Wednesday, July 13, 2016

টেরেসার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ

লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে
বেরিয়ে যাচ্ছেন টেরেসা মে। আজ তাঁর যুক্তরাজ্যের
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার কথা। রয়টার্স
নাটকীয়ভাবে আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন টেরেসা মে। যতটা সহজে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন, দেশ চালানো তাঁর জন্য ততটাই কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। গণভোটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দলীয় বিভক্তি নিরসন, অবনতিশীল অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণসহ ইইউর সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্নির্ধারণের কাজটি তাঁকেই করতে হবে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরোধী দলগুলোর মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নিজের পরিকল্পনা, নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন এবং ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ নিয়ে ভাবনার সুযোগও হয়নি টেরেসার। তাঁর প্রথম মন্ত্রিপরিষদে ইইউর পক্ষের-বিপক্ষের এমপিদের যুক্ত করে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের বিভাজন নিরসনের চেষ্টা থাকবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গতকাল মঙ্গলবার তাঁর মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠক করেছেন। আজ বুধবার সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহি শেষ করে বিকেলে রানির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন তিনি। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন টেরেসা মে। তবে গতকাল মঙ্গলবারই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের মালামাল সরাতে ভ্যানগাড়ির আনাগোনা শুরু হয়। ইইউর পক্ষে প্রচার চালালেও নতুন প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে বলেছেন, ‘ইইউ থেকে বিচ্ছেদ মানে বিচ্ছেদ। যুক্তরাজ্য কোনোভাবে ইইউর সদস্য থাকবে না এবং স্বার্থের সর্বোচ্চটুকু নিশ্চিত করেই যুক্তরাজ্য ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ করবে।’ টেরেসার এমন বক্তব্যের পর ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রভাবশালী নেতা আঙ্গেলা ম্যারকেল গতকাল মঙ্গলবার জার্মানিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন,
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের কাজটি সহজ হবে না। যুক্তরাজ্য যদি ইইউর মুক্তবাজার ব্যবস্থার সুবিধা নিতে চায়, তাহলে তাদের অবশ্যই ইইউভুক্ত দেশের নাগরিকদের মুক্ত চলাচলের অধিকারসহ মৌলিক নীতিগুলো মেনে নিতে হবে। এদিকে, দ্রুত একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তুলেছে গ্রিন পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট দল। গৃহবিবাদে অস্থির প্রধান বিরোধী দলের নেতা জেরেমি করবিনের সমর্থকেরাও এই দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। বিরোধী দল লেবার পার্টির গৃহবিবাদ মারাত্মক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। জেরেমি করবিনের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা অ্যাঙ্গেলা ইগলের কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছেন ক্ষুব্ধ করবিন সমর্থকেরা। তাঁকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। জেরেমি করবিন পুনরায় নেতা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে গতকাল দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে করবিন সমর্থকদের জড়ো হওয়ার আশঙ্কায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়। এ অবস্থায় করবিন তাঁর সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
লেবার দলের তৃণমূল সদস্যদের বিপুল সমর্থন নিয়ে করবিন মাত্র নয় মাস আগে নেতা নির্বাচিত হন। কিন্তু দলের এমপিরা শুরু থেকেই তাঁর নেতৃত্বের বিরোধিতা করে আসছেন। সর্বশেষ অ্যাঙ্গেলা ইগল ৫১ জন এমপির সমর্থন নিয়ে করবিনের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন। এতে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী লেবার দলকে নতুন করে নেতা নির্বাচন শুরু করতে হচ্ছে। কিন্তু ওই নির্বাচনে করবিনের প্রার্থী হওয়া নিয়ে চলছে তুমুল উত্তেজনা। দলের তৃণমূল সদস্যরা করবিনকেই নেতা হিসেবে চাচ্ছেন। আর এমপিরা চাচ্ছেন করবিনের পুনরায় প্রার্থী হওয়া ঠেকিয়ে দিতে। অ্যাঙ্গেলা ইগলের নির্বাচনী এলাকার লেবার সদস্যরাও করবিনের প্রতি তাঁদের সমর্থন ঘোষণা করে অ্যাঙ্গেলার এমপি মনোনয়ন বাতিলের দাবি তুলেছেন। করবিনবিরোধীরা চাচ্ছেন, নতুন নেতা নির্বাচন করে তবেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তুলবেন।

কাশ্মীর নিয়ে ভারতে জোর তৎপরতা

ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শ্রীনগরে কারফিউ
চলাকালে জনশূন্য এক সড়কে সতর্ক পাহারায় একজন
পুলিশসদস্য। গতকাল তোলা ছবি। রয়টার্স
আফ্রিকার চার দেশ সফর করে দেশে ফিরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করলেন। উপত্যকার সব মানুষকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তিনি আবেদন জানিয়েছেন। কাশ্মীর পরিস্থিতির কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং তাঁর আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন। হিজবুল মুজাহিদীন নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর গত শনিবার থেকে উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন গতকাল মঙ্গলবার মারা যাওয়ায় গত চার দিনে সাধারণ নাগরিক, পুলিশসহ নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০। আহত সাড়ে তিন শর বেশি।
মঙ্গলবার উপত্যকা থমথমে থাকলেও নতুন করে সহিংসতা ছড়ায়নি। গতকালের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি, প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, সোমবার থেকেই হিংসার তীব্রতা কমতে শুরু করেছে, তবে কারফিউ জারি রাখা হচ্ছে। আগামীকাল পরিস্থিতির অবনতি না হলে রেশন দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হবে। দিনের বেলায় জায়গা বিশেষে কারফিউও শিথিল করা হতে পারে। খোলা হতে পারে ইন্টারনেট পরিষেবাও। চালু হতে পারে ট্রেন চলাচল। বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বলেন, পাকিস্তান এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে।
রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বিবৃতি দিয়েছেন। জঙ্গিরাও সীমান্ত পেরিয়ে উপত্যকায় ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছে। সীমান্তরক্ষীদের সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, আজই (মঙ্গলবার) তিন অনুপ্রবেশকারীকে মেরে ফেলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলায় যথাসম্ভব কম বলপ্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই বৈঠকে অমরনাথ যাত্রা নিয়েও আলোচনা হয়। সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, যে দুই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু হয়, সেখানকার ও যাত্রাপথের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করা হয়েছে। রাজ্য সরকার চায় যাত্রা অব্যাহত রাখতে। কারণ, তা না হলে এটাই প্রমাণিত হবে যে রাজ্য সরকার ও প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ। সরকার অবশ্য মনে করে, যাত্রাপথ ও যাত্রীদের নিরাপত্তায় স্থানীয় মুসলমানেরাই সচেষ্ট। কারণ, এই যাত্রার ওপরেই নির্ভর করে স্থানীয় দরিদ্র মুসলমানদের সারা বছরের রোজগার।
কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ইতিমধ্যেই বিরোধী নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে। রাজনাথ সিং আলোচনা করেছেন ওমর আবদুল্লাহ, সোনিয়া গান্ধী ও সীতারাম ইয়েচুরির সঙ্গে। ১৮ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে সংসদের বাদল অধিবেশন। সেখানে বিরোধীরা অবশ্যই কাশ্মীর পরিস্থিতি তুলবেন। গতকালের বৈঠকের পর জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ফের একবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, তাঁর উচিত ছিল ভিডিও কনফারেন্স মারফত এই বৈঠকে যোগ দেওয়া। মেহবুবা বা তাঁর বিধায়কেরা কেউই বিক্ষোভকারীদের প্রশমিত করতে রাস্তায় নামেননি বলে সোমবার তাঁদের সমালোচনা করেছিলেন ওমর।

মের সামনে ব্রেক্সিটের দুঃস্বপ্ন

ডেভিড ক্যামেরন যখন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচিত হলেন, তখন আমরা তাঁর দলটাকে বদলে ফেলার সংকল্পকে খাটো করতে অনেক কথা বলেছি। কিন্তু কোনো কিছুতেই তেমন উৎসাহ সৃষ্টি হচ্ছিল না। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনাদের কাছে কি এমন কিছু আছে যাতে ডানপন্থীরা আরও কিছুটা বিরক্ত হবে?’ ক্যামেরনের শুরুর দিকের অবস্থাটা এমনই ছিল, যখন তিনি টোরি পার্টিকে মধ্যপন্থায় রাখার এবং ইউরোপ নিয়ে বাকোয়াসি বন্ধের জোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। আজ ১১ বছর পর সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই তিনি ডাউনিং স্ট্রিট ছেড়ে যাচ্ছেন, যখন তাঁর সব অর্জন এক অনাবশ্যক গণভোটের আড়ালে হারিয়ে গেছে। তিনি ইউরোপের ভবিষ্যতের ব্যাপারে চরমপন্থী ডানদের শান্ত করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিণামে দেখা গেল, এই ডানপন্থীরা এক ছোট ক্ষতের মুখ চিরে বিশাল হাঁ বানিয়ে দিলেন, আর ক্যামেরনকে পদত্যাগে বাধ্য করলেন।
ছয় বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করার পর ক্যামেরন বিদায় নিলেন। তবে আমরা ধন্যবাদ দিতে পারি, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে ডানপন্থীদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক একদল গুপ্ত ষড়যন্ত্রকারী রক্ষণশীল ক্যামেরনকে তাড়ালেন, যাঁদের সঙ্গে ছিল আরেক দল বেকুব মধ্যপন্থী, যাঁরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সাধারণ বোধবুদ্ধির ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। এখন ব্রিটেনকে ব্রেক্সিটের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু অন্তত এটা তো হয়েছে যে এই কট্টর ডানপন্থীরা পার্টি দখল করতে বা তাঁদের মনোনীত কাউকে ক্ষমতায় বসাতে পারেননি। কথা হচ্ছে, নারীবাদ, পুরুষ সমকামিতা ও কর্মক্ষেত্রে সমতাবিষয়ক অ্যান্ড্রিয়া লিডসমের ধারণা এতটা সেকেলে যে তাঁকে ডাউনিং স্ট্রিটে বসানো হলে তা ভোটারদের অবজ্ঞা করার শামিল হতো। তিনি যেমন এ কাজের জন্য যোগ্য নন, তেমনি তিনি একেবারেই অনভিজ্ঞ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ৮৪ জন টোরি এমপি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। লিডসমের শোচনীয় প্রচারণা অভিযান যে এত দ্রুত ভেঙে পড়ল, তাতে বোঝা যায়, টোরি পার্টির ক্ষমতা-ক্ষুধা আছে। লেবার পার্টির সঙ্গে এ ক্ষেত্রে তাদের পার্থক্য খুবই দৃষ্টিগ্রাহ্য। মনে হচ্ছে, লেবার পার্টি নিজেদের দলের নেতৃত্বের সংকট দীর্ঘায়িত করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।
টেরেসা মে কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের। রাজনীতিক হিসেবে তাঁকে বিরলই বলতে হয়, কারণ এত দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে থেকেও তিনি লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিলেন। টেরেসা বেশ কঠিন স্বভাবের একজন মানুষ। তিনি টোরি পার্টির প্রতিনিধিদের মুখের ওপর বলে দেন, লোকে তাদের জঘন্য পার্টি মনে করে, আবার পুলিশের কাছে কঠিন সত্য বলতেও তিনি পিছপা হন না। তবে অভিবাসন-বিষয়ক তাঁর মনোভাবের ব্যাপারে আমি ভীত। এমনকি তিনি বিদেশি ছাত্রদেরও ছাড় দিতে নারাজ। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, সরকারি সেবাব্যবস্থা যে বহুদিন ধরে ব্যর্থ হচ্ছে, তার দায় সবাই বিদেশিদের ঘাড়ে চাপাতে চায়, নিজেদের নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও টেরেসা মে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন। যাজকের মেয়ে হিসেবে তাঁর মধ্যে বোধবুদ্ধিসম্পন্ন প্রধান শিক্ষিকার চরিত্র আছে, যিনি কথা বলেন খুব কম, যাকে প্রায়ই প্রথাগত শায়ার টোরি বলা হয়। তবে তিনি নিশ্চিতভাবে ব্যবহারিক প্রকৃতির মানুষ, যিনি মেপে মেপে সিদ্ধান্ত নেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নও করেন। তিনি অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশী, যাকে ডাউনিং স্ট্রিটের জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা বা সমঝোতার শিল্পটা শিখতে হবে। তিনি দেশকে নাড়া দেওয়ার মতো আদর্শবাদী নন, ফলে তিনি সাধারণ ব্যঙ্গ চরিত্রের চেয়ে বেশি জটিল ও আকর্ষণীয়।
এ কথা ভোলা যাবে না যে আজ থেকে ১৪ বছর আগে এই টেরেসা মে টোরি দলের সম্মেলনে সাহসের সঙ্গে বলেছিলেন, সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে টোরি দল ঠিক পথে নেই। প্রচারকেরা এটা ভালো বলতে পারবেন, টেরেসা মে সাধারণত পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও স্টপ অ্যান্ড সার্চের সময় বর্ণবৈষম্যের ব্যাপারে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পুরুষ সমকামীর বিয়েতে সমর্থন দেওয়ার জন্য উদার গণতন্ত্রী মন্ত্রীরা তাঁকে আলাদাভাবে প্রশংসা করেছেন। ঝানু রাজনীতিক হিসেবে মে জানেন, কনজারভেটিভ পার্টির তেড়েফুঁড়ে ডান দিক ধরে না হেঁটে মাঝপথ বরাবর হাঁটার মহিমা কী, বিশেষ করে লেবার পার্টি যখন নিজের সমস্যা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। তাঁর শেষ বক্তৃতার কথাই ধরুন, সেখানে মে বলেছেন, তাঁর সরকার গরিব, কালো, শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক ও মানসিক রোগীদের জন্য কাজ করবে। তিনি বিশ্বাস করেন, করপোরেট কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালালে দেশকে যেমন আবার একত্র করা যাবে, তেমনি ‘অভিজাতদের’ ব্যাপারে মোহভঙ্গ ভোটারদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাবে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে তিনি এটা করতে পারেন, যখন করপোরেট কর্তারাই বিশ্বাস করছেন, তাঁদের বেতন অনৈতিক পর্যায়ে চলে গেছে।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে একটি প্রশ্ন তাঁর মাথার ওপর ঝুলবে, সেটা হলো কীভাবে ব্রেক্সিটের দুঃস্বপ্নের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তাঁর একজন সহযোগী পরামর্শ দিয়েছেন, ব্রেক্সিটের ফলে অনিবার্যভাবে যে মন্দা হবে, তাতে অভিবাসন এমনিতেই কমে আসবে, যেটা তাঁকে সীমান্ত বন্ধ না করে মুক্তবাজারের পক্ষে থাকার সুযোগ করে দেবে, যার মাধ্যমে আবার ভোটারদেরও নিশ্চিন্ত রাখা যাবে। কিন্তু খুব ছোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও তিক্ত ডানপন্থীদের নিয়ে সমস্যার সমাধান বের করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, যেখানে তাঁকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে অর্থনৈতিক চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। কিন্তু দুঃখের কথা হলো, টেরেসা মে হয়তো আরও একজন টোরি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, যাঁর শাসনামল সংকীর্ণমনা ইংরেজদের কারণে ক্ষতবিক্ষত হবে, যাঁরা ইউরোপের চেয়ে নিজেদের স্বার্থপরতাকেই বেশি মূল্য দেয়।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া।
ইয়ান বিরেল: দ্য গার্ডিয়ান–এর সাবেক উপসম্পাদক।

অন্ধকারে আলোর দীপশিখা

কী করে আশ্চর্য এই অতিচেনা আমাদেরই ছেলে—কুড়িটি বছর যে প্রাচুর্যের মাঝে বড় হলো এ দেশেরই জল-হাওয়া, মাটি ও মানুষের কোলাহলে; সেই ছেলে কেমন করে এত ঘৃণা, এত দ্বেষ, এত হিংসা, এত হিংস্রতার মাঝে, রক্তচক্ষু মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে, প্রাণদান তুচ্ছ জ্ঞান করে, দৃঢ়চিত্তে সগর্বে জানিয়ে দিল যে ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’—এ কথা যতই ভাবি অবাক হয়ে যাই। জাতির ইতিহাসে কালিমালিপ্ত এক চরম অন্ধকার রাতে আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে মেঘের রুপালি প্রান্তের মতো জ্বলে উঠল ফারাজ-তারকা। ফারাজ আইয়াজ হোসেন তার প্রাণের বিনিময়ে জানান দিল তার অনুচ্চারিত, কিন্তু সগর্বে ঘোষিত রক্তস্নাত মানবতার বাণী। এ বাণী সমমর্মিতার, এ বাণী নৈতিক নিষ্ঠার, এ বাণী অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার, এ বাণী জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে মানবতার অচ্ছেদ্য বন্ধনে গেঁথে পৃথিবীকে প্রীতিময় পরিবেশে বাসযোগ্য করে তোলার। তার আত্মবলিদান অন্ধকারের পাদপীঠে জ্বালিয়ে দিল ভুবন আলো করা অনির্বাণ এক মঙ্গল প্রদীপ। ১ জুলাইয়ের বিভীষিকাময় রাতে গুলশানে হলি আর্টিজান ক্যাফে ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের জন্য, বাঙালির জন্য এক চরম শোকাবহ ঘটনা, জাতির ইতিহাসের একটি করুণতম মুহূর্ত। আতিথেয়তা বাঙালির স্বভাবজাত আর ইসলামের মর্মবাণী হচ্ছে শান্তি। অথচ এই প্রেক্ষাপটেই রচিত হলো ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মন্তুদ একটি চরম বিয়োগান্ত কাহিনি। কূটনৈতিক মহলে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে। ঢাকায় আগত বিদেশিরা দুবার কাঁদেন। প্রথমবার যখন আসেন তখন দুশ্চিন্তা থাকে, কোথায় যাচ্ছি?
ট্রাফিক জ্যাম আর রাজনৈতিক অস্থিরতার এই দেশ। ঝড়-বন্যার প্রকোপ। বিনোদনকেন্দ্রের অনুপস্থিতি, পরিবহনের দুষ্প্রাপ্যতা। আবার তাঁরা কাঁদেন বিদায়ের মুহূর্তে, বাংলাদেশ ছাড়ার প্রাক্কালে। তাঁদের অভিজ্ঞতার উপলব্ধি, এত অতিথিবৎসল সজ্জন বাঙালিরা। আন্তরিকভাবে এঁরা বিদেশিদের বরণ করে নেয়। বিদেশিদের জন্য তাঁদের গৃহের অবারিত দ্বার। বিদেশিকে সাহায্য-সহায়তায় উদ্গ্রীব থাকা যেন একজন বাঙালির স্বভাবজাত ধর্ম, আর এরই সঙ্গে রয়েছে সাম্যবাদী ইসলামের আলোতে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একই কাতারে রেখে সবাইকে একান্ত আপন করে নেওয়া। কিন্তু বাঙালির এই চিরন্তন ইতিবাচক চরিত্র হনন করতেই যেন বিধ্বংসী আঘাত এল, যা সিরিয়া-ইরাকের ইসলামিক স্টেটের মুখপাত্রের দাবি অনুসারে এক আন্তর্জাতিক চক্রের ধ্যানধারণাপ্রসূত। বেপথু এই চক্রান্তকারীরা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত মুসলমানদের প্রতি অন্যায়, অবিচার ও নৃশংসতার প্রতিবাদে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এক বিধ্বংসী পন্থার উদ্ভাবন করেছে; যা ঘৃণা-বিদ্বেষ-অসহনশীলতায় লালিত এবং হিংস্র প্রতিশোধ গ্রহণের অযৌক্তিক স্পৃহাপ্রসূত। তা নিষ্ঠুর এবং অফলপ্রসূ, ধিক্কৃত, পাশবিক এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সেই যে তথাকথিত ‘অবিশ্বাসী’ সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আমেরিকান সিআইএর সৃষ্ট তালেবান দলে যোগ দেওয়ার জন্য রিক্রুটমেন্ট করা শুরু হলো—বুশ-ব্লেয়ারের অমার্জনীয় ক্রাইমে সৃষ্ট ইরাক-সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপে তা হলো বিধৃত। দুর্ভাগ্যক্রমে তা আজ নিয়েছে আইএস নামধারী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের রূপ।
গুলশান ট্র্যাজেডির পর যুদ্ধরত সিরিয়ার রাকা থেকে তিন আন্তর্জাতিক অথচ বাঙালি জঙ্গি ঘোষণা দিল—বেশ করেছি, দুর্গতি আরও আছে। হয়ে গেল শোলাকিয়া। কী অসহনীয় ধৃষ্টতা, কী পাশবিক কল্পনা! কী করে কীভাবে এদের মগজধোলাই হলো? এসব ঘোষক এবং গুলশানে যেসব জঙ্গি তাণ্ডবলীলা চালাল, তারা তো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। অনেকেই বিত্তবান পরিবারের সন্তান। নতুন করে ভিডিওতে হুমকি শোনা গেল এমন এক তরুণের কাছ থেকে, যে শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারের একজন, ছিলেন সুগায়কও, ‘ক্লোজ-আপ ওয়ান’ তারকা। বাবা ছিলেন এই সরকারের অধীনেই এককালে স্বরাষ্ট্রসচিব এবং অবসর-উত্তর নিয়োগপ্রাপ্ত ইলেকশন কমিশনার। কেউ বা হলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতার সন্তান। টেলিভিশনে বাবা তাঁর প্রশ্নাতীত পারিবারিক পটভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। যা-ই হোক না কেন, মোদ্দা কথা হলো, এখন প্রমাণিত হলো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের জাল বিস্তৃত হয়েছে সমাজের সর্বস্তরে। আর তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের মানসে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে সন্ত্রাস দমনে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে সর্বদলীয় ঐক্যভিত্তিক আদর্শকেন্দ্রিক সার্বিক উদ্যোগ। ব্লেম-গেম ও আত্মঘাতী দলীয় রাজনীতি বাদ দিয়ে সবারই উচিত হবে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে তরুণ ফারাজ যে আশা ও আদর্শের প্রদীপ প্রজ্বালিত করল, তাতে স্নাত হয়ে তার রক্তে ভেজা বাণী অনুধাবন করে তা গ্রহণ করা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আদর্শিক নিশ্ছিদ্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা। বাকরুদ্ধ এই মহান ট্র্যাজেডিতেও আজ আমরা মাথা উঁচু করে বলতে পারি, ফারাজ আমাদের গর্বের ধন।
আমাদের আশার উৎস। যে সমাজে ফারাজ হোসেনের মতো মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন তরুণের জন্ম হতে পারে, সে সমাজে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা অবশ্যই থাকতে পারে না। ফারাজের কুলখানিতে নেমেছিল মানুষের ঢল। সব শ্রেণির, সব পেশার, সব দলের বেদনায় মুহ্যমান মানুষের সমাগম। তবে মনে হচ্ছিল, শোকে ও সংকল্পে সবাই যেন ঐক্যবদ্ধ। এই ফারাজ স্মৃতি-মিলনীতে শোকাহত ইতালির রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা (ইতালির নয়জন নাগরিক হয়েছিলেন এই নির্মমতার শিকার) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘এই ট্র্যাজেডি আমাদের সবাইকে কাছে টেনে নিয়ে এসেছে। এ দেশের তরুণ সজ্ঞানে প্রাণ দিয়েছে সন্ত্রাস রোধে। দিয়েছে প্রাণ বাংলাদেশেই কর্মরত অনেক ইতালীয় নাগরিক। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ।’ এই মনোভাব তো ফারাজের শাহাদাতেরই সৃষ্টি। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক ত্যাগের কথা, প্রাণদানের কথা, জীবন বাজি রেখে সম্মুখসমরে এগিয়ে যাওয়ার কথা আমরা শুনেছি। শুনেছি মহাপুরুষদের মানবতাবোধের কথা। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে আত্মাহুতি দিয়ে ফারাজ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করল, আমি এর নজির কোথাও দেখিনি, কখনো শুনিনি।
অনায়াসেই সে দানবীয় সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারত, বস্তুত তাকে ওরা ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু না, ফারাজের কাছে তা ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। বন্ধুদের সঙ্গে, আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা সে করেনি। মানবতাবোধের জন্য, ন্যায়ের জন্য, সমমর্মিতার জন্য, সত্যের জন্য, নৈতিকতার জন্য সব বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মাথা উঁচু করে নির্দ্বিধায় মৃত্যুকে বরণ করেছে। তার এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ঘটনাক্রমে আকস্মিক বা দায়িত্ব পালন-প্রসূত নয়। হঠাৎ করে তার প্রাণ হরণ হয়নি। সুচিন্তিতভাবেই নীতিনিষ্ঠ থেকে অসীম-সাহসী ফারাজ বরণ করেছে তার নিয়তি। এর চেয়ে মহান আর কী হতে পারে? বাংলাদেশের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে ফারাজ হোসেন একটি আলোর ঝলকানি। তার শাহাদাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের সংঘবদ্ধ সংগ্রামের জন্য প্রেরণা, উৎসাহ ও সাহস জোগাবে। সফল হবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্যের আহ্বান। এটা আমাদের প্রত্যয়, জাতির প্রত্যাশা। ফারাজের মতো তরুণের এ ধরনের আত্মাহুতি কিছুতেই বৃথা হতে পারে না। হারিয়ে যেতে পারে না ধরার ধুলায়।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী: অর্থনীতিবিদ ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।