Thursday, July 12, 2018

নেপাল: সম্পর্ক পুনঃবিন্যস্থকরণ by আর কে রাধাকৃষ্ণান

প্রদীপ কুমার গেওয়ালি
প্রদীপ কুমার গেওয়ালি গত মার্চে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশটি তার দুই এশিয়ান জায়ান্ট ভারত ও চীন এবং বিশ্বপর্যায়ে বিভিন্ন প্রভাবশালীদের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার কাজে সচেষ্ট হয়েছে। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশকের প্রথম সময় পর্যন্ত স্ব-শিক্ষিত কমিউনিস্ট ও পার্টির কর্মী ভূবেষ্টিত দেশটিতে অদ্ভূত সমস্যায় পড়েছেন। চীনে প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলির সফরের আগে তাকেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তার অন্যতম দায়িত্ব হলো ভারতের সাথে নেপালের সম্পর্ক পুনঃবিন্যাস করা। সম্প্রতি তিনি ফ্রন্টলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে অনেক কিছু বলেছেন। এখানে সংক্ষিপ্তাকারে তা তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: নতুন সরকার দীর্ঘ অস্থিতিশীলতার পর স্থিতিশীলতার আশাবাদ সঞ্চার করেছে। গত দুই দশকের মধ্যে কোনো সরকারই আট বা নয় মাসের বেশি টিকতে পারেনি। কেন?

জবাব: নেপালি জনগণের প্রধান সমস্যা হলো অস্থিতিশীলতা। ফলে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এত দুর্বল রয়ে গেছে যে এর ফলে বিদেশী হস্তক্ষেপ অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি করে। আমরা স্থিতিশীল সরকারের দিকে নজর দিয়েছি, যাতে সরকার তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে। কোনো সরকার যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে তাদের পরিবর্তন করার অধিকার রয়েছে জনগণের। এটিই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়।

প্রশ্ন: দুই কমিউনিস্ট পার্টির একীভূত হওয়ার ফলে পার্লামেন্টে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ২৭৫টি পার্লামেন্টারি আসনের মধ্যে আপনারা পেয়েছেন ১৭৪টি। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক আচরণবিধি ছুঁড়ে ফেলতে আপনাদের সাহসী করবে?

জবাব: আমি বলব, এখানকার কমিউনিস্ট পার্টির বৈশিষ্ট্য অনন্য। সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত সব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার নেপালি কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলনে একীভূত হয়েছে। অনেকে ভীতির সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে বাম শক্তি অগণতান্ত্রিক শক্তির দিকে ছুটবে। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বাস্তবে আমরাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রপথিক।

প্রশ্ন: কমিউনিস্ট আন্দোলন কিভাবে জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধের ধারণার মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে?

জবাব: নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি নেপালি জনগণের সব আন্দোলনের প্রধান প্রধান ধারার প্রতিনিধিত্ব করে।এসব ধারার মধ্যে আছে দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ। তাছাড়া আমরা সংস্কারবাদী ও মানবিক প্রকৃতির। এসব কারণেই এখানকার কমিউনিস্ট পার্টি এত শক্তিশালী ও জনপ্রিয়।

প্রশ্ন: দুই কমিউনিস্ট পার্টি কি মদেশি ও উপজাতীয় লোকজনের ব্যাপারে একমতে আসতে পারবে?

জবাব: নেপালে কমিউনিস্ট আন্দোলন শুরু হয়েছে কেবল শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে মতাদর্শে নিয়ন্ত্রিত হয়ে। ধীরে ধীরে এটি বিভিন্ন কর্মজীবী শ্রেণির প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে ওঠে। তবে নেপালে দুই ধরনের শোষণ রয়েছে। একটি হলো শ্রেণিগত বৈষম্য, অপরটি হলো সামাজিক বৈষম্য- যেমন জেন্ডার বৈষম্য, দলিতদের প্রতি বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বৈষম্য। আমরা এসবের মধ্যে ভারসাম্য বিধানের চেষ্টা করছি, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছি।

প্রশ্ন: কোয়ালিশনের দুই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যকার বিভাজন কিভাবে সরকারে কাজ করবে? আপনারা প্রথমে একীভূত হওয়ার সমঝোতা করলেন, তারপর তা বাস্তবায়নে লাগল প্রায় আট মাস। এখন শোনা যাচ্ছে, অনেক নেতাই ক্ষমতা কাঠামোতে পদ চায়।

জবাব: ১৯৯০-এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির দুটি পতাকা ছিল। ১৯৯৬ থেকে ২০০৬-০৭ সময়কালে দুটি ধারার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য ছিল। তারা একে অপরকে হটিয়ে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নেপালে সশস্ত্র সংগ্রাম, সহিংসতার পথ সফল হয় না। তারপর মাওবাদীরা বুঝতে পারল, তারা যদি তাদের নীতি ও কর্মপন্থা না বদলায়, তবে তাদের মারাত্মক ক্ষতি হবে। পর তারা তাদের পথ বদলিয়ে সামরিক শাখা গুটিয়ে বহু দলীয় গণতন্ত্রকে গ্রহণ করে নেয়। দুই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সহযোগিতার এটি ছিল শক্ত ভিত্তি।

গত ১০ বছর ছিল আরেকটি প্রতিযোগিতার সময়। দলগুলোর মধ্যে কিছুটা দোটানা ছিল। কমরেড প্রচন্ড [পুষ্প কমল দহল] একবার বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‌‘আমি কি প্রধানমন্ত্রী না আমি প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা?’ ওই ছিল মানসিকতা। তারা ক্ষমতা গ্রহণ করেই সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটি বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত ছিল না। পরে তা বুঝতে পেরেছিল।

ইউএমএলের শক্ত ভিত্তি রয়েছে। তারা একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও তা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। আমরা স্থিতিশীলতা চেয়েছিলাম। আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাত দশক ব্যয় করেছি। এখন আমরা সমৃদ্ধ সমাজ গঠন করার দায়িত্ব পেয়েছি। মাওবাদীরাও বুঝতে পেরেছে, এখন সময় হলো ইউএমএলের সাথে সহযোগিতা করার।

জোট সরকার কাজ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে শুরুতে দ্বিধা ছিল। কিন্তু এখন আমরা পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী যে আমরা পারব। দলটি কেবল আদর্শগতভাবেই নয়, কাজ করার স্টাইলেও একতাবদ্ধ।

প্রশ্ন: ৩ জুন সম্পাদকদের বৈঠকে আপনি বলেছেন, এখন থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অন্যান্য দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এজেন্ডায় পরিণত হবে না। এটি কি অবরোধ-পরবর্তী রাজনীতি?

জবাব: হ্যাঁ। আমাদের ধারাবাহিক ও দৃঢ় নীতি এমনই হওয়া উচিত। অতীতে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডায় [ভারত ও নেপালের মধ্যে] প্রভাব ফেলেছে। আমরা লজ্জায় পড়েছি যখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিদেশে গিয়ে বলেছেন যে আমাদের সংবিধান এভাবে কিংবা ওভাবে পরিবর্তন হবে।

এখন ভারত বা চীন কিংবা অন্য কোনো দেশের সাথে আলোচনার সময় আমরা কখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো আনব না। দ্বিতীয়ত, আমাদের একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। ভারতের নিজস্ব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। একইভাবে চীনেরও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমরা তাদের আকাঙ্ক্ষার অংশ হবো না।

প্রশ্ন: ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় সবসময়ই থাকবে: উন্মুক্ত সীমান্ত, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নেপালি অবস্থান, নেপালি রুপির নিশ্চয়তা দানে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক ইত্যাদি। ভারত-নেপালের বর্তমান সম্পর্কে আলোকে এগুলো নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার দরকার আছে কি?

জবাব: অনেক সময় ‘বিশেষ’ শব্দটির নানা ব্যঞ্জনা থাকে। আমাদের উচিত হবে ওই শব্দটি ব্যবহারে সংযত থাকা। তবে এটি অনন্য বিষয়। উন্মক্ত সীমান্ত, সাংস্কৃতিক সান্নিধ্য, একই খাবার ইত্যাদি ব্যাপারে কথা বলার অধিকার আছে। দ্বিতীয়ত, ‘ইমিন্যান্ট পারসনস গ্রুপ’ আমাদের সামগ্রিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছে। নেপাল ও ভারতের মধ্যকার ১৯৫০ সালের চুক্তিটি পুরোপুরি পর্যালোচনা করা উচিত। রানাদের সই করা ওই চুক্তিতে অনেক অন্যায় বিষয় রয়েছে। আমরা পর্যালোচনা করে পারস্পরিক আস্থা ও মিত্রতার ভিত্তিতে নতুন চুক্তি করব।

প্রশ্ন: সবশেষে আসে ভারত-নেপাল সমীকরণ। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ এই ইস্যুটি নিয়ে জর্জরিত। আপনারা কিভাবে এর মোকাবিলা করবেন। চীন সফরে গিয়ে আপনারা অনেক বড় তালিকা উপস্থাপন করেছেন।

জবাব: আমরা চীনের সাথে বৃহত্তর অংশীদারিত্ব চাই। আমরা মঞ্জুরির চেয়ে শিথিল ঋণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারণ মঞ্জুরি অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় শর্তের সৃষ্টি করে। তবে আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই, নেপালের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো উভয় পক্ষের কাছ থেকে কল্যাণ লাভ করা। অন্য কোনো দেশের সাথে নেপালের সম্পর্ক নিয়ে সংশয়ে না পড়ার জন্য আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের বারবার অনুরোধ করছি। আমরা যখন চীনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলি, তা ভারতের বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য নয়। আমাদের মুখ্য নীতি হলো, আমরা আমাদের মাটিকে কোনো প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দেব না। আমরা উভয় দেশের প্রকৃত উদ্বেগের ব্যাপারে সর্বাত্মক যত্নশীল থাকব।

