Sunday, March 30, 2025

ঈদ যেন গাজাবাসীর জন্য নয়

ফিলিস্তিনিদের ঈদ উদ্‌যাপন বলে কিছুই নেই। ইসরায়েলি হামলার মধ্যে গাজাবাসীর জন্য এটা হবে দ্বিতীয় ঈদ।

গাজা এখন ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক নগরী। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ফিলিস্তিনি জনগণ ঈদ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পবিত্র রমজান মাস ফিলিস্তিনিদের কেটেছে দুঃসহ কষ্টে। ১ মার্চ ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রথম দফার যুদ্ধবিরতি শেষ হয়। এর পর থেকে গাজায় আবার হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। রোজার মধ্যেও খাবার নেই, মাথা গোঁজায় ঠাঁই নেই তাঁদের। কষ্টে, অনাহারে কাটছে মানুষের জীবন।

হামাসের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে এ মাসের শুরু থেকে গাজায় ত্রাণসহায়তা পৌঁছাতে দেয়নি ইসরায়েল। ফলে আবার গাজা ছেড়ে পালাতে হয়েছে অনেক পরিবারকে। এই অনাহার ও কষ্টের মধ্যেও ঈদ পালন করতে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। রোজার মাস শেষ হতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে আজ ঈদ উদ্‌যাপিত হবে। কিন্তু ঈদ যেন গাজাবাসীর জন্য নয়। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ‘তাঁদের উদ্‌যাপনের কিছুই নেই’।

১৮ মার্চ ইসরায়েল গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করেছে। এতে গত ১১ দিনে ৮৯০ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর পর থেকে ইতিমধ্যে ইসরায়েলি হামলায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। নিহতদের অধিকাংশ নারী ও শিশু। এ ছাড়া কয়েক সপ্তাহ ধরে গাজা উপত্যকায় কোনো খাবার বা ত্রাণ প্রবেশ করতে পারেনি। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত অস্থিতিশীল।

ইসরায়েলি হামলার মধ্যে গাজাবাসীর জন্য এটা হবে দ্বিতীয় ঈদ। প্রথম ঈদের সময় ইসরায়েলি ভয়াবহ হামলার রেশ এবারও তাঁদের টানতে হচ্ছে। কিন্তু এবার আশায় বুক বেঁধেছিলেন তাঁরা। ভেবেছিলেন যুদ্ধবিরতি হবে। ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে হামলা কিছুটা কমেছিল। তবে ১৮ মার্চ থেকে গাজায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফেলে ইসরায়েল। তাদের হামলায় কয়েক শ মানুষ মারা যান। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ হামলার নির্দেশ দেন।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। এ সময় হামাসের হাতে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়। হামাসের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের দাবি করা হয়। এতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও একযোগে সব জিম্মিকে মুক্তির কথা বলে হামাস। ইসরায়েলি প্রস্তাবে হামাস রাজি না হওয়ায় গাজায় ত্রাণসহায়তা বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল।

একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যে রোজা পালন শুরু করেছিলেন গাজাবাসী। তাঁদের আশা ছিল স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে যাবে হামাস ও ইসরায়েল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ায় ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য আবার বদলে গেল।

অ্যাম্বুলেন্সে হামলা

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ইসরায়েলের সেনাবাহিনী শনিবার স্বীকার করেছে, গাজার অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে তারা সন্দেহজনক যান হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলোতে গুলি চালিয়েছে। হামাস একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। গত রোববার রাফার তাল আল-সুলতানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা ছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ২৭৭।

বাস্তুচ্যুত এক ফিলিস্তিনি নারী পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী খাবার কুকিস তৈরি করছেন। গত শুক্রবার গাজা নগরীতে
বাস্তুচ্যুত এক ফিলিস্তিনি নারী পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী খাবার কুকিস তৈরি করছেন। গত শুক্রবার গাজা নগরীতে। ছবি: এএফপি

আজ ঈদ মধ্যপ্রাচ্যে: একটু থামুন, ছবিটা দেখুন তো!

একটু থামুন। রিপোর্টের এই ছবিটার দিকে একবার ভালো করে লক্ষ্য করুন তো! কী দেখছেন! সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশ যখন পবিত্র রমজান পালন শেষে ঈদের আনন্দে, তখন গাজার এই শিশুরা জীবন বাঁচাতে একটু খাবারের জন্য এভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের কারো পিতা নেই। কারো মাতা নেই। ভাইবোন নেই। একেবারে এতিম। আল্লাহর দয়া আর মানুষের করুণার ওপর ভর করে বেঁচে আছে তারা। একবার ভাবুন তো এই শিশুদের ঈদের কথা! তাদের জীবনে ঈদ মানে কি আনন্দ? তাদের কাছে ঈদ মানে মুক্তি, স্বাধীনতা। বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। একটুকরো স্বাধীন জন্মভূমি। সেই অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করে গণহত্যার উল্লাসে মেতে উঠেছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পবিত্র ঈদের দিনেও রক্ষা পায়নি গাজা আর এর শিশুরা। আজ সেখানে ঈদুল ফিতর। এর মধ্যেই সেখানে বোমা হামলা চালিয়েছে জায়নবাদী ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আবার ৫ জনই শিশু।

ওদিকে মিশর ও কাতার নতুন একটি যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। হামাস তা গ্রহণ করার কথা বলার পর নেতানিয়াহুর অফিস থেকে বলা হয়েছে, তারা একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে।

ওদিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলেছে, তাদের হাতে যে পরিমাণ খাদ্য মজুদ আছে তাতে গাজায় মাত্র ১০ দিনের সরবরাহ দেয়া সম্ভব। এর মধ্যে ইসরাইলের অব্যাহত অবরোধ তুলে না নিলে মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। হাজার হাজার মানুষের কোনো খাবার থাকবে না। গাজায় এরই মধ্যে পুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে যে ইর্মাজেন্সি মজুদ আছে তা মাত্র ৪১৫০০০ মানুষের পুষ্টি বিষয়ক বিস্কুট। এ অবস্থায় বেসামরিক লোকজনের প্রয়োজন পূরণে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক কর্মী ও জাতিসংঘের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রালয়ের হিসাবে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০,২৭৭ জন ফিলিস্তিনি। আহতের সংখ্যা ১১৪০৯৫। অন্যদিকে গাজার মিডিয়া অফিস প্রায় দুই মাস আগে বলেছে, নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৬১,৭০০। হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। অনলাইন আল জাজিরা বলছে, দখলীকৃত পশ্চিম তীরের তাম্মুন শহরে ২২ বছর বয়সী একজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলিরা। এ হত্যার কথা নিশ্চিত করেছে ইসরাইল। তাদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাবেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল।

ওদিকে গত ২৪ ঘন্টায় লোহিত সাগরে তিন দফা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ হ্যারি ট্রুম্যানে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। তারা বলেছে, শত্রুদের যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে তাদের যোদ্ধারা হামলা করেছে। টেলিগ্রামে হুতির এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেছেন, গাজায় আগ্রাসন বন্ধ ও অবরোধ তুলে না নেয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনি নিষ্পেষিত জনগণের অধিকারের প্রতি অব্যাহত সমর্থন থেকে কোনোভাবে পিছপা হবে না তারা।

ওদিকে পবিত্র ঈদ উপলক্ষ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইয়েমেনে হুতি নেতা আবদুল মালিক বদর আল দিন আল হুতি। তিনি পবিত্র ঈদের দিনে গাজায় ইসরাইলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং তাদের সুরক্ষার জন্য সব সময় দ্ব্যর্থহীনভাবে সমর্থন দিয়ে যাবেন ইয়েমেনের মানুষ।

mzamin

যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন উমামা ফাতেমা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল নারীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ’। তবে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা।

শনিবার (২৯ মার্চ) রাতে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছেন।

ফেসবুকে স্ট্যাটাসে উমামা বলেছেন, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ’ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ এর পক্ষ থেকে জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নারী আন্দোলনকারীদের বিশেষ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। এই অ্যাওয়ার্ডের অধীনে ‘ম্যাডেলিন অলব্রাইট অনারারি গ্রুপ অ্যাওয়ার্ড’ হিসেবে জুলাই অভ্যুত্থানের সকল নারীদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে দেওয়া লেখাটি নিজের পোস্টে উদ্ধৃত করেন তিনি।

