Saturday, August 30, 2025

ভারত–পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা, কাদের নিশানা করে মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে তারা by আবিদ হুসেইন

দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ২৮ আগস্ট আল–জাজিরার অনলাইন সংস্করণে লিখেছেন পাকিস্তানি সাংবাদিক আবিদ হুসেইন। এতে ভারতের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির আসল প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারত সফলভাবে অগ্নি-৫ নামের মাঝারিপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে বলে তারা ২০ আগস্ট ঘোষণা দিয়েছে। উড়িষ্যা রাজ্যের বে অব বেঙ্গল উপকূলের পরীক্ষার এলাকা থেকে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়।

অগ্নি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ ‘আগুন’। অগ্নি–৫ দৈর্ঘ্যে ১৭ দশমিক ৫ মিটার, ওজন ৫০ হাজার কেজি। এই ক্ষেপণাস্ত্র এক হাজার কেজির বেশি পারমাণবিক অস্ত্র বা প্রচলিত ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এই ক্ষেপণাস্ত্র ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে পারে। এটি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে, যা এটিকে বিশ্বের দ্রুততম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কাতারে নিয়ে গেছে।

অগ্নি–৫ ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষার সপ্তাহখানিক আগে পাকিস্তান ঘোষণা দিয়েছিল, তারা নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি) গঠন করতে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সেই ঘাটতি পূরণ করার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা গত মে মাসে পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে চার দিনের সংঘাতের সময় প্রকাশ্যে এসেছিল।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সর্বশেষ পরীক্ষা আসলে পাকিস্তানের জন্য নয়, বরং আরেক প্রতিবেশী চীনের জন্য বেশি বার্তা বহন করছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ঘোষণার পর নয়াদিল্লি আবার এই দেশটির সঙ্গে সতর্কভাবে সম্পর্ক উষ্ণ তৈরির চেষ্টা করছে।

অগ্নি-৫-এর পাল্লার মধ্যে এশিয়ার বেশির ভাগ অংশ পড়ে, যার মধ্যে চীনের উত্তরাঞ্চলও রয়েছে। রয়েছে ইউরোপের কিছু অংশও। ২০১২ সালের পর থেকে ভারতের এটি দশম পরীক্ষা এবং গত বছরের মার্চের পর প্রথম।

বিশ্লেষকদের মতে, সময়টা ছিল খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এই পরীক্ষা এমন এক সময়ে চালানো হয়েছে, যখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে আগামীকাল রোববার চীন সফরে যাচ্ছেন।

দীর্ঘদিন সীমান্ত বিরোধ নিয়ে উত্তেজনার পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা ফিরছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের পণ্যে শুল্ক দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছেন। কারণ, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তবে সম্পর্কের এই পরিবর্তনের মধ্যেও ভারত এখনো চীনকেই তার প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে থাকে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বিশ্বের দুই জনবহুল দেশের মধ্যে সম্পর্ক কতটা জটিল। আর ভারতের মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের মূল লক্ষ্য আসলে চীনই।

পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র সুবিধা

গত মে মাসের সংঘর্ষে ভারত স্বীকার করেছে, তারা কিছু যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। তবে তারা পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটির বড় ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে তাদের সুপারসনিক ব্রহ্মস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় প্রতিপক্ষের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে ভারত।

ব্রহ্মস ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে এবং ৩০০ কেজি পর্যন্ত পারমাণবিক বা প্রচলিত ওয়ারহেড বহন করতে পারে। খুব নিচু উচ্চতায় ও দ্রুতগতিতে উড়ে বলে এটি প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সহজেই এই ক্ষেপণাস্ত্র পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকতে পেরেছিল বলে ভারতের দিক থেকে দাবি করা হয়েছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, অগ্নি-৫ পরীক্ষার সঙ্গে পাকিস্তানের এআরএফসি ঘোষণার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। বরং এটি চীনকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছে।

২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ানে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর ভারত ও চীন চার বছর ধরে হিমালয় সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। পরে ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ায় মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের বৈঠকের পর সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে।

আগামীকাল রোববার মোদির চীন সফর হবে ২০১৮ সালের পর প্রথম। অতীতে ভারত বারবার বলে এসেছে, চীনের সঙ্গে তারা সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করলেও বেইজিং সীমান্তে আগ্রাসী আচরণ করেছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর এয়ার পাওয়ার স্টাডিজের ফেলো মনপ্রীত সেতি আল–জাজিরাকে বলেন, চীনকে হুমকি হিসেবে দেখে ভারতের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। তবে আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নয়। অগ্নি-৫ হলো ৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র, যা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লারি বলেছেন, ‘অগ্নি-৫ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও এর প্রধান লক্ষ্য আসলে চীন। চীনের পূর্ব উপকূলীয় শহর—যেগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো ভারতের নাগালে আনা কঠিন। তাই, ভারতের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।’

দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা

ভারত ও পাকিস্তান বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার বৃদ্ধি করছে। দুই দেশই ক্রমেই দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র তৈরি করছে।

