Thursday, April 16, 2026

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিমান এত আধুনিক, সিঁড়ি কেন সেকেলে by আসহাবিল ইয়ামিন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বহনকারী বিমান বিশ্বজুড়ে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ নামে পরিচিত। এটি প্রযুক্তির দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক বাহন। বিমানটির ভেতরে রয়েছে সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থা, অপারেশন থিয়েটার ও বিলাসবহুল সব সুবিধা। তবে এই বিমানে ওঠার সময় প্রেসিডেন্টকে প্রায়ই একটি সাধারণ হাতল ধরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে দেখা যায়। সমস্যাটি এখানেই।

এই হাতল ধরা সিঁড়ি বেয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার সময় প্রেসিডেন্ট ও তাঁর কর্মকর্তাদের মাঝেমধ্যে হোঁচট খেতে দেখা যায়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে এই সিঁড়িতে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতেও দেখা গেছে। তিনি আসলে বেশ কয়েকবারই হোঁচট খেয়েছেন। জো বাইডেনের সেই হোঁচট খেয়ে পড়ার মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরালও হয়েছিল।

মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যেন জো বাইডেনের পথেই হাঁটছেন। কারণ, গত জুন মাসে একটি ভিডিও খুব ভাইরাল হয়। যেখানে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় হঠাৎ হোঁচট খেয়েছেন। নিউ জার্সির মরিসটাউনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি যখন ক্যাম্প ডেভিড যাওয়ার জন্য বিমানে উঠছিলেন, তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সামনেই তাঁকে হোঁচট খেতে দেখা যায়। এই ভিডিও ক্লিপও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

যে দেশে আধুনিকতম সব প্রযুক্তি আছে, সেখানে কেন প্রেসিডেন্টের জন্য এমন ‘সেকেলে’ সিঁড়ির ব্যবস্থা? কেনই বা একটি উন্নত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য আধুনিক, হাইড্রোলিক বা স্বয়ংক্রিয় সিঁড়ি ব্যবহার করা হয় না?

মার্কিন বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার চার্লস গ্রিমস বেশ কিছু কারণ জানান, কেন এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাধারণ সিঁড়ি এখনো ব্যবহার করা হয়। প্রথমে আসে প্রেসিডেন্টকে যখন বিমানে ওঠানো বা নামানো হয়, তখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নিরাপত্তাকে। এ কারণেই এয়ার ফোর্স ওয়ানকে কখনোই সাধারণ টার্মিনাল ভবনের কাছে পার্ক করা হয় না। বরং বিমানটিকে সব সময় টার্মিনাল থেকে দূরে একটি নিরাপদ ও ফাঁকা জায়গায় রাখা হয়। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের থেকে দূরে, চারপাশ ঘেরা ও সুরক্ষিত নিরাপত্তাবলয় খুব সহজেই তৈরি করা সম্ভব হয়। এই নিরাপত্তাব্যবস্থাই এই সাধারণ সিঁড়ি ব্যবহারের প্রধান কারণ।

সাধারণ বিমানবন্দর টার্মিনালগুলো সব সময়ই অসংখ্য অচেনা যাত্রীতে ঠাসা থাকে। এত ভিড়ের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাওয়া মানেই বিরাট নিরাপত্তাঝুঁকি। টার্মিনালকে বারবার খালি করা, আর এত যাত্রীকে ঘন ঘন তল্লাশি করে প্রেসিডেন্টকে তাঁদের থেকে দূরে রাখা কার্যত অসম্ভব। তাই এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাধারণত এই সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়, যা প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সুরক্ষিত বিমানে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এটিই প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যবস্থা।

আধুনিক সিঁড়ি ব্যবহার না করার পেছনে একটি বড় কারণ হলো জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ বা জনসংযোগ। প্রেসিডেন্ট যখন এই সিঁড়ি দিয়ে ওঠেন বা নামেন, তখন তিনি দর্শকদের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন। সিঁড়ির নিচে পাতা লালগালিচা, সামরিক ও ভিআইপিদের উপস্থিতিতে দেওয়া অভ্যর্থনা—পুরো দৃশ্যটাই ছবি তোলার জন্য দারুণ মুহূর্ত তৈরি করে। এটা শুধু নিরাপত্তা বা সুবিধার জন্য নয়। বরং অনেকটা ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। এ জন্য মনে করা হয় যে এভাবে প্রেসিডেন্ট মানুষকে তাঁর ক্ষমতা দেখাতে ও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারেন।

