Sunday, December 28, 2025

গৃহযুদ্ধ থেকে এবার ভোটের মাঠে, মিয়ানমারে জান্তার সামনে কী

মিয়ানমারে প্রায় পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতা দখল করে রেখেছেন জান্তা বাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইং। গত সপ্তাহে সামরিক বাহিনীর একটি ঘাঁটি থেকে জনসাধারণকে ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সতর্ক করে এ–ও বলেন, মানুষ যেন এমন প্রার্থীদের বেছে নেয়, যাঁরা তাতমাদো বা মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

হ্লাইংয়ের এই বক্তব্য থেকে সহজেই বোঝা যায় যে গৃহযুদ্ধের ময়দানে জান্তা যা করতে পারেনি, নির্বাচনের মাধ্যমে তা করতে চায়। তা হলো নির্বাচনে নিজেদের সমর্থিত দলকে জয় পাইয়ে দেওয়া। আর এর মাধ্যমে সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখে নিজেদের ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করা। একই সঙ্গে নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে বিদেশে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা কিছুটা কমিয়ে আনা।

তবে বিশ্লেষক ও কূটনীতিকেরা বলছেন, গৃহযুদ্ধ আরও ভয়াবহ হতে থাকা দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা যে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করছে, তা একপ্রকার দুঃসাধ্য। আর যেখানে বিদেশিরাই এই নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করছেন এবং বাঁকা চোখে দেখছেন, সেখানে জয়ের পর ওই দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

মিয়ানমারে ভোট হবে দুই ধাপে। ২৮ ডিসেম্বর ও ১১ জানুয়ারি। এই দুই দিনে দেশটির ৩৩০টি শহর এলাকার মধ্যে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আছে—এমন ২২০ এলাকায় ভোট হবে। গবেষণা সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক রিচার্ড হর্সে বলেন, ‘পরোক্ষ সামরিক শাসন সশস্ত্র বিদ্রোহ বা নাগরিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কোনো সমাধান আনবে না, বরং মিয়ানমার সংকটের মধ্যেই ডুবে থাকবে।’

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা পায় মিয়ানমার। তখন থেকেই দেশটিতে বেশির ভাগ সময় শাসন করেছেন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের তালিকায় নাম লেখান মিন অং হ্লাইং। সে সময় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে মিয়ানমারে নোবেলজয়ী অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ২০১৫ ও ২০২০ সালে নির্বাচনে জয় পেয়েছিল। দলটিকে ভেঙে দিয়েছে মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশন। এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না তারা। জান্তাবিরোধী অন্য দলগুলোও অংশ নিচ্ছে না। নির্বাচন করছে ছয়টি দল। এর মধ্যে সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) জেতার সম্ভাবনা বেশি।

ইউএসডিপি জিতলে মিন অং হ্লাইং শক্তিশালী অবস্থানে থেকে যাবেন, এটা বলাই যায়। তবে অতীতে কিছু ভিন্ন উদাহরণ রয়েছে। যেমন ২০১০ সালের নির্বাচনের পর সাবেক জেনারেল থেইন সেইনকে বেসামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে বসিয়েছিল সামরিক বাহিনী। তবে তিনি কিন্তু উল্টো উদারপন্থী নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর জেরেই ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন গণতান্ত্রিক সু চি।

এটাও ঠিক যে সেই সময়ের চেয়ে বর্তমান চিত্র একেবারে ভিন্ন। গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারের ঐক্য এক ছিন্নভিন্ন। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট এশিয়া পিস ইনস্টিটিউটের গবেষক ইয়ে মিও হেইন বলেন, সামরিক বাহিনীর আয়োজিত এই নির্বাচনের জেরে দেশে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে টেকসই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে না।

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং
মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জান্তার ভয়াবহ হামলা আর ভোট নিয়ে আতঙ্কের কথা জানালেন মিয়ানমারের এক নারী

গত মাসে এক গভীর রাতে ইয়াং জা কিম তাঁর পাশের গ্রামে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। এর পরপরই তাঁর মাথার ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়ে যায়। দূরে ধোঁয়া দেখে তিনি ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসেন।

ইয়াং জা কিম বলেন, ‘আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, জান্তা সরকারের যুদ্ধবিমানগুলো আমাদের ওপরও বোমা ফেলবে। তাই আমরা কিছু খাবার, জামাকাপড়সহ হাতের কাছে যা পেলাম, তা নিয়ে গ্রামের পাশের জঙ্গলে দৌড়ে পালাই।’

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় চিন প্রদেশে নিজ গ্রাম কে-হাইমুয়ালে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন এই নারী। গত ২৬ নভেম্বর ঘটে যাওয়া ওই দুর্বিষহ ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় ইয়াং জা কিমের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ দেখা যাচ্ছিল।

২৮ ডিসেম্বর থেকে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দমন–পীড়ন শুরু করেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো নতুন করে নিজেদের দখলে নিতে ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। এ কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় আক্রান্ত এলাকার কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদেরই একজন ইয়াং জা কিম।

কিম যখন বিবিসির কাছে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর পাশে মাদুর পেতে বসে ছিলেন আরও চার নারী। এ সময় তাঁরাও কাঁদতে শুরু করেন। সে রাতে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে গিয়ে তাঁদের যে দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার ছাপ তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