এআরএফসি ঘোষণার আগে পাকিস্তান ফাতাহ-৪–এর সক্ষমতা দেখিয়েছিল। এই ক্ষেপণাস্ত্র ৭৫০ কিলোমিটার পাল্লার এবং প্রচলিত ও পারমাণবিক উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম।

অন্যদিকে ভারত কাজ করছে অগ্নি-৬–এর ওপর, যার পাল্লা হবে ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি। এতে থাকবে স্বাধীনভাবে লক্ষ্যবস্তু আঘাত করার (এমআইআরভি) একাধিক প্রযুক্তি। অগ্নি-৫-এ ইতিমধ্যেই এই ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।

এমআইআরভি ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে, যা আলাদা আলাদা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে এই অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের সম্মানসূচক প্রভাষক মনসুর আহমেদ বলেছেন,  ভারতের সর্বশেষ পরীক্ষা দেখাচ্ছে, তাদের আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ছে। অগ্নির বিভিন্ন সংস্করণে নানা ধরনের ক্ষমতা যোগ করে ভারত দেখাচ্ছে, তারা সাবমেরিন থেকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ (এসএলবিএম) ক্ষমতার দিকেও এগোচ্ছে।

মনসুর আহমেদ আরও বলেন, ‘ভারতের ভবিষ্যৎ সাবমেরিনের জন্য কী ধরনের ওয়ারহেড তৈরি করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে কতগুলো মোতায়েন করা যাবে। তবে আগামী এক দশকে শুধু তাদের সাবমেরিন বহর থেকেই ২০০-৩০০ ওয়ারহেড মোতায়েন করা সম্ভব হতে পারে।’

বর্তমানে ভারতের দুটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন (এসএসবিএন) চালু আছে, আরও দুটি নির্মাণাধীন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছে এখনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক সাবমেরিন নেই। তাদের কার্যকর সবচেয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শাহীন-৩, যার পাল্লা ২ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার।

মনসুর আহমেদ আরও বলেন, পাকিস্তানের আবাবিল হলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এমআইআরভি সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার। তবে এটি বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাল্লার এমআইআরভি ব্যবস্থা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার ও পারমাণবিক নীতিবিষয়ক গবেষক তুঘরল ইয়ামিন বলেন, পাকিস্তানের কর্মসূচি পুরোপুরি ভারতকেন্দ্রিক ও প্রতিরক্ষামূলক। কিন্তু ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা উপমহাদেশ ছাড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তি প্রদর্শনের দিকে। তাদের দূরপাল্লার ব্যবস্থা আসলে চীনকে লক্ষ্য করে তৈরি, যাতে তারা বড় শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, পাকিস্তানের কর্মসূচি শুধু ভারতকে নয়, আরও কয়েকটি দেশকে লক্ষ্য করে চলছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের (সিইআইপি) কৌশলগত বিষয়ক চেয়ার অ্যাশলে জে টেলিস বলেন, চীন ও পাকিস্তান দুটি দেশকেই ভারত লক্ষ্যবস্তুতে রাখতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তান চায় ভারত ছাড়াও ইসরায়েল ও এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও তার পাল্লায় আনতে।

টেলিস আরও বলেন, দুই দেশের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করার জন্য, যাতে যুদ্ধবিমান ঝুঁকিতে ফেলতে না হয়।

পাকিস্তানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, ভারতের প্রতি নীরব সমর্থন
গত বছরের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যদি এভাবে চলতে থাকে, পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও এমনকি যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ক্ষমতা অর্জন করবে।

অন্যদিকে টেলিসের মতে, ভারতের ক্রমবর্ধমান অস্ত্রভান্ডারকে ওয়াশিংটন বা তার মিত্ররা অস্থিতিশীল মনে করে না।

টেলিস বলেন, ভারতের বিপরীতে পাকিস্তানের সক্ষমতাকে পশ্চিমারা উদ্বেগজনক মনে করে। কারণ, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রাথমিক ইতিহাসেই পশ্চিমাবিরোধী রং ছিল। আর ৯/১১ এবং অ্যাবোটাবাদে অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর সেগুলো বিশেষভাবে মার্কিনবিরোধী হয়ে উঠেছে।

ক্যানবেরাভিত্তিক শিক্ষাবিদ মনসুর আহমেদ বলেন, ‘ভারতের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন আসলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রকাশ্য সমর্থনেই হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে ভারতকে দেখতে চায়। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি এবং পরমাণু সরবরাহকারী গ্রুপের (এনএসজি) ছাড় ভারতের জন্য কার্যত পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মর্যাদা এনে দিয়েছে, যদিও ভারত পরমাণু অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) সই করেনি।

এনপিটি হলো স্নায়ুযুদ্ধ যুগের একটি চুক্তি, যার উদ্দেশ্য পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার এবং নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য অর্জন। এতে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তবে ২০০৮ সালে গড়ে উঠা পারমাণবিক উপকরণ ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী ৪৮টি দেশের জোট এনএসজি ভারতের জন্য ছাড় দেয়। ফলে ভারত এনপিটিতে সই না করেও বৈশ্বিক পারমাণবিক বাণিজ্যে অংশ নিতে পারছে। এটি ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিস্টোফার ক্লারি বলেন, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের কর্মসূচি বা ভারতের অগ্নি-৫ পরীক্ষার বিষয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।