তিনি বলেন, আগামী ১ এপ্রিল, ২০২৫ যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও এবং ফার্স্ট লেডি মিলানিয়া ট্রাম্প পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন।

কেন তিনি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন- সে বিষয়ে উমামা বলেন, নারী আন্দোলনকারীদের কালেক্টিভ স্বীকৃতি আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের নারকীয় হামলাকে প্রত্যক্ষভাবে এন্ডোর্স করে যাওয়ার জন্য এ অ্যাওয়ার্ডটি ব্যবহৃত হয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা যুদ্ধকে অস্বীকার করে পুরস্কারটি ইসরায়েলের হামলাকে যে প্রক্রিয়ায় জাস্টিফাই করেছে তা পুরস্কারের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যেখানে ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের মৌলিক মানবাধিকার(ভূমির অধিকার) থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তাই ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সম্মান রেখে এই পুরস্কার আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করলাম। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসিয়াল সিলমোহর (বায়ে) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসিয়াল সিলমোহর (বায়ে) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত

তিন সন্তানের লাশের ভার নাসির উদ্দিন কীভাবে বইবেন

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় নাসির উদ্দিনের বাড়িতে সবাই আহাজারি করছেন। বাড়ির সদস্যরা তো বটেই, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী যাঁরা এসেছেন, তাঁরাও কাঁদছেন। এই বাড়ির তিন সন্তান আজ শনিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার সোনার বাংলা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। একসঙ্গে তিন সন্তানের লাশের ভার নাসির উদ্দিন কীভাবে বইবেন, মুঠোফোনে বিলাপ করে বলছিলেন তিনি।

নাসির উদ্দিন শ্রমিকের কাজ করতে গেছেন রাঙামাটি। তিন ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে সেখান থেকে রওনা দিয়েছেন তিনি। পথে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিন ছেলে হারানোর কষ্টের কথা বলছিলেন, আর হাউমাউ করে কাঁদছিলেন।

নিহত তিন ভাই হলেন মো. নাঈমুজ্জামান খান ওরফে শুভ (২২), মো. শান্ত খান (১৪) ও মো. নাদিম খান (৮)। পাথরঘাটার টিকিকাটা ইউনিয়নের বাইশকুরা গ্রামে তাঁদের বাড়ি। দুর্ঘটনার পরপরই তিন ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাঁদের লাশ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আনা হয় মঠবাড়িয়ার গুলশাখালী গ্রামে তাঁদের নানাবাড়িতে। এ সময় সেখানে মাতম শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৪টায় শেষ খবর অনুযায়ী, লাশ তিনটি নিয়ে স্বজনেরা বাইশকুরা গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে রওনা দিয়েছেন। সেখানেই তাঁদের লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছে।

এলাকার লোকজন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাঈমুজ্জামানকে গ্রামের সবাই শুভ নামেই বেশি চেনেন। ঢাকার সাভারে একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন তিনি। তাঁর ছোট ভাই শান্ত গুলশাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং নাদিম গুলশাখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তাঁদের ছোট আরেক ভাই ছিল। সাত মাস বয়সী ওই ভাইটি গত বছর পানিতে ডুবে মারা গেছে। ফলে একই পরিবারের চার ভাইয়ের কেউ রইল না।

শুভ মাত্র চার দিনের ছুটি পেয়ে ঈদ করতে এসেছিলেন বাড়িতে। তবে তাঁর সহকর্মী বন্ধু রাকিব ঈদে ছুটি পাননি। শুভ ঢাকা থেকে আসার সময় রাকিব নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনা নতুন পোশাক শুভকে দিয়েছিলেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য। রাকিবের বাড়ি পাশের পাথরঘাটা উপজেলার মানিকখালী গ্রামে।

ঢাকা থেকে শুভ বাড়িতে পৌঁছান গতকাল শুক্রবার রাতে। আজ শনিবার সকালে মোটরসাইকেলে বেরিয়েছিলেন রাকিবের বাড়ি পাথরঘাটার উদ্দেশে। সঙ্গে নিয়েছিলেন ছোট ভাই শান্ত ও নাদিমকে। পাথরঘাটা-মঠবাড়িয়া সড়কের সোনার বাংলা এলাকায় ঢাকাগামী রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে তাঁদের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

বাবা নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমার মতো হতভাগা আর কে আছে। আজকে একসঙ্গে আমার তিন ছেলে মারা গেল, গত বছর আমার ছোট ছেলে (৭ মাস) পানিতে ডুবে মারা গেছে। আমার জীবনের কী অপরাধ ছিল জানি না। আমার চার ছেলে আজকে কেউ নাই। আমি শ্রমিকের কাজ করি। আমার সংসারের জন্য বড় পোলারে চাকরি করতে দিছি সাভারে। আমি ছিলাম রাঙামাটি, এহন বাড়ির পথে।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মঞ্জু বলেন, ‘এর আগে আমাগো গ্রামে একসঙ্গে তিনজনের লাশ কেউ দেখি নাই। নাসির তার পরিবার নিয়ে আমাদের এখানে বাস করত। সে শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ করে। তার চার ছেলে। গত বছর তার ছোট ছেলে পানিতে ডুবে মারা গেছে। আমরা এ গ্রামের মানুষ আগে কখনো তিনজনের লাশ একসঙ্গে দেখি নাই।’

রাকিবের বাবা হিরু হাওলাদার বলেন, ‘আমার ছেলে রাকিব আর শুভ একসঙ্গে ঢাকায় চাকরি করে। রাকিব এবার ঈদে ছুটি পায় নাই। এ জন্য শুভর কাছে আমাদের জন্য কিছু কাপড় কিনে দিছে। সেগুলো দেওয়ার জন্য আজ সকালে আমাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলে সোনার বাংলা এলাকায় সে আর তার দুই ছোট ভাই বাসচাপায় মারা গেছে। আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই আজকে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পিরোজপুর বাসমালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কোনো দুর্ঘটনাই আমাদের কাম্য নয়। মঠবাড়িয়া সড়কটি ব্যস্ত সড়ক হওয়ার পরও এটি প্রশস্ত নয়। রাস্তা প্রশস্ত না হওয়া এবং বাস ও মোটরসাইকেল উভয়ে বেপরোয়া গতির হওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।’

পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান বলেন, ‘তিন ভাইয়ের দাফনের ব্যবস্থা করতে পরিবারের সদস্যরা আবেদন করলে আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য একটি অনুদানের ব্যবস্থা করব।’ 

বরগুনার পাথরঘাটায় বাসের চাপায় মোটরসাইকেলের আরোহী তিন ভাই নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে উপজেলার সোনার বাংলা এলাকায় দুর্ঘটনাস্থলে
বরগুনার পাথরঘাটায় বাসের চাপায় মোটরসাইকেলের আরোহী তিন ভাই নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে উপজেলার সোনার বাংলা এলাকায় দুর্ঘটনাস্থলে। ছবি: প্রথম আলো

