Monday, June 4, 2018

‘ক্রসফায়ারে’ আম ও আমজনতা by শুভ কিবরিয়া

‘ক্রসফায়ার’ নতুন ঘটনা নয়। দেশে দেশে এই ওষুধের পরীক্ষা-নীরিক্ষা বহুকাল আগেই হয়ে গেছে। মেক্সিকো কিংবা কলম্বিয়ায় ক্রসফায়ারের গল্প দিয়ে শত্রুদমন খুব কাজে লাগেনি। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোয় এই ওষুধ অনেক বদ হজমের জন্মও দিয়েছে। হালে ফিলিপাইনে এই পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য দেশটিকে বদনাম কুড়াতে হচ্ছে খুব। সে দেশের শাসক এই ‘ক্রসফায়ার’ চালু করে কুখ্যাত তো হয়েছেন, আবার দেশের ভেতর খোদ বড় আদালতের বড় বিচারকদেরও অপ্রিয়ভাজন হয়েছেন। কিন্তু ফিলিপাইনের যে মূল সংকট, সেই দারিদ্র্য, আয় বৈষম্য, বেকারত্ব, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ—এসব সমস্যার সমাধান মেলেনি এই ক্রসফায়ার ওষুধে।
আইন, সভ্যতা, গণতন্ত্র বলে ‘ক্রসফায়ার’ দুই রকমের বিপদ ডাকে। প্রথমত, এটা বেআইনি। এটা বিচারের স্বাভাবিক নীতির পরিপন্থী। এখানে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, এটা সুশাসনের পরিপন্থী। এটা প্রতিপক্ষকে দুনিয়াছাড়া করার কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি। আর ক্রসফায়ার শেষাবধি প্রতিপক্ষের মনে যে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগায়, সেটা যেকোনও ধরনের চরমপন্থাকেই উৎসাহিত করে। কাজেই ক্রসফায়ার, না দেয় শান্তি না আনে স্বস্তি।
...২...
মানুষের ক্রসফায়ার নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ আছে। স্পষ্টত পক্ষ-বিপক্ষ আছে। যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন দুনিয়াজোড়াই তারা এর বিপক্ষে। তারা মনে করেন কথিত অপরাধীরও বলার কিছু আছে। আছে সংশোধনের সুযোগ। কাজেই হত্যা শেষ বিচারে কোনও সমাধান নয়। শুধু তাই নয়, যে প্রতিষ্ঠান অভিযুক্তকে দোষী বলছে, সেই তাকে হত্যা করতে পারে না। প্রকৃতই অভিযুক্ত অপরাধী কিনা, তা বিচার করবে তৃতীয়পক্ষ। পুলিশ আসামি ধরে তাকে হত্যা করার বিচার সভ্য আইনে চলে না। আদালতে কথিত অভিযুক্তকে অপরাধী প্রমাণ করতে হয়। আদালত তার শাস্তির বিধান করে। সেই শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ দিতে হয়। আপিলে তা খারিজ হলে কিংবা চূড়ান্ত বিচারে যে সাজা বহাল থাকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করতে হয়। এটা ক্রসফায়ারের বিপক্ষ দলের মত। যারা ক্রসফায়ারের পক্ষে আছেন, তারা ভাবেন এত বাছ-বিচার করতে গেলে সমাজে আর অপরাধ দমন করা যাবে না। চিহ্নিত অপরাধীকে দুনিয়া থেকে না সরালে অপরাধ কমবে না। যারা এই মতের পক্ষের মানুষ, মূলত তারা আইনানুগ অস্ত্রধারী। তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন মানুষ। তাদের দায়িত্ব সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তারা সমাজ রক্ষার দায়িত্ব পান সমাজের বিধিবিধান মেনেই। হয় জনতার ভোটে নয় গায়ের জোরে কোনও না কোনোভাবে ক্ষমতায় বসেই তারা সমাজ উদ্ধারের এই শর্ট-কার্ট পথকে মোক্ষম উপায় বলেই ভাবেন।
...৩...
