Wednesday, December 18, 2013

সময়চিত্র- শাবাশ আওয়ামী লীগ by আসিফ নজরুল

একজন মানুষও ভোট দেয়নি। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত আসেনি। তবু আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোটের মিত্ররা আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে গেছে!

মিডিয়া ভাবনা- টিভি টক শো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা! by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

মহাজোট সরকারের নানা সমালোচনা ও ব্যর্থতা রয়েছে, তা সত্য। কিন্তু একটা ব্যাপারে সরকারের প্রশংসা করতে হবে। তাহলো, তাদের সরকারের আমলে গণমাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছে।
দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বিগত পাঁচ বছরে গণমাধ্যমের ওপর তেমন নিয়ন্ত্রণ আসেনি। সংবাদপত্রে কলামিস্টরা স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা লিখেছেন। টিভির টক শোতে আলোচকেরাও স্বাধীনভাবে সরকারের দোষত্রুটি দেখিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদপত্রে সরকারের নানা দুর্নীতি, ভুলনীতি, দলীয়করণ, অপরাজনীতি, ছাত্রলীগের টেন্ডার-বাণিজ্য নিয়ে অসংখ্য অনুসন্ধানী ও সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা অত্যন্ত সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। যারা পারেনি, তারা তাদের দক্ষতার অভাবে পারেনি অথবা মালিকের আগ্রহের অভাবে পারেনি। সরকার বাধা দেয়নি। সরকারের এই মুক্ত সাংবাদিকতার নীতি প্রশংসনীয়। গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা। মহাজোট সরকার গণতন্ত্রের নানা শর্ত লঙ্ঘন করলেও স্বাধীন সাংবাদিকতার শর্তটি বাস্তবায়নে বাধা দেয়নি।

মহাজোট সরকার বিদায় নিয়েছে। ক্ষমতায় এখন নির্বাচনকালীন বহুদলীয় সরকার। যেসব দল সরকারে রয়েছে, তারা প্রায় সবাই আওয়ামী লীগবান্ধব। প্রকৃত বিরোধী দল এই সরকারে নেই। নির্বাচনের সময় গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে, এটাই প্রত্যাশিত। অথচ সেই বহুদলীয় সরকার নির্বাচনের প্রাক্কালে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার পাঁয়তারা করছে বলে জানা গেছে।

একটি দর্শকপ্রিয় টিভি চ্যানেলের টক শোর উপস্থাপনা থেকে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা বুঝতে কারও অসুবিধে হবে না যে মালিকপক্ষের ওপর সরকার চাপ সৃষ্টি করায় এই ঘটনা ঘটেছে। উল্লেখ করা যায় যে মাহমুদুর রহমান মান্না একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সফল বাগ্মী হওয়াতে টিভির রাজনৈতিক টক শো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতেন। তাঁর অনুরাগী দর্শকের সংখ্যা প্রচুর। এই ঘটনা থেকে অনেকে আশঙ্কা করছেন সরকার নির্বাচনের আগে টিভির টক শোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করবে। কোনো কোনো টিভি চ্যানেলে বিশেষ বিশেষ আলোচককে আমন্ত্রণ না করার জন্য চাপ আছে। এই চাপ প্রয়োগের কারণ বেশির ভাগ টিভি চ্যানেল বর্তমান সরকারের অনুগ্রহে লাইসেন্স পেয়েছে। বেশির ভাগ মালিকই আওয়ামীপন্থী। চ্যানেল মালিক ব্যবসায়ীদের নানা দুর্বলতার কথা সরকার জানে। কাজেই সরকার চাইলে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ দিতে পারে। অনেককে দিচ্ছেও।

টিভির টক শো শুধু সরকারের সমালোচনা করে, এই ধারণা ঠিক নয়। অনেক আলোচক সরকারের নীতির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং নানা বিষয়ে সরকারের সাফল্য তুলে ধরেন। পাশাপাশি বা একই অনুষ্ঠানে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে বলেই এই অনুষ্ঠানগুলোর জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা এত বেশি। ‘বিটিভির’ মতো শুধু একতরফা প্রশংসা হলে দর্শক এসব অনুষ্ঠান দেখতেন না। সরকার টক শোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে কি সব প্রাইভেট চ্যানেলকে বিটিভির অবস্থানে নিতে চায়?

সম্প্রতি আলোচ্য বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য টক শোর মডারেটর, আলোচক ও নাগরিক সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট প্রতিনিধি জাতীয় প্রেসক্লাবে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে এবিএম মূসা ‘টেলিভিশন টক শো: সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে নাগরিক উদ্যোগ’ শিরোনামে যে বক্তব্য পাঠ করেছেন, তা উদ্ধৃত করা হলো:

‘সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে আমরা টেলিভিশন টক শোতে স্বাধীন মতামত প্রকাশে সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিধিনিষেধ আরোপের কথা জানতে পেরেছি। এরই অংশ হিসাবে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল থেকে টক শো উপস্থাপককে পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও আমরা জানতে পেরেছি। সরকারের সমালোচনাকারী বা ভিন্নমতাবলম্বী বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষককে টক শোতে আমন্ত্রণ না জানানোর জন্য টিভি চ্যানেলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং সরকারের পছন্দমতো আলোচকদের বাধ্যতামূলক আমন্ত্রণ জানানোর জন্য টিভি চ্যানেলগুলোকে নানাভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে। এর আগে দেশের বরেণ্য কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ওপর হামলা, আক্রমণ এবং হয়রানির মতো কিছু শোচনীয় ঘটনাও সাম্প্রতিককালে ঘটেছে।

আমরা তাকে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক বলে মনে করি। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করছি এবং সরকারকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে অনতিবিলম্বে বিরত হওয়ার দাবি করছি।’

আমরা মনে করি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের চর্চা এবং এতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত রাখার স্বার্থে সরকারসহ সব মহলের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করা বা তার সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা বা গঠনমূলক বিভিন্ন মতামত প্রদান করার অধিকার বাংলাদেশ সংবিধান বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রদান করেছে। বিশেষ করে, দেশে নির্বাচনকালীন সময়ে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতাসহ এসব মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা এবং এসব অধিকার হরণকারী সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা। টক শো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মাধ্যমে সরকার তার এই কর্তব্যেও বরখেলাপ করছে। সরকারের এ ভূমিকা জনগণের মুক্ত মননশীলতা, চিন্তা ও বাকস্বাধীনতার চর্চা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করি।

আমরা বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের অধিকার এবং ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নকারী সব মহলের সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে জোর অনুরোধ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে জনগণকে মুক্তভাবে কথা বলতে দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে তাদের অংশগ্রহণের অধিকারকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করারও আহ্বান জানাই।

আমরা আশা করি, সরকার এই ভুল পথে পা বাড়াবে না। গণমাধ্যম যদি সরকারের বিপক্ষে চলে যায়, তাহলে সেই সরকারকে আর কেউ রক্ষা করতে পারবে না। এমনিতে নানা কারণে বর্তমান সরকারের অবস্থা টালমাটাল। টক শো নিয়ন্ত্রণ করে সরকার কফিনের শেষ পেরেকটি যেন না মারে।

মহাজোট সরকার বিদায় নেওয়ার আগে আরও ১৩টি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়ে গেছে। আমাদের দলীয় রাজনীতি ও সরকার কতটা দূষিত হলে এ রকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার একটা বড় প্রমাণ এটি। টিভি লাইসেন্স, বেতার লাইসেন্স, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির লাইসেন্স বর্তমান সরকার একমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় দিয়েছে। ব্যতিক্রম খুব কম। যেহেতু এগুলোর প্রায় প্রত্যেকটি দিয়ে প্রচুর মুনাফা করা সম্ভব। এমনকি শুধু লাইসেন্স বিক্রি করে দিলে বা অন্যদের ভাগ দিলেও বিরাট অঙ্কের টাকা আয় করা সম্ভব। আমাদের দুই বড় দলের রাজনীতি যে প্রধানত হালুয়া-রুটির রাজনীতি, তা এই ঘটনাতে আবার প্রমাণিত হয়েছে। টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স নিয়ে দল ও সরকারের ওপর মহলে যে অনেক লেনদেন হয়েছে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। কারা লাইসেন্স পেয়েছেন, তাঁদের নাম, পরিচয় দেখলেও তা অনুমান করা যায়। টিভি মাধ্যমের উন্নয়ন নিয়ে তাঁরা যে খুব উদগ্রীব, তা কারও মনে হবে না। টাকা রোজগার ও নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ানোই এই টিভি লাইসেন্স সংগ্রহের প্রধান উদ্দেশ্য।