মুসলিমদের ঘরে ঘরে আনন্দের হাওয়া: গাজায় ক্ষুধা, রক্ত, আর্তনাদ

সারাবিশ্বে মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় আনন্দ উৎসব সমাগত। ঈদের আনন্দ ঘরে ঘরে শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু গাজার মানুষের ঈদ নেই। তাদের আছে আর্তনাদ। রক্ত। ক্ষুধা। বোমার অব্যাহত আঘাত। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) আদেশে যুদ্ধাপরাধী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অব্যাহতভাবে সেখানে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পবিত্র রমজান ও ঈদের আনন্দকেও তারা রক্তের নদীতে মিশিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতাযোদ্ধা হামাসের সঙ্গে প্রথম দফা যুদ্ধবিরতি ইসরাইল ভেঙে দেয় ১৮ই মার্চ। তারপর থেকে অব্যাহতভাবে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ১৮ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। এ সময়ে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৯৮৪ জন। সারাবিশ্বের চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে এ ঘটনা। কিন্তু কারো মুখে কোনো রাঁ নেই। যেন ইসরাইলকে লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হয়েছে গাজার মানুষদের মেরে মরুভূমি বানিয়ে দেয়ার। হাত-পা হারানো, পিতা-মাতা, ভাইবোন হারানো ছোট্ট ছোট্ট শিশুর যে বীভৎস ছবি, ভিডিও প্রকাশ পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, টেলিভিশনের পর্দায়- তাকে কারো বিবেক সামান্য পরিমাণে আন্দোলিত হচ্ছে না। পাশাপাশি নভেম্বরে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। দক্ষিণ লেবাননেও তারা অব্যাহত হামলা চালাচ্ছিল। গাজায় সব রকম মানবিক সহায়তা ও খাদ্য সরবরাহ কমপক্ষে তিন সপ্তাহ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে যে, এ কারণে ফিলিস্তিনে হাজার হাজার মানুষ ভয়াবহ অনাহারে ভুগছেন। পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। বিশ্বজুড়ে যখন মুসলিমের ঘরে ঘরে আনন্দের হাওয়া, তখন ফিলিস্তিনিরা কোনোমতে উদোরপুর্তি করার জন্য খাবার পাচ্ছে না। এরই মধ্যে ইসরাইলের হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫০,২০৮ ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন ১,১৩,৯১০ জন। তবে গাজার মিডিয়া অফিসের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৬১,৭০০। এই সংখ্যা কয়েকগুন বাড়তে পারে। কারণ, ধ্বংসস্তূপের নিচে যে অসংখ্য গাজাবাসী আটকা পড়ে আছেন তাদেরকে এই সংখ্যার মধ্যে ধরা হয়নি। মুসলিম বিশ্বে না হলেও ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে পালিত হয়েছে আল কুদস দিবস। পবিত্র রমজান মাষের শেষ শুক্রবারকে জুমাতুল বিদা ও আল কুদস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এটি হলো জায়নবাদী ইভেন্টের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনপন্থি একটি ইভেন্ট। শিকাগোর বিক্ষোভ থেকে স্লোগান দেয়া হচ্ছিল- ‘বর্ণবাদ: দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য খারাপ, ফিলিস্তিনের জন্যও খারাপ’। বিক্ষোভের আশপাশে অনেক মানুষ ছিলেন। তারা বলেছেন, ভয়ে তারা অংশ নিতে পারেননি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রশাসন এই বিক্ষোভ থেকে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করে দেশ থেকে বের করে দিতে পারে। এরই মধ্যে মাহমুদ খলিল নামে একজন সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে প্রশাসন। তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তবু যারা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন তারা গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করছিলেন।

ওদিকে মিশিগানের কংগ্রেসওমেন রাশিদা তায়েব সহ মিশিগান রাজ্যের মন্ত্রী এবং অন্য নির্বাচিত কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন অভিবাসন বন্দিশিবির থেকে মাহমুদ খলিলকে মুক্তি দিতে। এ মাসের শুরুর দিকে খলিলকে আটক করা হয়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে যোগ দেয়ার অপরাধে তাকে আটক করা হয়। রাশিদা তায়েব সহ অন্যরা যৌথ স্বাক্ষরে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, খলিলকে আটক একই সঙ্গে তার অধিকার ও আত্মমর্যাদার জন্য অপমানজনক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চাইলে এটা তার বিরুদ্ধে হুমকি। আইনকে লঙ্ঘন করে মাহমুদ খলিলকে টার্গেট করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দায়ী করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গাজায় ইসরাইলি সরকার সব রকম শাস্তি আরোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভে অংশ নেয়ার কারণে খলিলকে টার্গেট করা হয়েছে এটা পরিষ্কার। তাকে টার্গেট করা হয়েছে কারণ, তিনি একজন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিনি। তাকে টার্গেট করা হয়েছে তার জাতীয়তার জন্য।

ওদিকে ইসরাইলের অব্যাহত হামলায় গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অবরোধ দেয়ার ফলে কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছাতে পারছে না সেখানে। হাসপাতালগুলো ভরে যাচ্ছে হতাহত মানুষে। নেই ওষুধ। জীবন বাঁচাতে রক্তের ভীষণ প্রয়োজন। আহতদেরকে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছেন চিকিৎসকরা। ওদিকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ ইসরাইল বিরোধী অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর প্রেক্ষিতে, ওই সেন্টারটির একাডেমিক লিডারশিপ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

mzamin

শহীদ পরিবারে ঈদ নেই by ফাহিমা আক্তার সুমি

ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর এবার মুক্ত পরিবেশে ঈদ উদ্‌যাপনের সুযোগ পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু যাদের ত্যাগে এই ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের অবসান হয়েছে সেই শহীদদের পরিবারে নেই ঈদের আনন্দ। ঈদের আনন্দের পরিবর্তে বিষাদের কালো ছায়া, শোকের আবহ। প্রিয় স্বজনকে ছাড়া ঈদ কাটবে শহীদদের পরিবারে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ স্বামী, কেউ ভাই, কেউবা বাবা-মাকে। স্মৃতিকাতর পরিবারগুলোতে এবারের ঈদ এসেছে শুধুই হাহাকার নিয়ে। কারও মুখে হাসি নেই। নেই কোনো ঈদ আয়োজন। গেল বছরগুলোতে এসকল শহীদরা স্বজনদের নিয়ে কেনাকাটা করেছেন। কিন্তু এবারের ঈদে তারা কেবলই স্মৃতি। ঈদের দিনে প্রিয়জনদের কবরের পাশে আর্তনাদে কাটবে স্বজনদের সময়। অনেক শহীদের বাড়িতে রান্না হবে না বিশেষ কোন খাবার। অনেকে পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন গেল বছরগুলোর স্মৃতি মনে করে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর অনেকের সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের। তারা বলেছেন, তাদের জীবনে ঈদ-রোজা বলে কিছু নেই। সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে রমজান ও ঈদের আনন্দ।

মেহেদী হাসান (২৬)। তিনি একজন গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন। গত বছরের ১৮ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে মারা যান। তার দুই শিশু সন্তান রয়েছে। সন্তানদের নিয়ে তার স্ত্রী কেরানীগঞ্জে ভাড়া বাসায় থাকেন। মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি বলেন, ঈদের আনন্দ-খুশি আমার জীবনে আর নেই। নিভে গেছে আমার ঘরের আলো। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। জীবন থেকে হারিয়ে গেছে ঈদের আনন্দ। প্রত্যেকবার ঈদে দুইবার কেনাকাটা করতাম। সে রোজার আগে কেনাকাটা করে আমাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠাতো। নিজে ঢাকা থেকে যাওয়ার আগে আমাদের সবার জন্য কেনাকাটা করে আবার নিয়ে যেতো। তাকে ছাড়া এ বছর মনে হচ্ছে না আমার জীবনে ঈদ নামে কিছু আছে। ইফতারের সময় প্রতিদিন ফোন করে খবর নিতো। সেহ্‌রির সময় হলে আবার ফোন করতো। রমজান ঈদ ঘিরে পরিবারের মধ্যে একটা আনন্দ বয়ে যেতো। এবার আর অন্যবারের মতো আয়োজন নেই। কখনো ভাবতে পারিনি তাকে ছাড়া এভাবে ঈদ করতে হবে। পুরো পৃথিবী আমাকে দিয়ে দিলেও তার অভাব কখনো পূরণ হবে না। বড় মেয়েটা বাবাকে অনেক বুঝতো কিন্তু ছোট বাচ্চাটার বোঝার মতো বয়স হয়নি। বড় মেয়েটা সবসময় বাবার কথা বলে সে কখনো মানতেই পারে না যে তার বাবা আর কোনো দিন আসবে না। ওদের বাবা ১৫ দিনের মতো বাসায় রোজার ইফতার করার সুযোগ পেতো। এবার কোনো আনন্দ আমাকে ছুঁয়ে যাবে না। মেয়েদের এখনো ঈদের নতুন পোশাক কিনে দেইনি। আমার মনে হয় এমন ঈদের সকাল যেন না আসুক। আমাকে আর কেউ নতুন নতুন খাবার তৈরির জন্য বলবে না। মেয়েদের তাদের বাবার মতো আনন্দ হয়তো দিতে পারবো না তবুও তাদের শান্তনা দিয়ে রাখি। ঈদের নামাজ শেষে মেয়েকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে যেতো। মেয়েদের খুশি রাখতে কিছুটা তাদের জন্য কেনাকাটা করবো কিন্তু সেটি আর আগের মতো খুশি মনে হবে না।

