Monday, November 10, 2025

ডেমোক্র্যাটরা সাবধান! ট্রাম্প প্রতিশোধের ছক কষছেন by জনাথন ফ্রিডল্যান্ড

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও মেয়র নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি হেরে গেছে। এতে ডেমোক্র্যাটরা, এমনকি বিশ্বের অনেক মানুষই খুশি। কিন্তু এখন তাদের সতর্ক হতে হবে, কারণ ট্রাম্প হার মানতে জানেন না। তিনি আর যেন না হারেন, সেই চেষ্টা তিনি করবেন। তার জন্য ন্যায্য বা অন্যায্য, যে কোনো পথে হাঁটতে তিনি কুণ্ঠাবোধ করবেন না।

এখন পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা পরস্পর গ্লাস ঠুকে জয় উদ্‌যাপন করছেন। কারণ, এই জয় এসেছে এমন সময়ে, যার ঠিক এক বছর আগে তাঁরা হোয়াইট হাউস, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—সবকিছু ট্রাম্পের কাছে হারিয়েছিলেন। সবচেয়ে নাটকীয় জয়টি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউইয়র্কে। সেখানে জোহরান মামদানি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

আমেরিকার অন্য প্রান্তেও ডেমোক্র্যাটরা সাফল্য পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে ভোট দিয়েছেন, যা কিনা ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এর মাঝেই নিউজার্সি ও ভার্জিনিয়ায় ডেমোক্র্যাটরা গভর্নর নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।

এই সাফল্যগুলো ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষ করে তাঁর নিজের শহর নিউইয়র্কে মামদানির জয়ে তিনি খুব বিরক্ত হয়েছেন। ট্রাম্প মামদানিকে ‘এক কমিউনিস্ট পাগল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর এই কথার পরই মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (মাগা) শিবির সক্রিয় হয়ে মামদানির বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছে।

নিউইয়র্ক পোস্ট প্রথম পাতায় মামদানির ব্যঙ্গ ছবি ছেপেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তাঁর হাতে হাতুড়ি ও কাস্তে। ওপরে লেখা ‘দ্য রেড অ্যাপল’। সেখানে ‘আর’ অক্ষরটি উল্টো করে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেটিকে সোভিয়েত প্রতীকের মতো লাগে। ফক্স বিজনেস চ্যানেলও ‘বলশেভিক’ ধাঁচের গ্রাফিকস ব্যবহার করে সমাজতন্ত্রের ‘বৈশ্বিক হুমকি’ নিয়ে অনুষ্ঠান করেছে।

রিপাবলিকানদের লক্ষ্য হলো, আগামী বছরের মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের ‘মামদানি মার্ক্সবাদী দল’ হিসেবে তুলে ধরা। তবে ডেমোক্র্যাটরা আত্মবিশ্বাসী। তারা মনে করে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানো ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ থাকলে এই আক্রমণ সামলানো সম্ভব। তারা রাজ্যভেদে ভিন্নভাবে কথা বললেও মূল বার্তা এক—মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা। ভার্জিনিয়া ও নিউ জার্সির প্রার্থীরাও মামদানির মতো এই ইস্যুই তুলেছেন; তবে আরও মধ্যপন্থী ও শান্ত ভাষায়।

এই কৌশল ২০২৬ সালের প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনে কাজ করতে পারে। কিন্তু ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (যেখানে একটি জাতীয় বার্তা ও একটি একক প্রার্থী নিয়ে শহর ও উপশহর উভয় শ্রেণির ভোটারকে একত্র করতে হবে) সেটি অনেক কঠিন কাজ হবে।

এই ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা রাজনীতিবিদদের গতানুগতিক কাজ হলেও এখন সামনে আছে আরও ভয়ানক হুমকি। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তিনি নিউইয়র্কে ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দিতে পারেন। মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, তিনি এর আগেও নজির ভেঙে ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেসে সেনা পাঠিয়েছেন এবং শিকাগো ও পোর্টল্যান্ডে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন।