বিমান হামলার পরপরই বাড়ি ছেড়ে পালানো কিম আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে চান না।

এই নারী বলেন, ‘যদি আমরা ধরা পড়ি এবং ভোট দিতে রাজি না হই, তবে তারা আমাদের জেলে ঢোকাবে এবং নির্যাতন করবে। আমাদের যাতে ভোট দিতে না হয়, সে জন্যই আমরা পালিয়ে এসেছি।’

মিয়ানমারের চিন প্রদেশের কেউ কেউ জান্তা সরকারের সর্বশেষ এই হামলা ও দমন–পীড়নকে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন।

বাড়িঘর ছেড়ে পালানো মানুষদের অনেকে প্রদেশের অন্যান্য অংশে আশ্রয় নিয়েছেন। আর ইয়াং জা কিমসহ কিছু মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে প্রবেশ করেছেন। তাঁরা সেখানকার ভাফাই গ্রামের ব্যাডমিন্টন খেলার পরিত্যক্ত একটি মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। সঙ্গে করে সামান্য যেসব জিনিস আনতে পেরেছেন, তা প্লাস্টিকের বস্তায় রেখে দিয়েছেন। ওই গ্রামের বাসিন্দারা তাঁদের খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সাহায্য করছেন।

৮০ বছর বয়সী রাল উক থাংকেও এই বয়সে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত দিনের পর দিন জঙ্গলে তাঁবু টাঙিয়ে থেকেছেন তিনি।

রাল উক থাং বলেন, ‘আমরা আমাদের এই সরকারকে ভয় পাই। তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। তাদের সেনাবাহিনী অতীতে আমাদের ও অন্যান্য গ্রামে ঢুকে মানুষকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করেছে এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।’

মিয়ানমারের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে প্রাণখুলে কথা বলা সহজ নয়। সামরিক সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের দেশটিতে অবাধে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থাৎ গত নির্বাচনের পরপরই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা ক্ষমতা দখল করে। এর পর থেকেই নিজেদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর আগ্রাসন চালাচ্ছে।

জান্তা বাহিনী সর্বশেষ গত সপ্তাহে চিন রাজ্যের দক্ষিণে রাখাইন রাজ্যের একটি হাসপাতালে হামলা চালায়। রাখাইনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো বলছে, এতে অন্তত ৩০ জন নিহত ও ৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

চিন হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন বলেছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত চিন রাজ্যের অন্তত তিনটি স্কুল ও ছয়টি গির্জাকে বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে জান্তা। এতে ৬ শিশুসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন।

বিবিসি গত ১৩ অক্টোবর ভানহা গ্রামের একটি স্কুলে বোমা হামলার ঘটনাটি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করেছে। হামলার সময় সেখানে পাঠদান চলছিল। হামলায় জোহান ফুন লিয়ান চুং (৭) ও জিং সের মাউই (১২) নামের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। তা ছাড়া এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি মিয়ানমারের সামরিক সরকার।

এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বাউয়ি নেই লিয়ান। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে ছোট পরিবার তাঁর। ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের ঠিক পরেই ফালাম শহরে তাঁদের বাড়িটি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এরপর তাঁরা কে-হাইমুয়াল গ্রামে নতুন করে জীবন সাজিয়েছিলেন। এবার সেখানে হামলার পর তাঁরা আবারও গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

লিয়ান বলেন, ‘এটা কত যন্ত্রণাদায়ক ও কঠিন এবং দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কত বড় কষ্টের ছিল, তা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের এটা করতে হয়েছে।’

লিয়ান আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বকে জানাতে চাই, আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলে সামরিক বাহিনী যে দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলকেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না, সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র কীভাবে থাকতে পারে?’

মিয়ানমারের সাবেক নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) অভ্যুত্থানের আগের দুটি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছিল। তবে এই নির্বাচনে তারা লড়ছে না। কারণ, সু চিসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশ এখন কারাগারে।

বাস্তুচ্যুত রাল উক থাং বলেন, ‘আমরা এই নির্বাচন চাই না। কারণ, সামরিক বাহিনী দেশ চালাতে জানে না। তারা শুধু উচ্চপদস্থ নেতাদের স্বার্থে কাজ করে। যখন অং সান সু চির দল ক্ষমতায় ছিল, আমরা কিছুটা গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমরা শুধু চোখের পানি ফেলছি।’

ইয়াং জা কিমের আশঙ্কা, এই নির্বাচনে কারচুপি হবে। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জোটবদ্ধ নয়—এমন কোনো দলকে ভোট দিলে তারা আমাদের ভোট চুরি করবে। পরে দাবি করবে, আমরা তাদেরই ভোট দিয়েছি।’

এই নির্বাচন কয়েকটি ধাপে অনুষ্ঠিত হবে এবং জানুয়ারির শেষ নাগাদ ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নির্বাচনের আয়োজনকে ‘ধোঁকাবাজি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-06%2F563kdzm8%2Fmiyanmar.jpg?rect=0%2C0%2C1200%2C800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া বাড়ি ঘুরে দেখছেন স্থানীয়রা। ৬ ডিসেম্বর ২০২৫; মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের তাবাইন শহরে। ছবি: এএফপি

