Thursday, February 19, 2026

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু আসল বিজয়ী কি ড. ইউনূস? by যুধাজিৎ শংকর দাস

ইন্ডিয়া টুডের বিশ্লেষণঃ সবাই যখন সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার দ্বৈরথে চোখ রাখছিল, তখন বাংলাদেশে নীরবে তৈরি হচ্ছিল এক রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড়। এর কেন্দ্রে ছিল এমন এক লড়াই-একজন প্রধানমন্ত্রী, যার নোবেল নেই; আর এক নোবেলজয়ী, যার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার নেই। খালেদা জিয়ার ছেলে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান মঙ্গলবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এটা সেই লড়াইয়েরই ফলাফল।

আমি যে ঘূর্ণিঝড়ের কথা বলছি, তা হলো আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ও নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিনের সংঘাত। এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল। ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়া, সহিংসতা, নাটকীয়ভাবে শেখ হাসিনার পতন এবং হঠাৎ করে মুহাম্মদ ইউনূসের আবির্ভাব- সবকিছুই যেন ঘড়ির কাঁটার মতো সময়মতো ঘটেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস জানান, হাসিনাকে সরানোর আন্দোলন ছিল সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলেছে, রাজনৈতিক দল ও ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো ছাত্রনেতাদের পেছনে মাঠের শক্তি জুগিয়েছিল। আজকের প্রশ্ন হলো- ফেব্রুয়ারি ১২’র নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলেও এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলেও, প্রকৃত বিজয়ী কি ইউনূস? রাজনৈতিক শক্তি না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি নিজের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করলেন? আর ইতিহাস কি তার প্রতি সদয় হবে?

৮৫ বছর বয়সী ইউনূস নির্বাচিত সরকার শপথ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ১৮ মাসের শাসনামলে তিনি যেসব লক্ষ্য নিয়েছিলেন, তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন- অর্ডিন্যান্স জারি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, সেনাপ্রধান ডিসেম্বর ২০২৫-এ নির্বাচন চাইলেও তিনি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন নির্ধারণ করেন এবং সেই নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া- সব মিলিয়ে ইউনূস বড় বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শফকত রাব্বী বলেন, ৮৫ বছর বয়সে ইউনূস অল্প সময়ে প্রায় সব লক্ষ্য পূরণ করেছেন। তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রোডাকটিভ সরকারপ্রধান বলা যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, ইউনূস অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে ও নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জনতার উচ্ছৃঙ্খলতা রোধ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। ইউনূসের বড় ব্যক্তিগত বিজয় হলো- তিনি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ভোট সম্পন্ন করেছেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতিও আদায় করেছেন। সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, বাংলাদেশের অন্তত ৪০ শতাংশ ভোটার-সমর্থিত দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করেও তিনি তা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এটা একপ্রকার অলৌকিক ঘটনা।

ইউনূস-হাসিনা দ্বন্দ্বের শিকড়
এই সংঘাতের সূত্রপাত বহু আগে। ২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র আওতায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে ইউনূসকে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ইউনূসের বিরুদ্ধে চাপ বাড়তে থাকে। গ্রামীণ টেলিকমের শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সমালোচকরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে উল্লেখ করেন। অবশেষে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন
ড. ইউনূস অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে পারেননি। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও জনতার হাতে হত্যার ঘটনা অব্যাহত ছিল। নারীর অধিকার ইস্যুতে ইসলামপন্থীদের দাবির কাছেও তিনি নতি স্বীকার করেন। তবে তিনি তথ্য সুরক্ষা, ডাটা প্রাইভেসি ও ক্লাউড কম্পিউটিং সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স পাস করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তার প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিলেও, বিএনপি তার কিছু ধারায় আপত্তি জানিয়েছে। ফলে এর বাস্তবায়ন অনিশ্চিত।

রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া কীভাবে সফল?
ড. ইউনূসের নিজস্ব রাজনৈতিক দল নেই। ছাত্রদের আহ্বানে তিনি দায়িত্ব নেন। কিন্তু তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের মতো শক্তিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একত্র করতে সক্ষম হন। তিনি ছাত্রনেতাদের সংগঠন এনসিপি ও যুবসমাজের সমর্থন পান। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।

এখন ইউনূসের ভবিষ্যৎ কী?
কেউ কেউ ধারণা করছিলেন তিনি হয়তো প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, তবে বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় সেই সম্ভাবনা কম। অধ্যাপক শাহান মনে করেন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করাই তার বড় অর্জন। তবে বিশ্লেষকরা বলবেন- তার সাফল্য ও ব্যর্থতা মিলিয়ে এক মিশ্র উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন।
সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, ইউনূস প্রমাণ করেছেন তিনি আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক অ্যাক্টর।

কিন্তু ইতিহাস কি মুহাম্মদ ইউনূসকে উষ্ণ আলিঙ্গন দেবে? স্বদেশ রায়ের ভাষায়, ইতিহাস বেছে নেয়। সবাইকে জায়গা দেয়, কিন্তু সব বিজয়ীকে নয়।
(অনলাইন ইন্ডিয়া টুডে থেকে অনুবাদ)

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু আসল বিজয়ী কি ড. ইউনূস?

ওরা কেন ভোট দিতে পারে না by সৈকত আমীন

প্রকাশ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ সারা দেশে ভোট চলছে। বহু প্রতীক্ষা, বহু আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই ভোট। বহু বছর পর মানুষ নিজেদের হাতে রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ পেয়েছে। বহু বছর পর সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে নিশ্চিত হয়েছে ভোটাধিকার। এ ঘটনা নিঃসন্দেহে আনন্দের। এই আন্দন নিয়ে সকাল সকাল বের হয়েছিলাম ভোট দিতে। ঢাকার প্রায় ৮৫ লাখ ভোটারের মধ্যে আমিও একজন। আনন্দের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে একটা শঙ্কাও সামনে এল। ভোটাধিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা আমরা অর্জন করলাম, কিন্তু এই অধিকার প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা সক্ষম হলাম কতটা?

এই শঙ্কার বার্তাবাহক ছিলেন একজন রিকশাচালক। তাঁর নাম হাসিব ইসলাম। হাসিবের রিকশায় চড়ে মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম। একা রিকশায় চড়লে পুরোনো অভ্যাসবশত রিকশাচালকদের সঙ্গে গল্প করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছাই। এতে প্রথমত সময়টা ভালো কাটে। দ্বিতীয়ত, রিকশাচালকদের কথায় দেশ ও জাতি নিয়ে এমন অনেক গল্প উঠে আসে, যা সাংবাদিকতার ফ্রেমে সাধারণত আঁটে না। ক্যামেরার লেন্সে যা সাধারণত ধরা পড়ে না।

হাসিবও এ বিষয়ে হতাশ করেননি। তাঁর বয়স ২৮। বসতভিটা কুড়িগ্রামের উলিপুরে। ঢাকার মিরপুরে স্ত্রী ও তিনি থাকেন। স্ত্রী পোশাকশ্রমিক। তিনি বা তাঁর স্ত্রী ভোট দিতে যেতে পারেননি।

জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভোট দিতে কেন গেলেন না? হাসিব জানালেন, ঢাকা থেকে ভোট দিতে যাওয়া–আসা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচের বিষয়। তাঁর পরিবারের এই খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই। ভোট দিতে না যেতে পারা নিয়ে তাঁর ভেতরে আফসোস আছে। কারণ, হাসিবের মতে, এর আগের দুটি নির্বাচনে আরও লাখ লাখ মানুষের মতো তিনিও ভোট দিতে পারেননি।

গতকাল বুধবার দেশের নানান জায়গায় ভোটারদের মধ্যে নগদ অর্থ বিলি করার অভিযোগে রাজনৈতিক দলগুলোর বহু কর্মী আটক হয়েছেন। জনরোষের কবলে পড়েছেন অনেক স্থানীয় নেতা। হাসিবকে জিজ্ঞাসা করছিলাম, কোনো প্রার্থী ভোট দিতে যেতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না? আর্থিক দুরবস্থার বিষয়টা বিবেচনা করতে চেয়েছেন কি না? এই ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত হাসিব খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। সম্ভবত আমি অজান্তেই তাঁর আত্মমর্যাদায় আঘাত করে ফেলেছিলাম।

হাসিব দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘কেউ টাকা সাধলেই কি টাকা নিতাম? সামর্থ্য থাকলে নিজের পয়সা খরচ করেই ভোট দিতে যাইতাম। কারও কথায় ভোট দিতে কেন যাব, টাকা কেন নেব?