এখন যেসব টিভি চ্যানেল চলছে তার মধ্যে বেশ কয়েকটি মূলধন, স্পনসর, বিজ্ঞাপন ও উপযুক্ত লোকবলের অভাবে ধুঁকছে। বাংলাদেশে টিভি মিডিয়ায় উপযুক্ত লোকবল, শিল্পী, লেখক, উপস্থাপক পাওয়াই এক বড় সমস্যা। টিভির পর্দায় শুধু লাইসেন্স দেখালে তো আর দর্শক সেই চ্যানেল দেখবে না। আমাদের বিজ্ঞাপনের বাজারও সীমিত। সরকার এই বাস্তব সত্যটিও মনে রাখে না। লাইসেন্স বিতরণ করে দুর্নীতি করা যাদের একমাত্র লক্ষ্য, তাদের অবশ্য অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করার কথা নয়। যে সরকার বা মন্ত্রণালয় পাঁচ বছরে একটা সম্প্রচার নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি, সেই সরকারের মন্ত্রীরা আবার মাইক পেলে বড় বড় কথা বলেন।

একটা সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরি না করে খেয়ালখুশি মতো এ ধরনের টিভির লাইসেন্স দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত? দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব তো রুটিন কাজ চালিয়ে যাওয়া, নীতিগত বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা নয়। সে ক্ষেত্রে এই ১৩টি টিভি লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার জন্য আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।


মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়ন কর্মী।

নৃশংসতা- ছাত্রলীগের রোষে প্রাণ গেল পথচারী বিশ্বজিতের

বিশ্বজিৎ দাস সম্ভবত ভুল সময়ে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এইটুকু ভুলের কারণেই জীবন গেল তাঁর। ওই খানে তখন অবরোধের পক্ষের মিছিলে ধাওয়া দিয়েছিলেন ছাত্রলীগের কর্মীরা।

জানতে ইচ্ছা করে by সাহস রতন

বছর ঘুরে আবারও ১৬ই ডিসেম্বর। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক কষ্টে অর্জিত সবচেয়ে স্মরণীয় একটি দিন।

বিশ্বজিৎ হত্যা: ছাত্রলীগের ৮ জনের ফাঁসি, ১৩ জনের যাবজ্জীবন

পুরান ঢাকায় দরজি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ জন কর্মীর মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বাকি ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আজ বুধবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক এ বি এম নিজামুল হক এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ছাত্রলীগের আট কর্মী হলেন রফিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল, মাহফুজুর রহমান ওরফে নাহিদ, জি এম রাশেদুজ্জামান ওরফে শাওন, কাইয়ুম মিয়া, ইমদাদুল হক ওরফে এমদাদ, সাইফুল ইসলাম, রাজন তালুকদার ও নূরে আলম ওরফে লিমন। তাঁদের মধ্যে রাজন তালুকদার ও নূরে আলম পলাতক। বাকি ছয়জন কারাগারে আছেন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ছাত্রলীগের বাকি ১৩ কর্মী হলেন এ এইচ এম কিবরিয়া, গোলাম মোস্তফা, খন্দকার ইউনুস আলী, তারেক বিন জোহর, আলাউদ্দিন, ওবায়দুল কাদের, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান, আল আমিন শেখ, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, কামরুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন। এঁদের মধ্যে এস এম কিবরিয়া ও গোলাম মোস্তফা কারাগারে আছেন। বাকি ১১ জন পলাতক।
৪ ডিসেম্বর মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক রায় ঘোষণার জন্য ১৮ ডিসেম্বর (আজ) দিন ধার্য করেন।
রায় ঘোষণার আগে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার আসামীদের আদালতে হাজির করা হয়। ছবি: মনিরুল আলম 
গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে পথচারী বিশ্বজিৎ দাসকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মীরা নির্মমভাবে পেটান ও কোপান। বাঁচার জন্য দৌড় দিলে তিনি শাঁখারীবাজারের রাস্তার মুখে পড়ে যান। রিকশাচালক রিপন তাঁকে রিকশায় তুলে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক বিশ্বজিৎকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার সময় বিশ্বজিৎ লক্ষ্মীবাজারের বাসা থেকে শাঁখারীবাজারে নিজের দর্জি দোকানে যাচ্ছিলেন।
হত্যার ঘটনায় ওই রাতে সূত্রাপুর থানায় মামলা করে পুলিশ। পরদিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। এরপর সাত আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়।

তদন্ত শেষে চলতি বছরের ৫ মার্চ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ জন কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। ২৬ মে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
আসামিদের মধ্যে আটজন রফিকুল ইসলাম, মাহফুজুর রহমান, রাশেদুজ্জামান, কাইয়ুম মিয়া, এস এম কিবরিয়া, এমদাদুল হক, সাইফুল ইসলাম ও গোলাম মোস্তফা কারাগারে আটক আছেন।
বাকি ১৩ আসামি রাজন তালুকদার, ইউনুস আলী, আজিজুল হক, তারেক বিন জোহর, আলাউদ্দিন, ওবায়দুল কাদের, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান, মীর মো. নূরে আলম, আল আমিন শেখ, মনিরুল হক, কামরুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন পলাতক রয়েছেন।
এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ বিশ্বজিতের বাবাসহ ৩৩ জনকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করে। উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষ গত ২৭ নভেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে। এরপর কারাগারে আটক আট আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তাঁদের আইজীবীরা। পলাতক ১৩ আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ সব মিলিয়ে পাঁচ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।

সহিংস রাজনীতি সমর্থনযোগ্য নয়- অর্থনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি

বিজয় দিবসের আগের দিন দেশজুড়ে ব্যবসায়ী সমাজ সাদা পতাকার প্রতিবাদবন্ধন কর্মসূচি পালন করল। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতি যেভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে,
তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাতে এবং ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি প্রবল অনীহা জানাতেই এই প্রতিবাদবন্ধন কর্মসূচি। কিন্তু তাদের এই বার্তা যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্ণকুহরে সেভাবে প্রবেশ করেনি, তা এখন পরিষ্কার। সব অনুরোধ-আহ্বান উপেক্ষা করে বিরোধী দল নবোদ্যমে ৭২ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করল। এর ফলে কয়েক মাস ধরে হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক সহিংসতার যে নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়েছে, তা আরও প্রলম্বিত হবে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে ইতিমধ্যে কতখানি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে, তা বোঝা যায় প্রথম আলোয় প্রকাশিত একগুচ্ছ প্রতিবেদনে। এসব প্রতিবেদনে সব ধরনের ব্যবসায়ী-শিল্পপতির অসহায় অবস্থা ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো সময়মতো রপ্তানিপণ্য জাহাজে তুলতে না পেরে চড়া মাশুল গুনছে, ২০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া লাখ টাকা হয়ে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়েছে, স্থলবন্দরগুলোতে পণ্য জমে গেছে, যা বাজারে ও কারখানায় আনা যাচ্ছে না, বিভিন্ন কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন অনিশ্চিত সময় কাটাচ্ছেন। দাবি আদায়ের নামে হরতাল-অবরোধে এখন পুড়ছে পণ্যবাহী ট্রাক, থেমে যাচ্ছে কারখানার চাকা, আহত হচ্ছেন রাস্তার ধারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নাশকতার শিকার হচ্ছে রেলপথ।

এ রকম অবস্থা আরও কত দিন চলবে, তা কেউ বলতে পারছে না। ইতিমধ্যে এই ধ্বংসযজ্ঞ যে গোটা অর্থনীতিকে অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছে, তা কোনো রকম অঙ্ক কষা ছাড়াই বলে দেওয়া যায়। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে একটি গতিময় ও স্পন্দবান অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছিল। বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৫৯তম, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে তৃতীয় স্থানটি বাংলাদেশের, সহজে ব্যবসা করার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সর্বোপরি ২০২১ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পথে অভিযাত্রায় ছিল বাংলাদেশ। চলমান অসুস্থ রাজনীতির সহিংস ছোবলে সেই অভিযাত্রার পদযুগলে বিরাট ক্ষতের সৃষ্টি হলো। সামনে এগোনোর চেয়ে এই ক্ষত সারানোর দাওয়াই প্রয়োগই এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

এ রকম একটা অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী আচরণই কাম্য। দেশে রাজনৈতিক সংকট তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি দলের দায় যেমন বেশি, তেমনি এই ধ্বংসযজ্ঞ বিস্তারের বড় দায় প্রধান বিরোধী দলকেই নিতে হবে। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো জামায়াত-শিবির এই ধ্বংসযজ্ঞের দাবানল ছড়িয়ে দিতে যে হিংস্র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তা কঠোরভাবে দমন করার জন্য সরকারের কুশলী পদক্ষেপ প্রয়োজন। অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিলে তার মূল্য কমবেশি সবাইকে দিতে হবে, আর এই ক্ষতি আসলে অপূরণীয়।

