Thursday, January 15, 2015

সরকার সন্ত্রাসীদের দিয়ে হামলা চালাচ্ছে -ড্যাব প্রতিনিধিদলকে খালেদা জিয়া

গুলশানে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সরকার সন্ত্রাসীদের দিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপর হামলা করছে। এতে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি এ কে এম আজিজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে যায়। রাত আটটার দিকে তাঁরা বের হয়ে আসেন। এরপর খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ড্যাবের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এস এম রফিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি জানান, তাঁকে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেছেন। রফিকুল ইসলাম জানান, খালেদা জিয়া আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার কথা বলেছেন। খালেদা জিয়া আরও বলেন, এই আন্দোলনের লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া নয়, দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার রক্ষা এবং উন্নয়নের রাজনীতি নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকবে। বিএনপির চেয়ারপারসন ড্যাব প্রতিনিধিদলকে তাঁদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে ব্যাপারগুলো বুঝাতে বলেছেন। পেপার স্প্রের কারণে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার যে অবনতি হয়েছিল, সে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তিনি এখন সুস্থ আছেন বলেও জানায় ড্যাব প্রতিনিধিদল। ৩ জানুয়ারি থেকে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ‘অবরুদ্ধ’ অবস্থায় আছেন বিএনপির চেয়ারপারসন। তবে প্রথম দিকে তিনি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও এখন আর করছেন না। আজও ওই কার্যালয়ের দুপাশে পুলিশ অবস্থান নিয়ে আছে। কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর দুপাশের রাস্তায় আগের মতোই পিকআপ ভ্যান, জলকামান রাখা আছে।
শুলশানে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে কূটনীতিকরা
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের গুলশানের বাসায় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন কয়েকটি দেশের কূটনৈতিকরা। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন এর রাষ্ট্রদূত ছাড়াও আছেন কানাডার পলিটিক্যাল কনসালটেন্ট। ড. আব্দুল মঈন খান ছাড়া বিএনপির পক্ষে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং স্ব-নির্ভর বিষয়ক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।

শার্লি এব্দোতে বাংলাদেশ নিয়ে কার্টুন

ফরাসী ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী শার্লি এব্দো অফিসে বন্দুকধারীদের হামলায় ১২ জন নিহত হবার পর তারা প্রথম যে সংখ্যাটি বের করেছে - তাতে বাংলাদেশকে নিয়েও একটি কার্টুন আছে। নবী মোহাম্মদ (স.) একটি কার্টুন দিয়ে প্রচ্ছদ করা এই সংখ্যাটি ছাপা হয়েছে ৫০ লক্ষ কপি। বাংলাদেশকে নিয়ে করা কার্টুনটিতে বাংলাদেশের রফতানীমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়। এতে দেখা যাচ্ছে একটি পোশাকের কারখানায় খালি গায়ে এবং ছেঁড়া প্যান্ট পরা কয়েকজন লোক টি-শার্ট সেলাই করছে। সেই টি-শার্টের ওপর ফরাসী ভাষায় লেখা ‘Je Suis Charlie’ অর্থাৎ ‘আমিই শার্লি’ - যা ৭ই জানুয়ারির ওই আক্রমণের পর পত্রিকাটির সাথে সংহতি প্রকাশের একটি জনপ্রিয় শ্লেগান হিসেবে সারা দুনিয়ায় রাতারাতি পরিচিতি হয়ে ওঠে। কার্টুনে শিরোনামে বলা হচ্ছে Pendant ce temps, au Bangladesh- যার অর্থ অনেকটা ‘অন্যদিকে দেখুন বাংলাদেশে কি হচ্ছে..’ দৃশ্যত বোঝানো হচ্ছে যে শার্লি এবদোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশের হিড়িকে ওই শ্লোগানওয়ালা টি-শার্টের বিক্রি বেড়েছে, এবং তাতে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো ভালোই ব্যবসা করে নিচ্ছে। আর তাই, টি-শার্ট সেলাই করতে ব্যস্ত সহাস্য লোকদের একজন বলছে ‘De tout coeur avec vous’  অর্থাৎ ‘আমরা সর্বান্ত:করণে আপনাদের সঙ্গে আছি’। দুই আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসী নাগরিকের চালানো ওই হামলায় পত্রিকাটির সম্পাদক ও কয়েকজন কার্টুনিস্টকে হত্যা করা হয়। আক্রমণকারীরা দাবি করে যে পত্রিকাটিতে নবী মোহাম্মদ (স.) একটি কার্টুন ছাপানোর প্রতিশোধ নিতেই তারা ওই হামলা করে। প্যারিসে একই সময় আরও দুটি আক্রমণে একজন মহিলা পুলিশ এবং একটি ইহুদি দোকানে কোনাকাটা করতে আসা চারজন লোক নিহত হয়। পরে পুলিশের অভিযানে সবগুলো ঘটনার আক্রমণকারীরাই নিহত হয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

খালেদা জিয়া ১২ দিন ধরে অবরুদ্ধ

গুলশানের নিজ কার্যালয়ে ১২ দিনের মতো অবরুদ্ধ রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বুধবারও সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের মূল ফটকের এক পাশে রাখা আছে পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যান ও অন্য পাশে একটি জল-কামান। গেটের সামনে দুই স্তরে রয়েছে পুলিশি নিরাপত্তা। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে ৮৬ নম্বর সড়ক দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১২টায় মহিলা দলের সহ-সভাপতি ডা. নূরজাহান মাহবুবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রান্না করা খাবার নিয়ে দেখা করতে আসেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। এ সময় অন্যদের মধ্যে ছিলেন- মহিলা দলের নেত্রী মনি বেগম, শামসুন নাহার, সাজেদা আলী হেলেন, শিরীন জাহান এবং রোকেয়া সুলতানা। সাক্ষাৎ শেষে কার্যালয়ের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তারা বলেন, গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার আদায়ে যে আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে সে দাবি অাদায় না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীকে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন খালেদা জিয়া। এরপর বেলা ১টা ২০ মিনিটে খাবার নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মেহেরুন্নেসা হক, নারী নেত্রী সুরাইয়া বেগম, আসমা আরেফিন, হুসনে আরা চৌধুরী এবং মরিয়ম বেগম। আসমা আরেফিন সাংবাদিকদের বলেন, যতদিন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবে ততদিন পর্যন্ত খালেদা জিয়া অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ম্যাডামের মনোবল এখনও দৃঢ় আছে বলে তিনি জানান।

তারারা কোথায় যায়?

রাতের আকাশের বেশিরভাগ অংশই তারায় জ্বলজ্বল করে। তবে ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ছে কালো ফাঁকা অংশ। সেখানে তারার ঝলমলে দীপ্তি নেই, আছে কালোর রাজত্ব। কেন এমনটা ঘটে? সেখানকার তারাগুলোই বা যায় কোথায়? ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইউরোপিয়ান স্পেস অবজারভেটরির (ইএসও) তোলা সাম্প্রতিক কিছু আলোকচিত্র দেখে মনে এমন প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন অন্য কথা। তাদের ভাষ্য, আলোকচিত্রের ওই কালো অংশ ফাঁকা মনে হলেও বিষয়টি আসলে তা নয়। ৭০০ আলোকবর্ষ দূরের ওই কালো অংশ আসলে তারার ক্ষেত্র, ঘন মেঘকণার আবরণ। ভবিষ্যতে এখান থেকেই তারার জন্ম হবে।
ইএসওর এক কর্মকর্তা বলেন, ছবি দেখে মনে হতে পারে, কিছু তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু জ্বলজ্বলে তারার মাঝে ওই কালো অংশ প্রকৃতপক্ষে গ্যাস ও মেঘের ধুলোয় ভরা। বিজ্ঞানীরা ওই কালো মেঘের নাম দিয়েছেন লিন্ডস ডার্ক নেবুলা ৪৮৩ বা এলডিএন ৪৮৩। চিলিতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান স্পেস অবজারভেটরির পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র লা সিলার উঁচুতে স্থাপিত ক্যামেরায় এসব আলোকচিত্র ধারণ করা হয়েছে।
অস্পষ্টতার জন্য ঘন আণবিক ভরের এলডিএন ৪৮৩কে বিজ্ঞানীরা কালো নীহারিকার আখ্যা দিয়েছেন। তারাহীন মনে হলেও এসবই তারার জন্মের জন্য সবচেয়ে উর্বর জায়গা। বিজ্ঞানীরা এসব মেঘের গঠন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান, সেখানে সম্ভাবনাময় তারার অস্তিত্ব রয়েছে। তারাগুলো এখনও অসম্পূর্ণ, গর্ভাবস্থায় রয়েছে। কমপক্ষে কয়েক হাজার বছরে এগুলো পূর্ণাঙ্গ তারার রূপ নেবে। মহাকাশের হিসাবে এ সময় বেশ সামান্যই। কারণ, একটি একটি তারার জীবনকাল কয়েক মিলিয়ন থেকে কয়েক বিলিয়ন বছরেরও বেশি। খবর :মেইল অনলাইন।

সেনাবাহিনী জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ: প্রধানমন্ত্রী by সাহাদাত হোসেন পরশ

সেবার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের শীতকালীন মহড়া শেষে দরবারে বক্তৃতাকালে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমমন্ত্রী বলেন, 'জনগণই দেশের শক্তি। আপনারা জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের সবার দায়িত্ব সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন করা। তাই জনগণের আস্থা অর্জন জরুরি।'
জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করে জনগণের কাছাকাছি যেতে হবে।  আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য এটা যেমন প্রয়োজন একইভাবে সকলের জন্য প্রযোজ্য।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এই মহড়া ৫৫ পদাতিক ডিভিশন তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করছে। দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় যেকোন অশুভ শক্তিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করতে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।'
জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'জাতিসংঘ মিশনে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধিতে সরকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। মিশন চলাকালে স্বল্প খরচে দেশে ছুটিতে আসা ও দৈনিক ভাতা বাড়ানোর ব্যাপারে জাতিসংঘ সদর দফতরের সঙ্গে আলোচনা চলছে।'
একটি আধুনিক ও চৌকস সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
সেনাসদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীকে ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। গোটা বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রতিটি স্তরে ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে আর্মি ইনফরমেশন টেকনোলজি সাপোর্ট অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।'
একইভাবে বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে এই সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের মহড়া দেখেন ও তাদের সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে নদীর পাড়ে শত্রুদের অবস্থানের ওপর হামলা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল মুহাম্মদ ফরিদ হাবিব, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারীসহ উচ্চ পদস্থ সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক।

আফসানাকে তাড়া করছে আগুন by ইকবাল হোসেন

তরুণী আফসানা কেবলি তার চারপাশে আগুন দেখছেন। তার চোখেমুখে শুধুই ভয়। চরম মানসিক যন্ত্রণার এক ছবি তাকে তাড়া করছে। গনগনে আগুনের সে ছবি হয়তো তার জীবন থেকে কোনোদিন সরে যাবে না। মানসিক ও শারীরিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত মেয়েটির প্রশ্ন, 'আমরা তো কোনো রাজনীতি করি না। তাহলে আমাদের ওপর এ জঘন্যতম হামলা কেন? কেন আগুন?' তার এই প্রশ্নে উপস্থিত কারও মুখেই কোনো ভাষা নেই। কারও কাছেই তিনি প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন না। রংপুরে পেট্রোলবোমায় বাসে আগুনলাগা আর তাতে মানুষকে পুড়ে যেতে দেখেছেন সেই বাসের যাত্রী আফসানা। দশ দিন আগে তার দাদা মারা গেছেন। দাদাকে শেষ দেখা দেখতে পরিবারের সবাই মিলে ১২ দিন আগে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের উলিপুরে এসেছিল আফসানাদের পরিবার। 'মঙ্গলবার রাত তখন একটার কাছাকাছি। বাসে ছোট ভাই আল-আমিনের পাশে বসে আছি।' এই দুটি বাক্য বলার পরেই আফসানার চোখেমুখে রাজ্যের আতঙ্ক এসে ভর করল। তার পর দাউদাউ আগুনের আঁচের স্মৃতিতে সে বিমর্ষ, তার কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে, 'হঠাৎ বৃষ্টির মতো ঢিল এসে পড়তে লাগল বাসের ওপর। এর পর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করল বাসটিতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মানুষের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার-চেঁচামেচি। বাঁচাও বাঁচাও চিৎকারে বাতাস ভারি হয়ে উঠছিল।' আফসানা থামলেন। দু'চোখে হাত দিয়ে যেন সেই ভয়াবহ স্মৃতি ঢেকে দিতে চাইলেন। কিন্তু মনের গভীর থেকে আসা জ্বলজ্বলে স্মৃতির ভারে আবারও তার কণ্ঠে কান্না, 'যে যেভাবে পারে প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টা করছে। কেউ জানালা দিয়ে, কেউ দরজা নিয়ে বের হয়। আমরা কীভাবে বাস থেকে নেমেছি তার কিছুই মনে করতে পারছি না। জীবনে এমন দৃশ্য দেখিনি।'
গাজীপুর ভাওয়াল সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী আফসানা বেগম। তিনি বাস থেকে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন। তার পরিবারের ১০ সদস্যের কয়েকজন এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন হাসপাতালে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দু'দিন আগে উলিপুরে দাদার দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন তারা। অবরোধের কারণে গাজীপুর যেতে পারছিলেন না। তাদের পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মঙ্গলবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে খলিল এক্সক্লুসিভ বাসে উলিপুর থেকে ঢাকায় রওনা দেয়। রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসটি এলে ঘটে বর্বরতম ঘটনাটি। দুর্বৃত্তদের পেট্রোলবোমায় আফসানার ফুফু তছিরনের দেহের ৯৩ শতাংশ পুড়ে যায়। তিনি এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ডাক্তার বলেছেন, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আফসানার মামি মনোয়ারা বেগম ও তাদের দুই কন্যা নুশরাত ও নাদিয়াকে রংপুর সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তা ছাড়া আফসানার দুই ভাবি লাকি ও মিনারা, তাদের মেয়ে ফারজানা ও নিরব, মা ছালেহা বেগম অগি্নদগ্ধ হয়েছেন। তারা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভাই আল-আমিন বাস থেকে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন। তিনিও চিকিৎসাধীন।
ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আফসানা জানান, তার পেছনের সিটে এক মহিলা বাচ্চা নিয়ে বসে ছিল। তারা আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। মা আর শিশু বাচ্চাটির পুড়ে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে আফসানার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। শানিত কণ্ঠে তার প্রতিক্রিয়া, 'আমরা তো কোনো দোষ করিনি। জীবনের তাগিদে আমরা উলিপুর গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলাম। যেভাবে আক্রমণ করা হলো তাতে মনে হয় আমাদের বাসের সবাইকে ওরা পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল।'

‘জীবন রক্ষার প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়া হবে’

পেট্রোল বোমা হামলাকারীরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ করলে জানমাল রক্ষায় প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। বৃহস্পতিবার বিজিবি সদরদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিজিবি মানুষ হত্যা করতে চায় না। তবে মানুষ হত্যা করতে দেখলে এবং নিজে আক্রান্ত হলে জীবন বাঁচানোর তাগিদে যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করবে বিজিবি। এজন্য বিজিবি সদস্যদের অস্ত্র ধরতে হতে পারে। উপর থেকে এমন নির্দেশ আছে কি-না সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন মহল থেকে এমন কোন নির্দেশনা নেই। জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনে বিজিবি অস্ত্র ব্যবহার করবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, সীমান্ত পাহারা বিজিবির প্রধান কাজ হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনকে সাহায্য করাও বিজিবির দায়িত্ব। জনগণের জানমাল রক্ষায় যতদিন দরকার ততদিন বিজিবি মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাবে বলেও জানান তিনি। বিজিবি মহাপরিচালক জানান, সম্প্রতি ৩৫ জেলা প্রশাসক বিজিবি মোতায়েনের জন্য আবেদন করেন। বর্তমানে ১৭টি জেলায় বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। জেলা প্রশাসকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। কিছু কিছু জায়গায় বিজিবি স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে, প্রয়োজনে নামানো হবে।