হাসিবের মতে, নির্বাচন কমিশন বা ভোট–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর মতো দরিদ্র ও ভোটকেন্দ্র থেকে অনেক দূরে থাকা ভোটার বিষয়টি কখনোই বিবেচনায় রাখেননি। তিনি জানেন, প্রবাসীদের জন্য ডাকযোগে ভোট প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সুযোগ যদি দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষও পেতেন, তাহলে ভোটের পরিবেশ ও ভোটের সংখ্যা—দুটিই আরও উৎসবমুখর হতে পারত। হাসিব আশাবাদী, নির্বাচিত সরকার পরবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁদের কথা অবশ্যই বিবেচনা করবে।

সামর্থ্যের কাছে সীমাবন্ধ এই দুর্দশার চিত্র কেবল হাসিবের নয়। বাসা থেকে অফিসে আসার পথে নিম্নবিত্তের ৯ জন মানুষের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাঁরা প্রত্যেকেই ভোটার। কিন্তু ভোট প্রয়োগ করার সক্ষমতা থেকে এখনো অনেক দূরে। হাসিবের রিকশা থেকে নেমে যখন মিরপুর ১০ নম্বর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে দাঁড়ালাম, সেখানে উৎসবের আমেজ চলছে। স্কুলটি ঢাকা–১৫ আসনের নারীদের অন্যতম বড় ভোটকেন্দ্র।

স্কুলের একটু দূরেই নিজের ফ্লাস্ক আর বিস্কুটের ঝুড়ি নিয়ে ব্যস্ততার ভেতর ছিলেন রবিউল ইসলাম। ৪০ বছর বয়সী রবিউল ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতা। তাঁর বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে।

২০ বছর ধরে ঢাকায় থাকলেও ভোটার এলাকা বদল করা হয়নি। প্লাস্টিকের কাপে চা ঢালতে ঢালতে রবিউল আক্ষেপ করে বললেন, ‘ভাই, দোকানের সামনে দিয়ে মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে, এটা দেখে কলিজাটা হু হু করে। আমার এলাকা হলে তো আজ আমি কোনো লাইনের ধার ধরতাম না, বুক ফুলায়া গিয়া সিল মারতাম। কিন্তু আমার এলাকা তো ভাই অনেক দূরে। মা-বউ আছে গ্রামে। যাইতে–আসতে কমপক্ষে তিন হাজার টাকা। এক দিন চা বিক্রি না করলে পরের দিন ঘরে চাল ওঠে না। আমি কি তিন হাজার টাকা খরচ কইরা ভোট দিতে যাওয়ার শখ–আহ্লাদ করতে পারি?’

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে মেট্রো স্টেশনের নিচে দেখা মিলল ষাটোর্ধ্ব মোজাম্মেল মিয়ার। একটি ভ্যানে শুয়ে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁর বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটালাম।

মোজাম্মেল মিয়ার ভোট নীলফামারীতে। শেষবার ২০০৮ সালে তিনি ভোট দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের অনভ্যাস আর সক্ষমতার অভাবে এবারও তিনি ঢাকায় থেকে গেছেন পেটের দায়ে।

মোজাম্মেল মিয়া খুব শান্ত, কিন্তু কঠোর ভাষায় বললেন, ‘ভোট দিতে কার না মন চায়, বাজান? ভোট দিতে পারা মানে নিজেরে দেশের মানুষ মনে হওয়া। আমরা তো কুলি-মজুর। আমরা কাজ করলে খাই, না করলে উপাস থাকি। আমগো মতো মাইনষের ভোট তো শুধু আঙুলের ছাপ না, এটা হইলো কয় দিনের কামাইয়ের লগে লড়াই।'

'আমার নীলফামারী যাইতে-আসতে যে ট্যাকা খরচ হয়, হেইডা দিয়া আমি ১৫ দিনের চাউল কিনতে পারি। তাইলে বোঝেন, পেটের ক্ষুধার সাথে ভোটের লড়াইটা কেমন! আমার একটা বাড়তি টাকার নোটও।’

যখন প্রশ্নটা উঠল, আসলে সমাধানের পথ কী হতে পারত? তিনি একটু নড়েচড়ে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সরকার তো কত কামই করে। গরিব মাইনষের বেলা কোনো একটা ব্যবস্থা কি হইতে পারত না? মনে করেন, যারা এমন বহু দূরে থাকে আর কাম কইরা খায়, সরকার যদি বিশেষ দিনগুলোয় আমগো যাতায়াত বা আসা-যাওয়ার একটা সুযোগ কইরা দিত; তাইলে দেখতেন এই দিনমজুর, কুলি-মজুরে নীলফামারী, রংপুর সব ভরে গেছে। যদি আমগো আনা-নেওয়ার কোনো ইনতেজাম থাকত, তাইলে আজ আমি নীলফামারীর কেন্দ্রে গিয়া হাসিমুখে সিলটা দিতাম।’

সংকটের এই মেঘ কেবল দিনমজুরবর্গের ওপরেই নয়, সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণের এই দিন নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বহু বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন, অনিশ্চয়তা আর আত্মত্যাগের পর নাগরিকেরা আবারও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু মাঠে ঘুরে, ভোটকেন্দ্রের বাইরের বাস্তবতা দেখে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। ভোটাধিকার নিশ্চিত হলেই কি ভোট প্রয়োগের সক্ষমতাও নিশ্চিত হয়?

হাসিব, রবিউল, মোজাম্মেলদের কণ্ঠে যে বঞ্চনার সুর শোনা গেল, তা কেবল আর্থিক অক্ষমতার বিবরণ নয়, এটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দলিল। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ হলেও কর্মসংস্থানের কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের যে বিশাল স্রোত তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের ভৌগোলিক বিন্যাসের সমন্বয় হয়নি। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় লাখ লাখ মানুষ কাজের প্রয়োজনে বসবাস করছেন, কিন্তু তাঁদের ভোটার এলাকা রয়ে গেছে নিজ নিজ জেলায়। ফলে ভোট দেওয়া তাঁদের কাছে রাজনৈতিক অধিকার নয়, অর্থনৈতিক বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচন কমিশন প্রবাসীদের ডাকযোগে ভোটের সুযোগ দিয়েছে, যা প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত শ্রমশক্তির জন্য কোনো সমান্তরাল ব্যবস্থা নেই। অনলাইনে অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র নির্বাচন, কর্মস্থলভিত্তিক বিশেষ ভোট, আগাম ভোট বা পোস্টাল ব্যালটের মতো পদ্ধতি নিয়ে এখনো কার্যকর আলোচনা শুরু হয়নি।

তবে সংকট শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী, কারখানার তদারকি কর্মী, হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্স, সংবাদকর্মী, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতের জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীরা আজ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। কেউ রাতভর ডিউটিতে, কেউ মাঠে রিপোর্টিংয়ে, কেউ জরুরি অস্ত্রোপচারে। রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখতে তাঁরা ভোটের দিনটিকে ব্যক্তিগত অধিকারের চেয়ে পেশাগত দায়বদ্ধতার কাছে সমর্পণ করেছেন। এই আত্মত্যাগের কোনো পরিসংখ্যান নেই, কোনো আলাদা তালিকাও নেই।