মিয়ানমারে জনগণকে ভোট দিতে বাধ্য করতে ‘নৃশংসতা’ চালাচ্ছে জান্তা: জাতিসংঘ

জাতিসংঘ মঙ্গলবার জানিয়েছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকার আসন্ন সেনানিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে জনগণকে ভোট দিতে বাধ্য করতে সহিংসতা চালাচ্ছে এবং ভয়ভীতিও প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে মানুষকে ভোট থেকে বিরত রাখতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করছে। জেনেভা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষকে ভোট দিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জনগণের প্রতি নৃশংস সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশের কারণে মানুষকে গ্রেপ্তার থামাতে হবে। মিয়ানমারের জান্তা আগামী রোববার থেকে ভোট আয়োজন করতে যাচ্ছে। তারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হিসেবে প্রচার করছে। দেশটির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের ও গৃহযুদ্ধ শুরুর পাঁচ বছর পর নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে।

অপর দিকে সাবেক বেসামরিক নেতা নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি এখনো কারাগারে রয়েছেন এবং তার জনপ্রিয় দলটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা ধাপে ধাপে এক মাসব্যাপী এই ভোটকে সামরিক শাসনের নতুন রূপ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলকার টুর্ক গত মাসে এএফপিকে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে নির্বাচন আয়োজন ‘অকল্পনীয়’। মঙ্গলবার তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সাধারণ মানুষ সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী উভয়ের হুমকির মুখে পড়ছে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘নির্বাচন সুরক্ষা আইন’-এর অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগের কারণে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অনেককে ‘অত্যন্ত কঠোর সাজা’ দেওয়া হয়েছে। ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের হ্লাইংহায়া শহরতলির তিন যুবককে নির্বাচনবিরোধী পোস্টার টাঙানোর কারণে ৪২ থেকে ৪৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, তারা ম্যান্ডালে অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়েছে। তাদের সতর্ক করা হয়েছে, ভোট দিতে না গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে বা তাদের বাড়িঘর দখল করা হবে।

ফলকার টুর্ক জোর দিয়ে বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষকে অনিরাপদ অবস্থায় ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাধ্য করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, মানুষ সামরিক সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকেও ‘মারাত্মক হুমকির’ মুখে পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছেন ৯ জন নারী শিক্ষক, যাঁদের গত মাসে কিয়াইকতো থেকে অপহরণ করা হয়। তখন তাঁরা ব্যালটসংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন। বিবৃতিতে বলা হয়, পরে তাঁদের অপরাধীদের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তাসহ মুক্তি দেওয়া হয়।

ফলকার টুর্ক বলেন, এই নির্বাচন স্পষ্টতই সহিংসতা ও দমন–পীড়নের পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যেখানে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংগঠন বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগের কোনো পরিবেশ নেই।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-23%2Fi1l5dl6n%2FMyanmar-Army.jpg?rect=0%2C0%2C608%2C405&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স

খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা, বড়দিনের ছুটি বাতিল—ভারত সরকারের নীরবতা কী বার্তা দিচ্ছে by অমল চন্দ্র

ভারতে বড়দিনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ, গির্জা ও প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। এতে ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন এই সম্প্রদায়ের মানুষ। কোনো কোনো রাজ্যে বড়দিনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এসব নিয়ে লিখেছেন অমল চন্দ্র। ২৫ ডিসেম্বর লেখাটি দ্য ওয়্যারের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়।

বড়দিনের ছুটি বাতিল কেবল একটা ‘ছুটি বাতিল’ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতীকীভাবে বর্জন এবং তাঁদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার এক গভীর চিত্র।

ভারতের কেরালা রাজ্যের লোক ভবনের কর্মীদের বড়দিনের ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্তটি কেবল প্রশাসনিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন নয়, বরং এটি ভারতজুড়ে জনরোষের সৃষ্টি করেছে। লোক ভবনের কর্মীদের ২৫ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সুশাসন দিবস’-এর সরকারি কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

লোক ভবনের এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। কারণ, এর আগে তাদের সরকারি ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি মাসের পাতায় ভি ডি সাভারকারের প্রতিকৃতি দেখা যায়। বিষয়টিকে নিছক ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে না দেখে বরং একটি নির্দিষ্ট আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই দুটি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে বড় দিনের ছুটি বাতিলকে আর কাকতালীয় কোনো ঘটনা বলে মনে হয় না। ২৫ ডিসেম্বরের কর্মসূচিকে দাপ্তরিক রুটিন কর্মসূচি বলা হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বড়দিন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, এটি ভারতের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে পবিত্র দিন। বিশেষ করে যে রাজ্যে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক বেশি, সেই কেরালা রাজ্যে বড়দিনে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির নির্দেশ দেওয়াকে নিরপেক্ষতা নয়, বরং সংখ্যাগুরুবাদী আধিপত্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি বর্তমানে ভারতের ক্রমবর্ধমান ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র নমুনা, যেখানে জনজীবনে ধর্মীয় সহনশীলতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

এই ধারাটি কেবল কেরালায় সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর প্রদেশেও যোগী আদিত্যনাথ সরকার ঘোষণা দিয়েছে, বড়দিনে স্কুলগুলো বন্ধ থাকবে না এবং শিক্ষার্থীদের অটল বিহারি বাজপেয়ির জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে। খ্রিষ্টান সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীরা এর তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করছে এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কেরালার ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে এই রাজ্যটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অথচ এখানেও ইদানীং বড়দিনের উৎসবে বাধা দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। ক্যাথলিক বিশপ ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থা সংঘ পরিবারের সমর্থকদের বড়দিনের প্রদর্শনী এবং ক্যারল-সংগীত অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি জনসমক্ষে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত উসকানি।

