Tuesday, August 26, 2025

শত বছরের পুরোনো বিশাল আস্ত গির্জা চলে যাচ্ছে অন্য শহরে

মাটিধসে ঝুঁকিতে পড়া ১১৩ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক একটি গির্জাকে না ভেঙে পুরোপুরি স্থানান্তর করা হচ্ছে। সুইডেনের উত্তরাঞ্চলের একটি সড়ক ধরে পাঁচ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে গির্জাটিকে।

সুইডেনের কিরুনায় ১৯১২ সালে নির্মিত লাল কাঠের বিশাল এই গির্জাকে বড় একটি ট্রেলারের ওপর তোলা হয়েছে। এটি ধীরে ধীরে নতুন শহরের পথে যাত্রা করছে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০০ মিটার গতিতে চলা এই যাত্রা শেষ হতে দুই দিন লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে লৌহ আকরিক খনির খননকাজের কারণে সৃষ্ট ভূমিধস ও ফাটলের ঝুঁকিতে আছে পুরোনো শহরের কেন্দ্রস্থল। কিরুনার ভবনগুলোর স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে গির্জার স্থানান্তর সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা। শহরটি আর্কটিক সার্কেলের ১৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।

গির্জার ভিকার লেনা জার্নবার্গ ও লুলেয়ো ডায়োসিসের বিশপ আশা নাইস্ট্রোমের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গির্জা স্থানান্তরের যাত্রা শুরু হয়। সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে ট্রেলারের ইঞ্জিন চালু হয়ে বিশাল কাঠের গির্জাটিকে নিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে শুরু করে। প্রথম ঘণ্টায় এটি মাত্র ৩০ মিটার অগ্রসর হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই ব্যতিক্রমী ঘটনা প্রত্যক্ষ করছেন।

সুইডেনের সাংস্কৃতিক কৌশলবিদ সোফিয়া লাগারলোফ মাত্তা বলেন, ‘এটা বিশাল জনসমাগম। শুধু কিরুনা বা সুইডেনের বিভিন্ন জায়গা থেকেই নয়, নানা ভাষার মানুষ এখানে এসেছেন। মনে হচ্ছে, যেন চোখের সামনে ইতিহাস তৈরি হচ্ছে।’

স্থানান্তরের কাজের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প ব্যবস্থাপক স্টেফান হোমব্লাড জোহানসন বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বিশাল ও জটিল কাজ এবং এখানে কোনো ভুলের সুযোগ নেই। তবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে।’

২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে কিরুনার অন্যান্য ভবন নিরাপদ এলাকায় সরানো শুরু হয়। বেশির ভাগ ভবন ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, তবে কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা হুবহু অক্ষত সরানো হয়েছে।

এর মধ্যে আছে ইয়ালমার লুন্ডবোমসগার্ডেনের হলুদ সারির তিনটি পুরোনো কাঠের বাড়ি ও খনির ব্যবস্থাপক ইয়ালমার লুন্ডবোমের বাসা। এগুলো তিন ভাগে কেটে সরানো হয়েছিল। পুরোনো সিটি হলের ছাদের ক্লক টাওয়ারটিও সরিয়ে নতুন সিটি হলের পাশে বসানো হয়েছে।

সুইডিশ আইনে কোনো ভবনের নিচে খননকাজ করার অনুমতি নেই। কিরুনার একটি উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রবার্ট ইলিতালো বলেন, ‘মানুষ হঠাৎ ফাটলের মধ্যে পড়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। সময়ের সঙ্গে ফাটলগুলো পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অবকাঠামো ধসে পড়ার আগে মানুষকে সরিয়ে আনতে হবে।’

লৌহ আকরিক খনির অপারেটর ও কিরুনার সবচেয়ে বড় নিয়োগদাতা এলকেএবি পুরো শহর স্থানান্তরের খরচ বহন করছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার কোটি সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ৭৩৭ মিলিয়ন পাউন্ড)।

কিরুনা গির্জার উচ্চতা ৩৫ মিটার (১১৫ ফুট), প্রস্থ ৪০ মিটার ও ওজন ৬৭২ টন। এটি একসময় সুইডেনে ১৯৫০ সালের আগের সবচেয়ে সুন্দর ভবন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল।

এত বড় ভবন স্থানান্তর একটি জটিল বিষয়। তবে ভবনটিকে না ভেঙে প্রকৌশলীরা পুরো ভবনটি একসঙ্গে অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নিচ্ছেন। এটি সরানো হচ্ছে ইস্পাত বিমের ওপর ভর করে স্বচালিত মডুলার ট্রান্সপোর্টারের মাধ্যমে।

জোহানসন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাস্তা প্রস্তুত করা, যাতে এত বড় ভবন পার হতে পারে। আমরা রাস্তা ২৪ মিটার (৭৯ ফুট) প্রশস্ত করেছি। রাস্তা থেকে ল্যাম্পপোস্ট, ট্রাফিক লাইট সরানো হয়েছে, এমনকি একটি সেতু ভেঙে ফেলা হয়েছে।’

গির্জা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া দেখতে গোথেনবার্গ থেকে গাড়ি চালিয়ে সেখানে গেছেন লেনা এডকভিস্ট ও তাঁর স্বামী। লেনা বলেন, ‘আমি বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া গির্জায় যাই না। তবে এটি আমার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। ওরা না ভেঙে গির্জাটি পুরোপুরি সরাচ্ছে, এটা আমাদের জন্য গৌরবের।’

ভেইডেক্কে নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক কিয়েল ওলভসন বলেন, ‘বছরের পর বছর প্রস্তুতির পর অবশেষে আমরা এগোতে শুরু করেছি। আমি আনন্দিত এবং মুহূর্তটা উপভোগ করছি। আবহাওয়া ভালো, আর আমি নিশ্চিত সবকিছু নির্বিঘ্নে চলবে।’

অক্ষত অবস্থায় গির্জা স্থানান্তরে সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজগুলোর একটি হলো, গির্জার ভেতরের ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা করা, বিশেষ করে সুইডিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স ইউজেনের আঁকা বিশাল বেদিচিত্র।

স্থানান্তরের কাজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জোহানসন বলেন, ‘এটা এমন কিছু নয়, যেটা হুক থেকে নামিয়ে নেওয়া যায়। এটা সরাসরি ইটের দেয়ালে আটকানো, তাই ক্ষতি ছাড়া সরানো যেত না। এ জন্য স্থানান্তরের সময় ছবিটি গির্জার ভেতরেই ঢাকা থাকবে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই স্থানান্তর বিস্ময়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি গভীর আবেগঘন মুহূর্ত। সোফিয়া লাগারলোফ মাত্তা বলেন, ছোটবেলায় তিনি দাদির হাত ধরে প্রথমবারের মতো গির্জায় গিয়েছিলেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গির্জাটি ছিল আত্মিক কেন্দ্র ও মিলনস্থল।

মাত্তা আরও বলেন, ‘এই স্থানান্তর আমাদের আনন্দ ও বেদনার স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে এনেছে। আর আমরা সেই স্মৃতিগুলো সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি অন্য শহরে।’

স্থানান্তরের কাজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জোহানসন একজন প্রকৌশলী। তিনি গির্জার গসপেল সংগীত দলেরও সদস্য। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটি একেবারেই বিশেষ কাজ। ১০০ বছর আগে গির্জাটি এলকেএবি পৌরসভার জন্য তৈরি করেছিল। এখন আমরা এটিকে নতুন শহরে সরিয়ে নিচ্ছি। আর কোনো বিকল্প ছিল না।’

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে গতকাল বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে গির্জাটি নতুন শহরের কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়ার কথা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-21%2Fi2n2qw8r%2FKiruna-Church-3.jpg?rect=0%2C0%2C5460%2C3640&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
৬৭২ টন ওজনের বিশাল এই গির্জাকে বড় একটি ট্রেলারের ওপর তোলা হয়েছে। এটি ধীরে ধীরে নতুন শহরের পথে যাত্রা করছে। ১৯ আগস্ট। ছবি: এএফপি

গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে ইসরায়েল কি পশ্চিমা বিশ্বেও একঘরে হয়ে যাচ্ছে

ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পশ্চিমা মিত্রদেশ এখন রাজনৈতিক চাপে পড়েছে। এ চাপ আসছে দেশগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। কারণ, গাজার বাসিন্দাদের অনাহারে থাকার তথ্য-প্রমাণ তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।

গাজাবাসী যে না খেয়ে আছেন, তা মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো নিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূতকে ইসরায়েলে পাঠিয়েছেন। সেখানে গিয়ে তিনি গাজার বিশৃঙ্খল খাদ্য বিতরণব্যবস্থা দেখবেন।

গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা করছে কি না, তা নিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবী এখন প্রশ্ন তুলছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে করা জরিপে দেখা যাচ্ছে, মানুষ ইসরায়েলকে নিয়ে আরও নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এ যুদ্ধ শেষ করার স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে না।

ইসরায়েলের প্রতি এ অবিশ্বাস নিয়ে ক্ষুব্ধ দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, গাজায় অনাহারের তথ্য অতিরঞ্জিত, হামাসকে ধ্বংস করা দরকার, সমালোচনাকারীরা অনেকেই ইহুদিবিদ্বেষী। নেতানিয়াহুর মতে, পশ্চিমা দেশগুলো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে তা হবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য হামাসকে পুরস্কৃত করা।

ইসরায়েলি রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক নাটান স্যাকস বলেন, একে একই ধরনের আরেকটি সমস্যা হিসেবে মনে করছে ইসরায়েল। কিন্তু তারা বিশ্বের মনোভাব বুঝতে ভুল করছে। কারণ, পুরো দুনিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এখন বদলে যাচ্ছে। আর তরুণদের মধ্যে এ বদলটা সবচেয়ে বেশি।

গাজায় ব্যাপক অনাহার নিয়ে যখন মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে, তখন বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল আরও একা হয়ে পড়ছে। ২০২৩ সালে হামাসের সে হামলা এখনো ইসরায়েলিদের মনে গেঁথে আছে। কিন্তু গাজায় যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ আর অনাহার চলছে, তা বিশ্বের অন্যদের চোখে আরও বেশি পড়ছে এবং গুরুত্ব পাচ্ছে।

হামাসের হাত থেকে জিম্মিদের মুক্তির জন্য গত মার্চে ইসরায়েল গাজায় সাহায্য বন্ধ করে দেয়। তারপর তারা সেখানে নিজেরা খাবার বিতরণের চেষ্টা করে। কিন্তু তা বিশৃঙ্খল ও প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। ইসরায়েলের ত্রাণকেন্দ্রগুলোয় খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু ফিলিস্তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন।

এ সংঘাত কখন শেষ হবে, তা কেউ জানে না। ইসরায়েল বহুবার গাজার বিভিন্ন জায়গা দখলে নিয়েছে, আবার ছেড়েও দিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, গাজায় ৬০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। নেতানিয়াহু এখনো জানাননি, সংঘাত শেষে হামাসের বদলে কে গাজা শাসন করবে। এ কাজে যাদের সহায়তা করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি—সেই সৌদি আরব, মিসর বা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতেও রাজি নন তিনি।

ট্রাম্প হামাসবিরোধী সংঘাতে ইসরায়েলের পক্ষে। তিনি আগেও নেতানিয়াহুকে যেভাবে খুশি হামলা করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু এবার ট্রাম্পকে গাজার দুর্ভিক্ষের ভিডিও দেখে হতবাক মনে হয়েছে। তাঁর অনেক ঘনিষ্ঠ সমর্থকও এখন বলছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে হবে।

ইসরায়েলের লেবার পার্টির নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকারের হয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া ড্যানিয়েল ল্যাভি বলেন, এখন একধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক জায়গা, যেমন অপেরা হাউস বা সংগীত উৎসবে ইসরায়েলবিরোধী, ফিলিস্তিনপন্থী—এমনকি কখনো ইহুদিবিদ্বেষী বিক্ষোভ হচ্ছে। পপ তারকা বিলি আইলিশ ও আরিয়ানা গ্র্যান্ডে যুদ্ধবিরতি ও গাজায় সাহায্যের পক্ষে কথা বলেছেন।

ল্যাভি এখন ইউএস-মিডল ইস্ট প্রজেক্ট নামের একটি অলাভজনক সংস্থার প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে ইসরায়েল মনে করেছে, তারা যদি জোরেশোরে ‘হলোকাস্ট’ ও ইহুদিবিদ্বেষের কথা প্রকাশ করে, তাহলে সবাই চুপ করে যাবেন, কিন্তু সময় বদলে গেছে। এ কৌশল এখন আর আগের মতো কাজ করছে না।

জনমত জরিপেও সেই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এপ্রিলে করা এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের ৫৩ শতাংশ এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ইসরায়েলে হামাসের হামলার আগে এ হার ছিল ৪২ শতাংশ। তাদের মধ্যে খুবই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা মানুষের হার ১৯ শতাংশ। ২০২২ সালে তা ছিল ১০ শতাংশ।

আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, ২৪টি দেশের মধ্যে ২০টিতে অর্ধেক বা তার বেশি মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, তুরস্কসহ অনেক দেশে এ হার ৭৫ শতাংশের বেশি। তরুণদের মধ্যে এ মনোভাব আরও বেশি।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে তাঁর দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও একই কথা বলেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শর্ত সাপেক্ষে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির কথা বলেছেন। এসব এটাই তুলে ধরছে যে ইসরায়েল ও যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

যদিও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মূলত প্রতীকী পদক্ষেপ। আগে থেকেই ১৪৭টি দেশ এ পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও যদি তা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রই হবে নিরাপত্তা পরিষদের একমাত্র স্থায়ী সদস্য, যারা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি। তখন ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ভেটো দিতে হতে পারে।

পশ্চিমারা এত দিন ধরে চুপ ছিল। কারণ, তাদের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে দেওয়া হতো না বলে মনে করেন ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক বার্নার্ড আভিশাই। তিনি বলেন, এখন গাজায় যা ঘটছে, তা দেখে জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে আসছে। এটা অনেকের ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করা বা ভ্রমণের ইচ্ছা কমিয়ে দিচ্ছে। ইসরায়েলের অর্থনীতিতে এটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে।

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চাক ফ্রেইলিচ বলেন, মানুষের মনোভাবে এ বদল এবং ইসরায়েলকে এর জন্য যে মূল্য দিতে হবে, সেই বাস্তবতা বুঝতে দেরি করছেন নেতানিয়াহু। এ মনোভাব বদলের পেছনের কারণ যা–ই হোক না কেন, মূল বিষয়টা হলো ইসরায়েল একঘরে হয়ে যাচ্ছে।

ফিলিস্তিনি মা সামাহ মাতার অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় ভোগা ছেলে ইউসেফকে কোলে ধরে রেখেছেন
ফিলিস্তিনি মা সামাহ মাতার অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় ভোগা ছেলে ইউসেফকে কোলে ধরে রেখেছেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

কোটিপতি হয়েও ভূমিহীন কোটায় খাসজমি হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক এমপি