রাজনীতিকে কলুষিত না করার আহ্বান টিআইবির

রাজনীতিকে কলুষিত না করার জন্য দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ সকালে সংস্থাটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা সহিংসতার রাজনীতি চাই না। মানুষের জীবন ও গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হোক এমন কর্মসূচীও চাই না। দুই দলকে সহিসংতার রাজনীতি পরিহার করার আহ্বান জানান তিনি। ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে সুশাসন: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে লাইসেন্স প্রদানে প্রায়  ১৫ লাখ টাকা নিয়ম বহির্ভূত লেনদেন হয়। টাকার অংক নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অধিদপ্তর বিষয়টি স্বীকার করেছে। প্রতিবেদনের আরও বলা হয়, বড় বড় ঔষধ কোম্পানীগুলো রপ্তানীর জন্য উন্নত মানের কাঁচামাল ব্যবহার করে ঔষধ প্রস্তুত করে। আর দেশের অভ্যন্তরে বিক্রির জন্য অপেক্ষাকৃত নিন্মমানের কাঁচামাল ব্যবহার করছে। অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ উৎপাদনে তাদের আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রভাবকে ঔষধ প্রশাসনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।

‘দুটো পক্ষকেই একটা সমঝোতার দিকে আসতে হবে’

বাংলাদেশে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। চলছে বিএনপির দেয়া টানা অবরোধ; তার মধ্যেই থেকে থেকে চলছে হরতাল। বাড়ছে সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা। যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়ায় ব্যবসায়িক এবং রপ্তানি কার্যক্রমে এসেছে স্থবিরতা। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ রহমান গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রতিবাদে আজ সারাদেশে ডাকা হয়েছে হরতাল।এই সংকটে অবসান করতে সরকার কি করছে? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেন, সমাধান শুধু সরকারের উপর নির্ভর করেনা।সরকারের দায়িত্ব জনগণের জানমাল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর সাথে আলাপ আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করাটাও সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। দেশে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা থাকতে পারে; তবে সংবিধান অনুযায়ী আরেকটি নির্বাচনের আগে অরাজকতা সৃষ্টি করে আবারও নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়। দেশে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে সহিংসতার ঘটনা বাড়ার পরও সরকার কেন আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে না সে প্রশ্নে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ২০১৩ সালেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপার্সনকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন, কিন্তু আলোচনা হয়নি। এখন আলোচনায় বসার জন্য সবার আগে এই সহিংস কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

‘৪০০ টাকা হাজিরায় মিছিলে আইছি’

হরতাল ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় ঘেরাওয়ের চেষ্টা করেছে শতাধিক শ্রমিক। দিনমজুর শ্রমিক-জনতার ব্যানারে আজ সকালে তারা মিছিল নিয়ে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বরের কাছে তাদের আটকে দেয়। তাদের হাতে ছিল কোদাল, খুন্তি ও কাস্তে। এসময় শ্রমিকরা হরতাল ও অবরোধ বিরোধী শ্লোগান দেয়। পুলিশ তাদের নিবৃত্ত করলে প্রায় ২০ মিনিট অবস্থানের পর তারা বনানীর দিকে চলে যায়। মিছিলে অংশ নেয়া এরশাদ আলী জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা তাকে মিছিলে পাঠিয়েছে। প্রথমে অসুস্থতার অজুহাতে তিনি মিছিলে আসতে চাননি। তখন ওই আওয়ামী লীগ নেতা জিজ্ঞেস করেন, ‘তোর হাজিরা কত?’। দৈনিক ৪০০টাকা হাজিরা জানালে তিনি পরিশোধ করতে রাজি হয়ে যান। এরশাদ আলী বলেন, ‘আমি কোনো দল করি না। ৪০০ টাকা হাজিরা পাইছি। তাই মিছিলে আইছি।’ মিছিলে অংশ নেয়া আরেক শ্রমিক শান্তি বেগম দাবি করেন, মিছিলে অংশ নেয়া সব মহিলারা আওয়ামী লীগ করেন। হরতাল-অবরোধে কাজ না পাওয়ায় তারা খালেদার কার্যালয় ঘেরাও করতে এসেছেন।

রাজধানীতে হরতাল সমর্থনে শিবিরের মিছিল, মগবাজারে দগ্ধ গাড়িচালকের মৃত্যু

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানের ওপর হামলার প্রতিবাদে ২০দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সমর্থনে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় মিছিল করেছে ছাত্রশিবির। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর ভাটারার নতুনবাজার এলাকায় মিছিল ও রাস্তায় অগ্নিসংযোগ করেছে শিবির ঢাকা মহানগরী উত্তর। রাস্তায় অগ্নিসংযোগ করে এসময় শিবিরকর্মীরা প্রায় ২০ মিনিট রাস্তা অবরোধ করে রাখে। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন ভাটারা থানা সভাপতি আব্দুর রহমান, গুলশান থানা সভাপতি মিজানুর রহমান, সাবেক শিবির নেতা আব্দুল কাইয়ুমসহ স্থানীয় শিবির নেতৃবৃন্দ। একই সময়ে রাজধানীর উত্তরার দক্ষিনখান এলাকায় ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রশিক্ষণ সম্পাদক আইয়ুব আলীর নেতৃত্বে হরতালের সমর্থনে মিছিল করেছে ছাত্রশিবির। মিছিলে আরো উপস্থিত ছিলেন শাখার সাহিত্য সম্পাদক আজিজুল ইসলাম সজিব, দক্ষিনখান সভাপতি কামরুজ্জামান সোহাগ, উত্তরখান সভাপতি কেরামত আলীসহ আন্যান্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
ঢাকা মহানগরী পূর্ব সভাপতি রেজাউল হক রিয়াজের নেতৃত্বে সকাল ৯টায় রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় ২৫-৩০জন শিবিরের নেতাকর্মী মিছিলে অংশ নেয়। এসময় কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত, মহানগর সেক্রেটারি এম শামীম, অর্থসম্পাদক তোজাম্মেল হক, প্রচার সম্পাদক আবদুল কাদের, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন, স্কুলকার্যক্রম সম্পাদক ফায়জুর রহমান, সবুজবাগ থানা সভাপতি হাফিজুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে হরতালের সমর্থনে ছাত্রশিবির চকবাজার অঞ্চল সকাল ৮টায় হরতাল বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিলে নেতৃত্বদেন মহানগর প্রচার সম্পাদক আবদুল কাদের। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন চকবাজার থানা সভাপতি হেলাল উদ্দিন, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা সভাপতি রেদওয়ান উল্যাহ, চকবাজার সেক্রেটারি আশরাফুল আলম, লালবাগ সেক্রেটারি জামিল হোসেন প্রমুখ।
মগবাজারে দগ্ধ গাড়িচালকের মৃত্যু
মগবাজারে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রোল বোমায় দগ্ধ প্রাইভেটকার চালক আবুল কালাম (২৮) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মগবাজারে গাড়ি থেকে নামার সময় দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয় কালাম। আজ দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটের আইসিইউতে মারা যায় সে। বার্ন ইউনিটের আইসিইউ প্রধান শাহ আলম ভূইয়া মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতের বাবার নাম মৃত আব্দুল হক হাওলাদার। বাড়ি বরিশালের আগৈলঝড়া থানার রাংতা গ্রামে।

ইরাকের ফেরারি পাখিরা

শীতে দেশ–বিদেশে পাড়ি দেওয়া একটি ইউরোপীয় স্টার্লিং
তীব্র শীত থেকে রক্ষা পেতে ইউরোপের স্টার্লিং পাখিরা বছরের এই সময়টায় ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় জমায় উত্তর ইরাকে। আরও অনেক পরিযায়ী পাখির মতো তারা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ইরাকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত থাকে। তবে যুদ্ধের ডামাডোলে এবার ইরাকে অতিথি পাখির সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম। খবর এপির। ইরবিল এলাকায় অতিথি পাখি ধরতে প্রতিবছর মৌসুমি শিকারিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শিকার করা পাখিগুলো তাঁরা ইরবিল শহরের বাজারে বিক্রি করেন। বিদেশি পাখি আসার দুটি মাসে অনেকেই একে অস্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নেন। ক্রেতাদের কেউ কেউ মাংস খেতে পাখি কেনে। তবে বেশির ভাগ মানুষ পাখি কেনে তাদের মুক্ত আকাশে ছেড়ে দিতে। স্থানীয়দের প্রচলিত বিশ্বাস, এভাবে বন্দী পাখি ছেড়ে দিলে পুণ্য হয়। ইব্রাহিম খলিল বংশপরম্পরায় পাখি শিকার করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর কমপক্ষে তিন থেকে চার হাজার, কখনো বা সাত থেকে আট হাজার পাখি ধরতে পারি। এ বছর আমি হাজার তিনেক ধরতে পারলেই বরাত ভালো মনে করব।’
স্থানীয়রা মনে করছেন, ভয়াবহ যুদ্ধের কারণেই এবার পাখির সংখ্যা কম। পাখি শিকারি খালাম তাসিন বলেন, ‘পাখিরা চলে গেছে। ওরা এত শব্দ সহ্য করতে পারে না।’ ইরবিলের কাছের যে এলাকায় অতিথি পাখিরা থাকে, তার থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং কুর্দি বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই চলছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর যুদ্ধ বিমানগুলো মাঝেমধ্যেই হানা দিয়ে বোমা ফেলে। যুদ্ধের ডামাডোলে পাখির সংখ্যা যেমন কমে গেছে তেমনি এর বিক্রিও গেছে কমে। মানুষের হাতে পয়সা না থাকায় এই অবস্থা। আগে পাখি মুক্ত করে দিতে গড়ে একজন শ দুয়েক করে কিনতেন। আনোয়ার ওয়ালিদ নামের এক ব্যক্তি সেদিন মাত্র চারটি পাখি কিনলেন। ৬৫ বছর বয়সী ওয়ালিদ একে একে আকাশে উড়িয়ে দিলেন পাখিগুলো। যুদ্ধকবলিত ইরাকের অনিরাপদ আকাশে মুক্তির আনন্দে ডানা মেলে দিল তারা।

জাওয়াহিরির নির্দেশে শার্লি এবদো কার্যালয়ে হামলা

ফ্রান্সের প্যারিসে বিতর্কিত ব্যঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদোর কার্যালয়ে রক্তক্ষয়ী হামলার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদার ইয়েমেনি শাখা। ইন্টারনেটে ছাড়া এক ভিডিওবার্তায় তারা বলেছে, আল-কায়েদার প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরির নির্দেশে ওই হামলা চালানো হয়। খবর এএফপি, রয়টার্স ও আল-জাজিরার। ইন্টারনেটে গতকাল বুধবার প্রকাশিত ভিডিওবার্তায় আল-কায়েদা ইন দি অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলার (একিউএপি) জ্যেষ্ঠ নেতা নাসের আল-আনাসি বলেন, ‘একিউএপি মহান আল্লাহর বার্তাবাহকের অবমাননার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করছে।’ শীর্ষ নেতা জাওয়াহিরি হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন দাবি করে আনাসি বলেন, ‘একিউএপির নেতৃত্ব হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়ন করে।’ ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ করার জন্য পরিচিত ফ্রান্সের শার্লি এবদো পত্রিকা। এর প্যারিসের কার্যালয়ে ৭ জানুয়ারি তিন মুসলিম যুবক সশস্ত্র হামলা চালিয়ে আট সাংবাদিকসহ ১২ জনকে হত্যা করে। হামলাকারীরা ঘটনার সময় চিৎকার করে বলে, মহানবী (সা.)-এর অবমাননার প্রতিশোধ নিতেই তারা হামলা চালিয়েছে। নতুন সংখ্যা নিয়ে আগ্রহ, নিন্দা: সাপ্তাহিক শার্লি এবদোর নিয়মিত প্রচারসংখ্যা ৬০ হাজার হলেও গতকাল প্রকাশিত নতুন সংখ্যাটি ছাপা হয়েছে ৩০ লাখ। তার পরও বাজারে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যায়।
এ সংখ্যাটির আরও ২০ লাখ কপি ছাপানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। নতুন এ সংখ্যার প্রচ্ছদে আবারও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কার্টুন ছেপেছে পত্রিকাটি। এর শিরোনাম হিসেবে লেখা: সবকিছু ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্ম বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান কর্তৃপক্ষ মিসরের আল আজহার এর নিন্দা করেছে। তবে পাশাপাশি বিষয়টিকে উপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে বলেছে, মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা এতই ওপরে যে সামান্য কার্টুনে তা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। অন্যদিকে ইরান নতুন কার্টুন ছাপার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘এটা অবমাননাকর ও উসকানিমূলক পদক্ষেপ।’ জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) একে ‘নির্বোধের কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। শার্লি এবদোর গতকালের সংখ্যায় ছাপা হওয়া কয়েকটি নিবন্ধের অনুবাদ এবং বোকো হারাম ও আইএস জঙ্গিদের নিয়ে কিছু কার্টুন গতকাল পুনর্মুদ্রণ করে তুরস্কের শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা চুমহুরিয়েত। পত্রিকাটি বলেছে, বাকস্বাধীনতার আদর্শকে সমুন্নত রাখার স্বার্থেই তারা তা করছে। ফরাসি সরকার জানিয়েছে, বিতর্কিত কৌতুক অভিনেতা লিওদোনো ইহুদি সুপার মার্কেটে হামলায় জড়িত বন্দুকধারীর প্রতি সহানুভূতি দেখানোয় তাঁকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া প্যারিস হামলার পর সন্ত্রাসবাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের দায়ে তাঁরা অন্তত ৫৪টি মামলা করেছেন।

মুসলিমদের প্রশংসা করলেন জার্মান প্রেসিডেন্ট গাউক

জার্মান প্রেসিডেন্ট ইয়োখিম গাউক সে দেশে বসবাসরত মুসলমানদের প্রশংসা করেছেন। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্যারিসের সন্ত্রাসী ঘটনার বিরুদ্ধে বার্লিনে বিশাল মানববন্ধনে তিনি বলেন, এ কর্মসূচি প্রমাণ করে, ইসলাম ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সন্ত্রাসের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে না। ব্রান্ডেনবুর্গ তোরণের সামনে জার্মানির কেন্দ্রীয় ইসলামিক ফোরাম আয়োজিত মানববন্ধনে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। জার্মান প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশপ্রেমিক শব্দের অর্থ হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মেনে নিয়ে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের একসঙ্গে বসবাস। জার্মানিতে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ই জার্মান।পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত দিয়ে শুরু হয় মানববন্ধন। এতে জার্মান প্রেসিডেন্ট ছাড়াও চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল, মন্ত্রিসভার সদস্য, জার্মানিতে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং মুসলিম, খ্রিষ্ট্রান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জার্মানির কেন্দ্রীয় ইসলামিক ফোরামের সভাপতি আমান মাজায়েক প্যারিসের সন্ত্রাসী ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, প্যারিসের দুই ঘটনায় একজন মুসলিম পুলিশের নিহত হওয়া এবং সুপার মার্কেটে এক মুসলমান যুবকের ইহুদি ক্রেতাদের প্রাণ রক্ষাই প্রমাণ করে, সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীদের কোনো সম্পর্ক নেই।
এর আগের দিন আঙ্গেলা ম্যার্কেল সাবেক জার্মান প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান ভুল্ফের বক্তব্য স্মরণ করে বলেন, ‘ইসলাম ধর্মও জার্মানের অন্তর্গত’। তিনি ২০১৪ সালে জার্মানিতে আসা প্রায় দুই লাখ সিরীয় শরণার্থীকে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলেও জানান। মানববন্ধনে বার্লিনে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক মুসলমান অধিবাসী অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারী এক তরুণ বলেন, ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে, জিহাদের দোহাই দিয়ে বিপুলসংখ্যক তরুণকে ইউরোপ থেকে ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ‘পাশ্চাত্যের ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমী ইউরোপীয়রা’ (পেগিডা) নামে একটি আন্দোলনের ব্যানারে গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে জার্মানির ড্রেসডেন শহরে প্রতি সোমবার মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে। বিভিন্ন জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে ইসলামবিরোধী এ আন্দোলনের জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। এ রকম প্রেক্ষাপটে এ দেশে বসবাসরত মুসলমানরা এই প্রথম শীর্ষ রাজনীতিকদের উপস্থিতি ও সংহতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রকাশ্য কোনো অনুষ্ঠান করলেন।

