Monday, June 30, 2014

উদ্যোগ প্রশংসনীয়, তবে- by আলী ইদ্‌রিস

রথমবারের মতো ঢাকা শহরের প্রবেশমুখে পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ফলমূল ও খাদ্যপণ্যে ফর্মালিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করে  বিষাক্ত পণ্য ধ্বংস ও দোষীকে জেল-জরিমানার দ- দেয়া হচ্ছে। সরকারের এ কার্যক্রম অত্যন্ত প্রশংসনীয় সন্দেহ নেই। কিন্তু কার্যক্রমে কিছু গলদ রয়ে গেছে বলে মনে হয়। প্রথমত ঢাকা শহরই সারা দেশ নয়, ঢাকা শহরে ধরপাকড় হলে অপরাধ চলে যাবে অন্য শহরে। চুনি-পুটিরা ফর্মালিন মেশায় না, আমদানিকৃত পণ্য যেমন মাছ, ফলমূল, সবজি ইত্যাদিতে বিদেশী রপ্তানিকারকরা অথবা বড় বড় আমদানিকারকরা ফর্মালিন মিশিয়ে গুদামজাত করে। আপেল, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি, আমদানির পর ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত তাজা থাকে কিভাবে? দেশীয় পণ্য, যেমন- আম, জাম, লিচু, আনারসেও বড় বড় পাইকাররা ফর্মালিন মেশায়, খুচরা ব্যবসায়ীদের কিছু করতে হয় না। কিন্তু এ অভিযানের ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে। এ জন্য আমদানিকৃত পণ্যের প্রবেশপথে অর্থাৎ প্রতিটি বন্দরে পণ্য পরীক্ষা করে ঢুকতে না দিলে ফর্মালিন মেশানো কোনদিন বন্ধ হবে না। ফলমূল ও সমস্ত পচনশীল দ্রব্য দেশের প্রবেশপথে পরীক্ষা করার জন্য প্রতিটি বন্দরে  যন্ত্রপাতিসহ স্থায়ী টিম থাকতে হবে এবং তাদের সনদপত্র ছাড়া কোন পণ্য খালাস করা হবে না। উল্লেখ্য, বর্তমানে বন্দরে আমদানি করা পণ্যের বেলায় রেডিয়েশন, ক্ষতিকর পোকা-মাকড়, কীটনাশক নেই তার সনদ  নিতে হয় অথচ মারাত্মক বিষ ফর্মালিনের সনদ নেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, অদ্ভুত ব্যবস্থা বৈকি! দ্বিতীয় কার্যকরী পদক্ষেপ হবে ফর্মালিন আমদানি, মজুত ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা।  ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই গত বছর থেকে বনানী, শান্তিনগর, মহাখালি, টাউন হল, কাওরান বাজার, মিরপুর-১, গুলশান-২, উত্তরা রাজউক ইত্যাদি বাজারকে ফর্মালিনমুক্ত বাজার ঘোষণা করে। বাজার বলতে কাঁচাবাজার অর্থাৎ মাছ, মাংস, সবজি ও ফলমূলের বাজার বা কিচেন মার্কেটকেই বোঝানো হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত ফর্মালিন পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। এফবিসিসিআই’র উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রতারক চক্র থেমে নেই। সুযোগ পেলেই তারা  নানা পন্থায়, নানারূপে ফর্মালিন ব্যবহার করে থাকে। উদ্দেশ্য, ব্যবসায়িক দ্রব্যের পচন রোধ করে মুনাফা বৃদ্ধি করা। এজন্য এফবিসিসিআই’র মহান  উদ্যোগ সফল হয়নি। তা ছাড়া এফবিসিসিআই কর্তৃক ব্যবহৃত যন্ত্রটি দামি হলেও এর রিডিং প্রায়ই সঠিক হয় না, ফলে পাল্টা বিতর্ক দেখা দেয়। তবে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য অধিদপ্তর ও কিছু বেসরকারি সংস্থার আবিষ্কৃত যন্ত্র দিয়েও ভ্রাম্যমাণ আদালত  কাজ চালায়। ফর্মালিনকে ভেজাল হিসাবে নয়, প্রাণনাশী বিষ হিসেবে দেখলেই এ অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- হওয়া উচিত। মহাজোট সরকারকে সাধুবাদ জানাই সংসদে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদ- ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করে  ফর্মালিন আইন পাস করার জন্য।  কিন্তু এদেশে আইনের অভাব নেই, আছে কঠোর ও লাগাতার প্রয়োগের অভাব। শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালতকে নয়, সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে এ আইনে মামলা করার ক্ষমতা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গাছের ডাল ছাঁটাই করে মূলোৎপাটন না করলে যেমন কাজ হয় না, তেমনি ফর্মালিন আমদানি, মজুত ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানিকৃত পণ্যের প্রবেশপথে অর্থাৎ বন্দরে পণ্য পরীক্ষা করে ঢুকতে না দিলে ফর্মালিন মেশানো কোনদিন বন্ধ হবে না। এফবিসিসিআইয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির মতে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ৫০০ থেকে ৬০০ টন ফর্মালিন মজুত ছিল। কি ভয়ঙ্কর অবস্থা! তাহলে ফর্মালিন সহজলভ্য এবং সস্তা হবে না কেন। হাসপাতাল, ওষুধ কোম্পানি ও অন্য ক’টি শিল্প ছাড়া খুব কম শিল্পে ফর্মালিন ব্যবহার করা হয়। তাহলে ৬০০ টন ফর্মালিন কোথায় ব্যবহৃত  হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। পানির মতো সহজলভ্য ও সস্তা বলেই গ্রামে-গঞ্জেও ফর্মালিন পাওয়া যায় এবং সব কিছুতে ব্যবহৃত হয়। অসুস্থ জনবল যেমন উৎপাদনের জন্য অনুকূল নয় তেমনি দেশের ও জন মানুষের চিকিৎসা  ব্যয়ও বৃদ্ধি পায় এবং প্রজন্ম সুস্থতার সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে না। সুতরাং সাময়িকভাবে আইন প্রয়োগ না করে প্রজন্ম ও মানবিকতার স্বার্থে খাদ্য পণ্যকে ফর্মালিনমুক্ত করতে হবে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারক, ধনাঢ্য, ব্যবসায়ী কেউই ফর্মালিনের বিষ থেকে মুক্তি পাবেন না, জেনে হোক, অজান্তে হোক, এই বিষ তাদের দেহে কোন না কোন সময় প্রবেশ করবেই। সুতরাং স্থায়ী ব্যবস্থা হিসাবে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ জরুরি। ১. বর্তমান বিরাট মজুত কমানোর জন্য আগামী ছ’মাস ফর্মালিন আমদানি বন্ধ করা উচিত। ২. যাদের কাছে অবৈধ মজুত আছে এক মাসের মধ্যে তা সেনাবাহিনী বা বিজিবির নিকট জমা দিতে হবে, অন্যথায় ৫ বছরের জেল। ৩. একমাত্র সেনা বাহিনীকে বা অপারগতায় বিজিবিকে ফর্মালিন আমদানির লাইসেন্স দেয়া উচিত এবং সব হাসপাতাল, ওষুধ কোম্পানিগুলোকে আমদানিকারকের নিকট থেকে বৈধভাবে ফর্মালিন কিনে নিতে হবে। ৪. আমদানিকৃত মাছ, ফলমূল ও পচনশীল দ্রব্য দেশের প্রবেশপথে পরীক্ষা করার জন্য প্রতিটি বন্দরে  যন্ত্রপাতিসহ স্থায়ী টিম থাকতে হবে এবং তাদের সনদপত্র ছাড়া কোন পণ্য খালাস করা হবে না। সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হবে ফর্মালিন আমদানি, মজুত ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করা, তাহলেই ৮০% অপরাধ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সরকারকে সেদিকে নজর দেয়ার জন্য নিবেদন করছি।

আমি মেসি নেইমার দু’জনেরই ভক্ত- অপু বিশ্বাস

উফ! শনিবার ব্রাজিল-চিলি’র শ্বাসরুদ্ধকর খেলা দেখলাম। মনে হয়েছে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছি। শেষ পেনাল্টি কিক পর্যন্ত ছিল অনিশ্চয়তা। ইয়েস! শেষ বিচারে আমরাই জিতেছি। তবে ব্রাজিলের এই জয়ে মান বাঁচলেও মনটা ভরেনি। কারণ, চিলির সঙ্গে জিততে হলে ব্রাজিলের এতোটা ঘাম ঝরাতে হবে এটা মানতে পারছি না। তবে এই খেলায় রেফারির আচরণ ব্রাজিলের অনুকূলে ছিল না। এটা দুঃখজনক। যা হোক, আমি দল হিসেবে ব্রাজিলকে পছন্দ করি এটা যেমন সত্যি, তেমন খেলোয়াড় হিসেবে আমার সবচেয়ে পছন্দ মেসিকে। যার ফলে দু’দলের প্রতিই আমার সমান আগ্রহ এবং সমর্থন রয়েছে শুরু থেকেই। ব্রাজিল দ্বিতীয় রাউন্ড পেরিয়ে গেছে। আশা করছি আর্জেন্টিনাও মেসি জাদু দিয়ে এই পর্ব উতরে যাবে। আর আজকের খেলা হলো ফ্রান্স-নাইজেরিয়া এবং জার্মানি-আলজেরিয়ার। এরমধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আমি প্রথম সাপোর্ট করবো ফ্রান্সকে। কারণ, এবার ফ্রান্স আলোচনায় না থাকলেও তারা দারুণ খেলছে। অনেক গোছানো খেলা ফ্রান্সের। তবে এটাও ঠিক, যতদূর পেপার-পত্রিকায় পড়ে জেনেছি এবার সবচেয়ে স্ট্রং টিম জার্মানি। দেখা যাক ফুটবল বিশ্বের বড় দু’টি দল ফ্রান্স এবং জার্মানির ভাগ্যে কি আছে আজ। আমি চাই এই দু’টি দলও এই পর্ব পেরিয়ে যাক। তা না হলে কোয়ার্টার-সেমিফাইনাল জমবে না। কারণ, খেলায় যদি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই না হয় তাহলে সেই খেলা দেখে কোন মজা নেই। যেমন মজা পেয়েছি ব্রাজিল-চিলির খেলা দেখে। আমার মনে হয় এখন পর্যন্ত এই আসরের বেস্ট খেলা ছিল এ ম্যাচটি।

আইসল্যান্ডে রোজা ২১.৫৭ ঘণ্টা

রমযান হল ইসলামিক বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে নবম মাস, এ মাসে বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা সাওম পালন করেন। রমজান মাসে রোজাপালন ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে তৃতীয়তম। পানাহার বর্জন করে রোজা রাখেন মুসলমানরা। ভৌগলিক কারণে রোজার সময় নিয়ে পার্থক্য হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে সময়ের তারতম্যের কারনে সেহরী থেকে ইফতারে সময়ের পার্থক্য কোন কোন দেশে দ্বিগুণ সময়ে হয়ে থাকে। কয়েকটি দেশে অল্প সময়ের মধ্যে রোজা রেখেই ইফতার সারতে হয়। আবার কিছু দেশে লাগে দীর্ঘ সময়। এবার সবচেয়ে বেশি সময় রোজা থাকতে হবে আইসল্যান্ডের অধিবাসীদের। সেহরী থেকে ইফতার পর্যন্ত সময়কাল ২১.৫৭ ঘণ্টা। মানে ইফতার করে তার দুই ঘণ্টা পরেই আবার সেহরী করতে হবে। আর সবচেয়ে কম সময় ৯.৫৬ ঘণ্টা রোজা থাকতে হবে সিডনি, অস্ট্রেলিয়ায় অধিবাসীদের। সম্প্রতি ইংরেজি হাফিংটন পোস্ট রোজার সময় নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় এ বছর আইসল্যান্ডের মুসলমানদের দীর্ঘ সময় নিয়ে রোজা রাখতে হবে। এছাড়াও দীর্ঘ সময়ের মধ্যে লন্ডনে রোজা রাখার সময় ১৮ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট। জার্মানির বার্লিনে ১৯ ঘণ্টা ১ মিনিট। তৃতীয় স্থান হলো কানাডার টরন্টোতে দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ ঘণ্টা ১৪ মিনিট। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে দিনের দৈর্ঘ্য কমবেশি হয়ে থাকে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার জুনিআউতে রোজার দৈর্ঘ্য ১৯ ঘণ্টা ৫১ মিনিট হলেও ডারবোর্নে তা ১৬ ঘণ্টা ৫৯ মিনিট। অন্যদিকে শিকাগোতে এ সময় ১৬ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট এবং নিউ ইয়র্ক শহরে ১৬ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। আবার লস অ্যাঞ্জেলসে তা ১৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। এশিয়ার  দেশগুলোর মধ্যে ঢাকায় এবার রোজার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ ঘণ্টা ৩ মিনিট। সৌদি আরবের মক্কায় সময় কিছুটা কমে দাড়িয়েছে ১৪ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট। ব্রাজিলের রিওতে সেহরি থেকে ইফতারের সময়ের পার্থক্য ১২ ঘণ্টা ৪ মিনিট। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এবার রোজার দৈর্ঘ্য মাত্র ৯ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। অন্যদিকে একই শহরে উচ্চতার কারনে ইফতার  সেহরীতে হেরফের রয়েছে। দুবাইয়ের আল বুর্জ খলিফায় নীচ তলা থেকে ১৬০ তলার বাসিন্দাদের ইফতারের ক্ষেত্রে ৩ মিনিট ব্যবধান রয়েছে। আবার সুর্যোদয়ের ক্ষেত্রেও ঘটে একই ঘটনা। উপর তলায় ৩ মিনিট আগে এবং নীচে তিন মিনিট পরে সকাল শুরু হয়।