ওয়াসিম শেখ (৩৮)। শনির আখড়ায় ফুটপাথে প্যান্ট বিক্রি করতেন। গত বছরের ১৮ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে মারা যান। তার ৯ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ওয়াসিমের স্ত্রী রেহানা বলেন, এইবার ঈদ অন্যবারের মতো হবে না। রমজান মাসটাই খুব কষ্টে যাচ্ছে। আমার এগারো মাসের একটি মেয়ে আছে। ঈদে কোনো কিছু কেনাকাটাও করিনি। মেয়ের জীবনে এবার প্রথম ঈদ। অন্যান্য বছর রমজানের মধ্যে ঈদের কেনাকাটা সেরে ফেলতো ওর বাবা। কিন্তু এবার ঈদ হবে না আমাদের। কোনো আনন্দ নেই আমাদের মাঝে। ওয়াসিমের বোন তামান্না বলেন, এই ঈদ তো আমাদের জীবনে দুঃখ নিয়ে এসেছে। আমার ভাইকে হারিয়েছি, সে আমাদের পরিবারের একমাত্র আয় করতো। বাবা-মা এবং তার স্ত্রী-সন্তানকে সেই দেখেশুনে রাখতো। বাবাও ভাই মারা যাওয়ার আগে মারা যায়। সবাই ওই ভাইটার দিকে চেয়ে থাকতো। ঈদ আসলে সে সবাইকে ঈদের পোশাক কিনে দিতো। তাকেও আমরা পোশাক কিনে দিতাম। সবাই মিলে অনেক আনন্দ করতাম। এবার তার একমাত্র মেয়ের জীবনে প্রথম ঈদ, সেই ঈদেই সে বাবা হারা হয়েছে। অথচ ভাই যদি বেঁচে থাকতো এই মেয়েটাকে নিয়ে কতোই না আনন্দ করতো। যখন মারা যায় তখন মাত্র দেড় মাস বয়স ছিল মেয়েটির। আমার মাও তার সন্তান হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছে। তার জীবনে আশা-ভরসা সব হারিয়েছে। ওয়াসিমের স্ত্রীও অনেক ভেঙে পড়েছে। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে কিছু টাকা পেয়েছে। ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তান ও মা একসঙ্গে থাকে।

১৮ বছর বয়সী রুবেল মিরপুর-১০ নম্বরে ভ্যানে সবজি বিক্রি করতেন। গত বছরের ৫ই জুলাই গুলিতে নিহত হন। মিরপুরে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন রুবেল। পড়ালেখা করা হয়নি তার। বাবাকে তার উপার্জনের টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। রুবেলের বাবা মো. ইদু বলেন, ছেলেটার বয়স খুব কম ছিল। সে আমার তিন ছেলে সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। সংসারে আমাকে অনেক সহযোগিতা করতো। এর আগের বছরগুলোতে রমজান আসলে আমাদের নিজে থেকে ভালো ভালো খাবার কিনে খাওয়ায় দিতো। সব সময় জানতে চাইতো কি খেতে ইচ্ছে করছে। প্রতি ঈদে বাবা-মা বোনকে নিয়ে ঈদের পোশাক কেনাকাটা করতো। এখন তো আমার ছেলে নেই, সে আর ফিরে আসবে না। ওই সন্তানই আমার সংসার দেখে রাখতো। ওর মা সারাক্ষণ খেতে গেলে, ঘুমাতে গেলে ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। তাকে বোঝানো যায় না। এবার ছেলের জন্য ঈদের পোশাক কিনে এক অসহায় ছেলেকে দিয়েছি। কিন্তু ঈদের দিনে তাকে তো কোনোভাবে ভুলে থাকতে পারবো না। মুখে কোনো খাবার যদিও যায় চোখের পানি তো ধরে রাখা যাবে না। ঈদের দিন সন্তানের কবর জিয়ারত করতে যাবো। আমার সন্তান সবজি বিক্রি করে আসার সময় গুলিবিদ্ধ হয় মিরপুর-১০ নম্বরে। গুলিটি তার বুকে এসে লাগে। এ খবর শুনতে পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। সন্তানের সব স্মৃতি বুকে চেপে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। রুবেল ঈদের দিনে খুব ঘুরতে পছন্দ করতো, আমাদের নিয়ে ঈদে ঘুরতে যেতো।

মুনসুর মিয়া মোহাম্মদপুরে একটি পেট্রোলপাম্পে কাজ করতেন। গত বছরের ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত হন। তার দশ বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে সে একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। মোহাম্মদপুরে বছিলাতে নিজ বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকতেন। মুনসুরের স্ত্রী রিমা আক্তার বলেন, ওর বাবাকে ছাড়া কষ্ট করে চলছি। সে ছাড়া এই প্রথম ঈদ আমাদের। রমজান মাসটায় সারাক্ষণ তার কথা মনে পড়েছে। একজন সন্তান তার বাবাকে ছাড়া কীভাবে কাটাচ্ছে। কীভাবে তাকে ছাড়া আমার সন্তান আনন্দ করবে। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের কষ্ট চাপিয়ে রেখে তার জন্য অল্প কিছু কেনাকাটা করেছি। আমার সন্তানটি এতিম তাকে তো আর তার বাবাকে ফিরিয়ে এনে দিতে পারবো না। মা হিসেবে নিজে সব কষ্ট চেপে রেখে তাকে খুশি রাখতে চেষ্টা করি। ওর বাবা থাকলে অন্যবারের মতো নামাজ শেষে আমাদের নিয়ে ঈদে ঘুরতে যেতো। ঈদ ঠিকই আসবে কিন্তু আমাদের জীবনে আর আনন্দ নিয়ে আসবে না।

বাপ্পী (৩৫)। স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। দেশে ফিরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করেন। বাপ্পীর ৪ বছরের একটি শিশু সন্তান রয়েছে। দেড় বছর আগে বাপ্পীর স্ত্রী মারা যান। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন তিনি। পরিবার নিয়ে মিরপুরে বসবাস করতেন। গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানে হাতিরঝিল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। তিনি ৫ই আগস্ট গুলিতে মারা যান। বাপ্পীর বোন উমাইমা বলেন, ভাইয়াকে ছাড়া কোনোরকম কেটে যাচ্ছে। সে প্রতি বছর বাবা-মা, আমাকে এবং মেয়েকে কেনাকাটা করে দিতো। সবাইকে ঈদের সালামি দিতো। খুব পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করতে বলতো। নিজে রান্নার সময় দেখিয়ে দিতো। খুব খাবার প্রিয় একজন মানুষ ছিল ভাইয়া। আমার ভাতিজি সবসময় বলতে থাকে বাবা কোথায়? আমার ঈদের শপিং করে দিবে না। তোমরা আমাকে ঈদের শপিং করে দিচ্ছো না কেন? ও তো জানে না ওর বাবা মারা গেছে। ও মনে করে ওর বাবা বিদেশ ঘুরতে গেছে ওর জন্য চকলেট, খেলনা নিয়ে আসবে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গত বছরের ১৯শে জুলাই  রামপুরাতে গুলিতে মারা যান আব্দুল্লাহ ইফতি। গুলিটা তার মাথায় লাগে। পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মেরাদিয়ায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করতেন। ইফতির বাবা ইউনুস সরদার বলেন, ইফতি আমার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল। সে যখন বেঁচে ছিল তখন প্রতি ঈদে তার মা ও আমাকে নিয়ে শপিং করতো ঈদের। একমাত্র মেয়েটি বিয়ে দিয়েছি। এখন আমরা দু’জন থাকি। ঈদের কোনো আনন্দ নেই। এ বছর এখনো ঈদের কেনাকাটা করা হয়নি। কখনো মন টানছে না ছেলেকে ছাড়া ঈদের নতুন পোশাক কিনতে যেতে। ইফতি থাকলে রোজার কয়েকটা হলেই কেনাকাটা শুরু করে দিতো। এর আগের ঈদগুলোতে সে অনেক আনন্দ করতো। ঘটনার দিন গুলি লাগার দুই ঘণ্টা পর আমি জানতে পারি। ইফতি ছাড়া আমাদের জীবনে আর ঈদ ফিরে আসবে না। 

