Monday, August 26, 2024

গণ-অভ্যুত্থানের পরের শ্রীলঙ্কা থেকে যা শেখার আছে by আলতাফ পারভেজ

দুই বছর আগে শ্রীলঙ্কায়ও একটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতনের পর দেশটিতে রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কার কীভাবে ঘটছে এবং কী কী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, দেশটির অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের কী শেখার আছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী অভিমত লিখেছেন আলতাফ পারভেজ

বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আগস্ট অভ্যুত্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনা হচ্ছে। রক্তাক্ত জুলাই ও আগস্টের বিজয় কীভাবে পশ্চিমবঙ্গ ও বেলুচিস্তানের তরুণ-তরুণীদের প্রভাবিত করেছে, তার খবর ইতিমধ্যে দেখা গেছে।

এসবে গর্ব করার অনেক কিছু আছে। তবে বাংলাদেশের জন্য দরকারি কিছু আছে সামান্য। বরং ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ অন্য যেসব বার্তা আছে, সেসব এখন বেশি মনোযোগ দাবি করছে।

বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরের দুই বছরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতাসহ নীতিনির্ধারকেরা খতিয়ে দেখতে পারেন এখন। কেন দুনিয়া কাঁপানো গণ-অভ্যুত্থানের শেষে আগামী মাসে শ্রীলঙ্কা আবারও নির্বাচনের পথে এল, তার পর্যালোচনা বাংলাদেশে বসেও প্রয়োজনীয় হতে পারে।

নতুন সরকারের মেয়াদ কত দিন

বাংলাদেশে এখন ‘অন্তর্বর্তী’ সরকার চলছে। এই অন্তর্বর্তী সময়ের মেয়াদ কত দিনের, সেটা কেউ জানে না। নিঃসন্দেহে এটা মোটাদাগের রাজনৈতিক অস্পষ্টতা। এ রকম অস্পষ্টতার লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখন কম। কারণ, এ সরকার ছাত্র-জনতাই কায়েম করেছেন। এটা সফল এক গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ফল হিসেবে এসেছে।

যেকোনো সফল গণ-অভ্যুত্থান নিজে থেকে জনগণের একটা ‘যৌথ সাধারণ ইচ্ছা’ আকারে রাজনৈতিক বৈধতার দাবি নিয়ে হাজির হয়। বর্তমান সরকার সেভাবে পেয়েছে বাংলাদেশ।

আবার দেশ তীব্রভাবে উৎসবমুখর একটা নির্বাচনের জন্যও অপেক্ষা করছে। নির্বাচিত সরকারেই যে মানুষের শেষ পক্ষপাত, সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। একই সঙ্গে তারা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায়ও ফিরতে চায় না। ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ও চায়। এ রকম সব চাওয়া মেলাতে গেলে প্রথাগত ঐতিহ্যে বেখাপ্পা লাগে। কিন্তু বলা যায়, এটাই বাংলাদেশের চায়ের আড্ডার চলতি ধাঁধা এখন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৮ আগস্ট কূটনীতিবিদদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এমন একটি সময়ে এসে দেশের দায়িত্ব নিয়েছি, যখন প্রায় সবকিছুতে চরম বিশৃঙ্খলা। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমে সংস্কারের পর যত দ্রুত সম্ভব অন্তর্বর্তী সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবে।’ অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রথমে কিছু সংস্কার হবে, তারপর নির্বাচনও হবে।

প্রধান উপদেষ্টা নীতিনির্ধারণী কিছু কথা বললেন এবং গণ-অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষারই প্রতিধ্বনি দেখা গেল তাতে। গতকাল রোববার প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন।

ছাত্র-জনতা এখন নজর রাখছেন তাঁদের ‘যৌথ ইচ্ছা’র প্রকাশ সরকারের দৈনন্দিন কাজে, প্রতিদিনকার প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোয়, গুরুত্বপূর্ণ পদের বদলি-নিয়োগ-পদায়নে কতটা পড়ছে। এ রকম পদক্ষেপ গ্রহণের দৈনন্দিন প্রক্রিয়ায় ছাত্র-জনতা নিজেরা কতটা শরিক আছেন, সেটাও নিশ্চয়ই তাঁরা দেখবেন বা দেখছেন। শত শত শহীদের আত্মদানে শুরু হওয়া নতুন সমাজ নির্মাণের কাজ কেবল ২১ জন ব্যক্তির দায় হতে পারে না। তাহলে সেটা পুরোনো ঔপনিবেশিক শাসনপদ্ধতির আরেক দফা অনুশীলন হবে মাত্র।
প্রথমে সংস্কার, পরে নির্বাচন?

শ্রীলঙ্কাও অনেকটা একই রকম পরিস্থিতিতে ২০২২ সালটা শুরু করেছিল। প্রথমে তারা দুঃশাসক গোতাবায়া রাজাপক্ষে ও তাঁর ভাই মাহিন্দাকে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে তাড়ায়। বলা যায়, এ সময় তারা ‘রাজাপক্ষে’ গোত্রের গড়ে তোলা প্রশাসক গোষ্ঠীর ওপরের দিকের পুরোটাকেই তাড়াতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের মতোই জন-আন্দোলনের মুখে সেখানে সর্বোচ্চ নির্বাহী পালান এবং জনতা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখল করে উৎসবে লিপ্ত হয়। সিংহলি ভাষায় লঙ্কানরা সেই অভ্যুত্থানকে বলছিলেন ‘আরগালয়’। আরগালয় মানে, ‘সংগ্রাম’। বাংলাদেশে যেমন আন্দোলনের পরপর ‘রাষ্ট্র সংস্কার চাই’ আওয়াজ উঠেছে দিকে দিকে, শ্রীলঙ্কায় তেমনি বলা হতো ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ চাই।

বাংলাদেশে যেভাবে পালিয়ে যাওয়া শাসকেরা কর্তৃত্ব কায়েম করতে গিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করেছিলেন, রাজাপক্ষেরাও সিংহলি জাতীয়তাবাদের সে রকম এক মডেল ব্যবহার করেন লুটপাটে। তাঁরাও নির্বাচনী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছিলেন। দুর্নীতি ও অপশাসনে অর্থনীতিকে দেউলিয়া করে ফেলেন। যেন তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই এগোচ্ছিল তখনকার বাংলাদেশ।

এসব ছিল প্রকৃতপক্ষে জনতার কাছে জবাবদিহিহীন এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনপদ্ধতির জের। শ্রীলঙ্কায় যা হয়েছিল, তা যেমন অভিনব ছিল না; বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পতিত দশাও অনুমানহীন ছিল না। ফলে উভয় দেশে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত ছিল এবং সফলও হয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় অভ্যুত্থানের পরপর বাংলাদেশের মতো পুরোনো শাসক দল পুরোটা পালিয়ে যায়নি। সংসদ রয়ে গিয়েছিল। সেই সংসদে রাজাপক্ষেদের দলের সদস্যরাও রয়ে গিয়েছিলেন। ফলে রাজাপক্ষেরা ক্ষমতার পরিসর থেকে সরে গেলেও বাংলাদেশের মতো এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, যা পুরোপুরি অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা মতো। বরং পার্লামেন্টের ভেতর ‘আপসরফা’ হয় এবং পুরোনো রাজনীতিবিদ রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রধান করে একটা সরকার হয়।

পার্লামেন্টের ভেতর থেকে ‘নিয়মতান্ত্রিক’ভাবে তৈরি হলেও শ্রীলঙ্কার সরকারও প্রথাগত নির্বাচিত সরকার ছিল না। কারণ, রনিলের দলের সংসদে মাত্র একজন সদস্য ছিলেন। অথচ তাঁর নেতৃত্বের সরকারকে সবাই মেনে নিয়েছিল। সরকার মানাতে গিয়ে ‘ক্ষমতাকেন্দ্র’গুলো থেকে গণ-অভ্যুত্থানের দাবিদাওয়া পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি খোদ সমাজে গণ-আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাগুলোও রয়ে গিয়েছিল। সবাই প্রাথমিকভাবে চাইছিল অর্থনীতির পুনরুদ্ধার।

বাংলাদেশে পুরোনো সরকার বৈদেশিক দেনা রেখে গেছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। অনেকটাই বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি ছিল শ্রীলঙ্কার। ছোট অর্থনীতি সত্ত্বেও ৫১ বিলিয়ন ডলার দেনা বানিয়ে ফেলেছিলেন পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা।

এসব কারণেই এখন থেকে দুই বছর আগে নতুন প্রেসিডেন্ট রনিলও বারবার বলেছেন, ‘আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন’। সেই সরকার দুই বছর শেষে এখন দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দিচ্ছে। আরও অনেকের পাশাপাশি রনিল বিক্রমাসিংহেও এখন প্রেসিডেন্ট হতে চাইছেন। ৭৫ বয়সী রনিল ইতিমধ্যে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আবারও আগ্রহী!এই মাটির বীর সন্তানদের জন্য রূপকল্প ২০৫০

ক্ষমতা বণ্টনব্যবস্থার সংকট

রাষ্ট্রনৈতিক দিক থেকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মিল বিপুল। উভয়ে ব্রিটিশ কলোনি ছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্রিটিশরা উভয়কে ছেড়ে যায়। তবে এই ‘ছেড়ে যাওয়া’ কেবল শ্বেতাঙ্গ শাসকদের ছেড়ে যাওয়া। প্রায় ২০০ বছরে নির্মিত পুরো ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোই ব্রিটিশরা শ্রীলঙ্কা ও বঙ্গে (ভারতবর্ষে) রেখে গিয়েছিল। এমনকি ১৯৭১ সালে নতুন করে মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে বিজয়ী বাংলাদেশেও প্রায় একই আইনি ব্যবস্থা থেকে গিয়েছিল সামান্য কিছু প্রচ্ছদতুল্য পরিবর্তন বাদে।

গত সাত দশকে মূলধারার নির্বাচনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের মতো শ্রীলঙ্কায় বারবার ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করলেও ঔপনিবেশিক এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার করেনি।

বাংলাদেশের বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতো সেখানকার ফ্রিডম পার্টি (এখন পডুজানা পেরামুনা) ও ন্যাশনাল পার্টি বারবার ক্ষমতার মধু খেলেও সমাজে ক্ষমতার বণ্টনব্যবস্থায় কোনো সংস্কার করেনি, যার চূড়ান্ত ফল ২০২২ সালের মার্চে ছাত্র-জনতা যখন ‘আরগালয়’ ঘটান, তখন আর পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোকে ডাকছিলেন না। তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন না।

বাংলাদেশে যেভাবে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রশক্তি, তেমনি শ্রীলঙ্কায় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশন বা আইইউএসএফ ছিল সংগ্রামের সবচেয়ে সাহসী শক্তি।

বাংলাদেশে যে আন্দোলন শুরু হয় অন্যায্য কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে, শ্রীলঙ্কায় শুরু হয়েছিল জিনিসপত্রের উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে। ইতিহাসের বিস্ময়, ২৪ মাসের ব্যবধানে উভয় দেশে সব ঘটে জুলাইয়ে।
শ্রীলঙ্কায় গত ২৪ মাসে যা হলো

২০২২-এর আরগালয়ের ফল হিসেবে শ্রীলঙ্কার রনিল সরকার যখন ক্ষমতা পায়, তখন তাদের সামনেও আজকের বাংলাদেশের মতো অনেক সংস্কার এজেন্ডা ছিল। শ্রীলঙ্কাও এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন চেয়েছিল। তারাও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় প্রাদেশিক সরকারের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন চাইছিল। তামিল-অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এটা খুব জনপ্রিয় দাবি।

শ্রীলঙ্কার নির্বাচনী ব্যবস্থা বেশ ভালো। আনুপাতিক ভোটে সেখানে জনপ্রতিনিধি বাছাই হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি ও আমলাকাঠামো এমন পুরোনো ধাঁচের যে একটা ভালো নির্বাচনও সেখানে জনস্বার্থে কিছু করতে পারে না; বরং উল্টোটা ঘটে। সাংবিধানিক বিধানের জোরে কুলীনেরাই সব নিয়ন্ত্রণ করত তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক পথে’।

এ জন্য ২০২২ সালে পুরো দেশে আরেকটি বড় দাবি ছিল সাংবিধানিক সংস্থাগুলোয় প্রধান নির্বাহী ও শাসক দলের হস্তক্ষেপের রাস্তা বন্ধ করা। বাংলাদেশে পাবলিক সার্ভিস কমিশন, নির্বাচন কমিশনের মতো সংস্থাগুলোয় যেভাবে সমস্যা হতো, শ্রীলঙ্কাও তা থেকে রেহাই চাইছিল। সেখানে সংবিধানের ২০এ অনুচ্ছেদ প্রেসিডেন্টকে দানবীয় ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে; বাংলাদেশের সংবিধান নানা কৌশলে যেভাবে প্রধানমন্ত্রীকে প্রায় একই ধরনের ক্ষমতাশালী করেছে।

করব করব করেও রনিল সরকার এসব সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে এগোয়নি। সরকার ‘অর্থনীতি বাঁচাতে’ গিয়ে আইএমএফের পরামর্শমতো যেসব পদক্ষেপ নেয়, তাতে আন্দোলনের শক্তির একাংশ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা দেশজ বিবেচনাকে মাথায় রেখে সংস্কার চাইছিল এবং সেটা না হওয়ায় দ্রুত নির্বাচন চাইতে শুরু করে। তখনই দেখা যায়, অনির্বাচিত সরকার হিসেবে এককভাবে কোনো টিমের পক্ষে জাতীয়ভিত্তিক সংস্কার এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এ সুযোগে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রও প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে নীরবে তাদের অনাগ্রহ জানিয়ে রাখছিল।

ছাত্র-তরুণদের নতুন সংবিধানের দাবি তাদের কাছে ছিল অতি স্পর্শকাতর। বাংলাদেশের সাইবার অ্যাক্টের মতো বহু কালো আইন আছে সেখানে। গণ-অভ্যুত্থানের সরকারও সেগুলো কবর দিতে পারেনি।

দেশটিতে বাংলাদেশের মতোই আমলাতন্ত্র খুবই শক্তিশালী। স্বাধীনতার পর থেকে প্রশাসনের জনজবাবদিহি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ ছিল না, বরং তামিলদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র শক্তিশালী’ করতে গিয়ে আমলাতন্ত্রকে ধর্ম, অর্থ ও আইনগত উপাদানে সবল করা হয়েছে ক্রমে। তারা একটা অনির্বাচিত সরকারের কাছে সমর্পিত হতে অনিচ্ছুক ছিল।

তা ছাড়া অনির্বাচিত এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকারও তাদের ওপর প্রচণ্ড রকম নির্ভরশীল ছিল। চলমান অবস্থার সুবিধাভোগীরা কেন্দ্রীভূত শাসনের মজা ছাড়তে চাইছিল না। গণ-অভ্যুত্থানের সুবিধা নিয়ে গড়ে ওঠা রনিলের মন্ত্রীরাও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিজেদের পছন্দের অদক্ষ লোক দিয়ে ভরে জনগণকে হতাশ করতে শুরু করেন। উল্টো দিকে সময় যত গড়িয়েছে রাজনীতিবিদেরা নির্বাচন পেতে সরব হয়ে উঠছিলেন।