এ ছাড়া সুবিধার দিক থেকেও এই সাধারণ সিঁড়ি সেরা। সাধারণত যাত্রীদের জেট ব্রিজ থেকে নেমে টার্মিনাল, ব্যাগেজ এরিয়া পার হয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ গাড়িতে যেতে হয়, যা অনেক সময়ের ব্যাপার। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সিঁড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই মাত্র কয়েক ফুট হেঁটে তাঁর অপেক্ষায় থাকা লিমোজিনে উঠে যেতে পারেন। তাই বিমানটিকে এমন একটি স্থানে রাখা হয় যেখানে প্রেসিডেন্টকে বহনকারী লিমোজিন, সিক্রেট সার্ভিসের ১৫ থেকে ২০টি গাড়ির পুরো বহর একসঙ্গে যেতে পারে। এ ধরনের বিশাল বহরের জন্য টার্মিনালের কাছে জায়গা পাওয়া কঠিন। সিক্রেট সার্ভিস কখনোই চাইবে না যে প্রেসিডেন্ট সাধারণ যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে টার্মিনালের বাইরে থাকা লিমোজিনে উঠুন।

বাইরে থেকে লিফটের মতো কোনো ব্যবস্থা তৈরি করে প্রেসিডেন্টকে বিমান থেকে নামানো যেতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার দিক থেকে সেটি পুরোপুরি নিরাপদ না–ও হতে পারে। আবার দেখতেও কিছুটা হাস্যকর লাগতে পারে। এ কারণেই কোনো প্রেসিডেন্টই এখন পর্যন্ত আধুনিক, হাইড্রোলিক বা স্বয়ংক্রিয় সিঁড়ি ব্যবহার করেননি এয়ার ফোর্স ওয়ানে।

এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠতে গিয়ে লালগালিচায় মোড়া সিঁড়িতে পরপর তিনবার হোঁচট খান জো বাইডেন। মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রু বিমানঘাঁটি, ২০২১ সালের মার্চে তোলা
এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠতে গিয়ে লালগালিচায় মোড়া সিঁড়িতে পরপর তিনবার হোঁচট খান জো বাইডেন। মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রু বিমানঘাঁটি, ২০২১ সালের মার্চে তোলা। ছবি: রয়টার্স

বাবার দেওয়া খেলনা থেকেই উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের নেশা by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

উইলবার রাইট আর অরভিল রাইট। পিঠাপিঠি দুই ভাইকে ‘রাইট ব্রাদার্স’ নামেই চেনে বিশ্ব। কিংবদন্তি এই দুই উদ্ভাবক উড়োজাহাজ উদ্ভাবন করেন এবং বিশ্বের মানুষকে উড়তে শেখান। বড় ভাই উইলবারের জন্মদিন আজ ১৬ এপ্রিল।

উইলবার ১৮৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মিলভিলের কাছে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের চার বছর পর ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ডেটনে জন্মগ্রহণ করেন অরভিল। বড় ভাইয়ের জন্মদিনে জেনে নেওয়া যাক উড়োজাহাজ উদ্ভাবনে দুই ভাইয়ের সাধনার গল্প।

খেলনা থেকে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন

শিশুকালেই দুই ভাইয়ের মনে আকাশজয়ের নেশা দানা বেঁধেছিল। জানা যায়, বাবার দেওয়া একটি খেলনা হেলিকপ্টার তাঁদের মনে বুনে দিয়েছিল স্বপ্নের বীজ। ১৮৭৮ সালের কোনো এক সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন বাবা মিল্টন রাইট। এ সময় ছোট দুই ছেলের জন্য আনা একটি উপহার বাসার মধ্যেই ওপরে ছুড়ে মারেন বিশপ বাবা।

১৯০৮ সালে একটি ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুই ভাই বলেন, ‘ধারণা করছিলাম খেলনাটি মেঝেতে পড়ে যাবে। কিন্তু মেঝেতে পড়ে যাওয়ার পরিবর্তে কক্ষের ছাদের অংশে ধাক্কা লাগার আগপর্যন্ত এটি উড়তে থাকে। ধাক্কা লেগে এটি উল্টে যায় এবং মেঝেতে পড়ে যায়।’

