Sunday, March 29, 2015

দুই শিবিরেই নানা হিসাব by কাফি কামাল

সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে দুই শিবিরেই চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। অরাজনৈতিক এ নির্বাচনে এখন রাজনীতিই হয়ে উঠেছে মুখ্য। রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের হিসাব কষে এগোচ্ছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। প্রার্থী সমর্থন দিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জয়-পরাজয়ের হিসাব কষছে বিএনপির অবস্থানের ওপর। আর বিএনপি নির্বাচনের ছক করছে সরকারের গতিবিধি ও আচরণ দেখে। এ কারণে এখন পর্যন্ত প্রার্থী মনোনয়ন ও নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোন ঘোষণা দেয়নি দলটি। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচনের মাঠে থাকলে আওয়ামী লীগের জন্য নির্বাচনী হিসাব অন্যরকম হবে বলে মনে করছেন দলের নেতারা। এ কারণে বিরোধী জোটের অবস্থানের ওপর নির্ভর করেই নির্বাচনী কৌশল ঠিক করতে চায় ক্ষমতাসীন দল। এ ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার যে শক্ত ইঙ্গিত দিয়ে আসছে তাতে অনেকটা শঙ্কাও ভর করেছে আওয়ামী লীগে। কারণ বিএনপি একক প্রার্থী দিয়ে মাঠে নামলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানিতে বিপর্যস্ত বিএনপিতে নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া নিয়ে নানা মত থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার পক্ষেই মত আসছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নেতাকর্মীরা হয়রানির শিকার হলেও সুষ্ঠু ভোট হলে সাধারণ ভোটাররা তাদের পাশে দাঁড়াবেন। এতে নির্বাচনের ফলও তাদের পক্ষে থাকবে।
শঙ্কায় আওয়ামী লীগ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট অংশ নেয়ায় কিছুটা শঙ্কায় পড়েছে  ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। এ কারণে জীবনপণ লড়াই মানসিকতা নিয়ে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা। গত শুক্রবার গণভবনে আয়োজিত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে বৈঠকে এসব প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। বৈঠকে কাউন্সিলর পদে অংশ নিতে আগ্রহী কয়েকজন প্রার্থী বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ার বার্তা পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু সেই বার্তা ভুল প্রমাণ করে তারা অংশ নিচ্ছে। দলীয়ভাবে বিশৃঙ্খল অবস্থায় থাকলেও প্রার্থী দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কম প্রার্থী দিচ্ছে।  বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান, সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফী, সবুজবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ ও ওয়ার্ড পর্যায় থেকে আবদুস সালাম ও আসলাম মাস্টার বক্তব্য রাখেন। বক্তারা তাদের বক্তব্যে, নিজেদের মধ্যে নানা বিভেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন নেতারা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য চলাকালীন সময়ে মাঠ পর্যায়ের নেতারা শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী দল-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন বলে দলীয় সভানেত্রীকে আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রী মহানগর নেতাদের কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এ কমিটি প্রার্থী ঠিক করবে।
ভোটারদের ওপর ভরসা বিএনপির
গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানির ভয়ে আত্মগোপনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। গ্রেপ্তার আতঙ্কে এলাকাছাড়া তৃণমূল নেতাকর্মীরাও। ঘাড়ের ওপর ডজন ডজন মামলার খড়গ। তাই প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ নেই তাদের। সক্রিয় সমর্থকরাও নেই স্বস্তিতে। প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী সম্ভাব্য মেয়র ও কমিশনার প্রার্থীরা। এদিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের কাছে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী ঘরনার বিশিষ্ট নাগরিকদের তরফে কিছু পরামর্শ এবং দাবি জানানো হলেও তার ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং সরকারদলীয় নেতাদের বক্তব্যেও সেসব দাবির ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারছে না বিরোধী জোট। ইতিমধ্যে প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রার্থী আসামি হলে ছাড় দেয়া হবে না।’ তবু সিটি করপোরেশন নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল। সক্রিয় নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে যেখানে ন্যূনতম নিশ্চয়তা নেই সেখানে কেন আন্দোলন কর্মসূচি শিথিল করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ? এমন প্রশ্ন ও আলোচনা-পর্যালোচনায় মুখর এখন বিরোধী কর্মী-সমর্থকরা। প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে বিরোধী জোট কিভাবে ফলাফল নিজেদের অনুকূলে আনবে এমন কৌতূহল নানা মহলে। কিন্তু বিএনপির শীর্ষ নেতারা এবার হাঁটছেন নতুন কৌশলে। দলের নেতাকর্মীদের চেয়ে এবার সাধারণ সমর্থক এবং ভোটারদের ওপরই বেশি ভরসা করতে চান তারা। বিএনপি ও জোটের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা এমন দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে সরকারের নানা অনিয়ম, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। তার ওপর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার ক্ষোভও রয়েছে। সুষ্ঠু পরিবেশ পেলে সিটি নির্বাচনের ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যাবে। নেতারা জানান, ঢাকা সিটিতে বিরোধী নেতাকর্মীরা একেবারেই কোণঠাসা অবস্থানে। সবার ওপর মামলা ঝুলছে। বাড়িতে বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি চলছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেও নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে বিএনপি। কারণ এবার কর্মীদের চেয়ে ভোটারদের নীরব ভূমিকার ওপর বেশি আস্থা রাখতে চায় শীর্ষ নেতৃত্ব। ভোটারদের ওপর ভরসা করার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে ঢাকায় নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তৎপরতা শুরু করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকদের সংগঠন ‘শত নাগরিক’। চট্টগ্রামে ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলন’-এর মতো ঢাকায় সুনির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন ঘোষণা দিতে পারে ‘শত নাগরিক’। নাগরিক সমাজের ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে বিশিষ্ট নাগরিকদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা হবে। নেতারা জানান, নির্বাচনী পরিবেশের ওপরই সর্বাধিক জোর দেবে ২০ দল। এ নিয়ে শিগগিরই জোটের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু দাবিও তুলে ধরার সম্ভাবনা রয়েছে। শত নাগরিক-এর সদস্য সচিব আবদুল হাই শিকদার বলেন, নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতে আলোচ্য বিষয়গুলো বিএনপি চেয়ারপারসনকে অবহিত করা হয়েছে। ওনার কথা-বার্তায় মনে হয়েছে, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে সরকারই ফাঁদে পড়েছে। যে মুহূর্তে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের নির্দেশনা দেবে, জনগণ ঢাকা ও চট্টগ্রামের রাস্তায় নেমে আসবে। জেল-জুলুম-গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে কোন লাভ হবে না। গ্রেপ্তার করে বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করা যাবে না। বিএনপিকে ভোট থেকে বিরতও রাখা যাবে না। দলের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচন ও আন্দোলন একই সঙ্গে চলবে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি না হলে সিটি নির্বাচন বয়কট করবে বিএনপি। এমন সিদ্ধান্ত বিবেচনায় রেখেই নির্বাচনী ট্র্যাকে ছুটতে শুরু করেছে দলটি।  সরকার ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া এবং পদক্ষেপ দেখে তারপরই দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে নির্বাচনে থাকা না-থাকার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি। বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের চেয়ে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ পাবে কিনা তার ওপরই নির্ভর করবে বিএনপির চূড়ান্ত অংশগ্রহণ বা সরে দাঁড়ানো। এদিকে বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতারা জানান, এবার সিটি নির্বাচনে কমিশনার প্রার্থীরা একটি বিরাট ফ্যাক্টর হবেন। কারণ প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক সরকার দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থী থাকতে পারে। আর সেটা হলে কেন্দ্রে ভোট কারচুপির সম্ভাবনাও কমবে। যার সুফল পাবে জনসমর্থিত প্রার্থীরা। 
নেতারা জানান, ২০ দলীয় জোটের চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার এবং বিরোধী জোটের মধ্যে একটি আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তৎপর রয়েছেন আন্তর্জাতিক মহলসহ কূটনীতিকরা। আন্দোলনে নানা নৈরাজ্যের ঘটনার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে একটি প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে সরকার। সেখানে বিএনপিকে অগণতান্ত্রিক, নির্বাচনবিমুখ এবং জঙ্গি মনোভাবের দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারের সে প্রচারণাকে ভুল প্রমাণ করতে চায় বিএনপি। বিএনপি নেতারা মনে করেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক মহলের সতর্ক পর্যবেক্ষণে থাকবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ পেলে ফলাফল নিজেদের অনুকূলে এনে বিএনপি তাদের পক্ষে জনসমর্থনের বিষয়টি প্রমাণের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে তীব্র প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হলে সেক্ষেত্রে আন্দোলনের যৌক্তিক ভিত্তিও সুদৃঢ় হবে। বিএনপি ও জোটের নেতারা জানান, নানামুখী বিচার-বিশ্লেষণের পর সিটি নির্বাচনে ইতিবাচক মনোভাবের বার্তা দিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল। অবরোধ-হরতালের সমন্বয়ে চলমান আন্দোলন কর্মসূচি থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসেছে বিরোধী জোট। অনির্দিষ্টকালের অবরোধের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে দু’দফায় ৫দিন করে হরতালের যে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিল ২০ দল সেখান থেকে সরে এসেছে। গত সপ্তাহের শেষ দুদিনের পর চলতি সপ্তাহেও নতুন করে হরতালের ঘোষণা আসেনি ২০ দলের তরফে। নেতারা আশা করেন, হরতাল কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার মাধ্যমে যে ইতিবাচক বার্তা দেয়া হয়েছে সরকার সেটাকে নিশ্চয়ই গুরুত্বের সঙ্গেই নেবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনীতি ও নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
চট্টগ্রামে মনজুর আলমের পর ঢাকায় আবদুল আউয়াল মিন্টু ও সর্বশেষ হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর জমে উঠতে শুরু করেছে নির্বাচন। এ দুজনের মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনায় বিএনপি নেতা-কর্মীরা কিছুটা উচ্ছ্বসিত ও আশাবাদী। তবে বিএনপি নেতারা জানান, বিকল্প চিন্তা মাথায় রেখে ঢাকার দুই সিটিতে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নির্বাচন নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মনোভাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে বিএনপির হাইকমান্ড। পরিস্থিতি অনুকূল না হলে কিংবা সবার জন্য সমান নির্বাচনী মাঠ তৈরি না হলে নেয়া হবে ভিন্ন কৌশল। যদি সরকার নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি না করে, বিরোধী নেতাকর্মীদের সমানভাবে প্রচার-প্রচারণার সুযোগ না দেয়, তাহলে নির্বাচন থেকে সরে এসে আন্দোলনের পথ বেছে নেবে বিএনপি। নির্বাচন থেকে সরে এলেও কৌশলে নির্বাচনে থাকবে দলটি। সেক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ঢাকা উত্তরে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক কারাবন্দি মাহমুদুর রহমান মান্না পেতে পারেন অঘোষিত সমর্থন।

শিকাগোতে অনুষ্ঠিত হলো জিয়াউর রহমান ডে প্যারেড -রাষ্ট্রদূত ও আওয়ামী লীগের বিরোধিতা

ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের তীব্র বিরোধিতার মুখে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো সিটিতে উদযাপন করা হয়েছে জিয়াউর রহমান ডে প্যারেড। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে শিকাগো নগর কতৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এই প্যারেডের আয়োজন করে স্থানীয় বিএনপি সমর্থকদের সংগঠন বাংলাদেশ কমিউনিটি অব শিকাগোল্যান্ড। ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত প্যারেডটিতে রোড মার্শাল হিসাবে নেতৃত্ব দেন শিকাগো সিটির ডেপুটি মেয়র এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা অলডারম্যান জো মোর। বিশেষ অতিথি হিসাবে অনুষ্ঠানটিতে অংশ নেন বিএনপি-র ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা এবং সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বিএনপি-র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য সচিব ও সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী। প্যারেডে অংশগ্রহণকারীরা শতাধিক সুসজ্জিত যানবাহনের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ শিকাগোর জিয়াউর রহমান ওয়ে এবং আরও কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী অংশ নেন এই কর্মসূচিতে।
পূর্ব নির্ধারিত এ কর্মসূচি বাতিলে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত এম জিয়া উদ্দিন শিকাগোর মেয়রকে চিঠি দেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগও এই অনুষ্ঠানের তীব্র বিরোধীতা করে। এমন বিরোধীতার মধ্যেই অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিকাগোর ডেপুটি মেয়র ও ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা অল্ডারম্যান জো মোর বলেন, গণতন্ত্রের জন্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভূমিকা রেখেছেন, সংগ্রাম করেছেন এবং জীবন দিয়েছেন। তার প্রতি সম্মান জানাতেই আমরা এখানে আয়োজনে উপস্থিত হয়েছি। আর এই নীতিমালার ভিত্তিতেই শিকাগো সিটি জিয়াউর রহমান দিবসকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশে চলমান বর্তমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যে কোন ব্যক্তির অধিকার রয়েছে অবাধ সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা সিটির সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বলেন, বিএনপি ও জিয়াউর রহমানের ভাবমূর্তি বিনষ্টের জন্য সরকার যতো পদক্ষেপই গ্রহণ করুক না কেন, বাংলাদেশ নামক দেশ যতোদিন থাকবে ততোদিন কেউই জিয়াউর রহমানের নাম পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।  তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পরই দেশবাসী মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। এটাই প্রকৃত সত্য। বিদেশের মাটিতে জিয়াউর রহমানের স্বীকৃতিতে তাই সরকার ইর্ষান্বিত হয়ে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে । খোকা বলেন, শিকাগো সিটিতে জিয়াউর রহমান ডে প্যারেড উদযাপনের স্বীকৃতি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক  বর্তমান সরকারের কর্মকান্ডের কড়া সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশকারী। যে আশা-আকাঙক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছিল সে আশা-আকাঙক্ষা সরকার হত্যা করেছে। তিনি বলেন, এরা নিজেদের আওয়ামী লীগ বলে পরিচয় দেয়, আসলে তারা সশরীরে বাকশাল। আজকের এই আন্দোলন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আজকের আন্দোলন একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। জেল-জুলুম যতোই চলুক না কেন এ আন্দোলন চলছে এবং চলবে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যতোদিন পর্যন্ত আদায় না হবে ততোদিন পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। বাংলাদেশী কমিউনিটি অব শিকাগোল্যান্ড এর সভাপতি শাহ মোজাম্মেল নান্টুর সভাপতিত্বে প্যারেড-পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতা শরাফত হোসেন বাবু, এশিয়ান হিউম্যান সার্ভিসের সভাপতি আশরাফ আলী, জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া, দেওয়ান আকমল চৌধুরী, সৈয়দ বদর ইসলাম, শাহ মোসাদ্দেক মিন্টু, জসিম উদ্দন প্রমুখ।