আবার আন্তর্জাতিক মহলও দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নামে সেখানকার প্রশাসনের আমূল বদল দেখতে চায়নি। তাদের আগ্রহ ছিল কেবল তামিল এলাকার স্বায়ত্তশাসন।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কায় যেটা দেখা যাচ্ছিল, ব্যাপকভিত্তিক রাজনৈতিক সমর্থন আছে, এমন কোনো সংস্কারবাদী দল ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়। আবার কথিত সংস্কারবাদীরাও তামিলদের মতো বঞ্চিতদের বেলায় এসে সংস্কার প্রশ্নে ইমান ঠিক রাখতে পারছিলেন না। এর মধ্যে দীর্ঘ সময়ের অনির্বাচিত সরকারে জনসমাজে ক্ষোভ ও অস্থিরতাও বাড়ছিল। তার জের আসন্ন সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে এখনো এ রকম অবস্থা আসেনি। সংস্কার ও নির্বাচনকে সমন্বয় করতে গিয়ে এখানে হয়তো শিগগির সংলাপ হবে। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চয়ই অন্তর্বর্তী সরকারকে তাদের অভিমত জানাবে। কিন্তু একমত হয়ে কিছু বলতে পারবে কি তারা? এর মাঝে ‘প্রশাসক’দের দিয়ে স্থানীয় সরকার চালাতে গেলে উন্নয়ন-স্থবিরতা আসতে পারে। উন্নয়ন-উদ্যোগগুলোয় জনসম্পৃক্তি ও অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।

আবার নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারহীন পরিবেশে এখনই নির্বাচনও দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ভালো ফল আনবে না। এই দুইয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনাই বাংলাদেশে এ সময়ের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে, সংস্কার উদ্যোগ এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার ও ঐক্য দরকার। কিন্তু মানুষের চাওয়ার মতো করে রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তুত না হলে বিষয়টি দুরূহ হয়ে যেতে পারে।

আলতাফ পারভেজ লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক

খালেদা জিয়াকে হত্যাচেষ্টার মামলা: কানাডা থেকে জায়েদ খান বললেন, ‘আমি হতবাক’

গতকাল রোববার রাতে নিজের নামে মামলার কথা জেনেছেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান। একজন শিল্পী হিসেবে এমন মামলার কথা শুনে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন। কানাডা থেকে জায়েদ খান বললেন, ‘আমি বিস্মিত, আমি হতবাক। মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়ানো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

প্রায় এক দশক আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের চিত্রনায়ক জায়েদ খান, উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয় ও অভিনেতা সাজু খাদেম রয়েছেন। জায়েদ জানান, প্রথম আলোর মাধ্যমে গতকালই খবরটি জেনেছেন।

মামলা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেকোনো শিল্পীর রাজনৈতিক মত থাকতেই পারে। এটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আমি কখনোই অতিরঞ্জিত বা বিতর্কিত কোনো কিছু করিনি। কিন্তু গতকাল দেখলাম, আমার নামে মামলা। ৯ বছর আগের আমি নাকি হত্যাচেষ্টায় গাড়ি ভাঙচুর করেছি। সেই সময়ে তো শত শত সাংবাদিক ছিলেন, এটা নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়েছে। যদি থাকতাম, তাহলে তো তখনই খবরের শিরোনাম হতাম। এখন ঢালাওভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে শিল্পীদের নামে মামলা আমি সমর্থন করি না।’
জায়েদ জানান, দেশের একটি পরিবর্তন এসেছে। সেখানে সবাই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাইবে। সবার নাগরিক অধিকার থাকবে। দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু উদ্দেশ্য হাসিলে কারও ক্যারিয়ারে বাধা হলে, শিল্পাঙ্গন কখনোই এগিয়ে যেতে পারবে না। জায়েদ বলেন, ‘ঢালাওভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে সত্যিকারের অনেক অপরাধীদের আড়াল করা হচ্ছে। আমাদের টেনে ধরার জন্য এই মামলা। আমি হলফ করে বলতে পারি, কোনো মিছিল–মিটিংয়ে কোনো দিন ছিলাম না। দেশের ক্ষতি হয়, রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো কাজ করিনি। সেগুলো যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে আমার নামে মামলা করতে পারেন। আমি ক্ষতি করে থাকলে তার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সাজিয়ে মিথ্যা মামলা দিলে স্বাধীনতার প্রতি আস্থা থাকবে না।’

এর আগে দুই মেয়াদে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন জায়েদ খান। ২০২২ সালে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তাঁর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নিপুণ আক্তার। সেই নির্বাচনে জায়েদ ভোটে জিতলেও ফলাফল নিপুণ মেনে না নিলে কোর্টে মামলা করেন। হেরে যান জায়েদ। চলে মামলা–মোকদ্দমা। তখনই আলোচনায় আসেন জায়েদ। পরবর্তী সময় কখনো বিয়ে, কখনো নারী নিয়ে মন্তব্য করে, কখনো ডিগবাজি দিয়ে ভাইরাল হতে থাকেন তিনি। ট্রলেরও শিকার হয়েছেন এই সমালোচিত নায়ক।
‘আমার ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়ের আমি কখনোই রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো কাজ করিনি, আমার কোনো ব্যাংক লোন নাই। আমি কোনো অপকর্ম করিনি। বিএনপি নিয়ে কখনোই খারাপ কিছু বলিনি। এই অধিকার আমার নেই। সেই সময়ে গাড়িবহরে থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। রাজনৈতিক কোনো মিছিল–মিটিংয়ে থাকিনি। এটা শিল্পীর কাজ নয়। এখনো যদি ভিত্তিহীন মামলা হয়, তাহলে ২০২৪–এর এই স্বাধীনতার মূল্য কোথায় থাকবে? আমি হই আর যে–ই হোক, অপরাধ করলে মামলা হবে। আইনে তার বিচার হবে। কিন্তু আজগুবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দেওয়ায় আমি হতবাক, বিস্মিত হয়েছি।’

জায়েদ খান অভিনীত সর্বশেষ সিনেমা ‘সোনার চর’ পবিত্র ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায়। পরে কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। এ আগে ছয় বছর আগে ‘অন্তর জ্বালা’ সিনেমাটি মুক্তি পায়। এদিকে জায়েদ সর্বশেষ কলকাতার অভিনেত্রী সায়ন্তিকার সঙ্গে একটি সিনেমায় অভিনয় করেন। কিন্তু সিনেমাটি শেষ হয়নি। পরে পূজা ব্যানার্জি নামের আরেক টালিউড অভিনেত্রীর সঙ্গে সিনেমা করার কথা ছিল।

সবশেষে জায়েদ বললেন, ‘শিল্পীদের নামে এভাবে সাজিয়ে মামলা হলে মিডিয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। কাজের সুস্থ পরিবেশ থাকবে না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ, অপকর্ম থাকলে মামলা অবশ্যই সমর্থন করি। কিন্তু ঢালাও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা সমর্থন করি না। দেখলাম সাকিব আল হাসানের নামেও এমন মামলা হয়েছে। এমন মামলা দেশের সম্মানের স্বার্থে বন্ধ করা হোক। তবে কারও যোগসূত্র থাকলে হতে পারে।’

বাংলাদেশের 'আয়রন লেডির' পতন, নানা প্রশ্ন

শেখ হাসিনা বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশকে লোহার মুষ্টিতে শাসন করেছেন। কিন্তু ৫ আগস্ট প্রবল  ছাত্র বিক্ষোভের মুখে পড়ে তিনি পদত্যাগ করেন ,অবশেষে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। জনতা প্রধানমন্ত্রীর খালি বাসভবনে ভিড় করে এসে  বিজয়োল্লাস করতে থাকে। সেই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন নারী নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান হিসাবে হাসিনার ১৫বছরের রাজত্বের আকস্মিক পতন ঘটে।

মিডিয়া আউটলেটের রিপোর্ট অনুযায়ী, হাসিনার অফিসে থাকার শেষ ২৪ ঘন্টা  সময় সত্যিই মনে রাখার মতো ছিল। ৪আগস্ট সন্ধ্যা ৬ টায়, হাসিনা ক্রমবর্ধমান সরকার বিরোধী বিক্ষোভ দমনের লক্ষ্যে  অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশব্যাপী কারফিউ জারি করেন। সেই রাতে, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে অনলাইনে  একটি মিটিং করেন এবং তাদের নির্দেশ দেন যে,  কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় নেমে আসা বেসামরিক লোকদের উপর গুলি চালানো যাবে না। সেনাপ্রধান তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে রিপোর্ট করেন যে তার সৈন্যরা রাজধানী ঢাকায় লকডাউন কার্যকর করতে পারেনি।

৫ আগস্ট সকালে  হাসিনাকে কড়া পাহারায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে লুকিয়ে রাখা হয়। বিক্ষোভ দমনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা   জানিয়ে দেন যে তারা পরিস্থিতির ওপর  নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন । একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা হাসিনাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে , ওই  সিনিয়র কর্মকর্তা হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানাকে বলেন  প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে রাজি করাতে , তাতেও কোনও  লাভ হয়নি। অবশেষে হাসিনার ছেলে, সজীব ওয়াজেদ জয়, একজন ব্যবসায়ী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী সরকারের একজন উপদেষ্টা, মাকে  ফোন করে রাজি করান।   নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে  হাসিনা দ্রুত ভারতে প্রবেশের জন্য অস্থায়ী অনুমতি চেয়ে  আবেদন করেন।

হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে  অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়। সময় ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছিল। তারা অনুমান করেছিল যে জনতার ভিড় ৪৫ মিনিটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পৌঁছে যাবে । তিনি এবং রেহানা সরকারী বাসভবনের কাছে একটি পুরানো বিমানবন্দরে এসে সামরিক হেলিকপ্টারে চড়েন। পদত্যাগ প্রক্রিয়া  সম্পূর্ণ হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে হাসিনা এবং তাঁর বোন  ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । প্রায় দুই ঘণ্টা পর, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান  একটি টেলিভিশন ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং বলেন  যে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।

ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রী , যিনি শেষ অবধি ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন তাঁর জীবন ছিল অস্থিরতায় পূর্ণ। হাসিনা ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা, শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট  এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের একজন  নায়ক, চার বছর পরে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। হাসিনার মা ও ১০ বছর বয়সী ভাইসহ তার পরিবারের ছয় সদস্যকে হত্যা করা হয়। হাসিনা ও রেহানা ওই সময় পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় গণহত্যা থেকে রক্ষা পান। তারা বহু বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন।১৯৮১ সালে, হাসিনা দেশে ফিরে আসেন এবং তার পিতার প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ (AL) এর সভাপতি হন। ১৯৯০ সালে দেশের গণতন্ত্রীকরণের পর, তিনি ১৯৯১  সালের সাধারণ নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেন।কিন্তু আওয়ামী লীগ অপ্রত্যাশিতভাবে খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কাছে হেরে যায়।

১৯৯৬সালের নির্বাচনে হাসিনা জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর, হাসিনা নিজের ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করেন, বিরোধী দলকে দমন করেন এবং নিজের  শাসনকে দীর্ঘায়িত করেন।সরকারি চাকরির জন্য বিতর্কিত কোটা পদ্ধতির কারণে বাংলাদেশের "আয়রন লেডি" এর আকস্মিক  পতন ঘটে। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র একটি দেশ , সেই সময় থেকে  সরকারি চাকরিতে ৩০% সংরক্ষণ ছিল ১৯৭১ সালের   "মুক্তিযোদ্ধাদের" সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য । দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পোশাক শিল্পের হাত ধরে   অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ  করেছে,  উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার  ব্যাপক। আর তাই কোটা ব্যবস্থাকে অন্যায্য আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায় শিক্ষার্থীরা।

ছয় বছর আগেও প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন। হাসিনা রাজি হন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত কোটা  বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু চলতি বছরের ৫ জুন কোটা প্রথা বিলুপ্তির বিরুদ্ধে হাইকোর্ট নীতিগত সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে কোটা পুনর্বহাল করে । আদালতের রায়ের পরে  আবারও বিক্ষোভ শুরু হয়।সরকার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল, কিন্তু ছাত্রদের   ক্ষোভ গিয়ে পড়ে সরকারের উপর। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এই রায় রাজনৈতিক চাপের ফলে হয়েছে। হাসিনা দাবি করেন যে বিএনপির মতো বিরোধী দল পর্দার আড়ালে থেকে ছাত্রদের উস্কাচ্ছে  এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্র্যাক ডাউন করার নির্দেশ দিয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন হাসিনা বিক্ষোভকারীদের "রাজাকার" বলে অভিহিত করেন।

চাকরিতে কোটা সিস্টেম নিয়ে যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল  তা সরকারকে উৎখাত করার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয় । ২১শে জুলাই সুপ্রিম কোর্ট সরকারি চাকরিতে  বেশিরভাগ কোটা বাতিল করে দেয়, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে । নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে উভয় পক্ষের অসংখ্য হতাহতের ঘটনা ঘটে, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ১৬ অগাস্ট প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, সরকার পতনের পর ছাত্র বিক্ষোভ এবং পরবর্তী অশান্তিতে প্রায় ৬৫০  জন মারা গেছেন ।হাসিনাকে  বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে  তার নৃশংস প্রতিক্রিয়ার  মূল্য চোকাতে হয়েছে । হাসিনা এমন একজন নারী যাঁকে ৪৩বছর আগে, স্বাধীনতার নায়কের কন্যা হিসাবে আনন্দের সাথে স্বাগত জানিয়েছিল গোটা দেশ । এখন তিনিই দেশ থেকে নির্বাসিত।

বড় প্রশ্ন হল হাসিনা, যিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে  নেতৃত্ব দেবেন বলে আশা করা হয়েছিল, তিনি কেন একজন নির্মম কর্তৃত্ববাদী  শাসক হয়ে উঠলেন। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপিং ইকোনমিসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মায়ুমি মুরায়ামা  বলছেন- '১৯৯৬ সালে যখন তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তখন হাসিনাকে  একজন কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিবিদ বলে আমার মনে হয়নি।  দু বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে  থাকার পর হাসিনা ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় ফিরে আসেন তখন তাঁর  কর্তৃত্ববাদী আচরণ  প্রকাশ পেতে শুরু করে।  প্রথমেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে হাসিনা সংবিধান সংশোধন করেন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য একটি সিস্টেমের  অভাব ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ স্থানান্তরকে বাধা দেয় এবং তার কর্তৃত্ববাদকে কায়েম করার পথ প্রশস্ত করে দেয়।

তিনি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে  দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাঁকে  বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করান, বিএনপিকে দুর্বল করে দিতে কোনো কসুর বাকি রাখেননি হাসিনা।  দেশে এমন একটি পরিবেশ তৈরী করেছিলেন যেখানে সরকারের সমালোচনা ছিল অপরাধের সমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং গণমাধ্যমে  বাকস্বাধীনতার অধিকারকে খর্ব করা হয়  । আ.লীগের ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য বাড়তে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে  এবং প্রশাসনের সমালোচকরা হয়রানির শিকার হতে থাকেন।  প্রকৃতপক্ষে  মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির কোটা নিয়ে বিক্ষোভ ছিল হাসিনারকর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রাথমিক সুবিধাভোগী আ.লীগকে সমর্থনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য হিন্দু -র দাবি , 'হাসিনা তার সেরা উপদেষ্টাদের থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।  শেষ পর্যন্ত, শুধুমাত্র তার বোন রেহানাকেই বিশ্বাস করতেন'।  মুরায়ামার  পর্যবেক্ষণ -' না' শুনতে পছন্দ করতেন না হাসিনা , তাই প্রধানমন্ত্রী প্রতিবাদী ছাত্রদের যুক্তি এবং উপলব্ধি সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি। '