রাতে ক্রসফায়ার দিনে পুরস্কার

রাতে পুলিশের ক্রসফায়ারে মারা গেছে দুই যুবক। পুলিশের দাবি, তারা পেশাদার ছিনতাইকারী। তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে জড়ো হতে গিয়ে পুলিশের মুখোমুখি হয় তারা। পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে দু’জন নিহত হয়। পালিয়ে যায় তাদের কয়েক সঙ্গী। রাত পোহানোর পর দিনে গোয়েন্দা পুলিশের এ টিমকে পুরস্কৃত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার বেনজীর আহমেদ। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রমজান মাসের নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এক সভায় এ ঘোষণা দেয়া হয়। সভায় রাজধানীর ৪৯টি থানার ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুরস্কার হিসেবে গোয়েন্দা পুলিশের (পূর্ব) অবৈধ মাদক উদ্ধার ও প্রতিরোধ টিমকে ৫০ হাজার টাকা দেয়া হবে। সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে অজ্ঞাত ছিনতাইকারী হিসেবে পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া দুই যুবককে শনাক্ত করেছে তাদের পরিবারের সদস্যরা। নিহত দুই যুবক হলো রমজান আলী ওরফে জাভেদ (৩৭) ও জাকির হোসেন ওরফে আকমল (৩৫)। রমজান সায়েদাবাদ বাস মালিক-শ্রমিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক। আর জাকির সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের শ্রমিক লীগের নেতা। নিহত দুই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের দাবি, শ্রমিক লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে সংগঠনের সভাপতি খায়রুল হক ডিবি পুলিশকে টাকা দিয়ে তাদের হত্যা করিয়েছে। পুলিশ জানায়, শনিবার মধ্যরাতে ডিবির (পূর্ব) অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও প্রতিরোধ টিম বিশেষ অভিযান চালাতে গিয়ে দেখে- মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনির পূর্ব দিকের রাস্তার ওপর দু’টি মোটরসাইকেলসহ ৬ থেকে ৭ জন লোক অবস্থান করছে। ডিবির দলটি মাইক্রোবাস থামিয়ে তাদের সমবেত হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করতে গাড়ি থামানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এ সময় গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় টহল পুলিশ তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে দু’টি মোটরসাইকেল ও দু’টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ডিবি পুলিশের ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি (ঢাকা মেট্রো চ-৫১-৬২৭১) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় ডিবির এসআই নৃপেন কুমার ভৌমিকের করা পৃথক দুটি মামলায় (নং ২৬ ও ২৭) বলা হয়েছে, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের সময় পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তা সরকারি পিস্তল থেকে ২৩ রাউন্ড ও দুই কনস্টেবল তাদের সরকারি শটগান থেকে ১০ রাউন্ড গুলি করেন। তবে পুলিশের দাবি, তাদের নয়, সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুই যুবক নিহত হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, নিহত দুই ব্যক্তিকে কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। নিহত রমজানের মাথায়, গলায়, পেটের নিচে ও ঊরুতে মোট পাঁচটি এবং জাকিরের মাথায়, বাম পায়ে ও পেটে তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, নিহত দুই যুবক পেশাদার ছিনতাইকারী। তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। তাদের ‘প্রিভিয়াস ক্রিমিনাল ডাটা’ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অপর একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, নিহত রমজানের বিরুদ্ধে ৯৩টি ও জাকিরের বিরুদ্ধে ৪২টি মামলার তথ্য পেয়েছেন তারা। রমজান আলী জাভেদকে সবাই ‘রমজান ডাকাত’ বলেই চেনে।
গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহত জাবেদের বোন রুনা বেগম দাবি করেন, ‘তার ভাই রায়েরবাগের দোতলা মসজিদের পাশে স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টায় ওই বাসা থেকে জাবেদের বন্ধু খোকন তাকে ডেকে নিয়ে যায়। এর ১ ঘণ্টা আগে জাবেদকে খোকনের বান্ধবী রূপা ফোন দেয়। রূপার সঙ্গে জাবেদের সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় মোবাইলে কথা হতো। এ নিয়ে তার ভাবি ঝর্ণা তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। তিনি আরও বলেন, বিকাল বেলায় বের হওয়ার পর থেকেই জাবেদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। দিন গড়িয়ে সারারাত তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। রুপার ফোন পেয়ে জাবেদ মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি এলাকায় যায়। ওই বাসায় আগে থেকেই সায়েদাবাদের শ্রমিক লীগ নেতা খাইরুল ও বাবু ছিল। ওই বাসায় যাওয়া মাত্রই খাইরুল ও বাবু ডিবি পুলিশকে ফোন করে জাবেদকে তাদের হাতে তুলে দেয়। পরে খাইরুল, খোকন ও বাবুর প্ররোচনায় ডিবি পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। রুনার দাবি, তার ভাইকে হত্যায় ডিবি পুলিশ মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছে। রুনা জানান, টেলিভিশনের স্ক্রলে ডিবি পুলিশের ক্রসফায়ারে দু’জন মারা যাওয়ার খবর পেয়ে তারা হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ভাইকে শনাক্ত করেন।
জাবেদের স্ত্রী নুসরাত জাহান ঝর্না বলেন, ‘সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মালিক ও শ্রমিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তার স্বামী। কাঁচপুর, দাউদকান্দি ও হোমনা রোডের প্রধান লাইনম্যান ছিলেন তিনি। সমিতির সভাপতি খায়রুল হক ও তার দুই সহযোগী বাবু ও খোকন টাকার ভাগ চাইতেন। ভাগ না দেয়ায় তারা একবার জাভেদকে মারধরও করে। এ কারণেই তারা ডিবি পুলিশকে ভাড়া করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তাকে ডেকে নিতে রূপাকে ব্যবহার করা হয়। তিনি রূপাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। বলেন, রূপাকে গ্রেপ্তার করলে এটা ক্রসফায়ার না হত্যাকাণ্ড তা বেরিয়ে আসবে। ছিনতাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার স্বামী একজন ধার্মিক ছিলেন। ডিবি পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে এখন ছিনতাইকারী বানাচ্ছে। আমার স্বামী যদি আইনের চোখে কোন অপরাধ করতো তাহলে পুলিশ তাকে আদালতে সোপর্দ করে বিচার করতো। কিন্তু তাকে কেন এভাবে হত্যা করা হলো। আমি যে এখন বিধবা হলাম। কিছুদিন পর আমার এইচএসসির রেজাল্ট। আমার কি হবে? আমি খুনি ও খুনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করবো।
নিহত জাবেদের নারায়ণগঞ্জের মৌচাক এলাকায় বিসমিল্লাহ ফার্নিচার নামে একটি দোকান রয়েছে। পার্টসের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। শ্যামপুরের দোলাইরপাড় এলাকায় একটি অফিসে বসতেন। তার পিতার নাম আবদুল মান্নান। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ থানার নুনেরটেক এলাকায়। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।
অন্যদিকে জাকির হোসেন আকমলের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন জানান, শনিবার সকালে অন্যান্য দিনের মতোই জাকির তাদের ডেমরার বাসা থেকে বেরিয়ে যান। দুপুরের পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ ছিল। সকালে তিনিও টেলিভিশন দেখে হাসপাতালে গিয়ে স্বামীর লাশ শনাক্ত করেন। তিনি বলেন, আমার স্বামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আমার স্বামীর মতো ভালমানুষ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। স্বামী জাকির ডেমরা এলাকায় কাপড় ব্যবসা করতেন জানিয়ে তিনি বলেন, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে তার যাতায়াত ছিল। তিনি শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিনতাই করতে পারেন না। তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। নিহত জাকিরের পিতার নাম হারুন মৃধা। তানিম নামে ছয় বছরের একটি সন্তান রয়েছে তার। গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের কাউখালীর কাউন্দিয়ায়।

মৃত্যুদণ্ড দেশে বিদেশে যুগে যুগে- ধর্মীয় মতামত বিতর্ক ও নতুন ধারা by শফিক রেহমান

বিশ্বের প্রায় সব ধর্মের সূচনা হয়েছিল প্রাচীনকালে। তারপর সামাজিক বিবর্তনে মানুষের চিন্তাধারা যুগে যুগে বদলে যেতে শুরু করে। সমাজ রাষ্ট্র ও ধর্ম বিষয়ে এখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বদলে গিয়েছে। এমনকি যারা ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি তাদের মধ্যেও নিজেদের ধর্ম বিষয়ে নতুন চিন্তাভাবনা এসেছে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ চেয়েছে ধর্মের আওতায় থেকেও পরিবর্তিত যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। আর তার ফলে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছে এবং একই ইস্যুতে বিভিন্ন মত প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। এসব মতামত বিবেচনা করে ধার্মিক মানুষরা নিজেদের সিদ্ধান্তে এসেছেন।

বৌদ্ধ ধর্ম
খৃষ্টপূর্ব ৫২৮-এ বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার শুরু করেছিলেন নেপালের রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম। তার এই ধর্ম ৫০০ খৃষ্টাব্দ অবদি শুধু ইনডিয়ান সমাজে নয়, মধ্য ও পূর্ব এশিয়াতেও প্রভাব বিস্তার করেছিল।
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ পঞ্চশিলাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জীবননাশ থেকে বিরত থাকতে। এতে লেখা হয়েছে, প্রত্যেকেই শাস্তিকে ভয় পায়। প্রত্যেকেই মৃত্যুকে ভয় পায়। ঠিক তোমারই মতো। সুতরাং তুমি কাউকে হত্যা করবে না অথবা এমন কিছু করবে না যার ফলে কেউ নিহত হতে পারে।
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে আরো লেখা হয়েছে, তাকেই আমি ব্রাহ্মণ বলব যে অস্ত্র ছেড়ে দিয়েছে এবং সকল প্রাণীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ছেড়ে দিয়েছে। সে কাউকে হত্যা করে না। সে অন্য কোনো ব্যক্তিকে হত্যায় সাহায্য করে না।
অনেক বৌদ্ধ, বিশেষত পশ্চিমে, মনে করেন, শুধু বাক্যে বোঝানো হয়েছে, কোনো আইনগত পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিরোধী তাদের ধর্ম। তবে পুরাকালের বইয়ের ব্যাখ্যা প্রায়ই বিতর্কের সৃষ্টি করে। এই ব্যাখ্যাও বৌদ্ধ ধর্মে বিতর্কিত হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ দেশে কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ৮১৮ খৃষ্টাব্দে জাপানের সম্রাট সাগা মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও কিছু জমিদার তাদের এলাকায় মৃত্যুদণ্ড চালু রেখেছিলেন। ১১৬৫ খৃষ্টাব্দে জাপানে আবার মৃত্যুদণ্ড চালু হয়। এখনো তাই।

অবশ্য সম্প্রতি কিছু বিচারক মৃত্যুদণ্ড সই করতে রাজি হননি। এ ক্ষেত্রে যুক্তিস্বরূপ তারা নিজেদের ধর্মবিশ্বাসের উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে ভুটান ও মঙ্গোলিয়া মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। শ্রীলংকা এক সময়ে মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করলেও আবার সেটা চালু করেছে। থাইল্যান্ডে মৃত্যুদণ্ড বরাবরই চালু ছিল এবং আছে। তবে থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারকদের মতে এ বিষয়ে মতভিন্নতা আছে।

বুদ্ধ তার বাণী দিয়ে খুনি এবং অপরাধীদের যে সংশোধিত করেছিলেন সে বিষয়ে বৌদ্ধ পুরাণে অনেক কাহিনী আছে। যেমন, আঙ্গুলিশালা ৯৯৯ জনকে হত্যার পর নিজের মা এবং বুদ্ধকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বুদ্ধের প্রভাবে তিনি অনুতপ্ত হন এবং বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
ইনডিয়াতে বৌদ্ধ সম্রাট অশোক (৩০৪-২৩২ খৃষ্টপূর্ব) শাসন আমলে মৃত্যুদণ্ড ছিল। কিন্তু জীবন রক্ষার জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আপিল করার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। সব পশুপ্রাণী হত্যা সম্রাট অশোক নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে।
এক শ্রেণীর বৌদ্ধ পণ্ডিত মনে করেন, কোনো রকম সহিংসতার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের সহ-অবস্থান সম্ভব নয়। বিশেষত যুদ্ধ এবং মৃত্যুদণ্ড বৌদ্ধ ধর্মের মূলনীতিবিরোধী।
তারা একটি কাহিনীর উল্লেখ করেন।

এক চোর ধরা পড়ার পর রাজার সামনে দুটি বিকল্প ছিল। এক. তাকে ক্ষমা করে দিয়ে সংশোধনের পথে নিয়ে আসতে সচেষ্ট হওয়া এবং সেজন্য তাকে অর্থসাহায্য করা। দুই. তাকে শাস্তি দিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা, যেন সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে চুরি করা থেকে বিরত থাকে।
রাজা দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে নেন।
কিন্তু এতে বিপরীত ফল হয়।

চোররা যখন বুঝল ধরা পড়লে তাদের মৃত্যুদণ্ড হবে তখন তারা যে ব্যক্তির কাছ থেকে চুরি করছে তাকে এবং ঘটনার সকল সাক্ষীকে হত্যা শুরু করে। এভাবে ওই রাজার রাজত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরির সাথে হত্যার সংখ্যা দ্রুত অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তার ফলে ওই রাজত্বে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, বৃটিশ পুলিশ নেহায়েতই বাধ্য না হলে অপরাধীদের মোকাবেলায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না। ফলে বৃটেনে অপরাধ সংশ্লিষ্ট নিহতের সংখ্যা কম থাকে। অন্য দিকে আমেরিকান পুলিশ তুলনামূলকভাবে আগেই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। ফলে আমেরিকায় পুলিশি অভিযানে হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়।

ক্যাথলিক কৃশ্চিয়ান
মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে কৃশ্চিয়ান ধর্মে বহু রকমের মতামত আছে। কেউ মনে করেন, যিশু যে ক্ষমার বাণী প্রচার করেছিলেন তার সম্পূর্ণ বিরোধী মৃত্যুদণ্ড, কারণ এটি প্রতিহিংসার বাস্তবায়ন। সুতরাং এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।
আবার কেউ মনে করেন, ওল্ড টেস্টামেন্ট আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।
মৃত্যুদণ্ডবিরোধীরা মনে করিয়ে দেন, যিশু বলেছিলেন, এক গালে চড় খেলে আরেক গাল বাড়িয়ে দিতে। তারা মনে করিয়ে দেন, পরকীয় প্রেমে অভিযুক্ত ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এক নারীকে যখন পাথর ছুড়ে মারা হচ্ছিল তখন যিশু সেটা বন্ধ করেন। মৃত্যুদণ্ডবিরোধীরা বলেন, এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, শারীরিকভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন যিশু।
কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেও কৃশ্চিয়ানরা আছেন।
আবার কিছু কৃশ্চিয়ান আছেন, যারা সম্পূর্ণভাবে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অসম মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেও নন।
রোমান ক্যাথলিক চার্চের সেইন্ট টমাস একুইনসে মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করেছিলেন অপরাধ সংখ্যা কমানোর পন্থা রূপে- প্রতিশোধ রূপে নয়।
পোপ দ্বিতীয় জন পল বলেছিলেন, সাধারণত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে, সমাজকে রক্ষা করার জন্য কোনো দুর্বৃত্তের মৃত্যুই যদি একমাত্র উপায় হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
ক্যাথলিক এনসাইকোপিডিয়া (১৯১১ সংস্করণ) বলেছে, ক্যাথলিক চার্চের নীতিমালাবিরোধী নয় মৃত্যুদণ্ড। অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা এবং ঐশ্বরিক অনুমোদন রাষ্ট্রের আছে।

প্রটেস্টান্ট কৃশ্চিয়ান
আমেরিকায় সকল ধরনের মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা যারা সবচেয়ে আগে করেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন প্রটেস্টান্ট কৃশ্চিয়ানদের একটি শাখা, দি রিলিজিয়াস সোসাইটি অব ফ্রেন্ডস বা কোয়েকার (Quaker) চার্চ।
সাদার্ন ব্যাপটিস্টরা খুন ও দেশদ্রোহিতার দায়ে দণ্ডিতদের মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করলেও তারা বলেন, সেখানে যেন কোনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা অথবা রাষ্ট্রীয় বৈষম্য না থাকে।
বৃটেনে ১৯৮৮-তে অ্যাংলিকান বিশপদের ল্যামবেথ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়, যেসব সরকার মৃত্যুদণ্ড দেয় তাদের বিরুদ্ধে চার্চ বলে... প্রতিটি মানুষের ঐশ্বরিক সম্মান যেন রক্ষা হয়... ন্যায়বিচারও করতে হবে... সুতরাং মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প ব্যবস্থা বের করতে হবে।
ইউনাইটেড মেথডিস্ট চার্চ এবং অন্যান্য মেথডিস্ট চার্চও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। তারা বলেন, সামাজিক প্রতিশোধ নিতে কোনো মানুষকে মেরে ফেলা উচিত নয়। মেথডিস্ট চার্চ আরো বলে, মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয় অসমভাবে গরিব, অশিক্ষিত, সংখ্যালঘু এবং মানসিক রোগাক্রান্ত অথবা আবেগপ্রবণ মানুষরা। ইউনাইটেড মেথডিস্ট চার্চের সম্মেলন সকল সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা যেন অবিলম্বে সকল মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করে।

মেথডিস্ট চার্চ ঠিকই বলেছিল। বাংলাদেশে যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে তাদের অধিকাংশই গরিব অথবা নিম্নশ্রেণীর। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ও উচ্চশ্রেণীর মানুষের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে হাতেগোনা, যেমন- রিমা হত্যা মামলায় মনির-এর এবং রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যা মামলায় সামরিক অফিসারদের।
আরেকটি প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায় ইএমসিএ ১৯৯১-এ তাদের নীতিমালা ঘোষণায় বলে, মৃত্যুদণ্ডের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিশোধ নেওয়া। কিন্তু শুধু অনুশোচনা ও ক্ষমার মধ্য দিয়েই শান্তি আসতে পারে- সামাজিক ক্ষত সারাতে পারে।
কমিউনিটি অব ক্রাইস্ট নামে আরেক প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায় ২০০০-এ তাদের বিশ্ব সম্মেলনে ঘোষণা করে, শান্তির চার্চ রূপে আমরা মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। ন্যায়বিচার ও ক্ষত সারানোর জন্য বিকল্প পথ আমরা খুঁজতে চাই... আমাদের চার্চের সবাইকে অনুরোধ করছি, তারা যেন তাদের নিজেদের দেশে মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করেন।
মেননাইট কৃশ্চিয়ানরাও (চার্চ অব বৃপরেন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস) তাদের প্রতিষ্ঠার সূচনা থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন।

মরমোন কৃশ্চিয়ান
মরমোন কৃশ্চিয়ানরা (দি চার্চ অব জিসাস ক্রাইস্ট অব ল্যাটার ডে সেইন্টস) মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে না- মৃত্যুদণ্ড উৎসাহিতও করে না। মরমোনরা বলেন, দেশের আইনের ওপর সেটা নির্ভর করবে।

হিন্দু ধর্ম
হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শিক্ষাগ্রন্থে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে এবং বিপক্ষে বলা হয়েছে। হিন্দু ধর্মে অহিংসার বাণী প্রচারিত হয়েছে যেখানে দাবি করা হয়েছে আত্মা অবিনশ্বর... মৃত্যু কেবল দৈহিকভাবে হতে পারে। কিন্তু ধর্মশাস্ত্রে বলা হয়েছে, খুনের কারণে এবং ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের সময়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

ইসলাম ধর্ম
মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে মুসলিম জ্ঞানীজনদের মধ্যে কিছু বিতর্ক আছে। প্রায় সব মুসলিম দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। তবে সেটা কার্যকরের পন্থা হয় ভিন্ন। যেমন- ইরান ও ইরাকে ফাঁসি দিয়ে। সৌদি আরবে শিরশ্ছেদ করে। কিছু মুসলিম দেশে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি ছিল।
কিছু মুসলিম দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ-এর (দিয়া) মাধ্যমে বাচতে পারেন। অতি সম্প্রতি এই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে ইরানে, যেখানে শেষমুহূর্তের ঠিক আগে নিহত ব্যক্তির আত্মীয় ক্ষমা করে দেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তকে।
মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে মুসলিমরা প্রায়ই কুরআনের একটি বাণী (৫:৩২) উল্লেখ করেন। সেটা হলো :
খুনের জন্য অথবা দেশে অনিষ্ট ছড়ানোর জন্য (রাষ্ট্র কর্তৃক) মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া, কেউ যদি কোনো ব্যক্তিকে খুন করে তাহলে সেটা হবে সকল ব্যক্তিকে খুন করার মতো (অপরাধ) এবং কেউ যদি কোনো ব্যক্তির প্রাণ রক্ষা করে তাহলে সেটা হবে সকল ব্যক্তির প্রাণ রক্ষা করার মতো (কাজ)।
If anyone kills person- unless it be (a punishment) for murder or for spreading mischief in the land- it would be as if he killed all people. An if anyone saves a life, it would be as if he saved the life of all people. (Quran 5:32)
মুসলিম জ্ঞানীজনরা বলেন, দেশে অনিষ্টের (Mischief in the land) মানে হতে পারে এমন সব কর্মকাণ্ড যার ফলে সারা দেশ অথবা জাতির গভীর ক্ষতি হতে পারে। দুর্নীতি, যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে এই ধরনের ক্ষতি হতে পারে। মুসলিম দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেয়া হয়।

