Thursday, November 26, 2009

‘আমি তোমাকেই বলে দেব’ -স্মরণ by মাহমুদুজ্জামান বাবু

কবে প্রথম দেখা হয়েছিল? মনে নেই। শুধু মনে পড়ে, তখন আমাদের চারপাশে সকাল-দুপুর-রাতজুড়ে সামরিক স্বৈরশাসন। যখন-তখন সান্ধ্য আইন। এবং আমাদের প্রতিবাদ। মিছিল। এবং তাত্ক্ষণিকভাবে হয়ে ওঠা নতুন কোনো একটি গান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলা ভবন, মল চত্বর আর মধুর ক্যান্টিন তখন মুখর হয়ে থাকত স্লোগানভরা রোদবৃষ্টিতে। আর টিএসসির ভেতর-বাহির থইথই করত পথনাটক, আবৃত্তি আর গানের মহড়ায়। এসবের ফাঁকে ফাঁকে বিরতি মিললেই টিএসসির ফুটপাত ঘেঁষে অস্থায়ী চায়ের দোকানে বিরামহীন বিতর্ক; কে আপসকামী আর কে আপসহীন! কোন সংবাদটি ভুল আর কোনটি ঠিক! কে ভীরু আর কে সাহসী! মনে পড়ে। পড়ছে। সঞ্জীব চৌধুরীর গানের মতো করেই আজ এখন এই মুহূর্তে... ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন?’ আমি এখন কোন সমুদ্রে যাব?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়েছিল সঞ্জীব। তারপর শুরু করেছিল সাংবাদিকতার কাজ। অসম্ভব রকমের উদ্ভাবনী সৃজনশীলতা তাকে দিয়েছিল অস্থিরতার ডানা। সে ডানায় ভর করে উড়ত তার উড়ালপঙ্খী মন। সেই অস্থির মনটা নিয়ে আজ কত গল্প শুনি! ভুল গল্প। ঠিক গল্প।
১৯৮৭-এর ১০ নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে নূর হোসেন প্রতিবাদের রাজপথে গিয়ে দাঁড়ালে স্বৈরাচারী এরশাদের দাঙ্গা পুলিশ যখন তাকে গুলি করে খুন করল, নতুন করে সান্ধ্য আইন জারি করল, চলমান আন্দোলনটা তখন একটু থমকাল। তখনকার স্বনামখ্যাত কবি ও আবৃত্তিকার ইস্তেকবাল হোসেন নূর হোসেনকে নিয়ে একটা কবিতা লিখলে সঞ্জীব সেটা সুরারোপ করে গেয়েছিল। হাহাকার ও কান্নায় মোড়ানো সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় আজও কানে কানে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের চার দিন পর টিএসসির সামনের খোলাপথে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের বিজয়মঞ্চে গান-কবিতা-বক্তৃতার উপচে পড়া কোলাহলে হাতে হাত ধরে থাকা সময়ের গল্প-চরিত্র সঞ্জীব আজ স্মৃতির উপন্যাসের নায়ক। মনে পড়ছে।
আমরা কেউ কেউ সক্রিয় রাজনীতিতে থেকেছি তার পরও। একই রকম সমাজ বদলানোর চোখ নিয়ে সঞ্জীব জড়িয়েছিল সাংবাদিকতার পেশায়। তখন দেখা হতো খুব কম। দেখা হলে স্মৃতি তর্পণ। পানাহারে আসক্তি বেড়েছিল তার। বিষাক্ত তরল ছোঁয়া লালচে চোখ এবং আচমকা ঝলসে ওঠা দ্যুতিময় প্রশ্ন... ‘বাবু, আমাদের সেই সব দিন কোথায় গেল?’ উত্তর মেলে না। দিনগুলো কোথায় যায়? জাগরণের দিন কোথায় আসলে?
সীমানা পেরিয়ে যেতে চেয়েছিল সঞ্জীব চৌধুরী। পেরিয়ে যেতে চেয়েছিল না পাওয়ার সকাল-দুপুর-রাত। গানে লিখল সে, ‘যাই পেরিয়ে এই যে সবুজ বন, যাই পেরিয়ে সকাল দুপুর রাত, যাই পেরিয়ে নিজের ছায়া, বাড়িয়ে দেয়া হাত’। গান ছিল তার যাপিত জীবনের প্রিয়তম ছন্দ। আশির দশকে সাংবাদিকতা শুরু করলেও ‘শঙ্খচিল’ নামে একটি গানের দলে নিয়মিত সংগীতচর্চা শুরু করে সে। এখান থেকে ওখান থেকে ছুটতে ছুটতে ১৯৯৬ সালে বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গে গড়ে তোলে ‘দলছুট’ ব্যান্ড। এবং সেখানেই সে প্রথম বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না’ গানটি যুগলভাবে গায়।
তার কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পায় ‘বায়োস্কোপ’, ‘রিকশা কেন আস্তে চলে না’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’, ‘আমি তোমাকেই বলে দেব’, ‘সাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে’ এবং দিনাজপুরে পুলিশের হাতে ধর্ষিত ও নিহত ইয়াসমীনকে নিয়ে করা ‘আহ্ ইয়াসমীন’ গানগুলো।
টেলিভিশনের জন্য নির্মিত একটি ধারাবাহিকসহ বেশ কয়েকটি নাটকে সঞ্জীব অভিনয়ও করেছিল। লিখেছে গল্প, ছোট কাগজের জন্য কবিতা, কখনো কখনো গানের মঞ্চেই অচেনা আবেগে করেছে আবৃত্তি।
অনেক পরে, যখন আমিও গাইতে এসেছি সবটুকু, ২০০৩-এ সঞ্জীব তার প্রথম অ্যালবামে গাইল সেই গান, ‘আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া/সন্ধানও করিয়া/স্বপ্নেরই পাখি ধরতে চাই/ স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই/আমি অন্তরেরই কথা বলতে চাই...’। টালমাটাল চারপাশে সঞ্জীব আমাদের বিশ্বাস করাতে চেয়ে বলল, ‘ওরা বলে, ট্রাকে করে ওরা আমাদের জন্য খাদ্য ও পানীয় নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, বন্ধুগণ, ওই ট্রাকে কোনো খাদ্য ও পানীয় ছিল না। ছিল ৩০০টি লাশ। নিয়ে যাচ্ছিল গুম করার জন্য...।’
অনিচ্ছুক এক ঘুম যেদিন সঞ্জীব চৌধুরীর চোখ বুজিয়ে দিল, নিজেরই গানটি সঞ্জীব গুনগুন করে গেয়েছিল কি? এখনো কি গায়? ‘ঘুম ভাঙা পথ/শেষ হতে বলো কত বাকি/ ভোর হবে বলে জেগে থাকি’।

আবারও যেন তৈলাক্ত বাঁশে ওঠারই অভিজ্ঞতা -সুশাসন by বদিউল আলম মজুমদার

নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস করা ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইন, ২০০৯’-এ অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সম্পর্কিত বিধান নিয়ে আমাদের পিছু হটার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোতে ‘এ যেন এক তৈলাক্ত বাঁশে ওঠারই অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যাপক মতবিনিময়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের অধীনে কতগুলো শর্ত সাপেক্ষে রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংযোজন করা হয়। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো হলো: কেন্দ্রীয়সহ দলের সর্বস্তরের কমিটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারণ; দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্তকরণ; দলের তৃণমূলের কমিটিগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রদান; দলের সর্বস্তরে নারীদের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি।
সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এসব শর্ত অমান্য করার কারণে দলের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস করা ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইন, ২০০৯’-এ নিবন্ধনের এসব শর্ত রাখা হলেও দুর্ভাগ্যবশত এগুলো না মানলে কমিশনের নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা রহিত করা হয়। তাই আমরা তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার মতো কিছুটা অগ্রসর হয়ে আবার যেন পিছু হটছি! এমন অভিজ্ঞতারই যেন আবারও পুনরাবৃত্তি ঘটেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে।
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৫ সালের ২৪ মে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি যুগান্তকারী রায় দেন। রায়ে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের আটটি তথ্য হলফনামা আকারে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সংগ্রহ করে তা ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তথ্যগুলো হলো: ১. সার্টিফিকেটসহ প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা; ২. বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে রুজু করা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগের তালিকা (যদি থাকে); ৩. অতীত ফৌজদারি মামলার তালিকা ও ফলাফল; ৪. প্রার্থীর পেশা; ৫. প্রার্থীর আয়ের উত্স ও উত্সসমূহ; ৬. অতীতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকলে জনগণের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার বর্ণনা; ৭. প্রার্থী ও প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের সম্পদ এবং দায়দেনার বর্ণনা এবং ৮. ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যক্তিগতভাবে বা যৌথভাবে এবং কোম্পানি কর্তৃক—যে কোম্পানিতে প্রার্থী চেয়ারম্যান, নির্বাহী পরিচালক কিংবা পরিচালক—গৃহীত ঋণের পরিমাণ ও বর্ণনা।
আরও স্মরণ করা যেতে পারে, রায়টি দেওয়ার পর সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিকের পক্ষ থেকে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিচারপতি এম এ আজিজের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রার্থীদের প্রদত্ত হলফনামার কপিগুলোও আমাদের দেওয়া হয়নি। বরং কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, রায়টি ‘ডিরেক্টরি’, ‘ম্যান্ডেটরি’ নয়। অর্থাত্ এটি মানা বাধ্যতামূলক নয়। তবুও গত জোট সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত পাঁচটি উপনির্বাচনে প্রার্থীদের দেওয়া যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে, তা সুজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্বেচ্ছাব্রতীরা ভোটারদের মধ্যে লিফলেট আকারে বিতরণ করে। একই সঙ্গে তিনটি নির্বাচনী এলাকায় ‘প্রার্থী-ভোটার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
ভোটারদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়নের এ প্রচেষ্টায় একটি বড় ধরনের আঘাত আসে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আবু সাফা নামের জনৈক ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি লিভ টু আপিল পিটিশন দায়েরের মাধ্যমে, যা ৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চে গৃহীত হয়। কয়েকটি কারণে লিভ টু আপিল পিটিশন গ্রহণের বিষয়টি ছিল অস্বাভাবিক। প্রথমত, আবু সাফা ছিলেন একজন তৃতীয় পক্ষ। তিনি মূল মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, মামলাটি শুনানিকালে বাদীপক্ষ কিংবা তাদের উকিলদের কেউই উপস্থিত ছিলেন না। এ ব্যাপারে তাদের জানানোও হয়নি। তবে শুনানির সময় আবু সাফা হাইকোর্টের রায়টির ওপর স্থগিতাদেশ প্রার্থনা করেন, যদিও সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ তা নামঞ্জুর করেন।
জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ভণ্ডুল করার সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনাটি ঘটে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের প্রাক্কালে ২০০৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ওই দিন আবু সাফার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের অবসরকালীন বেঞ্চের বিচারপতি মো. জয়নাল আবেদীন আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে আটটি তথ্য দেওয়ার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। এ স্থগিতাদেশটিও ছিল অস্বাভাবিক। প্রথমত, স্থগিতাদেশের শুনানিটি ছিল একতরফা এবং ‘কেভিয়েট’ দেওয়া থাকলেও মূল মামলার বাদীদের এ ব্যাপারে জানানো হয়নি এবং তাঁদের কৌঁসুলি আদালতে উপস্থিতও ছিলেন না। (কেভিয়েট দেওয়া থাকলে আইনসম্মত পদ্ধতি হলো, শুনানির সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং তাদের বক্তব্য শোনা।) দ্বিতীয়ত, আবু সাফা তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রকাশের ব্যাপারে আপত্তি জানালেও বিজ্ঞ বিচারপতি পুরো আটটি তথ্যসংবলিত হলফনামা জমা দেওয়ার ওপরই নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তৃতীয়ত, যদিও আবু সাফা তাঁর নিজের তথ্য দেওয়ার বিপক্ষে আদালতের শরণাপন্ন হন। বিচারপতি জয়নুল আবেদীন সব প্রার্থীর ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। উল্লেখ্য, অবিশ্বাস্য ধরনের ক্ষিপ্রতা দেখিয়ে নির্বাচন কমিশন একই দিনে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার হরণ করে।
প্রসঙ্গত, স্থগিতাদেশ প্রার্থনার আর্জিতে আবু সাফা দাবি করেন, তিনি স্বল্প শিক্ষিত কিন্তু বিত্তশালী ও সমাজকর্মে লিপ্ত স্থানীয়ভাবে একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। তিনি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ আসন থেকে একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং হলফনামার মাধ্যমে শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রকাশ করলে নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। তাই জনস্বার্থে তিনি আপিল করেন। পরবর্তী সময়ে আমরা সুজনের পক্ষ থেকে সন্দ্বীপে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি, আবু সাফা একজন প্রতারক, তাঁর পক্ষে আদালতে দেওয়া বক্তব্য সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং তিনি তাঁর জন্মস্থান সন্দ্বীপে বসবাসও করেন না। উল্লেখ্য, আবু সাফার সম্পর্কে প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘সুপ্রিম কোর্টে আবু সাফার আবেদন: সন্দ্বীপে তাঁর স্বজনেরা শুনে হেসেই খুন’। উল্লেখ্য, পরবর্তী সময়ে আপিলের চূড়ান্ত শুনানিকালে আবু সাফার আইনজীবীরা আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও তাঁকে হাজির করতে ব্যর্থ হন। তাই পুরো বিষয়টিই ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সঙ্গে একটি জঘন্য জালিয়াতি।
প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার হরণের আরেকটি চরম ঘটনা ঘটে প্রধান বিচারপতি জে আর মোদাচ্ছের হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চের ২০০৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দেওয়া একটি রায়ের মাধ্যমে। ওই দিন আদালত আবু সাফার প্রতিপক্ষের আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের যুক্তিতর্ক না শুনেই আপিলটি গ্রহণ করেন—অর্থাত্ হাইকোর্টের রায় খারিজ করেন—রায় দেন। পরবর্তী সময়ে ড. হোসেনের প্রবল আপত্তির মুখে এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর হস্তক্ষেপের ফলে আদালত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রায়টি নাটকীয়ভাবে প্রত্যাহার করেন।
পরবর্তী সময়ে অবশ্য প্রধান বিচারপতি এম রুহুল আমিনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ সর্বসম্মত রায়ে ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর আপিলটি খারিজ করে দেন। প্রতারণার কারণে এটি কোনো আপিলই হয়নি বলে রায় দেন। এ রায়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরপর গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশ জারি করে এ অধিকার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুজন এ ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত ‘স্থানীয় সরকার গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি’—বর্তমান লেখক যার একজন সদস্য ছিল—স্থানীয় সরকারের সর্বস্তরের নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে সুপারিশ করে। কমিটি সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর খসড়া তৈরি করে হলফনামা আকারে সাতটি তথ্য (সংসদ সদস্য হিসেবে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তা ব্যতীত) দেওয়ার বিধান এগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত যেসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়, সেগুলোতে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অনেকেরই স্মরণ আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট নয়টি পৌরসভা ও চারটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব প্রার্থীকে হলফনামার মাধ্যমে সাতটি তথ্য দিতে হয়। গত ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনেও চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের হলফনামা আকারে এসব তথ্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করতে হয়। সুজনের উদ্যোগে এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রার্থীদের প্রোফাইল তৈরি করে ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। আমাদের স্বেচ্ছাব্রতীরা সিটি করপোরেশন ও পৌর নির্বাচনের ১৩টি স্থানেই প্রার্থী-ভোটার মুখোমুখি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এসব উদ্যোগে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও চ্যানেল আই আমাদের সহযোগী ছিল। এসব অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক এবং এগুলো ভোটারদের জেনে-শুনে-বুঝে সত্, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সহায়তা করে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস করা উপজেলা আইনে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের বিধানটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদ সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইন পাস করে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এসব আইন থেকেও তথ্য দেওয়ার বিধানটি রহিত করা হয়। অর্থাত্ যে অধিকার ভোটাররা আগে ভোগ করেছিল, সে অধিকার তাদের থেকে হরণ করা হয়। নাগরিক হিসেবে আমরা এ ধরনের সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না।
উল্লেখ্য, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ২০০৩ সালে দেওয়া একটি ঐতিহাসিক রায়ে বলেন: ‘গণতন্ত্র যাতে গুণ্ডাতন্ত্র এবং উপহাস বা প্রহসনে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি জরুরি। বিভ্রান্তিমূলক তথ্য, ভুল তথ্য, তথ্যের অনুপস্থিতি—এসবই নাগরিকের অসচেতনতার জন্য দায়ী। আর এতে গণতন্ত্র গুণ্ডাতন্ত্র ও প্রহসনে পরিণত হতে বাধ্য।’ [পিইউসিএল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (২০০৩) ৪ এসসিসি]
আরও উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী আরেকটি রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে বাক্স্বাধীনতা তথা নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে দেখেন। আদালত ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া বনাম এডিআর [(২০০২) ৫ এসসিসি] মামলার রায়ে বলেন: ‘আমাদের গঠনতন্ত্র [অনুচ্ছেদ ১৯(১)(এ)] বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। নির্বাচনে ভোট দেওয়া ভোটারদের বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাত্ ভোটার সরব হয় বা মত প্রকাশ করে ভোটের মাধ্যমে। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্যপ্রাপ্তি অতি আবশ্যকীয়।’ আমাদের বিজ্ঞ আদালতও একই ধরনের মতামত প্রকাশ করেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, কারোরই নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করার এখতিয়ার নেই এবং আদালতের মাধ্যমে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব।
পরিশেষে এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের গণতন্ত্রের সংকটের একটি বড় কারণ আমাদের সর্বস্তরের অনেক নির্বাচিত প্রতিনিধির অযোগ্যতা ও অসততা। রাজনীতি আমাদের দেশে আজ যেন বহুলাংশে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের—স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত—গুণগত মানে পরিবর্তন আনা জরুরি। আর এ জন্য সর্বস্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া আবশ্যক, যাতে ভোটাররা নির্বাচনী বুথে তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে তথ্য দেওয়ার বিধানটি বাধ্যতামূলক করার জন্য আমরা জাতীয় সংসদের সদস্যদের সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাই। আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