এরশাদ-জিএম কাদের বৈঠক

হাসপাতালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের।
সকাল ১১টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত তারা হাসপাতালে একান্তে কথা বলেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে বৈঠকের বিষয়ে জিএম কাদের কোন কথা বলেননি। এরশাদকে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে এমন আলোচনার মধ্যেই তার অনুজ দেখা করতে হাসপাতালে যান। ধারণা করা হচ্ছে, দলের পরবর্তী করণীয় নিয়ে এরশাদ জিএম কাদেরকে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, এরশাদ ও ছেলে এরিখসহ চারজনের পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। যদিও এরশাদ দেশের বাইরে যেতে চাইছেন না বলে তার ঘনিষ্টজনরা বলছেন। সম্প্রতি এরশাদের উদ্বৃতি দিয়ে তার বক্তব্য প্রচার করায় তার বিশেষ উপদেষ্ঠা ববি হাজ্জাজকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ববি নিজের ফেসবুক স্ট্যটাসে জানিয়েছেন, তাকে জোর করে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এদিকে দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এবং জিএম কাদেরের ওপর চাপ রয়েছে। এ কারণে তারা গা বাঁচিয়ে চলছেন। হাওলাদার প্রকাশ্যে খুব একটা আসছেন না। একই অবস্থা জিএম কাদেরেরও। গতকাল এরশাদের মুক্তির দাবিতে জিএম কাদেরের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি বাসা থেকে বের হতে পারেননি। তার আগে তার বাসার সামনে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অবস্থান নেয়। দলের অপর নেতা কাজী ফিরোজ রশিদ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কর্মসূচিতে উপস্থিতি থাকলেও তিনি গণমাধ্যমে স্পষ্ট কোন বক্তব্য রাখেননি। এদিকে নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে ধূম্রজাল চললেও দলের সরকারপন্থি বলে পরিচিত নেতারা প্রকাশ্যে কোন কথা বলছেন না। তারা দলীয় কোন কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন না। প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদের অবস্থানও রহস্যে ঘেরা। অনেকে বলছেন চাপে পড়ে তিনি এমন কৌশল নিয়েছেন। আবার কেউ বলছেন, জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে রাখতে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ি কাজ করছেন রওশন।

নিঃসঙ্গ গণতন্ত্র ও জ্বলন্ত স্বদেশ by ড. মাহফুজ পারভেজ

একাকী ও নিঃসঙ্গ হাঁটছে বাংলাদেশ; বাংলাদেশের গণতন্ত্র। হাঁটছে নিঃসঙ্গ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন। সরকার। সবাই একাকী ও নিঃসঙ্গ। অন্যদিকে জ্বলছে দেশ।

বিশ্বজিত হত্যায় ৮ জনের মৃত্যুদন্ড

দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ মামলায় ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক অচলাবস্থা- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায় by এ কে এম জাকারিয়া

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছে হংকংভিত্তিক এশীয় হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি)।

রাজনৈতিক সহিংসতা- বাংলাদেশ কি নেভাবে না এ আগুন? by কাবেরী গায়েন

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জাতির সামনে একটি নতুন প্রত্যাশার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে, যেমন দেশকে ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দায়িত্বশীলতা বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

নতুন বছরের শুরুতে শাকিরার নতুন গান

আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে মুক্তি পাচ্ছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পপগায়িকা শাকিরার নতুন একটি গান। গানটির পাশাপাশি এর মিউজিক ভিডিওর কাজও এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

শাবাশ আওয়ামী লীগ

একজন মানুষও ভোট দেয়নি। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত আসেনি। তবু আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোটের মিত্ররা আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে গেছে! ভোটহীন, প্রার্থীহীন ও নির্বাচনহীন নির্বাচনে জেতার এই অনন্য রেকর্ড এই ভূবিশ্বে একটি দলই করতে পেরেছে। সেটি আমাদের প্রিয় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন।
এই নির্বাচনী বিজয়ের মাহাত্ম্য বলে শেষ করা যাবে না। এই বিজয় সম্পন্ন করার জন্য আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকারকে সর্বদলীয় সরকারে রূপান্তরিত করেছে, রওশন এরশাদ ও রাশেদ খান মেননকে একসঙ্গে শপথ গ্রহণ করিয়েছে, জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র পরে ‘শিশুতোষ’ গণ্য করে এড়িয়ে গেছে! এই বিজয় সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশন সময় পার হওয়ার পরও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও দলের প্রার্থীরা নিজেরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পরও কমিশন তা গ্রহণ করতে অসম্মতি জানিয়েছে। কমিশন জাতীয় পার্টির অসম্মত ও প্রত্যাহারে ব্যর্থ প্রার্থীদের জোর করে লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগে বিলীনকামী জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টিকে উদারহস্তে নৌকায় চড়িয়েছে! ‘সার্চ কমিটির’ মাধ্যমে গঠিত নির্বাচন কমিশন ‘রিসার্চ’ করে করে এভাবে এক অভাবিত নির্বাচনহীন নির্বাচনের পরিকল্পনা সম্পন্ন করেছে! এই কমিশন এমন একটি অবাধ নির্বাচন করতে পারবে, তা সবচেয়ে বেশি বুঝতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ। দলের নেতাদের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাকে অভিনন্দন! এই বিজয় সম্পন্ন করার জন্য আরও বহু কাণ্ডকীর্তি হয়েছে। বিজয় সম্পন্ন করার প্রয়োজনে সন্ত্রাস দমনের বাহিনী র‌্যাব এরশাদ অসুস্থ তা বুঝতে পেরেছে, অচিরেই হয়তো অন্য কোনো সংস্থা তার মানসিক অসুস্থতাও খুঁজে বের করবে।
এই বিজয়যাত্রা এরশাদের অর্ধযুগের সংসার ‘তছনছ’ করেছে, রওশাদ এরশাদকে শহীদ মিলনের স্মৃতিবিজড়িত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়ে এসেছে, কাজী জাফর ‘মীর জাফর’ কিংবা ‘মীরমদন’ কি না সেই গুরুতর বিতর্ক জাতিকে উপহার দিয়েছে। এই বিজয়ের পথে সচরাচর জামানত হারানো বাম নেতারা নৌকায় বিলীন হয়েছেন, গডফাদার, মাদক ব্যবসায়ী বা চোরাকারবারি হিসেবে স্বনামধন্যদেরও বিজয় নিশ্চিত করতে বাকিরা সরে গেছে। বিএনএফ নামে একটি দলের হাইব্রিড জন্ম হয়েছে। এই বিজয়ের রূপকারদের অভিনন্দন। গণতন্ত্রের এই নব অধ্যায় নির্মাণের পথে বাদ সাধতে চেয়েছিল প্রধান বিরোধী দল। তাই তাদের অফিস বিরতিহীনভাবে পুলিশ-র‌্যাবে অবরুদ্ধ রয়েছে, বয়সের ভারে ন্যুব্জ বিএনপির নেতাদের রিমান্ডের আদেশ হয়েছে, বাকি নেতারা বাড়িঘর ছেড়ে টেলিফোন বন্ধ রেখে আত্মগোপন করেছেন। বিএনপি অফিস থেকে অবরুদ্ধ, নিঃসঙ্গ ও অসুস্থ সন্ত্রাসী রুহুল কবির রিজভী গ্রেপ্তার হয়েছেন, রিজভীর ডামি সালাহ উদ্দিন আহমদ গোপন ভিডিও বার্তায় পারদর্শী হয়ে লাদেন খেতাব পেয়েছেন। ‘নতুন গণতন্ত্রের শত্রু’ খালেদা জিয়াকে ক্ষুব্ধ মানুষের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পুলিশ মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বিএনপি নির্বাচনে এলে তাদের সঙ্গেও আসন ভাগাভাগি করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও সর্বদলীয় করা যেত! খালেদা জিয়া তা ভাবতে পারেননি। আওয়ামী লীগ-বিএনপির এই অসাধারণ সম্প্রীতির কথা ভেবেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী! বাংলাদেশে নির্বাচন মানে ছিল কালোটাকা আর পেশিশক্তির খেলা। এই অশুভ প্রবণতা থেকে নির্বাচনকে রক্ষা করার জন্য দেশে ডজন ডজন আইন আর আচরণবিধি হয়েছে, শত শত গোলটেবিল আলোচনা হয়েছে,
সেখান থেকে বহু সংবিধান বিশেষজ্ঞ আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে। নির্বাচনকে কলুষমুক্ত করার বেশুমার ডলার, ইউরো আর বাংলাদেশি টাকা খরচ হয়েছে, এনজিও শিল্পের বিপুল বিকাশ হয়েছে, বহু ধারণাপত্র, প্রস্তাব আর ‘ইন-ডেপথ’ গবেষণার প্রসব হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে কালোটাকা আর পেশিশক্তির আস্ফাালন তাতে একটুও কমে যায়নি। এবারের মহান নির্বাচনে এক নিমেষে দেড় শতাধিক আসনে সেই আস্ফাালনকে নিশ্চিহ্ন করা গেছে। যেসব আসনে একতরফা নির্বাচন হবে, সেখানেও এই কালোটাকা আর পেশিশক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা প্রায় ধূলিসাৎ হয়েছে। পেশিশক্তি আর কালোটাকা দমনের জন্য নির্বাচনহীন নির্বাচনের এই অভিনব, অচিন্তনীয় আর অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য আওয়ামী লীগের চেয়ে আর বেশি প্রশংসা কে পেতে পারে! এই মহান বিজয়ের পথ তাই বলে নিষ্কণ্টক ছিল না। এই বিজয় রুখতে বিরোধী দলের জঙ্গিরা শহরে-গ্রামে আওয়ামী লীগের লোকদের পুড়িয়ে বা কুপিয়ে হত্যা করছে, পুলিশ-র‌্যাব নির্বিচারে গুলি ছুড়ে জঙ্গিদের হত্যা করছে, রহস্যময় নাশকতার ঘটনায় সাধারণ মানুষ প্রাণ দিচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরকে ককটেল আর পেট্রলবোমা মারার জন্য দোষারোপ করেছে। দেশের সুশীল সমাজের অধিকতর বিদগ্ধ অংশটি শুধু বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, অন্য অংশ শুধু পুলিশ আর রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর সন্ত্রাসের নিন্দা করেছে। মিডিয়ার অধিকতর ‘প্রগতিশীল’ একটি অংশ শুধু জঙ্গিদের ককটেলে পোড়া মৃতদেহের ছবি ছাপছে, ‘সরকারবিরোধী’ অংশটি ছাপছে শুধু পুলিশের গুলিতে নিহতদের ছবি! সুশীল সমাজ আর মিডিয়া যে কত ‘অনিরপেক্ষ’ তা এই নির্বাচনের ডামাডোলে এভাবেই প্রমাণিত হয়েছে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নেতারা কেন এত দিন সুশীল সমাজ আর মিডিয়াকে তুলাধোনা করেছেন, তা ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’ এখন বুঝতে পারছে। তাদের পক্ষ থেকে তাই নেতাদের অভিবাদন! মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আওয়ামী লীগের একজন বর্ষীয়ান নেতা বহু আগে নেলসন ম্যান্ডেলা, আব্রাহাম লিংকন আর মহাত্মা গান্ধীর সমষ্টি বলে বর্ণনা করেছিলেন। উদার হূদয় এই গুণমুগ্ধ ব্যক্তি পরে রাষ্ট্রপতির পদকে অলংকৃত করেছিলেন। কিন্তু আমরা এত দিনে বুঝতে পারছি যে তিনি আসলে প্রধানমন্ত্রীর যথেষ্ট তারিফ করতে পারেননি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিছু ক্ষেত্রে ম্যান্ডেলা-লিংকনদের সবার সমষ্টিরও ঊর্ধ্বে। ম্যান্ডেলা আর লিংকনরা মিলে তাঁর মতো বন্ধুত্বময় নির্বাচনের কথা ভাবতে পারবেন না! লাস্কি থেকে শুরু করে হান্টিংটন পর্যন্ত পৃথিবীর তাবত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিলেও গণতন্ত্রের এমন নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করতে পারবেন না। তিনি নতুনভাবে গণতন্ত্রকে বিনির্মাণ করেছেন। আসুন, আমরা তাঁর অবদানকে নতশিরে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এই নির্বাচনের বিজয়যাত্রার পথে শত মানুষ প্রাণ দিয়েছে, হাজার মানুষ আহত হয়েছে, হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আরও বহু ক্ষয়ক্ষতি ভবিষ্যতে হয়তো হবে। কিন্তু এত কিছুর বিনিময়ে হলেও সংবিধান তো আমরা রক্ষা করতে পেরেছি! অতীতে কোনো সামরিক বা বেসামরিক সরকার বা কোনো তত্ত্বাবধায়ক সংবিধান রক্ষার জন্য এতটা ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখাতে পারেনি। পেরেছে শুধু আওয়ামী লীগের সরকার। দেশি-বিদেশি সব মূর্খের নসিহত প্রত্যাখ্যান করে এই সরকার একটি নজিরবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতির অধিকারকে রক্ষা করেছে। আসুন, আমরা মুক্তকণ্ঠে আওয়ামী লীগ সরকারের গুণকীর্তন করি! আওয়ামী লীগের বিজয়ের বন্দনা করি! জয় হোক আওয়ামী লীগের!