বর্তমান যুগে অধিকাংশ কৃশ্চিয়ান যেমন মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন তেমনটা মুসলিমরা করেননি। তদুপরি কিছু মুসলিম দেশে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় এবং সেই ছবি পত্রিকা ও ইন্টারনেটে প্রকাশ করায় মুসলিমরা সাধারণত চিত্রিত হয়েছেন মৃত্যুদণ্ডের পক্ষপাতী এবং প্রাচীনপন্থী রূপে।

ইহুদি ধর্ম
ইহুদি ধর্মে নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করা হয়। তবে সেই দণ্ড দেওয়ার আগে সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সকল সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি নির্দেশে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের মামলায় তিনজন নয়- অন্ততপক্ষে ২৩ জন বিচারককে থাকতে হবে।
দ্বাদশ শতাব্দীর ইহুদি জ্ঞানী ব্যক্তি মুসা ইবনে মায়মুন বলেন, একজন নিরপরাধের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চাইতে এক হাজার অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া শ্রেয়।
মুসা বিন মায়মুন (Maimonides) যুক্তি দেন, সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত না হয়ে একজন অভিযুক্তকে মেরে ফেললে আমরা একটা পিচ্ছিল পথে পড়ে যাবো এবং শেষ পর্যন্ত বিচারকের অভিরুচি মোতাবেক দণ্ড হবে।
It is better and more satisfactory to acquit a thousand guilty persons than to put a single innocent one to death... that executing a defendant on anything less than absolute certainly would lead to a slippery slope of decreasing burdens of proof, until we would be convicting merely, according to the judges caprice.
নয় শ বছর আগে মুসা বিন মায়মুন যা বলেছিলেন, সেটা বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে প্রায়ই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে সরকার দ্বারা অনুরুদ্ধ অথবা আদিষ্ট অথবা প্রভাবিত হয়ে বিচারক তার অভিরুচি অনুযায়ী রায় দিয়েছেন।

ইহুদি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ইসরেল-এ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে শুধু একটি কারণে। সেটি হলো : মানবতার বিরুদ্ধে কোনো নাৎসি যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
ইসরেলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বেসামরিক আদালতে শুধু একজনেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কয়েক হাজার ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়েছিলেন জার্মান নাৎসি লেফটেন্যান্ট কর্নেল এডলফ আইখম্যান (Adolf Eichmann)। ১৯৪৫-এ যুদ্ধের পর তিনি আর্জেন্টিনাতে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। ১৯৬০-এ ইসরেলি গুপ্তচর বাহিনী মোসাদ তাকে বুয়েনস এয়ার্সে খুজে বের করার পর অপহরণ করে ইসরেলে নিয়ে আসে। যুদ্ধ অপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে তার বিচার শুরু হয় ১৯৬১-তে জেরুসালেমের আদালতে। তখন আর্জেন্টিনা তীব্র আপত্তি করে বলেছিল, আইখম্যানকে অপহরণ করে ইসরেল আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করেছিল।
ইসরেলি সরকারের ঐকান্তিক ছিল বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করার যে আইখম্যানের বিচার হচ্ছে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে। বিশ্বের টপ মিডিয়া এই বিচারকাজ দেখার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিল এবং ৭৫০ দর্শক রিপোর্টারের আসন ছিল।

ওপরের নির্দেশ
৫৬ দিন শুনানির পরে। শত শত নথিপত্র পেশ করার পরে এবং ১১২ জন সাক্ষীর (যাদের অধিকাংশ ছিলেন গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুর মুখ থেকে বেচে আসা) স্যা দেওয়ার পরে তিনজন বিচারক একমত হয়ে আইখম্যানের মৃত্যুদণ্ড দেন। ট্রায়ালের পুরো সময়টায় হাই সিকিউরিটির মধ্যে আইখম্যানকে আদালতে একটি বুলেটপ্রুফ গ্লাসের খাচায় রাখা হয়।
আইখম্যান তার ডিফেন্সে বলেন, তিনি ওপরের নির্দেশে কাজ করেছিলেন এবং যেহেতু তিনি ওপরের কর্তাব্যক্তিদের আদেশ মেনে চলার শপথ নিয়েছিলেন। সেহেতু তিনি সব সময়ই সেটা মানতে বাধ্য ছিলেন। আইখম্যান আরো বলেন, ইহুদিদের মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সুলার, হেইডৃচ, হিমলার এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে হিটলার।
বিচারকরা তার এই ডিফেন্স (ওপরের নির্দেশ) নাকচ করে দেন। তারা রায়ে বলেন, আইখম্যান শুধুই যে ওপরের নির্দেশ মেনে কাজ করেছিলেন তা নয়- তিনি সম্পূর্ণভাবে নাৎসি সরকারের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং গণহত্যায় একটি প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন- গুলি চালিয়ে নয়, হত্যার আয়োজনে নিজের অফিস ডেস্কে বসে অংশ নিয়ে।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৬১-তে আইখম্যান মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তিনি সুপৃম কোর্টে আপিল করেন। তার দণ্ড বহাল থাকে। শেষ চেষ্টায় তিনি ইসরেলি প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেন। কিন্তু সেটাও নাকচ হয়ে যায়। ৩১ মে ১৯৬২-তে মধ্যরাতে ইসরেলের রামিয়া জেলখানায় ফাসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। শেষ খাবার হিসেবে কিছু খেতে চাননি আইখম্যান। তিনি এক বোতল ওয়াইন চেয়েছিলেন এবং পেয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি কালো টুপি মাথায় পরতে চাননি।
চার ঘণ্টার মধ্যে একটি গোপন স্থানে আইখম্যানের দেহ পোড়ানো হয়। তারপর ইসরেলি নেভির একটি পেট্রল বোটে তার দেহভস্ম নিয়ে যাওয়া হয় ভূমধ্যসাগরে এবং সেখানে আন্তর্জাতিক পানির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
এডলফ আইখম্যানের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড থেকে দুটি বিষয় শিক্ষণীয়। এক. হত্যার অপরাধে বিচারপ্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে করা উচিত এবং দুই. উপরের নির্দেশ মেনে চলাটা হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ডিফেন্স হতে পারে না।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে যেসব একস্ট্রা জুডিশিয়াল মার্ডার হচ্ছে তার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দ্বিতীয় শিক্ষাটি নিতে পারেন।
সাইমন ওয়েজেনথাল, অস্টৃয়ার ইহুদি যিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন নাৎসি অপরাধীদের খুজে বের করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে। তিনি আইখম্যানের মৃত্যুদণ্ডের পরে বলেন, সারা বিশ্ব এখন বুঝতে পারবে ডেস্ক মার্ডারার বলতে কি বোঝায়। এখন আমরা জানি, কাউকে খুন করতে মানসিক বিকারগ্রস্ত হতে হয় না- কোনো ব্যক্তি তার ডিউটি বা ওপরের নির্দেশ পালনের জন্য বিশ্বস্ত অনুচর ও আগ্রহী হয়েই খুন করতে পারে।
Faicbook.com/shafik Rehman Presents

ওয়ার্ল্ডকাপ হ্যাংওভার

এবারের ব্রাজিল বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে আগের বিশ্বকাপগুলোর ব্যয়ের তুলনায় ব্রাজিল বিশ্বকাপে ব্যয়ের একটি পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে। স্পোর্টস বিজনেস জার্নাল জানিয়েছে, আয়োজন শেষে সব মিলিয়ে ব্রাজিলের খরচ গিয়ে দাঁড়াতে পারে ১৫০০ কোটি থেকে ২০০০ কোটি ডলারে। টিভি স্বত্ব, টিকিট, কর্পোরেট স্পন্সরশিপ আর মার্কেটিংয়ের লাভ রাখবে ফিফা। আর পর্যটকদের ব্যয় থেকে ব্রাজিল রাখতে পারবে আনুমানিক ৫০ কোটি ডলার। এটা খুব একটা সুবিধাজনক পরিস্থিতি নয় ব্রাজিলের জন্য। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যয় করেছিল ৬০০ কোটি ডলার। পক্ষান্তরে উন্নত অবকাঠামো আর আধুনিক স্টেডিয়ামসমৃদ্ধ দেশ জার্মানি (২০০৬), ফ্রান্স (১৯৯৮) ও যুক্তরাষ্ট্রের (১৯৯৪) বিশ্বকাপ আয়োজনে দেশগুলোর ব্যয় হয়েছিল ১০০০ কোটিরও কম। ২০০২-এর আসরে যখন এশিয়ার জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল সেবার তাদের ব্যয় হয়েছিল যথাক্রমে ৫০০ কোটি ও ২৫০ কোটি ডলার। ব্রাজিলের মতো তাদেরও তৈরি করতে হয়েছিল একাধিক নতুন স্টেডিয়াম। ব্রাজিলের সমস্যাগুলোর একটি হলো: ফিফার বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী প্রতিটি আয়োজক দেশকে ন্যূনতম ৪০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসহ ৮টি স্টেডিয়াম থাকতে হবে। যার মধ্যে উদ্বোধনী খেলার জন্য ৬০ হাজার ধারণক্ষমতা ও ফাইনাল খেলার জন্য কমপক্ষে ৮০ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। শুধুমাত্র এই বাধ্যবাধকতাই মেটানো যথেষ্ট কঠিন। তারপরও ব্রাজিল কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের কাছে নিজেদের ১২টি শহরের পরিচিতি তুলে ধরার লক্ষ্যে ভেন্যু রেখেছে ১২টি। প্রত্যেকটির ন্যূনতম ধারণক্ষমতা কমপক্ষে ৪০ হাজার। ২০০৯ সালে ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশন প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছিল, বিশ্বকাপের জন্য ১২টি স্টেডিয়াম সংস্কার ও নতুন করে তৈরি করতে খরচ হবে ১১০ কোটি ডলার। শেষমেশ স্টেডিয়ামের পেছনে মোট বাজেট গিয়ে দাঁড়ায় ৪৭০০ কোটি ডলার। ৯টি স্টেডিয়াম নতুন। আর তার মধ্যে ৭টি স্টেডিয়াম পুরোনো স্টেডিয়াম ভেঙে সেখানেই নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। ৪টি স্টেডিয়ামের শহরগুলোর কোন দল ব্রাজিল সকার লিগের ফার্স্ট ডিভিশনে নেই। মানাউসে একটি দল আছে যারা সেকেন্ড ডিভিশনে খেলে। তাদের খেলাগুলোতে গড় দর্শক উপস্থিতি হয় ১৫০০’র মতো। মানাউসে এখন নতুন যে স্টেডিয়াম আছে তার ধারণক্ষমতা ৪২,৩৭৪। এর পেছনে ব্যয় হয়েছে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সবমিলিয়ে এ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ৪টি খেলা অনুষ্ঠিত হবে। মানে গারিঞ্চা ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের পেছনে সার্বিক ব্যয় হয়েছে ৯০ কোটি আর স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা ৭০ হাজার। ফোর্টালেজা, রেসিফে ও সালভাদর প্রত্যেকটি শহরেরই ফার্স্ট ডিভিশনে খেলা দল রয়েছে। তাদের খেলাগুলোতে গড় দর্শক উপস্থিতি থাকে ১৫ হাজার। আর টিকিটের মূল্য থাকে মাত্র ১০ ডলার। রেসিফেতে বিশ্বকাপের নতুন স্টেডিয়াম তৈরির আগে থেকেই ছিল তিনটি বড় ও বহুমুখী স্টেডিয়াম। এ শহর নিবাসীদের এতটা উচ্চমূল্যে টিকিট কেনার ক্রয়ক্ষমতা নেই যা দিয়ে এসব স্টেডিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব। আর নির্মাণ ঋণ তো আছেই। সাও পাওলোতে সংস্কারযোগ্য মরুম্বি স্টেডিয়ামটি ফিফার মানদণ্ড মেটাতে না পারায় এটাকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয়া হয়। স্থানীয় আয়োজক কমিটি মরুম্বিকে সংস্কার করার পরিবর্তে নতুন স্টেডিয়াম তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১১ সালের মে মাসে ফিফা স্টেডিয়াম পর্যবেক্ষণ সফরের পর নতুন স্টেডিয়ামের নকশার সঙ্গে আরও কিছু সংযোজন করে। যার ফলে মূল খরচের ৩০ শতাংশ বেড়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৬৫ কোটি ডলারে। ২০১৪’র শুরুর দিকে একটি ক্রেন ধসে স্টেডিয়ামের ভালো একটি অংশ বরবাদ হয়ে যায়। এরপর কাজ বন্ধ থাকে বেশ কিছু দিন। রিও ডি জেনিরো’র বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়াম সেই ১৯৫০-এর বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ২০০৭ সালে প্যান আমেরিকান গেমসের জন্য ২০ কোটি মিলিয়ন ডলারের সংস্কার করা হয়। ফিফা’র বিচারে ওই সংস্কার যথেষ্ট ছিল না। প্যান আমেরিকান গেমসের পর মারাকানা স্টেডিয়াম আংশিক ভেঙে ফেলা হয়। এরপর আবার নতুন করে নির্মাণে ব্যয় হয় ৫০ কোটিরও বেশি। নতুন করে নির্মাণের জন্য ভেঙে ফেলা হয় একটি স্কুল, একটি জিমনেশিয়াম, একটি ওয়াটার পার্ক আর লাতিন আমেরিকার প্রথম আদিবাসী জাদুঘর। পার্কিংয়ের জন্য জায়গা করতে ওই স্থানটি সমান করে ফেলা হয়। কিন্তু ১২ই জুন যখন বিশ্বকাপের আসরে পর্দা উন্মোচন হয় তখন আহামরি সংখ্যক গাড়ি সেখানে দেখা যায়নি। ৭০০ পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। প্রথম ১০০ জনকে করা হয় বন্দুকের মুখে। তাদেরকে দু’ঘণ্টার দূরত্বে রিও’র পশ্চিম দিকে আবাসের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। বাকি পরিবারেরা প্রতিবাদ জানিয়ে মামলা করে। এর ফলে তারা অপেক্ষাকৃত উন্নত জায়গায় যেতে সমর্থ হয়। খেলার বাইরে বিশ্বকাপের জন্য যেসব অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো নতুন বাস লেন নির্মাণ। খেলোয়াড়, কর্মকর্তা আর ফুটবল ভক্তদের দ্রুত যাতায়াতের জন্য এয়ারপোর্ট আর হোটেল থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত এসব নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হয়। এছাড়াও বিমানবন্দরগুলোতে নির্মাণ করা হয় নতুন রানওয়ে আর টার্মিনাল। আর নিরাপত্তা ব্যয় ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিজ বাড়িঘর ছাড়া হতে হয়েছে আনুমানিক আড়াই লাখ দরিদ্র ব্রাজিলিয়ানকে। এছাড়াও দুর্বল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত শিক্ষা আর যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভুগছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যে ব্রাজিল জুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছিল তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে বিশ্বকাপের আসর। তারপরই ব্রাজিল সরকারকে বিশাল অঙ্কের বিল পরিশোধ করতে হবে। আর সেটা করতে হবে যাবতীয় বন্ডহোল্ডার আর জনগণকে। বিশ্বকাপ উন্মাদনার হ্যাংওভার হতে আর খুব বেশি দেরি নেই।