mzamin

ভূমিকম্পে মিয়ানমারে ধ্বংসযজ্ঞ: মৃত্যু ১০০০ ছাড়ালো

ভূমিকম্পে মিয়ানমার যেন মৃত্যুপুরী। শুক্রবারের প্রলয় সৃষ্টিকারী এই ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে এক হাজার। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। শুধু মিয়ানমারই নয়, থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী বেশ কয়েকটি দেশেও এই কম্পন বড় রকম প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে নিহতের সংখ্যা দেড় শতাধিক। সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর মান্দালয়ে। এই শহরটি ভূমিকম্পের উৎসস্থলের একেবারে কাছে। ঘটনার পর থেকে উদ্ধারকর্মীরা অবিরাম মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে জীবিতদের সন্ধান করছেন। অসংখ্য মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। তাদের পরিণতি কী হয়েছে- তা কেউ জানেন না। একজন উদ্ধারকর্মী মান্দালয় থেকে বিবিসিকে বলেছেন, তারা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে লোকজনকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি হাইরাইজ ভবন ধসে পড়েছে। ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। সেখানেও উদ্ধার অভিযান চলছে। সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ১০০ শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। তাদের কোনো খোঁজ মিলছে না। সেখানে মারা গেছেন কমপক্ষে ৬ জন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় ন্যূব্জ দেশটির অর্থনীতি এবং শাসকরা দৃশ্যত একঘরে হয়ে আছেন। এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শাসকদের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়ার ঘটনাও বিরল। দেশটি সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাছাড়া আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নাগরিক সমাজের মধ্যে অক্ষমতার কারণে সেখানে আসলে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা বোঝা খুবই কঠিন। বিভিন্ন দেশ থেকে এরই মধ্যে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো শুরু হয়েছে।

নিরাপদ আছেন সুচি
ভয়াবহ ভূমিকম্প মিয়ানমারকে তছনছ করে দিয়েছে। ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে সেখানে শুক্রবার নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০০২ জন। এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে। কারণ, যেসব মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন, তাদের অনেককে উদ্ধার করা হচ্ছে মৃত অবস্থায়। তবে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী বলে পরিচিত অং সান সুচি নিরাপদে আছেন। জেল কর্তৃপক্ষের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র বিবিসিকে বলেছেন, সুচি অক্ষত আছেন। রাজধানী  নেপিড’তে অবস্থিত একই জেলের অন্যরাও নিরাপদে আছেন। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের শুরুতে ১লা ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন অং সান সুচি। তারপর থেকেই তিনি জেলে আছেন। ২০২৩ সালে তাকে জেল থেকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে আবার রাজধানীতে একটি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

বুকফাটা আর্তনাদ নারুয়েমোলের
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। সেখানে ধসে পড়েছে বহুতল একটি ভবন। তার কয়েক মিটার দূরেই একটানা কেঁদে চলেছেন এক নারী। তিনি বলছেন, তাকে আমি একবার দেখতে চাই। সে কি অবস্থায় আছে আমি জানতে চাই। এই নারীর নাম নারুয়েমোল। তার ৪৫ বছর বয়সী স্বামী ওই ভবনটির নির্মাণকাজে যোগ দিয়েছিলেন। শুক্রবারের ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে পড়েছে। তার নিচে চাপা পড়েছেন নারুয়েমোলের স্বামী। এ খবর জানার পর তিনি বুকফাটা আর্তনাদে চিৎকার করছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার স্বামীর কোনো খোঁজ মেলেনি। তবু তিনি আশা ছাড়েননি। মনে করছেন, এখনও তার স্বামী বেঁচে আছেন এমন অন্তত একটি খবর পাবেন। চিৎকার করে তিনি বলছেন, সে ছিল পুরো পরিবারের আয়ের উৎস। তার আর্তনাদের সঙ্গে সমানতালে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছিল মেশিন। উদ্ধারকর্মীরা ইট-লোহার বিশাল বিশাল চাঁই সরাচ্ছিলেন।

‘মুহূর্তেই পুরো বাড়ি ধসে পড়লো আমার ওপর’
ভূমিকম্পের সময় মিয়ানমারের মান্দালয়ের একজন অধিবাসী অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন কী ঘটেছিল শুক্রবার। তার ভাষায়- ভূমিকম্পের সময় বাথরুমে ছিলাম। আকস্মিক পায়ের তলায় সবকিছু ভয়াবহভাবে দুলতে থাকে। কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড দুলতে থাকে। পুরো বাড়িটা আমার চোখের সামনে ধসে পড়ে। বাড়িটা ধসে পড়ার আগে আমি পিঠের ওপর ভর করে শুয়ে পড়লাম। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পরে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করি। আমার পিতা ও এক চাচা এসে উদ্ধার করেন আমাকে। ৫ থেকে ৬ জন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধারের কয়েক সেকেন্ড পরেই আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত করে। আমাদের ভবনটি আরও ধসে যেতে লাগলো। ভয়ে শুকিয়ে গেলাম। বেদনায় মুষড়ে পড়লাম। হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। আমার পিতা আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেলেন। আমাদের বাড়িতে সাতজনের বসবাস। তার মধ্যে আমার দুই আন্টিকে উদ্ধার করা হয়েছে আমার সঙ্গে। তার একজন মারা গেছেন। অন্যজন হাসপাতালে। আমার দাদা, চাচি ও চাচাদের এখনও পাওয়া যায়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন তারা। তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শতকরা শূন্য ভাগ। এ সবই ঘটে গেছে আমার চোখের সামনে। 

mzamin

মিয়ানমার ভূমিকম্পের শক্তি ৩৩৪টি পরমাণু বোমার সমান

মিয়ানমারে ভয়াবহ ভূমিকম্পের শক্তি ছিল ৩৩৪টি পারমাণবিক বোমার সমান। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ববিদ জেস ফনিক্সকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের ভূমিকম্প যে পরিমাণ শক্তি নির্গত করেছে, তা প্রায় ৩৩৪টি পারমাণবিক বোমার সমান। সতর্ক করেছেন তিনি। বলেছেন, আরও অন্তত দু’মাস মিয়ানমার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকবে। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট এবং ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের ওপর মিয়ানমারের অবস্থান। এ দু’টি প্লেটের স্থানান্তরের কারণেই ভূমিকম্প হয়েছে। এই স্থানান্তর আরও ২ মাস পর্যন্ত চলবে। এ কারণে আগামী দু’মাস ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকবে মিয়ানমার। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর মান্দালয় থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা এপিসেন্টার। ইউএসজিএস জানিয়েছে,  মিয়ানমারে ৭.৭ এবং ৬.৪ মাত্রার দু’টি ভূমিকম্প হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন ধ্বংস্তূপ থেকে ১ হাজারের  বেশি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ২ হাজার ৩৭৬ জনকে। এছাড়া ৩০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ব্যাপক এই ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও।  এই ৭ দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে থাইল্যান্ডের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। রাজধানী ব্যাংককে কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়ায় এখনও নিখোঁজ আছেন শতাধিক মানুষ। এছাড়া  দেশটিতে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ১০ জনের দেহ। এরা সবাই ভূমিকম্পে ভবন ধসে মারা  গেছেন। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত  নেপিডো, সাগাইং, মান্দালয়, ম্যাগওয়ে, বাগো ও পূর্ব শান্ত এই ছয় প্রদেশ ও অঞ্চলে ইতিমধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সামরিক সরকার। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শক্তিশালী কম্পনে ন্যাপিডো, সাগাইং, মান্দালয়সহ পাঁচটি শহরে ভবন ধসে পড়েছে। এ ছাড়া একটি সেতু ও একটি  রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইরাবতি নদীর ওপর আভা সেতু ধসে পড়েছে।  সেতুটি ভেঙে পানির মধ্যে হেলে পড়েছে।
mzamin

বিশ্বকে বদলে দিতে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে

বিশ্বকে বদলে দিতে শিক্ষার্থীদের বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র শেখার জায়গা নয়, এটি স্বপ্ন দেখারও জায়গা। স্বপ্ন দেখতে পারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। আপনি যদি স্বপ্ন দেখেন, তবে তা ঘটবেই। আপনি যদি স্বপ্ন না দেখেন, তবে তা কখনো ঘটবে না। অতীতের দিকে নজর দিলে দেখবেন যা কিছু ঘটেছে, কেউ না কেউ আগে তা কল্পনা করেছিল। কল্পনা যেকোনো কিছু থেকে বেশি শক্তিশালী। গতকাল চীনের বেইজিংয়ে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ভাষণের আগে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। অনুষ্ঠানে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের চেয়ারম্যান হে গুয়াংচাই ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট গং চিহুয়াং বক্তব্য রাখেন। প্রফেসর ইউনূস শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং অকল্পনীয় বিষয়ে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেন। যদিও অনেক সময় এটি অসম্ভব মনে হতে পারে। তিনি বলেন, মানব সভ্যতার যাত্রা হলো অসম্ভবকে সম্ভব করা। সেটাই আমাদের কাজ। আর আমরাই তা করতে পারি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের ঘর মনে করি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্মানসূচক প্রফেসর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উদ্ভাবন ও উৎকর্ষতার কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করতে পেরে আমি গর্বিত। এই সম্মাননা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই প্রতিশ্রুতির কথা, যা আমি গত বছর বাংলাদেশে রূপান্তরকারী পরিবর্তনের অগ্রভাগে থাকা লাখ লাখ যুবকের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য করেছি।

ড. ইউনূস বলেন, তাদের স্বপ্ন ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার, যে দেশটি দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত হবে। প্রধান উপদেষ্টা তার সরকারের সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যেখানে উদ্যোক্তা বিকাশকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, মানুষ জন্মগতভাবে দরিদ্র নয়, বরং ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে দরিদ্র হয়ে পড়ে, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে না। তিনি বলেন, সমাজে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণার কারণেই মানুষ কষ্ট ভোগ করে। প্রফেসর ইউনূস বলেন, মানুষ জন্মগ্রহণ করে চাকরি খোঁজার জন্য নয়, বরং তারা সৃষ্টিশীল। মানুষকে চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করতে হবে। নারীদের বিপুল সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, এমনকি বাংলাদেশের দরিদ্রতম নারীও মাত্র ২০ মার্কিন ডলার ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারে। তিনি বলেন, নারীরা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় উদ্যোক্তা হতে পারেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. ইউনূস বলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত? শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো- সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে বিশ্বকে পরিবর্তন করা। বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে কার্বনমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা তার ‘তিন শূন্য তত্ত্ব’- শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য দারিদ্র্য এবং শূন্য বেকারত্ব ও সামাজিক ব্যবসার ওপরও আলোকপাত করেন, যা সমাজের সমস্যাগুলো সমাধান করে। তিনি বলেন, সকলেরই নিজেদেরকে ‘তিন শূন্য’ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।

চীন সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা: এদিকে চারদিনের সরকারি সফর শেষে চীন থেকে দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এয়ার চায়নার একটি বাণিজ্যিক বিমান শনিবার স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ৫৭ মিনিটে বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চিফ প্রোটোকল অফিসার হং লেই বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে বিদায় জানান। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৭শে মার্চ চীনের হাইনান প্রদেশে আয়োজিত বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া (বিএফএ) সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনের ফাঁকে তিনি বেশ কয়েকটি বৈঠকও করেন। প্রধান উপদেষ্টা ২৮শে মার্চ বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। তিনি টেকসই অবকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ, বাংলাদেশ ২.০ উৎপাদন ও বাজার সুযোগ এবং সামাজিক ব্যবসা, যুব উদ্যোক্তা এবং তিন শূন্যের বিশ্ব- এসব বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তিনটি গোলটেবিল বৈঠকেও যোগ দেন।

mzamin

চায়ের দেশের মনকাড়া জীববৈচিত্র্য by ইমাদ উদ দীন

দু’চোখ জুড়ে কেবল দৃষ্টি নন্দন নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নানা জীববৈচিত্র্যের সমারোহ। পাহাড়ি টিলা, নদী হাওর আর চায়ের দেশ। বলা চলে সবুজের স্বর্গরাজ্য খ্যাতি এ জেলার। প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত মৌলভীবাজারের প্রকৃতির অপরূপ রূপ মাধুর্যের কী নেই ওখানে। চোখের প্রতিটি পলকেই প্রশান্তির পরশ। এখানকার উজাড় করা ভূপ্রকৃতির অপরূপ লীলা নিকেতন এ যেন এক ব্যতিক্রমী মায়াবী দৃশ্য। ৯২টি চা বাগান, লেবু, আনারস, আগর-আতর ও রাবার বাগান, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড ও হামহাম জলপ্রপাত আর কতো কি। আর দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি ও তার জীববৈচিত্র্য। এ জেলার সৌন্দর্যবর্ধনের অন্যতম প্রাকৃতিক উপকরণ। সবুজ বন জীববৈচিত্র্য আর অনন্য প্রকৃতি। মনোমুগ্ধতার এক অন্যরকম আবেশ। 

মনকাড়া চায়ের রাজ্য: বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির ফোঁটায় সজীব সতেজ দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি। আর শুষ্ক মৌসুমে আধমরা চা গাছগুলো থাকে নির্জীব। বৃষ্টি এলেই পত্রপল্লবে জীবনচক্র ফিরে। তখন কী যে অপরূপ প্রাণবন্ত  প্রাণচঞ্চলতা। পাহাড়ি টিলার পরতে পরতে যেন সবুজের ঢেউ খেলা। আঁকাবাঁকা মেঠো পথে সকাল থেকেই চা কন্যারা কাজে ব্যস্ত। তাদের রপ্তকরা নিজস্ব কায়দা কৌশলে চা-পাতা চয়ন ব্যতিক্রমী শৈল্পিকতা। নানা হাড়খাটুনি কঠিন পরিশ্রমী এ মানুষগুলোর জীবন যুদ্ধের গল্প একটু ভিন্ন রকম। তাদের মানবেতর জীবনযাপনের মাঝেও আছে সমৃদ্ধ নিজস্ব সংস্কৃতি। তাদের মনোমুগ্ধকর চা নৃত্য বা কাঠি নৃত্য সমৃদ্ধ করেছে সংস্কৃতিকে। দেশে ১৬৭ চা বাগানের মধ্যে  মৌলভীবাজার জেলার ৭টি উপজেলায় রয়েছে ৯২টি।  

জলপ্রপাত: মাধবকুণ্ড আর হামহাম জলপ্রপাত আকৃষ্ট করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। দেশের অন্যতম জলপ্রপাত দু’টির অবস্থান যেমন জেলার দু’টি উপজেলায়। তেমনি ব্যতিক্রমী গুণে মুগ্ধ করছে পর্যটকদের। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত জেলার বড়লেখা উপজেলার কঠিন পাথরের পাহাড় পাথারিয়া পাহাড়ের উপর বহমান গঙ্গামারা ছড়া মাধবকুণ্ড  জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ে, ১৬২ ফুট  উপর থেকে পড়ে তা মাধবছড়া দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপর থেকে পানি নিচে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট কণ্ড। আর ডান পাশে সৃষ্টি হয়েছে পাথরের গুহা। ওই দৃশ্যগুলোই মাধবকুণ্ডের আর্কষণ। এডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে হামহাম জলপ্রপাতের গুরুত্ব অন্যরকম। গহীন অরণ্যের ১৩৫/১৪৭ ফুট উচ্চতার এই অনিন্দ্য সুন্দর এই জলপ্রপাতটি জেলা কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি কুরমা বনবিটে অনেকটা   গোপনীয়তায় তার রূপ মাধুর্য জানান দিচ্ছে।  

হাকালুকি হাওর: দেশের সবচেয়ে বড় ও এশিয়ার অন্যতম হাওর হাকালুকি। মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ৫টি উপজেলার ১৮,১১৫ হেক্টর আয়তনের অর্ধশতাধিক বিলের এই বিশাল হাওর বিপন্ন ও বিলুপ্ত প্রজাতির জলজ জীববৈচিত্র্যের নিবাস। মিঠাপানির মাছ, দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির অন্যতম আধার হাওরটি বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে মনকাড়া রূপ সৌন্দর্যে আপন করে কাছে টানে প্রকৃতিপ্রেমীদের।

বৃষ্টিবন লাউছড়া: গহীন বনে বন্যপ্রাণীর হাঁকডাক আর অবাধ বিচরণ। জীববৈচিত্র্যের সমারোহের এমন নজরকাড়া অপরূপ প্রকৃতির আধার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার জাতীয় উদ্যান। বৃষ্টি বন বা রেইন ফরেস্ট ‘লাউয়াছড়া’। দেশের অন্যতম ও  জেলার একমাত্র এই জাতীয় উদ্যানটি দেশি-বিদেশি প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। উদ্যানের প্রবেশ পথে সারিবদ্ধ গাছ আর আঁকাবাঁকা রেলপথ আকৃষ্ট করে যে কাউকে। কি নেই ওখানে। সবুজ গাছগাছালি, বনজজঙ্গল আর লতাগুল্মের মধ্যেই নানা জাতের বন্যপ্রাণীর আপন নিবাস। সূর্যোদয় কিংবা গোধূলীলগ্নে ওখানকার বাসিন্দারা জানান দেয় এটাই তাদের আপন ভুবন। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশে অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে লাউয়াছড়া অন্যতম। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়া বনের অবস্থান। বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণী, ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছগাছালি আর লতাগুল্ম। নানা জাতের পাখি আর সবুজ প্রকৃতিতে ভরপুর ‘ট্রপিক্যাল  রেইন ফরেস্ট’ হিসেবে খ্যাত লাউয়াছড়া। এ জেলার  চা বাগান, অর্ধশতাধিক রাবার ও আগর বাগান, কমলা, লেবু ও আনারস বাগান, হাওর, মাধকণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, মাধপুর লেক, আলী আমজদের নবাববাড়ি, খাসিয়াপুঞ্জি ও পান চাষ, বাইক্কাবিলসহ নানা আর্কষণীয় দর্শনীয় স্থান দেখার পরও পর্যটকরা ছুটেন লাউছড়ায়। জানা যায় ১৯২৫ খিষ্টাব্দে বৃটিশ সরকারের উদ্যোগে ওখানে লাগানো হয় নানা জাতের গাছগাছালি। বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১,২৫০  হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ খিস্টাব্দে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। জানা যায় বিশ্বখ্যাত ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টিডেজ’ ছবির একটি অংশের শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়ায়। এ ছাড়াও মাধবপুর লেকসহ জেলা জুড়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক ছোট বড় দৃৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট। এবার ঈদে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। রয়েছে তাদের সে রকম প্রস্তুতি। পাঁচতারকা মানের দুসাই রিসোর্ট ও গ্র্যান্ড সুলতানসহ শতাধিক হোটেলমোটেল ও রিসোর্ট পর্যটক বরণে প্রস্তুত। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্র জানায়, পর্যটক বরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা এজেলায় আগত পর্যটকদের নির্বিঘ্ন সেবা দিতে প্রস্তুত।
mzamin

রমজানে জেগে থাকে সিলেট by মিজানুর রহমান

পুণ্যভূমি সিলেট। আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ওই শহর নিয়ে রয়েছে নানা মিথ। মুসলিম অধ্যুষিত সিলেটে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়। রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় দেশের অন্য অনেক শহরে দিনের বেলা হোটেল রেস্তরাঁ বন্ধে জোরজবরদস্তির খবর মিলে। কিন্তু সিলেটে এটি হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের খানাপিনার জন্য যেটুকু খোলা থাকে তাতে কেউ কখনো প্রতিবন্ধকতা দূরে থাক ফিরেও তাকায় না। রমজানের রাতে সিলেট শহরটি জেগে থাকে। ব্যবসা-বণিজ্যের জন্য নয় বরং ইবাদত বন্দেগেী, জিকির-আজকারের জন্য। সিলেটের সবক’টি মসজিদে রাতভর ইবাদতে কাটান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজন। তারা ডেভিল তথা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিজের নফ্‌স বা আত্মাকে বাঁচাতে আল্লাহ্‌র দরবারে ধরনা দেন। আদালত ছাড়া শহরের অন্যত্র সকালে লোকজনের ভিড় তেমন হয়না বললেই চলে। তবে হ্যাঁ, ইফতার থেকে সেহ্‌রি অবধি অন্যরকম এক সিলেট।

বাইরে থেকে সিলেট অঞ্চলে ঢুকলেই আচমকা শীতল বাতাস মনে প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দেয়। এ নিয়ে অনেক মিথ আছে। বোদ্ধারা নানা ব্যাখ্যা দেন। পাশেই ভারতের ডাউকি। বিস্তীর্ণ পাহাড়। ওখান থেকে ধেয়ে আসা শীতল সিলেটের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। শুধু কী তাই- রমজানের শুরুতেই সিলেট নগরে পা দিয়েই আন্দাজ করা গেল ভিন্নতার। ইবাদতের একটি শহর। গোটা রাতই জেগে থাকে সিলেট নগরী। মসজিদে মসজিদে চলে ইবাদত। যার সমাপ্তি ঘটে ফজরে নামাজের মধ্য দিয়ে। নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার থেকে হাঁটার রাস্তা নাইওরপুল। রাত তখন একটা। পয়েন্টের পাশে নাইওরপুল জামে মসজিদ। ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। শুধু শব্দ বললে ভুল হবে, রীতিমতো আর্তনাদ। কয়েক শ’ মুসল্লি জামাতবদ্ধ হয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করছেন। মধুর সুরে হচ্ছে কোরআন তিলাওয়াত। নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন মুসল্লিরা। যারাই নাইওর মসজিদের সামন দিয়ে যাচ্ছেন কান্নার শব্দ শুনছেন। মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই আবেগী পরিবেশ। আলো-আঁধার ঘেরা মসজিদের ইবাদতরত মুসল্লিরা কেউ কারও দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। নামাজ শেষ করে ইমাম সাহেব বসলেন। শুরু হলো জিকির পর্ব। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে জিকির আজকার চলে। মুসল্লিরা প্রাণখোলা ইবাদতে মশগুল। জিকিরের ফাঁকে ফাঁকে চলে নবী (সা.) শানে দরূদপাঠ, তাওবা-ইস্তেগফার। জীবনের সব ভুলত্রুটি স্মরণ করে ইমাম সাহেবের সঙ্গে সবাই তওবা করেন। এ পর্ব শেষ হতেই শুরু হয় মোনাজাত। প্রায় ২০ মিনিটব্যাপী চলা মোনাজাতে শুধু কান্না আর কান্না। নাইওরপুল জামে মসজিদের এই ইবাদত- বন্দেগীর খবর জানেন গোটা সিলেটবাসী। সময় পেলে অনেকেই ঢুঁ মারেন মসজিদে। রমজানের শুরু থেকে প্রতিরাতে এই রুটিন। দূর-দূরান্ত থেকে পরহেজগার মুসল্লিরা এসে শামিল হন। হাজী ইসমাইল হোসেন। নগরের কুমারপাড়ার বাসিন্দা। সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত। করোনাকাল ছাড়া জীবদ্দশায় প্রতিটি রমজানেই তিনি এ মসজিদে এসে ইবাদত করেন।

মানবজমিনকে জানালেন- এ মসজিদের ইবাদতে তৃপ্তি মেলে। মহান আল্লাহ্‌র কাছে মুসল্লিরা নিজেদের সব উজাড় করে দিয়ে ইবাদতে মশগুল হতে পারেন। এটি অন্যরকম এক আবেগ। বলে বুঝানো যাবে না। তিনি জানান- রমজানে সিলেট শহর সহ আশপাশের এলাকার মানুষ এই মসজিদে ইবাদতে এসে শরিক হন। রাত পৌনে একটা থেকে শুরু হয় দলবদ্ধ ইবাদত পর্ব। ভোররাত পর্যন্ত চলে। এবার অনেকেই এ মসজিদে এতেকাফরত। সিলেট শহরের জিরো পয়েন্টের অদূরে ওলিকুল শিরোমনি হযরত শাহ্‌জালাল (র.) এর দরগাহ্‌। সিলেটের স্থানীয় অনেক মানুষ এটিকে ‘বাদশার বাড়ি’ বলে ডাকেন। আবেগপূর্ণ বন্দেগীর তীর্থ স্থান। রমজানের শুরু থেকে নগর এবং নগরের বাইরের গন্তব্যস্থল থাকে দরগাহ। বিশেষ করে তারাবির নামাজ পড়তে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন মানুষ। তারাবির নামাজে সবচেয়ে বেশি মুসল্লি হয় দরগাহে। তারাবিহতে বিশেষ আকর্ষণ প্রধান ইমাম হাফেজ মাওলানা আসজাদ আহমদ। তার তিলাওয়াত শুনে শুনে নামাজে শরিক হতে অনেক মুসল্লিই আসেন। মধুর কণ্ঠের তিলাওয়াতে তারাবির সময় গোটা দরগাহ এলাকায় পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। ওল্ডহাম বিএনপি’র সভাপতি ও বৃটেনের ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন এবার রমজানের শুরু থেকেই সিলেটে। থাকছেন দরগাহ এলাকায়। প্রতিদিনই তারাবির নামাজে শরিক হন। জানালেন; মক্কা-মদিনার সঙ্গে অন্য কোথাওর তুলনা হয় না। সিলেটের সেই পবিত্র নগরীর ঘ্রাণ পাই, নামাজ পড়ে প্রশান্তি পাই।

এ কারণে রমজানে দেশে থাকলে সিলেটে বিশেষত দরগাহে এসে নামাজ পড়ি। ইফতার ও সেহ্‌রিতে দরগাহে এলাহী কাণ্ড। কয়েকশ’ মানুষের ইফতার ও সেহ্‌রির আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে ইফতারে অনেকেই এসে শরিক হন। গরিব-দুঃখী যেই হোন না কেন কোথাও ইফতার না পেলে দরগাহে মিলবে। ব্যক্তি বা সংস্থার উদ্যোগে ইফতারে শরিক হওয়ার রীতিও রয়েছে। এজন্য অনেকেরই পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন হয়ে থাকে। ৩৬০ আউলিয়ার শহর সিলেট। গোটা শহরজুড়েই মাজার আর মাজার। সড়কের মধ্যখানেও মাজার। রাতভর এসব মাজারে চলে ইবাদত-বন্দেগী। স্থানীয় অনেকেই আসেন মাজার জিয়ারতে। ইতিহাস বেত্তাদের ভাষ্য মতে, প্রায় ৭০০ বছর ধরে এই রেওয়াজ রয়েছে সিলেটে। স্থানীয়দের মতে; সিলেট হচ্ছে- আদবের শহর। এখানে ৩৬০ আউলিয়া শুয়ে রয়েছেন। বেয়াদবি চলবে না। ফলে আদব রেখেই চলতে হয় সিলেটের মানুষকে। মিথ আছে এই শহরে ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর! ৩৬০ আউলিয়া আসার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছিলেন গাজী বুরহান উদ্দিন (রহ.)। শহরের পূর্বপাশে তার মাজার। পাশে বিশাল মাদ্রাসা। রাতভর ইবাদত-বন্দেগী চলে মাদ্রাসা ও মসজিদে। মাদ্রাসার মুহতামিম শায়েখ নাসির উদ্দীন দরগাহ ইমামসাব হুজুরের ছাত্র। এখন তিনি নিজেই বয়োবৃদ্ধ। জানালেন- সিলেটের মানুষ ধর্মপ্রাণ। রাতভর ইবাদত- বন্দেগীতেই কাটান। এই রেওয়াজ পূর্ব-পুরুষদের আমল থেকে। দিন দিন মানুষ আরও ধর্মপ্রাণ হচ্ছে। তিনি বলেন- পবিত্র শহর সিলেটের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখানকার আলেম- উলামাদের অবদান অনেক বেশি। তাদের মেহনতের কারণেই সিলেট তার ধর্মীয় গতিপথ ঠিক রেখেছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। আউলিয়ার শহরের পাশাপাশি সিলেট আলেম-উলামাদের শহর। তাদের সিলসিলাও আলাদা। তবে আক্বিদাগত তেমন পার্থক্য নেই। এ কারণে আলেমদের মধ্যে ঐক্য রয়েছে।

সকাল হলে সিলেটের মাদ্রাসা-মসজিদ থেকে ভেসে আসে কোরআন শিক্ষার সুর। মাদ্রাসার ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে রমজান মাস জুড়ে সহি-শুদ্ধ কোরআন পড়ার তালিম দেয়া হয়। নাইওরপুল মসজিদে রাত ৩ টায় তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে চোখ মুছতে মুছতে বের হচ্ছেন  মুসল্লিরা। গতকাল গভীর রজনীতে কথা হয় এক মুসল্লির সঙ্গে। তিনি জানান- আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ আর মাফি পেতে নীরবে প্রতিদিন আসি।  নামাজ পড়ে  ইমাম ও খতিব নাজিম উদ্দিন কাসেমী সাহেব দোয়ায় অংশ নেই। আমার মনে হয় যেন আল্লাহ্‌ আমার ফরিয়াদ শুনছেন। আশা করি ক্ষমা করবেন। নয়াসড়ক মসজিদে প্রতিবছর আগমন করেন আওলাদে রাসূল (সা:) আরশাদ মদনী (র:)। তিনি তাহাজ্জুদের জামাত পড়ান। সেখানে নামাজ পড়তে আসেন সমগ্র সিলেট বিভাগ থেকে মুসল্লিরা। এই নয়াসড়ক পয়েন্ট এখন মাদানি চত্বর নামে নামকরণ  করা হয়েছে। ইবাদত পিপাসুদের অনেকে এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে ছুটে যান একটু প্রশান্তি আর আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দাদের সহবতের আশায়। তাহাজ্জুদে আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করার আশায় পরেহজগার সাদাসিধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ লক্ষ্মণীয়। নগরীর বন্দরবাজার জেলরোডস্থ শাহ্‌ আবু তুরাব মসজিদও সারা রাত ইবাদতের একটি কেন্দ্র। সেখানে হযরত আব্দুল্লাহ (র:) হরিপুরীর সাহেবজাদা মাওলানা হেলাল আহমদ ও শায়খুল হাদিস আব্দুল কাদির বাগরখালী নসীহত পেশ করেন। তাহাজ্জুদের নামাজে ইমামতি করেন- মসজিদের পেশ ইমাম মো. আবদুস শহীদ। ওই মসজিদে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাধারণ মুসল্লিরা নামাজ আদায় ও ইবাদত-বন্দেগী করেন।

অনেক মুসল্লি জানান-  আধ্যাত্মিক সিলেটের এই আমলের প্রথা বাপ- দাদার মুখে শুনে এসেছেন। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভই একমাত্র প্রত্যাশা আগত মুসল্লিদের। ইসলামের দাওয়াত আর ধর্মীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে প্রাচীন শ্রীহট্টে আগমন ঘটে দরবেশ ও আউলিয়া হযরত শাহ্‌জালাল (র:)-এর। এই দরবেশের সঙ্গে আসেন হযরত শাহ্‌পরাণ (র:)সহ ৩৬০ আউলিয়া। এখানে সূফি-সাধকরা ইসলামের পতাকা উড়ান। গোটা অঞ্চলে হয় ইসলামের প্রচার। সিলেটেই শায়িত আছেন তারা। তার পথ ধরে ইসলামের মহান বাণী প্রচার করছেন শায়খে বরুনা,  ইদ্রিস লক্ষ্মীপুরীর মতো শায়খরা। তাদের নসীহত শুনেন ইবাদত-পিপাসু মুসল্লিরা। তরুণ প্রজন্মও হাঁটছে সেই পথ ধরে। সিলেটের বুজুর্গ ও অলিদের এই ত্যাগ যুগ যুগ থেকে সিলেটবাসী কদর করে আসছে। রমজানের পবিত্র মহিমায় আধ্যাত্মিক সিলেট যেন সত্যিই একখণ্ড পুণ্যভূমি।