Friday, December 5, 2025

ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের নজর কেন, মাদুরোকে সরিয়ে দিলে কী হবে এই তেলের

যুক্তরাষ্ট্রের ভাবগতি দেখে মনে হচ্ছে, ভেনেজুয়েলায় হামলা চালাতে একেবারে প্রস্তুত তারা। এর পেছনে একটি কারণ আছে বলে গত সপ্তাহে উল্লেখ করেছিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। সেটি হলো—তাঁর দেশের বিপুল জ্বালানি তেলের ভান্ডার নিজেদের দখলে নিতে ওয়াশিংটনের তুমুল আগ্রহ।

ভেনেজুয়েলা ঘিরে আধা ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মোতায়েন করেছে ১৫ হাজার সেনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেই রেখেছেন, শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ চালানো হতে পারে। দেশটির আকাশসীমা এড়িয়ে চলতেও বলেছেন তিনি।

তবে এর পেছনে মূল কারণ তেল নয় বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। ট্রাম্প সরকারের ভাষ্যমতে, ভেনেজুয়েলা থেকে অবৈধ অভিবাসী ও মাদক ঠেকাতে চেষ্টা করছে তারা। তাই এই সেনা সমাবেশ। কারণ যা–ই হোক না কেন, ভেনেজুয়েলায় যদি সরকারের পরিবর্তন হয় তাহলে দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে তাদের হাতে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেলের ভান্ডার।

ভেনেজুয়েলার কালো সোনা

বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মাটির নিচে। তা একদমই ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের (ইআইএ) হিসাবে, ভেনেজুয়েলার কাছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের অপরিশোধিত তেলের ভান্ডার রয়েছে, যা ইরাকের চেয়েও বেশি। এটি বিশ্বে সংরক্ষিত মোট তেলের ৫ ভাগের ১ ভাগ।

তবে ভেনেজুয়েলা খুব কম পরিমাণ তেল উত্তোলন করে—প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল। এটি বিশ্বের মোট উত্তোলনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। তেল উত্তোলনের এই পরিমাণ ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতা নেওয়ার আগের সময়ের অর্ধেক। আর ১৯৯৯ সালে সমাজতন্ত্রীরা ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় বসার আগের সময়ের চেয়ে এক–তৃতীয়াংশের কম।

এই কমার পেছনে কারণটা কী? আসলে ভেনেজুয়েলা সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ক্রমেই তেল উত্তোলন কমেছে। এ ছাড়া ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। ফলে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর অবস্থা খারাপ হচ্ছে এবং উত্তোলনের সক্ষমতা কমছে।

বিদেশি বিনিয়োগটা ভেনেজুয়েলার জন্য বড় একটি সমস্যা। কারণ, দেশটির তলদেশে যে ভারী ও সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল রয়েছে, তা উত্তোলনের জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি ও উচ্চ মাত্রার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রয়োজন। এগুলো তোলার এবং পরিশোধনের ক্ষমতা রয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তেল কোম্পানির। তবে ভেনেজুয়েলায় ব্যবসা করতে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

২০০৫ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ২০১৯ সালের ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেত্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম কমাতে ২০২২ সালে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি শেভরনকে ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গত মার্চে ট্রাম্প ওই লাইসেন্স বাতিল করেন। তবে মাদুরো সরকার এ থেকে কোনো আয় করতে পারবে না—এমন শর্তে আবার অনুমতি দেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র কেন ভেনেজুয়েলার তেল চায়

বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র বেশি তেল উত্তোলন করে। এরপরও দেশটির তেল আমদানির দরকার হয়—বিশেষ করে যে ধরনের তেল ভেনেজুয়েলা উত্তোলন করে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে সেগুলো হালকা ও কম সালফারযুক্ত। এগুলো পেট্রল উৎপাদনের জন্য ভালো হলেও আর বেশি কিছু পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলায় পাওয়া যায় ভারী ও সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল। এই তেল পরিশোধনের সময় ডিজেল, অ্যাসফাল্ট এবং কলকারখানা ও ভারী যন্ত্রপাতির জ্বালানিসহ বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য পাওয়া যায়। বিশ্বজুড়ে ডিজেলের জোগান কমে আসছে। এর বড় একটি কারণ হলো ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা।

ইআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ভেনেজুয়েলা থেকে এক লাখ দুই হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা মোট তেলের দশম উৎস ছিল ভেনেজুয়েলা। একই সময় পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে প্রতিদিন ২ লাখ ৫৪ হাজার ব্যারেল এবং কানাডা থেকে ৪১ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে ওয়াশিংটন।

ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বড় কারণ হলো—এই তেল তাদের কাছাকাছি রয়েছে, দামও কম। আঠালো ও বেশি ঘনত্বের কারণে এই তেল বেশি পরিশোধনের দরকার পড়ে। এ জন্যই এটি কম দামে পাওয়া যায়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ফিউচারস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ পরিশোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে ভেনেজুয়েলার ভারী তেল প্রক্রিয়াজাত করার মতো করে। যুক্তরাষ্ট্রের তেলের তুলনায় ভেনেজুয়েলার তেল পরিশোধনের সক্ষমতাও বেশি সেগুলোর।

মাদুরোর পতন হলে এই তেলের কী হবে

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর যদি পতন হয়, আর বিশাল এই তেলের ভান্ডারের ওপর থেকে যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তাহলে সুবিধা পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা। পাশাপাশি এ থেকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিও সুবিধা পেতে পারে। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার তেলের রপ্তানি বাড়লে তা বড় পরিসরে তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় বিভিন্ন বিষয় পরিচালনার জন্য যদি আমরা একটি বৈধ সরকার পাই, তাহলে বিশ্বের তেলের সরবরাহ আরও বাড়তে পারে। ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের ঝুঁকি কমবে। ভেনেজুয়েলার তেল বাজারকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারলে তা একটি বিরাট বিষয় হবে।’

তবে আগামী দিনে ভেনেজুয়েলার তেল পূর্ণমাত্রায় বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারলেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনের সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনার জন্য কয়েক বছর এবং বিরাট খরচের প্রয়োজন। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেত্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলা জানিয়েছে, ৫০ বছর ধরে তাদের পাইপলাইনগুলো নতুন করে সংস্কার করা হয়নি। আর উত্তোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে বিভিন্ন অবকাঠামোগত সংস্কারে ৫৮ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে।