ব্রাজিলের কোপাকাবানায় অন্য দৃশ্য

সে এক অন্য রকম দৃশ্য রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতে। হাজার হাজার মানুষ কিলবিল করছে। তারা সবাই সেখানে একত্রিত হয়েছিলেন ব্রাজিল বনাম চিলি ম্যাচটি দেখতে। শেষ মুহূর্তে যে নাটকীয়তা জমে ওঠে তখন সেখানে হিমশীতল নীরবতা। স্থির হয়ে সব চোখ তাকিয়ে থাকে সৈকতে খেলা উপভোগের জন্য বসানো এক জায়ান্ট স্ক্রিনে। লুই ফিলিপ স্কলারির শিষ্যরা যখন বেলো হোরাইজোন্তে মাঠে খেলছিল, তখন গোটা দেশ সেলেকাওদের খেলা দেখতে মগ্ন। যদিও স্বাগতিক ব্রাজিলের হলুদ জার্সি পরিহিত ভক্ত-সমর্থকরাই ছিল বেশি, তবুও চিলির লালশার্টধারী সমর্থক যে একেবারে ছিল না, তা নয়। কেউ কেউ এসেছিলেন ভিন্ন রূপে। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সাম্বা ডান্সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছিলেন অনেকে। ডেভিড লুইজ যখন চিলির জালে গোল দিলেন, তখন ভক্তদের উচ্ছ্বাস ছাপিয়ে উঠছিল সমুদ্রের গর্জনকেও। তবে ম্যচের শেষের দিকে যখন তাবৎ ব্রাজিল সমর্থকরা হেরে যাওয়ার শঙ্কায় ভুগছেন, তখন সৈকতের ব্রাজিল সমর্থকদের অনেকেই ছিলেন প্রার্থনায় রত। পেনাল্টি শ্যুটআউটে জুলিও সিজার যখন ঠেকিয়ে দিচ্ছিলেন সানচেজদের শট, তখন যেন অন্তরে কিছুটা স্বস্তি আসতে শুরু করে তাদের। চিলির শেষ শটটি যখন বারে লেগে ফিরে যায়, তখন আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর কান্নার এক অদ্ভুত ঢেউ দেখা যায় সৈকতের বুকে। চিলির সমর্থকরা তখন বেদনায় আর শোকে মূহ্যমান, আর ব্রাজিল সমর্থকদের চোখে তখন আনন্দ আর স্বস্তির অশ্রু। কেউ আর্তচিৎকারে গগন বিদীর্ণ করেন। সাম্বার তালে তালে চলতে থাকে উন্মাতাল রাত। সে দৃশ্য যারা না দেখেছেন তাদের তা বলে বোঝানো কষ্ট। মুহূর্তের মধ্যে যখন ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত হয় তখন যেন সেখানে বিস্ফোরণ হয়ে ফেটে পড়ে এতটা সময়ের হিমশীতল নীরবতা।

মিডিয়া বনাম শামীম ওসমান by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

নারায়ণগঞ্জের একটি বিখ্যাত পরিবারের সন্তান এবং আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান ক্রমশই চট্টগ্রামের আরেকটি বিখ্যাত পরিবারের ছেলে সাকা চৌধুুুুরীর মতো বিতর্কিত হয়ে উঠছেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এ দুটি পরিবারই বঙ্গবন্ধু পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ। এ জন্যই সাকা চৌধুরীর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী যুদ্ধাপরাধী (৭১ সালের) হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু এই পরিবারটির প্রতি স্নেহশীল ছিলেন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই পরিবারটি যাতে লাঞ্ছিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেছিলেন। অবশ্য সাকা চৌধুরী তার স্বভাবজাত দুর্বৃত্তপনার জন্য সেই স্নেহের কোনো মর্যাদা রাখেননি। এখন তিনি একাত্তরের দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কারাবাসে আছেন। তার অসাধারণ বাকপটুতা অশোভন ও অশালীন কথাবার্তা বলায়। এখন সেই হম্বিতম্বি খুব একটা শোনা যায় না।

চট্টগ্রামের সাকা চৌধুরীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানের একটা বিরাট পার্থক্যও আছে। শামীম ওসমান যুদ্ধাপরাধী নন, বরং মুক্তিযোদ্ধা এবং তার গোটা পরিবারই মুক্তিযোদ্ধা। এই পরিবারের খান সাহেব ওসমান আলী আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং শামীম ওসমানের বাবাও ছিলেন আওয়ামী লীগের সামনের কাতারের একজন নেতা এবং সংসদ সদস্য। বঙ্গবন্ধুর মতো তার কন্যা শেখ হাসিনারও এই পরিবারটির প্রতি যথেষ্ট স্নেহ-মমতা রয়েছে। শামীম ওসমানও বঙ্গবন্ধু পরিবার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
তা সত্ত্বেও সাকা চৌধুরীর স্বভাব চরিত্রের সঙ্গে শামীম ওসমানের একটা জায়গায় মিল আছে, তা হল অশোভন ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলায় এবং অসঙ্গত কার্যকলাপে। শামীম যুদ্ধাপরাধ করেননি; কিন্তু তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ আছে। আর কথাবার্তা বলায় তার শালীনতা ও দম্ভের আগেও কোনো সীমা ছিল না। বর্তমানে তা সব সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি ঢাকার সব মিডিয়ার সাংবাদিকদের (একটি মাত্র কাগজ ছাড়া) কুকুর আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, এরা সবাই সংবাদপত্রের বড়লোক মালিকদের কালো টাকা পাহারা দেয়ার জন্য নিযুক্ত কুকুর। আগে তারা এই পাহারার কাজে কুকুর পুষতো, এখন সাংবাদিক পোষে।
ক্ষমতাসীন দলের একজন বিশিষ্ট নেতা ও সংসদ সদস্য এবং দেশের একটি বিখ্যাত পরিবারের সন্তানের মুখে এসব কথা মানায় কি? নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের ঘটনা এবং সেই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আসামি নূর হোসেন কলকাতায় ধরা পড়ার পর তার কোনো কোনো জবানবন্দিকে কেন্দ্র করে ঢাকার একশ্রেণীর মিডিয়া শামীম ওসমানও এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিলেন এমন একটা সন্দেহ জনমনে সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে তা সত্য। একটা দৈনিক তা বিশেষভাবে করে চলেছে। তাকে উইচ হান্টিংও বলা চলে। কিন্তু সব কাগজ ও তাদের সাংবাদিকরা তা করেননি। শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে আগেও যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ ছিল তাকে ভিত্তি করে কোনো কোনো মিডিয়ায় তার প্রতি সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
একটি বড় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তকারী পুলিশের মতো তদন্তকারী সাংবাদিকদেরও সবাইকে সন্দেহ করার (তা সঠিক নয়, প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত) অধিকার আছে। এক্ষেত্রে শামীম ওসমানের উচিত নিজেকে এই সন্দেহ থেকে মুক্ত করার জন্য সর্বপ্রকার তদন্ত ও অনুসন্ধানে নিজেকে খোলামেলাভাবে তুলে ধরা। যে বিশেষ সংবাদপত্রটি তার বিরুদ্ধে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উইচ হান্টিংয়ে নেমেছে, তার মুখোশ উন্মোচিত করা। দেশের সব সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের (একটি ছাড়া) কুকুর আখ্যা দেয়ার মতো অসংযত ও অশালীন মনোভাব দেখানো নয়। অভিযোগ যতই তিক্ত এবং অসত্য হোক, তার জবাব দিতে গিয়ে রেগে গেলে বা শালীনতার সীমা ছাড়ালে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দিতে পারে, অভিযোগটি সত্য।
শামীম ওসমান যদি তার বিদ্বিষ্ট (গোটা আওয়ামী রাজনীতির প্রতিই পত্রিকাটি বিদ্বিষ্ট) বিশেষ পত্রিকাটির প্রচারণায় শালীন জবাব দিতেন, তাহলে আপত্তির কিছু ছিল না। এই পত্রিকাটি আগেও আওয়ামী লীগ-বিদ্বেষ থেকে শামীম ওসমানের লুঙ্গির খুট ধরে টানাটানি করেছে এবং তা সীমা ছাড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জের মেয়র নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে শামীম ওসমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়। বিপুল ভোটে শামীম ওসমানের পরাজয়েও সম্ভবত এটাও একটা কারণ। তাতে শামীম ওসমানের রাগ থাকতেই পারে। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা নিয়ে যদি তিনি বিষয়টি ভাবতেন তাহলে একটি পত্রিকার নীতি ও সাংবাদিক সততা নিয়েই প্রশ্ন তুলতেন; গোটা দেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সম্পর্কে জঘন্য অবমাননাকর উক্তি করে তার নিজের, দলের ও পরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেন না।
আমি তাকে চিনি এবং স্নেহ করি। এই পরিবারের অনেকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। প্রয়াত বন্ধু মোস্তফা সারোয়ারের কথা আমি এখনও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাই শামীম ওসমানকে উপদেশ দেই, নিজেকে সংযত করুন। দেশের সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমা চান। একটি বিখ্যাত পরিবারের এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করুন। নিজেকে সাকা চৌধুরীর মতো এক দুর্বৃত্তের পর্যায়ে নামিয়ে আনবেন না।
নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শামীম ওসমানকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যে কোনো দেশেই এ ধরনের ঘটনায় সংবাদপত্রকে খোঁজখবর নিতে এগিয়ে আসতে হয় এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নিয়ে খবর প্রকাশ তাদের কর্তব্য এবং দায়িত্ব। কোনো সংবাদপত্র এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ির এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপরায়ণতার পরিচয় দেখালে ক্ষমতাসীন সরকার সমালোচিত সন্দেহভাজন ব্যক্তির পক্ষে (তিনি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত) অবশ্যই দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু সরকার বা সরকার পক্ষকে সে সুযোগ না দিয়েই শামীম ওসমান যেভাবে অনবরত দায়িত্বহীন ও পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা বলে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তোলেন, তাতে প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল শামীম ওসমানকে সংযত হওয়ার এবং সাত খুনের মামলার তদন্তে আন্তরিকভাবে সহায়তাদানের পরামর্শ দেয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা করেননি। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলেছেন, তিনি শামীম ওসমানের পরিবারের পক্ষে। এই কথাটি জোর গলায় বলার কি কোনো দরকার ছিল? নারায়ণগঞ্জের মেয়র নির্বাচনের সময় জনগণের ভোট শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে এ কথা জেনেও তিনি সেলিনা হায়াৎ আইভীর পরিবর্তে তাকে দলের মনোনয়ন দিয়েছিলেন। নির্বাচনে শামীম ওসমানের বিরাট পরাজয়ের পরও তিনি গত সংসদ নির্বাচনে এ এলাকায় মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে আবার শামীম ওসমানকে মনোনয়ন দিয়েছেন। এটা কি জনগণের রায় ও মনোভাবকে উপেক্ষা করার শামিল নয়? জনগণ তো জানেই, তারা না চাইলেও প্রধানমন্ত্রী শামীম ওসমানের পক্ষে থাকবেন। এটা নতুন করে ঘোষণা করার তো দরকার ছিল না। ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে জানিয়ে দিলেন, তিনি জনগণের মনোভাবকে তোয়াক্কা করেন না এবং তার সমর্থন যে কোনো অবস্থায় একটি পরিবারের পক্ষেই।
এই মনোভাব জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তির সঙ্গে মানায় না। বঙ্গবন্ধু-কন্যার মানসিকতাও এটা হতে পারে না। সম্ভবত দলনেত্রী ও জননেত্রীর কাছে প্রশ্রয় পেয়েই শামীম ওসমান আরও উদ্ধত হয়েছেন এবং একজন পুলিশ অফিসারকেও ধমকাতে সাহস পেয়েছেন। তার এই ঔদ্ধত্য আরও বেড়েছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের আরও একটি ঘোষণায়। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠ অনুসরণ করে (অথবা তার নির্দেশে) বলেছেন, তারা শামীম ওসমানের পরিবারের পক্ষে। সঙ্গতভাবেই দেশে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের সরকার যদি একটি পরিবারের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে দেশের মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে কে?
এখানে আরও একটি প্রশ্ন আছে। যেখানে একটি পরিবারের বিশিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে (সত্য মিথ্যা যা-ই হোক), সেখানে দেশের সরকারই যদি আগাম ঘোষণা দেয়, তারা ওই পরিবার অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে, তাহলে ওই অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনা সরকারি পুলিশ বা গোয়েন্দা বাহিনীর পক্ষে সম্ভব কি? যদি সম্ভব না হয় তাহলে বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে। আওয়ামী লীগের মতো দলের শাসনামলে এই ধরনের কান্না শোনার আশংকা দেশের মানুষ কখনও করেছিল কি?
দেশের সাংবাদিকদের অবমাননা করে শামীম ওসমান যে কথা বলেছেন তাতে আমিও ক্ষুব্ধ। আমিও দেশের একজন সাংবাদিক। আমি শামীম ওসমানের কাছে শুধু সাংবাদিক হিসেবে নয়, তার বড় ভাই এবং একজন শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা দাবি করি। তিনি যদি তা না করেন, তাহলে দলমত নির্বিশেষে দেশের সব সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের উচিত হবে, তাকে বয়কট করা। তার কথাবার্তা সব কিছু প্রকাশ বন্ধ করা। দেশের মানুষের উচিত হবে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনে তার সত্যই কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তার অবাধ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করার জোর দাবি জানানো। দোষী সাব্যস্ত হলে সাকা চৌধুরীর মতোই তার দণ্ড হওয়া উচিত।
এই প্রসঙ্গে বলি, দেশের একশ্রেণীর মিডিয়া, যারা নিরপেক্ষতার ভান করে তাদের পছন্দের নয় এমন রাজনীতিকদের নিয়ে চরিত্র হননের সাংবাদিকতা করেন, তারা এই অসৎ সাংবাদিকতা থেকে বিরত হোন। তাদের দুষ্ট সাংবাদিকতা দেশের সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের শুনাম ও ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপন করে এবং শামীম ওসমানের মতো ব্যক্তিদের সাংবাদিকদের সম্পর্কে জঘন্য অবমাননামূলক উক্তি করার সাহস জোগায়। দেশের সাংবাদিকদের উচিত, একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর এই অপসাংবাদিকতা থেকে দেশের সৎ ও শুভ সাংবাদিকতাকে রক্ষা করা এবং তার সুনাম ও মর্যাদা রক্ষা করা।
আমরা অতীতেও দেখেছি, একটি পত্রিকার পছন্দের রাজনীতির লোক না হলেই কোনো কোনো প্রভাবশালী রাজনীতিকের সম্পর্কে চরিত্র হননে কখনও কৌশলী, কখনও সরাসরি প্রচারণা চালানো হয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী সাজানো হয়েছে এবং তাদের রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দেয়া হয়েছে। এই বিশেষ দৈনিককে দেখা গেছে, শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়াতে যতটা আগ্রহী, সাকা চৌধুরীর জঘন্য অপরাধগুলো সম্পর্কে নিত্যপ্রচার চালাতে তারা ততটা আগ্রহী ছিল না।
ফেনীর জয়নাল হাজারীকে নিয়ে এই পত্রিকাটির অতি প্রচারণা এক সময় দেশে সাংবাদিকতার জগতে যথেষ্ট কালি ছিটিয়েছে। এই পত্রিকার সম্পাদক হাজারীর বিরুদ্ধে অনবরত উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা (সত্য মিথ্যা যা-ই হোক) চালানোর ফলে জয়নাল হাজারীও তার তৎকালীন সংসদ সদস্য পদের রক্ষাকবচের সুযোগ নিয়ে ওই পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে যে কুৎসিত অভিযোগ তোলেন এবং অন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সেই কুৎসা প্রকাশ করেন, তা ওই সম্পাদকের জন্য এক চরম অবমাননাকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে ওই পত্রিকার সম্পাদক দেশের অন্য সম্পাদক ও সাংবাদিকদের শরণাপন্ন হন এবং তারা যুক্তভাবে হাজারীর বিরুদ্ধে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে ওই সম্পাদকের সম্মান রক্ষার ব্যবস্থা করেন।
শামীম ওসমান সম্পর্কিত অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে নিয়ে একটি বা একশ্রেণীর মিডিয়ার উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণার বাড়াবাড়ি সম্পর্কেও দেশের সৎ ও প্রকৃত সাংবাদিকদের যেমন সতর্ক থাকা এবং তাদের পেশার সততার সুনাম রক্ষা করা উচিত, তেমনি একটি বা একশ্রেণীর পত্রিকার বাড়াবাড়িকে অজুহাত করে দেশের সব সাংবাদিককে গালনিন্দা করা থেকে শামীম ওসমানের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরত করা ও বিরত রাখা উচিত। এ কাজটি তার দলনেত্রী শেখ হাসিনাই ভালো পারেন এবং তার পারা উচিত। শামীম ওসমানের ধৃষ্ট বক্তব্য তার নিজের, তার দলের ক্ষতি করবে এবং এমন একটি অসুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করবে যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
লন্ডন ২৯ জুন ॥ রবিবার, ২০১৪