ক্লারি বলেন, পাকিস্তান যত দিন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শাহীন-৩ ও আবাবিলের সীমার মধ্যেই রাখবে, আমি মনে করি, ততদিন পশ্চিমা সরকারগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হবে না। তাদের নিজেদের ব্যস্ত থাকার মতো আরও অনেক সমস্যা আছে।

ইসরায়েলের গোপন সামরিক তথ্যই বলছে, নিহত ফিলিস্তিনিদের ৮৩ শতাংশ বেসামরিক মানুষ

যৌথ অনুসন্ধান প্রতিবেদন: মিডল ইস্ট আইঃ- ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যই জানাচ্ছে, গাজা উপত্যকায় হামলায় নিহত ছয় ফিলিস্তিনির মধ্যে পাঁচজনই বেসামরিক মানুষ। এক যৌথ অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইসরায়েলের ‘‍+৯৭২ ম্যাগাজিন’–এর হিব্রু ভাষার সহযোগী প্রকাশনা ‘লোকাল কল’ ও প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান যৌথভাবে ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছরের মে মাস পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোপন গোয়েন্দা তথ্যভান্ডারে নাম-পরিচয়সহ ৮ হাজার ৯০০ জন হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) যোদ্ধাকে নিহত বা ‘সম্ভাব্য নিহত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ওই সময় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৩ হাজার।

অর্থাৎ এ হিসাব অনুযায়ী, নিহত ফিলিস্তিনিদের মাত্র ১৭ শতাংশ যোদ্ধা ও বাকি ৮৩ শতাংশই বেসামরিক মানুষ।

+৯৭২ ম্যাগাজিন ও লোকাল কল এ বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা এ তথ্যভান্ডারের অস্তিত্ব কিংবা নিহত হামাস ও পিআইজে সদস্যদের সংখ্যার ব্যাপারে আপত্তি জানায়নি।

তবে পরে দ্য গার্ডিয়ান একই বিষয়ে প্রশ্ন করলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভিন্ন সুরে কথা বলে। সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, প্রতিবেদনে যে সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তবে কোন তথ্য ভুল, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। শুধু বলেছেন, সংখ্যাগুলো সেনাবাহিনীর ‘সিস্টেমে’ থাকা তথ্যের প্রতিফলন নয়।

একই তথ্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গণমাধ্যমকে ভিন্ন উত্তর দেওয়ার কারণও সেনাবাহিনী ব্যাখ্যা করেনি।

নিহত ফিলিস্তিনির হিসাব

ইসরায়েলি তথ্যভান্ডারে মোট ৪৭ হাজার ৬৫৩ জন ফিলিস্তিনির নাম রয়েছে। তাঁদের হামাস ও পিআইজের সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। এ তথ্য তারা বলছে গাজা থেকে উদ্ধার করা হামাস ও পিআইজের অভ্যন্তরীণ নথির ভিত্তিতে। তবে এসব নথি দ্য গার্ডিয়ান, ‍+৯৭২ ম্যাগাজিন বা লোকাল কল—কোনোটিই দেখতে পায়নি বা যাচাই করতে পারেনি।

তালিকায় ৩৪ হাজার ৯৭৩ হামাস সদস্য ও ১২ হাজার ৭০২ জন পিআইজে সদস্যের নাম রয়েছে। এর মধ্যে নিহত হিসেবে ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯০০ জনকে। নিশ্চিতভাবে নিহত বলা হয়েছে ৭ হাজার ৩৩০ জনকে, আর ১ হাজার ৫৭০ জনকে ধরা হয়েছে ‘সম্ভাব্য নিহত’ হিসেবে।

তবে নিহত এই ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিলেন সংগঠন দুটির নিচের স্তরের সদস্য। তথ্যভান্ডারে থাকা ৭৫০ শীর্ষস্থানীয় সদস্যের মধ্যে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ জন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেসামরিক ফিলিস্তিনি হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি

লোকাল কলের আগের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যাকে ইসরায়েলও নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেয়। দেশটির সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধানও সম্প্রতি সেই হিসাব উদ্ধৃত করেছেন।

তবে নতুন তদন্ত বলছে, বেসামরিক ফিলিস্তিনি হতাহত হওয়ার হার হয়তো ৮৩ শতাংশের বেশি। কারণ, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব শুধু উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ভবন বা অন্যান্য স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া হাজারো লাশ এতে অন্তর্ভুক্ত নেই।

আরেকটি বিষয় হলো ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তাঁদের তালিকায় অনেক বেসামরিক মানুষকেও যোদ্ধা হিসেবে দেখাতে পারেন—শুধু হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগে। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য বা গাজার প্রশাসনিক কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন, যাঁদের আন্তর্জাতিক আইনে যোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা যায় না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এমনও হতে পারে, অনেক ফিলিস্তিনি, যাঁদের হামাস বা পিআইজের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই, তাঁদেরও যোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে যে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড তার সেনাদের অনুমতি দিয়েছে, তাঁরা চাইলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিহত ফিলিস্তিনিদের যোদ্ধা হিসেবে রিপোর্ট করতে পারেন।

একজন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সদস্য বলেন, ‘মানুষ মারা যাওয়ার পর তাঁদের সন্ত্রাসী বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। যদি আমি শুধু ব্রিগেডের রিপোর্ট শুনতাম, তবে আমার মনে হতো, আমরা হামাসের ২০০ শতাংশ যোদ্ধাকে মেরে ফেলেছি!’

এদিকে মে মাসের পর থেকে গাজায় বেসামরিক মানুষের নিহত হওয়ার হার আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই মাসেই আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার পরিবর্তে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত বিতর্কিত ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ ত্রাণ বিতরণ শুরু করে।

এর পর থেকে শুধু ত্রাণ নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

আধুনিককালের যুদ্ধেও বিরল

প্রতিবেদনে বলা হয়, আধুনিককালের যুদ্ধে এভাবে ৮৩ শতাংশ বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা বিরল। এমনকি সিরিয়া ও সুদানের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধেও এ হার এত বেশি ছিল না।

দ্য গার্ডিয়ানের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালের পর থেকে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা, রুয়ান্ডার গণহত্যা ও ইউক্রেনের মারিউপোলে রাশিয়ার অবরোধ ছাড়া অন্য কোনো সংঘাতে বেসামরিক মানুষের এত বেশি মৃত্যু আর দেখা যায়নি।

গণহত্যার অভিযোগ

শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজায় ইসরায়েলের হত্যাকাণ্ডকে সরাসরি গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংস্থা হিসেবে জানায়, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ আসলে গণহত্যা। এরপর একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ও ইসরায়েলের নিজস্ব মানবাধিকার সংস্থা বেতসেলেম।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা আলবানিজও গত বছর দুটি প্রতিবেদনে বলেছেন, গাজায় গণহত্যা চলছে।

গত মাসে হলোকাস্ট ও গণহত্যা নিয়ে গবেষণায় খ্যাতি পাওয়া অধ্যাপক ওমর বার্তভ গাজার যুদ্ধকে ‘অবশ্যম্ভাবীভাবে গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতো আরও অনেক খ্যাতিমান ইসরায়েলি ও ইহুদি গবেষক পৌঁছেছেন একই সিদ্ধান্তে।

গাজার উত্তরাঞ্চলে জাবালিয়ার একটি ভবনে ইসরায়েলি হামলার পর আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০ আগস্ট ২০২৫
গাজার উত্তরাঞ্চলে জাবালিয়ার একটি ভবনে ইসরায়েলি হামলার পর আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০ আগস্ট ২০২৫ ছবি: এএফপি

ডিপ্লোমাধারী ও স্নাতক প্রকৌশলীদের মধ্যে কেন এই দ্বন্দ্ব by মাহবুবুর রাজ্জাক

সারা দেশের ছাত্র প্রকৌশলীরা গতকাল বুধবার তিন দফা দাবিতে শাহবাগে জমায়েত হয়েছিলেন। তাঁদের দাবিগুলোর মূল কথাটি হলো সরকারি চাকরিতে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা বাতিল করতে হবে। প্রকৌশলী পদ ও পদবি হবে শুধু স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই দাবিগুলোর সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই।

দেশের প্রকৌশল খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রশাসনের উচিত ছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসা। অথচ পুলিশ তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত পরিবেশ তৈরি করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

অন্যদিকে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরাও আন্দোলনে আছেন। তাঁরা নিজেদের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিতে চান এবং প্রকৌশলীদের জন্য উপযুক্ত পদগুলোয় বর্ধিত হারে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের পদায়ন চান। এর বাইরে তাঁদের কিছু কিছু দাবি স্বার্থগত দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। দাবিগুলোর সঙ্গে আবার একমত নন স্নাতক প্রকৌশলীরা।  

দেশের শিল্পায়ন ও উন্নয়নে প্রকৌশলী ও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের সমন্বিত টিমওয়ার্ক প্রয়োজন। প্রকৌশলীদের কাজ প্রকৌশলীদেরই করতে হবে। তেমনি প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের কাজও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদেরই করতে হবে। দুই দলের কাজই একটা আরেকটার পরিপূরক। কাজেই রেষারেষি নয়, প্রয়োজন কাজের সুষম বণ্টন। উভয় পক্ষের উচিত আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যাগুলোর সমাধান করা এবং প্রকৌশল খাতের সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করা।

আমাদের বুঝতে হবে ‘প্রকৌশলী’ শব্দটি কোনো বংশগত পদবি নয়। উন্নত বিশ্বে শুধু একাডেমিক সনদের বলে প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করা যায় না। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর পেশাগত দক্ষতার একটি স্তর অতিক্রম করে প্রফেশনাল পরীক্ষা পাস করলেই কেবল প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়া যায়। প্রকৌশলী পদবিটি তিনিই ব্যবহার করতে পারেন, যিনি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার মান পূরণ করেছেন এবং নির্ধারিত সময় পরপর তাঁর লাইসেন্স নবায়ন করেছেন।