এটি আসলে ট্রাম্পের আরও অনেক পদক্ষেপের মধ্যকার একটি। তিনি এখন থেকেই চেষ্টা করছেন যেন ২০২৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনগুলো এই সপ্তাহের নির্বাচনগুলোর মতো না হয়, অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে না যায়। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে মানুষ ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে ভোট দেয়। তাই অনেকের ধারণা, আগামী বছরে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ আবার নিজেদের দখলে নিতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে।

কিন্তু ট্রাম্প এমনটি হতে দিতে চান না। এ জন্যই তিনি টেক্সাসের রিপাবলিকানদের ওপর চাপ দিয়ে কংগ্রেসীয় সীমানা এমনভাবে পুনর্নির্ধারণ করিয়েছেন, যাতে পাঁচটি নতুন ‘নিরাপদ রিপাবলিকান আসন’ তৈরি হয়। তার জবাব হিসেবেই ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটরা নিজেরাও পুনর্বিন্যাস করে আরও পাঁচটি আসন বাড়াতে এবার ভোটারদের অনুমতি চেয়েছেন। ভোটাররা তাতে সম্মতি দিয়েছেন।

এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, মিসৌরি ও ইন্ডিয়ানার রিপাবলিকানদেরও একইভাবে এলাকা পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। ভোটাররা রিপাবলিকানদের ছেড়ে গেলেও যাতে হাউস রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে জন্য অতিরিক্ত আসন তারা সৃষ্টি করতে চায়।

তবে এই সপ্তাহের ফল বলছে, যদি নির্বাচন অবাধ হয়, তাহলে ডেমোক্র্যাটরা জিততে পারে এবং তারা ট্রাম্পের স্বৈরাচারী পথে বাধা দিতে পারে। কিন্তু নির্বাচন আদৌ অবাধ হবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।

জনাথন ফ্রিডল্যান্ড, গার্ডিয়ান পত্রিকার কলাম লেখক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব by স্মৃতি এস. পাটনায়েক

কাঠমাণ্ডু পোস্টের বিশ্লেষণঃ দেশজুড়ে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব ও জুলাই চার্টার নিয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে বাংলাদেশে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত কমিশন (এনসিসি)। সম্প্রতি কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের রোডম্যাপ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। এমনকি দলগুলোর মধ্যে গভীর বিভাজন রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অভিযোগ করেছে, জুলাই চার্টার বিষয়ে তাদের ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে- পরবর্তী সংসদ ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে গঠিত হবে। এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।

এ বছর ১৭ই অক্টোবর ২২টি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিতে ‘জুলাই চার্টার’ জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়। এটি ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর যাত্রার সূচনা হিসেবে ঘোষিত হয়। কারণ এনসিসি বেশিরভাগ সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য গড়ে তুলেছিল। তবে, ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) এবং পাঁচটি বামপন্থী দল এই চার্টারে সই করেনি। এনসিপি জানিয়েছে, চার্টার বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া তারা কোনো নথিতে সই করবে না।

বামপন্থী দলগুলো- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী) এবং বাংলাদেশ জাসদ মত দিয়েছে যে চার্টারে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-  প্রতিফলিত হয়নি। এসব সংশোধন না হলে তারা সই করবে না।
গণফোরাম, যারা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তারাও চার্টারে সই করেনি।

রাজনৈতিক বিভাজন
বিএনপি চায় গণভোট (রেফারেন্ডাম) ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে হোক। কিন্তু জামায়াতে ইসলামি চায়, গণভোটটি জাতীয় নির্বাচনের আগেই হোক। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ- যাদের দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ও তাদের মিত্র জাতীয় পার্টিকে পরামর্শ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়া হয়। মোট ৩৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে এনসিসি ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব দেয়। যার বিপরীতে ৫৮টি ভিন্নমত যুক্ত করা হয়। তার বেশিরভাগই বিএনপি, বাম দল ও জামায়াতের পক্ষ থেকে আসে।

