Thursday, March 1, 2018

কোটার মাত্রাটা কি একটু বেশি? by সফিকুল সাজু

চাকরির ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা একটি যৌক্তিক বিষয়। এটা থাকতেই পারে। বিভিন্ন কারণে থাকাও উচিত। যেমন, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে নারী, প্রতিবন্ধী, বিভিন্ন পিছিয়ে থাকা জেলার নাগরিক ও সুযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠী হিসেবে পাহাড়িরা কোটাসুবিধা পাওয়ার দাবি রাখেন। এছাড়া ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় প্রেষণা হিসেবে কোটার প্রচলন থাকা প্রয়োজন। যেমন, মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, এমন কি নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির নেশায়। কোন কিছু দিয়ে তাদের সে ঋণ শোধ হবে না। বোধ করি ঋণ শোধ করে দেব বললেও তাদের প্রতি অসম্মান হবে। তবু দেশের নাগরিকদের উৎসাহ দেয়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় প্রেষণা হিসেবে আামাদের বীর যোদ্ধা ও তাদের উত্তরসূরীদের একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় কোটা সুবিধা দেওয়া উচিত। এটুকু মেনে নেওয়ার মত বোধশক্তি ও মূল্যবোধ আমাদের শিক্ষিত তরুণদের থাকা উচিত।
আাবার শিক্ষিত মেধাবীদের যোগ্যতার নিরিখে চাকরি প্রদান করা একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। 'যোগ্যতা', 'পরীক্ষা', 'মূল্যায়ন'- শব্দগুলো যখন আসে, তখন মেধা কথাটাও চলে আসে। মেধা বাদ দিলে ওই শব্দত্রয় অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা সে মেধাকে কতটুকু মূল্যায়ন করছি?
অগ্রাধিকারের বিষয়টি ভাবতে গিয়ে কোটাপ্রথাকে আমরা এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি যে, কোটা সুবিধাপ্রাপ্তদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেও তরুণ প্রজন্ম দুদণ্ড ভাবে না। কোটাকে এমন চরম পর্যায়ে না পৌঁছালে আামাদের মুক্তিযোদ্ধা, নারী এবং অন্যান্য সুবিধাভোগীরা কি অসন্তুষ্ট হতেন?  মোটেও না, বরং তারাও এর একটা যৌক্তিক মাত্রা প্রত্যাশা করেন। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে মোট চাকরির ৫৫ শতাংশই চলে যাচ্ছে। মেধাবীদের জন্য থাকে ৪৫ শতাংশ মাত্র! যেখানে কোটা সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠী মাত্র অর্ধকোটি, আর কোটা বহির্ভুত ১৫.৫ কোটি। অর্থাৎ একগুণ মানুষের জন্য অর্ধেক চাকরি আর একত্রিশগুণ (১৫.৫X২) মানুষের জন্য বাকি অর্ধেক। বাংলাদেশে উপজাতি ১৬ লাখ, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ২ লাখ, আনুমানিক সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী ২০ লাখ (সর্বোচ্চ), প্রতিবন্ধী ১৫ লাখ, এই মোট ৫১ লাখের জন্য চাকরির ৪৫ শতাংশ (নারী কোটা ব্যতীত) চলে যাচ্ছে । বাকি ১৫.৫ কোটির জন্য থাকে ৫৫ শতাংশ। এটা কতটা যৌক্তিক? নারী কোটাও এখন আর ১০ শতাংশ রাখার দরকার নেই (অতীত পরিস্থিতির তুলনায়)। কারণ, এখন আামাদের নারীরা অনেক এগিয়েছে, ক্ষেত্রেবিশেষে ছেলেদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে তারা।
সর্বোপরি এই কোটার মাত্রাটা কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? এটা সব মিলিয়ে তো কোনভাবেই এক-পঞ্চামাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়, সেখানে বিদ্যমান অর্ধাংশেরও বেশি হচ্ছে কোটা। এভাবে হয়ত অনেকে শুনতে শুনতে সয়ে গেছেন। একটু ভিন্নভাবে বলি, মনে করুন, কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর ৫৫ শতাংশ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের সন্তান হয়, আর ৪৫ শতাংশ দেশের সমস্ত জনগণের মধ্য থেকে, তবে তা কি মেনে নিতে পারবেন? যারা চাকরির ক্ষেত্রে কোটা পাচ্ছেন, তারাও কি পারবেন? একটু নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করুন তো। আামি বিশ্বাস করি, যিনি দেশের জন্য জীবন বাজি রাখার মত মানসিক স্বচ্ছতা ও বিশালতা ধারণ করেন, তিনি কখনও কোটার মত সংকীর্ণ স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। কাজেই কোটাকে সংস্কার করে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা হলে, মনে হয় না কোন বীর মুক্তিযোদ্ধা বা অন্য সুবিধাভোগীরা প্রতিবাদ করবেন। অন্তত যৌক্তিক দেশপ্রেমিকরা করবেন না। দেশটা আমাদের সবার। তাই আামাদের সব পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে এবং ছাড় দেয়ার মানসিকতা লালন করতে হবে জাতীয় সমৃদ্ধির খাতিরে ।
সমৃদ্ধ দেশের জন্য আমাদের মানবসত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অতিমাত্রায় কোটাপ্রথার মত এমন অনিয়ম কখনও দেশের সুষ্ঠু সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে না। আমরা আমাদের জাতীয় দর্শনকেই নিচু করে গড়ে তুলছি। আমাদের তরুণরাও এমন সংস্কৃতিতে দ্বিধান্বিত। তারা চরম অবিশ্বাস ও আাত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছে। এটা আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বপ্নের সত্যিকার প্রতিফলন কখনও ঘটাবে না।
বর্তমান সরকারে থাকা দলটির হাতেই এই দেশ এসেছে। এদেশের বড় বড় সব অর্জন হয়েছে। অনেক চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়িত হয়েছে। গণমানুষের আাস্থার জায়গা হিসেবে অসহায়রা বারবারই এই সরকারের কাছে এসেছে। আামার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকার লাখো তরুণের এই আার্তনাদ শুনবে, এর একটা বিহিত করবে। এই তরুণদের অধিকাংশই মাঠে-ঘাটে-দোকানে কিংবা খালে-বিলে-কারখানায় কাজ করে দেশের অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তোলা সাধারণ পরিবারের সন্তান। তাদের সংখ্যাটা বিশাল, অবদান বেশি, স্বপ্নও বিশাল, অথচ তাদের সুযোগ কম। তাই তাদের স্বপ্নকে মর্যাদা দিতে হবে। তবেই আামাদের জাতির জনকের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন আালোর দেখা পাবে, তার দর্শন এগিয়ে যাবে।
লেখক : শিক্ষক, কবির হাট সরকারি কলেজ, নোয়াখালী

জোর করে হিজাব খোলার ক্ষতিপূরণ ৬০ হাজার ডলার

জোর করে হিজাব খুলে ফেলার এক মামলায় নিউইয়র্ক শহরের কর্তৃপক্ষ তিনজন মহিলার সাথে এক আইনি সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং তাদের প্রত্যেককে ৬০ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে।
মামলার বাদী তিনজন তরুণী অভিযোগ করেছিলেন যে, নিউইয়র্ক পুলিশের কর্মকর্তারা সবার সামনে তাদের হিজাব খুলে ফেলতে বাধ্য করেছিলেন এবং ছবি তুলেছিলেন। মামলাটির শুরু ২০১২ সালে। এক তরুণীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় পুলিশ তাকে আটক করে। ব্রুকলিন পুলিশ প্রিসিংক্টে জনসমক্ষে তাকে হিজাব খুলতে বাধ্য করা হয় এবং ছবি তোলা হয়। ওই নারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাটি আগেই খারিজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হিজাব খোলার ব্যাপারে একই ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটার পর এ নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং এতদিন ধরে মামলাটি চলছিল। অবশ্য এরই মাঝে ২০১৫ সালে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ থেকে কর্মকর্তাদের প্রতি নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এতে ধর্মীয় প্রয়োজনে যারা মাথা ঢেকে রাখেন, সেটা খুলে ফেলার ব্যাপারে নিয়মাবলী জারি করা হয়। এই মামলার বাদী পক্ষের উকিল তাহানি আবুশি বিবিসিকে বলেন, মামলাটি শুধু মুসলমানদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, অন্য যেসব ধর্মে মাথা ঢেকে রাখার রেওয়াজ আছে, তাদের জন্য এই মামলার রায় তাৎপর্যপূর্ণ।

ডিসি পদে রদবদল

জনপ্রশাসনে রদবদল এবং কর্মকর্তাদের কর্মস্থল পরিবর্তন অবশ্যই একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সামনে সাধারণ নির্বাচন থাকায় এখন থেকে জনপ্রশাসনে বড় ধরনের কোনো রদবদল সংগত কারণেই বিশেষ মনোযোগের কারণ হতে পারে। একসঙ্গে ২২ জেলায় ডেপুটি কমিশনার এবং ১৫ জেলায় পুলিশ সুপার বদলের পরে আরও বেশি রদবদলের খবর বেরিয়েছে। সুতরাং এসব রদবদল রুটিন হোক বা না হোক, জনপ্রশাসনে এখন থেকে আনা প্রতিটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে সতর্ক নজর রাখা। কারণ, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গঠনে জনপ্রশাসনের একটি বড় ভূমিকা থাকার বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সচিব পরিবর্তন বিষয়ে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া ইসিকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এতে সন্দেহ সামান্য যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর্ব ছাড়া ইসি জনপ্রশাসনে বদলি বা কর্মস্থল নির্ধারণে আনুষ্ঠানিকভাবে মতামত দিতে পারে না। আবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী হোক বা না হোক, বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনলে তার একটি নেতিবাচক প্রভাব ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ওপর পড়তে পারে। সুতরাং এই অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগের দিকে না থাকে, তাহলে তার ঘাটতি পূরণ করা ইসির পক্ষে কঠিন হতে পারে। ডেপুটি কমিশনাররা রিটার্নিং অফিসার না হলেও নির্বাচনকালীন প্রশাসনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবেন। আর তাঁরা রিটার্নিং অফিসার হলে তো তাঁদের গুরুত্ব আরও বাড়বে। এটা সুবিদিত যে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী প্রার্থীরা ডিসি-এসপি নিয়োগে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকেন। নির্বাচনী বছরে এটি যে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে,
সে বিষয়ে আর সন্দেহ কী? ক্ষমতাসীন দলকে বিবেচনায় নিতে হবে যে তারা যেহেতু দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংকল্পবদ্ধ, তাই তাদের পক্ষে সম্ভব সব রকম উপায়ে জনপ্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সেই হিসাবে নির্বাচন কমিশনের একটি নৈতিক দায়িত্ব বর্তায় জনপ্রশাসনের রদবদল বিষয়ে সরকারের কী কর্তব্য, তা কোনো একটি উপযুক্ত উপায়ে এখন থেকেই স্মরণ করিয়ে দেওয়া। অন্যথায় সরকারি দল যদি তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার আগমুহূর্ত পর্যন্ত প্রশাসনে তাদের অবস্থান শক্ত করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়, তাহলে তফসিল ঘোষণার পর অল্প সময়ে পরিবর্তন আনা প্রায় অসম্ভব বলে বিবেচিত হতে পারে। ডিসি রদবদলে বড় আশঙ্কা হলো তাদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত তাদের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করেনি। ঐতিহ্যগতভাবে ডিসিরাই এটা পালন করে আসছিলেন। এটাও সত্য যে ডিসিদের দিয়ে আমরা ভালো-মন্দ দুই ধরনের নির্বাচনই করিয়েছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের চারটি সুষ্ঠু নির্বাচনই ডিসিদের করা। সুতরাং ক্যাডার হিসেবে তাঁদের নিশ্চয় খাটো করা যাবে না। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা কুমিল্লার তৎকালীন ডিসি হিসেবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন করে নিন্দিত আবার জুনের গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে নন্দিত হয়েছিলেন। সুতরাং সরকার কী চাইছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন একান্তভাবে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে ইসির দায়িত্ব। সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে আমরা ডিসিদের মতোই জেলা ও থানা নির্বাচন কর্মকর্তা পেয়েছি। সুতরাং রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিতে তাঁরাই অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য। আর ঘাটতি পড়লে প্রশাসন ক্যাডার বাদ দিয়ে অন্যান্য ক্যাডার দিয়েও তা পূরণ করা যেতে পারে।

মহাসড়কে মৃত্যুর বিভীষিকা

গত মাসে ‘বাংলাদেশ সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট ২০১৭’ প্রকাশের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার নামে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড চলছে।’ একই অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে অন্যতম মহামারি হিসেবে চিহ্নিত।’ এ ধরনের বক্তব্য যে কী মর্মান্তিক বাস্তবতা তুলে ধরে, তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত গত সোমবার সোনারগাঁয়ের টিপুরদী এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনা। শিশু, নারীসহ ১০ জন নিরীহ মানুষ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছে, আহত হয়েছে ২৬ জন। দুর্ঘটনা আকস্মিক এবং তা প্রতিদিন ঘটে না—এমন কথা এখন আর বাংলাদেশে খুব একটা খাটে না। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। সর্বশেষ ৩৭৫ দিনে প্রথম আলোয় প্রকাশিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোতে মোট প্রাণহানির যোগফল দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ২০০। এই হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে দৈনিক ৮ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। কী কী কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, তা অজানা নয়। বিশেষজ্ঞরা সেসব চিহ্নিত করেছেন। সোমবার সোনারগাঁয়ের দুর্ঘটনাটি দৃষ্টান্তমূলক: যাত্রীবাহী বাসটির চালক বাস চালাতে চালাতে মুঠোফোনে কথা বলছিলেন, তিনি শুরু থেকেই বাসটি চালাচ্ছিলেন বেপরোয়া গতিতে, বাসটির ফিটনেস সনদ ছিল না, বাসটি প্রথমে একটি রিকশাকে ধাক্কা দিয়েছিল,
কিন্তু মহাসড়কে রিকশার মতো অযান্ত্রিক ও অন্যান্য ছোট যানবাহন চলাচল আইনত নিষিদ্ধ এবং যে কনটেইনারবাহী ট্রেইলরের সঙ্গে বাসটি ধাক্কা খেয়েছে, সেটিকে মহাসড়কে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, যা বেআইনি। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে যে প্রধান কারণগুলো বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন, তার সবগুলোই এই সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে এই কারণগুলো দূর করতে হবে। কিন্তু এ নিয়ে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা তার আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে আর দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর হার বেড়েছে ২২ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু এভাবে আর চলতে পারে না। বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তৎপর হতেই হবে।

পরিচয় দিতে লজ্জা পায় জাতীয় পার্টি! by সোহরাব হাসান

মাটি দোআঁশলা হলে ভালো ফসল হয়। কিন্তু রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল দোআঁশলা হলে তার ফল ভালো হওয়ার কোনো কারণ নেই। সাবেক স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির দ্বৈত পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চার বছর ধরেই আলোচনা হয়ে আসছিল। জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা এসব আলোচনা-সমালোচনা আমলে নেননি। এমনকি এরশাদ প্রকাশ্যে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের সরকার থেকে পদত্যাগের চরমপত্র দিয়েও সফল হননি। এবারে সরব হয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান ও সংসদে আলংকারিক বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। তিনি যখন দেখলেন দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করাতে পারছেন না, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হলেন। গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির সম্মান বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। মন্ত্রিসভা থেকে জাপার সদস্যদের পদত্যাগ করার নির্দেশ দিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁরা দেশে-বিদেশে নিজেদের পরিচয় দিতে পারেন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা লাগে। কারণ, সবাই জানতে চায়, জাতীয় পার্টি সরকারি দল, না বিরোধী দল। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা সরকারি দল, না বিরোধী দল, কোনটা আমরা?’ প্রথমেই রওশন এরশাদকে ধন্যবাদ জানাই তাঁর এই সত্য ভাষণের জন্য। তিনি স্বীকার করেছেন, জাতীয় পার্টি পরিচয় সংকটে আছে এবং জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে বাইরে কথা বলতে লজ্জা পান। অনেক সময় কৌতূহলের সঙ্গে দেখেছি, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথি এসে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন। সুযোগ পেলে বিএনপিপ্রধানও তাঁদের সঙ্গে দেখা করতেন। কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে দেখা করেন না। জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের ওপর এরশাদ কিংবা রওশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। এরশাদ কিংবা রওশন জানেন যে তাঁদের কথায় জাতীয় পার্টির কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করবেন না। তাই এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ-উপরোধ করছেন যেন তিনি তাঁদের মন্ত্রীদের বাতিল করে দেন। এ কথা ঠিক যে সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভায় কাকে নেওয়া হবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই নিয়ে থাকেন। কিন্তু জাতীয় পার্টি নিজে বিরোধী দল হবে, না সরকারের অংশীদার হয়ে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত তো প্রধানমন্ত্রী নেবেন না। নিতে হবে জাতীয় পার্টির নেতাদের। রওশন এরশাদ ক্ষোভ ও হতাশার সুরে বলেছেন, ‘টানাটানি করে বিরোধী দল হওয়া যায় না।
তাঁরা হয় বিরোধী দল হবেন, না হলে সরকারে থাকবেন। তিনি বলেন, ‘না হয় আমাদের ৪০ জনকে সরকারে নিয়ে নেন। বিরোধী দল দরকার নেই।’ রওশন হতাশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আরও বলেন, ‘আপনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি বলতে পারতেন, ঠিক আছে সব মন্ত্রিত্ব ছাড়ো। মন্ত্রিত্বে থাকার দরকার নেই।’ অনেক দেরিতে হলেও রওশন স্বীকার করেছেন, টানাটানি করে বিরোধী দল হওয়া যায় না। এখন জাতীয় পার্টি থেকে যেসব নেতা মন্ত্রিসভায় আছেন, তাঁদেরই ঠিক করতে হবে, তাঁরা মন্ত্রী থাকবেন না বিরোধী দলে বসবেন। মন্ত্রী থাকলে বিরোধী দলে বসা যায় না। কিংবা বিরোধী দলে থাকলে মন্ত্রী হওয়া যায় না। আসলে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যানের ভয়, দল থেকে কাউকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বললে তাঁরা শুনবেন না। মঙ্গলবার যখন টেলিভিশনে রওশনের বক্তৃতা শুনছিলাম, তখন তাঁর পাশেই বসে ছিলেন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান। তাঁদের চেহারায় কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি। এর আগেও তাঁরা অনেকবার এ ধরনের কথা শুনেছেন। হয়তো দেখা যাবে, পদত্যাগের কথা বললে, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বললে তাঁরা দল ছেড়ে আওয়ামী লীগেও হিজরত করতে পারেন। এ কারণেই দলীয় নেতাদের প্রতি হুকুমনামা জারি না করে রওশন প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাতীয় পার্টিকে বাঁচানোর আরজি জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের নেতারা সরকারপ্রধানের কাছে গণতন্ত্র বাঁচানোর আহ্বান জানান। কিন্তু রওশন জানালেন জাতীয় পার্টি বাঁচানোর আবেদন। তাঁর উপলব্ধি, ‘আমরা যখন বাইরে যাই, তখন সবাই বলে, তুমি কোথায় আছ, সরকারে না বিরোধী দলে? আমরা তো বলতে পারি না।’ তবে রওশন এরশাদের এসব আবেদন-নিবেদন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তথা সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি রওশন এরশাদের প্রশংসা করে বলেছেন, গণতন্ত্র চর্চা কীভাবে সুষ্ঠু করা যেতে পারে, তার নজির সংসদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রওশনের এই আহাজারির পেছনে জাতীয় পার্টিকে বিশুদ্ধ বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা নয়, সুযোগসন্ধানী মতলব কাজ করে থাকতে পারে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার শরিক জাতীয় পার্টির অনেক নেতাই মনে করেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে নাও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী হিসেবে সংসদে আসতে হবে। জনগণের কাছে ভোট চাইতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে সরকার থেকে বেরিয়ে গেলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দর-কষাকষিতেও সুবিধা হবে। তবে সে রকম সুবিধা জাতীয় পার্টির নেতারা নাও পেতে পারেন। কেননা, বিএনপির মনোভাব হলো যত প্রতিকূল অবস্থাই হোক না কেন তারা নির্বাচনে যাবে। এমনকি মামলার কারণে খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনে যাওয়ার সুযোগ নাও পান, তাহলেও বিএনপির মনোভাব হলো নির্বাচনে যাওয়া। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগে দলের নেতাদের সে রকম বার্তাই দিয়ে গেছেন। বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টির বর্তমান অস্তিত্ব সংকট আরও ঘনীভূত হবে। কয়েক দিন আগে জাতীয় পার্টির প্রধান এরশাদ বলেছিলেন, বিএনপির কতিপয় নেতা শিগগিরই তাঁর দলে যোগ দেবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ যোগ দেয়নি। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে যোগ-বিয়োগের সব হিসাব-নিকাশ যে বদলে যাবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। রওশন এরশাদের কথায় শুধু জাতীয় পার্টি নয়, গণতন্ত্রের পরিচয় সংকটও ঘনীভূত হয়েছে।
sohrabhassan55@gmail.com

ইসমে আজমের চমকপ্রদ আবিষ্কার by স্বাধীন সেন

কৈশোরে বুদ্ধদেব গুহর ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে ধরনের অ্যাডভেঞ্চারধর্মী বই অনেক পড়েছি। ঋজুর নাম শুনেই কেন জানি না ওই ঋজুদার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। তার একটা কারণ অবশ্যই ঋজুর সঙ্গে সুন্দরবনের সখ্য। ঋজুর ভালো নাম ইসমে আজম। এসএসসি পাস। সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করছেন সাত বছর ধরে। অমিতাভ ঘোষ আর অনু জালাইয়ের মতো লেখক-গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সুন্দরবনে চলতে গেলে জোয়ার-ভাটার হিসাব জানা কত জরুরি। খাওয়ার পানি সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। পানি না থাকলে জীবনও থাকবে না। বাঘ-কুমিরের চাইতেও সুন্দরবনের আসল বিপদ তাকে না জেনে তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে গেলে। ইসমে আজম বাঘ খুঁজতে গিয়ে খুঁজে বের করেছেন পুরোনো স্থাপনা, ঢিবি, মৃৎপাত্রসহ নানা নিদর্শন। তিনি যে গুপ্তধন সন্ধানের মতো অ্যাডভেঞ্চার করেননি, সেটা তাঁর ছবি তোলা, তথ্য সংগ্রহ আর বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি দেখলেই বোঝা যাবে। সাত বছর ধরে তিনি খুঁজে বের করেছেন প্রত্ননিদর্শন, জিপিএস দিয়ে অবস্থান রেকর্ড করেছেন। কোমরকাদায় নেমে নেমে ছবি তুলেছেন। ইন্টারনেট ঘেঁটে ও বই পড়ে সেসব বোঝার চেষ্টা করেছেন। এই জমানায় বৈষয়িক লাভের কথা বা খ্যাতিকে রেয়াত না দিয়ে তিনি কাজ করে গেছেন সতীশ চন্দ্র মিত্রের মতো করে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো মানুষ এ দেশে এই জমানায় এখন দুর্লভ। তাঁকে সালাম জানাই তাঁর নেশাসক্তি, আবিষ্কার ও গবেষণার গুরুত্বের জন্য। সুন্দরবন সম্পর্কে আমাদের নাগরিকদের ধারণা এখনো প্রধানত পর্যটকসুলভ। আমরা এ-ও মনে করি যে সুন্দরবনকে পোষ মানানো শুরু হয় পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতকের সময়কালে বা পরে মোগল শাসনামলে। সে সময় এই ভূমির পূর্বাংশ স্থিতিশীলতা পায় গঙ্গা নদীর (বর্তমানে ভাগীরথী/আদি গঙ্গা নদী) জলধারার বেশির ভাগ বর্তমান পথ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে। এই পূর্বাংশেই বাংলাদেশের সুন্দরবন। জঙ্গল কেটে কৃষিজমি বিস্তৃত করার মধ্য দিয়ে এ সময় সেখানে মানববসতি গড়ে ওঠে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন এই মত প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ঐতিহাসিক ও ভূতাত্ত্বিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নদীপ্রবাহের পরিবর্তনের এই সময়কাল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন ও তার ভূমিরূপের স্থিতিশীলতার দাবির ভ্রান্তি এখানে মানববসতির আদি সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করা যায়। আমাদের আরেকটি ভুল ধারণা হলো, সতত পরিবর্তনশীল বন্যাপ্রবাহ ও কাদামাটির দেশে মানুষের পক্ষে অতীতে বসতি গড়া সম্ভব হয়নি। বন্যা সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারণা, বন্যা, ভূমিরূপ ও মানববসতির ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে আমাদের গবেষকদের আগ্রহের অভাবও এসব ভুল অনুমান ও সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী। সৌভাগ্যের বিষয়, ভারতের পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশের সুন্দরবন ও সংলগ্ন ভূমিরূপ নিয়ে ভূতাত্ত্বিক, পারিবারিক ও জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নালে অভিসন্দর্ভও প্রকাশিত হয়েছে।
উপকূলবর্তী জোয়ার-ভাটার প্রতিবেশে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বনের বয়স রেডিও কার্বন (ক্যালিব্রেটেড) অনুযায়ী প্রায় ১০ হাজার বছর আগে। হলোসিন সময়কালে সমুদ্র সমতলের উচ্চতার পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা বলছে, সে সময় উপকূলরেখা আরও উত্তরের দিকে ছিল। আদি-প্রতিবেশ ও আদি-উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে গবেষণাগুলো জানিয়েছে, শ্বাসমূলীয় বন মাঝেমাধ্যেই হারিয়ে গেছে, আবার বিকশিত ও বিস্তৃত হয়েছে। পলি কোথাও সরে যাচ্ছে, কোথাও সঞ্চিত হচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে। সুপেয় আর নোনার মিশেল তৈরি হচ্ছে। এই সক্রিয় বদ্বীপের উপকূলীয় প্রতিবেশে আদি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও মেঘনার পানিবাহিত পলির মিশ্রণ শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। সতীশ চন্দ্র মিত্র সুন্দরবনসহ এতদঞ্চলের প্রত্ননিদর্শন সম্পর্কে বিশ শতকের শুরুতেই বলে গেছেন। নিজ আগ্রহে ও উদ্যমে কালীদাশ দত্ত ও তাঁর অনুসারীরা পশ্চিম বাংলার সুন্দরবন ও সংলগ্ন অঞ্চলে দীর্ঘকাল জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাঁর এবং পরবর্তী পেশাদার প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাজের মাধ্যমে তেরো শতকের আগের অসংখ্য প্রত্ননিদর্শন ও প্রত্নস্থান আমাদের নজরে আসে। তার মধ্যে রয়েছে জটার দেউল, কঙ্কনদিঘি, তিলপি, কোরবেগ, ধোসা, গোবিন্দপুর, দেউলপোঁতা, আটঘড়া, দমদম, হরিনারায়ণপুর। এর অনেকগুলোতে প্রত্নখনন পরিচালিত হয়েছে। কোনো কোনোটি থেকে তৃতীয়-দ্বিতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ শতকের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার দাবি করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। এর আরেকটু উত্তরে গেলে চন্দ্রকেতুগড়। এটিসহ অন্যান্য প্রত্নস্থান আর লিপি বিশ্লেষণ করে ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও রণবীর চক্রবর্তীর মতো পণ্ডিতেরা অঞ্চলটিকে টলেমি ও বিভিন্ন গ্রিক উৎসে উল্লিখিত গঙ্গারিডাই জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলেছেন। অজ্ঞাতনামা নাবিকের লেখা পেরিপ্লাস অব দ্য ইরাথ্রিয়ান সি বইটিতেও (আনুমানিক প্রথম শতাব্দী) এই অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। ওই সুন্দরবন থেকে পাওয়া গেছে লক্ষণ সেনের দ্বিতীয় রাজ্যাঙ্কে লিখিত দুটি তাম্রলিপি এবং একাদশ-দ্বাদশ শতকে ডোম্মনপালের সময়ের আরেকটি তাম্রলিপি। ভাগীরথীর মোহনার সাগরদ্বীপেও পাওয়া গেছে প্রত্ননিদর্শন। স্থানটি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছেও তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সমস্যা হলো, বাংলাদেশের সুন্দরবন ও আশপাশের এলাকায় সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস-এর পরে তেমন কোনো সামগ্রিক গবেষণাভিত্তিক বই প্রকাশিত হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদন রয়েছে সংলগ্ন অঞ্চলের প্রত্নস্থান নিয়ে। মোদ্দাকথায়, বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে কোনো পরিকল্পিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালিত হয়নি বললেই চলে। ইসমে আজমের জরিপে চিহ্নিত প্রত্নস্থানগুলো তাই সুন্দরবনের প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এর মধ্যে প্রত্নস্থানের কমপক্ষে তিনটি গুচ্ছ—খেজুরদানা, আড়পাঙ্গাশিয়া ও সাতক্ষীরার খোলপটুয়া নদীর পাড়ে উন্মোচিত ইটের তৈরি কাঠামো—আনুমানিক নবম থেকে দ্বাদশ খ্রিষ্টীয় শতক বা তার পরের সময়কালের বলে অনুমান করি। ইটের আকারের ওপর ভিত্তি করে সময়কাল নির্ণয় করাকে হালের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় খারিজ করে দেওয়া হয়। মৃৎপাত্র তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য সময়কাল নির্ধারক। বেশ কিছু স্থানেই বিভিন্ন সময়ের মৃৎপাত্রের সন্নিবেশ লক্ষ করা যায়। সুন্দরবনের নিয়ত রূপান্তরপ্রবণ নদীব্যবস্থা, উপকূলীয় পলল সঞ্চয়ের পরিবেশ ও জোয়ার-ভাটা মিলিয়ে কোনো কোনো স্থানের মৃৎপাত্রগুলো বিভিন্ন স্থান থেকে স্রোতে ভেসে এসে জমা হয়েছে। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও আকৃতির চুল্লিগুলোও বিভিন্ন সময়ের বলেই মনে হয়। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এসব চুল্লি লবণ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হতো। ইসমে আজম এসব চুল্লির বিস্তৃতি ও অবস্থানের বিশদ মানচিত্র তৈরি করেছেন। এসব চুল্লিসহ ইটের স্থাপনাগুলো আর অপরিবর্তিত মৃৎপাত্রের সন্নিবেশ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সুন্দরবনের এই পরিবর্তনশীল পরিবেশেও মানুষ কমপক্ষে এক হাজার থেকে চৌদ্দ শ বছর ধরে বসতি তৈরি করছে। খেজুরদানার ইটের কাঠামোগুলো নদীতে থাকায় ভাটার সময়ই কেবল আংশিক উন্মোচিত হয়। প্রত্নকাঠামো ও চুল্লিগুলো প্রায় ৮০০ মিটার দূরত্বে একটি রেখা বরাবর বিস্তৃত। কাঠামোগুলোর ব্যবহার সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে লবণ উৎপাদনের সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক উড়িয়েও দেওয়া যায় না। উপকূলীয় অবস্থান দেখে অনুমান করা যায়, পুরো প্রত্নস্থানটি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে নির্মিত ও ব্যবহৃত হয়েছিল। লবণ উৎপাদন এবং নদী ও সমুদ্রপথে বাংলা ও ভারতের পূর্ব উপকূলবর্তী বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর জন্য এই বসতি গড়ে উঠে থাকতে পারে। তবে বসতিটি অব্যাহতভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল, নাকি মাঝেমধ্যে পরিত্যক্ত হয়েছিল, তা বলা মুশকিল। আমার মতে, ইসমে আজম অন্তত তিনটি কালপর্বের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন: ১. নবম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী, পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী এবং অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে বর্তমান।
অনেক জায়গায় প্রত্ননিদর্শন, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে মৃৎপাত্রগুলো বিভিন্ন সময়ের। এই প্রত্নস্থানগুলো বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে মানববসতির উদ্ভব ও রূপান্তর সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত মতবাদ ভুল প্রমাণ করেছে। মোগল আমলের বহু আগেই এখানে মানুষ বসতি গড়েছিল। আমার অনুমান, এমন অনেক প্রত্নস্থান ও নিদর্শনই সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ছড়িয়ে আছে। কোনো কোনোটি পুরু পলির নিচে চাপা পড়েছে। ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ে রুপার্ট ভ্যান দ্যো নুর্ট পশ্চিম সুন্দরবনের প্রত্নস্থান ও প্রত্ননিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস এবং তার সাপেক্ষে মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি প্রস্তাব করেছেন, এই প্রত্নস্থান ও বসতিগুলো নিয়ত প্রতিকূল ও পরিবর্তিত পরিবেশেও মানুষের অভিযোজনের প্রমাণ দেয়। মানুষ বসতি তৈরি করছে। বসতি বারবার ধ্বংস হয়েছে এবং গড়ে উঠেছে। কখনো বিশেষ কারণে, কখনো আশপাশের অন্যান্য বসতির সঙ্গে সম্পর্কসূত্রে এই রূপান্তরপ্রবণ প্রতিবেশে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মানুষের সঙ্গে প্রতিবেশের এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব খুঁজতে চায় না। ইসমে আজমের আবিষ্কার সেখানে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। সুন্দরবন থেকে একটু উত্তরে আরও অনেক প্রাক্-মধ্যযুগীয় প্রত্নস্থানের খোঁজ সতীশচন্দ্র মিত্র দিয়ে গেছেন। তার মধ্যে আছে কপিলমুনি-আগ্রা, বড়বাড়ি, ঝুড়িঝাড়া ঢিবিসহ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের দক্ষিণাংশের বিভিন্ন প্রত্নস্থান। পরিকল্পিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালিত হলে এ রকম বিচিত্র প্রত্নস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এসব এলাকায়ও একসময় সুন্দরবন বিস্তৃত থাকার ভূতাত্ত্বিক আলামত পাওয়া গেছে। ইসমে আজমের আবিষ্কার কমপক্ষে নবম শতক বা তারও আগে থেকে উপকূলীয় পরিবেশে শ্বাসমূলীয় বাস্তুব্যবস্থায় মানববসতির প্রমাণ। এই বসতিগুলোর বিস্তার এবং সেগুলোর মধ্যের আন্তসম্পর্ক বুঝতে গেলে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার সক্রিয় ও পরিণত বদ্বীপের অন্যান্য প্রত্নস্থানের সঙ্গে এর সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সেটি অনেক বড় কাজ। আশা করি, পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিকদের নির্মোহ সমর্থনে ইসমে আজম তাঁর নিষ্ঠা, আগ্রহ ও সততার মাধ্যমে এই কাজে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবেন।
স্বাধীন সেন: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক

নবজাতকের কী দোষ? by মানসুরা হোসাইন

জন্মের পরপর জীবন্ত নবজাতককে রাস্তায় বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো নবজাতক শিয়াল-কুকুরের খাবারে পরিণত হচ্ছে। কিছু নবজাতক অনাত্মীয় গুটি কয়েক মানুষের দয়ায় পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীবন্ত নবজাতককে ফেলে দেওয়াই সব সমস্যার সমাধান কি না। নবজাতক ফেলে দেওয়ার পর, তাকে মৃত বা জীবন্ত উদ্ধারের পর নবজাতকের অদৃশ্য জন্মদাত্রী মা নিজের বুকের ধন কীভাবে রাস্তায় ফেলে দিলেন, তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের শিশু অধিকার পরিস্থিতি ২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর রাস্তা/ডাস্টবিন বা ঝোপ থেকে অজ্ঞাতপরিচয়ের ১৭টি নবজাতক কুড়িয়ে পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে ফেলে দেওয়া বা কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতকের সংখ্যাটি ছিল ৯। অর্থাৎ এ সময়ে এ ধরনের ঘটনা বাড়ে ৮৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এ ছাড়া গত বছর অজ্ঞাতপরিচয়ের ২৪ শিশুর লাশ পাওয়া যায়, যার ৯৯ শতাংশই ছিল নবজাতক (জন্মের পর ২৮ দিন বয়স পর্যন্ত)। নারী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই বিয়েবহির্ভূত অনেক ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে নারী-পুরুষ। ফলে এই নবজাতকদের জন্ম যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি বেড়ে গেছে জীবন্ত নবজাতককে ফেলে দিয়ে সব দায় থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ঘটনা। এতে করে নবজাতকের জন্মদাতা বাবা-মা হয়তো নিষ্কৃতি পাচ্ছেন, কিন্তু ফেলে দেওয়া নবজাতকের কপালে কী ঘটছে? মাত্র এক দিন আগে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ফরিদপুরে একটি কাগজের কার্টনের ভেতর থেকে এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে লাশটি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে শহরের আলীপুর পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়। চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারির রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট থানা-পুলিশ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নে রাস্তার পাশ থেকে ওষুধের কাগজের কার্টন থেকে এক মৃত নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে। তারও লাশ দাফন হয় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। এ ধরনের খবর দেখলেই মনে প্রশ্ন জাগে, কী দোষ ছিল এ নবজাতকের? আর প্রথম আলো বা বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়টি ঘটনাই বা প্রকাশ পায়, তাও একটি প্রশ্ন। চলতি বছরেরই ১০ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার আশুলিয়ায় এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কের পাশে পলাশবাড়ী এলাকায় একটি ডাস্টবিন থেকে এই নবজাতকের লাশ তুলে নিয়ে তা কুকুরে খাচ্ছিল। চলতি বছরের গত ১৫ জানুয়ারির ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। গাড়ি থামিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের ফটকের অদূরে পলিথিনে মোড়ানো কিছু একটা ফেলে যান এক তরুণী। পুলিশ ভাষ্য অনুযায়ী, ফেলে যাওয়া ভ্রূণটি চার-পাঁচ মাসের হতে পারে। যাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন: কোনো কোনো নবজাতক সৌভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে আসে। ফাইজা তেমনই একজন। ২০১৫ সালে কুকুরের কামড় থেকে বেঁচে যাওয়া নবজাতকটির নাম ফাইজা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তার এ নাম দেয়।
যার অর্থ বিজয়িনী। হাসপাতাল থেকে ও যায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোটমণি নিবাসে। এখন আছে আইনগত বাবা-মায়ের কাছে। পূর্ব শেওড়াপাড়ার পুরোনো বিমানবন্দরসংলগ্ন একটি মাঠে সিমেন্টের বস্তায় ভরে ফেলে গিয়েছিল ফাইজাকে। কুকুরের দল বস্তার ভেতর থেকে বের করে ঠোঁট ও নাকের বেশ খানিকটা অংশ খেয়ে ফেলে। বাঁ হাতের দুটি আঙুলের ডগাও চলে যায় কুকুরের পেটে। কয়েকজন নারী ওকে কুকুরের হাত থেকে উদ্ধার করেন। রাজধানীতে সরকারের ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম রানু প্রথম আলোকে জানালেন, আদালতের মাধ্যমে ফাইজা এখন নতুন বাবা-মায়ের বাড়িতে আছে। বর্তমানে নিবাসে পাঁচ মাস বয়সী আরেকটি মেয়ে নবজাতক আছে। জন্মের পর তাকেও রাজধানীর খিলগাঁওয়ে কেউ ডাস্টবিনে ফেলে যায়। বিড়াল ঘুরঘুর করে চারপাশে। কান্নার শব্দ পেয়ে এলাকাবাসী ওকে উদ্ধার করে। গত নভেম্বরে জুবলি বেগম নিবাসটিতে উপতত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব নেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী ছয়জনকে (একসময় রাস্তায় ফেলে দেওয়া নবজাতক) আদালতের মাধ্যমে আইনগত অভিভাবকের হাতে তুলে দিতে পেরেছেন বলে জানালেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঘটা করে উদ্‌যাপিত হলো কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় অহনা আমির নিঝুমের জন্মদিন। ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার করতে আর একটু দেরি হলেই ওর ছোট্ট দেহটি চলে যেত শিয়ালের পেটে। এখন ওর বাবা-মা নিঃসন্তান দম্পতি মো. আমির উদ্দিন ও সাবরিনা আক্তার। মেয়ের জন্মদিনে তাঁরা নিমন্ত্রণ করেছিলেন স্থানীয় সাংসদ (পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী আসন) মো. সোহরাব উদ্দিনসহ ৭০০ অতিথিকে। গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি তাকে উদ্ধার করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মিলে নিঃসন্তান দম্পতি আমির ও সাবরিনার কাছে অহনাকে তুলে দিয়েছিলেন। ঘটনাটি ছিল ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির। ডাস্টবিনের পাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপের মধ্যে খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো নবজাতকটির সারা শরীরে ময়লা, দগদগে ঘা ছিল। প্রস্রাব-পায়খানা দিয়ে শরীর মাখামাখি। ওই নবজাতকের বয়স এখন আট বছর। ওর নাম ঐশ্বর্য। ঐশ্বর্য এখনো আলো ছড়াচ্ছে। অথচ পুলিশ প্রথমে জানিয়েছিল, নেওয়া চলবে না। এ কথা শুনে শওকত আরা ফিরে যেতে চান। তখন সেই পুলিশই আবার পেছন থেকে ডাকেন। বলেন, ‘আপনি নিলে তবু তো ও বাঁচবে।’ তারপর শওকত আরা থানায় মুচলেকা দিয়ে নবজাতককে নেন। পালক পিতা ফজলুল বাসেত খান বললেন, ‘নবজাতক উদ্ধারের পর বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত খবরে আমরা আমাদের টেলিফোন নম্বর দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত ফেলে যাওয়া নবজাতকের বাবা-মা পরিচয় দিয়ে কেউ নিতে আসেনি। আমাদের মেয়ে ঐশ্বর্য এখন স্কুলে যাচ্ছে। ও ভালো আছে। মেয়ে আর একটু বড় হলে আমরা ওকে জানাব ওর জীবনের ইতিহাস।’ ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম রানু বলেন, ‘নিঃসন্তান দম্পতিরা আইনগত অভিভাবকত্ব নিতে হন্যে হয়ে আমার প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিচ্ছেন প্রতিদিন। অন্যদিকে, কেউ না কেউ সদ্য জন্ম নেওয়া নিজের সন্তানকে কুকুর-বিড়ালের সামনে ফেলে যাচ্ছেন। প্রথমেই মনে হয়, আহা, নবজাতকটির তো কোনো দোষ ছিল না।’
মানসুরা হুসাইন: সাংবাদিক।

জাতিসংঘ আসলে পারে কী? by মারুফ মল্লিক

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত জনমানসে কিংবা সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপর কোনো আবেদনই সৃষ্টি করে না। শান্তি স্থাপনে, জনসাধারণকে রক্ষার্থে জাতিসংঘ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বা জাতিসংঘের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। তবে কোথাও গণহত্যা সংগঠিত হওয়ার পর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে বা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্গঠনে জাতিসংঘ বেশ দক্ষতা দেখিয়েছে। জাতিসংঘ এখন অনেকটাই বৈশ্বিক ত্রাণ বিতরণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্লিন সংকট থেকে শুরু করে হালের সিরিয়া সংকট বা রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘ নিন্দা, বিবৃতি প্রদান ও নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করেনি। ১৯৬২ সালে কিউবায় মিসাইল সংকট সমাধানে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ভিয়েতনামে বা কোরিয়া উপদ্বীপের যুদ্ধে কী করেছে জাতিসংঘ? নাপাম বোমার চিহ্ন এখনো বয়ে বেড়ায় ভিয়েতনামিরা। নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ার ঘৌতায় ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করেছে। এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কে মানল? রাশিয়া তো নিরাপত্তার পরিষদের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিল। কিন্তু ঘৌতায় হামলা থামেনি। রাশিয়া পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির সুযোগ দিয়েছিল। জঙ্গি বা বিদ্রোহীরা কি সেই সুযোগে জনসাধারণকে বের হতে দিয়েছে? ঘৌতার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিষদের থেকে রাশিয়া বা জঙ্গিরা অধিক শক্তিশালী। সিরিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করতে না পারা, রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ বন্ধ করতে না পারলেও লিবিয়া বা ইরাকে সিভিলিয়ানদের রক্ষা ও গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র ধ্বংসের নামে ইরাকে, সোমালিয়ায় যুদ্ধের আয়োজন করে দিয়েছে জাতিসংঘ। ন্যাটো জোটকে বিশ্বের যত্রতত্র যুদ্ধের বৈধতাও দিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের ‘প্রোটেকশন অব সিভিলিয়ান’ ও বিভিন্ন প্রস্তাবের সুবিধা নিয়ে যুদ্ধবাজ জর্জ বুশ-টনি ব্লেয়াররা বারুদের গন্ধে বিষিয়ে দিয়েছে দজলা ও ফোরাতের পানি। দজলা ও ফোরাতের রক্তাক্ত দরিয়ায় বুশ-ব্লেয়ারের কুৎসিত চেহারা এখনো ভেসে ওঠে। জাতিসংঘ লিবিয়া ও ইরাকে সিভিলিয়ানদের রক্ষায় যতটা আগ্রহী মিসরের ক্ষেত্রে ততটা নয়। তাই জেনারেল সিসির মিসরে পাঁচ বছরে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ গুম হয়ে গেলেও জাতিসংঘের সিভিলিয়ান রক্ষার কথা মনে পড়ে না। কারণ পশ্চিমাদের স্বার্থ। জাতিসংঘ কি শেষ পর্যন্ত লিগ অব নেশনের (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে গঠিত) পরিণতি ভোগ করবে? আন্তরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কি জাতিসংঘ ব্যর্থ?
অকার্যকর হয়ে বা ভেঙে যাবে? জাতিসংঘ কার্যত বিশ্বের ক্ষমতাধর শক্তিগুলোর ভাগ-বাঁটোয়ারার সংঘে পরিণত হয়েছে। সেই সংঘে বসে ক্ষমতাধরা বিশ্বের কোন অংশের নিয়ন্ত্রণ নেবে, সেই ফয়সালা করা হয়। তাই কাশ্মীর সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারেনি এই প্রতিষ্ঠান। চোখের সামনে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো। সেই ফিলিস্তিনকেই এখন জাতিসংঘে গিয়ে আরজি জানাতে হয়, আমি সন্ত্রাসী না। আমরা নিজ ভূমির অধিকারের জন্য লড়াই করছি। বরং জাতিসংঘ দখলদার ইসরায়েলের পক্ষেই যেন কথা বলে। হামাস বা ফাতাহ সন্ত্রাসী সংগঠন কিনা নিরাপত্তা পরিষদে সেই নিয়ে বিতর্ক হয়। কিন্তু চোখ বেঁধে ফিলিস্তিনের প্রতিবাদী কিশোরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলাই বারণ। এতে আবার অ্যান্টিসেমেটিক তকমা পাওয়ার ভয় আছে। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময়ও সাক্ষীগোপালের ভূমিকায় ছিল জাতিসংঘ। বসনিয়ার সেব্রেনিতসায় সারা বিশ্বের সামনে গণহত্যা পরিচালনা করল সার্বরা। জাতিসংঘ বসে বসে দেখল। অভিযোগ রয়েছে জাতিসংঘর শান্তিরক্ষী বাহিনী সার্ব বাহিনীকে জ্বালানি তেল দিয়ে সহায়তা করেছিল। এখন আবার সেই সার্বদেরই ধরে ধরে সাজা দেওয়া হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, সার্বরা যদি গণহত্যার দায়ে সাব্যস্ত হয়, তবে সার্বদের জ্বালানি তেল দিয়ে সহায়তা করার জন্য গণহত্যায় সহযোগিতার দায়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী ডাচ সেনারা দোষী সাব্যস্ত হবে না কেন?
এই প্রশ্ন তোলার এখনই উপযুক্ত সময়। সিরিয়ার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় জাতিসংঘের ব্যর্থতা ও একচোখা আচরণকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘ কেন সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারছে না? জাতিসংঘের পক্ষে আসলে জনসাধারণকে রক্ষা করা সম্ভবও না। জাতিসংঘ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই ধারণ ও বাস্তবায়ন করে। বিশেষভাবে, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের অপ-ইচ্ছাকে বৈধতা দানের সুশীল রূপ হচ্ছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী শক্তির বৈশ্বিক জোট। যদিও প্রতিষ্ঠাকালে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিগ্রহ এড়িয়ে শান্তি স্থাপনের জন্য এই আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রতিষ্ঠা। কার্যত এটি ছিল বিজয়ী শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আইনগত এক প্রক্রিয়া। আধিপত্য বিস্তারে সারা বিশ্বের সম্মতি আদায়ের ক্ষেত্র হচ্ছে জাতিসংঘ। নিরাপত্তা পরিষদ হচ্ছে সেই ক্ষেত্র, যেখানে ভোটো ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাধরদের দাপট সবাই মেনে নিয়েছে। বস্তুত, জাতিসংঘের গঠনকাঠামোতেই ত্রুটি রয়েছে। জাতিসংঘ আদৌ কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়। বিশ্ব মোড়লদের পাস কাটিয়ে কিছু করার ক্ষমতা জাতিসংঘে রাখা হয়নি। সিরিয়া সংকটের কথাই ধরা যাক। জাতিসংঘের পক্ষে সম্ভব হবে না বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আবরোধ আরোপ করা। কারণ, এতে রাশিয়া ভেটো দেবে। আবার জঙ্গি-বিদ্রোহীদের দমনে বাশারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করাও জাতিসংঘের পক্ষে সম্ভব না। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেন ভেটো দেবে। বাস্তবতা হচ্ছে, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইসরায়েল নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে সিরিয়ার ফ্রন্টে প্রকাশ্যে বা গোপনে লড়াই করছে। এই দেশগুলোর মোক্ষ লাভের পরই যুদ্ধ থেমে যাবে। এই লড়াইয়ে কেউ জিতবে। কেউ হারবে। বা কেউই হারবে না। যুদ্ধবাজদের মধ্যে সন্ধি হবে। শান্তি আসবে। এরিক মারিয়া রেমার্কের মত কেউ লিখবে ‘সিরিয়া রণাঙ্গন সম্পূর্ণ শান্ত’। বা অ্যানা ফ্রাংকের মতো কেউ ডায়েরিও লিখতে পারে। জাতিসংঘ সিরিয়ার পুনর্গঠনের মহাযজ্ঞে নেমে পড়বে। তবে যুদ্ধবাজদের কাছে হেরে যাবে আইলান কুর্দিরা। আইলান কুর্দিদের স্মরণে হাজার হাজার স্মৃতির মিনার নির্মাণ হবে। গ্রীষ্ম বা বসন্তে ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে আলেপ্পো, হোমস, ঘৌতার সেই সৌধগুলো। কিন্তু আইলান কুর্দিরা নিশ্চিত করেই ওপার থেকে এসব যুদ্ধ, ফুল, মিনার, পুনর্গঠনের তামাশা দেখে উপহাস করবে। তাই সময় হয়েছে জাতিসংঘের পুনর্গঠন নিয়ে ভাবার। উপহাস থেকে দায়মুক্তির।
ড. মারুফ মল্লিক, রিসার্চ ফেলো, সেন্টার কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি।

মায়ের কঙ্কালের সঙ্গে ৩০ বছর ধরে বসবাস

পাশের ফ্ল্যাটে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। এমন আশঙ্কা থেকে সম্প্রতি ইউক্রেনের মেকোলাইভ শহরের পুলিশের কাছ ফোন করেছিলেন প্রতিবেশীরা। খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান অফিসাররা। ফ্ল্যাটের দরজা খোলার পর দেখতে পান মেঝেতে পড়ে আছেন ৭৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধা। আর পাশের ঘরের  শায়িত অবস্থায় আছে একটি কঙ্কাল। এটির চারপাশে ধর্মীয় মূর্তি রাখা  ছিল। পুরো বাড়ি ছিল আবর্জনায় ভরতি। সঙ্গে অনেক খবরের কাগজও রাখা ছিল। কঙ্কালটি  ছিল সাদা পোশাকে মোড়ানো। এটির পায়ে ছিল নীল রঙের জুতা আর সবুজ মোজা। বৃদ্ধা জানান, কঙ্কালটি তার মায়ের। ৩০ বছর আগে যার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ যখন ওই বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে তখন তিনি অনেক অসুস্থ ছিলেন। পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওই বৃদ্ধা পরে পুলিশকে জানান, তার মায়ের ৩০ বছর আগে মৃত্যু হলেও তিনি বিশ্বাস করেন এখনও বেঁচে আছেন তার মা। প্রতিবেশীরা জানান,বয়স্ক ওই নারী একাই থাকতেন। কারও সঙ্গে মিশতেন না। নিজের ঘরের সামনের দরজাও পুরোপুরি খুলতেন না কখনও। যা পেনশন পেতেন তা দিয়েই চলতেন। প্রতিবেশীরা কখনও কখনও দয়া পরাবশ হয়ে তার দরজার সামনে খাবার রেখে যেত। কয়েক বছর আগে ওই বৃদ্ধা পা দুইটি অসাড় হয়ে যায়। এরপর থেকে হুইলচেয়ারেই চলাফেরা করতেন তিনি। কিন্তু কয়েকদিন আগে সে শক্তিটুকুও হারান। কিন্তু তারা কেউ কল্পনাই করেননি বৃদ্ধা এত বছর ধরে ঘরে মায়ের কঙ্কাল নিয়ে বসবাস করছেন। ইউক্রেন পুলিশ কঙ্কালটি উদ্ধার করে ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য পাঠিয়েছে। এই নিয়ে একটি পুলিশ ফাইলও খোলা হয়েছে। ওই বৃদ্ধাকে আপাতত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে তাকে সারিয়ে তুলতে মনোবিদের সাহায্য নেয়া হবে জানিয়েছে ইউক্রেন পুলিশ।
সূত্র : মেইল অনলাইন, মিরর

শীর্ষ ২৫ খেলাপির কাছে দশ হাজার কোটি টাকা

দেশের শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। এ টাকা আদায়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শীর্ষ ২৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৬৯৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে অংশ নেন সদস্য নাজমুল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান, ফরহাদ হোসেন এবং আখতার জাহান। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো তাদের অসহায়ত্বের কথা বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি ঘোষণা করা হলে, তারা আদালতে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসে। ফলে ব্যাংকগুলোর কিছুই করার থাকে না। আদালতের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কমিটির পক্ষ থেকে এসব ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং খাত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে একটি কমিটি করতে বলা হয়েছে। ওই কমিটিকে আগামী দেড় মাসের মধ্যে করণীয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা ঋণ নিয়েছে, তাদের পারিবারিক পরিচয়সহ বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিটি খেলাপি ঋণ কমাতে সংশ্নিষ্ট আইন পরিবর্তনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, শীর্ষ ২৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের দাদা ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইলিয়াছ ব্রাদার্স। আলোচিত এ প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ৮৮৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আসবাব প্রতিষ্ঠান অটবির মালিকানাধীন যশোরের নওয়াপাড়ার কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেমসের কাছে আটকে আছে ৫৫৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপের মালিকানাধীন জাসমির ভেজিটেবল অয়েল ৫৪৮ কোটি টাকার খেলাপি। ঋণ কেলেঙ্কারিতে আলোচিত হলমার্ক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের কাছে পাওনা ৫২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। মাদারীপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বেনেটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ৫১৭ কোটি টাকা খেলাপি। পরিবহন কোম্পানি টিআর ট্রাভেলসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ট্রেডিং হাউজের কাছে পাওনা ৪৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের কাছে ৪৭৪ কোটি ৩৭ লাখ,
সিদ্দিক ট্রেডার্সের কাছে ৪২৮ কোটি ৫৭ লাখ, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজের কাছে ৪১৪ কোটি ৮০ লাখ, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেডের কাছে ৪০১ কোটি ৭৩ লাখ, লিজেন্ড হোল্ডিংসের কাছে ৩৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। হলমার্ক ফ্যাশনের ৩৩৯ কোটি ৩৪ লাখ, খাতুনগঞ্জের জয়নাল আবেদীনের ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের কাছে ৩৩৮ কোটি ৭৪ লাখ, বিএনপির সাবেক এমপি হারুনুর রশিদ খান মুন্নুর মালিকানাধীন মুন্নু ফেব্রিক্সের কাছে ৩৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকার খেলাপি। এ ছাড়া ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিক্স ৩২২ কোটির টাকার ঋণ শোধ করেনি। শাহারিশ কম্পোজিট টাওয়েল লিমিটেড ৩১২ কোটি ৯৬ লাখ, নূরজাহান সুপার অয়েল ৩০৪ কোটি ৪৯ লাখ, কেয়া ইয়ার্ন ২৯২ কোটি ৫৩ লাখ, সালেহ কার্পেট মিলস ২৮৭ কোটি ১ লাখ, ফেয়ার ইয়ার্ন প্রসেসিং ২৭৩ কোটি ১৬ লাখ, এসকে স্টিল ২৭১ কোটি ৪৮ লাখ, চৌধুরী নিটওয়্যার ২৬৯ কোটি ৩৮ লাখ, হেল্প লাইন রিসোর্সেস ২৫৮ কোটি ৩০ লাখ, সিক্স সিজন অ্যাপার্টমেন্ট ২৫৪ কোটি ৫৭ লাখ ও বিসমিল্লাহ টাওয়েলস ২৪৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার খেলাপি। এদিকে সংসদীয় কমিটি শেয়ারবাজার নিয়েও আলোচনা করেছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্য ফরহাদ হোসেন। তিনি জানান, সামনে নির্বাচনের বছর, এই সময় পুঁজিবাজারে যাতে কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১০ সালে যেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গিয়েছিল সে সব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভারত ও চীনের দুটি কনসোর্টিয়ামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে 'কৌশলগত' ও 'ভূ-রাজনৈতিক' বিষয় বিবেচনা করার জন্য বলা হয়েছে। এদিকে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কার্যকর ও সুষ্ঠু শেয়ারবাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে আধুনিক সার্ভেইলেন্স সিস্টেম সংযোজন এবং সুপারভিশন ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার ফলে শেয়ারবাজারের বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই বলে কমিটিকে জানানো হয়। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নামে-বেনামে নানা ধরনের সার্ভিস চার্জ আদায়, ক্রেডিট কার্ডে অতিরিক্ত সুদহার, সুপ্ত চার্জ আদায়সহ গ্রাহকদের নানা ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখে আগামী বৈঠকে প্রতিবেদন প্রদানের সুপারিশ করা হয় বৈঠকে। বাজারে চালসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

রক্তচাপ কমাতে যা প্রয়োজন

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হদরোগে আক্রান্ত হওয়া এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে।একারণে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ আছে এমন কারো যদি ওজন বেশি থাকে তাহলে প্রথমেই তা কমানোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য উচ্চ ক্যালরিসম্পন্ন খাবার পরিহার করতে হবে। যত বেশি সম্ভব ফলমূল আর শাকসবজি খেতে হবে।
সেই সঙ্গে প্যাকেটজাত খাবার পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে যে খাবারগুলিতে বেশি পরিমান কার্বোহাইড্রেট, চিনি, ফ্যাট এবং লবণ থাকে- সেগুলি এড়িয়ে চলাই ভালো। যথাসম্ভব অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে। ক্যাফেইন জাতীয় খাবার থেকেও সাবধান থাকতে হবে। শুধু খাদ্যাভাসে পরিবর্তন নয়, উচ্চ রক্তচাপ কমাতে নিয়মিত ব্যয়াম করাটাও জরুরি। নিয়মিত ব্যায়াম আর পরিমিত খাদ্যাভাস ওজন কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন কমপক্ষে আধঘণ্টা করে সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন হাঁটা কিংবা ব্যায়াম করা উচিত। উচ্চ রক্তচাপ কমানোর অন্যতম প্রধান শর্তই হলো চাপমুক্ত থাকা। এজন্য যোগব্যায়াম কিংবা মেডিটেশন করতে পারেন। হালকা ধরনের গান কিংবা টিউন শুনতে পারেন নিজেকে চাপমুক্ত রাখতে। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শারীরিক পরিশ্রমের মতোই শরীরের জন্য সহায়ক। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর -এটা সবারই জানা। ধূমপান করলে উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধূমপান পরিহার করতে হবে।
সূত্র : ওয়েব এমডি

হঠাৎ কেটে গেলে যা করবেন

রান্নাঘরে কাজের সময়,শিশুরা খেলতে গিয়ে কিংবা যে কারও কেটে গিয়ে রক্তপাত হতে পারে। এ ধরনের দুর্ঘটনা হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘরোয়া উপায়ে চিকিৎসা নেয়া উচিত।  বাড়িতে হলুদের গুড়া থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তা ক্ষতস্থানে লাগান। এতে রক্তপাত থেমে যাবে এবং সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।
আপেল সিডার ভিনেগার ক্ষত সারাতে ভাল কাজ করে। রক্তপাত বন্ধ করতে কিংবা ব্যথা সারাতে কেটে যাওয়া স্থানে এটি ব্যবহার করতে পারেন।  এমনিতে বেশি চিনি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু ক্ষতস্থানে চিনি লাগালে তা দ্রুত কাজ করে। তবে ১৫ মিনিটের মধ্যে তা ধুয়ে ফেলা উচিত।  কেটে যাওয়া ক্ষত সারাতে মধু অ্যান্টিব্যাক্টিরিয়াল হিসেবে কাজ করে। এটি সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এমনকি পুড়ে যাওয়া ক্ষত সারাতেও মধু বেশ উপকারী।  পোকামাকড়ের কামড়ে ক্ষত সৃষ্টি হলে কিংবা শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে আক্রান্ত স্থানে টি ব্যাগ চেপে ধরত পারেন। এটা তাৎক্ষণিক রক্তপাত বন্ধ হতে সাহায্য করবে।

ত্বকের যত্নে ভিটামিন সি

ভিটামিন সি ত্বকের জন্য অত্যন্ত জাদুকরী। যুক্তরাষ্ট্রের 'অরেগন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে'র একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, ভিটামিনে সি-তে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় এটি সূর্য রশ্মিতে পুড়ে যাওয়া, কালো হওয়া ত্বকের লাবণ্য ফিরিয়ে আনে এবং ত্বকে বয়সের ছাপ পড়া  রোধ করে।  ত্বকে ভিটামিন সি পৌঁছানোর কয়েকটা উপায় রয়েছে। বাজারে ভিটামিন 'সি' সমৃদ্ধ অনেক ধরনের ফেসওয়াশ, টোনার এবং ময়েশ্চেরাইজিং ক্রিম পাওয়া যায়। এগুলো ত্বকে ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে ত্বকে ভিটামিন সি পৌঁছানোর আরও কয়েকটি উপায় আছে। সকালে উঠে এক গ্লাস পানির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে পারেন।
এটা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বকও মসৃণ রাখে।  ত্বক ভালো রাখতে প্রচুর ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। এর মধ্যে ফুলকপি, আনারস, স্ট্রবেরি, ব্রকলি -এগুলো উল্লেখযোগ্য। এসব ছাড়া কমলাতেও প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখলে তা ত্বক এবং শরীরের উপকার করবে।  এছাড়া ত্বকে ভিটামিন সি পৌঁছানোর জন্য এক চা চামচ অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে দুই টেবিল চামচ লেবুর রস যোগ করুন। তারপর তাতে দুই টেবিলচামচ গোলাপ পানি মিশিয়ে স্প্রে বোতলে ভরে তা ফ্রিজে রেখে দিন । মিশ্রণটি প্রতিবার মুখে স্প্রে করার আগে ভালভাবে ঝাঁকিয়ে নিন।নিয়মিত ব্যবহারে এটি আপনার ত্বক মসৃণ আর টানটানে রাখতে সাহায্য করবে।
সূত্র : এনডিটিভি

জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র by ড. নিয়াজ আহম্মেদ

জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যাই থাকুক না কেন, প্রকৃত জাতীয়তাবাদ হলো সেই বোধ, যেখানে ব্যক্তি রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ প্রশ্নে একাত্মবোধ করে; রাষ্ট্রের ভালোকে নিজের ভালো, রাষ্ট্রের মন্দকে নিজের মন্দ মনে করে। জাতীয়তাবাদের বোধ বিবেচনায় এবং এর ভালো-মন্দের বিচার ও স্বীকারোক্তি জাতিকে শক্তিশালী ও উজ্জীবিত করতে সহায়তা করে। মন্দের গঠনমূলক সমালোচনা এবং এ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেওয়া প্রতিটি জাতীয়তাবাদী নাগরিকের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এখানে ব্যক্তির কথা বলা হলেও ব্যক্তি রাষ্ট্র, সরকার কিংবা রাজনৈতিক দল থেকে আলাদা নয়। ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য নাও হয়, তাতে ক্ষতি নেই। তার নিজস্ব মতামত প্রকাশ জাতিবোধকে জাগাতে ও সক্রিয় করতে সহায়তা করে। মূলত এ প্রশ্নে ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলার মধ্যে সত্যিকার জাতীয়তাবোধ লুক্কায়িত থাকে। বিপরীত অবস্থা রাষ্ট্রের নিজের জন্য বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর। সাধারণ জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবোধের প্রকাশ না ঘটলেও অর্থাৎ ভালো-মন্দের প্রকাশবোধ না থাকলে ক্ষতি কম। কেননা, তারা হয়তো প্রকাশের কোনো ফোরাম পায় না; কিন্তু রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী গোষ্ঠী প্রকাশ না করলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, এর সঙ্গে গণতন্ত্রেরও সম্পর্ক রয়েছে। গণতন্ত্রকে নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বিরূপ মন্তব্য রয়েছে। কেউ গণতন্ত্রকে এতটাই অপছন্দ করে বলেছেন, গণতন্ত্রের লেবাস পরে একটি সরকার বৈরী আচরণ করতে পারে। তবে এমন সুযোগ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হতে পারে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টেকসই, মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং বারবার ক্ষমতায় আসতে হলে গণতন্ত্রের লেবাস পরে বৈরী আচরণ করা  দুরূহ ব্যাপার। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেখানে গণতন্ত্রের উপস্থিতির পরিবর্তে স্বৈরতান্ত্রিক অথবা একনায়কতন্ত্রের প্রকাশ পাবে। সরকার বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এথেন্সে ছিল বিধায় নাগরিকদের মধ্য থেকে দৈবচয়নের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ করা হতো। তাদের বিচারে সক্রেটিসের ফাঁসি দেওয়া হয়। এমন গণতন্ত্রেরও খারাপ দিক রয়েছে। প্রাচ্যে নগররাষ্ট্রের উদ্ভবের মধ্য দিয়ে সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সরকার যা খুশি তা যেন করতে না পারে সে জন্য ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আনয়নের প্রয়োজন অনুভব করা হয়। জনগণের অধিকার আদায় এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য পার্লামেন্ট, সিনেট এবং স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব ঘটে। লক্ষ্য ছিল নিয়ন্ত্রণ আরোপ। কেননা, রাষ্ট্র ও সরকার যেন কোনোভাবেই জনগণের অধিকার আদায়ে বৈরী ও অগণতান্ত্রিক আচরণ না করে। সে অনেক আগের কথা। এখনকার সমাজ ও রাষ্ট্রে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। আগের প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে আছে, পাশাপাশি নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে; কিন্তু গণতন্ত্রের ঝুঁকির কথা যা দার্শনিকরা অনেক আগে বলে গেছেন, তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। সমস্যা দেখা দেয় যখন জাতীয়তাবাদের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক আমরা খুঁজে না পাই। প্রথমত, মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের ভালো-মন্দের সঙ্গে ব্যক্তির ভালো-মন্দের গভীর সম্পর্ক। কেননা, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র আলাদা সত্তা নয়। রাষ্ট্রের ভালোকে স্বীকার না করলে রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নেই, তবে স্বীকার না করা এক প্রকার অন্যায়। কিন্তু দোষ-ত্রুটিকে ধরিয়ে দেওয়া ও গঠনমূলক সমালোচনা করা শ্রেয় এবং তা না পারা রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার শামিল।
গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে আমরা বিকৃত ও নগ্ন সমালোচনাই বেশিরভাগ সময় লক্ষ্য করি। সরকারের সফলতাকে প্রকাশ করলে সরকার সফল ও তাদের সুনাম বৃদ্ধি পাবে- এমন ধারণা থেকে প্রশংসা করা হয় না। কিন্তু সাধারণ জনগণ কোনো না কোনোভাবে সফলতার কথা বলতে পারেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে এখানে সরকারের কল্যাণ ও ভালোর দিক বিবেচনা, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদকে বিবেচনায় আনার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করা হয়। দেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, বাড়ছে কর্মসংস্থানও; জনগণের সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতা  ক্রমে বিস্তৃতি লাভ করছে। কিন্তু তা স্বীকার করায় যেন কোথায় বাধা। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বীকার না করার প্রবণতা বেশি। সাধারণ মানুষের প্রকাশের ভঙ্গি ভিন্ন। কোনো ফোরাম না থাকা, সরাসরি রাজনীতি না করলেও মতাদর্শ থাকা ইত্যাদি কারণে তাদের প্রকাশভঙ্গি আলাদা। আবার কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি কারও কারও এমন বিরূপ ধারণা যে, অনেক ভালো কাজ করলেও তারা ভালো নয়। এর কারণ হতে পারে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের আদর্শ ও মতাদর্শ কোনোভাবেই পছন্দনীয় নয়। অথচ এমন আদর্শ ও মতাদর্শের সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলি, তখন এরই নামান্তর খুঁজে পাই। এমন আদর্শের কথা বলি, যা অসাম্প্রদায়িক, সার্বজনীন ও ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবেব প্রকাশ ঘটায়। জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র তখনই পরিপকস্ফ ও বিকশিত হয়, যখন আমরা ভালো-মন্দ এবং কল্যাণ-অকল্যাণকে নির্দি্বধায় স্বীকার করতে পারি। শুধু মন্দকে নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা এবং ভালোর কথা একদম না বলা সঠিক নয়। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার কোনো না কোনো ভালো কাজ করে আসছে। যদি তাই না হতো তাহলে দেশের অগ্রগতি এতটা দ্রুত হতো কিনা সন্দেহ। কোনো সরকার বেশি কাজ করেছে, অন্যরা কম করেছে। কল্যাণ ও অকল্যাণ প্রশ্নে এমনটা স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তন আনয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে কোনো বিশেষ সরকারের অবদান বেশি এবং অনস্বীকার্য। তাদের প্রয়োজনীয়তা এতটাই বেশি, যদি আমরা এমন রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। এমন সরকারের বিকল্প এমন সরকার। এখন আমাদের করণীয় কীভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও পরিবেশকে শক্ত, মজবুত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করা যায়। হাত গুটিয়ে বসে থাকা কিংবা স্রেফ গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে উদ্ভট ও অস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে কখনও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারবে না।
আমরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করব কিন্তু প্রদানকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞ হবো না, রাষ্ট্রীয় নীতি ও পরিকল্পনার সুফল পাব কিন্তু তা স্বীকার করব না; তাহলে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হবে কীভাবে? আর মন্দ সম্পর্কে গঠনমূলক সমালোচনা এবং গঠনমূলক উত্তরণের পথ ভাবনায় আসবে না, তাও ঠিক নয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও সচেতন নাগরিককে ভাবতে হবে যদি আমরা সত্যিকারভাবে জাতীয়তাবাদকে  ধারণ, লালন ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তাহলে আমাদের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ধারক ও বাহকের ক্ষেত্রে কোনো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। দ্বিমতের অর্থ জাতিকে বিভক্ত হিসেবে দেখা। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালনে কোনো দ্বিমত থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সব দিবস পালন না করা এবং কোনো কোনো দিবস নিয়ে কটাক্ষ করা  বাংলাদেশ নামক দেশ ও মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা। আমাদের গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও প্রগতি; যা-ই বলি না কেন, এর প্রতিটির সঙ্গে এগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আপনি মনে-প্রাণে এগুলোকে বিশ্বাস করেন তো দেশের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবতে পারবেন। দ্বিধাহীনভাবে গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারবেন। ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলতে পারবেন। প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তি ও সরকারকে বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোকে এমন রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে সামনে এগোতে হবে। নইলে দেশ এগিয়ে যাবে আর বিরুদ্ধ চেতনায় দীক্ষিত রাজনৈতিক দলগুলো পিছিয়েই থাকবে।
অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
neazahmed_2002@yahoo.com

ইউজিসির পদক্ষেপ যেন ব্যর্থ না হয় by ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালন ব্যয়ের মঞ্জুরি প্রদানের কাজটি করে আসছিল। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে মঞ্জুরি না দিলেও সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ ভার ইউজিসির ওপর এসে পড়েছে। তবে অনিয়ম খুঁজে পেলেও নিজে শাস্তি প্রদান করতে পারে না, কেবল ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে। প্রশাসনিক ক্ষমতা ঘাটতির কারণেই কি ইউজিসি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও অনেক পদক্ষেপ ও নীতিমালা কার্যকর করতে পারছে না? গত দশকে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদিত পদের বাইরে যথেচ্ছা শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের সংস্কৃতি দৃশ্যমান ছিল। কয়েক বছরে অবশ্য ইউজিসি সে প্রবণতা বেশ কমিয়ে আনতে পেরেছে। তার গৃহীত ও আশু পদক্ষেপগুলোতে যে অসঙ্গতি ও সমস্যা দূরীকরণ প্রাধান্য থাকছে, তা নিয়ে বিতর্ক নেই। ২০০৯ সালে প্রণীত প্রথম নিয়োগ ও পদোন্নতির অভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়নি, গত বছর নতুন করে অনুমোদিত নীতিমালাটিও প্রত্যাখ্যাত হলো। এখন চলছে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা, যেটা ব্যর্থ হলে গণমানুষের মধ্যে ইউজিসির সক্ষমতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে পারে। ইউজিসির প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ানো প্রশ্নে কারও আপত্তি থাকার কারণ নেই। তাই ২০১২ সালে সরকার এটাকে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তর করার পদক্ষেপ নিয়েছিল। তারপর প্রস্তাবিত আইনে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশলগুলো বেশ সমালোচনা হয়েছে। সে পরিক্রমায় পাঁচ বছর আগে তৈরি খসড়া আজ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়নি। এখানে অবশ্যই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নীতিতে উচ্চশিক্ষা কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। আইনটি প্রণীত হলে কমিশন আকারে ইউজিসি হয়তো কার্যকরী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ পাবে। তবে কমিশনের চেয়ারম্যানকে মন্ত্রী কিংবা সদস্যদের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েই যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হবে, সেটা বলা যাবে না। ইতিপূর্বে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পেয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান কতটা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন? কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে প্রত্যেক উপাচার্যের অল্পবিস্তর স্বাতন্ত্রতা থাকে। জ্ঞান সৃজন ও রাজনৈতিক পুঁজি- এই দুই পরিবর্তনের সংমিশ্রণে ভিন্নতা থেকেই অনন্য প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। গুণমানের উত্তরণকল্পে হলেও পরিবর্তনকালে ইউজিসিকে মনে রাখতে হবে যে, প্রায় নিয়ন্ত্রণ অনুপস্থিত সংস্কৃতি থেকে অতি দ্রুত পূর্ণ নিয়ন্ত্রক হওয়া সহজ হবে না।
ইউজিসি বর্তমানে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা চালু করতে কাজ করছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমসিকিউ পদ্ধতিতে আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে। ভর্তি কার্যক্রম বিদেশেও আলাদা দেখেছি। নতুন পদ্ধতিতে মেডিকেল কলেজগুলোর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণ, কৃষি, প্রকৌশল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি আলাদা গুচ্ছ ধরে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু করার লক্ষ্যে ইউজিসি চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠকে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্য মহোদয়ও আহ্বান করেছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ভর্তিচ্ছুদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণজনিত ব্যয় ও শ্রম হ্রাসের যুক্তিতে প্রক্রিয়াটি অবশ্যই সমর্থনযোগ্য। তবে মেডিকেল কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পার্থক্যটা হলো, মেডিকেলের বিষয় নয় শুধু কলেজ নির্বাচন করতে হয়। আর পঠিতব্য বিষয়ের গুরুত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে শিক্ষামানের বিষমসত্ততার মধ্যে নির্বাচনে সঠিক কারিগরি প্রক্রিয়া নির্ধারণে শঙ্কা থাকছে। বাজারে বিষমসত্ততার নানারূপ তথ্য থাকলেও নির্দেশনা দেওয়ার মতো আমাদের কোনো র‌্যাংকিং আছে কি? অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণে কারিগরি জটিলতার চেয়ে অধিক শঙ্কার জায়গা হবে প্রশ্ন ফাঁস। কয়েক বছরে সমালোচনার শীর্ষে আছে পাবলিক পরীক্ষার সব পর্যায়ে প্রশ্ন ফাঁস। এবার তো এসএসসি পরীক্ষার সব প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে! তার সঙ্গে মেডিকেলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের খবরও আছে। ভর্তির প্রশ্ন ফাঁসে ব্যাপকতা কম হলেও এ কাজে আর্থিক প্রণোদনা অতি বেশি থাকায় প্রবণতা বাড়ছে। কোনো ছাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া মানে মাসসম্মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত আট-দশ লাখ টাকার খরচ বেঁচে যাওয়া। সেই সঙ্গে শিক্ষামানের পার্থক্যের প্রসঙ্গও যুক্ত হবে। তাই ফাঁস প্রশ্নের চাহিদা এতই বেশি যে, কেউ দু-চার লাখ খরচ করেও লাভ থাকে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন ফাঁস এখনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর্যায়ে রয়েছে বলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ বহুলাংশে থাকছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় স্বচ্ছভাবে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণে সচেষ্ট আছে। কিন্তু গুচ্ছ পদ্ধতিতে প্রশ্ন ফাঁস হলে অসচ্ছল পরীক্ষার্থীদের সহজ অংশগ্রহণ ও খরচ বাঁচানোর লাভের চেয়ে ক্ষতিটা কি অতুলনীয় হবে না? দেশে সার্বিক প্রশ্ন ফাঁস দমনে কুচক্রী মহলের ওপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না আসা পর্যন্ত গুচ্ছ পদ্ধতির প্রক্রিয়া থেকে সরে আসাটাই সমীচীন হবে বলে মনে হয়। ভাবতে হবে, স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন পেয়ে বিত্তবান ও বখাটেদের নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার সুযোগ বাড়বে কিনা? আর কুচক্রী মহল প্রশ্ন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাধারণ ব্রেন্ডিং কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? অন্যদিকে অভিন্ন পরীক্ষা গ্রহণ কার নেতৃত্বে কীভাবে হবে ঠিক করাটাও কঠিন হবে। ইউজিসির যেহেতু এমন পরীক্ষা গ্রহণে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাই নেতৃত্ব নিলেও সহজে বাস্তবায়ন করতে পারবে কি? ইউজিসির কার্যাবলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে গণমানুষ এখনও প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতা সম্পর্কে অবহিত নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক্রমে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের মতো ইউজিসির অবস্থান তলানিতে নামুক, সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই ভর্তি কার্যক্রমে নয় বরং উচ্চশিক্ষায় গতিশীলতা আনয়নে ইউজিসির আশু সফলতা বেশি কাঙ্ক্ষিত। ইতিমধ্যে প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদে সেরা ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক প্রচলন করে ইউজিসি প্রশংসিত হয়েছে। স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর প্রবণতা রোধকরণ হতে পারে আরেকটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এদিকে ইউজিসিকে কমিশন বানাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগে পদ সৃষ্টি, যোগ্যতা নির্ধারণ ও নিয়োগে মন্ত্রণালয় কর্তৃত্ব নিতে সচেষ্ট বলে অভিযোগ আছে। ইতিমধ্যে দেখা গেছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এবং শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করে সমঝোতার পরও গ্রহণযোগ্য অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি। সেটা যেভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তাতে ইউজিসির নেতৃৃত্বের দুর্বলতা কি দৃশ্যমান হয়নি? ইউজিসি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে অসামঞ্জস্য দূর করতে চায়; তবে শুরুটা হতে পারে অভিন্ন ছুটির তালিকা প্রণয়ন দিয়ে। সেই সঙ্গে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করাটা অতি জরুরি বলে মনে হয়। খুশির খবর হলো, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালুর সময় প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে প্রেষণে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের আনার জন্য ইউজিসি তার বার্ষিক প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে। দেখার বিষয় হলো, সরকারি সাড়া কতটা মেলে। মুখে অনেকে উঁচুমানের গবেষণার কথা বললেও অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকল্পে উঁচুমানের প্রকাশনাধারীকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার তৎপরতা পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। তবু প্রত্যাশা করি, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্ঞানভিক্তিক সমাজ বিনির্মাণে ইউজিসি সফল হোক।
akanda_ai@hotmail.com
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের মর্যাদা, অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে: শেখ হাসিনা

আমি প্রথমেই শ্রদ্ধা জানাই মহান ভাষা আন্দোলনে সকল শহীদকে যাঁরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদেরকে মা বলে ডাকার অধিকার দিয়ে গেছে। শ্রদ্ধা জানাই আমাদের মহান নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। যিনি বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবার আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং যাঁর আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ পেয়েছি। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি, আমাদের জাতীয় চার নেতা এবং ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনকে। জাতির পিতা ১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহর ১২.০১ মিনিটে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, '১৯৫২ সালের আন্দোলন কেবল ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।' ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল। সেখানে ঘোষণা দেওয়া হলো, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত উর্দু। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিল করে তখনকার মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে গিয়েছিল প্রতিবাদ জানাতে। সেখানেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন, তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সভা ডাকলেন। তমুদ্দুন মজলিসসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন মিলে সিদ্ধান্ত নিল ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের, 'ভাষা দিবস' হিসেবে ১১ মার্চ ঘোষণা দেওয়া হলো। তারও পূর্বে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের দিয়ে ছাত্রলীগ গঠন করেছিলেন। ১১ মার্চ ধর্মঘট করতে গিয়ে অনেক নেতা গ্রেফতার হন, সেখানে জাতির পিতাও ছিলেন। আমাদের এখানে দীপু মনির বাবা ওদুদ সাহেবসহ প্রায় ৭০ জনের মতো তখন গ্রেফতার হন অথবা পুলিশের লাঠির বাড়িতে আহত হয়। এরপর মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন সাহেবের ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনা হয়। তিনি ওয়াদা দিয়েছিলেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পার্লামেন্টে তুলবেন। ১৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সভা হয়। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
সেখানে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণ দেওয়া হয়। এই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যাতে জনমত সৃষ্টি করা এবং সংগ্রাম গড়ে তোলার এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ফরিদপুরে যেয়েও গ্রেফতার হন, আবার মুক্তি পান। পরে ঢাকায় ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে ভুখা মিছিল হয়। তখন লিয়াকত আলী খান পূর্ববঙ্গে আসার কথা, সেই সময় এই আন্দোলনে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে গেলেন। তারপর অনেকে মুক্তি পেয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মুক্তি পাননি। কারাগারে থেকেও তিনি যখনই কোর্টে অথবা চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসতেন, তখনই ছাত্রনেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। ছাত্রলীগের তখন সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নইমউদ্দীন সাহেব ও খালেক নেওয়াজ, তাঁদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, একুশে ফেব্রুয়ারি তখন প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট সেশন বসবে, তখন পার্লামেন্ট বসত জগন্নাথ হলের যে হলটা ভেঙে পড়ে গিয়েছিল- আপনাদের মনে আছে ১৫ অক্টোবর, সেখানে প্রাদেশিক পরিষদের বৈঠক হতো। যেহেতু ছাত্রদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে সেই ধরনের নির্দেশনা দেন। সেই সাথে সংগ্রাম পরিষদ আবার গঠন করা হয় ১৯৫২ সালে এবং সেখানে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যেন সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়, সে নির্দেশনাও তিনি দিয়েছিলেন। তিনি দাবি আদায়ের জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন করা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের ন্যাপের মহিউদ্দিন সাহেব (পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতা) অনশন করেন। অনশনরত অবস্থায় তাঁকে ফরিদপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় ওয়াইজ ঘাট থেকে স্টিমার ছাড়ত, নারায়ণগঞ্জে থামত। তিনি আগেই খবর দিয়েছিলেন যে, নারায়ণগঞ্জের নেতৃবৃন্দ যেভাবে হোক ওনার সঙ্গে যেন দেখা করে। সেখানে অনেকের সাথে সাক্ষাৎ হয়, সেখানেও নির্দেশ দিয়ে যান আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। '৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যখন মিছিল বের হয়, গুলি চলে এবং আমাদের শহীদরা রক্ত দিয়ে ভাষা আন্দোলনকে একটা জায়গায় নিয়ে যান। এরপর নির্বাচন হয়। যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলেও সেই সরকার বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকার চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করে সেই সরকার বাতিল করিয়ে ৯২/ক ধারা দিয়ে ইমার্জেন্সি ডিক্লেয়ার করে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবার গ্রেফতার হন। এরপর '৫৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি পাকিস্তানের জন্য প্রথম সংবিধান রচনা করেন। এই সংবিধানে উর্দুর সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ঘোষণা দেয়। '৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল' জারি করেন। তিনি একাধারে সেনাপ্রধান, সেই সাথে নিজেকে রাষ্ট্রপতিও ঘোষণা দেন। সে সময় বলা হয়, বাংলা ভাষা চর্চা করা যাবে না, বাংলায় কথা বলা যাবে না। কবিতাগুলোকেও মুসলমানি ভাষা দিতে হবে; মানে সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। সেটাকে করা হয়েছিল, ফজরে উঠিয়া আমি দেলে দেলে বলি, সারাদিন আমি যেন আচ্ছা হয়ে চলি। এমনকি কবি নজরুলের সেই কবিতা- সজীব করিব মহাশ্মশান, এই মহাশ্মশান থাকতে পারবে না, সেখানে বসানো হলো গোরস্থান। আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা যাবে না, রবীন্দ্রনাথ পড়া যাবে না। আমাদের বাংলা ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা, রফিক স্যার উপস্থিত আছেন, তখন শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ করেছিলেন। আমাদের বাংলা ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন আবদুল হাই স্যার, তাঁকে ডেকে মোনায়েম খান বলেন, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাতে কি আছে? রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কি চলে না ভাষা? হাই স্যারকে ডেকে মোনায়েম খান সাহেব বললেন- কী মিয়ারা, আপনারা বসে খালি রবীন্দ্রসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন। ২-৪ খান রবীন্দ্রসঙ্গীত নিজে লিখে ফেলতে পারেন না! হাই সাহেব খুব ভদ্রলোক ছিলেন- বিনয়ের সাথে বলেছিলেন, স্যার, সেটা তো রবীন্দ্রসঙ্গীত হবে না, আমি লিখলে ওটা তো হাই সঙ্গীত হয়ে যাবে। এই আঘাতটা কিন্তু সেই আমাদের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত, বারবার দেখেছি- কখনও রোমান হরফে বাংলা লিখতে হবে, কখনও আরবি হরফে বাংলা লিখতে হবে। জাতির পিতা যে কথাটা বলেছিলেন, ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার জন্য নয়; এখানে আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ আন্দোলন ছিল। তিনি যে ৬ দফা দিয়েছিলেন, সেটা ছিল বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সোপান। ৬ দফা দেবার সাথে সাথে তাঁকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে, তাঁকে ফাঁসি দিয়ে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রসমাজ, জনগণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটিয়েছিল এবং বাধ্য করেছিল এই মামলা প্রত্যাহার করে তাঁকে মুক্তি দিতে। তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ ৭ মার্চের, যে ভাষণ আজকে বিশ্বঐতিহ্য প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণার সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা বিজয় অর্জন করলাম '৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এরপরে জাতির পিতা মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরে এলেন।
একটা প্রদেশ ছিল বাংলাদেশ, সেটাকে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চলতে শুরু করেছে, দেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। মানুষের ভেতরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে। এই বাংলাদেশে তারা গণহত্যা চালিয়েছে, বাড়িঘর পুড়িয়েছে। ৩ কোটির ওপর মানুষ গৃহহারা ছিল। প্রতিটি শহীদ পরিবার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, আহত মুক্তিযোদ্ধা, লাঞ্ছিত মা-বোন; তাদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা সব ব্যবস্থা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। মিত্রশক্তি ভারতের সেনাবাহিনী যারা আমাদের সাথে ছিল, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, জাতির পিতার অনুরোধে ইন্দিরা গান্ধী তাদেরকে ফেরত নিয়ে যান। বাংলাদেশ একটু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ ভাগ পর্যন্ত অর্জন করতে সক্ষম হই- দুর্ভাগ্য, যে ঠিক তখনই আঘাতটা এলো, জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। একই সাথে গোটা পরিবারের সাথে আমার মেজো ফুপু, সেজো ফুপু, ছোট ফুপু প্রত্যেকের বাড়িতে আক্রমণ করল, প্রতিটি বাড়ির সদস্যকে হত্যা করল। জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করল। ১৫ আগস্টের পর প্রথমে বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। যখন বুঝল, এটা মানুষ গ্রহণ করবে না, তখন সেটা দ্বিতীয়বার উচ্চারিত হয়নি। এরপর ২১ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি, যারা এসেছিল তারা তো অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী। তারা ওই আইয়ুব খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই ক্ষমতায় এসেছে। তারা যেই শক্তিকে আমরা পরাজিত বললাম, তাদেরই প্রতি খোষামোদী, তোষামোদী চাটুকারিতা আমরা দেখেছি। যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন, সেই বিচার মার্শাল অর্ডিন্যান্স দিয়ে বন্ধ করে তাদেরকে মুক্ত করে দল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অনেকে বলেন, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছিল। তাদের বহুদলীয় গণতন্ত্র মানেই তো ওই যুদ্ধাপরাধীদের দল করার সুযোগ দেওয়া, যাদের সাজা হয়েছিল তাদের মুক্ত করা। কাউকে প্রধানমন্ত্রী, কাউকে মন্ত্রী, কাউকে উপদেষ্টা, তাদের হাতে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা তুলে দেওয়া। জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার না করে পুরস্কৃৃত করে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া। ২১ বছর পর আমরা সরকারে আসি। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমরা যখন ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, বহু দেশের বহু জাতির মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। কাজেই সেই মাতৃভাষাগুলোকে সংরক্ষণ করা, সেই মাতৃভাষাগুলোর চর্চা করা, নমুনা রাখা- একটা ভাষা জাদুঘর, আমরা সেই জাদুঘর তৈরি করেছি। এই প্রতিষ্ঠানটার আমি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করি; কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে আমার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট তৈরি হতে দেয়নি। ২০০৯ সালে সরকারে আসার পর আবার সেটা প্রতিষ্ঠা করি। ভাষা জাদুঘর করে দিয়েছি। মনে হয়, সারা বিশ্বব্যাপী আজকে বাংলাদেশেরই দায়িত্ব পড়েছে মাতৃভাষাকে সংরক্ষণ করার। বাংলায় আমরা যখন অনার্স করতাম, তখন ছিল সাবসিডিয়ারি- এখন বলে মেজর আর মাইনর। কিন্তু বাংলা ভাষা নাকি শেখা যায় না, নেওয়া যায় না। আমার মনে হয়, এ বিষয়ে ইউজিসির সাথে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আলোচনা করতে হবে- বাংলা ভাষার প্রতি এই অবহেলা কেন? আর আমরা ব্যাপকহারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছি; কিন্তু সেখানে বাংলা ভাষা শিক্ষা হবে না, বাংলা সাহিত্য শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে না- এটা তো হতে পারে না। কিছুদিন আগে আমাকে একজন একটা বিয়ের কার্ড দিলেন। তিনি সচিব ছিলেন। আমি ধন্যবাদ জানালাম, কার্ডটা বাংলায় রচনা করেছে। এখানে আমার স্যার বা সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সাহেব যা বলেছেন- বিয়ের কার্ড হয় ইংরেজি ভাষায়। অনেকে যখন নিয়ে আসত আমি জিজ্ঞেস করতাম, ইংরেজি ভাষায় কেন? এটা একটা ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে। এই দৈন্যতা কেন দেখাতে হবে? আমার শ্রদ্ধেয় স্যার রফিক সাহেব ও সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সাহেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গেছেন। আমি নোট করে নিয়েছি, অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। অন্য ভাষা শিখতে হবে। বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখতে গেলে আমাকেও অন্য ভাষা শিখতেই হবে। কিন্তু অন্য ভাষা না শিখতে পারলে উন্নত হতে পারব না, এটা বিশ্বাস করি না। জাপানিজরা জাপানিজ ভাষায় কথা বলে। তারা সারাবিশ্বে একসময় সব থেকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত জাতি হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলেছিল। আমাদের ভাষা শহীদরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা দিয়ে গেছে, আমরা সেটা শিখব না কেন? ওনারা ঠিকই বলেছে, সাইনবোর্ডগুলো লেখা হয় ইংরেজিতে। এটা ভাষারই একটা নিয়ম- আদান-প্রদান এটা হয়। কিন্তু মাতৃভাষার চর্চটা তো থাকতে হবে।
যেমন কথা হচ্ছে- উচ্চ আদালতের রায় ইংরেজিতে লেখা হয়। অনেক সাধারণ লোক ইংরেজি ভালো জানে না, তার যে উকিল সাহেব থাকে রায় পড়ে যেটা বোঝায়, সেটাই বুঝতে হয়। এখানে অনেক আইনজীবী আছেন, তারা যেন কিছু মনে না করেন। এখন নিম্ন আদালতে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বাংলা ভাষায় রায় দেয়ার। উচ্চ আদালতেও, আশা করি, নিশ্চয়ই সেটা লিখবে। আরেকটা বিষয়,বাংলা ভাষায় কথা বলি কিন্তু বাংলা অনেকটা ইংরেজি টোনে বলা, কেমন যেন একটু বিকৃত করে বলার একটা চর্চা শুরু হয়ে গেছে। আমরা (দুই বোন) ১৯৭৫-এর পর ৬ বছর বিদেশের মাটিতে থাকতে হয়েছিল। ছেলেমেয়েগুলো বিদেশেই লেখাপড়া শিখতে বাধ্য হয়েছিল, যেখানে বাংলা শেখার এতটুকু সুযোগ ছিল না। কিন্তু আমি রেহানা, আমাদের ছেলেমেয়েরা হোস্টেলে পড়াশোনা করেছে, প্রতি সপ্তাহে বাংলায় চিঠি লিখতাম; ছুটিতে এলে বাংলা শেখাতে চেষ্টা করতাম। তারা বিদেশে লেখাপড়া শিখেও যতটুকু বাংলা বলতে পারে, আমরা তো দেখি যে, বাংলাদেশে থেকে হয়তো ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, তারাও যেন বাংলা বলতেই চায় না, বলতেই পারে না; একটু বিকৃত করে বলে। আমি আবারও বলছি, আমি কিন্তু ভাষা শেখার পক্ষে। সব দেশেই এটা আছে, একটি মাতৃভাষা শিক্ষা আর একটি দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা। এখন দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। গ্রামে বসেই ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন দেশের ভাষা শিখে, অনলাইনে অর্থ উপার্জন করছে। সেই সুযোগটা সৃষ্টি করতে হবে; কিন্তু সাথে সাথে আমার মায়ের ভাষার চর্চা তো থাকতে হবে। পরিবার থেকে উৎসাহিত করতে হবে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আমরা যে কাজগুলো করি, মাঝখানে পথ হারিয়ে যায় ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত। আবার সরকারে আসার পর, আজকে বাংলাদেশে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখা, মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের কাহিনী বলা। অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা বলতে সাহস পেতেন না। সরকারি চাকরির জন্য মুক্তিযোদ্ধা লিখতে সাহস পেতেন না। তাহলে চাকরি পাবে না। কী দুর্ভাগ্য! তখন ছিল রাজাকারদের দাপট। ৯ বছর সরকারে থাকার পরে অন্ততপক্ষে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে আজকে মানুষ গর্ববোধ করে, এখন আর ভীতসন্ত্রস্ত হয় না। এই আত্মবিশ্বাসটা যেন হারিয়ে না যায়। এমন কোনো অন্ধকারে যেন আবার আমরা না পড়ি যে, আবার আমাদেরকে সেই অন্ধকারে চলে যেতে হবে, আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে, সেই পরিবেশ যেন আর কোনোদিন বাংলার মাটিতে না আসে, সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। কারণ যাদের হৃদয়ে পাকিস্তান, থাকে বাংলাদেশে, সবরকম আরাম-আয়েশ, ফল ভোগ করবে এই দেশে, আর অন্তর আত্মাটা পড়ে থাকবে ওই দেশে, তাদের জন্য আবার কাঁদে পাকিস্তান, পেয়ারে পাকিস্তান! এই পেয়ারে পাকিস্তানওলাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষা করে চলতে হবে। এটাই আমার আবেদন দেশবাসীর কাছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ১৫ আগস্টের খুনিদেরকেও পার্লামেন্টে ভোট চুরি করে বসানো হয়েছিল। আর যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে, সাজা কার্যকর হয়েছে, তাদেরকে যারা মন্ত্রী বানিয়েছিল, লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা তাদের হাতে যারা তুলে দিয়েছিল, জাতি যেন কোনোদিন তাদেরকে ক্ষমা না করে। যারা আমার মা-বোনকে রেপ করেছে, যারা গণহত্যা চালিয়েছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, লুটপাট করেছে সেই যুদ্ধাপরাধী আর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে, তাদের বিচারের রায় আমরা কার্যকর করেছি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আমরা নিম্নআয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলাম, আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি অর্থাৎ একধাপ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। বাঙালি জাতি আজকে মর্যাদা পেয়েছে। এই অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে, শহীদদের প্রতি এটা আমাদের অঙ্গীকার, এই অগ্রযাত্রা আমরা অব্যাহত রাখবো।

গুজবে কান দেবেন না... by মাকিদ হায়দার

অনেকেই বলে থাকেন গুজবের হাত-পা, কান বলে কিছুই নেই। ১৯৬৫ সালে শুনেছিলাম, পাকিস্তান ও ভারতের যুদ্ধে পাকিস্তান ভারতের হাজার হাজার সৈনিক হত্যা করেছে। অনেক যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। পাকিস্তানের সৈনিকরা যে কোনো সময় দিল্লি দখল করে নেবে। চা-পান শেষে দিল্লির জামে মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ আদায় করবে। তারপর সমগ্র ভারতকে পাকিস্তান বানানো হবে। পরে শুনেছি, সেটি ছিল গুজব। এটি ছিল মনোবল বাড়ানোর কৌশল। অথচ সেই যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল পাকিস্তান। ১৯৬৯ সালে শুনেছিলাম, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনয়েম খানের কাছে রাওয়ালপিন্ডি থেকে আইয়ুব খানের কোনো টেলিফোন এলেই গভর্নর মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে কাঁপতে নাকি বলতেন, জি আব্বা হুজুর, জি আব্বা। যতক্ষণ প্রেসিডেন্ট সাহেবের কথা শেষ না হতো ততক্ষণ পর্যন্ত গভর্নর সাহেব চেয়ারে না বসে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গভর্নর মোনয়েমকে নিয়ে হাজার রকমের গুজবের ভেতরে আরও ছিল, তিনি কবি জসিমউদ্‌দীনকে নাকি বলেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত রচনা করতে। গুজবের হাত-পা থাকুক বা না-ই থাকুক, ভাসতে ভাসতেই পৌঁছে যায় হাজার মানুষের কানে। অপরদিকে গুজবের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকে দেয়াল লিখন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের আগে শহরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দেয়ালে বিশাল বিশাল হরফে লেখা হয়েছিল- 'শেখ মুজিবের মুক্তি চাই'। কোথাও কোথাও লেখা হয়েছিল চীনের মহান নেতা মাও সে তুং-এর মহান বাণী- (ক) শ্রেণিশত্রু খতম কর, (খ) বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস। গত শতকের আশির দশকে মোহাম্মদপুরের আসাদ গেট পার হতেই হাতের বাঁদিকের বাড়ির একটির দেয়ালে লেখা ছিল- 'এরশাদের চরিত্র/ফুলের মতো পবিত্র।' হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তখন দেশের রাষ্ট্রপতি এবং গণমানুষের আলোচনার মধ্যমণি। দুর্মুখ, দুর্বৃত্তরা বলেছিল, দেয়ালের ওই অমৃত বাণী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরই রচিত; তিনি কাউকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন। মগবাজার থেকে তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তায় আসতে হাতের ডানদিকের একটি দেয়ালে লেখা দেখলাম, যা দেখে আকৃষ্ট হলাম- 'কষ্টে আছে আইজুদ্দীন'। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর অনেক রকম গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা শেষে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেবেন। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে এমনকি এই দশকের গোড়ার দিক থেকেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাড়ির দেয়ালে কে বা কারা লিখেছিলেন- শেখ মুজিব হত্যার বিচার চাই। দেয়াল লিখনটি দেখার পর হঠাৎ অতীতে ফিরে গেলাম। সেটি ১৯৬৫ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ের কথা। আমি কলেজে পড়লেও মালিবাগ থেকে সাইকেল চালিয়ে চলে যেতাম ইকবাল হলে, আড্ডা দিতে (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। হঠাৎ একদিন শেখ শহীদুল ইসলাম ভাই ইকবাল হল থেকে আমাকে সঙ্গে নিয়ে ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতে তার মামার বাড়িতে গেলেন। এমনকি রিকশা ভাড়া 'আট আনা' দিয়ে আমাকে জানালেন, মামার সঙ্গে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেব। যথারীতি বাইরের ঘরের লম্বা চৌকি/বেঞ্চের ওপরে বসতে না বসতেই শেখ মুজিব নেমে এলেন দোতলা থেকে। দেখলাম লম্বা, সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান, লুঙ্গি পরনে; হাত পাইপ। একবার তাকালেন শেখ শহীদের দিকে, পরে আমার দিকে। শহীদ ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেন- ছেলেটি কে? শহীদ ভাই জানালেন, জগন্নাথ কলেজে পড়ে; ছাত্রলীগের তরুণ... কথাটি সম্পন্ন করতে পারলেন না শেখ শহীদ। তখনই তার মামা আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, রাজী উদ্দিন রাজুকে চিনিস নাকি? বললাম হ্যাঁ। রাজু ভাই তো আমাদের নেতা।
জগন্নাথ কলেজের ছাত্র সংসদের সহসভাপতি। শেখ সাহেব বোধ করি আমার কথা শুনে আশ্বস্ত হলেন। সৌভাগ্যক্রমে শহীদ ভাইয়ের মামী, তিনিও এসে উপস্থিত এবং কাকে যেন বললেন, কবুতরের খাবার-পানি ঠিকমতো দিস। শেখ মুজিব বললেন, টুঙ্গিপাড়া থেকে গতকাল যে খেজুরের গুড়, পাটালি আর মুড়ি এসেছে, ওদের খেতে দাও রেনু। সেই আমি প্রথম বেগম মুজিবের নাম শুনলাম। যথারীতি গুড়-মুড়ি আসার আগে শেখ সাহেব বললেন, বাড়ি কোথায়? বললাম, পাবনায়। তিনি শেষ শব্দটি বলেছিলেন- পড়ালেখা ভালো করে করবি। সেই কথাটি এখনও আমাকে দোলায়িত করে। বাঙালি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি। তাই স্মৃতি খুবই নির্মম। দীর্ঘ ৫৩ বছর এই ঢাকা শহরে বাস করে অনেক দেয়াল লিখন দেখলাম এবং পড়লাম, গুজব শুনলাম সহস্রাধিক। দেয়াল লিখন ও গুজবের মাঝে পার্থক্যটি হলো- দেয়াল লিখন মানুষের দৃষ্টিতে দীর্ঘদিন দৃশ্যমান, গুজব ভাসমান। ১৯৭৩-৭৪ সালে ডাকসুর বার্ষিক নাটকে শেখ কামাল অভিনয় করেছিলেন। আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতায় অভিনয় করেছিলেন রেখা আহমেদ, খায়রুল আলম সবুজ। ম. হামিদ নাট্যচক্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং ডাকসুর অন্যতম নেতা। শেখ কামালের কণ্ঠে গান শুনেছিলাম। তিনি বাচ্চাদের সঙ্গে গেয়েছিলেন সত্তরের দশকের একটি জনপ্রিয় গান- 'চালে ডালে মিশাইলি রে'। বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' নাটকে তাকে দেখেছিলাম। সম্ভবত তিনি অভিনয় করেছিলেন এবং ছাত্র ছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের। সেই কামালকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে হত্যার শিকার হতে হয়েছিল কতিপয় বিভ্রান্ত সৈনিকের হাতে। এখন একটি গুজব ও সত্য ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। জানুয়ারি, ১৯৭৬ সালের শীতসন্ধ্যায় রূপকথা সিনেমা হলের মালিক মোবারক হোসেন রত্ন, আমি, বলাকার শহীদুল্লাহসহ আড্ডা যখন তুঙ্গে, শহীদুল্লাহ বললেন- চলেন যাই আমিন উদ্দীন পার্কে। দু'জনে রিকশায় চেপে গিয়ে পৌঁছালাম যাত্রার মাঠে। রাত তখন প্রায় ১০টা। লোকে লোকারণ্য। মাইকে ভেসে আসছে- আজকের যাত্রার বিশেষ আকর্ষণ বিশ্ববিখ্যাত নৃত্যশিল্পী প্রিন্সেস আলেয়ার সঙ্গে নাচবেন ১২ জন ডানাকাটা পরী। ঠিক রাত ১২টা বাজার ১৫ মিনিট আগে ঢোল-ডগর, কাঁসর-সানাই বাজতে শুরু করল। সেইসঙ্গে ১২টি ডানাকাটা পরীসহ প্রিন্সেস আলেয়ার উদ্দাম নৃত্য। ১২টা বাজতেই শুরু হলো 'ঘরজামাই' যাত্রা। তখনই আমার পাশে এসে বসলেন পাবনা সদর থানার এক সাব ইন্সপেক্টর। বারকয়েক আমার চেহারা ভালো করে লক্ষ্য করলেন। তারপর আমার নাম, ঢাকায় কোথায় কী করি-না করি। তারপর হঠাৎ চলে গেলেন। রাত গভীর হতেই শহীদুল্লাহ বললেন, মা আমার জন্য জেগে আছেন, আর যাত্রা দেখব না। আমরা ঘুমাতে গিয়েছি। হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। সেই ফাঁকে শহীদুল্লাহ অন্ধকারে পালিয়ে গেলেন একদল পুলিশ আর মিলিটারির চোখ ফাঁকি দিয়ে। ঘুম জড়ানো চোখে দেখলাম, আর্মির একজন ক্যাপ্টেনসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ। শুনলাম, 'শালাকে এতদিনে পেয়েছি।' যাত্রা দেখতে গিয়ে যে সাব ইন্সপেক্টর আমার যাবতীয় তথ্য নিয়েছিলেন, তিনিও আছেন ওই দলে। তিনি কাকে যেন বললেন, আপনার কথাই ঠিক। চুল, গোঁফ, চেহারায় মিলে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে বেঁধে তুলে ফেললেন জিপে। এমন সময় ফজরের আজান পড়ল, আমি কিছুই বুঝলাম না। জিপ গিয়ে পৌঁছাল নূরপুরের আর্মি ক্যাম্পে। আমার শরীরে ফুলহাতা শার্ট আর লুঙ্গি। ঘণ্টা তিন-চার পরে তৎকালীন (১৯৭৬) পাবনার ডিসিএমএলএ সাহেব এলেন। সঙ্গে একজন তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট। আসামি হিসেবে আমাকে ডাকা হলো। ডিসিএমএলএ সাহেবের কক্ষে ঢুকতেই সেই তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন- আরে মাকিদ ভাই! তখনই ডিসিএমএলএ সাহেব তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন, উনাকে কি আপনি চেনেন? ডিসিএমএলএ কী ভেবে সেন্ট্রিকে ডেকে পাঠালেন। ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, সোর্সকে ধরে হাজতে পাঠিয়ে দাও ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য। নূরপুরের আর্মি ক্যাম্প থেকে প্রায় দৌড়ে চলে এলাম দোহারপাড়ায়। দিনকয়েক আর শহরে যাইনি ভয়ে। শহীদুল্লাহ নিজেই একদিন দোহারপাড়ায় এসে জানালেন আমাকে এক চমকপ্রদ খবর। আমি আর আমার ছোট ভাই হাবীবুল্লাহ নাকি কুষ্টিয়ায় মিলিটারিদের ওপর বোমা মেরেছি। গাড়ি হাইজ্যাক করে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম ভারতে। দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও চমকপ্রদ, হাস্যকর এবং ভীষণ মজার। পুলিশের সেই এসআই এবং তাদের এক সোর্স ভেবেছিল, আপনি শেখ কামাল। আপনাকে দেখতেও কামালের মতোই। পাতলা, লম্বা; উচ্চতা ছয় ফুট। ইতিপূর্বে সমগ্র বাংলাদেশে একটি গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল- ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জাতির পিতাসহ পরিবারের সবাই নিহত হলেও কর্নেল ফারুক, রশীদ এবং অন্য খুনিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শেখ কামাল বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গোপন সূত্রে পুলিশ জেনেছিল, কামাল ভারতে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতে খুঁজতে পাবনায় এসেছেন। ক্যাপ্টেন লিয়াকত যখন নিশ্চিত হলেন, আমি শেখ কামাল নই, তখনই নিস্কৃতি মিলল সেই ভয়াবহ সময়ের কালে। শহীদুল্লাহ ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে জানিয়েছিলেন, চেহারায় মিল থাকলে বিপদ কীভাবে ঘনিয়ে আসে- তার জ্বলন্ত প্রমাণ আপনি। আজকাল প্রায় একই রকম ঝামেলায় পড়তে হয়। বিশেষত একুশের বইমেলায় এবং ঢাকার বাইরে শিল্প-সাহিত্যের অনুষ্ঠানে গেলে। অনেকেই ভাবেন, আমি বোধ হয় জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আমাকে নাকি দেখতে জাফরের মতো সাদা চুল, গোঁফ লম্বা, কালার প্রিন্টেড শার্ট সবকিছু মিলিয়ে। তরুণ-তরুণীরা জাফর ভেবে তার সদ্য প্রকাশিত বই নিয়ে স্বাক্ষরপ্রাপ্তির আশায় এলে বুঝিয়ে বলি, আমি তিনি নই। রবিঠাকুরের সেই কথায় আবার ফিরে আসি- 'পুরানো স্মৃতিগুলো মদের মতো'। দেয়াল লিখন পড়বেন, তবে গুজবে কান দেবেন না। দিলে নিজের কান দুটো হারাতে হবে। অথবা চিলও নিয়ে যেতে পারে।

পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ? by আমিরুল আলম খান

'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?' প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী বঙ্কিমচন্দ্রের এই বাক্য ধার করিয়া লেখা শুরু করিলাম। কেননা, আদিকাল হইতে ভনিতায় গুরুর প্রতি ভক্তি প্রদর্শন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য রীতি। বাংলাদেশে শিক্ষা পথ হারাইয়াছে- এমন অধর্ম কথা দুঃশীল ছাড়া কে কহিতে পারে? কোন গহন বনে সে পথ হারাইয়াছে, কোন প্রবল ঝঞ্ঝাবাত্যা তাহাকে অকূল সাগরে নিক্ষেপ করিয়াছে, তাহা বুঝিয়া ওঠা আমাদের দুঃসাধ্য বটে। তাই এই রূপ ধারণা আমরা প্রথমেই নাকচ করিতে চাই। ২০১৮ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষা আজ শেষ হইল। বলাই বাহুল্য, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে তাহা এক অনন্য কীর্তি হইয়া রহিল। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে তাহা লিখিত হইতে পারে। কেননা, এবার এমন একটি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয় নাই, যাহার প্রশ্ন ফাঁস না হইয়াছে। তাহার চেয়ে আরও দুঃখের কাহিনী হইল, স্বয়ং সেনাপতি রণে ভঙ্গ দিয়া যুদ্ধের আগেই পরাজয় মানিয়া লইয়াছেন এবং সগর্বে ঘোষণা করিয়াছেন- প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করিবার সাধ্য তাহাদের নাই। পলাশীর প্রান্তরে নবাবের প্রধান সেনাপতি জাফর আলী খাঁর মতোই মহাসেনাধ্যক্ষ অস্ত্র সংবরণ করিয়া পরাজয় নিশ্চিত করিয়াছেন। এ জন্য তিনি সর্বোচ্চ পুরস্কারে ভূষিত হইতে পারেন। তবে চৌদ্দ-পনেরো বছরের কিশোর-কিশোরীদের গরাদে পাঠাইতে কেহ কসুর করে নাই। তাহাদের অপরাধ, তাহাদের স্মার্টফোনে কে বা কাহারা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পাঠাইয়াছিল। কাহারা পাঠাইল, কোথা হইতে পাঠাইল, কেমন করিয়া তাহারা প্রশ্ন সংগ্রহ করিয়া ফাঁস করিল, তাহা জানা গেল না। তাই দুর্বৃত্তরা ধরাছোঁয়ার বাহিরেই রহিল; কিন্তু অবুঝ শিশুরা জীবনের প্রথমেই লৌহকারার অন্তরালে বন্দি হইল। সংবিধানে শিশুদের যে অধিকার দেওয়া হইয়াছে, তাহা ডোবা পুকুরে ডুবিয়া গেল। এহেন আইন প্রয়োগে স্বর্গলোকে এখন বাংলাদেশের বিশেষ সমাদার হইবে, তাহা নিশ্চিত। জাতি এখন তথ্য জানার অধিকারী। দেশে তথ্য অধিকার আইন পাস হইয়াছে এবং একজন তথ্য আধিকারিক সমহিমায় গদিনশিন। তাহা হইলে কী হইবে, কোন অর্বাচীন অভিন্ন প্রশ্নে মাধ্যমিক পরীক্ষা গ্রহণের পরামর্শ দিয়াছিলেন, সেই মহাপণ্ডিতের নাম জাতি অদ্যাবধি জানিতে পারে নাই। জানিতে পারিলে তাহাকে আমরা সংবর্ধনা দিতে পারিতাম; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কোনো পদকে ভূষিত করিতে পারিতাম। কেননা, তাহার মস্তিস্কজাত পরামর্শে এবার সাড়ে ২২ লক্ষ কিশোর-কিশোরী পরীক্ষা নামক প্রহসনে নায়ক-নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করিল, তাহারা সারা জীবন এই তকমা বহন করিবে যে, ২০১৮ সালে বাংলা মুলুকে পরীক্ষা নামক যে প্রহসন মঞ্চস্থ হইয়াছিল, তাহারাই ছিল তাহার আসল কুশীলব। আমাদের শিক্ষা সচিব অতীব ভদ্রলোক। পরীক্ষায় এমন অভিনব বিপর্যয়ে অনেকেই এমন মন্তব্য করিয়াছেন যাহা তাহার মনোপীড়ার কারণ হইয়াছে। তিনি খেদের সহিত তাহা বলিয়াছেন এবং দেশের মিডিয়া তাহা প্রকাশ করিয়া তাহার মর্মপীড়ার খবরটি দেশবাসীকে জানাইতে ভুল করে নাই। আমরা অক্ষম ব্যক্তি। মান্যবর সচিবের প্রতি শুকনা সহানুভূতি প্রকাশ ছাড়া আর কীবা করিতে পারি! তবে আমরা আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা লইয়া আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত; যাহার আংশিক মাত্র মিডিয়া ফাঁস করিয়াছে, তাহা জানিয়া ধন্য হইলাম। জানিতে পারিলাম, আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে এমন এক নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা তাহারা আবিস্কার করিয়াছেন, যেখানে লখিন্দরের বাসরঘরে সর্প অনুপ্রবেশের অণু পরিমাণ কোনো ছিদ্রই থাকিবে না এবং তজ্জন্য লখিন্দর নিরাপদে বাসর উপভোগ করিবে। তাহার পর্যায়গুলি জানিলে দেশবাসী 'মারহাবা, মারহাবা' রবে চারিদিক উচ্চকিত করিবে, তাহাতে আমরাও নিঃসন্দেহ হইয়াছি। প্রশ্ন ফাঁস রোধে অন্তত চারি পর্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গৃহীত হইয়াছে, যাহা মিডিয়া ফাঁস করিয়াছে।
পর্ব-১. শতাধিক প্রশ্নের ব্যাংক হইতে বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করিয়া পরীক্ষার দিন সকালে র‌্যান্ডম প্রথা অবলম্বনে মাত্র অর্ধ ঘণ্টায় প্রশ্ন তৈরি করা হইবে।
পর্ব-২. পরীক্ষার অর্ধঘণ্টা পূর্বে তাহা কেন্দ্রে অনলাইনে পাঠানো হইবে। তাহার পূর্বেই অবশ্য হলে পরীক্ষার্থীরা আসন লইবে। সুতরাং প্রশ্ন ফাঁস হইলেও তাহাতে কোনো সুবিধা কেহ পাইবে না।
পর্ব-৩. কেন্দ্র অধিকর্তা সেই প্রশ্ন ডাউনলোড করিবেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তাহা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখিয়া দিবেন।
পর্ব-৪. ব্ল্যাকবোর্ডে উৎকীর্ণ প্রশ্ন পড়িয়া পরীক্ষার্থীগণ পরম আহদ্মাদে উত্তর লিখিয়া আসিবে। ইহাতে বঙ্গাল মুলুক প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘোরতর সমস্যা হইতে নিজেকে মুক্ত করিবে। এই গায়েবি আবিস্কারের কথা পাঠ করিয়া এক অধম লিখিয়াছে, তাহাতে পরীক্ষার নামে পরীক্ষারই অপমৃত্যু নিশ্চিত হইবে। আমরা আদার বেপারী, জাহাজের খবর জানিয়া কী লাভ? পরীক্ষা লইয়া এ দেশে যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হইতেছে, দুনিয়ার কোথাও তাহা বে-নজির। দেশের সুউচ্চ মহলে যাহারা বাস করেন, যাহারা আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখান, তাহারা ভাবিয়া চিন্তিয়া যাহা আবিস্কার করিয়াছেন তাহা নিতান্ত মাকাল ফল হইবে- এমত সন্দেহ যাহারা পোষণ করেন তাহাদের মনে কুমতলব থাকাই সম্ভব। তবে শুনিতে পাই, গ্যাজেট বেপারীরা আনন্দে গোঁফে তা দিতেছেন, মাত্র দেড় মাসের মধ্যে তাহাদের নাকি বিরাট বাণিজ্য সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে। সকলেই মানিবেন, বাণিজ্য যত প্রসারিত হইবে, দেশও তত শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করিবে, জাতি দ্রুত উন্নত ও ধনী হইবে। তবে দেশে নিন্দুকের অভাব নাই। বেতমিজরা কহিতেছেন, এই নিদানে সবই হাসিল হইবে, কেবলমাত্র পরীক্ষা গ্রহণ ছাড়া। আর এই তত্ত্ব যাহারা আবিস্কার করিয়াছেন তাহারা নাকি পাবনার হেমায়েতপুরের সল্ফ্ভ্রান্ত বাসিন্দা। সুতরাং সুফল মিলিবেই। বহুকাল পূর্বে কেহ নাকি বলিয়াছিলেন, শিক্ষায় যেদিন আমলা-কেরানিরা সুদৃশ্য নাসিকা গলাইতে শুরু করিয়াছে, সেই দিন হইতে লজ্জায়, ঘৃণায় এ দেশ হইতে বিদ্যাদেবী বিদায় লইয়াছেন। তাহারা বলেন, কাজটি গুরুদের উপর ছাড়িলে অনর্থ কম হইত। কিন্তু গুরুদের উপর মহাপ্রতাপশালীদের আস্থা নাই। তাই গুরুদের শিক্ষা হইতে যত দূরে রাখা যায়, ততই জাতির মঙ্গল! আমরা বিনীতভাবে একটি ছোট্ট আবদার রাখিতে চাই- লেখাপড়া, পরীক্ষা ইত্যাদি কর্ম হইতে শিক্ষকদের দূরে রাখুন, দেশের একমাত্র সৎ প্রাণী আমলা-কেরানিদের উপর বিদ্যার সকল ভার অর্পণ করুন। বিদ্যাদেবী নিজেই মুক্তি পাইবেন।
amirulkhan7@gmail.com
সাবেক চেয়ারম্যান, যশোর শিক্ষা বোর্ড

আর কতদিন এই ভাঙা রেকর্ড? by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আজকে আমার একজন সহকর্মী তার স্মার্টফোনে আমাকে একটা ভিডিও দেখিয়েছে। আমি আমার জীবনে এর চেয়ে হৃদয়বিদায়ক কোনো ভিডিও দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। ভিডিওটি একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর। ছেলেটি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলছে, সে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তরও সে পেয়ে গেছে। কিন্তু সেই উত্তরে বেশ কয়েকটা ভুল ছিল। ক্ষুব্ধ ছাত্রটি বলছে, কেন ভুল উত্তর সরবরাহ করে তাদের এভাবে উত্ত্যক্ত করা হয়? যে কোনো হিসেবে এটাকে খুবই মজার একটা কৌতুক হিসেবে বিবেচনা করার কথা ছিল; কিন্তু আমি এই ভিডিওটি দেখে বিন্দুমাত্র কৌতুক অনুভব করিনি। আমি এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করেছি। আমাদের দেশে আমরা নতুন একটি তরুণ প্রজন্ম তৈরি করেছি, যারা সাংবাদিকদের বলতে সংকোচবোধ করে না যে, তারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর সরবরাহকারীদের ওপর তারা ক্ষুব্ধ হয়, যদি তারা উত্তরে ভুল করে। আমাদের এই নতুন প্রজন্ম ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। এ রকমটি আগে ছিল না- এ রকমটি হয়ে যাওয়ার জন্য আমরা দায়ী। আমরা হাতে ধরে এ রকম একটি প্রজন্ম তৈরি করেছি। যদি এই দেশে প্রশ্ন ফাঁস না হতো, তাহলে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম এ রকম হয়ে যেত না। কাজেই আমি খুব অসহায়বোধ করি, যখন দেখি এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা বিষয়টিকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তারা বলেন, প্রশ্ন ফাঁস নতুন কিছু নয়, আগেও প্রশ্ন ফাঁস হতো। প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে কথা বলা হচ্ছে সরকারের একটি দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টামাত্র। আমি এটাকে মোটেও ছোট একটা বিষয় হিসেবে দেখতে পারি না। আমার কাছে এটাকে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো মনে হয়, মহামারী প্লেগের মতো মনে হয়। প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কারণে আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে অর্থহীন করে দেওয়া হয়েছে। একটি ছেলে বা মেয়ের জিপিএ ফাইভ কথাটির অর্থ কী, আমরা জানি না। আসলেই সে ভালো একজন ছাত্র বা ছাত্রী হতে পারে কিংবা সে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া একজন অসৎ অভিভাবকের অসৎ সন্তান, অসৎ শিক্ষকের অসৎ ছাত্র হতে পারে। তুলনামূলকভাবে খারাপ গ্রেডের একজন ছাত্র বা ছাত্রী হয়তো আসলে একজন সোনার টুকরো ছেলে বা মেয়ে। তার চারপাশে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখেও সে প্রলোভনে পা দেয়নি, সৎ থেকেছে, বাবা-মায়ের বকুনি খেয়েছে, বন্ধুদের হাসির পাত্র হয়েছে। কে এই প্রশ্নের জবাব দেবে? শুধু কি তাই? পরীক্ষার নম্বর দিয়ে ছেলেমেয়েদের কলেজ ঠিক করে দেওয়া হয়। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখে পরীক্ষা দেওয়া ছেলেমেয়েরা ভালো ভালো কলেজের সিটগুলো দখল করে নেবে।
আমাদের সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা তাদের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পান না, আমি শুনতে পাই। আগে প্রশ্ন ফাঁস হতো কিনা, আমরা জানি না। যদি হতো অবশ্যই সেটি খুবই খারাপ একটা ব্যাপার হতো। কিন্তু আগে প্রশ্ন ফাঁস হতো বলে এখন প্রশ্ন ফাঁস হওয়াটি মেনে নিতে হবে- এটা নিশ্চয়ই একটা যুক্তি হতে পারে না। আগে এ দেশে রাজাকাররা গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়াত বলে এখনও তারা গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে ঘুরবে- সেই কথাটি তো আমরা কখনও বলি না। খুঁটিনাটি না জেনেও শুধু কমন সেন্স দিয়েও অনেক কিছু বোঝা যায়। আগে প্রশ্ন ফাঁস করতে হলে কাউকে না কাউকে পুরো প্রশ্নটির একটি কপি জোগাড় করতে হতো, এখন তার দরকার হয় না। একটা প্রশ্নকে মাত্র এক ঝলক দেখার সুযোগ পেতে হয়, চোখের পলকে প্রায় অদৃশ্য একটা ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তুলে নিয়ে আসা যায়। আমি নিজের কৌতূহলে পরীক্ষার প্রশ্ন ছাপানো এবং বিতরণ করার পুরো প্রক্রিয়াটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। আমি জানি, অনেক মানুষ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। তারা অকারণে এবং অপ্রয়োজনে এই প্রশ্নটিতে হাত বুলানোর সুযোগ পান। কাজেই প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরাছোঁয়ার বাইরের একটি বিষয় নয়। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত মাত্র একজন অসৎ মানুষের প্রয়োজন, যে এক ঝলক প্রশ্ন দেখার সুযোগ পেলে সম্ভবত কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলতে পারে। এখানে একটা কৌতূহলের বিষয় বলা যায়। আমি জানতে পেরেছি, বেশ কিছুদিন আগে একটা সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে বিজি প্রেসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়-সম্পত্তির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছিল (বিজি প্রেস হচ্ছে সেই প্রেস, যেখানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইত্যাদি গোপন কাগজপত্র ছাপানো হয়)। এই প্রেসে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়-সম্পত্তি বা ব্যাংক ব্যালান্সের খোঁজখবর নেওয়ার উদ্দেশ্য খুবই সহজ। কেউ হঠাৎ করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাচ্ছে কিনা, হঠাৎ কেউ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে কিনা, সেটি খুঁজে বের করা। যদি এ রকম কিছু দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে 'ডালমে কুছ কালা হ্যায়'। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এই অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় তদন্তটি হঠাৎ করে 'ওপরের' আদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাজেই বিজি প্রেসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অসৎ উপায়ে বড়লোক হতে শুরু করেছে কিনা, সেটি জানার আর কোনো উপায় থাকল না। আমি যেটা জানতে পেরেছি তার মাঝে কতটুকু সত্যতা আছে, জানা দরকার। কারণ এটি যদি সত্য হয় তাহলে আমাদের ভয় পাওয়ার অনেক কারণ আছে। 'ওপরের' আদেশটি কত ওপর থেকে এসেছে, আমি সেটাও জানতে খুবই আগ্রহী। একটা সময় ছিল যখন কোনোভাবেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করতে রাজি হয়নি যে, পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। আমি তখন অসহায়বোধ করেছি। কারণ আমি জানি, একটি সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রথমে সমস্যাটি বুঝতে হয়। যদি সমস্যা আছে, সেটি মেনেই নেওয়া না হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান করা হবে কেমন করে? শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন সবাই জানে, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। সেটি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা হাইকোর্ট নিজে থেকে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করার ব্যাপারে সুপারিশ দেওয়ার জন্য দুটি কমিটি করে দিয়েছেন। সেই কমিটি দুটির একটির দায়িত্বে রয়েছেন প্রফেসর মোহাম্মদ কায়কোবাদ। ২০১৪ সালে প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য আমি যখন শহীদ মিনারে বৃষ্টির মাঝে বসে ছিলাম, তখন আমার সঙ্গে সারা বাংলাদেশের একজন মাত্র শিক্ষক ছিলেন; তিনি প্রফেসর কায়কোবাদ। কাজেই আমি নিশ্চিতভাবে জানি, প্রশ্ন ফাঁসের এই অভিশাপ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে আন্তরিক মানুষটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। আমি অনুমান করতে পারি, এই কমিটি নিশ্চয়ই কোনো কিছু ধামাচাপা দেবে না, সমস্যাটির গভীরে প্রবেশ করবে এবং নিশ্চিতভাবে একটি সমাধান খুঁজে বের করবে। প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারটি যখন আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি, তখন সেটি বন্ধ করার এক ধরনের আয়োজন শুরু হয়েছে। তবে আয়োজনটি 'প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ' করার জন্য নয়; আয়োজনটি ফাঁস হয়ে যাওয়া 'প্রশ্ন বিতরণ' বন্ধ করার জন্য। যদি ধরে নিই, প্রশ্ন ফাঁস আমরা বন্ধ করতে পারব না, সেটি হবেই হবে; আমরা শুধু এর বিতরণটি বন্ধ করব, তাহলে বুঝতে হবে আমরা প্রশ্ন ফাঁস বন্ধের যুদ্ধে আগেই পরাজয় স্বীকার করে বসে আছি। আমি বিশ্বাস করতে রাজি নই যে, প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব নয়। অবশ্যই সম্ভব; শুধু সেটি আন্তরিকভাবে চাইতে হবে। যদি প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা যায়, তাহলে তার বিতরণ বন্ধ করার জন্য আলাদা করে নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে হবে না। যে প্রশ্ন ফাঁসই হয়নি, সেটি বিতরণ করবে কেমন করে? যারা প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি দীর্ঘদিন থেকে দেখে আসছে, তারা মোটামুটিভাবে তার একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করে আসছে। মূল প্রশ্নটি অনেক আগেই ফাঁস হয়, সেটি ধাপে ধাপে বিতরণ করা হয়। যখন পরীক্ষা প্রায় শুরু হতে যাচ্ছে, তখন বিনামূল্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। একেবারে শেষ ধাপে যখন এটা খুচরা হিসেবে বিতরণ করা হয়, তখন তাদের কাউকে কাউকে ধরা হয়েছে; কিন্তু তারা নেহাতই চুনোপুঁটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছিল, প্রশ্ন ফাঁসকারী কাউকে গ্রেফতার করতে পারলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। অনেককেই ধরা হয়েছে (এর মাঝে বাস বোঝাই এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও আছে)। তাদের কতজনকে পাঁচ লাখ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, কে জানে! প্রশ্ন ফাঁসকারী চুনোপুঁটিকে গ্রেফতার করেছেন এ রকম একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে নতুন একটি তথ্য দিয়েছেন। সেটি হচ্ছে, প্রশ্ন ফাঁসের এই রমরমা ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বিকাশ। বিকাশে টাকা পাঠানোর পুরো ব্যাপারটি যেহেতু পানির মতো সোজা, তাই এটি অপরাধচক্রের সবচেয়ে প্রিয় পদ্ধতি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এ রকম একটি পদ্ধতিতে টাকা পাঠানো হলে কে পাঠাচ্ছে এবং কার কাছে পাঠাচ্ছে, তার একটা হদিস থাকবে। কিন্তু আমি সবিস্ময়ে এবং মহাআতঙ্কে আবিস্কার করেছি, সেটি সত্যি নয়। কোনো রকম নিয়মনীতি না মেনে বিকাশে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলা সম্ভব এবং সেই অ্যাকাউন্টে টাকা লেনদেন সম্ভব। যে বড় পুলিশ অফিসারটির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তিনি বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন, এই বিকাশ প্রযুক্তির কারণে কিডন্যাপিং অনেক বেড়ে গেছে। শুধু তাই নয়, তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, যে প্রযুক্তি অপরাধীদের টাকা লেনদেনে সাহায্য করে, আমাদের দেশ কি সেই প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত হয়েছে? আমি কখনও বিকাশ ব্যবহার করে টাকা পাঠাইনি। তাই এ প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। কিন্তু সহজ প্রশ্নটি তো করতেই পারি- যদি এই প্রক্রিয়ায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে টাকা লেনদেন করতে পারে, তাহলে তার দায়দায়িত্ব কি বিকাশকে নিতে হবে না? আবার প্রশ্ন ফাঁসের মূল ব্যাপারটায় ফিরে আসি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, একটি প্রশ্ন পুরোপুরি এবং অন্যগুলো আংশিক ফাঁস হয়েছে। যেগুলো ফাঁস হয়েছে সেগুলোর পরীক্ষা কি আবার নেওয়া হবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে, যদি নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়, তার প্রশ্ন আর ফাঁস হবে না? যদি হয় তখন কী হবে? আমি আমার ভাঙা রেকর্ড বাজাতে বাজাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। আর কতদিন?

সেই মহাউত্থানের দিনে by অজয় দাশগুপ্ত

এমনই একটি দিন, যেন পহেলা মার্চ! এমন দিন বিশ্বের কোন দেশে কোথায় মিলবে? ১৯৭১ সালের ১ মার্চ সকাল থেকে ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের মধুর ক্যান্টিনে। দুপুর ১টার দিকে ঢাকা রেডিও থেকে ঘোষণা করা হলো- ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের যে অধিবেশন বসার কথা ছিল, তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। মধুর ক্যান্টিনে তখন শ'খানেক ছাত্রছাত্রী। তারা জয় বাংলা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন করসহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমে আসে। আমিও ছিলাম এই দলে। কলাভবন থেকে ফুলার রোড ধরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছানোর মধ্যে গোটা রাজপথ লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। কার্জন হল ও ফজলুল হক হলের পাশ দিয়ে গুলিস্তানের দিকে যাওয়ার সময় আমাদের পথে পড়ে একটি লাকড়ি বিক্রির পাইকারি ব্যবসা কেন্দ্র। শত শত লাকড়ির মুট রাখা ছিল বিক্রয়ের জন্য। স্বাধীনতাকামী হাজার হাজার জনতার হাতে হাতে সে লাকড়ি মুহূর্তে পৌঁছে গেল। এর আগে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের রেলিং ভাঙতে দেখেছি একদল তরুণকে। বেশ পুরু লোহা দিয়ে তৈরি রেলিং থেকে কীভাবে যে রডগুলো আলাদা করা হলো কেবল গায়ের জোরে, তাকে কেবল অলৌকিক বলা চলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন মতিঝিলের পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে অবস্থান করছেন। তিনি আগের রাতেই ধারণা পেয়েছেন, পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হচ্ছে। কেন এ পদক্ষেপ? কারণ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকারী দল আওয়ামী লীগের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার দল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা দাবি থেকে এক চুলও সরে আসতে রাজি হননি। তিনি বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষকে এর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। ১ মার্চ দুপুরে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি- বাংলাদেশ চলেছে স্বাধীনতার পথে। প্রকৃতপক্ষে সেদিন থেকেই পাকিস্তানের পূর্বাংশে স্বাধীন সত্তায়। এখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের নির্দেশ মুহূর্তে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আমার সোনার বাংলা ...' নির্ধারিত হয় জাতীয় সঙ্গীত। ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ, নূরুল আমীন ও আতাউর রহমান খানের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এদের কেউই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। পাকিস্তান পার্লামেন্টে বঙ্গবন্ধু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। জনগণ তাকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। কিন্তু দেশ যেহেতু স্বাধীনসত্তায় আবির্ভূত হতে চলেছে, এক পাকিস্তানের ধারণা অতীত হতে চলেছে- তেমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু সবার মতামত চেয়েছেন। কেমন সেই নতুন পরিস্থিতি? এ বিষয়ে ভারতের গবেষক শ্রীনাথ রাঘবন তার '১৯৭১' গ্রন্থে লিখেছেন, 'ইয়াহিয়ার ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। সরকারি অফিসার ও কর্মচারীরা ধর্মঘট করে, ব্যাংক ও বাণিজ্যিক অফিসের কর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আদালতপাড়া খালি হয়ে যায়। পাকিস্তান ও কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে ক্রিকেট খেলা চলছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে, সেখানে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীদের হাতে বাঁশের লাঠি ও লোহার রড। তারা স্লোগান দিচ্ছিল স্বাধীনতার জন্য। বলছিল সশস্ত্র সংগ্রামের কথা।... তিনি পূর্বাণী হোটেল থেকে জানান, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তার যা বলার বলবেন।' ইয়াহিয়া খানের বিশ্বস্ত উপদেষ্টা ড. জি ডব্লিউ চৌধুরী তার 'দি লাস্ট ডে'জ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান' গ্রন্থে লিখেছেন, রেডিওতে ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় প্রতিক্রিয়া হয় ভায়োলেন্ট, মুজিব তার ভাষায় 'অহিংস অসহযোগ আন্দোলন' শুরু করেন। কিন্তু এটা গান্ধীর মতো 'অহিংস অসহযোগ' আন্দোলন ছিল না। মুজিব প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, যা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জন্য একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার শামিল। মুজিবের নির্দেশে কার্যত প্যারালাল সরকার কাজ করতে থাকে। ৩ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ পূর্ব পাকিস্তানে কার্যকর ছিল না। 'লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে' গ্রন্থে রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করলেন, 'এটা নীরবে সহ্য করা যায় না। ষড়যন্ত্রকারীদের সুবুদ্ধি ফিরে না এলে ইতিহাস তার নিজস্ব পথেই চলবে।' প্রতিবাদের বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ে গোটা পূর্ব পাকিস্তান যেন ডুবে গেল। প্রকৃতই এমন বিদ্রোহ কখনও দেখেনি কেউ। ১ মার্চ দুপুর থেকে পরের কয়েকটি ঘণ্টা গোটা বাংলাদেশে কত শহর, বন্দর ও গ্রামে কত সমাবেশ হয়েছে, কত মানুষ অংশ নিয়েছে, সে হিসাব রাখার কেউ ছিল না। সামান্য খবরই এসেছে সে সময়ের সংবাদপত্রে। যেখানে যেভাবে পেরেছে মিছিল, সমাবেশ করেছে। কোনো গবেষক দল যদি আনুমানিক হিসাবও বের করতে পারেন, দেখা যাবে একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সম্ভবত একসঙ্গে এত মিছিল-সমাবেশ বিশ্বে আর কখনও দেখা যায়নি। জনগণ প্রতিবাদ জানিয়েছে পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে। অস্ত্র তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে। ৭ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে নবতর পর্যায়ের আন্দোলন-অসহযোগিতা। বেতার-টেলিভিশন চলে এসেছে জনগণের নিয়ন্ত্রণে। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু এবং তার সহকর্মীদের সর্বোচ্চ মাত্রায় সচেতন থাকতে হয়েছে- যেন এ আন্দোলনকে কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারে। ৭ মার্চ তিনি যদি ঘোষণা দিতেন ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করো- হয়তো সেটাই করা হতো। কিন্তু তাতে আমাদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে বিশ্বের সমর্থন লাভ কঠিন হতো। আমরা চিহ্নিত হতাম বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে। কিন্তু ২৫ মার্চের পর দেখা গেল, পাকিস্তানের শাসকরাই অভিযুক্ত একটি জনপদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রক্তের বন্যায় দমিয়ে রাখার জন্য ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র প্রয়োগের কারণে। আর বঙ্গবন্ধু বিশ্বের চোখে পরিণত হয়েছেন নিপীড়িত একটি জনগোষ্ঠীর মুক্তিসংগ্রামের মহানায়কে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেবেন, তার নানা ব্যাখ্যা এখন বিশ্বব্যাপী চলছে। তিনি এ ভাষণে যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন তা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।
জি ডব্লিউ চৌধুরী লিখেছেন, মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি; কিন্তু জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে (৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন- ২৫ মার্চ অধিবেশন বসবে) যোগদানের জন্য চারটি শর্ত ঘোষণা করেন। শ্রীনাথ রাঘবন লিখেছেন, একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সেটাকেই বাঙালিদের ওপর হামলার অজুহাত করত- এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সচেতন ছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ঘোষণা মেনে নেবে কিনা সেটাও নিশ্চিত ছিল না। শেখ মুজিব স্বাধীনতার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট চার দফা দাবি উপস্থাপন করেন। তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি; কিন্তু তার ১৭ মিনিটের ভাষণ was a master piece of oratory’. তিনি লিখেছেন, মুজিবের বক্তব্য ও দাবি ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানেরও অনেক নেতা তার প্রতি সমর্থন জানান। ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকা আসেন। এর আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বাঙালিরা অতিথিপরায়ণ। ইয়াহিয়া খান আমাদের অতিথি। তাকে অতিথি হিসেবে স্বাগত জানানো হবে। এভাবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ইয়াহিয়া খান পদার্পণ করছেন একটি 'স্বাধীন দেশে'। ইয়াহিয়া খান ঢাকা বিমানবন্দর থেকে কীভাবে রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে আসবেন, সেটা নিয়ে পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কারণ ফার্মগেটে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেনাবাহিনীর চলাচল বন্ধ রাখার জন্য চেকপোস্ট ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু ঢাকার এসপি তাদের জানান, 'প্রেসিডেন্টের গাড়িবহর যেন বাঙালি স্বেচ্ছাসেবকদের চেকপোস্টে আটকে রাখা না হয়, সে জন্য বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছেন।' ১৫ মার্চ থেকে পরের কয়েকটি দিন ঢাকায় ইয়াহিয়া খানের যে আলোচনা হয়েছে তাতে কিন্তু বঙ্গবন্ধু একটি স্বাধীন দেশের সরকারপ্রধান হিসেবেই নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ একটি জাতির ভাগ্য কীভাবে প্রভাবিত করেছিল, সেটা আমাদের জানা। এখন এটা মানবজাতির সম্পদ। এবারের ৭ মার্চ দিনটি নতুন তাৎপর্য নিয়ে এসেছে। এদিন দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সব শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একই সময়ে এ ভাষণের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা কি করা যায় না- যেখানে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ছাত্র-শ্রমিক-পেশাজীবী-সংস্কৃতিসেবীসহ সমাজের সব অংশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন?
সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com