Thursday, June 26, 2025

জোহরান মামদানি যেভাবে ইতিহাস বদলে দেওয়ার পথে by ওমর কায়সার

২৪ জুন রাত। নিউইয়র্কের জ্যামাইকার মুসলিম সেন্টারের সামনে মানুষের জটলা। তরুণ, যুবক ও বয়স্ক মানুষও আছেন। সবাই উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত। কয়েক দিন ধরে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন তাঁরা। সেই চিন্তার অবসান হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনের প্রাথমিক পর্বে তাঁদের প্রার্থী জোহরান মামদানি জয়ী হয়েছেন। তাঁদের এত দিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।

কিছু দিনের জন্য সন্তানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি। আছি নিউইয়র্কেই। ফলে নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনের এই উত্তাপ ও উত্তেজনা দেখার সুযোগ হলো। এবারের সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা তৈরি করেছিলেন জোহরান। ধীরে ধীরে বিশ্ব মিডিয়ায় শিরোনাম হয়ে যান তিনি। এখন তো নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হওয়ার একেবারেই দ্বারপ্রান্তে তিনি। মুসলিম কাউকে এ প্রথম মেয়র হিসেবে পেতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ শহর।  

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে কথা বললাম। তাদের বিশাল একটি অংশ জোহরান মামদানিকেই সমর্থন দিয়েছেন। জোহরানের প্রায় নিশ্চিত বিজয় নিয়ে তাদের ভাবনা কী?

জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ও জেনারেল সেক্রেটারি মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা আফতাব উদ্দিন মোহাম্মদ মান্নান বলেন, ‘খুব ভালো লাগছে। আমরা সবাই এই বিজয়ের অংশীদার। এর মাধ্যমে একটি নতুন ইতিহাস রচিত হলো। জোহরান মামদানি একজন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট এবং বর্তমানে একজন সিটি কাউন্সিলর। আমরা তাঁর পক্ষ নিয়েছি। কারণ, তিনি সব সময় ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁদের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে আসছেন। তিনি ন্যায়ের পক্ষে। নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ৪০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করেছেন। মেয়র প্রার্থী হিসেবে তাঁর অঙ্গীকারগুলোও আমাদের আকৃষ্ট করেছে।

তিনি পরিচ্ছন্ন সাবওয়ের কথা বলেছেন। সবার জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করার কথাও বলেছেন এবং নিউইয়র্কের শ্রমজীবী মানুষের জন্য বেতন বাড়ানোর বিষয়টিকে তিনি খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন বলেও অঙ্গীকার করেছেন। এসব চিন্তা এখানকার মুসলমানদের আকৃষ্ট করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি একজন ভালো মুসলিম, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা উচ্চশিক্ষিত আইনজীবী ও তাঁর বাবা হার্ভার্ডের শিক্ষক।’

আফতাবের কথায় নিউইয়র্কের মুসলমান সম্প্রদায়ের কথার প্রতিফলন ঘটেছে। জোহরান মামদানি নামটি কয়দিন আগেও আমার কাছে অপরিচিত ছিল। বাংলাদেশে তাঁর নাম আগে শুনিনি। কিন্তু আফতাবের কথায় বুঝলাম, জোহরান এখানে খুব জনপ্রিয় এবং এখানকার রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী। প্রাথমিক পর্বে তাঁর জয় এখানকার রাজনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত চিহ্নিত হচ্ছে। এটি যেন এখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি নীরব বিপ্লব।

জোহরান মামদানির বিজয়কে কেন এত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন মুসলমানরা? কেন একে মাইলফলক ভাবছেন? তার বেশ কয়েকটি কারণ আছে। প্রধান কারণ হলো, তিনি একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তিনি একজন মুসলমান ও প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ। এমন পরিচয়ের একজন মানুষ নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হতে চলেছেন, মানে একটি বিশ্বখ্যাত মহানগরের শীর্ষ পদে আসীন হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ রকম আগে কখনো ঘটেনি। এবারই প্রথম। আর এ ঘটনা শুধু নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতি নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে। মার্কিন রাজনীতি ও সামাজিকভাবে মুসলমানদের একটা স্বস্তি ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে অনেকের ধারণা।

নাইন–ইলেভেনের পর থেকে মার্কিন সমাজে মুসলমানেরা ‘সন্দেহভাজন’ হয়ে দিন যাপন করছে। মুসলমানেরা হয়ে উঠেছে আতঙ্কের মতো। মুসলিম পরিচয়টাই যেন হয়ে উঠেছিল একটি উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার বিষয়। সেই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সন্দেহের দেয়াল ভেঙে সামনে এগিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সমাজ। তাদের এগিয়ে যাওয়া প্রথম প্রত্যক্ষ করা গেছে দুজন নারীর মাধ্যমে। তাঁরা হলেন মিনেসোটার ইলহান ওমর ও মিশিগানের রাশিদা তালিব। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রথম মুসলিম নারী সদস্য রাশিদা তালেব ও ইলহান ওমর। তাঁরা দুজনই ২০১৯ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাশিদা তালেব মিশিগান থেকে এবং ইলহান ওমর মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত হন।

দুজনই মার্কিন কংগ্রেসে মুসলিম নারীদের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন। তাঁদের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।