জুলাই চার্টারের মূল বিষয়সমূহ
চার্টারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। তবে এতে এমন কিছু সংস্কার রয়েছে, যা সংবিধান সংশোধন ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- ২৭টি নির্বাচন সংস্কার, ২৩টি বিচার বিভাগীয় সংস্কার, ২৬টি প্রশাসনিক সংস্কার, ২৭টি দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত সংস্কার। গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- সংসদে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হতে হবে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস করতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই দফায় সীমিতকরণ করতে হবে, দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী পদ একসঙ্গে না রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ করতে হবে। চার্টারে বলা হয়েছে, আগামী সংসদ ২৭০ দিনের মধ্যে যদি চার্টারটি পাস না করে, তবে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। বিএনপি এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা শুধুমাত্র প্রেসিডেন্টের।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তন
চার্টারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল। এই সরকার নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে এবং এর প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে নির্বাচনের জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হবে। প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়স বাড়ানোর মাধ্যমে ২০০৬ সালে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়। পরে সেই বিচারপতি দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বিএনপি প্রেসিডেন্টকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে দেয়, যা প্রক্রিয়া-বহির্ভূত ছিল। পরে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ এই ব্যবস্থা বাতিল করে। যার ফলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন হয়। এর মধ্যে বিএনপি কেবল ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বেশিরভাগ দলের প্রধান দাবি। পাকিস্তানেও অনুরূপ একটি পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে, যদিও সেখানে ঐকমত্য পাওয়া কঠিন।

মূল অচলাবস্থা
বর্তমানে দুটি বড় প্রশ্ন রাজনৈতিক ঐকমত্যে বাধা সৃষ্টি করেছে। তা হলো গণভোটের সময়কাল। বিএনপি চায়, গণভোট জাতীয় নির্বাচনের দিনেই হোক। জামায়াত ও এনসিপি চায়, নির্বাচনের আগে হোক। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পাওয়া গেলে তবেই চার্টার কার্যকর হবে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো অনুপাতভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা (পিআর সিস্টেম)। জামায়াত, অন্যান্য ইসলামপন্থী দল ও এনসিপি মনে করে এই পদ্ধতি সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে। কিন্তু বিএনপি চায় প্রথমে ভোটে জয়ী পদ্ধতি বহাল থাকুক। কারণ অনুপাতভিত্তিক ভোটব্যবস্থা ছোট দলগুলোকে শক্তিশালী করবে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়াবে বলে তারা মনে করে।
নতুন রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার (আরপিও) অনুযায়ী প্রতিটি দলকে নিজেদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে হবে, যা বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক জোট ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

উপসংহার
দলের ভেতরের বিভাজনই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে জটিল করে তুলেছে। আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি বাদ দেয়া মানে দেশের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক মতামতকেও উপেক্ষা করা। দলটি যে জনঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, তা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে- ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর নির্মাণে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মত কি উপেক্ষিত থাকবে, নাকি এটি আবারও এক ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’-এর অধ্যায় হয়ে উঠবে?

(স্মৃতি এস. পাটনায়েক, একজন গবেষক, মানোহর পারিকার ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিস, নয়াদিল্লি, ভারত। কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে অনুবাদ)

https://mzamin.com/uploads/news/main/188218_Abul-1.webp

স্বৈরাশাসক সুহার্তো ইন্দোনেশিয়ার ‘জাতীয় নায়ক’

ইন্দোনেশিয়ার স্বৈরাশাসক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোকে জাতীয় নায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সুহার্তোর ‘নিউ অর্ডার’ শাসনামলে (১৯৬০-১৯৯০) ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তবে সেই সময় রাজনৈতিক দমনপীড়নও ভয়াবহ মাত্রায় চলে। সেই সময়কালেই হাজারো রাজনৈতিক বিরোধী নেতা নিহত হন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। দেশটিতে জাতীয় নায়ক পদটি বার্ষিকভাবে দেয়া হয়। এর মাধ্যমে দেশকে প্রদত্ত অবদানের জন্য ব্যক্তিদের সম্মান করা হয়। সোমবার জাকার্তার প্রেসিডেন্ট ভবনে এক অনুষ্ঠানে বর্তমান ইন্দোনেশিয়ান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ১০ জন নতুন নায়কের মধ্যে সুহার্তোকে অন্তর্ভুক্ত করেন। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট সুবিয়ান্তো হলেন সুহার্তোর সাবেক জামাই। অক্টোবর মাসে ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় প্রায় ৫০ জন প্রার্থীকে এই পদমর্যাদার জন্য মনোনীত করে।