গোড়াতেই গলদ by শামীমুল হক

কাদের পেটে নাকি ঘি হজম হয় না। যদিও বা কখনও তারা ঘি খেয়ে ফেলে তাহলে দেখা যায় তাদের গায়ের সব লোম উঠে গেছে। শুধু চামড়া নিয়ে বেঁচে আছে। বিশ্রী এক অবস্থা। তাদেরকে জাত ভাইয়েরাও ঘৃণা করে। মানুষ তো দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়। কথা হচ্ছিল ফরমালিন নিয়ে। ফলমূল, শাকসবজি, মাছ সব কিছুতেই এখন ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। বাজারে তরতাজা, জিভে পানি আসা সব ফল দেখে মানুষ এগিয়ে যায়। কিনে নেয়। কিন্তু অর্থ দিয়ে যে তিনি বিষ কিনে নিলেন নিজে কি তা জানেন? হয়তো জানেন। হয়তো না। কিন্তু একটি কথা তো ঠিক- আমরা সবাই অবগত ফরমালিন সম্পর্কে। তারপরও উপায়হীন আমরা। অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি সবাই। এই রসমধুর মাসে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সাইনবোর্ড দেখা যায়। যেখানে লেখা ‘এখানে ফরমালিনবিহীন আম পাওয়া যায়’। আশ্চর্যের বিষয় পরীক্ষা করে দেখা গেছে এসব আমেও রয়েছে ফরমালিন। এ অবস্থা হলে মানুষ যাবে কোথায়? কাকেই বা বিশ্বাস করবে। গত সপ্তাহ খানেক ধরে পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। যেখানে ফল বোঝাই ট্রাক থামিয়ে ফরমালিন আছে কিনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেসব ট্রাকে পরীক্ষা করা হয়েছে তার সব ক’টিতে পাওয়া গেছে ফরমালিন। প্রশাসন এসব ফল নষ্ট করে দিয়ছে। প্রশ্ন হলো এসব ট্রাকে আসা ফল সরাসরি বাগান থেকেই আনা হয়েছে। তাহলে বোঝা যায় বাগানেই ফরমালিন মেশানো হয়েছে। আসলে গোড়াতেই গলদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এখন প্রতিটি বাগানেই একটি করে চেক পোস্ট বসাতে হবে। কড়া নজরদারিতে আনতে হবে বাগানগুলো। কলা, আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস সব কিছুতেই মেশানে হচ্ছে ফরমালিন। শুধু তাই নয়, কাঁচা ফল পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড। মফস্বলের ছোট্ট এক শহরে এক রাতে হেঁটে যাচ্ছিলাম। দেখলাম চেনা এক ফল ব্যবসায়ী ট্রাক থেকে একেবারে কাঁচা আনারস নামাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আরে এমন কাঁচা ফল ক’দিনে পাকবে? তিনি বললেন, একটু দাঁড়ান। তিনি ফল নামিয়ে গুদাম ঘরে নিয়ে গোল করে সাজিয়ে রাখলেন। আর ঠিক মাঝখানে রেখে দিলেন এক টুকরো কার্বাইড। তারপর বললেন, সকালে আসবেন। তখন দেখবেন আসল খেলা। বাসায় গিয়ে অধীর আগ্রহ কখন সকাল হবে। কখন ওই ব্যবসায়ীর গুদাম ঘরে যাবো। কি দেখবো? ঘুম থেকে উঠে দেখলাম ঘড়িতে সকাল ৮টা। দৌড়ে গেলাম গুদাম ঘরে। কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যবসায়ী এলেন। গুদামের তালা খুললেন। একি! রাতে কি দেখলাম আর এখন কি দেখছি। সব আনারস হলুদ হয়ে গেছে। যেন এইমাত্র বাগান থেকে কেটে আনা আনারস। তিনি বললেন, এই কার্বাইড না দিলে আনারস এক সপ্তাহেও পাকতো না। বরং শুকিয়ে যেতো। ব্যবসায় ক্ষতি হতো। এর পরের অবস্থা হলো-ফরমালিন মেশানো। হলুদ আনারস যেন দ্রুত না পচে সেজন্য। কলাও ঠিক একই ভাবে কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয়। এসব না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলে আসছে। সব ওপেন সিক্রেট। প্রশাসন এখন নড়েচড়ে বসলেও সব জায়গায় গিয়ে পরীক্ষা করা তাদের পক্ষে কি সম্ভব? গতকাল গাড়িতে করে আসছিলাম। ডেমরা ব্রিজের সামনে পুলিশের চেকপোস্ট। গাড়ি থামার ইশারা দিলেন এক পুলিশ সদস্য। গাড়ি থেমে গেল। এক পুলিশ সদস্য এগিয়ে এসে হাতে ধরিয়ে দিলেন একটি লিফলেট। এ লিফলেটের মাধ্যমে ফরমালিন নিয়ে ক্রেতাদের সচেতন করা হচ্ছে। ফরমালিন কি, এর ক্ষতিকারক দিক এবং ফরমালিন মিশ্রিত কোন ফল না কিনতে বলা হয়েছে। এমনকি কোথাও যদি ফরমালিন সম্পর্কিত কোন তথ্য থাকে তা-ও জানিয়ে দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। দু’টি ফোন নাম্বারও দেয়া হয়েছে ডিএমপির দু’জন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তার। লিফলেট পড়তে পড়তে মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিলো। মানুষকে সচেতন করে লাভ কি? আমরা সবাই সচেতন হলাম। কিন্তু বাজারে ফরমালিন ছাড়া কোন ফল নাই। তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? ফলের মাসে ফল খেতে কে না পছন্দ করে। ফরমালিনের জন্য কি ফল খাওয়া বন্ধ করে দেবে? না ফল খাওয়া বন্ধ করবে না। তারা ফরমালিন আছে কিনা তা পরীক্ষা না করে ফল কিনছে। খাচ্ছে। প্রশাসন সচেতন হওয়ার পর বাজারে ফলের দাম বেড়ে গেছে। তিন শ’ টাকার লিচুর শ’ হয়ে গেছে পাঁচ শ’ টাকা। বলা হচ্ছে ফরমালিনবিহীন হওয়ায় এর দাম বেশি? ফরমালিনবিহীন হলে দাম কেন বেশি হবে? এর কোন উত্তর নেই ব্যবসায়ীর কাছে। এক আড্ডায় এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল। এক লোক একটি গল্প শুনিয়ে দিলেন। গল্পটি এমন- এক মেথর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটি সুগন্ধির দোকানের সামনে গিয়ে পৌঁছলেন। যে দোকানে আতর, সেন্টসহ নানা সুগন্ধি বিক্রি করা হয়। ওই দোকান পার হওয়ার সময় তার নাকে এসে লাগে সুগন্ধ। এ গন্ধে তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। মানুষজন তাকে ঘিরে ফেলেন। কেউ তার নাকে মুখে পানি ছিটিয়ে দেন। কেউ বা মৃগী ব্যারাম মনে করে নাকের কাছে চামড়ার জুতা ধরেন। না! কোন কিছুতেই তার সংজ্ঞা ফিরে আসছে না। ওই সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আরেক মেথর। তিনি বিষয়টি টের পেলেন। কাছে গিয়ে সবাইকে বললেন, আপনারা কেউ কিছু করতে হবে না। আমাকে একটু সুযোগ দিন, চেষ্টা করে দেখি। তিনি সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত পাশেই কচু গাছের পাতা ছিড়ে নিলেন। আর পাশের বাসার বাথরুমে ঢুকে তাতে বিষ্ঠা নিয়ে এলেন। আর ওই বিষ্ঠা আনা পাতা মেথরের নাকে লাগাতেই তিনি সংজ্ঞা ফিরে পেলেন। এ গল্প শুনিয়ে লোকটি বললেন, বাঙালির অবস্থাও হয়েছে এমন। বিষ মেশানো খাবার খেতে খেতে আমাদের শরীরে বিষ মিশে গেছে। এখন ভাল খাবার পেটে হজম হবে না। আর খেলেও ওই কুকুরের মতো শরীরে পশম আর থাকবে না। অন্য একজন বললেন, তাই বলে কি আমরা ফরমালিন মেশানো খাবারই খাবো? লোকটি বললেন না! আমাদের বিষ মেশানো খাবার থেকে দূরে থাকতে হলে আর কখনও যেন ফরমালিন বাজারে না আসতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। একেবারে বাজার ভেজালমুক্ত করতে হবে। বেচাকেনায়, আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। তাহলেই যদি কিছু বদলায় পরিস্থিতি!

প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনা করবেন কি? by সেখ সোহেল রানা

প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন? এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আমরা কেউ বলছি না যে, আমরা আসলে একুশ শতকের প্রযুক্তির কাছে হেরে গেছি। হ্যাকাররা হ্যাক করেছে। তারপর তারা সেই ইনফরমেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে সবখানে। প্রযুক্তির দিক থেকে তারা  আমাদের থেকে স্মার্ট। আমরা আরও স্মার্টনেস আর দক্ষতা দিয়ে তাদের মোকাবিলা করতে পারিনি। পৃথিবীর দেশে দেশে গড়ে উঠেছে মাল্টিলেভেল সিকিউরিটি সিসটেম বা এমএলএসএস। সেই সিস্টেম ডিজাইনের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সেখানে কাজ করছে প্রযুক্তিবিদ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, মনস্তত্ত্ববিদদের সমন্বিত বিশেষজ্ঞ দল। আর আমরা সেই মান্ধাতা আমলের ধ্যান-ধারণা নিয়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ডাটাগুলো রক্ষায় পাহারা বসিয়েছি। এটা অসম্ভব। যারা ডাটা চুরি করছে তারা প্রযুক্তির যে রণসজ্জায় সজ্জিত আমাদের তার চেয়েও বেশি প্রযুক্তির উৎকর্ষ অর্জন করতে হবে। তবেই আমরা তাদের মোকাবিলা করতে পারবো।
একটি পাবলিক পরীক্ষার সর্বপ্রথম ধাপ প্রশ্নপত্র তৈরি করা। ধরে নিই, প্রতিটি বিষয়ের জন্য ৫০ জন প্যানেল শিক্ষকের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র আহ্বান করা হলো। তারা প্রশ্নপত্রের একটি করে সফট কপি একটি বিশেষ ফরম্যাটে (ধরে নিই .ীষং) আপলোড করলেন একটি শক্তিশালী সফটওয়্যার অ্যাপলিকেশনে। এই সফটওয়্যারটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে ৫০ সেট প্রশ্নপত্র থেকে  কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোটি কোটি ধরনের প্রশ্নপত্র তৈরি করতে সক্ষম। এই প্রশ্নপত্রগুলো Decode করে বিশেষ ধরনের  Binary Signal-এ রূপান্তরিত করা হবে এবং বহুস্তরবিশিষ্ট বিশেষ একটি ডাটাবেজ সিকিউরিটি সিস্টেমে সংরক্ষিত করা হবে। ছাপানোর কয়েক সেকেন্ড আগে তথ্যগুলো Encode  করা হবে।
প্লেট সিস্টেমের ছাপাপদ্ধতি বাতিল করে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। মানুষের পরিবর্তে পুরো ছাপার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবে Microprocessor নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি Robotics বা Automated Machine । রোবটগুলোর মধ্যে Artificial Intellegence Program Integrated থাকবে না। শুধুমাত্র একটি বা দু’টি কাজের নির্দেশিত প্রোগ্রাম সন্নিবেশিত থাকায় এগুলো তৈরির খরচ হবে অত্যন্ত কম।
প্রিন্টিং মেশিনটি একটি কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।  ছাপার পরে কাটিং, প্যাকিং, সিকিউরিটি সিল- সবই একটি Automated Control System-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে। একটি বিশেষ secured রুমের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে- যেখানে থাকবে শুধুই রোবট অথবা Automated Machine। তাই তথ্য চুরির কোন আশঙ্কা থাকবে না। সিস্টেমেটিং সমস্যা হলে বাইরে থেকে Auto detection & Rescue পদ্ধতির মাধ্যমে Remote Solution দেয়া হবে। থাকবে সিসি ক্যামেরা এবং Access card এর ব্যবহারও।
সিকিউরিটি সিস্টেমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলোspecification। অর্থাৎ যারা এইচএসসি’র প্রশ্নপত্র ছাপার সঙ্গে জড়িত তারা শুধু এই পরীক্ষার ছাপার কাজই করবে, অন্য কোন পরীক্ষার কাজ তারা করবে না। তাতে সিকিউরিটি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ছাপার ক্ষেত্রে wastage কপিগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৎক্ষণাৎ damping করে ফেলতে হবে। টেস্ট প্রিন্টিং হবে Decoding Language-এ। সিকিউরিটিজ সিস্টেম ডিজাইনে আরও টারমিনাল লেয়ার যোগ করা যেতে পারে।  যেমন, যারা প্রিন্টিং রুমে কোর ডাটা নিয়ে কাজ করবে তাদেরকে একটি বিশেষ ধরনের লেন্সযুক্ত চশমা পরতে হবে যেটি প্রশ্নপত্রের ফন্টগুলোকে রূপান্তরিত এবং বিকৃতভাবে উপস্থাপন করবে।
যারা কোর প্রিন্টিং রুমে কাজ করবেন তারা কর্মস্থল ত্যাগ করার পূর্বমুহূর্তে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি কম্পিউটার গেইম খেলবেন। সিকিউরিটি ব্যবস্থার এই ধাপটি বেশ কার্যকর এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এই বিশেষ ধরনের কম্পিউটার গেইম মস্তিষ্কের মধ্যে সদ্য প্রবেশকৃত তথ্যের শতকরা ৯০-৯৯ ভাগ মুছে ফেলতে সক্ষম। সিকিউরিটির পরের ধাপে রয়েছে প্রেসে নেটওয়ার্ক জ্যামার বসানো। তাছাড়া, বিজি প্রেসে কর্মরত ব্যক্তিদের  মোবাইল ও কমিউনিকেশন সিস্টেম যেমন মোবাইলের ওগঊ ট্র্যাকিং, ডাটা ট্র্যাকিং, গ্লোবাল পজিশনিং ইত্যাদি অটো-মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় আনা যেতে পারে।
সিকিউরিটির সর্বশেষ স্তরে রয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইলে অটো স্ক্রিনিং বা ফিল্টারিং-এর ব্যবস্থা করা। ফেসবুক, টুইটারসহ বাংলাদেশে যত ইন্টারনেট পেজ লোড হচ্ছে; ইমেইলে, মোবাইলে যত তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে সেগুলো ফিল্টার করে, আইপি অ্যাড্রেস ডিটেক্ট করে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা সম্ভব। ‘অপরাধী কম্পিউটার’কে ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে স্থায়ীভাবে disable করে দেয়া সম্ভব। কারণ ওই কম্পিউটার পরবর্তীতে আইপি অ্যাড্রেস পরিবর্তন করলেও মাদারবোর্ডের কিছু unique  তথ্য থাকে যেটা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
filtering tag ব্যবহার করে মোবাইল অপারেটরগুলো অপরাধী মোবাইল সেটের IME detect  করে সেগুলো মোবাইল নেটওয়ার্কে স্থায়ীভাবে disable করে দিতে পারে। এই ধরনের আর্থিক ক্ষতি অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের উৎসাহ কমিয়ে দিতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে একটি মাল্টিলেয়ার সিকিউরিটি সিস্টেম গড়ে তোলার সময় এসেছে। প্রয়োজন ডাটা সিকিউরিটি গবেষণা কেন্দ্র। এটি অপরিহার্য এবং শিক্ষার্থীদের অধিকারও বটে।  আমরা যেন একটা মেধাবী প্রজন্ম সৃষ্টি করে যেতে পারি।