প্রেসিডেন্ট  শাহাবুদ্দিন, যার কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না, তিনি সঙ্কটের পরবর্তী পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবেলায় জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাথে সহযোগিতা করেছিলেন। বিরোধী দল, নাগরিক সংগঠন এবং ছাত্র গোষ্ঠীর সাথে পরামর্শ করার পর, তিনি আ.লীগ-অধ্যুষিত সংসদ ভেঙে দেন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। প্রাক্তন কূটনীতিক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মী এবং ছাত্র প্রতিনিধি সহ ১৬ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে গঠিত, অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশে স্থিতিশীলতা আনার   এবং   গণতান্ত্রিক নির্বাচন সংঘটিত করার  দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের জনগণ  দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত, প্রায় ৩০% করে দুটি প্রধান দল, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি -এর সমর্থক , বাকি ৪০%  ছোট দলগুলিকে সমর্থন করে।গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সম্ভবত রাজনৈতিক গতিশীলতা  ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করবে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে যদি বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা  আ.লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে  পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, "বাংলাদেশের জনগণ এতদিন যে বাইনারি রাজনীতি দেখে এসেছে  তা তারা আর মেনে  নিতে চাইছে না। এই অল্প সময়ের মধ্যে   তৃতীয় কোনো পক্ষের উদ্ভব এবং মানুষের জন্য সত্যিকারের বিকল্প প্রদান  কঠিন হবে।'

অন্তর্বর্তী সরকারের হয়ে শপথগ্রহণ  অনুষ্ঠানে ইউনূস তার বক্তপব্যে বলেছিলেন, ' বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছে। 'এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হাসিনার   ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে শেষ পর্যন্ত সামরিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসনমুক্ত একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হবে কিনা।জাপানের মতো  শুধুমাত্র নেতৃস্থানীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলিই নয় -- বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সাহায্য দাতা -- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের পাশাপাশি ,  গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ  যেখানে কর্তৃত্ববাদ  এবং গণতন্ত্র উভয়ই  বিদ্যমান , তারাও বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নয়ের উপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখবে।

সূত্র-নিক্কেই এশিয়া

হাসিনার প্রস্থানের পর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু -ব্লুমবার্গের নিবন্ধ

বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দুর্নীতি ঢাকতে দেশের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সকে স্ফীত করে দেখানো  হয়েছে। দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিবিদ তথা নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে হাসিনার সময়কালের  অব্যবস্থাপনার তথ্য সম্বলিত একটি ‘শ্বেতপত্র’ তৈরি করতে বলেছে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে ৯০ দিনের মধ্যে এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।  নোবেল বিজয়ী ব্যাংকার মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার, যিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শনিবার ঢাকায় একটি সাক্ষাৎকারে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য (৬৮) বলেছেন, ‘ডেটা নিয়ে আমরা গুরুতর সমস্যায় পড়েছি। আসল তথ্যকে চেপে রাখা হয়েছে। আমি এটাকে ‘তথ্যের নৈরাজ্য’ বলে উল্লেখ করতে চাই।’

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানির উৎস বাংলাদেশের একটি অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প তুলে ধরা হয়। কিন্তু ভট্টাচার্য বলছেন, ‘হাসিনার প্রশাসন সম্ভবত রপ্তানি, মুদ্রাস্ফীতি এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ভুল তথ্য প্রকাশ করেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে।’

হাসিনা, যিনি গণবিক্ষোভের মুখে পড়ে পদত্যাগ করেন এবং এই মাসে ভারতে পালিয়ে যান। ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮.৩৬ ট্রিলিয়ন টাকা দেশি ও বিদেশি ঋণের বোঝা  রেখে গেছেন। যা তিন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সমান।

ভট্টাচার্য বাংলাদেশের জন্য তিনটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করেছেন: সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঘাটতি। তিনি বলছেন,  ‘গত কয়েক বছরে স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়েছে এবং হাসিনা এর জন্য ইউক্রেনের যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। যদিও আমরা মনে করি এটা যুক্তিযুক্ত নয়’।

বাংলাদেশের ট্যাক্স -টু-জিডিপি অনুপাত ৭.৩%, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন একটি। এই অনুপাত ২০২৫  সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে ৮.৮% এ উন্নীত হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, ‘সবথেকে বড় বিভ্রান্তির জায়গা হলো আপনার ৫% থেকে ৭% স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি রয়েছে এবং আপনি কর সংগ্রহ করেন না। যার অর্থ দাঁড়ায় হয় প্রবৃদ্ধি কাল্পনিক ছিল, অথবা যারা প্রবৃদ্ধি থেকে উৎপন্ন আয় থেকে উপকৃত হয়েছে তারা করের আওতায় আসেনি। সম্ভবত এর একটি বড় অংশ দেশের বাইরে ফানেল করা হয়েছিল।’

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক কাজ হলো বিদ্যুতের মতো জরুরি পরিষেবার জন্য অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে  প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করা। নবনিযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গত সপ্তাহে বলেছেন যে, দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাথে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তার জন্য আলোচনা চালাচ্ছে এবং অন্যান্য বহু-পাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে তহবিল চাইছে। রপ্তানিতে ব্যাঘাত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যা বর্তমান সংকটের আগে থেকেই  কমে গিয়েছিল। গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। বাংলাদেশ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেপো রেট ৫০ পয়েন্ট বাড়িয়েছে। আদানি পাওয়ারের বাংলাদেশের কাছ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া রয়েছে।

১৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যার বাংলাদেশ উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন পেতে আদৌ প্রস্তুত কিনা। সরকার পরিবর্তন এবং পরবর্তীতে সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণে জাতিসংঘ সম্প্রতি সলোমন দ্বীপপুঞ্জের এলডিসি ক্যাটাগরির বাইরে যাওয়ার বিষয়টি স্থগিত করেছে। ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশ যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তা গ্র্যাজুয়েশনের সমস্যা নয় বরং  উন্নয়নের সমস্যা। অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও দেশ ট্র্যাকে রয়েছে।’

জাতিসংঘের প্যানেলে থাকা এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন,  বাংলাদেশ এখনও গ্রাজুয়েশন স্তরের জন্য তিনটি মানদণ্ডের উপরে রয়েছে: মাথাপিছু জিএনআই, মানব সম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দুর্বলতা সূচক।

প্রবল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, গত সপ্তাহে সহিংস বিক্ষোভে ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান যেকোনো কর্তৃত্ববাদী  সরকারের প্লেবুকে অনায়াসে জায়গা করে নিতে পারে। সবশেষে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, ‘বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়।  প্রথমে, আপনি বহুত্ববাদকে ঘৃণা করতে শুরু করেন , তারপরে আপনি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা বাতিল করেন, এবং তারওপরে আপনি আপনার পক্ষপাতদুষ্ট লোকদের সমস্ত প্রতিষ্ঠানে রাখেন - অগত্যা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে দেশ চলে। যাকে এককথায় চাটুকারিতা বলা যায়।’

নির্বাচন কখন হবে সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত -ড. মুহাম্মদ ইউনূস

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেছেন, বৈষম্যহীন, শোষণহীন, কল্যাণময় এবং মুক্ত বাতাসের রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই স্বপ্নপূরণে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ।  রোববার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার ভাষণ সরাসরি সমপ্রচার করা হয়। ছাত্র-জনতা যে স্বপ্ন নিয়ে বিপ্লব এনেছে তা সফল করতে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। ছাত্র-জনতার বিপ্লবে নিজেকে একজন সহযোদ্ধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার নানা খাতে পর্বতসম চ্যালেঞ্জ রেখে গেছে। দেশবাসীর সহযোগিতা নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে। জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত আমাদের নয়।

জুলাই-আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়ে আপনাদের কাছে কিছু কথা বলতে চাই। স্মরণাতীত কালের ভয়াবহ বন্যায় যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, যারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বা যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন, যারা দুঃসহ জীবনযাপন করেছেন তাদের স্মরণে রেখে কথা বলছি। বন্যাদুর্গতদের জীবন দ্রুত স্বাভাবিক করার জন্য যাবতীয় উদ্যোগ সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে নেয়ার আয়োজন করেছি। ভবিষ্যতে সব ধরনের বন্যা প্রতিরোধে আমাদের অভ্যন্তরীণ এবং প্রতিবেশীদর সঙ্গে যাতে যৌথভাবে নেয়া যায়, সে আলোচনা শুরু করছি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিপ্লবী ছাত্র-জনতা জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমাকে এক গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তারা নতুন এক বাংলাদেশ গড়তে চায়। নতুন প্রজন্মের এই গভীর আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব রূপ দেয়ার সংগ্রামে আমি একজন সহযোদ্ধা হিসেবে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। দেশের সব বয়সের, সব পেশার, সব মতের, সব ধর্মের সবাইকে বিনা দ্বিধায় এই সংগ্রামে যোগ দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

ড. ইউনূস বলেন, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে লাখো মা-বোনের আত্মদানের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ আমরা পেয়েছিলাম, তা ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরাচারের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। আপনারা দেখেছেন আমাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তারা কীভাবে শেষ করেছে। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে দুর্নীতি। এমন এক দেশে আমাদের দেশ রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে স্বৈরাচারের পিয়ন দুর্নীতির মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ করার মতো অকল্পনীয় কাজ করে গেছে নির্বিবাদে। শিক্ষা খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে, ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজার খাতে লুটপাট, প্রকল্প ব্যয়ে বিশ্বরেকর্ড, অবাধ সম্পদ পাচার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে নিজ দলের পুতুলে রূপান্তর, বাকস্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকার হরণ এসব হিমশৈলের অগ্রভাগমাত্র। ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ফ্যাসিবাদী সরকার খর্ব করেছে জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা ও অধিকার। দুঃশাসন, দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার নিপীড়ন, বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে জনসুরক্ষা বিপন্ন করেছে। জনগণকে নির্যাতন ও বঞ্চনা ও বৈষম্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের মানুষসহ কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার বছরের পর বছর হরণ করেছে। মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে স্বৈরাচার তার নিজের, পরিবারের ও দলের কিছু মানুষের হাতে দেশের মালিকানা তুলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, কিন্তু এই দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েই আমাদের গড়তে হবে স্বপ্নের বাংলাদেশ। বৈষম্যহীন, শোষনহীন, কল্যাণময় এবং মুক্ত বাতাসের রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আমি তাদের সেই স্বপ্নপূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। আপনাদের সবাইকে এই শুভ লগ্নে তাদের স্বপ্নপূরণে সব শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। তাদের স্বপ্ন আমাদের স্বপ্ন। জাতীয় জীবনে তরুণরা একটি মহাসুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আমরা সবাইকে সুযোগ ব্যবহার করার কাজে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানাচ্ছি, বলেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, গণরোষের মুখে ফ্যাসিবাদী সরকার-প্রধান দেশত্যাগ করার পর আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার থাকবে পুরোপুরি সুরক্ষিত। আমাদের লক্ষ্য একটিই। উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ। আমরা এক পরিবার। আমাদের এক লক্ষ্য। কোনো ভেদাভেদ যেন আমাদের স্বপ্নকে ব্যাহত করতে না পারে সেজন্য আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মযাত্রার প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে আপনাদের কাছ থেকে যে সমর্থন পাচ্ছি সেজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। আমরা অনুধাবন করছি যে, আমাদের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা অনেক। এ প্রত্যাশা পূরণে আমরা বদ্ধপরিকর। যদিও দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রহীনতা, ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের জন্য পর্বতসম চ্যালেঞ্জ রেখে গিয়েছে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আমরা প্রস্তুত। আজ আমি সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করতে আপনাদের সামনে এসেছি।
শুধু আমি বলবো আপনাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। এখনই সব দাবি পূরণ করার জন্য জোর করা, প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ব্যক্তিবিশেষকে হুমকির মধ্যে ফেলা, মামলা গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা, বিচারের জন্য গ্রেপ্তারকৃতকে আদালতে হামলা করে আগেই এক ধরনের বিচার করে ফেলার যে প্রবণতা তা থেকে বের হতে হবে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের গৌরব ও সম্ভাবনা এসব কাজে ম্লান হয়ে যাবে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টাও এতে ব্যাহত হবে, যোগ করেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, রাতারাতি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন। নড়বড়ে এক কাঠামো, আমি বরং বলবো জনস্বার্থের বিপরীতমুখী এক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের দেশ পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে হয়েছে। আমরা এখান থেকেই বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়তে চাই যেন এ দেশে জনগণই সত্যিকার অর্থে সকল ক্ষমতার উৎস হয়। বিশ্বদরবারে একটি মানবিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে সমাদৃত হয়। তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষার্থী ও জনতার আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে সফল আমাদের হতেই হবে। এর আর কোনো বিকল্প নেই।

দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন জুলাই-আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানে বলপ্রয়োগ ও হতাহতের যে দুঃসহ ঘটনা ঘটানো হয়েছে তার স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধানকে বাংলাদেশে এসে তদন্ত শুরু করতে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তদন্তের প্রক্রিয়া এ সপ্তাহেই শুরু হবে। তাদের প্রথম দল ইতিমধ্যে এসে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে নস্যাৎ করতে যে শত শত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছিল তার অধিকাংশ প্রত্যাহার করেছি এবং আটক ছাত্র-জনতার মুক্তিলাভের ব্যবস্থা করেছি। পর্যায়ক্রমে মিথ্যা ও গায়েবি সব মামলার ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষকে দুঃসহ ভোগান্তি থেকে মুক্ত করা হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে।
তিনি বলেন, সকল আহত শিক্ষার্থী ও জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। সে লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী দুইজন উপদেষ্টার সহায়তায় একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই কার্যক্রমের জন্য এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকার অতি দ্রুত ‘জুলাই গণহত্যা স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে এনেছি। আপনাদের সবার এবং বিদেশে অবস্থানরত ভাই-বোনদের অনুদান এই প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেছি।