মাদুরোর পতনের পর যদি পশ্চিমবান্ধব কোনো সরকার ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতায় বসে তাহলে পশ্চিমা দেশগুলো হয়তো এই বিপুল খরচ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে পারে। এটি শুধু ভেনেজুয়েলার তেল ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের জন্যই তারা করবে না, এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিষয়াদিও জড়িত থাকবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে রাশিয়ার তেলের কথা। এই তেল ভেনেজুয়েলার তেলের মতোই। সে কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরও রাশিয়ার তেলের ওপর ব্যাপক হারে নির্ভরশীল ভারত ও চীন। এখন ভেনেজুয়েলায় যদি তেল উত্তোলন বাড়ে, তা রাশিয়ার তেলের একটি বিকল্প হতে পারে। এর জেরে রাশিয়ার ক্রেতারা ভেনেজুয়েলামুখী হলে মস্কোর অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে।

ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে দেশটির ওপরও। কারাকাস যদি আবার আগের মতো তেল উত্তোলন করতে পারে তাহলে তাদের আয় বাড়বে। বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, ভেনেজুয়েলা আবার তেল থেকে আয়কে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে এ জন্য তাদের মাদুরোমুক্ত হতে হবে।

এসব কারণে জল্পনা রয়েছে যে মাদুরোর ওপর ট্রাম্পের চাপের পেছনে একটি কারণ ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল। চলতি সপ্তাহান্তেই তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের মহাসচিবের কাছে লেখা একটি চিঠিতে মাদুরো বলেছিলেন, তাঁর দেশের তেলের মজুত দখল করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোও তা–ই মনে করেন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে তেল। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে একটি সমঝোতার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এমনটা করছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-02%2Fhi6jwvbe%2Fven-1.jpg?rect=12%2C0%2C674%2C449&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির একটি অবকাঠামো। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতে জ্বলজ্বল করছে পবিত্র কাবা

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নভোচারী ডন পেটিটের মহাকাশ থেকে তোলা একটি চমকপ্রদ ছবি ইন্টারনেটে আলোড়ন তুলেছে। রাতের বেলা মহাকাশ থেকে তোলা ওই ছবিতে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগর ঝলমল করছে।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উঁচুতে মহাকাশ থেকে ওই ছবি তোলা হয়েছে। ছবিতে ঝলমলে মক্কা নগরের বুকে একটি উজ্জ্বল সাদা রঙের আলোর গোলক দেখা যাচ্ছে। সেটি মক্কার বুকে অবস্থিত পবিত্র কাবা বলেই উল্লেখ করেছেন ডন পেটিট।

ডন পেটিট তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টে ছবিটি পোস্ট করেন ২ ডিসেম্বর। এতে তিনি লিখেছেন, মহাকাশের কক্ষপথ (অরবিট) থেকে তোলা ছবিতে সৌদি আরবের মক্কা। মাঝখানের উজ্জ্বল ছোট্ট এলাকাটি কাবা শরিফ, ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থান, যা মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান।

ছবিতে মক্কা নগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত মক্কার কেন্দ্রে রয়েছে গ্র্যান্ড মসজিদ (মসজিদুল হারাম)। লাখ লাখ এলইডি ও সোডিয়াম লাইটের কারণে রাতের বেলা মহাকাশ থেকে মক্কা নগর ঝলমলে দেখায়।

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা পবিত্র শহর মক্কায় এ ‘দিব্য আলো’র দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছেন।

একজন লিখেছেন, ‘মহাকাশ থেকে দেখা কাবার আলো একেবারেই আলাদা, যেন রাতের বেলা পৃথিবীর নিজস্ব চিরন্তন আলোয় তার আত্মা জ্বলজ্বল করছে। দিব্য জ্যোতি।’

এই ছবি তোলা ও সবাইকে তা দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনেকে নভোচারী ডন পেটিটকে ধন্যবাদ দিয়েছেন।

পেটিট একজন দক্ষ ‘অ্যাস্ট্রো ফটোগ্রাফার’ ও রসায়ন প্রকৌশলী। মহাকাশ থেকে ছবি তোলার প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো এমন শিল্পকর্মে রূপান্তর করার জন্য তাঁর জগৎজোড়া খ্যাতি রয়েছে।

মহাকাশ থেকে পেটিটের তোলা বিখ্যাত কয়েকটি ছবির মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর মেঘমালার ওপরে চমকপ্রদ নক্ষত্রপথ (স্টার ট্রেইল), মহাদেশীয় চিরহরিৎ বনের ওপর নাটকীয় বজ্রঝড়, মেরু অঞ্চলজুড়ে নৃত্যরত উত্তরীয় আলো (অরোরা)।

নাসার নভোচারী ডন পেটিট তাঁর ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে ২ ডিসেম্বর এই ছবি পোস্ট করেন
নাসার নভোচারী ডন পেটিট তাঁর ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে ২ ডিসেম্বর এই ছবি পোস্ট করেন। ছবি: ডন পেটিট

বিশ্বব্যবস্থা: যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে বাকি পশ্চিমাদের এগিয়ে আসতে হবে by চিন-হুয়াত ওং ও উইং থাই উ

যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে ভূরাজনৈতিক পশ্চিম বা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা যাবে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে এমনটা কল্পনা করাই কঠিন ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বনেতৃত্ব টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা অংশীদারদের এখন নিজেদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। এখন আর সন্দেহ নেই, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করা যাবে না, করা উচিতও হবে না। ট্রাম্প খোলাখুলি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের অবজ্ঞা করেন; আবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরশাসকদের প্রশংসা করেন।

আদতে ট্রাম্প কেবল একটি লক্ষণ মাত্র। আসল সমস্যাটা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কয়েক দশক ধরেই তৈরি হয়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু জিডিপি দ্বিগুণ হয়েছে, অথচ বাস্তবে গড় পরিবারের আয় বেড়েছে এক-চতুর্থাংশের কম। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। রোনাল্ড রিগ্যান থেকে শুরু করে ট্রাম্প পর্যন্ত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টরা ধনীদের কর কমিয়েছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, সুবিধা নাকি সবার কাছে ‘ট্রিকল ডাউন’ হয়ে পৌঁছাবে। অথচ একই সময়ে প্রযুক্তিগত স্বয়ংক্রিয়তা ও উৎপাদন খাত বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার কারণে লাখো কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তা ধ্বংস হয়েছে।