তাঁরা প্রকৌশলকাজে স্বাক্ষর, ডিজাইন অনুমোদন ও নিরীক্ষণ করলে ধরে নেওয়া যায় যে পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করেই তা করেছেন।
প্রকৌশলীদের জন্য একটি কোড অব এথিকস অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকে। এতে দুর্নীতি, পক্ষপাত, গাফিলতি থেকে বিরত থাকা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার শপথ থাকে। তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য আইনগতভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে একজন প্রকৌশলী তাঁর লাইসেন্স হারান এবং প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অধিকারও হারান।

প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করা যায়—এমন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেশে এখন বেড়েছে। তাই প্রকৌশল পেশায় মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সরকারের উচিত প্রকৌশলী, প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীসহ প্রকৌশল খাতে সব পেশাজীবীর জন্য পেশাগত ট্রেনিং, রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স চালু করা।

সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে চাকরির জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। যত বড় ডিগ্রিই থাকুক, লাইসেন্সবিহীন কাউকেই প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকলে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরা কেন, কার্যত স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও প্রকৌশল পদবি ব্যবহার করতে পারেন না।

বর্তমানে স্নাতক প্রকৌশলীদের এন্ট্রি পদ নবম গ্রেডের, আর প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের এন্ট্রি পদ দশম গ্রেডের। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নবম গ্রেডের ৩৩ শতাংশ পদ আবার ডিপ্লোমাধারীদের পদোন্নতি দিয়ে পূরণ করার রীতি চালু করা হয়। কার্যত কোথাও কোথাও এর চেয়েও অনেক বেশি পদ ডিপ্লোমাধারীদের দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রথমত নবম গ্রেডে স্নাতক প্রকৌশলীদের ঢোকার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত ডিপ্লোমাধারীরা পদোন্নতির মাধ্যমে এমন সব পদে পদায়িত হচ্ছেন, যেসব পদে স্নাতক প্রকৌশলীরাও বিসিএস ছাড়া যোগ দিতে পারে না। এটি স্নাতক প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে একটি বড় রকমের বৈষম্য এবং প্রকৌশল খাতের জন্য অশনিসংকেত।

প্রশ্ন হলো স্নাতক প্রকৌশলীদের কর্মক্ষেত্রে ডিপ্লোমাধারীরা পদায়িত হতে পারেন কি না? উত্তর হলো ‘না’। ডিপ্লোমাধারীরা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত নন। তাঁদের কর্মক্ষেত্র আলাদা। তাই উচিত হবে তাঁদের চাকরি, পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য অবিলম্বে প্রকৌশলীদের সমান্তরাল আরেকটি ধারা চালু করা।

ফলে স্নাতক প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের পদ ও কাজ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হবে। প্রকৌশল খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী দলের মধ্যে অকারণ রেষারেষি বন্ধ হবে। দুই দল নিঃশঙ্কচিত্তে কাজে মনোযোগ দিলে কাজের গতি ও দক্ষতাও বাড়বে।

প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় ব্যবস্থাপনা সংকট প্রকট। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তারা সংস্থার প্রধান হয়ে থাকেন। তাঁরা প্রকৌশলীদের পেশাগত সমস্যার প্রতি সুবিচার করতে পারেন না।

সম্প্রতি একজন উপদেষ্টা দেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। অথচ এই প্রকৌশলীরাই বিদেশের মাটিতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। সমস্যা প্রকৌশল শিক্ষায় নয়, সমস্যা প্রকৌশল সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনায়। প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় কাজের গতিশীলতা আনতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রকৌশল প্রশাসন ক্যাডার সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এতে দেশের প্রকৌশল খাতে উন্নততর নেতৃত্ব তৈরি হবে। সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের দ্বন্দ্বে মেধার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পেশাতেই মেধার প্রয়োজন; এমনকি যিনি ফসল ফলান তাঁরও। মেধার প্রমাণ দেখিয়েই স্নাতক ও ডিপ্লোমা সনদ অর্জন করতে হয়। তবে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুরোর কিছু সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে।

কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞ শিক্ষকের স্বল্পতা, গবেষণাগারের অভাব, যন্ত্রপাতির অভাব, সঠিক মূল্যায়নের অভাব ইত্যাদি। বলতে দ্বিধা নেই, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো বেশি অবহেলার স্বীকার। এই দায় ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। ডিপ্লোমাধারীরা যেন তাঁদের কাজে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন, সেভাবে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের।  
   
বলা হয়, ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষার পথ সীমিত করে রাখা হয়েছে। এটি অবশ্যই অনুচিত। উচ্চমাধ্যমিক বাদ দিয়ে ডিপ্লোমা সনদের জন্য চার চারটি বছর ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, তা–ও ভেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে ভালো হয়, পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দুই বছরে কারিগরি বোর্ডের আওতায় উচ্চমাধ্যমিক সনদ দিয়ে যাঁরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তাঁদের যদি সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়। যাঁরা তারপর পলিটেকনিকে কারিগরি ধারায় থাকবেন, তাঁরা দুই বা তিন বছরে প্রকৌশলে ডিপ্লোমা নিয়ে হয় শ্রমবাজারে যাবেন, নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে দুই বছরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে পারবেন।

তবে ভুলে গেলে চলবে না, সবাই প্রকৌশলী হতে চাইলে সেটাও প্রকৌশল খাতের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সহায়ক নয়। তাই ডিপ্লোমাধারীদের জন্য প্রস্তাবিত ক্যাডারে সম্মানজনকভাবে পেশাগত বিকাশের সুযোগ থাকতে হবে, যাতে তাঁরাও সন্তুষ্টচিত্তে পেশায় মনোযোগী হতে দ্বিধান্বিত না হন।

পরিশেষে প্রকৌশল খাতে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন তাঁরা সর্বশেষ প্রযুক্তি ও নীতিমালা সম্পর্কে হালনাগাদ থাকেন এবং সর্বোচ্চ পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেন।

* ড. মাহবুবুর রাজ্জাক, অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।
- ই-মেইল: mmrazzaque@me.buet.ac.bd
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-28%2Fsz8hyf9a%2FUntitled-3.jpg?rect=2%2C0%2C1677%2C1118&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
স্নাতক প্রকৌশলী এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিক্ষোভ। ছবি: প্রথম আলো

৯/১১ হামলায় সহায়তার অভিযোগে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মামলা চলবে: ফেডারেল বিচারক

নিউইয়র্কের একজন ফেডারেল বিচারক ৯/১১ হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের দায়ের করা মামলা খারিজে সৌদি আরবের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই সন্ত্রাসী হামলার আগে সন্ত্রাসীদের সহায়তা করেছিল তারা।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট জজ জর্জ ড্যানিয়েলস রায় দিয়েছেন, বাদীদের দাবিগুলো এ মামলাটি বিচারের জন্য যথেষ্ট। ফলে এই ঐতিহাসিক মামলার বিচার চলতে থাকবে এবং দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইও চলমান থাকবে।

বাদীদের অভিযোগ, সৌদি আরব সরকার ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলার আগে সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী একটি চরমপন্থী চক্রকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তবে সৌদি আরব এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।

গত বছরের এক শুনানিতে নিহতদের পরিবারের আইনজীবীরা এ সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তাঁদের দাবি, এতে এমন একটি চক্রের বিষয়ে তথ্য উঠে এসেছে যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত কয়েকজন উচ্চপদস্থ সৌদি কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। আইনজীবীদের দাবি, এই চক্রটি সারা দেশে সন্ত্রাসীদের চলাফেরায় সহায়তা করেছে।

ড্যানিয়েলস তাঁর রায়ে বলেছেন, মামলার অভিযোগের জবাবে সৌদি আরব  যে ব্যাখ্যা বা প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে, সেগুলো খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেক জায়গায় সেগুলো স্ববিরোধীও বটে। তাঁর মতে, ৯/১১-এর হামলার আগে সন্ত্রাসীদের সহায়তায় ওমর আল-বায়ুমি ও ফাহাদ আল-থুমাইরি নামের দুই ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছিল সৌদি আরব।

টুইন টাওয়ারে ৯/১১ হামলা
টুইন টাওয়ারে ৯/১১ হামলা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জুলাই সনদ: যেসব ইস্যুতে আর ছাড় দেবে না বিএনপি ও সমমনারা by কিরণ শেখ

জুলাই সনদের তিন ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি নয় বিএনপি ও সমমনা জোটের দলগুলো। তারা জানিয়েছেন, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে স্থান দেয়া হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। এ ছাড়া, জুলাই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলে অঙ্গীকারনামায় যে কথা বলা হয়েছে সেটাতেও আপত্তি জানিয়েছেন তারা। পটভূমিতে ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং সংগ্রাম স্থান না পাওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষ্য, দ্বিমত এবং একমতের বিষয়গুলোও সনদে সঠিকভাবে উপস্থাপন হয়নি। শব্দ চরণ এবং বাক্য গঠনেও ত্রুটি দেখছেন তারা। ওদিকে, কোনো রাজনৈতিক ‘সমঝোতার দলিল’ সংবিধানের উপরে স্থান পেতে পারে কিনা- সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির ভাষ্য, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে জায়গা দেয়ার সুযোগ নেই। জুলাই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলে অঙ্গীকারনামায় যে কথা বলা হয়েছে সেটাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছে দলটি। এ ছাড়া, সনদে অঙ্গীকারনামা নিয়েও আপত্তির কথা জানিয়েছে দলটি। তবে, এসব বিষয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি ও সমমনারা।