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার স্থির, বছরে যোগ হচ্ছে ২২ লাখ মানুষ by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

৩৫ বছর বয়সী নাজমা ছয় সন্তান নিয়ে কষ্টে জীবনযাপন করছেন। স্বামী ইউসুফ দিনমজুরি করে সংসার চালান। এত বড় পরিবার নিয়ে তার স্বামীও সন্তুষ্ট নন। ইউসুফ বলেন, আগে বুঝতে পারিনি। এখন চেষ্টা করছি জনসংখ্যা যাতে আর না বাড়ে। রাজধানীর পলাশী মোড়ে ইডেন কলেজের দেয়ালের সঙ্গে ঝুপড়ি ঘর পেতে থাকেন হাজেরা। ২৩ বছর বয়সী এই মহিলা জানান, তার বাল্যবিবাহ হয়েছে। এই মুহূর্তে তিনি তিন সন্তানের জননী। তার স্বামী রিকশা চালান। কষ্টে দিন কাটে তাদের।
তিনি জানান, সরকারের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের  লোকজন বছরেও একবার আসেন না। প্রশ্ন করে বলেন, আমরা গরিব মানুষ, ওষুধ কিনার টাকা পাবো কোথায়। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা কম। তাই সন্তান নিয়েছি। এখন বাচ্চা লালন-পালনে কষ্ট হচ্ছে। নদী ভাঙার কারণে জামালপুর জেলা  থেকে এই শহরে আসা তাদের। শুধু নাজমা দম্পতিই  নন, দেশে প্রতিদিন জনসংখ্যা বাড়ছে ৫ হাজার ২০৫ জন। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭-এর ১লা জুলাই পর্যন্ত ১৯ লাখ লোক বৃদ্ধি পেয়েছে দেশে। ২০১৬ সালে লোক ছিল ১৬ কোটি ৮ লাখ। ২০১৭-এর ১লা জুলাই এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ কোটি ২৭ লাখ জনসংখ্যা। এটাকে প্রাক্কলিত জনসংখ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
বিবিএস আরো বলছে, গত পাঁচ (২০১৩ থেকে ২০১৭) বছরে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়েনি। প্রায় একই রকম রয়েছে। স্থবির হয়ে আছে। ব্যবহারকারীর সংখ্যাও আর বাড়ছে না। দেশের জনসংখ্যার ওপর পড়ছে এর বিরূপ প্রভাব। ১লা জানুয়ারি ২০১৮ সালে প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৬ লাখ। টিএফআর ২ দশমিক শূন্য ৫। বিবিএস চলতি বছরের ৩০শে জুন ‘বাংলাদেশ স্যাম্পেল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৭’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি প্রাক্কলিত (ইস্টিমিটেড) জনসংখ্যা।
১০ই জুলাই পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরে এক ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, প্রতি বছরে দেশে নতুন করে ২২ লাখ লোক যোগ হচ্ছে। যা একটি জেলার লোকের সমান। তিনি বলেন, বর্তমানে টিএফআর ২ দশমিক ৩। অর্থাৎ গড়ে একজন নারী দুজনের উপরে সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। টিএফআর দুই থাকলে ভালো হতো বলে তিনি উল্লেখ করেন। রিমোট বা দুর্গম এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা দুর্বল স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চেষ্টা চলছে দুর্বলতা দূর করার।
জাতিসংঘ ২০১৫ সালের জনসংখ্যা বিষয়ক প্রজেকশন বলেছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা আগামী ২০৫০ সালে ২০২ মিলিয়ন হবে। অর্থাৎ ২০ কোটি ২০ লাখে দাঁড়াবে। দেশে পরিবার পরিকল্পনার কর্মসূচির সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন বহু দম্পতি। কালেভদ্রে যেটুকু পান তা আবার এনজিও কর্মীদের কাছ থেকে। অনেকে আবার টাকার অভাবেও এনজিওদের পন্থায় পরিবার পরিকল্পনার কর্মসূচি নিতে পারেন না। ফলে থমকে যেতে বসছে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, এমনই মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী দম্পতিদের কাছে পৌঁছায় না বলে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
অনেককে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকারি কোনো ধরনের সুবিধা না পেয়ে তারা পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারছে না বলে অভিযোগ আসছে।
বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখাতে পেরেছিল জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার (কন্ট্রাসেপটিভ প্রিভিলেন্স রেট-সিপিআর) বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে সক্ষম দম্পতি প্রায় ৮ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। প্রতি দশকে এর ব্যবহার বেড়েছে। ২০০০ সালে এই হার বেড়ে ৫৪ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপরের ১০ বছরে গতি অনেকটা শ্লথ হয়ে পড়ে। ২০১১ সালে এর হার ছিল ৬১ দশমিক ২ শতাংশ।
২০১২ সালে ছিল ৬২ দশমিক ২ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ছিল ৬২ দশমিক ৩। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার তেমন বাড়েনি। প্রায় একই রকম রয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী শহর অঞ্চলের (৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ) মহিলারা গ্রামাঞ্চলের (৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ) মহিলার চেয়ে বেশি হারে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের সঙ্গে মোট প্রজনন হারের (টোটাল ফার্টিলিটি রেট-টিএফআর) সম্পর্ক সরাসরি। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারী যত সন্তানের জন্ম দেন, সেটাই টিএফআর।
১৯৭৫ সালে নারীরা মোট ছয়টির বেশি সন্তানের জন্ম দিতেন (টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৩)। ২০০১ সালের দিকে এই সংখ্যা ছিল ৩। ২০১৪ সালের হিসাব অনুসারে বর্তমানে টিএফআর ২ দশমিক ৩। অর্থাৎ গড়ে একজন নারী দুজন করে সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। ২০১৬ সালের মোট প্রজনন হার ২০১১ সালের মোট প্রজনন হারের (২ দশমিক ১১) থেকে সামান্য কম। প্রজননের সব পরিমাপ তুলনা করলে দেখা গেছে, সমপ্রতি বছরগুলোতে বাংলাদেশের জন্মের হার ২ দশমিক ১ এর কাছাকাছি। অনেকটা স্থির অবস্থায় আছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় মরণশীলতা ৫ দশমিক ১ জন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী মোস্তফা সারোয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদার হার পূরণের চেষ্টা চলছে। যারা পদ্ধতি গ্রহণ করতে চান কিন্তু সেখানে পৌঁছানো যাচ্ছে না। যোগাযোগ গ্যাপ রয়েছে। তাদের কাছে যাওয়ার কর্মসূচি নিচ্ছে সরকার। তিনি বিবিএসএস’র সূত্র ধরে বলেন, এখন টিএফআর ২ দশমিক ১। ভালো অবস্থানে আছে। এখন থেকে পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ দেয়ার জন্য একটি কল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। যার নম্বর ১৬৭৬৭ (সুখী পরিবার)।
পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণকারীর সংখ্যা হার সন্তোষজনক নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ দম্পতির মধ্যে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এখাতে জনবলও বাড়াতে হবে। অনেক মাঠকর্মী আছেন যারা মাঠে সঠিকভাবে কাজ করেন না। অনেকে মাঠেই যান না। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার প্রবণতা বেশি। ফলে নারী সন্তান ধারণে দীর্ঘ প্রজননকাল পাচ্ছে। বেশি সন্তান জন্মদানের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। আঠারো বছরের আগেই ৭৩ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশে। যা পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশি। সমাজের প্রচলিত প্রথা ও ধারণার কারণে অনেক মেয়ে শিশু বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে বলে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের গবেষণায় উঠে এসেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা গবেষণার এই ফলাফল তুলে ধরেন। গবেষণার প্রতিবেদনের ফলাফল উল্লেখ করে তারা বলেন, এশিয়ার তিনটি দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলের বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের হার বেশ উদ্বেগজনক।
পরিবার পরিকল্পনা মাঠকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অফিসিয়াল টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে পরিবার-পরিকল্পনা পরিদর্শকরা পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণকারী দম্পতির সংখ্যা তাদের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রার) খাতায় বাড়িয়ে লিখে থাকেন। একই সঙ্গে অফিসিয়াল টার্গেট পূরণ করতে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকরা ষাটোর্ধ্ব নারী ও পুরুষদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ করাচ্ছেন। এক হাজার টাকা ভাতা ও শাড়ি এবং লুঙ্গির লোভ দেখিয়ে তাদের এ বন্ধ্যাকরণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত ৪৫ থেকে ৫০ বছরের নারীর আর সন্তান ধারণ ক্ষমতা থাকে না। কর্মসূচির চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বলছে, বাল্যবিবাহ এখনও একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান।
১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে মেয়েদের বিয়ে না দেয়ার আইন থাকলেও ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে (বিডিএইচএস-২০১৪); ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের ৩১ শতাংশ প্রথম বা দ্বিতীয় বারের মতো গর্ভবতী হন; ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার অনেক কম (মাত্র ৪৭ শতাংশ); পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণের হার মাত্র ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ, পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদার হার এখনও ১২ শতাংশ; পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিতে ড্রপ আউটের হার এখনও ১২ শতাংশ; সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে ৬২ শতাংশ মায়ের প্রসব এখনও বাড়িতে সংগঠিত হয়; সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে মোট প্রজনন হার অন্যান্য বিভাগের চেয়ে এখনও বেশি; সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ধনী-গরিব, শহর, গ্রাম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে; দুর্গম এলাকার (হাওর, বাঁওড়, বিল, চর, পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকা) জনগণের নিকট এখনও পরিবার পরিকল্পনা সেবা যথাযথভাবে পৌঁছে দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর-উন-নবী মানবজমিনকে এ প্রসঙ্গে বলেন, এনালগ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে হবে না। অর্থাৎ পুরানো ধাঁচের কর্মসূচি দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা চলবে না। ইনোভেটিব এপ্রোচ লাগবে পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে। এখন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। মানুষকে আর্কষণ করে এমন কর্মসূচি দিতে হবে। মানুষের মূল্যবোধ হুড়হুড় করে পরিবর্তন হয় না। সম্পদের সঙ্গে জনসংখ্যার ব্যালেন্স দেখতে হবে। জনসম্পদ কাজে লাগাতে পারলে পরিবার পরিকল্পনা অটোমেটিক কাজে আসবে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ ১১ই জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করা হবে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-‘পরিকল্পিত পরিবার সুরক্ষিত মানবাধিকার।’