এখানে একটি নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। রাষ্ট্র কি শুধু ভোট গ্রহণের দিনকে সফল করতে চায়, নাকি প্রত্যেক নাগরিককে ভোট প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়? কতজন ভোট দিতে চেয়েও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় পারেননি, সে অদৃশ্য সংখ্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র শ্রমিকের জন্য তিন হাজার টাকা মানে পনেরো দিনের খাদ্যনিরাপত্তা। জরুরি পেশার কর্মীর জন্য ভোটের দিন মানে পেশাগত দায়িত্বে অবিচল থাকা। এ দুই বাস্তবতাই গণতন্ত্রের নীরব আত্মত্যাগের অংশ।

নিশ্চয়ই এ সমস্যার সমাধান অদূর ভবিষ্যতের জন্য অসম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর রিমোট ভোটিং, আগাম ভোটের সুযোগ, কর্মস্থলভিত্তিক অস্থায়ী কেন্দ্র, আন্তজেলা ভোটার স্থানান্তরের সহজ প্রক্রিয়া কিংবা বিশেষ যাতায়াতের সুবিধা নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এসব উদ্যোগ শুধু ভোটের হার বাড়াবে না; রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে আরও আস্থাভিত্তিক করবে।

যে মানুষগুলো নিজেদের সামর্থ্য, সময় ও শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রকে সচল রাখছেন, অথচ ভোটের দিনে লাইনে দাঁড়াতে পারছেন না, তাঁদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন রাষ্ট্র কীভাবে করবে? নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হওয়া এই অদৃশ্য নাগরিকদের দৃশ্যমান করা। রাষ্ট্র যদি প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এই বহু প্রতীক্ষিত ভোট সত্যিকার অর্থে জনতার হবে।

নয়তো ভোটের উৎসবে লাখো নাগরিকের মনের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হতেই থাকবে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার কয়েকটির লাইন—

‘আমি সেই অবহেলা, আমি সেই নতমুখ, নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান ভেজা চোখ,

আমাকে গ্রহন কর।’

* সৈকত আমীন, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
- ই-মেইল: shoikotamin@yahoo.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-12%2Fq6pg1o4u%2FWhatsApp-Image-2026-02-12-at-2.54.19-PM.jpeg?rect=0%2C18%2C1280%2C853&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নির্বাচনের দিন বেলা ১১ টায় কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনজন দিনমজুর। প্রথম আলো

বিএনপির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আওয়ামী লীগ কার্যালয় খোলার সাহস পেত না: নাহিদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ (সবুজ সংকেত) রয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিএনপির কাছ থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আওয়ামী লীগ এটা করার সুযোগ বা সাহস পেত না।

এবারের নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের যোগসাজশ হয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে দলীয় পর্যালোচনা জানাতে এই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল এনসিপি।

বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জবাবদিহি দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে প্রশাসনিকভাবে সেই কার্যালয় বন্ধ করায় যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধের ডাক দেব। সেটার জন্য এই সরকারকেও আমরা কাঠগড়ায় দাঁড় করাব ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের দায়ে।’ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়টিকে ব্যাপকভাবে প্রচার করায় কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বেসরকারি এখন টিভির দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো দলীয় গণমাধ্যম চাই না। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে সেই প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। আমরা আশা করব, এই মুহূর্ত থেকে এটা বন্ধ হবে, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে।’

দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, একটি ভুল ব্যাখ্যা ও সংবিধানের দোহাই দেওয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যপদে শপথ না নিয়ে একধরনের প্রতারণা করা হয়েছে, গণভোটের গণরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। সংসদকে কার্যকর করতে একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হোক। সংস্কার পরিষদ ছাড়া এই জাতীয় সংসদের কোনো মূল্য নেই।

আইনের শাসন নিশ্চিত করা, পুলিশে দলীয়করণ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, রাস্তাঘাটে চলাফেরায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মব সংস্কৃতি বন্ধ করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাজার ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার, বিরোধী দলের ওপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় দমন-পীড়ন বন্ধ করা এবং নোয়াখালীর হাতিয়ায় ধর্ষণের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাগালে রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতেও নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

‘নতুন মন্ত্রিসভা পুরোনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা’

বিএনপি সরকারের ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় কোনো নতুনত্ব দেখছেন না বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই মন্ত্রিসভা দেখে আমাদের কাছে কোনোভাবে মনে হয়নি, এটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং এখানে পুরোনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। এই মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি। মন্ত্রিসভায় নারী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ যথেষ্ট পরিমাণ হয়নি। সার্বিকভাবে এটা প্রতিনিধিত্বমূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক মন্ত্রিসভা হয়নি।’

নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের গড় বয়স প্রায় ৬০ বছর বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় কিছু তরুণকে সুযোগ দেওয়া হলেও এতে তারুণ্যের বাংলাদেশের প্রতিফলন হয়নি। সবচেয়ে ‘অ্যালার্মিং’ (উদ্বেগের) বিষয় হলো, এই মন্ত্রিসভায় প্রায় ৬২ শতাংশ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ব্যবসায়ী। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি হচ্ছে ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হওয়াটা অপরাধ নয়, কিন্তু মন্ত্রিসভায় যে রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থাকা উচিত, সেটা হয়নি।

বিএনপির মন্ত্রিসভায় ব্যাপক আর্থিক অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও ঋণখেলাপির অভিযোগে অভিযুক্ত, হত্যা মামলার আসামি—এ ধরনের লোককে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, বড় বাজেটের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এমন একজনকে দেওয়া হলো, যিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং হত্যা মামলার আসামি।...নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা বলছেন। কিন্তু তাঁর নিজের মন্ত্রিসভা ও দলীয় সংসদ সদস্যরা ঋণ কবে পরিশোধ করবেন, দেশের মানুষ সেটা জানতে চায়।

কিছু ভালো ও অভিজ্ঞ লোকও নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন উল্লেখ করে সেটিকে সাধুবাদও দেন নাহিদ। তিনি বলেন, তবে সার্বিকভাবে পরিবর্তন বা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এই মন্ত্রিসভা যাচ্ছে না। একদিকে তাঁরা (বিএনপির নেতারা) বলছেন, প্লট নেবেন না, গাড়ি নেবেন না। কিন্তু তাঁরা ঋণখেলাপিদের সংসদে নিয়ে গেলেন, মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছেন। বৈধ সুবিধাকে অস্বীকার করে জনগণের সামনে সাধু সাজা হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বড় বাজেটের মন্ত্রণালয় দেওয়া হলো।

বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের স্থান পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক।

‘গণভোট বাতিল হলে সরকারেরও বৈধতা থাকবে না’

গণভোটের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যে রিট হয়েছে, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি, আদালত গণভোট বা জনগণের পক্ষেই রায়টা দেবেন। কারণ, যদি গণভোট বাতিল হয়ে যায়, তাহলে এই সংসদ নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। গণভোট বাতিল হলে এই সরকারেরও বৈধতা থাকবে না।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কারও বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি না থাকে, তাহলে সেই সেটআপ পরিবর্তন না করার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানো যায়।

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, মাহবুব আলম, যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহউদ্দিন সিফাত, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-19%2Fmfv3et47%2FNahid-Islam-01.jpeg?rect=0%2C77%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। ছবি: প্রথম আলো

‘আপনার ছেলে আর নেই, ইন্না লিল্লাহ পড়েন’ by আব্দুর রাজ্জাক

১৮ বছর বয়সী ফাহাদের চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। তবে উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে বাবা তাঁকে পাঠিয়ে দেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। দালালের মাধমে ইথিওপিয়া থেকে ১৫ দিন দুর্গম জঙ্গলে পথচলার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান ফাহাদ। তবে আফ্রিকায় পৌঁছেই মৃত্যু হয় তাঁর।