এরপর তালিকা প্রকাশের পর সোমবার পুরষ্কার গ্রহণ করেন সুহার্তোর সন্তানরা। প্রেসিডেন্টের অফিসের লাইভস্ট্রিমে বক্তৃতায় বলা হয়, সুহার্তো ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৪৫ সালে জাকার্তায় যুদ্ধে জাপানি সেনাদের অস্ত্রসম্ভার নিষ্কাশনে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু সুহার্তোকে জাতীয় নায়ক হিসেবে সম্মান দেয়ার সিদ্ধান্তটি অনেক নাগরিকসমাজের বিরোধের মুখোমুখি হয়েছে। গত সপ্তাহে প্রায় ১০০ মানুষ জাকার্তায় সুহার্তোর মনোনয়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যোগ দেয়। প্রায় ১৬,০০০ মানুষ অনলাইনে স্বাক্ষর করেছে একই দাবিতে। সোমবার জাকার্তায় আরেকটি প্রতিবাদ হয়। এ জন্য শত শত নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়।

mzamin

সেই শারা ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন

যে আহমেদ শারা’র মাথার মূল্য এক কোটি ডলার ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, সেই শারাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওয়াশিংটনে হবে এই বৈঠক। আহমেদ শারা এখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট। তিনি আনুষ্ঠানিক সফরে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন। এর মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী’ তালিকা থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। সাবেক ইসলামি যোদ্ধা আহমেদ শারা সোমবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে তার বিদ্রোহী জোট ক্ষমতাচ্যুত করে ১১ মাস আগে। এরপর সৌদি আরবের রিয়াদে প্রথম ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আহমেদ শারা’র। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা আগে সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী তথাকথিত ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর সন্দেহভাজন ডজনখানেক সদস্যকে আটক করেছে বলে ঘোষণা দেয়। সিরিয়ায় ওই জঙ্গিগোষ্ঠীর অবশিষ্ট অংশ নির্মূলের যৌথ প্রচেষ্টা ট্রাম্প ও শারা’র আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিরীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ইসলামিক স্টেটের সন্দেহভাজন ৭১ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে আহমেদ শারা সিরিয়াকে পুনরায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশটি আসাদ শাসনের অধীনে বহু বছর বিচ্ছিন্ন ছিল এবং ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে জর্জরিত। তিনি এ বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। সেখানে তিনি বলেন, সিরিয়া আবারও বিশ্বের জাতিগুলোর মধ্যে তার যথার্থ অবস্থান পুনরুদ্ধার করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। এ সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে সমর্থন জানায়। এটি ওয়াশিংটনের মাসব্যাপী ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। শুক্রবার আহমেদ শারা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনাস হাসান খাত্তাবের নাম যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ-অর্থায়নে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট জানায়, সিরীয় নেতৃত্ব যে অগ্রগতি প্রদর্শন করেছে তার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শারা’র নাম এর আগে ‘মুহাম্মদ আল-জাওলানি’ নামে তালিকাভুক্ত ছিল। এটি ছিল তার ছদ্মনাম। তখন তিনি হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর নেতা ছিলেন। এই গোষ্ঠী ২০১৬ সাল পর্যন্ত আল-কায়েদার সহযোগী ছিল। পরে শারা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এইচটিএস নেতৃত্বের আগে শারা ইরাকে আল-কায়েদার হয়ে যুদ্ধ করেন এবং একসময় মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দী ছিলেন। তার মাথার দাম ছিল এক কোটি ডলার। এ বছর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র এইচটিএস-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ট্রাম্প এর আগে মে মাসে রিয়াদ সফরের সময় শারা’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে বর্ণনা করেন একজন কঠিন মানুষ, অতীতে অনেক শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে। তার অতীত সত্ত্বেও, শারা এমন সব সরকারের সমর্থন পেয়েছেন যারা আসাদ শাসনের বিরোধিতা করেছিল। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন একটি মধ্যপন্থী সরকার গঠনের, যা সিরিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও গোষ্ঠীর সমর্থন পেতে সক্ষম হবে।