মামদানির বিজয়ও এ রকম একটি বড় ঘটনা হতে চলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, মামদানির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা রাজনৈতিক ভাবনাগুলো শুধু তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষকে ঘিরে বিকশিত হয়নি। তিনি উদারনৈতিক মানুষ। তাঁর পরিচয় বা কর্ম শুধু নিজের ধর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। মুসলমানদের জন্য আলাদা কোনো কর্মসূচি বা এজেন্ডা তাঁর নেই। তিনি নিউইয়র্ক সিটির সব মানুষের সাধারণ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন, যেমন বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা, পুলিশের সংস্কার করা, জলবায়ু ন্যায়বিচার ইত্যাদি। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় এগুলোই প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। এ জন্য তিনি শুধু মুসলমানদের প্রতিনিধি নন, সব নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আর এ রকম মনোভাবই তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে বলে এখানকার ভোটারদের বিশ্বাস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি প্রবাসী বলেন, শুধু নিজের সম্প্রদায়গত চিন্তা আর কর্মকাণ্ড দিয়ে মানুষ নেতা হতে পারেন না। মামদানি সেটা করেননি বলেই, নিজের গণ্ডির বাইরে চিন্তা করেছেন বলেই তিনি এগিয়ে গেছেন। তিনি আরও বলেন, একটা সময় ছিল এখানে মুসলমানরা ভোটার হিসেবে উপেক্ষিত ছিল। সেই মুসলমানরা এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসছে। এটা কম কথা নয়।

মামদানির বিজয় এখানকার মুসলমানদের জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো, আটলান্টা, ডেট্রয়েট, হিউস্টনের মতো বিশাল সিটিগুলোয় মুসলিম তরুণেরা উৎসাহিত হচ্ছেন। তাঁরা স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে রাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন। ফলে সামাজিক হীনম্মন্যতা মুছে তাঁরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

আগামী ৪ নভেম্বর চূড়ান্ত অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে জোহরান মামদানি লড়বেন ও জিতে আসবেন—এ ব্যাপারে বিশ্লেষকেরা প্রায় নিশ্চিত। তাঁর এ বিজয় শুধু একজনের বিজয় নয়, এতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এটি শুধু রাজনৈতিক বিজয় নয়, মুসলমানদের প্রতি এখানকার সমাজের আস্থার পুনর্নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তরও রচিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে।

* ওমর কায়সার, প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক

জোহরান মামদানি
জোহরান মামদানি

জোহরান মামদানির নিউইয়র্ক জয় যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনপন্থী রাজনীতিকে চাঙা করছে

নিউইয়র্ক সিটি নিয়ে সাহসী সব পরিকল্পনা রয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টির মেয়র পদপ্রার্থী জোহরান মামদানির। তিনি নগর কর্তৃপক্ষের মালিকানায় মুদিদোকান চালু, আরও বাড়ি নির্মাণ ও বাসের ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করতে চান। আরও চান ভর্তুকিপ্রাপ্ত ভাড়াটেদের জন্য বাড়িভাড়া বৃদ্ধি স্থগিত করতে।

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিকে সামনে রেখে মামদানির প্রতিদ্বন্দ্বীরা ও কিছু গণমাধ্যম ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে তাঁর অবস্থানের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

মামদানি ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় সরব কণ্ঠস্বর। তিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নিপীড়নের নিন্দা জানিয়েছেন এবং গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে গণহত্যা হিসেবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের সঙ্গেও একমত পোষণ করেছেন।

ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে মামদানির এ অবস্থান নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীরা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও নিজের অবস্থান থেকে একচুল পিছু হটেননি তিনি এবং ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোকে হারিয়ে অভাবনীয় জয় পেয়েছেন। স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য মামদানি এখন ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র প্রার্থী।

মামদানির সমর্থকদের মতে, তাঁর এ জয় হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন বাঁকের সূচনা, যা এটিই দেখিয়েছে যে প্রগতিশীল নীতিমালা ও ফিলিস্তিনের অধিকারকে সমর্থন দিয়েও নির্বাচনে সফল হওয়া সম্ভব।

প্রগতিশীল সংগঠন জাস্টিস ডেমোক্র্যাটসের মুখপাত্র উসামা আন্দ্রাবি বলেন, ‘এটি একটি বড় ঘটনা। যাঁরা সত্যিকারের প্রগতিশীল এবং ধনকুবের ও করপোরেট অর্থায়নে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রচার সংস্থার বিরুদ্ধে শ্রমজীবী শ্রেণিকে একত্র করতে প্রস্তুত, কিন্তু গণহত্যার মতো বড় বিষয় নিয়ে কোনো ছাড় দেন না, তাঁদের সাফল্য কেউ আটকাতে পারবে না।’

ঐতিহ্যগতভাবে নিউইয়র্কে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। তাই দলীয় প্রার্থী হিসেবে মামদানির নভেম্বরের মেয়র নির্বাচনে সহজ জয় পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

‘ফিলিস্তিন বিষয়ে তিনি একচুলও পিছু হটেননি’

ডিজিটাল মিডিয়ায় দক্ষ, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও অমায়িক স্বভাবের ৩৩ বছর বয়সী তরুণ মামদানি নিউইয়র্কের রাস্তায় তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারণা ও ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজ সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন।

গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর মামদানি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক, যাঁরা ভোট দেননি এবং যাঁরা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশা প্রকাশ করেছেন—এমন সব ধরনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর তিনি তাঁদের সামনে নিজের রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি যে ভিডিও তৈরি করেন, তাতে দেখা যায়, তাঁদের কেউ কেউ বলেন যে তাঁরা মেয়র পদে মামদানিকে সমর্থন করবেন।

মামদানির সমর্থকদের মতে, তিনি স্বেচ্ছাসেবীদের একটি বিশাল বাহিনী গড়ে তুলতেও সফল হয়েছেন। তাঁরা লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের দরজায় দরজায় গিয়ে মামদানির পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন।

সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের সমাজবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হিবা গোয়ায়েদ বলেন, অনেক তরুণ জোহরান মামদানির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এবং ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কারণে মূলত তাঁর প্রচারে যুক্ত হয়েছেন।

গোয়ায়েদ আল–জাজিরাকে আরও বলেন, ‘ফিলিস্তিন বিষয়ে নিজের অবস্থান থেকে তাঁর (মামদানি) একচুলও পিছু না হটা এক বিরাট বিষয়। তা–ও এমন এক পরিবেশে, যেখানে বলা হতো, এ অবস্থান নেওয়া রাজনীতিতে ব্যর্থতার কারণ হবে। কিন্তু এ আন্দোলন (মামদানির প্রচার) শুধু সেই মতটা জোর দিয়ে বলেইনি, বরং পুরো আন্দোলনই ওই মতের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।’

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘যদি মামদানি সমালোচকদের খুশি করতে নিজের অবস্থান বদলে ফেলতেন, তাহলে যে সমর্থন আর উদ্দীপনা তাঁকে জেতাতে সাহায্য করেছিল, সেটা হারিয়ে ফেলতেন। কিন্তু তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি যে সমর্থন দেখিয়েছেন, তা সম্ভবত তাঁর প্রচারকে আরও শক্তিশালী করেছে।’

ডেমোক্র্যাট প্রাইমারি নির্বাচনে জয়ের খবরে সমর্থকদের সঙ্গে উল্লাস করছেন জোহরান মামদানি। ২৫ জুন ২০২৫
ডেমোক্র্যাট প্রাইমারি নির্বাচনে জয়ের খবরে সমর্থকদের সঙ্গে উল্লাস করছেন জোহরান মামদানি। ২৫ জুন ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

গাজায় আগ্রাসনে নেমে নিহত সাত ইসরায়েলি সেনা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় হামাসের হামলায় সাত ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।

বুধবার (২৫ জুন) ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। গত কয়েক মাসের মধ্যে এটি ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য অন্যতম ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা।

নিহত সেনারা সবাই ৬০৫তম কমব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সদস্য ছিলেন। মঙ্গলবার (২৪ জুন) খান ইউনিস এলাকায় তারা একটি সামরিক যান নিয়ে টহল দিচ্ছিলেন।

এ সময় হামাস যোদ্ধারা তাদের গাড়িতে বোমা পেতে রাখে, যার বিস্ফোরণে গাড়িটি আগুন ধরে পুড়ে যায় এবং সাতজন সেনারই মৃত্যু হয়। ঘটনার দায় স্বীকার করেছে হামাস। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী দল ও হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছিল; কিন্তু সেনাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, নিহত সেনারা ওই এলাকায় হামাসের সুড়ঙ্গ ও অবস্থান লক্ষ্য করে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল। উল্লেখ্য, ৭ অক্টোবর ২০২৩ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে নিহত সেনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭৯ জনে।

অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, ৭ অক্টোবরের পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ৫৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক।

এ ছাড়া মঙ্গলবার গাজায় খাদ্য সহায়তা নিতে আসা আরও অন্তত ৪০ ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরিচালিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) নামক একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম চলাকালে এই হামলা হয়।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে, জিএইচএফের কার্যক্রম নিরপেক্ষতা ও মানবিক নীতিমালার পরিপন্থি এবং এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিলেন গাজায়ও হয়তো শান্তি ফিরবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমাদের ইরানে চালানো হামলা গাজা যুদ্ধের আলোচনায় একটি শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে। আশা করি ভালো কিছু হবে।

তবে ইসরায়েল সরকার এখনো গাজায় যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে নয়। কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ দাবি করেছেন, আরও দুই মাস সময় পেলেই আমরা হামাসকে সম্পূর্ণ পরাজিত করতে পারি।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে যুদ্ধবিরতির দাবি জোরালো হচ্ছে। পার্লামেন্ট সদস্য মোশে গাফনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি এখনো বুঝতে পারছি না কেন আমরা এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এখানে ট্রাম্পের মতো কেউ দরকার, যে এসে বলবে—‘ঠিক আছে, এবার শেষ।’

প্রসঙ্গত, গাজায় এখনো প্রায় ৫০ ইসরায়েলি জিম্মি অবস্থায় রয়েছে, যাদের মধ্যে ৩০ জনের জীবিত থাকার সম্ভাবনা কম। সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির খসড়ায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, বেঁচে থাকা জিম্মিদের অর্ধেক এবং মৃতদের দেহ ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব ছিল, তবে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। 

ছবি : সংগৃহীত

ট্রাম্পের ‘সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন’ জোহারান মামদানি

নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতিতে জোহারান মামদানির উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা টানা শুরু হয়ে গেছে। এর কারণ শুধু তাঁদের বিপরীতমুখী আদর্শের জন্য নয়, বরং মামদানি নিজেই তাঁর প্রচারকে ট্রাম্পের ধারার রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

মামদানি ঘোষণা করেছেন, ‘আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন—একজন প্রগতিশীল মুসলিম অভিবাসী, যে সত্যিকারের বিশ্বাস থেকে লড়ে।’ এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, মামদানির প্রার্থিতা ট্রাম্পের রাজনীতির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ—যা গত কয়েক বছরে জাতীয় ও নগর রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

এই তুলনাটা কেবল কথার তুলনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মামদানির জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তৃণমূল-ভিত্তিক প্রচারাভিযান প্রচলিত ধারাকে ভেঙে দিয়েছে। ট্রাম্পও এভাবে প্রচলিত ধারাকে ভেঙেছিলেন। তবে মামদানির বার্তা ও সমর্থক জোট ট্রাম্পের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

নিউইয়র্ক সিটির সবচেয়ে কনিষ্ঠ এবং প্রথম মুসলিম মেয়র হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জোহারান মামদানি শুধু তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের জন্যই নয়, বরং তাঁর স্বল্প আর্থিক অবস্থা এবং ব্যতিক্রমধর্মী পারিবারিক পটভূমির কারণেও জাতীয় পর্যায়ে দৃষ্টি কেড়েছেন।

জোহারান মামদানির সম্পদ

ফোর্বস এবং সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ বছর বয়সী মামদানির মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ডলারের মধ্যে। তাঁর এ সম্পদ ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেক মার্কিন রাজনীতিকের বিপুল সম্পদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