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ সম্প্রতি দুই উপজেলার খাসজমি সম্পদশালীদের নামে বন্দোবস্ত ঠেকাতে আদালতে মামলা করে বেশ প্রশংসিত হয়েছেন। অথচ তার বিরুদ্ধেই নামে-বেনামে ভূমিহীনদের খাসজমি হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, শুধু ভূমিহীনরাই খাসজমি বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্য। অথচ কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ফরহাদ নিজেকে ভূমিহীন দাবি করে বিপুল পরিমাণ খাসজমি বরাদ্দ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি ফরহাদের নামে বরিশাল নগরীতে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার বাড়ি, ঢাকায় ফ্ল্যাট, পেট্রোল পাম্প এবং বিভিন্ন উপজেলায় কৃষিজমি। এত সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে ভূমিহীন ঘোষণা করে তিন একরের বেশি খাসজমি নিজের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। এক ব্যক্তির নামে এক একরের বেশি জমি বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম না থাকায় তিনি নিজের নাম তিনভাবে ব্যবহার করেছেন। এ তিনটি নাম হলো কাজী মেজবাহ উদ্দিন, কাজী ফরহাদ উদ্দিন ও কাজী ফরহাদ হোসেন। তবে তাদের সবার বাবার নাম একই—কাজী আকতারুজ্জামান।

অভিযোগ রয়েছে, ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালে পদাধিকার বলে উপজেলা খাসজমি বন্দোবস্ত কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন ফরহাদ। সেই সুযোগে তিনি নিজের এবং আত্মীয়স্বজনের নামে একরে একরে চরের খাসজমি বন্দোবস্ত নেন।

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের খাস খতিয়ান বইয়ের তথ্যানুযায়ী, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের লড়াইপুর মৌজার ৫২ নম্বর খতিয়ানে ১০৬৪ নম্বর দাগে কাজী মেজবাহ উদ্দিন নামে এক একর ২২ শতাংশ, একই মৌজায় ৪৮ নম্বর খতিয়ানের ১৬০৯ নম্বর দাগে কাজী ফরাদ উদ্দিনের নামে ১ একর ২৫ শতাংশ এবং কাজী ফরহাদ হোসেনের নামে ৩২ নম্বর খতিয়ানের ১৫৬০ নম্বর দাগে ১ একর ২৪ শতাংশ খাসজমি রয়েছে। তিনটি দাগের জমি বন্দোবস্ত নিতে এক নাম তিনভাবে ব্যবহার করা হলেও তাদের বাবার নাম হিসেবে কাজী আকতারুজ্জামান নামটি ব্যবহার করা হয়েছে।

ভূমি অফিসের খতিয়ান বইয়ে দেখা যায়, শুধু ফরহাদের নামেই নয়, তার প্রয়াত বাবা আকতারুজ্জামানের নামেও রয়েছে এক একরের বেশি খাসজমি। এ ছাড়া শ্রীপুর ইউনিয়নের কাজী পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নামেও একরে একরে খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া রয়েছে। এরা সবাই মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদের পরিবার হিসেবে এবং ভুয়া নাম ব্যবহার করে জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিজের নামে খাসজমি বন্দোবস্ত থাকার বিষয়টি সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ স্বীকার করেছেন। তবে ওই জমি তার বাবা তার নামে বরাদ্দ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন তিনি। ফরহাদ বলেন, ‘ওই জমি আমার বাবা আমার নামে বন্দোবস্ত নিয়েছে। তা-ও আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন নেওয়া হয়েছে।’ সেক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে সম্পদশালী হয়েও তিনি কেন এ বন্দোবস্ত বাতিল করেননি জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম মশিউর রহমান বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী শুধু ভূমিহীনরাই খাসজমি বন্দোবস্ত পাবে। যারা সম্পদশালী, ট্যাক্স দেন, তাদের নামে খাস মি বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। সাবেক বা বর্তমান সংসদ সদস্যদের খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কোনো নির্দেশনা নেই। সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ কীভাবে খাসজমি বন্দোবস্ত পেয়েছেন, তা আমাদের জানা নেই।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের দেওয়া হয়নি বলে আদালতে মামলা করেন মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কাছে তথ্যপ্রমাণসহ আদালতে হাজির হাওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়েছে। আমরা মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদের নামে খাসজমি থাকার বিষয়টিও আদালতকে জানাব।’

কোটিপতি হয়েও ভূমিহীন কোটায় খাসজমি হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক এমপি
কোটিপতি হয়েও ভূমিহীন কোটায় খাসজমি হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক এমপি


গাজায় কেন আবার হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে ইসরায়েল by মেরন র‍্যাপোপোর্ট

যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ নৃশংস হামলা নিয়ে মিডল ইস্ট আইয়ে লিখেছেন ইসরায়েলি সাংবাদিক ও লেখক মেরন র‍্যাপোপোর্ট। তিনি ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজের সাবেক বার্তা বিভাগের প্রধান। বর্তমানে তিনি স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। ফিলিস্তিনি মালিকদের থেকে জলপাইগাছ চুরি নিয়ে অনুসন্ধান করার জন্য তিনি ন্যাপোলি ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর জার্নালিজম পেয়েছিলেন।

গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের চালানো হামলায় ৪০০ জনের বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা শতাধিক। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এটা ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে ভয়ানক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সামরিক পদক্ষেপ।

হামলার পাশাপাশি গাজাবাসীর ঘরবাড়ি ছাড়ার নির্দেশও নতুন করে জারি করেছে ইসরায়েল। ফলে গাজাজুড়ে হাজার হাজার মানুষ নতুন করে জোরপূর্বক স্থানচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

এমনকি ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর মধ্যপন্থী সামরিক ভাষ্যকার আমোস হারেলও গত মঙ্গলবার থেকে গাজাবাসীর ওপর শুরু করা হামলাকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সরকারের স্বার্থে শুরু করা যুদ্ধ বলে মনে করেন।

এ হামলা ও হামলার ধরনের সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হামলার সঙ্গে তিনটি বিষয়ের সম্পর্কে আছে বলে মনে হচ্ছে। এক. রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুর টিকে থাকা। দুই. সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর তাঁর আধিপত্য বিস্তার। তিন. জনগণকে উত্তেজিত না করে মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা।

সরকার টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ

চলতি মাসের শেষের দিকে নেতানিয়াহুকে বাজেট পাস করতে হবে। এটা করতে না পারলে তাঁর সরকারের পতন হবে এবং নতুন নির্বাচন দিতে হবে।

বাজেট যদি পাস করা যায়, তাহলে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নেতানিয়াহুর সরকার টিকে যাবে। তাই বাজেট পাস করতে পারাটা তাঁর সরকারের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

আগামী মাসে পার্লামেন্টে বাজেট পাস করতে পারবে না, এখন পর্যন্ত এমন স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত নেই। তবে নিজের জোট সরকারের শরিক ইউনাইটেড তোরাহ জুদায়িজম পার্টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন নেতানিয়াহু। আশকেনাজি ইহুদিদের নিয়ে গঠিত এ দলের অতিগোঁড়া সদস্যরা বাজেট পাসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন।

নেতানিয়াহুর জোট সরকার টিকে থাকার জন্য ইউনাইটেড তোরাহ জুদায়িজম পার্টির আটটি আসন বেশ দরকারি। দলটি এরই মধ্যে একটি বিল উত্থাপন করেছে, যেখানে অতিগোঁড়া তরুণদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে চাকরি করা থেকে অব্যাহতি দিতে বলা হয়েছে। নেতানিয়াহু সরকার বিলটি সমর্থন না করলে দলটি বাজেট পাসে বাগড়া দিতে পারে।

এ কারণে নেতানিয়াহুর সরকারকে শক্তিশালী করার দরকার পড়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে শোনা যাচ্ছে, ইসরায়েলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির আবার নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভায় ফিরছেন। রাজনৈতিক দল জ্যুইশ পাওয়ারের এই নেতা গত জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি অনুমোদনের পর পদত্যাগ করেছিলেন।

গত মঙ্গলবার গাজায় হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা পর বেন-গভির ঘোষণা দেন, তাঁর দল আসলেই সরকারে ফিরতে যাচ্ছে। কারণ, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার তাঁদের যে দাবি ছিল, তা পূর্ণ হয়েছে।