প্রতীকীভাবে একঘরে করার বাইরেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। ‘ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ২০২৩ সালে হয়েছিল ৬০১টি। আর ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে অন্তত ৮৩০টিতে দাঁড়িয়েছে। এটি গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বছর কত হামলা হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।

এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে শারীরিক আক্রমণ, প্রার্থনায় বাধা, গির্জা ভাঙচুর, সামাজিকভাবে বর্জন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে যাজকদের হেনস্তা করা।

সহিংসতার এই মানচিত্রটি লক্ষ করলে একটি রাজনৈতিক ধরন চোখে পড়ে। এবার সবচেয়ে বেশি সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে উত্তর প্রদেশ থেকে। এরপর রয়েছে ছত্তিশগড়, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা। এসব রাজ্যে চরমপন্থী বয়ান এখন স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাজেও প্রভাব ফেলছে।

এসব আক্রমণের নিষ্ঠুরতা এখন ব্যক্তিগত পর্যায়েও পৌঁছেছে। ওডিশার বালাসোর জেলায় বহুল আলোচিত এক ঘটনায় ক্যাথলিক যাজক ও সন্ন্যাসিনীরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে একদল উগ্রবাদীর আক্রমণের শিকার হন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরের’ অভিযোগ আনা হয়েছিল। ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া এই হামলাকে একটি উদ্বেগজনক জাতীয় প্রবণতার অংশ বলে বর্ণনা করেছেন, যেখানে ধর্মীয় গুরুদের ক্রমেই সন্দেহ ও সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রদেশের জাবালপুরে পরিস্থিতি আরও খারাপ। সেখানে স্থানীয় ডায়োসিসের ভিকার জেনারেলসহ জ্যেষ্ঠ যাজকেরা থানার ভেতরেই লাঞ্ছিত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা মূলত সন্দেহজনক অভিযোগে আটক খ্রিষ্টান পুণ্যার্থীদের পক্ষে কথা বলতে সেখানে গিয়েছিলেন। জনরোষের মুখে একটি এফআইআর দায়ের করা হলেও সঙ্গে সঙ্গে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এই পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ এবং আইনের পক্ষপাতমূলক প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শারীরিক সহিংসতা ও আইনি বলপ্রয়োগ কীভাবে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে ছত্তিশগড়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অসংখ্য প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাচার বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে রেলস্টেশন ও গণপরিবহন পয়েন্টগুলো থেকে খ্রিষ্টান যাজক ও সন্ন্যাসিনীদের আটক করা হয়েছে। তাঁরা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং খুব কমই এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো যুক্তি দিয়েছে, আইন প্রয়োগের চেয়েও এসব ব্যক্তির গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো জনপরিসরে খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।

এমনকি গির্জাগুলোও হামলার নিশানায় পরিণত হয়েছে। ছত্তিশগড়ের ধামতরি জেলায় গত ৮ জুন বোর্সি গ্রামে রোববার সকালের প্রার্থনার সময় একদল হিন্দু চরমপন্থী পিনিয়েল প্রেয়ার ফেলোশিপে হামলা চালায়। তারা গির্জা ভাঙচুর করে, চেয়ার ও বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলে, বাইবেল পুড়িয়ে দেয় এবং প্রার্থনারত ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালায়।

উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলার সময় একজন যাজক অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। হামলাকারীরা সে সময় ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিচ্ছিল এবং সেখানে সমবেত হতে নিষেধ করছিল। এরপর ভয়ে অনেক খ্রিষ্টান ভক্ত সেখানে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, কীভাবে পবিত্র স্থানগুলো এখন সহিংসতার মুখে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে।

এই বৈরী আবহাওয়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক হুমকির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হচ্ছে, যা সহিংসতার পর্যায়ে না গেলেও সামাজিকভাবে খ্রিষ্টানদের বর্জনকে স্বাভাবিক করে তুলছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়ে হিন্দুদের বড়দিন পালন থেকে বিরত থাকতে বলছে। এর মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের সাংস্কৃতিক প্রকাশকে ‘বিদেশি’ ও ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।

উত্তরাখন্ডের হরিদ্বারে বড়দিনের সব অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে। কারণ, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সেগুলোকে ‘হিন্দুবিরোধী’ বলে দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

এসব ঘটনার কোনোটিই বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বেশ কিছু বিজেপিশাসিত রাজ্যে এখন ধর্মান্তরবিরোধী আইন বলবৎ আছে, যা খ্রিষ্টানদের জন্য একটি আইনি ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফলে সাধারণ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকেও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হিসেবে সাজানো সম্ভব হচ্ছে। এসব আইন জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদের সুরক্ষার চেয়ে বরং অনেক সময় উগ্রপন্থীদের আইন হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দিচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী জনতাকে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহিত করছে।