রাজনৈতিক সমাধান হলেই সহিংসতা বন্ধ হবে by নূরুল হুদা

বিএনপি নেতা রিয়াজ রহমান মঙ্গলবার গুলশান এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এটা নিশ্চয়ই বিনা উদ্দেশ্যে করা হয়নি। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। সাবেক কূটনীতিক। বিএনপি সরকারের আমলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। কাজেই এ হামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে আন্দাজ করা যায়। যারাই এটা করে থাকুক, শেষ পর্যন্ত এর একটা খারাপ সিগন্যাল যাচ্ছে। লক্ষণটি ভালো নয়।
দেশে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্য একটি খারাপ সময় যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটছে। এসবের পেছনে দৌড়াতে হচ্ছে তাদের। যোগাযোগ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা দিতে হচ্ছে- রাস্তা বা রেললাইন রক্ষায় যেখানেই হোক। দেশে এ ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত না থাকলে তো এর দরকার পড়ত না। এখন আইনশৃংখলা বাহিনীকে অতিরিক্ত শ্রম, সময় ও সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে অনেক জরুরি কাজ হয়তো তাদের দিয়ে করানো যাচ্ছে না। যেমন- অপরাধ দমন অথবা জনগণের জন্য কোনো সেবামূলক কাজে তাদের সেভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশে যে সহিংসতা চলছে এক্ষেত্রে মূল সমস্যাটা তো রাজনৈতিক। কাজেই সহিংসতা বন্ধে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন। এটা সবাই বোঝেন যে, সমঝোতা হলেই দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। সরকার বা বিরোধী দল কেউই বলছে না যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশকে পরিপূর্ণভাবে স্থিতিশীল বলে মনে হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে যে কারণে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বিরোধী দল বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনটা ঠিকমতো হয়নি, আমরা নতুন নির্বাচন চাই। এটি রাজনৈতিক বিষয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা হলেই আইনশৃংখলা পরিস্থিতিজনিত সমস্যার সমাধান হবে।
রাষ্ট্রের যেসব প্রশাসন ব্যবস্থা আছে, তাদের তো সরকারের কথা শুনতেই হবে। সেটা শুনতে গিয়ে যাদের অন্যরকম মতামত আছে তাদের সঙ্গে একটা সংঘাতে এসে যেতে হচ্ছে। সব জায়গাতেই এমনটি দেখা যায়। এখানে একটু বেশি হচ্ছে।
দেশে যে সহিংস পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার একটাই সমাধান- সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনায় বসা। অনেকে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সমাধানের কথা বলেন। কিন্তু আমি মনে করি, এটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাধানের বিষয় নয়। জাতীয়ভাবেই এর সমাধান হওয়া উচিত। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ দেখতে গেলে যে ধরনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দরকার, সেটা রাজনৈতিক নেতারা দেখাবেন এ আশাই করি।
নূরুল হুদা : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক

তারা কি সত্যিই জনগণের জন্য রাজনীতি করেন! by এ কে এম শাহনাওয়াজ

রাজনীতিকদের অন্তত বক্তব্যে-স্লোগানে আমরা শুনতে পাই, তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন। জনগণ অবরোধ-হরতাল করছে। জনগণ হরতাল-অবরোধ প্রতিরোধ করছে। কিন্তু অবরোধ-হরতালে যে সহিংস ঘটনা ঘটছে- পেট্রলবোমায় ঝলসে যাচ্ছে মানুষ, আগুনে পুড়ছে যানবাহন- এজন্য কি অবরোধ আহ্বানকারীদের কেউ দুঃখ প্রকাশ করেছেন? বিএনপি নেতা রিয়াজ রহমান সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়েছেন- আমরা সবাই দুঃখিত, ক্ষুব্ধ। কোনো সহিংস ঘটনায় বিএনপি নেত্রী এই প্রথম ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ২০ দলীয় জোট আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। যেদিন রিয়াজ রহমানের ওপর হামলা হয়েছে, সেই একই দিন (মঙ্গলবার) কুড়িগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা বাসে পেট্রলবোমা হামলা হয়েছে। শিশুসহ চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। তাদের জন্য কে দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করবে! রাজনীতিকরা কি গলা চড়িয়ে দাবি করতে পারবেন- তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন?
বঙ্গবন্ধু-উত্তর কাল থেকে আমাদের রাজনীতিকরা চক্ষুরোগে আক্রান্ত। তারা দূরদৃষ্টি দিয়ে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেন না। দৃষ্টিটা থাকে সিংহাসন পর্যন্ত। পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দেশ বা জাতির জন্য কী বার্তা বয়ে আনবে সে বিষয়ে ভাবার দায় কারও নেই। ক্ষমতার মদে এতটাই মত্ত থাকেন যে, নিজ দলের ভবিষ্যৎ শক্তি বা সম্ভ্রমের বিষয়েও কোনো খেয়াল থাকে না তাদের। রাজনীতির নায়কদের অভীষ্ট লক্ষ্য হয়ে পড়েছে ক্ষমতাশালী, অর্থশালী আর প্রতিপত্তিশালী হওয়া। এ কারণে চলমান রাজনৈতিক দর্শন দেশ ও জাতির জন্য স্বস্তি নিয়ে আসতে পারছে না। এদিক থেকে জিয়াউর রহমান কিছুটা নিজ বিবেচনায় দূরদৃষ্টিতে তাকাতে পেরেছিলেন। ক্ষমতার শক্তিতে নিজের ভবিষ্যৎকে দৃঢ় অবস্থানে দাঁড় করাতে নিজ বলয় তৈরি করে নিয়েছিলেন। তিনি ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উল্টো শিবির থেকে নিজ অবস্থান তৈরি করার পরিকল্পনা নেন। ফলে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শিবিরের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধেন। পাকিস্তান, সৌদি আরব আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ে নিজেকে যুক্ত করে বিএনপি নামের দলটিকে প্রতিপালন করতে থাকেন। ফলে মুখে যাই বলা হোক, বিএনপি দলটির পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জিয়াউর রহমান সে সময়ের আওয়ামী লীগের দুর্বলতা আর দুর্দশাকে পুঁজি করে নতুন দলটিকে শক্ত অবস্থান দিতে পেরেছিলেন। নতুন প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের তরুণদের মন থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পেরেছিলেন ফিকে করে দিতে। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ এসব তরুণের মনে বিতর্কিত চরিত্র ও দল হিসেবে উপস্থাপিত হতে লাগল। সূচনালগ্নে ছাত্রদল-যুবদল করে আসা বন্ধুরা এখনও সে ঘোর কাটাতে পারেননি। এটিই ছিল জিয়াউর রহমানের সাফল্য ও দূরদৃষ্টির প্রভাব। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এ যুগের আওয়ামী লীগ আর জন্ম সংকটে থাকা বিএনপি কারও আচরণ আর দর্শনে গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার কোনো চেষ্টা নেই। জনগণকে নিয়ে ভাবার বদলে ক্ষমতার সিঁড়ি ডিঙ্গাতে সব পক্ষ শুধু ‘জনগণ’ জপমালা করেন। আর সব শেষে জনগণের বুকে পা রেখে মসনদে চড়ে বসেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক চেতনা বিচ্ছিন্ন রাজনীতির এসব বিধায়করা দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতে চান না গণশক্তি একটি শাশ্বত শক্তি। শেষ পর্যন্ত টিকতে হলে গণশক্তিকে পরোয়া করেই বা শ্রদ্ধা দেখিয়েই টিকতে হবে।
সারা পৃথিবী খুঁজতে হবে না, বাংলাদেশের অতীতে চোখ রাখলেই জানা যাবে, যুগ যুগ ধরে এ মাটির সফল শাসকরা গণশক্তির ওপরই আস্থা রেখেছেন বেশি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে বাংলার উত্তরাংশ দখল করে তা ভারতীয় মৌর্য সাম্রাজ্যের অংশ করেছিলেন সম্রাট অশোক। এ সময়ের রাজশক্তির দৃষ্টি ছিল জনকল্যাণের দিকে। মৌর্যদের পর ভারতীয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে বাংলা। এ পর্বের শাসকরাও সুশাসন বজায় রাখেন। ফলে কোনো জনঅসন্তোষ তৈরি হয়নি। কিন্তু গুপ্ত শাসনের অবসান হলে গণশক্তির ওপর শ্রদ্ধা দেখাতে পারেননি স্থানীয় রাজারা। প্রতিক্রিয়ায় একশ’ বছরের জন্য অরাজকতায় ডুবে যায় বাংলা। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে বাংলার মানুষ গণতান্ত্রিক বোধকে জাগিয়ে তুলেছিল। তারা সম্মিলিতভাবে নির্বাচিত করে গোপালকে। তিনি শক্তিশালী পাল বংশের পত্তন করলেন। আট শতক থেকে পরবর্তী চারশ’ বছর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বৌদ্ধ পাল রাজারা। কিন্তু পালদের হাত থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নেয়া সেন রাজারা গণশক্তিকে পরোয়া করেননি। দাক্ষিণাত্য থেকে এসে অন্যায়ভাবে দখল করেছিলেন বাংলার রাজদণ্ড। নিজেদের গণরোষ থেকে বাঁচাতে বর্ণপ্রথা চাপিয়ে দিয়ে বাংলার মানুষকে শ্রেণীবিভক্ত করে দেন। এ দেশের সংগ্রামী মানুষকে শূদ্র অভিধায় কোণঠাসা করে নির্যাতন করতে থাকেন। তবে এর ফল খুব ভালো হয়নি। নির্যাতিত মানুষের নীরব সমর্থন পেয়ে তেরো শতকের শুরুতে বহিরাগত তুর্কি যোদ্ধারা দখল করে বাংলার সিংহাসন।
আচরণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করেছিলেন এ মুসলিম সুলতানরা। মধ্যযুগের প্রায় ছয়শ’ বছর মুসলিম সুলতান আর মোগল সুবেদাররা অসাম্প্রদায়িক গণমুখী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। মধ্যযুগের হিন্দু কবিরা তাদের গ্রন্থে মুসলমান শাসকদের প্রশংসা করেছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে হলেও ইংরেজ শাসকরাও গণশক্তিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। ১৭৫৭ সাল থেকে বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের যাত্রা শুরু হলেও শাসকরা দাফতরিক ভাষা ইংরেজি করেনি। বুঝেছিল, নানা ভাষাভাষীর ভারতে ভাষায় হাত দিলে দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে। তাই প্রায় ছয়শ’ বছর ধরে চলা রাজভাষা ফার্সিকেই বহাল রাখে তারা। অনেক পরে ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে ১৮৩৫ সালে সবার সম্মতিতে ইংরেজিকে করে দাফতরিক ভাষা। পাকিস্তানি শাসকরা গণশক্তিকে মূল্য দেয়নি। এর পরিণতি তো বারবার আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
দুর্ভাগ্য, নিজ ঘরে এতসব উদাহরণ থাকার পরও আমাদের রাজনীতিকরা গণশক্তিকে তাচ্ছিল্য আর অপমান করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বারবার হোঁচট খাচ্ছেন, তবুও হুঁশ হচ্ছে না। এর কারণ আমাদের রাজনীতির আদর্শ জনগণের কল্যাণ চিন্তা নয়। জনগণের নাম ব্যবহার করে প্রতারকের মতো সুবিধার ফসল ঘরে তোলাই হচ্ছে এ ধারার রাজনীতিকদের মোক্ষ। সীমাবদ্ধ দৃষ্টি বলেই সব পক্ষের উদ্দেশ্য ক্ষমতায় যাওয়া এবং সব চর্ব, চোষ্য, লেহ্য আকণ্ঠ হজম করা। তারপর গণআদালতে ফাঁসি হলেও কিছু যায় আসে না। কিছুকাল ঘাপটি মেরে থাকব। আবার সুবিধামতো ‘জনগণ’ ‘জনগণ’ জিকির তুলে মসনদের দিকে ছুটব।
এ কারণেই বিএনপি জোটের ডাকা অবরোধ এবং নানা স্থানে অবরোধের স্যালাদ হিসেবে হরতাল যোগ করে সপ্তাহকাল ধরে জনজীবন বিপন্ন করে তুলছে বিএনপি। সরকারি দমন নীতির কারণে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি থাকতে পারত; কিন্তু জনগণের স্বাভাবিক জীবন বিপন্ন করা অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি উল্টো বিএনপিকে জনঅসন্তোষের মুখোমুখি করছে। অথচ এ সত্যকে একেবারেই আমলে নিতে চাচ্ছেন না বিএনপির নেতা-নেত্রীরা। বাস্তব ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়েছে, গণমানুষ সম্পৃক্ত হয়নি এ কর্মসূচিতে। তাই সব যানবাহনই চলছে। মানুষ চলাচল করছে। তারপরও কি জনজীবন স্বাভাবিক বলব? চোরাগোপ্তা হামলায় জীবন যাচ্ছে স্কুলছাত্র, শিক্ষক, পরিবহন কর্মচারী থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষের। বোমায় ঝলসে যাওয়া মানুষ মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। যাদের ক্ষমতায় যাওয়া-আসার সঙ্গে কোনো ভূমিকা নেই। সব সচল আছে, তবু ক’জন অভিভাবক সাহস পাচ্ছেন তাদের সন্তানকে স্কুল-কলেজে পাঠাতে? ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বিয়েতে যাওয়া কর্তব্য বিবেচনা করার পরও সাহস পাচ্ছি না গাড়ি নিয়ে বেরোতে। জরুরি হলেও অনেকে ঢাকার হাসপাতালে আনতে পারছেন না দূর-দূরান্তে থাকা জটিল রোগীকে। কৃষক তার ফসল নিয়ে বসে আছেন। দেশের হাজার কোটি টাকার রফতানি বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে প্রতিদিন। রাজনীতিকরা ছেঁদো কথা যতই বলুন না কেন- মানুষের কাছে স্পষ্ট, মানুষ জানে, বিএনপি এ অরাজকতা চাপিয়ে দিচ্ছে দলকে নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে আর ক্ষমতার মসনদে বসতে। এসবের বাস্তবায়ন করতে বলির পাঠা বানাচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এসব হিংস্র মানসিকতার নেতা-নেত্রীদের জানা উচিত গণসমর্থনহীন সহিংসতার পথে কখনও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।
সরকারপক্ষও কি যথাযথ কর্তব্য পালন করছে? তাদেরও কি লক্ষ্য নয় বিএনপিকে নিঃশেষ করা এবং নিজেদের ক্ষমতার ভিত পাকাপোক্ত করা? তাই জনগণকে রক্ষার পদক্ষেপ দেখা যায় না। দিনের পর দিন অরাজকতা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিপক্ষ; কিন্তু আলোচনা করে ফয়সালা করার কোনো উদ্যোগ নেই। আর যদি শক্তি দিয়ে দমনও করতে চায়, সে লক্ষ্যও পূরণ হচ্ছে না। মনে হয় সাধারণ মানুষ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, এ অসুস্থ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে আলোচনা বা শক্তি প্রয়োগ সব কিছুকেই মানুষ সমর্থন দেবে। কারণ জনগণের কথা ভেবে কোনো পক্ষই তো মধ্যপন্থা খুঁজতে চাইছে না। জনগণ চায় মুক্তি।
বিএনপি নেতারা কি একবারও ভাবছেন জনগণের সমর্থন নেই তবুও কেন অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন? রাজনীতি মানুষকে কতটা অমানবিক করে তোলে তা দেখে বিস্মিত হতে হয়। ভেবেছিলাম মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের জাল স্বাক্ষর আর বিজেপি নেতার নাম ভাঙিয়ে মিথ্যা ফোনালাপের কথা ফাঁস হওয়ার পর খালেদা জিয়াসহ সাধারণ নেতারা লজ্জা না পেলেও সিনিয়র ও রাজনীতিতে বিদগ্ধ নেতারা লজ্জায় অধবদন হবেন। অথচ আশ্চর্য, দুদিন আগে টিভিতে দেখলাম ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মতো সিনিয়র শিক্ষিত বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে আসার পর সাংবাদিকদের কাছে কলের পুতুলের মতো বলে যাচ্ছেন, নেত্রী ‘শান্তিপূর্ণ’ অবরোধ চালিয়ে যেতে বলেছেন। পাশাপাশি অব্যাহত অশান্তির ছবি টিভির পর্দা গুলজার করছিল। আগুন জ্বলছিল বাসে, পণ্য বোঝাই ট্রাকে। সাভারে ব্যানার টানিয়ে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের মেয়েরা চলন্ত বাসের ওপর একের পর এক ঢিল ছুড়ে যাচ্ছে। জনগণ আতংক নিয়ে জীবন-জীবিকার পথে ছুটছে। অবরোধ আমলে না নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার আর গাড়ির যাত্রী জনগণ। এরপর সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ছড়িয়ে তাদের জীবন বিপন্ন করে এবং অর্থনীতি ধ্বংস করে আমাদের রাজনীতিকরা ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে’ অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন! এতটাই নির্লজ্জ রাজনীতি এখন আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। বিরোধী দল কতটা উন্মত্ততা দেখাচ্ছে, সরকার কতটা দমন নীতি চালু রাখছে, তা সাধারণ মানুষের আর দেখার সময় নেই। নিজেদের রক্ষা নিজেদেরই করতে হবে। উনিশ শতকের ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আরনল্ড টয়নবি সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে দেখিয়েছিলেন একটি সূত্রের মধ্য দিয়ে। আর তার সূত্রটি হচ্ছে ‘থিওরি অব চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স’। অর্থাৎ সৃষ্টির আদি থেকে মানুষসহ সব প্রাণিকুলকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। যে সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে সে টিকে আছে আর যে পারেনি সে হারিয়ে গেছে। যেমন ডায়নোসর ও ম্যামথের মতো প্রাণী বিরুদ্ধ পরিবেশ মোকাবিলা করতে না পেরে হারিয়ে গেছে। আবার লাখ লাখ বছর ধরে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তেলাপোকা ঠিকই টিকে আছে। আমরা মনে করি, ক্ষমতার মদে মত্ত নষ্ট রাজনীতি আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। টিকে থাকতে হলে আমাদেরই ফুঁসে উঠতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, গণশক্তির ফুঁসে ওঠার সময় এসে গেছে। অনাচারকারীদের প্রতিহত করতে মানুষকেই মাঠে নামতে হবে। মানুষের শক্তির কাছে পেট্রলবোমা ও ককটেলের শক্তি অতি তুচ্ছ। সত্যিই যদি মানুষ পথে নেমে আসে, তবে এর শেষ পরিণতি চলমান রাজনীতির জন্য খুব ভালো হবে না। আমরা আশা করব, একটিবার অন্তত দূরদৃষ্টি দিয়ে এ সত্য উভয় পক্ষের মহান রাজনীতিকরা অনুধাবন করবেন।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সম্ভাবনা বিনষ্টকারী রাজনীতির কবলে দেশ by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে তালা ও দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে তার গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজপথ, রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে গোটা দেশ; ঝরছে রক্ত, মরছে মানুষ, জ্বলছে আগুন, ধ্বংস হচ্ছে সম্পদ। সাধারণ মানুষ কার্যত যার যার ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছে। আতংকে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা কারও কাছেই স্পষ্ট নয়। সব সামাজিক শক্তি একে অপরের মুখোমুখি। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত হয়ে আবির্ভূত হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। কাজেই চিন্তাশীল মানুষের কাছে রাষ্ট্রের পরিণতির দিকটাই এখন মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে রাষ্ট্র যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে মোড় নিতে পারে। বিপদাপন্ন হতে পারে গণতন্ত্র ও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। ধ্বংস হতে পারে মানুষের সব স্বপ্ন এবং সম্ভাবনা। এসব ভাবনা রাজনীতিকদের ভাবনায় থাকতে হবে। দায়িত্বহীন কথাবার্তা ও আচরণ বন্ধ করতে হবে, সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে, দমন-পীড়ন ও জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, কেউ যদি বিশ্বের সব ক্ষমতা পেয়ে যান আর আত্মাকে হারান, তাতে কোনো প্রশান্তি নেই।
কথায় আছে, ডানা ভাঙা হাঁস রাতে শুধু শেয়াল দেখে, তেমনি বর্তমান সরকারও মনে হয় দেখে এই বুঝি তারা ক্ষমতা হারাল। এমনটি না হলে কেন তারা বিএনপি অফিসে তালা দেবে? কেন তারা খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করবে? কেন তারা খালেদা জিয়াকে জনসভা করতে দেবে না? এসব প্রশ্ন আজ জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করে কি গণতন্ত্র রক্ষা দিবস পালন করা শোভনীয়? এরকম বিকৃত গণতন্ত্র নিয়ে আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সামনে এগোনো যাবে? না দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ বানানো যাবে? কাজেই আগে রাজনীতি ঠিক করতে হবে, রাজনীতি ঠিক না হলে এক সময় তাসের ঘরের মতো সব ভেঙে পড়বে। তখন এর দায়-দায়িত্ব যারা ড্রাইভিং সিটে আছেন তাদেরই নিতে হবে। তাদের আরোহীর নয়, চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে তাদের।
দিশেহারা হয়ে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার বিপজ্জনক খেলা দেশ তো নয়ই, রাজনীতি ও রাজনীতিকদের জন্যও ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না। কোনো পেশাদার রাজনীতিক এমন জঘন্য ও আত্মঘাতী কাজ করতে পারেন না। চেয়ারপারসনকে অবরুদ্ধ করে, প্রধান কার্যালয়ে তালা দিয়ে ও নেতাকর্মীকে মামলা-হামলার মাধ্যমে জেলে আটক রাখলেই কি বিএনপি নেতৃত্বশূন্য হয়ে যাবে? না, কখনোই না; এভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্বশূন্য করা যায় না। তখন কর্মীরা নেতৃত্ব হাতে তুলে নেবে। দলের নীরব সমর্থকরা কর্মীর দায়িত্ব পালন করবে। দমন-পীড়ন ও জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে যে শেষ রক্ষা হয় না এটি আসলে শাসকরা বুঝতে চায় না, ক্ষমতার মোহে তারা বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে এক অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত জনতার শক্তির কাছে তাদের করুণ পরাজয় বরণ করতে হয়, ধিকৃত শাসক হিসেবে ইতিহাসে তাদের নাম লিপিবদ্ধ হয়। নিকট অতীতে মইন-ফখরুউদ্দীনের কুখ্যাত জরুরি সরকার রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষের ওপর অহেতুক দমন-পীড়ন ও জেল-জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। মানুষ তাদের এখন ধিক্কার দেয়। দমন-পীড়নের ফল যে শেষ পর্যন্ত ভালো হয় না, এর চেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত আর কিইবা হতে পারে।
আসলে ক্ষমতার মোহ পেয়ে বসেছে শাসকদের। দমন-পীড়ন, জুলুম-নির্যাতন এবং গুম-অপহরণ-গুপ্তহত্যাকে তারা ক্ষমতায় থাকার উপায় মনে করছে। হামলা-মামলা, জেল-জুলুম ও ভয়-ভীতি-আতংক সৃষ্টি করে, বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্বশূন্য করার বিপজ্জনক খেলায় তারা মেতেছে। শাসকদের বুঝতে হবে, বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; সামাজিক শক্তিও বটে, ঢালাও গ্রেফতার ও দমন-পীড়ন চালিয়ে দলটিকে স্তব্ধ করা যাবে না। অতীতে বহুবার প্রমাণ হয়েছে, শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গ্রেফতার করে দলটিকে স্তব্ধ করা যায় না। বরং যারাই দলটিকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষকে অনেক স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। বাংলাদেশ ডিজিটাল হবে, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে ইত্যাদি। কথা হল, মানুষকে যে স্বপ্নই দেখানো হোক না কেন, স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। দমন-পীড়ন, গুম-গ্রেফতার ও জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাতে গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের যেটুকু উন্নতি হয়েছে, তা ধরে রাখাই কঠিন হবে। রাজনীতিতে অশুভ শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করা বাঞ্ছনীয় নয়, রাজনীতিকরা নিখোঁজ হবেন এবং অহেতুক ও অন্যায়ভাবে জেলে যাবেন এটিও মেনে নেয়া যায় না; কেননা খোদ রাজনীতিকদের জন্যই তা ভয়ংকর, আগে পরে রাজনীতিকরাই এর শিকার হবেন। বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এসব নিঃসন্দেহে অশনি সংকেত। রাজনীতিতে যদি পরমতসহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে কোনোভাবেই দেশে স্থিতি ও শান্তি বিরাজ করবে না। দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রফতানি ব্যাহত হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ হবে, নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে না, দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত হবে, সর্বোপরি জিডিপির সূচকও নিচের দিকে নামবে।
অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের রাজনীতি নিয়ে একটি রফতানিমুখী দেশ চলতে পারে না। তাই আগে রাজনীতি ঠিক করতে হবে। রাজনীতিকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সংঘাত-সংঘর্ষের মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। দম্ভ ও পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বাক্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। জেলে আটক রাজনীতিকদের মুক্তি দিতে হবে। দ্বন্দ্ব-সংঘাত উসকে দেয় এ ধরনের বক্তৃতা-বিবৃতি দেয়া বন্ধ করতে হবে। গণতন্ত্র মেনে রাজনীতি করলে রাজনীতি কোনোভাবেই সহিংসতার পথে ধাবিত হয় না। রাজনীতিতে পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে এবং বিজয়কে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ছোট কোনো জনপদ নয়। জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের অষ্টম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী এখন বিশ্বের অনেক শক্তিধর দেশ। চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ বড় বড় দেশ বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ। কাজেই বাংলাদেশের শত্রু এখন চতুর্মুখী। এটি এদেশের রাজনীতিকদের বুঝতে হবে, সংকীর্ণ মনের রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সামনে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করতে হবে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সার্ক কি কখনও যথার্থ আঞ্চলিক সংস্থা হতে পারবে? by ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