‘গণতন্ত্র ও সন্ত্রাস সহাবস্থান করে না’

‘সহিংসতা-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ও অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এক হও’ স্লোগানকে ধারণ করে সম্মিলিত নাগরিক সমাজের জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এ কনভেনশনের আলোচনা সভায় বক্তরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। অনুষ্ঠানে অবস্থানপত্র পাঠ করেন, সম্মিলিত নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক ও কনভেনশনের সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জামান। তিনি বলেন, সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্রের মালিক দেশের নাগরিকরা হলেও বৃহত্তর নাগরিক সমাজ এখন ভয়াবহ সংকটে। বর্তমানে দেশকে গড়ে তোলার পরিবর্তে ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়ায় ইন্ধন যোগানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে জঙ্গিবাদী নৃশংসতার শিকার হচ্ছে মুক্তবুদ্ধির চর্চা তথা মানবতা। খলীকুজ্জামান বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তি মুক্তিযুদ্ধে যে নৃশংসতা দেখিয়েছে, আজ তারা এবং তাদের দোসররা পেট্রলবোমা মেরে সেই একই ধরনের নৃশংসতা চালাচ্ছে। কিন্তু এরা সামাজিক শক্তি নয়। এরা সমাজবিনাশী জঙ্গি অপশক্তি। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও সন্ত্রাস সহাবস্থান করে না। তাই এই অপশক্তিকে দমন না করা পর্যন্ত দেশে শান্তি আসবে না। শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরাজিতদের কৌশল হলো ঐক্য বিনষ্ট করে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে রাখা। বহুমত গণতান্ত্রিক সমাজের সবলতা। কিন্তু অনৈক্য গণতন্ত্রের বড় শত্রু। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতন্ত্রের বিকাশে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় এগিয়ে আসতে হবে। অর্থনীতিবিদ ও কচিকাঁচার মেলার সভাপতি খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে। কিন্তু একাত্তরে তারা সফল না হলেও পরবর্তীকালে তারা রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধীরা ব্যবসা করে কোটিপতি হলেও কোন মুক্তিযোদ্ধা কোটিপতি হতে পারেনি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার ছিল। আর এখন আছে নব্য রাজাকার। যে জন্য আমরা ষড়যন্ত্র থেকে আজও মুক্তি পাইনি। রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে তাদের লোকজন আছে। তাই আমাদের সাবধান থাকতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে এদের চিন্থিত করতে হবে। এরা যেন ছদ্মবেশে আমাদের বিভ্রান্ত করতে না পারে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সংহতির মাধ্যমে আমরা যদি দেশকে গড়ে তুলতে না পারি তাহলে তারা গণহত্যা চালিয়েই যাবে। এই গণহত্যা থেকে কেউ রেহাই পাবে না। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী বলেন, একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্যই সন্ত্রাস, সহিংসতা, পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর হলেই এরা ভয় পাবে। তাই আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধীদের যেসব মামলা রয়েছে তা দ্রুত শেষ করতে হবে। না হলে এরা কোন না কোনভাবে ছাড়া পেয়ে আবারও দেশ ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ বীর বিক্রম বলেন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সবকিছু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে জঙ্গিবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সমাজের প্রতিটি স্তরে ঢুকে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করে এদের প্রতিরোধ করতে হবে। ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইসিএলডি) নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, রাজনীতির মূল ভিত্তি এখন সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে।
ড. নিলুফার বানুর পরিচালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের সভাপতি একেএমএ হামিদ। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের যুগ্ম মহাসচিব ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ম হামিদ, ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, প্রিপ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক এরোমা দত্ত, কর্মজীবী নারীর সভাপতি প্রতিমা পাল মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. জাহেদা আহমদ, প্রকৌশলি ড. এমএ কাশেম, নড়িয়া উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক মাজেদা শওকত আলী, কৃষি, শ্রমিক অধিকার মঞ্চের সমন্বয়ক রাহেলা রব্বানী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন মোল্লা। কনভেনশন শেষে সম্মিলিত নাগরিক সমাজের ৪২ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সংগঠনের কমিটি হবে বলে নেতৃবৃন্দ জানান।

হিথ্রোতে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের হাতাহাতি

হিথ্রো বিমানবন্দরে বাংলাদেশ  থেকে আসা কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের  নেতাদের বরণ করতে গিয়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় বিমানবন্দরের কার পার্কিং এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং লাঞ্ছিত হন দুইজন। আগামী ২৯শে মার্চ রোববার কর্মিসভা ও সকল শাখা কমিটির অভিষেক উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে গতকাল রাত ৯টার এক ফ্লাইটে লন্ডনে আসেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ  কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওসার ও দপ্তর সম্পাদক সালেহ আহমদ টুটুল। কেন্দ্রীয় নেতাদের নিজেদের গাড়িতে জোর করে তোলা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন উপস্থিত নেতাকর্মীগণ। একই ফ্লাইটে বাংলাদেশ থেকে আসা এক যাত্রী বলেন- এমন ঘটনায় আমি সত্যিই মর্মাহত, বিলেতে বাংলাদেশী রাজনীতির এমন চর্চা সবসময় আমাদের মাথা হেট করছে। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান এবং শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক আ স ম মিসবাহ কেন্দ্রীয়  নেতাদের তাদের গাড়িতে জোর করে তুলতে  গেলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতির সূত্রপাত ঘটে। পরে বিমানবন্দরে কর্মরত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।  এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক বলেন- ঘটনা সম্পর্কে আমি এখনও বিস্তারিত অবগত নই। তবে এ ধরনের ঘটনা যদি ঘটে থাকে তবে তা অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক।

অস্থিতিশীলতার দ্বারপ্রান্তে by রাজা রুমি

জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে ঝরে গেছে শতাধিক জীবন। ধর্মঘটের কারণে ঢাকা প্রায় স্থির হয়ে গিয়েছিল, যে শহরটি বাংলাদেশের রাজধানী ও অর্থনীতির স্নায়ুকেন্দ্র। পেছন ফিরে দেখা যাক। পাকিস্তান থেকে পৃথক হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি ছাপ রয়ে গেছে, যা মূলত রাজনীতিতে ঘন ঘন সামরিক হস্তক্ষেপ, বড় ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে আবর্তিত হওয়া অকার্যকর গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলার দরুন সৃষ্ট। বিপরীত মেরুতে অবস্থানরত দুই শিবিরের শীর্ষে রয়েছেন দুই নারী, যারা ‘বেগমস’ নামে পরিচিত। তারা হলেন আওয়ামী লীগের প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। আগেরজন দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় বীর শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। দ্বিতীয়জন দেশের প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। জিয়াউর রহমান আবার দেশের রক্ষণশীল অংশের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। ওই দুই দল, রাজনীতিবিদ ও তাদের শাসন থেকে নির্গত হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি মাত্রা।
সাম্প্রতিক অস্থিরতার শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে। সে নির্বাচন বিরোধীদের বর্জন সত্ত্বেও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। উল্লেখযোগ্য বিরোধী দল বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর দাবি ছিল, দলনিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। তবে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে একতরফা নির্বাচনী চর্চার দিকেই এগিয়ে যান হাসিনা, যার ফলে তিনি সহজেই আরেকবার ক্ষমতায় আরোহণ করেন।
নির্বাচন থেকে অস্থিরতার দিকে: গত ৫ই জানুয়ারি ছিল ২০১৫ সালের নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি। দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেয় বিরোধীরা। সরকার বেশ শক্ত হাতে প্রতিক্রিয়া দেখায় বিরোধী কর্মীদের গ্রেপ্তার ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে। এর পাল্টা হিসেবে বিরোধীরা দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধ আহ্বান করে। সেই থেকে বিরোধীদের আন্দোলন ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পাল্টা আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় নিজের কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখে সরকার। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার গতিও ত্বরান্বিত করতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থনের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী নেতাদের ওপর মামলা ঝুলে আছে। এতে দলটিও রয়েছে বেকায়দায়। জানুয়ারি থেকে প্রায় ৭ হাজার বিরোধী কর্মী ও সমর্থকদের আটক করেছে পুলিশ। শতাধিক মানুষ রাজপথে সংঘর্ষে, পেট্রলবোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় ২০ জনের মতো বিরোধী কর্মীকে বিচারবহির্ভূত উপায়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ খুবই উদ্বিগ্ন। সর্বশেষ এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল ২০০৭ সালে, যখন সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করেছিল। ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ নুরুল আমিন বলেন, উভয় শিবিরের কট্টরপন্থিরা কোন ছাড় দিতে রাজি নন। একই কথা বলছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংস্থাটি বলছে, দলীয় স্বৈরাচারের মতো আচরণ করছেন দুই নেত্রী, যারা গোটা দেশকে দুটি যুদ্ধংদেহী শিবিরে বিভক্ত করছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, কিছু বিরোধী দলের কর্মীর সহিংস অপরাধের দরুন সরকারের হত্যাকাণ্ড, অন্যায়ভাবে আটক ও হতাহতের ঘটনাসমূহকে যৌক্তিকতা প্রদান করে না।
অর্থনৈতিক ও সরকারি দুর্দশা: বাংলাদেশের এ রাজনৈতিক হাঙ্গামার মধ্যে অবরোধ, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে প্রতি বছর ২৪০০ কোটি ডলারের পোশাকশিল্পের ওপর। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) জানিয়েছে, পোশাকশিল্প ইতিমধ্যেই ৩৯০ কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা খাতের ক্ষতির পরিমাণ ২১০ কোটি মার্কিন ডলার। সম্প্রতি সপ্তাহে কৃষকরা নিজেদের পণ্য অবরোধের কারণে বিভিন্ন শহরে নিয়ে যেতে পারেননি। ফলে কৃষি খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫৩.৩ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান মুডিস দেশটির ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে। দেশটি যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জন করেছে, তা আংশিকভাবে হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমান প্রবৃদ্ধি ছোট ঘাটতির দিকে রূপান্তরিত হতে পারে। গত কয়েক মাসে পরিবহন খাত বলতে গেলে বন্ধই ছিল। এর ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রমও। গত দুই দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক উন্নয়ন সূচকে উন্নতি করা সত্ত্বেও দেশটির রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা এখনও বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। এটি এখনও কর্তৃত্বপরায়ণ, বংশানুক্রমিক ও ব্যক্তিচালিতই রয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই, সংসদ ও সুপ্রিম কোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অমার্যাদাই হয়ে উঠলো ফলাফল। বিরোধীদের অভিযোগ, আদালতও আওয়ামী লীগের বিশ্বস্তদের দিয়ে পূরণ করা হয়েছে গত ছয় বছর। সত্য কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে কেবল নিজেদের বিশ্বস্তদেরই নিয়োগ দিয়েছে। এর ফলে আমলাতন্ত্রেও দলীয় বিভাজন ঢুকে গেছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সরকারি সংস্কার। এ ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনেও নতুন পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এর আগেরবার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি বিধান ছিল, যেটি বর্তমান সরকার বিলুপ্ত করে দিয়েছে।
এরপর কি?: গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পদ্ধতি দুই অহংচালিত নারীর কাছে জিম্মি, যাদের রয়েছে বিপুল সমর্থক। আরেক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, সামরিক বাহিনী কোন হস্তক্ষেপ ছাড়া নীরবভাবে সবকিছুর দর্শক হওয়াটাই বেছে নিয়েছে। হাসিনার প্রথম মেয়াদে সংবিধানকে ধর্মনিরপেক্ষ করা হয়েছে।
দেশটিতে রাজনৈতিক সহিংসতার ধরন সুস্পষ্ট। সাধারণত নির্বাচনের আগে আগে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সহিংসতা মাত্রা ছাড়িয়েছে। এমনকি এখন আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতিও এটি হুমকিস্বরূপ। হাসিনা সমপ্রতি খালেদার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় ফিরতে চান। তবে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, সহিংস কৌশল অবলম্বন করে সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের সুযোগ দিয়েছেন বরং হাসিনা। সরকারের কাছে যে একমাত্র অবশিষ্ট উপায়টি রয়েছে, তাহলো, রাজনৈতিক সংলাপের আয়োজন করা ও বিরোধীদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো। বর্তমান শাসক দলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভারতেরও ঢাকাকে বিরোধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক সহাবস্থানের উপায় খোঁজার পরামর্শ দেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় আরেকটি অচলাবস্থার সম্ভাবনা রয়েই যায়। বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নও ঢাকার কর্তৃপক্ষকে বলতে পারে, রাজপথে লড়াইয়ের বদলে রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে। বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণে রাজনৈতিক পদক্ষেপের অনুপস্থিতি থাকলে, বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দ্বারপ্রান্তে থেকেই যাবে।
লেখক: ওয়াশিংটনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির একজন ভিজিটিং ফেলো এবং দ্য ফ্রাইডে টাইমসের কনসাল্টিং এডিটর। গতকাল ফরেইন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ।