এ বছর তিনি ঘোষণা দেন, তার নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব সদস্য সিরিয়ার আলাওয়ি সংখ্যালঘুদের হত্যা করেছে বলে অভিযোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সুন্নি বেদুইন উপজাতি যোদ্ধা ও দ্রুজ মিলিশিয়াদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ দেখা দিয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- এইচটিএস-নেতৃত্বাধীন সরকার কি সত্যিই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবে?

mzamin

২৬ মার্কিন ধনকুবেরের সোয়া দুই কোটি ডলারও মামদানির জয় ঠেকাতে পারেনি

নিউইয়র্ক নগরের মেয়র নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর জন্য নগর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মুদিদোকান চালানো, বিনা মূল্যে গণপরিবহন এবং শিশু পরিচর্যার মতো নীতির প্রচার চালিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির জোহরান মামদানি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

জোহরান মামদানির এই প্রগতিশীল কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী কিছু ব্যক্তির নিশানায় পড়ে গিয়েছিলেন। ফোর্বসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৬ জন ধনকুবের এবং ধনী পরিবার সম্মিলিতভাবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনী প্রচারে ব্যয়ের জন্য ২ কোটি ২০ লাখ ডলার (প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা) দিয়েছে।

বিলিয়নিয়ারদের বিপুল অর্থায়ন

জোহরানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অর্থদাতাদের মধ্যে ছিলেন ব্লুমবার্গ এলপির সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ব্লুমবার্গ, হেজ ফান্ড ম্যানেজার বিল অ্যাকম্যান, এয়ারবিএনবির সহপ্রতিষ্ঠাতা জো গেবিয়া এবং এসটি লডারের উত্তরাধিকারী লডার পরিবারের সদস্যরা। এঁরা প্রত্যেকে অ্যান্ড্রু কুমোর প্রচার শিবিরকে কমপক্ষে ১ লাখ ডলার করে দিয়েছিলেন।

মাইকেল ব্লুমবার্গ একাই ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিসহ পুরো নির্বাচনে কুমোর প্রচাররের জন্য ৮৩ লাখ ডলার দিয়েছিলেন। অন্যদিকে অ্যাকম্যান ১৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং লডার ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার দান করেছিলেন।

মোট অনুদানের অর্ধেকের বেশি প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ডলার ২৪ জুন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই এসেছিল। দলীয় প্রাইমারিতে কুমোকে হারিয়ে মামদানি মনোনয়ন নিশ্চিত করেন।

অন্যান্য বড় দাতার মধ্যে ছিলেন নেটফ্লিক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হেস্টিংস এবং গণমাধ্যম উদ্যোক্তা ব্যারি ডিলার। তাঁরা প্রত্যেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার করে দিয়েছিলেন।

ক্যাসিনো ব্যবসায়ী স্টিভ উইন অক্টোবরে ৫ লাখ ডলার এবং তেল ব্যবসায়ী জন হেস কয়েক মাসে ১০ লাখ ডলার দেওয়ার মাধ্যমে রক্ষণশীল দাতারাও এই লড়াইয়ে অংশ নেন।

জোহরানের প্রতিক্রিয়া

ফোর্বস অনুসারে, ১৩ অক্টোবর এক জনসভায় ধনকুবেরদের বিরোধিতার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জোহরান মামদানি বলেছিলেন, ‘বিল অ্যাকম্যান এবং রোনাল্ড লডারের মতো ধনকুবেরেরা এই নির্বাচনে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছেন। কারণ তাঁরা বলেন, আমরা অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করছি। আমি এখানে একটি কথা স্বীকার করছি, তাঁরা ঠিকই বলছেন।’