আমাদের আজকের প্রতিপাদ্য বিষয় মানুষের ‘ক্রসফায়ার’ নয়। যে উপায়ে ডজন ডজন মানুষ মধ্যরাতে বন্দুকযুদ্ধে হাপিত্যেশ হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের বুলেটে তা নিয়ে আমরা আপাতত মাথা ঘামাতে চাচ্ছি না। ওটা রাষ্ট্রের বড় বড় মহাজনদের কারবার। আমরা আদার ব্যাপারি আমাদের জাহাজের খবর নিয়ে দরকার নেই। আমরা বরং আদা বা তার কাছাকাছি কিছু নিয়ে মাথা ঘামাই।
এখন রমজান মাস। এই মাসে বাজারে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের চাহিদা থাকে ব্যাপক। মানুষ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী প্রচুর পরিমাণেই কেনা-বেচা করে এই মাসে। যদিও বলা হয় রমজান সংযমের মাস। কিন্তু বাংলাদেশে দিন শেষের সংযম আসলে প্রচুর ইনটেকের মাধ্যমেই শেষ হয়। এ মাসে আমরা সবকিছুই বেশি বেশি করি। এই মাসে আমরা যেমন ইবাদতের আচার অনুষ্ঠান অনেক বেশি বেশিই করি,তেমনি আমরা খাইও বেশি। হরেক পদের খাদ্য দিয়ে ইফতারি করি। সেহরি করি বহুপদের উপাদেয় খাদ্য দিয়ে। এ মাসে আমরা কামাই বেশি, খরচও করি বেশি। আমরা খাই বেশি, নষ্টও করি বেশি।
বাজার অর্থনীতিতে এ মাসে সব পণ্যের বেচাকেনা চলে রমরমা। তাই, যারা এসব পণ্য বিক্রি করেন, তাদের অনেকেই মুনাফা বেশি করতে চান অসাধু উপায়ে। যে যেরকমভাবে পারেন খাদ্যে-ফলে-পণ্যে এই সময়ে ভেজাল মিশিয়ে, ওজনে কম দিয়ে, ফরমালিন, কার্বাইড মিশিয়ে মানুষকে ঠকিয়ে বেশি বেশি মুনাফার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রের যারা অবিভাবক, তারাও তাই সোচ্চার হয়ে ওঠেন এই মাসেই বেশি করে। তারাও এইমাসে দ্রুত বিচারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত ভ্রাম্যমাণ আদালতের চাকাঘোরান জোরে । বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারকেরা বাজার ঘুরে ঘুরে সাজা বাড়ান। তাদের ভাষায় নষ্ট-পচা-বাসি-খারাপ খাবার, খারাপ পণ্য , তারা নষ্ট  করেন। কখনও কখনও বুলডোজারের চাকায় চলে এই ক্রসফায়ারও। গত ক’বছর ধরে মৌসুমি ফল আম পড়েছে এই ক্রসফায়ার চক্রে। কেমনতর সে চক্র সেই গল্পটাই শুনি।
...৪...