কর্ক, বাঁশ ও কাগজ দিয়ে তৈরি এবং রাবার ব্যান্ড দ্বারা চালিত হেলিকপ্টার মডেলটি দুই ভাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে। এ ধরনের আকাশযানের প্রতি তাঁদের মধ্যে তুমুল আবেগ তৈরি হয়। আকাশে ওড়ার স্বপ্ন রীতিমতো নেশার মতো কাজ করে দুই ভাইয়ের মধ্যে।

যদি লক্ষ্য থাকে অটুট

এই স্বপ্ন পূরণ এতটা সহজ ছিল না রাইট ভাইদের জন্য। এর বড় কারণ ছিল এ ধরনের আকাশযান তৈরির প্রকৌশল জ্ঞান এবং আর্থিক সংস্থানের অভাব। দুজনেরই হাইস্কুলে থাকার সময় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদিও পরে একজন ডিপ্লোমা করতে পেরেছিলেন। অর্থের ব্যবস্থা করাও এতটা সহজ ছিল না দুজনের জন্য।

দুই ভাই কর্মজীবন শুরু করেছিলেন পত্রিকা আর ছাপাখানার ব্যবসা দিয়ে। তবে এ ব্যবসায় তেমন সফল হননি তাঁরা। এরপর দুই ভাই ‘দ্য রাইট সাইকেল কোম্পানি’ নামে বাইসাইকেলের ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে ভাড়া দেওয়া বা যন্ত্রাংশ বেচাকেনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও শিগগিরই তাঁরা নতুন নতুন নকশায় সাইকেল তৈরি করতে শুরু করেন। ২০ বছর এই ব্যবসা করে আয়রোজগারও করলেন বেশ।

এরপর শুরু হলো আসল স্বপ্নের পথে যাত্রা। ১৮৯৯ সাল থেকে শুরু হলো গবেষণা। ১৯০০ সালে তৈরি করলেন প্রথম গ্লাইডার (একধরনের উড়োযান)। ১৯০১ থেকে ১৯০৩ সাল পর্যন্ত নিরলসভাবে চলতে থাকে প্রচেষ্টা। অনেকবারই দুই ভাইয়ের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে তাঁরা হাল ছাড়েননি। একবার উড্ডয়নের চেষ্টা ব্যর্থ হলে ত্রুটি সারিয়ে এবং আরও নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে আবার নেমে পড়েন দুই ভাই।

অবশেষে ১৯০৩ সালের ডিসেম্বরে আসে সাফল্য। ১৭ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টা। নর্থ ক্যারোলাইনার কিটি হকসংলগ্ন কিল ডেভিল হিল। গ্যাসোলিন ইঞ্জিনচালিত ফ্লায়ারের (আকাশযান) পাটাতনে চড়ে বসলেন অরভিল। পাইলটসহ এটির ওজন ছিল ৩৪০ কেজি। ইঞ্জিন চালু হলো। ঠিক ১০টা ৩৫ মিনিট। অরভিলকে বুকে নিয়ে শূন্যে উড়াল দিল ফ্লায়ার। আকাশে ছিল মাত্র ১২ সেকেন্ড। সামনের দিকে উড়ে যায় ১২০ ফুট (৩৬ মিটার)। তাতে কী! এই ১২ সেকেন্ডই পৃথিবীর গতিপথকে চিরতরে বদলে দিল।

চার ব্যক্তি রাইট ভাইদের এই উড়োজাহাজ উড্ডয়নের পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁদের একজন ছবি তোলেন। অবশ্য খুব কম সংবাদপত্রই ঘটনাটি নিয়ে খবর প্রকাশ করেছিল।

এই পরীক্ষাকে উড়োজাহাজ উড্ডয়নের প্রথম কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। এরপর দফায় দফায় আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান দুই ভাই। শেষ পর্যন্ত রাইট ভাইদের হাত ধরে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন পূরণ হয় মানুষের।

দুই ভাইয়ের একসঙ্গে উড়তে মানা

দুই ভাই মাত্র একবারই একসঙ্গে উড়োজাহাজে চড়েছিলেন। কারণ, অরভিল ও উইলবার তাঁদের বাবাকে দুই ভাইয়ের একসঙ্গে উড়োজাহাজে না চড়ার কথা দিয়েছিলেন। বাবা মিল্টন রাইটের আশঙ্কা ছিল, কোনো এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় দুই ছেলেকে একসঙ্গে হারাতে পারেন তিনি।

