধ্যে ১ নম্বরে ছিল। এ ক্ষেত্রে তো কোনো অগ্রগতি নেই। পরিস্থিতি তো দিনে দিনে শোচনীয় হচ্ছে।
সাঈদ খোকন : এ ক্ষেত্রেও সেই সমন্বয়হীনতার কথাই বলতে হয়। যানজট দূর করতে এককভাবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে কোনো ভূমিকা রাখা কঠিন। দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থা যার যার মতো করে প্রকল্প নিচ্ছে। শান্তিনগর থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার কিছু আমার সিটি করপোরেশন জানে না। এটা তো হওয়া উচিত না। অথচ একটি কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য ঢাকা ট্রান্সপোর্ট সমন্বয় বোর্ড রয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও নানা সিদ্ধান্ত হয়।
প্রথম আলো : তা হলে তো যানজটের ক্ষেত্রে কোনো আশার কথা শোনা যাচ্ছে না।
সাঈদ খোকন : বিভিন্ন চলমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিশ্চয়ই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে উন্নয়ন কার্যক্রম চলার সময় কিছু ভোগান্তিও নিতে হয়। ঢাকায় মেট্রোরেল তৈরির কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এটা হলে নগরবাসীর গণপরিবহনের ক্ষেত্রে একটা বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে এর কাজ শুরু হলে জনদুর্ভোগ হবেই। শান্তিনগর থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত যে ফ্লাইওভার হবে, তার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। আমি বুঝতে পারছি যে আগামী তিন-চার বছর একটা বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাবে।
প্রথম আলো : গুলিস্তান এলাকার বিশৃঙ্খলা, হকারদের রাস্তা দখল, হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা বাসের দখলে চলে যাওয়া—এসব দূর করার ক্ষেত্রেও তো কিছু হয়নি।
সাঈদ খোকন : হকারদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমরা কাজ শুরু করেছি। তালিকা করে পুনর্বাসন করা হবে। গুলিস্তান থেকে বাস স্টপেজ সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমরা মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি বলব যে এই নিয়ে হোমওয়ার্ক চলছে। আপনাদের কথা দিচ্ছি, শিগগিরই ক্লিন গুলিস্তানের জন্য কাজ শুরু করব।
প্রথম আলো : আপনার অগ্রাধিকারের মধ্যে আরও একটি বিষয় ছিল ‘দূষণমুক্ত নাব্য ও নিরাপদ বুড়িগঙ্গা’। এ ব্যাপারে কিছু এগোল?
সাঈদ খোকন : আমরা আপাতত বুড়িগঙ্গা নদীর সামনের জায়গা মানে ওয়াটার ফ্রন্ট উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি। আমরা নদীর পাড় পরিষ্কার করা ও সেখানে নানা কিছু করার পরিকল্পনা নিচ্ছি। নকশা তৈরির কাজ চলছে। অনুমোদনের পর আগামী বছরের শেষে কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করছি। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে।
প্রথম আলো : পৌরকর নির্ধারণ ও আদায় নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্সসহ এ ধরনের সেবা নিতে পয়সা গুনতে হয় বলেও অভিযোগ আছে। আপনি মেয়র হওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
সাঈদ খোকন : পরিস্থিতির আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এই দাবি করব না যে দুর্নীতি একদম চলে গেছে। আমি নিজে নিয়মিত কার্যালয়গুলোতে যাই। যেকোনো অভিযোগ পাওয়ামাত্র তা বিবেচনায় নিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, ব্যবস্থা নিই। দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধে কিছু জিনিস আমরা অনলাইনভিত্তিক করে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছি। যেমন: জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স—এসব অনলাইনে করা যাবে। হোল্ডিং ট্যাক্সের ক্ষেত্রে স্বনির্ধারণী পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছি এবং তা অনলাইনে করা যাবে। এসব কার্যকর হলে দুর্নীতি আরও কমে আসবে।
প্রথম আলো : নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার জন্য সামনে আর কী কী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন?
সাঈদ খোকন : আমরা শিগগিরই রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। আগামী দুই মাসের মধ্যে দেখবেন কাজের ধুম শুরু হয়ে গেছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে আমরা ২৬ নম্বর ওয়ার্ডটিকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছি। পরে তা অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও সম্প্রসারণ করার ইচ্ছা রয়েছে। ৫০টি স্থানে ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের ব্যবস্থা হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় নিয়ে আসব। সেখানে অভিযোগ বক্স থাকবে। আমরা শক্ত হাতে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করব। আবর্জনা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
প্রথম আলো : আপনি ঢাকা দক্ষিণের মেয়র, কিন্তু থাকেন ঢাকা উত্তরে। এতে সমস্যা হয় না। আপনার ভোটারদের এ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই?
সাঈদ খোকন : যানজটের কারণে আসা-যাওয়ায় সমস্যা হয়। আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবছি কী করা যায়। তবে আমার ভোটারদের অভিযোগ নেই। কারণ, আমি অফিসের বাইরেও সপ্তাহে দু-তিন দিন মানুষের সঙ্গে কাটাই।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
সাঈদ খোকন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

আড়াইহাজারে গণপিটুনিতে নিহত ৮

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চাল লুট করতে এসে গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে ডাকাতদলের ৮ সদস্য নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছে আরও ৪ জন। ডাকাতির সময় ধাওয়া দিয়ে গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ ডাকাতদলের ১২ সদস্যকে আটক করে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলে ৭জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যায়। নিহত ডাকাতদের মধ্যে ৪ জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলো-ফেনীর সোনাগাজী থানার আলমপুরের এবায়দুলের ছেলে ট্রাকচালক রাজিব ওরফে রনি (৩০), ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মধ্য বায়রা এলাকার রুবেল (২৫), জুয়েল ওরফে টিটু (৩০) ও ময়মনসিংহের মধ্যপাড়া এলাকার শওকত (৩০)। বাকি ৪ জনের পরিচয় (এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) পাওয়া যায়নি। আহত ডাকাতরা হল- ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার মিলন মিয়ার ছেলে সাব্বির (২৫), ছানা মিয়ার ছেলে সজিব (২৬), লতিফের ছেলে মানিক (৩২), চাঁদপুর সদরের ওছমান মিয়ার ছেলে লোকমান (২৮)। আহতদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। দুর্ধর্ষ ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের পুরিন্দা বাজারে।
পুলিশ ও গ্রামবাসীর সূত্রমতে, বৃহস্পতিবার ভোররাতে সংঘবদ্ধ একটি ডাকাতদল ট্রাকযোগে এসে উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের পুরিন্দা বাজারে আসে। বাজারের পাহারাদার নজরুল ইসলাম জানান প্রথমে ডাকাতদল পর্যায়ক্রমে মোতালিব মিয়া, আউয়াল ও নিয়ত আলীকে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে। পরে বাজারের হাজী আবদুল গফুর ভুইয়ার মালিকানাধীন ভাই ভাই স্টোরের তালা কেটে চাউলের আড়ৎ থেকে চাউলের বস্তা লুট করে ডাকাতরা তাদের নিয়ে আসা ট্রাকে তুলতে থাকে। ওই সময় বাজারের মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে এসে বিষয়টি আঁচ করতে পেরে মসজিদের মাইকে প্রচার করে বাজারে ডাকাত পড়েছে। এ সময় মাইকে মুসল্লিদের ডাক চিৎকারে আশপাশের মসজিদ থেকেও ডাকাতির সংবাদ মাইকে প্রচার করতে থাকলে পুরিন্দা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শত শত গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে ডাকাতদের ধাওয়া দেয়। গ্রামবাসীর ধাওয়া খেয়ে ডাকাতদলের সদস্য দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। প্রাণভয়ে তাদের কেউ বাঁশঝাড়ে, কেউ কচুরি পানার ডোবায়, কেউ পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। উত্তেজিত গ্রামবাসী একপর্যায়ে পুরিন্দা বাজার থেকে ৩ জন, পুরিন্দা রোকন উদ্দিন মোল্লার মাঠ থেকে ৪ জন, পুরিন্দা আনোয়ার মেম্বারের পুকুর থেকে ৩ জন ও বাগবাড়ি থেকে ২ ডাকাতকে ধরে ফেলে। পৃথক পৃথক স্থানে তাদের গণপিটুনি দেয় শ’ শ’ গ্রামবাসী। এ সময় ডাকাতদের আর্তচিৎকার ও গ্রামবাসীর হৈ চৈয়ে ভীতিকর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এলাকায়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ডাকাতির ঘটনায় চরমভাবে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী হামলে পড়ে ডাকাতদের ওপর। যে যেভাবে পেরেছে আক্রমণ করতে থাকে ডাকাত সদস্যদের। এলোপাথাড়ি পিটুনিতে একে একে প্রাণ হারায় ৭ ডাকাত। তাদের নিথর দেহ চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উৎসুক জনতার ভিড়। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা আনোয়ার মেম্বারের পুকুর থেকে ৩, পুরিন্দা বাজার থেকে ১ ও রোকনউদ্দিন মোল্লার মাঠ থেকে ৩ ডাকাতের মৃত দেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এবং মারাত্মক আহত ৫ ডাকাতকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে এক ডাকাত মারা যায়।
পুরিন্দা বাজারের ভাই ভাই স্টোর চালের আড়তের মালিক হাজি গফুর ভুঁইয়া জানান, তার আড়তে ১৫০ বস্তা চাল ছিল। ডাকাতরা আড়ৎ থেকে ৪০ বস্তা চাল ট্রাকে তুলে ফেলে এবং আরও চাল ট্রাকে তোলার সময় নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা দেখে মসজিদের মাইকে ডাকাত পড়েছে বলে প্রচার করলে আমরা শুনে বাজারে আসি। তিনি আরও জানান, গ্রামবাসী ডাকাতদের চাল ভর্তি ট্রাকটিও আটক করেছে।
সাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অদুদ মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, গ্রামবাসী ডাকাতদের ধাওয়া দিলে কেউ পুকুরে, কেউ বাঁশের ঝাড়ে ও কেউ ডোবায় কচুরি পানার তলে লুকিয়ে থাকলে সেখান থেকে জনতা তাদেরকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। তিনি জানান, প্রায়ই পুরিন্দা বাজারে ও আশেপাশের বাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত হলেও এ পর্যন্ত কোনো ডাকাতকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তাই ডাকাতদের প্রতি এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ ছিল।
বাজারের নৈশপ্রহরী নজরুল ইসলাম জামান ও মোতালেব মিয়া জানান, বুধবার রাত ৩টার পর একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৪৩১১) যোগে ১৮ থেকে ২০ জনের সংঘবদ্ধ ডাকাত দল আসে আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের পুরিন্দা বাজারে। এ বাজারটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত। ডাকাতরা রাতে বাজারে আসার পর নিজেদের চাল ক্রেতা পরিচয় দেয় জামান ও মোতালেবের কাছে। তাদের কাছে গফুর ভূঁইয়ার মালিকানাধীন চালের গুদামের খবর জানতে চায়। অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ওই দুই নৈশপ্রহরীর হাত পা বেঁধে ফেলে ডাকাতরা। তাদের মধ্যে একজন কোনোমতে দড়ির বাঁধন খুলে দৌড়ে স্থানীয় মসজিদে গিয়ে মুয়াজ্জিনকে বিষয়টি জানালে দ্রুত মাইকিং করা হয়। আর সে কারণেই ধরা পড়ে ডাকাতরা।
গ্রামবাসী আলেক মিয়া (৫৭) জানান, গ্রামে চুরি ডাকাতি প্রায়ই হয়। কিন্তু থানা পুলিশ তা বন্ধ করতে পারছে না। এতে ভুক্তভোগী লোকজন ছাড়াও গ্রামবাসীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল। তাই ডাকাতদের হাতের নাগালে পেয়ে আগে-পিছে চিন্তা না করে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। সামনের দিকে ডাকাতি না কমলে এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। কারণ পুলিশের উপর গ্রামবাসীর  আস্থা কমতে শুরু করেছে।
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ডাকাত সদস্য সজীব ও সাব্বির সাংবাদিকদের জানান, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলাতে। বুধবার রাতে তারা স্ব স্ব জেলা হতে ঢাকায় আসে। সেখানে তেজগাঁও হতে একটি ট্রাক ভাড়া করে। আর এর পুরো মনিটরিংটি ছল মানিকের কাছে। সে মূলত ডাকাত দলের টিম লিডার। সজীব ও সাব্বিরের দেয়া তথ্য মতে যদি ডাকাতির মিশনে ১৮ জন থাকে তাহলে তাদের মধ্যে ৮জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে আরও ৪জন। সে হিসেবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে ৬ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানিক এখনো চিকিৎসাধীন। সুস্থ হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) জহিরুল ইসলাম।
স্বামীর লাশ দেখে সংজ্ঞাহীন স্ত্রী
এদিকে আড়াইহাজার থানায় গিয়ে নিহত ডাকাত সদস্য গাড়িচালক রাজিব ওরফে রনির লাশ শনাক্ত করেন স্ত্রী নাজমা বেগম। তিনি জানান, তার স্বামী রনি ঢাকায় একটি বাসে হেলপারের কাজ করতেন। ১০ দিন ধরে স্বামীর সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি। সে ডাকাতি করত কি না তা আমার জানা নেই। লোক মারফত জানতে পেরে আড়াইহাজার থানায় এসেছি। এ সময় থানা প্রাঙ্গণে রাখা স্বামী রনির লাশ দেখে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। অপরদিকে ডাকাতদের পাকড়াও করতে আসা কয়েক শত মানুষ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে জড়ো হওয়ায় ভোর রাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। আড়াইহাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফুল হক জানান, সকালে স্থানীয় লোকজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৭ ডাকাতের লাশ ও আহত অবস্থায় ৫ ডাকাতকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক ডাকাতের মৃত্যু হয়। নিহত ডাকাতদের লাশ ময়নাতদন্ত করার জন্য নারায়ণগঞ্জ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় রাতেই অজ্ঞাত পরিচয় দিয়ে কয়েক হাজার এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

৭৬,০০০ কোটি টাকা পাচার ‘নেপথ্যে তিন কারণ’

প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার হচ্ছে বিভিন্ন পথে। এসব অর্থ পাচারের পেছনে দুর্নীতি, অনিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই দায়ী বলে মনে করেন দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে অর্থ সুরক্ষা, আস্থার সংকট ও নিরাপদবোধ মনে করছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফলে বেশি লাভের আশায় অনেকেই আমদানি-রপ্তানির আড়ালে দেশের অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আগের পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রতি বছরই অর্থ পাচারের পরিমাণ বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তারা। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) বলছে, বাংলাদেশ থেকে শুধু ২০১৩ সালেই ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার পাচার হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা ৭৬ হাজার ৩৬১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পাচার হওয়া এ অর্থ আগের বছরের তুলনায় ৩৩.৭৯ শতাংশ বেশি। ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৪-১৩’ শীর্ষক সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জিএফআই। ওই প্রতিবেদনেই অর্থ পাচারের এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন জিএফআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভ কার ও অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্পেনজারস। অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন বা মিসইনভয়েসিং, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে এ অর্থ পাচার হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির অবস্থায়। এটা একটা অর্থ পাচারের বড় কারণ হতে পারে। তিনি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়ে বলেন, আমদানির পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমেও অর্থ পাচার হতে পারে।
জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পাচার হলেও ২০১৩ সালে এর পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এতে বেশি অর্থ পাচার হওয়া দেশের তালিকায় খারাপ অবস্থানে গেছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ ছিল ১৪৫টি দেশের মধ্যে ৫১তম। আর এবার বাংলাদেশ ১৪৯টি দেশের মধ্যে হয়েছে ২৬তম।
জিএফআইয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে ২০০৪ সাল থেকে অর্থ পাচারের হিসাব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০১২ ও ২০১৩ সালে। যেমন ২০১২ সালে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ ছাড়া ২০০৪ সালে পাচার হয়েছিল ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং ২০১১ সালে পাচার হয় ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় কেউ দেশে বিনিয়োগের বিষয়টি ভাবছে না। অনিরাপদবোধ করছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের চিন্তা কখন কী হয়ে যায়। সে কারণে আস্থার সংকটে রয়েছেন তারা। এ ছাড়া অর্থসুরক্ষা ও বেশি লাভের আশায় কেউ কেউ টাকা বিদেশে পাঠাচ্ছেন। আমদানি-রপ্তানির আড়ালেও অর্থ পাচার হচ্ছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারিও বেড়েছে। আর নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নির্বাচনের আগে এসব অর্থ বিদেশে পাচার করে; যার চিত্র জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বিদেশে অর্থ পাচার অনেক পুরনো। আগের পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রতি বছরই অর্থ পাচারের পরিমাণ বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন এ অর্থনীতিবিদ। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ বলেন, পাচার করা অর্থের যে হিসাব করা হয়েছে, তা ধারণামাত্র। বাস্তবে এর চেয়েও বেশি অর্থ পাচার হচ্ছে। তার মতে, দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ না থাকায় অর্থ পাচার হচ্ছে। পাশাপাশি সুশাসনের অভাবে সহজে দুর্নীতি হচ্ছে। অবৈধ এ অর্থ দেশে নির্বিঘ্নে ব্যবহার করতে না পেরে তা পাচার করা হয়। পর্যাপ্ত নজরদারি ও আইনের শাসনে দুর্বলতা রয়েছে; যা সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, সবকিছুর আগে গোড়ায় হাত দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তাদের। ভাসা ভাসা বলে লাভ নেই। ঢালাওভাবে কাউকে দোষারোপ না করে সুনির্দিষ্টভাবে যারা অবৈধ পথে অর্থ পাচার কাজে লিপ্ত তাদের খুঁজে বের করতে হবে। অর্থ পাচারকারীরা বাংলাদেশেই আছেন। তারা এ দেশকে ভালোবাসেন না। দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ আছে দাবি করে মাতলুব বলেন, এ দেশের মতো এত লাভজনক বিনিয়োগ পরিবেশ পৃথিবীর কোথাও নেই। অর্থ পাচার থামাতে হবে। আর বাড়তে দেয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে গতকাল এনবিআর সম্মেলন কক্ষে ‘জনকল্যাণে রাজস্ব : রাজস্ব আদায়ে চাই অব্যাহত সহযোগিতা’ শীর্ষক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা রাখবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে নিয়মিতভাবে মুদ্রা পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তদের শনাক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করবে প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, আগে মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত ও মামলা করার এখতিয়ার কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ছিল। এখন এর আওতা বাড়ানো হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য সংস্থার পাশাপাশি এনবিআরও এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সরকার এখন চোরাচালানের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সোচ্চার।

নিখোঁজদের ফিরে পেতে স্বজনদের আকুতি- মানবাধিকার রক্ষায় আন্দোলন চলবে : মির্জা ফখরুল

সারা পৃথিবীতে মানবাধিকার ভুলুণ্ঠিত অভিযোগ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিশ্বে মানবাধিকার নিয়ে দ্বিমুখী নীতি চলছে। একদিকে মানবাধিকার রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র পৃথিবীতে মানবাধিকার ভুলুন্ঠিত।
আজ বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, আজকে যেমনি জঙ্গিরা আক্রমণ করে মানবাধিকার হরণ করছে, তেমনিভাবে ‘সভ্য দেশগুলোও’ আরব জগতে বিমান থেকে বোমা মেরে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। তাদেরকে ঘর থেকে উচ্ছেদ করে দিচ্ছে। লাখ লাখ আরবরা আজ সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে ভেলায় করে। এমন অবস্থায় মনে হচ্ছে- ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অব হিউম্যান রাইটস।
মির্জা ফখরুল বলেন, এই অবস্থায় আমাদেরকে অত্যন্ত সচেতনভাবে গণতন্ত্রের যে নীতি তা তুলে ধরে আন্দোলন করেই যেতে হবে। দেশের মানুষ কখনো হার স্বীকার করতে জানে না। আমরা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে চাই, আমরা দেশের মানুষের মানবাধিকার রক্ষা, ভোট এবং গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যে তাদের সেই আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে এবং বিজয় তাদের হবেই।
আজ বিকেলে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মানবাধিকার বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। এছাড়া বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরাও বক্তব্য রাখেন। সভা সঞ্চালনার সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৫৯ জন ব্যক্তি গুম হয়েছেন।
গুম ও নিখোঁজ হওয়া স্বজনদের বক্তব্য শোনে আবেগাপ্লুত হয়ে নিজেও কান্না করেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, সন্তান হারা পিতা বাকরুদ্ধ হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোট শিশু বাবার খোঁজে বার বার দরজায় অপেক্ষা করে। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না। মায়েরা প্রতিনিয়ত কান্না করেন। এই দেশ কী আমরা স্বাধীন করেছিলাম। আমরা কী দেশ স্বাধীন করলাম?
তিনি বলেন, আমাদের নেতা এম ইলিয়াস আলী, ঢাকার নেতা চৌধুরী আলম, কুমিল্লার লাকসামের সাবেক এমপি হুমায়ুন কবির হিরু নিখোঁজ হয়ে গেলেন। কোনো খোঁজ নেই। তাদের সন্তানেরা প্রতিদিন অপেক্ষা করছে।
দেশে শান্তি খোঁজে পাওয়া খুব কঠিন মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রতিদিন স্বজন হারাদের অশ্রু ঝরছে। তাদের চোখের পানির মূল্য অনেক। সেই মূল্য আজকে জাতিকে দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, সমগ্র দেশে ঘটলেও শুধু আমরা ঢাকার বিষয়গুলো জানতে পারছি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে সারাদেশে অসংখ্য নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। অনেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অনেকেই পঙ্গু হয়েছেন। পুলিশ ধরে নিয়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে তাদের পঙ্গু বানিয়েছে। কাশিমপুর জেলখানায় কমপক্ষে ২৫ জন ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীকে আমি দেখেছি। ক্রসফায়ারের নামে যে কত মানুষ নিহত হয়েছে তা ইতোমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, মনে হয় বিশ্ব মানবাধিকার- বোধ হয় ডবাল স্ট্যান্ডার্ড। একদিকে তারা মানবাধিকারের কথা বলছে, অন্যদিকে মানবাধিকারে লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
মওদুদ আহমদ বলেন, বাংলাদেশের সব কিছুই আছে আবার কোনো কিছুই নেই। বিচার বিভাগ আছে। কিন্তু স্বাধীনতা কতটুকু আছে, তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। সরকারের পরিবর্তন হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্র ফিরে পেতে চাই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরে পেতে চাই। মানবাধিকার ফিরে পেতে চাই। এটার জন্যই আমাদের সংগ্রাম। ছোট শিশুরা বড় হওয়ার আগেই গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম করতে হবে।
তিনি বলেন, মসজিদের ইমাম হত্যা হচ্ছে, বিদেশী নাগরিক হত্যা হচ্ছে। দেশে গণতন্ত্র নাই বলেই এ ধরনের ঘটনা গুলো ঘটছে। কিন্তু সরকার পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি দিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে যা ভুল পথ।
তিনি বলেন, সঠিক পথ হবে- দেশে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। এটা আপনারা এককভাবে সমাধান করতে পারবে না। আমরা এ ধরনের ঘটনাটা কখনো চাইনা। তাই সব গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরো বলেন, আপনাদের মনের দুঃখ শেয়ার করতে পারবে না। যার দুঃখ তার। আমরা সহানুভূতি জানাতে পারবো।
স্বজনহারাদের আকুতি আর কান্না
গুম হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে মহানগর বিএনপির ৩৭নং ওয়ার্ডের সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক দলের আবদুল কাদের ভুঁইয়া, মাসুমের মা আয়শা আখতার, মো. কাউসারের স্ত্রী মিনু, বিমান বন্দর থানা ছাত্রদলের নিজাম উদ্দিন মুন্নার বাবা মো. শামসুদ্দিন, বংশাল থানা ছাত্রদলের মো. সোহেলের পিতা মো. শামসুর রহমান, মো জহিরের মা হোসনে আরা বেগম, মো. ৭৯ নং মহানগর ছাত্র খালিদ হাসান সোহেলের স্ত্রী সৈয়দা শাম্মী সুলতানা, সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সেলিম রেজা পিন্টুর ভাই রাজীব হাসান তনু প্রমূখ।
গুম হওয়া স্বজনদের আকুতি আর কান্নায় হলরুম কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারা তাদের সন্তানদের ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান। এসময় সভাস্থল গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে।
গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা পারভেজের শিশু কন্যা হৃদি (৪) বলে, শেখ হাসিনা আন্টি আপনি আমার পাপাকে (বাবা) ছেড়ে দিন। আমরা আপনার জন্য দোয়া করব। প্লিজ পাপাকে ছেড়ে দিন। আমি স্কুলে যাব, চকলেট খাব।
একই আকুতি জানিয়ে গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা চঞ্চলের ছেলে আবুল আহাদ (৫) বলে, শেখ হাসিনা আন্টি, আপনি আমরা পাপাকে ছেড়ে দিন। পাপাকে ছাড়া আমরা কিছু ভালো লাগে না। মা ও দাদা পাপার জন্য সব সময় কাঁদে।