৬০ ভাগ নলকূপে পানি না পাওয়ার শঙ্কা

খুলনায় ভূ–গর্ভস্থ পানির স্তর নামছে
গ্রীষ্মকাল না আসতেই খুলনা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক এলাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে। এতে গ্রীষ্মকালে নগরের ৬০ ভাগ নলকূপে পানি না পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকার মানুষ এখনই পানির অভাবে দুর্ভোগে পড়েছে।
খুলনা ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, নগরের ১৫ লাখ মানুষের প্রতিদিনের পানির চাহিদা ২৪ কোটি লিটার। এর পুরোটাই ভূ-গর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে ওয়াসা ৮৩টি উৎপাদক নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে। বাকিটা নগরবাসী হস্তচালিত নলকূপ ও নলকূপে পাম্প লাগিয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে উত্তোলন করে।
চলতি মৌসুমে ওয়াসা পরিচালিত গত কয়েক মাসের জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের আগস্ট মাসে নগরে পানির গড় স্তর ছিল ১৬ থেকে ১৯ ফুটের মধ্যে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে ১৯ থেকে ২৪ ফুটে দাঁড়ায়। আর মার্চের মাঝামাঝিতে তা কোথাও কোথাও ২৭ থেকে ২৮ ফুটে নেমেছে। ওয়াসার প্রকৌশলীরা বলছেন, এর মধ্যে বৃষ্টি না হলে আগামী এপ্রিলে কোথাও কোথাও পানির স্তর ৩০ ফুটের নিচে নেমে যেতে পারে।
পানির স্তর পরিমাপের জন্য ওয়াসার নিয়মিত জরিপ এলাকা ৭০টি। এর মধ্যে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পরিচালিত জরিপের ফলাফল বলছে, নগরের পিটিআই মোড়, নিরালা শিশুপার্ক, সোনাডাঙা ট্রাক টার্মিনাল, খালিশপুর ও মুজগুন্নী এলাকায় পানির স্তর গড়ে ২৫ ফুটে নেমে এসেছে। ২০ থেকে ২৪ ফুটের মধ্যে রয়েছে এমন এলাকার সংখ্যা ২০টিরও বেশি।
এ বিষয়ে খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ডি কামালউদ্দিন বলেন, সাধারণত পানির স্তর ২৬ ফুটের নিচে নামলে হস্তচালিত নলকূপ থেকে পানি ওঠে না। আর যদি তা ৩০ ফুটের নিচে নেমে যায়, তাহলে বাসা-বাড়িতে মোটর দিয়ে পানি ওঠানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাঁর আশঙ্কা, বৃষ্টি না হলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নগরের ৬০ ভাগ হস্তচালিত নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়বে। গত বছর এ সময়টায় বৃষ্টি না হওয়ায় নগরের ২৭টি এলাকায় পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে ছিল।
নগরের শেখপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মোটর দিয়ে এখনই তাঁরা পানি বেশি পাচ্ছেন না। পানি আসার গতিও ধীর। সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে জানা যায়, কিছু কিছু হস্তচালিত নলকূপ দিয়ে পানি আসছে না।
আসন্ন এই সংকট মোকাবিলায় স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত সময় পাম্প চালানো, ওয়াসার নিজস্ব ১০ হাজার হস্তচালিত নলকূপ মেরামত ও নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনসহ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নতুন উৎপাদক নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বিষয়টিকে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখছি। দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য মধুমতী নদী থেকে পানি এনে তা পরিশোধন করে নগরবাসীর মধ্যে সরবরাহের জন্য খুলনা ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট নামের একটি প্রকল্প চলমান আছে।’

সমরাস্ত্রে সবচেয়ে সমৃদ্ধ সৌদি সেনা

উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত সেনাবাহিনীটি সৌদি আরবের। এর বাইরেও দেশটির পশ্চিমা মিত্রদের পক্ষ থেকে রয়েছে যে কোনো পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্র“তি। ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বরাত দিয়ে শনিবার এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে। সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ২ লাখ ২৭ হাজার। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্য ৭৫ হাজার, বিমান বাহিনীর ২০ হাজার এবং নৌবাহিনীর সাড়ে ১৩ হাজার। ১৬ হাজার সদস্য দেশটির বিমান প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত। কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছেন আড়াই হাজার সৈন্য এবং বাকি ১ লাখ হচ্ছেন ‘ন্যাশনাল গার্ড’-এর সদস্য। এর বাইরেও রয়েছে প্যারামিলিটারি বাহিনীর সাড়ে ২৪ হাজার সদস্যও। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ট সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। এসব দেশের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ পায় দেশটির সেনাবাহিনী। আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে সৌদি আরব অন্যতম বড় ক্রেতা। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটি।
ইরানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা হুমকি থাকায় এসব অস্ত্র কেনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার থেকে সীমান্তবর্তী দেশ ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত শিয়া বিদ্রোহী হুথিদের বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণে বিমান হামলা শুরু করে সৌদি আরব। হামলায় আরও ৯টি দেশ সামরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ সরঞ্জামগত দিক থেকে সহায়তা করছে। বেশিরভাগ অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য থেকে কিনলেও ফ্রান্স এবং জার্মানির সঙ্গে অস্ত্র কেনার চুক্তি আছে সৌদির। এর মধ্যে ইউরোফাইটার জেট যুক্ত হয়েছে দেশটির বিমান বাহিনীতে। রয়েছে ৬০০ ট্যাংক, ৭৮০টি অস্ত্রসজ্জিত যান এবং ১৪২৩টি সেনাবহনের গাড়ি। বিমান বাহিনীতে এফ-১৫, ইউরোফাইটার, টর্নেডো, টাইফুনসহ বিভিন্ন ধরনের ৩১৩টি ফাইটার জেট রয়েছে। এর বাইরে হেলিকপ্টার রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক। ১৬টি প্যাট্রিয়ট, ১৭টি শাহিন, ১৬টি হক এবং ৭৩টি ক্রোটেল/শাহিন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে সৌদি আরবের কাছে। নতুন করে অর্ডার দেয়া হয়েছে আরও বহু ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্রের।
সশস্ত্র বাহিনীতে মোট সদস্য : ২ লাখ ২৭ হাজার
সেনাবাহিনী : ৭৫ হাজার
বিমান বাহিনী : ২০ হাজার
নৌ-বাহিনী : ১৩ হাজার ৫শ’
বিমান প্রতিরক্ষা : ১৬ হাজার
ক্ষেপণাস্ত্র তত্ত্বাবধান : ২৫শ’
ন্যাশনাল গার্ড : ১ লাখ

লি কুয়ানের শেষকৃত্যানুষ্ঠান আজ

আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠান আজ। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ উপলক্ষে ব্যাপক আয়োজন হাতে নেয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় রাষ্ট্রীয় শোক মিছিল বের করা হবে। ১৫.৪ কিলোমিটার পথ ঘুরে সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে যাওয়া হবে।
সেখানে দুপুর ২টা ৩০ থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত শেষকৃত্যানুষ্ঠান হবে। লি কুয়ান ছিলেন সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে লি সিয়েন লং তার বড় ছেলে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে ৯১ বছর বয়সে মারা যান লি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট একটি বন্দর শহর থেকে সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করার রূপকার বলা হয় লি কুয়ানকে।

মধ্যপ্রাচ্যে একনায়কতন্ত্রই কি ভালো ছিল?

ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘকাল রাজতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে থাকা মধ্যপ্রাচ্যে কি একনায়কতন্ত্রই উত্তম শাসনব্যবস্থা? ইয়েমেন থেকে লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক সংঘাত দেখে এ প্রশ্নটাই এখন সামনে আসছে। ২০১১ সালের কথিত আরব বসন্তের পর থেকে এই তিনটি দেশের পথ-পরিক্রমা ভিন্ন হলেও সংঘাত সবখানেই রয়েছে। একটা বিষয় স্পষ্ট, এই অস্থিতিশীলতা থেকে বের হওয়ার স্বল্পমেয়াদি কোনো রাস্তা সামনে দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতায় পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে। যদিও এ অঞ্চলের বর্তমান করুণ অবস্থাটি তাদেরই গর্ভজাত ফসল। একনায়কতন্ত্রের প্রতি আরব বসন্তের আগে-পরে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির দ্বৈত অবস্থা ও তাদের আধুনিক ইতিহাসের অদূরদর্শিতা আজকের এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
২০১১ সালের আগে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের চেয়ে স্থিতিশীলতা বেশি মূল্যবান ছিল। দশকের পর দশক ধরে আরব একনায়তন্ত্র সহ্য করা হয়েছে, কারণ তারা পশ্চিমাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে দিয়েছিলেন। মিসরে হোসনি মোবরককে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও বাণিজ্যচুক্তিতে রাজি ছিলেন। সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে গোলান হাইটস নিরাপত্তার রক্ষক বিবেচনা করা হয়েছিল। আর ইয়েমেনের আলী আবদুল্লাহ সালেহ ছিলেন আল কায়দাবিরোধী মিত্র। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ কিংবা মানবাধিকার কর্মীদের ততটা উচ্চবাচ্য ছিল না। এ অবস্থা দেখে পশ্চিমা বিশ্ব খুশি ছিল তাদের স্বার্থ অনন্তকাল নিরাপদ। বিনিময়ে আরবের একনায়করা পশ্চিমাদের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পেতেন। নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিশ্চয়তাও পেতেন। এর মধ্যে ইয়েমেন ছিল গতিশীল চুম্বক। সালেহর ব্যক্তিস্বার্থে করা নানা উচ্চাভিলাষী অপকর্মের অন্ধ সমর্থন করতেন পশ্চিমা কূটনীতিকরা। অস্ত্র চোরাকারবারি থেকে ব্যবসায়িক পার্টনারও ছিলেন তিনি। অথচ ইয়েমেনের অধিকাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। সালেহর আবেদন আরও বেড়ে যায়, যখন আরব উপদ্বীপে আল কায়দার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা চালানোর সুযোগ দিয়েছিলেন। একনায়কতান্ত্রিক বাস্তবতা উল্টে গেল যখন আরব বসন্ত শুরু হল। পশ্চিমা বিশ্ব তা উপেক্ষা করতে পারিনি। প্রকাশ্যে তারা বিপ্লবকে সমর্থন দিল। কিন্তু একনায়কতন্ত্র পরবর্তী অবস্থা সামলানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ঠিক করতে পারেনি। বর্তমান অরাজকতার জন্য দায় তাই পশ্চিমাদেরই। লিবিয়াকে স্থিতিশীল করার স্পষ্ট কোনো ভিশন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে তারা আন্তর্জাতিক সামরিক অপারেশন চালালো। যার পরিণতিতে এখন ধুঁকে ধুঁকে মরছে দেশটি।
কূটনৈতিক নানা হম্বিতম্বিতে সত্ত্বেও সিরিয়া নোংরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের গণঅভ্যুত্থানের মীমাংসা হল এভাবে, উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (জিসিসি) উদ্যোগে সালেহ তার ডেপুটি আব্দো রাব্বো আল মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। কিন্তু এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ভেবে দেখা হয়নি। যার মূল্য এখন শোধ করছে ইয়েমেন। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইয়েমেনের জাইদি হুথি ও সুন্নিদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে আমলে নেয়নি। হুথিদের ওপর একনায়ক সরকারের অবদমনকে গুরুত্ব দেয়নি। মার্কিন ড্রোন হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার এক ধরনের জনঅসন্তোষও ছিল। হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠতা ও সমর্থন বিবেচনা না করে তাদের অধিকার অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। এখন অনেকেই বলছেন, ওটা ‘আরব বসন্ত’ ছিল না, ছিল ‘আরব শীত’। একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ কখনও সোজাসাপ্টা হয় না। ইয়েমেনের বর্তমান বিপর্যয় এটাই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একনায়কতান্ত্রিক শাসনেই স্থিতিশীলতা ও স্বস্তি ছিল। যদিও ভেতরে অগ্ন্যুৎপাতের আয়োজন ছিল। কিন্তু একনায়করা তাদের জনগণের ওপর কড়াকড়ি করলেও বিনিময়ে দেশকে নিরাপদ রাখে। পশ্চিমা সাহায্য নিলেও একনায়কদের নিজস্ব স্বার্থে যখন আঘাত লাগে, তারা ঘুরে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই যে সংঘাত, তা একনায়কদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বৈরাচারের ফল। একনায়কী সেই ঢাকনা খুলে যাওয়ায় তা বের হয়ে পড়েছে। তাই মনে হচ্ছে ওই সব লৌহ মানবরাই ‘সাময়িক’ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার চাদরে মুড়ে রেখেছিল। সেই ‘সাময়িক’ সময়টাই তো কয়েক দশক।