তবে ১৯১০ সালের ২৫ মে দুই ছেলেকে একবার একসঙ্গে উড়োজাহাজে চড়তে দিয়েছিলেন বাবা। ডেটনে ছয় মিনিটের এই ফ্লাইটে উড়োজাহাজ চালান অরভিল। যাত্রী হিসেবে ছিলেন উইলবার।

অবতরণ করার পর অরভিল প্রথম এবং একবারের জন্যই তাঁর ৮২ বছর বয়সী বাবাকে উড়োজাহাজে তোলেন। অরভিল যখন উড়োজাহাজ চালিয়ে উঁচুতে উঠছিলেন, তখন তাঁর উচ্ছ্বসিত বাবা চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আরও উঁচুতে অরভিল, আরও উঁচুতে।’

বিশ্বে মর্যাদার আসনে সত্যিই অনেক উঁচুতে উঠেছেন দুই ভাই। রাইট ভাইদের প্রতি সম্মান জানাতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১৭ ডিসেম্বর পালিত হয় ‘রাইট ব্রাদার্স ডে’।

সূত্র: ন্যাশনাল অ্যাভিয়েশন হেরিটেজ এরিয়া (ভিজিটনাহা ডটকম), ভয়েস অব আমেরিকা

নিজেদের তৈরি ফ্লায়ারে (একধরনের আকাশযান) রাইট ভাইয়েরা। দুই ভাই মাত্র একবারই একসঙ্গে উড়োজাহাজে চড়েছিলেন
নিজেদের তৈরি ফ্লায়ারে (একধরনের আকাশযান) রাইট ভাইয়েরা। দুই ভাই মাত্র একবারই একসঙ্গে উড়োজাহাজে চড়েছিলেন। বেটম্যান আর্কাইভের সৌজন্যে

জাপানে কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় হারিয়ে যায় কেন by আসহাবিল ইয়ামিন

জীবনে যখন সবকিছু অসহ্য মনে হয়, তখন সব ছেড়েছুড়ে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। এমন অনুভূতি অনেকেরই হয়। এই অনুভূতি থেকে অনেকেই নিজেদের জীবন, চাকরি, বাড়ি ও পরিবার ছেড়ে স্বেচ্ছায় উধাও হওয়ার পথ বেছে নেন। আশ্চর্যজনকভাবে, জাপানে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা টাকার বিনিময়ে সবকিছু থেকে হারিয়ে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সাহায্য করে। টাকার বিনিময়ে স্বেচ্ছায় উধাও হয়ে যাওয়া জাপানে কোনো অপরাধ নয়। রয়েছে এর আইনি স্বীকৃতিও। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন জাপানের কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় উধাও হয়ে যেতে চায়?

জাপানে স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বলা হয় জুহাতসু (Jōhatsu)। জাপানি এই শব্দটির অর্থ ‘বাষ্পীভবন’। চুলায় পানি জ্বাল দিলে পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে হারিয়ে যায়। জুহাতসুরাও স্বেচ্ছায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত জীবন থেকে কোনো চিহ্ন না রেখে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যান। এই ঘটনা জাপানে বেশ পরিচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এমন ঘটনা দেখা যায়।

জাপানের সমাজ ও কর্মক্ষেত্র অন্য অনেক দেশের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে নিয়ম মানা ও ব্যক্তিগত সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া জাপানের মানুষ কাজপ্রিয়। প্রচণ্ড পরিশ্রমী তাঁরা। একসময় এই কাজের চাপ থেকে বের হতে পারেন না অনেকেই। আবার জাপানে অনেক মানুষ একা থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই পারিবারিক আবহ কম পান তাঁরা। এসব কারণে জুহাতসুর মতো ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়। জাপানি সংস্কৃতিতে চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়াকে লজ্জাজনক মনে করা হয়। এ ধরনের সামাজিক চাপ থেকে জন্ম নেওয়া মানসিক কষ্ট এত তীব্র হতে পারে যে অনেকেই তা আর সহ্য করতে পারেন না।

জাপানে কারোশি মানে অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যুর ঘটনাও দেখা মেলে। এগুলো জাপানের গভীর সামাজিক সমস্যার একটি দিক। এই মানুষগুলো মনে করেন এভাবে উধাও হয়ে গেলে তাঁরা নিজেদের সম্মান বাঁচাতে পারবেন। সঙ্গে পরিবারও আর্থিক বোঝা থেকে মুক্তি পাবে।

জাপানে এমন কিছু কোম্পানি আছে, যারা সবকিছু ছেড়ে চিরতরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সাহায্য করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাপানি ভাষায় বলা হয় ইয়োনিগে-ইয়া। ইংরেজিতে ‘নাইট মুভিং সার্ভিস’, অর্থাৎ রাতের বেলায় উধাও হয়ে যাওয়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। যেখানে তারা কোনো চিহ্ন না রেখে গোপনে একজন ব্যক্তিকে তার বর্তমান জীবন থেকে গায়েব করে দিতে পারে। এর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হয় সেই নাইট মুভিং সার্ভিস কোম্পানিকে।

নাইট মুভিং সার্ভিসের জন্য খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ইয়েন। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৫৪ হাজার ৭৪৭ থেকে ৩ লাখ ১৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তবে টাকার পরিমাণ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন, সম্পত্তির পরিমাণ, গন্তব্যের দূরত্ব, রাতের বেলা ভ্রমণ, শিশুদের সঙ্গে নেওয়া বা ঋণ আদায়কারীদের থেকে পালানোর মতো বিষয়গুলো। অনেকেই অবশ্য এসব প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়াই প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুসরণ করে নিজেই নিখোঁজ হন।

জাপানে স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হওয়া মানুষদের খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় ব্যক্তিগত গোয়েন্দা সংস্থা দিয়েও তাঁদের সন্ধান পাওয়া যায় না। এর প্রধান কারণ জাপানের কঠোর গোপনীয়তা আইন। কোনো অপরাধ বা দুর্ঘটনা না ঘটলে পুলিশ এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না। তা ছাড়া, নিখোঁজ ব্যক্তিদের কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ না থাকায় তাঁদের খুঁজে বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

যারা নিখোঁজ হন, তাঁদের অনেকেই টোকিও বা ওসাকার মতো এলাকায় আশ্রয় নেন। এসব এলাকায় পরিচয়পত্র ছাড়াই নগদ অর্থে কাজ করা যায়। তাই তাঁরা সেখানে সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারেন। তবে এসব এলাকা অনেক সময় জাপানি অপরাধ চক্র ইয়াকুজাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

জুহাতসু শব্দটি ১৯৬০-এর দশকে প্রথম ব্যবহৃত হয়। তখন এটি সেইসব মানুষ প্রসঙ্গে ব্যবহার করা হতো যাঁরা আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদের ঝামেলা এড়াতে অসুখী দাম্পত্য জীবন থেকে হঠাৎ করে পালিয়ে যেতেন।

তবে ১৯৯০-এর দশকে জাপানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা দেখা দেয়। এই সময়ে বহু মানুষ চাকরি হারান এবং বিপুল ঋণে জড়িয়ে পড়েন। এর থেকেই জুহাতসুর প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় জাপানে। অর্থাৎ, শব্দটি বিবাহবিচ্ছেদ এড়ানো থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বা সামাজিক চাপ থেকে পালানোর একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

জাপানে জুহাতসু একটি স্পর্শকাতর এবং গোপনীয় বিষয়। সাধারণত প্রকাশ্যে আলোচনা করা হয় না এ বিষয়ে। প্রতিবছর ঠিক কত মানুষ নিখোঁজ হন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ধারণা করা হয়, প্রতিবছর লক্ষাধিক জাপানি উধাও হন।

যদিও ২০১৫ সালে জাপানের জাতীয় পুলিশ সংস্থা ৮২ হাজার নিখোঁজ ব্যক্তিকে নথিভুক্ত করেছিল। তবে জাপানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করা হয়। মিসিং পারসনস সার্চ সাপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের জানিয়েছে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ নিখোঁজ হন জাপানে। ২০২৪ সালে এ বিষয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানান জার্মান পরিচালক আন্দ্রেয়াস হার্টম্যান ও আরাতা মোরি। জুহাতসুর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও এই কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে সিরিজটি।

সূত্র: বিবিসি  

২০১৫ সালে জাপানের জাতীয় পুলিশ সংস্থা ৮২ হাজার নিখোঁজ ব্যক্তিকে নথিভুক্ত করেছিল
২০১৫ সালে জাপানের জাতীয় পুলিশ সংস্থা ৮২ হাজার নিখোঁজ ব্যক্তিকে নথিভুক্ত করেছিল। ছবি: ইউকিও জাপান