ধরা যাক, ট্রাম্প মার্কিন সংবিধান মেনে ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউস ছেড়ে দেবেন। তবু তাঁর প্রস্থান এসব সমস্যার সমাধান করবে না। এমনকি ডেমোক্র্যাটরা যদি আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান এবং ২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন, তবু যে জনপ্রিয়তাবাদী শক্তি ট্রাম্পের উত্থান ঘটিয়েছিল, তা মার্কিন রাজনীতিকে চালিয়ে যেতে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় ভুল পরিকল্পনা বা অপরিণত নীতি গ্রহণ করছে। উদাহরণ হিসেবে চীনকে ঠেকানো বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তারা প্রচুর অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করছে। কিন্তু একই সম্পদ যদি দেশের ভেতরে জরুরি ক্ষেত্রগুলোতে, বিশেষ করে নষ্ট হয়ে যাওয়া অবকাঠামো (রাস্তা, সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা ইত্যাদি) পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সমাজ আরও শক্তিশালী হতো, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ত আর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতাও বেড়ে যেত। কিন্তু যেহেতু সেই সম্পদ ভুল জায়গায় যাচ্ছে, সেহেতু যুক্তরাষ্ট্র নিজের ভেতরকার সমস্যা সমাধান করতে পারছে না, তাই আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও ক্ষয়িষ্ণু হবে।

এ প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির ভিত্তি ধরে রাখার জন্য পশ্চিমাদের বাকি দেশগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। তারা চাইলে তা পারবে। কারণ, এখানে অনেক সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী ‘মধ্যশক্তি’ রয়েছে। এখানে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্য, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডা। ২০২৪ সালে এসব দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ কোটি (যা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিগুণ) এবং তাদের সম্মিলিত জিডিপি ছিল ২৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের সমান।

যদি এই দেশগুলো বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষায় একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতে তারা নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে পারবে। ট্রাম্প আসলে একটাই জিনিস বোঝেন, তা হলো ক্ষমতার প্রদর্শন। এ কারণে এসব দেশের কর্মসূচি কেবল ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভালো চুক্তি আদায়েই সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; বরং তাঁর খামখেয়ালি একতরফা নীতি ও চীনবিরোধী বিষাক্ত প্রচারণার বৈশ্বিক প্রভাবকেও প্রতিরোধ করতে হবে।

এ জন্য অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র যখন ট্রাম্পের শুল্কপ্রাচীর তৈরি করছে, তখন এই নতুন বহুপক্ষীয় ব্লককে বৈশ্বিক গণসম্পদ সরবরাহ করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববাণিজ্য–ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ভাবতে হবে। হ্যাঁ, চীন পশ্চিমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যত দিন সে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে সমর্থন করবে, ইউরোপের জন্য ভূরাজনৈতিক হুমকি হয়ে থাকবে। কিন্তু পশ্চিমাদের মধ্যশক্তিগুলো চীনের সঙ্গে কোনো ‘থুসিডিডিস ফাঁদে’ আটকা পড়েনি। তাই সংঘাত অনিবার্য নয়। এ কারণে জলবায়ু কার্যক্রম ও মহামারি প্রস্তুতির মতো পারস্পরিক স্বার্থে ব্যবহারিক চুক্তি করার পথ খুঁজতে হবে।

তৃতীয়ত, পশ্চিমাদের মধ্যশক্তিগুলোকে, বিশেষ করে গাজায় গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। ট্রাম্প যেখানে স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন ও বেসামরিক হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করছেন, সেখানে ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেছে।

এভাবে পশ্চিমা দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করে দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ক্রমে বহুমেরু হয়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে।

* চিন-হুয়াত ওং, মালয়েশিয়ার সানওয়ে ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক
* উইং থাই উ, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-ডেভিসের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ইমেরিটাস
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরশাসকদের প্রশংসা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরশাসকদের প্রশংসা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

‘২৫ বছর আগে যা ছিলাম, এখন তার চেয়েও চাঙা’—বলার পরই বৈঠকে এক ঘণ্টা ‘ঘুমালেন’ ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার বৈঠক ছিল গতকাল মঙ্গলবার। বৈঠকে টেবিল ঘিরে বসেছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। একজন একজন করে ট্রাম্পের প্রশংসা করছিলেন। শেষ বক্তা ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

স্থানীয় সময় গতকাল দুপুরের পরপরই মন্ত্রিসভার ওই বৈঠক শুরু হয়। ট্রাম্প যথারীতি বৈঠকে ‘স্লিপি জো’(ঘুমকাতুরে জো) বাইডেনের কথা উল্লেখ করেন। মাঝেমধ্যেই ট্রাম্প তাঁর দেওয়া বক্তব্যে পূর্বসুরি ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টকে এ নামেই ডেকে থাকেন।

এরপর ট্রাম্প বৈঠকে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ২৫ বছর আগে যেমন ছিলেন, এখন তিনি তার চেয়েও চাঙা।

ট্রাম্প গত সপ্তাহে তাঁকে নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনের সমালোচনাও করেন। প্রতিবেদনে ট্রাম্পের কাজের সময়সূচি ও জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ৭৯ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে কিছুটা ধীরগতির হয়ে গেছেন।

ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলেন, ‘ট্রাম্প চটপটে, তারা চটপটে নয়।’

ট্রাম্প সাংবাদিকদের সমালোচনা করে বলেন, তাঁর স্বাস্থ্য ও প্রাণশক্তি নিয়ে সাংবাদিকেরা সঠিক কথা বলছেন না। এটি অন্যায়। ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা সবাই পাগল।’

কিন্তু পরবর্তী প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রাম্পকে নিজের দাবিতে অটল থাকতে, নিজের সেই চাঙাভাব ও প্রাণশক্তির প্রদর্শন করতে লড়াই করতে হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন দুপুরের ঘুমের সঙ্গে একটি দীর্ঘ ও প্রায় হেরে যাওয়া যুদ্ধ করে যাচ্ছেন।

এমনকি যখন মন্ত্রিসভার সদস্যরা একে একে তাঁর পছন্দের কাজগুলোর একটি, অর্থাৎ প্রশংসা করছিলেন, তখনো প্রেসিডেন্ট বারবার ঘুমিয়ে পড়ছিলেন বলে মনে হচ্ছিল।

এগুলো আসলে এমন দৃশ্য ছিল, যা নিয়ে ট্রাম্প একসময় উপহাস করতেন। এ ধরনের দৃশ্যকে তিনি তাঁর সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রাণশক্তি ও সক্ষমতার অভাবের প্রমাণ হিসেবে দেখাতেন।