মামদানির প্রধান আয়ের উৎস হলো নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে পাওয়া বাৎসরিক ১ লাখ ৪২ হাজার ডলারের বেতন। এর পাশাপাশি তিনি অতীতে ‘ইয়াং কার্ডামন’ নাম নিয়ে র‌্যাপ সংগীত করতেন, সেখান থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ২৬৭ ডলারের রয়্যালটি পান। মামদানি উগান্ডার জিনজা শহরে চার একর জমির মালিক, যার মূল্য প্রায় দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ ডলারের মধ্যে। তবে তাঁর উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবসায়িক মালিকানা বা বিনিয়োগ নেই।

মামদানি জন্মগ্রহণ করেন উগান্ডায়। তাঁর বাবা প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ মাহমুদ মামদানি—হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মা মীরা নায়ার, একজন খ্যাতনামা ভারতীয়-মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা। প্রায় ২৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে কুইন্স এলাকা থেকে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন।

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র হওয়ার লক্ষ্যে তাঁর প্রচারাভিযান পরিচালিত হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের অনুদানের ভিত্তিতে। এ পর্যন্ত তিনি ৭০ লাখ ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছেন ১৬ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিগত দাতার কাছ থেকে, যাঁদের অধিকাংশই দিয়েছেন ছোট অঙ্কের অনুদান—যা কর্মজীবী, অভিবাসী ও প্রগতিশীল জনগণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা তুলে ধরে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিজীবন ও বিপরীত অবস্থানে মামদানির রাজনীতি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রয়েছে বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ, আবাসন বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ও বহু দশকের বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে আজীবন নিউইয়র্কের বাসিন্দা ট্রাম্প তাঁর আর্থিক অবস্থান ও তারকাখ্যাতিকে ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক পরিচয় ও নীতিগত অগ্রাধিকারের রূপদান করতে।

যেখানে ট্রাম্পের সম্পদ আনুমানিক কয়েক বিলিয়ন ডলারের, সেখানে মামদানির আর্থিক তথ্য একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে—একজন প্রার্থী যার আর্থিক সক্ষমতা ব্যক্তিগত ব্যবসা বা উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত নয়, বরং গড়ে উঠেছে জনসেবা ও সম্প্রদায়ের সহায়তার মাধ্যমে।

ট্রাম্প ও জোহরান মামদানির নীতিগত পার্থক্যও ততটাই তীক্ষ্ণ। মামদানি বাড়িভাড়া জমার হার বন্ধ রাখা, বিনা মূল্যে গণপরিবহন, সম্প্রসারিত সামাজিক আবাসন এবং ধনীদের ওপর অধিক কর আরোপ করে জনসেবা উন্নয়নের পক্ষে। এসব নীতিই ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ শিথিল, পুলিশিং, এবং ধনীদের করছাড়-কেন্দ্রিক নীতির সরাসরি বিপরীতে অবস্থান করে।

মামদানির রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং সংহতির বার্তা; অন্যদিকে ট্রাম্পের ভাষ্য ঘুরে ফিরে এসেছে বহিষ্কার, সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রগতিশীল সংস্কারগুলোর বিপরীতে অবস্থানে।

মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচক হিসেবেও মামদানিকে চেনা যায়—বিশেষত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে। বিপরীতে, ট্রাম্প বরাবরই কট্টরপন্থী ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থানে থেকেছেন।

ট্রাম্প ও মামদানির রাজনৈতিক লড়াই শুধু নীতিমালার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রচারের সময় নিউইয়র্কে ট্রাম্পপন্থী কয়েকজন, যার মধ্যে রয়েছেন রিপাবলিকান কাউন্সিলর ভিকি পেলাডিনো, খোলাখুলি মামদানিকে দেশচ্যুতির দাবি করেন—যা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যক্তিগত ও আদর্শগত তীব্রতাকে আরও স্পষ্ট করে। মামদানি জবাব দিয়ে বলেন, ‘মৃত্যু হুমকি। ইসলামভীতির বৈষম্য। এখন বসে থাকা একজন কাউন্সিলর যে আমার দেশচ্যুতি চান। যথেষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প এবং তাঁর অনুগতরা এরকমই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। এটা আমাদের শহর ও সংবিধানের মূল্যবোধের ওপর আক্রমণ।’

তথ্যসূত্র: ইকোনোমিক টাইমস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্ক সিটির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী জোহারান মামদানি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্ক সিটির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী জোহারান মামদানি।

ইরানে ইসরায়েল যেভাবে ধরা খেল by অরি গোল্ডবার্গ

ইরানে টানা ১১ দিন বোমাবর্ষণ করে ইসরায়েল কী অর্জন করল? যুদ্ধবিরতি ঘোষণা দেওয়ার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইসরায়েলি লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর এই দাবি যে সমস্যাজনক, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

এই স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু দুটি লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছিলেন। এক. ইরানের পরমাণু কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়া। দুই. ইরানে শাসনব্যবস্থার বদল।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কি গুঁড়িয়ে দেওয়া গেল? উত্তরটা হবে, না। এটা মনে হচ্ছে যে ফর্দো পারমাণবিক স্থপানায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর আগেই সেখান থেকে ফিউশনযোগ্য বা বিভাজ্য পদার্থ সরিয়ে নিয়েছিল। ইউরেনিয়ামের এ মজুতই ইরানের হাতে থাকা পারমাণবিক কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যটি ব্যর্থ হয়েছে।

ইসরায়েল হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির যদি কোনো ক্ষতি করে থাকে, সেটা আসলে কী? এ প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বাংকার বাস্টার বোমা দিয়ে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে সক্ষম হয় ইসরায়েল। কিন্তু এর বাইরে এ আক্রমণ অভিযানে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেয়েছে খুব সামান্য।