আমি ভারতীয় ছবির পক্ষে নই

*বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?
**মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর তোমার প্রেমে পড়েছি, মনতাজুর রহমান আকবরের আগুনের চোখে প্রেম, মাসুম পারভেজ রুবেলে মিশন সিক্স, লেলিন হায়দারের মিশন সিআইডি ছবিগুলোর শুটিং নিয়েই এ মুহূর্তে ব্যস্ত আছি। পাশাপাশি বুলবুল বিশ্বাসের রাজনীতি ও বদিউল আলম খোকনের নাম ঠিক না হওয়া একটি ছবির শুটিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।
*সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির ফলাফল কী?
**সর্বশেষ আমার অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ‘সীমাহীন ভালোবাসা’। ছবিটি দর্শক বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। তবে তার চেয়ে বেশি রেসপন্স ছিল মমর সঙ্গে ‘প্রেম করবো তোমার সাথে’ ছবিতে। এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন রাকিবুল আলম রাকিব। একেবারে ব্যতিক্রমী একটি ছবি ছিল এটি। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ছবিতে এটাই ছিল মমর প্রথম অভিনয়।
*আপনাদের হিন্দি ছবির বিরুদ্ধে আন্দোলনের খবর কী?
**আমাদের আন্দোলন ফলপ্রসূ হয়েছে। আমি বলব আমরা সাকসেস। কারণ আন্দোলনের কারণে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আমাদের ডেকে পাঠানো হয়েছিল। তখন আমাদের নিশ্চিত করা হয়েছে, যে কটি (১১টি) ছবি আগে আইনের ফাঁকফোকর গলে আমদানি করা হয়েছিল সেগুলো প্রদর্শিত হওয়ার পর আর নতুন কোনো হিন্দি ছবি আমদানি করা হবে না।
*কিন্তু ভারতীয় বাংলা ছবির ক্ষেত্রে তো কোনো বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়নি।
**ভারতীয় বাংলা ছবির ক্ষেত্রে আমরা দাবি করেছি, যৌথ প্রযোজনার ছবি হলে বাংলাদেশে চলতে পারবে। এছাড়া এককভাবে কলকাতায় নির্মিত কোনো ভারতীয় বাংলা ছবি প্রদর্শন করা যাবে না।
*আপনাদের এ দাবি কি মেনে নেয়া হয়েছে?
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এ ব্যাপারেও আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
*বর্তমানে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা দিয়ে বাংলাদেশীদের মধ্যে যে ভারতবিদ্বেষী মনোভাব তৈরি হয়েছে সেটা কী ভারতের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার ছবির ওপর প্রভাব ফেলবে না? কিংবা দর্শকরা আপনাদের বয়কট করবে না?
**দেখুন, আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতীয় ছবির পক্ষে নই। আমার দেশে যে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে তার ডেভেলপ করে মানসম্মত ছবিতে অভিনয় করার পক্ষপাতী আমি। অন্যের দ্বারস্থ হয়ে তারকাখ্যাতি অর্জন করার কোনো ইচ্ছে আমার আগেও ছিল না, এখনও নেই। সুতরাং যৌথ প্রযোজনার ছবি দর্শক যদি বয়কট করে তাহলে সেটা আর নির্মিত হবে না। সবকিছু সময়ের ওপর ছেড়ে দেয়া ভালো।
আনন্দনগর প্রতিবেদক

ফাইনাল হবে উপভোগ্য

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে দেশে ফিরে আসা সৌম্য সরকার কাল ফাইনাল নিয়ে কথা বলেন-
প্রশ্ন : বিশ্বকাপের ফাইনাল কাল। আপনি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছেন। অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কেও ধারণা রয়েছে আপনার। রোববারের ফাইনালে আপনি কাকে এগিয়ে রাখছেন?
সৌম্য : অস্ট্রেলিয়া সুবিধা পাবে। তবে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। নিউজিল্যান্ড জিতলে খুশি হব।
প্রশ্ন : কে ব্যবধান গড়ে দিতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
সৌম্য : অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিংয়ে অনেক ভালো। বোলিংয়েও এগিয়ে।
প্রশ্ন : নিউজিল্যান্ডের সাউদি ও বোল্টকে কেমন দেখলেন?
সৌম্য : নিঃসন্দেহে তারা ভালো। ফাইনালেও তারা ভালো করবেন আশা করি।
প্রশ্ন : মেলবোর্নের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন। সেখানে আপনি খেলেছেন।
সৌম্য : মেলবোর্ন অনেক বড় মাঠ। প্রায় ৯০ হাজার দর্শক হয়। ফাইনাল উপভোগ্য হবে।
প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ার স্টার্ক ও জনসন ব্যবধান গড়ে দিতে পারবেন?
সৌম্য : স্টার্ক ভালো করলেও জনসন এবার খুব একটা ভালো করেননি। তবে জনসন জ্বলে উঠলে অস্ট্রেলিয়া ভালো ফল পেতেও পারে।
প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কনডিশনে কতটা পার্থক্য?
সৌম্য : পার্থক্য তেমন নেই। উইকেট ও আবহাওয়া প্রায় একই। তবে নিউজিল্যান্ডের উইকেটে বল মুভ করে অস্ট্রেলিয়ায় ততটা না।
প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্নার এবং ম্যাক্সওয়েল নিউজিল্যান্ডের জন্য কতটা হুমকি হতে পারেন বলে মনে করেন আপনি?
সৌম্য : দু’জনই বিপজ্জনক খেলোয়াড়। তাদের মোকাবেলা করা কঠিন।
প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়াকে রুখতে হলে নিউজিল্যান্ডকে কী করতে হবে?
সৌম্য : ভালো বল সবসময়ই ভালো। নিউজিল্যান্ড যদি তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারে, তাহলে ফলাফল তাদের অনুকূলে যাবে।
প্রশ্ন : নিউজিল্যান্ডের ম্যাককালামের ভূমিকা কেমন হতে পারে?
সৌম্য : নিউজিল্যান্ড অবশ্যই শক্তিশালী দল। আর ম্যাককালাম তো খুবই শক্তিশালী একজন খেলোয়াড়। তিনি ভালো খেলবেন।
প্রশ্ন : নিউজিল্যান্ডের সব মাঠ ছোট। মেলবোর্ন বিশ্বের অন্যতম বড় মাঠ। এতে নিউজিল্যান্ড কি সমস্যায় পড়তে পারে?
সৌম্য : মেলবোর্ন বড় মাঠ বটে। খেলাও হবে উপভোগ্য। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের মাঠ ছোট বলে তারা তেমন কোনো সমস্যায় পড়বে বলে মনে হয় না। মাঠ কোনো ফ্যাক্টর নয়।

উচ্চশিক্ষার্থে যেখানেই যাও দেশে ফেরত এসো

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী জাতীয় ইনডোর স্টেডিয়ামে
গতকাল ডেইলি স্টার আয়োজিত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের
মধ্যে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন l প্রথম আলো
বিশিষ্টজনেরা শিক্ষার্থীদের পুরস্কার দেওয়ার সময় বলেছেন, দেশ অনেক এগিয়েছে। সামনে অপার সম্ভাবনা। মেধাবী শিক্ষার্থীরা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য যেকোনো দেশেই যেতে পারে, তবে তাদের দেশে ফিরে আসা উচিত। তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী জাতীয় ইনডোর স্টেডিয়ামে গতকাল শনিবার ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনেরা এ কথা বলেন। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের জন্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। এ নিয়ে ১৬তম বারের মতো ইংরেজি মাধ্যমের কৃতী শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করল ডেইলি স্টার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের থেকেও এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকতে পারে কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্ম মেধার দিক থেকে দরিদ্র নয়। নতুন প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধ, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের শিক্ষায় গড়ে উঠতে হবে।’
এবারের আয়োজনে ডেইলি স্টার ১ হাজার ৭৫৯ জন শিক্ষার্থীকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রশংসাপত্র ও মেডেল দিয়েছে। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।
ডেইলি স্টার-এর প্রকাশক ও সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা, অংশগ্রহণ, কৌতূহলের মতো কিছু গুণাবলি গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারের। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে দেশেই থাকতে হবে তা নয়। বিশ্বের যেকোনো স্থানে থেকে দেশের সেবা করা যায়। অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেয় অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, বিএএফ শাহিন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়ালস ও স্কলাসটিকা।
অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ সময়ে মঞ্চে এলেন সাকিব। শিক্ষার্থীদের দেশের প্রতি দায়িত্ববান হওয়ার পরামর্শ দিলেন জাতীয় দলের এই সদস্য।
অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট উইনিংটন গিবসন, ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, মালয়েশিয়ার মনাশ ইউনির্ভাসিটির স্কুল অব সায়েন্সের সাদেকুর রহমান, এডেক্সেল এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক সায়মন ইয়াং, ইনডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম ওমর রহমান, মাইক্রোসফট মোবাইল ডিভাইসের এমার্জিং এশিয়ার মহাব্যবস্থাপক সন্দ্বীপ গুপ্তা বক্তব্য দেন।

দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক তৈরিতে মেরন সান অবদান রাখছে -স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল

নগরীর মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ এর চকবাজার ক্যাম্পাস-এর উদ্যোগে মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন, বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার ও সনদপত্র প্রদান এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুুষ্ঠান গত ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৯টায় অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্ কর্তৃক অনুষ্ঠান উদ্বোধনের পরপরই শুরু হয় ক্ষুদে শিল্পীদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। তিনদিন ব্যাপি আয়োজিত ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সমাপনী দিন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের মাননীয় পুলিশ কমিশনার মোহাঃ আবদুল জলিল মণ্ডল বিপিএম। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মিজানুর রহমান চৌধুরী, সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালী) শাহ মোহাম্মদ আবদুর রউফ, সহকারী পুলিশ কমিশনার আসিফ মহিউদ্দীন, বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মহসীন, চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ আতিক আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম মা, শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ- এর কার্যনির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট লায়ন সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মহিলা কাউন্সিলর শাহেদা কাসেম সাথী, কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক শাহনাজ পারভীন, চকবাজার ক্যাম্পাসের উপাধ্যক্ষ রাজেশ কান্তি পাল, চান্দগাঁও ক্যাম্পাসের উপাধ্যক্ষ নুর কাসেম তালুকদার, চিফ একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর শিহাব ইকবাল প্রমুখ। আলোচনা সভার পর আমন্ত্রিত অতিথি ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে আকর্ষণীয় বেলুন ফোলানো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় এবং অনুষ্ঠান শেষে ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে মাননীয় প্রধান অতিথি পুরস্কার তুলে দেন। প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন- “প্রতিটি শিক্ষার্থীর লক্ষ্য হতে হবে সৎ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠা এবং এজন্য কেবল ক্লাসে নয়, জীবনেও প্রথম হতে হবে। পিতা-মাতা ও শিক্ষককে মেনে চলার কোন বিকল্প নেই। শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে মেধা ও মননের বিকাশ ঘটাতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে, মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য অজিত হবে এবং মিশন ২০২১ এর সফল বাস্তবায়ন ঘটবে। স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক তৈরিতে মেরন সান অবদান রাখছে।” শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি শিক্ষক ও অভিভাবকদের সহযোগিতা কামনা করেন এবং নিজ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্ বলেন, “শিক্ষার্থীরা যদি অন্তরে এই বিশ্বাস ধারণ করে যে, তারা পারবেই, তাদেরকে পারতেই হবে, তাহলে ব্যর্থতা কখনো তাদের জীবনে আসতে পারবে না। এই বিশ্বাসের জোরেই নিরস্ত্র বাঙালিরা সশস্ত্র পাকহানাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ও বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল।”  আলোচনা সভা শেষে শুরু হয় মেরন সান সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের অংশগ্রহণে নাচ, গান, কৌতুক ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সমগ্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালনের দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষক পঞ্জক দাশ, শওকত ওসমান ও শিক্ষিকা স্বপ্না রাণী দত্ত। অনুষ্ঠানে মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ-এর সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকমণ্ডলী উপস্থিত ছিলেন।