এই ধারাবাহিক শত্রুতার মানবিক মূল্য অপরিসীম। শারীরিক আঘাতের বাইরেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁদের পরবর্তী প্রার্থনা সভা বা উৎসবের অনুষ্ঠান পুলিশের তল্লাশি নাকি উগ্র জনতার হামলার শিকার হবে—এসব নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন।

বর্তমান সময়টিকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক করে তুলছে, তা হলো এ ধরনের সামাজিক বর্জনকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়া। যখন ধর্মীয় ছুটি বাতিল, যাজকদের ওপর হামলা বা গির্জা ভাঙচুরের ঘটনাকে কোনো সাংবিধানিক জরুরি অবস্থা হিসেবে না দেখে কেবল প্রতিদিনের নিয়মিত সংবাদ হিসেবে দেখা হয়, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের অবনমন ঘটছে। এই পরিস্থিতি কেবল খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নয়, সব ভারতীয় নাগরিকের জন্যই চিন্তার বিষয়।

ভারতের সংবিধান ধর্মের স্বাধীনতা এবং সমান নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই অধিকারগুলো এখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।

তাই কেরালার লোক ভবনে বড়দিনের ছুটি বাতিলের ঘটনাকে কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি আসলে একটি বৃহত্তর আদর্শিক পরিবর্তনের লক্ষণ। এখানে জনপরিসরকে সূক্ষ্ম ও ধারাবাহিকভাবে সংখ্যাগুরুবাদী অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা হচ্ছে। জাতির সামগ্রিক কল্পনায় এটি সংখ্যালঘুদের প্রতীকী ও বস্তুগত জায়গা সংকুচিত হওয়ারই চিহ্ন।

এ ধারা পরিবর্তনের জন্য কেবল মাঝেমধ্যে নিন্দা জানানো যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যারা দ্ব্যর্থহীনভাবে সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করবে। দরকার এমন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। সর্বোপরি দরকার এমন গণমাধ্যম, যা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকে প্রান্তিক খবর হিসেবে না দেখে ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করবে। ধর্মীয় উগ্রবাদ থেকে উৎপন্ন স্বেচ্ছাচারী আইন লঙ্ঘনকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন না করে সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে।

যে দেশ বৈচিত্র্য ও সভ্যতাগত বহুত্ববাদ নিয়ে গর্ব করে, সেখানে বড়দিনের ছুটি বাতিল থেকে শুরু করে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর শারীরিক আক্রমণ গুরুতর এক কলঙ্ক। একটি ছুটির দিন বাতিল হওয়া হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি গভীর অসুস্থতাকে ধারণ করে। আর তা হলো রাজনৈতিক সংখ্যাগুরুবাদের যুগে অন্যকে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলা।

ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত ঐক্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে বিচার করা হবে না। বরং ঘৃণা ছড়ানোর মতো কাজ থেকে দেশটি তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকদের কতটা দৃঢ়ভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে, তা দিয়েই বিচার করা হবে।

ছত্তিশগড়ের ধামতরি জেলায় গত ৮ জুন একটি প্রার্থনা সভায় হিন্দুত্ববাদীরা হামলা চালিয়ে গির্জা ভাঙচুর করেছে, বাইবেল পুড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রার্থনারত ব্যক্তিদের মারধর করে। সেখানে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে উগ্রবাদী হিন্দুরা ভবিষ্যতে আর প্রার্থনা না করার হুমকি দেয়।

এই বৈরী পরিবেশ কেবল শারীরিক সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) মতো সংগঠনগুলো হিন্দুদের বড়দিনের উৎসব থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। উত্তরাখন্ডের হরিদ্বারে বিক্ষোভের মুখে বড়দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে।

বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে কার্যকর হওয়া ‘ধর্মান্তরবিরোধী আইন’ খ্রিষ্টানদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সাধারণ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এসব আইন অনেক সময় সাধারণ মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে।

এই শত্রুতার মানবিক মূল্য অনেক। শারীরিক আঘাতের বাইরেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতে সব সময় এক মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁরা জানেন না, পরবর্তী প্রার্থনা বা উৎসবে কখন পুলিশি ঝামেলা বা হামলার শিকার হতে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এসব ঘটনা এখন ভারতে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠছে। বড়দিনের ছুটি বাতিল বা গির্জা ভাঙচুরের খবর যখন আর সাংবিধানিক সংকট হিসেবে দেখা হয় না, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের অবনমন ঘটছে। ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমনাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

কেরালা লোক ভবনের একটি ছুটির ঘটনা আসলে একটি বড় আদর্শিক পরিবর্তনের লক্ষণ। যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে সংখ্যাগুরুদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাজানো হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের জন্য প্রতীকী ও বাস্তব জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে।

ভারতের বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদের যে অহংকার রয়েছে, সেখানে খ্রিষ্টানদের ওপর এই ক্রমাগত আক্রমণ এক বড় কলঙ্ক। একটি ছুটির দিন বাতিল হওয়া হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি এক গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সেটি হচ্ছে সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির যুগে অন্যকে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলা। ভারতের গণতন্ত্রের সার্থকতা কেবল মুখে ঐক্যের কথায় নয়, বরং এটি তার দুর্বলতম নাগরিকদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করছে।

ভারতের পাতিয়ালায় সেন্ট পিটার গির্জায় বড়দিনের উৎসবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাতিয়ালা
ভারতের পাতিয়ালায় সেন্ট পিটার গির্জায় বড়দিনের উৎসবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাতিয়ালা। ছবি: এএনআই