অথচ নিজের স্বাস্থ্য ও প্রাণশক্তি–সম্পর্কিত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করার মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় ট্রাম্প নিজের চোখ খোলা রাখতে সংগ্রাম করছিলেন বলে মনে হচ্ছিল। এমনকি যখন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রশংসা করছিলেন এবং ‘সর্বকালের সেরা প্রেসিডেন্টের জন্য সর্বকালের সেরা মন্ত্রিসভা’ বলে উল্লাস করছিলেন, তখনো।

শ্রমমন্ত্রী লরি চাভেজ-ডিরিমার যখন ট্রাম্পের শ্রমশক্তি উন্নয়ন প্রচেষ্টার বর্ণনা করছিলেন, সে সময়ও তিনি বারবার চোখ পিটপিট করছিলেন।

আবার শিক্ষামন্ত্রী লিন্ডা ম্যাকমাহন এবং স্বাস্থ্য ও মানবিক পরিষেবামন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন দেখা যায়, ট্রাম্প প্রায় ১০-১৫ সেকেন্ড ধরে চোখ বন্ধ রেখে স্থির হয়ে আছেন। এরপর ধীরে ধীরে চোখ নাড়ান বা সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন।

সিএনএনের হিসাব অনুযায়ী, ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ওই বৈঠক চলে এবং খুব সম্ভবত পুরো বৈঠকে একাধিকবার মনোযোগ হারিয়েছেন ট্রাম্প।

রুবিও যখন ট্রাম্পের ‘পরিবর্তনমূলক’ বৈদেশিক নীতির প্রশংসা করছিলেন, তখন তাঁর পাশের চেয়ারে বসে প্রেসিডেন্ট ঢলে পড়ছিলেন, চোখও বন্ধ করে ছিলেন। এরই মধ্যে হঠাৎ ট্রাম্প সোজা হয়ে বসেন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর দিকে তাকান।

কয়েক মুহূর্ত পর, রুবিও যখন কলেজ ফুটবল প্লে-অব মৌসুম নিয়ে রসিকতা করছিলেন, তখন প্রেসিডেন্টের চোখ আবার বন্ধ হয়ে গেল বলে মনে হয়।

রুবিওর রসিকতায় টেবিলের চারপাশে থাকা মন্ত্রিসভার সদস্যরা জোরে হাসেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট তখনো অভিব্যক্তিহীন, শুধু ঠোঁট হালকা ওপরের দিকে তোলেন, চোখ সামান্য ঝলমল করে মাত্র।

দীর্ঘ বৈঠকের পুরো সময় ট্রাম্প বারবার চোখ কুঁচকে তাকান, কখনো কখনো বন্ধ করেন বা বন্ধ হওয়ার মতো মনে হয়।

তবে হোয়াইট হাউস বলেছে, প্রেসিডেন্ট মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিলেন ও বৈঠক পরিচালনা করেছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-03%2Fvec2o61s%2FUS-President-Donald-Trump.avif?rect=0%2C0%2C582%2C388&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্পকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ছবি: এএফপি

মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং পুরো তিন ঘণ্টা ধরে চলা মন্ত্রিসভার দীর্ঘ বৈঠক পরিচালনা করেছেন।

লেভিট ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, এ বছর প্রেসিডেন্ট নয়বার মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছেন। এসব ঐতিহাসিক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর অসাধারণ দল মার্কিন জনগণের পক্ষে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ লক্ষ্য অর্জনে যেসব কাজ করেছেন, সেসবের বিস্তৃত তালিকা তুলে ধরেছেন।

তবে ট্রাম্প নিজে বা তাঁর প্রেস সচিব যতই প্রশংসা করুন, এক মাসের কম সময়ের মধ্যে হোয়াইট হাউসে কোনো অনুষ্ঠান চলাকালে দ্বিতীয়বারের মতো চোখ খোলা রাখতে ট্রাম্পকে লড়াই করার দৃশ্য জনগণের মনে প্রশ্ন তুলছে।

আগেরবার গত ৬ নভেম্বর ওভাল অফিসে এ দৃশ্য দেখা যায়। সেই ঘটনার পর ওয়াশিংটন পোস্ট বিভিন্ন ভিডিও ফিড পর্যালোচনা করে হিসাব করেছে যে ট্রাম্প প্রায় ২০ মিনিট ধরে চোখ খোলা রাখার জন্য লড়াই করেছেন।

ওই সময় ট্রাম্পের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ছবি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। ট্রাম্পের সমালোচকেরা এ ছবি ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর কার্যদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

গতকাল একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তির বয়স তাঁর কাজের ওপর প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে মানুষজনের প্রশ্ন বেড়েই চলেছে।

কয়েক দিন আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমআরআই পরীক্ষা করা হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওই পরীক্ষা তাঁর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ ছিল বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। এ নিয়ে লেভিট গত সোমবার বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শরীর-স্বাস্থ্য ভালো আছে।

৭৯ বছর বয়সী প্রেসিডেন্টের বিষয়ে লেভিট আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কার্ডিওভাস্কুলার ইমেজিং পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল, রক্তনালিতে সংকোচনের কোনো চিহ্ন নেই, রক্তের প্রবাহে কোনো বাধা নেই এবং হৃৎপিণ্ড বা গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিগুলোয় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। এককথায় তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র চমৎকার অবস্থায় আছে। তাঁর পেটের অংশের ইমেজিংও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।’

কেন ট্রাম্পের ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং (এমআরআই) পরীক্ষা করা হলো, তার কারণ প্রকাশ করা হয়নি। সাধারণ স্বাস্থ্যপরীক্ষার ক্ষেত্রে এমআরআই করাতে দেখা যায় না। বিস্তারিত জানানো হয়নি দেখে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, হোয়াইট হাউস প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পুরোপুরি ও সময়মতো প্রকাশ করছে কি না।

ওভাল অফিসে অনুষ্ঠান চলাকালে চোখ বন্ধ করে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেখে মনে হচ্ছে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। এই ছবিটি ৬ নভেম্বরের
ওভাল অফিসে অনুষ্ঠান চলাকালে চোখ বন্ধ করে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেখে মনে হচ্ছে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। এই ছবিটি ৬ নভেম্বরের। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ব্র্যাক আয়োজিত অ্যাডভোকেসি সংলাপে নারীদের কর্মসংস্থানসহ সার্বিক উন্নয়নে ৫ দফা সুপারিশ

সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশে ‘আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক’ কর্ম ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক নয়। সম্প্রতি ব্র্যাকের ‘ইমপ্রুভিং স্কিলস অ্যান্ড ইকোনমিক অপরচুনিটিজ ফর দি ওমেন অ্যান্ড ইয়থ ইন কক্সবাজার (আইজেক-ISEC)’ প্রকল্পের এক জরিপে দেখা যায়, কক্সবাজারে মার্কেট ও হোটেল খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের বেশ সুযোগ রয়েছে। তবে এসব খাতে এখনো নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে কম। 