আম উঠেছে বাজারে। অভিযোগ, অপিরপক্ব এই আম কার্বাইড ও ইথোফেন দিয়ে আগাম পাকিয়ে আনা হয়েছে বাজারে। এটা স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয় বলছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন(র‌্যাব) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ইতোমধ্যে ঢাকার কাওরান বাজারের আড়তে থাকা প্রায় ৩ হাজার মণ আম ধ্বংস করেছে বুলডোজার দিয়ে র‌্যাব ও ডিএমপি। তাদের অভিযোগ—আমগুলো অপরিপক্ব। এগুলো কার্বাইড ও ইথোফেন দিয়ে পাকানো।
কিন্তু বাজারে অভিযান চালিয়ে কয়েক হাজার মণ আম ধ্বংস করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এ বিষয়ক সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। একটি জাতীয় দৈনিকে ২৩ মে ২০১৮ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, জানা-বোঝার ঘাটতির কারণেই র‌্যাব ও ডিএমপি এভাবে আম নষ্ট করেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, অপরিপক্ব আমে স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিক পাকা আমের চেয়ে কম থাকে। কিন্তু এটা ক্ষতিকর নয়। তাই এসব আম ধ্বংস করার কোনও মানে হয় না। আর কার্বাইড দিয়ে পাকালে ফলে এর অবশিষ্টাংশ থাকে না। তাই তা ক্ষতিকর নয়। আবার নির্দিষ্ট মাত্রায় ইথোফেন ব্যবহার করে ফল পাকানো দেশের আইনে বৈধ। সারা বিশ্বেও তাই।
উল্লেখ্য অপরিপক্ব আম বাজারে আনা নিয়ন্ত্রণ করতে গত কয়েক বছর আমের উৎপাদক বড় দুই অঞ্চল রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় আম পাড়ার সময় বেঁধে দিয়েছে প্রশাসন। এবারও তা করা হয়। এবার সাতক্ষীরার আম ১৫ মে ও রাজশাহীর আম ২০ মে পাড়ার তারিখ দেওয়া হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছে, যে হাজার হাজার মণ আম ধ্বংস করা হলো, তা সাতক্ষীরার আম। ১৫ মে তারিখেই র‌্যাব ও পুলিশ ঢাকার বাজারে রক্ষিত এই আম ধ্বংস করে।
আমের জীবনে ক্রসফায়ার কিংবা বুলডোজার আঘাত নতুন নয়। ২০১৪ সালের আগে ফরমালিন মেশানোর অভিযোগে প্রচুর আম ও অন্যান্য ফল ধ্বংস করা হয়েছিল। পরে দেখা যায়, যে যন্ত্র দিয়ে ফরমালিন পরীক্ষা করা হচ্ছে, তা বাতাসে ফরমালডিহাইড মাপার যন্ত্র। তিনটি সংস্থার পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে হাইকোর্ট সেই যন্ত্রটি ফল ও মাছে ফরমালিন পরীক্ষায় অকার্যকর ঘোষণা করে।
...৫...
তাই বোঝা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাত থেকে আমের জীবন বাঁচাতে আরও জানা-বোঝা দরকার। দেশের মানুষের উপকারের নামে আমরা দেশের সম্পদের, অর্থনীতির আরও কোনও বড় ক্ষতি করছি কিনা, সেটা খুব ভেবে দেখা দরকার। বাংলাদেশের কৃষক তার নিজের শক্তিতে যে আমের উৎপাদন বাড়িয়েছে আমাদের অজ্ঞতা, অক্ষমতা, কুশাসন, ক্ষমতার দাম্ভিকতা কী, তা ধ্বংস করে দিচ্ছে কিনা? যখন এত বিপুল পরিমাণে দেশের আম ছিল না, তখন বিদেশের আমে সয়লাব হতো বাংলাদেশের বাজার। আমরা কৌশলে আবার সেই বিদেশি আমের বাজারকেই উৎসাহিত করছি কিনা, সেটাও দেখা ও ভাবা দরকার।
...৬...
আম থেকে এবার আমজনতায় ফিরি। মিডিয়াজুড়েই এখন বন্দুকযুদ্ধের খবর। ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ যে নামেই ডাকি না কেন, বিনা বিচারে মানুষের জীবনহানি চলছে। তার পরিসংখ্যানও বাড়ছে। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আমের ক্রসফায়ার বা বুলডোজার দিয়ে হত্যা নিয়ে চিন্তিত কিন্তু মানুষের জীবনহানি নিয়ে ততটা ভাবিত নয়। বরং তাকে উৎসাহিত করতেই উৎসাহী।
দুঃখের বিষয় সেটাই!