ইরান যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করা কঠিন।

ইসরায়েল কি ইরানে ‘সরকার পরিবর্তন’ ঘটাতে পেরেছে? এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, উল্টো ফলটাই বেশি হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থায় নেতৃত্বে থাকা সামরিক নেতাদের হত্যা করে ইসরায়েল চেয়েছিল দেশটির শাসক দলের বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থান উসকে দিতে। এ কৌশল এসেছে ইসরায়েলিদের সেই দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে তারা মনে করে, শত্রুরাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার সেরা উপায় হলো জ্যেষ্ঠ নেতাদের হত্যা করা।

কিন্তু এ কৌশল কখনোই কাজ করেনি। একমাত্র সম্ভাব্য ব্যতিক্রম হতে পারে লেবাননে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহর হত্যার প্রভাব। তবে হিজবুল্লাহর দুর্বল হওয়ার পেছনে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। অন্য সব ক্ষেত্রে নেতৃত্বকে নিকেশ করে দেওয়ার ইসরায়েলি এ কৌশল বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানের ক্ষেত্রেও ইসরায়েলি এ কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডে সরকারের প্রতি ইরানি জনগণের সংহতি জোরালো হয়েছে। ইসরায়েল ইরানিয়ান রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যা করে। আইআরজিসি সম্ভবত ইরানি রাজনীতির ক্ষমতাধর শক্তি। একই সঙ্গে ইরানি জনগণ সবচেয়ে ঘৃণা করে, এমন একটি সংস্থা আইআরজিসি।

তা সত্ত্বেও অনেক ইরানি, যাঁরা ইসলামিক রিপাবলিক ও বিশেষ করে আইআরজিসির কট্টর বিরোধী, তাঁরাও ইসরায়েলের হামলার পর সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন। ইরানিরা ইসরায়েলের এ হামলাকে সরকারের ওপর হামলা নয়, গোটা ইরানের ওপর শত্রুর আক্রমণ হিসেবে দেখছেন।

ইরানি ‘শাসকদের প্রতীকগুলোতে’ ইসরায়েলি বোমা হামলা কেবল পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। এভিন কারাগারে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। রাজনৈতিক বন্দীদের দমন-পীড়নের জন্য এ কারাগারের কুখ্যাতি আছে। ইসরায়েল কারাগারটিতে হামলা চালিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের সংগ্রামে সহায়তা দিতে চেয়েছিল। অথচ বাস্তবে এ হামলার ফলে বন্দীদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়েছে। কেননা কর্তৃপক্ষ অনেক বন্দীকে অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।

তেহরানে ‘ইসরায়েল ডুমসডে ক্লকে’ (এই ডিজিটাল ঘড়ি ইসরায়েলকে ধ্বংসের জন্য ইরানি প্রতিশ্রুতির প্রতীক বলে মনে করা হয়) বোমা হামলাটি ছিল নিতান্তই হাস্যকর।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারকেন্দ্র আইআরআইবিতে ইসরায়েলের বোমা হামলাও ছিল একেবারে উদ্ভট। ইসরায়েল দাবি করেছিল, ইরানি শাসকদের প্রোপাগান্ডা প্রচারের চেষ্টা রুখে দিয়েছে। এ বোমা হামলার পর অনেক ইসরায়েলি বলেছিলেন, এটি ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানকে ন্যায্যতা দেবে।

ইসরায়েল যদি এর ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন না-ই করতে পারে, তাহলে অন্তত বিশ্বজনমতকে কি তার পক্ষে টানতে পেরেছে? এটা সত্য যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এ হামলার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক আইনের কয়েকটি গুরুতর নিয়ম লঙ্ঘন করেছে।

এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। যা–ই হোক, ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প যুদ্ধে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু হামলার পরই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার আগে ও পরে ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তির বিষয়ে তাঁর আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন। সেখানে ইসরায়েলকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে সহায়তা করেন তাঁর নিজের এবং উপসাগরীয় মিত্রদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে।

বিশ্বের বেশ কয়েকজন নেতা (সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসে) খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সমর্থন করেন। একই সঙ্গে তাঁরা ‘ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারে’ সমর্থন দেন। কিন্তু তাঁদের কেউই ইসরায়েলের কঠোর দাবির তালিকা গ্রহণ করেননি। ইসরায়েল যেসব দাবি করেছিল, এর মধ্যে ছিল ইরান যেন একেবারেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে না পারে।

বিশ্ব আবার ‘কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়’, সেই নীতিতে ফিরে গেছে। ইরান এরই মধ্যে এ নীতি মেনে চলার ব্যাপারে আগ্রহী বলে জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের কার্যকর উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইরানকে বিশ্বব্যবসার জন্য একটি বৈধ অংশীদার হিসেবে মনে করছে। এটি ইসরায়েলের জন্য একটি পরাজয় এবং ইরানের জন্য একটি বিজয়।

ইসরায়েলের একেবারে কেন্দ্রে যে বাস্তব ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এই যুদ্ধে ইসরায়েল খুব দ্রুতই ইরানের আকাশসীমায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং প্রায় ইচ্ছেমতো হামলা চালাতে পেরেছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বারবার ইসরায়েলের সুপ্রসিদ্ধ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে বারবার তেল আবিব, জেরুজালেমসহ একেবারে কেন্দ্রে এবং দেশের সর্বত্র আঘাত হানতে সক্ষম হয়। ইরানের এ হামলায় গোটা ইসরায়েল কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

নজিরবিহীন হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। ইসরায়েলের প্রতিরোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছিল, খুব দ্রুত সেই শূন্যস্থান পূরণের আশা ছিল না। অর্থনীতি দ্রুত ভেঙে পড়ার মুখে পড়ে। এটি ইরানের জন্য আরেকটি বিজয়।

ইরান যুদ্ধের ক্ষত ও বোমা হামলার মধ্য দিয়ে নতুন ইরানের জন্ম হয়। শত শত মানুষের প্রাণহানি এবং নির্বিচার বোমা হামলায় ইরানের ক্ষয়ক্ষতি ছিল বাস্তব। কিন্তু শক্তিশালী ইসরায়েলি বাহিনীর মুখোমুখি হয়েও ইরান মাথা নত করেনি।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলিদের বাড়িঘরে আঘাত হেনেছে। কিন্তু তাতে ইরানের ভাবমূর্তিতে একটুও আঁচড় লাগেনি। কেননা বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ ইরানকে ইসরায়েলের আক্রমণের ভুক্তভোগী হিসেবে দেখেছে। ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগগুলো তাই তীব্রভাবে বাধাগ্রস্ত হয়নি।

কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে প্রতিশোধমূলক হামলার কথা আগে থেকেই সতর্ক করে ইরান খুব সফলভাবে উত্তেজনা প্রশমন করতে পেরেছে।

ইরান যথেষ্ট শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পেরেছে। ফলে ট্রাম্প ইসরায়েলকে সতর্ক করে দেন যে যুদ্ধবিরতি তারা যেন ভঙ্গ না করে। ইরান এমন একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলো, যে শক্তি হিসেবে তারা দাঁড়াতে চেয়েছে। ইরান দৃঢ়ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা ইরান জানিয়ে দিয়েছে।

* অরি গোল্ডবার্গ, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশেষ করে ইরান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : রয়টার্স

ইরানে বোমা হামলার সঙ্গে জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার তুলনা করলেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার ঘটনার তুলনা করেছেন।

দ্য হেগে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) এ কাজটা (পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন) করতে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। বর্তমানে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ ভালোভাবেই চলছে।’

ট্রাম্প বলেন, ‘এ হামলাই যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু আমরা যদি এতে সফল না হতাম? আমি হিরোশিমার উদাহরণ টানতে চাই না, কিন্তু যেভাবে সেই হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামিয়েছিল, এটাও তেমনই এক আঘাত ছিল। এই হামলা এবারের যুদ্ধের ইতি টেনেছে। যদি আমরা ওটা (ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা) ধ্বংস না করতাম, তারা (ইরান) এখনো লড়াই চালিয়ে যেত।’

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে দ্য হেগে এক বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘এ ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য ছিল...খুবই বিভ্রান্তিকর।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলেছে, “আমরা জানি না, এটা খুব ভয়াবহও হতে পারত।” তাদের কথাটা হয়তো ঠিক। কিন্তু আমার মতে, “আমরা জানি না” বলার কিছু নেই। ঘটনাটা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ আর ধ্বংসাত্মক।’

ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ না হলেও এই হামলার সাফল্য তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্পের ডানপন্থী সমর্থকেরা আগেই বলেছিলেন, এমন সামরিক হস্তক্ষেপ ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ নীতি এবং বিদেশি যুদ্ধে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে খাপ খায় না।

তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না এবং এই নির্ভুল ও সফল হামলা সেটা নিশ্চিত করবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, মার্কিন হামলা ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছে। তিনি একে ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার সঙ্গে তুলনা করেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতি টেনেছিল।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি হিরোশিমা কিংবা নাগাসাকির উদাহরণ দিতে চাই না, কিন্তু ঘটনাটি আসলে একই রকমের।’

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ‘এই হামলার মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি অন্তত কয়েক দশক পিছিয়ে গেছে। আমার মনে হয়, তারা আর কখনো এমন কিছু করার সাহস পাবে না।’

ট্রাম্পের বক্তব্যে সমর্থন রুবিও ও হেগসেথের

ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে মঙ্গলবার রাতে নেদারল্যান্ডসে পৌঁছান ট্রাম্প। সম্মেলনে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা দুজনই প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

হেগসেথ বলেন, ‘মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের একটি প্রতিবেদন, যাতে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল। আসলে এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।’

হেগসেথ আরও বলেন, প্রতিবেদন ফাঁসের সম্ভাব্য ঘটনা নিয়ে এফবিআই তদন্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেন, যারা প্রতিবেদনটি ছড়িয়েছে, তারা সেটিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটাই তো ওদের চালাকি।’

এ তিনজনই গণমাধ্যমে প্রকাশিত গোয়েন্দা মূল্যায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোর কঠোর সমালোচনা করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে। পাশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের। ছবি: রয়টার্স ২৪ জুন, ২০২৫

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে পারেনি মার্কিন হামলা

একটি প্রাথমিক গোপন মার্কিন রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে মাত্র কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়েছে। এই রিপোর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হামলায় দু’টি স্থাপনার প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়া গেলেও ভূগর্ভস্থ ভবনগুলো ধসে পড়েনি। এসব কথা বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে। তাতে বলা হয়, হামলার আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলেছিল, ইরান যদি দ্রুততার সঙ্গে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করে, তবে তাতে প্রায় তিন মাস সময় লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা এবং ইসরাইলি বিমান বাহিনীর টানা কয়েকদিনের আক্রমণের পর, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) রিপোর্টে বলা হয়েছে, কর্মসূচিটি কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে, তবে তা ছয় মাসের কম সময়ের জন্য। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ হামলার আগেই সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে পারমাণবিক উপাদানের খুব কমই ধ্বংস হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই উপাদানগুলোর কিছু গোপন স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কিছু ইসরাইলি কর্মকর্তা মনে করে, ইরান হয়তো ছোট আকারের গোপন সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র চালু রেখেছে, যাতে বৃহৎ কেন্দ্রগুলো আক্রমণের শিকার হলেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। অন্য কিছু কর্মকর্তা বলেন, রিপোর্টে দেখা গেছে- ফরদো, নাতানজ ও ইস্ফাহান- এই তিনটি পারমাণবিক স্থাপনাই মাঝারি থেকে গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে নাতানজ ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তবে ইরান এসব স্থাপনা পুনঃনির্মাণের চেষ্টা করবে কিনা- তা স্পষ্ট নয়।