সম্প্রতি সার্ক নেতাদের আরেকটি দ্বিবার্ষিক ‘বনভোজন’ সাড়ম্বরে শেষ হয়েছে। এবারের বনভোজনটির স্থানও ছিল যথাযথ। পর্বতকন্যা নেপাল। রাজকীয় বনভোজনে অংশগ্রহণকারী রাজপুরুষরা ফিরে এসেছেন এবং ভোজনতৃপ্তির ঢেকুর তুলে পরবর্তী বনভোজনের ‘মেনু’ পর্যালোচনা করছেন। সার্ক যে এখনও ঠুঁটো জগন্নাথ হয়েই আছে এবং আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে তার ‘যাত্রাই এখনও শুরু হয়নি’ (Non Starter) সেই বাস্তবতা নতুনভাবে উপস্থাপন করা হল। এবারে অবশ্য পর্বত দু’-একটি মূষিক প্রসব করেছে। একটি- ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চূড়ান্ত করার আশ্বাস। অপরটি নেপাল, ভুটান ও ভারতের কিছু বিদ্যুৎ বাংলাদেশের কাছে ‘বিক্রয়ে’র প্রস্তাব। এ নিয়েই আমাদের সরকারি মহলে আহ্লাদের যেন সীমা নেই। এ বগল-বাদ্য কতটা অর্থবহ সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।
ছিটমহল
ছিটমহল হচ্ছে বাংলার বুক চিরে রক্তক্ষরণের ক্ষতচিহ্ন। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাজনের সময় র‌্যাডক্লিফ সাহেবের ঝড়ো গতির পেন্সিল চালনায় সীমান্তরেখা অংকনের পর দেখা যায়, কিছু ভারতীয় মালিকানাধীন ভূমি বাংলাদেশের ভেতরে এবং বাংলাদেশী মালিকানাধীন কিছু ভূমি ভারতের ভেতরে পড়ে গেছে। জমিদারি বা জোতদারির সূত্র থেকে এ সমস্যার উদ্ভব ঘটে। সীমান্তের দু’পাশে ছড়িয়ে থাকা এ জমির টুকরোগুলোকেই ‘ছিটমহল’ নামে অভিহিত করা হয়। ১৯৪৭ সালেই এ ছিটমহলগুলোর বিনিময়ের প্রস্তার ওঠে। কিন্তু গোটা পাকিস্তান আমলে তাতে কোনোই অগ্রগতি হয়নি। ফলে এক দেশের ভেতরে অন্য দেশের ছিটমহলের অধিবাসীরা বহুবিধ সমস্যার মোকাবেলা করে কার্যত বন্দি জীবনযাপন করে আসছেন।
১৯৭৪ সালের ১৬ মে সম্পাদিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে এ ছিটমহলগুলো পরস্পর বিনিময়ের মাধ্যমে এই বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই চুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ভারতের ভেতরে থাকা সবচেয়ে বড় বাংলাদেশী ছিটমহল বেরুবাড়ী তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রত্যাশা ছিল, অতঃপর অন্যান্য ছিটমহলও অনুরূপভাবে হস্তান্তরিত হবে। হিন্দু অধ্যুষিত বেরুবাড়ীর বিনিময়ে ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের সীমানা সংলগ্ন দুটি মুসলমান অধ্যুষিত ছিটমহল, আঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম, বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য এক টুকরা জমি (১৭৮x৮৫ মিটার) বাংলাদেশকে চিরস্থায়ী লিজ দেয়ার সমঝোতা হয়। দুর্ভাগ্যবশত ভারতীয় পক্ষ স্থানীয় জনগণের আপত্তি এবং ভারতীয় সংবিধানের কতিপয় ধারার অজুহাত দেখিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করতে থাকে। ফলে চুক্তিটি গত ৪০ বছর ধরে হিমঘরে পড়ে আছে। ফলে বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অধিবাসীরা এখনও চরম দুর্ভোগে রয়েছেন, এক দেশের নাগরিক অপর দেশের অভ্যন্তরে কার্যত আটকা পড়ে আছেন। তাদের নিজ নিজ দেশের বৃহত্তর জাতীয় জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পদে পদে বাধা পেতে হয়। আবার যে দেশের ভেতরে তারা অবস্থান করছেন, সে দেশের জনজীবনের সঙ্গেও বোধগম্য কারণে তাদের সম্পর্ক সংঘাতময় হয়ে থাকছে। দু’পাশে সর্বমোট ১৬২টি ছিটমহলে দু’দেশের প্রায় ৫২ হাজার মানুষ এ দুর্ভোগে আছেন।
মনে রাখতে হবে, সবচেয়ে বড় ছিটমহলটি ছিল বেরুবাড়ী। যা ছিল বাংলাদেশী মালিকানাধীন; কিন্তু পড়েছে ভারতে। এটি একটি পুরো ইউনিয়ন, যার আয়তন ১১.২৯ বর্গকিলোমিটার, যা ১৯৭৪ সালে ভারতকে হস্তান্তর করা হয়েছে। অবশিষ্ট ছিটমহলগুলো বিনিময় সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ পাবে তার অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল, যেগুলোর মোট আয়তন হবে ১৭ হাজার ২০০ একর। বিনিময়ে ভারত পাবে তার অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশী ছিটমহল। যেগুলোর মোট আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর। বেরুবাড়ী, আঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম ছাড়া অন্য ছিটমহলগুলোয় জনবসতি খুব সামান্য।
অপদখলীয় ভূমি বিনিময়
ছিটমহলের পাশাপাশি রয়েছে দু’দেশের সীমান্তে কিছু ‘অপদখলীয় ভূমি’। মূলত নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও চর জেগে ওঠার কারণে অথবা বিরান অঞ্চলে সীমান্ত ঠিকভাবে চিহ্নিত না থাকায় এ সমস্যার উদ্ভব। এরকম ভূমি বাংলাদেশের ভেতরে আছে ভারতের ৩ হাজার ১৯৭ একর, ভারতের ভেতরে আছে বাংলাদেশের ২ হাজার ১৬৮ একর। বেরুবাড়ীসহ হিসাব কষলে এ ভূমি বিনিময়ে দু’পক্ষে আদান-প্রদান সমান সমান। অথচ এ ভূমির জন্য গত ৪০ বছর কত বৈঠক, কত বিবাদ-বিসম্বাদ, কত বক্তৃতা-বিবৃতি, কত আলোচনা-পর্যালোচনা, কত লেখালেখি। স্পষ্টত; সমস্যা সমাধানে সদিচ্ছার অভাবেই এটি এতদিন ঝুলে আছে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে বরাবরই এক পা এগিয়ে থেকেছে। আগ্রহের অভাবটা ছিল বরাবরই ভারতের দিক থেকে। যদিও ভারত শুরুতেই লাভবান হয়েছে বেরুবাড়ী পেয়ে এবং অবশিষ্ট বিনিময় সম্পন্ন হলেও ভারতই লাভবান থাকবে।
ভূমি বিনিময়ে সামান্য কমবেশি হওয়ার ব্যাপারটা ধর্তব্য নয়। ৫২ হাজার মানুষের নিত্যদিনের অবরুদ্ধ ও অস্বস্তিকর অবস্থার অবসান ঘটার ব্যাপারটাকেই বড় করে দেখতে হবে। দু’দেশের মধ্যে এ সামান্য ব্যাপার নিয়ে নিত্যদিনের মন কষাকষিও কোনো পক্ষের জন্যই স্বস্তিকর নয়। এবারকার সার্ক সম্মেলনের জের ধরে ভারতীয় পক্ষের সুমতি জাগ্রত হয়েছে, দু’দেশের সম্পর্কের জন্য তা অবশ্যই শুভ সংবাদ। এখন অপেক্ষা এ প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেটা নির্ভর করবে ভারতের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। ভারত তার লোকসভায় এ ব্যাপারে প্রস্তাব আনবে, সেজন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে সমঝোতা
এবারের সার্ক সম্মেলনে অপর যে বিষয়টিতে সমঝোতা হয়েছে তা হচ্ছে বিদ্যুৎ বিনিময়ে সম্মতি। একে ‘বিনিময়’ না বলে ‘বিক্রয়’ বলাই উত্তম। ভুটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প একান্তভাবেই ভারতীয় কর্তৃত্বাধীন, নেপালের অবস্থাও তথৈবচ। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মণিপুর, মেঘালয়, সিকিম ও আসামে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিয়েছে। মোটের ওপর সার্ক দেশগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ভারতই বিক্রেতা, অন্যরা ক্রেতা। আবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ক্রেতা একান্তভাবেই বাংলাদেশ। বর্তমান বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আকর্ষণীয় হতে পারে যদি বিদ্যুতের মূল্য, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং কারিগরি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। দু’দেশের সম্পর্কে নিত্যদিনের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে যা ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না (কয়েকদিন আগে ভারত থেকে ক্রয় করা বিদ্যুতের সঞ্চালনা থেকে উদ্ভূত সমস্যায় দেশজুড়ে যে অচিন্তনীয় বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে সে বিষয়টি সব সময় মাথায় রাখতে হবে)। তাছাড়া অন্য দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কারণে দেশের জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রয়াসে ভাটা পড়লে তার পরিণাম হবে মারাত্মক। জ্বালানি খাতে পরনির্ভরশীল থাকা খাদ্যে পরনির্ভরশীল থাকার চেয়েও ভয়ংকর। কারণ, খাদ্য ঘাটতি দু’-চার দিন সহ্য করা যায়, বিকল্প উৎস খোঁজা যায়; কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার পরিণতি কী হতে পারে তা আমরা দেখেছি।
কানেকটিভিটি এবারকার সার্ক সম্মেলনে আঞ্চলিক ‘কানেকটিভিটি’ নিয়ে কিছু কথাবার্তা হয়েছে; কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষ করে রেল ও সড়ক যোগাযোগ অবারিত করার প্রস্তাবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের পূর্বমুখী রুট বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সঠিকভাবে নির্ধারণের বিষয় আলোচিত হয়নি। এ বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সে ব্যাপারে কোনো জোরালো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।
পাকিস্তানের ওপর দিয়ে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়া থেকে তেল-গ্যাস দক্ষিণ এশিয়ায় আনার জন্য পাকিস্তানের প্রস্তাবে ভারত কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
এ সম্মেলনে চীনকে সার্কের সদস্যপদ প্রদান করার বিষয়টি ভারতের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে। অপরদিকে ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে মিয়ানমার বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ার অংশ বিবেচিত হয়ে এসেছে। সার্কের সদস্যপদের ব্যাপারে আফগানিস্তানের চেয়ে মিয়ানমারের দাবি অগ্রগণ্য। কিন্তু আফগানিস্তানকে পূর্ণ সদস্যপদ দেয়া হলেও মিয়ানমারকে পর্যবেক্ষকের পর্যায়ে রাখা হয়েছে। মিয়ানমারকে সার্কের পূর্ণ সদস্য করার ব্যাপারে বাংলাদেশেরই অগ্রণী ভূমিকায় থাকা প্রয়োজন।
সার্ক কি সত্যই যথার্থ ‘সহযোগিতা’ সংস্থা হয়ে উঠবে?
আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে সার্ক পৃথিবীর অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বহুদূরে, এমনকি প্রতিবেশী ‘আসিয়ানে’রও ধারেকাছে নয়। এর বড় কারণ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আয়তন ও শক্তিমত্তার বিস্তর পার্থক্য। এর আটটি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে একটির আয়তন ও শক্তিমত্তা অপর সাতটির মিলিত আয়তন ও শক্তিমত্তার চেয়ে বেশি। ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বিশাল ভারত রয়েছে কেন্দ্রীয় অবস্থানে। তার সঙ্গে আছে ছয়টি রাষ্ট্রের সীমান্ত। সবারই ভারতের সঙ্গে রয়েছে কিছু না কিছু সীমান্ত বিরোধ এবং সীমান্ত সম্পর্কিত নানাবিধ সমস্যা। একমাত্র পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ছাড়া আর কারও সঙ্গে কারও সীমান্ত-সম্পৃক্ততা নেই। যা সার্কের ‘ভারতকেন্দ্রিকতা’ আরও বাড়িয়ে দেয় এবং অপরাপর রাষ্ট্রকে একবারেই প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেয়।
অপরদিকে সার্কের কর্মপরিধিতে দ্বিপাক্ষিক বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত নয়। দ্বিপাক্ষিক বিরোধ এ ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কোনো সুযোগ নেই। ভারত এতে রাজি নয়। এ সীমাবদ্ধতা ফোরাম হিসেবে সার্কের কার্যকারিতা ও উপযোগিতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে রেখেছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে সার্ককে কার্যকর ও অর্থবহ করতে হলে এ মৌলিক বিষয়গুলো মাথায় রেখে এগোতে হবে। প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক বিরোধ সার্ক ফোরামে আলোচনার সুযোগ অবারিত করতে হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে বর্তমান বিশ্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সবচেয়ে সফল উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। পঞ্চাশের দশকের ‘ইউরোপীয় কয়লা ইউনিয়ন’ থেকে যাত্রা শুরু করে আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত আসতে অনেক ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়েছে এবং সেজন্য অনেক চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে। এক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে এগিয়ে আসতে হয়েছে এবং ছাড় দিতে হয়েছে। শক্তিমান সদস্যদের বেশি ছাড় দিতে হয়েছে (যেমন জার্মানি)। তবে একথা মনে রাখতে হবে যে, পৃথিবীর সব অঞ্চলের ভৌগোলিক রাষ্ট্রবিন্যাস, স্থানিক সমস্যাবলী এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিকতার ধরন অভিন্ন নয়। ফলে সব আঞ্চলিক সংস্থা একই মডেলের হবে, তা আশা করা যায় না। সার্কের ক্ষেত্রেও তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিকতার নিরিখে একটি কার্যকর কাঠামো নির্মাণ করতে হবে। ধরিত্রীর প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক আস্থা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে পরস্পর-নির্ভরশীলতার কোনো বিকল্প নেই। অবাধ জনচলাচল, সমন্বিত ও অবিচ্ছেদ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব-পরিবেশ, সহিংসতামুক্ত জনজীবন, ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সার্বিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমষ্টিগতভাবে এগিয়ে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সেক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে রাখা যেতে পারে।
সেই অর্থে, আবারও বলব, সার্কের যাত্রা এখনও শুরু হয়নি।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক

বিধ্বস্ত বিমানের ভয়েস রেকর্ডার উদ্ধার

ইন্দোনেশিয়ায় ডুবুরিরা সমুদ্র তলদেশ থেকে মঙ্গলবার এয়ার এশিয়ার বিধ্বস্ত বিমানের ককপিট ভয়েস রেকর্ডার উদ্ধার করেছে। ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়া নগরী থেকে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পথে জাভা সাগরে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এদিকে ওই এয়ারলাইন্সের প্রধান তাদের ‘কঠিনতম সময়’ কাটিয়ে উঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বিমানটির আরেকটি ব্ল্যাকবক্স ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার উদ্ধারের একদিন পর এটি উদ্ধার করা হল। বিমানটি কি কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে সে ব্যাপারে যন্ত্রটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।॥ৎ ফ্লাইটটি গত ২৮ ডিসেম্বর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কবলে পড়ে বিধ্বস্ত হয়।
এটি ১৬২ জন আরোহী নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়া থেকে সিঙ্গাপুরে যাচ্ছিল। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৪৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উড়োজাহাজের প্রধান কাঠামোর মধ্যে আরও অনেকের লাশ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এ কাঠামোর সন্ধান পাওয়া যায়নি। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ডাটা রেকর্ডার ছাড়া এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। খারাপ আবহাওয়ার কারণে প্রায় উদ্ধার কাজ ব্যাহত হলেও ব্ল্যাকবক্সের শব্দ সংকেত চূড়ান্তভাবে শনাক্ত হওয়ায় সপ্তাহান্তে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। এ অনুসন্ধান অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মঙ্গলবার ককপিট ভয়েস রেকর্ডার সমুদ্র তলদেশ থেকে উদ্ধার করার খবর নিশ্চিত করেছেন। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ভয়েস রেকর্ডারটি নৌবাহিনীর জাহাজ বান্দা আচেহতে নেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া ভিত্তিক এয়ার এশিয়ার ১৩ বছর ধরে সফলভাবে পথ চলার ক্ষেত্রে তাদের ফ্লাইটের এটি ছিল প্রথম বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এএফপি।

একুশ শতকে চীনের ২১ চমক

অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক বিলাসী মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে চীন। ১১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ব্যয়ে দেশটি এমন ২১টি প্রজেক্ট নির্মাণ করতে যাচ্ছে, যা তাক লাগিয়ে দেবে বিশ্বকে। এত বড় ও দীর্ঘ সেসব স্থাপনা যে চীনের মহাপ্রাচীরকে মনে হবে খুব ক্ষুদ্র কিছু। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ আন্ডার ওয়াটার টানেল, সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর, সবচেয়ে বড় গ্যাস পাইপলাইন, সবচেয়ে বড় খেলার মাঠসহ এমন দুই ডজনের মতো প্রজেক্ট নির্মাণ শুরু হয়েছে। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের। চীনের চমক লাগানো এই প্রজেক্টের একটি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ আন্ডার ওয়াটার টানেল নির্মাণ। ভূমিকম্পপ্রবণ এশিয়ার এই দেশের অভ্যন্তরে পানির নিচ দিয়ে খনন করা হবে টানেল। যার দৈর্ঘ্য হবে ইংলিশ চ্যানেলের তুলনায় দ্বিগুণ। উত্তরাঞ্চলীয় দুটো বন্দর নগরীর মধ্যে রেলপথও তৈরি হবে এই সুড়ঙ্গে। এটি নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৬০০ কোটি ডলার। ইতিমধ্যে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্রিজ,
বৃহত্তম বিমানবন্দর ও দীর্ঘতম গ্যাস পাইপলাইনের। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের ১৫০০ মাইল জায়গা নিয়ে এসব প্রজেক্টের নির্মাণ কাজে ব্যয় হবে ৮০০০ কোটি ডলার। সাংহাই নগরীতে কিছুদিনের মধ্যেই উদ্বোধন হবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম টাওয়ারের। ২৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত সাংহাই টাওয়ার নামের এই আকাশছোঁয়া ভবনটির উচ্চতা ২০৭৩ ফুট। অন্যদিকে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা টাওয়ারের উচ্চতা ২৭১৬ ফুট। তবে এই শহরেই নির্মিত হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম খেলার মাঠ ও পার্ক ‘সাংহাই ডিসনে রিজোর্ট’। ২২৫ একর জায়গা নিয়ে ম্যাজিক কিংডম স্টাইলের এই পার্ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫০০ কোটি ডলার। আগামী বছর এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এদিকে দালিয়ান শহরে তৈরি করা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আন্ডার ওয়াটার রেল টানেল, যা নগরের ১৬৩ মাইল ট্রানজিট ব্যবস্থাকে একীভূত করবে। ৪৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত বিমানবন্দর। বিলাস বহুল এসব প্রজেক্টের প্রায় প্রতিটির কাজই শুরু হয়ে গেছে। চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন গত নভেম্বরে এই ২১টি প্রজেক্ট বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়। চীনের এসব প্রজেক্ট সম্পর্কে ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ হুয়াং ইউকন বলেন, ‘চীনের ইতিহাসটাই এমন।

পাক-ভারত সমঝোতা সময়ের সিদ্ধান্ত

আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। পাকিস্তান ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বের বিষয়টি বলে শেষ করা যাবে না। এটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।’ মঙ্গলবার ইসলামাবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। জন কেরি বলেন, ‘এখন দু’দেশের মধ্যে একটা কঠিন সময় চলছে।
ঐতিহাসিক সমঝোতার জন্য অনেক সময় দেয়া প্রয়োজন। সংলাপের মাধ্যমে দু’দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিতে হবে।’ এদিন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উগ্রপন্থীদের দমনে দেশটির সরকারের উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের একটি স্কুলে নৃশংস জঙ্গি হামলার পর এক সফরে ইসলামাবাদ এসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি মঙ্গলবার এ কথা বলেন। পাকিস্তান গত জুন মাসে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তালেবান ও অন্য জঙ্গি মোকাবেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করে। তিনি বলেন পাকিস্তান এই অভিযানের জন্য ‘বিশাল কৃতিত্বের’ দাবিদার। তবে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, এ অভিযান এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তান আফগান সীমান্তে অবস্থিত। ফলে এখান থেকে জঙ্গিরা আফগানিস্তানের ভেতরে তালেবান বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইরত মার্কিন সৈন্যদের ওপর হামলা চালিয়ে আসছিল। তাই ওই এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
জন কেরি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি জোর দিয়ে বলতে চাই সীমান্ত এলাকা ও অন্যান্য স্থানে (সন্ত্রাসী) হুমকি নির্মূলে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদারে অঙ্গীকারবদ্ধ।’ কেরি বলেন, তালেবানের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো কেবল পাকিস্তান ও এর প্রতিবেশীদের জন্য নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্বের জন্যও হুমকি। সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে ভারত ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের সহায়তা দেয়ার অভিযোগ করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষমন্ত্রী খাজা আসিফ। তার দাবি, ভারত তার দেশের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে ‘পৈশাচিক হামলা’ চালাতে সহায়তা দিচ্ছে। পাকিস্তানের বেসরকারি চ্যানেল ডন নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান নিয়ে ষড়যন্ত্র করে ভারত। তালেবানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আছে এবং বেলুচিস্তানের গেরিলা তৎপরতার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায়ই নেই। পাকিস্তান ছায়াযুদ্ধ চায় ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান দলবীর সিং বলেছেন, ‘জম্মু-কাশ্মীর সীমান্তে ছায়াযুদ্ধ বাধাতে চাচ্ছে পাকিস্তান। নিজেদের নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দেশটি এমনটা করতে চাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে জম্মু-কাশ্মীর সীমান্তের সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের বেপরোয়া মনোভাবের পরিচয় ফুটে উঠেছে।’ সীমান্তে অস্ত্রবিরতি লংঘন প্রসঙ্গে দলবীর সিং বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা লাইন অব কন্ট্রোল দিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে না। তাই তারা আন্তর্জাতিক সীমাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে।