চাপের মুখে গণমাধ্যম by সুমিত গালহোত্রা

মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলা ভাষার জনপ্রিয় নিউজ শো ‘ফ্রন্টলাইন’-এর উপস্থাপক ছিলেন ৫ বছর। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার হতো সপ্তাহে তিন দিন। চলমান ঘটনাপ্রবাহ আলোচনা করতে রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের সদস্যবৃন্দ ও সাংবাদিকদের একসঙ্গে এনে অনুষ্ঠানটি খ্যাতি অর্জন করে। মি. চৌধুরী তার বিনয়ী কথন কিন্তু বলিষ্ঠ আচরণে নিজেকে তার সমসাময়িক অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করেছেন। আলোচকদের একে-অপরের ওপর চড়াও হওয়ার মতো কোন অনুষ্ঠান পরিচালনা করার পরিবর্তে তিনি অতিথিদের নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা সঞ্চালন করেছেন। যে সময়টায় বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যমের বেশিরভাগ নীরব হয়ে গেছে তখন চৌধুরীর এ অনুষ্ঠানের মতো টক শোগুলো ছিল সমালোচনামূলক সংবাদ কভারেজের সর্বশেষ জায়গাগুলোর একটি। গত মাসে ‘ফ্রন্টলাইন’ বন্ধ করে দেয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যানেলের চেয়ারম্যান বলেছেন ‘কারিগরি সমস্যার’ কারণে শোটি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছে। কিন্তু সিপিজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সফরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় ঘটনার বিপরীত বিবরণ উঠে এসেছে। মতিউর রহমান চৌধুরীসহ অনেক সাংবাদিক দাবি করেছেন রাজনৈতিক কারণে শোটি স্থগিত করার প্রচেষ্টার পেছনে কর্তৃপক্ষের হাত রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগের সপ্তাহগুলোতে বেসরকারি মালিকানাধীন বাংলাভিশন চ্যানেলকে তাদের টক শোকে কি কি বিষয় আলোচনার সুযোগ রয়েছে এবং কোন কোন সঞ্চালকে তাদের বাদ দেয়া উচিত সেই বার্তা দিয়ে কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে এমন রিপোর্ট গণমাধ্যমে আসে। কিন্তু হুকুম তামিল করতে অস্বীকৃতি জানান মি. চৌধুরী। ছয় সপ্তাহের বেশি সময় পরও শোটি বন্ধ রয়েছে। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র গণমাধ্যম কি ধরনের চাপের মুখে রয়েছে- অনুষ্ঠানটি বন্ধ থাকাটা তার একটি ইঙ্গিত।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে হারিয়ে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফেরেন। এ দুই নেত্রীকে প্রায়ই গণমাধ্যমে ‘ব্যাটলিং বেগমস’ আখ্যা দেয়া হয়। ১৯৯০ সালে ১৫ বছরের সামরিক শাসনের সময়কাল সমাপ্ত হওয়ার পর থেকে তারা পালাবদল করে ক্ষমতায় এসেছেন। গত বছর হাসিনার পুনঃনির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও অন্যান্য দলগুলো। এটা নতুন করে রাজনৈতিক নাটকীয়তায় যোগ হয়েছে। হাসিনার প্রতিপক্ষরা দাবি করে নির্বাচনে বৈধতার অভাব ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ করে দিতে তারা হাসিনার পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।
অনেক সাংবাদিক আমাকে বলেছেন, এর পর থেকে রাজনৈতিক পরিবেশের অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সংসদে সত্যিকারের কোন বিরোধী দল না থাকায় সরকারের ওপর সংসদের এখন কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আর বিচার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বলতে গেলে, নিম্ন আদালতগুলো সরকারের আঙুলের নিচে রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সত্যিকারের কোন ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ নেই যা হাসিনা ও খালেদাকে চরম ক্ষমতাধর করে তুলেছে। এসব ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে গণমাধ্যমের টিকে থাকা।’
বিরোধী গণমাধ্যমগুলো টার্গেট করার পর এবং ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে রাজনৈতিক বিরোধীদের কার্যত নির্মূল করার পর হাসিনা সরকারকে চ্যালেঞ্জ এবং সমালোচনা করতে পারে এমন সর্বশেষ যেসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। বাংলাদেশে সেটা মানুষের সামনে মূলত আসে টেলিভিশনের সংবাদ এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে। বিবিসির মতে বাংলাদেশে টিভি এখনও সব থেকে জনপ্রিয় মাধ্যম। আর বাংলা ভাষী পত্রিকাগুলো বড় নেতৃত্বের গৌরব করে- এসব পত্রপত্রিকাগুলো কখনও কখনও নানারকম এবং রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণ রয়েছে। বাংলাদেশের পৌঁছুনোর প্রাক্কালে দেশটির অন্যতম প্রচারিক বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর একটি মতামত-সম্পাদকীয়তে দেখলাম বলা হয়েছে, ‘সরকার তাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আর দায়িত্ব ছুঁড়ে ফেলেছে। এটা একটি কর্তৃত্বপরায়ণ পুলিশ রাষ্ট্রের ন্যায় আচরণ করছে। শাসকরা বিরোধীদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণ সঙ্কুচিত করে ফেলার মাধ্যমে তাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করছে। ঢালাওভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে। আর ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। সঙ্কট সমাধা হওয়ার পরিবর্তে আরও গভীরে পতিত হচ্ছে।’
যে দিন সকালে আমি ঢাকা পৌঁছাই বিএনপি দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। কয়েক দিন ধরে তা চলে। এসব হরতাল প্রায়ই শহর বা দেশের বিভিন্ন অংশ বন্ধ করে দিয়ে পালন করা হয়। এর সঙ্গে চলে সহিংস প্রতিবাদ। এ দফায় বাসে পেট্রলবোমা আর রাজপথ সহিংসতার প্রাত্যহিক খবর আসে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিনিদের শহরের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নিরাপদে থাকতে পরামর্শ দিয়ে সতর্কতা ইস্যু করে।
উত্তেজনাকর এ সময়ে আমি যেসব সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি তারা যেসব চাপের মুখে রয়েছে সেসব কথা বলেছেন। প্রথম আলোর এক প্রতিনিধি এবং সিপিজের ২০০২ সালের ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড জয়ী টিপু সুলতান বলেন, আমাদের দেশ বিভক্ত। আওয়ামী লীগকে যারা সমর্থন করেন না তারা হুমকির মুখে রয়েছেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে সকালের নাস্তার টেবিলে আলোচনা হয়। তার পত্রিকার চ্যালেঞ্জগুলো তিনি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতার জন্য পরিবেশ একেবারেই বন্ধুভাবাপন্ন নয়। বর্তমান সরকার মনে করে স্বতন্ত্র গণমাধ্যম তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।’ তিনি দাবি করেন, তার কর্মীদের প্রায়ই গোয়েন্দারা অনুসরণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অংশে মতিউর রহমান এবং তার কর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন মামলার কাগজপত্র দেখান তিনি। এসব মামলায় মানহানি থেকে শুরু করে আদালত অবমাননার অভিযোগ রয়েছে। মি. রহমান ব্যাখ্যা করলেন, সাধারণত এসব অভিযোগের বর্ণনা প্রায়ই একইরকম হয়ে থাকে। আর মামলার বাদীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিলেন  সরকারি আইনজীবী, আওয়ামী লীগ সমর্থক বা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য।
ঢাকাভিত্তিক বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের সাম্প্রতিক ঝঞ্ঝাটেও একই ধারা প্রতিফলিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রায়ের খবর সিপিজে প্রতিবেদনে আসে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। বার্গম্যান আমাকে বলেন, ‘আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকার সুযোগ খুঁজছে। সরকার এ যুক্তি দেখাতে পারে না যে তারা নয় আদালত এটা করছে। বেসরকারি ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের প্রতিনিধি বার্গম্যান। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ওয়ার ক্রাইম ট্রাইবুন্যাল শীর্ষক একটি ব্লগ লেখেন। এতে ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া ও আদালত নিয়ে সমালোচনামূলক রিপোর্ট লেখেন তিনি। বার্গম্যান জানান, তাকে ৫০০০ টাকা জরিমানা বা ৭ দিনের কারাদণ্ড দেয় আদালত। তিনি ওই জরিমানা পরিশোধ করেন। বার্গম্যানের বিরুদ্ধে রায় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে একটি বিবৃতিতে যেসব ব্যক্তিবর্গ, একাডেমিকস এবং পেশাদার ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন এবং আদালত অবমাননা আইনের সংস্কার আইনের আহ্বান জানিয়েছিলেন তাদের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা বা আদালতে হাজির হতে বাধ্য করা হয়। আমার সফরের সময় এ ঘটনা ঘটে। জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত স্বাক্ষরকারীদের কাছ থেকে তাদের বিবৃতির বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা চান। এপ্রিল মাসে আদালতের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হাসিনার সরকার গত দুবছর ধরে কিভাবে বিরোধী গণমাধ্যমকে নিশ্চুপ করিয়েছে সিপিজে তা নথিভুক্ত করেছে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে বেসরকারি আমার দেশ দৈনিকের বিরোধীপন্থি সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টিকারী মিথ্যা ও অবমাননাকর তথ্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও আনা হয় রাষ্ট্রদোহিতা এবং বেআইনি প্রকাশনার অভিযোগ। প্রায় দুবছর ধরে কারান্তরীণ রয়েছেন তিনি। এদিকে তার বিচার চলছে। ২০১৩ সালের মে মাসে পুলিশ দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভি স্টুডিওগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিভ্রান্তকারী তথ্য সম্প্রচারের অভিযোগে চ্যানেলগুলোকে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করা হয়। উভয় চ্যানেল তাদের কভারেজে ছিল বিরোধীপন্থি। এখনও চ্যানেল দুটি বন্ধ রয়েছে।
সরকার এছাড়াও গত বছর একটি সম্প্রচার নীতিমালা উপস্থাপন করে যেখানে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এমন কোন বিষয়বস্তু সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। একইসঙ্গে বাধ্যতামূলক করা হয় সরকারের দৃষ্টিতে জাতীয় গুরুত্ববহ অনুষ্ঠানগুলোর সম্প্রচার; উদাহরণস্বরূপ সরকারি নেতাদের বক্তব্য। নীতিমালা এখনও বাস্তবায়ন না হলেও, আমি যেসব সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি তাদের মতে এটা বার্তা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ইচ্ছার ইঙ্গিত।
জানুয়ারি মাসে বেসরকারি টিবি চ্যানেল একুশে টিভির মালিক আবদুস সালামকে গ্রেপ্তারেও সরকারে এ ইচ্ছা স্পষ্ট হয়েছে। তাকে বানোয়াট অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। খালেদা জিয়ার লন্ডনপ্রবাসী ছেলে এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য সম্প্রচারের পর উত্তাপ অনুভব করতে শুরু করে চ্যানেলটি। সংবাদ প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী তারেক তার বক্তব্যে হাসিনা-নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাতের আহ্বান জানান।
১৮ই ফেব্রুয়ারি হাসিনা সংসদে দ্য ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামপন্থি দল হিজবুত তাহরিরের একটি পোস্টারের ছবি প্রকাশ করার পর এ হুমকি দেন হাসিনা। ওই ছবির সঙ্গে শিরোনাম ছিল: ‘ফ্যানাটিকস রেইজ দেয়ার আগলি হেডস এগেইন’। ছবির ক্যাপশনে অংশবিশেষ হলো: দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট ও সহিংসতার সুযোগ নিয়ে সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা উসকে দেয়ার প্রচেষ্টায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামি সংগঠন হিজবুত তাহরির রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পোস্টার ছেপে লাগিয়েছে।
হাসিনা অভিযোগ করেন যে ডেইলি স্টার ওই জঙ্গি গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে এবং তাদের বার্তা প্রচার করছে। সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয় সংসদে হাসিনা বলেন, হিজবুত তাহরিরের পোস্টার পেপারে ছাপিয়ে তাদের যারা সহায়তা করছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেব। তারা ইতিবাচকভাবে লিখেছে নাকি নেতিবাচকভাবে লিখেছে আমার কিছু এসে যায় না। কিন্তু ওই পোস্টারের ছবি ছাপিয়ে যেটা কোন মনোযোগই কাড়তো না, পত্রিকাটি জঙ্গি উদ্দেশে সহায়তা করেছে।
দুদিন পর পত্রিকাটির সম্পাদক প্রথম পাতার মতামত সম্পাদকীয়তে লিখেছেন, আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি অবিবেচনাপ্রসূত। আর যা বলা হয়েছে তা যদি বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে বাংলাদেশে কোন মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম বেঁচে থাকবে না।  হাসিনার বক্তব্যের কিছু সময় পরই তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় মি. আনামের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তথ্য-প্রযুুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা জয় ফেসবুকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান। এদিকে, তথ্য মন্ত্রণালয় ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে এক বিবৃতিতে গণমাধ্যমের সরকারের হস্তক্ষেপের বিষয় প্রত্যাখ্যান করে। সজীব ওয়াজেদ মাহফুজ আনামের গ্রেপ্তার দাবির কিছু সময় আগে আমি মি. আনামের সঙ্গে কথা বলি। ঢাকায় তার কার্যালয়ে আমাদের বৈঠকে তিনি বলেন, তিনি শুধু কর্তৃপক্ষের চাপ নিয়েই উদ্বিগ্ন নন, বরং গণমাধ্যম স্বাধীনতার সার্বিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘গত বছরে মিডিয়া সেলফ-সেন্সরশিপ ধারায় চলে গেছে। সরকার সমালোচনামূলক কণ্ঠের প্রতি সম্পূর্ণ অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে।’
এ অসহিষ্ণুতা সরকার পেরিয়ে বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। আমি বাংলাদেশ ছাড়ার কিছুদিন পর বাংলাদেশী-মার্কিন ব্লগার অভিজিৎ রায় এবং রাফিদা আহমেদ বন্যা অজ্ঞাত হামলাকারীদের দ্বারা হামলার শিকার হন। এতে অভিজিৎ মারা যান আর তার স্ত্রী মারাত্মক আহত হন। অভিজিৎ ইসলামী মৌলবাদ নিয়ে স্পষ্টবাদী সমালোচক ছিলেন বলে বলা হয়। আর তিনি উদারমনা, প্রগতিশীল ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেছেন। একমাস পেরিয়ে গেছে। তার পরিবার উদ্বেগ জানিয়েছে যে, হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনতে অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই। ধর্ম নিয়ে মন্তব্যকারী ব্লগার আর সমালোকদের বিরুদ্ধে একটি সহিংস ধারার প্রতি ইঙ্গিত দেয় তার হত্যাকাণ্ড। মাহফুজ আনাম আমাকে বললেন, মুক্ত ও স্বাধীন সমাজের জন্য ধ্বংস্বাত্মক এক বিশ্বে আমরা বাস করছি।
(কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট, সিপিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ। লেখক সুমিত গালহোত্রা সিপিজের এশিয়া কার্যক্রমের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট। অতীতে তিনি সিএনএন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কাজ করেছেন।)