ধ্রুপদী জ্ঞানচর্চার শেষ মুঘলের বিদায় by ড. মাহফুজ পারভেজ

সরদার ফজলুল করিম আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। এ তথ্যটি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো এ জন্য যে, আমার জীবনে যত শিক্ষক পেয়েছি, তিনি তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আশির দশকের শেষ দিকে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে খ-কালীন শিক্ষকতায় যুক্ত হন। ততদিনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিকাল সমাপ্ত করেছেন এবং যেহেতু তিনি গতানুগতিক শিক্ষক রাজনীতি করতেন না, তাই ঢাকায় তিনি চাকরির মেয়াদ বাড়াতে পারেন নি। এতে অবশ্য জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা লাভবানই হয়েছিল তাকে পেয়ে। তিনি স্নাতকোত্তর স্তরে আমাদের পড়াতেন ওরিয়েন্টাল পলিটিক্যাল থট বা প্রাচ্য রাজনৈতিক চিন্তা নামের কোর্স। বিখ্যাত বেসাম-এর ‘ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া’ নামের ক্লাসিক বই থেকে তিনি পাঠ দিতেন। প্রাচ্য দেশের সংখ্যা, ন্যায়, চার্বাক দর্শন থেকে শুরু করে মৌর্য যুগ আর কৌটিল্যের ওপর সরদার স্যারের বিস্তারিত পাঠদানের স্মৃতি আজও তাজা। তখনই তার বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তিনি ছিলেন তাজা-সবুজ-তরুণ। ঢাকার শ্যামলী থেকে পাবলিক বাসে চড়ে চলে আসতেন সাভারের ক্যাম্পাসে। তার সঙ্গী হয়ে দেখেছি বিদ্যাচর্চার বাইরে আর কোন বিষয়েই তার আগ্রহ ছিল না। পাঠের পরিধি ছাড়িয়ে নিজের ব্যক্তিগত কোন বিষয়ই তিনি আলোচনা করতেন না। আত্মপ্রচার তো নয়ই। আমরা যারা তার সংগ্রামী জীবন, নির্বাচনে বিজয়ী  হওয়া, বাম আন্দোলন ইত্যাদি সম্পর্কে নানা লেখা পাঠের মাধ্যমে অবহিত ছিলাম, তারা বিভিন্ন সময়ে সে সব নিয়ে ক্লাসে প্রশ্ন করলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রসঙ্গগুলো এড়িয়ে গেছেন। পরে ব্যক্তিগত আড্ডা ও আলাপে কিছু কিছু প্রসঙ্গ ও স্মৃতিচারণ নিজে থেকেই করতেন। শিক্ষকতায় তার শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞান ও বিদ্যা বিতরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রবলভাবে প্রণোদিত করতে সক্ষম ছিলেন। জানার ও পড়ার আগুন ছাত্রছাত্রীদের হৃদয়ে প্রজ্বলিত করার মহৎ কৃতিত্বের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার একটি উল্লেখযোগ্য উক্তি হলো, পরীক্ষা পাসের জন্য নয়, জানার ও শেখার জন্য পড়ো, পরীক্ষা এমনিতেই পাস হয়ে যাবে। তিনি জোর দিতেন শিক্ষার্থীদের মৌলিক চিন্তা ও বিশ্লেষণের ওপর। বলতেন, তুমি যদি যুক্তি দিয়ে কোন বক্তব্য বা প্রসঙ্গ সত্যি সত্যিই প্রমাণ করতে পারো, তবে তুমি ঠিক। আমি তোমাকে নম্বর দেবো। নোট মুখস্ত করে লিখলে বেশি নম্বর পাবে না। নিজের মৌলিক চিন্তার মাধ্যমে উত্তর দান করো, অবশ্যই ভাল নম্বর পাবে। ক্লাসে নোট টুকে গ-িবদ্ধ পড়াতে তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি পড়াতেন একটি বিশাল ক্যানভাস নিয়ে। একটি বিষয় পড়াতে গিয়ে নিয়ে আসতেন আরও শত সহযোগী বিষয়। প্রাচীন ভারত পড়ানোর প্রয়োজনে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন প্রাচীন গ্রিস, প্রাচীন চীনের কনফুসিয়াস এবং প্রাচীন পারস্যের  জরথুষ্ট্রকে। উচ্চতর বিদ্যা ও জ্ঞানচর্চায় মহীরুহসম  পা-ত্িযের অধিকারী সরদার স্যার বিনয় ও সারল্যের প্রতীক ছিলেন। ক্লাসে কাউকে ধমক দেয়ার কথা তিনি ভাবতেও পারতেন না। অসচেতন ছাত্রছাত্রীরা অমনোযোগী হয়ে পাঠ-গ্রহণ না করলে তিনি তাদেরকে চিহ্নিত করে মজার মজার গল্প বলতেন। যে গল্পের মোর‌্যাল বা মর্মকথায় এমন কিছু উপদেশ থাকতো, যা সেই বেখেয়ালি ছেলে বা মেয়েটির অন্তর্চক্ষু উন্মীলনে সাহায্য করতো। আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, কিছু কিছু উদাসীন, বিষয়জ্ঞানহীন মানুষ আমাদের সমাজে সব কিছু ছেড়ে প্রার্থনা বা আরাধনার মতো বিদ্যাক্ষেত্রে-জ্ঞানচর্চার জগতে সন্তরণশীল আছেন। তাদের কারণে আমাদের মনন ঋদ্ধ হয়। আমাদের সৃষ্টিশীলতা বিকাশ লাভ করে। আমাদের চিন্তা-দর্শন নান্দনিক আলোয় উজ্জ্বল হয়। এমন মানুষ ছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। ড. আহমদ শরীফ। প্রফেসর এম. আসাদুজ্জামান। আহমদ ছফা। এদেরই শেষ প্রতিনিধি সরদার ফজলুল করিম। শেষ মুঘলই তিনি জ্ঞানচর্চার ধ্রুপদী ঘরানার- যারা ক্লাসিক্যাল আমেজে বিদ্যাচর্চা করেন এবং জ্ঞান আহরণের আনন্দে জীবন কাটান। এমন মানুষ এখন আর নেই বললেই চলে। থাকলেও তারা সংখ্যায় খুবই কম। সরদার ফজলুল করিম আমাদের বিদ্যাবত্তা ও জ্ঞানচর্চার জগৎ আলোকোজ্জ্বল কারী মুষ্টিমেয় মহতী মানুষের অন্যতম। তার মৃত্যুতে উচ্চতর বিদ্যায়তনে এবং চিন্তাশীল-জ্ঞানচর্চার জগতের বিরাট ক্ষতি হবে, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের মৌলিক চিন্তন প্রক্রিয়াও এতে ক্ষুণ্ন হবে। প্রাচীন জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক তথ্যগত বিদ্যার সমন্বয় সাধনের যোগ্যতাসম্পন্ন  প্রাচীন পুরুষেরা একে একে চলে গেলে আমাদের ঐতিহ্যের নদীটিই যেন ক্ষীণ হয়ে যেতে থাকে। সরদার ফজলুল করিমের মৃত্যুতে বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ক্ষতির ক্ষতটিও বড় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

নতুন প্রেমিকের খোঁজে মনিকা বেদি

নতুন প্রেমের সন্ধানে নেমেছেন বলিউড অভিনেত্রী মনিকা বেদি। মুম্বাই কোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে অনেকটা হালকা হলেন তিনি। স্থানীয় গ্যাংস্টার আবু সেলিমের সঙ্গে নিজেকে জড়ানোর অভিযোগে মনিকার জেলও হয়েছিল। বেশ কিছুদিন আদালত পাড়ায় দৌড়াদৌড়ি করে অবশেষে নিজেকে মুক্ত করলেন মামলা থেকে। এরই মধ্যে নরওয়েতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও শুরু করেছেন তিনি। জানা যায়, যে কোনো মুহূর্তে মুম্বাই থেকে নরওয়েতে যেতে পারেন। বিদেশ যাত্রায় এখন কোনো আইনি বাধা নেই তার। তবে এখনই যেতে চাইছেন না তিনি। আগে চলার পথে একজন ভালো সঙ্গী চাই তার। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যকে এক সাক্ষাৎকারে তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন মনিকা। তিনি বলেন, আবু সেলিমের সঙ্গে আমার যা হয়েছিল সেটি একটি দুর্ঘটনা। সেসব কিছু ভুলে নতুনভাবে জীবনটাকে সাজাতে চাই। এখন আমি পুরোপুরি স্বাধীন। একজন ভালো সঙ্গী দরকার। যার সঙ্গে আমার মনের মিল হয়। যে আমাকে প্রতিনিয়ত কেয়ার করতে পারবে।

ইরাক ও সিরিয়ায় ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ কায়েমের ঘোষণা বিদ্রোহীদের

ইরাক ও সিরিয়ার দখলকৃত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের ঘোষণা দিয়েছে কট্টরপন্থী সংগঠন ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লিভেন্ট (আইএসআইএস)। ইন্টারনেটে পোস্ট করা একটি অডিও বার্তায় এ ঘোষণা দিয়েছে বিদ্রোহী সংগঠনটি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।  বিদ্রোহীদের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন খলিফা এই রাষ্ট্রের শাসনভারের দায়িত্বে থাকবেন। ইসলামিক রাষ্ট্রটির নাম হবে ‘দ্য ইসলামিক স্টেট’। নতুন রাষ্ট্রের ব্যাপ্তি, বিস্তৃতি বা সীমানা হবে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় আলেপ্পো থেকে ইরাকের পূর্বাঞ্চলীয় দিয়ালা প্রদেশ পর্যন্ত। আইএসআইএস’র ঘোষণায় বলা হয়েছে, বিদ্রোহী সংগঠনটির নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি খলিফার দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি ‘খলিফা ইব্রাহিম’ নামে পরিচিতি পাবেন। ওই অডিও বার্তায় ‘সর্বত্র মুসলমানদের নেতা’ হিসেবেও ঘোষণা করা হয় তাকে। খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কট্টরপন্থীদের বহুদিনের লক্ষ্য ছিল। অপর এক খবরে বলা হচ্ছে, ইরাকের বহু অংশে সুন্নি বিদ্রোহীদের অগ্রসর ও দখল প্রতিষ্ঠার খবরে ইসরাইল স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে ইরাকি সেনাবাহিনী আইএসআইএস’র দখলে থাকা উত্তরাঞ্চলীয় তিকরিত শহরে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত ১১ই জুন বিদ্রোহীরা শহরটিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় দেশটির উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হামলা চালিয়ে সেখানে দখল প্রতিষ্ঠা করে আইএসএস।

অবাক কাণ্ড ঘটালেন জ্যাকুলিন

প্রথমবারের মতো সালমানের বিপরীতে ‘কিক’ ছবিতে অভিনয় করেছেন জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ। এরই মধ্যে এ ছবির প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। ছবিতে বেশ কিছু দৃশ্যে ঘনিষ্ঠভাবে ক্যামেরাবন্দিও হয়েছেন সালমান-জ্যাকুলিন। এরই মধ্যে এর ট্রেইলার প্রচারের মধ্য দিয়ে দর্শকদের কাছে ব্যাপক আগ্রহ-কৌতূহলের বিষয়ে পরিণত হয়েছে ছবিটি। ছবিটি নিয়ে আশাবাদী খোদ সালমান খানও। ছবিটি মুক্তি পেতে যাচ্ছে আসছে রোজার ঈদ উপলক্ষে। আর ঈদে সালমান খান অভিনীত যত ছবি মুক্তি পেয়েছে তার সবই সুপারহিট। তাই ধারণা করা হচ্ছে ব্যবসা সফলতার নতুন রেকর্ড ‘কিক’ স্থাপন করবে মুক্তি পাবার পর। এদিকে এ ছবিটির প্রচারণাতেই এখন বেশি সময় দিচ্ছেন সাল্লু ও জ্যাকুলিন। ভারতের বিভিন্ন স্থানে তারা যাচ্ছেন মজার মজার সব প্রচারণার বিষয় নিয়ে। সম্প্রতি মুম্বইতে এমনই একটি প্রচারণায় অংশ নেন তারা। আর তাতেই অবাক করা কা- ঘটিয়ে ফেলেন জ্যাকুলিন। সালমান প্রচারণার অংশ হিসেবে এর একটি গানে মজা করে পারফর্ম করছিলেন। ঠিক সে সময় নাচতে নাচতে জ্যাকুলিন সালমানকে জড়িয়ে তার কোলে উঠে পড়েন। বিষয়টিতে অবাক হয়ে যান সালমান। এখানেই থেমে যায়নি বিষয়টি। সাল্লুর গালে বেশ কয়েকটি চুমোও এঁকে দেন জ্যাকুলিন। এরপর সালমান তাকে নামিয়ে আবারও মজা করে জ্যাকুলিনের উদ্দেশে বলেন, আরে জ্যাকুলিন তুমি তো সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ে গেছো আমার। বেজেছে ১২টা। জ্যাকুলিন এ সময় কেবল মাথা নাড়তে থাকেন। এ বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে ভারতীয় মিডিয়া ফলাও করে মুখরোচক সংবাদ প্রচার করেছে। তবে এ বিষয়ে সালমানের কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কারণ, তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন জ্যাকুলিনের এমন কাজে। এ বিষয়ে জ্যাকুলিনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি হেসে বলেন, সালমানের প্রেমে আমি পড়েছি আরও অনেক আগে। এখন শুধু প্রকাশটা করলাম। আর কিছু নয়।

নির্মম রিকুইজিশন by কাজী সোহাগ

রাত ৮টা ৩০ মিনিট। শতাধিক যাত্রী নিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে ওয়ান লাইন পরিবহনের গাড়িটি যাচ্ছিল বাড্ডার নতুনবাজারে। মহাখালীর রেলগেট পার গতেই গাড়িটি থেমে গেলো। প্রথম ৫ মিনিট যাত্রীরা কিছ্ইু বুঝলেন না। তাদের ধারণা আরও যাত্রী নিতেই হয়তো থেমে থাকা। কারন গাড়ির ইঞ্জিন ছিলো সচল। তবে চালকের আসন ছিলো ফাঁকা। গরমে গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রীরা ততক্ষণে তেতে উঠেছেন। চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার সবাই লাপাত্তা। আশেপাশে কোন ট্রাফিক সার্জেন্টও নেই। কয়েক যাত্রী বিকল্প গাড়ি পেয়ে তাতে উঠে পড়েন। কিন্তু গাড়ির ভেতরে প্রথম সারিতে থাকা কয়েকটি আসনে ছিলেন নারী ও শিশু। অনেক যাত্রী নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে বেশি টাকা দিয়েছেন সুপারভাইজারকে। ভাংতি করে পরে বাকি টাকা ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু সুপারভাইজারকে না পেয়ে তারাও গাড়ি থেকে নামতে পারছিলেন না। এরইমধ্যে পেরিয়ে গেছে ১০ মিনিট। যাত্রীদের রাগের পারদ তখন তুঙ্গে। তাদের অশ্লীল গালি থেকে তখন রেহাই পাননি গাড়ির কর্মচারি থেকে শুরু করে ট্রাফিক পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও। এরইমধ্যে কয়েক বেপরোয়া যাত্রী গাড়ির কাঁচ ভাঙ্গার সুর তোলেন। কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে কয়েকটি কাঁচ ভেঙ্গে ফেলা হলো। আতংক আর ভয়ে গাড়িতে থাকা নারী ও শিশুরা চিৎকার করে উঠলেন। তড়িঘড়ি বাস থেকে বের হতে গিয়ে আহত হলেন। কয়েক যাত্রী এর প্রতিবাদ করলেন। তাদের যুক্তি গাড়ির তো কোন দোষ নেই। সব দোষ পুলিশের। তারা চালক ও অপর দুই কর্মচারিকে নিয়ে গেছে। হয়তো ঘুষের টাকা নিয়ে দেন দরবার চলছে। চাহিদামতো টাকা পেলেই পুলিশ গাড়িটি ছেড়ে দেবে। ২০ মিনিট পার হলেও কারও দেখা নেই। শেষ পর্যন্ত গাড়ির কাঁচ ভাঙ্গার উৎসবে মাতেন ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। সামনে,পেছনের গ্লাসসহ গাড়ির দুপাশের প্রায় ১০টি গ্লাস ভেঙ্গে ফেলা হলো। বিষয়টির খোঁজ নিতে মহাখালির ট্রাফিক বক্সে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই এগিয়ে এলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট রমজান। তাকে পুরো ঘটনা বলার পর জানালেন, ভাই সরকারি চাকরি করি। গাড়িটি রিকুইজিশন করা হয়েছে। আমিই করেছি। যাত্রীদের ক্ষুব্ধ হওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত বলে জানান। বললেন, আমি সব জানি। ওই অবস্থায় যদি আমি ওখানে উপস্থিত থাকি তাহলে পাবলিক তো আমাকেও মারবে। তবে গাড়ির ক্ষতির বিষয়ে উদাসীন ওই ট্রাফিক সার্জেন্ট। এমনকি শতাধিক যাত্রীর হয়রানি নিয়েও। এ বিষয়ে ওয়ান লাইন পরিবহনের মালিক ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা পুলিশের নির্মম রিকুইজিশনের শিকার। আমার আরও দুটি গাড়ি তারা রিকুইজিশন করে রেখেছে। ভাংচুরের কারনে গাড়ির এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আ.লীগ ৬৫ বছরে অনেক কিছু অর্জন করেনি, হারিয়েছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ কার্যালয়ে স্বাগত জানান
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে। ছবি: বাসস
শাবাশ এএসপি বশির!!
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনের দিন সঠিক দায়িত্ব পালনের কারণে এএসপি বশিরউদ্দীন বাহবা পেয়েছেন। এই ব্যাপারে পাঠক শহীদুল ইসলাম লিখেছেন: গণতন্ত্রের কথা বলে এঁরা দেশে দানবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। বড় কষ্ট লাগে, তার পরও এঁরা গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছেন।
মারুফ: যে শামীম ওসমানের কথা ছাড়া নারায়ণগঞ্জে নাকি একটি গাছের পাতাও নড়ে না, সেই শামীম ওসমানকে মুখের ওপর যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা এভাবে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অবিচল থাকতে পারেন, তাঁকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।
সাইফ আল খান: এএসপি বশিরের সাহসিকতা প্রমাণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে দলীয় হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি থেকে সরকার বেরিয়ে আসছে...। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ।
হিমু: এএসপি বশিরের পায়ের ধুলার যোগ্য রাজনীতিবিদ আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোনোটাতেই নেই।
মুজতবা জব্বার: যে দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট ‘তারেক’ অথবা ‘জয়’ নির্ধারিত, সেই দেশে শামীম ওসমানেরাই তো নেতা হবেন। তাই হওয়া উচিত নয় কি? (ভণ্ড) নেতাদের সমালোচনা করার আগে, আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের সমালোচনাটা আগে করা!
এম এইচ রহমতুল্লাহ: বিচ্ছিন্নভাবে একজন সৎ কিংবা দায়িত্বসম্পন্ন হয়ে কিছুই করতে পারে না। দুর্নীতি আর অনিয়মের শিকড় এখানে অনেক গভীরে প্রোথিত। দুর্নীতিবাজ আর চরিত্রহীনরা এখানে সংঘবদ্ধ। নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, কয়েক বছরের মধ্যেই দেখবেন এই বশির অন্য বশির হয়ে গেছেন। এখনকার এই চমৎকার সদিচ্ছা আর দায়িত্ববোধকে তিনি নিজেই ‘অল্প বয়সের অর্বাচীনতা’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। অনেক দেখেছিরে ভাই, এখন আর সহজে আশান্বিত হই না।
নজরুল ইসলাম: স্বাধীনতার ৪৩ বছরে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। কোহিনুর, আকবর, হারুন, বিপ্লব, শিবলী নোমানসহ আরও অনেকে। এএসপি বশিরউদ্দীনও সংবাদ শিরোনাম হলেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ফেনীর জেলা প্রশাসক সোলায়মান চৌধুরীও শিরোনাম হয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার আগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তিও পত্রিকায় সংবাদ হয়েছিলেন বনশ্রীর ঘটনায়। পাঠক, মিলিয়ে দেখুন তো কাদের পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত?
ভারতের চোখে সুষমার ঢাকা সফর ‘চমৎকার সূচনা’
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে ভারতের নতুন সরকারের পক্ষ থেকে সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরকে ‘চমৎকার সূচনা’ হিসেবে দেখছে দিল্লি। এ ব্যাপারে পাঠক নীরব লিখেছেন: সেটাই হওয়া উচিত। ভারতের উচিত আমাদের সঙ্গে ভালো প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করা। আমাদেরও তা-ই। এতে দুই দেশেরই কল্যাণ হবে।
মাহবুব নুর: মনে হচ্ছে, আমরা এখনো ব্রিটিশ উপনিবেশ যুগে আছি!! রানি এসেছেন—দলে দলে দেখা করার হিড়িক
পড়ে গেছে!!
রুমি: গণতন্ত্রের এহেন হাহাকারের মাঝে, বুশ-তন্ত্রের আবির্ভাব দেখতে পাচ্ছি। আমার সঙ্গে (মিল) থাকলে তুমি ভালো, আমার বিপরীতে (গরমিল) গেলে তুমি খারাপ। আমাদের কী হবে? আওয়ামী লীগই পারে, আওয়ামী লীগই পারবে দলের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ লেখাটি প্রকাশ করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে পাঠক হোসেইন আহামেদ লিখেছেন: আওয়ামী লীগ ৬৫ বছরে অনেক কিছু অর্জন করেনি; বলেন, অনেক কিছু হারিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলার মানুষ এক হয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। কিন্তু আজ আপনাদের ডাকে কিছু ভাড়া করা মানুষ ছাড়া আর কেউ আসবে না। এটাই আপনাদের অর্জন।
আলী হায়দার: আ.লীগই পারে এবং আ.লীগই পারবে। আর সেখানেই বাংলার মানুষের ভয়। কী পারবে, কী পেরেছে আর কী পারছে—তা দেশের মানুষ দেখছে। দেশের মানুষ এখন যারপরনাই শঙ্কিত ভবিষ্যতে আ.লীগ আর কী কী উপহার দেবে সেই ভাবনায়।
মারুফ সাদি: মানুষের জীবনে যেমন সাফল্য-ব্যর্থতা থাকে দল হিসেবে আ.লীগেরও সাফল্য-ব্যর্থতা আছে। আশা করি, আগামী দিনগুলোতে আ.লীগ আরও বেশি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিকশিত হবে।
সাইফুল আলম: আ.লীগ পারে তা ঠিক। তবে ইদানীং যা পারছে বা করছে, তা দেখে দেশ ও দেশের মানুষ অবাক। গুম-খুন আর দুর্নীতি নিয়ে যা হচ্ছে, তা এই দলটাকে ডোবাবে একদম পুরোপুরি।
খাদ্যে ক্ষতিকর মাত্রায় ফরমালিন মেলেনি
সাতটি সরকারি সংস্থা বলছে, বাজার থেকে আমসহ বিভিন্ন ফল ও খাদ্যসামগ্রী কিনে তা পরীক্ষা করে তাতে ক্ষতিকারক মাত্রায় ফরমালিন পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে পাঠক হালিম শাহ: যাঁরা পরীক্ষা করে ফরমালিন পাননি বলে ঘোষণা করেছেন, তাঁদের বাচ্চাদের ও তাঁদের নিয়মিত সাধারণ বাজার থেকে ফল কিনে খাওয়ানো হোক। দেশে অন্যান্য শিল্পে যা দরকার, তার তিন গুণ ফরমালিন আমদানি হচ্ছে বলে পত্রিকায় এসেছে। এগুলো খাদ্যে মেশানো না হলে ফল কেন সহজে পচে না—তার একটা ব্যাখ্যা নিশ্চয় এই লোকগুলো দিতে পারবেন।
সুকান্ত: মানুষের লোভ এত বেড়ে গেছে যে, তারা এত দিন যাদের সুখের জন্য দুর্নীতি করত; এখন তাদেরই অসুস্থ বানিয়ে মৃত্যু কামনা করতেও দ্বিধা করছে না!
আউয়ুব: যদি ঘটনা সত্যি হয়, তবে এখানেও একটা ফাঁকি থাকতে পারে। কারণ অসৎ ব্যবসায়ীরা শয়তানের বন্ধু। আর শয়তান সব ধরনের অভিনয়ই করতে পারে। সুতরাং সাম্প্রতিক সাঁড়াশি অভিযানের ফলে এমনও হতে পারে যে, তারা তাদের কার্যক্রম আপাতত শিথিল করেছে! আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ধন্যবাদ, তবে দীর্ঘমেয়াদি তৎপরতা চালাতে হবে আরও জোরালোভাবে, সেই অনুরোধ রাখছি।
রেদওয়ান: কিছুদিন আগেও পত্রিকায় দেখেছি, ফলমূলে অতিরিক্ত পরিমাণে ফরমালিন রয়েছে, যা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আর এখন নতুন করে শোনা যাচ্ছে ফরমালিন কম, নাকি সরকারকে ম্যানেজ করে ফেলেছে তারা। সব কেমন যেন ঘোলা হয়ে যাচ্ছে।...খোলাসা করে বলবেন কি?
সুমিত্রা কুমার পাল: আগামীকাল হয়তো শুনব কোনো ফলেই কোনোকালে ফরমালিন ছিল না। সবই মিডিয়ার প্রপাগান্ডা।
নাসের আহমেদ: খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য যেকোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পাঁচ মিনিট দাঁড়ালেই বুঝতে পারবেন। এত বেশি মানুষ অসুস্থ হচ্ছে কি এমনি এমনি?