অর্থনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি

বিজয় দিবসের আগের দিন দেশজুড়ে ব্যবসায়ী সমাজ সাদা পতাকার প্রতিবাদবন্ধন কর্মসূচি পালন করল। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতি যেভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাতে এবং ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি প্রবল অনীহা জানাতেই এই প্রতিবাদবন্ধন কর্মসূচি। কিন্তু তাদের এই বার্তা যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্ণকুহরে সেভাবে প্রবেশ করেনি, তা এখন পরিষ্কার। সব অনুরোধ-আহ্বান উপেক্ষা করে বিরোধী দল নবোদ্যমে ৭২ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করল। এর ফলে কয়েক মাস ধরে হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক সহিংসতার যে নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়েছে, তা আরও প্রলম্বিত হবে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে ইতিমধ্যে কতখানি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে, তা বোঝা যায় প্রথম আলোয় প্রকাশিত একগুচ্ছ প্রতিবেদনে। এসব প্রতিবেদনে সব ধরনের ব্যবসায়ী-শিল্পপতির অসহায় অবস্থা ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো সময়মতো রপ্তানিপণ্য জাহাজে তুলতে না পেরে চড়া মাশুল গুনছে, ২০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া লাখ টাকা হয়ে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়েছে, স্থলবন্দরগুলোতে পণ্য জমে গেছে, যা বাজারে ও কারখানায় আনা যাচ্ছে না, বিভিন্ন কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন অনিশ্চিত সময় কাটাচ্ছেন। দাবি আদায়ের নামে হরতাল-অবরোধে এখন পুড়ছে পণ্যবাহী ট্রাক, থেমে যাচ্ছে কারখানার চাকা,
আহত হচ্ছেন রাস্তার ধারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নাশকতার শিকার হচ্ছে রেলপথ। এ রকম অবস্থা আরও কত দিন চলবে, তা কেউ বলতে পারছে না। ইতিমধ্যে এই ধ্বংসযজ্ঞ যে গোটা অর্থনীতিকে অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছে, তা কোনো রকম অঙ্ক কষা ছাড়াই বলে দেওয়া যায়। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে একটি গতিময় ও স্পন্দবান অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছিল। বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৫৯তম, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে তৃতীয় স্থানটি বাংলাদেশের, সহজে ব্যবসা করার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সর্বোপরি ২০২১ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পথে অভিযাত্রায় ছিল বাংলাদেশ। চলমান অসুস্থ রাজনীতির সহিংস ছোবলে সেই অভিযাত্রার পদযুগলে বিরাট ক্ষতের সৃষ্টি হলো। সামনে এগোনোর চেয়ে এই ক্ষত সারানোর দাওয়াই প্রয়োগই এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। এ রকম একটা অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী আচরণই কাম্য। দেশে রাজনৈতিক সংকট তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি দলের দায় যেমন বেশি, তেমনি এই ধ্বংসযজ্ঞ বিস্তারের বড় দায় প্রধান বিরোধী দলকেই নিতে হবে। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো জামায়াত-শিবির এই ধ্বংসযজ্ঞের দাবানল ছড়িয়ে দিতে যে হিংস্র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তা কঠোরভাবে দমন করার জন্য সরকারের কুশলী পদক্ষেপ প্রয়োজন। অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিলে তার মূল্য কমবেশি সবাইকে দিতে হবে, আর এই ক্ষতি আসলে অপূরণীয়।

কাদের মোল্লার জন্য পাকিস্তানের দরদ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পাকিস্তানের আত্মিক সম্পর্ক যে গভীর, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। সম্প্রতি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী যে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে, তাতে আমরা বিস্মিত হইনি। তারা বাংলাদেশে তাদের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দলটির নেতার শাস্তিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটা হয়তো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির পর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে উদ্বেগ প্রকাশ করে নেওয়া প্রস্তাব যেমন ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞা, তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দেশটির নগ্ন হস্তক্ষেপও বটে। আরও দুঃখজনক যে প্রস্তাবটির পক্ষে বলতে গিয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাদের মোল্লার পরিণতিকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। যে দেশটিতে সামরিক আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সেই দেশের কাছ থেকে আমরা আইনি নসিহত শুনতে চাই না। বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার সামরিক বা গোপন আদালতে হচ্ছে না। এটি হচ্ছে ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (আদালত) আইনের অধীনে এবং সেখানে বিবাদীপক্ষ সব ধরনের আইনি সুরক্ষা পেয়েছে। এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর তারা রিভিউ আবেদনের সুযোগেরও সদ্ব্যবহার করেছে।
সে ক্ষেত্রে এই আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করা কিংবা এর নিন্দা করা কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত নয়, আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এর মাধ্যমে পাকিস্তান একাত্তরে বাংলাদেশে তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘটিত অপরাধকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, পাকিস্তান তাদের ভুল স্বীকার করবে। কিন্তু দেশটি অতীতের ভুল অস্বীকার করতে গিয়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছে। কাদের মোল্লা পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী বলেই তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে বলে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, তা যে সর্বৈব মিথ্যে, সে কথা পিপিপি সদস্যদের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে। কোনো আদর্শবাদ প্রচার বা পোষণ করার জন্য কাদের মোল্লার বিচার হয়নি, তাঁর বিচার হয়েছে হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের মতো ঘৃণ্য অপরাধের জন্য। আমরা পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের গৃহীত প্রস্তাবের নিন্দা এবং দেশটির প্রতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার দাবি জানাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তলব করে ব্যাখ্যা চেয়েছে। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয় বলে আমরা মনে করি।