৫ই জানুয়ারির প্রতিশোধ জনগণ সিটি নির্বাচনে নেবে

৫ই জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার প্রতিশোধ জনগণ এবার সিটি  নির্বাচনে নেবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারার সভাপতি প্রফেসর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। একইসঙ্গে অতীতের অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সরকারকে তওবা করে সিটি নির্বাচন নিরপেক্ষ করার দাবি জানান সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। এদিকে সিটি নির্বাচনের দলীয় প্রার্থীদের গণভবনে ডেকে প্রধানমন্ত্রী সংবিধান লঙ্ঘন করছেন বলে অভিযোগ করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। আগামী ১লা এপ্রিল নতুন কর্মসূচি ঘোষণা দেবেন বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেছেন, সিটি নির্বাচনের ফলাফল জোর করে নিতে চাইলে আপনি আরও পচে যাবেন। গতকাল মতিঝিলের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কাদের সিদ্দিকীর ফুটপাথে অবস্থানের ৬০তম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তারা। বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ৫ই জানুয়ারি নির্লজ্জভাবে বেআইনি নির্বাচন করেছিল সরকার। ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এখন তাদের সামনে শেষ সুযোগ এসেছে- তওবা করে অতীতের অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার। সরকারকে বলবো, সঠিক নির্বাচন দেন। একইভাবে নির্বাচন কমিশনকে বলবো- একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন করেন। এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারবেন- অতীতে ভুল হয়েছে আর হবে না। প্রশাসনের উদ্দেশে বি. চৌধুরী বলেন, অতীতে আপনারা আঙুল চোষার কথা বলেছিলেন। আর আপনাদের আঙুল চোষার দরকার নেই। দায়িত্বে আছেন, দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করেন। ক্ষেমতা (ক্ষমতা) দেখাইয়েন না। ক্ষেমতা বেশি দিন থাকে না। কারণ দায়িত্ব পালন না করলে এর প্রতিশোধ একদিন জনগণ নেবে। তিনি বলেন, ‘সিটি নির্বাচন সরকারকে সঠিক পথে আনার সুযোগ। এবার রুখে দাঁড়াতে হবে। ১৫৩টি আসনের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার প্রতিশোধ নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনারকে বলবো, পুতুল খেলা চলবে না। আমার ভোট আমি দিবো, তুমি ছিনিয়ে নেয়ার কে? কোন রকম অন্যায় চলবে না। বি. চৌধুরী বলেন, ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণের জনগণ যদি জেগে উঠে তাহলে আর হরতাল-অবরোধ দিতে হবে না। তুমি, আমাদের জাগিয়ে দিয়েছো, তোমাকে আমরা ঘুমাতে দেবো না। কাদের সিদ্দিকীকে রাস্তায় নামার পরামর্শ দিয়ে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, কাদের সিদ্দিকী আমার প্রিয় মানুষ। যাকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্ভব নয়। এ মানুষটির নীরব প্রতিবাদকে আমি সব সময় সমর্থন দিয়ে আসছি। কে ক্ষমতায় সেটা দেখার বিষয় নয়, আমার দল সব সময় কাদের সিদ্দিকীর পাশে থাকবে। তিনি বলেন, আপনি ৬০ দিন ধরে মতিঝিলে অবস্থান করছেন। জনগণের কাছে আপনার মেসেজ পৌঁছে গেছে। কিন্তু সরকার কানে দিয়েছে তুলা, পিঠে দিয়েছে কুলা। তারা আপনার কথা শুনবে না। তাই আপনি রাস্তায় নামুন। সিটি নির্বাচনে জনগণকে প্রতিশোধ নিতে উদ্বুুদ্ধ করুন। শুধু ঢাকা শহরে অবস্থান কর্মসূচি সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশে ছড়িয়ে দিন। সভাপতির বক্তৃতায় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার বাবা সারাজীবন সরকারি প্রভাবমুক্ত নির্বাচন চেয়েছেন। বিশ্বাস না করুন, আপনি আপনার বাবার (বঙ্গবন্ধু) আত্মজীবনী পড়ে দেখুন। আর আপনি গণভবনে ঢাকার গুণ্ডাদের নিয়ে খাওয়াচ্ছেন। সরকারি টাকা খরচ করছেন। একদিন এর বিচারও হবে। বাংলাদেশে এখন বিচার নাই। একজন প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করতে পারেন না। এটা সংবিধানের লঙ্ঘন। এমন একদিন আসতে পারে সেদিন আপনারও বিচার হবে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সরকার এক টুকরো শুয়োরের মাংসের মতো সিটি নির্বাচন দিয়েছে আর সবাই সেই নির্বাচনে লাফিয়ে পড়ছে। তাহলে এত মানুষ জীবন দিলো কেন? সিটি নির্বাচন নাকি ৫ই জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন প্রতিরোধ করার জন্য এত মানুষ জীবন দিলো? প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা শেষ হয়ে এসেছে মন্তব্য করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, শেখ হাসিনা আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আপনার ক্ষমতার সীমা শেষ হয়ে এসেছে। কারণ পুলিশ দিয়ে রাষ্ট্র চালানো যায় না। তাহলে আইয়ুব খান, এরশাদরা এখনও ক্ষমতায় থাকতো। সিটি নির্বাচন বাদ দেন। সিটি নির্বাচনেও আপনার দলের প্রার্থী হারবে। তাই অবিলম্বে আলোচনায় বসেন। এসময় আগামী ১লা এপ্রিল বিকাল ৫টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি দেয়ার ঘোষণা  দেন কাদের সিদ্দিকী। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন, বর্তমান সরকার গায়ের জোরে টিকে আছে। এ সরকারের দুই কান কাটা। লাজ-লজ্জা কিছুই নেই। তিনি বলেন, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আটকের ২১ ঘণ্টা পর থানায় হস্তান্তর করা হয়। তার ভাগ্য ভাল যে তাকে আদালতে হাজির করেছে। কিন্তু বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে তো ২০ দিন পরও ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। বর্তমান সরকারকে হিটলার ও মুসোলিনির সরকারের সঙ্গে তুলনা করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, এমন রাষ্ট্র হবে জানলে আমি, কাদের সিদ্দিকী, আমরা যুদ্ধ করতাম না। হিটলার ৬২ লাখ মানুষ হত্যা করেও মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিটলারের চেয়ে বড় স্বৈরাচার না, সেও আমাদের কণ্ঠরোধ করতে পারবে না। তিনি বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটির নির্বাচন দিয়ে সরকার প্রমাণ করতে চায় জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। সরকার যদি জোর করে সিটি নির্বাচনের ফলাফল পক্ষে নিতে চায় তাহলে তারা আরও পচে যাবে। জনগণ তাদের ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করবে। এর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে। জুলুমবাজ সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে। কাদের সিদ্দিকীর উদ্দেশে তিনি বলেন, শুরু থেকেই আমি তার অবস্থান কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছি। এবার কাদের সিদ্দিকীকে এ ভোট চোর-ডাকাতদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হবে। লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বাংলাদেশের নষ্ট রাজনীতির শিকার কাদের সিদ্দিকী। তিনি শুভবুদ্ধির মানুষ। ৭১-এ তিনি মুক্তিযুদ্ধ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এবার অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ব্যবসায়ী নেতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী নেতারা শুধু বিরোধী দলকে দোষারোপ করেন, তাদের উচিত ছিল কাদের সিদ্দিকীর পাশে বসা। কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করা প্রত্যেক শুভবুদ্ধির মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)-এর সভাপতি শেখ শওকত হোসেন নিলু বলেন, আপনি ৫ই জানুয়ারি নির্লজ্জ নির্বাচন করেছেন। ওই নির্বাচনে ৩৮টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৮টিই অংশ নেয়নি। এই কলঙ্কের বোঝা আপনি মাথায় নিয়ে ঘুরছেন কেন? এতে কোন লাভ হবে না। এসময় কাদের সিদ্দিকীকে অবস্থান কর্মসূচির বদলে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান তিনি। কবি আল মুজাহিদী বলেন, মার্টিন লুথার কিং যেমন বলেছিলেন, আমার একটি স্বপ্ন আছে। কাদের সিদ্দিকীও মানুষকে ভালবেসে, এ স্বপ্ন নিয়ে এখানে বসেছেন। ইতিহাসে তার এ অবস্থান কর্মসূচি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগর সভাপতি এটিএম হেমায়েত উদ্দিন বলেন, কাদের সিদ্দিকী রাস্তায় বসে অহিংস আন্দোলনের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, এ দৃষ্টান্ত আর কেউ সৃষ্টি করতে পারবে না। মতবিনিময় সভায় কাদের সিদ্দিকীর স্ত্রী নাসরিন কাদের সিদ্দিকী, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তালুকদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, শিক্ষাবিদ এম.ই.এইচ আরিফ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

প্রেমে ব্যর্থ, তাই বিমান ধ্বংস?

ফরাসি আল্পস পর্বতমালায় ১৫০ আরোহী নিয়ে জার্মানউইংসের বিমান বিধ্বস্ত হবার পেছনে দায়ী ভাবা হচ্ছে বিমানটির কো-পাইলট আন্দ্রেঁ লুবিটজকে। তবে তিনি ঠিক কী কারণে ইচ্ছা করে বিমান ধ্বংস করেছেন, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। প্রাথমিকভাবে তার অসুস্থতা, বিশেষ করে বিষণœতাকে দায়ী করা হলেও, সম্প্রতি মিলেছে নতুন তথ্য। ডেইলি মেইলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন লুবিটজ। তবে তাতে ব্যর্থ হয়ে বিমানটিই ধ্বংস করে দেন তিনি! এ প্রেমিকার নাম ক্যাথরিন গোল্ডবাচ, যিনি পেশায় শিক্ষিকা। দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের পর তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন লুবিটজ। তবে তার ক্রমবর্ধমান স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে ক্রমেই স¤পর্ক নিয়ে ভয়ে ভুগছিলেন ক্যাথরিন। বিমানটি বিধ্বস্ত হবার কয়েক সপ্তাহ আগে লুবিটজের সঙ্গে তার স¤পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশ লুবিটজের ফ্ল্যাট অনুসন্ধান করে প্রচুর পরিমাণে ওষুধ খুঁজে পেয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি সম্ভবত বিষণœতা-নিরোধক ওষুধ গ্রহণ চাইতেন না। আরও দাবি করা হচ্ছে, তদন্তকারী কর্মকর্তারা লুবিটজের ডায়রি উদ্ধার করেছে। ডায়রিতে লুবিটজ নিজের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার কারণে চাকুরি হারানোর ভয়ের কথা লিখেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। লুবিটজ ও ক্যাথরিনের বন্ধুরা জানিয়েছেন, তখন পর্যন্ত তারা একসঙ্গে থাকতেন। তবে ক্যাথরিন নতুন ফ্ল্যাটের সন্ধান করছিলেন। কেননা, ক্রমেই লুবিটজ তার স¤পর্ক নিয়ে ভীষণ একরোখা ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছিলেন। এমনকি ক্যাথরিন কী পোশাক পরবেন, কার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন, তা-ও ঠিক করে দিতে চাইতেন লুবিটজ। আবার এরই মাঝে ক্যাথরিনের সঙ্গে প্রতারণা করে লুবিটজ পাঁচ মাস ধরে চুটিয়ে প্রেম করেছিলেন তারই বিমানে কর্মরত আরেক বিমানবালার সঙ্গে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, লুবিটজের দৃষ্টিশক্তি ও স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, একই সঙ্গে ক্যাথরিনের সঙ্গে স¤পর্কের টানাপড়েনের ফলেই বিমানটি ধ্বংস করার চূড়ান্ত পাগলামো পেয়ে বসেছিল তাকে।

জনপ্রতিনিধি অপসারণ- আইন প্রয়োগের একচোখা নীতি পরিহার করুন

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলার জালে জড়িয়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের অন্তত ২৫ জন বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে গত এক বছরে সাময়িক বরখাস্ত কিংবা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে সমসংখ্যক জনপ্রতিনিধি পালিয়ে রয়েছেন। এ তথ্য যেমন অস্বাভাবিক তেমনি উদ্বেগজনক। কিন্তু তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো, একই অভিযোগে অভিযুক্ত ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী জনপ্রতিনিধিরা উচ্চ আদালতে আপিল করে কিংবা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ছুটি নিয়ে স্বপদেই বহাল রয়েছেন।
আইনের গুণাগুণ বিচারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই আইন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না। স্থানীয় সরকার সংস্থার জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে দ্বিবিধ ব্যত্যয় ঘটেছে। বিরোধী দলের সমর্থক জনপ্রতিনিধি হলে আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং সরকারি দলের সমর্থক হলে আইনের গতি থেমে যাওয়া কোনোভাবে কাম্য হতে পারে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হলো না কেন? সরকারি দলের সমর্থক জনপ্রতিনিধি ছুটির দরখাস্ত দিয়ে স্বপদে বহাল থাকলেও বিরোধী দলের সমর্থক জনপ্রতিনিধিরা সেই সুযোগ থেকে কেন বঞ্চিত হবেন?
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ব্যক্তিমাত্র নন, তাঁরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান এবং এলাকাবাসীর প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই সেই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো পদক্ষেপ মন্ত্রণালয় নিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে প্রামাণ্য অভিযোগ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানিমূলক মামলার মধ্যে ফারাক থাকতে হবে। অন্তত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সবার বেলায় সেই সুযোগ না দেওয়া আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে সরকার একদিকে ক্ষমতাশালী করার কথা বলবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেগুলো অকার্যকর রাখবে—এই দ্বৈতনীতি চলতে পারে না। মন্ত্রণালয় বা প্রশাসন এভাবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে, তা যে স্তরেরই হোক না কেন, সরিয়ে দিতে পারে না।