ন্যাটো মিত্রদের সামরিক ব্যয় বাড়াতে বলছেন ট্রাম্প

ব্রাসেলসে ন্যাটো সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর নেতারা
উত্তর আটলান্টিক দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটো মিত্রদের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন ২৯টি দেশের এই জোটের সদস্য দেশগুলোকে নিজেদের জিডিপি’র (গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট) চার শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বাড়াতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে জোটের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে সদস্য দেশগুলোর জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয় বাড়ানো। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যয় বৃদ্ধির তাগিদ না দিলেও জোটের নেতাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে বলেছেন। আর ন্যাটো মহাসচিব বলেছেন, জিডিপির দুই শতাংশ ব্যয় বাড়াতে সদস্য দেশগুলো সম্মত হয়েছে।
বুধবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে শুরু হয়েছে দুই দিনের ন্যাটো সম্মেলন। এতে যোগ দিচ্ছেন সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানেরা। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ন্যাটো মিত্রদের প্রকাশ্য সমালোচনা করে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প। বারবার তিনি বলে আসছেন যুক্তরাষ্ট্র অন্যায্য অতিরিক্ত ব্যয় করছে। তার দাবি অন্য ন্যাটো দেশগুলোর চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জিডিপির বহুগুন বেশি সামরিক ব্যয় করে আসছে। সম্মেলন সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সদস্য দেশগুলোকে ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বলে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বুধবার ন্যাটো সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে ন্যাটো সেক্রেটারি জেনস স্টোলেনবার্গ বলেছেন, সামনের বছরগুলোতে আরও বেশি ব্যয় করতে সদস্য দেশগুলো সম্মত হয়েছে। ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সব সদস্য দেশই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে। এই বছরে কমপক্ষে আটটি ন্যাটো সদস্য দেশ তাদের জিডিপির দুই শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর আমাদের বেশিরভাগ সদস্যদেশের ২০২৪ সালের মধ্যে এমনটি করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্টোলেনবার্গ বলেন, ‘এই শতকের এক চতুর্থাংশ বছর অনেক দেশ প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে হাজার হাজার কোটি ডলার কমিয়েছে। এখন তারা প্রতিরক্ষা বাজেটে হাজার হাজার কোটি মার্কিন ডলার যোগ করছে।’ তিনি বলেন, আসন্ন বছরগুলোতে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ব্যয় আরও ন্যায় সঙ্গতভাবে বন্টিত হবে। এই বছর থেখে শুরু করে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ন্যাটো মোট ২২ হাজার ছয়শো কোটি ডলার বরাদ্দ পাবে।
আল জাজিরা বলছে, স্টোলেনবার্গ ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর এই ব্যয় বৃদ্ধির আশ্বাস দিলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না।
‘রাশিয়ার কাছে জিম্মি জার্মানি’ -ট্রাম্প
ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েই বিতর্কের সৃষ্টি করে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বার্লিন ও মস্কোর মধ্যে গ্যাস নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে তাকে তিনি অসঙ্গত বলে আখ্যায়িত করেছেন। আক্রমণ শাণিয়েছেন জার্মানি ও রাশিয়ার প্রতি। তিনি দু’দিনের ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ব্রাসেলস পৌঁছেই বলেন, জার্মানি হলো রাশিয়ার কাছে জিম্মি (ক্যাপটিভ)। ক্ষুব্ধস্বরে তিনি এমন সমালোচনা করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ। এতে বলা হয়, অন্য বিশ্বনেতারা ব্রাসেলসে পৌঁছার আগেই বুধবার ন্যাটো সেক্রেটারি জেনারেল জেনস স্টোলটেনবার্গের সঙ্গে সকালে নাস্তার টেবিলে দার কণ্ঠ ধারালো করেন। এ সময় তিনি অন্য দেশগুলোতে তাদের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির তাগিদ দেন। ডনাল্ড ট্রাম্পের এমন সব মন্তব্যে এবার ন্যাটো সম্মেলনেও বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সমুহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে গত মাসে কানাডায় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে গিয়ে তিনি একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন। এমন কি ওই সম্মেলন থেকে যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছিল তাতে তিনি সম্মতি দেন নি। তিনি তার আগেই দলবল নিয়ে পাড়ি দেন সিঙ্গাপুরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে। তিনি এবার ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ব্রাসেলস পৌঁছে প্রথমেই টার্গেটে পরিণত করলেন জার্মানিকে। এ সময় তিনি বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে জার্মানি যে গ্যাস চুক্তি করেছে তাতে বার্লিন পুরোপুরি মস্কোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তার ভাষায় ‘আমি যতদূর জানি, জার্মানি রাশিয়ার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কারণ, তারা রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পাচ্ছে। আমরা জার্মানিকে রক্ষা করতে প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু তারা গ্যাস কিনছে রাশিয়ার কাছ থেকে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন। এটার কোনো ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ, তারা রাশিয়াকে গ্যাস কেনা বাবদ শত শত কোটি ডলার বিল দিচ্ছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের উচিত জার্মানির পক্ষ নেয়া’। ওই নাস্তার টেবিলে ডনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন ন্যাটো মহাসচিব। এ সময় তিনি ডনাল্ড ট্রাম্পকে ন্যাটোর অভিন্ন উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। জেনস স্টোলটেনবার্গ তাকে বলেন, ন্যাটো হলো ২৯টি জাতির জোট। এর মধ্যে মাঝে মধ্যে কিছুঠা পার্থক্য আছে। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকবে। কিছু অমতও থাকবে। এক্ষেত্রে রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত গ্যাস পাইপ লাইন হলো মিত্রদের মধ্যে ওইরকম একটি বিষয়। কিন্তু ন্যাটোর শক্তি বলে, এমন পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমরা সব সময়ই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে সক্ষম। পারস্পরিক সুরক্ষা, একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো এসবই হলো ন্যাটোর মূল কাজ। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি বিচ্ছিন্ন অবস্থার চেয়ে একত্রিত হলে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। এ সময় তিনি ট্রাম্পকে বুঝিয়ে দেন শীতল যুদ্ধের সময় রাশিয়ার সঙ্গে কি আচরণ করেছে ন্যাটোর মিত্ররা। ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী উরসুলা ভন ডার লিয়েন। তিনি বলেন, কোনো সংশয় ছাড়াই রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের প্রচুর ইস্যু আছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশ, মিত্র ও বিরোধীদের সঙ্গে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই যোগাযোগ রাখা উচিত।
ব্রাসেলসে ট্রাম্প-মার্কেল বাকযুদ্ধ
ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েই বিতর্কের সৃষ্টি করে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বার্লিন ও মস্কোর মধ্যে গ্যাস নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে তাকে তিনি অসঙ্গত বলে আখ্যায়িত করেছেন। আক্রমণ শানিয়েছেন জার্মানি ও রাশিয়ার প্রতি। তিনি দু’দিনের ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে বুধবার ব্রাসেলস  পৌঁছেই বলেন, জার্মানি হলো রাশিয়ার কাছে জিম্মি (ক্যাপটিভ)। ক্ষুব্ধস্বরে তিনি এমন সমালোচনা করেন। ট্রাম্পের এমন বিস্ফোরক মন্তব্যেল পাল্টা জবাব দেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। তিনি বলেন, জার্মানির স্বাধীনভাবে নীতি নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যাটোর অংশীদার দেশগুলো অধিক সুবিধা নিচ্ছে, ট্রাম্পের এমন অভিযোগের জবাবে মার্কেল বলেন, ন্যাটোয় এখনো জার্মানির বিপুল সৈন্য নিয়োজিত রয়েছে। এখনো আফগানিস্তানে আমাদের সৈন্য রয়েছে। সেখানে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও রক্ষা করছি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ। এতে বলা হয়, অন্য বিশ্বনেতারা ব্রাসেলসে পৌঁছার আগেই বুধবার ন্যাটো সেক্রেটারি জেনারেল জেনস স্টোলটেনবার্গের সঙ্গে সকালে নাস্তার টেবিলে তার কণ্ঠ ধারালো করেন। এ সময় তিনি অন্য দেশগুলোতে তাদের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির তাগিদ দেন। ডনাল্ড ট্রাম্পের এমন সব মন্তব্যে এবার ন্যাটো সম্মেলনেও বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে গত মাসে কানাডায় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে গিয়ে তিনি একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন। এমন কি ওই সম্মেলন থেকে যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছিল তাতে তিনি সম্মতি দেন নি। তিনি তার আগেই দলবল নিয়ে পাড়ি দেন সিঙ্গাপুরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে। তিনি এবার ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ব্রাসেলস পৌঁছে প্রথমেই টার্গেটে পরিণত করলেন জার্মানিকে। এ সময় তিনি বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে জার্মানি যে গ্যাস চুক্তি করেছে তাতে বার্লিন পুরোপুরি মস্কোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তার ভাষায় ‘আমি যতদূর জানি, জার্মানি রাশিয়ার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কারণ, তারা রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পাচ্ছে। আমরা জার্মানিকে রক্ষা করতে প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু তারা গ্যাস কিনছে রাশিয়ার কাছ থেকে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন। এটার কোনো ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ, তারা রাশিয়াকে গ্যাস কেনা বাবদ শত শত কোটি ডলার বিল দিচ্ছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের উচিত জার্মানির পক্ষ নেয়া’। ওই নাস্তার টেবিলে ডনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন ন্যাটো মহাসচিব। এ সময় তিনি ডনাল্ড ট্রাম্পকে ন্যাটোর অভিন্ন উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। জেনস স্টোলটেনবার্গ তাকে বলেন, ন্যাটো হলো ২৯টি জাতির জোট। এতে মাঝে মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকবে। কিছু অমতও থাকবে। এক্ষেত্রে রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন হলো মিত্রদের মধ্যে ওইরকম একটি বিষয়। কিন্তু ন্যাটোর শক্তি বলে, এমন পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমরা সব সময়ই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে সক্ষম। পারস্পরিক সুরক্ষা, একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো এসবই হলো ন্যাটোর মূল কাজ। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি বিচ্ছিন্ন অবস্থার চেয়ে একত্রিত হলে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। এ সময় তিনি ট্রাম্পকে বুঝিয়ে দেন শীতল যুদ্ধের সময় রাশিয়ার সঙ্গে কি আচরণ করেছে ন্যাটোর মিত্ররা। ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী উরসুলা ভন ডার লিয়েন। তিনি বলেন, কোনো সংশয় ছাড়াই রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের প্রচুর ইস্যু আছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশ, মিত্র ও বিরোধীদের সঙ্গে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই যোগাযোগ রাখা উচিত।