তিনি বলেন, আপনারা লক্ষ্য করেছেন, দায়িত্ব গ্রহণ করেই আমাদের আইনশৃঙ্খলা অঙ্গনে অস্থির পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থন দেশপ্রেমিক সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজে যোগ দিয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকার প্রশাসনকে চরম দলীয়করণ করার ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। আমরা ইতিমধ্যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছি। তবে প্রশাসনকে গতিশীল রাখতে এবং একইসঙ্গে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সময় প্রয়োজন। সেজন্য সকলকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রশাসনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো যেন জনগণের আস্থা ফিরে পায় সেটি আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, লুটপাট ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এই খাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা স্থাপন, ব্যবসা বাণিজ্যের সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং জনগণের জীবনযাপন সহজ করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ সচল করেছি। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য ব্যাংক কমিশন গঠন করা হবে। আর্থিক খাতে সার্বিক পরিস্থিতি এবং সংস্কার বিষয়ে একটি রূপকল্প তৈরি করা হবে যা দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। শেয়ার বাজার, পরিবহন খাতসহ যেসব ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে তা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবিদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের বিচার বিহর্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ এবং আয়নাঘরের মতো চরম ঘৃণ্য সব অপকর্মের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সবার বিচার নিশ্চিত করা হবে। তালিকা প্রস্তুত করে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে। দুর্নীতি ও সম্পদ পাচারের বিচার করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জনমুখী ও দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সব সংস্থা ও জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে কমিশনের নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। বাংলাদেশকে আর কোনোদিন কেউ যেন কোনো পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত না করতে পারে তার ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও গণমাধ্যেমর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। ফ্যাসিবাদী সরকার গণমাধ্যমের ওপর দলীয়করণ ও নির্যাতনের বোঝা চাপিয়েছিল। জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তথ্যের প্রবাহে বিদ্যমান আইন ও অন্যান্য বাধা অপসারণ করা হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন সব আইনের নিপীড়নমূলক ধারা সংশোধন করা হবে। ইতিমধ্যে এ ধরনের আইনগুলো চিহ্নিত করে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, বিদেশি সংবাদ কর্মীদের এদেশে আসার ওপর যে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল, ইতিমধ্যে আমরা তা তুলে নিয়েছি। বিদেশি সাংবাদিকদের দ্রুত ভিসা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকর্মীরা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা চালিয়ে যাবেন। বিগত সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে গেছে। আমরা তার পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের উদ্যোগ নেবো। এটা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আপনারা জানেন দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল, নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের অঙ্গীকার। একইসঙ্গে পাঠ্যক্রমকেও যুগোপযোগী করার কাজও দ্রুত শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা হবে এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে সফল পরিণতি দিতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা খাত এবং তথ্য প্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এর লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিতামূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা।

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, আমাদের সব উপেদষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সব সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত এবং বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষকের স্বার্থ যেন সুরক্ষিত থাকে, কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিত করা হবে। প্রবাসী শ্রমিকেরা যেভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছেন মুক্তিকামী জনগণ তা কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করে। তাদের প্রতি সকল পর্যায়ে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। জনগণের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। এই খাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে এবং সেখানে সরকারি ডাক্তারসহ বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা যেন নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত না থাকে, দেশের সব অঞ্চলের মানুষ সমান স্বাস্থ্যসেবা পায় সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আমরা বদ্ধপরিকর।

বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি সচেতন মন্তব্য করে ড. ইউনূস বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন বিষয়ে বর্তমান প্রজন্ম ওয়াকিবহালই শুধু নয়, তারা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে তা টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব। প্রকৃতি ধ্বংসকারী উন্নয়ন নয়। শুধু জিডিপি একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়, বন, মাটি আর বাতাস ধ্বংস আর দূষিত করে যে উন্নয়ন হয় তা দীর্ঘমেয়াদি-টেকসই নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীদের সঙ্গে আমাদের সরকারের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ একটি পৃথিবী রেখে যেতে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার বিকল্প নেই। আমাদের সরকার পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। এই কার্যক্রমে তরুণ সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, একটা বিষয়ে সবাই জানতে আগ্রহী, কখন আমাদের সরকার বিদায় নেবে। এটার জবাব আপনাদের হাতে, কখন আপনারা আমাদের বিদায় দেবেন। আমরা কেউ দেশ শাসনের মানুষ নই। আমাদের নিজ নিজ পেশায় আমরা আনন্দ পাই। দেশের সংকটকালে ছাত্রদের আহ্বানে আমরা এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা সব শক্তি দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করবো।

ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলী এই লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলে একটা টিম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। কখন নির্বাচন হবে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। দেশবাসীকে ঠিক করতে হবে আপনারা কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন। আমরা ছাত্রদের আহ্বানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছে।’

আমরা ক্রমাগতভাবে সবাইকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে যাবো যাতে হঠাৎ করে এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয় আমরা কখন যাবো। তারা যখন বলবে আমরা চলে যাবো। আমরা সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেও সংস্কার করবো। কমিশনকে যেকোনো সময় আদর্শ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রাখবো।

ড. ইউনূস বলেন, আমরা জাতীয় ঐক্যে বিশ্বাসী। প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ঐক্যর মধ্যদিয়ে নিশ্চিত করা হবে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী সবাই এদেশের নাগরিক এবং সমান আইনের সুরক্ষার অধিকারী। তাদের সবার মানবিক অধিকারসহ অন্যান্য সব অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। এজন্য আমি উপদেষ্টা পদমর্যাদাসম্পন্ন একজন বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছি যার দায়িত্ব হবে জাতীয় সংহতি উন্নয়ন।
তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সংস্কারের কাজ শুরু করেছি। দেশবাসীকে অনুরোধ করবো, একটা আলোচনা শুরু করতে আমরা সর্বনিম্ন কী কী কাজ সম্পূর্ণ করে যাবো, কী কী কাজ মোটামুটি করে গেলে হবে। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা দিকনির্দেশনা পেতে পারি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আলোচনা থেকেই আসবে। এই দিকনির্দেশনা না পেলে আমরা দাতা সরকার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে আলোচনায় দৃঢ়তার সঙ্গে অগ্রসর হতে পারছি না।

এনায়েতের হাজার কোটির সম্পদ by শুভ্র দেব

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে ফিটার মিস্ত্রির কাজ করেছেন। বাবা ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। আশির দশকের পরে পার্টনারশিপে পুরাতন একটি বাস কিনে পরিবহন সেক্টরে পদচারণা শুরু হয়। কয়েক বছরের ভেতরে ২০টি বাসের মালিক বনে যান। স্থান করে নেন পরিবহন মালিকদের সংগঠনে। এরপর তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলেফেঁপে ওঠেন। করতেন বিএনপি’র রাজনীতি। পরে নাম লেখান আওয়ামী লীগে।

বর্তমানে তিনি ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। এই সাইনবোর্ড ব্যবহার করেই তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সরকার পতন পর্যন্ত তিনি পরিবহন সেক্টরে একক রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন। সিন্ডিকেট গড়ে তুলে নানা অজুহাতে বাস মালিকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে কামিয়েছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। দেশে- বিদেশে গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণ বিত্ত-বৈভব। বিদেশে পাচার করেছেন অন্তত হাজার কোটি টাকা। সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী দিয়ে তিনি পরিবহন সেক্টরকে জিম্মি করে রাখতেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ৫ই আগস্ট পতন পর্যন্ত টানা ১৬ বছর ধরে তিনি ঢাকা সড়ক পরিবহন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি তালুবন্দি করেছিলেন। সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল তার দখলে। পরিবহন সেক্টরে মাফিয়া বনে চাঁদাবাজি করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেটা আমলে নেননি। বরং সব সেক্টরকে ম্যানেজ করে দিব্যি প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করতেন। সড়কে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার পর ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল। নৈরাজ্য রুখতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ, কমিটি, সভা-মিটিং করা হয়েছিল। কিন্তু এনায়েত ও তার কয়েকজন সহযোগীর কারণে সরকারের কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এতে করে সড়কে বাসচালকরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। যার ধারাবাহিকতা এখনো আছে। প্রতিদিনই সড়কে বেপরোয়া যানবাহন চালানোর জন্য একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিবহন সেক্টরের যত অরাজকতা হয়েছে তার মূলহোতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তার সঙ্গে ছিল বড় ধরনের একটি চক্র। এনায়েত উল্লাহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতাদের চাঁদাবাজির ভাগ দিয়ে বশ করে নিতেন। এ ছাড়া সরকারে সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাসে মাসে টাকা দিতেন। এসব কারণে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির মতো ঘটনার পরও কেউ প্রতিবাদ বা মুখ খোলার সাহস পায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ১৯৮৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যে থেকে এসে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে পার্টনারশিপে একটি মিনি বাস কিনেন। বাসটি মিরপুর-গুলিস্তান রোডে চলাচল করতো। ১৯৮৭ সালে তিনি মিরপুর-গুলিস্তান রুটের মিনিবাস মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক হন। পরে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি নড়েচড়ে বসেন। ওই সময় ১১ দফা দাবি নিয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা দেশব্যাপী ধর্মঘট করে। এনায়েত উল্লাহ ধর্মঘটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আলোচনায় আসেন। উপহার হিসেবে তিনি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। ওই সময় থেকেই তিনি পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৯ সালের ভেতরে তিনি ২০টি বাসের মালিক হন। আর এখন তিনি এনা পরিবহন নামক একটি কোম্পানির মালিক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খন্দকার এনায়েত উল্লাহ তার কিছু সহযোগীদের নিয়ে পুরো পরিবহন সেক্টরকে জিম্মি করে রেখেছিলেন। ঢাকার প্রতিটি বাস টার্মিনালই তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ ছাড়া সারা দেশের বাস-মিনি বাস, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির কাছ থেকেও চাঁদাবাজি করতেন। বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস মালিকদের কাছ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করেছেন। দৈনিক চাঁদার পাশাপাশি মাসিক চাঁদাও নিতেন। এ ছাড়া নতুন বাস কোনো রুটে দিতে হলে তাকে ২ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়। আবার কোনো কোম্পানি নতুন বাস কিনলে সেখান থেকে একটি ভাগ এনায়েত উল্লাহর ব্যাংক হিসাবে দেয় ওই কোম্পানি। না দিলে ওই কোম্পানির বাস সড়কে নামতে দেয়া হয় না। তাই ওই কোম্পানি বাস বিক্রির সময়ই মালিকের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা বেশি নেয়। এভাবে প্রায় দেড় দশকে কামিয়েছেন হাজার কোটি টাকা।

কি নেই তার? বাড়ি-গাড়ি, ফ্ল্যাট-প্লট, ফ্যাক্টরি, হোটেল-মোটেল, বিদেশে সেকেন্ড হোম, ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা। মানবজমিন-এর অনুসন্ধানে এনায়েত উল্লাহর বেশকিছু সম্পদের তথ্য মিলেছে। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে ধানমণ্ডির ১১/এ ৬২নং কনকর্ড টাওয়ারে ১টি ফ্ল্যাট, একই রোডের ৭৯নং সুবাস্তু টাওয়ারে ১টি, ধানমণ্ডির ১০ নম্বর সড়কের ১১নং কনকর্ড টাওয়ারের আরেকটি ফ্ল্যাট। গুলশানে আছে তার তিনটি ফ্ল্যাট। ইস্কাটন এবিসি টাওয়ারে রয়েছে একটি ফ্ল্যাট। ধানমণ্ডিতে তার দুটি, পল্লবীতে ৫ কাঠা জমির উপর বহুতল ভবন। মিরপুরে তার রয়েছে ৫টি বহুতল ভবন। এরমধ্যে সাততলা থেকে শুরু করে ১৫ তলা পর্যন্ত। মিরপুর-১ নম্বরে বেড়িবাঁধ চটবাড়িতে (ছায়ানীড় হোটেলের পাশে) প্রায় ১২০ কোটি টাকা মূল্যের ১৭২ শতাংশ জমি, সিলেটে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা মূল্যের ১২০ কাঠা জমি। ঢাকা টু ময়মনসিংহ, গাবতলী টু নাগেশ্বর, ঢাকা টু কক্সবাজার, ঢাকা টু চট্টগ্রাম, ঢাকা টু সিলেট, ঢাকা টু ফেনীতে তার শতাধিক কাউন্টার রয়েছে। প্রত্যেকটি কাউন্টার জমি কিনে তৈরি করা হয়েছে। না হয় নগদ টাকায় কেনা হয়েছে। প্রতিটি কাউন্টারের জন্য ২০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত টাকা দেয়া আছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় ৭৫ বিঘা জমির উপর এনা ফুডস কোম্পানি ও তার পাশে রয়েছে আরও ১৫০ বিঘা জমি। পূর্বাচল ৩০০ ফিট রাস্তার পাশে প্রায় শত বিঘা জমি। সিলেট কদমতলী বাস টার্মিনালে এনা পরিবহনের নিজস্ব টার্মিনাল। সেখানেই ২০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। মহাখালীতে নিজস্ব জমিতে এনা পরিবহনের অফিস। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লা বিশ্ব রোডের কাল কচুয়া বাজারের কাছে খন্দকার ফুড গ্যালারি নামে একটি রেস্টুরেন্ট ও পেট্রোল পাম্প রয়েছে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটাতে দুটি আবাসিক হোটেল। মালয়েশিয়া, কানাডা ও আমেরিকায় রয়েছে সেকেন্ড হোম। অভিজাত এসব বাড়ি কিনতে তার প্রায় ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এনায়েত উল্লাহর ঘনিষ্ঠজনরা বলেছেন, চতুর এই নেতা সর্বশেষ এক দশকে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এসব টাকা দিয়ে বিদেশে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আল আরাফাহ ইসলামি ব্যাংক, এইচএসবিসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের হিসাবে রয়েছে তার কোটি কোটি টাকা। নিজের ও পরিবারের সদস্য ছাড়াও এনায়েত তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও কাছের মানুষের নামে ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মালিক সমিতির কার্যালয় ছিল মতিঝিলে বিআরটিসি ভবনে। ছয় বছর আগে ইউনিক হাইটসে আট হাজার বর্গফুটের অফিস নেন এনায়েত। ওই অফিসের পেছনে প্রায় ১৫ কোটি টাকা খরচ করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলিস্তান-মিরপুর রুটে এনায়েত উল্লাহর একটি বাস চলাচল করলেও এখন সারা দেশের বিভিন্ন রুটে তার মালিকানাধীন অন্তত সাতশ’ বাস চলাচল করে। এসব বাসের মধ্যে এসি-নন এসি বাস রয়েছে। প্রতিটি বাসের দাম ২ কোটি টাকা থেকে শুরু করে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত। গড়ে তিন কোটি টাকা করে প্রতিটি বাসের দাম ধরলে ৭০০ বাসের দাম ২১০০ কোটি টাকা। তবে এসব বাসের মধ্যে পরিত্যক্ত, নষ্ট ও সার্ভিস সেন্টারেও রয়েছে শতাধিক বাস। সরকার পতনের পর এনা পরিবহন নামে কোনো বাস সড়কে চলাফেরা করে না। নাম বদল করে অন্য নামে এসব বাস চলাচল করার চেষ্টা করছে।

খন্দকার এনায়েত উল্লাহর গ্রামের বাড়ি ফেনীর ছাগলনাইয়া থানার নীচপনুয়া গ্রামে। বাবা ওবায়দুল হক খন্দকার ছিলেন ইউপি সদস্য তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে এনায়েত ছিলেন তৃতীয়। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিএনপি-জামায়াতের ডাকা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে রাস্তায় পরিবহন সচল রাখার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় থাকতেন এনায়েত উল্লাহ। গত ১৫ বছর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো থেকে হরতাল-অবরোধ ডাকা হলে সেসব দিনে বাস চলবে বলে ঘোষণা দিতেন তিনি। তবে গাড়ি চলাচলের ঘোষণা দিয়েও হরতাল-অবরোধের ওইসব দিনগুলোতে নিজের পরিবহনের কোনো বাস রাস্তায় নামাতেন না। এমন অভিযোগ আছে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ইস্যুতে এনায়েত উল্লাহর অফিসে বসে সাবেক ডিএমপি কমিশনার ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঢাকায় বাস পোড়ানোর রফাদফা করতেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা। বিআরটিএ’র হিসাবে দেশে বাস, মিনিবাস ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। তিন পদ্ধতির অধীন এসব যানবাহন থেকে বছরে অন্তত ১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা চাঁদা ওঠে।