শুভ কিবরিয়া
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

তিস্তার বরফ গলছে নাকি দিল্লি বহুদূর? by আমীন আল রশীদ

কলকাতা থেকে দিল্লির দূরত্ব এক হাজার ৪৯০ কিলোমিটার। কিন্তু ঢাকা থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৩১৩ কিলোমিটার। তার মানে কলকাতার জন্য দিল্লির চেয়ে ঢাকা অনেক বেশি নিকটবর্তী। এই দূরত্বের সমীকরণ মাথায় রেখে আমরা বাংলাদেশ-ভারতের অমীমাংসিত সমস্যা, বিশেষ করে অভিন্ন নদী তিস্তার পানি বণ্টনের রাজনীতিটা বোঝার চেষ্টা করতে পারি।
সবাই জানেন, তিস্তা এখন আর বাংলাদেশ-ভারত কিংবা হাসিনা-মোদির ইস্যু নয়। বরং এটি ঘুরপাক খাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক টানাপড়েনের বৃত্তে। যে কারণে ঢাকা-কলকাতার দূরত্ব ৩১৩ কিলোমিটার হলেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি অনেক সময়ই ‘দিল্লি বহুদূর’ বলেই প্রতীয়মান হয়।
এই বাস্তবতার পরও আমরা আশাবাদী হই। বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বন্ধুসুলভ বক্তৃতা দেন।
বিশ্বকবির প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে হাসিনা-মোদি ও মমতা একই সুরে এবং বন্ধুসুলভ বক্তৃতা দিয়েছেন। সেখানে পলিটিক্যাল রেটোরিক কিংবা বাহুল্য যাই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে ২০১৮ সালের ২৫ মে তারিখটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। মনে রাখা দরকার, দিনটি ছিল বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী এবং যাঁর জন্ম এই পশ্চিমবঙ্গেই।
উল্লেখ করার মতো বিষয়, কোনও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দুটি দেশের প্রধামন্ত্রী এবং একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিও বিরল ঘটনা। এটি বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বেরই নিদর্শন, যে নিদর্শনের একটি বড় স্থাপনা বাংলাদেশ ভবন। কবিগুরুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে এই ভবনটি শুধু বাংলাদেশেরই প্রতিনিধিত্ব করবে এমন নয়, বরং দু’দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্কের একটি বড় প্রতীক হয়ে থাকবে।
মমতা বলেছেন, বাংলাদেশ সম্মত হলে তারা পশ্চিমবঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি ভবন করতে চান। তার মানে বাংলাদেশ-ভারত বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গ, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির মিল অনেকখানি, সেই রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কের নদীতে যদি একটু জোয়ার আসে, তাহলে একসময় তিস্তার জল নিয়ে এই বাংলার শুষ্ক মৌসুমে হাহাকার হবে না বলেই প্রত্যাশা করা যায়।
বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে নরেন্দ্র মোদি তার ভাষণে বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল সীমানার মতো জটিল সমস্যার সমাধান হয়েছে; যা একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। উপকূলীয় অঞ্চলে নৌ চলাচল ও যোগাযোগে দুই দেশের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে মোদি বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সব রকম সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অন্যান্য দেশের জন্য একটি শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার বিষয় বলেও মোদি উল্লেখ করেন।
একই অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, অতীতে অনেক জল গড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও গড়াবে, তবে আমি মনে করি দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরো জোরদার হবে। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধুত্ব বিশ্বের জন্য ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে যখনই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কথা ওঠে, জোরেশোরে সামনে আসে তিস্তা ইস্যুটি। ভারতের সঙ্গে এরকম আরও অনেক অভিন্ন নদী থাকলেও তিস্তা এখন একটি সিম্বলে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ তিস্তা চুক্তিটা করে ফেলতে পারলে সেটি আওয়ামী লীগের কূটনৈতিক সাফল্যে যেমন আরও একটি পালক যুক্ত করবে, তেমনি এই সাফল্যের কৃতিত্ব নেবে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপিও। সমস্যাটা এখানেই। তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুতে প্রধান স্টেকহোল্ডার যে পশ্চিমবঙ্গ, তারা ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রতিপক্ষ। আগামী নির্বাচনে বিজেপিকে হারানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন মমতা। সুতরাং বিজেপির আমলে তিস্তাচুক্তি হয়ে গেলে তাতে বিজেপির যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য আসবে, মমতা সেই পালে হাওয়া দেবেন কিনা, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। অর্থাৎ রাজনীতিটা এখন কেন্দ্র বনাম রাজ্যের; তৃণমূল কংগ্রেস বনাম বিজেপির। সেই জটিল সমীকরণ আর রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে তিস্তা শেষ পর্যন্ত দিল্লি বহুদূর হয়েই থাকবে নাকি বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে তিন নেতা যেরকম বন্ধু ও সুপ্রতিবেশীসুলভ বক্তৃতা দিয়েছেন, কূটনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটবে, তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো বাংলাদেশ ও ভারতের আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তবে এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নদী বিগত কয়েক বছরে যথেষ্ট বেগবান হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় শান্তিনিকেতনে দুজন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে, যে টোনে, যে ভাষায় পরস্পরকে সম্বোধন করে কথা বলেছেন, সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক। কূটনীতিতে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হাসিনা-মোদি ও মমতার যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আমরা দেখেছি, তাতে আগামীকালই অমীমাংসিত সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমনটি না ভাবলেও, দুদেশের সম্পর্ক যে ভালো যাচ্ছে, তাদের কথাবার্তায় সেটির ইঙ্গিত ছিল।
বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক নদী বলে এই নদীর জলে বাংলাদেশের যে অধিকার, ভারতেরও তাই। সুতরাং আমরা চাইলেই তারা তিস্তা চুক্তি করে ফেলবে এবং আমাদের খরার মৌসুমে গলগল করে পানি ছেড়ে দেবে, বিষয়টি এত সহজে হবে না। ফলে অভিন্ন নদীর চুক্তি হওয়া যেমন জরুরি, তার আগে জরুরি যেসব রাজ্য ও অঞ্চলের ভেতর দিয়ে নদীটি প্রবাহিত, সেই অঞ্চলসমূহের মানুষ যাতে চুক্তির বিরোধিতা না করে বা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা। অর্থাৎ সম্পর্ক ভালো হলে এবং সমঝোতা হলে শুধু নদীর পানি কেন, আরও অনেক কিছুই আদান-প্রদান সম্ভব।
লেখক: সাংবাদিক
আমীন আল রশীদ

'কীভাবে আছি কেউ খবরও রাখে নাই' by জিয়াউল হক

২০১৭ সালের ১ জুন লংগদুর স্থানীয় যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়নকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে লংগদু উপজেলায় পাহাড়িদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দুই শতাধিক বাড়িঘর ও দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাড়ি বানানোর বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কিন্তু যার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এত কিছু ঘটে গেছে, সেই নয়নের স্ত্রী জাহেরা খাতুন দুই শিশু সন্তান নিয়ে অসহায় দিন কাটাচ্ছেন। স্বামীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গত বছরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘সরকার তো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বাড়ি দিচ্ছে। আমার জন্য তো কিছুই করলো না। আমার ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে কীভাবে আছি কেউ কোনোদিন খবরও রাখে নাই।’