পুতিন কীভাবে অর্থনৈতিক সংকট সামলে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন

সংকটের মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি, বাজেট–ঘাটতিসহ দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। কমে যাচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এর কারণ হিসেবে একদিকে যেমন রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অপর দিকে রয়েছে যুদ্ধ চালাতে বিপুল ব্যয়। এরপরও শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধের জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাজি হবেন বলে মনে হচ্ছে না।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার পরও বর্তমান গতিতে আরও বেশ কয়েক বছর ধরে দেশটি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মারিয়া স্নেগোভায়া বলেন, রাশিয়ার অর্থনীতিতে যে আঘাত এসেছে, তা বিপর্যয়কর নয়। এটি এখন পর্যন্ত ক্রেমলিনের জন্য মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।

একই কথা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক রিচার্ড কনোলির। তিনি বলেন, ‘যত দিন রাশিয়া জ্বালানি তেল উত্তোলন করতে পারবে এবং মানানসই একটি দামে তা বিক্রি করতে পারবে, তত দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশটির হাতে যথেষ্ট অর্থ থাকবে। যদিও রাশিয়ার অর্থনীতির বর্তমানে যে অবস্থা, তা দেশটির জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।’

ইতিহাসের দিকে তাকালে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে রাশিয়াকে প্রতিকূল চুক্তি করতে দেখা যায় বলে উল্লেখ করেন গবেষক স্নেগোভায়া। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর। তিনি বলেন, তবে রাশিয়া এখনো সেই পর্যায়ের সংকটের মধ্যে পড়েনি। এটা ইউক্রেনের জন্য খারাপ একটি খবর, এমনকি যুদ্ধ থামানোর জন্য তৎপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যমতে, এ বছর রাশিয়ার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আর এ মাসের শুরুর দিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব বলেছিলেন, যুদ্ধ চালাতে জাতীয় বাজেটের ৪০ শতাংশ খরচ করছে মস্কো। ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে রুশ সেনাদের সবচেয়ে বেশি বেতন দেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন গবেষক রিচার্ড কনোলি।

এ ছাড়া যুদ্ধ হতাহত সেনাদের পরিবারগুলোকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে রুশ সরকার। এর লক্ষ্য হতাহত নিয়ে রাশিয়ার ভেতরে ক্ষোভ কমানো। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গত জুনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার প্রায় ১০ লাখ জন হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার জন নিহত হয়েছেন।

কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিকস ইনস্টিটিউটের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার জাতীয় কল্যাণ তহবিলের আকার ৫৭ শতাংশ কমেছে। সম্প্রতি রাশিয়ার বড় তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান লুকঅয়েল ও রসনেফটের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এতে রাশিয়ায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে বলে জানান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের কিম্বারলি ডোনোভ্যান।

এই গবেষক বলেন, এ নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার বড় বড় তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকা ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করছে। এতে করে খরচ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত ও চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যদি তাদের মস্কো থেকে তেল কেনা বন্ধ করা যায়, তাহলে যুদ্ধের মোড় বদলে যেতে পারে। তখন একটি সমঝোতায় রাজি হওয়া ছাড়া পুতিনের সামনে হয়তো খুব কম পথই খোলা থাকবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-22%2F2rflw8n8%2Fputin-b.jpg?rect=0%2C0%2C620%2C413&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারর গৃহযুদ্ধের মধ্যে বিতর্কিত নির্বাচন

* ৩৩০টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ২৬৩টি এলাকায় নির্বাচন হবে। শুধু সেনানিয়ন্ত্রিত এলাকায়গুলোতেই নির্বাচন হচ্ছে।
* জয়ের সম্ভাবনা সেনাসমর্থিত ইউএসডিপির। ২০২০ সালের নির্বাচনে মাত্র ৬ শতাংশ আসন পেয়েছিল দলটি।

মিয়ানমারের ইরাবতী নদীর তীরে মান্দালয় শহর। মানুষকে ভালো দিনের আশা দেখাচ্ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা তাইজা কিয়াও। তিনি জান্তা সমর্থক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) থেকে নির্বাচনের একজন প্রার্থী। তাইজা কিয়াওয়ের ভাষণের সময়ই কমছিল উপস্থিত মানুষ। ভাষণ শেষে সেখানে আর কেউই ছিলেন না।

ওপরের চিত্রটা সাম্প্রতিক। আজ রোববার মিয়ানমারে শুরু হওয়া নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহের ঘাটতি এ ঘটনা থেকেই কিছুটা বোঝা যায়। কারণ, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার। দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বিভক্ত জাতি। এরপর সামরিক জান্তার মঞ্চস্থ এই নির্বাচনকে ভালো চোখে নিচ্ছেন না দেশ-বিদেশের মানুষ। নির্বাচনের পেছনে দেখা হচ্ছে অসৎ উদ্দেশ্য।

নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে তিন ধাপে। প্রথম ধাপ আজ। দ্বিতীয় ধাপ ১১ জানুয়ারি আর তৃতীয় ধাপ ২৫ জানুয়ারি। জানুয়ারির শেষে ফল ঘোষণা করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের মোট ৩৩০টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ২৬৩ এলাকায় নির্বাচন হবে। শুধু সেনানিয়ন্ত্রিত এলাকায়গুলোতেই নির্বাচন হচ্ছে। অন্যান্য এলাকা সশস্ত্র বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে।

মিয়ানমারের সাধারণত বহু মানুষের মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নির্বাচন চায় না। ২০২১ সালে নোবেলজয়ী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জান্তা ক্ষমতায় এসেছিল। ওই দলটিও নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। সরকারবিরোধী অনেক দলও নির্বাচনের মাঠে নেই। যে কটি দল নির্বাচন করছে, তার অনেকগুলোই সেনাসমর্থিত।

‘এটা মিথ্যার নির্বাচন’

নির্বাচন নিয়ে মানুষের আপত্তির নানা কারণ রয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকেও আপত্তি জানিয়ে বলা হচ্ছে যে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতেই এই নির্বাচনের আয়োজন করেছে জান্তা। এর মাধ্যমে বেসামরিক সরকার গঠন করা হলেও তা ঘুরবে জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ছড়ির ইশারায়। বিদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কাছ থেকেও মিয়ানমার কিছুটা বেশি বৈধতা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওপরে মান্দালয়ে সে সমাবেশের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ইউএসডিপি কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিল বিবিসি। তবে তাঁদের নাকি দলের নেতারা কথা বলতে মানা করেছেন। আসলে তাঁদের ভয়ের কারণটা আশপাশে থাকা উর্দিবিহীন সামরিক গোয়েন্দারা। ইউএসডিপি জান্তাসমর্থিত হলেও বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে গোয়েন্দা উপস্থিতিতে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন তাঁরা।

মিয়ানমারের এখন যদি কেউ নির্বাচনের সমালোচনা করে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে লাইকও দেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এরই মধ্যে কথা বলার সাহস দেখালেন এক নারী। তবে সবার চোখের আড়ালে, পরিচয় গোপন করে। তিনি বললেন, ‘এটা মিথ্যার নির্বাচন। সবাই তাঁদের স্বাধীনতা হারিয়েছেন। অনেকে মারা গেছেন। অনেকে দেশ ছেড়েছেন। কীভাবে এসব ক্ষেত্রে বদল আসবে?’

জেনারেলের চালাকি

এরপরও অসাধারণ এক নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী জান্তাপ্রধান হ্লাইং। তাঁর হাত ধরে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হলেও বড়দিনে ইয়াঙ্গুনের এক গির্জায় উপস্থিত হয়ে মানুষে মানুষে বিদ্বেষের নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনেছে জাতিসংঘ। তাঁর শাসনামলে গৃহযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৯০ হাজার মানুষ।

নির্বাচন নিয়ে হ্লাইং যে চালাকিটা করছেন, তাতে চীনের কূটনৈতিক সমর্থন রয়েছে। নির্বাচনে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সমর্থনও দিচ্ছে বেইজিং। আর চীন ও রুশ অস্ত্র ব্যবহার করে জান্তাবিরোধী বিদ্রোহীদের দখল করা অঞ্চলগুলো মুক্ত করছে সামরিক বাহিনী। গত দুই বছরে এলাকাগুলো দখল করেছিল বিদ্রোহীরা। ভোটের শেষ নাগাদ তাদের কাছ থেকে আরও ভূখণ্ড উদ্ধারের আশা হ্লাইয়ের।

আর অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি মাঠে না থাকায় নির্বাচনে সেনাসমর্থিত ইউএসডিপি জয় পাবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। ২০২০ সালে যখন মিয়ানমারের সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছিল, তখন দেশটির পার্লামেন্টে মাত্র ৬ শতাংশ আসন পেয়েছিল ইউএসডিপি। দলটি এবারের নির্বাচনে জয় পেলে মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট পদেও বসতে পারেন বলে ধারণা কিছু পর্যবেক্ষকের।

‘ছাড় দিতে কেউ রাজি নয়’

মান্দালয় থেকে কিছুটা দূরে, ইরাবতী নদীর অপর পাশেই মিনগান গ্রাম। একসময় পর্যটকদের কাছে গ্রামটি বেশ আকর্ষণীয় ছিল। তবে চার বছর ধরে মিনগানসহ মান্দালয়ের আশপাশের অনেক এলাকা জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের দখলে রয়েছে। সেখান থেকে প্রায়ই জান্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।

মান্দালয় থেকে মিনগানে যেতে কয়েকটি তল্লাশিচৌকি পার হতে হয়। সেখানে বিবিসির সঙ্গে কথা হয় স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার। তিনি বলেন, ‘ওই এলাকা থেকে উত্তর দিকের বেশির ভাগ গ্রামে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। চলমান লড়াইয়ে সবাই কোনো না কোনো পক্ষ নিয়েছে। এটি খুবই জটিল একটি বিষয়। কেউই ছাড় দিতে রাজি নয়।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-27%2Fx2p5p3d3%2FCapture.PNG?rect=0%2C1%2C971%2C647&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মিয়ানমারে আজ নির্বাচন। এ উপলক্ষে ভোট গ্রহণের আগে ভোটকেন্দ্রে প্রস্তুতি চলছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের। গতকাল ইয়াঙ্গুনে। ছবি: রয়টার্স