মামলা আর রিমান্ড জালে কোটা আন্দোলনের নেতারা : শ্রেণিকক্ষে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

মামলা আর রিমান্ড জালে বিপর্যস্ত কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা। এ পর্যন্ত আন্দোলনে যুক্ত ১০ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনকে পুলিশ রিমান্ডে নিয়েছে। আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানকে দুই দফায় ১৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। কারাগার ও রিমান্ডে থাকা শিক্ষার্থীদের পরিবার উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তি দাবি করছে তাদের পরিবার। রিমান্ডে নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাশেদ খানকে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
ছাত্রলীগ নেতার দায়ের করা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের  মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বাসভবনে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলা এবং পুলিশের যানবাহন ভাঙচুরের অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বাসভবনে হামলা ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় অন্য শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের আরেক নেতা ফারুক হাসানকেও রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার ফারুক, জসিম উদ্দিন ও মশিউর রহমানকে দুই দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এ ছাড়া পরীক্ষা থাকায় তরিকুল ইসলামের রিমান্ড নামঞ্জুর করেন আদালত। আন্দোলনে জড়িত আমান উল্লাহ, মাযহারুল, জাকারিয়া, রমজান ওরফে সুমন ও রবিনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।
শ্রেণিকক্ষে তালা দিয়ে মানববন্ধন: কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ, আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে গতকালও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফরম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি এখনো অব্যাহত রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৫টি বিভাগ। তালা দিয়ে বিভাগের সামনে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করেছে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোকাররম ভবন এলাকায় মানববন্ধন করে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড বহন করে।
আর শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচিতেও ছাত্রলীগ ভিন্নদিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। মানববন্ধনে নিজেদের কতিপয় কর্মীকে প্ল্যাকার্ড দিয়ে দাঁড় করিয়ে পুরো মানববন্ধনের কনসেপ্ট পরিপন্থি অবস্থান নেয় তারা। যদিও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে নিরাপদ ক্যাম্পাস ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে। তাদের বহন করা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- ‘হাতুড়ির স্থান পেরেকের উপর ছাত্রের উপর নয়’, ‘ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা চাই’, ‘আমার ক্যাম্পাসে আমি নিরাপদ তো?’, ‘ছাত্র আপনার, দায় নেবেন না কেন?’
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, অর্থনীতি বিভাগের রুশাদ ফরিদী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা প্রমুখ। এ সময় অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন অনেক দিন চলছিল। এটা ছিল ছাত্রদের আন্দোলন। আমরা এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে তখনি পাশে দাঁড়িয়েছি যখন ছাত্রদের উপর হামলা হয়েছে।
আমরা সচেতন ভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা দেখছি, যাদের উপর হামলা চালানো হয়েছে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাদের রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার করা হচ্ছে। যারা নিপীড়ক,  তারা সবাই চিহ্নিত। কিন্তু তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না।’ সহকারী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য ছাত্রদের আন্দোলন করার জন্য প্রেরণা দিচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ই আমাদের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভুল করতে পারে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা ভুল করতে পারে না।’ ছাত্রলীগকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যখন ঘোষণা দিলেন কোটা থাকবে না, তখন আপনারা আনন্দ মিছিল করলেন। বললেন আপনারা আগে ছাত্র পরে লীগ। কিন্তু যখন ছাত্ররা প্রজ্ঞাপনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করতে গেল তখনি হাতুড়ি দিয়ে হামলা চালালেন।’ এদিকে গতকালও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগ তাদের ক্লাস পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। অন্তত এমন ১৯টি বিভাগের খোঁজ পাওয়া গেছে যারা ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে- ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলা বিভাগ, আইন বিভাগ, অ্যাকাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ (২য় বর্ষ), মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, মার্কেটিং বিভাগ, ইএসওএল (৩য় বর্ষ), ইতিহাস, উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ (১ম বর্ষ),  লোক প্রশাসন (১০ম ব্যাচ), পালি এন্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ।
বহিরাগত ইস্যুতে মত পাল্টালো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ: এবার বহিরাগত ইস্যুতে নিজেদের মত পাল্টালো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কাউকে প্রবেশ বা গমনাগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় নাই।’ যদিও গত ৯ই জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বহিরাগতরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ/প্রক্টরের পূর্বানুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে অবস্থান ও ঘোরাফেরা এবং কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না’।
এ সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্রভাবে সমালোচিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত যত তাড়াতাড়ি উঠিয়ে নেয়া যায় ততই ভালো।’ সমালোচনার মুখে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কমিটির সিদ্ধান্তের বিষয়ে দেশের কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খণ্ডিতভাবে তথ্য প্রচারের ফলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কাউকে প্রবেশ বা গমনাগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় নাই।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে উৎসাহিত না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।’ এতে আরো বলা হয়, ‘যেসব সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের কথা প্রভোস্ট কমিটি বলেছে সেগুলো ঐতিহ্যবাহী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত রীতি-নীতি ও সিদ্ধান্তের আলোকে নেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সভা-সমাবেশসহ যে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি আবশ্যক হয়, এটা নতুন কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ পথে সব সময়েই পূর্বের ন্যায় বর্তমানেও নিরাপত্তা প্রহরী দায়িত্ব পালন করছে। তাদের দায়িত্ব পালনের অনুকূল কর্ম-পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। নিরাপত্তা প্রহরীদের দায়িত্ব ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা প্রদান করে থাকেন।
বর্তমান পদক্ষেপ তার অংশ মাত্র। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ ক্যাম্পাস পরিচালনার লক্ষ্যে যা করণীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ উল্লেখ করে এ বিষয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ।’
সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ক্লাস বর্জন ও আ ক ম জামালের হুমকি: এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মশিউর রহমানকে রিমান্ডে নেয়ার প্রতিবাদ ও তার মুক্তির দাবিতে ক্লাসে তালা ঝুলিয়ে বিভাগের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
এসময় শিক্ষার্থীরা মশিউরকে ছাড়া ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার পূর্ব ঘোষণায় অনড় থাকার কথা জানায়। এদিকে শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে বিভাগটির অধ্যাপক আ ক ম জামালের বিরুদ্ধে। তিনি পুলিশ ডাকবেন বলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হুঁশিয়ার করেন। সকাল ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিভাগের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলে সেখানে গিয়ে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ছবি তোলেন আ ক ম জামাল। এসময় তিনি সেখানে উপস্থিত বিভাগীয় চেয়ারম্যানসহ অন্য কয়েকজন শিক্ষকের সামনেই প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের দেখে নেয়ার হুমকি দেন। প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের তিনি বলেন, ‘ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কোনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।
আপনারা এগুলো বাদ দিয়ে  ক্লাসে যান। আপনারা একজন আইনজীবী ঠিক করেন। কোর্টে তার জন্য ফাইট করেন। আইনজীবী ঠিক করলে বিভাগ থেকে তার খরচের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে তাদের ধরা হচ্ছে।’ এসময় উপস্থিত সাংবাদিকরা তার কাছে এমন তথ্যের উৎস জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা অনুমান করতেছি।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরবর্তীতে অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, ‘তাদের কর্মসূচি পালন করার অধিকার আছে। আমার চলাফেরারও অধিকার আছে। আমি তাদের বলেছি যে, যদি তারা আমার চলাফেরায় বাধা দেয় তবে আমি পুলিশ ডাকব।’
উদ্বিগ্ন নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন: ক্যাম্পাসে মিছিল, মিটিং, বিক্ষোভ ও সমাবেশের মতো আন্দোলনের গণতান্ত্রিক ধারাগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কোনো ছাত্রসংগঠন বা পুলিশ যেন বাধা না দেয় সে দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা। এসময় তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসহ ছয় দফা দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের পক্ষে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী অর্ণি সেমন্তি খান।
দাবিগুলো হলো- মিছিল, মিটিং, বিক্ষোভ, সমাবেশের মতো আন্দোলনের গণতান্ত্রিক ধারাগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কোনো ছাত্রসংগঠন বা পুলিশ যেন বাধা না দেয়া; কোটা সংস্কার ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার দাবি করা যেসকল শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের অবিলম্বে মুক্তি ও আহতদের চিকিৎসা প্রদান; অহিংস মানববন্ধন ও মিছিলে বিনা উসকানিতে যারা হামলা করেছে তাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি; বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে সিট বণ্টনের দায়িত্ব  কোনো দল, গোষ্ঠী বা ছাত্রসংগঠনের হস্তক্ষেপমুক্ত করে হল প্রশাসনকে নেয়া; কোনো শিক্ষার্থীকে জোর করে সাংগঠনিক কর্মসূচিতে যোগদানে বাধ্য না করা পাশাপাশি কোনো ছাত্র স্বেচ্ছায় কোনো অহিংস আন্দোলনে যোগ দিলে তাকে হলের ভিতরে যেকোনো অত্যাচার বা নিগ্রহের হাত থেকে হল প্রশাসনকে সুরক্ষা দেয়া; বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসক তার ?উপর প্রদত্ত দায়িত্ব পালন না করে নিপীড়নমূলক অবস্থান নিলে তাকে অপসারণ করতে হবে।
অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি ছাত্রজোটের: এদিকে হলগুলোতে ছাত্রদের সভা-সমাবেশ করার জন্য প্রভোস্টের অনুমতির সিদ্ধান্ত বতিলের দাবি জানিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান জোটের নেতাকর্মীরা। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাবি সভাপতি সালমান সিদ্দিকী, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সভাপতি মো. ফয়েজউল্লাহ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাবি শাখার আহবায়ক আলমগীর সুজন প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন ছাত্র  ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির। এসময় তিনি ৩ দফা দাবি তুলে ধরেন।