গত বুধবার জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়ায় কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে লিখিত মতামত জমা দিয়েছে বিএনপি। এর আগে জুলাই সনদ নিয়ে গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। নেতারা বলেন, বিএনপি যেসব মৌলিক প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলোতে ছাড় দেবে না। বিএনপি এখানে তাদের আগের অবস্থানেই থাকতে চায়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একইসঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না, নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন অন্যতম।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণীত হবে, স্বাক্ষরিত হবে এবং বাস্তবায়িত হবে। অঙ্গীকারনামায় যে প্রস্তাবগুলো রাখা হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার এই দলিলকে সংবিধানের উপরে রাখা এবং কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না? এসব বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য নয়।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমরা চেষ্টা করছি কাছাকাছি আসার। আর নিজেদের মধ্যে আরও বোঝাপড়া বাড়াতে চাচ্ছি।

অন্যদিকে, জুলাই সনদ নিয়ে গত মঙ্গলবার যুগপৎ আন্দোলনের দল জোটদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি। এদিন রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এলডিপি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে বৈঠক করে দলটি। সেখানে অভিন্ন কিংবা কাছাকাছি মতামত দেয়ার পরামর্শ দেয় বিএনপি।
সূত্র  জানিয়েছে, বৈঠকে নেতারা বলেন- জুলাই সনদে অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছতা রয়েছে। যেসব প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য গঠন হবে, সেসব এখন শুধু বাস্তবায়ন করা হবে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে বাকি সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি বলেছে অঙ্গীকারনামায় জুলাই সনদকে সংবিধান ও আদালতের উপরে রাখা হয়েছে। এটা তারা আপত্তি করবে। আমরা বলেছি, এটা তো ঠিক হতে পারে না। আর জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতির যে প্রশ্ন তুলছে, আমরা মনে করি- আমরা যে মুখে মুখে অঙ্গীকার করছি এটাই যথেষ্ট।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে এবং আইনের ঊর্ধ্বে রাখার বিষয়ে আমাদের আপত্তি আছে। কারণ এটা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। কখনোই সংবিধানের উপরে স্থান পেতে পারে না।  

বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, বেশ কিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আসে নাই। অবজারভেশন ছিল- অপ্রচলিত শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বেশ কঠিন করে ফেলেছে। সেগুলো প্রচলিত শব্দের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে বাক্য গঠন ঠিক হয়নি। নোট অব ডিসেন্টের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। কিন্ত অনেক প্রস্তাবে যারা দ্বিমত হয়েছে, তাদের নাম কেন লিখলেন না? যারা একমত হয়েছে এবং যারা দ্বিমত হয়েছে- তাদের নাম জাতি জানুক। শুধুমাত্র নোট অব ডিসেন্টে বিএনপি, এলডিপি এবং ১২ দলীয় জোটসহ যুগপৎ আন্দোলনের দল ও জোটদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদেরকে ১৬৬টি সুপারিশমালা দেয়া হয়েছিল। কমিশন সনদে ৮৪টি সুপারিশমালা লিখেছেন। এর মধ্যে ২০ থেকে ৩০টি কমিশনে আলোচনা হয়নি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে আনা হয়েছে? 

mzamin

ইসরায়েলে কেন ‘কখনো আর নয়’ ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ by ওফের কাসিফ

ইসরায়েল যখন গাজায় সম্প্রসারিত সামরিক অভিযান চালিয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে, তখন দেশের ভেতরেই বিরোধিতার স্রোত জোরদার হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে গত শনিবার তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় সমাবেশগুলোর একটি।

ইসরায়েলের পুলিশ আগে থেকে অনুমতি নেওয়া এই মিছিলের অনুমোদন বাতিল করে দিয়েছিল। আমাদের মতো বিরোধীদের কণ্ঠস্বর তারা যে নীরব করে দিতে চায়, এটা ছিল তার সুস্পষ্ট চেষ্টা। কিন্তু আমরা তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে দিইনি।

এর এক দিন আগে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)’ গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে এবং পরিকল্পিতভাবে না খাইয়ে মেরে ফেলার ইসরায়েলের ভয়াবহ নীতি ফাঁস করে। এ অবস্থায় অনেক ইসরায়েলি মনে করছেন যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব।

ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা গাজা সিটি ‘পুনর্দখলে’ নেওয়ার প্রস্তাব পাস করার পর ইসরায়েলের সেনাবাহিনী তাদের রিজার্ভ থেকে ৬০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগের আদেশ দিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেটি কার্যকর হলে রিজার্ভের সদস্যসংখ্যা হবে ১ লাখ ৩০ হাজার। এটি যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। কিন্তু ইসরায়েলে সেনাসদস্যের সংখ্যাই শুধু বাড়ছে না, যুদ্ধ প্রত্যাখ্যানের আন্দোলনও বেড়ে চলেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কূটচালের বিরুদ্ধে নতুন করে অমান্যতার ঢেউ আছড়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আলোচনায় বা প্রকাশ্য আলোচনায়, আরও বেশিসংখ্যক ইসরায়েলি এই উপলব্ধিতে আসছেন যে সেনাবাহিনীর সেবা করা মানে সরকারের অপরাধের দোসর হওয়া।