ফোর্বস এমন ২৬ জন ধনকুবেরের নাম পেয়েছে, যাঁরা জোহরানের প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্বাচনী প্রচারের জন্য অর্থ দিয়েছেন। এঁদের মধ্যে ১৬ জনই নিউইয়র্ক নগরের বাসিন্দা।

জোহরানবিরোধী প্রচারে অর্থদাতা অন্যান্যের মধ্যে রয়েছেন জো গেবিয়া (৩০ লাখ ডলার), উইলিয়াম লডার ও পরিবার (২৬ লাখ), ব্যারি ডিলার (৫ লাখ), রিড হেস্টিংস (২ লাখ ৫০ হাজার), অ্যালিস ওয়ালটন (২ লাখ)।

জয়ের পর সমর্থনের প্রস্তাব

মজার বিষয় হলো, ফরচুন-এর খবর অনুযায়ী, প্রথমে জোহরান মামদানির বিরোধিতা করা কিছু ওয়াল স্ট্রিট ব্যক্তিত্ব জয়ের পর তাঁকে সমর্থনের প্রস্তাব দিয়েছেন। অ্যাকম্যান এক্সে এক পোস্টে জোহরানকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, ‘এখন আপনার একটি বড় দায়িত্ব। আমি নিউইয়র্ক নগরকে সাহায্য করতে পারি। আমাকে শুধু জানাবেন, আমি কী করতে পারি।’

জেপি মরগান চেজের সিইও জেমি ডিমন আগে ফরচুনকে বলেছিলেন, জোহরান মামদানি ‘সমাজতান্ত্রিকের চেয়ে বেশি মার্ক্সবাদী’।

অবশ্য জোহরানের মামদানির জয়ের পর ৫ নভেম্বর সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিমন বলেন, তিনি যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী। ডিমন বলেন, ‘যদি আমি এটিকে ফলপ্রসূ মনে করি, তবে আমি তা চালিয়ে যাব। যেকোনো মেয়র, যেকোনো গভর্নরকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।’
জোহরান ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি মেয়রের দায়িত্ব নেবেন।

জোহরান মামদানি
জোহরান মামদানি। ফাইল ছবি: এএফপি

ইউক্রেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ধসিয়ে দিয়েছে রাশিয়া, অন্ধকারে বিভিন্ন অঞ্চল

ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে রাশিয়া ব্যাপক হামলা চালানোর পর দেশটিতে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন অঞ্চল। আজ রোববার ৮ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিভ্রাটের সতকর্তা জারি করেছে দেশটির বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ইউক্রেনেরর্গো। হামলার জেরে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ‘শূন্যের’ কোঠায় নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

গত কয়েক মাসে ইউক্রেনের বিভিন্ন অবকাঠামোয় হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে রাশিয়া। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে শুক্রবার থেকে শনিবার পর্যন্ত কয়েক শ ড্রোন হামলা চালিয়েছে মস্কো। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।

ইউক্রেনের্গো জানিয়েছে, ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। গত শনিবার ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ভিতলানা গ্রিনচুক জানিয়েছেন, কিয়েভ, নিপ্রোপেত্রাভস্ক, দোনেৎস্ক, খারকিভ, পলতাভা, চেরনিহিভ ও সুমিতে সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে সেখানে নিয়মিত বিদ্যুৎবিভ্রাট থাকবে।

স্থানীয় টেলিভিশন ইউনাইটেড নিউজকে ভিতলানা গ্রিনচুক বলেছেন, শত্রুরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এটি প্রতিহত করা খুব কঠিন। আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর এমন হামলা হয়নি।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিয়া জানিয়েছেন, রুশ ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্দ্রি সিবিয়া তাঁর টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, ‘রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকির জবাব দিতে আমরা আইএইএর গভর্নর বোর্ডের জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানাচ্ছি।’