বিশ্বে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় বিল গেটস্

নিজ কর্মের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে শ্রদ্ধাভাজনে পরিণত হওয়া ব্যক্তিদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস্। ১৩টি দেশের নাগরিকদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে তৈরি করা এ তালিকায় বিল গেটস্রে পরের স্থানেই আছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তালিকায় বিশ্বের ৩০ জন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হয়। খবর এনডিটিভির। দ্য টাইমস ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য ‘ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট অ্যাডমায়ারড পিপল’ নামের ওই জরিপ চালায় ইউগোব নামের একটি প্রতিষ্ঠান। জরিপে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, চীন, মিসর, নাইজেরিয়া ও ব্রাজিলের ১৪ হাজার মানুষের মতামত নেয়া হয়। ওই তালিকার প্রথম ১০ জনের মধ্যে চারজনই ভারতীয়।
সব মিলিয়ে তালিকায় ভারতীয়ের সংখ্যা ৭ জন। তালিকায় ৭ম অবস্থানে আছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি, ৯ম এ আছেন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন। এছাড়াও তালিকায় আছেন ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম আজাদ (১০), সমাজকর্মী আন্না হাজারে (১৪), দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল (১৮) ও ব্যবসায়ী রতন টাটা (৩০)। তালিকার শীর্ষস্থানে অন্যদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন (৩), পোপ ফ্রান্সিস (৪) ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের (৬) মতো ব্যক্তিরা।

আমাকে জোর করে হামলায় পাঠানো হয়েছিল

‘আমার বাবা আর বড় ভাই আমাকে জোর করে আত্মঘাতী হামলা করতে পাঠিয়েছিলেন।’ বার্তাসংস্থা বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছে দশ বছরের আফগান শিশু স্পোজমাই। সোমবার আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে এক পুলিশ ছাউনিতে আÍঘাতী হামলা চালাতে গিয়ে ধরা পড়েছে এই বাচ্চা মেয়েটি। হামলার পূর্ব মুহূর্তে এক সেনা সদস্য ‘সুইসাইড ভেস্ট’সহ (আÍঘাতী কটি) তাকে হাতেনাতে পাকড়াও করে।
এরপর তাকে প্রদেশের রাজধানী লস্করঘাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ঝড় তুলেছে। সম্প্রতি বিবিসিতে স্পোজমাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে সে হামলার বিষয়ে নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে। তার অভিযোগ, বাবা আর বড় ভাইয়ের চাপের মুখে সে এ হামলায় রাজি হয়েছিল। তারা ওকে মেরেধরে আÍঘাতী কটি পড়িয়ে দেন। স্পোজমাই বিবিসিকে জানায়, তাদের নির্দেশ পালন করতেই সে হামলা করতে এসেছিল। পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর এখন আর বাড়ি ফিরতে চাইছে না স্পোজমাই।
ইতিমধ্যে সে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের কাছে নিজের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেয়ার আবেদন জানিয়েছে। এ সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, মেয়েটির গোত্রের প্রবীণ ব্যক্তিরা তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলেই কেবল তাকে স্বজনদের কাছে পাঠানো হবে। ধারণা করা হচ্ছে স্পোজমাই এক প্রসিদ্ধ তালেবান নেতার ছোট বোন। সেই ভাই তাকে আত্মঘাতী হামলায় উৎসাহ জুগিয়েছিল। বিবিসির নিউজ ডে নামক অনুষ্ঠানে স্পোজমাই বলে, সে হামলায় ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু তার ভাই তাকে বলে, তার একমাত্র লক্ষ্য হল মৃত্যু। এদিকে ধরা পড়ার পর তার বাবা তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু স্পোজমাই তার বাবাকে সরাসরি না করে দিয়েছে। সে বলেছে, ‘আপনার কাছে যাওয়ার চেয়ে বরং মৃত্যুকে বেছে নেব।’ তার ধারণা, বাড়িতে ফিরলে আবারও তাকে হামলা করতে পাঠানো হবে। সে বলে, ‘বাড়ি ফিরলে আবার একই ঘটনা ঘটবে। ওরা আবার আমাকে জোর করে হামলা করতে পাঠাবে।’
সে তার পরিবারের বিরুদ্ধে তাকে লেখাপড়া করতে দেয়নি বলেও অভিযোগ করেছে। সে বলে, ‘আমি বাড়িতে সব কাজ করতাম। রান্না করতাম, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতাম। তারপরও ওরা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। এমন আচরণ করত যেন আমি ওদের কেনা বাঁদি।’ গত সপ্তাহে সে প্রেসিডেন্টের কাছে নিজের জন্য একটি নিরাপদ বাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়ার আবেদন করেছে। এ সম্পর্কে তার স্পষ্ট ঘোষণা, ‘আমি আর বাড়ি ফিরে যাব না। আল্লাহ আমাকে আÍঘাতী বোমারু হওয়ার জন্য পাঠায়নি।’ তালেবান গোষ্ঠীর এ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট কারজাই। তবে তারা এ ধরনের কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬.২%: বিশ্বব্যাংক

চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৬ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের এ পূর্বাভাস সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। 'গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস' নামের এ রিপোর্টে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরুর আগেই রিপোর্ট তৈরি করায় এতে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এতে বাংলাদেসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতাকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে সরকার দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আর বিশ্বব্যাকের পূর্বাভাস ৬ দশমিক ২ শতাংশ। আগের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১৩-১৪ সালে সরকারের ৭ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।
এবারের রিপোর্টে ২০১৪ সালকে বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি 'হতাশাজনক বছর' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।  এতে ২০১৪ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা ৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বচানের আগে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছিল তা নির্বাচনের পরে না থাকায় এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।
এই স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে উল্লেখ করা হয় রিপোর্টে। এতে বলা হয়, যদি রাজনিত পরিস্থিতি শান্ত থাকে তাহলে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রফতানি ও রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়বে এবং বেসরকারি ভোগ চাহিদা বাড়বে। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
রিপোর্টে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারত ও নেপালের প্রবৃদ্ধি বাড়বে উল্লেখ করা হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি কমবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

উদ্বেগ-আতঙ্ক by নুরুজ্জামান লাবু

অরক্ষিত হয়ে পড়েছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকা। পরপর কয়েকটি ঘটনার পর ডিপ্লোমেটিক জোন বলে পরিচিত এ এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধে প্রায় প্রতিদিনই কূটনৈতিক এলাকায় কোন না কোন ঘটনা ঘটছে। যানবাহনে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ ছাড়াও গুলির ঘটনাও ঘটছে প্রায়ই। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কোন ঘটনারই কূলকিনারা করতে পারছেন না। সর্বশেষ গুলশান-২ নম্বর চত্বরের পাশে ৪৬ নম্বর সড়কে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে গুলি ও গাড়িতে আগুনের ঘটনায় কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কূটনৈতিক এলাকায় সব সময় নিরাপত্তা জোরদার থাকে। বর্তমানে আগের চেয়ে আরও বেশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় বিভিন্ন দূতাবাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকও করেছেন। জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান জোনের উপকমিশনার (ডিসি) লুৎফুল কবীর বলেন, কূটনৈতিক এলাকায় প্রবেশের প্রতিটি রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগের চেয়ে আরও বেশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার নিয়ে বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথাও স্বীকার করেন তিনি। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত শনিবার রাত ৯টায় গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। এর ঘণ্টাখানেক পর আরেক উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর গুলশান এভিনিউয়ের বাড়ি লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরদিন রাতেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান ও খন্দকার মোশাররফ হোসেনের গুলশান-২ নম্বরের বাসার সামনেও ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। এসব ঘটনায় পুলিশ চারটি জিডিও করেছে। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় কানাডিয়ান হাইকমিশনের সামনে ককটেল ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনাতেই দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছে। মোটরসাইকেলে কখনও দু’জন, কখনও তিনজন আরোহী ককটেল নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ বা গুলি ছুড়ে পালিয়ে গেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কয়েক দিন ধরেই গুলশান এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কোন কোন রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে যাতায়াত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পুলিশের গুলশান জোনের এক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার রাতে রিয়াজ রহমানকে গুলি ও গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনার পর গুলশান এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়তি আরও ৩০টি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগের চেয়ে ফুট ও প্যাট্রলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) নূরুল আলম বলেন, কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তার জন্য যা যা করণীয় তার সবই করা হচ্ছে।
এদিকে গতকাল গুলশান-বারিধারা ও বনানী এলাকার বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। বৈঠকে কানাডিয়ান হাইকমিশন অফিসের সামনে ককটেল হামলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আগুন, ককটেল ও গুলির বিষয়ে কথা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগের চেয়ে আরও বেশি নিরাপত্তা জোরদার করার কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করেন। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর গুলশান-বারিধারা ও বনানীর কূটনৈতিক জোনে অর্ধশত দেশের দূতাবাস রয়েছে। এসব এলাকা স্বাভাবিক সময়েও কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়। কিন্তু এবার নিরাপত্তার বলয় ভেঙে প্রায়ই নানা ঘটনা ঘটছে। এজন্য দূতাবাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে বলে। কূটনৈতিক এলাকার বিভিন্ন দূতাবাসের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের চ্যান্সেরি বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আতাউল কিবরিয়া বলেন, দূতাবাস এলাকায় আগে থেকেই কড়া নিরাপত্তা থাকে। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে ঘটতে না পারে এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা, নিহত ৫- পুলিশ–বিজিবির পাহারার মধ্যেই হামলা, দগ্ধ ১১

(দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ছে জিপ, গতকাল বেলা একটায় রাজধানীর মিরপুর রোডে সানরাইজ প্লাজার সামনে l ছবি: প্রথম আলো) সামনে পুলিশ আর পেছনে বিজিবির গাড়ি। মাঝে ৩০টি যাত্রীবাহী বাস ছুটছিল ঢাকার দিকে। এ রকম কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই একটি চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারা হয়। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে বাসটি। ঘটনাস্থলেই পুড়ে মারা যায় এক শিশুসহ চারজন। দগ্ধ হয় আরও ১২ জন। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরও একজন। বিভিন্ন হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন বাকি ১১ জন। নৃশংস এ ঘটনাটি ঘটেছে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের মিঠাপুকুরে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সাতজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য তিনজন রংপুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে নৃশংস এ ঘটনা ঘটল। অবরোধের সমর্থকেরা বাসে পেট্রলবোমা ছুড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। তাঁদের একজন শিবিরের কর্মী।
নিহত ব্যক্তিদের একজন ছাড়া সবার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন বিজয় তাবোগপুর গ্রামের রহিমা বেগম (৬০), তাঁর ছেলে রহিম বাদশা (৩৭) ও ননদ দরিচর গ্রামের জব্বার আলীর মেয়ে জেসমিন আক্তার (১৮) এবং রংপুরের সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তছিরন বেগম (৫৫)। গত রাত সোয়া ১১টার দিকে তছিরন বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। একই হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন দগ্ধ মিনারা বেগম (২০)। আর পুড়ে যাওয়ার কারণে শিশুটিকে কেউ চিনতে পারছে না। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রংপুরের পুলিশ সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় থেকে বিভিন্ন সময়ে আসা ঢাকাগামী ৩০টি যাত্রীবাহী বাস রংপুর শহরের মডার্ন মোড় থেকে পুলিশ ও বিজিবির পাহারায় রাত সোয়া ১২টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ওই বাস বহরের সামনে পুলিশের গাড়ি ছিল। পেছনে ছিল বিজিবির গাড়ি। বহরের ২৩ নম্বরে ছিল হামলার শিকার খলিল এন্টারপ্রাইজের বাসটি। উলিপুর থেকে ৪০ জনের মতো যাত্রী নিয়ে এটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। ১৫ মিনিটের মধ্যে বাসগুলো মিঠাপুকুর উপজেলার জায়গীরহাট পার হয়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বাতাসন ফতেপুর এলাকায় পৌঁছালে হামলার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আবদুল কাদের খান জানান, গুরুতর অগ্নিদগ্ধ উলিপুরের কাশিমবাজার গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে তছিরন খাতুন ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মিনারা বেগমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সাতজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও তিনজনকে রংপুর সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছে। চারটি লাশ মেডিকেল কলেজের মর্গে রয়েছে।
নিহত রহিম বাদশার স্ত্রী নিলুফার বেগম (৩২) গতকাল বিকেলে রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে জানান, তিনি স্বামী, শাশুড়িসহ পরিবারের তিনজনকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য রাত নয়টার দিকে ওই বাসটিতে তুলে দেন। রহিম ঢাকায় বাদাম বিক্রি করতেন বলে জানান তিনি। বেঁচে যাওয়া আরেক যাত্রী ঢাকার গাজীপুরের ভাওয়াল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আফসানা মিমি। তিনি জানান, তিনিসহ পরিবারের ১১ জন ওই বাসে ছিলেন। হঠাৎ করেই বাসের সামনের অংশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠতে দেখে সবাই জানালা দিয়ে নামতে থাকেন। বয়স বেশি হওয়ায় তাঁর দাদি নামতে পারেননি। গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হয়ে তিনি এখন চিকিৎসাধীন। আরেক যাত্রী আলেয়া বেগম বলেন, ‘ওই সময় ঘুম ঘুম ভাব ছিল। হঠাৎ চিৎকার শুনি। চোখ মেলিয়া দেখি বাসোত আগুন। জানালা খুলিয়া ঝাঁপ দেই। পুরা বাসটা আগুনে পোড়া গেল।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারীরা জানান, নিহত ব্যক্তিদের শরীর পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। মরদেহগুলো শনাক্ত পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। তবে একজনের হাতের চুড়ি দেখে ও আরেকজনের চুল দেখে শনাক্ত করা হয় যে তাঁরা নারী। ঘটনাস্থলের পাশে বাড়ি মকবুল হোসেনের (৬৮)। ঘটনার পর মানুষের আর্তচিৎকারে তিনি ঘরের বাইরে এসে আঙিনা থেকে আগুনের কুণ্ডলি দেখেন। তিনিই মিঠাপুকুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসকে মুঠোফোনে খবর দেন। তিনি জানান, এ স্থানে আগেও যাত্রীবাহী বাসে ইট-পাটকেল ছোড়া হয়েছে।
মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আলম জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যেতে যেতেই বাসটির অনেকটাই পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসার আগেই চারজন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। রাতেই ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা থেকে শিবিরের এক কর্মীসহ নয়জনকে আটক করা হয়। এঁদের মধ্যে একজন অন্য মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আছেন।
রংপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশি পাহারায় ৩০টি যাত্রীবাহী বাস মডার্ন মোড় থেকে একসঙ্গে ছাড়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারা থাকলেও গতির কারণে বাসগুলো কিছুটা ছাড়াছাড়ি হয়ে পড়ে। এই ফাঁকেই নাশকতা ঘটানো হয়েছে। বহরের অন্য বাসগুলো ঢাকার দিকে চলে যায় বলে জানান তিনি। এসপি আবদুর রাজ্জাক গত রাতে বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমরা মোটামুটি বুঝেছি, হরতাল দিয়ে যারা নাশকতা করছে, তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদ আহাম্মদ বলেন, ‘এ ধরনের নৃশংস ঘটনায় আমরা শোকাহত। জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।’
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত আহত ব্যক্তিদের দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, মহাসড়কের মিঠাপুকুরের সীমান্ত এলাকা থেকে পলাশবাড়ীর সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত একাধিক স্পর্শকাতর স্থানে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