চাকরি লাগবে না ছেলের মুক্তি চাই

‘মা, তুমি সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীকে বলো, আমাকে যাতে না মারে। আর রিমান্ডে না নেয়। আমাকে যাতে মুক্তি দেয়। আমরা সাধারণ ছাত্র। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না। আমি সরকারের বিপক্ষে নই। রাষ্ট্রবিরোধী কোনো  কাজ করিনি। আমরা কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করিনি। কোটা সংস্কার করে তা কমানোর জন্য যৌক্তিক আন্দোলন করেছি। কোনো অন্যায় করিনি। পুলিশের হাতে রিমান্ডে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা রাশেদ খান তার মায়ের কাছে এমন আকুতি জানিয়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পথে রাশেদ তার মাকে এসব কথা বলেন বলে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন তার মা সালেহা বেগম। ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন কার্যালয়ে গতকাল এ সংবাদ সম্মেলনে রাশেদ খানের স্ত্রী ও ছোট বোনও উপস্থিত ছিলেন।  চলমান কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদকে গ্রেপ্তারের পর দুই দফা রিমান্ডে নেয় পুলিশ। গত মঙ্গলবার সকালে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয় থেকে বের করে তাকে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় হাঁটিয়ে ডিএমপি কার্যালয়ের দিকে নেয়ার সময় অপেক্ষায় থাকা মা, স্ত্রী ও বোনের সঙ্গে কয়েক মিনিটের সাক্ষাতে রাশেদ এসব কথা জানায় বলে তারা জানান।
এ সময় রাশেদের মা সালেহা বলেন, আমি অন্যের ঘরে কাজ করে আমার মনি (রাশেদ)কে মানুষ করছি। আমার মনি সাধারণ স্টুডেন্ট। আমি আর তার চাকরি চাই না। বৃদ্ধ বয়সে কাজ করে আমি তাকে খাওয়াব। আমার সন্তানের চেহারা কেমন যেন হয়ে গেছে। তার মুক্তি চাই। মুক্তি পেলে আমরা আর তাকে আন্দোলনে যেতে দেব না। সে শুধু পরীক্ষা দিয়ে চলে আসবে।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরো বলেন, তিনিও তো মা। তার দু’সন্তান। তিনি আমারও মা। দেশের মা। তার কাছে আমার সন্তানের মুক্তি চাই।
সংবাদ সম্মেলনে রাশেদের স্ত্রী রাবেয়া আলো বলেন, গ্রেপ্তারের পর থেকে আমরা তার সন্ধানে পথে পথে ঘুরেছি। কয়েক দিন ধরে ডিবি কার্যালয়ের সামনে গিয়ে রাস্তায় অধীর আগ্রহে বসে থেকেছি। এত দিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার পর দুই ডিবি সদস্য তাকে হ্যান্ডকাপ পরা অবস্থায় বের করে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নেয়ার সময় দেখা হয়। তাকে ডিএমপি কার্যালয়ের দিকে নেয়া হয়। আমরা এগিয়ে যেতেই সে মাকে উদ্দেশ্য করে এসব কথা বলে।
তিনি আরো বলেন, তার শারীরিক অবস্থা ভালো না। তার সঙ্গে খুব খারাপ কিছু হচ্ছে। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। রাশেদও রাজনীতি করে না। সাধারণ স্টুডেন্টের প্লাটফর্ম থেকে আন্দোলন করেছে। এটাকে এখন বিভিন্নভাবে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমিও সাধারণ স্টুডেন্টস। সারা দিন টিউশনি করে পার করি। সে মুক্তি পেলে তাকে আমরা আর আন্দোলনে যেতে দেব না।
রাশেদের ছোট বোন মোসাম্মাৎ সোনিয়া খাতুন বলেন, রাশেদ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল কি না তা আপনারা আমাদের গ্রামের স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে জেনে নিতে পারেন। আমরা আর কিছু চাই না। তার মুক্তি চাই।

থাইল্যান্ডের গুহায় ১৭ দিন শিশুদের আগলে রাখা সেই কোচ by মাহাদী হাসান

ঢুকেছিলেন তিনিই প্রথম। বের হয়েছেন সবার পরে। বৃষ্টির ঝুঁকি নিয়েও কিশোর ফুটবলাররা থাম লুয়াং গুহায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল তার কারণেই। থাইল্যান্ডের ওয়াইল্ড বোর্স ফুটবল দলের কোচ একাপল আকে চান্থাওং তাই বিতর্কিত হয়েছেন। নিন্দুকেরা বলেছে, এমন দুর্গম আর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কিশোরদের নিয়ে গিয়ে মোটেও ঠিক কাজ করেননি তিনি। তার অনুমতির কারণেই ১৭ দিনের ‘অন্ধকার যাপন’ বাস্তবতায় কাটাতে হলো কিশোরদের। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, এই কোচ গুহার ভেতরের সেই অন্ধকার দিনগুলোতে আলোকশিখা হয়ে জ্বলেছেন। ডুবুরিরা বেরিয়ে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন, একাপল আকে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন কিশোরদের আগলে রাখতে। ওই শিশুদের অভিভাবকরাও তাই আস্থাশীল ছিলেন কোচের ওপর। ছেলেরা গুহায় থাকা অবস্থাতেই তারা বলেছিলেন, একাপলের প্রতি তাদের আস্থা আছে। ভরসা ছিল বন্ধুদেরও। কাছের মানুষরা তাকে সমাজের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হিসেবেই জানেন। সবার কাছেই তিনি বিশ্বাস, মানুষের জন্য মমতা, ভালোবাসা আর নিরাপদ আশ্রয়’। স্বজনদের একজন তাই মনে করছেন, এমনও হতে পারে যে রোদ থেকে শিশুদের বাঁচাতে তিনি তাদের নিয়ে গুহায় ঢুকে পড়েছিলেন!
গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আর বের হতে পারেনি। তার ভূমিকাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ’ মনে করছেন অনেকে। তবে নিজ এলাকায় পরোপকারের জন্য খুবই জনপ্রিয় একাপল। সমাজকর্মী ও আধ্যাত্ম সাধনার জন্য তার খ্যাতি আছে। অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার অভিযোগকে তাই উড়িয়ে দিয়েছেন পরিচিতজনরা। থামা কান্তাওয়ং নামে তার একজন আত্মীয়ের ভাষ্য, ‘ও দলকে ভালোবাসে। যখনই কোথাও যেত, বাচ্চাগুলোর সঙ্গে সেঁটে থাকতো। অভিভাবকরাও তাই ভরসা করতো ওকে।’ কোচের দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কান্তাওয়াং বলেন, ‘সে খুবই ভালো মানুষ। বাচ্চাদের ভালোবাসে। সবাইকে সাহায্য করে। খুব বিনয়ী।’
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কান্তাওয়াং কোচ একাপলের অতীতে ফিরে যান। জানান, 'ছেলেবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়েছে। অল্প দিন পর গত হয়েছেন ভাই। এতিম একাপল তখন বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে আশ্রয় নেয়। মঠেই এক দশকের শৈশব। মাঝে মাঝে কেবল একটু সময়ের জন্য বের হওয়া আর দাদিকে দেখতে আসা।' কান্তাওং বলেন, 'সেই সময়টা ওর জন্য খুবই কঠিন ছিল।'
২০ বছর বয়সে আবারও জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় একাপলের। ভিক্ষুর জীবন ছাড়লেও মন্দিরগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তার। প্রার্থনা ও সমাজসেবায় ব্যস্ত থাকতেন তিনি। কান্তাওয়াং বলেন, 'আকে সবসময়ই অন্যদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ।'