ভারতের আসামে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে বিক্ষোভ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতে বাংলাদেশ মিশনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। গতকাল শনিবার ভারতের আসাম রাজ্যে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে হিন্দুত্ববাদী চারটি সংগঠন।

এদিকে গত কয়েক দিনে টানা বিক্ষোভের পর গতকাল ভারতের দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে কোনো বিক্ষোভ হয়নি। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আজ রোববারও বাংলাদেশের সব মিশনে ভিসা সেবা বন্ধ থাকছে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ বারবার নাকচ করে আসছে সরকার। বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে উল্লেখ না করতেও বলা হয়েছে দিল্লিকে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থাও নিচ্ছে সরকার।

আসামে বিক্ষোভ

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের কাছে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দুরাষ্ট্র দাবি সমিতি, হিন্দু যুব-ছাত্র পরিষদ, আসাম রাষ্ট্রীয় হিন্দু ফ্রন্ট ও আসাম হিন্দু ঐক্য মঞ্চের সমর্থকেরা।

ঢাকা ও আসামের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে জানায়, হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা গতকাল গুয়াহাটির বাংলাদেশ মিশনের সামনে টানা দ্বিতীয় দিন বিক্ষোভ করেন। গতকালের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৭৫ জনের মতো। তবে বিক্ষোভের আগে থেকে বাংলাদেশ মিশন স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছিল। ওই অনুরোধে সাড়া দিয়ে গতকাল সকাল থেকে বাংলাদেশ মিশনের কাছে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারীরা মিশন অভিমুখে এলে মিশন থেকে ১০০ মিটারের কম দূরত্বে তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি দল মিশনে গিয়ে ‘বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ’ জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেয়।

এর আগে গত শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের গেটের কাছে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। সেখানে তাঁরা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অবস্থান নিয়ে ময়মনসিংহের দীপু দাসের হত্যাকাণ্ডসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের নানা অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি প্রতিনিধিদল মিশনে গিয়ে স্মারকলিপি দেয়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের বিক্ষোভ হলেও গতকাল দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে কোনো বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি।

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের উদ্ভূত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিল্লি, আগরতলা ও শিলিগুড়ি মিশনে ভিসা সেবা বন্ধ থাকবে। ঢাকা থেকে পরবর্তী নির্দেশ পাওয়ার পর এসব মিশনে ভিসা সেবা চালু হবে। তবে আগামীকাল সোমবার থেকে মুম্বাই মিশনে ভিসা সেবা আবার চালু হবে।

২৯০০ সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের আগের অবস্থানের যে পরিবর্তন হয়নি, সেটি গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ব্রিফিংয়ে জয়সোয়াল দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৯০০টির বেশি সহিংসতার ঘটনা স্বাধীনভাবে নথিভুক্ত হয়েছে, যেগুলোকে শুধুই ‘মিডিয়া অতিরঞ্জন’ বা ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আমরা কীভাবে দেখি, সে বিষয়ে আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট।’

বাংলাদেশের কূটনীতিকদের কাছে জানতে চাইলে তাঁদের বেশ কয়েকজন ওই সংখ্যা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এত বিপুল সংখ্যায় সহিংসতার ঘটনা আদৌ ঘটেছে কি না আর কীভাবে সেই সংখ্যা নথিভুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে তাঁরা সন্দিহান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেন, হুট করে ২ হাজার ৯০০ সংখ্যাটি কেন, কীভাবে এল! যদি সহিংসতার ঘটনা ঘটেই থাকে, তবে আগে কেন ভারত সে কথা বলেনি।

গতকাল আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ মিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা–কর্মীদের মিছিল আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা
গতকাল আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ মিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা–কর্মীদের মিছিল আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গে হুমায়ুন কবিরের নতুন দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ লড়বে ১৮২ আসনে

জনতা উন্নয়ন পার্টি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টির মধ্যে ১৮২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের তৃণমূল কংগ্রেসের বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবির সদ্য এই দল তৈরি করেন।

বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজ্য থেকে বিদায় দেওয়া নিজেদের লক্ষ্য মন্তব্য করে আজ শনিবার হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের জানান, নতুন জোটে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং অলইন্ডিয়া মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (মিম) থাকবে। তিনি আশা করছেন, এই জোট এবং তাঁর দল রাজ্যে নির্বাচনে নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। ৯০টি আসনে জয়লাভ করা তাঁর লক্ষ্য।

হুমায়ুন কবির ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের নামে একটি মসজিদ তৈরির ঘোষণা দেন। সেই দিন রাজ্যের রেজিনগরে আয়োজিত এক জনসভার মাধ্যমে সেই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এরপর তিনি বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। ২২ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন দল গঠনের ঘোষণা দেন।

হুমায়ুন কবির ৪০ বছর ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। রাজ্যে এর আগেও বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে নতুন দল তৈরি হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৈরি হয়েছিল আইএসএফ। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভাঙর আসন থেকে দলটির একজন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর নাম নওশাদ সিদ্দিকী।

পাঁচ বছর পর রাজ্যে নতুন দল তৈরি করলেন হুমায়ুন কবির। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের ওয়াকফ আইন এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তৃণমূল সমালোচিত। সেই কারণে তাঁর দল নির্বাচনে নতুন বিকল্প হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক হুমায়ুন কবির
পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক হুমায়ুন কবির। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি