Friday, January 16, 2026

ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’ নিয়ে গাজাবাসী কী ভাবছে

গাজাবাসীর কাছে ‘শান্তি’ এখন শারীরিক বা মানসিক—উভয় অর্থেই সুদূরপরাহত এক বিষয়। গত ১০ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে প্রায়ই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় গত তিন মাসে নতুন করে ৪৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

শুধু হামলা নয়, অবরোধ আর বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজার জনজীবন বিপর্যস্ত। এমন ক্লান্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির ‘দ্বিতীয় ধাপ’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, এই ধাপের লক্ষ্য হলো গাজাকে নিরস্ত্রীকরণ, একটি দক্ষ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পুনর্গঠন শুরু করা।

এই নতুন ব্যবস্থায় একটি ফিলিস্তিনি ‘টেকনোক্র্যাট’ (বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত) প্রশাসন থাকবে, যা তদারকি করবে আন্তর্জাতিক ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি বোর্ড। এই বোর্ডের প্রধান হিসেবে থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

কাগজে–কলমে ভালো হলেও বাস্তবে সংশয়

কাগজে-কলমে এই পরিকল্পনা শুনতে ভালো মনে হলেও গাজার মানুষের মনে রয়েছে গভীর সংশয়। কারণ, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে তারা যে ভয়াবহ হামলা ও ধ্বংসলীলা দেখেছে, তাতে তারা কোনো কিছুকেই সহজে বিশ্বাস করতে পারছে না।

গাজা সিটির সাংবাদিক ও লেখক আরওয়া আশুর বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের অনেক সিদ্ধান্তই গাজার বাস্তবতার চেয়ে অনেক দূরে। আমাদের প্রতিদিন কাটে অবরোধ, ভয়, মৃত্যু আর তাঁবুর ভেতর। যখনই কষ্টের লাঘব করার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাতে বাধা দেয়।’

আশুর আরও বলেন, ‘মানুষ আগের মতো স্কুল, হাসপাতাল আর অবাধে যাতায়াতের সুযোগ চায়। যদি এই ‘শান্তি বোর্ড’ এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে, তবে আমরা একে স্বাগত জানাই। কিন্তু তারা যদি তা না পারে, তবে এর লাভ কী?’

ফিলিস্তিনিদের বাদ দিয়ে কি সমাধান সম্ভব

দীর্ঘ ১৮ বছরের হামাস শাসন এবং দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর গাজার মানুষ পরিবর্তন চায়। তবে তারা চায় নিজেদের ভবিষ্যৎ গঠনে নিজেরা অংশ নিতে, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিনের প্রশাসনিক কাজ সামলাবে সাবেক উপমন্ত্রী আলী শাথের নেতৃত্বাধীন একটি ফিলিস্তিনি কমিটি। তবে এই কমিটির ওপর নজরদারি করবে ‘শান্তি বোর্ড’, যার নেতৃত্বে থাকবেন বুলগেরিয়ার সাবেক মন্ত্রী নিকোলে ম্লাদেনভ। ম্লাদেনভ অভিজ্ঞ কূটনীতিক হলেও তিনি ইসরায়েলের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন বা ফিলিস্তিনিদের অধিকার কতটা রক্ষা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

মানবাধিকারকর্মী মাহা হুসাইনি বলেন, ‘গাজায় যাদের জীবন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, তাদের বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই হলো সেই পুরোনো শাসনকাঠামো ফিরিয়ে আনা, যা এই দখলদারত্ব আর গণহত্যাকে প্রশ্রয় দিয়েছে।’

রাজনৈতিক জটিলতা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ ফাইয়াদ মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের সামনে ম্লাদেনভ বা এই শান্তি বোর্ডের মডেল মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) বা আরব দেশগুলোর কেউ এখন এই চুক্তি নষ্ট করতে চায় না। তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ইসরায়েলও চায় না গাজা কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাক। ফাইয়াদ বলেন, ‘ইসরায়েল চায় গাজা যেন শুধু একটি অস্ত্রহীন এলাকা হয়ে থাকে এবং সেখানকার মানুষ রাজনৈতিক অধিকারের কথা ভুলে গিয়ে শুধু প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়েই ব্যস্ত থাকে।’

গাজার বর্তমান জীবন

গাজা সিটির ৩০ বছর বয়সী কম্পিউটার প্রোগ্রামার সামি বালুশা বলেন, তাঁর কাছে শান্তির মানে খুব সহজ—রাতে নিরাপদে ঘুমানো এবং সকালে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা। যুদ্ধের কারণে তাঁকে ১৭ বার ঘরবাড়ি বদলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালাতে হয়েছে।

সামি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে শোনে না। আমার ভয় হয়, আগামী প্রজন্ম হয়তো এই নরকতুল্য জীবনটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেবে। মানুষ এখন বড্ড ক্লান্ত। তারা শুধু এই দুর্দশার অবসান চায়, তা যেভাবেই হোক।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-16%2Ffc9as5ls%2Fgaza1.JPG?rect=68%2C0%2C5081%2C3387&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় দেইর আল–বালাহর আল–আকসা মার্টারস হাসপাতালে। ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, মধ্য গাজা। ছবি: রয়টার্স

সিঙ্গাপুরের দ্রষ্টা–স্রষ্টা লি কুয়ান থেকে আমরা কী শিখব by হেলাল মহিউদ্দীন

কয়েক বছর আগের কথা। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের নেতাদের মধ্যে ‘বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হয়ে গেছে’ বা ‘সিঙ্গাপুরকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে’ ধরনের ভাষ্য বেশ জোরদার হয়ে উঠেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ–সংক্রান্ত আলাপের সরগরমের মধ্যেই কোনো একজনের ফেসবুক পোস্টে একটি মন্তব্য করেছিলাম—‘সিঙ্গাপুর একটি দুর্ভাগা দেশ। দেশটির ঐতিহাসিক স্বাধীনতা দিবসও নেই, বিজয় দিবসও নেই। যা আছে, সেটি হচ্ছে “ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া” দিবস।’

অনেকেই মন্তব্যটির ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। প্রত্যুত্তরে লিখেছিলাম, ‘শুধু ব্যাখ্যাই নয়, আমাদের বিজয় ও স্বাধীনতার ব্যর্থতা মূল্যায়নের একটি অত্যন্ত দরকারি আলাপ আকারেই উক্তিটি হাজির করব। আমাদের দুটি দিবস আছে। দুই দিবসেই আমরা চাওয়া-পাওয়া, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কথাগুলো বলার, নিজেদের মূল্যায়ন করার সুযোগ পাই। সিঙ্গাপুরে বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস না থাকায় তাদের মূল্যায়নের আনুষ্ঠানিক কোনো দিনও নেই; কিন্তু সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউর মাত্র তিনটি নীতিমালা নিলেই আমরা সত্যিই হয়তো সিঙ্গাপুর হয়ে উঠতে পারতাম।

‘ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া’ কথাটি আমার নয়, খোদ সিঙ্গাপুরের দ্রষ্টা-স্রষ্টা নির্মাতা লি কুয়ান ইউর।

সাংবাদিকেরা বা বিদেশিরা মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরের ‘সিসেশন’ বা ‘সেপারেশন’ বা বিভক্তি হয়েছে বললে তিনি মনে করিয়ে দিতেন—না না না, বিভক্তি হয়নি, আমাদের বের করে দেওয়া হয়েছে (নট সিসিডেড, উই আর এক্সপেলড)। বের করে দেওয়া নিয়ে তাঁর হীনম্মন্যতা ছিল না; বরং সত্য বলাটাই সততা—বিশ্বাস করতেন। ইতিহাস তো ইতিহাসই!

১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়ার সংসদে আইন করে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেওয়ার পর লি কুয়ান ইউ বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর কান্নার বাঁধভাঙা আইকনিক ছবিটি অনেকেই দেখে থাকবেন। (খুঁজলে ছবিটি অনলাইনে এখনো পাওয়া যেতে পারে। টিভি ফুটেজও ইউটিউবে থাকার কথা।) মধ্য ষাটের দশকে মালয়ি-প্রধান মালয়েশিয়ার সঙ্গে সিঙ্গাপুরের অমালয়ি চীনা বংশোদ্ভূতরাসহ সংখ্যালঘু তামিল অধিবাসীদের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক পরিচিতির কারণে পিছিয়ে পড়া, এবং কেন্দ্রের দ্বারা প্রান্তের শোষিত হওয়া এবং অন্যান্য বৈষম্যের কারণে দ্বন্দ্ব বাড়ছিল। ১৯৬৪ সালে একটি সাংস্কৃতিক দাঙ্গাও হয়েছিল।

তুলনায় নিলে অবাক হওয়ার বিষয়, মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর দ্বন্দ্ব পরিস্থিতি এবং পশ্চিম পাকিস্তান-পুর্ব পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল। দ্বন্দ্বগুলো তেজি হওয়ার ঘটনাও সমসাময়িক (মধ্য ষাট), সিঙ্গাপুরে যেমন মধ্য ষাটে, বাংলাদেশেও। বৈষম্য, বঞ্চনা, কেন্দ্র দ্বারা প্রান্তের শোষণ ও রাজনৈতিক হিস্যায় কমতি ইত্যাদি। মালয়েশিয়া সংসদে আইন করে সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে দিল। ভাবসাব, ‘যা বাবা, অত মারামারি, ঝুটঝামেলা, বৈষম্যের অনুযোগ-অভিযোগ নিয়ে একসঙ্গে থাকতে হবে না! যা আলাদা হয়ে যা।’

আলাপটি মোড় ঘুরে অন্যদিকে চলে যাওয়ার আগে লি কুয়ান প্রসঙ্গে ফিরি। লি কুয়ান কেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, তাঁর কাছ থেকে কী শেখার ছিল, আমরা কেন না শিখে ঠিক উল্টো পথেই হাঁটলাম, সেই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা দরকার।

লি কুয়ান রাষ্ট্রসংস্কারে নামলেন। সংস্কার এলে পুনর্গঠন হবেই। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বেশ কিছু নীতিমালা করলেন। নীতিমালাগুলোর তিনটির বিষয়ে ন্যূনতম ছাড়ও দেননি। সেই অন্যতম তিনটি নীতিমালা বাংলাদেশ অনায়াসেই অনুসরণ করতে পারত। কারণ, ১৯৭১ সালে বিজয়ের পরপরই দেখার সুযোগ ছিল মাত্র ছয় বছরে সিঙ্গাপুর কোথায় গিয়ে পৌঁছাল, কীভাবে পৌঁছাল! সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের চালকেরা সামান্য ভিশনারিও যদি হতেন, সিঙ্গাপুর থেকে শিখতেন।

লি কুয়ানের যুদ্ধ ঘোষণার মতো তিন নীতিমালার একটি বিষয়ে তাঁর উদ্ধৃতি—ইফ ইউ ওয়ান্ট টু বিট করাপশন, বি প্রিপেয়ার্ড টু জেল ইয়োর ফ্রেন্ডস (যদি আপনি দুর্নীতিকে হারাতে চান, তবে নিজের বন্ধুদের জেলে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত থাকুন।) দুর্নীতির বেলায় ‘জিরো টলারেন্স’ তিনি শুধু কথার কথাই রাখেননি। সত্যিকারের প্রয়োগও ঘটিয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, তারই মন্ত্রিপরিষদের ডাকসাইটে মন্ত্রী আত্মগ্লানিতে আত্মহত্যা করেছিলেন। তিনি বন্ধুকে রক্ষায় দাঁড়াননি। কারণ, বন্ধুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলছিল।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালাটি ছিল—যেকোনো মূল্যে নির্বাহী বিভাগকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের চাপ থেকে শতভাগ মুক্ত করে দিয়ে মেধানির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তিনি দেখালেন, কীভাবে সত্যিকারের মেরিটোক্র্যাসির (মেধাতন্ত্রের)চর্চা হয়। কীভাবে সবচেয়ে মেধাবী, দক্ষ, সৎ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষিতজনকে দিয়ে দেশ গড়ে তুলতে হয়। প্রধানমন্ত্রীরও যেন সব সময়ের জন্য জানা থাকে—একটি সুশৃঙ্খল অরাজনৈতিক প্রশাসনের নিয়মসিদ্ধ কার্যক্রমের বেলায় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের কানাকড়ি দামও থাকবে না।

‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্লড টু ফার্স্ট’ আত্মজীবনীটি ছাড়াও তাঁর নির্বাচিত সাক্ষাৎকারগুলোর সংকলন রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তাঁর একটি উক্তি আছে যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘একবার যদি আপনি সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যকে মানদণ্ড হিসেবে অনুমোদন করেন, তাহলে আপনি রাষ্ট্রকেই ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবেন।’ ১৯৭০ সালে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘সরকার আসবে ও যাবে। সিভিল সার্ভিসকে অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।’ তিনি লিখেছিলেন, ‘যদি আপনি যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য দেখে লোক নিয়োগ দেন, তবে পুরো ব্যবস্থাটি পচে যাবে।’

লি কুয়ান থেকে শিক্ষণীয় তৃতীয় শক্তিশালী নীতিমালা, ‘একটি দেশ পারিবারিক ব্যবসা নয়।’ রাষ্ট্রে পরিবার ঢোকানো যাবে না। তাহলে সেটি হয়ে পড়বে প্যাট্রিমোনিয়াল স্টেট, শেষ বেলায় স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বলেছিলেন, ‘যদি আমার ছেলে অযোগ্য হয়, তবে তাকে অন্য যে কারো মতোই পদচ্যুত করতে হবে। আরেকবার বলেছিলেন, ‘যে মুহূর্তে আপনার পরিবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে, সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্র শেষ হয়ে যাবে।’

লি কুয়ানের ছেলে লি সিয়েন ল্যুংও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন; কিন্তু সেটি মোটেও উত্তরাধিকারের রাজনীতির মাধ্যমে ঘটেনি। লি সিয়েন বহু বছর সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও মন্ত্রিসভায় নানা পর্যায়ে ও ধাপে কাজ করেছেন। কাউকে ডিঙিয়ে তাঁর প্রমোশন হয়নি। ক্ষমতায় আসার আগে তাঁকে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে দলীয় কাঠামো ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গিয়েই প্রধানমন্ত্রী হতে হয়েছিল।

লি কুয়ান উইল করে গেলেন, যাতে তাঁর মৃত্যুর পর অক্সলি রোডের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। কারণ, বাড়িটি যেন কোনোভাবেই ‘রাজনৈতিক স্মৃতিসৌধ’ বা পারিবারিক ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠতে না পারে। স্বভাবতই তাঁর সন্তানদের মধ্যে উইলটি নিয়ে মতভেদ তৈরি হয় তাঁর উইলকালে এবং জীবদ্দশাতেই। তবুও লি কুয়ান ইউ নিজের অবস্থান বদলাননি। তাঁর ভাষ্য ছিল, ‘ব্যক্তিগত স্মৃতি রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে উঠলে, রাজনীতি আবেগবন্দী হয়ে পড়ে।’

১৯৭১ সালের বিজয়-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের চিত্র মিলিয়ে দেখা যাক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্তত এই তিনটি নীতিমালার ওপর দাঁড়িয়ে এগোনোর রাজনৈতিক সততার পথে হাঁটতে পারত। হেঁটেছে শতভাগ উল্টো পথে।

১৯৭২ সাল থেকেই দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিতে থাকে। সিভিল সার্ভিসের বীভৎসতম দলীয়করণ হয়। আমরা হাস্যরস করি ‘তোফায়েল কমিশন’ নিয়ে। সে সময় আওয়ামী লীগ হরিলুটের মতো প্রশাসনকেও লুট করে নেয়। তোফায়েল আহমেদের তালিকাই ছিল প্রশাসনের পদ-পদায়নের ভিত্তি। অসংখ্য অদক্ষ-অযোগ্য, অপরাধী ও দুর্নীতিবাজ মানুষে প্রশাসন ভরে গিয়েছিল। সেই যে মগজে পচনের শুরু, রোগটির সংক্রামক হয়ে ওঠা আর থামেনি। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বয়সও ৫৫ বছরে পড়ছে।

২০২৪ সালে স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর বাংলাদেশের সামনে আরেকবার সুযোগ এসেছে শেখার ও ভুল সংশোধনের। নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়েছে। নানা অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। এখন কি তাহলে আমরা আবারও সিঙ্গাপুরের মতো সেই সুযোগটি হারাব?

* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

লি কুয়ান ইউ
লি কুয়ান ইউ। ছবি: এএফপি

ইরানের অবস্থা এবার কি ভিন্ন by হাসান ফেরদৌস

ইরানে কী ঘটছে, তা খোলা চোখে দেখার কোনো সহজ উপায় নেই। সবাই যে যাঁর চশমা পরে বাস্তবতা ব্যাখ্যা করছেন। একদল বলছে, ইসলামি বিপ্লবকে কাবু করা সহজ নয়। আমেরিকা বা ইসরায়েল যতই চেষ্টা করুক, এই শাসনব্যবস্থা টিকে যাবে। অন্য দল মনে করছে, ইরানের বিপ্লবী সরকার ভেতরে-ভেতরে এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে শক্ত একটি ধাক্কা দিলেই ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী ধসে পড়বে।

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লব ৪৭ বছরে পা দেবে। এই প্রায় অর্ধশতকে অন্তত আধডজন বড় ধরনের বিদ্রোহ ও গণবিক্ষোভ দেখেছে দেশটি। প্রতিবারই বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, এবার বুঝি বিপ্লব শেষ। তিন বছর আগে সরকারি হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তখনো অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার আর রক্ষা নেই। কিন্তু সরকার সেবারও পরিস্থিতি সামলে নেয়। তবে এবারের পরিস্থিতি সত্যিই ভিন্ন।

এর বড় কারণ, ইরানের মানুষ মরতে শিখে গেছে। অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে বেঁচে থাকার পথ প্রায় রুদ্ধ। কেবল সেনা নামিয়ে বা কামান দেগে মানুষকে আর ঠান্ডা করা যাবে না। আজকের ইরান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়েও আন্দোলন দমন করা যায়নি। ইরানে এখন যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, তার প্রধান চালিকা শক্তি দেশের নবীন প্রজন্ম, নারী ও পুরুষ উভয়েই। অনেকটা বর্ষাবিপ্লবের বাংলাদেশের মতোই।

এবারের পরিস্থিতি আলাদা, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইরানি-আমেরিকান অধ্যাপক ওয়ালি নাসের। তাঁর মতে, ইসলামি বিপ্লব কেবল দেশের ভেতর থেকেই নয়, দেশের বাইরেও হুমকির মুখে। বাইরের হুমকি বলতে তিনি ইসরায়েল ও আমেরিকার কথাই বোঝাচ্ছেন। এই দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরেই সুযোগ খুঁজছে, কীভাবে ইরানের ইসলামি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো যায়।

আমেরিকা ইরানের ওপর পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাতে অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধর্মীয় শাসনকাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। ইসরায়েল ও আমেরিকা মিলে ৩০ হাজার পাউন্ডের বোমা ব্যবহার করেও সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সরকারকে কাবু করতে পারেনি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। কারণ, নাসেরের ভাষায়, এবার ধর্মীয় শাসনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

একই কথা বলেছেন আরেক ইরানি বুদ্ধিজীবী, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্বাস মিলানি। তাঁর মতে, এবার সরকার একদিকে বৈধতা হারিয়েছে, অন্যদিকে দেশের মানুষ স্পষ্টভাবে পরিবর্তন চাইছে। এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লব ছিল প্রকৃত অর্থেই একটি গণবিপ্লব। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাতে অংশ নিয়েছিল।

এমনকি শাহের অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশও বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের। কারণ, শাহ আমলে অর্থনৈতিক সুবিধার সিংহভাগই ভোগ করত ইরানের অভিজাত শ্রেণি, আর প্রতিবাদকারীদের কপালে জুটত জেল ও নিপীড়ন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, বিপ্লবের প্রায় অর্ধশতক পরেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

শাহ আমলে সবচেয়ে আতঙ্কের নাম ছিল গোপন পুলিশ সাভাক। ক্ষমতায় এসে খোমেনি সরকার সেটির বদলে গড়ে তোলে সাভামা। নাম বদলালেও কাজ রয়ে যায় একই। প্রতিবাদ দমনে আছে বিপ্লবী গার্ড ও নৈতিক পুলিশ, যাদের ইরানি নামে ঘাস্ত-ই-ইরশাদ বলা হয়। মুখ খুললেই জেল। এর শিকার শুধু বিরোধী রাজনীতিক বা অ্যাকটিভিস্টরা নন। শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদী ২০২৩ সাল থেকে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের অভিযোগে কারাগারে। আরেক নোবেলজয়ী শিরিন এবাদি ২০০৯ সাল থেকে নির্বাসনে।

নৈতিক পুলিশি নিপীড়নের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ মাসা আমিনি। উত্তর-পশ্চিমের কুর্দি শহর সাকেজ থেকে তেহরানে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। হিজাব ঠিক না থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন দিন পর পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। এর প্রতিবাদে গড়ে ওঠে ‘নারী, জীবন ও মুক্তি’ আন্দোলন। একই ধরনের অভিযোগে ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাবা কোর্দ আফসারি। নারী অধিকার আন্দোলনের চাপে তিনি ২০২৩ সালে মুক্তি পান।

এই তালিকা বাড়ানো যায়, তাতে কথার পুনরাবৃত্তি হবে। ইসলামি বিপ্লব হয়েছিল ইরানের মানুষকে মর্যাদা ও সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে। তার বদলে দেশটি পেয়েছে একদলীয় শাসন, অনির্বাচিত ধর্মীয় নেতাদের প্রায় চার যুগের কর্তৃত্ব এবং অবিরাম নিপীড়ন। এই কারণেই আজ সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। একদিকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ১৯৭৯ সালে এক ডলারের মূল্য ছিল ৭০ রিয়াল। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল (না, আপনি ভুল পড়েননি, পরিমাণটা দেড় মিলিয়ন বা ১৫ লাখ)। মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪৮ শতাংশ। মানুষের আয় বাড়েনি, ব্যয় বেড়েছে। সরকার পরিবারপ্রতি সামান্য ভর্তুকি ঘোষণা করলেও তা দিয়ে বড়জোর কয়েকটি রুটি কেনা যায়। ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভ তাই অনিবার্য।

চলতি বিক্ষোভের মূল শক্তি দেশের তরুণ প্রজন্ম। দেশের ৬০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে, বেকারত্ব ও বন্ধ্যা অর্থনীতিতে তাঁরা ক্লান্ত, ক্রুদ্ধ। ভিডিওতে নাম না–জানা এক মায়ের ছবি দেখেছি, তাঁর ছেলে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিহত হয়েছেন। সবাই সেই ছেলেকে শহীদ অভিহিত করে তাঁকে সান্ত্বনা দিলে, সেই মা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আমার ছেলেকে শহীদ বলবেন না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, সে বাঁচতে চেয়েছিল।’

সোশ্যাল মিডিয়া ও ইরানি ডায়াসপোরার তথ্য অনুসারে, এই পর্যন্ত কম করে হলেও হাজার দু-এক মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। অনুমান করি, সেখানেও ১ জন মরে তো ১০ জন দাঁড়িয়ে যায়। ভীত ইরানি ধর্মীয় শাসকেরা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছেন (এমন কাণ্ড বাংলাদেশেও হয়েছিল)। তরুণেরা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চোরাপথ ব্যবহার করে স্টারলিংকের ইন্টারনেট টার্মিনাল চালু করেছেন। সরকারের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁরা বলছেন, ‘তোমরা এখনো ১৯৭৯ সালের ভাষায় কথা বলো, আমরা কথা বলি ২০২৫-২৬ সালের ভাষায়।’

এত দূর এসেও যে নিপীড়নমূলক ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে নবপ্রজন্ম সফল হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এখনো শক্তভাবে সে দেশের সরকারের পক্ষে। নিষ্পেষণ আরও বৃদ্ধি পেলে বিদ্রোহ ভেঙে পড়তে পারে। আমরা জানি, বিপ্লবের নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিতে সুযোগ খুঁজছেন ক্ষমতাচ্যুত রাজা রেজা শাহর ছেলে রেজা পাহলভি। তাঁর পেছনে ছাতা ধরে আছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ জানিয়েছে, সে দেশের সরকার সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম ব্যবহার করে রেজা পাহলভিকে ভবিষ্যৎ শাসক বানাতে টাকা ঢালছে। ইসলামি বিপ্লববিরোধী চলতি বিপ্লবকে কক্ষচ্যুত করার জন্য এই তথ্যই যথেষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত করুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি, তিনি সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পক্ষে যেকোনো মুহূর্তে ‘কিনেটিক অ্যাটাক’ বা সরাসরি সামরিক হামলা চালাতে পারেন বলে জানানো হয়েছে।

তেমন কিছু ঘটলে ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী খুব সহজেই এই বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পাবে। আর ইতিহাস বলে, সে যুক্তি ইরানে বহুবার কাজে দিয়েছে।

হাসান ফেরদৌস, লেখক ও প্রাবন্ধিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-13%2Fdamnbnqn%2FIran.jpg?rect=0%2C0%2C900%2C600&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রতি সংহতি জানাতে লন্ডনে প্রবাসী ইরানিদের প্রতিবাদ। ছবি: রয়টার্স

শক্তিশালী পাসপোর্ট সূচকে ২০২৬ সালেও শীর্ষে সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশের অবস্থান কত?

২০২৬ সালেও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টধারী দেশের স্বীকৃতি ধরে রেখেছে সিঙ্গাপুর। এ দেশের নাগরিকেরা আগাম ভিসা ছাড়া এবার বিশ্বের ১৯২টি দেশ ও অঞ্চলে ভ্রমণ করতে পারেন। আজ মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) প্রকাশিত পাসপোর্ট ইনডেক্সে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স।

সূচক প্রস্তুত পদ্ধতি নিয়ে হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) তথ্যের ভিত্তিতে কোন দেশের পাসপোর্ট দিয়ে আগাম ভিসা ছাড়া কিংবা ভিসামুক্ত সুবিধা নিয়ে কয়টি দেশে যাওয়া যায়, এর ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী পাসপোর্টের এ সূচক তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট ও ২২৭টি ভ্রমণ গন্তব্য।

মোট ১০১টি অবস্থানের এই তালিকায় দুর্বলতম দেশ আফগানিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির নাগরিকেরা মাত্র ২৪টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণের সুযোগ পান। সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানও তলানির দিক থেকে ৭ নম্বরে, অর্থাৎ ৯৫তম। বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী নাগরিকেরা ৩৭টি দেশে ভিসা ছাড়া বা অন অ্যারাইভাল ভিসায় ভ্রমণ করতে পারেন। গত বছরের শুরুতে আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ৩৯টি দেশ ভ্রমণ করতে পারতেন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা। আর বছরের শেষ প্রান্তিকে এই সংখ্যাটি হয় ৩৮। ২০২৪ সালের শুরুতে এই সংখ্যাটি ছিল ৪২।

যদিও এ নিয়ে বিতর্ক আছে। বাংলাদেশি অনেক পর্যটক অভিযোগ করেন, এসব ভিসামুক্ত দেশেও প্রবেশ করতে ভোগান্তি পোহাতে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে অনেক দেশে প্রবেশের অনুমতিও মেলে না।

সেরা পাঁচ

সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টধারী দেশের তালিকায় সিঙ্গাপুরের পরই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। ১৮৮টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন দেশ দুটির পাসপোর্টধারীরা।
১৮৬টি দেশে আগাম ভিসামুক্তা সুবিধা নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে যৌথভাবে আছে ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড।
এবারের সূচকে চতুর্থ অবস্থানে আছে ১০টি দেশ। অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, ফ্র্যান্স, জার্মানি, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে—এই দেশগুলোর পাসপোর্টধারীরা ১৮৫টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন।
হাঙ্গেরি, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই পাঁচটি দেশ আছে পঞ্চম অবস্থানে। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা ১৮৪টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান

বাংলাদেশের প্রতিবেশী, অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট মালদ্বীপের। সূচকে দেশটির অবস্থান ৫২তম। মালদ্বীপের পাসপোর্টধারীরা আগাম ভিসা ছাড়া ৯২টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন।
এরপরই ভারতের অবস্থান (৮০তম)। ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা ৫৫টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন। ৮৫তম অবস্থানে থাকা ভুটানের পাসপোর্টধারীরা ৫০টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন। মিয়ানমার আছে ৮৯তম অবস্থানে। দেশটির পাসপোর্টধারীরা আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন ৪৪টি দেশে।

সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের সূচকে শ্রীলঙ্কা আছে ৯৩তম অবস্থানে। দেশটির পাসপোর্টধারীরা ৩৯টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন।
বাংলাদেশের ঠিক পরে ৯৬তম অবস্থানে থাকা নেপালের পাসপোর্টধারীরা আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন ৩৫টি দেশে। পাকিস্তান রয়েছে ৯৮তম অবস্থানে। দেশটির পাসপোর্টধারীরা ৩১টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন।
শক্তিশালী পাসপোর্টের সূচকে সবচেয়ে নিচে (১০১তম) আফগানিস্তানের অবস্থান। দেশটির পাসপোর্টধারীরা ২৪টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন।

গত বছরের শুরুতে আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ৩৯টি দেশ ভ্রমণ করতে পারতেন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা
গত বছরের শুরুতে আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ৩৯টি দেশ ভ্রমণ করতে পারতেন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা। কোলাজ: প্রথম আলো

ক্রিকেট নিয়ে ‘নাটক’ ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে

দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়ঃ যে দেশ ক্রিকেটকে শুধু খেলা নয়, বরং কূটনৈতিক ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবেও দেখে- সেই ভারতই আশ্চর্যজনকভাবে খেলাধুলা ও রাজনীতির সীমারেখা আলাদা রাখতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কলকাতা নাইট রাইডার্সের আইপিএল দলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে না নেয়া নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কটি স্বাভাবিকভাবে একটি সাধারণ ক্রীড়া সিদ্ধান্ত হিসেবেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে দেশপ্রেম, পরিচয় ও জাতীয় আনুগত্য নিয়ে উচ্চকণ্ঠ গণভোটে।

এই বিচ্যুতি যতটা সামান্য মনে হয়, আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত জরুরি পার্থক্য। জাতীয় দল একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি দল প্রতিনিধিত্ব করে একটি শহর, একটি ব্র্যান্ড এবং একটি ব্যবসায়িক মডেলকে।

যখন কোনো দেশ যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা কূটনৈতিক ভাঙনের পর অন্য দেশের জাতীয় দলের বিপক্ষে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় আচরণ সম্পর্কে একটি প্রতীকী বার্তা দেয়। কিন্তু যখন একটি বেসরকারি মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনৈতিক চাপের মুখে কোনো বিদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দেয়, তখন বিষয়টি অনেক বেশি অস্পষ্ট ও সমস্যার হয়ে ওঠে। এতে একজন ব্যক্তিগত পেশাদার খেলোয়াড়কে গোটা একটি দেশের রাজনীতির প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়।

এটি বাংলাদেশের বিষয়ে বাস্তব উদ্বেগ অস্বীকার করার বিষয় নয়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, বৈরী রাজনৈতিক ভাষ্য, এবং ঢাকার সাম্প্রতিক কৌশলগত সংকেত নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাস্তব ও যুক্তিসংগত। এসব গুরুতর বিষয় দৃঢ় কূটনৈতিক আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু যাদের হাতে কোনো নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা নেই, যারা কোনো উসকানি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ নন- এমন ক্রীড়াবিদদের নিশানা করে সেই উদ্বেগের সমাধান হয় না। বরং উল্টো, এতে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়; দেশটিকে নীতিনিষ্ঠ নয়, বরং আবেগতাড়িত ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াশীল বলে মনে হয়।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট শুরু থেকেই সহাবস্থানের এক পরীক্ষাগার। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের খেলোয়াড়রা একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেন, একে অপরের সাফল্য উদযাপন করেন এবং এমন দর্শকদের সামনে খেলেন যারা জাতীয়তার চেয়ে দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এতে কখনোই ভারতের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়নি; বরং এটি ভারতকে একটি আত্মবিশ্বাসী, উন্মুক্ত ক্রীড়াসংস্কৃতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক প্রদর্শনীর জন্য সেই পরিসরকে দুর্বল করা কৌশলগত আত্মঘাতের শামিল। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রতিক্রিয়া আরেকটি অস্বস্তিকর প্রবণতাও উন্মোচন করেছে- পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জন্য খেলাধুলাকে কত সহজে অস্ত্র বানানো হচ্ছে। যখন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, আর খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন করা হয় পারফরম্যান্স নয়, পাসপোর্ট দেখে- তখন নাগরিক গর্ব ও সাংস্কৃতিক অনিরাপত্তার মাঝের সীমারেখা ঝাঁপসা হয়ে যায়।

এটি জাতীয় শক্তির লক্ষণ নয়। এটি স্নায়ুবিক দুর্বলতার লক্ষণ।
একইভাবে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াও- সম্প্রচার সীমিত করা বা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার হুমকি, সংযম নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোর রাজনীতিকেই প্রতিফলিত করে। প্রতিবেশীরা প্রতীকী প্রতিশোধে লাভবান হয় না। তারা লাভবান হয় সংযম, যোগাযোগ এবং এই বোধ থেকে যে, প্রতিটি উসকানি জোরালো হওয়ার যোগ্য নয়।
এর একটি গভীরতর ক্ষতিও আছে। যখন প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা ক্রিকেট মাঠে গড়ায়, তখন খেলাধুলা তার অনন্য ভূমিকা, একটি নিরপেক্ষ মিলনস্থল হারাতে থাকে। তখন ক্রিকেটও হয়ে ওঠে অভিযোগের আরেকটি মঞ্চ, রাজনৈতিক পয়েন্ট স্কোরিংয়ের আরেকটি ক্ষেত্র। এই ক্ষতি আমরা বহন করতে পারি না।
ভারতের প্রকৃত শক্তি বরাবরই ছিল তার বৈপরীত্য ধারণ করার ক্ষমতা কঠোর কিন্তু ভঙ্গুর নয়, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু রূঢ় নয়, নীতিনিষ্ঠ কিন্তু দণ্ডনির্ভর নয়। যদি আমরা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সত্যিই সম্মান পেতে চাই, তবে আমাদের প্রমাণ করতে হবে- কখন সীমারেখা টানতে হয়, আর কখন তা না করাই শ্রেয়।
একজন ক্রীড়াবিদকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিতে পরিণত করা রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ নয়।
এটি নিছক নাটক।
দীর্ঘমেয়াদে, এই নাটক ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/198499_1620745538_1606617524_5fc309b4f2a13_mustafizur-rahman.jpg

আসামের ‘দেশহীন’ মানুষরা: ২৪ ঘণ্টার নোটিশে ভারত ছাড়তে বলা হয়

স্ক্রলের প্রতিবেদনঃ পিতা তাহের আলিকে নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাসান আলি। ৫৮ বছর বয়সী এই মানুষটি এখন কেমন আছেন? বিদেশের মাটিতে কীভাবে বেঁচে আছেন? জানুয়ারির কনকনে ঠাণ্ডায় তিনি কী করছেন? কী ধরনের বিপদের মুখোমুখি হচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোই প্রতিদিন তাড়া করে বেড়াচ্ছে হাসান আলিকে। গত আট মাসে আসামের নগাঁও জেলার কৃষক তাহের আলিকে শুধু একবার নয়, তিনবার ভারত থেকে বের করে বাংলাদেশ সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠেলে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দু’বার বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে বলে জানান ৩১ বছর বয়সী সবজি বিক্রেতা হাসান আলি। এ নিয়ে তিনি ভারতের অনলাইন স্ক্রলের সঙ্গে কথা বলেছেন।

তাহের আলি একজন ‘ঘোষিত বিদেশি’। অর্থাৎ সারাজীবন আসামেই বসবাস করা সত্ত্বেও তিনি রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হলো আধা-আদালতসদৃশ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার আসামবাসীকে নাগরিকত্বহীন ঘোষণা করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য না শুনেই একতরফা আদেশ দেয়া হয়েছে। তাহের আলির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যারা ট্রাইব্যুনালে মামলায় হেরে যান, তাদের উচ্চ আদালতে আপিল করার অধিকার রয়েছে। অনেককে রাজ্যের ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়। কিন্তু গত বছরের মে মাসের আগে পর্যন্ত সাধারণত তাদের বাংলাদেশে ‘ডিপোর্ট’ করা হতো না। কারণ ট্রাইব্যুনালের রায় মানেই তারা অন্য দেশের নাগরিক- এমন প্রমাণ নয়।

কিন্তু মে মাসের পর থেকে বিজেপিশাসিত আসাম সরকার আইনি ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে ‘ঘোষিত বিদেশি’দের রাতের অন্ধকারে বন্দুকের মুখে সীমান্ত পার করিয়ে দিচ্ছে- যাকে বলা হচ্ছে ‘পুশব্যাক’। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই জোরপূর্বক বহিষ্কারকে বৈধতা দিতে ১৯৫০ সালের একটি আইন ব্যবহার করছেন। নভেম্বর থেকে রাজ্য সরকার কমপক্ষে ২২ জন ঘোষিত বিদেশিকে নির্দেশ দিয়েছে- ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে যেতে হবে’। ফলে তাদের আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগই থাকছে না। কিন্তু বাংলাদেশ যখন তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না, তখন তাহের আলির মতো মানুষরা আটকে পড়ছেন এক নিষ্ঠুর চক্রে- বারবার ঠেলে দেয়া আর আবার ফিরিয়ে আনার মধ্যে।
তাহের আলি একা নন। স্ক্রলের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯ ডিসেম্বরের পর কমপক্ষে সাতজন আসামবাসীকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের ঢুকতে না দিলে তারা ফিরে যান। কিন্তু আবারও জোর করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়। এর মধ্যে চারজন বর্তমানে বাংলাদেশের পুলিশ হেফাজতে আছেন বলে সে দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাহের আলি ছাড়াও কমপক্ষে আরেকজনকে তিনবার জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
স্ক্রল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছে- ১৯৫০ সালের আইনে বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের কি বারবার বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এবং তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়েছে কি না। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উত্তর পাওয়া যায়নি। উত্তর পেলে প্রতিবেদন হালনাগাদ করার কথা জানানোর কথা। আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, আসাম সরকারের এই নতুন নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও ভারতের সংবিধানের পরিপন্থী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাগরিকত্ব বিষয়ে গবেষক অভিষেক সাহা বলেন, এটা রাষ্ট্রহীনতা তৈরি করার প্রক্রিয়া। ভারত এই মানুষগুলোকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ আবার তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। দুই দেশের মাঝে এদের টেনিস বলের মতো ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

দিল্লিভিত্তিক আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, এই ধরনের হঠাৎ ও খামখেয়ালি বহিষ্কার ভারতের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, যে কোনো ডিপোর্টেশনের আগে নাগরিকত্ব যাচাই বাধ্যতামূলক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। এখানে সেই প্রক্রিয়ার কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না।

হাসান আলি প্রশ্ন করেন, কেন তার পিতাকে দুই দেশের মধ্যে এভাবে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার দেশ বলছে আমার পিতা বাংলাদেশের বিদেশি। কিন্তু বাংলাদেশ তো তাকে দু’বার ফিরিয়ে দিয়েছে। তাহলে আমাদের দেশ কোনটা? আমাদের কি আদৌ কোনো দেশ আছে?

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে নগাঁও জেলার একটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাহের আলিকে একতরফা রায়ে নাগরিক নন বলে ঘোষণা করে। ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি তেজপুর ডিটেনশন সেন্টারে চার বছর কাটান। ২০২৫ সালের মে মাসে পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর আসাম সরকার ঘোষিত বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে তাহের আলিকে তার গ্রাম গোরইমারি থেকে তুলে নিয়ে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। স্ক্রলের আগের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শত শত ঘোষিত বিদেশিকে পুলিশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়, যারা বন্দুকের মুখে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তাহের আলিও সেই ১০৯ জনের মধ্যে ছিলেন, যাদের মাটিয়া ট্রানজিট ক্যাম্পে নেয়া হয়। এটি ভারতের সবচেয়ে বড় ডিটেনশন সেন্টার। মে মাসে তাহের আলি ফোন করে ছেলেকে জানান, তাকে জোর করে সীমান্ত পার করানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ঢুকতে দেয়নি। তাকে আবার ভারতে ফিরিয়ে এনে কোকরাঝাড় হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়। হাসান আলি বলেন, আমরা তখন স্বস্তি পেয়েছিলাম।
এরপর আইনি লড়াই, নতুন করে গ্রেপ্তার, আবার পুশব্যাক- এভাবেই চলতে থাকে নিষ্ঠুর চক্র।

mzamin

গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছেন ইউরোপের সেনারা

গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছেন ইউরোপের ছয়টি দেশের সেনারা। যৌথ মহড়ায় অংশ নিতে আজ বৃহস্পতিবার গ্রিনল্যান্ডের রাজধানীতে পৌঁছান তাঁরা।

দ্বীপটির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করতে ডেনমার্ক ও তার মিত্ররা এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এই দলে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের সেনারা রয়েছেন।

সুমেরু অঞ্চলের এই দ্বীপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে গতকাল বুধবার একটি বৈঠক হয়। এ সময় ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বৈঠকে সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বেশ কিছুদিন ধরে ট্রাম্প বলে আসছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি। রাশিয়া কিংবা চীন যাতে এটি দখল করতে না পারে, সে জন্য এর মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা দরকার। এই ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব বিকল্প তাঁর বিবেচনায় আছে। তাঁর দাবি, সুমেরু অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে ডেনমার্ক সক্ষম নয়।

তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক বারবার বলে আসছে, দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়। যেকোনো ধরনের হুমকি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ মিত্রদের মধ্যে আলোচনা করেই সমাধান করা উচিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ ডেনমার্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপের অনেক নেতা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অভিযান চালিয়ে দ্বীপটি দখলে নেয়, তাহলে কার্যত ন্যাটোর সমাপ্তি হতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক জানিয়েছে, তারা গ্রিনল্যান্ড ও এর চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো শুরু করেছে। প্রতিরক্ষা জোরদারের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ন্যাটো মিত্রদের সহযোগিতায় এ পদক্ষেপ নিচ্ছে তারা।

জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, নরওয়েসহ ইউরোপীয় মিত্ররা বলেছে, চলতি বছরের শেষ দিকে বড় ধরনের মহড়ার প্রস্তুতি নিতে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক বাহিনীর সদস্য পাঠাচ্ছে তারা।

ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী সুমেরু ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে শিগগিরই যৌথভাবে যাচাই করে দেখবে যে ওই অঞ্চলে বাস্তবে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং মহড়া কার্যক্রম কীভাবে কার্যকর করা যায়।

ট্রাম্পকে সমর্থন প্রতি পাঁচজনের একজন আমেরিকানের

রয়টার্স/ইপসোসের একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৭ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টাকে সমর্থন করেন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের উল্লেখযোগ্য অংশ দ্বীপটি দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিরোধী। গত মঙ্গলবার দুই দিনব্যাপী জরিপটি শেষ হয়। জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন বলেছেন, তাঁরা গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনার কথা শোনেননি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-15%2Fsm3qtiak%2F3126fb20-f202-11f0-b5f7-49f0357294ff.jpg.webp?rect=29%2C0%2C675%2C450&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডেনমার্ক বিমানবাহিনীর একটি বিমানে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানীতে পৌঁছান ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা। ছবি: রয়টার্স

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক তহবিলের দাবি তুলল ট্রাম্প প্রশাসন

এবিসির রিপোর্টঃ ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে তারা বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অংশীদার দেশগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সহায়তা কমিয়ে দেয়ার ফলে এই নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর সংকট আরও বেড়েছে। এ তথ্য পাওয়া গেছে এবিসি নিউজের হাতে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি থেকে ১১ অক্টোবর ২০২৫। সে অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই অংশীদার দেশগুলো থেকে ৬৪.৬ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয় একে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ বলে বর্ণনা করেছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১১টি দেশ- যার মধ্যে রয়েছে বৃটেন, বাংলাদেশ, জাপান, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও নেদারল্যান্ডস- ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছরের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি করেছে।

তবে এই দেশগুলোর সহায়তা বৃদ্ধিতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব কতটা ছিল তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প প্রশাসন নিজেও সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নতুন তহবিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্চে ঘোষিত ৭৩ মিলিয়ন ডলার সহায়তার পাশাপাশি আরও ৬০ মিলিয়ন ডলার যোগ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তুলনামূলকভাবে, বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছর ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি অর্থ সহায়তা দেয়। যা সেই বছরের মোট আন্তর্জাতিক সহায়তার ৫০ শতাংশেরও বেশি। মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে বারবার আহ্বান জানিয়েছে যাতে তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায়। মিডিয়ায় যে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে- যেন এই দায়িত্ব কেবল ট্রাম্প প্রশাসনের- তা পুরনো ও বিভ্রান্তিকর। বাস্তবতা হলো, অনেক দেশ, বিশেষত আঞ্চলিক অংশীদাররা, বারবার দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে।

এই পদক্ষেপটি এসেছে এমন সময় যখন বার্তা সংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে মিয়ানমারের একটি রোহিঙ্গা শিবিরে মার্কিন সহায়তা কমানোর ফলে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, এপি’র এই দাবি সম্পূর্ণ ভুল, বিভ্রান্তিকর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন।

mzamin