কার্যকর সংলাপ চায় ইইউ, সহিংসতা ও ধরপাকড়ের নিন্দা আসকের

দেশে সংঘাতময় ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ এবং ‘গণতন্ত্র চর্চার স্থান সঙ্কুচিত হওয়া’য় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বাংলাদেশে থাকা মিশন প্রধানরা। গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকে তারা ওই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় ইইউ দূতরা দেশব্যাপী চলমান সহিংসতায় মৃত্যু ও আহত হওয়া, সহায়-সম্পত্তি ধ্বংস করা এবং সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার নিন্দা জানান। দুঃখ প্রকাশ করেন রংপুরে যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তদের আক্রমণের ঘটনায়। ইউরোপের ২৮ রাষ্ট্রের ওই জোটের বাংলাদেশস্থ ডেলিগেশন প্রধানের কার্যালয় থেকে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে জানিয়ে ইইউ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়- গণতন্ত্র চর্চার স্থান সঙ্কুচিত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিশন প্রধানরা বলেছেন, দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে মুক্ত মতপ্রকাশের অধিকার, আন্দোলন ও সমাবেশের পথ রুদ্ধ করা উচিত হবে না। দূতরা সহিংসতা পরিহার এবং প্রকৃত সংলাপের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি তাদের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। এদিকে রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে ইইউ দূতদের সঙ্গে মন্ত্রীর ব্রিফিংয়ের বিষয়ে অবহিত করা হয়। এতে কূটনীতিকদের সঙ্গে মন্ত্রীর নিয়মিত আলোচনার অংশ হিসেবে ব্রিফিংটি আয়োজন করা হয় বলে জানানো হয়। সরকারি ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকাস্থ ইইউ ডেলিগেশনের প্রধান চলমান সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষত জীবন নাশের ঘটনাগুলোর বিষয়ে। সহিংসতা দমনেরও আহ্বান জানান তিনি। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপে বিএনপি নেতা সাবেক রাষ্ট্রদূত রিয়াজ রহমানের ওপর গুলির ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ওই ঘটনার তদন্ত নিশ্চিত করতে সরকার এই মধ্যে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। কূটনীতিকদের তিনি বলেছেন, মিস্টার রহমান কিংবা তার পরিবারের কোন সদস্য এ নিয়ে কোন মামলা করেননি। এ অবস্থায় পুলিশ একটি মামলা দায়ের করেছে। ওই ব্রিফিংয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়া, নরওয়ে, ভ্যাটিকান ও সুইজারর‌্যান্ডের রাষ্ট্রদূতদের  ব্রিফ করেন। সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পরাষ্ট্র সচিব এম. শহীদুল হক উপস্থিত ছিলেন।
সহিংসতা ও ধরপাকড়ের নিন্দা আসকের
চলমান অবরোধ কর্মসূচি, সহিংসতা ও গণগ্রেপ্তারের ঘটনায়  উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশকেন্দ্র (আসক)। বুধবার আসকের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৪ঠা জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ রংপুরে চলন্ত বাসে পেট্রোলবোমা ছুড়ে পুড়িয়ে শিশুসহ চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। চোরাগোপ্তা হামলার কারণে জনমনে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। বিরোধী দলকে সমাবেশ করতে না দেয়া, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়, সংবাদমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের অধিকার অগণতান্ত্রিকভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অবিলম্বে এ অবস্থার অবসান দরকার। সবার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা এবং বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশে বাধা দেয়া থেকে বিরত থাকতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকে যে কোন ধরনের সহিংসতা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ বেছে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

অবরোধের সঙ্গে সারা দেশে হরতাল আজ

অনির্দিষ্টকালের চলমান অবরোধের পাশাপাশি সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা ২০ দলের হরতাল আজ। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে হত্যার উদ্দেশে গুলি করার প্রতিবাদে এ হরতাল ডেকেছে ২০ দল। মঙ্গলবার রাতে বিএনপি’র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ হরতালের ঘোষণা দেন। প্রথমে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার হরতাল ডাকা হলেও জনদুর্ভোগ কমাতে সেটা কমিয়ে আনা হয়েছে ১২ ঘণ্টায়। গতকাল এক বিবৃতিতে রিজভী আহমেদ বলেন, মঙ্গলবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানের ওপর হামলা এবং তাঁকে গুলি করে গুরুতর আহত করার প্রতিবাদে ২০ দলীয় জোটের ডাকে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশব্যাপী ১২ ঘণ্টার সর্বাত্মক হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য ২০ দলীয় জোটের ডাকা হরতাল এবং চলমান অবরোধ কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালনের জন্য দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। রিজভী আরও জানিয়েছেন বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এদিকে ২০ দলের আজকের হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জোটের শরিক দলগুলো। ২০ দলের আজকের হরতাল ও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ সফল করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে শফিউল আলম প্রধান বলেন, কোন উস্কানি ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না। জোটের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকুন। ছাত্র ভাইদের প্রতি আবেদন নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে প্রতিরোধ সংগ্রামকে জোরদার করুন। সরকারের উদ্দেশে প্রধান বলেন, ছল-চাতুরী-জেল-জুলুম, গুম-খুন ও ফাঁসির রশি ঝুলিয়ে ফায়দা হবে না। সুতরাং সময় থাকতে দাবি মানুন-ক্ষমতা ছাড়ুন ও নির্বাচন দিন। লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরান দেশবাসীর প্রতি একই আহ্বান জানিয়ে বলেন, শেখ হাসিনার পতন ঘটিয়ে সন্ত্রাস দুর্নীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে শরিক হোন। দেশবাসীকে সতর্ক অবস্থায় আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন আপসহীনতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশবাসীও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চলমান আন্দোলনে জীবনবাজি রেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণই শুধু করছে না, জীবনকেও বিপন্ন করছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলছে ও চলবে।
বিরোধী হত্যায় সরকার গুপ্তঘাতক নামিয়ে দিয়েছে
বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যায় সরকার গুপ্তঘাতক নামিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, এই ভোটারবিহীন সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করার জন্য গুপ্তঘাতকদের নামিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন পাড়ায়-মহল্লায়। জনগণের তৃণমূল আন্দোলনের চাপে শেষ বিষাক্ত ছোবল দেয়ার জন্যই তারা মরণঘাতী গুপ্তবাহিনীদের দিয়ে কমিটি গঠন করেছে। এরই নির্মম শিকার হয়েছেন দেশের পেশাদার কূটনীতিক, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকার দ্বিতীয় পর্যায়ের বাকশালী দুঃশাসনের চরম সীমায় উপনীত হয়েছে। সকল বিরোধী মত ও দলকে নিশ্চিহ্ন করে শতকরা ৫ ভাগ ভোট পেয়ে অবৈধ একদলীয় শাসনকে টিকিয়ে রাখতে তারা দেশব্যাপী এখন রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়ার কর্মসূচিতে লিপ্ত হয়েছে। রিজভী আহমেদ বলেন, তবে একদলীয় বাকশালী দুঃশাসনের এটি শেষ অন্ধকার। এই অন্ধকার দূরীভূত করার জন্য মৃত্যুকে জয় করার ব্রত নিয়ে ২০ দলীয় জোটসহ আপামর জনসাধারণ এখন দুর্বার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে। তিনি বলেন, শতকরা ৫ ভাগ জনসমর্থনের এই অবৈধ সরকারকে রক্ষার জন্য যারা জনগণের আন্দোলনের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছেন, তারা কেউই রেহাই পাবেন না। দেশের জনগণ তাদের বিচার নিশ্চিত করবেই। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে তার প্রতি অমানবিক আচরণসহ অশ্লীল কথাবার্তা যারা বলছেন তারাও এ দেশের মানুষের ক্রোধ থেকে কখনোই রেহাই পাবেন না।

অবরোধের নবম দিনেও সংঘর্ষ-আগুন, নিহত ৭

ধানমণ্ডি এলাকায় গাড়িতে আগুন
২০ দলের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ৯ম দিনে প্রাণ হারিয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে গতকাল রংপুরে বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে শিশুসহ ৫ জন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ওই পেট্র্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন আরও ৩০ জন। সেনবাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এক যুবলীগ নেতা। মঙ্গলবার মারধরের শিকার হয়ে আহত হয়েছিলেন তিনি। চট্টগ্রামে অবরোধ চলাকালে শিবিরের এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিনের মতোই গতকালও বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন ২০ দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। রাস্তা কেটে যোগাযোগ বিছিন্ন করা হয়েছে বেশ কয়েক জায়গায়। অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং সহিংসতার ঘটনা ছিল দেশজুড়েই। এর মধ্যেই অবরোধ ও হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ-মিছিল হয়েছে। কোথাও কোথাও পাল্টা কর্মসূচিও পালন করেছে সরকার সমর্থকরা। গতকাল রাজধানীতে ৭টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। ফেনীতে অন্তত ১০টি গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর চাঁপাই নবাবগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, সীতাকুন্ডুসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫০টি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এদিনেও মামলা হয়েছে বেশ কয়েকটি। বিক্ষিপ্ত ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে অনেক এলাকায়।
মামলা ও গণগ্রেপ্তার
২০ দলীয় জোটের চলমান অবরোধ ও বিভিন্ন জেলায় হরতালকে কেন্দ্র করে সংঘটিত নাশকতার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ২০ দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেসহ একাধিক মামলা করেছে পুলিশ। এছাড়া মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মাগুরা জেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক ওয়াশিকুর রহমান কল্লোল ও ছাত্রদলের সভাপতি কবির হোসেন, সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এখলাছুর রহমান মুন্না ও সদর উপজেলা ছাত্রদল নেতা জিয়াউল হক জিয়া, ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির যুব বিষয়ক সম্পাদক এনামুল হক মুকুল, ছাত্রদলের কেসি কলেজ শাখার সভাপতি মনিরুজ্জামান মাসুম, জয়পুরহাট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপনসহ সাতক্ষীরায় ৫১, কুমিল্লায় ৩০, নড়াইলে ২৮, ঝিনাইদহে ২৫, নোয়াখালীতে ২০, রংপুরে ১০, মৌলভীবাজারে ১৭, মেহেরপুরে ১৭, গাজীপুরে ১০, চাঁদপুরে ১২, রাজশাহীতে ১২, সিলেটে ৭, সিরাজগঞ্জে ৭, মাগুরায় ৫ জনসহ সারা দেশে ২০ দলীয় জোটের তিনশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এদিকে খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানের ওপর গুলিবর্ষণ ও বিএনপি নির্বাহী সদস্য বেলাল আহমেদকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায় ১৭ই জানুয়ারি শনিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে উপজেলা ২০ দলীয় জোট।
রংপুরে পেট্রল বোমায় নিহতের ঘটনায় বিএনপির নিন্দা
এদিকে রংপুরের মিঠাপুকুরে যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তদের পেট্রল বোমা নিক্ষেপে শিশুসহ চারজন নিহত ও ১২ জন আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। সেই সঙ্গে তিনি এমন ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গতরাতে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানের ওপর যারা আঘাত করেছে তারাই রংপুরের মিঠাপুকুরে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রল বোমা ছুড়ে ৪ জন যাত্রীকে হত্যা ও ১২ জনকে আহত করেছে। রিজভী আহমেদ বলেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করতেই ২০  দলের ডাকা চলমান শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচিতে সরকারি এজেন্ট দিয়ে যানবাহনে নাশকতা চালিয়ে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর সেই পুরনো খেলায় মেতে উঠেছে বর্তমান অবৈধ সরকার। রংপুরের মিঠাপুকুরে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যার ঘটনা বর্তমান আওয়ামী সরকারের ধারাবাহিক ও পুরনো নোংরা অপকর্মেরই যোগসূত্র। এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা-ের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। তিনি বলেন, নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা, শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তারও শাস্তির জোর দাবি জানান। আহতদের আশু সুস্থতা কামনা করেন।
রাজধানীতে ৭ গাড়িতে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ আহত ২: রাজধানীর পৃথক স্থানে সাতটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে দৃর্বৃত্তরা। এছাড়া বেশ কয়েক জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন দুই পথচারী। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর ১টায় গুলিস্তান হকি  স্টেডিয়াম এলাকায় বন্ধন পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। প্রায় একই সময়ে ধানম-ির ২৭ নম্বর সড়কে একটি প্রাইভেট কারে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এদিকে, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সোয়া ৬টায় ইডেন কলেজের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হয়। এতে ওই বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আজিমপুরের নিউ পরিবহন নামে একটি বাসে আগুন দেয় দৃর্বৃত্তরা। সোয়া ১টায় মোহাম্মদপুর ফায়ার সার্ভিসের পাশের রাস্তায় একটি নোয়া গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আগুন দেয়া হয় ডেমরার সাইনবোর্ড এলাকায় একটি বাসে। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৩টায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে খিলগাঁওয়ের বিশ্বরোড এলাকায় একটি বাসে। এদিকে, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বঙ্গবাজার মোড়ে দুর্বৃত্তরা তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে অভি নামে এক কলেজছাত্র এবং জীবন নামে এক যুবক আহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
ফেনী প্রতিনিধি জানান, সোনাগাজীতে অবরোধে পিকেটারদের হামলায় আহত বেলাল হোসেন (৩৫) নামে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। তবে ফেনী-৩ আসনের স্বতন্ত্র সাংসদ ও আওয়ামী লীগ নেতা রহিম উল্যা জানান, অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে নিজ দলের প্রতিপক্ষরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। গতকাল ভোরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত বেলাল হোসেন সুজাপুর গ্রামের জেবল হক’র ছেলে ও সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম জহির জানান, মঙ্গলবার রাতে সোনাগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সুজাপুর গ্রামের স্ক্রেপ ব্যবসায়ী যুবলীগ নেতা বেলাল হোসেন, মোবারক হোসেনসহ ৪ জন বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় অবরোধকারীরা তাদের ধাওয়া করে। পিকেটাররা একপর্যায়ে স্ক্রেপ ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন ও মোবারক হোসেনকে পিটিয়ে আহত করে। আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় বেলাল হোসেনকে রাতেই চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে গতকাল ভোরে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অপর আহত মোবারক হোসেন ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে ফেনী-৩ আসনের স্বতন্ত্র সাংসদ ও আওয়ামী লীগ নেতা রহিম উল্যা জানান, অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে যুবলীগ নেতা বেলাল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে নিজ দলের প্রতিপক্ষরা। তিনি বেলাল হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। এদিকে মঙ্গলবার অবরোধে ফেনী-নোয়াখালী সড়কের সিলোনিয়ায় গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তারা ১০টি গাড়ি ভাঙচুর করলে পিকেটারদের ধাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাক খাদে পড়ে যায়। অবরোধ সমর্থনে শহরে একটি মোটরসাইকেলে আগুন দিয়েছে পিকেটাররা। এদিকে বুধবার রাত ৯টায় সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হোসেন আহম্মদ জুয়েলের বাড়িতে আগুন দিয়েছেন দুর্বৃত্তরা। যুবলীগ নেতা বেলাল হোসেন নিহতের জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে।  পুলিশ নাশকতার অভিযোগে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে নয়জনকে আটক করেছে। এ ছাড়া ওই দিন রাতে শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কের পুরনো পুলিশ কোয়ার্টার মোড়ে একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয় পিকেটাররা।
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, চট্টগ্রামে অবরোধ চলাকালে শিবিরের এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে তার মৃত্যু হয়। পিকেটিং করতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়ায় গাড়িচাপা পড়ে তিনি মারা যান বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। নিহত শিবিরকর্মীর নাম জুবায়ের হোসেন (২২)। তার বাড়ি চুনতি ইউনিয়নের মিরখীল। অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণে জোবায়ের মৃত্যুবরণ করেন বলে জানান পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ৬টায় একটি পণ্যবাহী চলন্ত ট্রাকে আগুন দিতে গেলে জোবায়েরকে ধাওয়া দেয় পুলিশ সদস্যরা। স্থানীয় কক্সবাজার মহাসড়কের চুনতি এলাকায় এই সময় তার সঙ্গে আরও ছিলেন ৫ জন। সবাইকে লক্ষ্য করে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়লে জোবায়েরসহ অন্যরা দৌড় দেন। এতে বিপরীত থেকে আসা একটি বড় বাসে চাপা পড়েন তিনি। এতে ঘটনাস্থলেই তার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে যায়। পরে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয় বলে জানান কর্তব্যরত চিকিৎসক। এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার একেএম এমরান ভূঁইয়া বলেন, ছেলেটিকে নিয়ে দিনভর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সকালের দিকে সে বাসচাপায় মারা যায়। এই সময় সে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিতে গেলে বিপরীত থেকে আসা একটি বাস তাকে চাপা দেয়। তবে পুলিশের এই বক্তব্য অস্বীকার করে নগর জামায়াতের এক নেতা জানান, জোবায়েরসহ শিবিরের ১০-১২ জন নেতা-কর্মী মিছিল করার উদ্দেশ্যে চুনতি এলাকায় বের হয়। এই সময় পুলিশ ধাওয়া করলে সে গাড়ির নিচে পড়ে মারা যায়।
সিলেট অফিস জানায়, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের ডাকে গতকাল সিলেটে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। নগরীতে বিক্ষিপ্ত কয়েকটি অটোরিকশা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ছাড়া শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়। হরতাল চলাকালে নগরীতে কিছু রিকশা, অটোরিকশা চলাচল করলেও অধিকাংশ ছিল যাত্রীশূন্য। নগরী থেকে দূরপাল্লার কোন বাস-ট্রাক ছেড়ে যায়নি এবং আসেও নি। ব্যাংক-বীমার প্রধান ফটকে ছিল তালা। তবে কড়া পুলিশি প্রহরায় ব্যাংকের পরিবহন চলাচল করায় লেনদেনে কোন সমস্যা হয়নি। সকাল সাড়ে ৮টায় নগরীর বন্দরবাজারে পুলিশকে লক্ষ্য করে অন্তত ৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় ছাত্রদল কর্মীরা। সকাল ৯টার দিকে চৌকিদিখি এলাকায় শিবির নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় মিছিলকারীরা দুটি সিএনজি-অটোরিকশা ভাঙচুর করে। সকাল ১০টায় নগরীর তালতলা এলাকায় মিছিল থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় আগুন দেয় শিবিরের পিকেটাররা। বেলা সাড়ে ১১টায় নগরীর দর্শনদেউড়ী এলাকায় দু’টি সিএনজি অটোরিকা ও ১টি ব্যাটারিচালিত টমটম ভাঙচুর করে শিবির। প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার আদালতপাড়া থেকে সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে ও এর আগে সিলেট মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব বদরুজ্জামান সেলিমকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গতকাল সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদল জেলায় এবং ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করে।
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া থেকে জানান, বগুড়ায় চোরাগোপ্তা হামলা হয়েছে। হামলাকারীরা সড়ক মহাসড়কের পাশে লুকিয়ে থেকে ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করছে। মঙ্গলবার রাতে বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের গোকুল এলাকায় সবুজ নার্সারির সামনে একটি বস্তাবোঝাই ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলে ট্রাকটিতে আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আগুন নিয়ে ফেলে। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বিহিগ্রাম ও বগুড়া-নওগাঁ সড়কের সদর এবং কাহালু সীমানায় ২টি ট্রাক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এদিকে সড়ক মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া বগুড়া শহরের ইয়াকুবিয়া স্কুলের মোড়ে এসএ পরিবহন ও এসএ টিভি অফিস ভবনে ককটেল হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় একদল দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল নিয়ে এসে অফিস লক্ষ্য করে ৪-৫টি ককটেল নিক্ষেপ করে। ককটেলে ভবনের দ্বিতীয় তলার জানালা ও বেলকুনির কাচ ভেঙে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সেখানে হাজির হয়ে কয়েক রাউন্ড শর্ট গানের গুলি ছোড়ে। পরে পুলিশ ভবনের দ্বিতীয়তলা থেকে একটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, রাজশাহীতে ২০ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বিকাল পৌনে ৫টার দিকে নগরীর সোনাদিঘী মোড়ে ছাত্রশিবিরের মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় অবরোধকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও শর্টগানের গুলি ছুড়ে। জবাবে শিবিরকর্মীরা ২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা এলাকায় খড়ভর্তি ভুটভুটিতে এবং চারঘাটে খড়ের ট্রাকে আগুন দেয় অবরোধকারীরা। জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুুলিশ।
কুলিয়ারচর প্রতিনিধি জানান, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের উপজেলার ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন চারাকান্দা নামক স্থানে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম আলী, ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মঞ্জিল মিয়া, সাধারণ সম্পাদক জুয়েল মিয়াসহ ১৭ নেতাকর্মীকে আসামি করে কুলিয়ারচর থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলার এজাহার নামীয় আসামি উপজেলার চারাকান্দা গ্রামের মুতি মিয়ার ছেলে আলম (২৫)কে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বুধবার কোর্টে প্রেরণ করেছে।
দোহার (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ঢাকার দোহার উপজেলা থেকে খলিলুর রহমান খলিল নামে এক যুবদল নেতাকে আটক করেছে দোহার থানা পুলিশ। তিনি দোহার উপজেলা যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। বুধবার দুপুরে উপজেলার মাহমুদপুর তার  নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করে দোহার থানা পুলিশ।
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, বরিশালের আগৈলঝাড়ায় মঙ্গলবার গভীর রাতে পেট্রোল ঢেলে বিআরটিসি’র একটি বাস পুড়িয়ে দিয়েছে অবরোধ সমর্থনকারীরা। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে বাকাল গ্রামের উজ্জ্বল রাহাকে সন্দেহমূলক আটক করেছে। পুলিশ বাদী হয়ে আগৈলঝাড়া থানায় ২০/২৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২৫-৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মঙ্গলবার থানায় মামলা করেছে।
আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা জামায়াতের  সেক্রেটারি গোলাম রব্বানী (৫০)কে মঙ্গলবার রাতে আদমদীঘি থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃত জামায়াত নেতা গোলাম রব্বানীকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, মুন্সীগঞ্জে ছাত্রদলের মিছিলে লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। এ সময় ছাত্রদল নেতা মো. মাসুদ রানা, মো. মহিউদ্দিন, আল-আমিন, যুবদল নেতা বুরজাহানসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। এদিকে, মিছিল থেকে পুলিশ সদর উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. মহসিনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় সেখানে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে শহরের জুবলী রোডের মেথরপট্টি সংলগ্ন খালইস্ট সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
স্টাফ রিপোর্টার, পাবনা থেকে জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হরতালের সমর্থনে পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের মহেন্দ্রপুর নামক স্থানে রাস্তায় পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে শিবির নেতাকর্মীরা। গতকাল এ জেলা থেকে ৫৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ। হরতালে শহরে অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লা ও জেলার অভ্যন্তরে ভারি যান চলাচল করেনি।
চাটখিল প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি ইউছুফ নবী বাবুকে গুলি করেছে পুলিশ। বাবু জানান, গতকাল দুপুরে তিনি উপজেলা বিএনপির অবরোধের পক্ষে মিছিল শেষ করে পৌরবাজারের বদলকোট রোডের দিকে যাচ্ছিলেন। এমন সময় পেছন দিক থেকে চাটখিল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী তাকে পেছন থেকে ডাক দিলে ওই এলাকা ত্যাগ করার সময় এমদাদ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে একটি রাবার বুলেট বাবুর গায়ের জ্যাকেট ছিঁড়ে শরীরে বিদ্ধ হয়। অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তা ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বাবুকে গুলি করার কথা অস্বীকার করে বলেন, তিনি ওই সময় ডিউটিতেই ছিলেন না। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি পেয়ার আহম্মদ ছাত্রদল সভাপতি বাবুকে পুলিশ গুলি করেছে।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনার কেন্দুয়া-চট্টগ্রাম সড়কে উপজেলার চিরাং ইউনিয়নের পাছার এলাকায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে ৪টি নাইট কোচ ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আলী আশরাফ নামে এক বিএনপি কর্মীকে সান্দিকোনা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। 
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, সীতাকু-ে মঙ্গলবার রাতে একটি লরি ও একটি ট্রাকে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ওই দু’টি যানবাহন রাত ১২টায় ভাটিয়ারী এলাকায় পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা দু’টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, ভোরে লক্ষ্মীপুর-ঢাকা মহাসড়কের চন্দ্রগঞ্জের আন্ডারঘর এলাকায় মালবাহী একটি ট্রাক ও পিকআপে অগ্নিসংযোগ করেছে অবরোধকারীরা। একই সময় মুক্তিগঞ্জ, চরচামিতা, হাজিরপাড়া ৩টি ট্রাক ও দু’টি বাস ভাঙচুর করা হয়। রাতে বাগবাড়ী এলাকায় পিকেটারদের ধাওয়ায় মালবাহী পিকআপ খাদে পড়ে চালক দিদার হোসেন, হেলপার সজীবসহ তিনজন আহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা, রায়পুর, রামগতি, কমলনগর, রামগঞ্জ, চন্দ্রগঞ্জ থানাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও শিবিরের ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
শায়েস্তাগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শায়েস্তগঞ্জ দেউন্দি রোডে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেলে চালক আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার রাত ৯টায় এ ঘটনা ঘটে। ঢাকা থেকে সিলেটের জাফলংগামী ঢাকা ট্রাকটি বিকালে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত ৯টায় ট্রাকটি শায়েস্তাগঞ্জের দেউন্দি নামক স্থানে এসে পৌঁছলে একদল দুর্বৃত্ত ট্রাকটি লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: আজকের হরতালের সমর্থনে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় চুয়াডাঙ্গায় জেলা বিএনপি শহরে মিছিল বের করলে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সেখান থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবদুল মান্নানসহ ৬ বিএনপি নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহের বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, জামায়াত-শিবিরের ১০ নেতাকর্মীসহ ২৫ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ঝিনাইদহ সদর থানায় ১২, শৈলকুপা থানায় ৩, মহেশপুর থানায় ৪, কালীগঞ্জে ২, কোটচাঁদপুরে ২ ও হরিণাকু-ু উপজেলায় দু’জন রয়েছেন।
শিবগঞ্জ (চাঁপাই নবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে টানা অবরোধের নবম দিনে রাস্তা কেটে, গাছে গুঁড়ি ফেলে ব্যারিকেড দেয় অবরোধ সমর্থকরা। এ ছাড়া মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টায় একটি পিকআপে পেট্রল বোমা ছোড়ে আগুন দেয় অবরোধকারীরা। এ ছাড়া উপজেলা থেকে জামায়াত-শিবিরের একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, কিশোরগঞ্জে অবরোধে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মো. হারুন (৪৫) নামে এক ওয়ার্ড বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি সদরের চৌদ্দশত ইউনিয়নের ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। মঙ্গলবার দুপুরে চৌদ্দশত এলাকায় একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনায় তাকে আটক করা হয়।
মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় মাছবাহী একটি ট্রাকে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল ভোররাতে মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা সড়কের সেনের টিকিকাটা এলাকার গাজীবাড়ী নামক স্থানে চলন্ত ট্রাকে পেট্রলবোমা ছুড়ে অগ্নিসংযোগ করে। এতে মাছবাহী ট্রাকের প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ট্রাকের চালক দাবি করেছেন। পুলিশ এ ঘটনার সময় মনির হোসেন মুন্সী (২৫) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে বিএনপির ২৩ কর্মী-সমর্থককে আটক করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে সদর থানায় ১১, গাংনী থানায় ৯ এবং মুজিবনগর থানার অভিযানে ৩ জনকে আটক করা হয়। ২৩ জনকেই আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চাঁপাই নবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চাঁপাই নবাবগঞ্জে রাস্তা কেটে, গাছে গুঁড়ি ফেলে ব্যারিকেড দেয় অবরোধ সমর্থকরা। এ ছাড়া মঙ্গলবার রাত ১টায় কলাবাড়ীতে দুর্বৃত্তরা একটি পিকআপে পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করলে তা ভস্মীভূত হয়ে যায়। এদিকে রাতের আঁধারে চাঁপাই-সোনামসজিদ মহাসড়কের মুসলিমুপর এলাকায় রাস্তা কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করায় বর্তমানে চাঁপাই-সোনামসজিদ মহাসড়ক বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার যান চলাচল।
স্টাফ রিপোর্টার, রূপগঞ্জ থেকে জানান, রূপগঞ্জে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের ৫০ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে রূপগঞ্জ থানার এএসআই রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
নড়াইল প্রতিনিধি জানান, নড়াইলে পুলিশের অভিযানে বিএনপির ৬ নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন মামলা ও অভিযোগে ২৬ জনকে আটক করেছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এদের মধ্যে নড়াইল সদর থানায় বিএনপির এক কর্মীসহ ১০, কালিয়া থানায় ৪, লোহাগড়া থানায় ৫ এবং নড়াগাতী থানায় বিকাশ পরিবহন পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় ৫ বিএনপি নেতাকর্মীসহ ৭ জন।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, গতকাল উল্লাপাড়া থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে উপজেলার মোড়দহ গ্রাম থেকে জামায়াত নেতা মোড়দহ দাখিল মাদরাসার সহকারী সুপার মাওলানা মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক ও ভূতগাছা গ্রাম থেকে জাহাঙ্গীর আলম নামের ২ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী থেকে জানান, নোয়াখালীতে ছাত্রদলের ডাকা হরতালে যানবাহনে আগুন ও বসতবাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হরতালের আগের রাতে কোম্পানীগঞ্জে একটি সিমেন্টবাহী ট্রাক ও সিএনজি এবং চৌমুহনীর আবদুল হালিম শামীমের গাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর সড়কের আন্ডারঘর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় হামলায় ট্রাকের চালকসহ দু’জন গুরুতর আহত হন। একই সময় মো. রজ্জব আলীর নেতৃত্বে চনগাঁও গ্রামের হামিদ ব্যাপারীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালানো হয়। এতে মুজিবা খাতুন, মনতাজ মিয়া, কামাল, আবুল হোসেন ও বাকের জখম হন। ওই স্থানে দু’টি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন, ৩-৪টি সিএনজি ভাঙচুর ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এদিকে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ২০ দলেন ২১ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরপার্বতী ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর কাজী হানিফ, মাইজদীর নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল কর্মী সুমনসহ ১৯ জন।
ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ভালুকায় মঙ্গলবার রাতে নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কেয়া পরিবহন নামের একটি বাস পুড়িয়ে দিয়েছে অবরোধকারীরা। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দু’জনকে আটক করা হলেও জিজ্ঞাসাবাদের পর এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা না থাকায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে।