Friday, July 18, 2014

বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অনিবার্য -সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

সংসদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতের জন্য উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসনের (অপসারণ) ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া ‘অনিবার্য’ বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত  সেনগুপ্ত। তিনি বলেছেন, ‘সংসদের কাছে সকল বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সার্বভৌম সংসদ হয় না। সংসদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতের জন্যই সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা অনিবার্য।’ গতকাল সংসদীয় কমিটির বৈঠক  শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সুরঞ্জিত এ কথা বলেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ছিল। পরবর্তীতে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান বলে এই অনুচ্ছেদ বাতিল করেন। পরে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের’ কাছে  দেয়া হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বিচারকদের পদের  মেয়াদ’ শীর্ষক ৯৬ অনুচ্ছেদে ২ দফায় বলা হয়েছে ‘প্রমাণিত ও অসাদচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত প্রেসিডেন্টের আদেশ ব্যতীত  কোন বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।’ বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়ার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরেই এমপিরা দাবি জানিয়ে আসছেন। বিগত মহাজোট সরকারের সময়ে ২০১২ সালে তৎকালীন স্পিকার ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের একটি রুলিংকে  কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণের দাবি সংসদে তোলেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। ওই সময় বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে  দেয়ার দাবি করেন বেশ কিছু সংসদ সদস্য। সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর সময়ে এ নিয়ে আলোচনা উঠলেও ৯৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন করা হয়নি। গত ২৬শে জুন সংসদীয় কমিটির  বৈঠকে আইন কমিশনও একই সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা  দেয়। গতকাল সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘পত্র-পত্রিকা এবং কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে শুনেছি ৯৬ অনুচ্ছেদ আগের মতো ফিরিয়ে আনা হবে। ৭২-এর সংবিধানে যেসব মৌলিক অবস্থান ছিল তার মধ্যে এটি অন্যতম।’ ‘রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ সংসদের কাছে দায়বদ্ধ।  প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী বানায় সংসদ। আবার তাদের তাড়ায়ও সংসদ। তেমনি বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতাও সংসদের কাছে থাকা উচিত। কিন্তু একধরনের ভাব আছে-বিচার বিভাগের আবার জবাবদিহিতা কি?’ তিনি বলেন, ‘সামরিক  ঘোষণা দিয়ে ৯৬ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করা হয়েছিল। পরে ৫ম সংশোধনী বাতিল করে উচ্চ আদালতের রায় দিল। কিন্তু এটি ঠিক রেখে দিলো। সব যদি অবৈধ হয় তাহলে এটাওতো অবৈধ। বলা হলো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করা হবে। আজ অবধি একটিও গঠন হয়নি।’ নবম সংসদে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে গঠিত বিশেষ কমিটির এই কো-চেয়ারম্যান বলেন, ‘সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে এটা আসলে স্বাভাবিক ছিল। তাহলে এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতো না। আমি আপ্রাণ  চেষ্টা করেছিলাম। ভেতরে-বাইরে বিরোধিতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও  ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’। তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি সেটেলড ইস্যু। এনিয়ে বিতর্কের অবকাশ  নেই। পৃথিবীর দেশে দেশে  যেখানে সার্বভৌম সংসদ আছে  সেখানে বিচারবিভাগ সংসদের কাছে দায়বদ্ধ।’ রাষ্ট্র পরিচালনায় সমন্বয় থাকার জন্য ৯৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তসলিমা কেন দেশে ফিরতে চান?

বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকার যাতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করে এ জন্য তিনি সরকারকে অনুরোধ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাই কমিশনে গিয়ে ধরনা দিয়েছেন তার পাসপোর্ট নবায়নের জন্য। কিন্তু বার বারই শূন্য হাতে ফিরেছেন। তসলিমা নাসরিনের ভাষায়, এ বিষয়ে আমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কেন তা করা হয়েছে তার পিছনে কোন কারণ দেখানো হয় নি। তবে দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। কিন্তু তারা তো সরকারের নির্দেশনার বিরুদ্ধে যেতে পারেন না। তবু তসলিমা দেশে ফেরার চেষ্টা চালিয়েই যাবেন। অনলাইন বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ সব কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, তসলিমা নাসরিনের বয়স এখন ৫২ বছর। তিনি ইসলামের তীব্র সমালোচক। এ জন্য কট্টর মুসলমানদের পক্ষ থেকে হত্যার হুমকি দেয়ার পর তিনি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এর পরপরই তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট বাতিল করা হয়। তিনি প্রথমে চলে যান ভারতে। কিন্তু সেখানেও প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মুখে ২০০৮ সালে তিনি সুইডেন চলে যান। তারপর ফিরে আসেন ভারতে। এবারও স্থানীয় মুসলমানরা দেশে তার অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেন। এর পর থেকে তিনি ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে বসবাস করছেন। বাংলাদেশ তার নাগরিকত্ব দেয়া নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেনি। তবে তসলিমা নাসরিন দেশে ফিরতে নাছোড়বান্দা। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির খালেদা জিয়া অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার- যে বা যিনিই ক্ষমতায় থাকুন না কেন তাদের অবস্থানের কোন পার্থক্য নেই। তসলিমা নাসরিনকে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টিতে তারা সবাই একতাবদ্ধ। এ বিষয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, আমার লড়াই চলতেই থাকবে। সহজে আমি হার মানবো না। দিল্লির এপার্টমেন্টে বসে তিনি এ সব কথা বলেন বিবিসি’র সাংবাদিককে। ভারত সরকারের সঙ্গে তার ভিসা নিয়ে দীর্ঘ দিনের লড়াই শেষে এখানেই অবস্থান নিয়েছেন। গত দু’দশক ধরে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেনে বসবাস করার পর তিনি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাকে দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু এখানে তিনি অবস্থান করেন স্বল্প সময়ের জন্য। সেখানে তার উপস্থিতির বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। তিনি ২০০৮ সালে ওই শহর ছাড়তে বাধ্য হন। দিল্লিতে তার এপার্টমেন্টের প্রতিটি দেয়ালে বইয়ের শেলফ। তিনি সেখানে ব্যস্ত জীবন কাটান। পড়াশোনা ও লেখালেখির বাইরে সামাজিক মিডিয়া টুইটারে রয়েছে তার সরব উপস্থিতি। এছাড়া পোষা বিড়াল মিনুকে নিয়ে সময় কাটান। এ সবের বাইরে তিনি মাঝে মাঝেই বাংলাদেশ হাই কমিশনের দরজায় গিয়ে হাজির হন। তসলিমা নাসরিন বলেন, আমার লেখার বিরোধিতা করে বাংলাদেশের কট্টর ইসলামপন্থি ছোট্ট একটি গ্রুপ। কিন্তু সরকার কেন এসব মানুষকে ভয় পায়? তারা আমার মত মেনে নিতে পারে না বলেই কি আমি দেশের বাইরে থাকবো? নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন নি তসলিমা। তিনি বলেন, আমি আমার ক্ষোভ দিয়ে সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছি। সেই ক্ষোভ ছাড়া আমি কিছুই নই। তাই এর সঙ্গে কোন সমঝোতা নয়। তসলিমা বলেছেন, তিনি ভারতের নতুন সরকারকে বাংলাদেশের কাছে তার বিষয় তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, যদি তারা তা করতে পারেন তাহলে তিনি তাদের কাছে অসীম কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ থাকবেন। বিবিসি লিখেছে, রাশিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী লেখক আলেকসান্দর সোলজেনিৎসিন ১৬ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরেছেন। ফরাসি লেখক এমিল জোলা লন্ডন থেকে ফিরেছেন দেশে। তসলিমা নাসরিনের বেলায় ২০ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানেন, সরকারিভাবে তিনি এ দেশের নাগরিক নন, যে দেশকে তিনি নিজের দেশ বলছেন। তিনি বুঝতে পারেন এর কারণ কি। তবে সে জন্য তিনি পিছিয়ে যাবেন না। তিনি বলেন, দেখুন এটা শুধু আমার একার সঙ্গে করা হচ্ছে এমন নয়। এটা মুক্তভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়।

যুদ্ধবিরতির সময়ও ইসরায়েলি হামলা থামেনি

ইসরায়েল ও গাজার মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির সময়ও হামলা থামেনি। দুই পক্ষই হামলার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। এদিকে মিসরের মধ্যস্থতায় কায়রো আলোচনায় সমন্বিত যুদ্ধবিরতির খবর নাকচ করে দিয়েছে দুই পক্ষই। ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবিগদর লিবারম্যান বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির খবর সঠিক নয়।’ অন্যদিকে হামাস বলছে, কোনো যুদ্ধবিরতি হয়নি। তবে মিসরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার খবর বেরিয়েছিল, ইসরায়েল ও গাজা সমন্বিত যুদ্ধবিরতিতে ‘সম্মত’ হয়েছে। মিসরের মধ্যস্থতায় কায়রোতে আলোচনা শেষে ওই যুদ্ধবিরতি হয় বলে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন। খবর এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি ও আল-জাজিরার।
এর আগে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের আহ্বানে গতকাল পাঁচ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরায়েল ও হামাস।৭ জুলাই থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় গতকাল পর্যন্ত ১০ দিনে ২২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার ৭০০ জন।
প্রতিবেশী মিসরের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ গতকাল কায়রোয় আলোচনায় বসে। আলোচনার একপর্যায়ে ইসরায়েলি একজন কর্মকর্তা যুদ্ধবিরতিতে ‘সম্মত’ হওয়ার খবর জানান।ওই কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে। কাল (আজ শুক্রবার) থেকে তা কার্যকর হবে।’ তবে রয়টার্সের খবরেই বলা হয়, মিসরে ইসরায়েলের শুধু জ্যেষ্ঠ নেতারা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসরায়েলি শীর্ষ নেতারা যুদ্ধবিরতির বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
কিন্তু গাজায় ক্ষমতাসীন হামাস ওই খবর অস্বীকার করে। হামাস জানায়, কায়রোর আলোচনায় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে যুদ্ধবিরতির আলোচনা এগিয়ে চলছে। মিসরের আলোচনায় অংশ নেয়নি হামাস। ওই আলোচনায় যোগ দেওয়া ফিলিস্তিনি সংগঠন ফাতাহর প্রতিনিধি আজ্জা আল-আহমাদ আল-জাজিরা টেলিভিশনকে বলেন, কায়রোর আলোচনায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মতৈক্য হয়নি, তবে আলোচনা চলছে। সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি: গাজার বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের সুযোগ দিতে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দুই পক্ষ। ইসরায়েল এটিকে ‘মানবিক যুদ্ধবিরতি’ বলছে৷ গাজায় জাতিসংঘের ত্রাণ পরিচালনা কার্যক্রমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংক্ষিপ্ত এই যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাঁদের জরুরি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। এই কার্যক্রমের মুখপাত্র ক্রিস গানেস বলেন, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
গাজার বাসিন্দারা সংক্ষিপ্ত এই যুদ্ধবিরতির সময় নিত্যপণ্য সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেন। এ সময় গাজার প্রধান সড়কগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দুই ঘণ্টার মধ্যেই গাজা থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে অন্তত তিনটি রকেট ছোড়া হয়েছে। পাল্টা অভিযোগে হামাস বলেছে, যুদ্ধবিরতির সময় গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফায় মর্টার শেল নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ইসরায়েল-হামাস সংক্ষিপ্ত এই যুদ্ধবিরতি গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শুরু হয়ে বিকেল তিনটায় শেষ হয়। এর মধ্যেই মিসর থেকে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধবিরতিতে ‘সম্মত’ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মিনিট কয়েক আগেই গাজার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলায় তিন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হন। ফিলিস্তিনের জরুরি সার্ভিসের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা গতকাল জানান, ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলায় তিনজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি চারজন গুরুতর আহত হন। হামলায় ইসরায়েলের ছয়টি ট্যাংক অংশ নেয়।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৭ জুলাই ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ওই অভিযানে গতকাল পর্যন্ত ২২৭ ফিলিস্তিনি নিহত হন। আহত হন অন্তত এক হাজার ৭০০ জন। এঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।
যুদ্ধবিরতির জন্য সব উপায় ব্যবহার করা হবে: ওবামা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বুধবার হোয়াইট হাউসে বলেন, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান সহিংসতার অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র তার সব কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও সম্পর্ক ব্যবহার করবে।
দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য মিসরের প্রচেষ্টাকে ওয়াশিংটন সমর্থন করে উল্লেখ করে ওবামা বলেন, কার্যকর যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে তার অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। ওই অংশীদারদের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ রেখে চলছে হোয়াইট হাউস।
ওবামা বলেন, গাজা থেকে ছোড়া রকেট হামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে। কিন্তু গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির বিষয়টিও দুঃখজনক।
‘ইসরায়েল বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে’ -বিল ক্লিনটন
বিশ্বসম্প্রদায় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার বিষয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় উপর্যুপরি ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য করলেন তিনি। খবর এএফপির।
বিল ক্লিনটন বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। গত বুধবার তিনি ভারতের সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন।
বিল ক্লিনটন বলেন, একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিতে ইসরায়েল নিজেকে বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এটা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জন্য ভালো কিছু নয়। স্বল্প বা মধ্যমেয়াদে হামাস ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি বেসামরিক লোকদের হত্যা করতে বাধ্য করার মাধ্যমে দেশটিকে সাধারণ মানুষের কাছে ভীতিকর করে তুলছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ক্লিনটন বলেন, হামাস একটি কৌশল নিয়েছে। সেটি হলো, তারা তাদের বেসামরিক লোকদের হত্যা করতে ইসরায়েলকে বাধ্য করবে, যাতে করে বাকি বিশ্ব ইসরায়েলের নিন্দায় সরব হয়। আবার ইসরায়েল রকেট হামলার মুখে হাত গুটিয়ে বসেও থাকতে পারবে না।
ঐতিহাসিক ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন। বর্তমান সংকট নিরসনে তিনি একটি কার্যকর সংলাপে বসতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান। ক্লিনটন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুই পারেন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি নিবিড় শান্তিচুক্তি করতে। তাঁর এটা করা উচিত।’ সেটা করলে শতকরা ৬০ ভাগ ইসরায়েলিই নেতানিয়াহুকে সমর্থন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলকে স্থল অভিযান বন্ধ করতেই হবে: আব্বাস
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজায় স্থল অভিযান বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আরও রক্ত ঝরবে। সহিংসতা বন্ধের চেষ্টা জটিল হয়ে উঠবে।
ইসরায়েলের হামলায় গত ১১ দিনে গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫৮ জনে পৌঁছেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার মিসরের রাজধানী কায়রোতে সে দেশের বৃদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় আব্বাস স্থল অভিযান বন্ধের আহ্বান জানান। মিসরের সংবাদ সংস্থা মিনার বরাত দিয়ে এএফপিতে এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।
আব্বাসের ওই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগেই গাজায় ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরু হয়েছে। আজ শুক্রবার চালানো ইসরায়েলের স্থল অভিযানে শেজাইয়াহ নামের এক ব্যক্তিসহ সাতজন নিহত হয়েছেন।
জরুরি বিভাগের মুখপাত্র আশরাফ আল কুর্দ জানান, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। এ নিয়ে ১১ দিনে গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫৮ জনে পৌঁছাল।
গতকাল আব্বাস মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির সঙ্গে দেখা করেন। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জঙ্গি দল হামাসের মধ্যে সহিংসতা নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আব্বাস ওই সফর করেন। আজ শুক্রবার আব্বাস তুরস্কে যাবেন। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সেখান থেকে তিনি বাহরাইন ও কাতারে যাবেন।
মানবাধিকার সংস্থার মতে, গাজায় হামলার শিকার ৮০ শতাংশেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক। হামলায় এক হাজার ৯২০ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ফিলিস্তিন-শাসিত গাজার নিয়ন্ত্রক হামাস ও ইসরায়েল পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে যুদ্ধবিরতির সময়ও হামলা বন্ধ হয়নি।
ইসরায়েলের অভিযোগ, সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে গাজা থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে অন্তত তিনটি রকেট ছোড়া হয়েছে। পাল্টা অভিযোগে হামাস বলেছে, যুদ্ধবিরতির সময় গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফায় মর্টার শেল ছুড়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

বয়স তার ১২৬ হাঁটেন লাঠিছাড়া

১২৬ বছর তিনি বেঁচে আছেন। তিনি এমনটিই দাবি করছেন। তার পিতা-মাতা ছিলেন আফ্রিকান দাস। হোসে আগুইনেলো দোস সান্তোস নামের এই ব্রাজিলিয়ান নাগরিকের দাবি যদি সঠিক হয়, তাহলে তিনিই হচ্ছেন দুনিয়ার সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি, যার প্রমাণাদি আছে। তিনি তার বয়সের স্বপক্ষে নিজের জন্মসনদ দেখিয়েছেন। ব্রাজিলের দক্ষিণের শহর পেদ্রা ব্রাংকাতে জন্ম নিয়েছিলেন ১৮৮৮ সালের ৭ই জুলাই। অর্থাৎ দুনিয়ার শেষ দেশ হিসেবে ব্রাজিলে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মাত্র ২ মাস পর তার জন্ম। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিনি এখনও ব্যাচেলর, বিয়ে করেননি। কোন সন্তান নেই তার, লাঠি ছাড়াই হাঁটেন এখনও। ৫০ বছর ধরে প্রতিদিন একটি করে সিগারেট পান করেন। তার কোন স্বাস্থ্যগত সমস্যা নেই। ব্রাজিল লিজেন্ড পেলে যখন জন্ম নেন, তখন তার বয়স ৫২ বছর। ব্রাজিল যে বার ১৯৫০ সালের সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ আয়োজন করে, তখন তার বয়স ৬২! ব্রাজিলের জি-১ ওয়েবসাইটকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে  তিনি বলেন, লম্বা জীবনের কোন রহস্য নেই। সত্য হচ্ছে আপনি ক্রমেই বুড়ো হচ্ছেন। আপনি একটা সময় প্রতিটা পর্যায়ে আসবেন। আমার বয়স এত বেশি, এর কারণ আমি অনেকদিন বেঁচেছি। স্থানীয় মনোবিদ মারিয়ানা সিলভা বলেছেন, হোসের কোন শারীরিক সমস্যা নেই। তার উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ- কোনটিই নেই। তিনি একটি ভিটামিন ট্যাবলেট ও ক্ষুধা বৃদ্ধির জন্য একটি ট্যাবলেট ছাড়া আর কোন ওষুধ গ্রহণ করেন না। যখন মন ভালো থাকে, তখন তিনি গান গাইতে পছন্দ করেন। কিন্তু কেউ জানে না, কি গান তিনি গান! তিনি এমন এক সময়ের গান করেন, যেই সময়ের গানের কথা কারও মনে নাই। তিনি প্রতিদিন গোসল করেন না। মাঝেমাঝে তাকে গোসল করানোটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তবে তিনি নিজের জন্ম সনদ পেয়েছেন গত সপ্তাহে, এতদিন ধরে তার কোন প্রমাণাদি ছিল না। বিশেষজ্ঞদের একটি দল এসেছেন, তার জন্ম তারিখ পরীক্ষা করতে। স্থানীয়রা আশা করছেন যে, কার্বন-১৪ পরীক্ষার মাধ্যমে তার বয়স সমপর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি পৃথিবীর বয়স্কতম মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। স্থানীয় নেতা হোসে রোবার্তো পাইরেস বলেন, ১৩ হাজার ইউরো খরচ হবে জেনেও আমরা এই পরীক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি বলেন, আমরা এত টাকা খরচ না করে বয়স প্রমাণের চেষ্টাও করছি। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বের বয়স্কতম মানুষ আমাদের সঙ্গে এখানে থাকছেন, এবং সেই পরীক্ষাই হচ্ছে তার বয়স প্রমাণের একমাত্র উপায়।

সেক্সসিম্বল অভিনেত্রী সামিরা রেড্ডি সংসার ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত

বিয়ের পর থেকেই অভিনয় অনেকটা কমিয়ে দিয়েছেন বলিউডের সেক্সসিম্বল অভিনেত্রী সামিরা রেড্ডি। বিশেষ করে সংসার ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ততা বাড়ার কারণেই তার দুই বছরের দীর্ঘ বিরতি। সর্বশেষ ‘চক্রভিউ’ ছবিতে তাকে দেখা গিয়েছিলো দুই বছর আগে। তবে এবার সামিরা হাজির হচ্ছেন নতুনরূপে। ‘নাম’ শীর্ষক একটি ছবি মুক্তি পেতে যাচ্ছে সামিরার। আনিজ বাজমি পরিচালিত এ ছবির শুটিং ৫ বছর আগে শুরু হয়েছিলো। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় এর কাজ বন্ধ থাকলেও এক মাস ধরে ছবির কাজ আবারও শুরু করেছেন পরিচালক। ছবিতে সামিরাকে দেখা যাবে অজয় দেবগানের বিপরীতে। অ্যাকশন-থ্রিলারধর্মী এ ছবিতে অর্ধনগ্ন হয়ে অভিনয় করতে দেখা যাবে সামিরাকে। বিশেষ করে অজয়ের সঙ্গে একটি গানে বেশ খোলামেলা হয়ে ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন তিনি। বিয়ে পরবর্তী সামিরা এতোটা খোলামেলা আর হবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সেই হিসেবে সামিরার এই অর্ধনগ্ন রূপ হয়তো দর্শকরা শেষবারের মতোই দেখতে পাবেন। শুধু তাই নয়, এ ছবিতে অনেক অ্যাকশন দৃশ্যেও দেখা যাবে সামিরাকে। সামিরা নিজেই কয়েকটি সাহসী স্ট্যান্ট দিয়েছেন এই দৃশ্যগুলো করতে গিয়ে। সব মিলিয়ে ২ বছর পর অন্যরকম সামিরা রেড্ডিকে এখানে আবিষ্কার করা যাবে। ছবিটি নিয়ে দারুণ এক্সাইটেড ও আনন্দিত খোদ সামিরাও। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, এ ছবির কাজ শুরু করেছিলাম ৫ বছর আগে। আর শেষ হলো এখন। তবে ভালই লাগছে। এখানে আবেদনময়ী সামিরাকে যেমন আবিষ্কার করা যাবে তেমনি একাধিক অ্যাকশন দৃশ্যেও কাজ করেছি। ছবিটির কাহিনীও অনেক চমৎকার। আমার মনে হয় সবার ভাল লাগবে।

জরুরিভিত্তিতে গঠনমূলক সংলাপ দরকার: নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া স্টিফেন্স

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র মনোনীত নতুন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট এ দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক ধারা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কথা আবারও তুলে ধরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র সিনেট পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির সম্মুখে বার্নিকাট বলেন, ‘বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির সংসদীয় নির্বাচন নিঃসন্দেহে ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে জরুরিভিত্তিতে গঠনমূলক সংলাপে অংশগ্রহণ করা দরকার, যা আরও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠনের দিকে এগিয়ে যাবে।’ বার্নিকাট ড্যান মজীনার স্থলাভিষিক্ত হবেন।
আজ ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
শুনানিতে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বার্নিকাট। তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশে জবাবদিহির প্রসার এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করার প্রচেষ্টাকে সহযোগিতা করতে কঠিন পরিশ্রম করার ঘোষণা দেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশে শ্রম অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এখনো অগ্রাধিকার গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এসব বিষয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেন বার্নিকাট। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় নানা বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ঘোষণা দেন তিনি।
নিয়োগ চূড়ান্ত হলে সরকার, সুশীল সমাজ ও সব শ্রেণির বাংলাদেশির সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে বিস্তৃত ও ন্যায়সংগত অংশগ্রহণকে উত্সাহিত করে—এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করার কথা জানান সিনেট কমিটিকে।

মার্শিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাটের পুরো বক্তব্য.........

যুক্তরাষ্ট্র সিনেট পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির সম্মুখে
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত-মনোনীত
মার্শিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাটের বক্তব্য

চেয়ারম্যান মহোদয় এবং কমিটির সদস্যগণ, আজ আপনাদের সামনে আসতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করে আমার ওপর যে বিশ্বাস ও আস্থা অর্পণ করেছেন তার জন্য আমি তাদের আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।
চেয়ারম্যান মহোদয়, আমি আমার বোন ও তার স্বামী ক্যাথরিন ব্লুম হোয়াইট ও লুথার হোয়াইটকে এবং তৃতীয় শ্রেণী হতে আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের অন্যতম টমাস ডার্বিকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। আমি ও আমার বোন টমাস ডার্বির সংগে জার্সি শোর এলাকায় বড় হয়েছি। আমার দুই ছেলে সুমিত নিকোলস ও সুনীল ক্রিস্টোফার উপমহাদেশে জন্মগ্রহণ করে এবং তাদের পিতা অলিভিয়ের বার্নিকাটের মতো পুরো বিশ্বকে নিজের শ্রেণীকক্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করে। গত তিন দশকে, পাঁচটি ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে আটটি রাষ্ট্রে আমেরিকান জনগণের সেবা করার মতো সম্মানজনক সুযোগ হয়েছে আমার।

আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সেবা প্রদানের জন্য মনোনীত হওয়া একটি সম্মানের বিষয়। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র ও তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র বাংলাদেশ তার নমনীয়, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। প্রতি বছর প্রায় ৬ শতাংশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ একটি মধ্য আয়ের রাষ্ট্র পরিণত হওয়ার আকাংখা পোষণ করে এবং বর্ধমান গুরুত্ব বহনকারী বাণিজ্যিক অংশীদার ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের গন্তব্যস্থল। প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলা ভারত ও সদ্য উন্মুক্ত হতে চলা বার্মার মাঝে কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত বাংলাদেশ, যার ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মধ্য সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত অবস্থানে অবস্থিত এদেশটি।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশে শ্রম অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এখনো উচ্চ প্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় হিসেবে বিবেচ্য। রানা প্লাজা ভবন ধ্বস বা তাজরীন ফ্যাশনস্ কারখানা অগ্নিকান্ডের মতো হূদয়বিদারক ঘটনা আর না ঘটে সেটা বাংলাদেশীদের নিশ্চিত করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় বাংলাদেশ তার পোশাক খাতের রূপান্তরে অগ্রগতি সাধন শুরু করেছে। আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে আমি বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার উন্নয়ন ও শ্রমঅধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা আরো জোরদার করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রচেষ্টাসমূহকে সক্রিয়ভাবে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবো বলে আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি তার অর্থনীতির পরিধির বাইরেও বিস্তৃত যখন দেশটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ সহস্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনের দিকে এগিয়ে চলেছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটা গত আড়াই দশকব্যাপী এক সাফল্য গাঁথা হিসেবে পরিচিত এবং এই সাফল্য অর্জনে বাংলাদেশকে সহায়তা করায় যুক্তরাষ্ট্র গর্বিত। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পর এশিয়াতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র সহায়তার সর্ববৃহত্ গ্রহীতা। দেশটি প্রেসিডেন্টের তিনটি প্রধান উন্নয়ন উদ্যোগ: বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও ফিড দ্য ফিউচারের ক্ষেত্রে প্রাধিকার প্রাপ্ত রাষ্ট্র। মানবপাচার মোকাবেলায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকি হ্রাসের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সংগে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত হানার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে আমি এই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব উদ্যোগগুলোকে অব্যাহত রাখতে কাজ করার সুযোগের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। একইসংগে, আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে সন্ত্রাসবিরোধী, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা, শান্তিরক্ষা এবং মাদক ও অস্ত্র পাচার মোকাবেলাসহ নিরাপত্তা জোরদার ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতার অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে কাজ করতে আমি আগ্রহী।

কখনো কোনো মতপার্থক্য দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের মধ্যকার শক্তিশালী সম্পর্ক আমাদের সেটা নিয়ে খোলামেলা ও স্পষ্টভাবে আলোচনার সুযোগ দেয়। এই প্রেক্ষিতে, আমরা লক্ষ্য করেছি যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সম্পর্কিত সামপ্রতিক ধারা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। ৫ই জানুয়ারির সংসদীয় নির্বাচন নিঃসন্দেহে ত্রুটিপূর্ণ ছিলো এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে গঠনমূলক সংলাপে অংশগ্রহণ করা দরকার যা আরো প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠনের দিকে এগিয়ে যাবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অভিযোগ বিষয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে, আমি বাংলাদেশে জবাবদিহিতার প্রসার এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করার প্রচেষ্টাকে সহযোগিতা করতে কঠিন পরিশ্রম করবো।

আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে, আমি সরকার, সুশীল সমাজ ও সকল শ্রেণীর বাংলাদেশীর সংগে কাজ করবো যাতে সবচেয়ে বিস্তৃত ও ন্যায়সঙ্গত অংশগ্রহণকে উত্সাহিত করে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে আমি আন্তরিকভাবে মানবাধিকার ও বৈচিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধা, সুশীল সমাজের প্রসারের সুযোগ, সহিংসতা দ্বারা কলঙ্কিত নয় এমন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের আলোচনা এবং একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা দ্বারা আইনের শাসনের প্রতি অনুগত হওয়া সহ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে তুলে এমন নীতির প্রচারণা করবো। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যারা নৃশংসতা চালিয়েছিলো তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে তবে, সেই বিচারকার্য সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হতে হবে। চিত্তাকর্ষক কাজ করা বাংলাদেশী সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ অব্যাহত রাখার অধিকার ও নিজ মতামত উন্মুক্তভাবে তুলে ধরার অধিকারকে সমর্থন করা আমরা অব্যাহত রাখবো। একইসংগে আমরা স্বীকৃতি জানাই যে এই এসব প্রতিষ্ঠানসমূহ যে কোনো প্রগতিশীল গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রামীন ব্যাংকের অব্যাহত কার্যকরিতা নিশ্চিত করতে ও এর অনন্য প্রশাসনিক কাঠামো সংরক্ষণ করতেও আমরা সরকারকে উত্সাহিত করছি।

যে কোনো চীফ অব মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো বিদেশে আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। গত জানুয়ারি মাসের নির্বাচনের প্রাক্কালে ও তার পরবর্তী সময়ব্যাপী আমাদের ঢাকাস্থ দূতাবাস নিরাপত্তা বাহিনী ও সহযোগিদের সংগে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে যাতে কর্মী ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে সেটা উচ্চ প্রাধিকার বিশিষ্ট একটি বিষয় হয়ে থাকবে।

চেয়ারম্যান মহোদয়, দক্ষিণ এশিয়ায় আপনার গভীর আগ্রহ এবং আমাদের সরকার সেই মহাদেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজ অবস্থান পুনরায় সমন্বিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমার নিয়োগ চূড়ান্ত হলে আমি আপনার সংগে, কমিটির সংগে ও কংগ্রেসের অন্যান্য সদস্যদের সংগে বাংলাদেশ ও ঐ অঞ্চলব্যাপী আমেরিকার স্বার্থের অগ্রগতির জন্য কাজ করার সুযোগকে স্বাগত জানাই। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এক অগাধ সম্মানের বিষয় হবে।

আমি আপনাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সম্মানিত বোধ করবো।

দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়ানো উপন্যাস by কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

অনিলা স্মরণে নামের উপন্যাসে চলমান এক দীর্ঘশ্বাস আছে, যা কখনও ট্রেনের সঙ্গে, কখনও লাবণ্য দেবীর সঙ্গে, আবার কখনও কখনও বা সারাক্ষণই অনিলাকে ঘিরে থাকে। বাবার প্রতি এত প্রেমও খুব কম উপন্যাসেই আছে। হায়, দীর্ঘশ্বাসময় জীবনের মায়ার খেলা! আমরা এমনই খেলার বাঁধনে আটকা পড়তে পড়তে এটি পাঠ করতে থাকি। আমরা প্রথমেই দেখি লাবণ্য দেবীর নির্ভরতার এক আবহ তাতে আছে। তবে এও হয়ত সত্য যে, আমরা শেষ পর্যন্ত তার নির্ভরতার জায়গাটি চিহ্নিত করতে পারি না, কারণ মানুষ স্বয়ং কনফিউজিং প্রাণী; যেন সে নিজেকেই নিজে বারবার অতিক্রম করতে চায়। এক ভ্রান্তি বা বিলাসের জায়গা বারবার পরিবর্তন করে। আমরা লাবণ্য দেবীকে কখনও কন্যার দায়বোধের কাছে, কখনও মৃত স্বামীর স্মৃতির কাছে, কখনও বা রঞ্জিত চ্যাটার্জির প্রেমের কাছে সঁপে দিতে দেখি। আমরা শেষ পর্যন্ত অনিলার স্মরণে প্রাপ্ত দীর্ঘশ্বাসের কাছে যেন নিজেদের আশ্রয় খুঁজি। পাঠকের সৃজনশীলতাকে আমরা স্মরণে রাখতে বাধ্য হই। এমনি নানা স্তর এখানে উন্মোচিত হয়। আবার নতুন পাঠস্মৃতি এসে পুরনো স্মৃতিকে ডুবিয়ে দেয়। কমলকুমার মজুমদারের বহুবিধ মায়ায় আমরা হয়ত জারিত হই। এই উপন্যাসটিতে নির্ভরতা আর অপেক্ষা, প্রেম আর মৃত্যুকে, একেবারে জড়াজড়ি করে রেখেছে। আমরা প্রথমে দেখি লাবণ্য দেবী, যিনি সম্পর্কে অনিলার মা হন, তিনি কিছু প্রক্রিয়ার কাছে নির্ভরশীল হয়ে আছেন। তিনি কেবল অপেক্ষাই করে গেলেন। তার মেয়ে আসছে, যৌবনের কাছাকাছি বয়সের মেয়ে স্কুল থেকে তার কাছে আসছে। তার আছে পিতৃপ্রেম। সেই প্রেম জান্তব আকারে মেয়ের বুকের গহীনে লেগে আছে। মা লাবণ্য দেবী সেখানেও নির্ভরতা খোঁজেন। মেয়েকে তার মানসিকতা থেকে পরিবর্তন করে বর্তমানকে মেনে নেয়ার অপেক্ষা তার আছে। কিন্তু মেয়ে তার বাবাকে রীতিমতো প্রেম করে। বাবাবিনে যেন তার চলে না। বাবা মারা গেছে, অথবা মানসিক যাতনায় তাকে হয়ত হত্যাই করা হয়েছে। কিন্তু মেয়ের কাছে বাবার স্মৃতি একেবারে জ্যান্ত। সে তার বাবার মৃত্যুর জায়গা, শ্মশানের জায়গা দেখতে চায়। তার ভিতরে সেইসব স্মৃতি একেবারে জীবন্ত করে রাখতে চায়। কিন্তু মায়ের আছে প্রেম, অপারে প্রেম। তিনি রঞ্জিত চ্যাটার্জিকে ভালোবাসেন। তাকে একপর্যায়ে বিয়েও করেন তিনি। কিন্তু মেয়ে তা মেনে নেয় না। বাবার স্থলে মায়ের স্বামী হিসেবে অন্য কাউকে মেনে নিতে সে রাজি নয়। তাই তো এক ধরনের মোহ তার জাগে। একপর্যায়ে রঞ্জিত চ্যাটার্জির ভেতরে তার বাবার ছায়া যেন সে আবিষ্কার করে। হয়ত তা ভূতের ছায়া হয়ে আসে। কিন্তু তা অবলম্বন করে তো সে বাঁচতে পারে না। অনিলা একপর্যায়ে আত্মহত্যা করে। পৃথিবীর প্রতিও এক ধরনের অবজ্ঞা দেখায় সে। আসলে সে যেন নিজেকেই নিজের হর্তাকর্তা হিসেবে আবিষ্কার করতে চায়।
এ উপন্যাসেও কাহিনী আছে, কাহিনীর সূত্র আছে, তাদের ভিতর আবার পরম্পরাও আছে। এর চরিত্রসমূহ আলাদা করে, কখনও বা একত্র হয়ে কিছু ম্যাসেজ রাখে, সৌন্দর্য প্রকাশে তৎপর হয়, তারা এমনকি হতচকিত অবস্থায় নানা অবস্থান প্রকাশ করে। তারা সময়ের চেয়ে পিছনের কথা বলে। পুঁজির বিকাশ তাতে দেখি- মধ্যবিত্ত উত্থানের সময় আছে তাতে; আছে উপনিবেশি আবহ। একজন লাবণ্য দেবী হাওড়া স্টেশনে এসেছেন। তিনি মূলত অপেক্ষা করছেন তার মেয়ের জন্য। সে আসবে। সে একা তো আসবে না, তার সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস আছে, জীবনের অনেক কথা আছে, বৈদিক সৌন্দর্যকে প্রকাশের বিষয় আছে। কমলকুমার তো জীবন আঁকেন না, যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবনবৈচিত্র্যকে জোড়া লাগান। এমন এক জীবন আমরা দেখি, যা আমাদের কাছে থেকেও কোনো এক সময় পর্যন্ত অচেনা ছিল হয়ত, কিন্তু তিনি, কমলকুমার তার তীব্র চাহনীতে এর সবকিছু পরিষ্কার করতে থাকেন। অনেক জীবনের কথকতা নিয়ে এক সময় অনিলা আসে। তারা অ্যামিলওয়ার্থ হোটেলে গেলেও, তাদের আদি বাসস্থান শাহানপুর যাওয়ার কথা ভাবলেও, তাদের ভিতর রঞ্জিত চ্যাটার্জি থাকলেও, এর সবকিছুর ভিতর একজন পিতা, ভালোবাসার এক মানুষ ক্ষণে ক্ষণে দেখা দেন। তিনি গঙ্গাকিশোর। আমরা স্মরণ করতে পারি, কমলকুমার যে জীবন দেখান তাতে গঙ্গা, রামকৃষ্ণ, সমন্বিত চৈতন্য থাকেই। এখানেও নানা কিছুর ভিতর দিয়ে যৌথযন্ত্রণা যেন প্রকাশিত হচ্ছেই। তাই তো লাবণ্য দেবীর সঙ্গে একজন রঞ্জিত চ্যাটার্জি যুক্ত হলেও অনেক বিচিত্র অনুসঙ্গ তাতে যুক্ত হয়। তারা বিয়ে করলেও, তাদের বিষয়ে আরও যেন জীবনের কথা আমরা স্মরণ করতে বাধ্য হই। কাহিনীতে একজন পিতার মৃত্যু, কন্যার আহাজারি, মায়ের অন্য পুরুষে আসক্তি, বিয়ে, স্মৃতিজাগরণ মিলে এক-একটা ঘটনার জন্ম দেয়। এক ঘটনা অন্য ঘটনাকে টেনে আনে। অনিলার বাবার মৃত্যু নিয়েও হয়ত রহস্য থাকে। লাঞ্চ খেতে খেতে তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করেন, একটা রাত পেরোয়, পরদিন সকালে তার মৃত্যু হয়। একটা রহস্য থাকে, সেই রহস্য লাবণ্য দেবী আর রঞ্জিত চ্যাটার্জির বিয়ের ভিতর দিয়ে নতুন রহস্যের জন্ম দেয়। অনিলা এসব চাপ যেন সইতে পারে না। তার মনোজগতে একটা হাহাকার জন্ম দেয়। সে কেন প্রতিশোধ নিতে চায়, তা আমরা ভাবতে বাধ্য হই। সে তো মাকে খুনিও বলে! এই সব মিলেই হয়ত তার ভিতরে পাগলামিরও জন্ম দেয়। সে আত্মহত্যা করে। অনিলা আর তার জীবনের মধ্যে যেন অনন্ত মরুভূমি দেখা দেয়। এভাবেই একটা চরম রহস্যের ভিতর উপন্যাসটি শেষ হয় না। কিংবা তা শেষ হয় না বরং আমাদের মনোজগতে নানা অনুসঙ্গ ঘুরে ঘুরে আসে। এভাবেই একটি উপন্যাসের ভিতর অনেক ভাবমুখর জীবন ছায়া ফেলে যায়।
এ উপন্যাসেও কমন কিছু বিষয় দেখা যায়। বাবার প্রতি প্রেম, বালিকার ভিতর হঠাৎ সৌন্দর্যের প্রকাশ, মৃত্যুজনিত শোকপ্রণালী যেন কমলকুমারের একটা ধারা হিসেবে এসেছে। একটার সঙ্গে আরেকটার যোগ আছে। অনিলা স্মরণের অনিলা আর শ্যাম-নৌকার কালাচাঁদ যেন একই বৃন্তের দুটি ফুল- উভয়ই পিতৃপ্রেমের হাহাকার লালন করে। অনিলার কিশোর-বয়সের সৌন্দর্য যেন সুহাসিনীর পমেটম’র সুহাসিনীর আরেক মায়া। তার লেখায় মৃত্যুও বারবার আসে। কমলকুমার মৃত্যু আর সৌন্দর্যের ভিতর দিয়ে জীবনের নানা মায়া নির্মাণ করেন। খেলার প্রতিভার ভিতর দিয়ে মৃত্যুর যে সর্বশেষ মায়াময় ছায়া দেখি, তাই তো অনিলা স্মরণের গঙ্গাকিশোর, অনিলার ভিতর, শ্যাম-নৌকার কালাচাঁদের বাবার ভিতর, অন্তর্জলী যাত্রা’র সীতারাম বা যশোবতীর জীবনপাতের ভিতর বারবার ঘুরে-ফিরে আসতে দেখি।
উপন্যাসটিতে নানা স্তর আমরা লক্ষ্য করি : ১. অনিলার ভিতর ভাঙচুরের নানা আবহ আছে, ২. আছে লাবণ্য দেবীর ভিতর নিজেকে এক জায়গায় স্থাপনের চেষ্টা, ৩. প্রেমের আলাদা মাত্রা আবিষ্কারের প্রতি লেখকের নবতর ভাবনা, ৪. আছে মানবপ্রেমের সহজাত জৈবিকতা খোঁজার ডেসপারেটনেস। অনিলা তার জগৎ নির্মাণের ব্যাপারে একেবারে আপোষহীন। এ কথাটা তার টিচার থেকে শুরু করে, বান্ধবী, এমনকি লাবণ্য দেবীর কথিত বান্ধবীরাও জানেন। তাই তো তাকে পাগল বানানোর প্রচেষ্টাও তারা করে। কিন্তু অনিলা তার জায়গায় স্থির থাকে। যেন একটা মায়াময় স্পিরিচুয়াল জগতের ভিতর দিয়ে সে তার জগতের চিত্র নির্মাণ করে যায়। রক্তের প্রবাহমানতাকে সে অনেক বড় করে দেখে। তাই হয়ত কমলকুমারও দেখেন। রক্তের ধারা সুফল নিয়ে তিনি অনেক কথা বলার পক্ষেই তিনি আছেন। তিনি বংশীয় প্রবহমানতা আর রামকৃষ্ণের বহু চরিত্রের মিলিত রূপের কাছে বারবার ধর্ণা দেন। অন্যদিকে লাবণ্য দেবী তার স্বামীর স্মৃতিকে আঁকড়ে থাকার অতি লৌকিক জগতে থাকতে রাজি নন। তিনি যেন বিকাশমান মধ্যচিত্তের লোভকে চেতনায় লালন করতে চান। আধুনিক মধ্যবিত্ত তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। তাই তো রঞ্জিত চ্যাটার্জির প্রেম তার রক্তে খেলা করে। তারা জীবনকে একেবারে মিশিয়ে ফেলে। তারা জীবন আবিষ্কার করে, একে বহন করতে চায়। এটিই জীবন, এটিই হয়ত আধুনিক জৈবিকতার মৌলিক চেহারা।
শাহানপুর আর অ্যামলিওয়ার্থ হোস্টেল এ উপন্যাসের আরেক জীবন যেন। অনিলার স্কুলও এখানে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। অনিলাকে চেনার জন্য এসবের খুবই দরকার আছে। এ হচ্ছে চমৎকার অনুসঙ্গ। এত আধুনিকতা কমলের আর কোনো উপন্যাসে দেখা যায় না। এখানকার বর্ণনাশৈলীও অনেক স্মার্ট, লৌকিকতার বিষয়টা এখাবে বৈঠকি আমেজে এসেছে। তাকে আমরা ভিন্ন রূপে পাই। চিহ্নও এখানে আলাদা। অনেক লম্বা বাক্য আছে, ক্রিয়াবিশেষণ, অন্বয়ী ভাব নতুনরূপে বিকশিত হয়েছে। সমাপিকা ক্রিয়ার প্রতিও এখানে অনেক যত্নবান তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, উপন্যাসের চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে ভাষার মেজাজটা বিকশিত হয়েছে।
এ গল্প লাবণ্য দেবীকে আবিষ্কারের গল্পও বলা যায়। এমনকি বর্তমানতার সঙ্গে বৈদিক সৌন্দর্যও লেখক যুক্ত করার সাহস দেখিয়েছেন। আমরা এখানে নিমগ্নতার সাংস্কৃতিক ইতিহাস দেখি। শেষ পর্যন্ত অনিলার যে এমন করুণ পরিণতি হবে তা মোটেই যেন আন্দাজ করা যায়নি। স্কুল-পড়–য়া-মেয়ে অনিলার জন্য হাওড়া স্টেশনে অপেক্ষা করে তার মা লাবণ্য দেবী। এরপরই ধীরে ধীরে ছোট আয়তনের এ উপন্যাসটির প্যাঁচ খুলতে থাকে। গরিবী আয়তনের এ উপন্যাসটি ক্রমে ক্রমে মানবিক জটিলতার এক চমৎকার আখ্যান হয়ে ওঠে। এটি তার একেবারে প্রথম দিককার রচনা। একে ঠিক উপন্যাস না বলে বড়গল্প বলাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এটা কমলকুমারের আরেক উপন্যাস গোলাপ সুন্দরী’র মতোই হালকা-পাতলাও। এর ভাষাসৌকর্যও তার অন্য যে কোনো উপন্যাসের চেয়ে কিছুটা সহজিয়া ধাঁচের। পাঠককে তাতে পাঠ-ক্রিয়ায় নিমগ্ন রাখে। আমরা ক্রমে ক্রমে জানতে পারি, অনিলার পিতৃবিয়োগ ঘটাতে লাবণ্য দেবী অন্যত্র, রঞ্জিত চ্যাটার্জিকে বিয়ে করেন। এটি যেন লাবণ্য দেবী নিজেকে আবিষ্কারের, সত্য খোঁজার এক প্রচেষ্টা। তার মেয়ে অনিলা যাতে এটি মেনে নেন, তার জন্য কৌশলও তিনি কম করেন না। এটি আধুনিকতার ফল বলেও জানাতে চান অনিলাকে। তবে এ বিষয়টারও জট খোলে ধীরে ধীরে। লাবণ্য দেবী যে রঞ্জিত চ্যাটার্জির গাড়িতে করে তার স্বামীর শেষকৃত্যানুষ্ঠানের দিকে যায় তখন কারও মনে হতে পারে ইংরেজ আমলের এ কাহিনীতে যেন প্রতীকায়িত সহমরণকেই সমর্থন করা হচ্ছে। তবে কিছুক্ষণ পরই রঞ্জিত আর লাবণ্য পরস্পরকে নতুন করে চেনে এবং বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তা নিতান্তই ছেলেখেলা বলে মনে হয়। তবে আমরা এখানে যৌনতার কথা মনে করব,- এ দু’জনের শারীরিক সম্পর্কের কথা জানব। আমরা মোহিত হব। লেখকের জীবন পিপাসার ধরন দেখব। উপন্যাসের আয়োজনে লেখক নানাবিধ সত্য মোকাবিলা করছেন। সংসার ব্যাকুল দ্বন্দ্ব এখানে ম্যালা ডালপালা মেলেছে। আমরা অন্তত তিন ধরনের রিলেশন এবং রিলেশনজনিত ঝামেলা এখানে লক্ষ্য করতে থাকি। অনিলার সঙ্গে তার বাবার স্নেহময় প্রেম বা নির্ভরতাই এ গল্পের মৌলস্বর। অনিলা তার ওপর এত নির্ভরশীল যে অন্যসব সম্পর্ক যেন তার পরশে ধুলোয় মিশে যাবে! কিন্তু তা কি হয়। অনিলা তার বাবার ভিতর ঈশ্বরত্ব দেখে, তাতে সে লীন হতে চায়। এমনকি তা প্রতিষ্ঠাকল্পে তার দেহ-মনে নানা লীলার সঞ্চার হয়। যেন দেবী মহামায়া তাকে ভর করে, আলাদা সত্তা রূপে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, রক্ত বীজের উন্মাদনা সে প্রকাশ পেতে থাকে। কিন্তু অবশেষে তার অকাল মৃত্যুই ঘটে। যেন একধরনের শহীদত্ব বরণ করল সে। লাবণ্য দেবীর সঙ্গে রঞ্জিত চ্যাটার্জির বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে স্বল্প আয়তনের এ উপন্যাসটি আলাদা রূপময়তা পেয়েছে। তাতে চরিত্রেরও বিকাশ ঘটেছে। পাঠক আরেক আধুনিকতার সঙ্গে পরিচিত হলেন। অনিলার সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্কটি হয়ে উঠেছে কখনও কখনও স্পর্শকাতর, কখনও প্রাণকাতর। কথাক্রমে আবারও বলতে হয়, জীবনকে সময়োপযোগী, ও বাস্তবমুখি করার নানাবিধ চেষ্টা লাবণ্য দেবীর ছিল। এমনকি তাতে যে আধুনিকতার উšে§ষ ঘটে, জীবনের আরেক প্রবহমানতা সৃজন হয় তাও বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু কলির দেবত্ব যেখানে ভাবে, লীলায়, কামে ভর করেছে সেখানে পাঠক তো লেখকের কাছে বন্দিত্ব বরণ করা ব্যতীত উপায় নেই। এভাবেই কমলকুমার তার একরোখামির কাছে, স্বোপার্জিত আধুনিকতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে বসে আছেন।
এখানে রামকৃষ্ণকৃত পরমা সুন্দরীকে আবিষ্কারের নেশা আছে। চরিত্রের বিকাশের বিষয়টা এখানে খুবই স্পষ্ট, এর ধারাক্রমও বেশ কৌতূহলের। দীর্ঘবাক্যের নেশা এখানে আছে। এভাবেই অপার্থিব সাধনা আর জীবনবৈরাগ্যের এক মিলন আমরা দেখি। এভাবেই তিনি, কমলকুমার, কাব্যময়তার ভিতর অতি চমৎকার নান্দনিকতার স্বাদ দেন, ভাষা দেন, প্রাণপ্রবাহ আবিষ্কার করেন। আমরা ক্ষণে ক্ষণে তার মোহিনী মায়ায়, জীবনের অনেক রূপে, এমনকি জাদুময়তায় নিমগ্ন হই।

অ-ফেরা by জয়া ফারহানা

সম্পূর্ণ রায়গঞ্জটাই যেন পৌষের নিস্তরঙ্গ জলে থির দাঁড়িয়ে থাকা একখানা পানসি নৌকো। এক দৌড়ে বুড়ি ছোঁয়ার মতো অন্তরঙ্গ ছোট্ট একটা শহর। গোটা শহরটাই হবে বোধহয়, কত- ১০-১৫ কিমি.। তার বাইরে জঙ্গল আর জঙ্গল। কোথাও কোথাও জঙ্গল এত ঘন যে মধুকূপী ঘাসগুলো পর্যন্ত গলা ডুবিয়ে দেয়। মহানন্দা বলে একটি পাহাড়ি নদী সেখানে পাথরের ছোট বড় টিলার ওপর দিয়ে ঝিরঝির করে বয়ে চলেছে। বর্ষাকালে জল সেখানে ভারী গভীর, শীতকালে জল নেমে আসে হাঁটুতে। সারাদিনের অখণ্ড নির্জনতায় সামান্য ছেদ পড়ে সন্ধ্যায়। দুদিকের টানা বারান্দা দেয়া প্রাচীন আমলের উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর তুলসী মঞ্চ থেকে ভেসে আসে শাঁখের পোঁ পোঁ- তখন ঘুলঘুলিতে পায়রারাও সেই সুরে সুর মেলায়। আর আছে দু’একটা সখের বাইসাইকেল টুংটাং-টুংটাং। লাল ছইওয়ালা ২-৩ খানা রিকশা- ক্রিং ক্রিং। সীমান্ত এলাকা বলে অবশ্য বন্দরের একেবারে শেষ মাথায় ৯ মাসের পোয়াতি পেটের মতো পেট উঁচু ট্রাকগুলো ভারী ভারী মাল নিয়ে বন্দরমুখে ছুটে যায় শাঁ-শাঁ। আছে চীনের তৈরি কয়েকটি ইজিবাইক। কৃষি কাজে ব্যবহার হওয়া নসিমন-করিমন ও যারা বিপদের মুখে রায়গঞ্জে সদরে পৌঁছে দেয় জনপ্রতি তিন-চার টাকায়। শহরের একদম মাঝখান দিয়ে চলে গেছে লাল খোয়া ভাঙা ইটের রাস্তা। এখনও পুরোপুরি পাকা নয়। তার ঠিক পাশেই জল দুয়ানি খাল। সেই খালের ওপর বাঁশের আঁড়ে বসে থাকে দু’একটা মাছখেকো মিশকালো পানকৌড়ি আর ভোঁদর। আর সেই খালের গাঘেঁষে কাকডাকা ভোর আর বাদুড় ওড়া সন্ধ্যায় যুবতী মেয়েরা গান ধরে- ‘সতী কন্যা বিবাহ করাইল- যে কারণে।’ শহর থেকে খানিকটা দূরেই গজার জঙ্গল। এমনিই গজার যে সেখানে বিঘাখানেক জমি আবাদের উপযুক্ত করতে, বুনো মোষ আর শুয়োর চরিয়ে বেড়াতে টানা দেড়-দুমাস মেহনত করতে হয়। লোকে তো বলে এক ধরনের ‘ডামাবানু’ নামের জিন-পরী থাকে ওই ‘হলোধরার’ জঙ্গলে। আবার এমন দুর্নামও আছে মানুষকে বেঘোরে পেলে তারা মেরেও ফেলে। আছে ভয়ানক সব জোড়া জোড়া শঙ্খচূড় সাপ। যাদের ভয়ে কাঠুরিয়ারা পর্যন্ত মূল জঙ্গলে কাঠ কাটতে সাহস পায় না। সদ্য এসেছেন এখানে হাসনাত সাহেব তাঁর উপন্যাসটি লেখার জন্য। বহুদিন ধরে মগজের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে চরিত্রগুলো, প্লট। বলা যায় পোকার মতো সারাক্ষণ তার নাকের মধ্যে বো-বো ঘুরছে। ৬ মাসের মতো হল তার রাইটার্স ব্লক চলছে। সেই ভয়ঙ্কর দুর্দশা থেকে বাঁচতেও ছুটে এসেছেন তিনি এখানে। মানে এই জঙ্গুলে শহর রায়গঞ্জে। এখানকার ডাকবাংলোর খোলা বারান্দায় ক্যাম্প খাটে শুয়ে থাকলে বুনো মোষের ডাক শোনা যায়। বাতাসে লেপ্টে থাকে বহেরা ফুলের গন্ধ। দেখা যায় বহু দূর পর্যন্ত ফাঁকা আকাশ আর পাকুড় গাছের ডালে, মানে মগডালগুলোতে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে বক বসে থাকে সবুজ পাতার ফাঁকের মধ্যে মনে হয় যে হলুদ সাদা দুধিয়া ফুল ফুটেছে। এসব দেখতে দেখতেই হাসনাত ভাবেন যখন তার লেখা শেষ হবে ফিরে যাবেন জাদু বাস্তবতার শহর ঢাকায় তখন সত্যি সত্যিই এসব দুর্লভ বুনো দৃশ্যের আলাদা কোনো তাৎপর্য থাকবে কিনা। মানস-সরোবরের জঙ্গল নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, তারও আগে পূণিয়ার জঙ্গল নিয়ে বিভূতিভূষণ লিখেছেন অসামান্য ক্ল্যাসিক... তার লেখা আর বাংলা সাহিত্যে নতুন কী মাত্রা যোগ করবে। তাছাড়া রায়গঞ্জের জঙ্গল এখনও তেমন ঘুরে দেখা হয়নি তার। ক’দিন মাত্র এসেছেন। একদিনই মাত্র গিয়েছিলেন এর মধ্যে মহানন্দার পাড়ে। তাছাড়া পাড় মফস্বল হলে কী হবে, এখানকার স্থানীয় মানুষদেরও তো মনে হল ঢাকার লোকদের মতো আইসোলেটেডই। হাইওয়ের পাশে ঝুপড়ি চায়ের দোকানে বসে হাসনাত কারও কারও সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা চালিয়েছেন বৈকি। কিন্তু আলাপ জমে ক্ষীর হয়নি, ফেটে ফেটে গেছে। তাছাড়া এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য সামাজিক জীবন ভালো, মন্দ, ভাষার বুৎপত্তি এসব নিয়ে কথা বলবেন-ই বা কার সঙ্গে। আছে কে? ছোট্ট মফস্বল শহর। তাও আবার জঙ্গলের পাশে। সহজে কী কেউ নাগরিক সুবিধা ছেড়ে আসতে চায়। তারপরও ঝুপড়ি দোকানের ছত্রাক পড়া টেস্টে বিস্কুট মুখে দিয়ে দোকানির সাথে আলাপ জমাতে চেয়েছিলেন। তা সেদিন চায়ে দোকানি মানে আলতাফ এমন চিনি মেশালো যে হাসনাতের কথা বলার আগ্রহ-ই উবে গেল। হাসনাত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চাশটি বছর কাটিয়েছেন ঢাকায়। চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফিতে অভ্যস্ত হয়েছেন ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পরপরই। তাও প্রায় এক যুগের ওপর। প্রায় সুইটেক্স গোলানো সেই শরবতে চুমুক দিয়ে তিনি সান্ত্বনা পেতে চাইলেন এই ভেবে যে, যাক, অন্তত এ সামাজিক পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্তে আসা গেল যে মফস্বলের মানুষ চায়ে অতিরিক্ত মিষ্টি খায়। ঠিক তার পরপরই মুখভর্তি দাড়ি গোঁফওয়ালা একজন এসে বলল আলতাফ চা দে তো চিনি ছাড়া। হাসনাত ঔৎসুক্যের সাথে জানতে চাইলেন ভাই কি ডায়বেটিসের পেসেন্ট? দাড়ি-গোঁফওয়ালা লোকটি সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, কেন বলুন তো। অতএব হাসনাত তার পর্যবেক্ষণ শক্তি ভালো বলে যে মনে মনে একটি গোপন গর্ব নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন তাতেও জল পড়ল।
ভদ্রলোক অবশ্য পড়ে বেশ আন্তরিক স্বরেই বললেন- ডায়াবেটিস ফেটিস নয়- কাজের প্রয়োজনে নানান শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়... চিনির অনুপাত একবার ফিক্সড হয়ে গেলে, বারোয়ারী চায়ে স্বাদ পাওয়া যায় না তাই চিনিটাই ছেড়েছেন। পরের প্রশ্নের উত্তরে হাসনাত আবার বড় ধরনের হোঁচট খেলেন। প্রশ্নটা ছিল ভাই সাহেবের কাজটা কী। ভাই সাহেব, ভাই, এ সম্বোধনগুলো অচেনা জায়গায় তাকে বাড়তি সুবিধা এনে দেবে, লোকজন খানিকটা ঘনিষ্ঠতা অনুভব করবে বলে এসব পাতলা খাতির জমানোর চেষ্টা কিংবা খাতির জমানো। দাড়ি-গোঁফ আবারও রহস্য তৈরি করল। ‘তেমন কিছুই না’- বলে সে মুহূর্ত দেরি না করে সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটা ধরল। হাসনাত ভাবলেন, দিনকাল বহুত বদলে গেছে। ঢাকার পায়রার খোঁপের মধ্যে বসে বসে, বাইরের মফস্বলকে তারা যত আটপৌরে আন্তরিক, সরল ভাবেন মফস্বল শহরগুলো মোটেই আর তেমন নেই। ভ্রমণের তৃতীয় দিনে অবশ্য হাসনাতের লেখক সত্তার খানিকটা তৃপ্ত হওয়ার কথা। কারণ বাংলোর কেয়ারটেকারের দশ বছরের ছেলেটা ক্লান্ত এবং প্রায় উত্তেজনাহীন স্বরে কেটে কেটে যা বলল, তার- স্থানীয় ভাষায়, সেটাকে, প্রমিতকরণ করলে মানেটা দাঁড়ায় এই যে মহানন্দায় আবারও লাশ ভেসে উঠেছে।
আবার মানে কী? তবে কি মহানন্দায় প্রায় প্রায় অথবা মাঝে মধ্যেই লাশ পাওয়া যায়? আর একেবারে নিরীহ অর্থ করলেও মানে দাঁড়ায় এই যে এবারই অন্তত প্রথম নয়। নিদেনপক্ষে এর আগে অন্তত একটি লাশ পাওয়া গেছে মহানন্দায়। সেদিন-ই হাসনাত ডাকবাংলো থেকে বেশ খানিকটা দূরে চিতলমারীগঞ্জ পর্যন্ত হাঁটলেন। লক্ষ্য করলেন এই নিয়ে কারও মধ্যে চাপা পিসফিসানিও নেই। স্থানীয় ইজিবাইকের যে ভাড়া তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে বাইকওয়ালার কাছে শুনলেন হ্যাঁ, মহানন্দায় মাঝে মাঝেই লাশ পাওয়া যায় বটে তবে সেসব ডামা-বানু জিনের কাজ। হাসনাত তাজ্জবে হাঁ বনে গেলেন। ডামা-বানু জিনের কথা বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন আরণ্যকে। তো শত বছর পরে মধ্য প্রদেশের সেই প্রত্যন্ত ‘কড়ারী তিন টাঙা’ থেকে ডামা-বানু জিন-পরী কী করে মহানন্দায় এসে লাশ ফেলে যাবে সে রহস্যও রহস্যই থেকে গেল হাসনাতের কাছে। ডাকবাংলোর ডাইনিংয়ে বন মোরগের রান চিবুতে চিবুতে তার মনে হল জীবনের গতি যেখানে অতীব মন্থর সেখানকার মানুষ এসব রহস্য টহস্য করতে খুব ভালোবাসে। অথবা এসব তাদের অলস মুহূর্তে জমা হওয়া গল্প গাঁছার দুর্লভ মণি মুক্তো কিংবা কে জানে এসব রহস্যের আড়ালে থাকতেও পারে কোনো বিষধর রাজনীতি। কিছুই অসম্ভব নয়। তারপর মহিষের খাঁটি দুধের চিনিপাতা দই খেতে খেতে হাসনাত ভাবলেন কী জানি বাপু প্রকৃতিবিষয়ক উপন্যাস লিখতে গিয়ে আবার না তাকে ফেলুদার মতো নাক শুঁকতে শুঁকতে রহস্য... নাহ্। ভালো লাগছে না। ঘোর প্যাঁচের দুনিয়া ছেড়ে এসেছিলেন খানিকটা পাহাড়ি হাওয়ার সতেজ বাতাস বুড়ো ফুসফুসে ভরে নিতে। বদলে ফুসফুস দেখি নিকোটিনের চেয়েও বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভরে উঠল। কোথায় ভেবেছিলেন, পাহাড়ের টিলায় বসে সূর্যাস্ত দেখবেন, পাহাড়ি ফুলের বুনো গন্ধে মনের আয়ু বাড়িয়ে নেবেন, ঝাঁক ঝাঁক বন্যপাখির নির্ভার ওড়াওড়ি দেখবেন তা না কী সব লাশ টাশ!!! বিভূতিরা ভাগ্যবান ছিলেন বটে। কলকাতা পেরোলেই কলম উজাতো। আর আজকাল ঢাকা কী আর মফস্বল কী সব জায়গা-ই কে, কার বুকে চাকু মারবে সেই সব ওস্তাদি। চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়ে আজও দেখা হয়ে গেল সেই দাড়ি-গোঁফের সাথে। আজ তার চোখ দুটো আগুনের ভাটার মতো জ্বলছে। একবার কেতলীর ফুটন্ত পানির দিকে চেয়ে আরেকবার সেই কোড়া পাখির চোখের মতো লাল চোখওয়ালা রহস্যময় মানুষটার দিকে চেয়ে হাসনাত বললেন, ‘শুনেছেন নাকি মহানন্দায় লাশ পড়েছে?’
আলতাফ তখন কী একটা জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার গানের সুর ভাজছিল। হঠাৎই সেই সুর- ও হ্যাঁ, আমি জ্ঞান হারাব... জাতীয় একটা গান গুনগুন করছিল আলতাফ। তারপর মরেই যাবো, বাঁচাতে পারবে না তো- এই পর্যন্ত গেয়ে সে থেমে গেল- ‘তারপর স্যার তো’- বলেই জিভ কাটল। আর হাসনাত প্রায় একই সঙ্গে দুজনের দিকে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে বলল ‘ও আপনি মাস্টার নাকি?’ আর দাড়ি-গোঁফ, ইটের ভাটার চোখ উত্তর করল না, নাতো। কিন্তু মনে মনে ভাবল লোকটা অতি বোকা নয়তো অতি বদমাশ। এভাবে গায়ে পড়ে কেউ ভাব জমাতে আসে...? হাসনাত তবুও লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বলল ‘আর বলেন কেন, সরকার তো বলেই খালাস যে চিন্তার কিছু নেই। এদিকে ছেলে পেলে নিয়ে দুর্ভাবনায় আমাদের নাভিশ্বাস...। ঘরের সব মানুষ ঘরে না ফেরা পর্যন্ত স্বস্তি নেই অথচ... সরকার কিনা...। দাড়ি-গোঁফ আবারও হাঁটা ধরল। হাসনাত লক্ষ্য করল লোকটা একটু পা টেনে হাঁটে। তবে এবার আর সে ভুল করল না। বরং বুদ্ধিমান আর সতর্ক দোকানি আলতাফকে একা পেয়ে মনের প্রশ্নটা করেই ফেলল- ‘লোকটা করে কী?’। দেখা গেল আলতাফকে সে যত চতুর আর কৌশলী ভেবেছিল মোটেই সে তা না। বরং সে কথা বাজ। এতক্ষণ সে কথা বলেনি তা কেবল ইটভাটার মতো লাল চোখের লোকটার জন্য। তবে যা শোনা গেল তাতে হাসনাত আবার খেই হারালো। লোকটা ক্ষেতমজুরদের রাতের বেলা পড়াশোনা করায় আবার অসুখ হলে ওষুধপত্র দেয়... আবার এলাকায় মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার কারণে পাটাও হারাতে বসেছিল। এইসব ছেঁড়া ছেঁড়া তথ্যে তাকে চে’গুয়েভারা ভিন্ন আর কীই বা ভাবা যায়। কেননা আলতাফের ভাষায় ‘হেয় ডাক্তর ও মাস্টরও আবার পোলটিকশও করে।’ নাহ, মাথাটা ভার ভার লাগছে। আর এই সব জবরদস্ত রহস্যের ভার থেকে মাথাকে নিষ্কৃতি দিতে সে রায়গঞ্জ থেকে ১০ কিমি. পশ্চিমে মুণ্ডা পাড়ায় বেরিয়ে আসার চিন্তা করল। মহানন্দা কিংবা মহানন্দার লাশ কিংবা মহানন্দা তীরের বিপ্লবী চেগুয়েভারার মতো পাহাড়ি পথও হাসনাতের কাছে কম রহস্যময় মনে হলো না। পাহাড়ে ওঠার পর সে পথকে মনে হয় খাড়া উত্তরে চলে গেছে দু’কদম যেতে না যেতেই ঠাহর হয়, নাহ্ পথ গেছে পশ্চিমে। বহু পথ উজিয়ে বহু শ্রম ঘাম ব্যয় করে আবিষ্কৃত মুণ্ডাপাড়ায় হাসনাতের অর্জন কিছু কম হল না। কিছু জিনিস, যা সে ভেবেছিল মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বোধহয় তার আর দেখা হবে না, দেখা হয়ে গেল সেসবের সঙ্গে। দুর্লভ সেসব জিনিসের মধ্যে আছে সিঁদুরের চিহ্ন আঁকানো এয়োতি পিঁড়ি, রাধা-কৃষ্ণের ছবি আঁকানো মাটির দেয়াল, কুলুদিতে ঝুলানো লক্ষ্মীর কড়ির চুপড়ি, পিতলের ঘয়লা, কাঁসার গুড়গুড়ি, বাজবৌরী চিল, নিম ফুলের বুনো গন্ধ লাল সবুজের জল ছাপ দেয়া টিনের তোরঙ্গ, নলখাগড়ার বাঁশি, আলকাতরা মাখানো খুঁটি, নিরাম্বড় অথচ আন্তরিক আতিথেয়তা- আর এসব যখন সে ডায়েরিতে লিখছিল তখন এটা লিখতেও ভুলল না যে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, মুণ্ডা, কোল মারমাসহ যাবতীয় আদিবাসীরা ঢাকার লোকদের মতো মনের ভাব গোপন রাখতে শেখেনি। অতএব ধরে নেয়া যেতে পারে মহানন্দার তীরের ছিমছাম রায়গঞ্জ, মুণ্ডাপাড়া আর জঙ্গল হাসনাতের লেখক সত্তাকে একেবারে নিরাশ করেনি। কিন্তু যে কারণে ঢাকা থেকে এই এত দূর রাস্তাঘাটের নানা হ্যাপা পার হয়ে আসা... সেই কাজের-ই তো এখন পর্যন্ত কোন কূল-কিনারা করা গেল না। ঢাকা থেকে তার স্ত্রী, কন্যা, ঘনিষ্ঠ দু’চারজন বন্ধু, প্রকাশক সবাই-ই প্রায় মোবাইলে একই মত দিচ্ছে। হাসনাতের ফেরত আসা উচিত। মহানন্দায় ভেসে ওঠা লাশ কি সবাইকে ভাবিয়ে তুলল নাকি! এমনকি ঢাকাবাসীকেও যারা প্রায় সব ধরনের নৃশংসতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আজ সকালেও বন্ধু সিরাজুল তাকে সতর্ক স্বরে বলেছেন, হাসনাত মহানন্দায় লাশ কিন্তু এখন সচরাচরই মিলছে। শুনে বয়স্ক ঠোঁটের কোণায় ঈষৎ বিদ্রুপের হাসি ঝুলে থাকল হাসনাতের।
আগামীকাল বেডরুমে যে তোমার লাশ পাওয়া যাবে না নিশ্চয়তা কী বন্ধু। হাসনাতের মনে পড়ে ছাত্রাবস্থায় এই সিরাজুলই গরিব এবং পতিতদের দয়া নয়, অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে বলে ভিক্ষা দিত না এবং এই কাজ করতে গিয়ে তাকে কতবার যে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। যে সময়ের কথা তিনি ভাবছিলেন তখন সিরাজুলদের কৃষক বিদ্রোহ প্রায় নিস্তেজ হয়ে এসেছে। বিদ্রোহের নেতারা একের পর এক ধরা পড়ছেন। সে সময় সিরাজুলও ধরা পড়ল। পাকিস্তান সরকারের পুলিশ, মুসলিম লীগের গুণ্ডারা সিরাজুলদের ওপর হেন অত্যাচার নেই যে করেনি। সিরাজুল অগ্নিশিখার মতো জ্বলন্তই থেকেছে। সেই সিরাজুল আজ তাকে নিয়ে এত পলকা কারণে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। দুনিয়াকে তো সে কিছুই দিয়ে যেতে পারেনি। দুহাত ভরে খালি নিয়েছে আর একটা অর্থহীন জীবনযাপন করে গেছে। এখানে বলে রাখা ভালো আমরা হাসনাতকে বরাবর দেখেছি তার আটপৌরে জীবনের চোখ দিয়ে কিন্তু গল্প কথক জানে যৌবনে লালিত একটি বিপ্লব এবং সেই বিপ্লবের ব্যর্থতাজনিত বিষণœতা হাসনাতকেও সময় অসময়ে গ্লানির ঠোকর দিত। কিন্তু কর্মজীবনের নানান খপ্পরে পড়ে, সংসারের নানান লোভের ফাঁদে তরুণী সুন্দরী স্ত্রীর বিলাসী জীবনযাপনের আকাক্সক্ষার ফাঁদে পড়ে অবশেষে হাসনাত এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে বিপ্লব বহু দূরের ব্যাপার আপাতত অধিকার বঞ্চিত মানুষদের অধিকার নয়, ভিক্ষার প্রয়োজন। এ মিথ্যে প্রবোধে সে বহুদিন তার ময়ূরের মতো নীল পাখনাওয়ালা পাজেরোর ডানা মেলে পাঁচ টাকা, দশ টাকার নোট ছুড়ে দিয়েছেন- ঢাকার রাস্তায় প্রায় ভিড় জমে গেছে, তারা বলাবলি করেছে নিজেদের মধ্যে আরে এ রুম কুনসুম হয় নিহি? পাজুরুর জানলা কইলাম সবসুমাত বন-ই থাকে। কেলা খুলছে, কেলা? এসব ফিসফিসানি বন্ধ করে এক সময় যার যার কাজের পথে রওয়ানা হয়েছে। গভীর রাতে টিভি ক্যামেরা ছাড়া, হাসনাত, সিরাজুলসহ তার টিভি চ্যানেলের মালিক বন্ধুরা রেলস্টেশনে কম্বল বিলোতে গেছে ঝাকার মধ্যে শুয়ে থাকা আধো-ঘুম, আধো জাগা মানুষগুলো ভেবেছে এইসব কোনো জিন-পরীর কাজ। যেমন হাসনাতরাও বুঝতে পারেনি লুম্পেনস আর কমরেডদের তফাত। দীর্ঘস্থায়ী একটা লড়াইয়ের প্রস্তুতি কি তাদের সবার ছিল? এখন সেই বিপ্লবী ট্রান্সফর্মড-টু লেখক। এই কি পলায়ন? একটা ক্রোধও ক্ষীণভাবে গজরাচ্ছিল হাসনাতের ভেতর। পেছন তাকিয়ে দেখল সেই লাল চোখের লোকটা। আজ থেকে খানিকটা সতেজ দেখাচ্ছে। নিজে থেকে বলল, ‘কী এত সকালে ঘুম ভেঙে গেল।’ দুর্বল একটি হাসি দিয়ে প্রতুত্তর দিতে চাইল হাসনাত। তারপর আরাম কেদারার ক্যানভাসে গা গলিয়ে দিয়ে পাশের দড়ির চার পায়াকে ইঙ্গিত করে বলল, বসুন। এখানে কী মনে করে? আজ ঢাকা থেকে আমাদের সেন্ট্রাল লিডার আসছেন- তার জন্যই রুমের বুকিং দিতে... সিগারেট চলবে? খানিকটা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতেই আগুন বদল করল লাল চোখ। আমি অনিরুদ্ধ হাজরা। তত্ত্ব আর শ্রেণী সংগ্রামের যুদ্ধ ছেড়ে এখন মজুরদের সঙ্গে খাঁটি। তাদের সঙ্গেই ওঠা বসা তাদের লেখাপড়া শেখাই। গরিব চাষীদের সংগঠিত করি। জোতদারদের শোষণ বঞ্চনার ইতিহাস শোনাই। হাসনাত সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে বলল ‘হ্যাঁ শুনেছি আপনার সম্পর্কে।’ ‘কী শুনেছেন’? এই যেমন এখানকার লেবার শ্রেণীর মানুষদের কাছে আপনি খুব পপুলার কিন্তু কিছুতেই লিডার বনতে চান না। আবার সব ইউনিয়ন টিউনিয়নই আপনাকে সমঝে চলে। সবার জন্যই আপনার খুব দরদ। ঘরে ঘরে গিয়ে সবার খোঁজখবর করেন। কার অসুখ করল কার ঘরের চালা ভাঙল, কে কোথায় দরখাস্ত লিখবে, কাকে কোথায় ঢোকাতে হবে। অনিরুদ্ধ ঠাট্টা গলায় বলায় ও। কিছু লোকাল মিথ শুনেছেন তাহলে। আমি ভাবলাম আরও কিনা কি। আরও কিছু আছে নাকি? উৎসুক হল হাসনাত। এই যে বাম পা টা দেখছেন, একটু ছোট, শুধু ছোট কেন আমি শুদ্ধ নাই হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আপত্তি না থাকলে বলতে পারেন। না সেসব লম্বা আলাপ। তাছাড়া আজ লিডার আসছেন কাজও মেলা। আসছেন কেন তিনি? উপলক্ষ কি মহানন্দার সুলভ লাশ? কিছু হবে মনে করেন এইসব দায়সারা প্রতিবাদে? কী লাভ এসবে এইসব মৃত্যু, এইসব লাশ তো এখন পাখির পালকের মতোই হালকা। সুযোগ পেয়ে নরম্যান বেথুনকে ঝাড়ল হাসনাত। অনিরুদ্ধর চোখ আবার ইটের ভাটার মতো লাল হয়ে উঠল- আপনার কি ধারণা কেবল পয়সাওয়ালাদের লাশ-ই থাই পাহাড়ের মতো ভারী? হাসনাত বলল, আমার ভাবা না ভাবায় কী যায় আসে চোখের সামনে যা দেখছি তাই-ই বলি আর কী? আমরা তো মৃতদের কাতারে। তবে আপনি কী মনে করেন সেইটে ইমপরট্যান্ট। অনিরুদ্ধর চোখ আরও লাল হয়ে উঠছে। সে কিছুই বলল না। করমর্দনের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিলো। আর নীরব চোখের চাহনী দিয়ে বুঝিয়ে দিলো, যেন সময় হলেই সে জানিয়ে দেবে কোন মৃত্যুই পাখির পালকের মতো হালকা নয়। সব লাশই থাই পাহাড়ের মতো ভারী।

নূহাশপল্লীতে নৈঃশব্দের সন্ধ্যা by মাজহারুল ইসলাম

রাতে ভালো ঘুম হল না। চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছি। ভূতবিলাসের বারান্দায় গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা হয়েছে। সে আড্ডার একপর্যায়ে হুমায়ূন আহমেদের অনুরোধে শাওন ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে, জাদুধন’ গানটি গেয়ে শোনান। তারপর থেকেই তীব্র এক হাহাকার আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। গানের সেই বিষণ্ন সুর এখনও আমার কানে বাজছে। অমিয়, অন্বয়, স্বর্ণা ঘুমাচ্ছে। আমি আস্তে করে উঠে জাপানি বটগাছতলায় গিয়ে এক কাপ চা নিয়ে বসলাম। সেখানে আগে থেকেই শাকুর মজিদ বসা। হুমায়ূন আহমেদ ম্যানেজার বুলবুলকে সঙ্গে নিয়ে মাঠের মধ্যে এদিক-ওদিক হাঁটছেন। থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও হাফশার্ট তার পরনে। ঘুরে ঘুরে নিজের তৈরি নন্দনকানন দেখছেন। গতকাল ফার্মগেট খামারবাড়ী নার্সারি থেকে বেশকিছু চারা কিনে এনে লাগিয়েছেন। সেগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। ম্যানেজারকে কিছু নির্দেশনাও দিলেন। এক সময় খেজুরবাগান ঘুরে এসে দাঁড়ালেন আম্রকাননে। এখানে কিছু সময় ঘুরে দেখলেন। তারপর গেলেন ‘রাশেদ হুমায়ূন ঔষধি উদ্যানে’। শতাধিক প্রজাতির ভেষজ গাছ রয়েছে এখানে। উদ্যানের যত্নআত্তির খোঁজখবর নিলেন ম্যানেজারের কাছ থেকে। এবার পুকুরপাড়ের দিকে চলে গেলেন। এরই মধ্যে একের পর এক অনেক টিভি চ্যানেলের গাড়ি নুহাশপল্লীতে ঢুকল। সবাই জেনে গেছে চিকিৎসা বিরতিতে আসা হুমায়ূন আহমেদ আজই নুহাশপল্লী ছেড়ে ঢাকায় চলে যাবেন। নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে এখানে আর আসবেন না। দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফাররাও এসেছেন অনেকে। শাকুর একজনকে ডেকে মজা করে বলল, ভাই, আপনারা এত সকালে চলে এসেছেন? সাংবাদিক বললেন, শুনেছি স্যার ঢাকা ফিরে যাবেন। তাই সকাল সকাল চলে এলাম।
হুমায়ূন আহমেদ ফিরে এলেন আড্ডার রুমে। তার মা আয়েশা ফয়েজ ও বোন নুহাশপল্লীতে আছেন দু’দিন ধরে। আমরা সবাই একসঙ্গে আড্ডার রুমে বসে নাস্তা করলাম। নাস্তা শেষে আবার তিনি মাঠে বেরিয়ে গেলেন। বের হওয়ার আগে ম্যানেজারকে নির্দেশ দিলেন ঢাকা থেকে আসা পত্রিকার লোকজনদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে। সবাইকে যেন খেয়ে যেতে বলা হয়।
এবার সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক নাসির আলী মামুন এসেছেন। কাঁধে দুটো ক্যামেরা ঝুলানো। নানাভাবে ছবি তুলছেন। খ্যাতিমান সব মানুষদের পোর্ট্রেটের বিশাল সংগ্রহ তার। অনেক বছর ধরে তিনি হুমায়ূন আহমেদের ছবি তুলছেন। হুমায়ূন আহমেদ তার নিজের লাগানো বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। কোন গাছটা কখন কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন এবং ওই গাছের ঔষধি গুণাগুণ, বৈজ্ঞানিক নাম ইত্যাদি জানাচ্ছেন। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন দীঘি লীলাবতীর পাড়ে। এখানে একটি স্তম্ভে উৎকীর্ণ আছে দীঘির নামফলক। দু’হাতে স্তম্ভে ভর দিয়ে মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। পাশে তার শিশুপুত্র নিষাদ। এরপর বিশাল এ দীঘির চারপাশটা ঘুরলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। আমি সেই দলের সঙ্গে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ক্লান্ত হয়ে ফিরে এলাম। প্রায় দুই ঘণ্টার মতো হাঁটাহাঁটির পর পদ্মপুকুরের আগের পাড়ে রাখা রট আয়রনের চেয়ারে এসে বসলেন। শুরু হল আবার ইন্টারভিউ দেয়ার পালা। কয়েকটা টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা একসঙ্গে তাকে ফ্রেমবন্দি করেছে এবার। যার যার মতো করে প্রশ্ন করে যাচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ কোনোরকম বিরক্তি ছাড়া একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। সব সময় তাকে দেখেছি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতে। কিন্তু এবার চিকিৎসা বিরতিতে আসার পর থেকে দেখছি উল্টোটা। সবার সঙ্গেই কথা বলছেন প্রাণোচ্ছলভাবে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে বন্ধু ও প্রিয়জনরা আসতে শুরু করলেন। ডাক্তার এজাজ ভোরবেলা এসেছেন। সঙ্গে এনেছেন হুমায়ূনের প্রিয় এক বালতি কই মাছ।
বেলা ১১টার দিকে দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার এলেন সস্ত্রীক, সঙ্গে সহকর্মী মাহবুব আজিজ ও তার স্ত্রী। গোলাম সারওয়ারের স্ত্রী হুমায়ূন আহমেদের জন্য অনেক পদের খাবার রান্না করে এনেছেন। এনটিভির অনুষ্ঠানপ্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ এসেছেন। বিটিভিতে থাকাকালীন হুমায়ূন আহমেদের অনেক নাটক নির্মাণ করেছেন তিনি। কিছুক্ষণ পর সচিত্র সন্ধানীর গাজী শাহাবুদ্দীন এলেন সালেহ চৌধুরীর সঙ্গে। গাজী শাহাবুদ্দীন নিজেও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তারপরও এসেছেন প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে। অসুস্থ অবস্থায় এসেছেন অভিনেতা সালেহ আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য নাটক-সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি। গাড়ি থেকে ধরাধরি করে তাকে নামানো হল। হুমায়ূন আহমেদ এগিয়ে গিয়ে বললেন, এ অবস্থায় আপনি কেন এসেছেন?
তিনি বললেন, না এসে কি পারি?
সালেহ আহমেদকে একটি রুমে নিয়ে শোয়ানো হল। শক্তিমান অভিনেতা। বয়স এমন আহামরি কিছু হয়নি। অসুখ-বিসুখের কাছে পরাস্ত।
একপর্যায়ে শিল্প-সাহিত্যের লোকদের মিলনমেলায় পরিণত হলো নুহাশপল্লীর সবুজ চত্বর।
কিছুক্ষণ জাপানি বটগাছতলায় বসে কুশল বিনিময়ের পর হুমায়ূন আহমেদ সবাইকে নিয়ে তার রুমে চলে এলেন। বাইরে প্রচণ্ড গরম। দরোজা বন্ধ করে ঠাণ্ডা বাতাসে শুরু হল আড্ডা। আড্ডার বিষয়বস্তু মূলত পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ। হুমায়ূন আহমেদ নিউইয়র্কে চিকিৎসা সময়ের মজার কিছু গল্প শোনালেন। ১২টি কেমো শেষ করার পর ডা. জর্জ মিলার যখন জানালেন, ইউ আর নাউ ফিট ফর সার্জারি, সেই সময় তার অনুভূতির কথা। ডাক্তার কী কী বলেছে তার খুঁটিনাটি শোনানোর জন্য স্ত্রী শাওনকে ডাকলেন। তিনি আবার প্রতিটা ঘটনা ডিটেইল বলতে পারেন।
আড্ডার শেষপর্যায়ে গোলাম সারওয়ার জানালেন, তিনি হুমায়ূন দম্পতির সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে চান। আমরা একে একে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। দরজা ভেজিয়ে তারা কিছু সময় কথা বললেন। দুপুরের খাবারের জন্য সবাই আড্ডা রুমে। নুহাশপল্লীর পুকুরের তাজা মাছ, সারওয়ার ভাইয়ের আনা খাবার সবমিলিয়ে টেবিলভর্তি বিশাল আয়োজন। মধ্যাহ্নভোজের পর একে একে সবাই বিদায় নিয়ে ঢাকা ফিরে যেতে শুরু করলেন। হুমায়ূন আহমেদ তার রুমে চলে গেলেন বিশ্রাম নিতে। আলমগীর রহমান, শাকুর মজিদ, কমল ও আমি আড্ডার রুমে।
কিছুক্ষণ পর হুমায়ূন আহমেদ ফিরে এলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম কেন তিনি বিশ্রাম থেকে উঠে এসেছেন। তিনি এসেছেন সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে তার কী কথা হয়েছে তা আমাদের বলার জন্য। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, সারওয়ার ভাই জোর করে আমার পকেটে একটা সাদা খাম ভরে দিয়েছেন। খামের মধ্যে চার হাজার মার্কিন ডলার। তিনি কোনোভাবেই খাম নেবেন না। একপর্যায়ে সারওয়ার ভাই বললেন, আপনার চিকিৎসা-সহায়তার জন্য আমি কিছু দিচ্ছি না। সামান্য কিছু ডলার দিলাম, সার্জারি শেষে আপনি যখন সুস্থ হয়ে উঠবেন, তখন ভাবীকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাবেন। এ কথার পর তো আমি আর না করতে পারি না।
হমায়ূন আহমেদ একটা পান মুখে দিয়ে বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন। এর মধ্যে নতুন করে আরও কয়েকজন সাংবাদিক এসেছেন। তাকে জানাতেই তিনি বললেন, বসতে বল, আমি ঘুম থেকে উঠে কথা বলব। ঘুম থেকে উঠে দ্বিতীয় দফা তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সাংবাদিক এবং অন্য যেসব শুভানুধ্যায়ী এসেছিলেন দুপুরের পর, একে একে তারা বিদায় নিলেন। জাপানি বটগাছতলায় আমরা ক’জন একসঙ্গে বসে চা খেলাম। হুমায়ূন আহমেদও আছেন। চা খেয়ে এবার ঢাকা ফিরে যাওয়ার পালা। ম্যানেজার বুলবুলকে বেশকিছু নির্র্দেশনা দিলেন। বাক্সপেটরা গাড়িতে উঠানো হচ্ছে। নুহাশপল্লীর কর্মীরা একে একে তাদের প্রিয় মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছে।
আমরা সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি নুহাশপল্লীর মূল ফটকে পৌঁছতেই কর্মীরা দরোজা খুলে দিল। কর্মীদের সবাই এখানে ভিড় করেছে। বিদ্যুতের আলোয় দেখছি সবার মুখেই রাজ্যের বিষণ্নতা। তাদের প্রিয় স্যার সুস্থ হয়ে আবার কবে ফিরে আসবেন প্রিয় নুহাশপল্লীতে? দরোজা পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল শাল-গজারির অরণ্যে ঘেরা ছোট্ট এ জনপদের ভেতর দিয়ে। দুই দশক আগে নিভৃত এ পল্লী জেগে উঠেছিল এক জাদুকরের মোহন মন্ত্রে। অথচ আজ এ সন্ধ্যায় চারপাশটায় গভীর নৈঃশব্দ। খুব দ্রুতই আঁধারে ছেয়ে আসছে এই বনানী। নিকষ আঁধার।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে ঐক্য, অনৈক্য

ইসরায়েলে গণহত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল
ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও পারিবারিক বৈরিতাকেন্দ্রিক বাংলাদেশি রাজনীতিতে বহুদিন পর একধরনের রাজনৈতিক মতৈক্য দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন যে রাজনৈতিক রেষারেষিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে, তার পটভূমিতে অন্তত একটি ইস্যুতে রাজনীতির সব প্রতিদ্বন্দ্বীর এক সুরে কথা বলা অবশ্যই একটি ব্যতিক্রম। সরকারের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ, তাঁদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আধা সরকারি-আধা বিরোধী জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ এবং বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি থেকে শুরু করে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং প্রায় একঘরে হয়ে পড়া জামায়াতে ইসলামী—সবাই গাজায় ইসরায়েলি সামরিক হামলার নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো দলই তাদের বিদেশি বন্ধু বা সমর্থক রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ভারত (সামরিক কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্প্রতি গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়) রুষ্ট বা তুষ্ট হবে কি না, সেই উদ্বেগের কারণে নিশ্চুপ থাকেনি।
৩২ বছর আগে এই জুলাই মাসের ২২ তারিখে ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনিদের জন্য লড়াইরত অবস্থায় শহীদ হওয়া বাংলাদেশি কামাল মোস্তফা আলির আত্মা অন্তত এটুকু জেনে স্বস্তি পাবে যে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নে বাংলাদেশে এখনো জাতীয় মতৈক্য বজায় আছে। সত্তর ও আশির দশকে প্রচুর বাংলাদেশির ফিলিস্তিনে গিয়ে যুদ্ধ করার কথা জানা থাকলেও এই বাংলাদেশি শহীদের কথা অনেকের মতো আমারও জানা ছিল না।সম্প্রতি ফেসবুকের কল্যাণে বৈরুতভিত্তিক ইংরেজি সংবাদপত্র আল-আখবর-এ ফিলিস্তিন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর একটি নিবন্ধ আমার নজরে আসে। পত্রিকাটির ৩ জুলাই সংস্করণে সাংবাদিক ইয়াজান আল সাদি এ বিষয়ে একটি বিশদ তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তবে, যথারীতি নিবন্ধটি ফিলিস্তিনিদের ভাষ্যনির্ভর। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা কোনো তথ্য-উপাত্ত দিতে পারেননি বা দেননি।নিবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পাঠকদের অনেকে বেশ কিছু তথ্য পাঠিয়েছেন, যেগুলো অযাচাইকৃত হিসেবে অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে আশি ও নব্বইয়ের দশকে প্রত্যাগত ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ নামে একটি সংগঠন বেশ তৎপর ছিল। ওই সংগঠনটির সদস্যরা কোনো না-কোনো সময়ে ফিলিস্তিনে লড়াই করতে গিয়েছিলেন বলে দাবি করতেন। সরকারিভাবে এসবের বিবরণ বা রেকর্ড কোথাও না-কোথাও থাকার কথা।বিশেষ করে, এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর কিছুটা সম্পৃক্ততা ছিল বলে জানা যায়। আল-আখবর যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের একটি প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে বলেছে যে ১৯৮৭ সালে পিএলও–প্রধান ইয়াসির আরাফাতের ঢাকা সফরের সময়ে বাংলাদেশ জানিয়েছিল যে প্রায় আট হাজার বাংলাদেশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পিএলওর পক্ষে যুদ্ধ করতে গেছেন। ওই প্রতিবেদনে কিছু ফিলিস্তিনি যোদ্ধার বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রধান ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী পিএলওর লেবানন শাখার সম্পাদক, ফাতি আবু আল-আরাদাত আল-আখবর পত্রিকাকে বলেছেন যে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার বাংলাদেশি সেখানে যুদ্ধ করেছেন এমনকি এমন ব্যাটালিয়নও ছিল, যা পুরোপুরি বাংলাদেশিদের। তাঁর বর্ণনায়, ‘বাংলাদেশিরা ছিলেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। তাঁদের মনোবল ছিল অসম্ভব দৃঢ়। ইসরায়েলি আগ্রাসনে আটক হওয়ার পরও তাঁরা নাকি নির্যাতনের মুখে ‘পিএলও, ইসরায়েলি নো’ উচ্চারণ করতেন।
তাঁরা সত্যি সত্যিই এই সংগ্রামে বিশ্বাসী ছিলেন।’ অধিকাংশ বিদেশি যোদ্ধা পিএলওর প্রধান শরিক ফাত্তাহ গ্রুপে যোগ দিলেও লেবাননে সিরিয়া সমর্থিত গোষ্ঠী প্যালেস্টাইন ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি) ছিল শক্তিশালী।এই পিএফএলপির এক কর্মকর্তা লেবাননের শাতিলা শিবিরের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য জিয়াদ হাম্মো বলেছেন যে এসব বাংলাদেশি সামরিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি বলেছেন যে বেক্কা উপত্যকায় কয়েকজন বাঙালি এমন ভালো আরবি বলতেন যে লোকেরা ভুলে যেত যে তাঁরা বাংলাদেশি। তিনি জানান যে ওই সব বাংলাদেশির অনেকেই ১৯৮২-তে লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মোতায়েনের পর চলে গেছেন, কেউ কেউ মারা গেছেন আর অনেকে ইসরায়েলিদের হাতে বন্দী হয়েছিলেন।কামাল মোস্তফা আলি লেবাননের নাবাতিয়েহ প্রশাসনিক এলাকার হাই রক ক্যাসলের যুদ্ধে নিহত হন।২০০৪ সালে জার্মান মধ্যস্থতায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের সময়ে তাঁর লাশ উদ্ধার হয়। শাতিলা শিবিরের বাইরে ফিলিস্তিনি শহীদ সমাধির তত্ত্বাবধায়ক পত্রিকাটিকে জানান যে তাঁর কঙ্কাল বাংলাদেশে তাঁর পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে।তবে, ওই সমাধিক্ষেত্রে তাঁর স্মারক নামফলক এখনো আছে। পত্রিকাটিতে নিবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত বাংলাদেশি গবেষক নাঈম মোহাইমেন দাবি করেছেন যে ফিলিস্তিনি যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশিদের সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত। উমর চৌধুরী নামের আরেকজন জানিয়েছেন যে ঢাকা সেনানিবাসে ফিলিস্তিনিদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে মেজর মোহাম্মদ আফসারউদ্দিন তাঁর একটি বইয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেছেন। সংখ্যাটি যা-ই হোক না কেন, ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশিদের এই অকুণ্ঠ সমর্থন এখনো যে অব্যাহত আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।এখন আর কেউ হয়তো সশরীরে তাঁদের হয়ে যুদ্ধ করতে যেতে পারেন না, কিন্তু মানসিক সমর্থন এখনো অটুট। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দলমত-নির্বিশেষে সবার অভিন্ন অবস্থান অন্তত সেটাই প্রমাণ করে।
২. ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ-এ (১৩ জুলাই, ২০১৪) একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে, যার শিরোনাম হচ্ছে ‘ইসরায়েলস রিয়েল পারপাজ ইন গাজা অপারেশন? টু কিল অ্যারাবস’। লেখক অনেকগুলো পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক, গিডিয়ন লেভি। তিনি পত্রিকাটির সম্পাদনা পর্ষদেরও একজন সদস্য।তিনি বলছেন যে ৩০ বছর আগের লেবানন যুদ্ধের সময় থেকে অনুসৃত নীতি অনুসরণ করেই ইসরায়েল এই সাম্প্রতিকতম অভিযানটি চালাচ্ছে। তাঁর মতে, ইসরায়েল বিশ্বাস করে যে শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলেই সেখানে নিস্তব্ধতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে।হামাসের অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করা যে অর্থহীন তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে৷ কেননা, তারা যে পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। (প্রতিরক্ষা সাময়িকী জেন্স ডিফেন্স উইকলি জানিয়েছে যে হামাস ও প্যালেস্টানিয়ান ইসলামিক জিহাদ, পিআইজে দীর্ঘমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করেছে, ফলে তাঁরা আর চোরাই পথে অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরশীল নয়।) হামাস সরকারের পতন ঘটানোও বাস্তবসম্মত নয়। তা ছাড়া, হামাসের পতন ঘটলে তার চেয়েও বিপজ্জনক অন্য কেউ ক্ষমতায় আসতে পারে। সুতরাং, গিডিয়নের মতে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য শুধু একটিই হতে পারে; তা হলো, আরবদের হত্যা করে ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীকে খুশি করা। বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার যুক্তি হিসেবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যে তাদের হামলার লক্ষ্যস্থল বিভিন্ন ভবন এমনকি স্কুল-হাসপাতালকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে সেগুলোকে হামাসের ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার’ বা ‘সম্মেলনকক্ষ’ বলে অভিহিত করছে, তাকে গিডিয়ন যুদ্ধাপরাধ অভিহিত করে বলছেন যে এটা হচ্ছে ‘মাছির বিরুদ্ধে হাতি’র লড়াই। সিরিয়া বা ইরাকের সহিংসতার সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি বলছেন, গাজার বাসিন্দারা তো খাঁচায় বন্দী, তাঁদের পালানোর কোনো জায়গা নেই। ইসরায়েলি মেজর জেনারেল ওরেন শ্যাচরকে উদ্ধৃত করে তিনি বলছেন যে ইসরায়েলি বাহিনীর নীতি হচ্ছে ‘ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোয় হত্যাকাণ্ড চালালে তারা ভয় পাবে’। তাঁর মতে, আরবদের জন্ম হয় শুধু ‘হয় হত্যা করো না হয় নিহত হও’ এমন এক বাস্তবতায় আর ইসরায়েল তাদের হত্যা করে।
৩. গাজার নিরীহ নিরপরাধ শিশু, নারী ও বেসামরিক নাগরিকদের লাশের সারি, মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ এবং ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র বিশ্বব্যাপী জনমতের ওপর যে প্রভাব ফেলেছে, তার গুরুত্ব পাশ্চাত্যের রাজনীতিকেরা কতটা উপলব্ধি করছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে ডানপন্থী রক্ষণশীল রাজনীতিকেরা এখনো অনেকটা নির্লজ্জভাবে ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন সমর্থন জানিয়ে চলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী গভর্নর ক্রিস্টি ও কানাডার কনজারভেটিভ সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার সরাসরি ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ওবামা প্রশাসন এবং ক্যামেরন সরকার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বা কোনো ধরনের বয়কটের পথে যেতে নারাজ। যুদ্ধবিরতির জন্য মিসরীয়দের একতরফা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণও এটি। সৎ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা না নিতে পারার অভিযোগ তুলে হামাস তাই তাদের ভাষায় আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব উদ্যোগে আন্তরিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অনৈক্যকেই তুলে ধরে। সদ্য সাবেক হওয়া ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ তাঁর পদ হারানোর কয়েক ঘণ্টা আগে (সোমবার বিকেলে) হাউস অব কমন্সে এক বিবৃতিতে বলেন যে ‘হামাসকে এখন চারপক্ষীয় (কোয়ার্টেট-যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও জাতিসংঘ) নীতিমালা মেনে নিয়ে শান্তিপ্রক্রিয়ায় যোগ দেবে নাকি সহিংসতা আর সন্ত্রাস অব্যাহত রেখে গাজার জনগণের ওপর ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনা বজায় রাখবে, সেই মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ বহু বছর ধরে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তাদের এড়িয়ে চলা এবং নির্বাচিত সরকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতির পর হামাসকে শান্তিপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার এই বক্তব্য খুবই ইঙ্গিতবহ। তবে, তাঁর প্রস্থানের পর কনজারভেটিভদের মধ্যে কিছুটা কট্টরপন্থী হিসেবে বিবেচিত ফিলিপ হ্যামন্ড সেই ধারাটি অব্যাহত রাখেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কেননা, হামাসকে ফিলিস্তিনি রাজনীতি থেকে ছেঁটে ফেলা সম্ভব নয়, সেই উপলব্ধি বোধ হয় এখন খুবই জরুরি।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

গুনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফার করুন

ইস্তেগফার’ শব্দের অর্থ কৃত পাপকর্মের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহর অসংখ্য মহান গুণাবলির একটি হলো ক্ষমা। আল্লাহ তাআলা ‘গাফুরুর রাহিম’ অর্থাৎ তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু। মানবজাতি আল্লাহর ক্ষমা ও দয়া লাভ করে রমজান মাসে পাপমোচন লাভ করে সৌভাগ্যবান হতে পারে। যদি কোনো বান্দা ভুলবশত অতি ঘোরতর গুনাহের কাজ করে; এবং সেই ব্যক্তি যদি কায়মনোবাক্যে সিজদায় রত হয়ে তওবা-ইস্তেগফার করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ভিক্ষা চায়, তাহলে আল্লাহ সেসব ইমানদার লোকদের ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি, যে তওবা করে, ইমান আনে, সৎকর্ম করে ও সৎপথে অবিচলিত থাকে।’ (সূরা তাহা, আয়াত: ৮২) মানবজাতিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী।’ (সূরা নাসর, আয়াত: ৩) রমজান মাসে সিয়াম সাধনা রোজাদারের সামনে পাপমুক্তির পথ অবারিত করে দেয়। এ মাসের প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাত বা ক্ষমাপ্রাপ্তির এবং তৃতীয় দশক দোজখ থেকে নাজাত বা মুক্তি লাভের জন্য নির্ধারিত। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘এ মাসে চারটি কাজ অবশ্যকরণীয়। দুটি কাজ এমন যে তার দ্বারা তোমাদের প্রতিপালক সন্তুষ্ট হন। অবশিষ্ট দুটি এমন, যা ছাড়া তোমাদের কোনো গত্যন্তর নেই। চারটির মধ্যে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করা এবং অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা—এ দুটি কাজ আল্লাহর দরবারে অতি পছন্দনীয়।
তৃতীয় ও চতুর্থ হলো জান্নাত লাভের আশা করা ও জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের প্রার্থনা করা। এ দুটি এমন বিষয়, যা তোমাদের জন্য একান্ত জরুরি।’ (ইবনে খুজাইমা) মাহে রমজানের মধ্যবর্তী মাগফিরাতের দশকে ইবাদত-বন্দেগি করে রোজাদার মুমিন-মুসলমানরা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতি মুহূর্তে ক্ষমা লাভে ধন্য হতে থাকে। এ জন্য রোজার দিনে ইবাদতের সময়, চলাফেরায়, কাজের ফাঁকে, শয়নে-স্বপনে, রাত্রি জাগরণে, দিবা-নিশি রোজাদারদের মহান সৃষ্টিকর্তার সমীপে কায়মনোবাক্যে মাগফিরাত চাওয়া বা ইস্তেগফার করা অবশ্যকর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও আত্মবিশ্লেষণের সঙ্গে রোজা আদায় করল, সে পূর্বে কৃত গুনাহ মার্জনা করিয়ে নিল।’ (বুখারি ও মুসলিম) হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা দিনে ও রাতে গুনাহ করে থাকো আর আমি সব গুনাহ ক্ষমা করতে পারি। অতএব, তোমরা আমার কছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেব।’ (মুসলিম) আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য নফসের মধ্যে খারাপ চাহিদা রেখে দিয়েছেন। তবে তার মধ্যে ভালো ও মন্দের প্রবণতাও দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে বিবেক ও নফস উভয়ই সৃষ্টি করেছেন। বিবেক তাকে ভালো কাজের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে নফস তাকে মন্দ কাজের দিকে আকৃষ্ট করে। এ কারণে স্বভাবগতভাবে মানুষের মন গুনাহের দিকে আকৃষ্ট থাকে। পাপের দিকে আকৃষ্ট এ নফসকে বলা হয় ‘নফসে আম্মারা’।  এ নফসই মানুষের কাছে গুনাহকে মজাদার করে উপস্থাপন করে। ফলে মানুষের খারাপ কাজ করতে ভালো লাগে।গুনাহের শুরুতে যতই মজা লাগুক; কিন্তু পরে তার ক্ষতি প্রকাশ পায় বা অন্তর্জ্বালা শুরু হয়। গুনাহের মজা সামান্য সময়ের জন্য; আর এর অবশ্যম্ভাবী ক্ষতি হয় দীর্ঘস্থায়ী।
গুনাহখাতা মাফের পদ্ধতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যখন তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করে, তখন তারা তোমার কাছে এলে ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং রাসুলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইলে তারা আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত দয়ালু হিসেবে পাবে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৪) আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘বলো: হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আজ-জুমার, আয়াত : ৫৩) রমজান মাসের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও রজনীতে আল্লাহর জিকির, তওবা, ইস্তেগফার ও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকা বাঞ্ছনীয়। কেননা আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যই দুনিয়াতে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীবরূপে পাঠিয়েছেন। তিনি শয়তানও সৃষ্টি করেছেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য, যে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে সর্বক্ষণ মানুষকে অসৎ পথে পরিচালনায় সচেষ্ট থাকে। শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ যত পাপই করুক না কেন, অনুতপ্ত হয়ে এবং ভবিষ্যতে কখনো পাপ না করার দৃঢ়সংকল্প নিয়ে ইস্তেগফার করলে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। যখন মাহে রমজানের কদরের রাত হয়, তখন ক্ষমা প্রার্থনাকারীকে আল্লাহ তাআলা মাফ করে দেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কিন্তু সীমালঙ্ঘন করার পর কেউ তওবা করলে ও নিজেকে সংশোধন করলে আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩৯) অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,‘যারা ইমান আনে ও পরে কুফরি করে, আবার ইমান আনে আবার কুফরি করে; অতঃপর তাদের কুফরি প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তাদের কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং তাদের কোনো পথে পরিচালিত করবেন না।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৭) তাই আসুন, মাগফিরাতের দশকে কান্নাভেজা কণ্ঠে আমরা আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে মোনাজাত ও ক্ষমা প্রার্থনা করি, ‘হে আল্লাহ! মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা ও ইবাদতের বরকতে আমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দিন এবং জীবনে কৃত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন!
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক।
dr.munimkhan@yahoo.com

প্রত্যক্ষদর্শীর কণ্ঠে হামলার বর্বরতা

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুলে তালেবান জঙ্গিদের হামলায় মুহূর্তেই ঝরে পড়ল প্রায় দেড়শ’ চঞ্চল শিশু-শিক্ষার্থী। সেই বর্ণনাতীত বর্বরতা স্বচক্ষে দেখেছেন অনেকেই। মঙ্গলবার ওই ঘটনা কীভাবে ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ জানা না গেলেও বেঁচে যাওয়া কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন সেই লোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষ্য।
তখন পরীক্ষা চলছিল
গুলি শুরু হওয়ার পরপরই আমরা ক্লাসরুম ছেড়ে দৌড় দেই। নবম-দশম শ্রেণীতে পার্টি চলছিল, সেখানে অল্প কয়জন ছিল। ওপর তলায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা চলছিল। আমি দেখলাম, ৭-৮ জন লোক প্রত্যেকটা ক্লাসরুমে ঢুকছেন আর বাচ্চাদের ওপর গুলি চলাচ্ছেন।
মুদাসসির আওয়ান
গুলি চলছিল এলোপাতাড়ি
আমরা হলে বসে একজন কর্নেলের লেকচার শুনছিলাম। পেছন থেকে গুলির শব্দ শুনি। হঠাৎ পেছনের দরজা শব্দ করে খুলে গেল আর দু’জন লোক এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে লাগলেন। আমার পায়ে গুলি লাগলেও বাঁচতে পেরেছি।
কাশান, নবম শ্রেণী।
যাকে পাচ্ছিল তাকেই গুলি
তারা সামনে যাকে পাচ্ছিল, তাকেই গুলি করছিল। আমরা চেয়ারের পেছনে ও টেবিলের নিচে লুকাই। কিন্তু তারা আমাদের পায়েও গুলি চালাচ্ছিল।
-একজন ছাত্র (নাম জানা যায়নি)।
শুধু রক্ত আর লাশ
আমি দেখলাম যেসব বাচ্চারা কাঁদছিল আর চিৎকার করছিল তারা মুহূর্তেই লাশ হয়ে ঢলে পড়ছিল। সবার গায়ে বুলেট লাগছিল, সবার থেকে রক্ত ঝরছিল।
আবদুল্লাহ জামাল।
মরার অভিনয় করে বেঁচে যাই
হঠাৎ করে কেউ একজন চিৎকার করে আমাদের শুয়ে পড়তে এবং ডেস্কের নিচে লুকাতে বলে। তখনই বন্দুকধারীরা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে গুলি করে।
এরপর এক বন্দুকধারী চিৎকার করে বলে ‘বেঞ্চের নিচে অনেক শিশু রয়েছে, যাও তাদেরকে ধরো’। আমার দুই পায়ে হাঁটুর নিচে গুলি লাগে। প্রচণ্ড ব্যথায় আমার কান্না পাচ্ছিল। তখন আমি মরার মতো পড়ে থাকার কথা চিন্তা করি।
আমি টাই খুলে তা ভাঁজ করে মুখে গুজে দেই যাতে করে আমার গোঙানির আওয়াজ শোনা না যায়। বড় বুট জুতা পরা লোক বেঁচে যাওয়া ছাত্রদের খুঁজে খুঁজে গুলি করতে থাকে। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থেকে কখন গুলির অপেক্ষা করতে থাকি। আমার সারা শরীর কাঁপছিল। মৃত্যুর এত কাছকাছি চলে গিয়ে ছিলাম আমি।
সালমান খান (১৬)
রক্ত ও দেহের টুকরোগুলো ধুনা তুলার মতো উড়ছিল
‘বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির আঘাতে ফুটফুটে শিশুদের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে এবং তাদের শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত যেন ধুনা তুলার মতো উড়ছিল। এর সঙ্গে আর্তনাদ, মৃত্যুযন্ত্রণা যোগ হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল নারকীয় পরিস্থিতির।’
পাকিস্তানের পেশোয়ারে আর্মি পাবলিক স্কুলে তালেবান হামলায় বেঁচে ফেরা এহসান এলাহি ডেইলি মেইলের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন বর্ণনা দিয়েছে। সেই বীভৎস মুহূর্তগুলোর কথা বলার সময় বারবার ডুকরে কেঁদে ওঠে সে।
এহসান এলাহী

মৃত্যুর অ্যালার্ম বাজেনি যার

মঙ্গলবারের সন্ত্রাসী হামলায় পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলের নবম শ্রেণীর একজন বাদে সবাই তালেবানের বর্বর হত্যার শিকার হয়েছে। বেঁচে যাওয়া একমাত্র ছাত্র ১৫ বছর বয়সী দাউদ ইব্রাহিম। সকালে ইব্রাহিমের অ্যালার্ম ঠিকমতো কাজ না করায় এই ভয়াবহ গণহত্যা থেকে বেঁচে যায় সে।
ঘটনার আগের দিন রাতে দাউদ একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল। এ কারণে মঙ্গলবার সকালে সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। দাউদ হয়তো বেঁচে আছে তার প্রিয় বন্ধুদের শেষকৃত্য দেখার জন্য। ৭-৯ জন তালেবান বন্দুকধারী স্কুলটিতে নির্বিচারে গুলি এবং গ্রেনেড নিক্ষেপের মাধ্যমে ১৩২ শিশুসহ ১৪১ জনকে হত্যা করে। অনেক শিশুকে লাইনে দাঁড় করিয়ে, কাউকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

সবুজে অকুতোভয় বিজয়

শুধু ভারত কেন, ব্রিসবেনে যে কোনো দলের বিপক্ষেই অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ড দুর্দান্ত। এ মাঠে গত ২৬ বছরে কোনো টেস্ট হারেনি স্বাগতিকরা। গ্যাবার দুর্গে অস্ট্রেলিয়ান পেস ও বাউন্সের বিপক্ষে সর্বশেষ পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। ২০০৩ সলের ডিসেম্বরে সৌরভের ১৪৪ রানের সেই দুর্দান্ত ইনিংসের সুবাদে ব্রিসবেন টেস্ট ড্র করেছিল ভারত। প্রায় ১১ বছর পর গ্যাবার সবুজ উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে একটি দুঃসহ দিন উপহার দিলেন আরেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান। ওপেনার মুরালি বিজয়ের ঝলমলে এক সেঞ্চুরিতে কাল শুরু হওয়া ব্রিসবেন টেস্টের প্রথম দিনটা নিজেদের করে নিয়েছে ভারত। কাকতালীয়ভাবে সৌরভের মতোই ঠিক ১৪৪ রানে থেমেছে বিজয়ের দুর্দান্ত ইনিংসটি। দিন শেষে ভারতের সংগ্রহ চার উইকেটে ৩১১। বিজয়ের বিদায়ের পর দলকে পথ দেখাচ্ছেন সেঞ্চুরির পথে এগিয়ে চলা আজিংকা রাহানে। প্রথম সেশনেই প্রথম ভারতীয় ওপেনার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টানা তিন ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি কারার কীর্তি গড়েন বিজয়।
কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি, এরপর তুলে নেন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি। অস্ট্রেলিয়া বরাবরই তার প্রিয় প্রতিপক্ষ। টেস্টে বিজয়ের পাঁচ সেঞ্চুরির চারটিই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। অ্যাডিলেডে সিরিজের প্রথম টেস্টেই নিজের দুর্দান্ত ফর্মের নমুনা দেখিয়েছিলেন বিজয়। দুই ইনিংসে তার ব্যাট থেকে এসেছিল যথাক্রমে ৫৩ ও ৯৯ রান। কিন্তু বিরাট কোহলির জোড়া শতকে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তার কীর্তি। এবার কোহলিকে ছাপিয়ে আলোটা নিজের দিকে টেনে নিলেন বিজয়। ব্রিসবেনের বাউন্স উইকেটে সারা দিন বল করে মাত্র চার উইকেট পাওয়া স্বাগতিকদের জন্য যথেষ্ট হতাশার। অস্ট্রেলিয়ার ৪৫তম টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক দিনটা মোটেও ভালো কাটেনি স্টিভেন স্মিথের। আটজন বোলার ব্যবহার করেও ভারতকে চাপে ফেলতে পারেননি। অভিষিক্ত হ্যাজেলউড দুটি উইকেটের সঙ্গে চোটও পেয়েছেন।
আলরাউন্ডার মিচেল মার্শ লাঞ্চের পর আর মাঠেই নামতে পারেননি। হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ায় এ টেস্টে তার খেলা নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বোলিংয়ের মতো ফিল্ডিংও হয়েছে বাজে। মিচেল জনসনের বলে দু’বার বিজয়ের ক্যাচ ফেলেছেন শন মার্শ। শেষ পর্যন্ত প্রথম দিনের হিরো বিজয়ের উইকেটটি নিয়েছেন অ্যাডিলেডে ভারতকে শেষ করে দেয়া নাথান লায়ন। সকালে টস জিতে ব্যাটিং বেছে নেয়া ভারতের শুরুটাও হয় ভালো। শিখর ধাওয়ানের (২৪) বিদায়ে উদ্বোধনী জুটি ভাঙে ৫৬ রানে। দলীয় ১০০ রানে ইংলিশ অ্যাম্পয়ার ইয়ান গোল্ডের ভুল সিদ্ধান্তের বলি হন চেতেশ্বর পূজারা (১৮)। অ্যাডিলেডের ট্রাজিক হিরো কোহলি মাত্র ১৯ রানেই সাজঘরের পথ ধরেন। এরপর স্বাগতিকদের হতাশায় ডুবিয়ে ১২৪ রানের দুর্দান্ত এক জুটি গড়েন বিজয় ও রাহানে। দিন শেষে ৭৫ রানে অপরাজিত রাহানে। ২৬ রান নিয়ে তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন রোহিত শর্মা। এএফপি।
ভারত প্রথম ইনিংস
রান বল ৪ ৬
বিজয় ক হ্যাডিন ব লায়ন ১৪৪ ২১৩ ২২ ০
ধাওয়ান ক হ্যাডিন ব মার্শ ২৪ ৩৯ ০ ০
পূজারা ক হ্যাডিন ব হ্যাজলউড ১৮ ৬৪ ১ ০
কোহলি ক হ্যাডিন ব হ্যাজলইড ১৯ ২৭ ১ ০
রাহানে নটআউট ৭৫ ১২২ ৭ ০
রোহিত শর্মা নটআউট ২৬ ৩৪ ২ ১
অতিরিক্ত ৫
মোট (৪ উইকেটে, ৮৩ ওভারে) ৩১১
উইকেট পতন : ১/৫৬, ২/১০০, ৩/১৩৭, ৪/২৬১।
বোলিং : জনসন ১৫-২-৬৪-০, হ্যাজলউড ১৫.২-৫-৪৪-২, স্টার্ক ১৪-১-৫৬-০, মার্শ ৬-১-১৪-১, লায়ন ২০-১-৮৭-১, ওয়াটসন ১০.৪-৫-২৯-০, ওয়ার্নার ১-০-৯-০, স্মিথ ১-০-৪-০।

গতকাল ১০ জনসহ নয় দিনে নিহত ২০৭, আহত দেড় হাজার

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান ও স্থল হামলার প্রতিবাদে
গতকাল ফ্রান্সের স্ট্রসবুর্গ এলাকায় বিক্ষোভ। এএফপি
আবার রক্তাক্ত গাজা। আবার লাশের সারি, গাজায় স্বজন হারানোর বেদনায় কান্না আর আর্তনাদের শব্দ। সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পর গত মঙ্গলবার থেকেই আবার ফিলিস্তিনে নির্বিচারে হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। গতকাল বুধবার বেপরোয়া হামলায় অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে নয় দিনে নিহতের সংখ্যা ২০৭ জনে দাঁড়াল। অবশ্য গাজায় কেবল হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে বলে ইসরায়েল দাবি করছে। খবর বিবিসি, আল-জাজিরা, এএফপি ও রয়টার্সের। এদিকে গত মঙ্গলবার গাজা থেকে ছোড়া রকেট হামলায় এক ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি হামলার জবাবে নয় দিন ধরে গাজা থেকে ছোড়া রকেটে এই প্রথম কোনো নিহতের ঘটনা ঘটল। হামাসের ওয়েবসাইটে বলা হয়, বুধবার হামাসের অন্তত চারজন জ্যেষ্ঠ নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামাস-শাসিত গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, নতুন করে শুরু হওয়া হামলায় অন্তত ৩০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। হামলা হয়েছে হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা মাহমুদ জহর, জামিলা শান্তি, ফাতি হামাস ও ইসমাইল আসকারের বাড়িতে। গাজার চিকিৎসা কর্মকর্তারা জানান, বুধবার হামলায় কমপক্ষে ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ মাসের এক শিশুও রয়েছে। হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা মাহমুদ জহরের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজার জরুরি বিভাগের কর্মকর্তা আশরাফ আল-কুদরার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, গাজার রাফা শহরের একটি বাড়িতে হামলায় দুজন নিহত হন। রাফায় পৃথক হামলায় এক তরুণ নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ওই তরুণ কট্টরপন্থী সংগঠন ইসলামিক জিহাদের সদস্য। কুদরা জানান, রাফা ছাড়া খান ইউনিস এলাকায় পৃথক হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, এসব হামলায় কোনো নেতার হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর বুধবার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ২০৭-এ পৌঁছেছে। আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৩০ জনে। হতাহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। এদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। ইসরায়েল বলছে, গাজার কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর রকেট হামলার জবাবে ‘অপারশেন প্রটেক্টিভ এজ’ অভিযানের আওতায় বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। গাজা থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার রকেট ছোড়া হয়েছে।
এতে এক ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হন চারজন। ইসরায়েলি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার গাজা থেকে ছোড়া একটি রকেট ইরেজ সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে আঘাত হানে। এতে ওই ইসরায়েলি নিহত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, নতুন করে হামলা শুরুর আগে গতকাল গাজার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। বুধবার ভোর পাঁচটায় ওই বাসিন্দাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বলা হয়। গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে হাজার হাজার বাসিন্দাকেও নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়। বিমান থেকে প্রচারপত্র ফেলে ও রেকর্ড করা বার্তা প্রচার করে ফিলিস্তিনিদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা গাজার দুটি শহরের বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, মঙ্গলবার থেকে নতুন অভিযানে গাজায় ৯৬টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ শুরু করার পর প্রথম আট দিনে গাজায় এক হাজার ৭৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের প্রায় একতরফা সামরিক অভিযান বন্ধ করতে প্রতিবেশী মিসর গত মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব করে। মিসরের ওই প্রস্তাব অনুমোদন করে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা। সাময়িকভাবে হামলাও বন্ধ করে ইসরায়েলি বাহিনী। কিন্তু হামাস যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে জানায়, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই প্রস্তাব আনা হয়েছে। এটি ‘আত্মসমর্পণের’ সমতুল্য। হামাস পূর্ণাঙ্গ কোনো চুক্তি ছাড়া রকেট হামলা বন্ধ করবে না। এরপর আবার গাজায় হামলা চালানো শুরু করে ইসরায়েল। ইইউর পর্যবেক্ষক পাঠানোর প্রস্তাব: ইসরায়েল-গাজা সীমান্ত ক্রসিংয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর প্রস্তাব তুলেছে ফ্রান্স। দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবিয়াস গতকাল এই প্রস্তাব দেন। চলতি সপ্তাহে ওই প্রস্তাব নিয়ে ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের আলোচনা হতে পারে।

ভারতে হঠাৎ সরকারের পাশে তৃণমূল কংগ্রেস

মমতা বন্দোপাধ্যায়
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানাননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সরকার সম্পর্কে তাঁর দলের ভূমিকা কী হবে, এত দিন তা-ও স্পষ্ট করেননি। কিন্তু গতকাল বুধবার বাজেট বিতর্কে বিষয়টি স্পষ্ট হলো। বাজেট বিতর্কে সরকার সম্পর্কে তৃণমূল কংগ্রেসের মনোভাব স্পষ্ট করেন লোকসভায় দলের নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা ভালো কাজ করুন, আমরা সমর্থন করব।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর সরকারের প্রতি তৃণমূলের এই মনোভাব কয়েক দিন ধরে রাজধানীর অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। নির্বাচনী প্রচারের সময় মমতা-মোদি সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। এর অন্যতম কারণ,
‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ প্রসঙ্গ। সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে শিষ্টাচার মেনে মোদিকে মমতা অভিনন্দন পর্যন্ত জানাননি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-তৃণমূল সংঘাত এই মুহূর্তে চরমে। এরই মধ্যে হঠাৎ সরকারের ভালো কাজের সমর্থনের কথা প্রকাশ্য ঘোষণার কারণ কী, সে নিয়ে রাজধানীতে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানেই উঠে আসছে সারদাকাণ্ডে সিবিআইয়ের তদন্তের ভূমিকা প্রসঙ্গ। সমর্থনের প্রথম চমক টেলিকম রেগুলেটরি আইন সংশোধনী (ট্রাই) বিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখ্য সচিব হিসেবে সাবেক আমলা নৃপেন্দ্র মিশ্রকে অধ্যাদেশ জারি করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কারণ, সংশ্লিষ্ট আইনে ট্রাইয়ের চেয়ারম্যানের অবসরের পর কোনো সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিষিদ্ধ ছিল। বিজেপি সেই আইনকে সমর্থনও জানিয়েছিল। কিন্তু মোদির প্রিয় আমলাকে নিয়োগ দিতে সেই আইন পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলও সেই সংশোধনী বিল উত্থাপনের বিরোধিতা করে। তৃণমূলের সৌগত রায় তীব্র বিরোধিতা করার তিন দিন পর ঢোঁক গিলে গত সোমবার দলের নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বিলটিকে সমর্থন জানান। সোমবারের ওই চমকের পর দ্বিতীয় চমক গতকাল বুধবার বাজেট বিতর্ক।
সুদীপের ভাষণ আগাগোড়াই ছিল সংযত। বাজেটের বেশ কিছু প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু কিছু প্রস্তাব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা আগেই চালু করেছেন। যেমন কন্যাসন্তানের সামাজিক নিরাপত্তা ও তাদের বিকাশের জন্য কন্যাশ্রী প্রকল্প। অরুণ জেটলিকে উদ্দেশ করে সুদীপ বলেন, ‘রাজ্যকে ধারের ভার থেকে বাঁচাতে আগের সরকারকে বহুবার বলা হয়েছিল। আপনাদের কাছেও সেই অনুরোধ থাকল।’ সুদীপ প্রস্তাব করেন, গঙ্গাকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তাতে কলকাতাকে যেন সম্পৃক্ত করা হয়। সর্দার বল্লবভাই প্যাটেলের স্ট্যাচুর জন্য বাজেটে ২০০ কোটি রুপি বরাদ্দের বিরোধিতা না করে তিনি বরং কলকাতায় স্বামী বিবেকানন্দের জন্য একটা ওই রকম প্রকল্প করার অনুরোধ জানান। রেশন মারফত নিত্যপ্রয়োজনীয় একাধিক জিনিস সরবরাহের তালিকাও তিনি পেশ করেন। সেই সঙ্গে তিনি অনুরোধ করেন, বিদেশি লগ্নিকারীদের হাতে দেশটা ছেড়ে দেবেন না। সরকারকে তৃণমূলের হঠাৎ এই সমর্থনের দরাজ হাত বাড়ানোর কারণ কী, তা নিয়েই রাজধানীতে চলছে জোর জল্পনা। কংগ্রেস, সিপিএম তো বটেই, এমনকি বিজেপির কোনো কোনো নেতাও তৃণমূলের এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে সারদাকাণ্ডে সিবিআইয়ের তদন্তও একটা কারণ বলে মনে করছেন। তৃণমূলের রাজ্যস্তরের একাধিক নেতা এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি হবেন রাজা মেয়ে রাজকুমারী

প্রিন্সেস এমিলি
কেউ দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন, কেউ বা দেখেন বিলাসী জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু এক অন্য রকম স্বপ্ন দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের নাগরিক জেরেমিয়াহ হিটন। তাঁর স্বপ্ন, নিজের মেয়েকে রাজকুমারী হিসেবে দেখা। সেই লক্ষ্যে সম্প্রতি তিনি আফ্রিকার একটি দুর্গম এলাকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। পরে মিসর ও সুদানের মধ্যবর্তী বির তাবিল নামে একটি এলাকা তিনি নিজের বলে দাবি করছেন। খবর এপির।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার দৈনিক পত্রিকা ব্রিস্টল হেরাল্ড কুরিয়ারকে হিটন বলেন, ছোট্ট ওই পার্বত্য এলাকাটি এখনো কোনো দেশ দাবি করেনি। তিনি সেখানে তাঁর সাত বছর বয়সী মেয়ে এমিলির ডিজাইন করা একটি পতাকা উড়িয়ে এসেছেন। তিনি যেন সেখানকার রাজা এবং তাঁর মেয়ে রাজকুমারী হতে পারে, সেজন্য আগেভাগে পতাকা উড়িয়ে এসেছেন। তাঁরা ওই এলাকাটির নাম দিয়েছেন কিংডম অব নর্থ সুদান।

নাইজেরিয়ায় বোকো হারামের শীর্ষ কমান্ডার গ্রেপ্তার

মোহাম্মদ জাকারি
বোকো হারামের একজন কমান্ডারকে গ্রেপ্তার করেছে নাইজেরিয়া। মোহাম্মদ জাকারি (৩০) নামের ওই কমান্ডার জঙ্গি সংগঠনটির ‘শীর্ষ কসাই’ হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছে দেশটির পুলিশ। খবর সিএনএনের। পুলিশ জানায়, বোকো হারামের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ার বালমো ফরেস্ট এলাকায় পুলিশ ও সামরিক বাহিনী জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। এ সময় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন কমান্ডার জাকারি। তবে পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন।
কমান্ডার জাকারির বিরুদ্ধে নারী, শিশুসহ সাতজনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে বলে পুলিশ জানায়। এ ছাড়া বোকো হারামের বিভিন্ন নৃশংস হামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বোকো হারামের হামলায় চলতি বছর এ পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার ৫৩ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

জনশক্তি রপ্তানিতে মন্দা -প্রবাসী–আয় কমছে by শরিফুল হাসান

জনশক্তি রপ্তানির মন্দাবস্থা থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ। দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি কমছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) কমে আসা। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্স কমছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারক এবং এই খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের একসময়ের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে সেভাবে লোক যাচ্ছেন না। এর মধ্যেই দুই বছর ধরে প্রায় বন্ধ হয়ে আছে দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। তৃতীয় বড় বাজার মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে লাখ লাখ কর্মী যাবে শোনা গেলেও দেড় বছরে মাত্র হাজার পাঁচেক কর্মী গেছেন। যুদ্ধাবস্থার কারণে লিবিয়া ও ইরাকের শ্রমবাজারেরও খারাপ দশা। ওমান, বাহরাইন ও কাতারে কর্মী যাওয়া বাড়লেও গত পাঁচ বছরে সেই অর্থে নতুন করে কোনো শ্রমবাজার তৈরি হয়নি।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও সরকারিভাবে কর্মী পাঠানোসহ নানা বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে এ খাতের ব্যবসায়ীদের দ্বন্দ্ব চলেছে। এরই প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। এর মধ্যেই আবার সরকারি ডেটাবেইসে নিবন্ধিত কর্মী নিতে হবে—মন্ত্রণালয়ের এমন বাধ্যবাধকতার কারণে সংকট আরও বাড়ছে। তবে খন্দকার মোশাররফ হোসেন দ্বিতীয় দফায় মন্ত্রী হওয়ার পর ব্যবসায়ীরা এখন তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তবে এর সুফল এখনো আসেনি শ্রমবাজারে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে (২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন) দুই লাখ সাত হাজার ৯৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০১৩ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল দুই লাখ আট হাজার ৩৪০ জন। অথচ ২০১২ সালে একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন তিন লাখ ৭৪ হাজার ৮৩৭ জন। অর্থাৎ ২০১২ সালের চেয়ে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় পৌনে দুই লাখ কর্মী কম বিদেশে গেছেন।
জনশক্তি রপ্তানি কমার পাশাপাশি প্রবাসী-আয়ও কমেছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের চেয়ে ২০১৩ সালে সাত হাজার ৭৫০ কোটি টাকা কম প্রবাসী-আয় এসেছে। অর্থবছরের হিসেবেও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২০১২-১৩ অর্থবছরের চেয়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম প্রবাসী-আয় এসেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রবাসীরা এক হাজার ৪২২ কোটি ৭০ লাখ (১৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সেটি ছিল এক হাজার ৪৪৬ কোটি (১৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন) ডলার।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অতিরিক্ত কর্মী থাকা—এসব কারণে জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে। তবে জনশক্তি রপ্তানি কমার সঙ্গে রেমিট্যান্স কমার কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে করেন এই মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যারা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠায়, তাদের কোনো সুবিধা দেওয়া হয় না। একটু সুবিধা দিলেই রেমিট্যান্স বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংককে আমরা সেই কথা বলেছি।’
যোগাযোগ করা হলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী-আয় ব্যক্তি খাতের চাহিদা বৃদ্ধি করে। এর প্রবাহ কমে গেলে, বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাঁর প্রভাব পড়বে। গ্রামে দালানকোঠা, বাড়ি নির্মাণ কমে যাবে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী-আয় কমে যাওয়াটা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের থেকে যে আয় আসে, তা গ্রামে যায়। আমেরিকা থেকে যে অর্থ আসে, সেটা গ্রামে ততটা যায় না।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকারকে এটা গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর প্রচেষ্টা নিতে হবে। তা না হলে আমদানিতে এর প্রভাব পড়বে। এখন আমদানি বাড়তে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরও সচল হলে আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে। ফলে সে বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।
আট বছরের চিত্র: ২০০৭ সালে আট লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০০৮ সালে আট লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আগের বছরের তুলনায় জনশক্তি রপ্তানি অর্ধেকে নেমে আসে। ২০০৯ সালে চার লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিল। পরের বছর ২০১০ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলেও ২০১১ সালে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার এবং ২০১২ সালে ছয় লাখ আট হাজার কর্মী বিদেশে যান। কিন্তু ২০১৩ সালে তা চার লাখে নেমে আসে। এ বছরও সেই মন্দা অব্যাহত আছে।
কমার কারণ: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে গড়ে দেড় লাখ করে কর্মী গেছেন। কিন্তু ২০০৯ সালে এই বাজারটি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। গত সাড়ে পাঁচ বছরে মাত্র ৭৭ হাজার অর্থাৎ গড়ে বছরে ১৪ হাজারেরও কম কর্মী গেছেন দেশটিতে। সৌদি আরবে কিছু বাংলাদেশির অপরাধপ্রবণতা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের ব্যর্থতায় এখনো এই বাজারটি সেভাবে চালু হয়নি বলে জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা মনে করছেন।
জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা বলছেন, সৌদি আরবের বাজার পুরোপুরি চালু করা গেলে জনশক্তি রপ্তানির ধস ঠেকানো যেত। কিন্তু কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর পরেও সফল হয়নি বাংলাদেশ। তবে গত বছর দেশটিতে চলা সাধারণ ক্ষমার সুবিধায় আট লাখ বাংলাদেশি বৈধতা পেয়েছে।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড় বাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতিবছরই এই বাজারে কর্মী যাওয়া বেড়েছে। এর মধ্যে ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে আড়াই লাখ করে কর্মী গেছেন দেশটিতে। কিন্তু ভিসা জালিয়াতি ও কিছু প্রবাসীর অপরাধপ্রবণতার কারণে দুই বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয় দেশটি। এরপর সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতায় ওয়ার্ল্ড এক্সপো-২০২০ কে সামনে রেখে রাশিয়াকে সমর্থন দিলে ক্ষুব্ধ হয় আরব আমিরাত। ফলে এই বাজারটিতে জনশক্তি রপ্তানি এখন বন্ধ। গত দেড় বছরে মাত্র ২৫ হাজার কর্মী গেছেন দেশটিতে।
কুয়েতের শ্রমবাজার ২০০৯ থেকেই বন্ধ। গত সাড়ে পাঁচ বছরে মাত্র ৭৭৬ জন কর্মী গেছেন দেশটিতে। কুয়েতের জনশক্তি রপ্তানির সমস্যা সমাধানে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুয়েত সফর করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের আমিরকে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। যুদ্ধাবস্থার কারণে পরিস্থিতি খারাপ লিবিয়া ও ইরাকেও।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০০৭ ও ২০০৮ সালেও এই বাজারে চার লাখ কর্মী গেছেন। কিন্তু প্রতারণাসহ নানা অনিয়মের কারণে ২০০৯ সালের মার্চে এসে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় দেশটি। দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ২০১২ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়া এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এরপর দুই দেশের মধ্যে সরকারিভাবে কর্মী আদান-প্রদানের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ঘোষণা দেন, মালয়েশিয়া প্রতিমাসে ১০ হাজার করে কর্মী নেবে। বছরে তারা লাখ খানেক কর্মী নেবে। আগামী কয়েক বছরে পাঁচ লাখ কর্মী নেবে। কিন্তু গত দেড় বছরে মাত্র ছয় হাজার লোক মালয়েশিয়ায় গেছেন।
নতুন বাজার নেই: ওমান, কাতার, বাহরাইন ও সিঙ্গাপুরে চাহিদা আছে বলেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। গত ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ওমানে। এই সংখ্যা ৫৪ হাজার ২৮৪। এ ছাড়া ২৬ হাজার কর্মী সিঙ্গাপুরে, ৩৮ হাজার কর্মী কাতারে, ১১ হাজার কর্মী বাহরাইনে, সাড়ে ১০ হাজার কর্মী জর্ডানে, সাত হাজার কর্মী লেবাননে, চার হাজার কর্মী ব্রুনাই গিয়েছেন।
সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নতুন নতুন বাজার খোঁজা হচ্ছে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে এক শরও বেশি দেশে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুরোনো ১০টি দেশের ওপরই এখনো নির্ভর করে আছে বাংলাদেশ।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে ১৬টি দেশের তালিকা করা হয়। এ দেশগুলো হলো: জাপান, হংকং, তাইওয়ান, ইতালি, বেলজিয়াম, জার্মানি, স্পেন, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা ও জিম্বাবুয়ে। এই দেশগুলোর পরিস্থিতি দেখতে প্রবাসী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে পাঁচটি দলও গঠন করা হয়। এই কমিটির সদস্যরা অনেক দেশ সফর করলেও কোনো নতুন বাজার চালু করতে পারেননি।
জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা বলছেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে দ্রুত একটি বৈঠক করে এই খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তারপর সমাধানের কাজেও নামতে হবে একসঙ্গে।
জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি আবুল বাসার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এখন সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। খুব দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।’