এর অর্থ হলো এখন জুদায়িজম পার্টি বিপক্ষে ভোট দিলেও বাজেট পাস হবে। এটা নেতানিয়াহুর জন্য নগদ লাভ।

ট্রাম্প ফ্যাক্টর

গাজায় নতুন করে হত্যাযজ্ঞ শুরুর পেছনে ট্রাম্পেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছিলেন নেতানিয়াহু। সেখান থেকে ফেরার পর থেকে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি জোরেশোরে অনুসরণ করছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি বা আইন তোয়াক্কা করার কোনো গরজ নেই।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পর থেকে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টিটিউট থেকে বিরোধীদের ব্যাপক হারে ছাঁটাই করা শুরু করেছেন।

এরই মধ্যে সেনাবাহিনী ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’-এর শীর্ষ পদে রদবদল করা হয়েছে। হারজি হালেভিকে বাদ দিয়ে ইয়াল জমিরকে নতুন সেনাপ্রধান করা হয়েছে। নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের এক সপ্তাহের মাথায় তাঁর নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়।

জমির মার্চের শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তিনি সেনাবাহিনীতে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দূত হিসেবে কাজ করছেন।

জমির এরই মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ড্যানিয়েল হ্যাগারিকে অপসারণ করেছেন। তিনি সরকারের কাজের সমালোচক ছিলেন। ইয়ানিভ আসোরকে গুরুত্বপূর্ণ সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান করা হয়েছে। এই কমান্ডই গাজা যুদ্ধ দেখভাল করছে।

এর আগে ইয়ানিভ আসোর সেনাসদস্য বিভাগের প্রধান ছিলেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি নেতানিয়াহুকে অতিগোঁড়াদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ (কন্সক্রিপশন) দেওয়া থেকে বিরত রেখেছিলেন।

ইতজিক কোহেনকে অপারেশন অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য যাঁরা দায়ী, তিনি সেই শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন। সেনাবাহিনীতে এসব পরিবর্তন নেতানিয়াহুর পক্ষে যায়।

জমির এক সিনাগগে প্রার্থনায় যোগ দিয়ে বাইবেলে বর্ণিত শত্রু আমালেকীয়দের নির্মূল করার আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধের শুরুর দিকে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের আমালেকীয়দের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত নিয়ে সম্প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি সংস্থাটির প্রধান রোনেন বারকে অপসারণের ঘোষণা দিয়েছেন। ঘটনাচক্রে তিনি এমন এক সময়ে রোনেন বারকে সরাতে চাইছেন, যখন কাতার থেকে অর্থ নেওয়ার সন্দেহে নেতানিয়াহুর কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করছিল শিন বেত।

শিন বেত নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে নেতানিয়াহুর হাতে বিপুল ক্ষমতা কুক্ষিগত হবে। এ গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণ হাতে এলে নেতানিয়াহু তাঁর দেশীয় বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে পারবেন।

যুদ্ধবিরতি মেনে না চলার বিষয়েও নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের মনোভাব অনুসরণ করেছেন। ইসরায়েল-হামাসের মধ্যে গত জানুয়ারিতে হওয়া চুক্তিতে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ কার্যকর হওয়ার ১৬ দিন পর দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানো সম্ভব না হলেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।

কিন্তু ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে নেতানিয়াহু মনে করলেন, তিনি লিখিত চুক্তি অগ্রাহ্য করতে পারেন এবং সবচেয়ে নির্মম উপায়ে গাজায় হামলা চালাতে পারেন।

ইসরায়েলি জনগণের ভয়

গত মঙ্গলবার পুরো হামলা যুদ্ধবিমান দিয়ে চালানো হয়েছে। এতে স্থলবাহিনী অংশ নেয়নি। শুধু যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলা চালানোর মধ্যেও ইসরায়েলের ঘরোয়া রাজনীতির চিত্র ফুটে উঠেছে।

যদিও নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার অনিচ্ছা এবং যুদ্ধ পুনরায় শুরুর বাসনা গোপন করেননি। পাশাপাশি তাঁর অতিডানপন্থী মিত্র বেন–গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ গাজা উপত্যকা দখলে নেওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে বিতাড়নের দাবি জানিয়েছেন।

তারপরও গাজায় আবারও বড় ধরনের স্থল অভিযান পরিচালনা নিয়ে নেতানিয়াহু শঙ্কিত। কারণ, তিনি সেনাবাহিনী ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতে যে রদবদল করেছেন এবং সব জিম্মিকে মুক্ত করা ও যুদ্ধ শেষ করার মতো একটি চুক্তি নিয়ে তিনি যে দোলাচলে রয়েছেন, তা জনগণের একটি বিরাট অংশকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। তাঁরা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, এমন একটি সেনাবাহিনীতে কাজ না করতে জনগণের প্রতি খোলামেলা আহ্বান জানাতে পারে। সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে চাওয়ার হার এরই মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে পুরো গাজা বা অন্তত উপত্যকাটির উত্তরাঞ্চল দখল করতে গেলেও হাজার হাজার সেনা সমাবেশের প্রয়োজন হবে। কিন্তু এটা করতে গেলে নেতানিয়াহু সরাসরি বা অনানুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে পারেন।

সেনাসদস্য নিয়োগ দিতে গিয়ে গণপ্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হলে তা সেনাবাহিনীর জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে গণ্য হবে। অথচ এই সেনাবাহিনীই এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি সমাজের অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা বিল্ডিং ব্লক। সেনাবাহিনী ধাক্কা খেলে তা ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করবে।

তাই এসব কিছু আমলে নিয়ে অন্তত এখন পর্যন্ত শুধু বিমান হামলার ওপর নির্ভর করাকে নিরাপদ মনে করছেন নেতানিয়াহু। আপাতত বোমা ফেলাটাই নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সুবিধাজনক। কারণ, এতে সংরক্ষিত সেনা বা রিজার্ভিস্টদের যুদ্ধের মাঠে পাঠাতে হচ্ছে না বা সেনাসদস্যদের ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে না।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু এটাও জানেন, ফিলিস্তিনের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ হত্যার কারণে ইসরায়েলি সমাজে এরই মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

সুনির্দিষ্ট সামরিক উদ্দেশ্য নেই

সরকারকে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহু উল্লিখিত সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। কারণ, এসব হামলার সামরিক উদ্দেশ্য প্রায় অস্তিত্বহীন। এসব হামলার নেতানিয়াহুর একমাত্র সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্য হলো হামাসকে আরও চাপে রাখা, যাতে গোষ্ঠীটিকে এক ধাপের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করা যায়। এতে যুদ্ধ বন্ধের কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই সব জিম্মিকে উদ্ধার করা যাবে।

এবারের বোমা হামলার পর দ্বিতীয় ধাপের চুক্তির কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই যদি হামাস কিছু জিম্মিকে মুক্তি দিতে রাজি হয়, তা নেতানিয়াহুর পক্ষে যাবে। তখন তিনি বলতে শুরু করবেন, সামরিক চাপ দিয়েই তাদের মুক্ত করা গেছে। নির্বাচনেও তিনি এর সুবিধা নিতে পারেন। এরই মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহে তিনি এমনটি করেছেন।

কিন্তু সেটা তো ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পরিষ্কার কোনো লক্ষ্যবস্তু নয়। খোদ ইসরায়েলই বলছে, এবারের হামলায় হামাসের যেসব কর্মকর্তা মারা গেছেন, তাঁরা গোষ্ঠীটির গাজার বেসামরিক প্রশাসনের। এবারের হামলায় হামাসের সামরিক সক্ষমতার ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

এসব কিছুর কারণে বলা যায়, গাজায় এবার ইসরায়েলে নতুন করে যে অভিযান শুরু করেছে, তার উদ্দেশ্য ঘরোয়া রাজনীতির স্বার্থসিদ্ধি। কারণ, এবারের হামলার মধ্য দিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই গাজায় সন্ত্রাস ছড়ানো হচ্ছে।

অনুবাদ: মুহাম্মদ তাসনিম আলম

গাজায় ধ্বংসস্তূপে এক ফিলিস্তিনি শিশু। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে, ২০ মার্চ ২০২৫
গাজায় ধ্বংসস্তূপে এক ফিলিস্তিনি শিশু। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে, ২০ মার্চ ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

গাজায় হামলার নিন্দা জানালেও ইসরায়েলের সঙ্গে কেন বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে এসব দেশ

কখনো বিমান হামলা করে, কখনো অভুক্ত রেখে, কখনো তিলে তিলে, আবার কখনো দ্রুত—সব রকমভাবে অব্যাহতভাবে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে চলেছে ইসরায়েল। এর মধ্যেই ২৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধের অবসানের দাবিতে একটি বিবৃতি স্বাক্ষর করেছেন।

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থা গাজায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা জানানোর কয়েক মাস পর এখন এসব দেশ কেবল বিবৃতি দিচ্ছে। কিন্তু সংকট সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

যেসব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতি দিয়েছেন, সেসব দেশের কয়েকটি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গত সপ্তাহে ফ্রান্সও ঘোষণা দিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে দেশটি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। এ ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, এসব দেশ মুখে যতই ইসরায়েলের সমালোচনা করুক না কেন, তারা এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা–বাণিজ্য করে লাভবান হচ্ছে। তারা ইসরায়েলের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি বা এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যা ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে পারে।

এখন পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলায় অন্তত ৫৯ হাজার ৮২১ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৭৭ জন।

জেনে নেওয়া যাক, কোন দেশগুলো ইসরায়েলকে একদিকে তাদের সামরিক আগ্রাসনের জন্য দোষারোপ করছে, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

তথ্যভিত্তিক উন্মুক্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির (ওইসি) ২০২৩ সালের তথ্যানুসারে, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য—প্রতিটি দেশ ওই বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের বেশি আমদানি-রপ্তানি বা উভয় ধরনের বাণিজ্য করেছে।

এসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কী ধরনের বাণিজ্য করে

এসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে প্রধানত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (চিপ), টিকা ও সুগন্ধির মতো বিভিন্ন পণ্য বাণিজ্য করে।

ইসরায়েল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করে, সেগুলোর একটির নাম ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট। এগুলো আসলে ছোট আকারের চিপ, যা কম্পিউটার, মুঠোফোন, টেলিকম যন্ত্রপাতি, মেডিকেল ডিভাইসসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্যে ব্যবহৃত হয়।

এই চিপগুলোর একটি বিশাল অংশ আয়ারল্যান্ডে রপ্তানি হয়। শুধু ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রায় ৩৫৮ কোটি ডলার মূল্যের ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট রপ্তানি করেছিল ইসরায়েল। আয়ারল্যান্ড ইসরায়েল থেকে মোট যত পণ্য আমদানি করে, তার মধ্যে এই চিপই সবচেয়ে বেশি দামে এবং বেশি পরিমাণে আমদানি করা হয়।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে ইতালি।

২০২৩ সালে ইসরায়েলে মোট ৩৪৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে ইতালি। এর মধ্যে গাড়ি রপ্তানি করা হয় ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের।

এসব দেশ কি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে আয়ারল্যান্ড ও স্পেন ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করেছে। কিন্তু এরপরও তারা ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করেনি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী আরও সাতটি দেশ ১৯৮৮ সালেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এসব দেশ হলো সাইপ্রাস, মাল্টা ও পোল্যান্ড। তারা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণার পরপরই স্বীকৃতি দিয়েছিল।

এ ছাড়া আইসল্যান্ড ২০১১ সালে, সুইডেন ২০১৪ সালে এবং নরওয়ে ও স্লোভেনিয়া ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফ্রান্স বলেছে, তারা আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে স্বীকৃতি দেবে।

কোন কোন দেশ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, সাইপ্রাস, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, গ্রিস, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য।

সবগুলো দেশই এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েল বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় কী বলেছে

স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল বিবৃতিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘ইসরায়েল এই বিবৃতিকে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মনে করে। এটি হামাসকে ভুল বার্তা দিচ্ছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলো আর কী করছে

ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য এক জরুরি বৈঠকে গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং সব বন্দীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে। তারা গাজায় ইসরায়েলের অবরোধের ফলে সৃষ্ট খাদ্যসংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এসব চাপের ফলে ইসরায়েল কি বদলেছে

গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহারের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিকভাবে খুব আলোচিত। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের মতো ইসরায়েলপন্থীরাও এখন এ বিষয়ে কথা বলছেন।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল আল-মাওয়াসি, দেইর আল-বালা ও গাজা শহরে ‘মানবিক উদ্দেশ্যে’ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গাজায় ‘কৌশলগত বিরতি’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটি গত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।

তবে এই বিরতির মধ্যেও রোববার সকালে ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত ৪৩ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনাহার ও অপুষ্টিতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজন শিশু।

এ নিয়ে গাজায় অনাহারে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩৩ জনে, যার মধ্যে ৮৭টি শিশু।

গাজা উপত্যকার কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি হামলার পর পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে একটি শিশু
গাজা উপত্যকার কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি হামলার পর পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে একটি শিশু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের আগ্রাসনে গাজায় আরও ৫ সাংবাদিক নিহত

গাজা নগরীর নিয়ন্ত্রণ নিতে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। উপত্যকাটির অন্য এলাকায়ও চলছে নৃশংস হামলা। আজ সোমবার দক্ষিণে খান ইউনিস এলাকায় একটি হাসপাতালে হামলা চালিয়ে অন্তত ২০ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ সাংবাদিক রয়েছেন।

গাজা সিভিল ডিফেন্স সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আজ হাসপাতালে হামলার তথ্য জানিয়েছেন। নিহত পাঁচ সাংবাদিক হলেন রয়টার্সের সংবাদিক হুসাম আল-মাসরি, আল-জাজিরার সংবাদিক মোহাম্মদ সালামা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক মরিয়ম আবু দাগা, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক আহমেদ আবু আজিজ ও ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোয়াজ আবু তাহা।

সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ২২ মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ২০০ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের প্রায় সবাই ফিলিস্তিনি। সবশেষ চলতি মাসেই গাজা নগরীতে একটি তাঁবুতে ইসরায়েলের হামলায় আল-জাজিরার পাঁচ সাংবাদিক নিহত হয়েছিলেন।

আজ আল-নাসের হাসপাতালে হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, হামলার ঘটনা যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত করার নির্দেশনা দিয়েছেন বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ। সংঘাতে জড়িত নয়, এমন কোনো ব্যক্তি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে জন্য তারা দুঃখিত।

ইসরায়েলের হামলায় নিজেদের সংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে আল-জাজিরা। সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, সত্যের কণ্ঠ রোধ করার পরিকল্পিত অভিযানের অংশ হিসেবে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আরেক বিবৃতিতে রয়টার্স বলেছে, সংবাদকর্মী হুসাম আল-মাসরির মৃত্যুতে তারা ‘বিপর্যস্ত’।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। ইসরায়েল থেকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসা হয় প্রায় আড়াই শ জনকে। সেদিন থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত ৬২ হাজার ৭০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি।

এ ছাড়া ৬ আগস্ট থেকে গাজা নগরী দখলে শুরু করা ইসরায়েলের অভিযানে ১ হাজারের বেশি ভবন ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে উপত্যকাটির সিভিল ডিফেন্স সংস্থা। গতকাল এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, নগরীর জেইতুন ও সাবরা এলাকায় হামলায় চালিয়ে এ ভবনগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে চাপা পড়ে আছেন।

নেতানিয়াহুর কৌশল বদল

সম্প্রতি গাজায় যুদ্ধবিরতির নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ওই প্রস্তাবে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় গাজায় বন্দী থাকা ইসরায়েলের অর্ধেক জিম্মি মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। গাজায় বর্তমানে জীবিত ও মৃত মিলে ৫০ জন জিম্মি রয়েছেন। এ প্রস্তাবের সঙ্গে গত মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তার মিল রয়েছে।

উইটকফের ওই প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল হামাস। যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যস্থতাকারীরা এরপর ইসরায়েলের কাছ থেকে জবাব আশা করছিল। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহু বলেন, তিনি গাজা থেকে সব জিম্মিকে ফিরিয়ে আনার এবং সংঘাত পুরোপুরি শেষ করার আলোচনা শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বর্তমানে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তা নিয়ে কোনো কথা বলেননি তিনি।

একই সময়ে গাজা নগরী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য ব্যাপক হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। এটিও নেতানিয়াহুর কৌশলের অংশ বলে উল্লেখ করেছেন ইসরায়েলের কর্মকর্তারা। সিএনএনকে তাঁরা বলেছেন, গাজায় নতুন করে ব্যাপক সামরিক চাপের হুমকি সংঘাত বন্ধের জন্য ইসরায়েলের শর্তগুলো মেনে নিতে হামাসকে আরও নমনীয় করে তুলবে। এতে গাজায় ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।

ইসরায়েলি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, গাজা নিয়ে নেতানিয়াহুর নতুন কৌশল জেরুজালেম নয়; বরং ওয়াশিংটন থেকে এসেছে। বিগত কয়েক সপ্তাহে গাজা নগরীতে ইসরায়েলের অভিযানের বারবার সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব তাঁর প্রশাসন দিয়েছে, তার বিপরীতে গিয়ে যুদ্ধ বন্ধে হামাসকে পুরোপুরি নির্মূলের কথা বলছেন তিনি।

গত সপ্তাহে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘হামাসকে যখন মোকাবিলা করা হবে এবং নির্মূল করা হবে, তখনই বাকি জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে পারব আমরা। এটা যত দ্রুত করা হবে, সফলতার সম্ভাবনা ততই বাড়বে।’

ডানে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোয়াজ আবু তাহা। তিনি ফিলিস্তিনের পাশাপাশি বিদেশের কিছু গণমাধ্যমের জন্য কাজ করতেন। তাঁর পাশেই মরিয়ম আবু দাগা। তিনি এপির ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ছিলেন। ইসরায়েলের হামলায় আজ দুজনেই নিহত হন
ডানে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোয়াজ আবু তাহা। তিনি ফিলিস্তিনের পাশাপাশি বিদেশের কিছু গণমাধ্যমের জন্য কাজ করতেন। তাঁর পাশেই মরিয়ম আবু দাগা। তিনি এপির ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ছিলেন। ইসরায়েলের হামলায় আজ দুজনেই নিহত হন। ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের চাপে মোদি: নতুন কূটনৈতিক পথের খোঁজে দিল্লি by শীলা ভাট

বিশ্ব এখন ভারতের দিকে তাকিয়ে আছে। ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশের অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন শুল্ক আরোপ করার যে সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছেন, তা ভারতের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। এ চাপ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারতীয় কূটনীতির নতুন পথ খুঁজে নিতে বাধ্য করছে। মোদির দল আশা করছে, মোদির বেছে নেওয়া নতুন পথ ভারতের ঘরোয়া রাজনীতিকে আরও সংহত করবে।

সাত মাস ধরে ট্রাম্পের কূটনীতির লক্ষ্য হচ্ছে তার মূল ভোটার গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখা, বিশাল মার্কিন ঋণ কমানো এবং তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (সংক্ষেপে যাকে বলে ‘মাগা’) পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ট্রাম্পের এই মাগা রাজনীতি সারা বিশ্বেই আলোড়ন সৃষ্টি করছে।

এটা একধরনের বিদ্রূপ যে মোদির সমর্থকদের বড় অংশই ভারত-মার্কিন সম্পর্ক আরও মজবুত করার পক্ষেই ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের এ ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ তাদের মনে অবিশ্বাসের বীজ বপন করবে।

১৯৭১-৭২ সালের ইন্দিরা গান্ধীর পর ভারতীয় কোনো নেতা খুব কমই এমন সংকটময় অবস্থায় পড়েছেন, যেখানে ‘শয়তান’ আর ‘অতলপাতাল’—এই দুটোর একটাকে বেছে নিতে হয়, অর্থাৎ এদিকেও বিপদ, ওদিকেও বিপদ। তবে মোদি এখন তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

দীর্ঘ আলোচনার পর মোদি ট্রাম্পের ভারতবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে ‘দাঁড়িয়ে যাওয়ার’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিজেপির নেতারা ইতিমধ্যেই বলছেন, ভারতকে ট্রাম্পের নির্দেশ না মানার কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

মোদিই স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে তাঁর নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রতের কৃষক, জেলে ও পশুপালনকারী সম্প্রদায়ের স্বার্থের ক্ষতি করে, এমন যেকোনো নীতির বিরুদ্ধে মোদি দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

এটাও তাৎপর্যপূর্ণ যে জয়শঙ্কর ট্রাম্পের সঙ্গে ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলতে পারেন এবং পুতিনের সঙ্গে রুশ ভাষায় জারদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

সব মিলিয়ে ভারত-রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এখন এক নতুন গুণগত পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

মোদির চীন সফর প্রমাণ করছে, শুল্কবৃদ্ধির আঘাত থেকে দুর্বল ভারতীয় অর্থনীতিকে সামলাতে ভারত কতটা প্রস্তুত। সংকটে পড়লে মোদি নমনীয় কৌশল অবলম্বন করেন। এক ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষায়, ‘টিম মোদি’ এখন বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো সামাল দিচ্ছে চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সমন্বয়ে।

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলকে ওয়াশিংটনে বাণিজ্যচুক্তি ও শুল্কসংক্রান্ত আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের অন্য সদস্যরা হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, কৃষি ও কৃষককল্যাণমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এবং অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। তাঁরা নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং বাস্তব সময়ে মতামত ও তথ্য বিনিময় করছেন।

শুল্কযুদ্ধের কারণে নরেন্দ্র মোদি এখন নয়াদিল্লির প্রো-আমেরিকান ও অ্যান্টিচায়না (চীনবিরোধী) লবির আক্রমণের মুখে। অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক, যাঁরা মোদি সরকারের রাজনীতির সমালোচক ছিলেন, তাঁরা রাতারাতি চীনের সঙ্গে সংলাপ পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি হজম করতে পারছেন না। বিশেষত অভিযোগ রয়েছে যে পাকিস্তানকে সহায়তায় চীন ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভূমিকা রেখেছিল।

তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান জটিল অবস্থার জন্য মূলত ‘মোদির কূটনীতিই বেশি দায়ী’। তাঁদের ধারণা, চীনের প্রতি ভারতের এ নরম অবস্থান কোনো মূল্য ছাড়া আসবে না।

অন্যদিকে পাকিস্তানকে ‘খেলায় ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করা এবং রুশ তেল আমদানির বিষয়ে নয়াদিল্লির প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান ভারতের সব রাজনৈতিক মহলের কাছে ‘অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর’।

মোদির সমালোচকদের মতে, ভারত এখন কৌশলগত প্রজ্ঞার চেয়ে বাধ্যবাধকতা থেকেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। না হলে রাতারাতি কোয়াড উদ্যোগকে স্থবির করে দিয়ে ব্রিকসকে গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাখ্যা কী হতে পারে? তবে চাকরির বাজার ও জিডিপিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, এমন গভীরতর সংকটের মুখে এ সমালোচনা এখন অনেকটাই অর্থহীন হয়ে গেছে।

মোদি সম্ভবত এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দেবেন না। কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনের তারিখও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