হাসিখুশি ফাহাদ সব সময় বিদেশে যেতে চাইতেন। তাঁর দুই মামা দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করে ভালো আয় করেন। নিজেদের অবস্থা বদলেছেন। তাই তিনিও চাইতেন তেমন কিছু করবেন। ছেলের ইচ্ছা পূরণ করতে ৯ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে ফাহাদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠান তাঁর বাবা নুর মোহাম্মদ। তবে আফ্রিকায় পৌঁছেই মৃত্যু হয় ফাহাদের।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে বিমানে দক্ষিণ আফ্রিকার পথে রওনা হন মো. ফাহাদ (১৮)। প্রথমে ইথিওপিয়া, সেখান থেকে আরেকটি বিমানে জিম্বাবুয়ে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার কথা ছিল তাঁর, কিন্তু তা আর হয়নি। দালালেরা ইথিওপিয়া থেকে জঙ্গলের পথ ধরে জিম্বাবুয়ে নিয়ে যায় তাঁকে। সেখান থেকে সড়ক পথে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার। রোববার সকালে ছেলে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেছেন—এমন খবর পান ফাহাদের বাবা নুর মোহাম্মদ (৪৫)। কিন্তু সেই রাতেই আরেকটি টেলিফোনে ছেলের মৃত্যুর খবর আসে।

ফাহাদের কথা বলতে বলতে প্রতিমুহূর্তে কান্নায় গলা বুজে আসছিল নুর মোহাম্মদের। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলেকে কখনো কোনো অভাব দেখাইনি। বলতাম, বাবা তুই পড়ালেখা কর। কিন্তু সে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে চাইত। এরপর ব্যবস্থা করে দিই। এখন আমার ফাহাদ আর নেই।’

নুর মোহাম্মদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের উত্তর জোয়ারা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ফাহাদ ছিলেন মেজ। সম্প্রতি স্থানীয় কাঞ্চনাবাদ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তিনি। চলতি বছর তাঁর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও আর পড়তে ইচ্ছুক ছিলেন না তিনি।

একটি বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নুর মোহাম্মদ বলেন, ফাহাদের দুই মামা আগে থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকেন। তাঁদের সেখানে ব্যবসা আছে। ফাহাদের বড় মামা প্রায় ১০ বছর আগে এবং ছোট মামা ৮ মাস আগে একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় গেছেন। ছেলের পীড়াপীড়িতে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। সেই টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে ফাহাদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

নুর মোহাম্মদ বলেন, ঢাকা থেকে ৩০ জানুয়ারি আফ্রিকার উদ্দেশে বিমানে ওঠেন ফাহাদ। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে হঠাৎ একটা ফোন আসে। ফোনে অপরিচিত একজন তাঁকে বলেন, ‘আপনার ছেলে ফাহাদ আর নেই, ইন্না লিল্লাহ পড়েন, সে মারা গেছে।’

পরিবারের ধারণা, দীর্ঘ পথযাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা ও চিকিৎসার অভাবেই ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা ফাহাদকে ২০০ ডলার দিয়েছিলেন। ব্যাগেও পর্যাপ্ত শুকনা খাবার দিয়েছিলেন। তবে জঙ্গলে তাঁর থেকে সবকিছু ছিনতাই হয়েছে। এ কারণে ফাহাদকে কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে।

নুর মোহাম্মদ জানান, দালালেরা ঢাকা থেকে প্রথমে ইথিওপিয়া ও জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত বিমানে নেওয়ার কথা বলেছিল। পরে সীমান্ত পার করে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফাহাদকে ইথিওপিয়া থেকে একাধিক দেশ ঘুরিয়ে সড়কপথে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হয়। এ কারণে অনেক সময় তাঁকে জঙ্গলে হাঁটতেও হয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলে এ যাত্রা।

১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ফাহাদের ছোট মামা মোহাম্মদ ফয়সাল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নুর মোহাম্মদকে ফোন করেন। তিনি জানান, ফাহাদ দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরে পৌঁছেছেন। সেখানের একটি কক্ষে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। শুনে স্বস্তি পেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। ওই দিন রাতেই ফাহাদের মৃত্যুর খবর আসে ফোনে। ফাহাদের সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট ও কাগজে দেওয়া ঠিকানা দেখে একজন নুর মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই খবর দেন।

ফাহাদের বাবা নুর মোহাম্মদ জানান, দালাল চক্রকে প্রথমে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। পরে যাত্রা শুরুর করার সময় ব্যাংকের হিসাব নম্বরের মাধ্যমে আরও সাত লাখ টাকা দেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানোর পর আরও দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। ফাহাদের মৃত্যুর খবরে দালালেরা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

শোকে কাতর নুর মোহাম্মদের কান্নারও শক্তি নেই। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে অন্তত শেষবারের মতো দেখতে চাই। কীভাবে ওকে ছাড়া থাকব? এত হাসিখুশি ছেলেটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-18%2Ffm4052ve%2FWhatsApp-Image-2026-02-18-at-8.00.29-PM.jpeg?rect=0%2C0%2C1013%2C675&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে বিমানে ওঠার আগে ঢাকায় বিমানবন্দরে মো. ফাহাদ। ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় নতুন মন্ত্রিসভা: নাহিদ

নতুন বাংলাদেশের সংস্কার ও পরিবর্তনের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, ঘোষিত নতুন মন্ত্রিসভা তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নতুনত্বের পরিবর্তে এই মন্ত্রিসভায় পুরনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতাই প্রতিফলিত হয়েছে।’ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলামোটরে দলের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মন্ত্রিসভা গঠনে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি। দেশের প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী রাখা হয়নি, যা স্পষ্ট আঞ্চলিক বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। মন্ত্রিসভা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল হয়নি; নারীর অংশগ্রহণ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বও পর্যাপ্ত নয়।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে তারুণ্য দেশের রাজনৈতিক পথ দেখিয়েছে, সেই তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশের প্রতিফলন মন্ত্রিসভায় দেখা যায়নি। যদিও কিছু তরুণকে সুযোগ দেয়া হয়েছে, তবু মন্ত্রিসভার গড় বয়স তুলনামূলক বেশি হওয়ায় নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।’

এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যের প্রায় ৬২ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী পেশার সঙ্গে যুক্ত।’ ব্যবসায়ী হওয়া অপরাধ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন ছিল। অর্ধেকের বেশি ব্যবসায়ী হলে তারা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী হবে, জনগণের স্বার্থ নয়। এসব ব্যবসায়ীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।’

টিআইবির একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপির সংসদের প্রায় ৬২ শতাংশ সদস্যের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট ঋণ কবে পরিশোধ করা হবে—এ প্রশ্ন জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে—দল ও মন্ত্রিসভা থেকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞদের আনা হয়েছিল জাতীয় স্বার্থে। ভবিষ্যতেও তাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।’

এনসিপি আহ্বায়ক আরও বলেন, ‘জুলাই গণআন্দোলনের পর জনগণ একটি সম্পূর্ণ নতুন ও দুর্নীতিমুক্ত মন্ত্রিসভা প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু ঘোষিত মন্ত্রিসভা সেই পরিবর্তন বা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি।’

পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় নতুন মন্ত্রিসভা: নাহিদ

গাজায় নিহত ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে, সরকারি তথ্য ‘অতিরঞ্জিত’ নয়

ল্যানসেটের প্রতিবেদনঃ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আগের সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।

বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট–এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই গাজায় ৭৫ হাজারের বেশি ‘সহিংস মৃত্যু’র ঘটনার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস–নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে যে অতিরঞ্জিত তথ্য দেয়নি, ধারাবাহিক এসব গবেষণা সেটিই স্পষ্ট করেছে। সেই সঙ্গে তা ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানির বিস্তৃতি নিয়ে শক্তপোক্ত ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত ‘গাজা মরটালিটি সার্ভে’ বা জিএমএস নামের খানাভিত্তিক জরিপে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় ৭৫ হাজার ২০০ জনের ‘সহিংস মৃত্যুর’ খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগে গাজার মোট জনসংখ্যা ২২ লাখের প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

একই সময় গাজায় ৪৯ হাজার ৯০ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিল হামাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ল্যানসেটে প্রকাশিত হিসাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের চেয়ে ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

এ বছরের ২৭ জানুয়ারি গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭১ হাজার ৬৬২–এ দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর নিহত হয়েছেন ৪৮৮ জন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়।