রোজার ঐতিহাসিক পটভূমি

সিয়াম সাধনার মাস
প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত নবী-রাসুলগণ সবাই রোজা পালন করেছেন। রোজা শুধু নবী করিম (সা.)-এর প্রতি ফরজ করা হয়নি, পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের প্রতিও ফরজ করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পারো।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩) হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত নূহ (আ.) পর্যন্ত চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ ‘আইয়ামে বিজ’-এর রোজা ফরজ ছিল। আল্লাহ তাআলা হজরত আদম (আ.)-এর কাছে ঐশীবাণী পাঠালেন, ‘তুমি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখো।’ হজরত আদম (আ.)
এ তিনটি রোজা রাখায় তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হলো। এ জন্য এই তিন দিনকে আইয়ামে বিজ বলা হয়ে থাকে। (গুনিয়াতুত ত্বালেবীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩০৭) বেহেশতে হজরত আদম (আ.) যখন নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং তওবা করেছিলেন, তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তাঁর তওবা কবুল হয়নি। ৩০ দিন পর তাঁর তওবা কবুল হয়। এরপর তাঁর সন্তানদের ওপরে ৩০টি রোজা ফরজ করে দেওয়া হয়। (ফাতহুল বারী, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ১০২-১০৩) হজরত নূহ (আ.)-কে ‘দ্বিতীয় আদম’ বলা হয়। তাঁর যুগেও সিয়াম পালন করা হয়েছিল। তাফসিরে ইবনে কাসিরে বর্ণিত আছে, হজরত নূহ (আ.)-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোজা পালনের বিধান ছিল। তাফসিরবিদ হজরত কাতাদা (র.) বলেন, মাসে তিন দিন রোজা রাখার বিধান হজরত নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে শুরু করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ পর্যন্ত বলবৎ ছিল। মুসলিম মিল্লাতের পিতা সহিফাপ্রাপ্ত নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর যুগেও সিয়াম পালন করা হয়েছিল। আসমানি কিতাব তাওরাতপ্রাপ্ত প্রসিদ্ধ নবী হজরত মূসা (আ.)-এর যুগেও রোজার বিধান ছিল। ইহুদিদের ওপর প্রতি শনিবার বছরের মধ্যে মহররমের ১০ তারিখে আশুরার দিন এবং অন্যান্য সময় রোজা ফরজ ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা অবস্থায় পেলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ তোমরা কিসের রোজা করছ?’
তারা বলল, ‘এটা সেই মহান দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা হজরত মূসা (আ.) ও তাঁর কাওম (বনি ইসরাঈল)-কে মুক্ত করেছিলেন এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ হজরত মূসা (আ.) ওই দিন রোজা রেখেছিলেন, তাই আমরা আজ রোজা করছি।’ এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি তোমাদের অপেক্ষা হজরত মূসা (আ.)-এর অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি এদিন সাওম পালন করেন এবং সবাইকে রোজা রাখার নির্দেশ দেন।’ (বুখারি ও মুসলিম) হজরত মূসা (আ.) তুর পাহাড়ে আল্লাহর কাছ থেকে তাওরাতপ্রাপ্তির আগে ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করেছিলেন। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে বর্ণিত আছে, হজরত মূসা (আ.) তুর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার না করে ধ্যানে কাটিয়েছিলেন। তাই ইহুদিরা সাধারণভাবে হজরত মূসা (আ.)-এর অনুসরণে ৪০টি রোজা রাখা ভালো মনে করত। তার মধ্যে ৪০তম দিনটিতে তাদের ওপর রোজা রাখা ফরজ ছিল, যা ইহুদিদের সপ্তম মাস তিসরিনের দশম তারিখে পড়ত। এ জন্য ওই দিনটিকে আশুরা বা দশম দিন বলা হয়। এ আশুরার দিনে হজরত মূসা (আ.) তাওরাতের ১০টি বিধান পেয়েছিলেন। এ কারণেই তাওরাতে ওই দিনের রোজার জন্য তাগিদ এসেছে। এ ছাড়া ইহুদি সহিফাতে অন্যান্য রোজারও সুস্পষ্ট হুকুম রয়েছে। আসমানি কিতাব জাবুরপ্রাপ্ত বিখ্যাত নবী হজরত দাউদ (আ.)-এর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হজরত দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি এক দিন রোজা রাখতেন এবং এক দিন বিনা রোজায় থাকতেন।’ (বুখারি ও মুসলিম) অর্থাৎ হজরত দাউদ (আ.) অর্ধেক বছর রোজা রাখতেন এবং অর্ধেক বছর বিনা রোজা থাকতেন। আসমানি কিতাব ইঞ্জিলপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নবী হজরত ঈসা (আ.)-এর যুগে রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারী সম্প্রদায় রোজা রাখত।
হজরত ঈসা (আ.) তাঁর ধর্ম প্রচার শুরুতে ইঞ্জিল পাওয়ার আগে জঙ্গলে ৪০ দিন সিয়াম সাধনা করেছিলেন। একদা হজরত ঈসা (আ.)-কে তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞাসা করেন যে ‘আমরা অপবিত্র আত্মাকে কী করে বের করব?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘তা দোয়া ও রোজা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বের হতে পারে না।’ (মথি ৭-৬৬, সীরাতুন নবী, পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ২৮৭-২৮৮) খ্রিষ্টানদের জন্য রোজা পালনের বিধান ছিল। পবিত্র বাইবেলে রোজাব্রত পালনের মাধ্যমেই আত্মশুদ্ধি ও কঠোর সংযম সাধনার সন্ধান পাওয়া যায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের আগে আরবের মুশরিকদের মধ্যেও সিয়ামের প্রচলন ছিল। যেমন আশুরার দিনে কুরাইশরা রোজা রাখত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রাক-ইসলামি যুগে এই রোজা রাখতেন। যখন তিনি মদিনায় আগমন করেন, তখন এই রোজা নিজে রাখেন এবং সাহাবায়ে কিরামকে রোজা রাখার হুকুম দেন। পরিশেষে মাহে রমজানের সিয়াম যখন ফরজ হয়, তখন তিনি আশুরার রোজা ছেড়ে দেন। (বুখারি ও মুসলিম) হজরত কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) আমাদের আইয়ামে বিজের রোজা রাখার হুকুম দিতেন, আর আইয়ামে বিজের দিনগুলো হচ্ছে চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। (আবু দাউদ) রাসুলুল্লাহ (সা.) গৃহে অবস্থানকালে বা ভ্রমণরত অবস্থায় কখনো আইয়ামে বিজের রোজা ছাড়তেন না। (নাসাঈ) ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। পরে দ্বিতীয় হিজরি সালে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর মাহে রমজানের রোজা ফরজ হলে তা রহিত ও ঐচ্ছিক হয়ে যায়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