গুহায় প্রবেশের ৯ দিন পর ২ জুলাই গুহার ভেতরে শনাক্ত করা যায় কোচ আকে আর ১২ কিশোর ফুটবলারকে। গুহার উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ডুবুরিরা তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানান, আটকে পড়াদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন কোচ। কেননা, নিজে না খেয়ে কিশোরদের খাইয়েছেন তিনি। আত্মীয় কাতাওয়াংও সেই বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, সবসময়ই অন্যদের প্রতি মনোযোগী অাকে। গুহায় আটকে থাকা প্রথম ৯ দিন সে শিশুদের সাহায্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। সোমবার রাতে ওয়াইল্ড বোর ক্লাবের সিনিয়র দল অনুশীলন শুরু করেছে। জুনিয়র টিম আটকা পড়ার পর তারা সব অনুশীলন স্থগিত করেছিল। তারা জানায়, এমন অবস্থায় তারা অনুশীলন চালাতে পারে না। তবে উদ্ধার অভিযান সফল হতে থাকার পর তারা উদ্ধারকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতেই অনুশীলন শুরু করে। সপ্তাহে কয়েকবার ট্রেনিং দিলেও তেমন সম্মানী পেতেন না আকে। তবে টাকার কথা কখনও মাথায় নেয়নি। কান্তাওয়াং জানত, সে ফুটবল ভালোবাসতো, ভালোবাসত শিশুদের।
অনুশীলনরত সিনিয়র দলের সদস্যরা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন অাকের প্রতি তাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার কথা। তারা জানান, শিশুদের জন্য যেকোনও কিছু করতে ঝাঁপিয়ে পড়ার বাতিক আছে আকের। কায়ে হায়ে লাহুনা নামে এক খেলোয়াড়ের ভাষ্য, কোচ খুবই ভালো মানুষ। সবসময়ই শিশুদের সঙ্গে খেলতেন। তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও সার্বক্ষণিক নজর ছিল তার।’ কিশোর ফুটবলাররা যেই গুহায় আটকা পড়ে তার কাছেই অনুশীলন করেন সিনিয়র দলের সদস্যরা। লাহুনা বলেন, ‘যখন আমরা আটকে পড়ার খবর জানতে পারি, সাথে সাথেই ১১ জন সেখানে চলে যাই। পরদিন ভোর চারটা পর্যন্ত আমরা প্রবেশমুখে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।’ সিনিয়র টিমের কোচ পান্নাওয়াত জংকাম তাই আস্থাশীল। বলেন, ‘ও যখন বেরিয়ে আসবে, দেখবেন সবই ঠিক থাকবে। আমরা আগের মতোই তার সঙ্গে থাকব।’

গুহায় আটকে পড়া কিশোরদের বন্ধু অতাপর্ন খামেং। কোচ আকের সঙ্গেও তার সম্পর্ক দারুণ। যখন থেকেই আটকে পড়ার খবর শুনেছেন তখন থেকেই তার শঙ্কা সবাই ফিরবে তো। তবে আকের প্রশংসা করেছেন তিনি। অভিভাবকদের মতো করেই তার ওপরই ভরসা ছিল তার। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার আগে সে বলেছিল, ‘আমি আকেকে ভালোবাসি, তাকেই ভরসা করি। তিনি নিশ্চয়ই সবার খেয়াল রাখছেন। যারা আটকে আছে তারা সবাই নায়ক। তবে সবসময় বড় নায়ক আমাদের কোচ। আমি নিশ্চিত তিনি তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে শিশুদের সহায়তা করে যাচ্ছেন।’ খামেং মনে করে, কোচ এই দোষ হয়তো নিজেই নিতে চাইবেন। ‘তার ব্যাপারেই আমি চিন্তিত। আমি খুব শিগগিরই তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। আবার ফুটবল খেলতে চাই।’ সংবাদমাধ্যমের কাছে আর্তিময় কণ্ঠে বলে খামেং।
আকে আসলেই নিজের ওপর দোষ নিয়েছেন আগেই। গুহা থেকেই হাতে লেখা এক চিঠিতে কোচ কিশোরদের স্বজনদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, সব ছেলেই ভালো আছে। অনেক মানুষই তাদের খোঁজ-খবর রাখছেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, শিশুদের দেখাশোনার জন্য সবকিছু করব। আপনাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। আমি সব অভিভাবকের কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে অভিভাবকদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা কোচকে কোনও দোষ দিচ্ছেন না। এক চিঠিতে তারা লিখেছেন, ‘প্রিয় কোচ আকে, আপনার ফুটবল দলের সদস্যদের অভিভাবক হিসেবে আপনার প্রতি এবং শিশুদের ভালো যত্ন নেওয়া মনোভাবের প্রতি আমরা আস্থাশীল। আমরা আপনাকে জানাতে চাই যে এটা আপনার ভুল নয়। আমরা এখান থেকে কাউকে দোষ দিচ্ছি না, আপনিও নিজেকে দোষী ভাববেন না। আমরা সবাই পরিস্থিতি বুঝতে পারছি এবং আপনাকে সমর্থন জানাচ্ছি। আমাদের শিশুদের প্রতি আপনার ভালোবাসা ও যত্নকে সমর্থন করছি। সবাইকে নিয়ে নিরাপদে শিগগিরই গুহা থেকে আপনার বেরিয়ে আসার অপেক্ষা করছি আমরা। আপনার চাচিও গুহার প্রবেশমুখে অপেক্ষা করছেন।’

আকের চাচির বাড়ির পেছনেই একটি বৌদ্ধ মন্দির। মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে থাকা সেই মন্দিরের পুরোহিতরাও আশাবাদী ছিলেন আকে ফিরে আসবেন শিশুদের নিয়ে। আবার হাসিমুখে নিজের বাইকে করে মন্দিরে সবার সঙ্গে দেখা করবে। জয় নামে সাবেক এক ভিক্ষু বলেন, মায়ে সায়ে মন্দিরের সক্রিয় সদস্য আকে। সবসময়ই নিজের মোটরবাইকে শিশুদের নিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে যেতেন তিনি। এখন নিজেই শিল্পী আর মন্দিরের সাজসজ্জা বৃদ্ধিতে ছবি আঁকছেন। তিনি বলেন, ‘আকেকে সবাই চেনে। খুবই ভালো মানুষ। আমি তাকে প্রায়ই ওয়াত ফা তাত দোই ওয়াও মন্দিরে দেখতে পাই। সেখানেই প্রার্থনা করে। আমরা সেখানেই গল্প করি।’ আত্মীয় কান্তাওয়াং জানান, তিনি আকের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। উদ্ধারকারীদের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। ‘আমি জানি না সে কেনও ওখানে গিয়েছে। হতে পারে রোদের কারণে ছায়া খুঁজতে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল’।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, বিবিসি, স্টাফ-নিউ জিল্যান্ড
এক অভাবনীয় সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে ‘থাম লুয়াং’ গুহা থেকে কিশোর ফুটবল দলটিকে নিরাপদে বের করে আনার পর থাইল্যান্ডজুড়ে আনন্দের বন্যা বইছে। মানুষ বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তায়। কেউ গাড়ির হর্ন বাজিয়ে, কেউ নেচে-গেয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছেন। কেউবা আবার সেলফি কিংবা ছবি তুলে উল্লাস প্রকাশ করছেন। দেশটির সরকার ও নৌবাহিনীও আনন্দময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এ ঘটনায়।  মঙ্গলবার শেষ চার কিশোর ও তাদের কোচকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে প্রায় ১৭ দিনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান হয়েছে। গত ২৩ জুন দলটি চিয়াং রাই প্রদেশের ওই গুহায় প্রবেশ করেছিল। পুরো দলটিকে এখন চিয়াং রাই প্রাচানুকরহ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিন দিনের সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে তাদের সবাইকে বের করে আনা হয়। সফল উদ্ধার অভিযান শেষে চিয়াং রাইর এক কর্মকর্তা আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এটি। সারা জীবন মনে থাকবে। আমি তাদের কথা ভেবে কেঁদেছি। এখন আমি আনন্দিত। থাইল্যান্ডের প্রত্যেক মানুষ পরস্পরকে ভালোবাসে; এ বাস্তবতায় আমি অভিভূত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা বিনিময় ও অভিনন্দনের ঢল নেমেছে। ১৭ দিনের রুদ্ধশ্বাস এ উদ্ধার অভিযোনে অংশ নেওয়া দেশি-বিদেশি ডুবুরিদের প্রশংসা করে অনেকে তাদের ‘জাতীয় বীর’ আখ্যা দিচ্ছেন। বিস্তৃত এ উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া সবাইকে তাদের সাফল্যের আনন্দ উদযাপনে আমন্ত্রণ জানানোর ঘোষণা সোমবারই দিয়েছেন থাই প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা। জানিয়েছেন, সবপক্ষের জন্য ভোজের আয়োজন করবেন।
কিশোর ফুটবল দলটিকে বের করে আনার পর থাই নেভি তাদের ফেসবুক পাতায় লিখেছে, এটি অলৌকিক ঘটনা ছিল, নাকি বিজ্ঞান বা অন্য কিছু ছিল, তা আমরা জানি না। ১৩ ওয়াইল্ড বোয়ারের সবাইকে গুহা থেকে বের করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ক্লাব ফুটবল দল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থাই কিশোর ফুটবল দল ও তাদের উদ্ধারে কাজ করা সবাইকে ‘ওল্ড ট্রাফোর্ডে’ স্টেডিয়ামে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান শুরুর দিন রবিবার চারজন এবং সোমবার আরও চারজনকে উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার ৪ জন কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অভিযান। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘থাই নেভি সিলকে এমন অসাধারণ উদ্ধার অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিনন্দন। এটা দারুণ মুহূর্ত। সবাই মুক্তি, দারুণ কাজ হয়েছে।’ জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের মুখপাত্র স্টিফেন সেইবার্ট তার টুইটে বলেন, ‘সাহসী কিশোর ও তাদের কোচ এবং তাদের যারা উদ্ধার করেছে তাদের অনেক প্রশংসা করতে হয়। টুইটারে দেওয়া পোস্টে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেন, থাইল্যান্ডে সবাই উদ্ধার হয়ে যাওয়ায় আমরা খুবই খুশি। সারা বিশ্ব এ ঘটনায় নজর রেখেছিলো। তাদের সাহসকে শ্রদ্ধা জানাই।