প্রতিভার স্বীকৃতি চায় শিশুরা -শিশুশিক্ষা by আমিরুল আলম খান

ছোট্ট শিশু তৌসিফ। সে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হতে চায় সাতক্ষীরা সরকারি স্কুলে। সেখানে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার সুযোগ আছে। নামডাক আছে স্কুলটির। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার আগে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। তাই ভর্তির অনুমতি মেলেনি। তার মন খারাপ। মন খারাপ গোটা পরিবারের। বাবা ছুটে এসেছেন আমার কাছে। তাঁর ধারণা, আমি সুপারিশ করলে ছেলেটা ভর্তি হতে পারবে।
কাকে বলতে হবে? ডিসি সাহেবকে।
এখন সরকারি সব স্কুলের দায়িত্ব নিয়েছেন ডিসি সাহেবেরা। প্রধান শিক্ষকদের এখন করার কিছু নেই।
কী বলব তৌসিফের বাবাকে? বললাম, সুপারিশে কাজ হবে না। সন্তুষ্ট হতে পারলেন না তৌসিফের বাবা। তিনি বললেন, ছেলেটা আসলেই মেধাবী। লেখাপড়া ছাড়া আরও অনেক গুণ আছে তার। সে ভালো কবিতা আবৃত্তি করে, ভালো ক্রিকেট খেলে, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় উপজেলায় প্রথম স্থান পেয়েছিল। সুযোগ পেলে সে আরও ভালো করতে পারবে, স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করবে।
আমি তার বাবাকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করি। বলি, সাতক্ষীরায় পল্লীমঙ্গলের মতো ভালো স্কুল আছে। সেখানে ছেলেকে ভর্তির ব্যবস্থা করতে। বাবা খুশি হলেন না। তাঁর ইচ্ছা, সরকারি স্কুলেই ভর্তি হোক তৌসিফ।
প্রতিবছর আমাকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। কেউ না কেউ আসেন, তাঁর ছেলে বা মেয়েকে জেলা স্কুল বা সরকারি মাধ্যমিক স্কুল বা অন্য কোনো ভালো স্কুলে ভর্তির সুপারিশ করতে। তাঁদের ধারণা, আমার সুপারিশ রক্ষা করবে স্কুল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আসলেই সুপারিশে কোনো কাজ হয় না। তাদের অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। সুপারিশ মানলে ভালো ছেলে বা মেয়েকে বঞ্চিত করা হয় ভর্তির সুযোগ থেকে। তারা আমার কথা রাখতে পারে না। তাতে বরং আমি খুশিই হই। কেননা, একজন ভালো ছাত্র বঞ্চিত হোক, তা আমি কখনো চাই না।
কিন্তু তৌসিফের কথা আলাদা। সে শুধু মেধাবী নয়, ভালো আবৃত্তিকার, ভালো বক্তা, ভালো ক্রিকেট খেলোয়াড়।
তৌসিফের বাবা অবস্থাসম্পন্ন মানুষ। ছেলেকে মানুষ করার জন্য তিনি সবকিছু করতে রাজি। কিন্তু এতটুকু শিশুকে দূরে পাঠিয়ে তিনি ও তৌসিফের মা নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন কী করে? তাই তিনি ছুটে এসেছেন সাতক্ষীরা থেকে যশোরে। তদবির করাতে।
তৌসিফের ঘটনা আমাকে নানাভাবে ভাবিয়েছে। প্রথমত, এখনো সরকারি স্কুলের প্রতি মানুষের আস্থা আছে। দেশজুড়ে সরকারি ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে এত যে বিষোদ্গার, এর সব তাহলে সত্য নয়।
দ্বিতীয়ত, তৌসিফের বাবা যে কথাটা বলেছেন, তা হলো, তৌসিফ আর দশজন ভালো ছাত্রের চেয়ে আলাদা। তৌসিফ ভালো বক্তা। ভালো কবিতা আবৃত্তি করে, ভালো ক্রিকেট খেলে। সুযোগ পেলে সে আরও ভালো করতে পারবে। কিন্তু সে জন্য সে আলাদা কোনো ক্রেডিট পায়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এসব সহশিক্ষা কার্যক্রমের আলাদা কোনো মূল্যায়ন নেই। ভালো ছাত্রের একটাই সংজ্ঞা : তার স্মৃতি হবে প্রখর, সে দ্রুত মুখস্থ করতে পারে। পরীক্ষার খাতায় সে নির্ভুল লিখতে পারে। কিন্তু সে যে লেখে মুখস্থ বিদ্যা, সেখানে যে তার নিজস্ব চিন্তার কোনো প্রকাশ নেই—তার বিরুদ্ধে আমরা সবাই নীরব।
আমরা ধরেই নিয়েছি, শিশু আবার ভাববে কী? সে আবার নিজে লিখবে কী?
একবার আমি একজন কৃতবিদ্য অধ্যাপককে দেখেছিলাম। তিনি তাঁর ছয় বছরের ছোট মেয়েকে কিছু ফুলের নাম শেখাচ্ছিলেন। তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে তিনি কিছু ফুলের নাম লিখে দিচ্ছিলেন। আমি সেই অধ্যাপককে বলি, আপনি কি ওকে জিজ্ঞেস করে দেখেছেন, সে কোন কোন ফুল চেনে? তিনি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকান।
আমি এবার সেই শিশুটিকে বললাম, তুকি কী কী ফুল চেন? সে অন্তত ১০টি ফুলের নাম বলে গেল অবলীলায়। তার চেনা ফুল। তার শিশুমন যেসব ফুলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, সেসব ফুলের নাম।
অধ্যাপক মহোদয় হতোদ্যম হওয়ার পাত্র নন। তিনি বললেন, এসব বুনোফুলের নাম শিখলে সে কি পরীক্ষায় নম্বর পাবে?
আমি আরও অবাক হলাম। ওই অতটুকু শিশু, তাকে নিয়ে এখনই পরীক্ষা পাসের চিন্তা! বললাম, বেশ তো, ওকে আরও ফুল চেনার সুযোগ করে দিন। ওকেই ওর মতো করে ফুলের নাম লিখতে দিন। তাতে ওর নিজের ওপর আস্থা বাড়বে। কেবল আত্মবিশ্বাসী শিশুই বড় হতে পারে। তিনি এবার আমার ওপর রীতিমতো রুষ্ট হলেন।
দীর্ঘদিন ট্রেনিং কলেজে পড়িয়েছি। শিশু মনোবিজ্ঞান পড়িয়েছি শিক্ষকদের। মনে হয়, সে সবই শুধুই পুঁথিগত বিদ্যা। আমরা শিক্ষকেরা, অভিভাবকেরা একগাদা বই তুলে দিই শিশুদের কাঁধে। কিন্ডারগার্টেনগুলোয় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এত বইয়ের গাদা যে বহন করার সামর্থ্যই নেই এ বয়েসী শিশুর, তা কখনো ভাবি না। বইয়ের বোঝা টানতে টানতে বহু শিশুর মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাচ্ছে—এ কথা বলছেন চিকিত্সকেরা। কিন্তু তাতে কি? বেশি বই পড়া মানেই তো বেশি বেশি জানা, দিগ্গজ হওয়া! আমরা আমাদের সন্তানদের এরিস্টটল, আইনস্টাইন(!) বানাতে চাই। ইঁদুর দৌড়ে তাকে প্রথম হতেই হবে। নইলে সে শিকার হয় বাবা-মায়ের অশেষ লাঞ্ছনার!
২০০৮ সালে প্রায় দেড় শ শিক্ষার্থী নিজ স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে না পেরে নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিপদগ্রস্ত হয়। এর কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় অনেকের বাবা-মা তাদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেন। কাউকে কাউকে বাড়ি থেকেই বের করে দেন। লিখিতভাবে এসব তথ্য তারা দিয়েছিল তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে। শিশুদের প্রতি কী অমানবিক আচরণ! শুধু পরিবারের কাছে টিকে থাকার জন্যই তারা অবৈধভাবে পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে ধরা পড়ে।
আমাদের শিশুদের ওপর আমরা কী ধরনের মানসিক অত্যাচার করি, এটা এর একটা দৃষ্টান্ত মাত্র। আমাদের শিশুদের কোনো স্বাধীনতা নেই। শিশুর মেধা, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সামর্থ্য, রুচি—সবই আমাদের কাছে মূল্যহীন। আমরা ভালো ছাত্রের একটা সংজ্ঞাই কেবল জানি ও মানি: তাকে ক্লাসে প্রথম হতে হবে, সার্টিফিকেট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেতে হবে। এর বাইরে তার অন্য কোনো সাফল্য পিতামাতাকে খুশি করে না। খুশি করে না শিক্ষক বা প্রশাসকদেরও।
পরীক্ষায় শুধু দেখা হয়, সে কত মুখস্থ করতে পারে, তার কতটা সে উগরে দিতে পারে পরীক্ষার খাতায়। তার অন্য কোনো গুণ তার ভর্তির নিয়ামক হতে পারে—এটা যেন কেউ ভাবতেও পারি না। সে হয়তো ছবি আঁকতে পছন্দ করে, পছন্দ করে নাচতে, গাইতে। কিংবা পছন্দ করে খোলা আকাশের নিচে দৌড়ে বেড়াতে, নদীর জলে সাঁতার কাটতে। পারে সুন্দর করে ফুল সাজাতে, ঘর গোছাতে বা রান্না করতে। না, আমাদের অতি আধুনিক মা-বাবা-শিক্ষকদের কাছে শিশুদের এসব ইচ্ছা বা গুণ কোনোই যোগ্যতা নয়। তাঁরা চান, শিশুরা খেলা করে সময় নষ্ট করবে না, সারা দিনমান শুধু বই পড়বে, নোট গিলবে, পণ্ডিত হবে। এভাবে লেখাপড়া শিশুদের কাছে আবির্ভূত হয় এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক জীবনপ্রণালী হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন শিশুমনের এই যন্ত্রণা। তাঁর ডাকঘর নাটিকায় তিনি শিশুমনের এ আকুতির কথা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কে তার ধার ধারে! ডাকঘর তাই শিশুপাঠ্য বা অভিনয়োপযুক্ত শুধুই একটি নাটিকা! একে মান্য করা নিষ্প্রয়োজন! বার্নার্ড শ-এর একটি রচনা শিশুদের পাঠ্যতালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব করা হলে তিনি রাজি হননি। বরং জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি শিশুদের ওপর অত্যাচার করার মতো কিছু লিখেছি বলে তো মনে পড়ে না।’
আমরা শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে চাই। শিশুদের প্রতি আমরা কি সদয় হতে পারব?
আমিরুল আলম খান: শিক্ষাবিদ।
Amirulkhan570@gmail.com

সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে বিপত্তি -প্রশ্নপত্র বিক্রির পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের যেসব পরীক্ষা বিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে হয়, সেগুলোর প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের থাকা দরকার। অন্যের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র কিনে যখন কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেন, তখন শিক্ষক হিসেবে তাঁর পরীক্ষায় তিনি অযোগ্যতার প্রমাণ দেন। বিদ্যালয়ে কী মানের শিক্ষা দেওয়া হয়, সে বিষয়েও একটা ধারণা এ থেকে পাওয়া যায়।
সম্প্রতি প্রশ্নপত্র প্রণয়নের বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হয়েছে প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক ধ্যানধারণা প্রচারের প্রসঙ্গটি সামনে আসায়। একটি সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে দেশের প্রধান দুই নেত্রীর নাম ব্যবহার করে একজনের প্রতি অমর্যাদাকর ইঙ্গিত করা হয়েছে। আরেকটিতে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের প্রতি সহানুভূতিশীল বক্তব্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া কয়েকটি এলাকার প্রশ্নে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নিশ্চয় নিজস্ব রাজনীতি শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশই নিজেরা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেনি, বাইরে থেকে কিনে এনেছে।
এ ধরনের নিম্নমানের অথবা শিশুদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাসের মাধ্যমে যে শিক্ষকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকে, তিনিই ভালো জানেন তাঁদের শিক্ষার খোঁজখবর। শিক্ষার্থীর দুর্বলতা খুঁজে বের করে তাকে তা উত্তরণে সাহায্য করার দায়িত্ব তো ওই শিক্ষকের ওপরই পড়ে সবচেয়ে বেশি। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাই তাঁর সম্পৃক্ততা থাকা জরুরি।
আধুনিক প্রযুক্তি হাতের নাগালে চলে আসায় প্রশ্নপত্র প্রণয়নের নানা দিক এখন অনেক সহজ হয়েছে। ছাপার জটিলতা অনেক কমে গেছে। তাই আগে যেসব প্রতিষ্ঠান বাইরে থেকে প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা নিত, তাদেরও নিজেরা প্রশ্ন প্রণয়ন করার আর কোনো বাধা থাকা উচিত নয়।
তবে এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্ভবের দায় সরকারের ওপরও কিছুটা বর্তায়। শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও স্পষ্ট নির্দেশনা না দিয়ে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার উদ্যোগ কতটা সময়োপযোগী হয়েছে, সেটা ভেবে দেখা দরকার। প্রশ্নপত্র সরবরাহের যে ব্যবসা বিভিন্ন স্থানে চালু আছে, তা শিক্ষার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই এ ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে যে বিপত্তি দেখা দিয়েছে, তা অবসানে গত সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে আট দফা নির্দেশনা দিয়েছে, তা কঠোরভাবে পালিত হবে বলে আমরা আশা করি।

সক্রিয় আন্তর্জাতিক জঙ্গিরা -আঞ্চলিকভাবে সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন

জঙ্গি সমস্যার নতুন এক পর্বে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এত দিন সরকারিভাবে বলা হতো, বাংলাদেশের জঙ্গি তত্পরতা নিতান্তই স্থানীয় বিষয়, আন্তর্জাতিক জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াও তাঁর আমলে জঙ্গি দমন অনেকটা সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। গত রোববারের প্রথম আলোর সংবাদ জানাচ্ছে, একাধিক বিদেশি জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশে অবস্থান করে দেশ-বিদেশে নাশকতার পরিকল্পনায় লিপ্ত রয়েছে। সম্প্রতি ভারতীয় ও পাকিস্তানি কয়েকজন জঙ্গি নিরাপত্তা সংস্থার হাতে আটকও হয়েছে। এরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের অংশ। সুতরাং আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের সদস্য সংগ্রহের পশ্চাদ্ভূমি হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, কিংবা উপমহাদেশে তাদের প্রভাব বিস্তারের মঞ্চ হিসেবে বাংলাদেশের খোলামেলা পরিবেশকে তারা কাজে লাগাচ্ছে কি না, সেটা ভাবার বিষয়।
দুজন শীর্ষ জঙ্গিনেতার ফাঁসি কার্যকর এবং অনেকের আটক হওয়ার পর ভাবা হয়েছিল, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদী তত্পরতার হুমকি থেকে রেহাই পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, কেবল ডুবো পাহাড়ের ডগাটুকুই দৃশ্যমান, মূল দেহ রয়ে গেছে আড়ালে। সেই আড়ালের জগতে নানা জায়গায় তারা তাদের ঘাঁটি, প্রশিক্ষণের কেন্দ্র, যোগাযোগের কেন্দ্র, জাল মুদ্রার কারখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছে। দেশ থেকে প্রায় ২০০ জন জঙ্গি কর্মী ইরাক ও আফগানিস্তানে প্রেরিত হয়েছে বলে প্রথম আলোয় সংবাদ এসেছে। গত মঙ্গলবার ভারতের কলকাতায় তিন বাংলাদেশি জঙ্গি জাল টাকাসহ আটক হয়েছে। এর আগে ভারতের হায়দরাবাদ ও মুম্বাই শহরে নাশকতার ঘটনায় বাংলাদেশি জঙ্গিদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও উঠেছিল। সম্প্রতি ঢাকায় দুটি বিদেশি দূতাবাসে এদের হামলার পরিকল্পনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানে ধরা পড়ে এবং তা ঠেকানো হয়। সর্বশেষ পাকিস্তানি ও ভারতীয় জঙ্গিদের বাংলাদেশে সক্রিয় থাকার কথাও জানা গেল।
বাংলাদেশে ভারতীয় ও পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠকদের আনাগোনার একটি কারণ, সেসব দেশের চলমান জঙ্গিবিরোধী অভিযান। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে তারা তাদের আশ্রয়কেন্দ্র ও ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে থাকতে পারে। দ্বন্দ্বমুখর গণতন্ত্র এবং সমাজজীবনে নানা ভাঙাগড়া ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আবহে বাংলাদেশের মতো দেশে চরমপন্থী মনোভাব দানা বাঁধার সুযোগ রয়েছে। তবে সংঘবদ্ধ চক্র ছাড়া শক্তিশালী তত্পরতা চালানো কঠিন। বিশেষ করে ব্যাংক, হুন্ডি ইত্যাদির মাধ্যমে এরা বিদেশ থেকেও তহবিল পেয়ে থাকে। এ জন্য বিদেশ থেকে আসা অর্থের লেনদেনে সরকারি নজরদারি প্রয়োজন।
এ অবস্থায় সরকারসহ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি নতুন করে ভাবা দরকার। আন্তসীমান্ত জঙ্গি সমস্যা মোকাবিলায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ ও তথ্য আদান-প্রদানও জরুরি। জঙ্গি তত্পরতার বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক সমন্বিত কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। রাষ্ট্রীয় কোনো স্তর থেকে জঙ্গিরা যাতে সহায়তা না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে এসব ব্যবস্থা যাতে মানবাধিকার খর্ব না করে, সেই বিবেচনাও রাখা শ্রেয়।

জুনিয়র গলফ দল যাচ্ছে থাইল্যান্ড

বিশ্ব জুনিয়র গলফ প্রতিযোগিতায় খেলতে আজ থাইল্যান্ড যাচ্ছে বাংলাদেশের চার গলফার—ফাহাদ বিন তারিক, তাসবির হাসান মজুমদার, আরিফ মনসুর ও নিকিতা সরকার। ব্যাংককের রয়েল হুয়া হিন ক্লাবের গলফ কোর্সে অনূর্ধ্ব-১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী খেলোয়াড়দের এই টুর্নামেন্ট ২৬ নভেম্বর শুরু হয়ে চলবে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত।

এবার গেইলের প্রশস্তি

এ বছরই একবার এমনটা করেছেন ক্রিস গেইল। সিরিজের প্রথম টেস্ট শুরু হওয়ার আগের দিন যোগ দিয়েছিলেন দলের সঙ্গে। মে মাসে ইংল্যান্ড সফরের ওই ঘটনায় তীব্র সমালোচনা হয়েছিল তাঁর। একই ঘটনা ঘটল অস্ট্রেলিয়া সফরেও। এবার সবার মুখে গেইল-বন্দনা।
দুবারের কারণ যে ভিন্ন। ইংল্যান্ড সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়কের দেরির কারণ ছিল আইপিএল। আর এবার অসুস্থ মাকে দেখেই আবার ফিরছেন গেইল। দল নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েও অসুস্থ মাকে দেখতে জ্যামাইকায় ফিরে গিয়েছিলেন গেইল। সবাই যখন ধরেই নিয়েছিলেন প্রথম টেস্টটি মিস করছেন, তখনই গেইল ঘোষণা দিলেন প্রথম টেস্টের আগেই ফেরার। যাতে নিজ দেশে তো বটেই, প্রশংসা পাচ্ছেন প্রতিপক্ষেরও। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ও বর্তমান দুই সহ-অধিনায়ক শেন ওয়ার্ন ও মাইকেল ক্লার্ক প্রশস্তিতে ভাসিয়েছেন গেইলকে।
গেইলের মা হিজলিন গিলরয় গত শনিবার রাতেই হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছেন। এর পরই ব্রিসবেনে ফেরার ঘোষণা দেন গেইল, ‘আমি প্রচণ্ড খুশি যে মা বাড়িতে ফিরেছেন এবং চলাফেরা করতে পারছেন। পরিবারের সবাই এতে স্বস্তি পেয়েছে। আমি এখন অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে চাই, পূরণ করতে চাই দলের প্রত্যাশা।’
বৃহস্পতিবার থেকে প্রথম টেস্ট, আর গেইল ব্রিসবেন পৌঁছাবেন আজ রাতে। লম্বা ভ্রমণ—জেট লেগে কাবু হওয়ার সম্ভাবনা তাই ভালোমতোই আছে। কিন্তু গেইলকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে শেন ওয়ার্ন বলছেন, এটা তাঁর কাছে কোনো ব্যাপারই হবে না, ‘ও ভালোই থাকবে। ও এমন লোক নয় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উইকেটে পড়ে থাকবে। খেলবে নিজের মতোই, কাজেই একটা-দুটো নেট সেশন মিস করলে ওর এমন কিছু যাবে আসবে না।’ গেইলের প্রশংসা শোনা গেছে ক্লার্কের কণ্ঠেও, ‘তাঁর পারিবারিক এই সংকটে আমরাও সমবেদনা জানাচ্ছি। ও ফিরছে শুনে ভালো লাগছে। বিশেষ করে দর্শকদের জন্য এটা হতে যাচ্ছে দারুণ। ও হাত খুলে খেলে, বলকে গ্যালারিতে পাঠাতে ভালোবাসে। ও থাকলে দলের চেহারাটাই পাল্টে যায়।’
তবে সেই চেহারা পাল্টানোটা কি অস্ট্রেলিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো হবে? লিলি-ওয়ার্নের মতো সাবেকরা মোটেই তা মনে করেন না। শুধু অস্ট্রেলিয়ার সাবেকরা নন, সাবেক ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক ব্রায়ান লারাও এ মাসের শুরুতে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য কঠিন এক পরীক্ষা। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মূল স্ট্রাইক বোলার জেরোম টেলর মনে করছেন, ‘আন্ডারডগ’ তকমাটাই হবে আসল প্রেরণা, ‘অস্ট্রেলিয়ার দুর্দান্ত কিছু ক্রিকেটার আছে, কিন্তু ওরা অজেয় নয়। আমরা ঠিক করেছি, লড়াই করার আগে হারব না। আমরা আন্ডারডগ, কেউ আমাদের জয় আশা করছে না, চাপটা তাই অস্ট্রেলিয়ার ওপরই থাকবে।

অবসরের কথাও ভেবেছিলেন অঁরি

অনন্ত চাপ এসে ঘিরে ধরেছিল তাঁকে। চেপে বসেছিল একটা অভিমানও। এই চাপ আর অভিমান থিয়েরি অঁরির মনটাকে খুব বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন ফরাসি স্ট্রাইকার।
গত বুধবার বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফ ম্যাচে হ্যান্ডবল নিয়ে বিতর্ক অঁরির সহ্য হচ্ছিল না। সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে ফ্রান্সের সংসদ অধিবেশন—সব জায়গায় একই কথা, ‘হ্যান্ড অব অঁরি।’ অবসরই নিয়ে ফেলবেন কি না প্রশ্নে তাই ফরাসি দৈনিক লেকিপকে বলে ফেলেছিলেন, ‘ওহ্, হ্যাঁ।’ ‘শুক্রবার, বিষয়টা যখন অনেক ছড়িয়ে পড়ল, তখন আমি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম।’
অঁরির অবসর-চিন্তা এই প্রথম নয়। ‘এটাই প্রথম নয় (অবসর প্রসঙ্গ)। ২০০৬ বিশ্বকাপের পর অবসর নেওয়ার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু সেটি একটু আগেই হয়ে গিয়েছিল। ইউরো ২০০৮-এর পর ভেবেছিলাম, সেটাও সময়োপযোগী ছিল না। তখন একটা প্রজন্মেরই আমাকে দরকার ছিল’—বলেছেন অঁরি। ফ্রান্স ফুটবল অধিনায়ক আরও যোগ করেন, ‘এসব ঘটনা সত্ত্বেও সত্যিটা হলো এই, সবাই আমাকে হতাশ করেছে, কিন্তু আমি আমার দেশকে ছোট করতে পারি না।’ ওয়েবসাইট।
হাত দিয়ে বল থামানোর কথা স্বীকার করে নিয়েছেন অঁরি। আত্মপীড়ন থেকে একটা বিবৃতি দিয়ে জানান, আবারও ম্যাচ আয়োজনই এই বিতর্কের সঠিক সমাধান দিতে পারে। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা পর পরই জানিয়ে দিয়েছে এই ফলের কোনো নড়চড় হবে না। ফ্রান্সের পক্ষে সর্বোচ্চ গোল তাঁর, ১১৭ ম্যাচে করেছেন ৫১টি গোল। কিন্তু এই ঘটনার পর ফ্রান্সের ফুটবল ফেডারেশনের ওপর অভিমানই হয়েছিল অঁরির, কেননা পাশে পাননি তিনি ফেডারেশনকে, ‘ম্যাচের পর দিন এবং তার পর দিন, নিঃসঙ্গ বোধ করেছি, খুবই নিঃসঙ্গ। আমি একটি বিবৃতি দেওয়ার পরই কেবল এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তারা।’

ত্রিশঙ্কু অবস্থায় বার্সা-লিভারপুল

একটা দল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন। আরেকটা দল তিনবারের। বর্তমান চ্যাম্পিয়নও তারাই। এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে এই দুটি দলই এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থায়। প্রথম দলটি লিভারপুল, দ্বিতীয়টি বার্সেলোনা। লিভারপুলের জন্য নকআউট পর্বে উত্তরণের রাস্তাটা একটু বেশি দুর্গম। তুলনায় বার্সেলোনার একটু কম, তবে ১৯৯৩ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ নাম নেওয়ার পর থেকে এই প্রতিযোগিতার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া প্রথম চ্যাম্পিয়ন দলে পরিণত হওয়ার শঙ্কা ভালোই আছে তাদের।
বার্সেলোনা ‘এফ’ গ্রুপে আসলে তৃতীয় স্থানে। চার ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে ইন্টার মিলান শীর্ষে। রুবিন কাজানের সঙ্গে সমান ৫ পয়েন্ট নিয়েও বার্সা পেছনে, কেননা, দু দলের দুই ম্যাচ থেকে রুবিন কাজান পেয়েছে চার পয়েন্ট। এর মধ্যে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক অর্জন, বার্সাকে তাদের মাঠে হারিয়ে পাওয়া ৩ পয়েন্ট। মুখোমুখি ম্যাচের ফল অনুযায়ী সদ্য রুশ লিগজয়ী কাজানই এগিয়ে। আজ ন্যু ক্যাম্পে ইন্টার মিলানের সঙ্গে তাই বার্সেলোনার অগ্নিপরীক্ষা। এ ম্যাচে যদি তারা হারে আর কাজান যদি নিজেদের মাঠে হারিয়ে দেয় ডায়নামো কিয়েভকে, তাহলেই বার্সেলোনার স্বপ্ন শেষ।
ইন্টার মিলানে নাম লেখানোর পর আজই প্রথম ন্যু ক্যাম্পে ফিরছেন স্যামুয়েল ইতো। কিন্তু আজ কি তিনিই ‘শত্রু’ হয়ে শেল বেঁধাবেন পেপ গার্দিওলার দলের বুকে? ম্যাচ শেষেই এর উত্তর মিলবে। তবে বার্সেলোনার অবস্থা খুব সঙ্গিন। স্প্যানিশ লিগে শেষ ম্যাচটা অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের সঙ্গে ড্র করে প্রথমবারের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে তুলে দিয়েছে তারা পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। শুধু পয়েন্ট হারানোতেই দুর্ভাগ্যের শেষ হয়নি বার্সার, ইনজুরিও কুড়িয়ে পেয়েছে ওই ম্যাচে। দলের ‘প্রাণভোমরা’ লিওনেল মেসি চোট পেয়েছেন উরুর পেশিতে। ইন্টারের সঙ্গে ঘরের মাঠের ম্যাচটায় খুবই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছেন ‘আর্জেন্টাইন চ্যাম্পিয়ন’। আগামী সপ্তাহে লা লিগার ‘এল ক্লাসিকো’য় খেলতে পারাও পড়ে গেছে সংশয়ের আবর্তে। কোচ গার্দিওলা বলেছেন, ‘মেসি সম্পর্কে প্রথম কথাটাই যা বলতে পারি তা হলো সে ভালো নেই।’ যদিও বার্সেলোনার ক্রীড়া দৈনিক ক্লাবের ডাক্তারদের উদ্ধৃত করেছে এভাবে, ‘আমরা ইন্টারের সঙ্গে মঙ্গলবারের ম্যাচে তার (মেসি) খেলার সম্ভাবনাটা নাকচ করে দিচ্ছি না।’ শুধু মেসিই তো নন, বার্সেলোনা দলটাই এখন ইনজুরি-জর্জর। ইন্টার থেকে এবার এসেই বার্সেলোনার অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠা স্ট্রাইকার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের পায়ে চোট, তাঁর খেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা এরিক আবিদাল ও ইয়াইয়া তোরের সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়া, রাফায়েল মার্কেজের শরীরেও দেখা দিয়েছে সোয়াইন ফ্লুর লক্ষণ। সেন্টার ব্যাক জেরার্ড পিকেও রয়েছেন ইনজুরিগ্রস্তদের তালিকায়। একটা দল নামানোই কঠিন হয়ে পড়েছে বার্সেলোনার জন্য। এই গ্রুপে সবার নিচে থাকা ডায়নামো কিয়েভও (৪ পয়েন্ট) কিন্তু প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যায়নি। আজ রুবিন কাজানের সঙ্গে তাদের ম্যাচের ফলটাও তাই মাথায় রাখতে হচ্ছে চ্যাম্পিয়নদের।
লিভারপুলের ভাগ্য এখন পুরোপুরিই অন্যের হাতে। বুদাপেস্টের ফেরেঙ্ক পুসকাস স্টেডিয়ামে হাঙ্গেরির চ্যাম্পিয়ন দেব্রেসেনির সঙ্গে আজ তাদের জিততে হবেই। ‘ই’ গ্রুপে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা তৃতীয় স্থানে, শীর্ষে থেকে এরই মধ্যে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলা ফ্রান্সের লিওঁর হাতে ১০ পয়েন্ট, দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফিওরেন্টিনার ৯। আজ লিওঁতে গিয়ে যদি ম্যাচ জিতে নেয় ফিওরেন্টিনা, তাহলেই শেষ লিভারপুলের এবারে চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিযান। লিওঁ যদি জেতে, আর নিজেরা জয়ে ফিরতে পারে তাহলেই গাণিতিকভাবে বেঁচে থাকবে ‘অল রেড’দের নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন। চির আশাবাদী লিভারপুল কোচ রাফায়েল বেনিতেজ তবু বিশ্বাস হারাচ্ছেন না, ‘আমার এখনো বিশ্বাস, আমরা শেষ ষোলতে যাব। আমরা জানি আমরা যা চাই তা পাই।

আমি খুবই হতাশ

৩০ নভেম্বরের পর আর জাতীয় দলের ফিল্ডিং কোচ থাকবেন না মোহাম্মদ সালাউদ্দিন—খবরটা কোচ জেমি সিডন্স শুনেছেন বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর। টেলিফোনে প্রথমে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানাতে চাইলেও পরে বললেন, ‘আমি খুবই হতাশ। আমার দলের স্টাফদের মধ্যে সালাউদ্দিনই একমাত্র স্পিন কোচ। সালাউদ্দিনকে দল থেকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়নি। আর ও তো শুধু কোচ নয়, খেলোয়াড়দের মেন্টরও (গুরু)।’
বোর্ড বলছে, সালাউদ্দিনের কাজে সন্তুষ্ট না বলেই চুক্তি বাড়ানো হয়নি তাঁর। কিন্তু সালাউদ্দিনের কাজ সবচেয়ে কাছ থেকে যিনি দেখেছেন, সেই সিডন্স বলছেন, ‘আমি তার কাজে শতভাগ সন্তুষ্ট। ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর জিম্বাবুয়ে সিরিজে আমাদের ফিল্ডিং খুবই ভালো হয়েছে।’
সালাউদ্দিনের কাজে যদি এতই সন্তুষ্ট হন, তাহলে তাঁর চুক্তি নবায়নের সিদ্ধান্তে কেন কোনো ভূমিকা রাখলেন না কোচ? এই জায়গায় চমকে যাওয়ার মতো কথাই বললেন সিডন্স, ‘আমার সঙ্গে এ সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারেই কেউ কোনো আলোচনা করেনি।’
সালাউদ্দিনকে বাদ দেওয়ায় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরও অনেকেই খুব মন খারাপ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বললেন, ‘আমরা সবাই-ই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হলাম।’

বন্ড-আসিফের ফেরার টেস্ট

পাকিস্তান না নিউজিল্যান্ড, ব্যাটসম্যান না বোলার—কাদের হবে ডানেডিন টেস্ট? উত্তরটা জানা যাবে ম্যাচ শেষেই। তবে শুরুতেই এটিকে নিজেদের দাবি করতে পারেন দুই বোলার নিউজিল্যান্ডের শেন বন্ড ও পাকিস্তানের মোহাম্মদ আসিফ। ভিন্ন ভিন্ন কারণে প্রায় দুই বছর মাঠের বাইরে থাকার পর দুজনই ফিরছেন এই ডানেডিন টেস্ট দিয়ে!
বাক্যটার শেষে আশ্চর্যবোধক চিহ্নটা রেখে দেওয়ার কারণ, আইসিএল-ফেরত বন্ডের এই টেস্টে খেলাটা নিশ্চিত হলেও আসিফের ফেরাটা এক শ ভাগ নিশ্চিত নয়। আইপিএলের ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার সাজা (এক বছরের নিষেধাজ্ঞা) এবং দুবাই বিমানবন্দরে মাদকসহ ধরা পড়ার কারণে এত দিন ক্রিকেটের বাইরে, এ কারণে আসিফকে নামিয়ে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নাও নিতে পারে পাকিস্তান।
বোলাররাই নিয়ন্ত্রক হবে ম্যাচের, সাধারণ ধারণাটা এমনই। গ্রীষ্মের শুরুতে এমনিতেই ঠান্ডা থাকে নিউজিল্যান্ডে। তার ওপর দু দলেরই মূল শক্তি বোলিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কি দেশে কি দেশের বাইরে, টেস্টে রানের জন্য লড়াই করতে হয়েছে কিউই ব্যাটসম্যানদের। ব্যাটিং শক্তি বাড়াতে মাত্র চার বোলারকে একাদশে রেখেছে তারা। ম্যাচের আগের দিন অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি স্বীকারও করেছেন, ‘সত্যি বলতে কি আমাদের ব্যাটিংটা আশানুরূপ ভালো নয়।’ দলের দুশ্চিন্তা যে ব্যাটিং বন্ডও তা মানছেন, ‘সত্যিই আমাদের রানের দরকার। টেস্ট জিততে চাইলে বড় রানেরই প্রয়োজন বলে মনে করি আমি।’
পাকিস্তানের দুশ্চিন্তাও ব্যাটিং নিয়ে। ম্যাচে ২০ উইকেট নেওয়ার মতো বোলিং পাকিস্তানের আছে, এটা জানিয়ে পাকিস্তান কোচ ইন্তিখাব আলম বলেছেন, ‘ব্যাটিংই উদ্বেগের বিষয় হওয়ায় খুব সতর্ক থাকতে হবে আমাদের।’
তবে অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফই দলের স্বস্তির একটা বড় কারণ। তাঁর ক্যারিয়ার-গড় যেখানে ৫৪.৮৬, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ৬৯.৭১। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটাও পেয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডে। হঠাত্ করে পাওয়া নেতৃত্বটা ব্যাটিংয়ে ইউসুফকে আরও দায়িত্বশীল করবে বলে পাকিস্তানের আশা। এই আশাটাই আবার আশঙ্কা নিউজিল্যান্ডের। ‘তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে ভয়ঙ্কর। তাদের বোলিং আক্রমণে আছে ভারসাম্য এবং তাদের আছে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম গ্রেট ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ ইউসুফ’—বলেছেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক ভেট্টোরি।
বন্ড ও আসিফের ফেরার সিরিজটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে আরও একটি কারণে। এই সিরিজ দিয়েই রেফারেল পদ্ধতি চালু হচ্ছে নতুন নিয়মে। আগে তিনটি করে রেফারেল চাইতে পারত দু দল। এখন ইনিংসে দুবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আগ পর্যন্ত মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে দুই দল।

জাতীয় দলে সালাউদ্দিন-বিয়োগ

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের দ্বাদশ সভা মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে দিল বড় এক দুঃসংবাদ। জাতীয় দলের ফিল্ডিং কোচ হিসেবে তাঁর চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। সালাউদ্দিনের জায়গায় জাতীয় দলের আপত্কালীন ফিল্ডিং কোচের কাজ করবেন একাডেমির শ্রীলঙ্কান হেড কোচ রুয়ান কালপাগে।
সভার মাঝখানে গতকাল বিকেলে সংক্ষিপ্ত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস বলেছেন, ‘সালাউদ্দিনের মেয়াদ আগামী ৩০ নভেম্বর শেষ হবে, এর পর আর মেয়াদ বাড়ানো হবে না তাঁর। তাই বলে এমন নয় সালাউদ্দিন আর বোর্ডের সঙ্গে নেই। তাঁকে অন্য অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে।’ ফিল্ডিং কোচ হিসেবে সালাউদ্দিনের কাজে বোর্ড সন্তুষ্ট বলেই এই সিদ্ধান্ত—জানিয়েছেন জালাল ইউনুস। কালপাগে মূলত স্পিন বোলিং কোচ। বিসিবি আশাবাদী, ফিল্ডিং কোচ হিসেবেও কাজ করতে পারবেন তিনি। তবে জালাল ইউনুস বলেছেন, খুব দ্রুতই দক্ষিণ আফ্রিকা বা অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন ফিল্ডিং কোচ আনা হবে।
বিসিবির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বেশি কিছু বলার নেই সালাউদ্দিনের। টেলিফোনে জানানো প্রতিক্রিয়ায় শুধু বলেছেন, ‘আমি বোর্ডে চাকরি করি। বোর্ড যেখানে ভালো মনে করবে, সেখানেই কাজ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করব।’ ২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে জাতীয় দলের সঙ্গে আছেন সালাউদ্দিন। তাঁর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো না হলেও সভায় জাতীয় দলের কোচ হিসেবে জেমি সিডন্সের মেয়াদ ২০১১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সময় পর্যন্ত জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন খালেদ মাহমুদও। জাতীয় দল নির্বাচকদের মেয়াদ ২০১০ সালের ৩০ জুন পর্যন্তই। নির্বাচকদের বেতন-ভাতার ব্যাপারে বিশেষ কমিটির সুপারিশ কালই অনুমোদন না করে এ ব্যাপারে আরও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভা শেষে জানানো হয়েছে, আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাসে বাংলাদেশ সফর করবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ‘এ’ দল। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সঙ্গে ডাবল লিগ ভিত্তিতে একটা তিন জাতি সিরিজ খেলবে তারা। এ ছাড়া সফরকারী দুটি ‘এ’ দলের সঙ্গেই দুটি করে চার দিনের ম্যাচ আছে।
বিসিবির কালকের এই সভা শুরু হয়েছিল দুপুর ১২টার দিকে। কিন্তু বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে শুরু সংক্ষিপ্ত সংবাদ ব্রিফিংয়েও বলার মতো আর বেশি কিছু পেলেন না জালাল ইউনুস। সূত্র জানিয়েছে, সভার শুরুর দিকেই আলোচ্যসূচির বাইরের কিছু বিষয় চলে আসে এবং সেসব নিয়ে দীর্ঘ সময় উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। স্বয়ং বোর্ড সভাপতির তোলা এসব আলোচনার বেশির ভাগই ২০১১ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি-সংক্রান্ত। বিশ্বকাপ সামনে রেখে উন্নয়ন ও ক্রয় কর্মকাণ্ড দেখভালের জন্য পাঁচ সদস্যের একটা পর্যবেক্ষক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে সভায়।
শ্রীলঙ্কা ও ভারতকে নিয়ে আগামী জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় তিন জাতি সিরিজের টিকিটের দামও চূড়ান্ত হয়েছে কাল। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় সিরিজের প্রথম ছয় ম্যাচে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ২০০ টাকা, ফাইনালে যা হবে ৩০০ টাকা। স্পেশাল এনক্লোজার লিগ ম্যাচে ৪০০ টাকা এবং ফাইনালে ৫০০ টাকা, ক্লাব হাউসের টিকিট লিগ ম্যাচে ৫০০ টাকা এবং ফাইনালে ৬০০ টাকা করে। আর ভিআইপি গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের টিকিট লিগ ম্যাচে ২ হাজার টাকা এবং ফাইনালে আড়াই হাজার টাকা করে। চূড়ান্ত হয়েছে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-ভারত দুই টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের টিকিটের দামও—গ্যালারি ১০০ টাকা, স্পেশাল এনক্লোজার ২০০ টাকা, ক্লাব হাউস ৩০০ টাকা এবং ভিআইপি গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড ১ হাজার টাকা।
সবকিছুর পর কালকের সভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত বলতে হবে, জাতীয় দলের সঙ্গে মিশে যাওয়া মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে ছেঁটে ফেলাই।