হুমকির মুখে ভিন্নমত by গোলাম মুরশিদ

অমর একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
টিএসসির কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন ফুটপাতে খুন হন অভিজিৎ রায়।
আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে তোলা ছবি।
‘গড্ডলিকাপ্রবাহ’ কথাটা সুপরিচিত। কিন্তু এর অর্থটা অত পরিচিত নয়। ‘গড্ডলিকা’ মানে ভেড়ি, বিশেষ করে ভেড়ার পালে যে ভেড়িটা সবার সামনে চলে, সেই ভেড়ি। আর সংসদ অভিধানের মতে গড্ডলিকাপ্রবাহ কথাটার অর্থ: ‘পালের ভেড়ারা যেমন অন্ধের মতো অগ্রবর্তী ভেড়া বা ভেড়ির অনুসরণ করে, তেমনি ভালো-মন্দ বিচার না করে অন্য সবার সঙ্গে অগ্রবর্তীর অনুসরণ।’ ভেড়াদের এ এক মস্ত সুবিধা। দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিক্ষিপ্ত হওয়া দূরের কথা, ভাবারই ঝামেলা নেই। চোখ বুজে সামনের ভেড়াটাকে অনুসরণ করাই তাদের কাজ। শামসুর রাহমান হয়তো সে জন্যই বিদ্রূপ করে লিখেছিলেন, ‘মেষরে মেষ, তুই আছিস বেশ’।
ভেড়ার মতোই মানুষও একটা জন্তু। উভয়েরই চোখ-মুখ-নাক ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে। কিন্তু এই মিল সত্ত্বেও মানুষ ভেড়া নয়। সে ভেড়ার মতো অন্ধভাবে চলতে পারে না। তার মৌলিক কারণ তার মন নামের একটা বস্তু আছে। সেই মন চায় স্বাধীনভাবে নিজের পথে চলতে। তা ছাড়া, মনের অন্দর মহলে আছে মনের থেকেও অদম্য আরেকটা চেতনা, সে হলো তার ‘বিবেক’। সেই বিবেক তাকে পথ দেখায়। ভালো-মন্দ বিচার-বিবেচনা করার বুদ্ধি জোগায়।
পৃথিবীতে যখন থেকে মানুষের জন্ম, ভেড়ার জন্মও হয়তো তখন থেকে। এমনকি ভেড়ার বয়স মানুষের থেকে বেশি হওয়াও অসম্ভব নয়। কিন্তু এতকাল পৃথিবীতে বাস করা সত্ত্বেও ভেড়াদের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায় গড়ে ওঠেনি। ভেড়ারা গান লেখেনি, ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছে সহস্র জীবন’। সাম্যের ভিত্তিতে পরম নিশ্চিন্তে তারা নিরন্তর সুখে বসবাস করে আসছে। তাদের রাজনৈতিক নেতা নেই, সামাজিক মোড়ল নেই, এমনকি ধর্মগুরু নেই।
অন্যপক্ষে, মানুষ সামাজিক জীব। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা আছে। ব্যক্তিগত ভালো লাগা, মন্দ লাগা আছে। সে চায় নিজের মতে চলতে। অন্য মানুষের সঙ্গে আদান-প্রদান করে এবং পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আত্মতৃপ্তি তার কাছে পরম মূল্যবান। নিয়মকানুন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সমাজের মধ্যেই সে যত দূর সম্ভব স্বাধীনভাবে বাস করতে চায়। সেই তার প্রধান আনন্দ ও প্রাপ্তি। কেবল পেট ভরিয়ে সে সুখী হয় না। তার সুখের মাত্রা ও সুখের ধরন নির্ভর করে সামাজিক জীব হিসেবে সে কতটা সাফল্য লাভ করেছে, কতটা গুরুত্ব লাভ করেছে, তার ওপর। তার চরম বাসনা, সে নেতা হতে চায়।
এই নেতৃত্বের লড়াইকে এককথায় বলে রাজনীতি। এখন থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ একটা রাজনৈতিক জীব। সে রাজনীতি না করে পারে না। এক পথে রাজনীতি করা বন্ধ করা হলে সে আরেক পথ ধরে রাজনীতি করবে। মানুষের এই নেতৃত্বের লড়াই থেকেই ছোট-বড় নানা রাজনৈতিক দল এবং উপদলের সৃষ্টি হয়। অঞ্চলের ভিত্তিতে মানুষ বিভক্ত হয়ে যায়। আলাদা জাতি গড়ে ওঠে। নানা দার্শনিক আবির্ভূত হয়ে জীবনদর্শনের নানা রকমের ব্যাখ্যা দেন। এসব দার্শনিক চান তাঁদের অনুসারীরা তাঁদের মতবাদ অনুসরণ করে তাঁদের জীবনাচরণ করুক। তা-ই থেকে গড়ে ওঠে নানা আনুষ্ঠানিক ধর্ম ও উপধর্ম।
দৃষ্টান্তস্বরূপ খ্রিষ্টধর্মের কথা ধরা যাক। যিশুখ্রিষ্ট ছিলেন ইহুদি। তবে তিনি ইহুদি ধর্মের কিছু নতুন ব্যাখ্যা দেন। সেই ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছেন তাঁর যে অনুসারীরা, তাঁদের বলা হয় খ্রিষ্টান অর্থাৎ খ্রিষ্টবাদী। তাঁর মৃত্যুর কয়েক শ বছর পরে খ্রিষ্টধর্ম পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই শাখায় বিভক্ত হয়—ইস্টার্ন অর্থডক্স খ্রিষ্টধর্ম আর ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্ম। কিন্তু সেখানেই শেষ হলো না। ষোলো শতক থেকে তিন-চার শ বছরের মধ্যে নানা ধর্মগুরুর ব্যাখ্যা ও নেতৃত্ব অনুযায়ী খ্রিষ্টধর্ম প্রোটেস্ট্যান্ট, ব্যাপটিস্ট, লুথারিয়ান, প্রেস্বেটারিয়ান, অ্যাংলিকান, মেথডিস্ট, কোয়েকার, মর্মন, ইভেনজেলিকাল, বর্ন এগেইন, যেহোবা’স উইটনেস ইত্যাদি নানা শাখায় বিভক্ত হয়েছে। প্রতিটি শাখার নেতারাই দাবি করেন যে তাঁরা ধর্মের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সে ব্যাখ্যাই অভ্রান্ত এবং তাঁদের সম্প্রদায়ই অন্যান্য সম্প্রদায়ের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।
এভাবে হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, এমনকি ইসলামধর্মেরও নানা শাখা তৈরি হয়েছে। প্রতিটি শাখার অনুসারীরা দাবি করেন যে অন্য শাখার থেকে তাঁদের ধর্মীয় ব্যাখ্যাই শ্রেষ্ঠ। কাজেই এ ব্যাপারে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। কোনো সিদ্ধান্তই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
বস্তুত এ থেকে একটা জিনিসই প্রমাণিত হয়, সে হলো: মানুষ বুদ্ধিজীবী জীব এবং সে নিজের মতো করে চিন্তা করে। মানুষের এই স্বাধীন চিন্তাকে রোধ করার কোনো পথ নেই। অতীতকালে চেঙ্গিস খানের অথবা তৈমুরের হাতে কত লোক নিহত হয়েছে, তার সঠিক হিসাব কারও জানা নেই। কিন্তু হাল আমলে হিটলারের হাতে ৬৫ লাখ ইহুদি প্রাণ দিয়েছে। কমিউনিস্ট দেশগুলোয় ভিন্নমত পোষণ করার জন্য স্ট্যালিন, মাও, পলপটের হাতে লাখ লাখ লোক নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের গণহত্যা, বসনিয়ার গণহত্যা, রুয়ান্ডার গণহত্যা ইত্যাদি হত্যাকাণ্ডে লাখ লাখ লোক নিধন হয়েছে। এসব গণহত্যার কারণ ভিন্নমত ও রাজনীতি। কিন্তু এই পাইকারি হত্যা দিয়ে ভিন্নমতকে হত্যা করা যায়নি, অথবা রাজনীতিও বন্ধ করা যায়নি।
বস্তুত মতামত, ভিন্নমত ও স্বাধীন মত পোষণ করা মানুষের স্বভাব। প্রাণ দিয়েও মানুষ নিজের মতকে রক্ষা করে। মতামত ছাড়া জন্তুদের পক্ষেই বাঁচা সম্ভব, মানুষের পক্ষে নয়। কারণ, মানুষ বুদ্ধিমান ও রাজনৈতিক জীব। বেঁচে থাকার জন্য সে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো করে চিন্তাও করে।
স্বাধীনভাবে চিন্তা করার, স্বাধীন মত পোষণ করার, স্বাধীনভাবে বিশ্বাস করার, স্বাধীনভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করার অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। ধর্মীয় বিশ্বাস বললে অবশ্য খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম, ইসলাম ধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, ইহুদিধর্ম ইত্যাদি ধর্মের মতো আনুষ্ঠানিক ও বহুজন-সমর্থিত ধর্মকেই বোঝায় না। তা ব্যক্তিগত ধর্মও হতে পারে। কেউ ইচ্ছা করলে এক ধর্ম ত্যাগ করে আরেক ধর্ম পালন করতে পারে। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকারও তার জন্মগত, যদিও প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করে অন্যের অনুভূতিকে আঘাত করার অধিকার তার আছে কি না, তা বিতর্কের বিষয়। অন্তত অন্যের আবেগকে আহত করার উদ্দেশ্যে মত প্রকাশের অধিকার তার নেই।
একনায়ক অথবা স্বৈরাচারীকে মানুষ পছন্দ করে না। কারণ, একনায়ক অন্যদের মতামতকে গ্রাহ্য করে না। সে চায় নিজের মত অনুসারে অন্যদের চালাতে। মানুষ কেবল খেয়ে সুখী হলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাবার সংগ্রহ করত না। বরং বিনা পরিশ্রমে খাওয়াদাওয়া করে কারাগারে বাস করত। অথবা একনায়কের মত অনুসারে চলে বৈষয়িক উন্নতি করত। কিন্তু মানুষ তা করে না।
কিন্তু ইদানীং জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দারুণ উন্নতি হলেও স্বাধীন মত পোষণ এবং পালন করার সভ্য রীতির ওপরই হুমকি এসেছে। রাজনীতি থেকে আরম্ভ করে ধর্মমত পালন করা পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে মানুষ পরের মতের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তার চেয়েও মারাত্মক কেউ ভিন্নমত পোষণ ও পালন করলে, তাকে নিজের শত্রু বলে বিবেচনা করে। নিজের মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ না করে, বরং সে ভিন্নমতের গলা টিপে ধরে। যুক্তি দিয়ে নয় অথবা কোনো অহিংস উপায়ে নয়, প্রয়োজনবোধে সে সহিংসভাবে ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করতে চায়। আমাদের সমাজে সম্প্রতি কেবল ভিন্নমতকে নীরব করার প্রবণতা দেখা দেয়নি। কোনো মতকে বিপজ্জনক মনে করলে দরকার হলে, সেই মতাদর্শীকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
সম্প্রতি ভিন্নমত পোষণ করার জন্য অভিজিৎ রায়কে অজ্ঞাতনামারা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। অদূরেই বহু লোক ছিল। কেউ বাধা দেয়নি। হত্যাকারীদের কেউ ধাওয়া করে ধরার চেষ্টা করেনি। কেউ মুমূর্ষু অভিজিৎকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে আসেনি। এ থেকে কয়েকটা কথা প্রমাণিত হয় ১. পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহিষ্ণুতা এক দল লোকের বিবেক ও বিবেচনা থেকে একেবারে লোপ পেয়েছে, ২. পরের মতকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য এরা খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না, ৩. আমরা এত স্বার্থপর হয়েছি যে অন্যের বিপদ দেখলে তাকে সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে যাই না, ৪. আমাদের সংবিধানে মত পোষণ ও প্রকাশ করার যে স্বাধীনতা আছে, সে কেবল কথার কথা। এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করা কেউ দায়িত্ব বলে বিবেচনা করে না ও ৫. সভ্যতার পথ থেকে আমরা দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছি।
গোলাম মুরশিদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক।
ghulammurshid@aol.com