সরকার একতরফা নির্বাচনে কেন গেল? by আবদুল লতিফ মণ্ডল

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ও রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ৬ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর শেষে রাজধানীর এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাজনৈতিক সংকট নিরসনে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপে বসাতে পারাকে তিনি কিছুটা সাফল্য বলে মনে করেন। তাদের মধ্যে দু’দফা বৈঠক হয়েছে এবং তারা আরও বৈঠকে বসার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন। সংলাপের মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছানোর ব্যাপারেও তারা একমত হয়েছেন। সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্যের অবসান হবে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা করেন। তারানকোর মধ্যস্থতায় ১০ ও ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের গুলশানের বাসায় প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তারানকোর ঢাকা ত্যাগের পর দুই দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে তৃতীয় বৈঠকটি একই স্থানে নিল ওয়াকারের মধ্যস্থতায় ১৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলে ছিলেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, গণপূর্তমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধি দলে ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান ও ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বিএনপির পক্ষ থেকে চারটি প্রস্তাব দেয়া হয়। এগুলো হল- ‘নির্বাচনের বর্তমান তফসিল স্থগিত, দলীয় নেতা-কর্মীদের মুক্তি, নয়াপল্টনের কার্যালয় অবমুক্ত এবং সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।’ এসব শর্ত মানা হলে পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, প্রশাসন নিরপেক্ষকরণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে। আর আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বিএনপিকে হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে বলে। এ ছাড়া সারা দেশে জামায়াতে ইসলামীর নাশকতার বিরুদ্ধে বিএনপিকে দলীয় অবস্থান নেয়ারও প্রস্তাব দেয়া হয়। এসব প্রস্তাব নিয়ে নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনা করে তারা আবার বসবেন বলে জানান।
অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ঢাকায় আগমনের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিলে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২ ডিসেম্বর, প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের তারিখ ৫ ও ৬ ডিসেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৩ ডিসেম্বর এবং নির্বাচনের তারিখ ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্ধারণ করা হয়। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের তারিখ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। পত্রপত্রিকার খবর মোতাবেক বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১০৭ জন মনোনয়নপত্র জমাদানকারীর মধ্যে ৩৪০ জন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখের মধ্যে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় পার্টির (জাপার) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার নিয়ে। জাপার দেড়শ’ প্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ করা হলেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন সত্ত্বেও টেকনিক্যাল কারণ দেখিয়ে দলটির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরসহ কয়েকজনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ করেননি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা। তাই দলটির মুখপাত্র ১৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘উনাকে (এইচএম এরশাদকে) জোর করে এমপি বানিয়ে দেয়া হচ্ছে।’ রিটার্নিং অফিসারদের জারিকৃত গণবিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে ১৫ ডিসেম্বর পত্রপত্রিকার প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দাঁড়িয়েছে ১৫১ জনে এবং তারা হলেন আওয়ামী লীগ ১২৭, জাতীয় পার্টি-জাপা ১৮, জাসদ ৩, ওয়ার্কার্স পার্টি ২ এবং জাতীয় পার্টি-জেপি ১ জন। যেহেতু জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দলটির মনোনয়নপত্র জমাদানকারীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা থেকে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বলেন, সেহেতু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওই পার্টির নির্বাচিতদের বাদ দেয়া হলে বাকিরা মূলত মহাজোট সরকারের শরিক দলের।
সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমন বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনরা উদ্বেগ এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। দশম সংসদ নির্বাচনকে ‘তামাশা’ বলে মন্তব্য করেছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। তারা এই ‘একতরফা’ ও ‘পাতানো’ নির্বাচন অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, ‘নির্বাচনের নামে দেশে এটা তামাশা হচ্ছে।’ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান এ নির্বাচনকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে একাধিক ঠিকাদারের মধ্যে টেন্ডার ভাগাভাগির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন একটি হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া আরও অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এ নির্বাচনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন।
৫ জানুয়ারি ২০১৪-এ যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তার ফল জনগণ এখনই জানেন। ইতিমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের ফল প্রকাশিত হয়েছে এবং বাদবাকি আসনগুলোর ফলাফল সহজেই অনুমেয়। ধরে নেয়া যায়, আওয়ামী লীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনেই শুধু বিজয়ী হবে না, দুই-তৃতীয়াংশ আসনও পাবে। সংসদ হবে আওয়ামী লীগের শরিকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সর্বদলীয় সরকারে যারা যোগ দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি।’ তবে প্রশ্ন উঠেছে, ‘সমঝোতার ভিত্তিতে যে সংসদ তৈরি হচ্ছে, সেখানে যাকে খুশি ভোট দেয়ার অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে? নির্বাচনী মেকানিজমের মাধ্যমে একসময় যা হরণ করা হতো বলে প্রধানমন্ত্রী যথাযথভাবেই বর্ণনা করেছিলেন, এখনকার অবস্থা তা থেকে কী অর্থে ভিন্ন?’
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, দেড়শ’র বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর আলোচনা অব্যাহত থাকার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? সংলাপে উপস্থিত আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার বরাত দিয়ে ১৫ ডিসেম্বর যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নেতা নিশ্চিত করেছেন, নির্বাচনের আগে আর সংলাপ হচ্ছে না। তারা নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন। তারা বিএনপিকে জানিয়ে দিয়েছেন, তফসিল বাতিল করা সম্ভব নয়। তবে নির্বাচনের পর কী করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। বিএনপি একই সঙ্গে সংলাপ ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করলেও সরকার নির্বাচনের তফসিল স্থগিত না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কারণে এখন তারাও মনে করেন, সংলাপ ভেঙে গেছে। আর কোনো আলোচনা নয়। আন্দোলনের পথে যাওয়া ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর নেই। বিএনপি ১৭ ডিসেম্বর সকাল ৬টা থেকে ২০ ডিসেম্বর ভোর ৬টা পর্যন্ত টানা ৭২ ঘণ্টা নতুন করে অবরোধ ডেকেছে। এর আগে তিন সপ্তাহে তিন দফা অবরোধ করেছিল বিরোধী দল।
সমঝোতায় না গিয়ে সরকার একতরফা নির্বাচনের পথে এগুলো কেন?
এক. আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার কোনো সংকট সমঝোতার মাধ্যমে নিরসনের নজির খুব একটা নেই। ১৯৯৪ সালে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুললে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিরোধী দল সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে মতৈক্য না হওয়ার কারণে সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি বিএনপি একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদের নিজ দায়িত্বসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ এবং প্রশাসন দলীয়করণের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নবম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। আইন-শৃংখলার চরম অবনতি ঘটে। ফলে বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের সৃষ্টি হয়। এর পরের ইতিহাস সবার জানা।
দুই. বিভিন্ন জরিপে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থন এবং নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের সমূহ সম্ভাবনা ফুটে ওঠায় আওয়ামী লীগ বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কূট কৌশলের আশ্রয় নেয়। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য বিরোধী দলের দাবি পূরণে ক্ষমতাসীনরা নেয়নি কোনো পদক্ষেপ। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির প্রধান শর্ত নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়নি, যদিও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হবে বলে সংসদকে জানিয়েছিলেন এবং মহ