ইসরায়েল বরাবরই গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হতাহতের তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও গত জানুয়ারিতে ইসরায়েলি এক সেনা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধ চলাকালে গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীও মনে করছে।

নিহতের সংখ্যাটি বেশি হলেও গবেষকদের মতে, হতাহতদের জনমিতিক হার ফিলিস্তিনের সরকারি তথ্যের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্কদের হার সব মিলিয়ে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। ফিলিস্তিনের সরকারি হিসাবের সঙ্গে এ তথ্য অনেকটাই কাছাকাছি।

গাজা মরটালিটি সার্ভেতে ২ হাজার খানার ৯ হাজার ৭২৯ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। নিহতের সংখ্যা নির্ধারণে একটি কঠোর প্রমাণভিত্তিক গবেষণাকাঠামো অনুসরণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাট বলেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহতের সংখ্যাটি বিশ্বাসযোগ্য। তবে সেখানে বিধ্বস্ত ভবনগুলোর নিচে এখনো কত মরদেহ চাপা পড়ে আছে, সেটা জানা না থাকায় সংখ্যাটি সবচেয়ে কম ধরা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে এ গবেষণা প্রতিবেদন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ল্যানসেটে প্রকাশিত আগের একটি গবেষণার ফলাফলকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। ওই গবেষণায় পরিসংখ্যানভিত্তিক ‘ক্যাপচার-রিক্যাপচার’ মডেলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রথম ৯ মাসে ৬৪ হাজার ২৬০ জন নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-19%2Fbo9nv9ch%2Fprothomalo-Gaza.avif?rect=1%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজার খান ইউনিস এলাকায় নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের জানাজায় স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই একে অপরকে হত্যা করেন, দাবি ইসরায়েলি মন্ত্রীর

ইসরায়েলের উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদ ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই একে অপরকে হত্যা করেন। এখানে ইসরায়েল সরকারের কোনো দোষ নেই।’

গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি পার্লামেন্টে একটি বিতর্ক চলার সময় স্মোট্রিচ এ কথা বলার পর ব্যাপক ক্ষোভ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

এদিকে ইমান খাতিব-ইয়াসিনসহ ইসরায়েলের পার্লামেন্টের (নেসেট) কয়েকজন ফিলিস্তিনি আইনপ্রণেতা বিতর্ক চলাকালে বলেন, স্মোট্রিচের প্রস্তাবিত খালি জমির ওপর ১ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পত্তি কর ফিলিস্তিনিদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দেশটিতে ফিলিস্তিনিরা সম্পত্তির মালিক হলেও তা উন্নয়ন করার অনুমতি রাখেন না।

বিতর্ক চলাকালে ফিলিস্তিনি আইনপ্রণেতা অভিযোগ করে আরও বলেন, ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তে থাকা সহিংসতার দায় নিতে ইসরায়েল সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

জবাব দিতে গিয়ে স্মোট্রিচ উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা নিজেরাই একে অপরকে হত্যা করেন, কীভাবে এর দায় সরকারের হতে পারে?’

তবে স্মোট্রিচের এ মন্তব্যকে ঘৃণ্য ও বর্ণবাদী বলে উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানানো হয়।

ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘হত্যা বন্ধ করতে আপনাদের জনগণকে শিক্ষিত করে তুলুন। আসুন, আপনারা সন্ত্রাস ও সহিংসতার নিন্দা জানানো শুরু করুন। হামাসকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করুন।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলজুড়ে প্রধানত ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে বারবার বিক্ষোভও হচ্ছে।

গত মাসে সাখনিন ও তামরায় বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখান থেকে বিক্ষোভ অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

গত সপ্তাহে তেল আবিবে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। প্রায় এক লাখ মানুষ জমায়েত হন সেখানে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অন্যতম বৃহৎ সমাবেশগুলোর একটি ছিল এটি। বিক্ষোভ সমাবেশে তাঁরা সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সহিংসতা দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের মতে, এ বছর এ পর্যন্ত ইসরায়েলে ৫১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। সংস্থাটি ইসরায়েলের ভেতরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় নজর রাখে।

২০২৫ সালে ইসরায়েলে ২৫২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়। এক বছরে ২১৮টি পৃথক ঘটনায় নিহতের এ সংখ্যা নতুন রেকর্ড। গত দশকের তুলনায় নিহতের এই সংখ্যা প্রায় চার গুণ।

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ইসরায়েল সরকার এ সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে; যা সহিংসতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-19%2Fix6ixa6i%2FBezalel-Smotrich.webp?rect=11%2C0%2C1182%2C788&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জেনেভায় আলোচনা শেষ হতেই মধ্যপ্রাচ্যে যৌথ মহড়ায় ইরান-রাশিয়া

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। লক্ষ্য ইরান সংকট ও রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের একটি সুরাহা করা। তবে আলোচনার পরই রাশিয়াকে নিয়ে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করছে তেহরান ও মস্কো। আগামীকাল বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যের ওমান সাগরে এ মহড়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

এর আগে হরমুজ প্রণালিতে গত সোমবার মহড়া চালায় ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড কোর। ওই মহড়া ছিল এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ। এরপর আজ বুধবার ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল হাসান মাকসৌদলু বলেন, ওমান সাগর ও ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলে বৃহস্পতিবার যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হবে।

ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে এ যৌথ মহড়ার লক্ষ্য হলো সমুদ্রে নিরাপত্তা বাড়ানো এবং দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা। তবে কত দিন ধরে এ মহড়া চলবে, তা স্পষ্ট করেননি হাসান মাকসৌদলু। এদিকে মহড়া চলার সময় নিরাপত্তা স্বার্থে কয়েক ঘণ্টার জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে তেহরান। এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়।

মঙ্গলবার জেনেভায় ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার মধ্যস্থতা করেছিল ওমান। এর আগে ওমানের রাজধানী মাসকাটে প্রথম ধাপের আলোচনা হয়। ইরানের পরমাণু ইস্যু নিয়ে এর আগেও আলোচনা চলছিল। তবে গত বছর জুন মাসে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের কারণে আলোচনা থেমে যায়। ওই সংঘাতের সময় ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রও।

এদিকে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন রণতরিগুলো ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে’ দেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। মঙ্গলবার তেহরানে এক অনুষ্ঠানে খামেনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী এমন এক চপেটাঘাত খেতে পারে, যা থেকে তারা আর সেরে উঠতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী’ দাবি করার পরিপ্রেক্ষিতে খামেনি এ মন্তব্য করলেন। গত মাসে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের মহড়ার সময় গত সোমবার একটি নৌযান থেকে ছোড়া হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র
ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের মহড়ার সময় গত সোমবার একটি নৌযান থেকে ছোড়া হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র। ছবি: এএফপি

নির্বাচন কর্মকর্তার চোখে ২০১৮ ও ২০২৬: এক নির্বাচনে ভয়, আরেক নির্বাচনে ভরসা by মানসুরা হোসাইন

‘নিজের ছাত্রের বয়সী এক ছেলে কলার ধরে বলেছিল, সবাই ব্যালট বাক্সে দিয়ে দিয়েছে, তুই এখনো দেস নাই ক্যান?’ কথাটা বলতে গিয়ে কিছুক্ষণ থামলেন সৈয়দ নাজমুস সাকিব। অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন বলে হুমকি পেয়েছিলেন তিনি। ঘটনাটি ২০১৮ সালের। সেবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে হুমকি, ভয় আর অসহায়তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন নাজমুস সাকিব।

আট বছর পর, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তাঁর কণ্ঠে ভিন্ন সুর, ‘ন্যূনতম কোনো সমস্যা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।’

বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের ইংরেজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাজমুস সাকিব। নির্বাচনের পর পারিবারিক সময় কাটাতে ঢাকার বাইরে অবস্থানকালে শনিবার তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করে গেলেও নাজমুস সাকিব এ পর্যন্ত একবারও নিজের ভোট দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।