আন্দোলনটি কিন্তু মোটেই একমাত্রিক নয়। এই আন্দোলনে যাঁরা যুক্ত হচ্ছেন, তাঁদের বয়স, সামাজিক অবস্থান, উদ্দেশ্য বা মতাদর্শে ভিন্নতা রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে ‘মেসারভত’ গোষ্ঠীর কিশোরেরা। তারা প্রকাশ্যেই ইসরায়েলি যুদ্ধযন্ত্রের অংশ হতে প্রত্যাখ্যান করছে। তাদের সঙ্গে চূড়ান্ত কঠোর আচরণ করা হয়েছে। তাদের বারবার সামরিক কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। এসব কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে আমি নিজে এই সব সাহসী কিশোরের সঙ্গে দেখা করেছি। তারা ‘শান্তির সৈনিক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

আরও অনেকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মনে মনে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁদের সংখ্যা ঠিক কত, তার পরিসংখ্যান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আছে এবং সে তথ্য তারা প্রকাশ করনি। কিন্তু সেনাবাহিনীতে যুক্ত না হওয়ার জন্য ছাড়পত্র পেতে সাহায্য করে এমন একটি সংস্থা ‘ইয়েশ গ্ভুল’ বলছে, এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি হারেৎসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে যে সেনাবাহিনীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা মানুষের প্রতি সমর্থন উল্লেখযাগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন, এই প্রত্যাখ্যান শুধু যৌক্তিক নয়, গাজায় থাকা জিম্মিদের জীবন রক্ষার জন্যও এটা প্রয়োজনীয়।

সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার ডাক প্রত্যাখানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। এর মধ্যে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যুদ্ধাপরাধে অংশ নেওয়ার নৈতিক আপত্তি, সামগ্রিকভাবে দখলদারত্বের রাজনৈতিক বিরোধিতা, সামরিক অভিযানের ফলে জিম্মিদের নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ার উদ্বেগ এবং বিভিন্ন অতিরক্ষণশীল গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়ায় অসন্তোষ।

মানবতার মৌলিক ধারণায় একত্র হয়ে শনিবার হাজার হাজার আরব ও ইহুদি একসঙ্গে ক্ষুধা, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভকারীরা গাজার অনাহারী মানুষ ও বোমাবর্ষণে আহত শিশুদের ছবি তুলে ধরেন। তাঁরা জানেন যে গাজার বাসিন্দাদের দুর্বিষহ যন্ত্রণার জন্য যারা দায়ী, তারা এখন ক্ষমতায় রয়েছে।

আমরা দাবি জানিয়েছি, ইসরায়েলি হোক আর ফিলিস্তিনি হোক, সব জিম্মি ও আইনবিরুদ্ধভাবে আটকে রাখা বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। আমরা একটি রাজনৈতিক চুক্তির দাবি জানিয়েছি, যাতে ইসরায়েল সরকার গাজা থেকে সব সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে।

কিন্তু গাজায় আরেক দফা বোমাবর্ষণের খবরের পর সমাবেশ থেকে আমাদের যে ব্যানার, সেখানে স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘কখনোই আর নয়’। হত্যাযঞ্জের শিকার হওয়া শিশু ও অনাহারে থাকা পরিবারগুলো নিয়ে আমরা আর কখনো চুপ থাকব না। নেতানিয়াহু যখন আমাদের প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি, বসতি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে এবং হাসপাতালে আক্রমণের নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন আর আমরা নীরবে দেখব না। জিম্মিদের মুক্তি দিতে পারে, এমন চুক্তি আর আমরা প্রত্যাখ্যান করতে দেব না। আর কখনো গাজায় গণহত্যা হতে দেব না।

পোল্যান্ডের এক ইহুদি পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে ‘কখনো আর নয়’ শব্দের বিশেষ তাৎপর্য আমার কাছে আছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবজাতি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে আর কখনো এমন নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তি তারা হতে দেবে না।

হলোকাস্ট; ইহুদিদের গণহত্যা, নিষ্টুর অত্যাচারের সব সীমা ছুঁয়েছিল। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি ‘কখনো আর নয়’ স্লোগানকে সর্বজনীন কর্তব্য বলে মনে করি।

১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এবং গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি সনদ গ্রহণ করেছিল। গত কয়েক দশকে এই অমূল্য সত্যের সুরক্ষা দিতে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি। গাজায় যে চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে চলেছে, সেটা নিকট অতীতে দেখা যায়নি। এই বাস্তবতায় ‘কখনো আর নয়’ স্লোগানটি কেবল নৈতিক স্মরণ নয়, বরং নৈতিকভাবে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

প্রচলিত আছে, ‘একবার আমাকে ঠকালে দোষ তোমার, দ্বিতীয়বার ঠকালে দোষ আমার’। কিন্তু নেতানিয়াহু বারবার পশ্চিমা নেতাদের প্রতারিত করতে সক্ষম হচ্ছেন। শুক্রবার আইপিসি গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, এটি ‘সম্পূর্ণরূপে ভয়ানক ও পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’।

আমি ল্যামি ও ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের জিজ্ঞেস করতে চাই, যাঁরা এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী, সেই দলে আপনারা কি নেই?

* ওফের কাসিফ, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য

- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-03-21%2Ft5f9r6g4%2FIsrael.jpg?rect=1%2C0%2C659%2C439&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স