২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৫ কক্সবাজারের স্থানীয় একটি হোটেলে আয়োজিত ‘আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি’ শীর্ষক এক অ্যাডভোকেসি সংলাপে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। আইজেক (ISEC) প্রকল্পের উদ্যোগে  অনুষ্ঠিত এই সংলাপে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগহণ বাড়াতে বিভিন্ন সুপরিশ তুলে ধরেন।  

নারীদের কর্মসংস্থানসহ সার্বিক উন্নয়নে উঠে আসা সুপারিশমালার মধ্যে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, স্থানীয় বাজারগুলিতে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ টয়লেট নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে ‘জেন্ডার চ্যাম্পিয়ন’ স্বীকৃতি প্রদান করে নারী-সহায়ক নীতি বাস্তবায়নকে উৎসাহিত করা এবং নারী শ্রমিকদের অভিযোগ সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ উল্লেখযোগ্য। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যৌথভাবে কাজ করা জরুরি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে বক্তারা মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে এই সংক্রান্ত জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস এন্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের প্রধান মাসুমা বিল্লাহ।  স্বাগত বক্তব্য এবং প্রকল্পের কার্যক্রম তুলে ধরবেন ব্র্যাক-এর আইজেক (ISEC) প্রকল্পের প্রধান খন্দকার ফখরুল আলম।

সংলাপ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার নীলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী, কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মুরশেদ চৌধুরী প্রমুখ।

এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক, বাজার কমিটি, নারী উদ্যোক্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ মোট ৫০ জনের অধিক অতিথি উপস্থিত ছিলেন।  

কক্সবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার নীলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী বলেন, ”আমরা কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চাই। তবে সে কাজ বাস্তবায়নে পর্যটনখাতে অবশ্যই নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”

কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ”যেকোনো কিছু টেকসই করার জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপত্তা। কক্সবাজারে নারী-পুরুষসহ সকল পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আমাদের সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।”
আমরা কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প কে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চাই। তবে সেটির জন্য পর্যটনখাতে অবশ্যই নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে

ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান কাজী রওশন আরা বলেন, “বাজার ও হোটেল খাতে নারীবান্ধব অবকাঠামো ও নীতি বাস্তবায়ন জরুরি। এতে শুধু নারীর কর্মসংস্থানই নয়, পুরো অর্থনীতি উপকৃত হবে।”
মাসুমা বিল্লাহ বলেন, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া নারীদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই বিভিন্ন বাধার কারণে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ দেশে ‘আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক’ খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়লে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ”

প্রসঙ্গত: আইজেক (ISEC) প্রকল্পটি কক্সবাজারের ৯টি উপজেলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার মান উন্নয়নে কাজ করছে। গ্লোবাল এফেয়ার্স কানাডার আর্থিক সহায়তায় ব্র‍্যাক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী (ইউএনডিপি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এই প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছে।

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো কক্সবাজার জেলার শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন যুব, নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে বাজার উপযোগী, জেন্ডার-সংবেদনশীল দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।

mzamin

দিল্লির চোখে নেপালের ছাত্ররা ভালো কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্ররা ভয়ঙ্কর কেনো?

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের পরই যেন যুদ্ধ আর সার্কাসের মঞ্চে পরিণত হয় ভারতীয় মিডিয়ার নিউজরুম আর স্টুডিওগুলো। ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা শুরু হয় বাংলাদেশের আন্দোলন মূলত কট্টরপন্থী। সেই সাথে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ছড়ানো শুরু হয় একের পর এক প্রোপাগাণ্ডা। দেশটির প্রায় সকল মিডিয়াই নগ্নভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো শুরু করে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের প্রথম শ্রেনীর নেতা ও সরকার নিয়ে। এদিকে সহিংস গণ অভ্যুত্থানের পর গত ৯ সেপ্টেম্বর পতন হয় নেপালের সরকারের। গণঅভ্যুত্থানের ফলে গঠিত নতুন অন্তবর্তী সরকার ও নেপালের ছাত্র জনতাকে সরাসরি শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

প্রশ্ন হচ্ছে, দিল্লির চোখে নেপালের ছাত্ররা ভালো কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্ররা ভয়ঙ্কর কেনো?

সোমালি অভিবাসীদের ট্রাম্প ‘আবর্জনা’ বলার জবাবে কী বললেন ইলহান ওমর

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় বসবাস করা সোমালি অভিবাসীদের নিয়ে আবারও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প তাঁদের ‘আবর্জনা’ বলেছেন। পাল্টা জবাবে ডেমোক্রেটিক দলীয় কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর বলেছেন, তাঁর প্রতি ট্রাম্পের আসক্তি বিরক্তিকর।

ইলহান সোমালি বংশোদ্ভূত প্রথম নারী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। মিনেসোটা থেকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প কংগ্রেস সদস্য ইলহান ও অন্য সোমালি অভিবাসীদের ‘আবর্জনা’ বলে উল্লেখ করে তাঁদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে চলে যেতে বলেন।

ট্রাম্পের এ মন্তব্যের জবাব দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেছে নেন ইলহান। তিনি লেখেন, ‘আমার প্রতি তাঁর আসক্তি বিরক্তিকর। জরুরি ভিত্তিতে তাঁর সাহায্য দরকার। আশা করি, তিনি সেটা পাবেন।’

গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প তাঁর অভিবাসীবিরোধী বক্তব্যের ধার অনেক বাড়িয়েছেন, বিশেষ করে গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে দুজন ন্যাশনাল গার্ড সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার পর। সন্দেহভাজন হামলাকারী আফগানিস্তান থেকে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন।

তালেবান আবার আফগানিস্তান দখলের পর যুক্তরাষ্ট্র সে দেশে উদ্ধার অভিযান চালায়। ওই অভিযানের অংশ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যান ওই বন্দুকধারী। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এসব ঘটনা ট্রাম্প সোমালিয়ার মতো ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ থেকে অভিবাসন কড়াকড়ি করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, ‘যদি আমরা আমাদের দেশে “আবর্জনা” ঢুকতে দিতেই থাকি, তবে আমরা ভুল পথে চলে যাব। ইলহান ওমর আবর্জনা। তিনি আবর্জনা। তাঁর বন্ধুরাও আবর্জনা।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এরা এমন মানুষ নয়, যারা কাজ করে। এরা এমন মানুষ নয়, যারা বলে, চল, এগিয়ে যাই। চল, এই জায়গাটা মহান করি। এরা শুধু অভিযোগ করে। এরা অভিযোগ করে এবং যেখান থেকে তারা এসেছিল, সেখানে কিছুই পায়নি।’