দুদকের অভিযোগ: খন্দকার এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস থেকে দৈনিক ২ কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে সারা দেশ থেকেও চাঁদা তুলতেন। ২০১৯ সালে এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিসহ শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে। তার আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইসমাইল হোসেন বাচ্চু দাবি করেন, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ প্রতিদিন ঢাকার পরিবহন খাত থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন। ওই সময় অভিযোগ সংক্রান্ত নানা তথ্য-উপাত্ত দুদকেও জমা দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়ে চার বছর আগে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে তাকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেয় সংস্থাটি। ওই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সম্পদের হিসাব দাখিল করেন। এনায়েত উল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পান অনুসন্ধান কর্মকর্তারা। যাচাই-বাছাই শেষে তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে দুদকে প্রতিবেদন জমা দেন আড়াই বছর আগে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এ অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত থমকে যায়। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের শুরুতে এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রথমে দুদকের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়সালকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিছুদিনের মধ্যে তিনি শিক্ষা ছুটিতে গেলে আরেক উপ-পরিচালক মো. নুরুল হুদাকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। অনুসন্ধানের শুরুতে দুদক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফয়সাল খন্দকার, এনায়েত উল্লাহ, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের সম্পদের নথিপত্র চেয়ে সরকারি-বেসরকারি ৫৮টি ব্যাংকসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠান। এরপর কর্মকর্তা বদল হয়ে উপ-পরিচালক নুরুল হুদা দায়িত্বে এলে তিনি এ অনুসন্ধান এগিয়ে নেন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিআরটিএ, নিবন্ধন অধিদপ্তর, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ পাঁচ সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার পৌরসভা এবং জাতীয় গৃহায়ন অধিদপ্তরসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নুরুল হুদা। এরপর ২০২১ সালের জুনে খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ও তার স্ত্রী নার্গিস সামসাদ, ছেলে রিদওয়ানুল আশিক নিলয় ও মেয়ে চাশমে জাহান নিশির নামে থাকা সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেয়া হয়। ওই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। পরে তাদের সম্পদ বিবরণী যাচাই-বাছাই শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নুরুল হুদা।
সরকার পতনের আগেই এনায়েত উল্লাহ বিদেশে চলে যান। তাই অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।

বাংলাদেশকে আর কোনো দিন কেউ যেন কোনো পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত না করতে পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফ্যাসিবাদী সরকারের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ এবং আয়নাঘরের মতো চরম ঘৃণ্য সব অপকর্মের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

রোববার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, একটা বিষয়ে সবাই জানতে আগ্রহী, কখন আমাদের সরকার বিদায় নেবে। এটার জবাব আপনাদের হাতে, কখন আপনারা আমাদের বিদায় দেবেন। আমরা কেউ দেশ শাসনের মানুষ নই। আমাদের নিজ নিজ পেশায় আমরা আনন্দ পাই। আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলীও এই লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলে একটা টিম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কখন নির্বাচন হবে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। দেশবাসীকে ঠিক করতে হবে আপনারা কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন। আমরা ছাত্রদের আহ্বানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছে। আমরা ক্রমাগতভাবে সবাইকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে যাব যাতে হঠাৎ করে এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয়- আমরা কখন যাব। তারা যখন বলবে আমরা চলে যাব।

তিনি বলেন, আমরা সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেও সংস্কার করব। কমিশনকে যে কোনো সময় আদর্শ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রাখব।

ড. ইউনূস আরও বলেন, একটা বিশেষ ব্যাপারে আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাচ্ছি। আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতিদিন সচিবালয়ে, আমার অফিসের আশপাশে, শহরের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করা হচ্ছে। গত ১৬ বছরের অনেক দুঃখ-কষ্ট আপনাদের জমা আছে। সেটা আমরা বুঝি। আমাদের যদি কাজ করতে না দেন তাহলে এই দুঃখ ঘোচানোর সব পথ বন্ধ হয়ে থাকবে। আপনাদের কাছে অনুরোধ আমাদের কাজ করতে দিন। আপনাদের যা চাওয়া তা লিখিতভাবে আমাদের দিয়ে যান। আমরা আপনাদের বিপক্ষ দল নই। আইনসংগতভাবে যা কিছু করার আছে আমরা অবশ্যই তা করব।

তিনি বলেন, আমাদের ঘেরাও করে আমাদের কাজে বাধা দেবেন না। সবাই মিলে তাদের বোঝান তারা যেন এ সময়ে তাদের অভিযোগের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আমাদের দৈনন্দিন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাধা না দেন।

এর আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে জাতির উদ্দেশ্য ভাষণ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ। যা বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ড এবং বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে একযোগে সম্প্রচার করা হয়।

চাকরি জাতীয়করণের দাবি: অবরুদ্ধ সচিবালয়, আটকা উপদেষ্টা-সচিবরা

রাজধানীর শাহবাগ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে গত দুদিন ধরে আন্দোলনে রয়েছেন আনসার সদস্যরা। গতকাল রবিবার বন্যার্ত মানুষের জন্য ত্রাণবহনকারী কয়েকটি ট্রাকও আটকে দেন তারা। একপর্যায়ে তাদের একাংশ বাংলাদেশ সচিবালয়ে ঢুকে সেখানে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরে বিকেলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তাদের ‘রেস্ট প্রথা’ বাতিল করে দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। তবুও আনসাররা চাকরি জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে অনড় রয়েছেন।

রাত সোয়া ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তারা সচিবালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন। এতে সচিবালয়ের ভেতরে কয়েকজন উপদেষ্টা ও সচিবসহ বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী আটকা পড়েন।

সচিবালয়ে কর্মরত দুই মন্ত্রণালয়ের দুজন জনসংযোগ কর্মকর্তা কালবেলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত আনসাররা রাজপথ ছাড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে শাহবাগ ও প্রেস ক্লাবের সামনে ত্রাণের গাড়ি আটকে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি ফেসবুকে স্টাটাস দিয়ে বলেন, ‘এই সংকটের সুযোগ নিয়ে সরকারকে চেপে ধরে যারা দাবি আদায়ের জন্য আজকে রাস্তায় ত্রাণের গাড়ি আটকে আন্দোলন করছেন, তারা জাতির শত্রু।

কর্মকর্তারা জানান, ‘রেস্ট প্রথা’ বাতিলের সিদ্ধান্ত মানছেন না আনসাররা। এক দফা দাবি বা চাকরি জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও রাজপথ ছাড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

আনসারদের তিন বছর চাকরি করার পর ছয় মাস বিশ্রামে থাকার ‘রেস্ট প্রথা’ রয়েছে। এ পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা তারা মানছেন না। অন্যান্য দাবি-দাওয়া নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথাও জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

আনসারদের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। তাদের আশ্বাস দেওয়ার পরও চাকরি জাতীয়করণ করা হয়নি। দাবি না আদায় হওয়া পর্যন্ত সচিবালয় থেকে কাউকে বের হতে দেবেন না এবং কাউকে প্রবেশ করতে দেবেন না। এমন পরিস্থিতিতে সচিবালয়ের সব গেট বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন অনেকেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অনেক দর্শনার্থীকে বের হতে না পেরে সচিবালয়ের ভেতর গেটগুলোর সামনে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

একজন আনসার সদস্য বলেন, আমাদের প্রতিনিধিদের মিটিং-এ উপদেষ্টারা রেস্ট প্রথা বাতিলের কথা জানালেও আমরা এটা মানি না। আমরা চাই জাতীয়করণ। আমাদের এক দফা। এ দাবি মানতেই হবে। দাবি না মানলে আমরা রাজপথ ছাড়ব না।

এদিকে সচিবালয়ে আটকে পড়া কর্মকর্তারা গতকাল রাত সোয়া ৮টায় জানান, আনসারদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ফের অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সচিবালয়। গতকাল রোববার দুপুর ১২টার পর তারা সচিবালয়ের সামনে এবং অন্যান্য গেটগুলোতে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তাদের একাংশ সচিবালয়ে ঢুকে পড়েন।

জানা গেছে, দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে আন্দোলনরত আনসাররা সচিবালয়ের তিন নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। এতে করে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর আগে দুপুর ১২টার পর চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। এরপর অর্ধশতাধিক আনসার ঢুকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গেটটি দ্রুত বন্ধ করে দেয়। ভেতরে ঢুকে তারা চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।

গত দুদিন ধরে চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন করছেন আনসাররা। তাদের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। আশ্বাস দিয়েও চাকরি জাতীয়করণ করা হয়নি বলে দাবি তাদের।

‘রেস্ট প্রথা’ বাতিলের আশ্বাস : স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, আমরা তিন উপদেষ্টা এবং অন্যান্য সহকর্মী সবার সাথে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, এখন থেকে আনসারে কোনো ‘রেস্ট প্রথা’ থাকবে না। তিনি বলেন, একই সঙ্গে অন্যান্য দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে একটি কমিটি করা হবে। এই কমিটি সবকিছু পর্যালোচনা করে আমাদের কাছে প্রতিবেদন পাঠাবে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেব।

আনসারে ‘রেস্ট প্রথা’ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতি তিন বছর চাকরির পর আনসার সদস্যদের ছয় মাস রেস্টে থাকা লাগে। এই ছয় মাস পর তারা আবার জয়েন করেন। এই ছয় মাস তাদের খুব মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। নিয়োগ বিধিমালা থেকে এই প্রথা বাতিল করে কীভাবে তাদের চাকরিতে রেগুলার করা যায়, সে প্রক্রিয়ায় কাজ করা হচ্ছে। সাধারণ আনসারদের মধ্যে চারজন প্রতিনিধি নিয়ে আগামী সাত দিনের মধ্যে তারা একটি সুপারিশ দেবেন।

এ সময় তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, যেহেতু একটি কমিটি হয়েছে, সেহেতু বিচার-বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমাদের একটি জাতীয় সংকট চলছে। আমাদের অনেকদিকে কাজ করা লাগছে। এই দুর্যোগকালীন সময়েও এই সুপারিশ কমিটি সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে। আনসার ভাইদের যে সমস্যা, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সমাধানে আমরা পৌঁছাব। তবে, প্রাথমিকভাবে তাদের ‘রেস্ট প্রথা’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন দাবি নিয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় বসা আনসার প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলেন, আমরা উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি খুব আন্তরিক ছিলেন। আমরা দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করছি। কিন্তু আনসার সদস্যদের অন্য একটি অংশ প্রতিনিধি দলের সদস্যদের ঘোষণা অমান্য করে এখনো সচিবালয় অবরুদ্ধ করে রেখেছেন।

রাজনীতিতে ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব -পাকিস্তান টুডের প্রতিবেদন

বরাবরই শিক্ষার্থীরা ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। রাজনীতির কঠিন সন্ধিক্ষণে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা প্রায়শই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের তৎপর্যপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। বৃহৎ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ছাত্র আন্দোলনই সবসময় কোনো অঞ্চলের জন্য মূল চালিকা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনীতিতে বিশ্বব্যাপী তাদের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

২৫শে আগস্ট ‘স্টুডেন্টস ইম্প্যাক্টস অন পলিটিকস’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পাকিস্তান টুডে। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দেশটির স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে বিশাল আলোড়ন তুলেছিল শিক্ষার্থীরা। সেসময় তারা মাতৃভাষার পক্ষে দুর্বার আন্দোলন তৈরি করেছিল। যার প্রভাব পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও ছিল। বাংলাদেশের ছাত্ররা সবসময়ই দেশের রাজনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

তারা দেশের যেকোনো সংকটে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তুলেছে এবং সফল হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন নতুন এক গতি হাজির করেছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি, অসমতা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে তরুণদের ধারাবাহিক প্রভাব গোটা জাতিকে নতুন লক্ষ্যে অর্জনের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারে দুই ছাত্রের দায়িত্বপালন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা রাজনীতিতে ছাত্রদের আওয়াজকে বুলন্দ করেছে। এই পদক্ষেপটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং ছাত্র আন্দোলনের জাতীয় চেতনায় যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে তা প্রতিফলিত করে। ছাত্রনেতারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পেরেছে। শিক্ষাগত সংস্কার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলোর উপর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। তাদের সম্পৃক্ততা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের দিকে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে তরুণদের উদ্বেগগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকারে ছাত্রদের দায়িত্বপালন ঐতিহ্যগত রাজনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক। কেননা, ছাত্র আন্দোলনের মূল চাবি হচ্ছে ন্যায্যতা, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছতা। এক্ষেত্রে অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো দলীয়করণের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের অন্তর্ভুক্ত পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোকে ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত সমাজের পথে চলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএনপি’র মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ সত্ত্বেও শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্রুত রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া মানতে বাধ্য করা হচ্ছে যা সুশাসন প্রতিষ্ঠারই ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার উঠোন ছাড়িয়ে গেছে। এই আন্দোলন নীতি পরিবর্তনের পক্ষে তরুণ ভোটারদের সংঘবদ্ধ করেছে। রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহি করার মাধ্যমে রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুনঃনির্মাণ করার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে এই ছাত্র আন্দোলন। বিভিন্ন উপায়ে, ছাত্ররা জাতির জন্য একটি নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে কাজ করছে, তারা এমন পরিবর্তনের ধারা সৃষ্টি করতে চায় যা ন্যায্যতা, সমতা এবং ন্যায়বিচারের মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করবে।

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনীতিতে ছাত্রদের সক্রিয়তা কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনকে অনুপ্রাণিত করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাজের সকল স্তরে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। দেশের সর্বস্তরের নাগরিকরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। মূলত এই গণজোয়ার ইতিবাচক সমাজ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনে সক্ষম। বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো মৌলিকভাবে অগণতান্ত্রিক হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন তরুণরা। দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল বংশবাদী নেতৃত্ব দ্বারা প্রভাবিত, যেখানে ক্ষমতা একক পরিবার বা অভিজাতদের একটি ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়। যা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। তরুণদের প্রতিনিধিত্ব জবাবদিহিতার উপর জোর দেয়। এই জাতীয় ব্যবস্থায়, নেতৃত্ব প্রায়শই যোগ্যতা বা দলীয় সদস্যদের ইচ্ছার মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার পরিবর্তে পারিবারিক লাইনের মাধ্যমে চলে যায়। এই নিবিষ্ট বংশতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করে এবং নতুন চিন্তা ও নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

লন্ডনে ‘বিমানে লুটিলার’ শীর্ষক প্রতিবাদ: সিলেটে পূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার দাবি প্রবাসীদের by আরিফ মাহফুজ