স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সেদিন (গত বছর ১ জুন) সকালে অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার স্বামী নয়ন তখন বাসায়, মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। বাচ্চাদের সঙ্গে দুষ্টুমি করছিল সে। তখন বাইরে থেকে কে যেন ডাক দেয়- ও নয়ন দা, নয়ন দা, হুদু তুই? (নয়ন ভাই, কোথায় তুমি?)। তখন তিনি (নয়ন) বাসা থেকে একটা শার্ট ও জিন্স পরে বের হয়ে যান।’ এরপর সেদিন বিকালেই খাগড়াছড়ির চারমাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
জানা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও সদর যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন গত ১ জুন লংগদু সদর থেকে মোটরসাইকেল ভাড়ায় খাগড়াছড়ি যান। দুর্বৃত্তের হাতে তিনি প্রাণ হারান বলে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
নুরুল ইসলাম নয়নের স্ত্রী জাহেরা খাতুন সেই স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘চার বছরের ছোট মেয়েটা প্রায়ই বলে- মা, বাবা কেন আসে না। বাবা কই? বাবাকে কল দাও। তখন কোনও জবাব দিতে পারি না ওরে। ছেলেটার পড়ালেখা করানো এখন কঠিন হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বড় মেয়ের বিয়ে হওয়ার কারণে সে এখন শ্বশুরবাড়িতে থাকে। স্বামী ছাড়া আমার আর আয় করার মতো লোক নাই। একবেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। দলীয়ভাবে যা কিছু পেয়েছি তা দিয়ে বিভিন্ন এনজিওর ঋণ ছিল, বাজারের দোকানেও টাকা বাকি ছিল, সেগুলো দিয়ে এখন একেবারে হাত খালি। সরকার যদি আমার কোনও সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিত তাহলে আমিসহ আমার বাচ্চা দুইটার জীবনটা বেঁচে যেত। না হলে এই ছোট দুইটা বাচ্চা নিয়ে কয়েকদিন পর না খেয়ে মরে যেতে হবে।’
পাহাড়িদের সঙ্গে তার স্বামী নয়নের সুসম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর সঙ্গে এই এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি সবার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি অনেক দিন রাতে বাড়ি ফিরতেন না। তখন ফোন দিলে বলতো অমুক পাহাড়ি বন্ধুর বাসায় থাকবে। আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম। কিন্তু তাকে কেন মারলো এখনও জানি না। আমার স্বামীর কোনও শত্রু ছিল কিনা আমার জানা নাই। ওনার সঙ্গে সবার ভালো সম্পর্ক ছিল জানতাম।’
স্বামীর মৃত্যুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যতটুকু জানতাম, জেএসএস-এর কালেক্টরের সঙ্গে তার একটু কথাকাটাকাটি হয়েছিল। সেটাও ওনার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে। কারণ, তিনি লাইনের প্রধান ছিলেন। কী কারণে তাদের সঙ্গে ঝামেলা হয় তা এখনও জানি না।’
নয়নের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এভাবে পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে কীভাবে দেখেন, এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল ইসলাম নয়নের স্ত্রী জাহেরা খাতুন বলেন, ‘এটা কেন হলো, কীভাবে হলো, আমি কিছুই জানি না। হতে পারে অনেকে তার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে নাই।’ পাহাড়িদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে জাহেরা খাতুন জানান, ‘২ জুন সকালে আমার স্বামীর মরদেহের গোসল দিয়ে বিদায় দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শুনি ‘আগুন, আগুন’। আমরা তখনও বাসায় ছিলাম। কী করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’
উল্লেখ্য, গত বছরের ১ জুন লংগদু সদর ইউনিয়নের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মোটরসাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়ন ভাড়া নিয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পর বিকালে সেখানকার চার মাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। ২ জুন নয়নের লাশ নিয়ে জানাজার জন্য বাইট্টাপাড়া থেকে লংগদু উপজেলা পরিষদ মাঠে রওনা দিলে তিনটিলা পাড়ায় মিছিল আসার পর মিছিল থেকে হঠাৎ করে পাহাড়িদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ৩টি গ্রামের ২১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সরকার মোট ১৭৬টি বসতঘর নির্মাণ করার জন্য মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এসব বসতঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয় ৩০ মে।