ইলহান ওমর সম্পর্কে ট্রাম্প প্রায় কিছুই জানেন না বলেও দাবি করেন। কিন্তু তিনি বছরের পর বছর ধরে তাঁকে (ইলহান) যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে অভিযোগ করে যেতে দেখেছেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, তিনি একজন অদক্ষ ব্যক্তি। তিনি সত্যিই একজন ভয়ংকর মানুষ।’

ইলহানের জন্ম সোমালিয়ায়। গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে আট বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে দেশ থেকে পালিয়ে যান। কেনিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে চার বছর কাটানোর পর ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তিনি ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-03%2Fa6mkewb4%2FIlhan-Omar.webp?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইলহান ওমর। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প আসলে ইউরোপের পিঠে ছুরি মেরেছেন by হ্যারল্ড জেমস

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ একটি ভয়াবহ ঘটনা। এর অবসান জরুরি। কিন্তু কীভাবে? যুদ্ধ এখন যেহেতু প্রায় অচলাবস্থায়, তাই এর রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা স্বাভাবিক। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন যে শান্তি পরিকল্পনা এসেছে (যার ভাষাবিন্যাস পুরোপুরি রুশ ক্রেমলিনের লেখা বলেই মনে হয়), তা দেখলে বোঝা যায়, এই রাজনৈতিক খেলায় পুরো সুবিধাটাই আক্রমণকারী পক্ষকে দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ২৮ দফা পরিকল্পনা চারটি আলাদা ঘটনার পরে আসে, যেগুলো প্রতিটিই একেকটি মোড় ঘোরানোর মতো অবস্থা তৈরি করেছিল।

প্রথমত, ইউক্রেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্বকে দুর্বল দেখানোর জন্য এবং ইউক্রেনের সরকার পরিবর্তনের দাবি তোলার জন্য ইউক্রেনের নিজস্ব দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো থেকে আসা এসব অভিযোগকে ব্যবহার করা হয়।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোকে লক্ষ্য করে আরও তীব্র ও অযৌক্তিক পারমাণবিক হামলার হুমকি দিচ্ছে। তারা এমন অস্ত্র পরীক্ষা করেছে বলে দাবি করছে, যা নাকি যুক্তরাজ্যসহ উত্তর ইউরোপের সমুদ্রতীরবর্তী নিচু এলাকার ওপর তেজস্ক্রিয় ‘সুনামি’ তৈরি করতে পারে। ক্রেমলিন বলছে, তাদের ‘বুরেভেস্তনিক’ নামের পারমাণুচালিত ক্রুজ মিসাইল কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে থামানো যাবে না। এসব হুমকির উদ্দেশ্য ইউরোপকে ভয় দেখানো, যাতে তারা ইউক্রেনকে আর সামরিক সহায়তা না দেয়।

তৃতীয়ত, ইউরোপের নানা দেশে ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ বা প্রথাবিরোধী জনতাবাদী দলগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরের বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধ বন্ধ করাকে তাদের প্রধান দাবি বানিয়েছে।

এদিকে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সরকারগুলোকে দুর্বল, অকার্যকর ও দিশাহারা দেখাচ্ছে। তারা বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করবে, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া কাটিয়ে উঠবে, কিংবা নিজেদের ভাঙা সমাজগুলোকে আবার একত্র করবে।

ফলে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউরোপে এমন এক নতুন রাজনীতির যুগ শুরু হচ্ছে, যেখানে মারিঁ লো পেনের ন্যাশনাল র‍্যালি ফ্রান্সে, অলটারনেটিভ ফিউর ডয়চল্যান্ড জার্মানিতে আর নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকে ব্রিটেনে ক্ষমতায় যেতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ ও ইউরোপীয় রাজনীতি নিয়ে নানা ধরনের ভুল তথ্য (ডিজইনফরমেশন) ছড়াচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাকি রাশিয়ার তেল কিনে নিষেধাজ্ঞা ভাঙছে। বাস্তবে, রুশ তেল কেনা এখন সীমাবদ্ধ মাত্র দুটি দেশে। এর একটি হলো হাঙ্গেরি; অপরটি স্লোভাকিয়া। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে হাঙ্গেরি। তাদের প্রকাশ্য ক্রেমলিনপন্থী সরকার ট্রাম্পের কাছে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা অব্যাহত রাখার অনুমতি চেয়েছিল। আর ট্রাম্প তাদের সে অনুমতি দিতে কোনো আপত্তিই করেননি।

সর্বশেষ মার্কিন শান্তি প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিভ্রান্তিকর বর্ণনা। এটি কিছু পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক বহুদিন ধরে তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি হলো, ন্যাটো নাকি রাশিয়ার জন্য হুমকি, আর রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে দেওয়া পশ্চিমা নিরাপত্তা-গ্যারান্টি নাকি রাশিয়ার সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ।

তাঁদের মতে, ১৯৯০-এর দশকে ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণই সেই বিস্ফোরক, যা ২১ শতকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে উড়িয়ে দেয় এবং রাশিয়াকে ২০১৪ সালে ‘প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে’ নামায় এবং ২০২২ সালে সে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়।

যাঁরা মনে করেন ন্যাটোর বিস্তারই ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণ, তারা মূলত ক্রেমলিনের কথাই বিশ্বাস করছেন। অর্থাৎ তাঁরা বিশ্বাস করেন, ন্যাটো রাশিয়ার জন্য আসল হুমকি। কিন্তু তারা আসল হুমকিটিকে, অর্থাৎ সফল গণতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে উপেক্ষা করছেন।

ক্রেমলিন এখনো উনিশ শতকের তিনটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে: অর্থোডক্স খ্রিষ্টিয়ানিটি, স্বৈরতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ। এই মানদণ্ডে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মানে অন্য দেশের আত্মনিয়ন্ত্রণ দমন করার অধিকার।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসে—সংঘাত কি ‘স্থির’ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব? কার্যকর যুদ্ধবিরতি হলে মানুষকে পুনর্বাসন করা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা যেত। কিন্তু এই যুদ্ধবিরতি যদি রাশিয়ার চাপানো রাজনৈতিক সমাধান থেকে আসে, তাহলে ইউক্রেন, ইউরোপ এবং পুরো বিশ্বের জন্য এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।