থাইল্যান্ডের চিং রাই প্রদেশের গুহা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ভিডিওর মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানালো কিশোররা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই এক ভিডিওতে হাত নেড়ে অভিবাদন জানায় তারা। দেশটির সরকারি জনসংযোগ দফতর থেকে এই ভিডিও প্রকাশ করা হয়। গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আর বের হতে পারেনি। রবিবার (৮ জুলাই) থাইল্যান্ড সরকার শিশুদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তিন দিনের সফল অভিযানে উদ্ধার হয় কোচসহ ১২ খুদে ফুটবলার। বর্তমানে চিংরাই প্রচনুক্রোহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২ কিশোর ও তাদের কোচ। এখনও পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। তবে এক সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের পরিচালক থানাপাইসাল বলেন, তারা সবাই সুস্থ আছেন। বিশেষ করে যারা শেষে ভর্তি হয়েছেন তারা তাড়াতাড়ি সুস্থ হচ্ছেন।
সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে ১২ ফুটবলার ও তাদের কোচকে থাইল্যান্ডের গুহা থেকে বের করে আনা গেলেও ৪ জন ডুবুরি আটকে ছিলেন গুহার ভেতরে। থাইল্যান্ডের নৌবাহিনী তাদের অফিসিয়াল পাতায় দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছিল। পরে অপর এক ফেসবুক পোস্টে তারা ওই চারজনের বের হয়ে আসার খবর নিশ্চিত করেছে। টানা ৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২ জুলাই গুহার ভেতরে জীবিত অবস্থায় ১২ কিশোর ফুটবলারসহ তাদের কোচকে শনাক্ত করেন ডুবুরিরা। রবিবার (৮ জুলাই) থাইল্যান্ড সরকার তাদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ৩ দিনের সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে সবাইকে বের করে আনা হয়। সফল উদ্ধার অভিযান শেষে ফেসবুক পোস্টে থাই নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ‘১২ জন কিশোর ও তাদের কোচকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আমরা এখন চারজন ডুবুরির জন্য অপেক্ষা করছি।’ ভেতরে থেকে যাওয়া ওই ডুবুরিরা যেন সুস্থভাবে বেরিয়ে আসতে পারেন, সেজন্য সবাইকে প্রার্থনা করার অনুরোধ করেছিলেন তারা। কয়েক ঘণ্টা পর দেওয়া অপর এক ফেসবুক পোস্টে থাই নৌবাহিনী জানায়, সেই চার ডুবুরিও নিরাপদে বের হয়ে এসেছে।’ পোস্টে এ ঘটনায় আনন্দ প্রকাশ করে তারা। গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আটকা পড়েছিল।
থাইল্যান্ডের বহুল আলোচিত ‘থাম লুয়াং’ গুহাকে জাদুঘরে পরিণত করা হবে। এই গুহাতেই আটকে পড়েছিল দেশটির ১২ খুদে ফুটবলার এবং তাদের ২৫ বছরের কোচ। তিন দিনের অভিযানে গত ১০ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের সবাইকে উদ্ধার করা হয়। ওই উদ্ধার অভিযানের চিত্র ঠাঁই পাবে জাদুঘরটিতে। ১১ জুলাই বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন অভিযানের প্রধান নারংসাক অসোততানকরণ। তিনি বলেন, ‘থাম লুয়াং’ গুহার এই এলাকাটি হবে একটি জীবন্ত জাদুঘর। থাইল্যান্ডের আরেকটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হবে এটি। খুদে ফুটবলারদের কিভাবে উদ্ধার করা হয়েছে তা এখানে প্রদর্শন করা হবে। স্থাপন করা হবে তথ্যভাণ্ডার। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রযুত চান-ওচা বলেছেন, তার দেশ পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব দেবে। এজন্য গুহার ভেতরে ও বাইরে অতিরিক্ত সতকর্তামূলক পদক্ষেপ নেবে কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গুহাটি আপাতত বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ এটি খুলে দেওয়া হবে সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। এদিকে উদ্ধারের পর প্রথমবারের মতো ভিডিওর মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়েছে কিশোররা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই এক ভিডিওতে হাত নেড়ে অভিবাদন জানায় তারা। দেশটির সরকারি জনসংযোগ দফতর থেকে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আর বের হতে পারেনি। রবিবার (৮ জুলাই) থাইল্যান্ড সরকার শিশুদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তিন দিনের সফল অভিযানে উদ্ধার হয় কোচসহ ১২ খুদে ফুটবলার। বর্তমানে চিংরাই প্রচনুক্রোহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২ কিশোর ও তাদের কোচ। এখনও পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। তবে এক সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের পরিচালক থানাপাইসাল বলেন, তারা সবাই সুস্থ আছেন। বিশেষ করে যারা শেষে ভর্তি হয়েছেন তারা তাড়াতাড়ি সুস্থ হচ্ছেন।
একইসঙ্গে তিনি একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক ও দক্ষ ডুবুরি। আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার হিসেবেও রয়েছে তার সুখ্যাতি। মেধার এই বিরল সমন্বয়ই অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক রিচার্ড হ্যারিসকে থাইল্যান্ডের থাম লাং গুহার ভেতরে  নিয়ে গিয়েছিল। ৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর যখন গুহার মধ্যে কিশোর ফুটবল দলের অবস্থান শনাক্ত করা হয়, তখন থাইল্যান্ডে ছুটি কাটাচ্ছিলেন অ্যাডিলেডের এই চিকিৎসক। সেখান থেকে স্বেচ্ছায় ওই শিশুদের সাহায্য করতে যান তিনি। হ্যারিস গুহার মধ্যে গিয়ে কিশোরদের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত হন। সবাইকে বের করে আনা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। গুহা থেকে বের হয়ে আসা সবশেষ উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ছিলেন তিনি। তবে গোটা বিশ্ব যখন আনন্দে ভাসছে, সেই আনন্দে শামিল হওয়া হয়নি হ্যারিসের। গুহা থেকে বের হয়েই পিতার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে দেশে ছুটে যেতে হয় তাকে। স্বজন ও বন্ধুরা জানিয়েছেন, খবরটি তার জন্য যথেষ্ট পীড়ার কারণ হয়েছে।
হ্যারি হিসেবে পরিচিত ডা. হ্যারিস গুহার বাইরে বের হওয়া সর্বশেষ উদ্ধারকারীদের একজন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন থাই নেভি সিল সদস্যের সঙ্গে তিনি বের হয়ে এসেছিলেন সবার শেষে। সে সময় গুহার নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পানি বেড়ে যাচ্ছিলো। তবে ‘মিশন ইম্পসিবল’ ধারার একটি অভিযান শেষে উদযাপনের আনন্দে অংশ নেওয়া হয়নি তার। কারণ, বুধবার গুহা থেকে বের হওয়া অল্প সময় পরেই নিজের বাবার মৃত্যু সংবাদ পান তিনি। হ্যারির নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সাউথ অস্ট্রেলিয়ান অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, এমন রুদ্ধশ্বাস অভিযানে শারীরিক ও মানসিক চাপের পর এমন খবরে তার পরিবারের কষ্ট আরও বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডস্টারের চিকিৎসক ডা. অ্যান্ড্রু পিয়ার্স জানান, ‘হ্যারি একজন শান্ত ও দয়ালু মানুষ। এই অভিযানে সহায়তার করার জন্য তিনি দ্বিতীয়বার ভাবেননি।’ বলেন ‘এটা উত্থান-পতনের একটি আবেগপূর্ণ সপ্তাহ’।
অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, ডা. হ্যারিকে বিশেষ করে ব্রিটিশ ডুবুরিরা চিনতে পারেন। পরে থাইল্যান্ড সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই উদ্ধার অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়ে বিশপ বলেন, ‘তিনি (হ্যারি) উদ্ধার অভিযানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন’। বিশপ আরও জানান, হ্যারি গুহা অভিযানে পারদর্শিতার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা চিয়াং রাই’র ভারপ্রাপ্ত গভর্নর নারোংসাক ওসোটানাকর্ন বুধবার অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম নাইন নিউজ’কে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ানরা আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন, বিশেষ করে ওই চিকিৎসক’। হ্যারি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খুব ভালো। সবচেয়ে ভালো’। আর হ্যারির বান্ধবী সুয়ে ক্রোয়ি বিবিসি’কে বলেন, ‘চিকিৎসক একজন বিনয়ী ও নিঃস্বার্থ পারিবারিক মানুষ। তার উপস্থিতি গুহার মধ্যে শিশুদের স্বস্তি দিয়েছে’। ক্রোয়ি আরও বলেন, ‘তিনি শিশুদের সঙ্গে দারুণ। শিশুদের গুহার মধ্যে চলাচলে জন্য প্রস্তুত করতে তিনি সবচেয়ে ভালো উপায় নিশ্চিত করেছেন। তাদের সহায়তার জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ডা. হ্যারিকে প্রশংসা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন অনেকে। তারা হ্যারিকে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবিও জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অভিজ্ঞ ডুবুরি ডা. হ্যারি একজন আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফারও। তিনি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ক্রিসমাস আইল্যান্ড ও চীনের বেশ কয়েকটি গুহা অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ২০১১ সালে এক মর্মান্তিক গুহা অভিযানে তার বন্ধু অ্যাগনেস মিলোওকা বাতাস ফুরিয়ে গিয়ে মারা যান। হ্যারি তার লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়ে বিশপ বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে চিকিৎসা সহায়তা দলের সঙ্গে কাজ করায় হ্যারি কর্তৃপক্ষের কাছে পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ ভানুয়াতুতে অস্ট্রেলিয়ান এইড মিশনেও অংশ নিয়েছেন। বিশপ আরও বলেন, ‘তিনি একজন অসাধারণ অস্ট্রেলিয়ান। থাইল্যান্ডে উদ্ধার তৎপরতায় তিনি নিশ্চিতভাবে বড় ধরনের পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন’।
হ্যারির পাশাপাশি তার সঙ্গী ক্রাইগ চ্যালেনেরও প্রশংসা করেন বিশপ। অস্ট্রেলিয়ার পার্থের এই পশুচিকিৎসক গুহার মধ্যে হ্যারির সঙ্গেই ছিলেন। তারা দুজন ২০ জনের অস্ট্রেলিয়ান উদ্ধারকর্মী দলের সদস্য ছিলেন। তাদের সঙ্গে পুলিশ ও নৌবাহিনীর ডুবুরিরাও ছিলেন। এমন দুঃসাহসিক অভিযানের পর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকোম টার্নবুলের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন হ্যারি। ওই সময় তিনি অভিযানে সফলতার জন্য আটকে পড়া ১২ কিশোরকেই আসল ‘হিরো’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘বড় বীর হলো ওই ১২ শিশু আর তাদের দেখাশোনাকারী থাই নেভি সিলের চার সদস্য’। হ্যারি আরও বলেন, ‘তারা নিজেরাই নিজেদের মনোবল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। তাদের ওই অবস্থায় না পেলে আমরা কিছুই করতে পারতাম না’।
হ্যারির এমন কাজের জন্য প্রশংসা পেয়েছেন নিজ দেশের চিকিৎসকদের সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের। সংগঠনটির টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যারিকে ‘একজন চমৎকার চিকিৎসক ও মানুষ’ বলে অভিহিত করা হয়। সংগঠনটির সভাপতি ডা. টনি বারটনি বলেন, ডা. হ্যারিস অন্যদের সাহায্য করতে গিয়ে নিজের জীবনে ঝুঁকি নিয়েছেন। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তিনি বলেন, এখানে ডা. হ্যারিসের প্রচেষ্টা অস্ট্রেলিয়ার অনেক গতানুগতিক চিকিৎসকের চেয়ে সম্পূর্ণভাবে ব্যতিক্রমী আর এটা দায়িত্বের চেয়েও বেশি কিছু।
কেউ কউ বলছেন এটি ছিল ‘মিশন ইম্পসিবল’ ধারার এক অভিযান। সফলভাবে ১২ কিশোর আর তাদের কোচকে বের করে আনার পর আনন্দের বন্যায় ভাসছে থাইল্যান্ড। তবে উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, তাদের বের করে আনতে একটু দেরি হলেই বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা ছিল। উদ্ধার তৎপরতায় জড়িতদের উদ্ধৃত করে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, সবশেষ কিশোর বের হয়ে আসার পরপরই গুহার নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পানি বাড়তে শুরু করেছিল। উল্লেখ্য, ওই কিশোরদের অনেকেই সাঁতার জানত না।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, গুহাটির প্রায় এক মাইল দীর্ঘ অংশে পানি জমে ছিল। আটকে পড়াদের অনেকেই সাঁতার না জানার কারণে তাদের ডুবুরিরা প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্ধারের জন্য তৈরি করেন। উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে পাম্প করে পানি কমানোর ফলে উঁচুনিচু গুহার কিছু জায়গায় হাঁটার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল। বুধবারের (১১ জুলাই) উদ্ধার অভিযানে অংশগ্রহণকারী তিন অস্ট্রেলীয় ডুবুরিকে উদ্ধৃত করে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, মঙ্গলবার (১০ জুলাই) সর্বশেষ শিশুটি উদ্ধার হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মূল পাম্পটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। আর তাতে দ্রুত পানির উচ্চতা বাড়তে শুরু করে। আর তখনও পবেশপথ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে স্থাপিত ‘তৃতীয় চেম্বারে’ কয়েকজন ডুবুরি ও উদ্ধারকারী সরঞ্জামাদি গুছানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গুহার প্রবেশপথ থেকে ‘তৃতীয় চেম্বার’ বা অভিযান পরিচালনার অঞ্চলে যেতে হলে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে উদ্ধারকারীদের। ‘তৃতীয় চেম্বার’ থেকে শিশুদের কাছে পৌঁছাতে যেতে হয়েছে আরও ১.৭ কিলোমিটার। গত কয়েক দিন ধরে আটকে পড়া শিশুদের গুহার ভেতরে সঙ্গ দিচ্ছিলেন তিন থাই নেভি সিল সদস্য ও এক চিকিৎসক। মঙ্গলবার (১০ জুলাই) পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার সময় তখনও দেড় কিলোমিটারের মধ্যে (তৃতীয় চেম্বারে) পৌঁছাতে পারেননি তারা। দ্য গার্ডিয়ানের খবর অনুযায়ী, তৃতীয় চেম্বারে থাকা কয়েকজন ডুবুরি হঠাৎ চিৎকার শুনতে পান এবং গুহার গভীর থেকে হেড টর্চের আলো দেখেন। দেখতে পান, কয়েকজন উদ্ধারকারী ধীরে ধীরে শুকনা জায়গায় জড়ো হচ্ছেন। এরপর একে একে তারা গুহা থেকে বের হয়ে আসেন। অপেক্ষমাণ উদ্ধারকারীরা তাদের করতালি দিয়ে স্বাগত জানান।
অভিযানের প্রথম দিন ৮ জুলাই রবিবার চার শিশুকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর তাদের দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ৯ জুলাই উদ্ধার হয় ওয়াইর্ল্ড বোয়ার্স নামের ওই ফুটবল দলের আরও চার শিশু। তাদের সবাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গুহায় আটকে পড়ার ১৮ দিনের মাথায় ১০ জুলাই মঙ্গলবার শেষ হয় তিন দিনের উদ্ধার অভিযান। আগের দিন রাতে ভারী বর্ষণ সত্ত্বেও এদিন চার খুদে ফুটবলার ও তাদের কোচকে উদ্ধার করা হয়। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে হাসপাতালে সাতদিন পর্যন্ত তাদের আলাদা করে রাখা হবে।
গুহায় আটকেপড়া কিশোরদের জীবিত খুঁজে পাওয়া যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা বৌদ্ধভিক্ষু ফ্রা খুবা বুনচামকে সম্মান জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন থাইল্যান্ডের রাজা মহা ভাজিরালংকর্নই। ফ্রা খুবা বুনচাম ওই গুহার বাইরে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতেন। গত শনিবার থাই রাজা ওই বৌদ্ধ ধর্মগুরুকে দেখতে যান। ওই সময় তাকে সম্মান জানানোর প্রস্তাব দেন বলে জানিয়েছে থাই সংবাদমাধ্যম। উদ্ধারকারীরা আটকে পড়া কিশোরদের খুঁজে পাওয়ার আগেই তাদের অবস্থান সম্পর্কে ঠিকঠাক ভবিষ্যদ্ববাণী করেন ওই ধর্মগুরু। তিনি জানান, ওই কিশোর আর তাদের কোচকে দুই দিনের মধ্যে জীবিত খুঁজে পাওয়া যাবে। ওই সময়ে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘তারা এখনও সেখানেই আছে, আগামী দু-একদিনের মধ্যেই তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে।’ পরে গত ২ জুলাই দুজন ব্রিটিশ ডুবুরি গুহার বেশ কয়েক কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে আটকেপড়া কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে জীবিত শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এরপরই থাইল্যান্ডের মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত হয়ে ওঠেন ওই বৌদ্ধ ধর্মগুরু। শনিবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে রাজা ভাজিরালংকর্নই ওই ধর্মগুরুকে রাজকীয় গাউন উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই গাউন থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ সংস্কৃতির অংশ। ২৩ জুন কিশোররা নিখোঁজ হলে থাম লুয়াং গুহা এলাকা তিনবার পরিদর্শন করেন ধর্মগুরু ফ্রা খুবা বুনচাম। প্রতিবারই তিনি সেখানে ধর্মীয় আচার আর প্রার্থনা করেন। দ্বিতীয়বার পরিদর্শন শেষে ওই এলাকায় কয়েকদিন ধরে চলা বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যায় আর নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকেই বিশ্বাস করে থাকেন, বৃষ্টি বন্ধে ভূমিকা রয়েছে এই বৌদ্ধ ধর্মগুরুর। তবে গতকাল মঙ্গলবার নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধার অভিযান চলার সময়েও প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে সেখানে। ধর্মগুরু ফ্রা খুবা বুনচাম আজীবন নিরামিষভোজী। থাইল্যান্ড, ভুটান আর চীনের শান প্রদেশের বিভিন্ন গুহায় ধ্যানমগ্ন থেকে বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন তিনি। চীনের শান প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই ধর্মগুরু মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যদ্ববাণী করা শুরু করেন। থাইল্যান্ড ছাড়াও এই ধর্মগুরুর মিয়ানমার ও লাওসে প্রচুর ভক্ত রয়েছে। ফল আর বিস্কুট খেয়ে জীবনধারণ করে থাকেন তিনি। সবসময় হাঁটেন খালি পায়ে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শীর্ষ কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও তার অনুসারী। রবিবার (৮ জুলাই) থাইল্যান্ড সরকার তাদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় অভিযান শুরু করে। ওই দিন চারজনকে এবং সোমবার আরও চারজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ১০টা ৮ মিনিটে অবশিষ্ট ৫ জনকে উদ্ধারের জন্য ১৯ জন ডুবুরি গুহায় প্রবেশ করেছেন।