কাদের মোল্লার ফাঁসি আর আমাদের হাসি by বদিউর রহমান

অবশেষে কাদের মোল্লার ফাঁসি হল। এ ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় আমরা এক নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম। রাখে আল্লাহ মারে কে- এ বিশ্বাস অনেকের জন্য আরেকবার মজবুত হল বলা বোধ হয় দোষের হবে না। ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’র গান গেয়ে ফিরোজ সাঁই প্রমাণ করেছিলেন নিজের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে শেখ হাসিনাও বলতে পারেন ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’। তার বিপরীতে ‘মারে আল্লাহ রাখে কে’ কথাটি যদি এখন দেশ-বিদেশের উদাহরণ দিয়ে বলি তাহলে অনেকেই বড় অসন্তুষ্ট হবেন। তখন বলা হবে দুষ্কৃতকারী, পথভ্রষ্ট, ষড়যন্ত্রকারীদের কাণ্ড এটি, এমন মৃত্যু অপমৃত্যু। উপমহাদেশের এক সময়ের বড় তিন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুকে কি আমরা ‘মারে আল্লাহ রাখে কে’ বলব? জিয়াউর রহমান, জিয়াউল হক, রাজীব গান্ধী কিংবা ‘কোথায় সিরাজ সিকদার’- মৃত্যুগুলোকে কি মারে আল্লাহ রাখে কে বলতে পারব? আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না- সর্বশক্তিমানের ওপর অটুট বিশ্বাস থাকলে অদৃষ্টবাদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার আর অবকাশ থাকে না; তখন যা-ই কিছু ঘটে, সবকিছুকেই ওপরওয়ালা অর্থাৎ সর্বশক্তিমানের হুকুমে বলে চালিয়ে দেয়া যায়। তাই যদি অবিচল বিশ্বাস হয়, তবে তো রাখে আল্লাহ মারে কে অথবা মারে আল্লাহ রাখে কে- এ দুয়ের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না, তখন দুটোই একার্থক, সমার্থক এবং একই কথার দুটো প্রকাশভঙ্গি মাত্র। অনেক সময়ে বিকল্প দৃশ্যত বিকল্প মনে হলেও আসলে অর্থ বা মেসেজ একটিই। সহজ একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও সহজ হতে পারে। বাইরে ভীষণ বৃষ্টি, বেরোনো বড় কষ্ট, কিন্তু বাইরে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন হয়েছে। আবার একজনকে ঘরেও থাকতে হবে, এটাও বড় প্রয়োজন। বড় ভাই ছোট ভাইকে বললেন, একজনকে তো বাইরে যেতে হবে, একজনকে ঘরে থাকতে হবে। এখন আমি বিকল্প প্রস্তাব দিচ্ছি, তোর যেটা খুশি বেছে নে। আমি ঘরে থাকি, তুই বাইরে যা; অথবা তুই বাইরে যা, আমি ঘরে থাকি- কোনটা তোর পছন্দ? বুঝতেই পারছেন, যেই লাউ সেই কদু, নয় কি?
আমি বলি অদৃষ্টবাদ অনেক সময়ে শেষ ভরসা হয়। যখন নিজ যোগ্যতায় আমরা কোনো কিছু করতে সক্ষম হই না, যখন রাষ্ট্র আমাদের কোনো সুরক্ষা দিতে পারে না, যখন সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা বেঘোরে প্রাণ হারাই, যখন সহিংসতার আন্দোলনে ককটেলে কিংবা পেট্রল বোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে নিরীহ ব্যাংকার, টেম্পো বা বাসচালক/হেলপার মারা যায়, তখনও হয়তো আমরা বলব, মারে আল্লাহ রাখে কে। আইনের শাসন না থাকলে, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যক্তিস্বার্থে-ক্ষমতার লোভে দু’জনের হাতে বন্দি হয়ে পড়লে আমাদের আমজনতার ভাষ্য হবে- হয় রাখে আল্লাহ মারে কে, না হয় মারে আল্লাহ রাখে কে। কাদের মোল্লার বেলায় এবার ৪৬ ঘণ্টার আয়ু বৃদ্ধি আমাদের তা-ই স্মরণ করিয়ে দিল। সাঈদীকে যেমন চাঁদে দেখেছে তার কোনো ভক্ত, তেমনি কেউ হয়তো এখন বলবেন, কাদের মোল্লা আল্লাহর পেয়ারা বান্দা ছিলেন বিধায়ই তো মঙ্গলবার তার স্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছিলেন। কেন, আপনারা পরে টের পাননি সেই ভি চিহ্নের কী মাজেজা ঘটেছে? স্বরাষ্ট্র আর আইন প্রতিমন্ত্রীর ঢাকঢোল পেটানো সংবাদ সম্মেলনের সে কী ঘোষণা রাত ১২-০১ মিনিটে কাদের মোল্লার ফাঁসি হবে! মানুষ ভাবে এক, আল্লাহ করে আরেক, নয় কি? সব প্রস্তুতি নিয়েও কি ফাঁসি হল? হয়নি, কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে আ’লীগ নির্বাচনী ইশতেহার বেশ আগে থেকে প্রণীত থাকলেও ক্ষমতায় বসার পর এ বিচার নিয়ে আওয়ামী পাগলামি ঘটেছে যথেষ্ট। কেউ বলেছেন, এটা একটা প্রতীকী বিচার, দু’একজনের হলেই চলবে; কেউ পাল্টা বলেছেন, এ বিচার চলতেই থাকবে; আবার বিচারকার্য সমাধা নিয়ে কতজনের কত সময়-বাঁধা কথা! তার পরের স্কাইপি-এপিসোড তো আমাদের হাসালো, হায়রে বিচারের গুরুত্ব। ভালো, তারপরও তো বিচারপতি নিজামুল হক অবসরে যান না, পদত্যাগ করেন না, ট্রাইব্যুনাল থেকে চলে গেলেই যেন দায় শেষ আর কী! এবারও আমরা বলতে পারি, সবই আল্লাহর ইচ্ছা, তার হুকুম ছাড়া যে গাছের পাতাও নড়ে না। অতএব বিচারপতি নিজামুল হকেরই বা কী দোষ, সরকারের মন্ত্রীদেরই বা ত্র“টি কোথায়, আর আওয়ামী লীগের হম্বিতম্বির জন্য তাদেরই বা দোষ দেবেন কেন?
কাদের মোল্লার রায়ের কার্যকারিতা মঙ্গলবার (১০.১২.১৩) রাতে হঠাৎ থেমে গেল। চেম্বার বিচারপতি পরদিন অর্থাৎ ১১.১২.১৩ সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ফাঁসির রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন। পরের ঘটনা এবার সবাই জানলেন। অবশেষে রিভিউ আবেদন খারিজ হল, রায় কার্যকর হল। সরকার এবং আলী হয়তো নরম গলা উঁচিয়ে বলতে পারবে, তারা বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা অক্ষরে অক্ষরে মানেন। অবশ্যই বিলম্বে হলেও অর্থাৎ ৪৬ ঘণ্টা পরে হলেও সব প্রসেস শেষে ফাঁসি হওয়ার আলাদা একটা সুনাম সরকার এবং আলী পাবে, পেয়েছেও বটে। কিন্তু তা-ই যদি হবে, তবে আগের পাগলামিটা হল কেন? ওটা কি অযোগ্যতা, অদক্ষতা, নাকি অতিরিক্ত ফুটানির অপচেষ্টা ছিল? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি অবশ্যই কাম্য। যুদ্ধাপরাধীই বলা হোক, আর মানবতাবিরোধী অপরাধই বলা হোক, এটার বিচার নিয়ে বেশ ঢিলেমি হয়েছে। তা না হলে সরকারের পুরো মেয়াদের শেষ পর্যায়ে মাত্র প্রথম ফাঁসি কার্যকর হল কেন? আলী-সরকার কি শুরু থেকে দৃঢ়ভাবে মনোযোগী হলে সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যে দোষীদের বিচারের রায় কার্যকর করে যেতে পারত না? আমরা মনে করি, অবশ্যই পারত। তাহলে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, তবে কেন করা হল না? আমরা মনে করি, এ বিচার নিয়ে আলী তথা আলী-সরকার বেশ খেলেছে, তারা এ বিচারকে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য বেছে নিয়েছে। তাদের হয়তো ধারণা হয়েছে, অনেক ভালো কাজের পরও রাজনীতিতে অনেক সময়ে বড় ধরনের মার খেতে হয়, বিশেষত বাংলাদেশে তো এর কোনো তুলনাই হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ের পর চার্চিল আর ক্ষমতায় আসতে পারেনি; দেশ স্বাধীন করেও মুসলিম লীগ পরে ঘরে বসে গেছে; বাংলাদেশ স্বাধীন করেও সাড়ে তিন বছরের মধ্যে আলী একুশ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে গেছে। ’৯০-এর পর থেকে পালাক্রমে বাজাদ এবং আলী ক্ষমতায় এসেছে এবং ক্ষমতা হারিয়েছে। গত মেয়াদে আলী মূলত কয়েকজন গডফাদারের খেসারত দিয়েছে পুরের নির্বাচনে। একইভাবে বাজাদ তাদের দুর্নীতি আর হাওয়া-ভবনের ‘সুনামের’ সুনামিতে পড়েছে। এই-ই যখন অবস্থা, তখন রাজনীতির জন্য হাতের পাঁচ বা তুরুপের তাস ইশকাপনের টেক্কাটা তো হাতে রাখতে হয়, নাকি? আলী তার আগের মেয়াদে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যেমন শেষ করেনি, হাতে রেখে দিয়েছিল, এবারও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হাতে রেখে দিতে চেয়েছে। এবার যে বাজাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসতে চাইছে না, তার কারণও মূলত এ বিচার। আলী-সরকারের শুরু করে দেয়া এ বিচার বাজাদের গলার-কাঁটা বা ফাঁস হয়ে গেছে। সরকারে গেলে এ বিচার চালিয়ে না গেলে বাজাদের দ্রুত-পতন যেমন নিশ্চিত, আবার বিচার চালিয়ে গেলেও জামায়াত-শিবিরের চাপে বাজাদ চ্যাপটা হয়ে যেতে বাধ্য। অতএব আলীর ঝামেলা আলীই শেষ করুক- এমন কৌশলেই থাকতে চায় বাজাদ। আলীও সে সুযোগটা নিয়ে ধীরে চলো নীতিতে এগিয়েছে। একটি রায় কার্যকর করে আলী জনসমর্থনে যেমন আরও এগিয়ে গেল, তেমনি বিপরীত দিকে বাজাদকে আরও বেকায়দায় ফেলে দিল। এখন অন্য রায়গুলো কার্যকর করতে হলে আবার আলী-সরকারই দরকার।
ভোটের ফায়দা নেয়ার জন্য এ বিচার আলীর হয়তো হাতের পাঁচ, তুরুপের তাস কিংবা আমরা বলব, আলীর এ মেয়াদে এ বিচারের বড় অংশ শেষ করে অধিকাংশ রায় কার্যকর করে দিতে পারলে বরং আলীর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ত। ব্যবসায়ে ঝুঁকি নেয়া অনেক সময়ে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতে পারে বটে; কিন্তু প্রেম, যুদ্ধ কিংবা রাজনীতিতে বড় ঝুঁকি বড় ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারে বেশি। এসব ক্ষেত্রে হাতের একটা পাখি বনের দুটোর চেয়ে অবশ্যই উত্তম ভাবতে হয়। আলী এ বিচারের বিলম্বের কৌশলে বেশি লাভবান হবে ভাবার এখনও কোনো কারণ দেখা যায় না। রাজনীতি করার জন্য এ বিচারকে পুঁজি করা আলীর জন্য অবশ্যই বেমানান এবং জনগণের কাছে তা অগ্রহণযোগ্যও বটে। বিচার-প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্বের জন্য জনগণ আলীর সমালোচনায় মুখর। তারপরও আমরা আলী এবং আলী-সরকারকে সাধুবাদ দেব, একটা ভালো শুরু অধ-সমাপ্তের সমান (A good start is half-finishing)। এ বিচার নিয়ে আমরা যেন আর কোনো আওয়ামী-পাগলামি না দেখি, আমরা যেন বাকি রায়গুলো যথা দ্রুতগতিতে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই কার্যকর দেখতে পাই। মনে রাখা ভালো, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। আর কাদের মোল্লা তো ভাগ্যবান, এখন ফাঁসি হলেই বা ক্ষতি কোথায়, তিনি তো ৪২ বছর আরামে বেঁচেছিলেন! জনগণের হাসি আমরা দেখেছি, যুদ্ধাপরাধীদের আরও ফাঁসিতে আমরা প্রাণখুলে আরও হাসতে চাই, দেশটা আমাদের।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

দেশে রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এমনটি ঘটল by আকমল হোসেন

বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তাতে জনগণের কোনো অংশের পক্ষে স্বস্তিকর জীবনযাপন সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিয়ে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কাজকর্ম মিলে গিয়ে বর্তমানে মাত্রাহীন সংকটের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। বিশেষ করে গত তিন সপ্তাহ ধরে সন্ত্রাসী কাজের ফলে বিরাটসংখ্যক নিরীহ মানুষের জীবনহানি এবং দেশের অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ হামলা মানুষকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন নিয়ে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্যের শুরু পঞ্চদশ সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পর থেকে। পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতা এত তীব্র যে, এ দল দুটি কেউ কারও সমাধান নিয়ে আগ্রহী হয়নি। যার দরুন বিএনপি ও তার জোটবদ্ধ দলগুলো নানা সময়ে হরতাল-বিক্ষোভ সমাবেশ করে সরকারকে চাপ দিতে চেষ্টা করেছে। তবে এ বছরের শুরুতে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিচারের রায় ঘোষণা শুরু হলে ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।
এদিকে দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন আসন্ন হয়ে পড়ায় দেশের মানুষের ভেতর রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আকাক্সক্ষা প্রবল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন ও ভারতের রাষ্ট্রদূতদের দূতিয়ালির সঙ্গে এবার মার্কিন সরকারের সর্বোচ্চ মহল ও জাতিসংঘের মহাসচিবও বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। বিদেশীদের এভাবে আমদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু অতীতের মতো আমাদের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ক্ষমতালিপ্সার কারণে একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়টিতেও তারা কোনো সমাধান বের করতে না পারায় বিদেশী হস্তক্ষেপ অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে বিদেশীদের পরামর্শের দুটি মূল দিক ফুটে উঠেছে। এক. তারা চায় উভয় দলের মধ্যে সংলাপ থেকে সমাধান বের হয়ে আসুক, দুই. জাতীয় সংসদের নির্বাচন যাতে সবার (ইনক্লুসিভ) অংশগ্রহণে বিশ্বাসযোগ্য হয়। অন্যদিক যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টি সরকারের শক্তিশালী লবিংয়ে ব্যর্থতার জন্য স্পষ্ট না হওয়ায় কোনো কোনো দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রশ্নবিদ্ধ বিচারের অভিযোগ তুলেছে এবং মৃত্যুদণ্ড না দিতে আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, একমাত্র সরকারদলীয় জোটের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা এবং শেষ পর্যন্ত ১৫৪ জন প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া পুরো নির্বাচনকে একতরফা ও হাস্যকর করে তুলেছে। দু’দলের সংলাপও আর কোনো মূল্য বহন করছে না বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে।
এবারের বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রদূতদের অনুপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করছে। রাষ্ট্রদূতরা তাদের নিজ নিজ দেশ বা সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে কোনো দেশে নিযুক্ত থাকাকালে সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। এটি তাদের রুটিন দায়িত্ব। তাদের অনুপস্থিতি তাদের নিজ সরকার বা সংস্থার অনুমোদন ছাড়া হয়েছে বলে ধারণা করা যায় না। বর্তমানে একপক্ষীয় ও প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় সংসদের নির্বাচন ইউরোপীয় ইউনিয়ন পছন্দ করছে বলে মনে হয় না। তাই কূটনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন করেও তারা বিজয় দিবসের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকল।
ড. আকমল হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জনগণের অনুভূতির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন by আমেনা মহসীন

মহান বিজয় দিবসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতরা সাভারের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে না যাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হবে এটাই স্বাভাবিক। সাধারণত প্রতিবছর বিজয় দিবসে সাভারে স্মৃতিসৌধে সর্বস্তরের মানুষের পাশাপাশি বিদেশী রাষ্ট্রদূতরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে থাকেন। এটি রাজনৈতিক কোনো বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আÍউৎসর্গকারী মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যদের আÍত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু এবারে ইইউ’র রাষ্ট্রদূতরা বিশেষ কারণ দেখিয়ে সাভারের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি পালন করা থেকে বিরত থাকেন। তাদের এ আচরণ দুঃখজনক। ইইউর রাষ্ট্রদূতরা সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনে বিরত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ব্যাপারে ইইউ’র রাষ্ট্রদূতদের কোনো বক্তব্য থাকতেই পারে। কিন্তু এর সঙ্গে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আÍউৎসর্গকারীদের শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি গুলিয়ে ফেলা ঠিক হয়নি। তারা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। ইইউ’র রাষ্ট্রদূতদের উল্লিখিত আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সুস্পষ্ট লংঘন।
আমেনা মহসীন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিষ্টাচার বহির্ভূত by ফারুক চৌধুরী

বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতদের না যাওয়ার বিষয়টিকে আমি যে কোনো বিবেচনায় কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ বলে মনে করি। তাদের না যাওয়াটা যদি আমাদের বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি অসন্তোষ জানাতে গিয়ে হয়ে থাকে তাহলে আমি বলব, আমাদের স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস সংক্রান্ত যে কোনো অনুষ্ঠান সব রাজনীতির ঊর্ধ্বে। আমি এও বলব যে, এটা একটি নজিরবিহীন ঘটনা এবং আমাদের সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কাছে এ বিষয়টি উত্থাপন করা। অবশ্য আমি শুনেছি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা অপরাহ্নে মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভোরে সাভারে না গিয়ে তারা যে কূটনৈতিক অশিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে তারা দোষমুক্ত হতে পারছেন না। আমি আশা করব, আমাদের সরকার এ বিষয়ে আমাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করবে না। এক অর্থে, তাদের সাভারে না যাওয়াটা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর অবমাননা বলেও আমি মনে করি। আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে তাদের যদি কোনো অসন্তোষ থেকে থাকে, তা বোধগম্য। আমরা নিজেরাই আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায় এ নির্বাচনের সমালোচনা করে অনেক মন্তব্য প্রকাশ করেছি। ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই তা করা হবে। তবে আমি অবাকই হলাম যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা এমন একটি কাজ করলেন, যা একেবারে সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত হানবে। আমার নিজের অনুভূতিতে যেভাবে হেনেছে।
ফারুক চৌধুরী : সাবেক পররাষ্ট্র সচিব