মোদির প্রথম ‘অশুভ’ হস্তক্ষেপ

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভবন
ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি দেশটির সাবেক সলিসিটর জেনারেল গোপাল সুব্রামনিয়ামকে (এরপর জিএস) বিচারক নিয়োগে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অস্বচ্ছতার সঙ্গে অগ্রাহ্য করা এবং সেই বাছাই-প্রক্রিয়ার বিষয়ে খোদ সুপ্রিম কোর্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো মুখপাত্রের আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ না খোলার নীতি কার্যত একটি ঔপনিবেশিক ব্যাধি। আমাদের কাছে এই ঘটনা মোদির উজ্জ্বল বিজয়ের পর প্রথম মালিন্য, তাঁর সরকারের প্রথম বিতর্কিত পদক্ষেপ। জুলিয়াস সিজারের অনেকগুলো মুখ, ওঁর নির্দয় রূপ দেখানো কি তাহলে মোদি শুরু করে দিলেন? বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর মোদি সরকারের এই প্রথম হস্তক্ষেপ কংগ্রেস ‘অশুভ লক্ষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা বলেছে, বিজেপি ‘কমিটেড জুডিশিয়ারি’ চায়। এই ‘দায়বদ্ধ বিচারালয়’ অবশ্য দক্ষিণ এশীয় আরও অনেক শাসকের অত্যন্ত পছন্দনীয়। মোদি তাঁর সরকার গঠনের মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সুপ্রিম কোর্টকে ক্রুশবিদ্ধ করতে উদ্যত হলেন। এই ঘটনা আমাদের অবশ্য ১৯৭৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ইন্দিরা সরকারের রূঢ় হস্তক্ষেপকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। নির্বাচিতের আকাশচুম্বী গৌরব নিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার কর্তন করে যেমন খুশি সংবিধান সংশোধন করে চলছিলেন ইন্দিরা। নির্বাচনী দুর্নীতি বা নির্বাচনী তামাশা করা সত্ত্বেও কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে ইন্দিরার আনা সংবিধানের ৩৯তম সংশোধনী কেশাবানন্দ ভারতী মামলার রায়ে (এর ওপর ভর করে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছে) নাকচ হয়েছিল। এ নিয়ে ভারত বহুকাল বিভক্ত ছিল। ৪০ বছর পরে এসে দ্য হিন্দু তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলল, ‘ওই রায় ভারতের গণতন্ত্রকে বাঁচিয়েছে।’ আজ এটা স্মরণ করছি এ কারণে যে, কোনো বৈরী আইনবিদের ওপর ইন্দিরা যেভাবে শোধ নিয়েছিলেন, মোদি যেন একইভাবে শোধ নিলেন বলে প্রতীয়মান হলো।
কিংবা সংগত সন্দেহের জন্ম হলো। কেশাবানন্দ ভারতী মামলার তিন নন্দিত বিচারককে ডিঙিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি (এরপর প্রবি) হিসেবে এম এন রায়কে তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন। ‘কৃতজ্ঞ বিচারকেরা’ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য কতটা বিস্ফোরক হতে পারেন, তারও মন্দ নজির রেখে গেছেন মি. রায়। পঁচাত্তরের জরুরি অবস্থায় আট বিচারক অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেলেন। আর মি. রায় কেশাবানন্দকে উল্টে দিতে ১৩ সদস্যের বেঞ্চ করে শুনানি শুরু করে দিলেন। তবে তিনি লজ্জায় দ্রুত অধোবদন হলেন যখন বিখ্যাত আইনজীবী ননিভাই পাল্কিওয়ালা দেখালেন যে, কেউ তো কেশাবানন্দ রায়ের রিভিউর জন্য দরখাস্তই করেননি! প্রবি নেতৃত্বাধীন চার জ্যেষ্ঠ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত একটি কলিজিয়াম ভারতে বিচারক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। যদিও এটা তাঁদের সংবিধানে নেই। নির্বাহী বিভাগের প্রশংসনীয় সম্মতিতে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়ে দেড় দশকের বেশি সময় আগে একটি গাইডলাইন তৈরি করেছেন। সেমতে সুপ্রিম কোর্ট কলিজিয়াম সর্বসম্মতিক্রমে জিএসসহ তিনজনের তালিকা পাঠান সরকারের কাছে। নিয়ম হলো সরকার কারও বিষয়ে সম্মত হতে না পারলে তার কারণ উল্লেখপূর্বক তা পুনরায় বিবেচনার জন্য সুপ্রিম কোর্টে পাঠাবে। সুপ্রিম কোর্ট তখন তার সঙ্গে একমত হতে পারেন। না হতে পারলে তারও কারণ দর্শিয়ে দ্বিতীয়বার তার নাম পাঠাবেন। আর দ্বিতীয়বার পাঠালে সরকারকে সেটাই মানতে হবে। আমাদের মাসদার হোসেন মামলায় অধস্তন আদালতের বিচারক-বদলিতে শুধু প্রবির মতামতের প্রাধান্য এবং ১০ বিচারকের মামলায় সম্ভাব্য বিচারপতির ‘আইনি ধীশক্তি’র বিষয়ে প্রবির মতামত আর ‘পূর্ব বৃত্তান্তের’ ক্ষেত্রে সরকারকে মতামত দেওয়ার কথা বলা আছে।
দুঃখজনক হলেও উভয় বিবেচনায় সরকারের মতামতেরই প্রাধান্য নিশ্চিত করেছেন আমাদের আপিল বিভাগ। তাঁরা অবশ্য ‘স্বচ্ছতা’ বাধ্যতামূলক করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তা অস্বচ্ছতায় ঘটছে। ভারত এদিক থেকে অনেক অগ্রসর অবস্থায় আছে। জিএস নিজে সেধে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হতে চাননি; বরং সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি যখন মোদি সরকারের নেতিবাচক মনোভাব জানতে পারলেন, তখন তিনি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে নিজকে প্রত্যাহার করে নিলেন। প্রধান বিচারপতিকে লেখা এক চিঠিতে তিনি যথার্থই অনুযোগ করেছেন যে, সরকারের উচিত ছিল তাঁর বিষয়ে কেন আপত্তি, সেটা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের কাছে পুনরায় তিনজনের তালিকা প্রেরণ করা। কারণ, তিনটি শূন্য পদের বিপরীতে তিনজনের নামই পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সরকার তাঁর নামটি তিনজনের তালিকা থেকে ‘সেগরিগেট’ বা আলাদা করে দুজনের নাম পাঠিয়েছে। এই পর্যায়ে ক্ষুব্ধ জিএস প্রবিকে চিঠি লিখলেন। আমরা এটা দেখে বিস্মিত যে, ভারতীয় মিডিয়া অজ্ঞাতনামা সরকারি সূত্রের বরাতে স্বনামধন্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জিএস, যিনি গুজরাটের দাঙ্গায় মোদি ও বিজেপির বিতর্কিত ভূমিকা এবং বহুল আলোচিত ‘ভুয়া সোহরাবউদ্দিন বন্দুকযুদ্ধ’ মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে মোদি-বন্ধু অমিত শাহকে গ্রেপ্তার এবং গুজরাটে না ঢোকার শর্তে তাঁর জামিন মঞ্জুর করাতে আদালতকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এখন ‘সূত্রমতে’ ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) কাহিনি প্রকাশ করে চলেছে। কিন্তু তাঁরা সর্বাত্মক দাবি তুলছেন না যে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বিচারক নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পর্ব জনগণের কাছে খোলামেলা হতে হবে। জিএসের অযোগ্যতার বিষয়ে এখনো পর্যন্ত অজ্ঞাতনামা পলায়নপর সরকারি সূত্রগুলো কোনো গ্রহণযোগ্য অকাট্য অভিযোগ দাঁড় করাতে পারেনি।
মোদি এবং বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের ওই বন্ধুটি গুজরাট বিজেপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিজেপির অভাবনীয় নির্বাচনী বিজয়ের অন্যতম সার্থক কুশীলব (মোদি–বন্ধুরা তাঁকে বলেন ভারতের নয়া চাণক্য) হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। জিএস নিয়োগ বিরোধে আইনমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেও সরকারি মহল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লোকসভায় এ বিষয়ে কংগ্রেসকে মোকাবিলা করতে যথেষ্ট মসলাপাতি তাদের হাতে আছে। কিন্তু নিয়োগপর্ব শেষ হওয়ার পরে এই কোমর বেঁধে ঝগড়ায় নামার কোনো অর্থ হয় না। সরকারের ঝুলিতে কী আছে? বলা হচ্ছে, তাদের কাছে জিএস এর কথিত অসদাচরণসংক্রান্ত একটি টেপ রয়েছে, যা ‘রাদিয়া টেপ’ নামে পরিচিত। সরকারের দাবি, তারা জিএসের পেশাগত সামর্থ্য নয়, উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অথচ ওই রাদিয়া টেপে কী রয়েছে, তা সুপ্রিম কোর্টের অজানা নয়। কারণ, তারাই সিবিআইকে দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করিয়েছিলেন৷ হিন্দুস্তান টাইমস ২৬ জুন লিখেছে, জিএসের ফাইল সরকার আটকে দিয়েছে। কারণ, আইবি ও সিবিআই উভয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিকূল রিপোর্ট করেছে। তাতে তারা বলেছে, টুজি মামলায় সাবেক সলিসিটর জেনারেল (২০০৯-১১) জিএস তৎকালীন টেলিকমমন্ত্রী রাজার আইনজীবী ও সিবিআই কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। আর একটি বিলাসবহুল হোটেলের সুইমিংপুল মুফতে ব্যবহারে করপোরেট লবিস্ট নিরা রাদিয়া ও অন্যদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের টেপ রয়েছে।
মি. জিএস ওই বৈঠক এবং রাদিয়ার আনুকূল্য গ্রহণের অভিযোগ অসত্য বলে নাকচ করে দিয়েছেন। বলেছেন, সুইমিংপুল ব্যবহারে হোটেলের একজন স্টাফ তাঁকে ফোন করেছিল। কিন্তু সে সুযোগ তিনি নেননি। তা ছাড়া, মোদি সরকারের সূত্র পত্রিকার সাংবাদিকদের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য বিলি করছে যে, জিএসের নথি আটকে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের বিধানের ব্যত্যয় করেননি। তাঁরা তাঁদের গোপন থলে থেকে অতীতের নজির টেনে বের করেছেন। এই স্টাইল বাংলাদেশি রাজনীতিকদের স্টাইলের সঙ্গে খাপ খেয়েছে। কোনো ভুল বা মন্দ কাজের সমালোচনা করা হলে তাঁরা অতীতের নজির হাজির করে বর্তমানকে জায়েজ করে। এখানেও তারা বলছে যে, আইবির রিপোর্টের ভিত্তিতে এর আগেও অন্তত চারটি ক্ষেত্রে এভাবে সেগরিগেট বা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ঘটে থাকলেও সেটা আইনসম্মত হয়নি। তাতে সুপ্রিম কোর্ট কলিজিয়ামের মর্যাদা বাড়েনি। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের মোদির দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানানোকে বিজেপি নেতারা সংগত কারণেই ভারতীয় ‘গণতন্ত্রের শক্তির’ দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় দৃশ্যত অন্যায্য যুক্তি ও অগ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে তারা নিজেদের অগণতান্ত্রিক এবং কর্তৃত্বপরায়ণ নির্বাহী বিভাগের স্তরে নামিয়ে এনেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে চূড়ান্ত নিয়োগের আগে প্রকাশ্যে শুনানি হয়, সেটাই দক্ষিণ এশিয়াকে গ্রহণ করতে হবে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে এটা করেছে। ভারত সে পথে গেলে তার প্রতিবেশীদের সে পথে গমন করা সহজতর হতে পারে।
ভারতের প্রথম প্রধান বিচারপতি কানিয়া রাজনৈতিক বিবেচনা ব্যতিরেকে কেবলই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের অঙ্গীকার করেছিলেন। মোদি সরকার তার প্রতি সম্মান দেখাল না। এমনকি ভারতের, উপমহাদেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ারও জিএসকে না হারাতে সরকারের প্রতি গত ২৩ জুন আবেদন করেছিলেন। সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। তবে গোপাল সুব্রামনিয়াম কেবল সরকারের বিরুদ্ধেই নয়, তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট তার পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলো। অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট দ্বিতীয়বার তাঁর নাম পাঠানোর সুযোগ পাননি। এর আগেই অভিমান করে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এই পুরো অবস্থাটি নির্দেশ করে যে, জনগণের চোখের আড়ালে বিচারক বাছাইয়ের কলিজিয়াম রীতি রক্ষাকবচ নয়। কংগ্রেস বিল এনেও পাস করাতে পারেনি। ভারতের দুই সাবেক প্রধান বিচারপতি—মি. বালকৃষ্ণানান, যিনি বর্তমানে ভারতের মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, তাঁর সঙ্গে অনেক আগে দিল্লিতে এবং সম্প্রতি বিচারপতি আলতামাস কবীরের সঙ্গে ঢাকায় বিচারক নিয়োগের কলিজিয়াম রীতি নিয়ে আমি কথা বলি। তাঁরা উভয়ে বর্তমান রীতি বহাল রাখার পক্ষে। উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টানতে বিচারপতি কবীর বললেন, ‘না, কিছুতেই মানছি না। ভারতই ভারতের দৃষ্টান্ত।’ তবে তাদের সংবেদনশীলতা বজায় রেখেও বাছাই-প্রক্রিয়ায় অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। এখানে নতুন আইন করা মোদি সরকারের জন্য সত্যিকারের একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

যে হত্যাকাণ্ড বদলে দেয় বিশ্ব মানচিত্র

সারায়েভোতে খুন হওয়ার আগের দিন ১৯১৪ সালের
২৭ জুন ট্রেন থেকে নামছেন ফার্ডিনান্ড। এএফপি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উসকে দেওয়া আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ১০০ বছর পূর্তি ছিল গতকাল শনিবার৷ ১৯১৪ সালের এই দিনে বসনিয়ার সারায়েভো শহরে ঘটেছিল সেই হত্যাকাণ্ড৷ এর জের ধরে ইউরোপে যে রক্তপাত শুরু হয়, তা পুরো বিশ্বের মানচিত্রই বদলে দিয়েছিল৷ খবর এএফপির৷  ১৯১৪ সালের ২৮ জুন সারায়েভোর রাস্তায় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় আর্চডিউক ফ্রানজ ফার্ডিনান্ড ও তাঁর স্ত্রী সোফিকে গুলি করে হত্যা করেছিল একজন বসনীয় সার্ব৷ ওই হত্যাকাণ্ডের পর ইউরোপের দেশগুলো পরবর্তী চার বছর নজিরবিহীন সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বের নিয়তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ওই দিনটি নিয়ে আজও বলকান অঞ্চলের মানুষ গভীরভাবে দ্বিধাবিভক্ত৷ তাই এবারও দিনটির স্মরণে আলাদা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়৷ বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চলমান সম্মেলনের পাশাপাশি ওই হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষ পূর্তি পালন করেন ইউরোপের অনেক নেতা৷ বেলজিয়ামের ইপ্রেস নামক স্থানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়৷ সেখানেই ১৯১৫ সালে প্রথমবার রাসায়নিক গ্যাস মাস্টার্ড ব্যবহার করেছিল জার্মান বাহিনী৷ তবে বিভাজনের স্পষ্ট নিদর্শন দেখা গেল বসনিয়ার সারায়েভোতে। সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানই যাননি৷ বসনিয়ান সার্ব ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিক স্লোবোদান সোজা বলেন, ‘সবাইকে (সার্ব, মুসলিম ও ক্রোট) ২৮ জুন সারায়েভোতে একত্র করা আসলেই অসম্ভব একটা ব্যাপার৷’ চলমান বিভাজনের মূলে বিশেষ করে রয়েছেন ফার্ডিনান্ড হত্যাকাণ্ডের হোতা সার্ব জাতীয়তাবাদী গাভরিলো প্রিন্সিপ৷ আজকের সারায়েভোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজ প্রিন্সিপকে সন্ত্রাসী মনে করে৷ অন্যদিকে সার্বরা প্রিন্সিপকে মনে করে নায়ক৷

ইরাকে মালিকির দিন শেষ?

নুরি আল–মালিকি
ইরাকে শিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা আয়াতুল্লাহ আলী-সিস্তানি চার দিনের মধ্যে দেশে একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে গত শুক্রবার রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জািনয়েছেন। রাজনীতিতে তাঁর এই নাটকীয় হস্তক্ষেপের কারণে প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির আট বছরের শাসনাবসান ঘটতে পারে। আগামী মঙ্গলবার ইরাকের নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন বসছে। এর আগেই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রেসিডেন্ট বাছাইয়ের ব্যাপারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একমত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সিস্তানি। চলমান পরিস্থিতিতে তাঁর এই হস্তক্ষেপের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে মালিকির বহাল থাকার বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়েছে। গত এপ্রিলে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ওই পদে দায়িত্ব পালন করছেন মালিকি। নির্বাচনে তাঁর দল জয়ী হলেও সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন পায়নি। ফলে তঁাকে এখন একটি জোট সরকার গড়তে হবে অথবা ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট স্টেট অব ল এবং শিয়া সম্প্রদায়ের একটি অংশ ইতিমধ্যে একটি বৈঠক করলেও কাউকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করার ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এদিকে, আইএসআইএল জঙ্গিদের দমনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ ইরাকে সব দল ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের িভত্তিতে একটি সরকার যত শিগগির সম্ভব গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী মালিকি সহিংসতায় উসকানির অভিযোগ এনে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের দায়ী করছেন। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, বিরোধীরা নির্বাচন স্থগিত করার চেষ্টা করেছিল।
এখন তারা পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন স্থগিত করার চেষ্টা করছে। ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (আইএসআইএল) জঙ্গিরা গত দুই সপ্তাহে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সুন্নি অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি এলাকা দখল করে নিয়েছে। সেখানে সরকারি বাহিনী খুব সামান্যই প্রতিরোধ করতে পেরেছে। আর ওই জঙ্গিদের পরাজিত করতে সেনাবাহিনীকে সহায়তার জন্য সিস্তানির আগের আহ্বানে শিয়া সম্প্রদায়ের হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী সাড়া দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে প্রশিক্ষণ নেন। ইরাকের সাবেক নেতা প্রয়াত সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর প্রণীত শাসনব্যবস্থায় ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর পদটি সব সময়ই একজন শিয়া ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত। আর প্রেসিডেন্টের আলংকারিক পদটি একজন কুর্দি এবং স্পিকারের পদটি একজন সুন্নি মুসলমানের জন্য নির্ধারিত। ২০১০ সালের নির্বাচনের পর একটি জোট সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রী মালিকি প্রায় ১০ মাস সময় নিয়েছিলেন। সিস্তানির প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন সরকারে ইরাকের প্রধান তিনটি জাতিগোষ্ঠীর প্রাধান্য থাকতে হবে। মািলকির নেতৃত্বাধীন শিয়া সম্প্রদায়ের জোট গত এপ্রিলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে জয়ী হয়েছিল। তিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় আল-কায়েদা থেকে বিচ্যুত জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএলের উত্থান। তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতে চান বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু সুন্নিদের অভিযোগ, তাদের ক্ষমতার বাইরে রেখে দমন-পীড়নের মুখে রাখতে চাইছেন মালিকি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পশ্চিমা একজন কূটনীতিক বলেন, মালিকির দিন ফুরিয়ে এসেছে। তাঁর জোট থেকে সম্ভবত তারেক নাজেম বা বাইরে থেকে অন্য কেউ এবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে মালিকি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন না, এটা নিশ্চিত। কারণ, তিিন দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মালিকির রাজনৈতিক মিত্ররাও মনে করছেন, সিস্তানির আহ্বানে হয়তো এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী মালিকির বিদায় হচ্ছে না। তবে বিষয়টি নিয়ে তৎপর হতে সব রাজনৈতিক দলের ওপর এটি প্রভাব ফেরবে। কুর্দিরা এখনো প্রেসিডেন্ট পদে নিজেদের প্রার্থী নির্ধারণ করেনি আর সুন্নিরাও স্পিকার পদপ্রার্থী নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। এদিকে, আইএসআইএলের জঙ্গিদের বেপরোয়া মানুষ হত্যায় আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তাদের নৃশংসতার ছবি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আমিও লোকসভায় নতুন শিখতে হবে আমাকেও

নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘আমি প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছি...আমিও লোকসভার একজন নতুন সদস্য। জ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে আমাকে অনেক কিছু শিখতে হবে।’ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) থেকে প্রথমবার নির্বাচিত লোকসভার সদস্যদের জন্য আয়োজিত এক কর্মশালায় গতকাল শনিবার বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি এ কথা বলেন। দিল্লি ও হরিয়ানার মধ্যবর্তী সুরযকুণ্ডের একটি হোটেলে ওই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। খবর এনডিটিভির। ৬৩ বছর বয়সী মোদি এবারই প্রথম লোকসভার সদস্য পদে উত্তর প্রদেশের বারানসি এবং গুজরাটের ভাদোদরা আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি কোনো সাহায্যের প্রয়োজনে তাঁর অথবা দলীয় সভাপতি রাজনাথ সিংয়ের কাছে যাওয়ার জন্য দলের ১৬১ জন নতুন সদস্যের প্রতি আহ্বান জানান। যেকোনো ধরনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে মোদি বলেন, সদস্যদের পার্লামেন্টে বিতর্কের জন্য ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে।
তাঁরা কেন্দ্রকে যেমন প্রায় কংগ্রেসমুক্ত করেছেন, বিধানসভা নির্বাচনেও একই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হবে, তা যেখানেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন। দুই দিনের ওই কর্মশালা প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্য দিয়ে শুরু হয়। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রমুখ লোকসভার নতুন সদস্যদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন। সমাপনী বক্তব্য দেবেন দলটির প্রবীণ নেতা ৮৬ বছর বয়সী লালকৃষ্ণ আদভানি। আজ রোববার বিকেলে কর্মশালা শেষ হবে।