সাবেক কর্মকর্তারা বলেন, যদি ইরান দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চায়, তবে তা হবে অপেক্ষাকৃত ছোট ও অপরিপক্ব একটি বোমা। একটি ক্ষুদ্রায়িত ওয়ারহেড তৈরি করা আরও জটিল এবং সেই গবেষণার উপর কতোটুকু প্রভাব পড়েছে তা এখনো অজানা। বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন, ফরদো স্থাপনাটি যা একটি পাহাড়ের নিচে ২৫০ ফুট গভীরে অবস্থিত, তা ধ্বংস করতে একাধিক দিনের বিমান হামলার প্রয়োজন হবে। শনিবার মার্কিন যুদ্ধবিমান অন্তত দু’বার একই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। বি-২ বোমারু বিমান ফরদোতে ১২টি জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি) বোমা ফেলে। এগুলোকে ‘বাংকার বাস্টার’ বলা হয়। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ব্যবস্থাপক ব্রায়ান কার্টার বলেন, বর্তমানে ছয়টি বড় আকারের গর্ত ফরদোর ওপরে দেখা যাচ্ছে।

প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়েছে- তা অতিরঞ্জিত। কংগ্রেসে মঙ্গলবার হামলার বিষয়ে ব্রিফিং হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়েছে। সিনেটররা বৃহস্পতিবার এবং হাউজ সদস্যরা শুক্রবার ব্রিফিং পাবেন। হামলার পর থেকে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে উপদেষ্টাদের কাছে অভিযোগ করে যাচ্ছেন যে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টগুলো হামলার সফলতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে। তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তার প্রকাশ্য বক্তব্যও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

মঙ্গলবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ট্রাম্পের দাবি পুনরায় সমর্থন করে বলেন, আমরা যা দেখেছি এবং আমি সবই দেখেছি- তাতে স্পষ্ট, আমাদের বোমাবর্ষণ ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছে। আমাদের বিশাল বোমাগুলো প্রতিটি লক্ষ্যে নিখুঁতভাবে আঘাত করেছে এবং পুরোপুরি কাজ করেছে।

কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেন, পাঁচ পাতার এই গোপন রিপোর্টটি ছিল কেবল প্রাথমিক মূল্যায়ন এবং আরও বিশ্লেষণ আসবে যখন ইরান নিজে ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করবে ও আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনের ভেতরে যে রিপোর্ট দেখানো হয়েছে তা ‘মিশ্র’, অর্থাৎ চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনো বাকি। তবে ডিআইএ’র রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, এই সাইটগুলো প্রত্যাশার চেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ইরান এখনো তাদের অধিকাংশ পারমাণবিক উপাদান নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। অর্থাৎ তারা চাইলে খুব অল্প সময়েই আবার কর্মসূচি শুরু করতে পারে। রিপোর্টের তথ্য গোপন থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

হোয়াইট হাউস এই মূল্যায়নের তীব্র বিরোধিতা করেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, এই তথাকথিত মূল্যায়নের ফাঁস একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার উদ্দেশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হেয় করা এবং আমাদের সাহসী ফাইটার পাইলটদের সম্মানহানি করা। সবাই জানে, যদি ১৪টি ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের বোমা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে ফেলা হয়, তাহলে সেটা সম্পূর্ণ ধ্বংস ঘটায়।

ওদিকে সিএনএন আগে থেকেই গোয়েন্দা রিপোর্টের কিছু অংশ প্রকাশ করেছিল। কর্মকর্তারা বলেন, হামলায় ফরদোর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে ইরান কবে নাগাদ পুনরায় প্রবেশ করতে পারবে, বা পুনঃস্থাপন শুরু করতে পারবে- তা এখনো অনিশ্চিত। মিস্টার কার্টার বলেন, এই বোমা হামলায় তিনটি সাইটই ‘গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ইসরাইলের প্রাথমিক মূল্যায়নেও হামলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলেন, ভূগর্ভস্থ ফরদো সাইট পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি- এমন প্রমাণ তারা পেয়েছেন। হামলার আগেই মার্কিন সেনাবাহিনী বিভিন্ন সম্ভাবনার মাত্রা দিয়েছিল- সর্বনিম্নে কয়েক মাস, সর্বোচ্চ কয়েক বছর বিলম্ব হতে পারে বলে ধারণা ছিল। কিছু কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের অনুমান কখনোই নিখুঁত হয় না এবং ইরান যদি চায়, তাহলে তারা কতোদিনে পুনর্গঠন করতে পারবে তা বলা কঠিন।

ট্রাম্প ও হেগসেথ যদিও সাইটগুলো ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেছেন, তবে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ছিলেন তুলনামূলকভাবে সংযত। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করা। তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত ব্যাটল ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট অর্থাৎ যুদ্ধের পর চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এখনো বাকি। সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক কমান্ডার জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়ে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যথেষ্ট। তবে কিছু উপাদান টিকে থাকবে, এটা অপ্রত্যাশিত নয়। এজন্যই আমরা ব্যাটল ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট করি। কারণ সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী গেলেও বাস্তবতার ভিন্নতা থাকতে পারে।

সিনেটে মঙ্গলবারের শুনানিতে ডেমোক্রে?টরা আরও সংযত মন্তব্য করেন। সিনেটর জ্যাক রিড বলেন, চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি আমরা। সামরিক কর্মকর্তারা আগেই বলেছিলেন, ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে বেশি ক্ষতি করতে হলে একাধিক দফায় আঘাত করা প্রয়োজন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম দফার হামলার পরপরই তা বন্ধের ঘোষণা দেন। হামলার আগে মার্কিন গোয়েন্দারা বলেছিলেন, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে তাদের কাছে যথেষ্ট সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে- অর্থাৎ তারা চাইলে দ্রুত বোমা তৈরি করতে পারে।

যদিও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, এই ধরনের হামলা ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে প্ররোচিত করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো নিশ্চিত নয় যে, ইরান সে পথে এগোচ্ছে কিনা। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট

mzamin

পাকিস্তান পারমাণবিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, উদ্বিগ্ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ফরেন অ্যাফেয়ার্সের একটি নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এমন একটি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তারা আরও বলেছে যে, যদি পাকিস্তান একটি আইসিবিএম (আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র) অর্জন করে, তাহলে  ওয়াশিংটনের দেশটিকে পারমাণবিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকবে না। যদিও প্রতিবেদনে রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক জোটের উপর আলোকপাত করা হয়েছে, যা আমেরিকার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে ফরেন অ্যাফেয়ার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "যদিও পাকিস্তান দাবি করে যে তার পারমাণবিক কর্মসূচি কঠোরভাবে ভারতকে ঠেকানোর জন্য কেন্দ্রীভূত, তবুও  মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে  আইসিবিএম তৈরি করছে তা  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও  পৌঁছাতে পারে।"

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ধরনের ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে, পাকিস্তান হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরোধমূলক আক্রমণে তার অস্ত্রাগার ধ্বংস করার চেষ্টা করা থেকে বিরত রাখতে চাইছে অথবা ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে ভারতের পক্ষে হস্তক্ষেপ করার রাস্তা সাফ রাখতে চাইছে। এতে আরও বলা হয়েছে: "যাই হোক না কেন, মার্কিন কর্মকর্তারা   উল্লেখ করেছেন, যদি পাকিস্তান একটি আইসিবিএম অর্জন করে, তাহলে ওয়াশিংটনের দেশটিকে পারমাণবিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এমন আইসিবিএমধারী অন্য কোনও  দেশকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। সংক্ষেপে, ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক বিপদ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  আগ্রহের বিষয় ।" চীন যখন তার অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণের জন্য প্রতিযোগিতা করছে এবং রাশিয়া কয়েক দশক ধরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ত্যাগ করছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দেখতে পাচ্ছে। উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং সম্ভাব্য পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবেলা করার সময় একই সাথে দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করা।

পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে, মূলত আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে, বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষার পর। ১৯৯৮ সালে ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষার পর দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের তালিকায় যোগ দেয়। এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরণের পারমাণবিক অস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত কৌশলগত বিকল্পগুলোও  অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) বা ব্যাপক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (CTBT) স্বাক্ষর করেনি।  প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে দেশটির কাছে প্রায় ১৬৫টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

সূত্র : দ্য প্রিন্ট

mzamin

প্লাস্টিক নয়, দূষণের সম্ভাবনা বেশি কাচের বোতলে! সতর্ক করলেন বিজ্ঞানীরা

ফ্রান্সের খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থার প্রকাশিত এক  নতুন গবেষণায় দেখা গেছে - সোডা, ওয়াইন বা বিয়ারের মতো কাচের বোতলে বিক্রি হওয়া পানীয়তে প্লাস্টিকের বোতলের তুলনায় বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা থাকতে পারে। মানুষের চুলের প্রস্থের চেয়েও কয়েকগুণ ছোট হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। যা সময়ের সাথে সাথে  ছোট ছোট টুকরো হয়ে পরিবেশে মেশে।   মানুষ এবং অন্যান্য প্রজাতির দেহে প্রবেশ করে।  প্রায় সর্বত্রই এদের সনাক্ত করা গেছে।  মেঘের মধ্যে , সমুদ্রের গভীরতম অংশে , এমনকি  বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালার কাছেও।  ক্রমবর্ধমান গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই এবং যে খাবার খাই তার মাধ্যমে এই কণাগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করে স্ট্রোক, হরমোনের ব্যাঘাত এবং বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি করতে  পারে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন ,এই সম্ভাব্য বিষাক্ত কণাগুলোর  প্রাদুর্ভাব এবং কীভাবে মানুষ এগুলোর সংস্পর্শে আসে তা আরও ভালভাবে বুঝতে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে । 

পূর্ববর্তী গবেষণায় প্লাস্টিকের বোতলের একটি মূল উপাদানের সাথে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধির সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন, জার্নাল অফ ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে কাচের বোতলে বিক্রি হওয়া পানীয়তেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে। ফরাসি খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা ANSES-এর গবেষকরা  কোমল পানীয়, লেমোনেড , চা এবং বিয়ারের কাচের বোতলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ১০০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা খুঁজে পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাস্টিকের বোতল বা ধাতব ক্যানে পাওয়া পরিমাণের  চেয়ে এটি পাঁচ থেকে ৫০ গুণ বেশি হতে পারে। গবেষণার অন্যতম লেখক ইসেলিন চাইব এএফপিকে বলেছেন - 'আমরা যা ভেবেছিলাম, ঠিক তার উলটো ফলাফল এসেছে।  কাচের বোতল থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেল, প্লাস্টিকের মতো একই আকার ও রংয়ের পলিমার কম্পোজিশন বেরিয়েছে।'  গবেষণার তথ্য-পরিসংখ্যান খুঁটিয়ে দেখে জানা যাচ্ছে, বিয়ারের বোতলে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা থাকে, প্রতি লিটারে অন্তত ৬০টি।  সোডা বা লেমোনেডের বোতলে থাকে লিটার প্রতি ৪০টি কণা।  সাড়ে ৪ লিটারের পানির  কাচ ও প্লাস্টিকের বোতলে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার অনুপাত ৪.৫:১.৬।  অর্থাৎ এখানেই স্পষ্ট, প্লাস্টিকের বোতলের চেয়ে কাচের বোতলে দূষণ সৃষ্টিকারী কণার পরিমাণ বেশি।

সূত্র :  ইন্ডিপেন্ডেন্ট

mzamin