ইইউ রাষ্ট্রদূতরা আমার বিজয় দিবসকে অপমান করেছেন by মহিউদ্দিন আহমদ

মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতদের সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভোরবেলার অনুষ্ঠান বর্জনের খবরটি আমাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। আমার ধারণা, ইইউ’র কয়েকজন রাষ্ট্রদূত সংঘবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে মহান এই দিনটির শুরুর অনুষ্ঠানটি বর্জন করেছেন; আর বর্জন করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ অনুষ্ঠানে প্রত্যাশিতভাবেই ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দেশের সব দল-মত-গোষ্ঠীর মানুষ। সাভারের এই স্মৃতিসৌধে পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো, জিয়াউল হক, পারভেজ মোশাররফ, বেনজির ভুট্টো, নওয়াজ শরিফসহ পাকিস্তানের সব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানও সম্মান জানিয়েছেন। কিন্তু যাননি ইইউ’র এই লোকগুলো। লাখো কণ্ঠে এদেশের মানুষ গত পরশু বিজয় দিবসে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছেন; প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আমাদের পতাকা মাথায় তুলে ধরে সম্মান জানিয়েছেন। কিন্তু সম্মান জানাননি ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূতদের কয়েকজন। সকাল পৌনে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়। ইইউ’র রাষ্ট্রদূতরা সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যেই তাদের অফিস-বাসায় ফিরে গিয়ে তাদের তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি শুরু করতে পারতেন। কিন্তু মনে হচ্ছে তারা ইচ্ছা করেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমাদের এই বিজয় দিবসটিকে অপমান করলেন। আর বাংলাদেশে যখন সকাল ৭টা, তখন ইউরোপে গভীর রাত- রাত ২টা বা ৩টা। ইইউ’র সদর দফতর ব্রাসেলসে স্থানীয় সময় রাত ৩টায় ঢাকা থেকে ইইউ’র রাষ্ট্রদূতদের সকালের বৈঠকের সিদ্ধান্ত-সুপারিশের জন্য কেউ সেখানে অপেক্ষা করছেন, বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বিকালে এই রাষ্ট্রদূতরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির বিজয় দিবসের সংবর্ধনায় যে উপস্থিত ছিলেন, তা কোনো সান্ত্বনার বিষয় হতে পারে না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রদূতদের দাওয়াত করলে রাষ্ট্রদূত অথবা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতরা সেসব অনুষ্ঠানে যাবেন, এটাই নিয়ম। বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক জীবনে তাই দেখেছি, তাই করেছি।
ইইউ’র এ কয়েকজন রাষ্ট্রদূতের এমন অশিষ্টাচারের কোনো কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে সরকারিভাবে দেখানো সম্ভব হবে না। তাই বেসরকারিভাবে এবং যতভাবে সম্ভব এই রাষ্ট্রদূতদের এমন অসদাচরণের নিন্দা জানানো দরকার। তাদের অনুপস্থিতি দ্বারা তারা আমাদের বিজয় দিবসকে ‘কনটেম্পট’ দেখিয়েছেন। আমাদের বেসরকারি প্রতিক্রিয়াগুলোর কয়েকটি এমন হতে পারে :
এক. আমাদের অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতরা যৌথ বা এককভাবে তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে নিন্দা জানাতে পারেন; দুই. আমাদের বিভিন্ন পেশার মানুষজন এই রাষ্ট্রদূতদের জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রদূতদের আগে লিখিতভাবে জানিয়ে বর্জন করতে পারেন; তিন. আমাদের মিডিয়া এই রাষ্ট্রদূতদের বয়কট করতে পারে। আমাদের কোনো কোনো মিডিয়া কোনো কোনো রাষ্ট্রদূতকে মিডিয়া-হাউসে দাওয়াত করে সম্মান দিয়ে থাকে। এই চিহ্নিত রাষ্ট্রদূতদের এমন সম্মান-মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে মিডিয়া-হাউসগুলো বিরত থাকতে পারে; চার. সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গণজাগরণ মঞ্চ এবং অন্যসব অরাজনৈতিক সংগঠন এই কয়েকজন রাষ্ট্রদূত এবং তাদের দূতাবাসের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, মিছিল-মানববন্ধন করতে পারে; বিশিষ্টজনরা এ নিয়ে লেখালেখি করতে পারেন। এমন অশিষ্ট আচরণ, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবসের প্রতি অবজ্ঞা, উপেক্ষার প্রতিবাদ ও নিন্দা আমাদের জানাতেই হবে। বিষয়টি আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টির নয়; বিষয়টি আপনার, আমার, আমাদের সবার।

সংস্কারে সম্মত ইংলাক

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংস্কার আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছেন। নাগরিক সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন পরবর্তী থাইল্যান্ডকে সংস্কার করার সম্ভাব্য পন্থা নিরূপণে তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর জেনারেল থানাসাক প্রতিমাপ্রকর্নর সঙ্গে ইংলাক বৈঠক করবেন কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। জেনারেল থানাসাক ইতিমধ্যে বিরোধী নেতা সুথেপ থাগসুবানের সঙ্গে একই ধরনের একটি আলোচনা সভা আয়োজন করেছেন। শনিবারের ওই বৈঠকে সুথেপ পুনরায় তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ইংলাকের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি অনির্বাচিত কাউন্সিলের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সুথেপ ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করলেও পরোক্ষভাবে জেনারেল থানাসাককে ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি জেনারেলকে বলেন, ‘দ্রুত যদি আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নেন দেশের মানুষ আপনাকে হিরো হিসেবে দেখবে আর আমরা উদ্ভূত সমস্যা সমাধান করতে পারব।’ বিক্ষোভকারীদের হয়ে সামরিক বাহিনী এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা তেমন কোনো ইঙ্গিত দেয়নি তারা। জেনারেল প্রতিমাপ্রকর্ন বলেন, উভয়পক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি এমন একটি সমাধানে আসতে হবে, যা পরিস্থিতিকে একই চক্রে যেন ফিরিয়ে নিয়ে না আসে। এছাড়াও তিনি আইন অনুযায়ী স্বচ্ছ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সোমবার ইংলাক সংসদের নিুকক্ষ ভেঙে দেন এবং চলমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানান। বিক্ষোভকারীরা এখনও তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগ। সুথেপ ও তার ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক রিফর্ম কমিটি’র প্রত্যাশা, নির্বাচনের আগেই রাজনীতি থেকে দুর্নীতি দূর করতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হোক। এদিকে থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অভিজিত ভিজাজিভাকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছে দেশটির একটি আদালত। হত্যার দায়ে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে। তিন বছর আগে রাজধানী ব্যাংককে জনতার ওপর সামরিক অভিযানের দায়ে বৃহস্পতিবার তাকে অভিযুক্ত করে আদালত।
অভিজিতের সমর্থকরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখিয়ে যখন দেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছেন তখন আদালতের এ রায় ঘোষিত হল। থাইল্যান্ডের অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতরের মুখপাত্র নানথাসাক পুনসুক বলেন, ‘আমরা তাকে (অভিজিতকে) অভিযুক্ত করেছি। আদালত তার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করতে সম্মত হয়েছে।’ আদালতের রুদ্ধদ্বার কক্ষে শুনানির পর এ সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। ২০১০ সালে ব্যাংককের রাস্তায় ইংলাকের ভাই ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থকদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ৯০ ব্যক্তি নিহত ও প্রায় দুই হাজার মানুষ আহত হয়েছিল। ‘লাল শার্ট’ আন্দোলনকারী হিসেবে পরিচিত থাকসিনের সমর্থকদের দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনী সে সময় তাজা গুলি ব্যবহার করে। বৃহস্পতিবার ডেমোক্রেট পার্টির নেতা অভিজিতকে যখন আদালতে আনা হয় তখন লাল শার্ট আন্দোলনকারীদের একটি দল তাকে উদ্দেশ করে ‘খুনি’ বলে স্লোগান দেয়। এ সময় আদালত চত্বরে গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত থাকলেও ভিজাজিভা তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। সরকারি আইনজীবীরা ভিজাজিভা ও তার উপ-প্রধানমন্ত্রী সুথেপ থাগসুবানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে হত্যা ও হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগ এনেছেন। তবে অভিজিত ভিজাজিভা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি নির্দোষ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকার পার্লামেন্টের আস্থাভোটে জয়ী হয়। তারপরও অভিজিতের সমর্থক সরকারবিরোধীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে গেলে ইংলাক পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তাতেও সরকারবিরোধীরা ঘরে ফিরে না যাওয়ার পর অভিজিতের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হয় সরকার। তথ্যসূত্র : আলজাজিরা।
 

চার বছরেই আইনস্টাইন!

ব্রিটেনে চার বছরের এক শিশুর আইকিউ প্রখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সমমানের বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই আইকিউ পরীক্ষাতে সে ১৬০ স্কোর অর্জন করেছে। দক্ষিণ ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা শেরওয়েন শারাবি এ ধরনের চমকপ্রদ স্কোর করে মনোবিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
ডেইলি এক্সপ্রেস এক রিপোর্টে জানিয়েছে, তার এ আইকিউ স্কোর আইনস্টাইন, বিলগেস এবং স্টিফেন হকিংয়ের সমপর্যায়ের। অবশ্য আইনস্টাইনের আইকিউ কখনই পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। কারণ এটি পরিমাপ করার বিষয়টি এসেছে তার মৃত্যুর অনেক পরে। তবে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, তার আইকিউ হয়তো ১৬০-এর কাছাকাছি ছিল। শেরওয়েন ইতিমধ্যেই মেনসা ক্লাবের সদস্যপদ অর্জন করেছে। তিন বছর বয়সেই সে জিনিয়াস ক্লাবের সদস্যপদ অর্জন করে। মাত্র ১০ মাস বয়সে প্রথম কথা বলে সে প্রথমে বাবা-মাকে চমকে দিয়েছিল। মাত্র ২০ মাস বয়সেই সে পূর্ণবাক্য বলতে শিখেছিল বলে জানা গেছে।