সংশোধিত ট্রাম্প পরিকল্পনায়ও গুরুতর সমস্যা আছে। সেখানে স্পষ্ট ও শক্তিশালী ন্যাটো-ধরনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি নেই। রাশিয়া আবার আক্রমণ করলে ঠিক কী করা হবে, তার বদলে শুধু বলা আছে—‘আলোচনা হবে’। এই অস্পষ্টতা পুরো পরিকল্পনাটিকে খুবই বিপজ্জনক করে তোলে।

ইউক্রেনের দৃষ্টিতে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা ছিল একধরনের ‘পেছন থেকে ছুরি মারা’। ইউক্রেনের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত না হলেও এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে দেশটি যুদ্ধেই হার মানবে। তখন ইউক্রেনের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে—এর দায় কার? এতে দেশের ঐকমত্যনির্ভর রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং দেশ আবার স্বৈরশাসনের দিকে হোঁচট খেতে পারে।

ট্রাম্পের মূল পরিকল্পনা ইউরোপ, ইউরোপের প্রতিষ্ঠান এবং তার বিশ্বদৃষ্টিকেও দুর্বল করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তখন কাগুজে বাঘ হিসেবে দেখা হবে। সবাই মনে করবে, তার বড় বড় কথা ও বড় বড় ধারণা আছে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রয়োগ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা নেই। এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়লে ইউরোপীয় রাজনীতিবিদেরা বেশি করে নতিস্বীকার করবে ডানপন্থী (এবং কিছু ক্ষেত্রে বামপন্থী) সেই শক্তিগুলোর কাছে, যারা অতীতের জাতীয় সার্বভৌমত্বকেই ফিরিয়ে আনতে চায়।

বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া দুই শক্তিশালী দেশ জার্মানি ও ফ্রান্সের জন্য এমন পরিবর্তন অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। বাকি বিশ্বের জন্যও মার্কিন অবস্থান ভয়াবহ ইঙ্গিত বহন করে। রাশিয়ার ইতিহাস বর্ণনাকে এমন সরলভাবে গ্রহণ করা জানিয়ে দেয়—বিশ্বে আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব এখন চূড়ান্ত পতনের দিকে। এর মধ্য দিয়ে যে বার্তা পাওয়া যায়, তা খুবই স্পষ্ট: এখন আমেরিকা কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করে না, তাই তাকে সহজেই কিনে ফেলা যায়।

হ্যারল্ড জেমস, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-28%2Fd317u8y0%2FTrump.jpg?rect=0%2C0%2C1132%2C755&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা মূলত পুতিনের হাতকেই শক্তিশালী করছে। ছবি : রয়টার্স

দায়মুক্তি দিলে পদত্যাগ করে ভেনেজুয়েলা ছাড়তে চেয়েছিলেন মাদুরো, রাজি হননি ট্রাম্প

রয়টার্সের প্রতিবেদনঃ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তায় নিরাপদে দেশ ছেড়ে পালানোর সব সুযোগ হারিয়েছেন। গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাদুরোর একটি সংক্ষিপ্ত ফোনালাপ হয়। এ সময় মাদুরোর একাধিক অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। ওই ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্র এমন তথ্য জানিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ওপর কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের মধ্যে গত ২১ নভেম্বর ট্রাম্পের সঙ্গে মাদুরোর ফোনালাপ হয়। এর আগে মার্কিন সেনারা গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিক থেকে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকায় অন্তত ২১টি হামলা চালান। এসব হামলায় ৮৩ জনের মতো নিহত হন। নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক চাপের অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন এসব অভিযান পরিচালনা করছে।

মাদুরো ও তাঁর সরকার এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, তেলসহ ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্র ‘সরকার পরিবর্তনের’ চেষ্টা করছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, ফোনালাপে মাদুরো ট্রাম্পকে বলেছেন, তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলায় ক্ষমা পেলে তিনি ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যেতে প্রস্তুত। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে চলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা তুলে নেওয়ার কথাও বলেন মাদুরো।

ওই তিনটি সূত্রের ভাষ্য, এ সময় ভেনেজুয়েলার শতাধিক সরকারি কর্মকর্তার ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেন মাদুরো। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, মাদক পাচার কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

অপর দিকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন নির্বাচনের আগে একটি অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে দিতে চান বলেও অনুরোধ করেন মাদুরো।

১৫ মিনিটের কম সময়ের ওই ফোনালাপে মাদুরোর অধিকাংশ অনুরোধই প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। তবে তিনি মাদুরোকে জানান, পরিবারের সদস্যসহ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পছন্দের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় পাবেন তিনি। দুটি সূত্রের মতে, সে সুযোগ গত শুক্রবার শেষ হয়ে যায়।

এদিকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভেনেজুয়েলার উপকূল ঘিরে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সন্দেহজনক মাদকবাহী নৌকায় বেশ কিছুদিন ধরে হামলা চালানো হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। রয়টার্স

গাজায় নতুন গণকবরের সন্ধান: হত্যার পর বুলডোজার দিয়ে বালি চাপা

গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের নতুন গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। যারা মানবিক সহায়তা সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহত হন তাদেরকে বুলডোজার দিয়ে বালি চাপা দিয়েছে দখলদার ইসরাইল বাহিনী। সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন। এতে বলা হয়, উপত্যকার জিকিম ক্রসিংয়ের কাছে সহায়তা নিতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং নিহতদের মৃতদেহ বুলডোজার দিয়ে বালিতে চাপা দেওয়ার প্রমাণ সামনে এসেছে।