কাশ্মীরের অর্ধ-বিধবা ও বাংলাদেশে গুম by মীনাক্ষী গাঙ্গুলী

‘কে  উ একজন আমাকে জানিয়েছে, আপনারা সাহায্য করতে পারবেন। দয়া করে সাহায্য করুন, আমরা অসহায়।’ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে দুঃখজনকভাবে নিয়মিতই এমন আবেদন আসে। কিন্তু সবচেয়ে হিমশীতল বিষয় হচ্ছে,  যখন বলপূর্বক গুমের ব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া হয়। হাসিনা আহমেদ আমাকে ফোন দিয়েছিলেন তার স্বামী ও বিরোধী দল বিএনপি’র রাজনীতিক সালাহউদ্দিন আহমেদের ব্যাপারে কথা বলতে। তাকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ২০১৫ সালের ১০ই মার্চ সন্ধ্যায়। এক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, তখন তাকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সদস্য পরিচয় দেয়া ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। হাসিনা আমাকে জানিয়েছেন, তিনি আরও অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, যারা দেখেছে অপহরণকারীরা এসেছিল ভয়ঙ্করতম আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গাড়িতে চড়ে। তবে সালাহউদ্দিনের হদিস সমপর্কে কোনকিছু জানা থাকার কথা, বা তার অন্তর্ধানের পেছনে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে সরকার। এটিই হচ্ছে বলপূর্বক গুমের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। প্রিয়জন হয়তো বহুবছর ধরে এক অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচে, আশা আর নিরাশার দোলাচলে। মায়েরা চিন্তিত থাকেন, তাদের সন্তান যদি কখনও ফেরেও, তাহলে তাকে চেনা যাবে কিনা। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে যেসব নারী তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বামীর খোঁজে এখনও অপেক্ষায় আছেন, তাদের বলা হয় ‘অর্ধ-বিধবা’। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার জানিয়েছে, তারা শোকও প্রকাশ করতে পারেন না ঠিকঠাকভাবে। তারা অস্থির থাকেন এই ভেবে যে, তাদের প্রিয়জন কি এখন নির্যাতন ভোগ করছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, কবরে শায়িত হওয়ার মর্যাদা কি সে পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে, বহু পরিবার এমন প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে রয়েছে। গত ডিসেম্বরে, নিউ এইজ পত্রিকা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের গুমের ১৯টি ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পরিবারগুলো বলছে, সর্বশেষ তাদের দেখা গেছে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাজতে। যাই হোক, সরকারি সংস্থাগুলো, হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর হদিস সমপর্কে কোন তথ্য জানা থাকার কথা বা তাদের অপহরণে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। ওই একই মাসে, আইনমন্ত্রী তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারগুলো এখনও ওই তদন্তের ফলাফলের দিকে মুখ চেয়ে আছে। সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলো তখন, যখন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চলছে সহিংস লড়াই, যেটি শুরু হয়েছিল এ বছরের জানুয়ারিতে। এরপর থেকে ১৫০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন, কয়েকশ’ আহত হয়েছেন। এদের বেশির ভাগই হতাহত হয়েছে বিরোধী দলের চাপিয়ে দেয়া হরতাল ও অবরোধ না মানতে গিয়ে। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল, দেশব্যাপী হাজার হাজার বিরোধী কর্মীকে গ্রেপ্তার করা। হাসিনা আহমেদ বলেন, যদি আমার স্বামী কোন অপরাধ করে থাকে, তাকে শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু সে রীতিমতো হারিয়েই গেছে। আমি কীভাবে আমার ছেলেমেয়েকে বোঝাবো? তিনি বন্দীপ্রদর্শন পিটিশন দায়ের করেছেন আদালতে, কূটনীতিকদের কাছে লিখেছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের সাক্ষাৎ চেয়েছেন। কিন্তু তার ভাষায়, সরকার এসবকে পরোয়া করছে বলে মনে হয় না। অথচ, আন্তর্জাতিক আইনানুসারে বাংলাদেশ সরকার এসব পরোয়া করতে বাধ্য। বলপূর্বক গুমকে সংজ্ঞায়িত করা হয় রাষ্ট্রীয় সংস্থা কর্তৃক মানুষের স্বাধীনতাহানি হিসেবে। বলপূর্বক গুম প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। একই সঙ্গে, নির্যাতনের উপর নিষেধাজ্ঞা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক হওয়া থেকে মুক্ত থাকা সহ একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘণ করা হয় বলপূর্বক গুমের মাধ্যমে। নিজে যখন বিরোধী দলে ছিলেন শেখ হাসিনা নিজেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান গুমের চর্চা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি নিজে নির্বাচিত হলে এ পদ্ধতির সংস্কার করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন বিরোধীদের বর্জনের পর, নিজের টানা দ্বিতীয় মেয়াদে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ভোগ করছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়াটা বেছে নিতে পারেন, তদন্ত করতে পারেন গুমের ঘটনাগুলোর, একই সঙ্গে জড়িতদের মুখোমুখি করতে পারেন বিচারের। এর শুরু হিসেবে তিনি দেখা করতে পারেন তার মিতা হাসিনা আহমেদের সঙ্গে, এবং তার স্বামীর হদিস খুঁজে বের করতে স্বাধীন তদন্তের ঘোষণা দিতে পারেন।
(মীনাক্ষী গাঙ্গুলী মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক)
(গতকাল হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

পঞ্চম না প্রথম by তালহা বিন নজরুল

ক্রিকেট বিশ্বের চোখ আজ মেলবোর্নে। মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড। ধুন্ধুমার ব্যাটিংয়ের মোকাবিলায় আগুনে বোলিং। উড়ন্ত কিউই দল আজ অফুরন্ত শক্তির আঁধারে। প্রবীণ আর নবীনের লড়াইও বলা যায়। ফাইনালে খেলা যাদের অনেকটা অভ্যাসে পরিণত তাদের মোকাবিলায় মঞ্চে নবাগত। ছয়বারের ফাইনাল খেলে চারবার শিরোপা নিয়ে ফিরেছে অস্ট্রেলিয়া। আর নিউজিল্যান্ড সাতবারের প্রচেষ্টায় প্রথম খেলছে ফাইনালে। অস্ট্রেলিয়া কি পঞ্চমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হবে নাকি প্রথম শিরোপা জিতে নিউজিল্যান্ড গড়বে নতুন ইতিহাস। ১৯৯২-এ নিউজিল্যান্ডারদের দুরন্ত নৈপুণ্যে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন মার্টিন ক্রো তিনি আজ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। ভাবাবেগে আপ্লুত তারই উত্তরসূরিদের অদম্যস্পৃহায়। গতকাল তিনি লিখেছেন, মৃত্যুর আগে সম্ভবত এটিই তার দেখা শেষ ম্যাচ হবে। তার আবদার যদি আজ জিততে পারে ব্রেন্ডন ম্যাককালামের দল তবে তিনি একটা সুখস্মৃতি নিয়ে চিরনিদ্রায় যেতে পারবেন। আবেগ আর উৎকণ্ঠা সাগরের দুই তীরে।  কি হবে আজ? কে হাসবে শেষ হাসি? অস্ট্রেলিয়া না নিউজিল্যান্ড- কে হবে ক্রিকেট বিশ্বের নতুন চ্যাম্পিয়ন? মাইকেল ক্লার্ক না ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, কার হাতে শোভা পাবে দৈর্ঘে ৬০ সেন্টিমিটার আর ১১ কিলোগ্রাম ওজনের সোনা আর রূপায় গড়া ট্রফিটি? বাকি আর মাত্র কয়েকটি ঘণ্টা। সব অপেক্ষার অবসান হচ্ছে আজই। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে আজকের খেলা দিয়েই পর্দা নামছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৫-এর। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৪ দলের যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই শুরু হয়েছিল তার ফল বের হবে আজ অপরাহ্ণে। অস্ট্রেলিয়ায় তখন রাতের প্রথম প্রহর আর নিউজিল্যান্ডে মাঝরাত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একই মহাদেশের দুটি দেশ অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড। মাঝে বিশাল তাসমান সাগর। তবুও যেন একই বৃন্তে দুটি ফুল। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা সবই এক। দুটি দেশই হাজার হাজার মাইল দূরে বৃটেনের সিংহাসনে বসা রানীর বশ্যতা খুব গভীরভাবে স্বীকার করে চলেছে আজও। অজি-কিউইদের পূর্ব পুরুষরাই যে যুক্তরাজ্য থেকে আগত। এর চেয়ে আদর্শ ফাইনাল আর কি হতে পারতো। গত বিশ্বকাপে দুই সহ আয়োজক ভারত আর শ্রীলঙ্কা ফাইনালে খেলেছে। তারাও সাগরের জলরাশিতে বিভক্ত। কিন্তু তাদের ভাষা আর ধর্মে পার্থক্য বিরাট। বিশ্বকাপের ১১ আসরে দ্বিতীয়বার এবং টানা দুই সহ আয়োজক ফাইনাল খেলছে। ক্রিকেটের ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের ফারাকটাও কিন্তু তাসমান সাগরের চেয়ে কম নয়। অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট শুরু ১৮৭৭ সালে আর নিউজিল্যান্ডের ১৯৩০-এ। শুধু ঐতিহ্যে নয়, সাফল্যেও। তবে মাঠের লড়াই ভিন্ন। ওসব কাগজে কলমের হিসাব ধোপে টেকে না। ছোট-বড় কেউ কারে নাহি ছাড়ে, লড়ে যায় সমানে সমান। এবারের প্রেক্ষাপটে কোন অঘটন নয়, দাপুটে দু’টি দলই খেলছে ফাইনাল। অনেকের মতেই স্বপ্নের ফাইনাল। একই গ্রুপের দুটি দল। নিউজিল্যান্ড প্রথম আর অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয়। নিউজিল্যান্ডের কাছেই একমাত্র হার অজিদের। যদিও তা এক উইকেটের ব্যবধানে তবুও অঙ্কের হিসাবে এগিয়ে তারাই। নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা এবার যে তাণ্ডব দেখিয়েছেন তা কিংবদন্তির মতো হয়ে থাকবে। ম্যাককালাম, গাপটিল, উইলিয়ামসন, কোরি অ্যান্ডারসনতো আগেই দেখিয়েছেন। শেষটা জ্বলজ্বলে রেখেছেন গ্রান্ট এলিয়ট। অভিজ্ঞ রস টেইলর তো হাতই খুলতে পারছেন না নতুনদের দাপটে। লুক  রনকিও তেমন সুযোগ পাননি। তবে সবার এক সঙ্গে জ্বলে ওঠা হয়নি। একেক ম্যাচে একেক জন। এটা যেমন সাহসের তেমনি ভয়েরও। তারা সব ম্যাচ খেলেছে নিজেদের মাঠে এবং সেই সব মাঠ অস্ট্রেলিয়ার মাঠের চেয়ে ছোট। এটা তাদের জন্য নেতিবাচকও হতে পারে। প্রায় ১০০০০০ লাখ দর্শকের বেশির ভাগই থাকবে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে। অবশ্য নিউজিল্যান্ড আশা করতেই পারে যে, ভারতের বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীর সমর্থনটা তাদের দিকেই যাবে আজ। তাদের আহ্বানও জানিয়েছেন কিউই অধিনায়ক। অস্ট্রেলিয়ার দাপট কিন্তু নতুন নয়। অনেক ভারসাম্যপূর্ণ দল। ব্যাটে-বলে প্রতিভার ছড়াছড়ি তাদেরও। স্বয়ং অধিনায়ক চোটের কারণে নিজেকে মেলে ধরতে না পারলেও সতীর্থরা বিশেষ করে স্মিথ, ওয়ার্নার, ওয়াটসন, ম্যাক্সওয়েল ব্যর্থ হলেও ফিঞ্চ-হ্যাডিনও বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেন। তবে গ্রুপ পর্বে যেমন বোলারদের লড়াই হয়েছিল এবার তেমন হবে বলে আশা করছেন না বিশেষজ্ঞ মহল।  মেলবোর্ন বলেই এমন ধারণা। বোল্ট-সাউদি যদি তাদের দাপট দেখাতে পারেন তবে কিন্তু স্টার্ক-জনসনের সঙ্গে হ্যাজলউডও প্রস্তুত আছেন। ভেট্টরির জবাব দেয়ার জন্য ম্যাক্সওয়েলই যথেষ্ট হবেন কিনা বলা যায় না। ম্যাককালাম আত্মবিশ্বাসী জয়ের ব্যাপারে। তবে কাল মেলবোর্নে ক্লার্ক যেন কি বললেন ম্যাককালামকে। পিঠে হাত রেখে সময় কাটালেন। মাইকেল ক্লার্ক ঘোষণা দিয়েছেন কালই, যে এটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। এ ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখতে সতীর্থরা নিজেদের উজাড় করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কাল টিম মিটিংয়ে। টস আজ বড় একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। কেউ না চাইলেও এটাই সত্য যে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় স্নায়ুক্ষয়ী খেলায় টস বিরাট ভূমিকা রাখে। যে দলই জিতুক তারা চাইবে ৩০০ রানের বেশি তুলতে। ৩০০ না হলে সংগ্রহটা নিরাপদ থাকবে। মেলবোর্নের ইতিহাস বলে ৩০০ রানই নিরাপদ স্কোর হতে পারে। এই রান তাড়া করে জয়ের নজির খুবই কম। তাই বলে ্‌টাে এমন নয় যে, যে দল টস জিতবে সে দলই ম্যাচ জিতবে। যদিও বিম্বকাপ ফাইনালে বেশির ভাগই জয় পেয়েছে আগে ব্যাটিং করা দল। ১৯৯২এ মাঠেই পাকিস্তান মাত্র ২৪৯ রান করেও ইংল্যান্ডকে হারায় ২২ রানে। বিশ্বকাপের ফাইনালে এ অবধি অবশ্য কোন দলই ৩০০ রান করতে পারেনি। ১৯৯২তে নিজ দেশে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে সেমিফাইনালেই খেলতে পারেন অস্ট্রেলিয়া সেটি নাকি এখনও তাদের পোড়ায়। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড যে দলই জিতুক ক্রিকেট বিশ্বের কিছু যায় আসে না। তারা চায় জয় হোক ক্রিকেটের।