২০২৬: সকালের বিস্ময় দিয়ে শুরু

রাজধানীর লালবাগের জামিলা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে নাজমুস সাকিবের বুথ ছিল ভবনের তৃতীয় তলায়। ভোট শুরুর নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে সাতটার আগেই ভোটার উপস্থিত—এ দৃশ্য তাঁকে বিস্মিত করেছে।

২০১৮ সালের ভোটে অনিয়মের চূড়ান্ত রূপ দেখা নাজমুস সাকিব বলেন, ‘এবার ব্যালট পেপার হাতে আসার আগেই ভোটার হাজির। নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এত মানুষকে ভোট দিতে দেখা এবারই প্রথম।’

নাজমুস সাকিব বলেন, ভোট শুরুর পর দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটু সময়ের জন্যও তিনি নড়তে পারেননি। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে দুই মিনিটের জন্য ওয়াশরুমে যেতে পেরেছিলেন। তারপর বেলা পৌনে তিনটা পর্যন্ত আবার একটানা কাজ করতে হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে ভোট নেওয়ার পর ভোট গণনা শেষে বাড়ি ফেরেন তিনি।

নাজমুস সাকিবের বুথে ভোট দিয়েছেন পুরুষ ভোটাররা। তিনি বলেন, ৯০ বছরের বেশি বয়সী এক ভোটার অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে এসেছেন। টিপসই দিতে বললে তিনি নিজেই সই করতে চাইলেন। ভোট দিয়ে বেরিয়ে বললেন, ‘জীবনে আর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাব কি না, জানি না, তবে এবার সুষ্ঠুভাবে দিতে পারলাম।’

একজন বয়স্ক ভোটার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে ক্ষুব্ধ হয়ে গালাগালি করেছিলেন। কিন্তু বুথে ঢুকে প্রক্রিয়া দেখে পরে ক্ষমা চান।

নাজমুস সাকিব তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভোটারদের বেশ বড় একটা অংশ ‘গণভোট’ বিষয়টি বুঝতেই পারেনি। কিসের ‘হ্যাঁ’, কেন ‘হ্যাঁ’, কিসের ‘না’, কেন ‘না’—এ নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না অনেকের। বারবার বুঝিয়ে দিলেও বুঝতে পারছিলেন না। কয়েকজন গণভোটে ভোট না দিয়ে ব্যালটটি ফেরত দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। ব্যালট কেমন করে ভাঁজ করবেন, তা–ও বেশির ভাগ ভোটারকে দেখিয়ে দিতে হয়েছে।

বুথের ভেতরে নাজমুস সাকিবসহ অন্য যাঁরা দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁরা ভোটারদের বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তা করেছেন। একইভাবে বুথের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তা রক্ষায়, আনসার সদস্যরা ভোটারদের কক্ষ খুঁজে পেতে সহায়তা করাসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। নাজমুস সাকিব সুষ্ঠু ভোটের জন্য এই সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে নাজমুস সাকিব ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘...পুরো ২০২৫ সালে আমার যা পরিশ্রম হয়নি, আজ এক দিনে আমাকে তার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে।...মানুষের লাইন বেড়েই যাচ্ছে। লাঞ্চ করেছি বেলা পৌনে তিনটায়। ততক্ষণে ঘাড়ের পেছনে ব্যথা শুরু করেছে, প্রেশার বাড়ার লক্ষণ সম্ভবত।’

নাজমুস সাকিবের ফেসবুক পোস্টের নিচে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা অন্যরাও মন্তব্য করেছেন। তাঁরাও প্রায় একই রকমের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। ভোটাররাও তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। সাদিয়া ফারহা লিজা নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘ভাই, আমি শাড়ি পরে ফাল্গুন লুকে ভোট দিতে গিয়েছি।’

শাহরিয়ার নীল শুভ্র নামের একজন লিখেছেন, ‘আমার মা জ্বর নিয়েও সকালের নাশতা শেষে ওষুধ খেয়ে পান চিবাতে চিবাতে ভোট দিতে গেছেন। অনেকক্ষণ সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও হাসিমুখে ফিরেছেন। আবার ছোট খালার সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন, কে জিততে পারে বা ভোটের পরিস্থিতি কেমন। অথচ তাঁরা পুরোপুরি সংসার নিয়ে থাকা মানুষ। তাঁদের মাঝে এই আমেজ আগে দেখিনি।’

নির্বাচনে কোনো একটি কেন্দ্রে ১৯ জন দায়িত্ব পালনকারীর একজন ছিলেন ফাহরিন আহমেদ আনন্দ। তিনি নাজমুস সাকিবের পোস্টে মন্তব্যে লিখেছেন—সব দলের এজেন্টদের উপস্থিতিতে গণনা করা হয়েছে, এমনকি বাতিল ভোটগুলো একটা একটা করে তাঁদের দেখানো হয়েছে কেন বাতিল করা হয়েছে। এই ১৯ জনের সামনেই ভোট গণনা এবং লেখা শেষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সই করার পর তাঁরা কেন্দ্র ত্যাগ করেছেন। তাঁর মতে, মিডিয়ার এই যুগে তথ্য গোপন করা সম্ভব নয়।

গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ফলাফল ঘোষিত ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয় পেয়েছে। ফল ঘোষণা স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। আর তাঁদের শরিকেরা পেয়েছে তিনটি আসন। অর্থাৎ বিএনপি ও তার মিত্ররা পেয়েছে ২১২ আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্য শরিকেরা পেয়েছে ৯টি আসন। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্ররা পেয়েছে ৭৭ আসন।

২০১৮: ‘রাতের ভোট’-এর স্মৃতি

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার আমলের সেই নির্বাচন দেশ-বিদেশে পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ হিসেবে। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘ফিরে দেখা নির্বাচন ২০১৮: ‘রাতের ভোট’: আপনাদের ভোট হয়ে গেছে, চলে যান’ শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে নাজমুস সাকিব পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে ধানমন্ডি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

নাজমুস সাকিব বলেন, সেদিন সকালে ভালোভাবেই ভোট শুরু হয়। কয়েকজন ভুয়া ভোটার এসে প্রথমে সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু দুপুরের মধ্যে পুরো চিত্র পাল্টে যায়। কয়েকজন এসে বুথ থেকে বের হয়ে না গেলে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিতে থাকে। এ সময় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে যাঁরা, তাঁরাও নিশ্চুপ ছিলেন। শুরুতে প্রতিবাদ করলেও পরে তাঁর মনে হয়, একলা প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই।

বুথে অনুপ্রবেশকারীরা নিজেরাই ব্যালটে সিল মারতে থাকেন। এমনকি বুথের দায়িত্বে থাকা সবার জন্য দুপুরের খাবারও নিয়ে আসেন। নাজমুস সাকিব বলেন, ‘এর প্রতিবাদ হিসেবে বলেছিলাম, আপনাদের আনা খাবার খাব না।’

দায়িত্ব শেষে সেদিন রাতে বাসায় ফিরেও নিজের অভিজ্ঞতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফেসবুকে ওই পোস্টের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১২ মিনিট। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে মায়ের অনুরোধে তা মুছে ফেলেন। তিনি বলেন, তাঁর মায়ের ফোনে বিভিন্ন জায়গা থেকে কল আসা শুরু হয়েছিল। তাই মায়ের অনুরোধে তিনি পোস্টটি ফেসবুক থেকে ডিলিট করে দেন।

সম্প্রতি ২০১৮ সালের ভোট গ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আবারও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন নাজমুস সাকিব। ওই পোস্টে ইসমাইল হোসেন নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘আপনার ২০১৮ সালের পোস্টটা এখনো মনে পড়ে। পরিচিত অনেকের এমন সাহস ছিল না। পরে যে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেটাও মনে আছে।’

গত বছরের ২৩ জুন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছিলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন বিতর্কিত হলেও সেই দায় নির্বাচন কমিশনের নয়, নির্বাচন সুষ্ঠু রাখতে অনেক স্টেকহোল্ডার জড়িত থাকেন। নির্বাচন আয়োজন শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের আর কিছুই করার থাকে না। বিষয়টি উচ্চ আদালতের ওপর ন্যস্ত থাকে।

এবারের ভোট গণনা এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট ও ‘না’ ভোট নিয়ে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাজমুস সাকিব বলেন, ‘আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতার কথা বলেছি। ঢাকায় পরিচিত অন্য যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরাও বড় কোনো অনিয়ম বা খারাপ পরিস্থিতির কথা বলেননি। তবে ঢাকার বাইরে অনেক জায়গাতেই অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে খবর হয়েছে। এক দিনে সব অনিয়ম দূর হয়ে যাবে, তা তো বলা যাবে না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় সহিংস ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা প্রতিহত করেছে।’

চলতি বছরের নির্বাচনী দায়িত্বের পরিচয়পত্রসহ সৈয়দ নাজমুস সাকিব
চলতি বছরের নির্বাচনী দায়িত্বের পরিচয়পত্রসহ সৈয়দ নাজমুস সাকিব। ছবি: নাজমুস সাকিবের সৌজন্যে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কতটা ঘনিয়ে এসেছে?

দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ এখন ইরানের সামরিক নাগালের মধ্যে অবস্থান করছে। এর একটি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। আরেকটি রণতরী পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে পাঠানো হয়েছে।

তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এমন ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যাতে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেছেন, আমেরিকান শক্তি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারবে না। বরং একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকেই ডুবিয়ে দেয়া হতে পারে- এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।

এই দুই সংকেতের- অত্যধিক সামরিক শক্তির প্রদর্শন এবং কঠোর প্রতিরোধমূলক ভাষার মাঝখানে নীরবে চলছে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা উত্তেজনা এড়াতে আবারও আলোচনায় বসেছেন। মূল প্রশ্ন হলো- এই মুহূর্ত কি প্রকৃত সংঘাতের পূর্বাভাস, নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের দীর্ঘ, চক্রাকারে ঘুরতে থাকা উত্তেজনার আরেকটি অধ্যায়?

ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন এনডিটিভিকে বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুতর সময়। ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। গত এক বছরে আমরা দেখেছি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো চুক্তি না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে।

জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দেয়। ফলে আজকের হুমকিকে নিছক কথার লড়াই বলে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। অধ্যাপক ম্যাবনের মতে, বর্তমান অস্থিরতার মূল কারণ হলো ওয়াশিংটন আসলে আলোচনায় কী চায়, তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, সমস্যার একটি বড় অংশ হলো, তথাকথিত চুক্তির সুনির্দিষ্ট কাঠামো কী, তা পরিষ্কার নয়। আলোচনায় কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আছে। উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে- এ অবস্থায় এটি শুভ লক্ষণ নয়। তিনি বলেন, এটি ‘জবরদস্তিমূলক কূটনীতি’র অংশ- ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বোঝানো যে, যুক্তরাষ্ট্র তার কথায় অটল এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে।

তবে এতে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, কোনো ভুল যোগাযোগ বা পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যদিও কোনো পক্ষই তা চায় না। এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘নিরাপত্তা দ্বন্দ্ব’। ইরানও হুমকি দিয়েছে যে, তারা ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে। তবে অনেক মার্কিন ঘাঁটি এমন দেশে অবস্থিত, যাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ইতিবাচক। কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে আগের হামলার পর কাতারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। ফলে তেহরান দ্বিধায় রয়েছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো- সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান উত্তেজনা বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।

আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে হলেও, এতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, হিজবুল্লাহ ও হামাসের প্রতি ইরানের সমর্থন, এমনকি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইরান ভেতরে অর্থনৈতিক চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খাদ্যদ্রব্যের দাম ১০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, জানুয়ারিতে বিক্ষোভ হয়েছে। ফলে তেহরানের দরকষাকষির শক্তি সীমিত। ম্যাবনের মতে, ইরানকে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে হবে, নইলে ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক চাপে তারা গুঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু বেশি আপস করলে দুর্বলতার বার্তা যাবে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইরানের বড় লক্ষ্য। তবে এতে সাম্প্রতিক দমনপীড়নের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। এখানে শুধু শাসক টিকে থাকার প্রশ্ন নয়, বরং পুরো ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ জড়িত। হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়েছে এবং ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ। হুতিরা তুলনামূলক স্বাধীন। ইরাকি মিলিশিয়াদের নিজস্ব এজেন্ডা আছে। ফলে ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ ছাতা’ আগের মতো শক্তিশালী নয়। তবে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ- তেল বিক্রি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্ব সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরান বহুবার হরমুজ বন্ধ করার সক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়েছে। তা হলে বৈশ্বিক তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণের অপ্রত্যাশিত স্বভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আলোচনার মাঝেই তিনি আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্তমানে জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চলছে।

ইরান বলছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আলোচনার অযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র চায় ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’। ইসরাইল চায় আলোচনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি ইস্যুও থাকুক।
এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যেন উচ্চ ঝুঁকির পোকার খেলা- যেখানে প্রত্যেকে ব্লাফ করছে, কিন্তু কেউই পুরোপুরি নিশ্চিত নয় পরের চাল কী হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কতটা ঘনিয়ে এসেছে?

যে কারণে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় জামায়াত বারবার জেতে by গাজী ফিরোজ

চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থা সব সময় শক্ত ছিল। এই আসনে নির্বাচনের এক বছর আগেই জামায়াতে ইসলামী নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিন তিনবার জামায়াতের প্রার্থী এখানে জয়লাভ করেন। অপর দিকে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনের এক মাস আগে। থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপির কোনো কমিটি নেই। সাংগঠনিকভাবে জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী ছিল নতুন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দুই দলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, নতুন প্রার্থী ও প্রচারণার জন্য শুধু এক মাস সময় পাওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। তবে মাত্র ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী। নেতা–কর্মীরা বলছেন, বিএনপি আগে থেকে প্রার্থী নির্ধারণ করলে, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটিগুলো সক্রিয় থাকলে এই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে পারত।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়েছেন।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সে কারণে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনটি জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরীকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বিষয়টি আলোচনায় ছিল।

জোটের আলোচনা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী এই আসনে শাহজাহান চৌধুরীকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিনি এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা শুরু করেন। এর আগে এই আসনে নির্বাচন করায় এলাকার প্রার্থী হিসেবেও পরিচিত তিনি। তাঁকে নতুন করে পরিচিত হতে হয়নি। শাহজাহান চৌধুরী ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী অলি আহমদের কাছে পরাজিত হন। ২০০১ সালে তাঁর দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও চট্টগ্রাম–১৪ আসনে উভয় দল পৃথকভাবে নির্বাচন করে এবং তাতে শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে এই আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালের পর থেকে তিনবার জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার কারণে এই আসনে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে ভালো। বিএনপি থেকে অলি আহমদ নির্বাচন করলেও তিনি ২০০৬ সালে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) নামের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নেতৃত্ব হারা হয়ে যায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপি। বিএনপির কিছু নেতা–কর্মী অলির সঙ্গে যুক্ত হন। আর কিছু জামায়াতে ভিড়ে যান। বাকি যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

২০০৮ সালের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আসনে নিজেদের কোনো প্রার্থী না থাকায় নেতা–কর্মীরা ছিলেন দোদুল্যমান। আসনটি কখনো জামায়াত, আবার কখনো এলডিপিকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে, সেই শঙ্কায় থাকতেন নেতা–কর্মীরা।

অপর দিকে আওয়ামী লীগের বাধার মুখে প্রকাশ্যে ও গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে গেছে জামায়াতে ইসলামী। এমনকি ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসি দেওয়ার ঘটনায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ব্যাপক সহিংসতা হয়। কিন্তু আন্দোলন–সংগ্রামে সেখানে বিএনপির কোনো ভূমিকা ছিল না।

এদিকে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদের গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনে। তাঁরাও শাহজাহানের জন্য প্রচারণায় নেমেছিলেন। পক্ষান্তরে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা–ও স্পষ্ট ছিল না। উল্টো আসনটি বিএনপি তার জোটের শরিকদের ছেড়ে দিতে পারে, এমন আলোচনাও ছিল।

তবে এলাকাবাসী পাশে ছিলেন বলে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এমনটাই মনে করেন জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সাতকানিয়া–লোহাগাড়াবাসীর সুখে–দুঃখে আছি আমি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৭ বছরও জুলুম–নির্যাতনের শিকার লোকজনের পাশে ছিলাম। ৫ আগস্টের পর থেকে সশরীর তাদের পাশে ছিলাম। তাই লোকজন আমাকে বেছে নিয়েছেন। ভবিষ্যতেও আমি তাদের জন্য নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে করে যাব।’

জামায়াতে ইসলামীর আসন হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়ে বিএনপি কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপির কমিটি নেই। আমাদের প্রার্থী নির্ধারণও হয়েছিল এক মাস আগে। এটি জোটকে দেওয়া হতে পারে, এমন ধারণা ছিল সবার। এরপরও জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ লাখ ২৭ হাজার ভোট পাওয়া কম নয়।’

হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপিকে শক্তিশালী করতে সাংগঠনিকভাবে যা যা করা দরকার, আমরা সব করব। এবারের নির্বাচন থেকে আমরা ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠব।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-15%2Fa12qqfj8%2FWhatsApp-Image-2026-02-15-at-16.34.13.jpeg?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শাহজাহান চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

অভিবাসননীতিতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস

প্রকাশ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসননীতির প্রতি জনসমর্থন কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছে। হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় দফায় ফেরার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটিই তাঁর জনপ্রিয়তার সর্বনিম্ন হার।

রয়টার্স/ইপসোসের নতুন এক জনমত জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। জরিপটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্পের শক্তিশালী সমর্থক বলে পরিচিত মার্কিন পুরুষদের মধ্যেও তিনি সমর্থন হারাচ্ছেন।

গত সোমবার শেষ হওয়া চার দিনব্যাপী এই জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের অভিবাসননীতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিষয়টি অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এক ইস্যু। গত জানুয়ারিতে রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে এ হার ছিল ৩৯ শতাংশ। আর দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসে জনপ্রিয়তার হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প অভিবাসী বিতাড়নে কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তম অভিযান শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি বড় ধরনের চিরুনি অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে মুখোশধারী এজেন্টদের অভিবাসনবিরোধী তৎপরতার দৃশ্য দেখাটা এক সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বিক্ষোভকারী ও মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সহিংস সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, গত বছরের শেষ দিকের তুলনায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পুরুষ ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের অভিবাসননীতির প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ে পুরুষ ভোটাররা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন এবং ২০২৫ সালজুড়ে তাঁদের মধ্যে ট্রাম্পের অভিবাসননীতির জনপ্রিয়তা ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।

তবে সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ পুরুষ এ ইস্যুতে ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে নারী ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের অভিবাসননীতির সমর্থন গত বছরের প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার বিরল এক ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন গত সপ্তাহে মিনেসোটায় ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে তাঁদের বিতর্কিত অভিবাসী বিতাড়ন অভিযান বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। অঙ্গরাজ্যটিতে অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে দুই মার্কিন নিহত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর সময় ট্রাম্পের সামগ্রিক জনপ্রিয়তা ছিল ৪৭ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা কমে তাঁর এই মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। সর্বশেষ জরিপে তাঁর সামগ্রিক কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৩৮ শতাংশ মানুষ; যা গত ২৩ থেকে ২৫ জানুয়ারির জরিপেও একই ছিল।

দেশজুড়ে অনলাইনে পরিচালিত সাম্প্রতিকতম জরিপে ১ হাজার ১১৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন অংশ নেন। এতে ভুলের মাত্রা ধরা হয়েছে ৩ শতাংশ।

মিনিয়াপোলিসের ঘটনায় সহমর্মিতা প্রকাশ করে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন মানুষ। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, নিউইয়র্ক সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
মিনিয়াপোলিসের ঘটনায় সহমর্মিতা প্রকাশ করে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন মানুষ। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, নিউইয়র্ক সিটি, যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: রয়টার্স

মূল বিষয়ে একমত ইরান–যুক্তরাষ্ট্র

জেনেভায় আলোচনাঃ আলোচনায় দুই দেশের পরমাণুবিজ্ঞানী, আইনবিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদেরা উপস্থিত ছিলেন। ওমানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পারমাণবিক ইস্যুতে প্রস্তাব বিনিময় করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ পরমাণু আলোচনা শেষ হয়েছে। আলোচনা শেষে এক ইতিবাচক বার্তা দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, জেনেভা বৈঠকে তেহরান ও ওয়াশিংটন চুক্তির ‘মূল নীতিগুলোর’ বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

আরাগচি সাংবাদিকদের বলেন, যদিও অনেক কারিগরি দিক এখনো বাকি, তবে আলোচনার মূল ভিত্তি বা প্রধান নীতিগুলোর বিষয়ে দুই দেশই একমত হতে পেরেছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর একে বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরাগচি বলেন, ‘তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের কোনো চেষ্টা করছে না। এ কথা আমরা বারবার বলে আসছি।’

জেনেভায় আলোচনা

প্রায় চার ঘণ্টা ধরে জেনেভায় ওমানের দূতাবাসে এই বৈঠক হয়। ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। বৈঠকে দুই পক্ষই ওমানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পারমাণবিক ইস্যুতে নিজেদের ‘নোট’ বা প্রস্তাব বিনিময় করেছে। আলোচনায় দুই দেশের পরমাণুবিজ্ঞানী, আইনবিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদেরা উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয় দফার এই আলোচনায় মূলত পারমাণবিক চুক্তির কারিগরি বা টেকনিক্যাল দিকগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

চুক্তির খসড়া তৈরি করবে দুই পক্ষ

তৃতীয় দফার বৈঠকের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। আরাগচি বলেন, একটি সম্ভাব্য চুক্তির প্রাথমিক খসড়া তৈরির পর উভয় পক্ষ পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করবে। উভয় পক্ষ এই বিষয়ে একমত হয়েছে যে একটি সম্ভাব্য চুক্তির জন্য এখন খসড়া তৈরির কাজ চলবে। এরপর সেই খসড়াগুলো একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করা হবে এবং তার ভিত্তিতেই পরবর্তী আলোচনার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে।

ইরানের মহড়া

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে সামরিক মহড়া শুরু করেছে ইরান। এতে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ করার পথটির কিছু অংশ বন্ধ হয়ে গেছে। পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই এ মহড়া শুরু করে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও খামেনির জবাব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘পরোক্ষভাবে’ যুক্ত থাকবেন। তবে গতকালের বৈঠকে তিনি যুক্ত ছিলেন কি না, তা জানা যায়নি। ট্রাম্পের মতে, তেহরান এখন চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া। তিনি বলেন, চুক্তি না করার ভয়াবহ পরিণতি তারা ভোগ করতে চাইবে না। চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইরান হয়তো কঠোর দর-কষাকষির চেষ্টা করবে। তবে গত গ্রীষ্মে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বোমাবর্ষণের পর এ ধরনের অনমনীয় অবস্থানের পরিণতি সম্পর্কে তাঁরা এখন অবগত।

আলোচনা শুরুর পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক ভাষণে বলেন, ওয়াশিংটন জোর করে তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। ট্রাম্পের সরকার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলছেন, তাঁদের সেনাবাহিনী বিশ্বের শক্তিশালী। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীকেও মাঝেমধ্যে এমন জোরে চড় মারা যায় যে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে দ্বিতীয় দফা আলোচনা চলাকালে ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের বিক্ষোভ। গতকাল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ের কাছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে দ্বিতীয় দফা আলোচনা চলাকালে ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের বিক্ষোভ। গতকাল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ের কাছে। ছবি: রয়টার্স