জুনে পরিবারের জন্য আটা আনতে গিয়ে নিখোঁজ হন গাজার বাসিন্দা আম্মার ওয়াদি। যাওয়ার আগেই ফোনের স্ক্রিনে লিখে রেখেছিলেন- আমার কিছু হলে আমায় ক্ষমা করে দিয়ো মা। আমার ফোন যিনি পাবেন, পরিবারকে জানাবেন আমি মাকে খুব ভালোবাসি। পরে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি সেই ফোনটি খুঁজে পেয়ে বার্তাটি তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন। যা ছিল তাদের শেষ খবর। সিএনএন জানিয়েছে, জিকিম সীমান্তের আশপাশে গুলিবর্ষণে নিহতদের দেহ অনেক ক্ষেত্রেই মিলিটারি জোনে ফেলে রাখা হয়। অনেক সময় বুলডোজার চালিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়, আর অনেক দেহ উদ্ধার না হওয়ায় খোলা জায়গায় পচে-গলে পড়ে থাকে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃতদেহ এভাবে পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে- গ্রীষ্মজুড়ে জিকিম এলাকায় ব্যাপক বুলডোজার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। জুনে ঘটে যাওয়া এক হামলার পরের ভিডিওতে দেখা যায় উল্টে যাওয়া একটি ত্রাণ ট্রাকের চারপাশে আংশিক মাটিচাপা পড়ে থাকা দেহ। সাবেক দুই আইডিএফ সদস্য সিএনএনকে জানিয়েছেন, গাজার অন্যান্য অঞ্চলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তারা বর্ণনা করেছেন কিভাবে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ অগভীর কবরস্থানে বুলডোজার দিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আইডিএফ দাবি করেছে- তারা মৃতদেহ সরানোর জন্য বুলডোজার ব্যবহার করেনি। তবে তা দিয়ে কবর দেওয়া হয়েছিল কি না সে প্রশ্নের উত্তর তারা এড়িয়ে গেছে। আইডিএফ বলেছে, এলাকা সুরক্ষা, বিস্ফোরকের ঝুঁকি মোকাবিলা কিংবা রুটিন ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্য বুলডোজার ব্যবহৃত হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিশেষজ্ঞ জানিনা ডিল বলেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলোর দায়িত্ব নিহতদের এমনভাবে কবর দেওয়া যাতে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়। মৃতদেহ বিকৃত করা বা অসম্মানজনকভাবে কবরস্থ করা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ। জিকিম এলাকায় গুলির মাঝে ত্রাণ বহনকারী ফিলিস্তিনিদের ছুটে আসার একাধিক ভিডিও সিএনএন যাচাই করেছে। এক ভিডিওতে দেখা যায়- একজন ত্রাণ বহনকারীকে পিছন থেকে গুলি করা হচ্ছে। আরেকটিতে আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে আবার গুলি চলছে। এক ত্রাণ ট্রাক চালক বলেন, জিকিম দিয়ে গেলে প্রতিবারই লাশ দেখতে পাই। ইসরাইলি বুলডোজারগুলোকে মৃতদেহ মাটিচাপা দিতে দেখেছি। আরেকজন বলেন- এটা যেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল। সেখানে কী ঘটে কেউ জানে না।

জুনের মাঝামাঝি এক ঘটনায় একটি ত্রাণ ট্রাক ঘিরে ধরেন ক্ষুধার্ত মানুষজন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তখনই আইডিএফ গুলি চালায় এবং বহু মানুষ ট্রাকের নিচে পড়ে মারা যান। কয়েক দিন পর সিভিল ডিফেন্সের অ্যাম্বুলেন্স গিয়ে ১৫টি লাশ উদ্ধার করতে পারে, কিন্তু প্রায় ২০টি দেহ উদ্ধার না করেই ফিরে আসতে হয়। কারণ অ্যাম্বুলেন্স ভর্তি হয়ে গিয়েছিল।

এক আইডিএফ সদস্য জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে তাদের ঘাঁটির পাশে দুদিন ধরে পড়ে থাকা নয়টি মৃতদেহ বুলডোজার দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়। তিনি বলেন, কুকুরগুলো লাশ টেনে খাচ্ছিল। যে দৃশ্য দেখা ছিল অসহনীয়। মৃতদেহের পরিচয় নথিভুক্ত করার মতো কোনো চেষ্টা হয়নি। ইসরাইলি সৈন্যদের বয়ান সংগ্রহকারী সংগঠন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-ও জানিয়েছে- এ ধরনের আরও অনেক সাক্ষ্য তাদের কাছে এসেছে।
আম্মার ওয়াদির পরিবার এখনো তার খোঁজ পায়নি। তার মা নাওয়াল মুসলেহ বলেন, ছেলের কথা মনে পড়লেই চোখের পানি থামে না। আমরা যা-ই হোক মেনে নেব। শুধু জানতে চাই, তার কী হয়েছিল। গাজার সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল এখন নিখোঁজদের কবরস্থান হয়ে উঠেছে। যেখানে বহু মানুষ যে পথ ধরে ত্রাণ নিতে গিয়েছিলেন, সেই পথই তাদের শেষ যাত্রাপথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

mzamin

দিল্লির দূষিত বায়ুতে তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ২ লাখের বেশি মানুষ

দিল্লির বিষাক্ত বায়ু জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দিল্লির ছয়টি সরকারি হাসপাতালে তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি রোগীকে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, শীত আসলেই দিল্লি ও তার উপশহরগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নেয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই দিল্লির বায়ুর মান ইনডেক্স (একিউআই) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে ২০ গুণ বেশিতে অবস্থান করছে। বিশেষ করে পিএম ২.৫ কণার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। যা সরাসরি শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে ফুসফুসে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

দূষণের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। শিল্পকারখানার নির্গমন, যানবাহনের ধোঁয়া, তাপমাত্রা হ্রাস, বাতাসের গতি কমে যাওয়া এবং আশপাশের রাজ্যগুলোতে কৃষিজমির খড় পোড়ানোর মতো নানা কারণে পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির ছয়টি প্রধান হাসপাতালে ২০২২ সালে ৬৭ হাজার ৫৪টি, ২০২৩ সালে ৬৯ হাজার ২৯৩টি এবং ২০২৪ সালে ৬৮  হাজার ৪১১টি শ্বাসকষ্টের মামলা নথিভুক্ত হয়। সরকারের ভাষ্য, দূষণের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক দেখা গেছে, তবে এটি সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখানো সম্ভব নয়।

গত এক দশকে বেশ কয়েকবার দিল্লির গড় একিউআই ‘গুরুতর’ ৪০০-এর উপরে উঠেছে। যা সুস্থ মানুষদের জন্যও ক্ষতিকর এবং অসুস্থদের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। বুধবার সকালে সরকারি সমর্থিত ‘সফর’ অ্যাপ জানায়, দিল্লির গড় একিউআই ছিল প্রায় ৩৮০।

গত সপ্তাহে বিবিসি জানিয়েছে, দিল্লি ও আশপাশের হাসপাতালগুলোতে দূষিত বায়ুর কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া শিশুদের ভিড় বাড়ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপের দাবিতে দায়ের করা এক পিটিশনের শুনানি বুধবার দিল্লি হাই কোর্টে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে দেশটির সুপ্রিম কোর্টও গত কয়েক বছর ধরে দিল্লির অবনতিশীল বায়ুমান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

mzamin