হামলা বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চীন ও ভারতের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশ দুটি রাশিয়ার জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে পরিচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার কারণে শীতের আগে ইউক্রেনের তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশটির শীর্ষ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ওলেকজান্দ্রা খারচেঙ্কো সতর্ক করে বলেছেন, তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসবে, তখন কিয়েভের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তাপকেন্দ্র তিন দিনের বেশি বন্ধ থাকলে রাজধানীতে ‘প্রযুক্তিগত বিপর্যয়’ তৈরি হবে।

রুশ হামলার কারণে বিদ্যুৎবিভ্রাট চলছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়ক দিয়ে চলাচল করছে যানবাহন ও পথচারীরা। গতকাল শনিবার ইউক্রেনের খারকিভে
রুশ হামলার কারণে বিদ্যুৎবিভ্রাট চলছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়ক দিয়ে চলাচল করছে যানবাহন ও পথচারীরা। গতকাল শনিবার ইউক্রেনের খারকিভে। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় নিহত ৬৯ হাজার ছাড়াল

ফিলিস্তিনের গাজা যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে শান্তিচুক্তির এক মাস পূর্ণ হয়েছে। তবে এ সময় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজার বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত শনিবারও উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গত দুই বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজার নিহতের সংখ্যা ৬৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ইসরায়েলি হামলায় বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে একজন ফিলিস্তিনি পুরুষ নিহত হয়েছেন। অপর দিকে ইসরায়েলি বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উত্তর ও দক্ষিণ গাজায় তথাকথিত ‘হলুদ লাইন’ অতিক্রম করার অভিযোগে দুজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ২৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৯ হাজার ১৬৯ হয়েছে।

হামাস জানিয়েছে, তারা হাদার গোল্ডিন নামের একজন ইসরায়েলি সেনার মরদেহ উদ্ধার করেছে। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলি হামলার সময় আটক করা হয়েছিল। পরে তাঁর মৃত্যুর খবর জানা যায়। যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলকে আরও পাঁচজন জিম্মির মরদেহ ফেরত দেওয়ার কথা হামাসের। গোল্ডিন তাঁদের একজন। হামাস জানিয়েছে, ওই স্থান থেকে ছয়জন ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করেছে তারা। গত শনিবার ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাস ও রেডক্রসের কর্মীদের রাফায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি এলাকায় গোল্ডিনের মরদেহ খুঁজে বের করতে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে গাজা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেন ইস্যুতে অনড় রাশিয়া, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে প্রস্তুত ল্যাভরভ

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ রোববার জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাতে প্রস্তুত। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে রাশিয়ার মূল শর্তগুলো থেকে এক ইঞ্চিও সরে আসবে না তার দেশ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে চেষ্টা চালালেও এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের সমাধান হয়নি। গত মাসে তিনি হঠাৎ করেই হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠক বাতিল করেন।

পশ্চিমা গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছিল যে বৈঠক বাতিলের পর পুতিন নাকি ল্যাভরভের প্রতি ক্ষুব্ধ। তবে ক্রেমলিন শুক্রবার এ দাবি উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, রাশিয়া এখনো ইউক্রেন ইস্যুতে নিজের অবস্থান থেকে সরেনি। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা রিয়া নভোস্তিকে ল্যাভরভ বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং আমি বুঝতে পারি যে নিয়মিত যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। ইউক্রেন ইস্যু ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আমরা ফোনে কথা বলি এবং প্রয়োজনে মুখোমুখি বৈঠকের জন্যও প্রস্তুত আছি।

রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ১৯ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। যেগুলোকে তারা নিজেদের আইনগত অংশ বলে দাবি করছে। ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো অবশ্য এই দখল স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়। ল্যাভরভ বলেন, আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে পুতিন ও ট্রাম্পের শীর্ষ বৈঠকে যেসব বোঝাপড়া হয়েছিল। তা পুতিনের ২০২৪ সালের জুনের দাবি ও ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফের প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ একটি বৈঠকে কাজাখস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরমেক কোশারবায়েভের (ছবিতে নেই) সঙ্গে কথা বলছেন। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয়, ২২ অক্টোবর ২০২৫
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। প্রথম আলো