আরও তীব্র সমালোচনা আসছে তাঁদের কাছ থেকে, যাঁরা সারা জীবন ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দৃঢ় করতে কাজ করেছেন। তাঁরা অভিযোগ করছেন, মোদি ও জয়শঙ্করের যুগলবন্দী ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এজেন্ডা সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।

তবে মোদি-জয়শঙ্কর জুটি এসব সমালোচনা পাত্তা দিচ্ছেন না। কারণ, মোদির হাতে সময় নেই। বৈশ্বিক বাজারে এখন ভারতের জন্য উপযুক্ত বিকল্পও বেশি নেই। এ মুহূর্তে চীন ও রাশিয়াই ভারতের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম।

মোদি দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছেন যাতে ভারতের জিডিপি হঠাৎ তীব্রভাবে না কমে যায়। অনেক বিশেষজ্ঞ আগাম সতর্ক করে বলেছেন, জিডিপি প্রায় অর্ধশতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ভারত সরকারের এক সূত্র বলেছে, ট্রাম্পসৃষ্ট বিশাল সংকট সামাল দিতে ভারত চীনের সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং একই সঙ্গে পুরোনো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সতর্ক থাকবে, জাতীয় স্বার্থ মাথায় রেখে।

লক্ষণীয় যে মাসের শেষে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য মোদির চীন সফর জাপান সফরের সঙ্গে একত্রে পরিকল্পিত। তাঁর পরিকল্পনা হলো ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে ভ্রান্ত প্রত্যাশা পেছনে ফেলে দ্রুত বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করা।

গোপনে, যেমনটা এখন বিশ্বের অনেক রাজধানীতেই ঘটছে, নয়াদিল্লির রাইসিনা হিলে এক বাস্তবতা উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। সেটি হলো ভারত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ ও তাঁর মাগা এজেন্ডা সঠিকভাবে মূল্যায়নে ভুল করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চীনবিষয়ক কূটনীতিতে ভারতের কোনো গুরুত্ব নেই। আসলে মার্কিন কংগ্রেসে এখন পররাষ্ট্র দপ্তর কার্যত ক্ষমতাহীন, আর স্টিভ উইটকফের মতো রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত প্রভাব খাটাচ্ছেন। মার্কিন সরকারের পুরোনো কূটনৈতিক ব্যবস্থাগুলো বিনা নোটিশে ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের ব্যবসায়িক মনোভাব মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দীর্ঘদিনের নীতিকে আড়াল করে দিয়েছে।

চীন, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের সঙ্গে বহুপক্ষীয় সম্পর্কে ভারতের নতুন কৌশল ট্রাম্পের কারণেই, যিনি মোদিকে দুটি অস্বস্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য বিকল্প দিয়েছিলেন।

প্রথমত, কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কি কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারেন যে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁকে পাকিস্তান বিষয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দিয়েছেন, বিশেষত যখন ট্রাম্প সত্যকে গোপন করে কথা বলেন?

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রতি ট্রাম্পের বিস্ময়কর অজ্ঞতা ও সংবেদনশীলতার অভাবই সমস্যার মূল। তিনি মোদিকে এমন একটি প্রকাশ্য বিকল্প প্রস্তাব করেছিলেন, যা তিনি কখনোই গ্রহণ করতে পারেন না। নয়াদিল্লিতে কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন প্রস্তাব একমুহূর্তও বিবেচনা করবেন না। হয়তো এ উপলব্ধিই ট্রাম্পকে বিরক্ত করছে।

দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদির ওয়াশিংটন সফরের সময় ট্রাম্প ভারতীয় কৃষি ও দুগ্ধ বাজারে মার্কিন প্রবেশাধিকার চেয়েছিলেন। এ বিষয়গুলো পরবর্তী বাণিজ্য আলোচনায়ও তোলা হয়। এর পর থেকে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভারতে কৃষিসংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলোর মতোই সংবেদনশীল।

ভারতীয় সূত্রগুলোর দাবি, মার্চ থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা স্পষ্ট করে যে ভারতের কৃষি ও দুগ্ধশিল্প যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত করার প্রশ্নটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর ইস্যু হয়ে উঠেছে। এ কারণেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।

ট্রাম্পের দলের সদস্যরা ভারতের দুগ্ধ সমবায় ব্যবস্থা ও কৃষিভিত্তিক সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না রেখেই এমন কিছু চাইছেন, যা কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মেনে নিতে পারবেন না।

প্রতিবারই ভারত-মার্কিন আলোচনাকারী দল নানা সমঝোতার পর বাণিজ্যচুক্তির খসড়া তৈরি করে হোয়াইট হাউসে পাঠাত, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হতো।

কেন? অধিকাংশের ধারণা, ট্রাম্প তাঁর মাগা–সমর্থকদের দেখাতে চেয়েছিলেন, ‘দেখো, আমার বন্ধু মোদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৪০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার খুলে দিয়েছে।’ তিনি অবিবেচকভাবে ভেবেছিলেন, ভারতীয় ক্রেতারা ভুট্টা, সয়া, গরুর মাংস, চিজ ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির ভারত-মার্কিন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছেন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী ভারতের প্রতি অ-কূটনৈতিক, অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য দাবি উপস্থাপন করছে।

ভারতের কৃষিশিল্পে ট্রাম্প যে ধরনের ছাড় চাইছেন, তা কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দিতে পারবেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির জন্য এটি কার্যত অসম্ভব। ট্রাম্প শুল্ক কমাবেন, এমন আশা খুবই ক্ষীণ।

২৭ আগস্টের সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ভারতের শীর্ষ মহল পুরোপুরি ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলে নেমেছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঝুঁকি বিশ্লেষণ করছে, আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় দূতাবাসগুলো নতুন বাজার খুঁজছে।

আসন্ন সংকট মোকাবিলার জন্য জিএসটি কাঠামোয় সংস্কারসহ অন্যান্য পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে না এলে মোদি সরকারকে রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

এ পরিস্থিতিতে একমাত্র আশা, ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা দ্রুত তাঁদের পণ্যের জন্য বিকল্প বাজার খুঁজে পাবেন। শুল্ক-সন্ত্রাস বাস্তব।

চীনের সঙ্গে কূটনীতির পথ পরিবর্তন থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে ভারত সরকার বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে না।

* শীলা ভাট, দিল্লিভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
- দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প–মোদি বৈঠকের পরও ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে
ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প–মোদি বৈঠকের পরও ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

প্রত্যাবাসন না আত্মীকরণ—কোন পথে রোহিঙ্গা সংকট? by সুদীপ রায়

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য প্রায় পাঁচ দশকের একটি সমস্যা। সর্বশেষ বৃহৎ ঢলটিও আট বছর পেরিয়ে ইতিমধ্যে প্রলম্বিত শরণার্থী সংকটে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেকেই এত বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে প্রবেশ করতে দেওয়া চরম ভুল হয়েছিল বলে মত দিচ্ছেন। তবে প্রতিবশেী দেশের সংঘাতে এ ধরনের শরণার্থী বা উদ্বাস্তু তৈরি হওয়া এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া যেমন মানবিক, তেমনি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। জীবন রক্ষার জন্য রোহিঙ্গাদের তাৎক্ষণিক অন্য কোনো উপায় ছিল না, যদিও রোহিঙ্গা সমস্যাটি সমসাময়িক অন্যান্য শরণার্থী সমস্যা থেকে ভিন্ন।

ইউরোপে সিরীয় শরণার্থী, কেনিয়ায় সোমালি শরণার্থী, পাকিস্তানে আফগান শরণার্থী—তারা সবাই একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিল। অনেক শরণার্থী সমস্যা আবার প্রথমবারের মতো সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিক থেকে রোহিঙ্গা সমস্যা ভিন্ন, যা একটি একপক্ষীয় নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে সৃষ্ট। তারা কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে পলায়নপর কোনো উদ্বাস্তু নয়। ধারাবাহিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট, মিয়ানমার রাষ্ট্রটির কোনো সরকারই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মেনে নেয়নি। তাই যেকোনো অজুহাতে তাদের বিতারণ ও নিধন করার সব পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করেছে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় ভারত, চীন ও রাশিয়া নীরব ভূমিকা পালন করেছে, অনেকাংশে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা নির্মূলে উৎসাহিত করেছে। রাষ্ট্রগুলোর এ ধরনের ভূমিকার পেছনে অনেক কারণ ও স্বার্থ রয়েছে। শরণার্থী সমস্যার প্রভাব উৎস ও আশ্রয়দাতা উভয় দেশের জন্যই দীর্ঘস্থায়ী হয়। অন্যদিকে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অভিবাসন ও শরণার্থীস্রোতকে যেভাবে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাতে শরণার্থীদের মানবাধিকার বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। তারা শরণার্থী ক্যাম্পে কেবল মৃত্যুর জন্যই দিন পার করে।

আন্তসীমান্ত সংঘাতের বড় একটি কারণ হয়ে দাড়াঁয় শরণার্থী। এই আশঙ্কা বাংলাদেশকেও উচ্চ নিরাপত্তাঝুঁকিতে ফেলেছে। সব দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকারও চেষ্টা করছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ক্যাম্পের মধ্যেই আবদ্ধ রাখতে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারাও বুঝতে পারছে যে ক্যাম্পে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এই সমস্যার আশু কোনো সমাধান নেই।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা নিয়ে এ পর্যন্ত একাডেমি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবু আরও আলোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে নতুন ঢলের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কম করে হলেও ডজনখানেক সন্ত্রাসী গ্রুপ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের পক্ষে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সরকারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তবু প্রতিনিয়ত হত্যা, চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসা, জঙ্গি–সংশ্লিষ্টতা বেড়েই চলেছে।

বর্তমান বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের জন্য অপরিহার্য মানবিক সহায়তার জোগান নিশ্চিত করা প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ জন্য প্রতিবছর ন্যূনতম ৬০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘায়িত শরণার্থী সমস্যার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে দাতাসহায়তা হ্রাস পেতে থাকে। এই আট বছরে সহায়তার জোগান প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বিদ্যমান কাঠামোগত অন্যান্য সব সমস্যাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। সিংহভাগ দায়িত্ব চলে আসতে পারে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের ওপর। এ ছাড়া সর্বশেষ যে আন্তর্জাতিক শরণার্থীনীতি, সেখানে মানবিক সহায়তার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে আত্মীকরণের প্রতি জোর দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে তা-ও সম্ভব নয়।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, সরলভাবে বললে, বিপুল জনগোষ্ঠীর ছোট্ট একটি দেশে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী নিয়ে উন্নয়ন, শান্তি–শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ যত দিন পর্যন্ত এই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান না হবে, তত দিন বাংলাদেশের উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়া (গ্র্যাজুয়েশন) পিছিয়ে যাবে। অপর দিকে উন্নত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে শরণার্থীনীতি প্রণয়ন এবং শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করার একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতাও চলে আসে।

একবিংশ শতাব্দীতে প্রত্যাবাসন প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ সংঘাত (জাতিগত) এখন স্বাধীন নতুন কোনো রাষ্ট্রের জন্ম দিচ্ছে না। তৃতীয় দেশে স্থানান্তর সেটিও উদাহরণ দেওয়ার মতো নয়, তা ১ শতাংশের বেশি নয়। এ ছাড়া রিসেটেলমেন্ট উৎস দেশে থেকে যাওয়া বিপন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য একটি আকর্ষণ হিসেবে কাজ করে এবং তারাও বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোয় প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান শূন্য স্থানীয় আত্মীকরণ নীতি। এটি নীতি ও পুলিশিং দ্বারা আপাতভাবে সীমিত করা যায়। যেহেতু আন্তুর্জাতিক সম্প্রদায় ও ইউএনএইচসিআর অন্য দুটি সমাধান নিয়ে তেমন কিছু করতে পারে না, তারা মানবিক সহায়তার মাধ্যমে ক্যাম্পে স্থায়ীকরণে ও স্থানীয়করণে উদ্বুদ্ধ করে।

শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়দাতা দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নানাবিধ বিনিয়োগ সহায়তা করে থাকে। নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত চেষ্টা করেও যদি আশ্রয়দাতা দেশের নীতি পরিবর্তন করতে না পারে, তখন মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বিভিন্ন অজুহাতে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ সরকারও সেটি ভালোভাবে অনুধাবন করছে। তারই প্রতিফলন হলো প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর পরিকল্পনা। সব রোহিঙ্গার সেখানে স্থানান্তর সম্ভব না হলেও কক্সবাজারের জনগোষ্ঠী ও সম্পদের ওপর অভিঘাত হ্রাস পাবে। একই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরের মতো ভবিষ্যতে আরও আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হতে পারে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে তা একই সঙ্গে দুই নৌকায় পা দেওয়ার মতো। একদিকে চীনের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় সমাধান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এক নৌকায় পা দিতে বাংলাদেশ অনেক চিন্তা করছে, কিন্তু দিন শেষে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

এ ক্ষেত্রে জটিল ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বকে সংকটে নিপতিত করতে পারে, যেমন মানবিক করিডরের মতো কোনো পরিকল্পনা। তবে এটি স্পষ্ট আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যাকারী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীরা দোষী সাব্যস্ত হলেও রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

এ ছাড়া একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র এই আদালতের আদেশ গ্রহণ না করলে তা বাস্তবায়ন করাও প্রায় অসম্ভব। এ আদালতের রায়ের মতো জাতিসংঘের অধীন রাখাইনে একটি নিরাপদ জোন করাও প্রায় একই আইনী (রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব) বাধায় সীমাবদ্ধ। মিয়ানমার না চাইলে জাতিসংঘের পক্ষেও সেখানে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব নয়। সর্বশেষ যে বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, তা হলো চীনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন।

এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে কি না, তা সব সময়ই বিবেচ্য। অর্থাৎ চীনমুখী নীতি বা চীনের প্রতি নির্ভরশীলতার নীতি বাংলাদেশ গ্রহণ করবে কি না, সে সিদ্ধান্ত খুব জটিল। এ ছাড়া চীনমুখী নীতি গ্রহণ করলেই শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা ফিরতে পারবে কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং রাজনীতিতে বিশ্বস্ত বন্ধু বিষয়টি তেমন প্রযোজ্য নয়। একবিংশ শতাব্দীতে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বিশ্লেষণে এই বিষয়ের সত্যতা লক্ষণীয়।

কেননা এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য ভূরাজনীতিতে দিন দিন পশ্চিমাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিচার করা এবং চীনের মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান—এই যুগপৎ চেষ্টা কোনো ফল দেবে না। সার্বিক সমীকরণ হিসেবে রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধানে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না।

অতীত ইতিহাস বিবেচনা করলে জাতিসংঘের ওপর নির্ভরশীলতা ব্যতীত বাংলাদেশের জন্য তেমন কার্যকর কোনো পথ খোলা নেই। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনর জরুরি। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত ধারাবাহিক সরকার একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশি সক্ষম। সে ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সমস্যার মতো অনেক সমস্যা মোকাবিলাও সহজ হতে পারে। সর্বোপরি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচেষ্টা ও ঐকমত্য ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কোনোটিই অর্জন সম্ভব নয়।

* সুদীপ রায়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, হাঙ্গেরির করভিনাস ইউনিভার্সিটি অব বুদাপেস্ট থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়ে গবেষণা করেছেন

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সর্ববৃহৎ ঢলটি বাংলাদেশে আসে
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সর্ববৃহৎ ঢলটি বাংলাদেশে আসে। ছবি : রয়টার্স