‘লুটিলার লুটিলার বিমানে লুটিলার গুটিলার গুটিলার বিমানে কুটিলার! লুটেপুটে বিমানে সিলেটিদের খাচ্ছে আমাদের ছেলেমেয়ে দেশে না যাক চাচ্ছে। বয়স্ক মা-বাবা সদা থাকেন চিন্তায়’ এমন শিরোনাম শীর্ষক কবিতা ও প্রবাসী হোক বৈষম্যবিহীন, প্রবাসীদের দাবি একটাই, পূর্ণ আন্তর্জাতিক সিলেট বিমানবন্দর চাই, অন্য এয়ারলাইন্সের সুযোগ দিন এই স্লোগানগুলো সামনে রেখে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সকল অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে লন্ডনে আন্দোলনে নেমেছেন বৃটিশ বাংলাদেশি ও সাধারণ প্রবাসীরা।

২২শে আগস্ট বৃহস্পতিবার  লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে বৃটিশ বাংলাদেশি এবং প্রবাসীদের সংগঠন বৃটিশ বাংলাদেশি কমিটি ভয়েস ইউ.কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। বিক্ষোভ সমাবেশে প্রবাসীরা বলেন- বাংলাদেশিদের প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটের মূল্য বৈষম্য এবং সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে রূপদানের মাধ্যমে অন্যান্য বিদেশি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু করে প্রবাসী বৃটিশ বাংলাদেশিদের ছেলে সন্তান এবং বৃদ্ধ অসুস্থ মা-বাবাকে নিয়ে যাতে সিলেটে একটি ন্যায্যমূল্যে নিজের দেশে যাতায়াত করতে পারেন।  

সভায় বক্তারা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং ঢাকা হেড অফিসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নতুন চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, এ ছাড়াও লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এবং বিমানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের কাছে দাবি জানান যে, লন্ডন থেকে সিলেট রুটে বিমানের টিকিটের মূল্য এবং লাভের স্বচ্ছতা প্রদান।

অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের সঙ্গে মিল রেখে লন্ডন থেকে সিলেট রুটে বিমানের টিকিটের দাম কমানো, বিমানের অনলাইন টিকিট কেনার সিস্টেম শুরু করা, যেখানে দাম এবং ফি আগেই দেখানো হয়, বিমানের টিকিট বিক্রির মূল্য নির্ধারণ এবং সিন্ডিকেট কেলেঙ্কারি বন্ধ করা, লন্ডন থেকে সিলেট রুটে অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোকে সিলেট অবতরণের অনুমতি দেয়া এবং সিলেট ওসমানীকে প্রকৃত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করা। তবে এই সভার মূল আলোচনার মধ্যে ছিল বিমান এয়ারলাইন্স লন্ডন থেকে সিলেট রুটের টিকিটের উচ্চমূল্য, মূল্য বৈষম্য, অবিচার এবং সিলেট যাত্রীদের প্রতি অন্যায় আচরণের আসল কারণ চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বৃটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি ভয়েসের চেয়ারম্যান সেলিম উদ্দিন চাকলাদার এবং যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক নাসের আল-আমিন এবং ভাইস চেয়ারম্যান অ্যান্ড মিডিয়া রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং সাবেক কাউন্সিলর শাহ সোহেল আমিন। বক্তব্য রাখেন বিবিসিভি সংস্থার পক্ষ থেকে ভাইস চেয়ারম্যান জামালুর রহমান ও সহকারী সেক্রেটারি তমিজুর রহমান রঞ্জু এবং হাফসা ইসলাম (বিবিসিভি মহিলা কর্মকর্তা)।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পিকার কাউন্সিলর ব্যারিস্টার সাইফ উদ্দিন খালেদ, আব্দুল মুমিন জাহেদী কেরল-সাংবাদিক, শামসুল হক- কমিউনিটি সমাজকর্মী, লুকমান উদ্দিন- কমিউনিটি সমাজকর্মী, দিলাওয়ার হুসাইন- কমিউনিটি সমাজকর্মী, আবু হুরায়রা সাব-মাস্টার-কমিউনিটি সমাজকর্মী, আজম আলী-কমিউনিটি কর্মী আব্দুর রব-কমিউনিটি সমাজকর্মী, কামাল উদ্দিন-কমিউনিটি সমাজকর্মী, সুয়েজ মিয়া-কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট, রুপিয়া বেগম-কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট বক্তব্য রাখেন। এ সময় আরও অনেকগুলো সংগঠনের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের কমিটির সদস্যরা বক্তব্য রাখেন।

বৃটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি ভয়েস বিশ্বাস করে যে, এটি যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ১ মিলিয়ন বৃটিশ বাংলাদেশির বাংলাদেশে যাওয়া ও সহজ যোগসূত্র স্থাপনের জন্য একটি কমিউনিটি ক্যাম্পেইন। যদি বৃটিশ বাংলাদেশিরা বাংলাদেশে সহজে যাতায়াত করতে পারে তবে বাংলাদেশের ইকোনমিতে তাদের কন্ট্রিবিউশন বাড়বে এবং বাংলাদেশে ইনভেস্ট করতে সাহস পাবে। বিমান বাংলাদেশিদের  জাতীয় বাহক এয়ারলাইন, বাংলাদেশিদের  গর্ব এবং সম্পদ এর থেকে সবাই  আরও ভালো সেবা পাওয়ার দাবিদার এবং দাবি করাটা আমাদের ন্যায্য অধিকার।

বক্তারা ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন দাবিগুলো নিয়ে অনেক চেষ্টা ও লেখালেখির পরও  বিমান ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি অথবা কোনো ভালো জবাব পাননি। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন উপরোক্ত দাবিগুলো স্পষ্ট এবং আলোচনাযোগ্য এবং যতক্ষণ না বিমান এয়ারলাইন্স বৃটিশ গ্রাহকদের লুটপাট বন্ধ না করবে এবং আমাদের দাবি পূরণ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই বিবিসিভি ‘লুটিলার’ প্রচারাভিযান বিমানের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে লড়াই চালিয়ে যাবে।

শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর গুলিবর্ষণের ভিডিও নিয়ে তোলপাড়

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর গুলিবর্ষণের সেই ভিডিও নিয়ে তোলপাড় চলছে সর্বত্র। ভিডিও চিত্রে জাতীয় দৈনিকের দুই সাংবাদিক দৃশ্যমান হওয়ায় ঘোষণা দিয়ে স্ব স্ব পত্রিকার কর্তৃপক্ষ তাদের বরখাস্ত করেছে। ২৪শে আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিও ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের একপর্যায়ে সরকার পদত্যাগের আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। সরকার পতনের পর শামীম ওসমান ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন।  

এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় ১৯শে জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে অনেকগুলো হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহতের ঘটনায় শেখ হাসিনা, স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৯শে জুলাই বিকালে শহরের চাষাঢ়া বঙ্গবন্ধু সড়কে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় মিছিল বের করে। একটি উঁচু ভবনের উপর থেকে মুঠোফোনে ২৯ সেকেন্ডের ভিডিওটি ধারণ করা।

ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, শামীম ওসমান ও তার কয়েক শতাধিক অনুসারী আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে শহরের চাষাঢ়া এলাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কে শহরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকার দিকে ধাওয়া দিচ্ছে। সেখানে শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ (টিটু) গুলি ছোড়ে।

দুটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছিল টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজ ও যুগান্তর পত্রিকার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহমেদ। আরও ছিল, শামীম ওসমানের আত্মীয় (অয়ন ওসমানের শ্বশুর) ফয়েজ উদ্দিন লাভলু, তার ছেলে মিনহাজুল ইসলাম ভিকি ও শীতল পরিবহন বাসের পরিচালক অনুপ কুমার সাহা, ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নিয়াজুল ইসলাম, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন ভূঁইয়া সাজনু প্রমুখ। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ও তার ছেলে এমআরকে রিয়েনও গুলি চালিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহড়ায় শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসমাইল রাফেল প্রধান, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান সম্রাট, সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান উপস্থিত ছিল। তারা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। দেশ রূপান্তর পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি কমল খানকেও অস্ত্রের মহড়ায় দেখা যায়। গুলি করে শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়নের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছাত্রলীগ নেতা কাউসার আহমেদও।

১৯শে জুলাই শামীম ওসমানের নেতৃত্বে গুলি চালানোর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। তারা জানান, সেদিনের পরিস্থিতি ছিল ভীতিকর। ওই পরিস্থিতিতে ছবি ও ভিডিওধারণের কোনো সুযোগ ছিল না। ভিডিওধারণ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক মারধরেরও শিকার হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বঙ্গবন্ধু সড়কের চাষাঢ়া থেকে মণ্ডলপাড়া মোড় পর্যন্ত শামীম ওসমান ও তার বাহিনী কয়েক দফায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এই সময় শতাধিক গাড়ির বহর ব্যবহার করে তারা। তারা গাড়ি নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের জালকুড়ি এলাকাতেও আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এ ছাড়া চাষাঢ়া-আদমজী চিটাগাংরোড সড়ক দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জেও মহড়া দেয়।

ওদিকে ১৯শে জুলাই জুমার নামাজের পর যখন শামীম ওসমান তার বাহিনী নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর মুহুর্মুহু গুলি ছোড়েন তখন বঙ্গবন্ধু সড়কের নয়ামাটি এলাকার চারতলা ভবনের ছাদে খেলছিল ছয় বছর বয়সী রিয়া গোপ। রিয়ার বাবা ব্যবসায়ী দীপক কুমার গোপ সাংবাদিকদের তখন জানিয়েছিলেন, ‘গুলির শব্দ শুনে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে মেয়েকে আনতে ছাদে যান। ছাদ থেকে শিশুকন্যাকে কোলে নেয়ার পরই রিয়ার মাথার পেছনের দিকে একটি গুলি লাগে। রক্তে ভেসে যায় দীপক কুমারের হাত।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর ২৪শে জুলাই হাসপাতালে মারা যায় রিয়া।

বঙ্গবন্ধু সড়কে শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর গুলি করার ভিডিওটি নিজের ফেসবুক একাউন্টে শেয়ার করেছেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বিও। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ১৯শে জুলাই ২০২৪, শুক্রবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ শহরে শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর অস্ত্রসন্ত্রাস। যোগাযোগ করা হলে রফিউর রাব্বি জানান, ১৯শে জুলাই শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর গুলিতেই শিশু রিয়া গোপ নিহত হয়। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে ছিল না। তখন শামীম ওসমান তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অসংখ্য গুলি ছুড়েন। প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে মুহুর্মুহু গুলি ছোড়ার বিষয়টি থেকে বোঝা যায়, শামীম ওসমানদের গুলিতেই রিয়া গোপ মারা গেছে। এই বিষয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নারায়ণগঞ্জের সমন্বয়ক ফারহানা মানিক বলেন, ওই দিন (১৯শে জুলাই) ওই এলাকায় কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। কার গুলিতে রিয়া গোপের মৃত্যু হলো, সেটি প্রশাসনকে খুঁজে বের করতে হবে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও তাদের অনুসারী শাহ নিজামের নামে অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আমীর খসরু গণমাধ্যমকে জানান, অস্ত্রের মহড়া দিয়ে গুলি করার ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। সেখানে কারা, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লাইসেন্সকৃত বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশু রিয়া গোপের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন ওই এলাকায় কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। কার গুলিতে রিয়া গোপের মৃত্যু হয়েছে, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

দুই সাংবাদিক বরখাস্ত: ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে শনিবার রাতে দৈনিক যুগান্তর ও ডিবিসি নিউজ কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহমেদকে বরখাস্ত করেন। ডিবিসি নিউজ কর্তৃপক্ষ ও যুগান্তর কর্তৃপক্ষ তাদের অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদে বলেন, একটি জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে প্রচারিত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হলে পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই আদেশ ২৪শে আগস্ট থেকে কার্যকর করেছে কর্তৃপক্ষ।

ওদিকে রোববার দুপুরে দেশ রূপান্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি মো. মোবারক হোসেন খান কমল (কমল খান)কে বরখাস্ত করা হয়। সাংবাদিকসুলভ আচরণের পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে পত্রিকাটি তাদের অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই আদেশ ২৫শে আগস্ট ২০২৪ থেকে কার্যকর করেছে কর্তৃপক্ষ।

ইসরাইল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত

ইসরাইল ও লেবাননের যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ কোনো পক্ষই যুদ্ধ চায় না। তবে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। রোববার সকালে তাদের মধ্যে বড় মাত্রায় হামলা-পাল্টা হামলা হয়েছে। এতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শুরুতেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একতরফা প্রায় ১০০ যুদ্ধবিমান হামলায় অংশ নিয়েছে। এরপর হিজবুল্লাহও রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিযেছে ইসরাইলে। যদি এই হামলায় ইসরাইলের সত্যি ১০০ যুদ্ধবিমান অংশ নিয়ে থাকে, তাহলে এটা লেবাননে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় হামলা। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর এত বড় হামলা আর করেনি তারা। স্থানীয় সময় রোববার ভোর সাড়ে চারটার সময় ইসরাইল হামলা চালায়। জবাবে আধা ঘন্টা পরে ব্যাপক হামলা চালায় হিজবুল্লাহ।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারে যুদ্ধ আবার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনিতেই ইসরাইল গাজায় গণহত্যায় লিপ্ত। তার ওপর ইরানে তারা হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়েকে হত্যা করেছে। এর জবাব দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইরান। যদি ইরান, লেবাননে যুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল তাহলে মধ্যপ্রাচ্য তা ছড়িয়ে পড়া কোনোক্রমেই আটকাতে পারবে না। ইসরাইলের ভূখণ্ডে হামলার পর লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করেছে তেল আবিব। রোববার গণমাধ্যমকে এই তথ্য দিয়েছে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সের (আইডিএফ) মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, আত্মরক্ষার্থে হিজবুল্লাহ’র সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করছে ইসরাইলি বাহিনী। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, যেসব অঞ্চলে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ’র ঘাঁটি রয়েছে সেখান থেকে বেসামরিকদের নিরাপদে সরে যেতে সতর্ক করা হয়েছে। গত মাসে হিজবুল্লাহ’র প্রধানকে হত্যা করে ইসরাইলি বাহিনী। এর প্রতিশোধ নিতেই ইসরাইলে ড্রোন হামলা করেছে ইরান সমর্থিত লেবাননের ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। রোববার ভোরে উত্তর ইসরাইলে ড্রোন হামলার সতর্কতা সাইরেন শোনা যায়। ইসরাইলের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশটিকে লক্ষ্য করে ১৫০টির বেশি ড্রোন ছুড়েছে সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। এই হামলা প্রতিহত করতে কয়েক ডজন ইসরাইলি যুদ্ধ বিমান মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাগারি। ইসরাইলি বিমানগুলো দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ’র সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যেই ৩২০টির বেশি কাতিউশা রকেট নিক্ষেপ করেছে ইসরাইলের ভূখণ্ডে। যেগুলো ইসরাইলের ১১টি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি  বৈঠক করেছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে কমান্ডার ফুয়াদ শুক্‌রকে হত্যার প্রতিবাদে তারা ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখবে হিজবুল্লাহ’র নেতারা।
জুলাই মাসে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলের এক হামলায় নিহত হন ফুয়াদ শুক্‌র। এরপরই ইসরাইলকে কড়া হুঁশিয়ারি দেয় হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি গত বছরের ৭ই অক্টোবরের পর থেকে হামাসের সমর্থনে ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনিদের মুক্তির সমর্থনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে হিজবুল্লাহ।

আনসারদের অবস্থানে দিনভর অবরুদ্ধ সচিবালয় রাতে উত্তেজনা

দাবি আদায়ে সচিবালয় ঘিরে আনসার সদস্যদের অবস্থান করায় গতকাল দিনভর অবরুদ্ধ ছিল সচিবালয়। দাবি আদায়ের আশ্বাস দেয়ার পরও তারা অবস্থান চালিয়ে যাওয়ায় এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয় প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে। রাত সাড়ে ৯টায় এ রিপোর্ট লেখার সময়ও অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন কয়েকজন উপদেষ্টাসহ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় খাবার-পানি সংকটে পড়েন তারা। আনসাররা অবস্থান না ছাড়ায় রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের শিক্ষার্থীরা টিএসসিতে জড়ো হয়ে সচিবালয়ের দিকে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এতে উত্তেজনা তৈরি হয়। একই সময়ে সচিবালয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার তথ্য পাওয়া যায়। রাত ১০টায় শিক্ষার্থীদের ধাওয়ায় আনসার সদস্যরা সচিবালয় এলাকা ছেড়ে যায়।

ওদিকে বিকালে আনসার সদস্যদের প্রতিনিধি নিয়ে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এখন থেকে আনসারে কোনো ‘রেস্ট প্রথা’ থাকবে না। তিনি বলেন, আমরা ৩ উপদেষ্টা এবং অন্যান্য সহকর্মী সবার সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, একইসঙ্গে অন্যান্য দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি সবকিছু পর্যালোচনা করে আমাদের কাছে প্রতিবেদন পাঠাবে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেবো। আনসারে ‘রেস্ট প্রথা’ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতি ৩ বছর চাকরির পর আনসার সদস্যদের ৬ মাস রেস্টে থাকা লাগে। এই ৬ মাস পর তারা আবার জয়েন করেন। এই ৬ মাস তাদের খুব মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। নিয়োগ বিধিমালা থেকে এই প্রথা বাতিল করে কীভাবে তাদের চাকরিতে রেগুলার করা যায়, সে প্রক্রিয়ায় কাজ করা হচ্ছে। সাধারণ আনসারদের মধ্যে ৪ জন প্রতিনিধি নিয়ে আগামী ৭ দিনের মধ্যে তারা একটি সুপারিশ দেবেন। এ সময় তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, যেহেতু একটি কমিটি হয়েছে, সেহেতু বিচার-বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আমাদের একটি জাতীয় সংকট চলছে। আমাদের অনেকদিকে কাজ করা লাগছে। এই দুর্যোগকালীন সময়েও এই সুপারিশ কমিটি সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে। আনসার ভাইদের যে সমস্যা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সমাধানে আমরা পৌঁছবো। তবে প্রাথমিকভাবে তাদের ‘রেস্ট প্রথা’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এদিকে, বিভিন্ন দাবি নিয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় বসা আনসার প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলেন, আমরা উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি খুব আন্তরিক ছিলেন।

আমরা দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করছি। এদিকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অধীন সাধারণ আনসার সদস্যদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে প্রতিবেদন পেশ করতে বলা হয়েছে। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের আনসার শাখা-২ এর উপসচিব কে এম আল আমীন স্বাক্ষরিত আদেশে এ কমিটি গঠন করা হয়। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অধীন সাধারণ আনসার (পুরুষ/মহিলা), এসিস্ট্যান্ট প্লাটুন কমান্ডার (এপিসি) ও প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) কর্তৃক উত্থাপিত দাবি-দাওয়ার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে নির্দেশক্রমে কমিটি গঠন করা হলো। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদকে। কমিটির সদস্যরা হলেন-আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপ-মহাপরিচালক (প্রশাসন) কর্নেল তসলিম এহসান, ২৭ আনসার ব্যাটালিয়ন বান্দরবান সুয়ালকের পরিচালক রাসেল আহমেদ, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহকারী পরিচালক (রেকর্ড) মো. আবুল কালাম আজাদ, ১৩ আনসার ব্যাটালিয়ন রাঙ্গামাটি বাঘাইছড়ি মারিশ্যার কোম্পানি কমান্ডার মো. হুমায়ুন কবির শরীফ, সাধারণ অঙ্গীভূত আনসার সদস্য কর্তৃক গঠিত আহ্বায়ক কমিটি থেকে ৪ জন এবং সদস্য সচিব আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিচালক (প্রশাসন) জাহানারা আক্তার।

তারা কোথায়? by মিজানুর রহমান

নিয়োগ বাতিলের আগেই মিশন ছেড়েছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় কানাডাস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত দুই কাউন্সেলর মোবাশ্বিরা ফারজানা মিথিলা ও অপর্ণা রানী পাল। ৩১শে আগস্টের মধ্যে তাদের অটোয়ায় দায়িত্ব ছেড়ে ঢাকায় ফেরার আদেশ জারি করেছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু তারা সে পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি। ১৩ই আগস্ট প্রত্যাবর্তনের আদেশ হাতে পাওয়ার পরপরই গা-ঢাকা দিয়েছেন মিথিলা ও অপর্ণা। মিশন থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় গ্রহণ দূরে থাক, তারা এখন আর কারও সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন না। দুই কাউন্সেলরের অনুপস্থিতি এবং তাদের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগের চেষ্টায়ও হদিস না পাওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নোটিশে এনেছেন অটোয়ায় নবনিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নাহিদা সোবহান। ২১শে আগস্ট পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বরাবর তিনি একটি নোট পাঠান। স্থানীয় সূত্র বলছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী অপর্ণা পালের স্বামী অনেক আগেই কানাডায় সেটেল করেছেন। এখন তিনি দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়ার বন্দোবস্ত করার পথে রয়েছেন। এজন্য চটজলদি লাল পাসপোর্ট ছেড়েছেন। যেহেতু তিনি এখন পর্যন্ত সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেননি, তাই স্থানীয়দের ধারণা তার কাছে আগে থেকেই সাধারণ পাসপোর্ট থাকতে পারে। সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পলায়নের রাতেই অপর্ণা পাল নিজের এবং মিথিলা ফারজানা ব্যক্তিগত ও স্বামী-সন্তানের অনুকূলে থাকা কূটনৈতিক পাসপোর্ট সারেন্ডারের আবেদন করেন। দ্রুত পাসপোর্ট বাতিলের জন্য তারা তদবিরও করেন। রাষ্ট্র সরকারবিহীন থাকা অবস্থায় অর্থাৎ ৮ই আগস্ট তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের ফাইল উঠে এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততায় (ওই দিনেই) তা নিষ্পত্তি হয়। নথিতে দেখা গেছে, পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র সচিব)-এর অনুমোদন সাপেক্ষে মহাপরিচালক প্রশাসন ডিএম সালাউদ্দিন আহমদ ফাইলটি উত্থাপন এবং নিষ্পত্তি করেন। ফাইলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে মহাপরিচালক কনস্যুলার ও কল্যাণকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কনস্যুলার অনুবিভাগ সূত্র বলছে, পররাষ্ট্র সচিবের নির্দেশনা পেয়ে মিথিলা ফারজানার পরিবারের অনুকূলে থাকা ৩টি কূটনৈতিক পাসপোর্ট, মিথিলা (ডি ০০০১২১২৩), তার স্বামী জ্যোতি জাইন উদ্দীন পাসপোর্ট (ডি ০০০১২১২২) ও ছেলে অন্তর জিষ্ণুর পাসপোর্ট (ডি০০০১২১২১) এরইমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। সেই সঙ্গে অপর্ণা রানী পালের অনুকূলে থাকা পাসপোর্টও (ডিসি ৭০০৮৯২১) বাতিল করা হয়। গত নভেম্বরে বেসরকারি একাত্তর টিভির সংবাদ পাঠিকা ও উপস্থাপক মোবাশ্বিরা ফারজানা মিথিলাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় তৎকালীন সরকার। আগামী দুই বছরের জন্য তাকে ওই অনুবিভাগে পরিচালক বা বিদেশ মিশনে কাউন্সেলর পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এদিকে ২০১০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর রাজনৈতিক বিবেচনায় কানাডা মিশনে সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি অপর্ণা পাল। সেই থেকে ৫ দফা মেয়াদ বৃদ্ধি এবং দু’দফা পদোন্নতি পেয়ে (প্রথম সচিব এবং সর্বশেষ কাউন্সেলর) তিনি মিশনটিতে এক যুগের বেশি সময় ধরে ছিলেন।

পানি কমছে ফুটছে ক্ষত

উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতি ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। স্বস্তি ফিরছে আতঙ্কে দিন পার করা বন্যার্ত এলাকার বাসিন্দাদের। তবে পানি যত কমছে ততই দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষত। সর্বনাশা বন্যায় ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি থেকে শুরু করে সব কিছু। পানি নামার পর যখন সড়ক দৃশ্যমান হয় তখন দেখা যায় প্রতিটি সড়কই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। বেশির ভাগ পিচঢালা সড়ক ভেঙে গেছে, স্রোতে ভেঙে গেছে সড়কের বিভিন্ন অংশ। যেগুলো নতুন করে সংস্কার করা ছাড়া কোনো যানবাহন চলার উপায় নেই। ফেনীর সব উপজেলা থেকেই পানি নামছে। ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি থেকে ক্রমেই উন্নতির দিকে যাচ্ছে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। তবে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে।

নতুন করে কোনো জেলা প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল বলেন, বন্যার কবলে পড়েছে ১১ জেলার ৭৩ উপজেলা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৪৫টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা। এ পর্যন্ত ১০ লাখ ৪৭ হাজার ২৯টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫২ লাখ ৯ হাজার ৭৯৮ জন। মারা গেছেন ১৮ জন। গতকাল পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, সদরের যে সব এলাকা থেকে পানি নেমেছে সেসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। অনেকে অনেকদিন পর স্বজনের সন্ধান পেয়েছেন। সেখানে দেখা যায় প্রায় সব সড়কই বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত। কোনো সড়কই ঠিক নেই। যার কারণে পানি কমলেও ত্রাণবাহী যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। আবু বকর নামে পরশুরামের এক বাসিন্দা বলেন, অনেকদিন পর পরিবারের খোঁজ পেয়েছি। এলাকার মানুষের তীব্র খাদ্য সংকট রয়েছে। অনেকে দীর্ঘ সময় না খেয়ে আছেন। পরশুরামের আরেক বাসিন্দা বলেন, এলাকায় খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। এদিকে পানি কমেছে ফুলগাজী, ছাগলনাইয়াও। সেখানকার বাসিন্দারা জানান, পানি কমলেও এখানে খাদ্যের সংকট রয়েছে। সদরে যত পানি নামছে ততই দৃশ্যমান হচ্ছে সড়ক ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি। ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্রোতে ভেঙে গেছে সড়ক। এদিকে সোনাগাজী ও দাগনভূঞা পানি কমলেও সেটি অনেক কম। এ দুই উপজেলার অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দি। এখনো দুর্গম অনেক এলাকায় পৌঁছায়নি ত্রাণ সহায়তা। তাই মানবেতর জীবন পার করছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। তাছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণবাহী ট্রাক পৌঁছালেও নৌকার স্বল্পতার কারণে সেগুলো দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছানো যাচ্ছে না। গতকাল সকাল ৯টায় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশে তেমন বৃষ্টি হয়নি। এতে উজানের নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস অব্যাহত রয়েছে। ফলে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত আছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনীর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে কোনো কোনো স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে। আবহাওয়া সংস্থার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও এর কাছাকাছি উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের শঙ্কা নেই।

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে কুমিল্লার আরও একটি উপজেলা। গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বেশির ভাগ গ্রাম ডুবে যায়। শনিবার বিকাল থেকে পানি আসতে শুরু করলেও সন্ধ্যায় ডুবে যায় উপজেলার মানুষের বাড়িঘর। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২২শে আগস্ট রাতে গোমতীর বুড়িচং উপজেলার বুরবুড়িয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। রাতেই প্লাবিত হয় বুড়িচং উপজেলা। এতে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয় উপজেলা জুড়ে। শনিবার সেই পানি প্রবেশ করে পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায়। এ ছাড়া সকালে ব্রাহ্মণপাড়া এলাকায় ঘুংঘুর নদীর বাঁধ ভেঙে উপজেলায় পানি ঢুকতে থাকে। এখন পর্যন্ত ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার চার ইউনিয়নের ২৩ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরে বন্যার আরও অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে থাকা জেলার ৫টি উপজেলার বেশির ভাগ এলাকার মানুষ। পানিবন্দি অন্তত ৮ লাখ বাসিন্দা। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। চারদিকে এখন বানভাসি মানুষের হাহাকার। এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে ত্রাণ ও সুপেয় পানির সংকট। স্থানীয় এলাকাবাসী ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ২০ বছরের পর এত পানি আর জলাবদ্ধতা দেখেনি লক্ষ্মীপুরের মানুষ। গত দুইদিন ধরে ফেনী ও নোয়াখালীর বন্যার পানি রহমতখালী ও ডাকাতিয়া খাল হয়ে লক্ষ্মীপুরে ঢুকে পড়ছে।  বিশেষ করে ৫টি উপজেলা, চারটি পৌরসভা ও সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ, চরশাহী, দিঘলী, বাঙ্গাখাঁ, লাহারকান্দি ও উত্তর জয়পুরসহ ৪০টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রায় চার থেকে ৬ ফুট পানিতে ডুবে আছে জনপদ। এতে করে সরকারি হিসেবে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা আরও বেশি। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকেই শিশু সন্তান নিয়ে ছুটছেন আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলোতে। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। শুক্রবার বিকাল থেকে জেলার অনেক এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, শনিবার পর্যন্ত সাড়ে ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। তবে সে সংখ্যা আরও বাড়বে। পাশাপাশি ১৮৫টি আশ্রয়ণ কেন্দ্র ও ৬৬টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ২০ হাজারের মতো মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। অন্যদের উদ্ধারে কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৫৭৬ টন চাল, নগদ প্রায় ১১ লাখ টাকা, শিশু ও গো-খাদ্যের বরাদ্দ পাওয়া যায়। সেগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের দেয়া হচ্ছে। আরও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সবাই মিলে এই দূর্যোগ মোকাবিলা করা হবে।

ফেনীর উজানের পানিতে নোয়াখালীর বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে পানিবন্দি রয়েছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ। বন্যাদুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট। অন্যদিকে, খাদ্য সংকট ও সাপের উপদ্রবে দুয়ে মিলে নাকাল বন্যাদুর্গতরা। অনেকের কাটছে নির্ঘুম রাত। রোববার দুপুরের দিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) সৈয়দ মহিউদ্দিন আব্দুল আজিম বলেন, গত তিন দিনে নোয়াখালীতে ৬৩ জনকে সাপে কেটেছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সাপে কেটেছে ২৮ জনকে। বন্যার কারণে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে ১০৮ জন। সেনবাগ উপজেলার বাসিন্দা মো. আবুল খায়ের জানান, ফেনীর মুহুরী নদীর উজানের পানি প্রবেশ করায় জেলার সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী উপজেলার আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব উপজেলায় গত দু’দিন বৃষ্টি না হলেও উজানের পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক জায়গায় ঘরবাড়ি ও সড়ক তলিয়ে গেছে। স্কুলে ঢুকে পড়েছে পানি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। কবিরহাটের বাসিন্দা ফরমান হোসেন বলেন, বন্যা ও ভারী বর্ষণের কারণে কবিরহাটের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এদিকে দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষ কাজ করতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কর্মহীন মানুষেরা সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন সরকার ও বিত্তশালীদের কাছে। নোয়াখালী জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক আরজুল ইসলাম বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের পানিতে বন্যার পানি বাড়ছে। বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। প্রতিটি বাড়িতে ৩ থেকে ৫ ফুট জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকাগুলো যার পরিমাণ ৬ থেকে ৭ ফুট। বসতঘরে পানি প্রবেশ করায় বুধবার রাত পর্যন্ত অনেকে খাটের উপর অবস্থান করলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তারা নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্র, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান নিয়েছেন। বসত ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় খাবার সংকটে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। জেলার প্রধান সড়কসহ প্রায় ৮০ ভাগ সড়ক কয়েক ফুট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সড়কগুলোতে যান চলাচল অনেকটাই কম।

পাকিস্তানে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

রাওয়ালপিন্ডি টেস্টে প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা রান কম করেননি। স্বাগতিকরা ৪৪৮/৬ রানে ইনিংস ঘোষণার পর বাংলাদেশের ব্যাটাররাও কম যাননি। মুশফিকুর রহীমের ১৯১ রানের ওপর ভর করে গড়েন রানের পাহাড়, তারপর দ্বিতীয় ইনিংসে স্পিনাররা নিলেন একের পর এক উইকেট। এমন ব্যাটিং স্বর্গে পেসাররাও খারাপ করেননি। দলীয় পারফরম্যান্সের এমন দারুণ সমন্বয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ১০ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়। এর আগে ২০০৩ সালে মুলতান টেস্টে জয়ের খুব কাছে গিয়েও হেরেছিল বাংলাদেশ। সেবার টাইগারদের হৃদয় ভেঙে পাকিস্তানকে রক্ষা করেছিলেন ইনজামাম উল হক। দুই দশকেরও বেশি সময় পর এবার রাওয়ালপিন্ডিতে টাইগারদের গর্জন! বিদেশের মাটিতে সবমিলিয়ে বাংলাদেশের সপ্তম জয় এটি। টেস্টে বাংলাদেশের এটিই প্রথম ১০ উইকেটে জয়। এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩ টেস্ট খেলে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ছিল ২০১৫ সালে খুলনা টেস্ট ড্র।

১৪তম টেস্টে এসে বাংলাদেশ পেলো ঐতিহাসিক জয়। পাকিস্তান নবম প্রতিপক্ষ, যাদের টেস্টে হারালো বাংলাদেশ। বাকি থাকলো শুধু ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশের বাইরে বাংলাদেশের এটি মাত্র সপ্তম জয়, সবমিলিয়ে ২০তম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, রান তাড়ায় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ও এটি।
দেশের বর্তমান বাস্তবতা এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে পাকিস্তান সফরের আগে এই দলটাই ছিল একেবারে আলোচনার বাইরে। অথচ সেই দলটাই পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানের পূর্ণ শক্তির দলকে হেসেখেলে হারালো। সেটাও কোনো বিশেষ নৈপুণ্যে নয়। পুরোপুরি দলীয় পারফরম্যান্সে। প্রথম ইনিংসের কথাই ধরুন। টেস্টের প্রথম দিনে রাওয়ালপিন্ডির ভেজা উইকেটের সুবিধা নিয়ে ১৬ রানেই ৩ উইকেট ফেলে দিয়েছিলেন পেসাররা। ব্যাটসম্যানরা মাঝের দুই দিনে ভালো কন্ডিশনের সুযোগ নিয়েছেন। এরপর শেষদিনে ভেঙে যাওয়া উইকেটের সুবিধাটা নিলেন সাকিব-মিরাজরা। বাংলাদেশের ফিল্ডিং ভুলে গেলেও চলবে না। উদাহরণ হিসেবে লিটন দাসকে নিতে পারেন। বাবর আজমের একটি ক্যাচ মিস করার পরও পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত ফিল্ডিং করেন লিটন। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৬টি ডিসমিসালের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। অবশ্য পুরো দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজই ছিল অসাধারণ।
সর্বশেষ তিন বছরে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের বোলারদের গড় সবচেয়ে ভালো। ২২ গড়ে উইকেট নিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা, যা এই সময়ে সর্বনিম্ন। গতকাল রাওয়ালপিন্ডিতে এমন গড় বা এর চেয়ে ভালো কিছু করার প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের। বাংলাদেশের বোলাররা ভালোটাই করেছেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ১ উইকেটে ২৩ রান তুলে রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের চতুর্থ দিন শেষ করে পাকিস্তান। বাংলাদেশকে আবারো ব্যাট করাতে ৯৪ রান দরকার ছিল দলটির। উইকেটে ছিলেন আবদুল্লাহ শফিক ও শান মাসুদ। দিনের দ্বিতীয় ওভারেই পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদকে লিটন দাসের ক্যাচে পরিণত করেন হাসান মাহমুদ। তবে মাসুদের ক্যাচ নেয়া লিটনই পরের ওভারে শরীফুলের বলে বাবর আজমের ক্যাচ ছাড়েন। টেস্ট ক্রিকেটে দেড় বছরেরও বেশি হাফ সেঞ্চুরিহীন বাবর অবশ্য দ্বিতীয় জীবনকে খুব একটা কাজে লাগাতে পারেননি। ২২ রানে নাহিদ রানার করা ঘণ্টায় ১৪৬.৪ কিলোমিটার গতির বলে ড্রাইভ খেলতে গিয়ে ইনসাইড এজ হয়ে বোল্ড হন। এরপর পাকিস্তানের ভরসা ছিল সৌদ শাকিল। কী মনে করে যেন পরের ওভারেই সাকিবের বলে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে শট খেলতে চাইলেন শাকিল। ফলাফল স্টাম্পড হয়েছেন প্রথম ইনিংসে ১৪১ রান করা শাকিল। টেস্ট ক্যারিয়ারে যা তার প্রথম শূন্য। ৬৭ রানে ৪ উইকেট হারানো পাকিস্তান এরপর পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নেয়। শফিককে সঙ্গে নিয়ে রিজওয়ান গড়েন ৩৬ বলে ৩৭ রানের জুটি। রিজওয়ানই ছিলেন আক্রমণের নেতৃত্বে, শফিক খেলছিলেন দেখেশুনে। তবে সাকিবকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে সাদমানের হাতে ক্যাচ দেন এই ওপেনার। পরের ওভারেই মিরাজ ফেরান সালমান আলী আগাকে। এরপর রিজওয়ান একলা লড়াই চালিয়ে যান। তুলে নেন ফিফটি। তবে সেই ফিফটি বাংলাদেশের সামনে শঙ্কার কারণ হতে পারেনি। মিরাজের বলে ৫১ রান করে বোল্ড হন রিজওয়ান। এরপর শেষ উইকেট যাওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা। সেটাই হয়েছে। এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে পাকিস্তানের শেষ ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আলীকে ফেরান মিরাজ। ১৪৬ রানেই অলআউট হয় পাকিস্তান, যা টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বনিম্ন। পাকিস্তান ২৯ রানের লিড পেলে বাংলাদেশের জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩০ রানের। সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৬ ওভার ৩ বলেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। জাকির হাসান অপরাজিত ছিলেন ১৫ রান করে। আরেক ওপেনার সাদমান অপরাজিত ৯ রান করেছেন।

যেসব বিচারপতিদের পদত্যাগ চান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা

পলায়নকৃত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি এবং হাইকোর্ট বিভাগের দলকানা, অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ বিচারপতিদের পদত্যাগের দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। বিচারপতিবৃন্দের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্যবৃন্দ তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। রোববার সুপ্রিম কোর্ট বারের হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এডভোকেট শাহ আহমেদ বাদল এ দাবি করেন। তিনি বলেন, সাংবিধানিক শপথ ভুলে গিয়ে দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করে শেখ হাসিনা বা শেখ ফজলে নূর তাপস বা আনিসুল হকের নির্দেশে বিচারের নামে অবিচার করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- এডভোকেট মহসিন রশিদ, এডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুবসহ অন্যান্য আইনজীবীরা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কেউ কেউ অযৌক্তিক বিবৃতির পর বিবৃতি দিয়ে আমাদের আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সেই প্রিয় বন্ধুদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে এবং অনতিবিলম্বে হাইকোর্ট বিভাগের দলবাজ বিচারপতিদের পদত্যাগের আন্দোলনে শরিক হবেন। তারা বলেন, শুধু ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তনে ডুবন্ত বাংলাদেশকে উদ্ধার করা যাবে না। সেজন্য যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে বিচার বিভাগসহ সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন। যে ভাইরাস এবং অবিচারক সুলভ লক্ষণের জন্য আপিল বিভাগের বিচারপতিরা পদত্যাগ করেছেন, সেই একই ভাইরাস এবং লক্ষণসমূহ হাইকোর্ট বিভাগের অনেক বিচারপতির মধ্যে বিদ্যমান। আমরা গত ৮ই আগস্ট আইনজীবীদের দাবির মুখে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ জন বিচারপতির নাম উল্লেখ করেছিলাম। পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দলকানা, অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ হাইকোর্ট বিভাগের ২৫ জন বিচারপতির নাম উল্লেখ করেছি।

বাংলাদেশের সংবিধানকে নিরবচ্ছিন্নভাবে লঙ্ঘন করা, মানবিক মূল্যবোধকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে, বাংলাদেশের সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে এবং গণহত্যার মাধ্যমে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে ভারতে পালিয়ে গিয়ে শেখ হাসিনার রক্ষা হবে না। অবিলম্বে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে গ্রেপ্তারপূর্বক ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করাতে হবে।
গত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার থেকে ফ্যাসিস্ট সরকার এবং পরবর্তীতে গণহত্যাকারী সরকারে পরিণত করতে দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি দুঃখজনক এবং লজ্জাজনকভাবে শেখ হাসিনার আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল এবং সেই অপকর্মে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলো, তারা হচ্ছেন সাবেক প্রধান বিচারপতিদের মধ্যে সর্বজনাব বিচারপতি এ.বি.এম. খায়রুল হক, বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং সর্বশেষ পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। বিচার বিভাগকে শেখ হাসিনার আজ্ঞাবহ হওয়ার পেছনে মূল কুশীলব ছিলেন ব্যারিস্টার শেখ-ফজলে নূর তাপস, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, আনিসুল হক এবং সাবেক  অ্যাটর্নি জেনারেল প্রয়াত মাহাবুবে আলম।
যে ভাইরাস এবং অবিচারক সুলভ লক্ষণের জন্য আপিল বিভাগের বিচারপতিরা পদত্যাগ করেছেন, সেই একই ভাইরাস এবং লক্ষণসমূহ হাইকোর্ট বিভাগের অনেক বিচারপতির মধ্যে বিদ্যমান। আমরা গত ৮ই আগস্ট আইনজীবীদের দাবির মুখে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ জন বিচারপতির নাম উল্লেখ করেছিলাম।

অনেক দক্ষ আইনজীবীরা এবং বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা গত ২ সপ্তাহ ধরে পদত্যাগের দাবিতে বিচারপতিদের নাম উল্লেখ করেছেন, সকল তালিকা পর্যবেক্ষণে দেখা যায় হাইকোর্ট বিভাগের ২৫ থেকে ৩০ জন মাননীয় বিচারপতিবৃন্দ দলকানা, অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব দলকানা, অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ হাইকোর্ট বিভাগের ২৫ জন বিচারপতির নাম উল্লেখ করেছি। কোনো বিচারপতির প্রতি আমাদের কোনো রাগ-অনুরাগ বা বিরাগ নেই। নাথিং ইজ পার্সোনাল। শুধু ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তনে ডুবন্ত বাংলাদেশকে উদ্ধার করা যাবে না। সেজন্য যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে বিচার বিভাগসহ সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন।

হাইকোর্ট বিভাগের যে সমস্ত বিচারপতিবৃন্দ সাংবিধানিক শপথ ভুলে গিয়ে দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করে শেখ হাসিনা বা শেখ ফজলে নূর তাপস বা আনিসুল হকের নির্দেশে বিচারের নামে অবিচার করেছেন, বাংলাদেশের সাবেক ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী, সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে সাজা দিয়েছেন এবং সাজা দিয়ে পদোন্নতি নিয়েছেন, শুধু তাই নয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জনপ্রিয় জাতীয় নেতা শহীদ জিয়ার সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমানকেও অন্যায়ভাবে একের পর এক সাজা দিয়েছেন, এমনকি গণমাধ্যমে তারেক রহমানের কণ্ঠ রুদ্ধ করেছেন, সেই সমস্ত বিচারপতিদের পদত্যাগের আন্দোলনে আমাদের কয়েকজন আইনজীবী বন্ধু কেন আন্দোলনে নেই, আমরা বুঝতে ব্যর্থ। কেউ কেউ অযৌক্তিক বিবৃতির পর বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।



প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের বৈঠক: বাংলাদেশে সোলার প্যানেল কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে চীনের কিছু সোলার প্যানেল কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন। রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এসময় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করায় চীনা নেতৃবৃন্দ এবং জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসকে অভিনন্দন জানান।

প্রধান উপদেষ্টা বেইজিং ও ঢাকার মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, চীন সোলার প্যানেলের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তবে রপ্তানি বাজারে ক্রমবর্ধমান বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। চীনা উৎপাদনকারীরা তাদের সোলার প্যানেল কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তর করতে পারেন। এটি বাংলাদেশকে রপ্তানি  বৈচিত্র্যকরণ ও সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরে সহায়তা করবে।

তিনি উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে চীনে বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি সম্প্রসারণ, উভয় দেশের মধ্যে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও কৃষিখাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বানও জানান। এসময় রাষ্ট্রদূত বলেন, বেইজিং ঢাকার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত এবং আমি আশাবাদী যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ সফল হবে। আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ হবে।

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও বাংলাদেশের কৌশলগত এবং সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বের সম্পর্ক উচ্চ শিখরে রয়েছে এবং উভয় দেশ আগামী বছর তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বছর উদ্যাপন করবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতাকবলিত অঞ্চলে অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে চীনা সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

বৈঠকে ড. ইউনূস আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চীন বাংলাদেশে বসবাসরত দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে। প্রধান উপদেষ্টা চীনে তার স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, চীনের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনুস সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে এবং অনেক তরুণ ত্রি-জিরো ক্লাব গঠন করেছে। এসব ক্লাবের সদস্যরা দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি দুই দেশের তরুণ সম্প্রদায় এবং জনগণের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং চীনা রাষ্ট্রদূত ড. ইউনূসকে তার সুবিধাজনক সময়মতো চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন একটা সন্ধিক্ষণ পার করছে তবে বাংলাদেশের জনগণ এই চ্যলেঞ্জ অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। চীনা রাষ্ট্রদূত দূতাবাসের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের সহায়তার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে ২০ হাজার মার্কিন ডলারের একটি চেক হস্তান্তর করেন। তিনি বলেন, চীনা রেডক্রসও বাংলাদেশের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এক লাখ মার্কিন ডলারের মানবিক সহায়তা প্রদান করবে।